মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বাংলাদেশের দৃশ্যমাধ্যম পাঠ
সমসাময়িক কিছু সবক, হকিকত ও তরিকত
মাহমুদুল হাসান

ভূমিকা
The contemporary is he who firmly holds his gaze on his own time so as to perceive not its light, but rather its darkness. All eras, for those who experience contemporariness, are obscure. The contemporary is precisely the person who knows how to see this obscurity, who is able to write by dipping his pen in the obscurity of the present.1
জর্জিও আগামবেন তার ÔFor an Ethics of CinemaÕ প্রবন্ধে জানান, চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পী কেবল একজন অভিনয়শিল্পী-ই নন বরং তিনি ÔTypeÕ বা ‘সামাজিক ছাঁচ’ থেকে ÔPersonaÕ বা ‘ব্যক্তিত্ব’ এবং শেষ ধাপে গিয়ে পরিণত হন ‘উরাড়’ বা ‘দেবতা’ /‘মিথে’। এই পর্যায়ে এসে একজন অভিনয়শিল্পী নিজেই ÔBare LifeÕ ধারণ করে। কারণ তার কোনো কিছুই তখন পাঠক/দর্শকের আগ্রহের বাইরে থাকে না। সমসাময়িক বাংলাদেশে এর নজির ভূরি ভূরি। তবে জনপ্রিয় সংস্কৃতির রাজনৈতিক পরিসরকে বোঝার সুবিধার্থে ‘মেগাস্টার’ শাকিব খানকে এই আলাপে টেনে আনা যায়। আরো একটা বিষয়ে বলে রাখা ভালো যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের/ভিজ্যুয়ালের সাংস্কৃতিক রাজনীতি এবং তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পাঠ/সমালোচনা কখনোই জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিসরে হাজির থাকা চলচ্চিত্র/ভিজ্যুয়ালের চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া সম্ভব নয়। তাই এই আলাপে জনপ্রিয় সংস্কৃতির আইকন হিসেবে শাকিব খানের আবির্ভাব।
চলচ্চিত্রে চরিত্রায়ণের বাইরেও শাকিব খানের একটা সামাজিক জীবন আছে। যেটা তার সামাজিক ছাঁচ। আর এই ছাঁচেই শাকিব খানের অবয়বের গঠন। যেটা কার্ল ইয়ুং-এর আর্কেটাইপ-এর মতো। এই পরিসরেই অভিনয়শিল্পীর অস্তিত্ব বিদ্যমান। আর এই অস্তিগত জায়গা থেকেই শিল্পী তার চরিত্রের চরিত্রায়ণেও ব্যক্তিত্বের ছাপ রেখে যান। হয়ে ওঠেন অস্তিমান। কিন্তু সেই অস্তিত্ব নেতির সম্মুখীন হয়, যখন অভিনয়শিল্পী এই দুইটি স্তর পার করে ÔDivoÕ/ÔDivineÕ, ‘ক্লাসিক’, ‘স্টার কালচারে’ এসে পড়েন। নায়ক-এর অরিন্দম মুখার্জি রূপে উত্তম কুমার, হিরোইন-এর মাহি আরোরা রূপে কারিনা কাপুর খান এই নেতির প্রগাঢ় অবয়ব দাঁড় করায়। তাই আগামবেন দেখাতে চান, চরিত্ররা কেবল বাস্তব ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি নয়, বরং তারা সুনির্দিষ্ট একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক টাইপ বা ‘ছাঁচ’কে বহন করে চলে। এবং চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, উপরন্তু মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বের আলাদা একটা অবয়ব। এমনকি চরিত্রের ওপর দেবত্ব-ও আরোপ করে চলচ্চিত্র। যা বৃহত্তর পরিসরে তার পাঠকের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তাই এইখানে এসে চলচ্চিত্রের নৈতিকতা, অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একইসঙ্গে তার চরিত্রেরও অস্তিত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্ন ভাবনাচিন্তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষায়িত পরিসর/জগতে মৌলিক একটা প্রস্তাবনা আকারে হাজির হয়। চলচ্চিত্র ও তার চরিত্র পাঠে আগামবেন একটা পিচ্ছিল চিকন রশির উপর এনে দাঁড় করান। আশিল এমবেম্ব-এর ÔLimbo StateÕ -এর মতো। তখন দর্শক/পাঠকেরও অস্তিত্ব ও তাদের ভিজ্যুয়াল পঠনপাঠন নিয়েও তৈরি হয় ভাবনাচিন্তার বিশাল ক্ষেত্র।
আবার চলচ্চিত্র দর্শকের অভিজ্ঞতার বিশেষ রূপ। যেই পর্যায়ে চলচ্চিত্রের প্রতিটি মুহূর্ত দর্শকের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে ও তার উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। চলচ্চিত্রের সঙ্গে এর দর্শক এমনভাবে একাত্মতাবোধ পোষণ করে যে, চলচ্চিত্রে কোনো চরিত্রের মুক্তি তখন আর সাধারণ কোনো মুক্তি থাকে না। এই মুক্তি সময়ের পরিসরে দর্শককে এমন এক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে তা দর্শকের যাপিত জীবনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে ও তার অস্তিত্বগত মুক্তিকরণ ঘটায়। আগামবেন বলতে চান, চলচ্চিত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য (Aesthetics) কোনো চমক বা প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের মধ্যে সীমায়িত নয় বরং এর বিস্তৃতি আরো বৃহত্তর পরিসরে; যেই পরিসরে বাস্তবতা, সময় ও অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা একীভূত হয়ে পড়ে। আর চলচ্চিত্র বা ভিজ্যুয়াল হয়ে ওঠে সময়ের মেসিয়া।
ভিজ্যুয়ালকে পাঠ করার আরো একটা নতুন প্রস্তাবনা/তরিকা আগামবেন হাজির করেন তার ÔCinema and History: On Jean-Luc GodardÕ প্রবন্ধে। ইতিহাস আর চলচ্চিত্র কীভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেই আলাপ তোলেন তিনি। ইতিহাস লেখা হয় নথিতে। আর ইতিহাসমাত্র অতীত নয়। লিনিয়ার সংখ্যাতাত্ত্বিক বদ্ধ কোনো ধারণাও নয়। ইতিহাস যেমন ভূত, তেমনই অভূত এবং বর্তমানও। এই তিনের সম্মিলনেই গড়ে ওঠে ইতিহাসের গাত্র। ফুকো তার ÔThe Order of Things: An Archaeology of the Human SciencesÕ গ্রন্থে জানান, ইতিহাস এমন এক জিনিস যা মানুষের স্মৃতির সমান বয়সি। মানুষ যখন ‘ভাষা’ ব্যবহার ও আয়ত্ত করা শিখলো তখনই ইতিহাসের জন্ম। তাই মানুষ পাঠের ব্রহ্মাস্ত্র হলো ইতিহাস। তাই ঊনিশ শতকের আলোকায়ন ও রিজনের যুগে মানুষকে ‘ডিহিস্টোরিসাইজ’ থেকে রক্ষা করতে ফুকো ‘হিস্টোরিসাইজেশনে’র ধারণা সামনে আনলেন। তাড়না বোধ করতে থাকলেন কীভাবে মনুষ্য জাতিকে ‘ঐতিহাসিক’ করে তোলা যায়। ময়নাতদন্ত করে মানুষের বানানো বিশাল সভ্যতার শরীর কাটাছেঁড়া করে, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খুঁড়ে খুঁড়ে কীভাবে মানুষকে ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। লিনিয়ার নয় বরং সুনির্দিষ্ট সময়কালের (Fragmented) ক্রনোলজিকাল ইতিহাস কীভাবে সমুদ্রের অতল থেকে ডুবুরির মতো ডুব দিয়ে তুলে আনা যায়। আর এই প্রক্রিয়ার নামই ফুকো রাখলেন আর্কিওলজি। ফুকো তার এই ধারণা পেয়েছিলেন ফ্রিডরিখ নীৎশে’র কাছ থেকে। নীৎশে জানান, ইতিহাস কখনোই সংখ্যাতাত্ত্বিক লিনিয়ার কোনো কাঠামো হতে পারে না। ইতিহাস হলো আনটাইমলি, Fragmented, বৃত্তাকার। মানে জিনিওলজিকাল। আর এই ইতিহাসকে অচেতনে নিয়ে আসেন জাক লাকাঁ। তিনি বলেন, ‘বিগতকে ইতিহাস বলে না। বিগত তখনই ইতিহাস হয় যখন বর্তমান বলিতে পারে বিগতকে ইতিহাসে পাঠাইলাম; বর্তমান মুহূর্তে তাহাকে ইতিহাসে পাঠাইতেছি, কেননা তাহার জীবন বিগত হইয়াছে’।২
এই বিবেচনা থেকে ইতিহাসকে মোটেও অতীত বলা চলে না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এমনকি অতীতেরও পরতে পরতে হাজির থাকে ইতিহাস। আগামবেনের দাবি, চলচ্চিত্র কেবল ইতিহাসের বাহক নয়, বরং নিজেই ইতিহাস হয়ে ওঠে; ইতিহাসের অনটোলজি হয়ে ওঠে। এবং ইতিহাসের অস্তিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাকে ছাড়িয়েও যায়। এমনকি চলচ্চিত্র ওই ইতিহাসেরই সত্যাসত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে; ইতিহাস যে রিপ্রেজেন্টেশনাল সেই দিকে ধাবিত করে তার পাঠককে। আর এভাবেই ইতিহাসকে ত্বরায় চলচ্চিত্র/ইমেজ/ভিজ্যুয়াল।
ইমেজ/ভিজ্যুয়াল হলো সময়ের মেসিয়া। মানে বর্তমান সময়টা মূলত ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের সময়। সমাজকাঠামোর পরতে পরতে ইমেজ/ভিজ্যুয়াল। এর যাত্রাটা শুরু ৯০-এর দশকে। যেটাকে তাত্ত্বিকরা বলছে, ÔThe Pictorial Turn/The Visual TurnÕ|3 আবার ইমেজের ডিজিটালাইজেশনের ফলে তাকে আর কেবল বস্তুগত উপস্থিতি হিসেবে পাঠ করা যাচ্ছে না, বরং দেহগত অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে তথ্য যেভাবে প্রক্রিয়াজাত ও উপলব্ধি করা হয় সেই সমুদয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছে ইমেজ। সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর তাত্ত্বিক অবস্থান, অচেতনের গঠন হলো ইমেজ/ভিজ্যুয়াল দিয়ে। তার মানে মানুষের যাপিত জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই ইমেজ/ভিজ্যুয়াল। তাই এই সময়টাও ‘দেখার সময়’৪ সেহেতু ‘দেখার সংস্কৃতি’র যে আত্মীকরণ সেটাকে মাথায় রেখেই বাংলাদেশের জনপ্রিয় জনপরিসরে হাজির থাকা ভিজ্যুয়াল কালচার ও তার পঠনপাঠন নিয়ে সাম্প্রতিক (বিশেষ করে ’২৪ ও তার পরবর্তী সময়) কিছু প্রবণতার কথাই তুলে ধরা হবে এই প্রবন্ধে। সেদিকেই মূল অভিনিবেশ থাকবে লেখকের।
জনসংস্কৃতির রাজনৈতিক পরিসরে ভিজ্যুয়াল পলিটিক্স
আগেই একটা বিষয়ে বলে নেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের/ভিজ্যুয়ালের সাংস্কৃতিক রাজনীতি এবং ভিজ্যুয়ালের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পাঠ/সমালোচনা কখনোই জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিসরে হাজির থাকা চলচ্চিত্র/ভিজ্যুয়ালের চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল পলিটিক্সকে পাঠ করতে হলে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর সাংস্কৃতিক রাজনীতির পরিসরকে অবশ্যই গুনতির ভেতরে আনতে হবে। তবেই হয়তো বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল পাঠের একটা সুসংহত পাঠ ও ব্যাখ্যা হাজির করা সম্ভব। সেই জায়গা থেকে সবচেয়ে বেশি বিবেচ্য হলো, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল কী ধরনের সাংস্কৃতিক রাজনীতি উৎপাদন-পুনোরুৎপাদন করে চলেছে। সেটা বিবেচনার ক্ষেত্রে এই বক্তব্য জুতসই বলে মনে হয়,
... রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানে আমরা বসবাস করি, সেখানে নির্ধারিত চলচ্চিত্রের ভাষা-ভঙ্গি দেখতে পারা জরুরি। যেখানে পূর্বনির্ধারিত কতকগুলো জায়গা আছে, সেই কারণে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ‘আমাদের’ সিনেমার কারখানা কীভাবে সিনেমার কারখানার কারিগরি ভেঙে দিতে পারে সেই প্রশ্নটি ভাবা।৫
ফলে চলচ্চিত্র কারখানার আলাপ করতে হলে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরে পরে তার কালচারাল টার্নটাকে বুঝতে হবে ভালো করে। আর কারখানাকে বুঝতে হবে এইভাবে যে, তার ‘... বৈশিষ্ট্য হলো ভোক্তার রুচি [সে] কেয়ার করে না। ভোক্তার অভ্যাস তৈরি করে। ... খোলা বাজারে পণ্য বিপণন রীতির একটা পপুলিস্ট ধারা আছে। পঞ্জিকা যদি সরকার নিষিদ্ধ করে, তারপরও ১০ বছর পঞ্জিকা পাবেন। ওটাই জন-রাজনীতিক ট্রেন্ড।’৬ বর্তমান সময়ে এসে নতুন নির্মাতাদের হাত ধরে সেই প্রবণতাগুলো কেমন আকার ধারণ করেছে সেটাই দেখার বিষয়।
জুলাই আন্দোলনের পর পরই জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ((NCTB)) কর্তৃক প্রণীত নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের পেছনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদেরকে নিয়ে একটা গ্রাফিতি ‘পাতা ছেড়া নিষেধ’ সংযুক্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই গ্রাফিতিতে ‘আদিবাসী’ শব্দ থাকায় সেটা তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন তৈরি হয় এই ব্যাপারগুলো অর্থাৎ আইডেন্টিটি নির্মাণের ব্যাপারগুলো বর্তমান সময়ে কীভাবে সিনেমা বা ভিজ্যুয়ালে হাজির হচ্ছে বা বর্তমান নির্মাতাদের নির্মাণে জাতিসত্তার গঠন, জাতীয়তা, আইডেন্টিটি কীভাবে রিপ্রেজেন্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিলো মেঘের অনেক রং। সেখানেই প্রথম কোনো ‘বাঙালি’ চরিত্র বাদে কেউ/কয়েকজন প্রোটাগনিস্ট হিসেবে হাজির হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বাঙালি আধিপত্যবাদী ডিসকোর্সের বাইরে গিয়ে এই প্রথম কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে যেখানে উঠে এসেছে আদিবাসীদের ভূমিকা। এর পরে বি এফ ডি সি থেকে আর কোনো চলচ্চিত্র চোখে পড়ে না, যা এই ধরনের জাতিসত্তা, আইডেন্টিটি ডিল করেছে। এর অনেক পরে এসে নির্মিত হয়েছে মাই বাইসাইকেল (২০১৪) ও গিরি কন্যা (২০২২)। সেগুলো বি এফ ডি সি’র বাইরে নির্মিত। অর্থাৎ জনপরিসরে এর কোনো ইপ্লিমেন্টেশন তেমন একটা চোখে পড়ে না। জনপরিসরে হাজির থাকা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোও সেই মুক্তিযুদ্ধের বাঙালি আধিপত্যবাদী ডিসকোর্সের বাইরে যেতে পারেনি কখনোই।
জুলাই আন্দোলনের পর পরই যেভাবে শাহবাগ আর শাপলাকে কেন্দ্র করে বাইনারি রাজনীতি পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, সেটা জনপরিসরে হাজির থাকা সাংস্কৃতিক রাজনীতিরই ইঙ্গিত দেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারেক মাসুদরা মাটির ময়না দিয়ে যে আইডেন্টিটি নির্মাণের প্রচেষ্টায় রত হয়েছিলো তারই একটা সাবালক রূপের সন্ধান মেলে ’২৪-এ। কিন্তু সেই সাবালকত্বটাও ক্ষণিকের। ‘মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন, লুকালে না পায় অন্বেষণ’ কিংবা ‘মনের ঘোরে কেশের আড়ে পাহাড় লুকায়’-এর মতো ব্যাপার। এই সময়ে এসে তারেক মাসুদের উত্তরসূরি হিসেবে কামার আহমাদ সাইমন, নূরুল আলম আতিক, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, রায়হান রাফী’র মতো নির্মাতাদের কাজ করতে দেখা যায়। যার মধ্যে কেবল রাফী বাদে সবাই বি এফ ডি সি’র বাইরে থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। এখন ব্যাপার হলো, এদের নির্মাণ থেকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতির একটা পরিপক্ব রূপ দেখা যাবে কিন্তু বিবেচনাটা কেবল ওনাদের নির্মাণের (প্যারালাল সিনেমা) মধ্যে আবদ্ধ রাখলে তা ফ্রাগমেন্টেড হয়ে যাবে, পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এ কারণেই রাফী’র মতো জনপ্রিয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া নির্মাতাদের বিবেচনায় আনতে হবে। এদের মতো নির্মাতাদের বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে তাদের নির্মাণে প্রচণ্ড রকম ভারতীয় আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে। এই সময়ে এসে এই ধরনের নির্মাতাদের ‘প্যান-ইন্ডিয়ান’ চলচ্চিত্র হিসেবে তাদের নির্মাণকে ঘোষণা করতে দেখা যায়। যা স্পষ্টতই ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের হারমিনিউটিক্স’কেই তুলে ধরে। তুফান-এ পুষ্পা ইফেক্ট এমনকি সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বরবাদ (২০২৫) এবং জংলি (২০২৫) তে ভারতীয় প্রভাব একবারেই স্পষ্ট।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ’২৪-এর আন্দোলন রীতিমতো ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যে দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ৩২ নং বাড়ি ভেঙে ফেলা হলো, সেদিন রাতেই সেই বাড়ি পাহারা দেওয়া হলো হানি সিং-এর ‘লুঙ্গি ডান্স’ গান বাজিয়ে। সেসবের ভিজ্যুয়াল সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতির আধিপত্য এতোটাই কলোনাইজ এবং চেপে বসেছে যে, অচেতনেই সেই সংস্কৃতির কাছেই ফিরতে হচ্ছে! আর এ কারণেই বাংলাদেশ এখনো ভারতের ‘স্যাটেলাইট রাষ্ট্র’ হয়ে আছে।
যাইহোক, এবার চলচ্চিত্র থেকে ভিজ্যুয়াল পরিসরে ভাইরাল কনটেন্টের সাংস্কৃতিক রাজনীতি নিয়ে আলাপ তোলা যাক। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কনটেন্ট জগতে ‘রিপন ভিডিও’ এবং হিরো আলম উল্লেখযোগ্য নাম।
আম গাছে আম ফলে
কুমড়ো ফলে চালে,
দূর থেকে কিস দিলাম
তুলে নাও গালে।
... ... ...
আম চুক্কা, জাম চুক্কা
চুক্কার নাই শেষ,
রিপন মিয়া এগিয়ে চলো
রিপন মিয়ার বাংলাদেশ।
এটাই বাস্তব। আই লাবিউ। হা হা হা।
এই কয়েক লাইনের কবিতাগুলো ছিলো রিপন মিয়ার শুরুর দিকের মূল হাতিয়ার। ২০২৪-২৫-এ এসে রিপন মিয়ার পুনরুত্থান হয়েছে। তার মূল শক্তি ছিলো শট্র্স ও রিলস। বাংলাদেশের মানুষ যেমন ল্যাম্বরগিনি (Lamborghini), দামি হোটেল, রিসোর্টসহ নানা চাকচিক্যপূর্ণ জৌলুসময় ভিডিও দেখে, তেমনই একদম সাধারণ একজন মানুষ শীতের সকালে উঠে দাঁত মাজছে ছাই দিয়ে, পিঠা খাচ্ছে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বরই খাচ্ছে, এসব ভিডিও-ও দেখে। রিপন ঠিক সেই কাজটিই করেছেন। একইসঙ্গে তিনি কোলাবোরেট করছেন অন্য অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সঙ্গে। ‘এস পি ক্রিয়েশন’, ‘রাফসান দ্য ছোটোভাই’ ইতোমধ্যে তার সঙ্গে ভিডিও বানিয়েছে। শুধু শট্র্স বা রিলসেই আটকে থাকেননি তিনি। ইউটিউবে লঙ ফরম্যাট ভিডিও ব্লগ বা ভ্লগ করেছেন খুবই প্রফেশনালিজম মেইনটেইন করে।
যেসব কনটেন্ট ক্রিয়েটর ‘ক্রস ক্লাস পেনিট্রেশন’ করতে পারে তাদেরকে কালচারালি আলাদা চোখে দেখা জরুরি। ‘ক্রস ক্লাস পেনিট্রেশন’ বলতে বুঝায়, আপনি খুবই সাধারণ লোয়ার ক্লাস সিটিজেন কিন্তু আপনি যা করেন, আপনার কনটেন্ট আপার ক্লাসের মানুষজনও দেখে। উল্টোটাও হতে পারে, আপার ক্লাসের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভিডিও লোয়ার ক্লাসের মানুষজন দেখে; এটাই আসলে বেশি হয়ে থাকে। কারণ তাতে শ্রেণি আধিপত্য কাজ করে। কিন্তু রিপন মিয়া স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছেন। তিনি ঘটিয়েছেন তার উল্টোটা, নিজে লোয়ার ক্লাসে হোল্ড করেও তার নির্মিত কনটেন্ট আপার ক্লাসকেও দেখিয়েছেন। ইভেন এই সময়ে এসে আর কোনো শ্রেণি আধিপত্যেরই ধার তিনি ধারেননি। কারণটা হচ্ছে, সম্প্রতি জংলি চলচ্চিত্রের প্রোমোশন করানো হয়েছে রিপন মিয়াকে দিয়ে। যা একইসঙ্গে শ্রেণি আধিপত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ক্ষমতার আদলকে বদলে দেয়। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। সেটা হলো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির তুরুপের তাসও হতে পারেন তিনি। অন্যদিকে, হিরো আলম তো নিজেই একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং অভিনয়শিল্পী। তাকে নিয়েও একই কথা খাটে। তো ব্যাপার হচ্ছে, বর্তমানে ‘ভাইরাল কালচার’ হাজির হচ্ছে সোশাল মিডিয়ার বরাতে। তারপরে তারাই হয়ে উঠছে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। এবং হয়ে উঠছে কালচার ইন্ডাস্ট্রি এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ।
ভিজ্যুয়াল ও মিডিয়াম (মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ)
মার্শাল ম্যাকলুহান-এর বিশ্ববিখ্যাত তত্ত্ব ‘মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ’। এর অর্থ হলো, কোনো মিডিয়াম বা প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রদত্ত বার্তা যতোটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে সামাজিক ও ব্যক্তিক জীবনে ওই মিডিয়াম বা প্রযুক্তির প্রকৃতি, গঠন ও প্রভাব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এবং আলাদা করে আমলে নেওয়ার দাবি রাখে। তিনি জানান, যখন কোনো মিডিয়াম বা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় তখন সেই মিডিয়াম বা প্রযুক্তি অনুভূতি, সম্পর্ক ও সামাজিক গঠনকে পরিবর্তন করে ফেলে। প্রতিটি নতুন মিডিয়াম বা প্রযুক্তি কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো সামাজিক কাঠামোতেই পরিবর্তন নিয়ে তো আসেই সেইসঙ্গে সমাজের মৌলিক কাঠামোতে নতুন আস্তরণ তৈরি করে। এ বিষয়ে ম্যাকলুহান বলছেন,
... মাধ্যমই বার্তা। অর্থাৎ যেকোনো নতুন মাধ্যম বা প্রযুক্তি শুধু কাজ করার পদ্ধতিরই পরিবর্তন ঘটায় না, বরং ব্যক্তি ও সমাজজীবনের ওপরেও গভীর প্রভাব ফেলে। নতুন প্রযুক্তি বা মাধ্যম চিন্তা, যোগাযোগ ও আচরণের ধরন বদলে দেয়। এটা কেবল তথ্য পরিবহনের একটি মাধ্যম হিসেবেই কাজ করে না, বরং জীবনযাত্রার নতুন মাত্রাও তৈরি করে। জীবনযাত্রার এই নতুন মাত্রা অভ্যাস, সংস্কৃতি ও সমাজের কাঠামোতেও নিয়ে আসে ব্যাপক পরিবর্তন।৭
এখানে ম্যাকলুহান একেবারে পরিষ্কারভাবে বলছেন, মাধ্যম বা প্রযুক্তির গঠন এবং তার আকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সেই মাধ্যমটি মাধ্যম হিসেবে কীভাবে, কতোটা প্রভাব ফেলে সেটা তার বার্তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যক্তিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সব পরিসরেই আসে ব্যাপক রূপান্তর। এই জায়গা থেকে ভিজ্যুয়াল ও তার মাধ্যমগুলোকে ক্রিটিকালি দেখা যেতে পারে।
মানুষের ইতিহাস ভিজ্যুয়াল চর্চার ইতিহাস। কোনো না কোনোভাবে ভিজ্যুয়ালের সঙ্গেই তার যাপিত জীবনের যতো লেনদেন। এই ভিজ্যুয়াল ফ্রয়েডের দাবি অনুযায়ীজ্জযেহেতু অচেতন হলো ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের সমষ্টিজ্জমানুষের একেবারে দৈহিক-মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। সেই জায়গা থেকে মানুষ গুহাচিত্র এঁকেছে। তাদের ভেতরকার ভাবাবেগ প্রকাশ করেছে ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে। প্রকাশের এই মাধ্যমগুলোতেই যুগে যুগে এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এর ফলে সমাজকাঠামো ও ক্ষমতাকাঠামোর গড়নেরও এসেছে আমূল পরিবর্তন।
ম্যাকলুহানের মতে, চলচ্চিত্র একটি হট মিডিয়াম। যেখানে মনোযোগের পুরোটা প্রয়োজন হয় এবং তথ্যের হাই ডেফিনেশন থাকে। প্রেক্ষাগৃহে সেই পরিবেশ বজায় রেখেই চলচ্চিত্র দেখানো হয়। অর্থাৎ বড়ো পর্দা, উচ্চমানের সাউন্ড সিস্টেম, অন্ধকার পরিবেশে যা দর্শকের মধ্যে ওই ধরনের অনুভূতি তৈরি করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে চলচ্চিত্র পরিণত হয়েছে ভিজ্যুয়াল কনটেন্টে এবং সেই কনটেন্ট দেখা মাধ্যমেরও হয়েছে আমূল পরিবর্তন। এখন কনটেন্ট দেখা হচ্ছে মোবাইল, ল্যাপটপ, স্মার্ট টিভি, ট্যাবলয়েড-এ। এখানে দর্শকের ওই ধরনের এনগেজমেন্ট থাকছে না। দর্শক একইসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করে মানে মাল্টি-টাস্কিং করার পাশাপাশি ভিজ্যুয়াল কনটেন্টও দেখে। তাই ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে কুল মিডিয়ামে।
ম্যাকলুহানের ভাষায়, নতুন মাধ্যম পুরাতন মাধ্যমকে ধ্বংস করে না। কিন্তু ÔRemadiateÕ মানে নতুনভাবে সংস্কার করে। কাজেই প্রেক্ষাগৃহের ক্ষতি হবার আশঙ্কা খুবই কম।৮ ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট অনেক বেশি ডায়ালগ নির্ভর হচ্ছে। কারণ দর্শক ছোটো স্ক্রিনে এতো বেশি এবং অতিরিক্ত ভিজ্যুয়াল ডিটেইল দেখতে আগ্রহী হয় না। ম্যাকলুহানের তত্ত্ব অনুসারে, ডিজিটাল যুগে মাধ্যমের প্রভাব এতোটাই শক্তিশালী যে, এটা শুধু প্যাসিভ দর্শককে অ্যাক্টিভ-ই নয় বরং অ্যাক্টিভ পার্টিসিপেন্ট-এও পরিণত করছে। এর ফলে ‘ইন্টারেকটিভ সিনেমা’র জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অর্থাৎ দর্শক নিজেই মতামত প্রদানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারছে। সম্প্রতি নেটফ্লিক্স-এ মুক্তি পাওয়া বান্দারস্ন্যাচ (২০১৮)৯ ‘ইন্টারেকটিভ সিনেমা’র উদাহরণ।
এছাড়া ইউটিউব-এর মতো ওটিটি প্লাটফর্ম থাকার কারণে ইউ জি সি (User Generated Content) এর উত্থান ঘটেছে। এখানে দর্শক কেবল ভোক্তা নয়, একইসঙ্গে হয়ে উঠেছে নির্মাতাও। এবং এখানেই নানা ধরনের শর্টফর্ম ভিজ্যুয়াল স্টোরি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শর্টফর্ম ভিজ্যুয়াল স্টোরি বিশেষ করে ৫-১০ মিনিটের ভিজ্যুয়াল বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ সময়ের ভিজ্যুয়াল দেখছে না দর্শক। তাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে।
আগে চলচ্চিত্রের প্রধান প্লাটফর্ম ছিলো প্রেক্ষাগৃহ। যেখানে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিলো। কিন্তু ডিজিটাল মিডিয়ার নানা প্লাটফর্ম হাজির হওয়ার কারণে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। এই জায়গা থেকে নতুন মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের কিছু প্রবণতাও লক্ষ করা যায়, সেগুলো হলো : এ আই ও অ্যালগরিদমের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। ইউটিউবসহ বেশিরভাগ ওটিটি এখন ‘বিগ ডাটা’ মেথডে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যা নতুন ধরনের সাইকো পলিটিকাল ক্ষমতাকাঠামোর উদ্ভব ঘটাবে। ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলো দিন দিন আরো শক্তিশালী এবং চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে। এবং নতুন এইসব ডিজিটাল প্লাটফর্মের মালিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর জন্য আলাদা করে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ভিজ্যুয়াল, কগনিটিভিটি ও বায়োপলিটিক্স
ভিজ্যুয়াল বর্তমানে এমন একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, এটাকে এখন আর আলাদা করে কেবল চলচ্চিত্র হিসেবে আইডেন্টিফাই করা মুশকিল। বরং সবকিছুই হয়ে উঠেছে ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট। ভিজ্যুয়ালের এই যে রূপান্তর, সার্বিক দিক থেকে এটাকে বিবেচনা করতে হবে পুরো ভিজ্যুয়াল ইন্ডাস্ট্রির রূপান্তর হিসেবে। এছাড়া ভিজ্যুয়াল কনজাম্পশনের দার্শনিক জায়গাতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সময় এখন এতো দ্রুতগামী যে, মানুষের আর কোনো কিছু পড়ার সময় তো নাই-ই, দেখার সময়ও কমে এসেছে।
গুহার ভেতরে বাইসনের চিত্রের ইতিহাস তো মানুষের ভিজ্যুয়াল চর্চারই ইতিহাস। ওয়াল্টার জে. ওয়াং তার ÔOrality and Literacy: The Technologizing of the WordÕ বইয়ে বলছেন, মানুষ তার সেই ভিজ্যুয়াল কালচার ছেড়ে এসেছিলো ওরালিটিতে, পরে সে ধাবিত হয়েছে লিটারেসির দিকে। এখন এই সময়ে এসে ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের ডিজিটালাইজেশনের সুবাদে সে আবারও সেই আদিমকালে ফিরে যাচ্ছে, যেখানে ইমেজ/ভিজ্যুয়াল সবসময়ই মানুষের দেহগত ক্রিয়াকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলো। The Pictorial Turn/The Visual Turn -এর সুবাদে চারিদিক এখন ইমেজ/ভিজ্যুয়ালে সয়লাব। কাজেই সময়টাও এখন ‘দেখার’। তবে এই দেখাতেও এসেছে ব্যাপক রূপান্তর, এখন এই দেখার মধ্যেও আবদ্ধ থাকতে চায় না মানুষ, সে চায় আরো কিছু। যাইহোক মানুষ এখন বন্দি হচ্ছে ছোটো ছোটো টিকটক, শর্ট্স, রিলসের সার্কুলারাইজড জগতে। সে জগৎ কোনো লিনিয়ার কাঠামো নয় বরং ‘নিউজফিডে’র মতো অনন্ত সার্কুলারাইজড জগৎ। দীর্ঘ ভিজ্যুয়ালেও এখন তার অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেই জায়গা থেকে চলচ্চিত্রও দর্শকের চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পরিণত হয়েছে ভিজ্যুয়াল কনটেন্টে। এবং এই ভিজ্যুয়ালের আলাদা ভাষাও বিদ্যমান। যেটাকে বলা হচ্ছে ‘হুক আপ’ ল্যাঙ্গুয়েজ। মানে এই সময়কার দর্শক এতো বেশি এলিয়েনেটেড যে, তাকে কোনো কিছুতে মনোনিবেশ করাতে হলে সেই ধরনেরই ক্যাচি ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ দরকার। যা বর্তমান ভিজ্যুয়াল কনটেন্টকে ধারণ করতে হচ্ছে।
ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে মানুষের কগনিটিভিটির সম্পর্ক আগে থেকেই ছিলো। কিন্তু ছোটো ছোটো টিকটক, শট্র্স, রিলসের সার্কুলারাইজড জগতের সঙ্গে মিশতে গিয়ে মানুষের মনোনিবেশগত জায়গাতেও এসেছে বিরাট পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের কারণটা সুস্পষ্টজ্জপুঁজির লাগামহীন বিকাশ, এর ফলে মানুষের গন্তব্যহীন ছুটে চলা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বোপরি নিজের সঙ্গে নিজেরই এলিয়েনেশন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভিজ্যুয়ালের ভিজিবিলিটি ও কগনিটিভিটির সম্পর্ক/যোগসূত্রতাকে আরেকটু গভীরভাবে দার্শনিক ছাঁচে ফেলে ভাবতে হবে। ইমেজ/ভিজ্যুয়াল, মস্তিষ্ক ও মনোনিবেশ/কগনিটিভিটি নিয়ে জিল দেল্যুজ-এর আলাপ বেশ আকর্ষণীয়। দেল্যুজ তার এক সাক্ষাৎকারে বলছেন,
সিনেমা কেবল ইমেজের মধ্যেই নড়ন বা ক্রমিক গতি নিয়ে আসে না বরং মনের মধ্যেও সেটার সঞ্চারণ ঘটায়। মন আর মস্তিষ্ক একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত ... তাই মস্তিষ্ক হলো একক, মস্তিষ্কই স্ক্রিন/পর্দা। ... সিনেমা যা বলতে চায় সেটা মনোবিশ্লেষণ আর ভাষাতত্ত্ব দিয়ে প্রকাশ বা ধরা সম্ভব নয়। অন্যদিকে মস্তিষ্কের জৈবিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে আনবিক জৈবিক বিজ্ঞান সেটা করতে সক্ষম। কারণ চিন্তাও আনবিক। আর আনবিক গতির ওপরই নির্ভর করে গঠিত হয় আমাদের সত্তার স্বরূপ।১০
এখানে লেখকের দাবি, অন্যান্য উপাদানের পাশাপাশি দর্শকের মস্তিষ্কও ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের অংশ হয়ে ওঠে। এবং এই যে সমন্বিত ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের ধারণা, সেটা দীর্ঘ ভিজ্যুয়ালে কিছুটা ব্যাহতই হয় বলা চলে। মানে দর্শককে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। কিন্তু দর্শক যেহেতু আগে থেকেই এলিয়েনেটেড তাই সে আর ওই অস্বস্তিটুকু নিতে চায় না। সে ঢুকে যায় টিকটক, শর্ট্স, রিলসের জগতে। সেখানে ছোটো ছোটো ভিজ্যুয়াল থাকায় দর্শকের মনোনিবেশগত জায়গায় কোনো সমস্যা হয় না, আর সে ওই অস্বস্তিটুকুও আর বোধ/অনুভব করে না। আর এই শট্র্সগুলোতে সিস্টেমেটিকালি কনটিনিউটিকে বজায় রাখা হয়। যার ফলে মস্তিষ্কের ওপর কোনো চাপ অনুভূত হয় না। আর এ কারণেই কারো পক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই টিকটক, রিলস আর শর্ট্স ভিজ্যুয়ালের জগতেই সময় কাটানো সম্ভব হয়ে ওঠে। এবং এই জগতে ওই ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযুক্তি বা মনোনিবেশ ঘটে বেশ দারুণভাবে! এবং ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরো বেশি কমপ্যাক্ট করে তোলে। আর তখন তার মস্তিষ্কই হয়ে ওঠে স্ক্রিন/পর্দা।
অন্যদিকে, ‘ট্রেডিশনাল সিনেমা’ পরিণত হয়েছে ‘রিচুয়ালস’ বা বিশেষ ‘উৎসবে’; যেমন বছর ঘুরে বিশেষ উৎসব আসে সেরকম আরকি। এইসব উৎসব উদ্যাপনের আড়ালে মানুষের যাপিত জীবনে ধারণ করার জায়গা নিয়ে যেমন সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তেমনই ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে মানুষের সার্বক্ষণিক বসবাস বা যাপিত জীবনের সঙ্গে ভিজ্যুয়ালের যে সম্পর্ক সেটা আর চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে বলা যাচ্ছে না। বরং সেই জায়গাটা দখল করেছে টিকটক, রিলস, শর্ট্স। আর এসব কনটেন্ট মানুষকে আরো বেশি এলিয়েনেটেড, সেইসঙ্গে বিরাজনৈতিক করে তুলছে।
মানুষকে ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে বিরাজনৈতিক করে তোলার প্রসঙ্গ ধরে জৈবরাজনীতির বিশাল জমিনে পা রাখা যায়। পাসি ভালিয়াহো (Pasi Valiaho) তার ÔBiopolitical Screens: Image, Power, and the Neoliberal BrainÕ বইয়ে বলছেন, নিওলিবারেল সময়ে ইমেজ/ভিজ্যুয়াল স্ক্রিন মানুষের অনুভূতি, ধারণাকে প্রভাবিত করে; বুদ্ধিবৃত্তিক ও শরীরবৃত্তীয় অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ এবং পুনর্গঠন করে একইসঙ্গে সেগুলোকে বিশ্লেষণও করে।১১ ভালিয়াহো যুক্তি দেন, ইমেজ/ভিজ্যুয়াল মানুষের ভবিষ্যতকে বর্তমানে এনে হাজির করে। ভবিষ্যতকে এমন এক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করে যা বর্তমানে হাজির থেকেই মানুষ তার দেহে সেটাকে বাস্তব হিসেবে অনুভব করে। তিনি আরো বলছেন, নিওলিবারেলিজম ইমেজ/ভিজ্যুয়ালকে সামাজিক পরিসর থেকে সরিয়ে এনে ব্যক্তিক পরিসরে হাজির করে সেটাকে ইন্ডিভিজ্যুয়াল এপ্রোচের অংশ করে তোলে এবং আধুনিক ব্যক্তিসত্তার প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করে। এইখানে তিনি একটি দারুণ কথা বলছেন! তার ভাষ্য, বায়োপলিটিক্স বর্তমানে প্রজনন অঙ্গ বা জননেন্দ্রিয়ের (Genitals) তুলনায় মানুষের মস্তিষ্ককেই তার প্রধান বিষয়বস্তু/টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করে; এবং প্রজনন অঙ্গের জায়গাটা দখল করে বসে মানুষের মস্তিষ্ক। ইমেজ/ভিজ্যুয়াল মস্তিষ্কের নিউরোনাল ও সেরিব্রাল (Neuronal and Cerebral) কার্যকলাপকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে ব্যক্তি ও তার সামাজিক আচরণ সেইসঙ্গে বৃহত্তর পরিসরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যক্তি ও জনমানুষের মনোজগতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যা জৈবরাজনীতির অংশ হিসেবে হাজির হয়। সার্বিকভাবে তিনি বলতে চান, নিওলিবারেল ব্যবস্থা ইমেজ/ভিজ্যুয়ালকে জৈবরাজনৈতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তা ও সমাজকে প্রভাবিত করে এবং ওই পরিসরে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণতান্ত্রিক বলয় প্রতিষ্ঠা করে।
ওভার দ্য টপ : ক্ষমতা-সার্বভৌমত্ব-পুঁজি আর আবেগের রাজনীতি
সমসাময়িক বাংলাদেশের ভিজ্যুয়ালকে পাঠ করতে গেলে ওটিটি’র (Over The Top) আলাপ অনিবার্য। ওটিটি এখন বেশ বিস্তৃত ভিজ্যুয়াল মাধ্যম। বাংলাদেশে এর বিস্তার করোনা মহামারির সময়ে (যদিও শুরুটা আরো আগেই)। তাই সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি/বাস্তবতা থেকে মোটেও মুক্ত নয় ওটিটি। বরং ওই সময়ে যে ধরনের জৈবক্ষমতার চর্চা হয়েছে এবং তার পরবর্তী সময়কার রাজনীতিরও কিছুটা প্রতিফলন পাওয়া যেতে পারে ওটিটিতে। তাই ওটিটিকে এতো সহজভাবে নয় বরং বেশ ক্রিটিকালই বিবেচনায় নিতে হবে। আবার এই প্রশ্নটাকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে যে, ওটিটি কোন শ্রেণিকে রিপ্রেজেন্ট করে। কোন শ্রেণির জন্য কনটেন্ট বানায়। একটা বিশেষ শ্রেণি। আর এই বিশেষ শ্রেণির বেডরুমের বিষয় হয়ে উঠেছে ওটিটি। কাজেই ওটিটি ভিজ্যুয়ালকে সামাজিক পরিসর থেকে নিয়ে আসছে ব্যক্তিক পরিসরে। আলাঁ বাদিউ’র ‘ডেমোক্রেটিক ইমব্লেম’ থেকে ব্যক্তিক পরিসরে চলে এসেছে ভিজ্যুয়াল। আর ঠিক এখানেই জনপরিসরের জায়গাটা দখল করে ফেলেছে ইউটিউব, রিলস, শট্র্স।
এছাড়া বর্তমানে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ব্যাপক উন্নতির ফলে ওটিটিকে ভাবা হচ্ছে দর্শকের বা ওটিটি ব্যবহারকারীর ‘যখনই চাইবে কনটেন্ট দেখার সুযোগ’ ও ‘কনটেন্ট বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা’র মেনিফেস্টেশন হিসেবে। এবং বর্তমান নয়া-উদারবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুঁজির বিস্তারের ফলে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিচ্ছিন্নতা। আর সেই ‘বিচ্ছিন্নতা সংক্রান্ত (এলিয়েনেটেড) বিনোদন চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অনলাইনে উপস্থিত ওটিটি প্লাটফর্ম সবচেয়ে লাগসই মাধ্যম হয়ে উঠেছে’ এবং এই বিচ্ছিন্নতাকেই কাজে লাগাচ্ছে ওটিটি এমনকি এর অংশীদার হয়ে উঠেছে, বলেও ধারণা করা হচ্ছে।১২ হ্যাঁ, এটা হয়তো কিছুটা তৈরি হয়েছে, কিন্তু এটা ভুললেও চলবে না যে, সর্ষের ভেতরেই থাকে ভূত। এবং ‘যখনই চাইবে কনটেন্ট দেখার সুযোগ’ ও ‘কনটেন্ট বেছে নেওয়ার যে স্বাধীনতা’র নামে ওটিটি যে ‘স্বাধীনতা’ দেয় তার থেকে হুকুমাত বজায় রাখে বেশি।১৩ উদাহরণ হিসেবে বিয়ুং চুল-হান-এর তাত্ত্বিক আলাপকে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। তিনি বলছেন, নিওলিবারেল সময়ে এসে পুঁজি ‘স্বাধীনতা’কে এমন কিছু ক্রাইটেরিয়াতে ভাগ করেছে যে, খোদ স্বাধীনতার ধারণাটাও একটা বদ্ধ কারাগার হয়ে উঠেছে।১৪
আবার গেই দেবোর্দ এবং জ্যঁ বদ্রিয়া জানাচ্ছে, সমাজে চালু থাকা স্পেক্টাকলসমূহ (গেই দেবোর্দ দাবি করছেন যে, পুঁজিবাদের সর্বশেষ রূপটি হলো অগণিত স্পেক্টাকলের এক প্রকাণ্ড পুঞ্জীভবন, যার মধ্যে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছুকেই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে একটা রিপ্রেজেন্টেশন রূপে। স্পেক্টাকল মানে ঠিক ইমেজের দুনিয়া নয়, অথবা আজকের দিনে মানুষ যাকে মিডিয়া নামে ডাকে, ঠিক তাও নয় (যদিও ইমেজ এবং মিডিয়া স্পেক্টাকলের অন্তর্ভুক্ত বিষয়)। বরং এ হলো জনগণের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ক, যা ইমেজের মধ্যস্থতায় নির্ধারণ হয়। স্পেক্টাকল আসলে খোদ মানবসমাজেরই বেদখল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অবস্থা। অন্যভাবে বললে, স্পেক্টাকল হলো পুঞ্জীভবনের চরম এক রূপ, যাতে পুঁজি পরিণত হয়েছে ইমেজে। মূলত এই কারণেই, স্পেক্টাকল আসলে খোদ বিচ্ছিন্নতারই বিশুদ্ধ রূপ ছাড়া অন্য কিছু নয়। যখন বাস্তব দুনিয়াটা রূপান্তরিত হয়েছে একটা ইমেজে আর ইমেজগুলো রূপান্তরিত হয়েছে বাস্তবে, মানুষের ব্যবহারিক শক্তিকে তার নিজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটা আলাদা দুনিয়ার রূপ দেওয়া হয়েছে। এ বিচ্ছিন্ন দুনিয়াটি থাকে মিডিয়ার কব্জা ও নিয়ন্ত্রণে, যার মধ্যে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির রূপগুলো ঠাস বুনোটে সেলাই করা আছে। এই দুনিয়াতেই মার্কেন্টাইল অর্থনীতি অর্জন করেছে পরম ও দায়দায়িত্বহীন সার্বভৌমত্ব এবং হুকুমাত কায়েম করেছে পুরো সমাজজীবনের ওপরে।
উৎপাদনের মিথ্যায়ন সম্পন্ন করার পর এখন তা ম্যানিপুলেট করতে পারে মানুষের যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সমাজের যৌথ স্মৃতি ও সামাজিক ভাববিনিময়তা, এবং তাকে রূপান্তরিত করতে পারে একটা স্পেক্টাকুলার পণ্যে, যেখানে সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ করা সম্ভব খোদ স্পেক্টাকলটা ব্যতিরেকে; বিশেষ করে, চলচ্চিত্র, গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন এইসব সমাজের মধ্যে আলাদা বাস্তবতা তৈরি করে এবং তা ‘অতিবাস্তব’। যা কেবল অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং তা সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেও কমোডিটিতে পরিণত হয়। একই বিষয় ওটিটিতেও লক্ষ করা যায়। ওটিটির উদ্ভব ও কনটেন্টের উদ্দেশ্য থেকে সেটা খুব সহজেই আন্দাজ করতে পারা যায়। বিষয়গুলোকে আরো বিস্তৃত পরিসরে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ নিচে আলোচনা করা হলো :
১. ওটিটি : করোনা মহামারি ও পরবর্তী বাস্তবতায় জৈবরাজনীতি থেকে মনোরাজনৈতিক পরিসরে উত্তরণ
মিশেল ফুকো’র প্যানঅপটিকন-এর যে ধারণা, সেখানে ‘নজরদারিকারী’ বিষয়ী (Subject) অদৃশ্য থাকে। এবং ‘নজরদারিত’ বিষয় (Object) ভাবতে থাকে সে নজরবন্দি রয়েছে। যা সেল্ফ সেন্সরশিপের মতো কাজ করে। এবং ‘নজরদারিকারী’ বিষয়ী (Subject) অদৃশ্য থেকেও সব জায়গায় হাজির থাকে। কিন্তু নব্য-উদারবাদী সময়ে ফুকো’র এই ধারণাও আর খাটে না। কারণ এই সময়ে ক্ষমতার নয়া-উদারবাদী প্রযুক্তি বিষয়ের (Object) ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করে না, তাকে রক্ষাও করে না এমনকি অবদমনও করে না। বরং তার মধ্যে আরো বেশি পরিমাণে প্রত্যাশা তৈরি করে, সম্মতি/অনুমতি প্রদান করে এবং কোনো কিছু বাস্তবায়নে আরো বেশি উৎসাহিত করে। ভোগকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সর্বাধিক/সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সবকিছুরই উদ্বৃত্তকরণ ঘটতে থাকে। ইতিবাচকতারও উৎপাদন ঘটতে থাকে অভূতপূর্বভাবে।
ফলে এই রকম একটা পরিস্থিতিতে এসে বিষয়ের (Object) ওপরও আর কোনো সেন্সরশিপ কাজ করে না। বা তার মধ্যে এই বোধ তৈরি করা হয় যে, সে ‘স্বাধীন’। উৎপাদন-ভোগসহ সবকিছুর অবাধ প্রবাহের মাধ্যমে বিষয়ের (Object) ভেতরে ‘স্বাধীনতা’র বোধ তৈরি করা হয়। যেটা ফুকো বা জর্জ অরওয়েল-এর ‘নজরদারিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো’তে অনুপস্থিত। এবং নয়া-উদারবাদ এই ধরনের ‘স্বাধীনতা’র বোধ তৈরি করে। এবং সেটাকেই সমস্যাজনক বলে আইডেন্টিফাই করছেন বিয়ুং চুল-হান। তিনি বলছেন, ‘এখানে সবাই স্বাধীন বোধ/অনুভব করে। এবং এই স্বাধীনতার অনুভূতি/বোধটাই বর্তমান সময়ের সমস্যার জায়গা, যা জর্জ অরওয়েলের ‘নজরদারিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো’তে অনুপস্থিত। ... এবং এখন আর আলাদা করে প্যানঅপটিকনকে হাজির করতে হয় না। বিষয় (Object) নিজেই নিজের প্যানঅপটিকন হয়ে ওঠে’।১৫
এখন প্রশ্ন এই ‘স্বাধীনতা’কে কীভাবে কাজে লাগানো হয়; ওটিটিইবা কীভাবে কাজে লাগায়। দর্শকের ‘স্বাধীনতা’কে কাজে লাগিয়ে ওটিটি এই রাজনীতির উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই সিদ্ধান্তে আসার আগে এর প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করতে হবে। আগেই বলেছি ওটিটি আলাদা কগনিটিভ ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলে। যা তার দর্শককে মনস্তাত্ত্বিকভাবে হুক করে। এবং দর্শক তার ওই কনটেন্ট দেখতে বাধ্য হয়। তার মানে এখানে মনোজাগতিক নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গটা চলে আসছে। আর এটাকেই বলা হচ্ছে সাইকোপলিটিক্স। যা বায়োপলিটিক্সের উত্তরোত্তর ধারণা। যেখানে শরীর এবং জননেন্দ্রিয় কাজ করে না, কাজ করে বিষয় (Object) এর মনস্তাত্ত্বিক জগৎ। বাংলাদেশে ওটিটির যাত্রা বেশ আগে থেকে হলেও এর বিস্তৃতি ঘটেছে কিন্তু করোনার সময়টাতেই। এবং সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ওটিটি’র যাত্রা শুরু তখনই। তো করোনা মহামারির সময়ে জৈবক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জৈবরাজনীতির ক্ষেত্র উর্বর হয়ে ওঠে। ওটিটিতে সেই ব্যাপারটা সরাসরি পরিলক্ষিত না হলেও করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে ওটিটি টেকনোলজিকালি যে জায়গায় দাঁড়ায়, সেখানে দাঁড়িয়ে বায়োপলিটিক্সের যে ‘ডেমোগ্রাফি’র ধারণা সেটাকে উতরে গিয়ে ‘সাইকোগ্রাফি’ অবলম্বনের মাধ্যমে তার কাজ পরিচালনা করতে থাকে।১৬ এবং ক্ষমতার মাত্রা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যেখানে তার ‘অনুশাসনমূলক ক্ষমতার রোগ নির্ণয়কারী প্রযুক্তি (Orthopaedic Technology) চতুরতা অবলম্বন করে তার গোপন ইচ্ছা, চাহিদা এবং বাসনাসমূহ সমেত নগ্নভাবে রূহের সেই নিগূঢ়তম স্তরকে ভেদ করে এবং তাকে পুরোপুরি দখল করে নেয়’।১৭ ওটিটির বিশেষ কগনিটিভ ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ দর্শকের সেই জায়গাতেই প্রবেশ করে। এবং তাকে হুক করার মাধ্যমে পুরো মনোজগৎ দখল করে বসে এবং সেখানে শুরু করে ইচ্ছা, চাহিদা ও বাসনাসমূহের চাষাবাদ।
আগেই বলেছি ওটিটি ভিজ্যুয়ালকে সামাজিক পরিসর থেকে সরিয়ে একেবারে ব্যক্তিক পর্যায়/পরিসরে নিয়ে এসেছে। তো এই পর্যায়ে সাইকোপলিটিক্স কীভাবে কাজ করে? এর আগে বায়োপলিটিক্সের কাজের ধরন আলাপ করতে হবে। বায়োপলিটিক্স কাজ করে ‘ডেমোগ্রাফি’ বা ‘জনতাত্ত্বিক’ পরিসরে। বা কালেকটিভলি জনসংখ্যার জৈবিক তথ্যকে সে কাজে লাগায়। অর্থাৎ তার কাজ বায়োলজিতেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সেটা কালেকটিভ বা সামাজিক পরিসরের মধ্যে। কিন্তু সাইকোপলিটিক্স এই কালেকটিভ জায়গা থেকে সরে এসে ইন্ডিভিজ্যুয়াল পরিসরেও ঢুকে পড়ে। প্রত্যেকটা সাইকি বা আত্মার সাইকোগ্রাফি করে সে। মানে সাইকিক বাসনার উন্মোচন (Disclose of the Psyche) ঘটায়। ওটিটি-ও ব্যক্তিক পরিসরে হাজির হয়ে তার কগনিটিভ ভিজ্যুয়াল ও কগনিটিভ ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে ব্যক্তিকে হুক করে এবং ব্যক্তির সাইকিক বাসনারই উন্মোচন ঘটায়।
চলচ্চিত্রকে ‘গণতন্ত্রায়নের নমুনা বা সিম্বল’ হিসেবে মনে করেন আলাঁ বাদিউ। কারণ চলচ্চিত্র দেখার পরিসর অর্থাৎ প্রেক্ষাগৃহ এমন একটি সামাজিক, রাজনৈতিক পরিসর যেখানে সবাই সশরীরে হাজির হয়ে চলচ্চিত্র দেখে। এবং চলচ্চিত্রের বিশেষ কোনো ঘটনায় সবাই একইসঙ্গে তার প্রতিক্রিয়া জানায়। আবার পারস্পরিক যোগাযোগের (বাচনিক-অবাচনিক) মাধ্যমে ঐক্যমতেও পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে এই পরিসরে। হেবারমাসের তাত্ত্বিক বিবেচনা মাথায় নিলে এই পরিসর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক জনপরিসর হয়ে ওঠে। কারণ এর আলাদা যোগাযোগ সক্ষমতা রয়েছে। হেবারমাসের ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ তৈরির অন্যতম শর্ত হলো যোগাযোগ। কার্যকরী যোগাযোগ সম্ভব না হলে পাবলিক স্ফিয়ার গড়ে উঠতে পারে না। যে কারণে তিনি পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ কাজ করেছেন। ওটিটি চলচ্চিত্রের সেই পাবলিক স্ফিয়ার এবং সামাজিক যোগাযোগের বৈশিষ্ট্য থেকে সরিয়ে এনে তাকে শয়নকক্ষের বিষয় করে তোলে। এমনকি চলচ্চিত্রের সামাজিক রূপকে বাতিল করে ব্যক্তিক চাহিদা, বাসনার মেনিফেস্টেশন হিসেবে হাজির করা হয়। কাজেই ওটিটি ব্যক্তিক পরিসরে হয়ে ওঠে নয়া-উদারবাদের ব্রহ্মাস্ত্র। এবং ইন্ডিভিজ্যুয়ালিস্টিক অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের রাস্তাতেও বাধ সাধে ওটিটি। আর এর মাধ্যমে ওটিটি মোটেও চলচ্চিত্রকে গণতান্ত্রিক পর্যায়ে আর রাখতে পারে না বরং ইন্ডিভিজ্যুয়ালিস্টিক অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে হয়ে ওঠে নয়া-উদারবাদী মতাদর্শের ধারক-বাহক। আর এখানেই হরাইজোন্টাল ওটিটি ইউটিউবের সাফল্য। ইউটিউব এখন সার্বজনীন ওটিটি। এটা মানতেই হবে। তার কনটেন্টও ইউজার জেনারেটেড। ইউটিউবের আলাদা সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থা থাকলেও বিনামূল্যেই মানুষজন বেশিরভাগ কনটেন্ট দেখতে পারে। তাৎক্ষণিক ফিডব্যাকও দিতে পারে। তবে বিপদের জায়গা হলো এর ‘বিগ ডাটা’ প্রসেস এবং সেই অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেওয়া। যা তার ইউজারকেও পণ্যে পরিণত করে।
এছাড়া ওয়াল্টার বেঞ্জামিন মানুষের সামনে ‘অপটিকাল আনকনসাস’ (Optical Unconscious) এর ধারণা হাজির করেন। তিনি জানান, ‘অপটিকাল আনকনসাস’ হলো মানুষের সেই দৃষ্টিগ্রাহ্য বাস্তবতা যা সচেতনাবস্থায় তার চোখে পড়ে না বা চেতনার বাইরে থেকে যায়। কিন্তু ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তা মানুষের সামনে দৃশ্যমান হয়। এই অপটিকাল মাধ্যমগুলো এমন কিছু বাস্তবতাকে সামনে হাজির করতে পারে যা খালি চোখে দেখা যায় না। অর্থাৎ এইসব প্রযুক্তি (ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র) মানুষের চেতনাগত অভিজ্ঞতার বাইরে থাকা অপটিকাল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু বিয়ুং চুল-হান বলতে চান, বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ‘বিগ ডাটা’র (Big Data)১৮ ফলে সেই জায়গাটা আর ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের হাতে নেই। সেটা চলে এসেছে ডিজিটাল প্রযুক্তির হাতে। এবং যেহেতু মাধ্যমটারও পরিবর্তন ঘটেছে অর্থাৎ অপটিকাল মাধ্যম থেকে তা চলে এসেছে ডিজিটাল মাধ্যমে, তাই বিয়ুং চুল-হান এটাকে বলছেন ‘ডিজিটাল আনকনসাস’ (Digital Unconscious)। তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিগ ডাটা ও ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন ক্ষমতাকাঠামো তৈরি করেছে, কিন্তু মানুষ সেটা সরাসরি বুঝতে পারে না। বিগ ডাটা, অ্যালগরিদম ও এআই (AI) মানুষের আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন সব ইনসাইটফুল তথ্য দেয়, যেগুলো হয়তো মানুষ নিজেরাও সচতেনভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। ডিজিটাল প্রযুক্তি তার অভ্যাস, চিন্তা ও আচরণের অজানা মাত্রাগুলো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হতে থাকে। এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সাবকনসাস ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার ভবিষ্যৎ আচরণ নির্ধারণ করে।
ডিজিটাল আনকনসাসের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, তা নীরব নজরদারি চালায়, অ্যালগরিদমিক মডেল (Machine Learning & Predictive Analytics) ব্যবহারের মাধমে ব্যবহারকারীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ ও পূর্বানুমান করে, নিজে নিজেই শোষিত হওয়াকেই আরো বেশি শক্তিশালী করে এবং ব্যক্তিক গোপনীয়তার হ্রাস ঘটায়।১৯
প্রশ্ন হলো এর সঙ্গে ওটিটির সম্পর্ক কোথায়? অবশ্যই সম্পর্ক রয়েছে। প্রথমত, ওটিটি বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রযুক্তি। দ্বিতীয়ত, আর সব সামাজিক যোগাযোগ প্লাটফর্মের মতোই ওটিটি অ্যালগরিদমিক মডেল (Machine Learning & Predictive Analytics) ব্যবহার করেই কাজ করে। এবং বিশেষ করে Predictive Analytics মডেল ব্যবহারের মাধমে নেটফ্লিক্স, ইউটিউবসহ প্রায় সব ওটিটিই তার ব্যবহারকারীদের পছন্দের কনটেন্ট অনুমান করে এবং সাজেস্ট করে যা একইসঙ্গে যেমন ব্যক্তিকে তৃপ্ত করে তেমনই তার পছন্দকেও সীমায়িত করে ফেলে। ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর ক্ষমতার জায়গা হলো তাদের ‘বিগ ডাটা’ এবং এআইভিত্তিক সুপারিশ ব্যবস্থা। ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলো দর্শকের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট সাজিয়ে দেয়। যা ক্ষমতার নতুন ধরন তৈরি করছে। অর্থাৎ দর্শক তার ইচ্ছা-স্বাধীনভাবে কনটেন্ট নির্বাচন করছে না। বরং অ্যালগরিদম তাদের দেখার যে পছন্দ সেটার তালিকা তৈরি করছে। এছাড়া এটাও জানা গেছে, নেটফ্লিক্স-এ প্রায় ৮০ শতাংশ দর্শক কনটেন্ট বাছাই করে এবং দেখে ‘Suggested ContentÕ থেকেই।২০ এমনকি নতুন নির্মাতারা যদি অ্যালগরিদমিক শর্তপূরণ করতে না পারে তাহলে তাদের কনটেন্ট সুপারিশকৃত হয় না এবং দর্শকের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। ফলে এইসব ওটিটি প্লাটফর্মের ‘বিগ ডাটা’ অবলম্বন করে সংগৃহীত বিশাল তথ্য ভাণ্ডার বিয়ুং চুল-হান-এর মতে, দর্শক, ভোক্তা ব্যবহারকারীদের নিজে নিজেই শোষিত হওয়ার (কারণ ব্যক্তি নিজেই উৎসাহিত হয়েই তথ্য প্রদান করছে) নতুন পথ উন্মোচন করছে। একইসঙ্গে ব্যক্তিক গোপনীয়তা হ্রাসের মাধমে নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন ক্ষমতাকাঠামো তৈরি করেছে, কিন্তু ভোক্তা সেটা সরাসরি বুঝতে পারছে না।
দুই. ওটিটি-কনটেন্ট সোভারেইন, দর্শক তার অধীন
ওটিটি ক্ষেত্র বিশেষে একক ক্ষমতাসম্পন্ন, সার্বভৌম পরিসরও বটে। কনটেন্ট, যোগাযোগ-প্রবাহ এবং কর্তৃপক্ষের ডাটা সংগ্রহের ধরনের জায়গা থেকে এই পরিসরে সার্বভৌমত্ব বিরাজ করে বেশিরভাগ সময়েই। সেই সঙ্গে মাধ্যম হিসেবেও এর সার্বভৌম রূপ রয়েছে। এবং এই সার্বভৌমত্বের লিগালিটিও প্রমাণ করা হয় দর্শকের মাধ্যমে, তবে অনেকটা ছদ্মবেশে। আপাত দৃষ্টিতে দেখা যায়, কনটেন্ট বোধহয় দর্শকই বাছাই করে দেখছে; কিন্তু এই কনটেন্ট আপলোড, বাছাই, দেখা কিংবা ফিডব্যাক দেওয়া এবং যোগাযোগ-প্রবাহের সার্বিক দিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও বিবেচনায় নিলে সেটাকে মোটেও ‘দর্শকের বেছে নেওয়া’ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং তা ওটিটি ও তার কনটেন্টের সার্বভৌমত্বেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। ম্যানুয়েল ক্যাসেলস তার ‘ÔCommunication Power’ বইয়ে জানান, ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ যতো বিকশিত হতে থাকে এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক যতো প্রসারিত হতে থাকে ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ ক্রমশই ততো বেশি আনুভূমিক রূপ নেয়। ফলে রাষ্ট্র ও বৃহৎ মিডিয়া ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে ‘স্ব-চালিত গণযোগাযোগ’ এবং ‘ম্যাস-সেল্ফ কমিউনিকেশন’ গড়ে ওঠার পথও খুলে যায়।২১ ওটিটিকেও অনেকে সেই জায়গা থেকে পাঠ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউটিউবের বেশিরভাগ কনটেন্ট হয় ইউজার জেনারেটেড। এখানে দর্শক তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ফিডব্যাক দিতে পারে। আবার সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ওটিটিগুলোতে বিভিন্ন মানের, ধরনের কনটেন্টের উপস্থিতি থাকে। কিন্তু এসবের আড়ালে এর যেটুকু একক ও সার্বভৌম রূপ রয়েছে সেটা ঢাকা পড়ে যায়। অর্থাৎ কেবল আনুভূমিক রূপটাই আলোচনাতে আসছে ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’র তত্ত্বের বদৌলতে। কিন্তু এই তত্ত্বও পুরোপুরি খাটে না এখানে। ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ যেভাবে এইসব প্রাযুক্তিক প্লাটফর্মগুলোকে আনুভূমিক হিসেবে চিহ্নিত করে, এই প্লাটফর্মগুলো ততোটা আনুভূমিক নয়; বরং খাড়াখাড়ি (ভার্টিকাল) এবং আনুভূমিকের সংমিশ্রণ। আর খাড়াখাড়ি হলে সেখানে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং সার্বভৌমত্বের সম্পর্ক থাকে। কিন্তু ওটিটি ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নেটওয়ার্কসমূহকে কেবল আনুভূমিক দাবি করার ফলে যেটা হচ্ছে তা হলো, এইসব ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর একক ক্ষমতার জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারা যাচ্ছে না। একটা ছদ্মবেশী রূপ ধারণ করছে। এই অবস্কিউরিটিকে খোলাসা করতে হলে ওটিটির কনটেন্ট ও এর দর্শকের কনটেন্ট দেখার ধরন এবং কীসের ওপর ভিত্তি করে ওটিটি কর্তৃপক্ষ কনটেন্ট প্রকাশ করে, সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। তবেই এর সার্বভৌম রূপের আন্দাজ কিছুটা করা সম্ভব। অন্যান্য ওটিটির সঙ্গে ইউটিউবকেও ওটিটি হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। এটা একটি যুগান্তকারী ওটিটি প্লাটফর্ম। আর এর কনটেন্ট যেহেতু ইউজার জেনারেটডে, তাই সেখানে আনুভূমিকতা রয়েছে। আর সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ওটিটিগুলো যেহেতু পুঁজিকেন্দ্রিক সেখানে আনুভূমিকতা ও খাড়াখাড়িভাব দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই কাজ করে। কারণ যেহেতু ওটিটি টাকা দিয়ে দেখতে হয়, সেহেতু দর্শকের গুরুত্বটা মাথায় রাখতে হয়। কিন্তু কীভাবে তারা দর্শকের গুরুত্বটাকে মাথায় রাখে সেটাই দেখার বিষয়।
সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ওটিটিগুলোর যে যোগাযোগ প্রবাহ, সেটা অনেকটাই একমুখী; এই জায়গাতে দর্শকের ফিডব্যাকের জায়গাটা কম এবং যেটা ফিডব্যাক হিসেবে ওটিটি কর্তৃপক্ষ নেয় সেটা ‘বিগ ডাটা’। আর এই ‘বিগ ডাটা’র পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো ‘5V’ নামে পরিচিত। সেগুলো হলো-আয়তন (Volume) : বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহকরণ; বৈচিত্র্য (Variety) : বিভিন্ন ধরনের তথ্যের (টেক্সট, ইমেজ, ভিজ্যুয়াল, অডিও ইত্যাদি) সমাহার; এবং গতিবেগ (Velocity) : দ্রুত গতিতে ডাটা উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ (রিয়েল টাইম ডাটা প্রসেসিং)। আরো দুটো বৈশিষ্ট্য এর সঙ্গে যুক্ত হয়, নির্ভরযোগ্যতা (Varacity) : তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা; এবং মূল্যায়ন (Value) : তথ্য থেকে মূল্যবান ইনসাইটসমূহ বের করে তা ব্যবহার করা। আর এই ‘বিগ ডাটা’র মূল উৎস হলো, ডিজিটাল প্রযুক্তিসমূহ, সোশাল মিডিয়া, মোবাইল অ্যাপস, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (ঝঊঙ), স্মার্ট ডিভাইসসমূহ ইত্যাদি। এই ‘বিগ ডাটা’র বেশিরভাগই ব্যবহৃত হয় মূলত গ্রাহকের মনোজগৎ এবং ভোক্তার আচরণ (Consumer Behavior) বোঝার জন্য, সেটা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে হতে পারে, হতে পারে রাজনৈতিক, ক্ষমতাকাঠামোগত কিংবা সাইবার সিকিউরিটি’র নামেও।২২ তো খেয়াল করলে দেখা যাবে ওটিটিতে ‘বিগ ডাটা’র সবগুলো প্রক্রিয়াই রয়েছে। ওটিটি কাজ করে মূলত তার গ্রাহকের মনোজগৎ এবং ভোক্তা আচরণকে বিশ্লেষণ করেই। এবং এর মাধ্যমে ‘মেটা-ডাটা’ও তৈরি করা হয়।২৩ কাজেই এটা স্পষ্ট যে, ওটিটি পুরোপুরি ‘বিগ ডাটা’র ওপর নির্ভরশীল।২৪ আর বিয়ং চুল-হান এই প্রক্রিয়াকে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে আইডেন্টিফাই করছেন।২৫ নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ আসলে সেটাকে একপাক্ষিক, একক ও সার্বভৌম না বলে পারা যায় না। অর্থাৎ ওটিটির আনুভূমিক কাঠামোর ভেতরেই তার খাড়াখাড়ি কাঠামো লুকিয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে নয়া উদারবাদ যেমন ‘স্বাধীনতা’র আড়ালে শোষণকে বহাল রাখে। তবে এটাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ডিজিটাল প্রযুক্তি হিসেবে ওটিটি (ইউটিউবসহ) অন্যান্য প্রযুক্তির তুলনায় (যেহেতু নতুন) কিছুটা হলেও আনুভূমিক। তবে যতো সময় যাচ্ছে ততোই এই প্রযুক্তির খাড়াখাড়ি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে। এমনকি হচ্ছেও।
এছাড়া বর্তমান সময়ে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ব্যাপক উন্নতির ফলে ওটিটিকে ভাবা হচ্ছে দর্শকের বা ওটিটি ব্যবহারকারীর ‘যখনই চাইবে কনটেন্ট দেখার সুযোগ’ ও ‘কনটেন্ট বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা’র মেনিফেস্টেশন হিসেবে। এবং বর্তমান নয়া-উদারবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুঁজির বিস্তারের ফলে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিচ্ছিন্নতা। আর সেই ‘বিচ্ছিন্নতা সংক্রান্ত (এলিয়েনেটেড) বিনোদন চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অনলাইনে উপস্থিত ওটিটি প্লাটফর্ম সবচেয়ে লাগসই মাধ্যম হয়ে উঠেছে’ এবং এই বিচ্ছিন্নতাকেই কাজে লাগাচ্ছে ওটিটি-এমনকি এর অংশীদার হয়ে উঠেছে, বলেও ধারণা করা হচ্ছে।২৬ কিন্তু এটাকে এতো ছোটো পরিসরে না ভেবে আরো বৃহৎ পরিসরে পুরো ভিজ্যুয়াল ইন্ডাস্ট্রির অংশ হিসেবে এবং আরো বৃহত্তর পরিসরে কালচার ইন্ডাস্ট্রির অংশ হিসেবে পাঠ করলে এর কলকব্জাগুলোকে বুঝতে সুবিধা হয়। কেবল মানুষের এলিয়েনেশনকে কাজে লাগাচ্ছে না ওটিটি, বরং তারাও এই এলিয়েনেশন প্রক্রিয়ার অংশীদার এবং ইন্ডিভিজ্যুয়ালিস্টিক অ্যাপ্রোচেরও অংশীদার। মানুষ এলিয়েনেটেডে হয়ে ওটিটিতে যাচ্ছে বিনোদন নিতে, সেখানে তারা আরো বেশি পুঁজির গ্রাস হচ্ছে, পরিণত হচ্ছে অনলাইন শ্রমিকে। এবং ‘যখনই চাইবে কনটেন্ট দেখার সুযোগ’ ও ‘কনটেন্ট বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা’র নামে ওটিটি যে ‘স্বাধীনতা’ দেয়, তার থেকে হুকুমাত বজায় রাখে বেশি। মনে রাখতে হবে, সর্ষের ভেতরেই থাকে ভূত। উদাহরণ হিসেবে বিয়ং চুল-হান-এর তাত্ত্বিক আলাপকে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। তিনি বলছেন, নিওলিবারেল সময়ে এসে পুঁজি স্বাধীনতাকে এমন কিছু ক্রাইটেরিয়াতে ভাগ করেছে, খোদ স্বাধীনতার ধারণাটাও একটা বদ্ধ কারাগার হয়ে উঠেছে। তিনি বলছেন,
নব্য-উদারবাদী সময়ে ক্ষমতার প্রযুক্তিসমূহ আরো বেশি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপ পরিগ্রহ করেছে। সে এখন সরাসরি ব্যক্তিদের ওপরে কর্তৃত্বারোপ করে না বরং এটা নিশ্চিত করে যে, ব্যক্তি নিজেরাই যাতে নিজেদের ওপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এবং ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্কগুলো আরো বেশি অভ্যন্তরীণ হয়ে ওঠে। তারপর এটাকেই স্বাধীনতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। আত্মোন্নয়ন, আত্মসমর্পণ, স্বাধীনতা এবং শোষণ তখন একই কাতারে গিয়ে দাঁড়ায়।২৭
কাজেই ওটিটি মোটেও ব্যক্তির সামাজিকভাবে তৈরি হওয়া এলিয়েনেশনকে কাজে লাগায় না বরং নিজেই সেই এলিয়েনেশন প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহণ করে। আর ‘যখনই চাইবে কনটেন্ট দেখার সুযোগ’ ও ‘কনটেন্ট বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা’র নামে নেটওয়ার্কড প্রিজন গড়ে তোলে, যা মুনাফা তৈরি কারখানা আর ভোক্তারা সেখানে অনলাইন শ্রমিক। ভোক্তাদেরকে শ্রমিকে পরিণত করার মাধ্যমে এলিয়েনেশন আরো বাড়ে, কমে না মোটেও।
তিন. মুড ফুড; মুড ওটিটি
সাবস্ক্রাইবার তার ‘মন-মর্জি/মুড’ অনুযায়ী ওটিটিতে আর্কাইভ করা কনটেন্ট অথবা নতুন কনটেন্ট দেখে থাকে। এখন প্রশ্ন, সাবস্ক্রাইবারের এমন ‘মন-মর্জি/মুড’ কীভাবে তৈরি/নির্মিত হয়? এই ‘মন-মর্জি/মুড’ও নিয়ন্ত্রণ করে তারাই, যারা কনটেন্টগুলো দেখায়। এটাকে বিচার করতে হলে দর্শকের কনটেন্ট দেখার আগের প্রক্রিয়াগুলোকে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর বেশিরভাগ মালিকানাই করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক মোবাইল অপারেটর কোম্পানির হাতে। তারা সেবা ও পণ্য বিক্রির জন্য আরো পণ্য ও সেবা বিক্রি করে। ওটিটি তারই বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু নয়। গেই দেবোর্দ দেখান কীভাবে মিডিয়া ও ভোক্তাসমাজ ইমেজ, পণ্য ও সাজানো ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিগঠিত হতে থাকে। তিনি ‘The Society of the Spectacle’ বইয়ে বলেন,
আধুনিক ভোগবাদী সমাজে চাহিদা ও বাসনা কৃত্রিমভাবে ছদ্ম-চাহিদা ও বাসনা আকারে উৎপাদন-পুনরুৎপাদন হতে থাকে। এবং ছদ্ম-চাহিদা ও বাসনাগুলোকে এমন কোনো প্রকৃত চাহিদা ও বাসনার সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয় যেগুলো ওই সমাজ ও তার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত নয়। এসব পণ্যের (ছদ্ম-চাহিদা ও বাসনা) প্রাচুর্যতার ভিড়ে সামাজিক চাহিদার যে অর্গানিক/জৈবিক রূপ তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এবং পণ্যের (ছদ্ম-চাহিদা ও বাসনা) যান্ত্রিক সঞ্চালন/একীভূতকরণ এক সীমাহীন কৃত্রিমতাকেই প্রকাশ করে চলে যা জীবের জীবন্ত আকাক্সক্ষাকেও পরাভূত করে চলে প্রতিনিয়ত। এবং এই স্বায়ত্তশাসিত কৃত্রিমতার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা সমস্ত সামাজিক জীবনকে মিথ্যা প্রমাণ করে।২৮
ওটিটি ইমেজের যে স্পেকটাকল, তার আড়ালে এই নব্য উদারবাদী সময়ে ভোগবাদী সমাজের কৃত্রিমভাবে ছদ্ম-চাহিদা ও বাসনার উৎপাদন-পুনরুৎপাদন করে চলছে। আবার ওটিটিতে কনটেন্টের ছড়াছড়ি, রয়েছে আর্কাইভ করা কনটেন্টও। যা সারপ্লাস ভ্যালু তৈরি করে। আলাঁ বাদিউ এটাকে বলছেন ‘সারপ্লাস সিইং’ (Surplus Seeing)২৯। ওটিটিতে এই প্রবণতাটা রয়েছে। সেখানে ভিজ্যুয়ালের যে আর্কাইভ এবং কনটেন্টের ছড়াছড়ি, তার সারপ্লাস ভ্যালু খেয়াল করার মতো। আগে কোনো কনটেন্ট যতোবার দেখানো হতো, কনটেন্ট সংশ্লিষ্টরা ততোবার টাকা পেতো, কিন্তু এখন সেটা আর নেই। অর্থাৎ সেখানে কোনো কনটেন্ট একেবারে কিনে নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে দর্শকের দেখার কারণে কনটেন্ট সংশ্লিষ্টরা আর টাকা পায় না। এই অর্থ আলাদাভাবে সারপ্লাস ভ্যালু তৈরি করে। সেইসঙ্গে কনটেন্টের আর্কাইভাইজেশন তৈরি করে ‘সারপ্লাস সিইং’। এই সমস্যা নিয়ে ইতোমধ্যেই আমেরিকায় আন্দোলন শুরু হয়েছে। কিন্তু সমাধানটা শেষ পর্যন্ত হয়নি।
জ্যঁ বদ্রিয়া যে ‘কনজিউমার সোসাইটি’র ধারণা দেন, সেই ধারণা অনুযায়ী ওটিটি সমাজকে পরিণত করছে ‘কনজিউমার সোসাইটি’তে। এর ব্যাখ্যাটা এমন হতে পারে, বিভিন্ন সিম কোম্পানি তাদের ডেটা কনসাম্পশন বাড়াতে ওটিটিতে ফ্রি কনটেন্ট দিচ্ছে এবং তাদের গ্রাহককে সেটা গ্রহণও করতে হচ্ছে; আর এর মাধ্যমে তার গ্রাহক পরিণত হচ্ছে ‘কনজিউমার সোসাইটি’তে। এছাড়া বাংলাদেশের ওটিটির মালিকানা নজরে নিলে দেখা যায়, এর মালিকানা বেশিরভাগই কোনো না কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক মোবাইল অপারেটর কোম্পানির হাতে। এইসব কোম্পানির পণ্য ও সেবাসমূহ টার্গেট অডিয়েন্সকে ভোগ করাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে ওটিটি প্লাটফর্মসমূহ। যেমন, ‘বায়োস্কোপ’-এর মালিক গ্রামীণফোন, ‘বিঞ্জ’-এর মালিক রবি ও এয়ারটেল, ‘চরকি’র মালিক ট্রান্সকম গ্রুপ, ‘দীপ্ত প্লে’র মালিক কাজী মিডিয়া লিমিটেড, ‘আইস্ক্রিন’-এর মালিক ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও ‘চ্যানেল আই’, ‘টফি’র মালিক বাংলালিংক, ‘টেলিফ্লিক্স’-এর মালিক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটক, ‘বাংলাফ্লিক্স’-এর মালিক বাংলালিংক জি এস এম এবং ‘জাগোবিডি’র মালিকানা রয়েছে প্রাণ-আর এফ এল-এর হাতে।
এছাড়া প্রত্যেকটি ওটিটিরই উপবিভাগগুলোতে রয়েছে চটকদার ও আকর্ষণীয় শিরোনাম ও ভিজ্যুয়াল। যা তারা ব্যবসায়িক পরিধির বিস্তৃতি ও কনজিউমার তৈরির জন্য করে। বদ্রিয়া তার ‘The Consumer Society: Myths and Structure’ বইয়ে বলছেন, আধুনিক সমাজে ভোগবাদ কেবলই অর্থনৈতিক ও চাহিদগত বিষয় নয় বরং এটা একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো এবং অনুশীলনের অংশ। যা গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন এবং প্রতীকী বিনিময়ের (অর্থাৎ পণ্যের বস্তুগত কার্যকারিতার চেয়ে তাদের দেওয়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা (Sign-Value) বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে) মাধ্যমে মানুষের জীবনে অতিরঞ্জিত আকারে গুরুত্ব পায় এবং তার সামাজিক পরিচয় ও ইমাজিনেশনের অংশ হয়ে ওঠে। আধুনিক সমাজের বাস্তবতা ও তার রেপ্রিজেন্টেশন তখন একাকার হয়ে যায়। অর্থাৎ গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনের নির্মিত বাস্তবতা/তুলে ধরা বাস্তবতা আর প্রকৃত বাস্তবতার কোনো মিল থাকে না। যা একধরনের ‘ÔHyper-reality’ বা ‘অতিবাস্তবতা’র জগ তৈরি করে। আর এই ‘অতিবাস্তবতা’র ফাঁদে পড়ে মানুষ প্রতিনিয়তই বিভ্রান্তির শিকার হতে থাকে।৩০ কিন্তু ওটিটি হয়তো সরাসরি সেই ‘অতিবাস্তবতা’ তৈরি করছে না, আবার ক্ষেত্র বিশেষে করছেও। তবে ওটিটি বিশেষ শ্রেণির সামাজিক পরিচয় ও ইমাজিনেশনকে একটা ফ্রেমিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসছে। একই সঙ্গে মুনাফার সর্বোচ্চকরণ ঘটাচ্ছে (Revenue Maximization)।৩১ ওটিটির ভোক্তা শ্রেণির দিকে তাকালেই সেটা বুঝতে পারা যায়। একটা বিশেষ শ্রেণি (উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত) এই সেবাটা গ্রহণ করে। বদ্রিয়া’র মতে, এই সেবাটা কেবল চাহিদা বা অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত নয় বরং সামাজিক সাংস্কৃতিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে। এবং যা ওই বিশেষ শ্রেণির সামাজিক পরিচয় এবং ইমাজিনেশনকেও প্রভাবিত, এমনকি নিয়ন্ত্রণও করে থাকে। একইসঙ্গে ওটিটিতে ডাটার যোগান দেওয়া ও কনটেন্ট ভোগের মাধ্যমে এর ব্যবহারকারী নিজেই পরিণত হয় কমোডিটিতে। ওটিটি কনটেন্ট যেমন বিক্রি করে, তেমনই তার ব্যবহারকারীকেও বিক্রি করে। ব্যবহারকারীর কাছে কনটেন্টের উপযোগিতা বিক্রির মাধ্যমে তার কাছ থেকে সাইকোসোমাটিক গড়ন জেনে নেয় ওটিটি। এবং ভোক্তার ব্যক্তিগত তথ্যও ব্যবহার করা হয়। যাতে পরবর্তী সময়ে আরো উপযোগিতাসম্পন্ন কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব হয়। এবং ভোক্তারা এই ব্যাপার নিয়ে বেশ উদ্বেগও প্রকাশ করছে।৩২ আর এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী নিজেও পরিণত হচ্ছে কমোডিটিতে।
ইমেজ/ভিজ্যুয়াল : ’২৪-এর ‘ভায়োলেন্ট’ মেসিয়া
মেসিয়া ইতোমধ্যেই পৌঁছেছেন এই জমিনে। মেসিয়ানিক ঘটনাও ঘটে গেছে। তবে তার উপস্থিতির মধ্যে আরেকটি সময় নিহিত থাকে। যা তার প্রত্যাবর্তনকে আরো বেশি বিস্তৃত করে তোলে। এবং এই প্রত্যাবর্তনের বিস্তৃতকরণ মোটেও বিলম্বিতকরণ নয়, বরং বিপরীতভাবে তার প্রত্যাবর্তনের বিস্তৃতকরণ সেই সময়কে মানুষের নিকট আরো বেশি করে উপলব্ধিযোগ্য করে তোলে। ... মেসিয়া সর্বদাই তার সময়কে ধারণ করে চলেন, অর্থাৎ তিনি একইসঙ্গে সময়কে নিজের করে নেন এবং সেই সময়কে পরিপূর্ণতায়ও পৌঁছে দেন (আগামবেনের তাত্ত্বিক ধারণাতে মেসিয়ানিজম খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। ইহুদি ঐতিহ্যে মেসিয়ানিজম হলো সেই ধারণা, যেখানে কোনো কিছুকে উদ্ধার করতে এই জমিনে নেমে আসবেন মোসিহ। তিনি এসে মানুষকে নাজাতের পথ বাতলাবেন। কিন্তু আগামবেনের দাবি করেন, মোসিহ মানুষের মধ্যেই হাজির আছে সুপ্ত সম্ভাবনা আকারে। সেই সম্ভাবনাকে যখনই আমরা ভাষাগত কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসতে পারবো, উন্মোচন করতে পারবো, তখনই তিনি আমাদের মধ্যেই তার স্বরূপেজ্জএইরূপ আবার আমাদেরই স্বরূপজ্জহাজির হবেন।)।৩৩
নানা কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য যদি বলা হয় তার মধ্যে রয়েছে-প্রথমত, এই আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলো না। বলতে গেলে অনেকটা ‘রাইজোমেটিক’ এবং ‘মলিকুলার রেভ্যুলিউশনে’র চরিত্র পেয়েছে এই গণঅভ্যুত্থান। দ্বিতীয়ত, নতুন কিছু পলিটিকাল সিগনিফায়ারের উদ্ভব ঘটেছে এই গণঅভ্যুত্থানে (যেমন : র্যাপ মিউজিক, গ্রাফিতি, গানের নতুন ধরন ইত্যাদি) যা বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক আন্দোলনকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয়। তৃতীয়ত, ইমেজ/ভিজ্যুয়ালে সয়লাব ছিলো পুরোটা আন্দোলন এবং এর পরবর্তী সময়টাও। এই ইমার্জেন্সকে মাথায় রেখে বলতে হবে, এই আন্দোলনের একটা বড়ো জায়গা জুড়ে ছিলো ইমেজ/ভিজ্যুয়াল। চতুর্থত, ভায়োলেন্সের এক অনন্য মাত্রা পরিলক্ষিত হয় এই আন্দোলনে। সেটা বেশিরভাগই ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমেই ট্রান্সমিট হয়েছে। সেই জায়গা থেকে পুরো আন্দোলনের স্পিরিট ধারণ করে বসে ইমেজ/ভিজ্যুয়াল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এইসব ভায়োলেন্ট ইমেজ/ভিজ্যুয়াল ছড়িয়ে পড়ার ফলে তা মানুষের মধ্যে অন্যরকম একটা ‘ডিভাইন ভায়োলেন্সে’র উদ্রেগ ঘটিয়েছে। রাষ্ট্র সেটাকে রদ করার জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছিলো, কিন্তু এই যুগে এসে এসব বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয় আদৌ। তা ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত গতিতে।
মানুষ ‘মেসিয়ানিক সময়ে’ বসবাস করছে। ’২৪-এর ইমেজ/ভিজ্যুয়াল সেই মেসিয়া রূপে আবির্ভূত হয়েছিলো। যে কিনা সমসাময়িক সময়কে মানুষের উপলব্ধিযোগ্য এবং মানুষের অধীন করে তুলেছে। উপরের উদ্ধৃতির প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। যাইহোক, ইমেজ/ভিজ্যুয়াল সেই সময়কে ধারণ ও সেই সময়ে হাজির/বর্তমান থেকে মানুষের নাজাতের পথকে ত্বরান্বিত করেছে। আর সেই নাজাতের পথ হলো ‘সহিংস পথ’। আর তাই ’২৪-এর ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের আবির্ভাব হলো সহিংস মেসিয়ার আবির্ভাব। মেসিয়ানিক ভূমিকা যে ইমেজ/ভিজ্যুয়াল পালন করেছে, সেটা অস্বীকার করার মতো কিছু নাই। কিন্তু তার ‘সহিংস পন্থা’ নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। তাই একটু তাত্ত্বিক পটভূমি ও প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। অর্থাৎ ‘সহিংসতা’ কীভাবে নাজাতের পথ হয়ে ওঠে। সেই দিকে নজর ফিরাতে হবে।
হানা আরেন্ট তার ‘On Violence’ বইয়ে সহিংসতা নিয়ে জানান, ক্ষমতা ও সহিংসতা পরস্পরের বিপরীত ধারণা। ক্ষমতা জনগণের সম্মতি ও সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। অন্যদিকে সহিংসতার উদ্ভব ক্ষমতার অনুপস্থিতি থেকে। এবং সহিংসতা হলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়া। তিনি বলছেন, ‘ক্ষমতা ও সহিংসতা পরস্পরের বিপরীত। যেখানে একটির আধিপত্য থাকে, সেখানে অন্যটি অনুপস্থিত থাকে।’ কিন্তু ক্ষমতা ও সহিংসতার একটা গোপন আঁতাত থাকে। সেটা আরেন্ট-এর বক্তব্যে অনুপস্থিত। কিন্তু তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার এই কথাতে, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও পাবলিক লাইফ যতো বেশি আমলাতান্ত্রিক হবে, সহিংসতার আকর্ষণও ততো বাড়বে।’ হানা আরেন্ট ‘অহিংসা’র জন্য গান্ধীজি ও মার্টিন লুথার কিং-এর প্রশংসা করেন এবং তাদের দেখানো পথকে সমর্থন করেন।৩৪
ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তার আলোচনায় সহিংসতার বিস্তৃত পরিসর নিয়ে আলাপ করেন। এবং মুক্তির উপায় বাতলে দেন যেটা আরেন্ট-এর আলোচনায় পাওয়া যায় না। বেঞ্জামিন তার ‘Critique of Violence’ প্রবন্ধে বলছেন, সহিংসতা দুই ধরনের; প্রথমটিকে তিনি বলছেন ‘পৌরাণিক সহিংসতা’ বা (Mythic Violence)। এই সহিংসতা আইন প্রতিষ্ঠাকারী সহিংসতা, ও আইন সংরক্ষণকারী সহিংসতার সমন্বয়ে গঠিত। এই ‘পৌরাণিক সহিংসতা’কেই রাষ্ট্র তার কাজে লাগায়। কিন্তু বেঞ্জামিন আরেক ধরনের সহিংসতার কথা বলেন। সেটাকে তিনি বলেন, ‘রুহানি সহিংসতা’ বা ‘ÔDivine Violence’। এই সহিংসতাকে তিনি মোটেও প্রতিশোধ পরায়ণ শক্তি হিসেবে নয় বরং এটাকে তিনি মানবসমাজের মুক্তির একমাত্র সম্ভাব্য উপায়/পথ হিসেবে আইডেন্টিফাই করছেন। এটা সহিংসতার এমন একটি রূপ, যা বিদ্যমান আইন ও রাষ্ট্রের সব শোষণমূলক কাঠামোকে ধ্বংস করে। এবং ঘুরে গিয়ে কোনো আইনী কাঠামোতে আবদ্ধ হয় না, বরং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতকল্পে কাজে করে। বেঞ্জামিন মনে করেন, এটা একটি ‘নৈতিক শুদ্ধি প্রক্রিয়া’ ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দিশারী। বেঞ্জামিন দাস বিদ্রোহ, ফরাসি বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লবসহ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সব গণআন্দোলনকে ‘রুহানি সহিংসতা’র রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেন।৩৫
এই জায়গাতে এসে আরো দুইজন চিন্তকের চিন্তার সঙ্গে বেঞ্জামিনের চিন্তা মিলে যায়। তারা হলেন ফ্রাঞ্জ ফাঁনো এবং স্লাভোয় জিজেক। ফ্রাঞ্জ ফাঁনো তার ‘The Wretched of the Earth’ বইয়ে ঔপনিবেশিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘Revolutionary Violence’ ধারণা দেন। তিনি জানান, ঔপনিবেশিক শক্তি কখনোই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। তাই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা কূটনৈতিক সমাধান কোনো সমাধান নয়। নিপীড়িত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিউপনিবেশায়ন ঘটাতে হলে দরকার সহিংসতা। আর তিনি বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে সহিংস প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। এটা সহিংস এই অর্থে যে, এতে যার বিউপনিবেশায়ন ঘটে, তার ঘাড়ে চেপে বসা উপনিবেশের ভূত এমনভাবে চেপে বসে যে, তার পুরো অস্তিত্বই সে গ্রাস করে নেয়। সেখান থেকে মুক্তির একমাত্র পথ সহিংসতা। আর তাতে তার অস্তিত্বের সঙ্কটও দেখা দেয়। কিন্তু তারপরও তা সম্ভব বলে মনে করেন ফাঁনো। এবং এই বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া/প্রতিরোধকে তিনি তিনটি ভাগে ভাগ করেন। প্রথমত, নিজস্ব সংস্কৃতির মাধমে একধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সংগঠনের মাধমে নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা; এবং তৃতীয়ত, সশস্ত্র সংগ্রাম ও সহিংস প্রতিরোধ। তবে ফাঁনো সর্বশেষটার ওপরই নজর দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি, হোক সেটা নিজের ওপর সহিংস হয়ে কিংবা ঔপনিবেশিক শক্তির ওপর সহিংস হয়ে। তিনি বলেন, ‘সহিংসতা একটি শুদ্ধিকরণ শক্তি ও প্রক্রিয়া। সহিংসতা উপনিবেশিত ব্যক্তিকে তার হীনম্মন্যতা, হতাশা ও নিষ্ক্রিয়তা থেকে কেবল মুক্তই করে না বরং তার আত্মমর্যাদাকে পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।’৩৬
জিজেক তার ‘Violence: Six Sideways Reflections’ বইয়ের দুটো অধ্যায়ে (‘ÔSOS ViolenceÕ I ÔDivine Violence’) সহিংসতা নিয়ে বেশ বড়ো পরিসরে আলাপের পাশাপাশি নিওলিবারেলিজমের যুগে সহিংসতার গতি-প্রকৃতি, বিচার-বিশ্লেষণ হাজির করেন। ‘Divine ViolenceÕ-এ জিজেক ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ধারণাকেই পরিপ্রেক্ষায়িত করে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘রুহানি সহিংসতা হলো ন্যায়ের সেই কঠোর অনুপ্রবেশ যা আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাজ করে।’ কিন্তু ‘SOS Violence’-এ জিজেক তার মৌলিক কিছু প্রস্তাবনা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, সহিংসতা কেবল চোখে দেখা কোনো হামলা বা যুদ্ধ নয়, বরং সমাজ-রাষ্ট্রের যে কাঠামোগত শরীর তার গভীরে নিহিত এক কাঠামোগত বাস্তবতা। এই সহিংসতা বিভিন্ন দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান, কাঠামোগত-প্রাতিষ্ঠানিক, স্থিতাবস্থা, ভাষা-প্রতীক, রাজনীতিসহ নানা পরিসরে অস্থিতিশীল অবস্থায় হাজির থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতাও তার রূপ বদল করে। সহিংসতা এখন মোটেও শারিরীক বা প্রত্যক্ষ (Subjective Violence) কোনো বিষয় নয়, বরং তা অনেক বেশি সিস্টেমেটিক এবং সিম্বলিক। নব্য-উদারবাদী সময়ে ‘শান্তি’ ও ‘মানবাধিকারে’র নামে সামরিক হস্তক্ষেপ ‘ÔSOS Violence’-এর সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। জিজেক বলেন, এই প্রচ্ছন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতাকে চোখে দেখা যায় না বলে এটাকে বিবেচনায়ও নেওয়া হয় না। কিন্তু এই প্রচ্ছন্ন সহিংসতার মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির ফলেই প্রত্যক্ষ সহিংসতার উদ্ভব ঘটে। এবং যা পরবর্তী সময়ে ‘Divine ViolenceÕ-এ রূপ নেয়।৩৭
মাওলানা ভাসানী তার ‘অহিংসা ও বিপ্লব’ প্রবন্ধে অহিংসাবাদের সমালোচনা করেন। এবং তার আলোচনায় হানা আরেন্ট যেভাবে গান্ধীজী ও মার্টিন লুথার কিং-এর অহিংসাবাদের প্রশংসা করেন সেটারও সমালোচনা হাজির রয়েছে। মাওলানা ভাসানী বলেন-
... গান্ধী ও টলষ্টয়ের অহিংসা দর্শন লইয়া শিক্ষিত মহলে উন্নতমানের একটি সেমিনার জমিতে পারেজ্জসাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদ, ধনতন্ত্রবাদী শাসন-শোষণের অবসানকল্পে সর্বহারা জনতার মুক্তিকল্পে কোন বাস্তব কর্মসূচী গ্রহণ করা যাইবে না। ডক্টর মার্টিন লুথার কিং মার্কিন নিগ্রোদিগকে প্রাণ দিয়া ভালবাসিয়াছেনজ্জইহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁহার অহিংসানীতি নিগ্রোমুক্তি আন্দোলনের অনেক ক্ষতি করিয়াছে ইহাও সত্য। আমার মতে, চপেটাঘাতের বদলে চপেটাঘাত তো বটেই পারিলে পদাঘাতও করিতে হয়। মার্কিন ধনিক-বণিক সমাজ নিগ্রোদেরকে যেভাবে শাসন-শোষণ করিয়াছে তাহার দাগ উঠাইতে অহিংসার দর্শন হাস্যকর ব্যাপার বৈ কি!৩৮
মাওলানা ভাসানীর এই বক্তব্যের ওপর ভর করেই ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আলাপে ঢোকা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে আরো কিছু কথা বলে নেওয়া ভালো। সেটা হলো, মাওলানা ভাসানী ‘অহিংসানীতি’র চেতনাকে পুরোদমে ‘প্রি-পলিটিকাল’ বা ‘প্রাক-রাজনৈতিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ‘প্রাক-রাজনৈতিক’ চৈতন্য হলো এমন এক সংস্কারধর্মী চৈতন্য, যে চৈতন্যের ফলে শোষিত, নিপীড়িত জনগণ যে শাসক দ্বারা শোষিত তার কাছেই যায় শোষণের বিচার চাইতে। এবং এই ধরনের চৈতন্য তৈরি হয় পুরোপুরি ঔপনিবেশিকতার মধ্যে এবং এর ভেতরেই আবদ্ধ থাকে। ‘প্রাক-রাজনৈতিক’ চৈতন্য যারা ধারণ করে তারা কখনোই পুরো শোষণভিত্তিক সমাজ ও ক্ষমতা কাঠামোর মূলোৎপাটন চায় না। তারা চায় সর্বোচ্চ সংস্কার। সেই সংস্কারটাও চায় তাদেরই কাছে, যাদের দ্বারা তারা শোষিত হয়। সেটা মাওলানা ভাসানী বলছেন এইভাবে-
... অহিংসার বাণী এবং অহিংস কৌশল মানুষের বিপ্লবী চেতনাকে ভোঁতা করে মাত্র-দেশের শতকরা পঁচানব্বইজন মানুষের চিরস্থায়ী কোন কল্যাণ সাধন করিতে পারে না। তাই যখনই আমি দেখিতে পাই যে দেশবাসী অহিংসার মন্ত্রে দীক্ষা লাভ করিয়া মানবীয় কল্যাণের কথা ভাবিতেছে তখন সত্যিই আমার করুণা জাগে-কি আফিমই না তাহাদিগকে পাইয়া বসিয়াছে। দেশবাসীর এহেন বিনীত আরজের সুযোগে দেশের শতকরা মাত্র পাঁচ জন লোক কি সুবিধাই না লুটিয়া থাকে! যে জনতা বিপ্লবের ঝাণ্ডা বহন করিয়া কৌশলীদের অপমৃত্যু ঘটাইয়া দিতে পারিত তাহাদিগের চোয়ালেই লাগাম আঁটিয়া দেওয়া হয়। তাঁহারা তখন কথা বলে ঠিকই কিন্তু যাহারা কোনদিনই তাহাদের মুক্তিদান করিবে না তাহাদের দরবারেই বলে। ... মোটকথা, অহিংসা শোষণের একটি ‘মহৎ’ কৌশল-এই সত্যটি কেউ বুঝিয়া উঠে না। শোষণ মুক্তির বলিষ্ঠ ধাপ তথা বিপ্লবের পথে পা বাড়াইবার মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা ধ্বংস করিবার মোলায়েম মত ও পথই হইলো অহিংসা।৩৯
তবে ডেভিড গ্রেইবার-এর অরাজবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটু ক্রিটিকাল এবং সমাজতাত্ত্বিক। গ্রেইবার সহিংসতাকে অন্যান্যদের মতোই ক্ষমতার প্রকাশ ও সামাজিক পুনর্গঠনের একটি উপাদান হিসেবে দেখছেন। তবে অন্যান্যদের সঙ্গে গ্রেইবারের পার্থক্যের জায়গা হলো, তিনি সহিংসতাকে বিপ্লবের বা বিপ্লবী পরিবর্তনের অপরিহার্য উপাদান বলে মনে করছেন না। তিনি ব্যাখ্যা করছেন, বিপ্লব মানে রাষ্ট্রশক্তির বিপক্ষে সহিংস লড়াই নয়, বরং একটি সামাজিক সম্পর্কের পুনর্গঠন। অর্থাৎ বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক রূপান্তরের ফল। তিনি বলছেন, ‘বর্তমান সিস্টেমের চাপিয়ে দেওয়া সীমাবদ্ধ জগতের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক ভাবনাকে দিগন্তজোড়া প্রসারিত করার কাজটাই এই সময়ের প্রকৃত বিপ্লব/বিপ্লবী কাজ।’৪০
’২৪-এর গণআন্দেলনকে সেই জায়গা থেকে বিবেচনা করতে গেলে অবশ্যই তাকে একটি সহিংস আন্দোলন বলতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এই রকম সহিংস আন্দোলন পরিলক্ষিত হয়েছে ’৭১-এ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রাককালে। আগেই বলা হয়েছে, এই আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তার ভিজ্যুয়াল মেনিফেস্টেশন ও ভিজ্যুয়াল পলিটিক্সের জায়গা। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আওয়ামী পেটোয়া বাহিনীর সহিংসতা এবং আন্দোলনকারীদেরকে নির্বিচারে হত্যা করার ফুটেজ। যা রক্তাক্ত ও সহিংস। এইসব সহিংসতা ট্রান্সমিট হয়েছে ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে। এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশেষ করে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দৃশ্য যখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আন্দোলন আরো দানা বাঁধতে শুরু করে এবং আরো বেশি সহিংস হয়ে উঠতে থাকে। সেই ফুটেজ ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম হয়ে চলে যায় একেবারে প্রান্তিক মানুষের হাতেও।
এই পর্যায়ে এসে আন্দোলনে দুই ধরনের সহিংসতাই পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা যেটা অগোচরে ঘটেছে। সেটা গত দেড় দশক ধরেই চলে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে যখন এই ধরনের সহিংসতা আর কাজ করছিলো না, তখন রাষ্ট্র এবং সরকার সরাসরি বা প্রত্যক্ষ সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিলো। এবং এই ধরনের সহিংসতার ভিজ্যুয়ালও ধারণ করা হয়েছে জায়গায়-বেজায়গায়। সেই সব ভিজ্যুয়াল যেনো সর্বসাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তার জন্য ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু ইন্টারনেট চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওইসব সহিংস ভিজ্যুয়াল সামাজিক মাধ্যম হয়ে ছড়িয়ে গেছে সবার কাছে। তার মানে রাষ্ট্র ও সরকার ‘ÔSOS Violence’ বা ‘পৌরাণিক সহিংসতা’র আশ্রয় নিয়েছিলো, কিন্তু তা কোনো কাজেই যখন আসছিলো না, তখন তারা বাধ্য হয়ে প্রত্যক্ষ সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। তার প্রমাণ মেলে একজন পুলিশ কর্মকর্তার এই বক্তব্যে, ‘গুলি করলে একটাই মরে, আর একটাই যায়, বাকিগুলা যায় না, স্যার।’
আর এই পর্যায়ে এসে উদ্ভব ঘটে ‘Revolutionary Violence’ এবং ‘রুহানি সহিংসতা’র। উপরের পুলিশের বক্তব্যই তার প্রমাণ। এই সহিংসতার ফলে তাদের মধ্যে ‘কাউন্টার ভায়োলেন্সে’র উদ্দামতা তৈরি হয়। কারণ রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আওয়ামী পেটোয়া বাহিনীর সহিংসতার ভিজ্যুয়াল তখন বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের হাতে হাতে। তাই বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দিয়েছে রাস্তায় নেমে আসা হাজারও মানুষ। কারণ তারা তাদের প্রাণকে উৎসর্গ করেই রাস্তায় নেমেছিলো বর্বরতা, আর দেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করার ব্রত নিয়ে। আর ঠিক তখনই তাদের মধ্যে জন্মায় ‘রুহানি সহিংসতা’। প্রায় ২,০০০ মানুষকে হত্যার ভিজ্যুয়াল দেখার পরে কারো পক্ষে সেটাকে স্রেফ ‘বাস্তবতা’ বলে মেনে নেওয়াটা অসম্ভব। সেটা সম্ভবও হয়নি। তাই সেই রুহানিয়াতের বলে বলিয়ান হয়েই জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাস্তায় নেমেছিলো জনতা, কারণ তাদের ভেতরে তখন ‘রুহানি সহিংসতা’র ঘূর্ণিবায়ু ভর করেছে। আর এর পরিপ্রেক্ষিতের নামকরণ করা যেতে পারে ‘ভিজ্যুয়াল ভায়োলেন্স’। কারণ তার বিস্তৃতি ঘটেছে ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমেই।
এই ‘ভিজ্যুয়াল ভায়োলেন্সে’র আরো কিছু উদাহরণ হাজির করা যেতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে কিছু অ্যানিমেটেড শর্টফিল্ম ছড়িয়ে পড়েছিলো। সেখানে দেখা যায়, নয় দফা দাবি কীভাবে একজন মানুষকে হত্যা করার ফলে তার রক্ত দিয়ে নয়ের নিচের ফাঁকা স্থান পূরণ হয়ে এক দফা দাবিতে পরিণত হয়। এই যে রক্তপাত এবং রক্ত ঝরানোর আকাঙ্ক্ষা এটা তো সেই রুহানিয়াতেরই অংশ। আবার সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে দেখা যায় ভিন্নরকম সহিংস ভিজ্যুয়াল পলিটিক্স। একই দিনে একইসঙ্গে সারা বাংলাদেশের প্রায় সব ফেইসবুক ইউজার তাদের প্রোফাইল লাল রঙ করে ফেলে। যে ফেইসবুক লাল রঙকে ‘সহিংস’ বলে তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে, সেই লাল তথা সহিংসতার ভাষাতেই বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবাদ/প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো। আরো একটি বিষয় হলো, ’২৪-এর র্যাপ এবং স্লোগানের ভিজ্যুয়াল ইমাজিনেশন এবং প্রচ্ছদের ভিজ্যুয়ালস। সেগুলোও এই ‘রুহানি সহিংসতা’কেই তুলে ধরে এবং হয়ে ওঠে তারই মেনিফেস্টেশন।
’২৪-এ ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের ভূমিকাকে অনেকটা মেসিয়ানিক বলে মনে হয়। কারণ ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের সেই ক্ষমতা রয়েছে। আর এখানেই গেই দেবর্দকে সমালোচনা করছেন আগামবেন। গেই দেবর্দ দেখাচ্ছেন, মিডিয়া ও ভোক্তাসমাজ ইমেজ/ভিজ্যুয়াল, পণ্য ও সাজানো ঘটনার মধ্য দিয়ে কীভাবে পরিগঠিত হতে থাকে। তার আলোচনায় ইমেজ/ভিজ্যুয়ালের ভূমিকা নেতিবাচক এবং তিনি দেখাচ্ছেন ইমেজ/ভিজ্যুয়াল কীভাবে মানুষের দৃষ্টিকে সুনির্দিষ্ট স্পেকটাকলে বন্দি করে ফেলে। কিন্তু আগামবেন বলছেন, ইমেজ/ভিজ্যুয়াল তার মেসিয়ানিক ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে তার নাজাতের পথ বাতলে দিতে পারে।৪১ ’২৪-এর ভিজ্যুয়াল তারই প্রমাণ।
ভিজ্যুয়াল এবং এআই : এআই-এর দেখানো, মানুষের দেখা
অতীতের সব প্রযুক্তির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রকৃতির ওপরে মানুষের নিয়ন্ত্রণ/কর্তৃত্ব বাড়াচ্ছে না। বরং নিজেই মানুষের হাত থেকে প্রকৃতির ওপরে নিয়ন্ত্রণ/কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তার নিজের হাতে নিয়ে নিচ্ছে। মানুষ সেটা উপলব্ধি করতে পারুক বা না পারুক, প্রযুক্তির কারণে মানুষের মধ্যে যে আত্মকেন্দ্রিক অহংকার গড়ে উঠেছিলো, তা শিগগিরই মানবিক গুরুত্ব হারাতে পারে এবং ধাবিত হতে পারে বিরাট এক অর্থহীনতার দিকে।৪২
এআই নিজেকে মানুষের ‘সহকারী’ হিসেবে দাবি করে। কিন্তু স্লাভোয় জিজেকের উপরের আশঙ্কাটারও যথেষ্ট মূল্য রয়েছে। তিনি বলছেন, এআই এখন আর মানুষের ‘সহকারী’ নয়। সে এখন নিজেই যেকোনো মৌলিক এবং সৃজনশীল কনটেন্ট (অডিও, ভিজ্যুয়াল, রিটেন) নির্মাণ করতে সক্ষম। সেই জায়গা থেকে মানুষের সৃজনশীলতার ওপর এটা বিশাল একটা আঘাতও বটে। এ কারণেই জিজেক আবারও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, মানুষ যেভাবে এআইয়ের ভাষা আয়ত্ত করছে, তাতে ভবিষ্যতে এআই আর মানুষের ভাষাগত জায়গাটাতে তফাত করাটা বেশ মুশকিলের কাজ হয়ে দাঁড়াবে। তাই জিজেক দাবি করছেন, এআই একটা মেশিন; সে যেমন রুহহীন তেমনই মানুষকেও রুহহীন করে তুলছে। যার দরুন ‘পোস্ট অ্যান্থ্রোপসিনিক’ পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে মানুষ। ‘অ্যান্থ্রোপসিন’ ধারণা দিয়ে ব্রুনো লাতুর কেবল ভূতাত্ত্বিক কোনো কিছু বুঝাননি, বরং তিনি এর সার্বিক দিক নিয়ে আলাপ করেন। তিনি জানান, শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রকৃতি থেকে মানুষের ভয়ানক রকম এলিয়েনেশন ঘটেছে। এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নতিতে নির্ভরশীল হয়ে মানুষ এমন একটা যুগে এসে পৌঁছেছে যে, সে নিজেকে পৃথিবী পরিবর্তনকারী বিশাল এক শক্তিরূপে দাবি করে বসছে।৪৩ কিন্তু এআই সেই জায়গাটাতেই আঘাত করে বসেছে। এই এখতিয়ার এখন আর মানুষের হাতে কতোটুকু সেটা নিয়েই সন্দেহের জায়গা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া ডিপফেইক এবং ইথিকসের জায়গাতেও রয়েছে যথেষ্ট ধোঁয়াশা। কারণ এআই কোনো ইথিকসের ধার ধারে না। বা সামাজিক ইথিকস সে বোঝে না। তারপরও সে একটা মেশিন হয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে ইতোমধ্যেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিল্পীর শিল্পের স্বত্ব নিয়ে তৈরি হচ্ছে ক্রাইসিস। শিল্পের পুঁজিভিত্তিক ‘মেকানিকাল রিপ্রোডাকশন/রিপ্রোডিউসিবিলিটি’কে ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ‘গণতন্ত্রায়ণ’ হিসেবে দেখেছিলেন।৪৪ কারণ সেই সময়ে শিল্পীর শিল্পকর্মের স্বত্ব তার কাছে থাকলেও সেই শিল্প হয়ে উঠেছিলো সবার। কিন্তু এআইয়ের যুগে শিল্পীর সেই স্বত্ব রক্ষা করাই দায় হয়ে উঠেছে। কারণ এখন এআই কোনো শিল্পীর স্টাইলকে তার টুল হিসেবে ব্যবহার করে। যার ফলে শিল্পীর নিজস্বতা বলে কিছু থাকছে না। যা শিল্পী ও এআইয়ের মধ্যে নতুন করে কপিরাইট আইন হাজির হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সেটা হলেও যেমন মুশকিল, না হলেও মুশকিল। না হলে উপরের ঘটনাটা ঘটবে মানে শিল্পী তার শিল্পের তো বটেই, সঙ্গে নিজেই নিজের স্বত্ব হারাবে। আর এই কপিরাইট আইন হলে যেটা হবে তা হলো, হিউম্যান য়েনটিটির ডিহিউম্যানাইজেশন ঘটবে। এআইকে যখন শিল্পী তার স্টাইলে ট্রেইন হওয়ার লিগাল অ্যাপ্রুভমেন্ট দিবে, তখন শিল্পী নিজেই ক্যাপিটালের ভেতরে ইনক্লুড হয়ে পড়বে। কিন্তু বেঞ্জামিন সেটা চাননি। তিনি চেয়েছিলেন, শিল্প পুঁজিভিত্তিক মেকানিকাল রিপ্রোডিউসিবিলিটি’র ভেতর দিয়ে গেলেও শিল্পী যেনো না যায়। যার কারণেই তিনি ‘aura’-এর আবির্ভাব ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু এআইয়ের যুগে শিল্পীকেও এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। যা শিল্পীর ‘aura’ হানি ঘটাচ্ছে।
কাজেই এআইয়ের যুগের নতুন কিছু প্রবণতা মাথায় রেখেই ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিবেচনায় নামতে হবে। প্রথমত, এআইকে এখন কোনো ইমেজ/ভিজ্যুয়াল তৈরি করতে স্রেফ একটা বর্ণনা দিলেই চলে। এআই সেই বর্ণনাকে বেইজ করে ইমেজ/ভিজ্যুয়াল হাজির করে। ক্ষেত্র বিশেষে তা নিখুঁত হয় আবার ক্ষেত্র বিশেষে তা চাহিদার সঙ্গে হয়তো খাপ খায় না। এটা একটা কমিউনিকেশন প্রসেস। সেখানে এআইকে বর্ণনার মাধ্যমে বোঝাতে সক্ষম হতে পারলে তবেই আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া সম্ভব। এই জায়গাতে এসে মানুষকে এআইয়ের ভাষা জানতে হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। যে এআই মানুষের ভাষা ব্যবহারের যে পটেনশিয়ালিটি সেটার সিকিভাগও ধারণ করতে পারে না, সেই এআইয়ের ভাষা শিখতে হচ্ছে মানুষকে। এটাকে প্রবলেমাটাইজ করে জিজেক বলছেন,
নতুন চ্যাটবটগুলোর (এআই) সমস্যা শুধু এটুকুই নয় যে, তাদেরকে প্রায়শই বোকা এবং সাদাসিধা মনে হয়; বরং সমস্যাটা এখানে যে, তারা এতোটাও ‘বোকা’ বা ‘সাদাসিধা’ হয়ে উঠতে পারেনি, যাতে করে তারা মানুষের সাংস্কৃতিক ও যোগাযোগের সামাজিক দুনিয়াতে হাজির থাকা তার বিরচিত মুখের কথা, রসিকতা, সহজ-সরল সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ইঙ্গিত ও বিপরীত ভাবনাগুলোকে বুঝতে পারে। আরো বেশি উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এইসব চ্যাটবটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা মানুষকে ভবিষ্যতে বিরাট স্থূল, অসংবেদনশীল ও সরল চিন্তার ফাঁদে পড়ে তার প্রতি নতি স্বীকার করার মতো ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।৪৫
অর্থাৎ মানুষের সহজাত প্রবণতাগুলোকে ধরার সক্ষমতা এআইয়ের নেই। একইসঙ্গে এআই কেবল সুনির্দিষ্ট অ্যালগরিদম অনুসরণ করেই তার কাজ করে, এক্ষেত্রে তার মধ্যে কোনো ধরনের মানবীয় আবেগ, অনুভূতি ও কনটেক্সট বোঝার মতো সক্ষমতাও নেই। আর ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়েই জিজেক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে বিবেচনা করছেন ‘আর্টিফিশিয়াল ইডিওসি’ বা ‘কৃত্রিম বোকামি’ হিসেবে। এর সঙ্গে নোয়াম চমস্কি’র ‘জেনারেটিভ গ্রামার’ ধারণার অনেকটা মিল পাওয়া যায়। চমস্কি জানান, মানুষের ভাষা শেখার সক্ষমতা জৈবিক। মানে সে জন্মগতভাবেই ভাষা আয়ত্ত করার মতো সক্ষমতা নিয়েই জন্মায়। এবং এই ভাষার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। যেগুলো একটা শিশু খুব ছোটো বয়সেই আয়ত্ত করে নেয় ও অসীম বাক্য গঠনে সমর্থ হয়। চমস্কি এই সুনির্দিষ্ট কাঠামোকে বলেন, ‘Deep Structure’। আর এই নিয়ম মেনে যে সীমাহীন বাক্য গঠিত হয় সেটাকে বলেন, ‘Surface Structure’। তার মানে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো অর্থাৎ ‘Deep Structure’ তার বিবেচনার মূল জায়গা। কিন্তু এআইয়ের এই সক্ষমতা নেই। এআই মূলত ডাটাভিত্তিক; সে তথ্য বিশ্লেষণ করে, অনুধাবনের চেষ্টা করে এবং সেই অনুযায়ী কেবল উত্তর করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই অনুধাবন ও উত্তরে যথেষ্ট গড়মিল রয়েছে। সর্বোপরি চমস্কি বলতে চান, ‘... মানুষ যান্ত্রিক নয়, মানুষ অন্য সকল প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র এবং সকল মানুষ সৃজনশীল ...।’৪৬ কিন্তু এআইয়ের যন্ত্রবৎ আচরণ এখন মানুষ আয়ত্ত করছে এটাই শঙ্কার বিষয়।
যাইহোক, এছাড়া কোনো ভিজ্যুয়ালের জন্য যদি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের প্রয়োজন পড়ে সেটাও এআই তৈরি করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে ঠিক একই প্রক্রিয়াতে তার সামনে ওই ভিজ্যুয়ালের ডিটেইল বর্ণনা হাজির করতে হয়। এর আগে এআইয়ের ব্যবহার হতো কেবল ভি এফ এক্স-এর কাজে। মানে মানুষের তৈরি করা কাজে এআই দিয়ে সেটাকে মোডিফাই করা হতো। কিন্তু এখন সেটার আমূল রূপান্তর ঘটেছে। এখন এআই দিয়েই পুরো চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাণে এখন এআই ব্যবহারের ছড়াছড়ি। অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রির গণ্ডি পেরিয়ে এআই এখন পুরো ভিজ্যুয়াল ইন্ডাস্ট্রি দখলের পথে। যা হিউম্যান য়েনটিটির জন্য হুমকিস্বরূপ।
উপসংহার
বর্তমান যুগ দৃশ্যমানতার। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের বিস্তার, সবমিলিয়ে মানুষের ভাবনাচিন্তা, ভাব প্রকাশের বড়ো, বোধহয় প্রধান মাধ্যম ভিজ্যুয়াল ও ভিজিবিলিটি। সাম্প্রতিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ফলে বাংলাদেশেও এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। ফলে পুরো অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসরেও এসেছে পরিবর্তন। বিশেষ করে ’২৪-এ ভিজ্যুয়ালের ব্যাপক ছড়াছড়ি এবং আন্দোলনে তার ভূমিকা, তা নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে বসতে হয়। যদিও ম্যানুয়েল ক্যাসেল অনেক আগেই সোশাল মিডিয়াকেন্দ্রিক আন্দোলনের আলাপ তুলেছেন তার ‘Networks of the Outrage and Hope: Social Movements in the Internet Age’ বইটাতে। তবে সেখানে ভিজ্যুয়ালের ভূমিকা নিয়ে আলাপ পাওয়া যাবে না। এখানেই ভিজ্যুয়াল নতুন করে মাত্রা পায়।
নতুন সময়ে ভিজ্যুয়াল কেবল ভিজ্যুয়াল নয়, এর ভূমিকা এখন মেসিয়ানিক। এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির বিশাল ক্ষেত্র থেকে শুরু করে মানুষের যাপিত জীবন, প্রত্যেকটি পরতে পরতে ঢুকে ৭০,০০০ পর্দার উন্মোচন ঘটাতে থাকে ভিজ্যুয়াল। আর এখানেই ভিজ্যুয়াল অনন্য।
লেখক : মাহমুদুল হাসান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি ও অনুবাদ করছেন।
https://www.facebook.com/mahmud.alhasan.14418
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. Agamben, Giorgio (2011: 13); ‘What Is the Contemporary?’; Nudities; Stanford University Press, USA.
২. খান, সলিমুল্লাহ (২০২৩ : ৩৩); ‘বাংলার রেনেসাঁসের পরিণতি: স্মৃতি ও বিস্মৃতি’; উৎসর্গ: পরিবার প্রজাতি রাষ্ট্র; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. Mitchell, W.J.T. (1995: 11); ‘The Pictorial Turn’; Picture Theory: Essays on Verbal and Visual Representation; The University of Chicago Press, UK.
৪. মামুন, আ-আল; ‘যুগান্তরের কথা: দেখবেন নাকি পড়বেন’; দেখুন : https://www.shokalshondha.com/reading-versus-seeing/; retrieved on: 26.03.2025
৫. চৌধুরী, মানস (২০২২ : ৩৭); ‘সিনেমা কারখানা’; সিনেমা কারখানা ও ‘এন্টি-সিনেমা’ ঘোষণাপত্র; ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী।
৬. প্রাগুক্ত; চৌধুরী (২০২২ : ৩৮)।
৭. McLuhan, Marshall (1994: 07); ‘The Medium Is the Message’; Understanding Media: The Extensions of Man; The MIT Press, UK.
৮. মামুন, আ-আল ও হায়দার, কাজী মামুন (২০২৫ : ১০৬); ‘সঙ্কটে সম্ভাবনায় ওটিটি’; বাংলাদেশের দৃশ্যসংস্কৃতি : ওটিটি পর্ব, ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী।
9. “‘Black Mirror’ Interactive Film: Inside the 2-Year Journey of ‘Bandersnatch’”; https://www.hollywoodreporter.com/tv/tv-news/black-mirror-bandersnatch-netflixs-interactive-film-explained-1171486/; retrieved on: 01.04.2025
10. Deleuze, Gilles (2000: 366); ‘The Brain Is the Screen’; The Brain Is the Screen: Deleuze and the Philosophy of Cinema; Edited by: Gregory Flaxman, University of Minnesota Press, UK.
11. Valiaho, Pasi (2014: ix); ‘Preface’; Biopolitical Screens: Image, Power, and the Neoliberal Brain; The MIT Press, UK.
১২. প্রাগুক্ত; মামুন ও হায়দার (২০২৫ : ১৩, ১০৪)।
13. ‘Barkha Singh: OTT platforms give freedom of choice’; †`Lyb : https://indianewengland.com/barkha-singh-ott-platforms-give-freedom-of-choice/; retrieved on: 29.03.2025
14. Han, Byung-Chul (2017: 1-4); ‘The Crisis of Freedom’; Psychopolitics: Neoliberalism and New Technologies of Power; Translated by: Erik Butler; Verso book, USA.
১৫. প্রাগুক্ত; Han (2017: 37-40).
১৬. প্রাগুক্ত; Han (2017: 20).
১৭. প্রাগুক্ত; Han (2017: 20).
১৮. প্রাগুক্ত; Han (2017: 56-60).
১৯. প্রাগুক্ত; Han (2017: 63-65).
20. ‘Netflix
says 80 percent of watched content is based on algorithmic recommendations’; †`Lyb : https://mobilesyrup.com/2017/08/22/80-percent-netflix-shows-discovered-recommendation/;
retrieved on: 01.04.2025
21. Castells, Manuel (2009: 24-26); ‘The Global Network Society’; Communication Power; Oxford University Press, UK.
22. ‘Understanding Big Data Processing: 2025’s Ultimate Guide’; †`Lyb :https://hevodata.com/learn/big-data-processing/
23. The Ultimate Guide to OTT Data Management for Content Sellers, SymphonyAI Media, p. 03-04.
24. Arshad, M, Onn CW, Ahmad A. et al. (2025); ‘Big Data Analytics and AI as success factors for online video streaming platforms’; Front. Big Data 8: 1513027. Doi: 10.3389/fdata.2025.1513027.
25. Han, Byung-Chul (2017: 56-60); ‘Big Data’; Psychopolitics: Neoliberalism and New Technologies of Power; Translated by: Erik Butler; Verso book, USA.
২৬. মামুন, আ-আল ও হায়দার, কাজী মামুন (২০২৫: ১৩, ১০৪); ‘ওটিটি: দৃশ্যসংস্কৃতির নতুন ধারা’, ‘সঙ্কটে সম্ভাবনায় ওটিটি’; বাংলাদেশের দৃশ্যসংস্কৃতি : ওটিটি পর্ব, ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী।
27. Han, Byung-Chul (2017: 28); ‘Foucault’s Dilemma’; Psychopolitics: Neoliberalism and New Technologies of Power; Translated by Erik Butler; Verso book, USA.
28. Debord, Guy (2014: 28); ‘Unity and Division Within Appearances’; The Society of the Spectacle, Bureau of Secrets, Canada.
29. Badiou, Alain (2013: 132); ‘SURPLUS SEEING: Jean-Luc Godard, Histoire(s) du cinema’; Cinema, Translated by: Susan Spitzer; Polity Press, USA.
30. Baudrillard, Jean (1998: 15); ‘Introduction’; The Consumer Society: Myths and Structure, Sage Publications, UK.
31. Ahmed, Abdul & Ahmed Mahdi Abdulkareem; ‘Big Data Analytics in the Entertainment Industry: Audience Behavior Analysis, Content Recommendation, and Revenue Maximization’; Reviews of Contemporary Business Analytics, 6(1), p.88-102.
32.‘Data collection and usage by OTT services (No. 431)’;https://www.wik.org/en/publications/publication/no-431-data-collection-and-usage-by-ott-services; retrieved on: 30.03.2025
33. Agamben, Giorgio (2005: 71); ‘The Fourth Day: Apostolos’; Time That Remains: A Commentary on the Letter to the Romans; Stanford University Press, USA.
34. Arendt, Hannah (1969: 56); On Violence, A Harvest/HBJ Book, USA.
35. Benjamin, Walter (2004: 236); ‘Critique of Violence’; Walter Benjamin: Selected Writings, Vol. 1, 1913-1926, Edited by: Marcus Bullock and Michael W. Jennings, Harvard University Press, USA.
36. Fanon, Frantz (2004: 01-52); ‘On Violence’; The Wretched of the Earth, Translated by: Richard Philcox, Grove Press, USA.
37. Zizek, Slavoz (2008: 09-39; 178-205); ‘SOS Violence’, ‘Divine Violence’; Violence: Six Sideways Reflections, Picador, USA.
৩৮. ভাসানী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান (২০০৬: ৬১-৬২); ‘অহিংসা ও বিপ্লব’; মাওলানা ভাসানীর সাপ্তাহিক হক-কথা সমগ্র, সংগ্রহ ও সম্পাদনা : আবু সালেক, ঘাস ফুল নদী, ঢাকা।
৩৯. প্রাগুক্ত; ভাসানী (২০০৬ : ৫৯-৬০)।
40. Graeber, David (2011: 41-65); ‘Revolution in Reverse’; Revolution in Reverse: Essays on Politics, Violence, Art, and Imagination, Minor Compositions, UK.
41. Giorgio, Agamben (2014: 25); ‘Cinema and History: On Jean-Luc Godard’; Cinema and Agamben: Ethics, Biopolitics and Moving Image, Bloomsbury, USA.
42. ‘The Post-Human Desert’; †`Lyb : https://www.project-syndicate.org/commentary/ai-post-human-future-by-slavoj-zizek-2023-04; retrieved on: 30.03.2025
43. Latour, Bruno (2017: 111); ‘The Anthropocene and the destruction of (the image of) the Globe’; Facing Gaia: Eight Lectures on the New Climatic Regime; Polity Press, UK.
44. Benjamin, Walter (2006: 101); ‘The Work of Art in the Age of its Technological Reproducibility’; Walter Benjamin: Selected Writings, Vol. 3, 1935-1938, Edited by: Michael W. Jennings and Howard Eiland, Harvard University Press, USA.
45. ‘The Artificial Idiocy’; †`Lyb : https://www.koreatimes.co.kr/opinion/20230328/artificial-idiocy; retrieved on: 04.04.2025
৪৬. মামুন, আ-আল (২০০৬: ১৯); ‘ভূমিকার বদলে’; মানবপ্রকৃতি : ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা; রোদ, রাজশাহী।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন