সৈয়দা নিগার বানু, তাওকীর ইসলাম সাইক, অমিত রুদ্র ও কাজী মামুন হায়দার
প্রকাশিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘গণসিনেমা লাস্ট কী হবে জানেন তো, একটা ইন্ডাস্ট্রি’
সৈয়দা নিগার বানু, তাওকীর ইসলাম সাইক, অমিত রুদ্র ও কাজী মামুন হায়দার

১৬ জানুয়ারি ২০২৫, বিকেল পাঁচটা, ৫২৭/ই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন
সৈয়দা নিগার বানু আপা হঠাৎই ফোন করে জানালেন রাজশাহী আসছেন। তার সঙ্গে যে অনেক আগে থেকে পরিচয় ছিলো, এমন নয়। অল্প দিন হলো তার সঙ্গে কথা হচ্ছে, তাও মোবাইল ফোনে। ফলে তার সঙ্গে দেখা হওয়া নিয়ে আমাদের আগ্রহ ছিলো। তিনিও জানালেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সঙ্গে বসতে চান। আমরা জানালাম কেবল একবার বসলে হবে না, যে কয়েকদিন রাজশাহী থাকবেন আমাদের সময় দিতে হবে। নিগার আপার দিক থেকেও আমাদের এই আবদারে মৌনসম্মতি পাওয়া গেলো। জানুয়ারি ২০২৫-এ আপা যে কয়েকদিন রাজশাহীতে ছিলেন, প্রায় প্রতিদিনই তার সঙ্গে দেখা ও কথা হয়েছে নানা বিষয় নিয়ে। ওয়েস্ট লন্ডনের ফিল্ম স্কুলে পড়ালেখা করার আগে নিগার আপা মূলত টেলিভিশনেই কাজ করতেন। পড়ালেখা করে দেশে ফিরে সেটা আর করতে চাননি। তখন চলচ্চিত্রই তার প্রধান আরাধ্য। সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় আর থাকবেন না, ফিরে যাবেন নিজের শহর খুলনায়। সেখানেই শুরু হলো তার চলচ্চিত্রযুদ্ধ। পৈতৃক বাড়িতে গড়ে তুলেছেন চলচ্চিত্রের সংগঠন; বন্ধুদের কাছ থেকে মুষ্টির চালের মতো জমানো টাকায় সেখানেই গড়ে তুলেছেন চলচ্চিত্র দেখার থিয়েটার। আট বছর ধরে প্রত্যন্ত এক গ্রামে গিয়ে তাদের নিয়ে নির্মাণ করেছেন ‘গণসিনেমা’। সেই সিনেমা প্রকল্পে প্রযোজক থেকে দর্শক পর্যন্ত সবাই ওই গ্রামেরই। নিজে নির্মাণ করেছেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নোনা পানি (২০২৩)।
‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আখড়ায় বসে নিগার আপাই বললেন রাজশাহীর নির্মাতা তাওকীর ইসলাম সাইক-এর সঙ্গে কথা বলতে চান। সাইক তার মতোই চলচ্চিত্রযোদ্ধা! ঢাকার বাইরে রাজশাহীতে থেকে প্রতিদিন যুদ্ধ করে যাচ্ছেন চলচ্চিত্র নিয়ে। ‘শাটিকাপ’খ্যাত তাওকীরকে নিগার আপার কথা বলতে তখনই দেখা করার আগ্রহ দেখালেন। কিন্তু তখন সম্ভব ছিলো না। ফলে পরেরদিন বসার সময় ঠিক করা হলো বিকেল পাঁচটায়। ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ নিগার আপা, তাওকীর, ফুটপ্রিন্টের নির্বাহী প্রযোজক অমিত রুদ্র ও ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ সম্পাদক কাজী মামুন হায়দার বসেছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আখড়ায়। সেখানেই দীর্ঘ আড্ডায় কথা হয় চলচ্চিত্র নিয়ে। সেই আলোচনার শেষ পর্ব পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। [সম্পাদক]
সৈয়দা নিগার বানু : আমি একটু বলি, হীরালাল সেন আর দাদাসাহেব ফালকে-ইতিহাসটা তো দাদাসাহেব ফালকেকে নিয়ে গড়ে উঠেছে, হীরালাল সেন কিন্তু আসছে না। ওই সময়টা কমার্শিয়াল ফিল্মের ব্যবসাও রমরমা ছিলো, কিন্তু স্পেস কম ছিলো। তা না হলে আদুর গোপালকৃষ্ণানকে কো-অপারেটিভ ফিল্মে যেতে হতো না। এই স্ট্রাগল থাকবে ভাই!
তাওকীর ইসলাম সাইক : আমি এটা একদমই বলছি না আপা!
নিগার বানু : আমি তো দর্শককে সেন্সেবল হন, এই আশ্বাস দিয়ে নিয়ে আসতে পারবো না।
সাইক : আমি বলতেছি যে, আমাদের আসলে গল্প বলার ক্ষেত্রে-ধরেন ফিল্মমেকার হিসেবে তো আমি রিজিড থাকতেই পারি, আমি এই ধরনের সিনেমাই বানাবো, ভাই দেখলে দেখো, না দেখলে সমস্যা নাই। কিন্তু আমরা কি আরেকটু ইয়ে হতে পারি না। যেমন ধরেন, আপনার যে সিনেমা এটা তো গণমানুষের সিনেমা, গণমানুষ বানিয়েছে। ফলে আরেকজন গণমানুষের কাছে তো এই সিনেমা আকর্ষণীয় হওয়ার কথা! সেটা কিন্তু হচ্ছে না!
মানে ও তো সিনেমা বুঝছেও না, দেখছেও না। তাহলে আমরা আর একটু সহজ করে বানাতে পারি কি না, যে সিনেমাটা আসলে ব্রিজ হিসেবে কাজ করবে।
নিগার বানু : মানে মিডল ফিল্ম?
সাইক : যে সিনেমাটা কিনা দর্শককে আস্তে আস্তে এইখানে নিয়ে আসবে। আমরা এখন এমন একটা বাজারের মধ্যে আছি ...।
নিগার বানু : আমি একটু আপনাকে ইন্টারাপ্ট করছি। দেখেন যদি কমার্শিয়াল ফিল্ম না থাকে, তাহলে কিন্তু আর্টফিল্ম থাকবে না।
সাইক : সেটা তো থাকবেই না, একদমই থাকবে না।
নিগার বানু : কারণ ১০টা কমার্শিয়াল ফিল্মের পাশে যদি দুইটা আর্টফিল্ম হাউজ থাকে, তাহলেই সেটা চলবে। আমি আর একটা জিনিস বিশ্বাস করি প্রোডিউসারকে পথে বসিয়ে আমার কোনো লাভ নাই। আমি যদি একজন প্রোডিউসারকে ধরে তার রক্ত চুষে খাই, তাহলে সে পালিয়ে যাবে। বরং আমি যদি প্রোডিউসারের কাছে ১০০ টাকা নিই, তাকে ১০১ টাকা ফেরত দেওয়ার নিয়ত থাকতে হবে। যাতে ও পরে আরেকটি সিনেমা করতে আগ্রহী হয়। আমি নিজেকে এই ঘরানার ফিল্মমেকার মনে করি। যাই বলি না কেনো, দিনশেষে ফিল্মের সঙ্গে কমার্স যুক্ত। ফলে যে কমার্স ইনভেস্ট করছে, ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে তাকে ওই টাকা ফেরত দেওয়া তার দায়িত্ব। আবার যিনি ইনভেস্ট করছেন তারও দায়িত্ব ক্রিয়েটিভিটিটাকে প্রমোট করা।
আমরা একসময় মনে করেছিলাম, সিনেমা ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ হলো ডিশলাইন। কিন্তু ঘটনা হলো অন্য দেশে তো ডিশ ছিলো, তাদের সিনেমা তো ধ্বংস হয়নি! এখন আবার মনে করছি ডিজিটাল প্লাটফর্ম; তাহলে অন্য দেশের সিনেমাহলগুলো রমরমা হচ্ছে কীভাবে?
তার মানে হলো, আমাদের অ্যাপ্রোচে কোথাও একটা প্রবলেম আছে। যেমন ধরেন, কেনো নোনা পানি খুলনার ১৫ লাখ মানুষের মধ্যে ১৫,০০০ মানুষ দেখবে না। ১৫,০০০ মানুষও যদি এটা ১০০-২০০ টাকা টিকিট কেটে দেখে, তাহলে বিনিয়োগের অনেক টাকাই তো উঠে যেতো। কিন্তু প্রোডিউসারকে ওই ভাবনাটা ভাবতে হবে। নির্মাতাকে নিয়ে যৌথভাবে তাকে ভাবতে হবে যে, আমার প্রোডাক্টটা যেনো আমি সেল করতে পারি। ধরেন, ‘শাটিকাপ’টা না হয় ‘চরকি’ নিয়েছে; যদি না নিতো তাহলে হয়তো আপনারা দেখানোর ব্যবস্থা করতেন। এছাড়া এখন তো আরো বড়ো বড়ো প্লাটফর্ম আছে, বড়ো বড়ো জায়গা আছে। বিপরীতে এগুলোও কিন্তু আবার বড়ো বড়ো জায়গা আটকে দিচ্ছে। ফলে আমরা যে এতিম, সেই এতিমই থেকে যাচ্ছি। যতোই দরজা খুলুক না কেনো, সেখানে মহারথীরা দাঁড়িয়ে আছে। আমাদেরকে সেই দরজায় ঢুকতে দেবে না, সেটা খুব সহজও না। ফলে আমাদের নিজেদের দরজা নিজেদেরই বানাতে হবে।
অমিত রুদ্র : ওই যে বললেন, ১৫,০০০ মানুষও দেখছে না! এখন প্রশ্ন হলো, ওই মানুষগুলো কি দেখার সুযোগ পাচ্ছে?
তাওকীর : এগ্জ্যাক্টলি, ওই মানুষগুলো আসলে এটা জানেই না। ওদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। আর আমরা সংখ্যায়ও অনেক কম।
কাজী মামুন হায়দার : এক্ষেত্রে অবশ্য ‘শাটিকাপ’ টিম একটা কৌশল ব্যবহার করেছিলো। আমি যতোদূর জানি, ‘চরকি’ ওদেরকে ঢাকায় প্রিমিয়ারের কথা বলেছিলো, কিন্তু ওরা বলেছিলো, যেহেতু এটা পুরোপুরি রাজশাহীতে নির্মিত, তাই প্রিমিয়ারটা রাজশাহীতে করতে চাই। ‘চরকি’ অবশ্য এটাতে কোনো বাধা দেয়নি।
নিগার বানু : আমিও তো নোনা পানির প্রিমিয়ার খুলনাতে করেছি। ২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নোনা পানির প্রিমিয়ার হয়েছে। ৮০০ দর্শক একসঙ্গে বসে এটা দেখেছে।
অমিত : ‘শাটিকাপ’-এর প্রিমিয়ার তার কয়েকদিন আগে হয়েছে, ২০২২-এর জানুয়ারির ১৩ তারিখে।
মামুন হায়দার : তার মানে চিন্তার জায়গায় আমরা সবাই খুব কাছাকাছি আছি [সবার হাসি]।
নিগার বানু : বেঙ্গল আমাকে বলেছিলো, আপনি মার্কেটিং পলিসি কীভাবে করছেন? আমি বলেছি, আমার সারাদেশের দর্শক দরকার নাই। এতো দামি পোস্টারেরও দরকার নাই আমার। আপনি খুলনার ১০ লাখ দর্শককে ধরেন, যারা ২০০ টাকা করে টিকিট কেটে নোনা পানি দেখবে। আমরা ব্র্যান্ডিং করবো, ‘এটা খুলনার সিনেমা, খুলনার মানুষের সিনেমা, খুলনার প্রোডাক্ট’-এটা আপনারা দেখেন। মানুষ কিন্তু ২০০ টাকা টিকিটে অবশ্যই এটা দেখতে আসবে, সেটা সিনেমাহলে কিংবা অন্য যেকোনো জায়গায় চলুক।
মামুন হায়দার : এই ঘটনাটা কিন্তু ‘শাটিকাপ’-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছিলো। রাজশাহীর মানুষ মনে করতে থাকলো, এটা ওদের জিনিস! এখানে যেহেতু প্রচুর বাইরের মানুষ আছে, তারা এলাকায় গিয়ে একই কথা বলতে থাকলো যে, রাজশাহীতে একটা ওয়েবসিরিজ হয়েছে। ফলে তারাও সেটা দেখেছে।
নিগার বানু : শোনেন, আমাদের ফিল্মগুলোর স্টাইলটা এ রকম হবে-যে যার জায়গায় ফিল্মটা দেখাবে। ওইটা দেখে আরেকজন ডিরেক্টর উৎসাহী হবে। আর যেটা করতে হবে, স্বত্বটা নিজের কাছে রাখতে হবে। এটা আমাদের জন্য একটা বড়ো স্ট্রাগল! এই দেখেন নোনা পানি নিয়ে যা হচ্ছে, ‘বেঙ্গল’ না গিলতে পারে, না ফেলে দেয়! আমি একটা ফিল্ম পয়দা করলাম, বাচ্চা জন্ম দিলাম, অথচ আমার কোনো অভিভাবকত্ব নাই!
সাইক : ধরেন ‘শাটিকাপ’-এর সময় এই জ্ঞানটা ছিলো না। জ্ঞান ছিলো না মানে কী, তখন সাহস ছিলো না। তবে ‘সিনপাট’-এর সময় আমরা প্রচুর ফাইট করেছি। এখন নতুন প্রজেক্ট করলে এটা মাথায় রাখতে হবে। এই যে দেলুপি প্রজেক্টটা তো এভাবেই করা-টাকা নাই, কোনো ফাইন্যান্সার নাই। ভাই, দরকারই তো নাই, আমরা তো চাইনি।
নিগার বানু : বরং আমরা এক্সপার্টিজ ধার নিতে পারি। যেমন, আমাদের প্রথম দিককার ফিল্মের বাজেট ছিলো ৩,০০০ টাকা। ক্যামেরায় যে কাজ করেছে একেবারে পেটেভাতে। পরে অবশ্য ওই ফিল্মটা ৪০,০০০ টাকা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। ওই টাকা দিয়ে পরে আমরা আরেকটা ফিল্ম বানিয়েছি। ওই ফিল্মটা দেখে একজন প্রোডিউসারের পছন্দ হয়েছে, তখন তিনি বললেন, আমাকে একটা ডকুমেন্টারি বানিয়ে দাও। ওই ডকুমেন্টারির টাকা দিয়ে আরেকটা বানিয়েছি। মানে মাছের তেলে মাছ ভেজে ভেজে আমরা বেঁচে আছি আরকি!
তবে বড়ো ফিল্মটার জন্য আর পারলাম না; যদিও ওটা একটা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হয়েছিলো। তবে অনেক সমস্যা গেছে! ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ফিল্ম বানাই আর না বানাই ‘বেঙ্গল’-এর (বেঙ্গল ফাউন্ডেশন) সঙ্গে আর কাজ করবো না।
সাইক : কেবল ‘বেঙ্গল’ না আপা, যে প্রোডিউসারের সঙ্গেই কাজ করেন এখানে, একই অবস্থা।
অমিত : আমাদের প্রোডিউসারদের ইমিডিয়েট কিছু রিটার্ন দরকার পড়ে। আপনি যেটা বললেন না, বিক্রি করতে পারলে সবই বিক্রি করা যায়, কিন্তু এদের বিক্রি করার সেই ধৈর্যটা নাই।
মামুন হায়দার : আমি আসলে ব্যাপারটা অন্যভাবে একটু ব্যাখ্যা করতে চাই। ‘বেঙ্গল’-এর আসল উদ্দেশ্য তো সিনেমা বানানো নয়। তারা চায় টোটাল রাষ্ট্রকাঠামোতে ওর যে প্রভাব আছে, তা যে ভিজ্যুয়ালেও আছে, সেটা প্রমাণ করা।
সাইক : এছাড়া তাদের তো আর্ট পিচ কিনে রাখারও একটা ধান্দা আছে।
মামুন হায়দার : সেটা খানিকটা অন্য জিনিস। এটার শুরুটা মনে হয় এস এম সুলতানকে দিয়ে। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক আর আহমেদ ছফাকে দিয়ে ওরা সুলতানের যা যা রেখেছে, তা দিয়ে ওদের কয়েকটা জেনারেশন চলে যাবে।
নিগার বানু : মানে কিউরেটিং করা।
মামুন হায়দার : আমার মনে হয়, বিষয়টা ওটাও নয়। ওদের তো নানা ব্যবসা আছে, দখলদারিত্ব আছে। ফলে রাষ্ট্রকে যদি ও নানা জায়গা থেকে চাপের মধ্যে না রাখতে পারে, তাহলে তো সমস্যা। গোলাম রাব্বানী বিপ্লব-এর যে সিনেমাটা-বৃত্তের বাইরে-অজপাড়াগাঁয়ের একজন বাঁশিবাদককে তুলে এনে শহুরে স্টার বানানোর যে প্রক্রিয়া; এই সিনেমা করে তো বিপ্লব ভাই হারিয়ে গেলেন একেবারে। আমাদের ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এ এই বিষয়টা নিয়ে একটা প্রবন্ধও লিখেছিলাম আমি-‘বৃত্তাবদ্ধ বৃত্তের বাইরে : বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের ফাঁদে চলচ্চিত্র গুমরে কাঁদে’ (ম্যাজিক লণ্ঠন, সংখ্যা ৯, জুলাই ২০১৫) এই শিরোনামে। ওই সিনেমাতে বিপ্লব ভাই ‘বেঙ্গল’-এর এই রাজনীতিটাই তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশে ‘প্রথম আলো’, ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’, ‘চ্যানেল আই’-এরা হচ্ছে কালচারাল মাফিয়া। এরা বাংলাদেশের মানুষের পুরো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে কন্ট্রোল করে বা করতে চায়। গত ১৫ বছরে এদেরকে নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে।
নিগার বানু : ইমপ্রেস টেলিফিল্ম-এর ডেস্কে আমি কাজ করেছি দুই বছর; ওদের ফিল্মগুলো বিভিন্ন ফেস্টিভালে পাঠানোর জন্য। ওই প্রথম আমি দেখেছি, ফেস্টিভাল পলিটিক্স কী জিনিস! যে টাকা খায় তাকে টাকা, যে মদ খায় তাকে মদ-সোজা কথা যেকোনো মূল্যে অ্যাওয়ার্ডটা তাদেরকে নিতে হবে। একবার শাইখ সিরাজ আমাদেরকে অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন ম্যাগসেসে পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে। আমরা তখন ভাবলাম কীভাবে এটা করবো, আমরা তো চুনোপুঁটি। তখন দেখেছি এই ধরনের হাউজগুলো কীভাবে মাফিয়ার মতো কাজ করে। ওদের কাছে আমরা একেবারে শিশু!
মামুন হায়দার : নিগার আপা, একেবারে ঠিক কথা বলেছেন, ওদের কাছে আমরা আসলেই শিশু! বৃত্তের বাইরে সিনেমাটাতে এগুলো সব আছে। আমি যতোখানি জানি, এই সিনেমাটার জন্য রাবেয়া খাতুন [বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন] পর্যন্ত ফোন করেছিলেন বিপ্লব ভাইকে-এটা বন্ধ করো। বৃত্তের বাইরে সাতদিনের জন্য একটা মাত্র সিনেমাহলে মুক্তি পেয়েছিলো। তার পর সিনেমাটা হারিয়ে যায়। বিপ্লব ভাইয়ের প্রথম ফিচার ফিল্ম ছিলো স্বপ্নডানায়, ওটা আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার পেয়েছিলো। অথচ বৃত্তের বাইরে করার পর বিপ্লব ভাই নিজেই বৃত্তের বাইরে চলে গেলেন।
নিগার বানু : আমাদের খুব বেশি পলিটিক্সের মধ্যে যাওয়ার দরকার নাই। কারণ পলিটিক্স যারা করবে, তারা তো আর ক্রিয়েটিভ কিছু করবে না। কিন্তু একটা বিষয় আছে এখানে, নিজেকে বিক্রি করার আগে জেনে-বুঝে একটু বিক্রি করা। বিশেষ করে কে আমাকে নিয়ে বিজনেসটা করছে, তা একটু বুঝে নেওয়া।
মামুন হায়দার : সাইক, একটা বিষয় যদি খেয়াল করো, একটা বিষয় নিয়ে কিন্তু একই সময়ে অনেকে চিন্তা করে।
অমিত : আপা, যেটা বললেন, নিজেদের মধ্যে এক্সপার্টিজ শেয়ার করা; সেটাও ধরেন আমরা করতে পারি। মানে ফাইন্যান্সিয়ালি কিছু করতে পারছি না, তাহলে এক্সপার্টিজ শেয়ার করছি।
সাইক : ওই পার্টনারশিপটাই তো আমরা করছি বা করার চেষ্টা করছি। এখন কথা হলো গণসিনেমার যে এক্সপেরিয়েন্সটা আপা শেয়ার করলেন, ওইটা আমাদের অনেক হেল্প করবে।
মামুন হায়দার : সেটা তো অবশ্যই। এটা দেখে কেউ তার গ্রামে গিয়ে এ ধরনের একটা প্রজেক্ট করতে চাইতে পারে।
সাইক : সেটা হতেই পারে, কিন্তু বেসিক যে আন্ডারস্টান্ডিং মানে আপা যে কথা বলছেন, কেউ যদি ওই ট্রেনিং প্রোগ্রামটা না করে; মানে সে যদি কেবল আইডিয়াটা নিয়ে যায়, মানে বেসিক বোঝাপড়া ছাড়াই কিছু করতে যায়, তাহলে সেটা নিয়ে সমস্যা হতে পারে।
নিগার বানু : আমি যখন গণসিনেমা নিয়ে রিসার্চ পেপারটা লিখছিলাম-এটা নিয়ে যারা কাজ করতে আগ্রহী তারা কীভাবে শুরু করতে পারে। একটা জিনিস বোঝা জরুরি, যিনি, যেখানেই কাজ শুরু করুক, তাকে তার মতো করে কিছু রিফর্ম করতে হবে।
সাইক : অবশ্যই, ও যদি নিজের মতো করে ওইখানে কিছু জিনিসপত্র না করতে পারে তাহলে তো ... ।
নিগার বানু : আমি আসলে রিফর্ম মানে বলছি, আত্মবিশ্লেষণ। আত্মবিশ্লেষণ মানে হলো নিজের সঙ্গে নিজে ওথ করা। এটা না করলে ওই মোটিভেশনটা কিন্তু সে পাবে না, এটা সোজা কথা। এই ওথটা এইরকম যে, ভাই আমি সবার পেছনে থাকবো। আমি অ্যাওয়ার্ড পাবো না। কেউ আমাকে চিনবে না। এই জাতীয় কিছু বিষয় নিজের সঙ্গে নিজে বলে নেওয়া। মানে আশা ভঙ্গ না হওয়া।
এর পর সে যখন কাজ করবে তাকে মাথায় রাখতে হবে, যদি গণসিনেমা করতে হয়, তাহলে এর সামনে-পেছনে কোথাও আমি নেই। আমি হচ্ছি ক্যাটালিস্ট। আমি উজ্জীবিত করবো, প্রয়োজনীয় শিক্ষাটা দেবা, প্রশিক্ষণটা দেবো, তারপর ওরা যেভাবে কাজ করবে, সেটাকে শুধু হালকা করে গাইড করবো। কিন্তু আমি আমার ইন্টেলেক্ট সেখানে ইম্পোজ করবো না। এটা না করতে পারলে গণসিনেমার ফ্লেভারটা পাওয়া যাবে না-যে গল্পটা হবে সেটা ওদের হবে না, আমার ভার্সন হয়ে যাবে। সেটাতে ক্ষতি নাই, পৃথিবীতে সব জায়গায় হচ্ছে সেটা। কিন্তু গণসিনেমার কনসেপ্টটাকে যদি আমি ধরতে চাই তাহলে এর বেসিক জিনিসটা হলো এই।
সাইক : কিন্তু এই গণসিনেমার পরবর্তী ধাপ যেটা, ধরেন ওই গ্রামের ছেলেমেয়েরা যদি সিনেমা বানাতে চায়, অথবা ধরেন এই গণসিনেমার কোনো আইডিয়া থেকে আমি ইন্সপায়ারড হলাম এবং চিন্তা করলাম আমি আমার জায়গার গল্পটা বলবো গণসিনেমা স্টাইলে। তার মানে আমি হলাম গণসিনেমার ওই মানুষটা, যে মানুষটা কিনা এটা থেকে ইন্সপায়ারড হয়ে এটা করছি। নিজেই আমি একটা সিনেমা বানাতে চাই। ধরেন, আমি একেবারে নতুন, আমি আপনার কাছ থেকে আইডিয়াটা নিলাম।
নিগার বানু : এই গণ মানে কিন্তু হায়ার পিপল না, এটা পলুরালিস্টিক।
সাইক : না ঠিক আছে, গণ’র মধ্যে তো আমিও আছি। তাহলে আমি সিনেমা বানানোর জন্য অন্যদের জোগাড় করলাম, এখন আমি আমাদের সিনেমাটা বানাবো। আমরাই এই সিনেমার মালিক, এই সিনেমার যতো জায়গা আছে, সব জায়গাতেই আমরা আছি।
নিগার বানু : কিন্তু গল্পটা যখন বাছাই করবেন, তখন কেবল আপনি যেনো না থাকেন।
সাইক : আমি তো আমার অঞ্চলের গল্প বলছি, আমার গল্প বলছি।
নিগার বানু : তাহলে তো এটা ইনডিভিজ্যুয়াল হচ্ছে।
সাইক : না না, এটা না।
নিগার বানু : গণসিনেমা লাস্ট কী হবে জানেন তো, একটা ইন্ডাস্ট্রি। যে ইন্ডাস্ট্রি থেকে নতুন ধরনের গল্প বের হবে-প্রতিটা মানুষের গল্প তো আলাদা। আর ইন্ডাস্ট্রি মানে সেখানে কর্মসংস্থান হবে; মূলত একটা আর্ট ফ্যাক্টরি হবে। তা না হলে তো আমরা সাসটেইন করতে পারবো না।
সাইক : ওই জায়গাতেই আসছি আপা। গণসিনেমাটা হচ্ছে প্রথম ধাপ, এটা হওয়ার পরে যখন অন্য জিনিসপত্রগুলো হচ্ছে, তখন তো আমিও একজন ফ্যাক্টরি লেবার। তার মানে প্রথমে আপনি ছিলেন টিচার, যে কিনা অন্যদের ট্রেইন করেছে, তার পর একটা সিনেমা হয়েছে। এর পর আমি চিন্তা করলাম, এই ফ্যাক্টরিতে মানুষজন নিয়ে একটা মেশিন দেবো; তখন সেও কি এটাই ফলো করবে, ওরা বানাবে আমি পেছনে থাকবো?
নিগার বানু : না না। আপনি তো ক্যাটালিস্ট। আপনার লিডার হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। লিডার হওয়ার বিষয়টাকে আপনার সাপ্রেস করতে হবে। বলতে হবে, ভাই, আমি কখনো লিডার হবো না, কেউ চিনবে না, কিন্তু ফিল্ম বের হবে। তাহলেই ফিল্মের আসল জিনিসটা আসবে, তাছাড়া হবে না। সিনেমার ডিরেক্টর হবে এভাবেই। আমাদের ডিরেক্টর ছিলো ‘ফটিক দল’ মানে সেখানে আটজন ডিরেক্টর ছিলো।
মামুন হায়দার : আমার মনে হচ্ছে সাইক যেটা বলতে চাচ্ছে, আইডিয়াটা ওখান থেকে নিয়ে ডিরেক্টর তার মতো করে ...
নিগার বানু : সেটা তো হচ্ছেই, তানভীর মোকাম্মেল কিংবা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সেটা তো করছেই। আমরা সেই ঘরানার কথাই বলছি। ফারুকীর টেলিভিশন, সেখানে কি উনি ওই অঞ্চলের গল্প বলছেন না!
মামুন হায়দার : আবার আমরা যদি তোমার [তাওকীর ইসলাম সাইক] কাজ ধরি, তাহলে সেটা নিগার আপা ও ফারুকীর মাঝামাঝি জায়গার একটা কাজ। সাইকের কাজ কিন্তু এগুলো থেকে ডিফারেন্ট-সেটা আপার কাজও না, ফারুকীর কাজও না।
সাইক : আমি কেবল আপার ওই কনসেপ্টটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম, তিনি যে জায়গাটায় সিনেমা বানিয়ে আসলেন, এর পরে যে ছেলেটা ওখানে উদ্যোগটা নেবে, সেও আপার দায়িত্বটাই পালন করবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় আমার কাছে যেটা কঠিন লাগছে, সেটা হলো আপা যে ইন্ডাস্ট্রির কথা বলছেন, সেটা হাইলি ক্রিটিকাল।
নিগার বানু : যদি আমরা একেকজন করে একটা টিম করে দিই, তাহলে না গল্পের ভেরিয়েশনটা আসবে। ওই মানুষগুলো ট্রেইন আপ হবে। কারণ আমাদের তো ট্রেনিং স্কুল নাই আলাদা করে, ফলে ও তো ফিল্ম বানাতে বানাতে শিখবে আসলে। প্রক্রিয়াটাই এ রকম। ধরেন, একটা গ্রামে পাঁচটা ফিল্ম হলো; এইবার এর ভেতর দিয়ে যদি পাঁচটা ছেলে বা মেয়ে তৈরি হয়ে যায়, ওরা কিন্তু তখন ওদের মতো করেই প্রফেশনাল কিছু খুঁজে বের করবে। কেউ হয়তো স্টুডিও দেবে, কেউ সিনেমাটোগ্রাফি করবে, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলবে। এভাবে ১০-১২টা গ্রামে যদি এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে যায়, তখন বাজারটা তৈরি হবে। ওরা তখন ওই সিনেমা নিয়ে এসে, খুলনা বা রাজশাহীতে দেখাবে। যদি সেগুলো পপুলার বা হিট করে যায় ‘শাটিকাপ’-এর মতো, তখন সিনেমাহলগুলো দেখাতে আগ্রহী হবে।
আমি ভেবেছি, অনেকভাবে অনেকগুলো সিনেমা হোক, তার ভেতর কোনোটা না কোনোটা তো ক্লিক করবেই। ক্লিক হলেই সেটা রিপিট হবে, এমনকি ওয়ান, টু, থ্রি পার্ট হতে পারে। কোনো সমস্যা নাই, কিন্তু মূলধারাটা হবে এটাই। আর এটার সঙ্গে যারা যুক্ত থাকবেন, তাদেরকে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করতে হবে, এটা সোজা কথা। একেকটা দল করে, তাদেরকে এক্সপার্ট করে ছেড়ে দিতে হবে; তখন হবে কী, গল্পগুলো একটা নতুন ধরনের ভাষা খুঁজে পাবে।
সাইক : ওই সেইম জিনিসটা কিন্তু আমরাও করছি আপা। কিন্তু একটা বিষয় যেটা মনে হচ্ছে, আপার যে প্রক্রিয়া সেখানে তিনি মাস্টার তৈরি করতে চান। যে মাস্টাররা আসলে সন্ন্যাসী। এই সন্ন্যাসীরা নিজের লাভ ছাড়া বলবে, ভাই, এখানে আমার ওই আগ্রহ নাই, আমার এক্সপার্টিজ দিয়ে এই সিনেমাটা হোক।
নিগার বানু : এক্সপার্টিজ তো একসময় ক্লিশে হবেই ভাই। যখনই দেখবেন একটা মানুষ ২৫টা ফিল্ম বানাচ্ছে, তখন ২৬তম ফিল্মটা তিনি ভালো নাও বানাতে পারেন। আমার গণসিনেমার কনসেপ্টটা একটা কারণেই-আমরা নতুনরা মানে নারী হিসেবে আমি কোনো জায়গা পাইনি জানেন। সত্যি সত্যি নারী হিসেবে কোনো জায়গা না পাওয়ায় আমাকে তৃতীয়, চতুর্থ নম্বর একটা কনসেপ্ট দাঁড় করাতে হয়েছে নিজের থেকে। যদি আমি জায়গা পেতাম, তাহলে এগুলোতে আসতাম না, আমি ডিরেক্টর হয়ে যেতাম, মানুষ আমাকে দেখে হই হই করতো, অটোগ্রাফ নিতো। আই অ্যাম নট সেলঅ্যাবল, ঠিক আছে? এজন্যই আমাকে এই ধরনের একটা কনসেপ্ট দাঁড় করাতে হয়েছে। হয়তো এই কনসেপ্টটা কাজ করবে, কিংবা করবে না। সেটা আমরা জানি না। কিন্তু শুরু করলাম।
আমি মনে করি, যতোদিন না সবকিছু ডিসেন্ট্রালাইজ হবে, ততোদিন শিল্প-সাহিত্যের কোনো মুক্তি নেই। ইন্সটিটিউট কোনো আর্ট তৈরি করবে না, আর্টিস্ট তৈরি করবে না। করলে, এতো আর্ট ইন্সটিটিউট থেকে কতো আর্টিস্ট বের হতো! সেটা কিন্তু হচ্ছে না। একটি সার্টিফিকেট কিংবা চাকরির জন্য ওই ডিগ্রি যথেষ্ট। কিন্তু সার্টিফিকেট দিয়ে কি আর আর্টিস্ট তৈরি হবে! আর আমার কনসেপ্টটা শুনতে একটু খটমট লাগছে হয়তো-আমি এতো কাজ করবো অথচ কেউ আমাকে চিনবে না, এটা কোনো কথা হলো!
সাইক : না না মোটেও না। আপনার কাজ আর আপনাকে চিনতে পারা না-পারা দুইটা প্রসঙ্গ একেবারে আলাদা। তাহলে তো আমাদের ক্ষেত্রেও এটা হতো, এই কাজগুলোর পরে আমরাও ঢাকায় চলে যেতাম। আমার মনে হয়, এটা তো একেক জনের পছন্দ আরকি!
নিগার বানু : আমাদেরও সমস্যা আছে, আমরা কোনো সেন্টারে যেতে চাই না। ঢাকা যাবে কলকাতা, কলকাতা যাবে নিউ ইয়র্ক-এই ডিসেন্ট্রালাইজ করা। ভাই, আমাদের গল্প, আমাদের দেখার লোক আছে, প্রোডিউসার আছে-আমরা তামিল সিনেমা কি দেখতাম আগে? এখন খুঁজে খুঁজে দেখছি না!
মামুন হায়দার : মালায়লাম সিনেমা তো এর সবচেয়ে বড়ো এক্সামপল। ইন্ডিয়াতে সাত-আটটা ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে চলছে! আসাম পর্যন্ত ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপড করেছে; সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাদের গল্প কিন্তু তাদেরই গল্প!
নিগার বানু : হ্যাঁ, অস্কারে গেলো তো তাদের ভিলেজ রকস্টার!
মামুন হায়দার : আমরা কিন্তু এই কথাটাই বার বার বলার চেষ্টা করছি, ওরা যদি ছয়-সাতটা ইন্ডাস্ট্রি করতে পারে, আমার এখানে দুইটা ইন্ডাস্ট্রি হলে সমস্যা কোথায়! কেনো রাজশাহীতে একটা স্বাধীন ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়াবে না! এখানে সাইক, অমিতরাও কিন্তু এই স্বপ্নটা দেখছে। আমরা সবাই মিলে স্বপ্নটা দেখছি।
নিগার বানু : আমাদেরকে কিন্তু আল্টিমেটলি ওই ইন্ডাস্ট্রির স্বপ্নটাই দেখতে হবে। এখানকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রির স্বপ্নটা বুনতে হবে।
মামুন হায়দার : এইটা মানে সিনেমাকে যদি আমরা ডিসেন্ট্রালাইজ না করি, তাহলে এই দেশের সিনেমাকে বাঁচানো কঠিন হবে। মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রির দিকে দেখেন, ওরা এতো বছর ধরে কাজ করছে, ওদের সবকিছু মানে মিউজিক, পোশাক, গল্প, এমনকি বৃষ্টি সব একেবারে নিজেদের। ওরা হয়তো ভাষার ক্ষেত্রে এখন কিছুটা মাল্টি ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করছে।
নিগার বানু : সেটা তো ব্যবসার কারণে হতেই পারে। এখন দেখেন বলিউড কিন্তু ওদের কথা বলছে, মানে বাধ্য হচ্ছে। এখন যদি আমরা বিষয়গুলোকে একটু র্যাপআপ করি তাহলে যেটা দাঁড়াচ্ছে সেটা হলো, আমাদেরকে প্রথমে ইন্ডাস্ট্রির চিন্তা মাথায় রাখতে হবে; দ্বিতীয়ত আমাদের নিজেদের ল্যাঙ্গুয়েজটা খুঁজতে হবে-সেটা ভিজ্যুয়াল, সাউন্ড, মিউজিক, অ্যাক্টিং, কস্টিউম হোক আর মেকআপ হোক। তৃতীয়ত, আমাদের সমমনাদের ইউনিটিটা বাড়াতে হবে।
মামুন হায়দার : আমাদের মনে হয়, এর কোনো বিকল্প নাই। এক্ষেত্রে আমরা খানিকটা এগিয়েছিও। সাইক, অমিতরাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকার এক্সামপল। আমি এগুলো এখন সবখানে বলছি। ফুটপ্রিন্ট তো দুর্দান্ত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে। এখন কেবল ধৈর্য ধরে তা এগিয়ে নিতে হবে। গল্প যাই বলি না কেনো, নিজের জায়গাটা ছাড়া যাবে না। আপা যেমনটা বললেন, প্যারালালি কমার্শিয়াল সিনেমাই কিন্তু অন্য সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
সাইক : এটা অবিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নাই।
মামুন হায়দার : এর বাইরে আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে সিনেমার অ্যাকাডেমিক পরিসর নিয়ে কাজ করছি। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ চলছে ১৫ বছর ধরে।
নিগার বানু : অবশ্যই এটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এখানে গালাগালি করার লোক আছে, কিন্তু প্রকৃত ক্রিটিক নাই।
সাইক : অথচ ভালো ক্রিটিক ছাড়া কিন্তু ভালো ছবি হবে না।
নিগার বানু : এখানে ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার নাই, আমরা সবাই কেবল ডিরেক্টর হতে চাই। সিনেমায় অন্যান্য যে জায়গাগুলো আছে, যেমন ধরেন লাইন প্রোডিউসার, কস্টিউম ডিজাইনার, স্ক্রিপ্ট সুপারভাইজার আরো হাজারটা কাজ আছে, সেগুলো করার লোক নাই।
অমিত : আমরা এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই আসি হয় ডিরেক্টর হতে, না হয় অ্যাক্টর হতে!
সাইক : সবমিলিয়ে আপাকে আসলে লাগবে আমাদের সঙ্গে। আমরা যদি অল্প জন আপনার সঙ্গে বসি, তাহলে কি রাগ করবেন!
সৈয়দা নিগার বানু
snbanu@gmail.com
তাওকীর ইসলাম সাইক
Touqir.footprint@gmail.com
অমিত রুদ্র
arudra.footprint@gmail.com
কাজী মামুন হায়দার
kmhaiderru@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন