Magic Lanthon

               

সালমা সুলতানা আশা

প্রকাশিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘আমি আসলে খুব সূক্ষ্ম, সিম্পল বিষয় নিয়ে কাজ করতে চাই’

সালমা সুলতানা আশা


সালমা সুলতানা আশা বরাবরই একজন গল্প বলিয়ে বা স্টোরিটেলার হতে চেয়েছেন। এবং এক্ষেত্রে তিনি যেকোনো মাধ্যম বেছে নিতে প্রস্তুত। সেটা যদি চলচ্চিত্র হয় তো চলচ্চিত্র, যদি থিয়েটার হয় তবে থিয়েটার; অথবা এই মাধ্যম হতে পারে স্থিরচিত্র। যেভাবেই হোক তিনি সমাজের নিপীড়িত মানুষের গল্পটা বলতে চান।

এই অবস্থান থেকে আশা পৃথিবীকে দেখেন কখনো তরুণ, মধ্যবয়স্ক, কখনো বৃদ্ধের চোখে। অর্থ খুঁজে বেড়ান শূন্যতায়। শূন্যতায় অর্থ খুঁজতে খুঁজতেই তার প্রথম গল্প বলিয়ের যাত্রা শুরু হয় থিয়েটারের মধ্য দিয়ে। নাট্যকার রিশ স্মোলেন-এর চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে ‘দ্য বক্স নাটকে তিনি নির্দেশনা দেন।


পৃথিবীজুড়ে চলমান ভয়াবহ গণহত্যা, নিপীড়ন ও প্রান্তিক মানুষের জীবন তাকে সবসময়ই ভাবিয়ে তোলে। এই ভাবনা থেকেই পরবর্তী সময়ে নির্দেশনা দেন জহির রায়হানের ‘আর কতদিন উপন্যাস অবলম্বনে ‘জেনোসাইড নাটকে। সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে ‘মুনীর চৌধুরী ১ম জাতীয় নাট্যোৎসব ২০২৫-এ রাজশাহী বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে ‘লাশের ইশতেহার নাটকেও তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। অভ্যুত্থানে নিহতদের আকাক্সক্ষা ও দাবিদাওয়ার ওপর ভিত্তি করে লেখা এই নাটকটি ৬৪ জেলার প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ ১৬টি প্রযোজনার একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে পড়ালেখা করা আশা তার চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সাইলেন্স ইন দ্য ক্যাওস নির্মাণের মধ্য দিয়ে। যেখানে তিনি ময়লার ভাগাড়ে পড়ে থাকা নাম না জানা এক মানুষের প্রেম, বিরহ ও বঞ্চনীয় যে সামাজিক জীবন; তার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের যে চরিত্র বা শোষণমূলক কাঠামো সেটার গল্প বলতে চেয়েছেন। ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে এই চলচ্চিত্রের জন্য আশা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে ‘চতুর্থ বাংলাদেশ স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসব-এ শ্রেষ্ঠ নির্মাতা ও শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহকের (সাদেকুল ইসলাম জুবায়ের ও বিল্লাল হোসেন) পুরস্কার অর্জন করেন।


সর্বোপরি আশা বিশ্বাস করেন, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং নীরব প্রতিরোধেরও মাধ্যম। তাই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণকে পেশা হিসেবে নয়, বরং একপ্রকার কমিটমেন্ট ও প্রতিরোধের অনুশীলন হিসেবেই ভাবেন। সালমা সুলতানা আশার সঙ্গে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ আগস্ট ‘ম্যাজিক লণ্ঠন-এর তরফে কথা বলেছেন তাসবীর হাসান 



ম্যাজিক লণ্ঠন : আপু, শুভেচ্ছা আপনাকে। সম্প্রতি আপনি সাইলেন্স ইন দ্য ক্যাওস সিনেমার জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেরা নির্মাতার পুরস্কার পেলেন। এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি দিয়েই শুরু করতে চাচ্ছি।


সালমা সুলতানা আশা : অনুভূতি তো অবশ্যই অনেক ভালো। এটা কিছুটা মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো। কারণ আমরা এই ফিল্মটি নিয়ে আসলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে নামিনি কখনো। এটা আমাদের একটা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ ছিলো। আমাদের না বাজেট ছিলো, না অনেক বড়ো টিম ছিলো। জাস্ট একটা বিষয়, একটা কনসেপ্ট আমাদের মাথায় ছিলো। এ নিয়েই আমরা মাঠে নেমে যাই। পুরো ফিল্মটি যদি আপনি দেখে থাকেন, নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন আমরা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফিল্মটা বানিয়েছি। সামনে একটা ফেস্টিভাল আসছে, মনে হলো সেখানে এটা দেওয়া যেতে পারে, দিয়েছি। সেখান থেকে এতো বড়ো অ্যাওয়ার্ড পাবো-এটা আমাদের কাছে অনেক বড়ো অ্যাওয়ার্ড কারণ আমরা এটা ফার্স্ট টাইম পেয়েছি। প্রথমবারের মতো আমাদের কোনো ফিল্ম আমরা বাইরে দিয়েছি। এর আগে ছোটোখাটো কিছু কাজ করেছি, কিন্তু সেগুলো কোনো প্লাটফর্মে দেইনি। সেই জায়গা থেকে আমরা খুবই খুশি! এটা খুবই ইন্সপায়ারিং ছিলো। নেক্সট টাইম যে বড়ো বড়ো কাজগুলো করবো, যে পরিকল্পনাগুলো করছি, সেটার জন্য এটাকে অনেক বড়ো-কী বলবো-ধাক্কা বা পুশ বলা যেতে পারে।


ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি অনেকটাই বললেন আরকি; আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরও বোধহয় পেয়েছি। তারপরেও প্রশ্নটা করি, ধরেন এই পুরস্কার কি কেবল ব্যক্তিগত নাকি মোটাদাগে স্বাধীন নির্মাণ ধারার জন্যও একরকম গুরুত্ব বহন করে; মানে রাষ্ট্রীয় এই পুরস্কার কি কোনোভাবে স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চায় এক ধরনের স্বীকৃতি স্বরূপ?


আশা : অবশ্যই। ফিল্মটা নেহাতই মনের ছোট্ট শখ-একটু করতে ইচ্ছা করলো, করলাম-এ রকম না। আমি অবশ্যই সবসময় ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার হতে চাইতাম বা স্টোরিটেলার হতে চাইতাম। সেই জায়গা থেকে এটা আমাদের জার্নির একটা স্টার্টিং।


ম্যাজিক লণ্ঠন : না, সেটা তো অবশ্যই। সেই দিক থেকে দেখবেন পুরস্কার নিয়ে আমাদের যে কনসেপ্ট, বা একটা প্রতিযোগিতা বোধহয় থাকে, পুরস্কার পেতে হবে। একটা তাড়না থাকে আরকি। অনেকের এ রকম চর্চাও থাকে বোধ হয়-পুরস্কারই তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য! সেদিক থেকে আপনি তো বললেনই পুরস্কারটা একেবারে অনাকাক্সিক্ষত ছিলো। পুরস্কার লক্ষ্য ছিলো না। কিন্তু হঠাৎ পাওয়া এই পুরস্কার এখন আপনার ইন্সপিরেশন হিসেবে কাজ করছে।


এদিকে আপনি স্বাধীন নির্মাতা হতে চান এবং বরাবরই এটাই হতে চেয়েছেন। সেই জায়গায় স্বাধীন নির্মাতাদের তো কতোগুলো সঙ্কট আছে মনে হয়! এই অবস্থায় পুরস্কারটা বিশেষ কোনো কাজ করলো কি না, বা করবে কি না, সেটা যদি আরেকটু বিস্তারিত বলতেন?


আশা : আমার মনে হয়, মানে এই ছোট্ট জার্নিতে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকারের সবচেয়ে বড়ো স্ট্রাগল হচ্ছে টাকা। আমি খুব ইনফরমালি বলছি! সবচেয়ে বড়ো স্ট্রাগল হচ্ছে টাকা। আইডিয়ার অভাব নেই, প্রচুর আইডিয়া, প্রচুর কাজ, এমনকি কর্মস্পৃহারও অভাব নেই। মাঝে আরো কিছু প্রবলেম থাকে, এমন কোনো স্টোরি ভাবলাম, সেটা আমি ম্যানেজ করতে পারছি না। যেমন, ধরেন ক্রিস্টোফার নোলান যখন দুইটা প্লেন ভেঙে ফেললো-আমি দুইটা প্লেন ভাঙতে পারবো না।


এখন এই পুরস্কারটা পাওয়ার কারণে যা হয়েছে, কিছু মানুষের সঙ্গে চেনা পরিচিত মানে একটু সম্পর্ক বা একটা সার্কেল তৈরি হয়েছে। যে কারণে এখন হয়তো কিছু হেল্প পাওয়া যেতে পারে। যেমন, রিসেন্টলি আমাকে একজন বলেছে, মিউজিকের কোনো হেল্প লাগলে সে আমাকে করবে। আবার আমার এক বড়ো ভাই বলেছেন, নেক্সট কোনো ফিল্মে সিনেমাটোগ্রাফার লাগলে, ক্যামেরা লাগলে, তিনি দেবেন। এই ধরনের হেল্প এই অ্যাওয়ার্ডের পরে পাওয়ার পসিবিলিটি বেড়েছে। এবং তারা বলছে, হেল্প করবে-এইটাই হচ্ছে একটু অ্যাডভান্টেজ আরকি। আর অ্যাওয়ার্ডের কারণে হয়তো আগামীতে প্রোডিউসার পেতে সুবিধা হবে। যেহেতু আমরা একটা কাজ করেছি, অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি, তার মানে কিছু তো পারি। এমনি এমনি তো মানুষ টাকা দেবে না। এগুলোই হেল্প, এই অ্যাডভান্টেজগুলো আসছে আরকি অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পরে।


ম্যাজিক লণ্ঠন : বুঝতে পেরেছি। তাহলে এবার আপনার সিনেমার প্রসঙ্গে চলে আসি। সাইলেন্স ইন দ্য ক্যাওস-এর জার্নির গল্পটা যদি বলতেন, এই গল্পটা ঠিক কীভাবে মাথায় এলো আপনার?


আশা : এটা আমার খুবই ক্লিয়ারলি মনে আছে-আমি একদিন কিচেনে রান্না করছিলাম। কিচেনের জানালা বরাবর একটা ময়লার স্তুপ আছে। এখন অবশ্য এটা নেই, ক্লিন করে ফেলছে। ওখানে সবাই ময়লা ফেলে, বোতল-টোতল ফেলে। আমি রান্না করতে করতে লক্ষ করলাম, একটা লোক আসছে ভ্যান নিয়ে। খুবই শীর্ণ মানে গায়ে শক্তি নাই। উনার ভ্যানের উপর বিশাল একটা জোড়াতালি দেওয়া বস্তা। সে ওই ডাস্টবিন থেকে বোতল কুড়িয়ে ওখানে রাখছে। এগুলো খুবই স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু যেটা আমার কাছে একটু অন্যরকম লেগেছে যে, ওনার কোলে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছিলো। ওই বাচ্চা বসতেও শেখেনি। খুবই ছোটো। তখন রাজশাহীতে তীব্র গরম। আমি বাসায় থাকতে পারছিলাম না ফ্যানের নিচে। ওই লোকটি রোদের মধ্যে ওই ছোটো বাচ্চা নিয়ে ভ্যান চালাচ্ছেন এক হাতে। সে নিজেও অসুস্থ! বাচ্চাকে নিয়েই ময়লা থেকে বোতল তুলছে। একটা সময় যখন তার হাত লেগে যায়, তখন ময়লার পাশে বাচ্চাটাকে রেখে বোতল কুড়াচ্ছে। তখন ওই যে ফ্রেমটা, ওই ভিউটা আমাকে এতো টাচ করেছে যে-স্ট্রাগলিং ফাদার; কিন্তু বেশিরভাগ সময় মাকেই আমরা বাচ্চা নিয়ে কাজে যেতে বেশি দেখি।


বাবাকে আমি এ রকম খুব কম দেখেছি, মানে এটা আমার ফার্স্ট টাইম দেখা। আমার মনে হলো স্ট্রাগলিং এই ফাদারকে নিয়ে কাজ করা যায়। আমার মাথায় তখন এসেছিলো ডকুফিকশন-আমি ওনাকে কিছু আর্থিক সহায়তা করবো। কারণ ওনার থেকে আমি একটা স্টোরি বের করে নিয়ে এসেছি। ওনাকে তো আমার কিছু হেল্প করা উচিত। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধু জুবায়েরকে ফোন দিই, বলি আমার বাসার সামনে এখনই আসো। আমি একজনকে পেয়েছি; তাকে খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছে; ওনাকে নিয়ে কাজ করতে চাই। ও চলে আসে কিছুক্ষণের মধ্যে। জুবায়ের এসে ওই লোকটার সঙ্গে কথা বললে, লোকটি রাজি হয়ে যায়।


জুবায়ের ওনাকে বুঝিয়ে বলে, আপনার কিছুই করতে হবে না, সারাদিন যেখানে যেখানে ঘোরেন, বাচ্চাকে নিয়ে যা যা করেন, দুপুরে কোথায় খান, ভাত খান না কি খান, দিনশেষে বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় ফেরেন; আবার আপনার দিন কীভাবে শুরু হয়; সারাদিন এগুলো করে কতো টাকা পান-আমরা জাস্ট দূর থেকে এগুলো পিক (ভিডিও) করবো। এই জন্য-আমরা তো স্টুডেন্ট-আপনাকে আমরা কিছু সাহায্য করতে পারি। লোকটা রাজি হয়ে যায়। এর পর আমরা একটা ডেট ফিক্সড করি ওনার সঙ্গে দেখা করে কথা বলার।


ওনার ওয়াইফ-ও আসে। তার সঙ্গে আমরা কথাও বলি, সব ঠিকঠাক হয়। কিন্তু যেদিন শ্যুট করবো, ওইদিন ফোন দিচ্ছি, ফোন বন্ধ। সামহাউ ওনারা মানে হাজবেন্ড-ওয়াইফ সেফ ফিল করে নাই। হয়তো মনে হয়েছে, প্রাইভেসি থাকবে না, বা কিছু একটা ভয় পেয়েছে-আমাদের অসহায়ত্বকে মানুষের সামনে দেখাবে। আমরা ঠিক জানি না-হয়তো এ রকম ফিল থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এতে আমরা খুব হতাশ হই। কিছুদিন পরে আমার ফিল্মের এক্সামও ছিলো। অবশ্য এটার উদ্দেশ্য শুধু এক্সাম ছিলো না। কারণ এটা আমাকে অনেক টাচ করেছিলো। এরপরে যেটা হয়, তারপরও আমি দুই-তিন দিন ট্রাই করি। কিন্তু ওনাকে পাই না। এদিকে ক্যামেরাসহ সব রেডি করে ফেলেছি। আমার তখন নিজের ক্যামেরা ছিলো না। এমনকি কিচ্ছু ছিলো না। এরপরে সিদ্ধান্ত নিলাম এই নিপীড়িত মানুষদের নিয়েই একটা গল্প বলবো। হয়তো একজন টোকাইকে নিয়েই গল্প বলবো।


ওনাকে যেহেতু পেলাম না, ফলে অন্যভাবে বলতে হবে। এখান থেকে মূলত শুরু। তারপরে যেটা হয়, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিলো, বাচ্চা ম্যানেজ করা। তখন ভাবলাম, একটা ক্যারেক্টার নিয়ে কাজ করবো। তারপর সেই ক্যারেক্টারকে নিয়ে আমরা কাজ শুরু করলাম, একজন টোকাই কীভাবে কী করে? আমাদের কিন্তু অনেক বড়ো প্ল্যান ছিলো। সেটাকে আমরা অনেক ছোটো করে নিয়ে এসেছি। টোকাইয়ের লাইফস্টাইল কী রকম, তাদের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক কী ধরনের, ওদের প্রেমে পড়াটা কেমন, ওদের স্বপ্নগুলো কী রকম?


আমরা এই ছোটো ছোটো জিনিসগুলো এখানে ঢুকাতে পেরেছি। আর এই বিষয়টাই ছিলো ইন্সপাইরেশন। ফিল্মে যদিও সবকিছু প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। গল্পটা ডিফরেন্ট হয়েছে, শেষে অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে।


ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে আপনি বলছেন, গল্প বলার ক্ষেত্রে আপনি পুরোপুরি স্যাটিসফাইড না?


আশা : পুরোপুরি না, কিছুটা স্যাটিসফাইড। আমরা অ্যাট লিস্ট যেটা বলতে চেয়েছি, পুরোটা না পারলেও কিছু তো বলেছি। এজন্য স্যাটিসফাইড। আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোনো ফিল্মমেকার হান্ড্রেড এ হান্ড্রেড স্যাটিসফাইড হতে পারে! আই ডোন্ট নো, কোথাও না কোথাও তাদের মনে হয় এটা আরেকটু এ রকম হতো বা এটা আরেকটু এভাবে করলে ভালো হতো। আর যখন আমরা ফিল্ম বানাই তখন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি। এই কাজটা যে করেই হোক শেষ করতে হবে। এইভাবেই করতে হবে, না পারলে আরো ১০টা রাস্তা আছে। সেই রাস্তা দিয়ে ঢুকতে হবে। তবে আমরা স্টোরিটেলিংয়ের ক্ষেত্রে স্যাক্রিফাইস করতে চাই না। কিন্তু সামহাউ হয়ে যায়, স্যাক্রিফাইস করতে হয়। ওই ফিল্মটা এখন যখন দেখি, প্রচুর ভুল চোখে পড়ে। মনে হয় এইটা কী করলাম! এটা মনে হয় খুব অতিরিক্ত, অতিরঞ্জিত হয়েছে! এটা আমি বাদ দিলেই ভালো হতো বা এটা ইনক্লুড করলে ভালো হতো। এখন যদি আমাকে কেউ বলে আপনার ফিল্মটা দেখান, আমি লজ্জায় পড়ে যাই! এটা দেখানোর মতো হয় নাই। এই হলো অবস্থা!


ম্যাজিক লণ্ঠন : এটা তো আপনার প্রথম সিনেমা; আমি যদি ভুল না করি আপনি এখনো হয়তো পড়ালেখা করছেন। কী ভেবে আপনি সিনেমা বানাতে এলেন? আপনার সিনেমা বানানোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য কী? আপনি তো থিয়েটারের শিক্ষার্থী, এটার সঙ্গে কি কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে?


আশা : অবশ্যই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। ফিল্ম বানানো শুরুর আগে মানে এগুলো নিয়ে চিন্তা করার আগে আমি ছবি তুলতাম, থিয়েটার করতাম। তারপরে ফিল্ম বানিয়েছি। আমি সবসময় চেয়েছি স্টোরিটেলার হতে। এমন কিছু গল্প বলতে, যে গল্পগুলো পেছনে থেকে যায়। আমি যেহেতু এই বিষয়গুলো বুঝি; থিয়েটারের স্টুডেন্ট হিসেবে আর্ট প্র্যাকটিস করি; আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করি। এটা আমার রেসপন্সিবিলিটি যে, লুকিয়ে থাকা স্টোরিগুলো বলা; সবার সামনে নিয়ে আসা। বিশেষ করে যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলা হয় না। আমরা এগুলো প্রতিদিন দেখি, হয়তো ফিল করি না। ওভাবে এক্সপ্রেসও করি না।


এমন না যে আমি সবসময় ফিল্মই বানাতে চাই; আমি স্টোরিটেলিংয়ের যেকোনো ওয়ে, যেভাবে কমফোর্টেবল হই, সেভাবেই বলবো। যদি এই মুহূর্তে মনে হয় এই স্টোরিটা থিয়েটারে ভালো বলতে পারবো, তাহলে আমি থিয়েটারই করবো। আমার যদি পরদিন মনে হয়, এই সেইম স্টোরি ফিল্মে বলবো, তখন আমি ফিল্মেই বলবো। আবার যদি কখনো মনে হয়, না এটা জাস্ট একটা স্থিরচিত্রের মাধ্যমে মানুষকে দেখাতে চাই, তখন আমি ওভাবেই দেখাবো। মানে যেকোনো ওয়েতে আমাকে স্টোরিটেলিং করতে হবে আরকি।


ম্যাজিক লণ্ঠন : দর্শক হিসেবে আপনি কোন ধরনের সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন, এবং সে সিনেমাগুলো নিয়ে একটু বলবেন, মানে কেনো দেখেন?


আশা : আসলে এটা খুবই কঠিন প্রশ্ন-কী রকম সিনেমা ভালো লাগে! একটা সময় ছিলো যখন আমি ভায়োলেন্স নিতে পারতাম না। এখন টারান্টিনোর ফিল্ম দেখছি। সামটাইমস মনে হয় এই ফাইটটাকে তারা আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আমি মোটামুটি সব জনরারই ফিল্ম দেখি। ফলে ভালো লাগা নিয়ে আমি স্পেসিফিক কোনো জনরার কথা বলছি না। আমার খুবই কাম অ্যান্ড কোয়াইট মিনিমালিস্টিক জিনিস ভালো লাগে। খুবই সিম্পল জিনিস, যেটা আমার লাইফে প্রতিদিন লিড করছি। ফর এক্সাম্পল, লাস্ট যে ফিল্মটা দেখেছি-আমাকে খুবই নাড়া দিয়েছে-পারফেক্ট ডেইজ। জাপানিজ ফিল্ম। এখানে একজন সুইপার পাবলিক টয়লেট ক্লিন করেন, এইটাই তার প্রফেশন। এই লোকটা যেভাবে প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে, যেভাবে সারাদিন কাজ করে, রাতে বাড়ি ফেরে, ঘুমানোর আগে বই পড়ে আবার সে কাজ করতে যায়। কাজের জায়গায় প্রত্যেকটা সিম্পল জিনিস সে নোটিশ করে-গাছের পাতা নড়া, তার বাসার সামনের গাছটার পাতা প্রতিদিন চেঞ্জ হওয়া। মানে এতো সাধারণ অথচ এতো সূক্ষ্ম জিনিস, আর এতো বিউটিফুলি ওখানে পোট্রে করা হয়েছে! এটা আমাকে খুবই টাচ করে।


এই টাইপের ফিল্ম আমার বেশি ভালো লাগে। আমি সব জনরারই ফিল্ম দেখি, কারণ ফিল্ম স্টাডি করতে আমার ভালো লাগে। বিভিন্ন ফিল্মমেকারদের সাইকোলজি বুঝতে ভালো লাগে। যেমন, মাঝখানে আমি বং জন হোর ফিল্ম প্রচুর দেখেছি। তাকে আমার খুবই পছন্দ, মানে খুবই! আরো ডিরেক্টর আছে, ওনাদেরকেও আমার ভালো লাগে। কিম কি-দুককে ভালো লাগে। তারপর মাজিদ মাজিদি, আব্বাস কিয়ারোস্তামি। যারা খুব সিম্পল বিষয় নিয়ে কাজ করে, এ রকম ফিল্মমেকারদের আমার ভালো লাগে। বিষয়বস্তু ভালো লাগলে জনরা কোনো সমস্যা নয় আমার কাছে।


ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনার সিনেমা ভাবনা বা সিনেমা বানানোতে বিশেষ কারোর প্রভাব আছে, যাকে আপনি অনুসরণ করেন?


আশা : অনুসরণ সেভাবে করি না। তবে প্রভাব আছে; যাকে দেখে অনেক ইন্সপায়ার হই। স্পেসিফিকভাবে বলতে গেলে মাজিদ মাজিদি, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, তারপরে বং জন হো। ইদানীং ভালো লাগে উইম উইন্ডারসকে। সম্প্রতি ওনার দুইটা ডকুমেন্টারি দেখেছি-প্রথমটি-এনসেল্ম- স্থাপত্য/ভাস্কর্য নিয়ে। আরেকটা হচ্ছে থিয়েটার নিয়ে পিনা। খুবই সুন্দর! আমি থিয়েটারের স্টুডেন্ট তো, আমার খুবই ভালো লেগেছে। উনি খুব সম্ভবত ফটোগ্রাফার ছিলেন। আমি ভুলও হতে পারি। উনি এতো সুন্দরভাবে থিয়েটারকে ফিল করে একটা ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন, যদিও থিয়েটারের লোক ছিলেন না। ওনাদের দ্বারা আমি অনেক প্রভাবিত বলা যেতে পারে।


ম্যাজিক লণ্ঠন : নতুন নির্মাতা হিসেবে সিনেমা বানানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলবেন-যে মুহূর্তগুলো আপনাকে আনন্দ দিয়েছিলো বা ব্যথিত করেছিলো?


আশা : প্রত্যেকটা সুন্দর শট্ পাওয়ার পরেই আনন্দ লাগতো, ফিল্ম শেষ হোক বা না হোক। কোনো কিছু আমি চেয়েছি, সেটা আর একটু বেটার পেয়েছি; এটা দেখলে আমার খুব খুশি লাগতো। মনে হতো এইটুকুই ফিল্ম! আর কিছু না দেখাই, এইটুকুই ফিল্ম। ফিল্ম বানাতে গিয়ে মিরাকলি অনেক ভালো কিছু আমরা পেয়ে গেছি। যা এক্সপেক্টেশনের বাইরে। তখন খুব ভালো লাগতো। ভয় কেটে যেতো। মনে হতো আমি যেটা চাচ্ছি সেটা হুবহু না পেলেও সামটাইমস মিরাকল হয়ে যায়। অবশ্য আমি খুবই অল্পে খুশি হওয়া মানুষ। ওই যে বললাম, একটা ছোট্ট শট্ ভালো পেলেই আমি খুশি হয়ে যেতাম।


পুরো ফিল্ম জার্নিতে অনেকবার খুশি হয়েছি, অনেকবার। আর কষ্টের একটা জায়গা আছে। এটা আসলে ইন্টারভিউয়ে বলা ঠিক হবে কি না! আমাদের শুটিংয়ে একটা ইঁদুর ছিলো। ইঁদুরটা রোদে স্ট্রোক করে মারা যায়। এটা খুবই দুঃখের ছিলো। ইঁদুরটা আমাদের সিনেমাটোগ্রাফারকে কামড়ও দিয়েছিলো। খুবই সিলি কথা হয়ে যাচ্ছে। ওই সময় আমার খুব কষ্ট লেগেছিলো, একটা ইঁদুর, ওকে আমরা শুটিংয়ের জন্য এনেছি, রোদে-গরমে থাকতে না পেরে ও মারা গেলো! ওকে নিয়ে আমরা ভার্সিটি মেডিকেলের পাশে সমাহিত করেছিলাম। ফুল দিয়েছিলাম!


আরেকটা জায়গা আছে, সেটা একেবারে পেছনের গল্প। কখনো কোথাও বলা হয়নি। আমাদের যে মেইন ক্যারেক্টার ছিলো, সে দাড়ি কেটে ফেলেছিলো। এইটা ভয়াবহ একটা কষ্টের জায়গা, কী বলবো! এই ফিলিংসটা আমি কীভাবে প্রকাশ করবো ঠিক জানি না-যখন দেখলাম ওর দাড়ি নেই! কিন্তু পরবর্তী সময়ে-ওই যে আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন-দাড়ি না থাকার কারণে আমাদের স্টোরি যেভাবে ঘুরে গিয়েছিলো এটাও একটা পজিটিভ দিক আরকি। ফলে ওটা আর কষ্টের জায়গায় রাখছি না।


ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে আপনাদের মূল চরিত্রের যিনি অভিনয়শিল্পী, তিনি দাড়ি কেটে ফেলার কারণে সিনেমার গল্পে প্রভাব পড়েছিলো?


আশা : আনডাউটলি! ভয়াবহভাবে! আমরা এই ফিল্মটা শুরু করেছিলাম জুলাই বিপ্লবের আগে। শুটিং করতে করতে আন্দোলন ভয়াবহভাবে জোরদার হয়ে গেলো। তখন আমাদের টিম মেম্বাররা ডিসাইড করি এখন শুটিং করা উচিত হবে না। আমরা সেই মানসিক অবস্থাতেও ছিলাম না। তাহলে সেটা খুব স্বার্থপরের মতো হয়ে যেতো। আর আমাদেরও রেসপন্সিবিলিটি ছিলো আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার। এভাবে মাঝখানে দুই-তিন মাস চলে যায়। জুলাই বিপ্লব আমাদের টিমের প্রত্যেক মেম্বারকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছিলো-প্রথম থেকেই আমরা তো নিপীড়িত মানুষের গল্প বলতে চাচ্ছিলাম-এই গল্পে আমরা জুলাইকে ইনক্লুড করতে চাইলাম। আমরা চেয়েছিলাম এটা থাকুক এই গল্পে। আন্দোলনের সময় আমরা মানসিকভাবে এতো যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম যে, এতো স্টুডেন্ট জীবন দিলো, এতোকিছু হয়ে গেলো-আমরা আর্টিস্ট, ফিল্ম বানাই, স্টোরি বলি, অথচ সেই স্টোরিগুলো বলতে পারছি না। তখন তো অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো, ফোনও চেক করতো। তখন আমরা কী করতাম, ছবি তুলে ড্রাইভে দিয়ে ফোন থেকে ডিলিট করে দিতাম।


তখন আমি আর জুবায়ের পরিকল্পনা করছিলাম, রাজশাহী শহরে আওয়ামী লীগ অফিস আছে না আড়ং-এর পাশে। ওইখানে লাস্ট যেদিন অনেক বড়ো হামলা হলো; ক্যাম্পাসে অনেক পুলিশ ঢুকলো। ওইদিন ওরা ফুল আর্মড ছিলো। ছাত্রলীগের ছেলেরা বড়ো বড়ো অস্ত্র নিয়ে এসেছিলো। আমরা চাচ্ছিলাম যেভাবেই হোক ওইগুলো শ্যুট করে ফেলবো। সামহাউ সেগুলো আমরা করতে পারিনি। পুলিশও আমাদেরকে মারছিলো, ছাত্রলীগও মারছিলো, স্টুডেন্টদের অনেকে তখন ভয়ে পালাচ্ছে, কেউ আমরা বলতে পারছিলাম না আমরা স্টুডেন্ট। ফলে সবমিলিয়ে সেদিন আমরা ওটা করতে পারিনি; আমাদেরকে সেটা তখন খুব পীড়া দিচ্ছিলো। বিশেষ করে জুবায়ের, ও সবসময় বলতো কিচ্ছু করতে পারলাম না! ক্যামেরাটা নিয়ে বের হতে পারলাম না!


আমাদের আরেক বন্ধু আছে, নাম হচ্ছে বৃন্ত। ওর কাছে প্রায় ২০ জিবির মতো এই ধরনের ফুটেজ আর ছবি ছিলো। ওর মেসে এসে পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে যায়। পরে হাত-পা ধরে কোনোভাবে ক্যামেরাটা বাঁচানো গেছে। ও সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে ক্যামেরাটা কিনেছিলো। ক্যামেরাটা ফেরত দিলেও মেমোরি কার্ডটা নিয়ে যায়। ওই কার্ডটা থাকলে হয়তো অনেক কিছু করা যেতো। যাইহোক শেষ পর্যন্ত কিছু করা যায়নি। ফলে সেই ব্যর্থতার কষ্ট ঘুচতে আমাদের ফিল্মটাতে আমরা জুলাইকে খুব ভালোবেসে কষ্ট নিয়ে ইনক্লুড করতে চেয়েছি। দেখে কারো মনে হতে পারে কিংবা আমার নিজেরও কখনো মনে হয়েছে যে জোর করে এখানে জুলাইকে ঢুকিয়ে দিয়েছি! কিন্তু তারপরও ওইটুকু ছোট্ট প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে আমরা জুলাইকে আমাদের ফিল্মে রেখে দিতে চেয়েছি আরকি! কই থেকে কই চলে গেলাম, না!


ম্যাজিক লণ্ঠন : সেদিক থেকে সাইলেন্স ইন দ্য ক্যাওস-এ আধুনিক রাষ্ট্রীয় নাগরিক জীবনের এমন এক চরিত্র দেখতে পাই, যার আসলে কোনো স্বীকৃতি নাই বা যার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি। এর পাশাপাশি সমসাময়িক বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া জুলাই আন্দোলনের একটা আবহ দেখা যায়। নির্মাতা হিসেবে আপনার দিক থেকে দর্শক আসলে এই দুটো বিষয়কে একসঙ্গে মিলিয়ে কী ধরনের বার্তা পেতে পারে?


আশা : এই কথা ভেবে আমরা স্টোরিটা এদিকে নিয়েছি যে, ওই কবরস্থানটার নাম যেনো কী? আজিমপুর কবরস্থান। যেখানে অনেকগুলো বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়। আমি নিউজে দেখেছিলাম, অনেকগুলো লাশ ওখানে গণকবরের মতো দেওয়া হয়েছে। এইসব লাশের কেউ খোঁজ করতে আসে নাই। যারা খোঁজ করতে এসেছিলো, তাদের ডেড বডি এগুলো নয়। তাহলে এই মানুষগুলো আসলে কারা? এরাও তো আন্দোলনে শরিক ছিলো। এরাও তো আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে, তাই না? এই আন্দোলনে দেখবেন-শুনতে একটু রুড লাগতে পারে-এখানেও এলিট শ্রেণিকে বেশি ফোকাস করা হয়েছে।


এই আন্দোলনে যে শ্রমিক ছিলো, দিনমজুর ছিলো, এগুলো অনেক পরে বলা হয়েছে। শুরুর দিকে কেবল বলা হয়েছে, বড়ো বড়ো ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট মারা গেছে! আমি তাদেরকে ছোটো করছি না। তারাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একইভাবে যাদের নাম পরিচয় নাই, যারা বড়ো বড়ো ইন্সটিটিউশনে পড়ে নাই, যাদের বড়ো ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নাই, সমাজে এ রকম পরিচয় নাই, তারাও কিন্তু একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্দোলনে। ফলে সাইলেন্স ইন দ্য ক্যাওস-এর ক্যারেক্টারটা কিন্তু সশরীরে আন্দোলনে ছিলো না। এ রকম অনেক মানুষ কিন্তু ভিক্টিম হয়েছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো, গুলি লেগে স্পট ডেড। বাসা থেকে কোনো কাজে বের হয়েছে-ওই যে ওর নাম ভুলে গেলাম, দুই বোনের এক ভাই। ওর বাবা বলছিলো, আমার ছেলে কিন্তু আন্দোলনে যায়নি। ও এমনি বেরিয়ে ছিলো। সাইলেন্স ইন দ্য ক্যাওস-এর গিট্টু চরিত্রের ওই ছেলেটা; ও সরাসরি আন্দোলনে যায় নাই, কিন্তু ভিক্টিম হয়ে গেছে। যারা মানুষ খুন করলো, মারলো, যারা ফ্যাসিস্ট, তারা আসলে কীভাবে নিপীড়ন করেছে সাধারণ মানুষের ওপরে-একটা মানুষ যে আন্দোলনে ছিলোই না, তাকেও ছাড় দেয় নাই, তাকেও কীভাবে নির্যাতন করেছে! আমরা এই জিনিসটা দেখাতে চেয়েছি।


আরেকটা বিষয় হলো, আমাদের ওই চরিত্রটা ময়লার স্তুপের মধ্যে ঘুম থেকে ওঠে এবং শেষমেশ ওই ময়লার স্তুপে গিয়েই পড়ে। এর মাঝখানে ওর যে স্ট্রাগল, এই যে নিপীড়ন, মানে ওর পুরো লাইফ সার্কেলটা-আমরা সমাজের মানুষেরা কিন্তু ওকে উপরে উঠতেই দিই না। ও যে এই ওয়ার্ল্ডে ছিলো এটা কেউ জানলোই না, বুঝলোই না!


ম্যাজিক লণ্ঠন : আমরা একেবারেই শেষের দিকে চলে এসেছি। আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যদি বলতেন, মানে ঠিক কী ধরনের গল্প বলতে চান? বর্তমানে নতুন কোনো গল্পের কথা ভাবছেন?


আশা : বর্তমানে আমরা বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি। তিন-চারটা স্ক্রিপ্ট নিয়ে আমরা তিন-চার জন কাজ করছি, এগুলো ডেভলপ করছি। আমি মূলত নিপীড়িত মানুষের গল্প বলতে চাই। এর বাইরে আমার আরো কিছু ইন্টারেস্টের জায়গা আছে, যেমন, গ্লোবালাইজেশন, পলিউশন। আমরা আরেকটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম নিয়েও কাজ করছি। হয়তো খুব দ্রুত এটার শুটিংয়ে নেমে যাবো। আমরা এই যে পলিথিন ব্যবহার করছি, এটা আস্তে আস্তে সবকিছু মানে ওয়ার্ল্ডকে কীভাবে ঘিরে ফেলছে-এগুলো নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। আমি আসলে খুব সূক্ষ্ম, সিম্পল বিষয় নিয়ে কাজ করতে চাই। যেগুলো অহরহ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে, কিন্তু আমরা নোটিশ করি না, ফিল করি না। খুবই ছোটো ছোটো জিনিস।



ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি সামগ্রিক ভিজ্যুয়াল ইন্ডাস্ট্রিকে কীভাবে দেখেন, বিশেষত সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এক্ষেত্রে ওটিটি কি কোনো সম্ভাবনা তৈরি করছে বলে আপনার মনে হয়?


আশা : আমি যখন ছোটো ছিলাম, তখন তো ওইভাবে ফিল্ম দেখা হয়নি। তবুও যতোটুকু দেখেছি; তারপর যখন বড়ো হচ্ছি, মানে যখন আমি টিনএজে ছিলাম, তখন মনে হয়েছিলো বাংলাদেশের সিনেমা আসলে আর চলছে না, চলবে না। তার পর হুট করে মনে হলো একটা রেভ্যুলেশন ঘটে গেছে-রায়হান রাফীর সিনেমাগুলো, সুমন ভাইয়ের [মেজবাউর রহমান সুমন] হাওয়া। দেখলাম আমাদের ডিরেক্টররা সিনেমার সবক্ষেত্রে যেইভাবে অত্যাধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার করছে, দারুণ কালার গ্রেডিংয়ের কাজ হচ্ছে! মানে তারা গতানুগতিকতার বাইরে ডিফারেন্ট কিছু করছে। ফলে আমার এখন যেটা মনে হয়, সামনে খুবই সম্ভাবনাময় সময়। অলরেডি ওই সম্ভাবনাময় সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এখন ফিল্ম ফেস্টিভালগুলোতে গেলে দেখা যায় প্রচুর ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার। ইয়াংরা প্রচুর ফিল্ম বানাতে চাচ্ছে, সবার এতো আগ্রহ! বিভিন্ন ওয়ার্কশপে গেলে খুব ভালো লাগে! আমাদের প্রতিবেশী ইন্ডিয়া তো ভয়াবহ একটা রেভ্যুলেশন ঘটিয়ে ফেলেছে! ওদের ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকারদের কাজ দেখলে চোখ কপালে উঠে যায়। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরাও যেভাবে এগুলোতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, আমরাও কোনো অংশে আর পিছিয়ে থাকবো না। যদি এ রকম চলতে থাকে, তাহলে অনেক দূর যাওয়ার পসিবিলিটি আছে। এরই মধ্যে আবার আদনান আল রাজীব একটা বড়ো অ্যাওয়ার্ড নিয়ে আসলেন!


এর আগে রেহানা মরিয়ম নূর, এদিকে কামার আহমাদ সাইমন আছেন! ওহ, আমি একটা কথা বলতে ভুলে গেছি তখন, কামার আহমাদ সাইমন আমাকে অনেক বেশি ইন্সপায়ার করেন। ওনাকে আমার অসম্ভব পছন্দ, ওনার কাজ দেখে আমি খুবই ইন্সপায়ার হই। ফলে ওনারা যেভাবে এগোচ্ছেন; তারপরে যদি আমি রানা স্যারের [কাজী মামুন হায়দার] কথাও বলি; স্যাররা এখানে মানে রাজশাহীতে একটা ফিল্ম স্কুল করেই ফেলেছেন বলা চলে! এখানেও আমরা সবাই আসবো, ফিল্ম নিয়ে নানা চর্চা হবে। যারা ফিল্ম বানাতে চায়, তাদেরকে ওনারা হেল্প করছেন। এ রকম যদি আরো হয় বিভিন্ন জায়গায়-এগুলো তো কোনো ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই সম্ভাবনাময়। আমার মনে হয়, আমাদের অনেক ভালো জায়গায় যাওয়ার সুযোগ আছে। অলরেডি আমরা অনেকখানি চলে এসেছি। ইন্টারন্যাশনাল প্লাটফর্মে সবাই চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।


আর ওটিটি প্লাটফর্ম নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে তো মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। মানুষ এখন আর কেউ টিভি খুলে রাত আটটায় নাটক দেখার জন্য বসে থাকে না। এখন আর ফ্রি না থাকলে নাটক মিস হওয়ার সুযোগ নেই। ওটিটি প্লাটফর্মে কোনো কিছু রিলিজ হয়েছে, আমি যখন ফ্রি থাকবো তখন দেখে নেবো। সবাই নিজেদের মতো করে নিজেদের ঘরে নিজেদের ফোনে দেখে ফেলছে। আমি এটাকে অবশ্যই পজিটিভলি দেখি। ওটিটি আমার কাছে অনেক সম্ভাবনাময় জায়গা।


ম্যাজিক লণ্ঠন : মানে নির্মাতা হিসেবে কোনো ব্যারিয়ার-সেই জায়গা থেকে ওটিটিকে কীভাবে দেখছেন?


আশা : আমি তো এখনো এই প্লাটফর্মে কোনো কাজ করিনি, করলে হয়তো বুঝতে পারবো ব্যারিয়ার আছে কি না! হয়তো আছে, কারণ ইন্টারনাল অনেক পলিটিক্স থাকে। যেমন, কথার কথা ও [সিনেমাটোগ্রাফার বিল্লাল হোসেন] যে ফিল্মটা নিয়ে এবার লিখছে ফারহা। ফিল্মটা তো ফিলিস্তিন নিয়ে, এটা যখন ‘নেটফ্লিক্স-এ ছাড়া হলো ইসরায়েল তখন ঘোষণা দিয়ে ‘নেটফ্লিক্স বয়কট করলো। ব্যারিয়ার তো থাকবেই, আমিও হয়তো ফেইস করবো। কিংবা নাও করতে পারি। এ ব্যাপারে এই মুহূর্তে আমার আসলে কোনো ধারণা নেই।


ম্যাজিক লণ্ঠন : আমি বলছিলাম সুইচ করার যে বিষয়টা-আগে কী হতো নির্মাতা যে সিনেমাটা বানাতো, দর্শক সিনেমাহলে গিয়ে সেটা দেখতে একরকম বাধ্য ছিলো। তার হাতে খুব বেশি অপশন ছিলো না। কিন্তু এখন ওটিটির যুগে দর্শক আর বাধ্য নয়; খুব সহজেই সুইচ করে ফেলতে পারে। হাজার হাজার কনটেন্ট তার কাছে! এই বিষয়টা নির্মাতাদের নতুন কোনো ক্রাইসিসে ফেলছে কি না? নাকি একভাবে এটাও একটা সম্ভাবনা-আপনার কী মনে হয়?


আশা : ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, এতে ক্রাইসিসে পড়ার কিছু নাই। একেকজনের টার্গেট অডিয়েন্স একেক রকম। যে শাকিব খানের সিনেমা দেখবে-শাকিব খানকে ছোটো করছি না-সে যে উইম উইন্ডারসের পিনা দেখবে এটা কিন্তু নয়। দর্শক তো ওটিটি প্লাটফর্ম না থাকলেও সুইচ করবে-এনাকে আমার পছন্দ না, আমি দেখবো না। এটাই আরকি! আমি আপনার প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছি কি না ঠিক জানি না! মানে একেক দর্শক একেক রকম। আমি বিশ্বাস করি, আমিও একদিন ফিচার ফিল্ম বানাবো, কথার কথা সেটা প্রেক্ষাগৃহেও মুক্তি দেবো, সবাই যে সেটা দেখতে আসবে না, এটাও আমি জানি।


একজন ফিল্মমেকার তো চাইবেই সবাই আসুক। সবাই আসলেই ভালো। কিন্তু কিছু তো টার্গেট অডিয়েন্স থাকে-যেমন কথার কথা আমি পলিথিন নিয়ে যে কাজটা করবো, সেখানে যে বার্তাটা দেবো, নিশ্চয় সেটা একজন রিকশাওয়ালা ফিল করবে না। সে ভাববে, আমি ৫০ টাকার মাছ কিনেছি পলিথিনে নেবো না তো কীসে নেবো? ও নিশ্চয়ই এজন্য পাটের ব্যাগ খুঁজতে যাবে না। আমি তো তাদেরকে নাড়া দিতে চাই যারা পলিথিন মেক করছে; যারা এই ইন্ডাস্ট্রিটাকে চালাচ্ছে। ওরা বানানো বন্ধ করলে রিকশাওয়ালা আর পলিথিন পাবে না। এই আরকি।


ম্যাজিক লণ্ঠন : ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকারদের জন্য তো ওটিটি খুবই জরুরি একটা প্লাটফর্ম বোধহয়।


আশা : হ্যাঁ। কারণ আমি তো এখন চাইলেই মানে ওটিটি প্লাটফর্মের জন্য ফিল্ম বানানোর বিষয়ে ডিল করতে পারি। কিংবা ফিল্ম বানিয়ে ওদেরকে দিয়ে দিতে পারি। এতে সবার দেখার সুযোগ হলো। কিন্তু এখন চাইলেই আমি সিনেমাহলে সেটা দিতে পারছি না। আমাদের জন্য অবশ্যই এটা একটা ভালো জায়গা, যেখানে আমাদেরকে অনেক বেশি সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে না।

 

 

সালমা সুলতানা আশা

salmasultanaashaa20@gmail.com

 

তাসবীর হাসান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

tasbirhasan2004@gmail.com

https://www.facebook.com/nibirsajeeb?mibextid=ZbWKwL

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন