Magic Lanthon

               

জেরিন আল জান্নাত

প্রকাশিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘সিনেমা কীভাবে বানাবো’

কেবল নবীন নয়, প্রবীণদেরও সিনেমা দেখা ও শেখার বই

জেরিন আল জান্নাত


ছোটোবেলায় সিনেমায় কোনো দৃশ্য দেখে পাশে কেউ যখন কান্নাকাটি করতো, তখন আমারও কষ্ট হতো! যদিও বুঝতাম এগুলো অভিনয়, তারপরও কেমন জানি কান্না পেতো। আবার কখনো সিনেমায় নায়ক-নায়িকা ধাক্কা লেগে চোখাচোখি হলেই গান দিয়ে শুরু হতো প্রেম। তখন ভাবতাম, বাস্তবেও হয়তো মানুষ এভাবেই প্রেম করে। প্রেম মানেই জড়িয়ে ধরে গান গাইতে হবে, নাচতে হবে। যদি কোনো সিনেমায় নায়ক মারা যেতো, সেটা মেনে নিতে অনেক কষ্ট হতো। নায়ক কেনো মরবে! কখনো নায়ক-নায়িকা দুজন মারা গেলে, মনে হতো সেটা ভালো সিনেমা নয়। কল্পনায় সেই সিনেমার গল্প নিজের মতো করে সাজাতে ভালো লাগতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেসব গল্পে নায়ক-নায়িকার মিলন হতো। এক ধরনের মানসিক শান্তি পাওয়া যেতো তাতে। তবে সিনেমা কীভাবে বানায় তা নিয়ে কোনো ধারণাই ছিলো না তখন। মাথায় তা নিয়ে কখনো চিন্তাও আসেনি। সিনেমা নির্মাণের বিষয়টা সবসময় বহুদূরের কারিগরি আর অনেক টাকাপয়সার বিষয় মনে হতো। সত্যি কথা বলতে এই বিষয় নিয়ে ভাবার প্রয়োজনই পড়েনি কখনো।


বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর মনে হলো কোনো একটা সংগঠনে সম্পৃক্ত হওয়া দরকার। কী ধরনের সংগঠনে যাবো ভাবছিলাম। আবৃত্তির শখ ছিলো, কিন্তু কোথায় যাবো, কী করবো, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে হঠাৎই একদিন সিনেমা নিয়ে কাজ করা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন-এ আসি, একেবারে অন্য একটা কারণে। সেদিনের অল্প সময়ের জন্য সেখানে থাকায়, কেমন জানি সবকিছু ভালো লেগে যায়। সিনেমা দেখার আগ্রহ থাকলেও, এ নিয়ে লেখালেখি কিংবা সিনেমা বানানো নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিলো না। তার পরও কেনো জানি ধীরে ধীরে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন-এ যাতায়াত শুরু করি। নিয়মিতভাবে প্রতি সপ্তাহে ‘রবিবারের সিনেমা দেখা ও পাঠচক্র শুরু করি; আড্ডা দিই, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সবার কথা শুনি। এর মধ্যেই ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালায় একবার সঞ্চালনাও করি। প্রথমবারের মতো সেখানে কোনো নির্মাতাকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হতে থাকে। অবশ্য যা যা করি, তার মধ্যে কিছু বুঝতে পারি, কিছু পারি না।


ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় লেখার ইচ্ছে ছিলো মনে মনে, তবে সাহস করে উঠতে পারিনি। আসলে পারবো কিনা তা নিয়ে নানা দ্বিধা কাজ করতো। এর মধ্যে একটা সুযোগ আসে লেখার। সাহস করে লেখা শুরু করি ‘প্রান্তজনের বিনোদনকথা বিভাগে। দুইজন প্রান্তিক মানুষের সাক্ষাৎকার নিই। তাদের জীবনে বিনোদন কী, কীভাবে তারা বিনোদিত হয়, ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলা, তাদের গল্প শোনা এবং লেখা; পুরো বিষয়টি অনেক উপভোগ করি। এভাবে আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে থাকে। আবার অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেও সিনেমা নিয়ে পড়ালেখার প্রয়োজন পড়ে। এ রকম একটা সময়ে সৈয়দ নিগার বানুর লেখা ‘সিনেমা কীভাবে বানাবো বইটি হাতে আসে। আগ্রহ নিয়ে বইটি পড়তে শুরু করি।


দুই.

শুরুতে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, বইটা আসলে কী নিয়ে। কারণ এ ধরনের বই আগে কখনো চোখে পড়েনি। ফলে খানিক আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করি। ভালোলাগা কাজ করতে থাকে। সিনেমা নির্মাণ যে শুধু বিশেষ কারো বিষয় নয়, আগ্রহ থাকলে এটা নিয়ে অনেকেই বা যেকোনো বয়সি মানুষ কাজ করতে পারে, তা বুঝতে শুরু করি। সবচেয়ে আশ্চর্য হই এটা বুঝতে পেরে যে, সিনেমা দেখে ঠিক বোঝা যায় না এর পেছনে কতো মানুষের মেধা, পরিশ্রম ও কষ্ট আছে! বইটি সিনেমার সেই পেছনের জগৎ সম্পর্কে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকে।


সিনেমা কীভাবে বানাবো বইয়ে ভূমিকা বাদেই অধ্যায় রয়েছে ১৪টি। একেবারে নতুন বা ছোটোদের জন্য লেখা বলেই হয়তো প্রত্যেকটা অধ্যায়ের নামে দারুণ সব উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায় ‘কী করে এবং কার হাত ধরে সিনেমা এল; দ্বিতীয় অধ্যায় ‘সাত ভাই চম্পা ও এক বোন পারুল; তৃতীয় অধ্যায় ‘সিনেমা বানাতে কী কী লাগে। এভাবে সিনেমা নির্মাণের ধারাবাহিকতার সঙ্গে মিলিয়ে একে একে এসেছে ‘মুভি ক্যামেরায় যা তোলা হয়, তা-ই সিনেমা নয়, ‘চিত্রনাট্য ছাড়া সিনেমা আর লবণ ছাড়া তরকারি, ‘শট জানলে ক্যামেরা চালানো পানির মতো সোজা, ‘ক্যামেরার সামনে অভিনয় সে এক ঘামঝরানো কসরত, ‘লাইট-সাউন্ড-ক্যামেরা-অ্যাকশন-কাট, ‘পিকনিক আর শুটিং কিন্তু এক নয়, ‘এডিটিং ছাড়া সব শট অচল, ‘কোথায় দেখাবে তোমার সিনেমা, ‘বিশ্বের কয়েকজন খুদে ফিল্মমেকারের কথা, এবং সর্বশেষে ‘কী দেখবে আর কী পড়বে


বইয়ের ভূমিকায় বলা হয়েছে দেশে ছোটোদের জন্য সিনেমা যেমন অনেক কম, তেমনই সিনেমা নিয়ে ছোটোদের জন্য বইয়ের সংখ্যাও কম। এই শিশু-কিশোরদের সিনেমা বানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানানোর উদ্দেশ্যে বইটি লেখা হয়েছে। এতে সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে মেলবন্ধনের কথা বলা হয়েছে মেধা ও প্রযুক্তির। লেখক মনে করেন, এখনকার শিশুরা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনেকখানি এগিয়ে। সিনেমা বানাতে প্রয়োজন মেধা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা, যন্ত্র নিয়ে আগ্রহ ও পরিশ্রম করার অদম্য শক্তি। এসবের সমন্বয়ে সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে দেশের সুনাম বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। ভূমিকার শেষে লেখক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তার ভাই সৈয়দ সাবাব আলী আরজু ও চলচ্চিত্রনির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল-এর প্রতি। যাদের হাত ধরে তার সিনেমার হাতেখড়ি হয়েছিলো। বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর এবং প্রকাশন আনন্দপাঠ প্রকাশনাকেও তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন।


তিন.

ভূমিকার পর প্রথম অধ্যায়েই আলোচনা হয়েছে সিনেমার ইতিহাস নিয়ে। সিনেমাকে নানা নামে ডাকা হয়-ফিল্ম, সিনেমা, মুভি, ছায়াচিত্র, ছায়াছবি, চলচ্চিত্র; আবার অনেকে বলে টকি, ছবি, বই। এগুলো বুঝতে গেলে এর ইতিহাস জানা জরুরি। সিনেমার মতো জটিল আবিষ্কার কেবল লুমিয়ের ভাইদের হাত ধরেই হয়নি। তাদের ক্যামেরা, আমেরিকার জর্জ ইস্টম্যানের রোল ফিল্ম এবং বৃটিশ ফটোগ্রাফার এডওয়ার্ড মায়াব্রিজ-এর প্রজেক্টর সিনেমার আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। লুমিয়ের ভাইদের তৈরি সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্র রেকর্ড করতো, ফিল্ম প্রসেস এবং মোশন পিকচার প্রজেক্ট করতো। তারা ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সে প্রথম দর্শককে সিনেমা দেখায়। এসব সিনেমার দৈর্ঘ্য ছিলো এক মিনিটেরও কম; সাদাকালো আর নির্বাক। তবে নির্বাক সিনেমার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দেই। আর ১৯৩০-এর মধ্যেই সিনেমা নানা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হয়ে ওঠে।


এদিকে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে হীরালাল সেন নির্মিত আলিবাবা ও চল্লিশ চোর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। একইসঙ্গে তিনি প্রথম তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্রও নির্মাণ করেন। যেহেতু হীরালাল থিয়েটারের দৃশ্য ক্যাপচার করেছিলেন সিনেক্যামেরায়, তাই ভারতের প্রথম সিনেমা হিসেবে স্বীকৃতি পায় দাদাসাহেব ফালকের সিনেমা রাজা হরিশচন্দ্র। পূর্ব বাংলার প্রথম সিনেমা মুখ ও মুখোশ (১৯৫৬), আর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা চাষী নজরুল ইসলাম-এর ওরা ১১ জন। এরপর আসে ডিজিটাল প্রযুক্তির সিনেমা। বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল সিনেমা পল ওয়ানগার নির্মিত উইন্ডহর্স (১৯৯৮); আর ভারতের সুব্রত সেন নির্মিত নীল নির্জনে (২০০৩)। বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল সিনেমা হিসেবে সেন্সর সনদপত্র পায় মোরশেদুল ইসলামের প্রিয়তমেষু (২০০৯)। ফলে সিনেমার এই ইতিহাস অনেক বিস্তৃত। বুঝতে পারি শুরু থেকে অনেক মানুষের মেধা ও পরিশ্রমে আজকের সিনেমা এখানে এসেছে। পড়তে ভালোও লাগে!



দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে সিনেমা কীভাবে অন্য শিল্পকলা থেকে উপাদান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকলায় রূপ নিয়েছে, তা নিয়ে। শিল্পকলার অন্য যেসব শাখা আছে যেমন, সাহিত্য, চিত্রকলা, নাটক, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র, নৃত্য, সঙ্গীত এগুলোর থেকে সব পরে এসেছে সিনেমা। তাই অধ্যায়টির নামকরণ করা হয়েছে ‘সাত ভাই চম্পা ও এক বোন পারুল। একটু জটিল লাগলেও অধ্যায়টি পড়তে ভালো লাগছিলো। কারণ এভাবে কখনো ভাবা হয়নি। সিনেমা নাকি চিত্রকলা থেকে নিয়েছে টোনের গভীরতা, রঙের ব্যবহার, ফ্রেমিং, কমপোজিশন ও আলোর ব্যবহার। নৃত্য থেকে নিয়েছে তাল ও ছন্দ; ভাস্কর্যের ত্রিমাত্রিক গঠন আর সঙ্গীত থেকে সুর ও রীতি। বিষয়গুলো নিয়ে পরিষ্কার একটা ধারণা তৈরি হলো। সত্যিই তো সিনেমার মধ্যে সব শিল্পকলার সমন্বয় ঘটেছে! ফলে এগুলো সম্পর্কেও ভালো জানা বোঝা থাকতে হবে। অথচ একটা বিষয় মাঝে মাঝে ভাবি, আমার চারপাশে যারা সিনেমা নিয়ে কথা বলে, নির্মাণ করতে চায়, তাদের মধ্যে তো এসব নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ কেনো জানি দেখি না!


পরের অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে সিনেমা বানাতে কী কী লাগে তা নিয়ে। দারুণ করে ধারাবাহিকভাবে এই ধাপগুলো এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমার জন্য প্রথমে একটি থিম দরকার, সেই থিম থেকে গল্প, গল্পে কিছু চরিত্র থাকে। এরপর চিত্রনাট্য, ক্যামেরা, অভিনয়শিল্পী, বাজেট, সাউন্ড, লাইট, লোকেশন। পরের ধাপে শুটিং, তারপর সম্পাদনা, আলো, শব্দ সংযোজন, সঙ্গীত, আবহসঙ্গীত, কালার কারেকশন, টাইটেল কার্ড ইত্যাদি। তবে লেখক বলছেন, এর সব ধরনের সুবিধা থাকলেও কেউ সিনেমা বানাতে পারবে না, যদি তার ইচ্ছা না থাকে। তার মানে আমি যা বুঝেছি, সিনেমাটা প্রথমে মাথায় তৈরি হয়, তার পর বাস্তবে। এর জন্য অনেক ধৈর্য আর সময়ের প্রয়োজন।


পরের অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে-‘মুভি ক্যামেরায় যা তোলা হয় সব সিনেমা নয় নিয়ে। পৃথিবীতে সিনেমার প্রধান তিনটি জাত কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র। এছাড়া তথ্যচিত্র, সংবাদচিত্র, নাটক, সিরিয়াল, বিজ্ঞাপনচিত্র, এগুলো ভিডিও ক্যামেরায় করা হলেও কেনো সিনেমা নয়-এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আমার কাছে সব থেকে মজার লেগেছে পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের আলোচনা। সেখানে নাকি কোনো নিয়মকানুন মানতে হয় না, স্বাধীনভাবে বানানো যায়।


চার.

অধ্যায় পাঁচ থেকে পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে ধারাবাহিকভাবে সিনেমা নির্মাণের ধাপগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সিনেমা বানাতে শুরুতেই প্রয়োজন হয় একটি গল্পের। এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে একেবারে শুরুতে। আমাদের চারপাশে অনেক ঘটনা, অনেক গল্প। এই গল্প যেমন মানুষের মাথায় থাকে, আবার অন্য কারো লেখা গল্পও থাকে। সিনেমার জন্য গল্প খুঁজতে হয়। এই খোঁজাখুঁজির ক্ষেত্রে গল্প সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকার কথা বলেছেন লেখক। গল্পে চরিত্র, বিন্যাস, পটভূমি, দ্বন্দ্ব, সংঘাত পাঁচটি উপাদান থাকতে হয়। তবে শুরুতেই জটিল বা বেশি বাজেটের গল্প বাছাই না করার পরামর্শ দিয়েছেন লেখক। এই পরামর্শটা ভালো লেগেছে! আমার মতো কেউ শুরুতেই উচ্চাকাক্সক্ষী হলে তার আর হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।


লেখক বলছেন, কেবল গল্প বাছাই করলেই হবে না, সেটাকে সিনেমার গল্প করে তুলতে হবে। এই ক্ষেত্রে গল্পের পাঁচটি ধাপের কথা বলা হয়েছে-গল্পের ব্যাখ্যা বা প্রদর্শন, গল্পটি যে সমস্যা নিয়ে এগোচ্ছে তার বিস্তার, ক্লাইমেক্স বা গল্পটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়, সমস্যার ক্রমান্বয় সমাধান এবং শেষে সমাধান। রাজা-রানির গল্প বলার মাধ্যমে লেখক তা চমৎকারভাবে বুঝিয়েও দিয়েছেন। এটাও খুব ভালো লেগেছে! এছাড়া তিনি সিনেমা নির্মাণের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি, প্রোডাকশন ও পোস্ট প্রোডাকশন তিনটি ধাপে কী কাজ করতে হবে তার তালিকাও দিয়েছেন। আর এই সবকিছুর বাইরে তিনি সিনেমা নির্মাণের জন্য অনেক বেশি সিনেমা দেখার ওপর জোর দিয়েছেন। সঙ্গে পর্যবেক্ষণ বাড়াতে বলেছেন, তাহলে নাকি চারপাশ থেকে সিনেমার জন্য অনেক গল্প বের করে আনা যাবে।


পরের অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে চিত্রনাট্য নিয়ে। চিত্রনাট্যকে বলা হয় চলচ্চিত্রের লিখিত রূপ। তবে তা সম্পূর্ণ নয়। কারণ এতে দৃশ্য, চরিত্র, শব্দ, সংলাপ, সমস্যা, উত্তরণ ইত্যাদি থাকলেও গতি, লয়, ছন্দ, আবেগ, অভিনয়, সুর থাকে না। গল্প লেখা শেষ হলে, সেটাকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে সিনেমার ভাষায় লিখতে হয়। প্রতিটি দৃশ্যের আলাদা উদ্দেশ্য থাকে; সব দৃশ্য মিলে হয় সিনেমা। এগুলো যতোই পড়ছি, ততোই ভালোলাগা তৈরি হচ্ছিলো; ভাবছিলাম একটা সিনেমার পেছনে কতো বড়ো কর্মযজ্ঞই না থাকে! অথচ আমরা কতো সহজে সেই সিনেমা দেখি, ভালো-খারাপ মন্তব্য করি! এছাড়া গল্প ও চিত্রনাট্য লেখা নিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে লেখক যেসব উদাহরণ দিয়েছেন, সেগুলো বুঝতে অনেক সহায়তা করেছে। আগে চিত্রনাট্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিলো না। অধ্যায়টি পড়ার পর অনেক বিষয় বুঝতে পেরেছি।


এরপরের অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে ক্যামেরার বিভিন্ন শট্ নিয়ে। শট্ শব্দটি কমবেশি পরিচিত, আমার মতো সিনেমা নিয়ে অজ্ঞ লোকও শটের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু এর ব্যবহার যে এতো বিস্তৃত তা সম্পর্কে জানা ছিলো না। ফলে সিনেমা বানাতে চাইলে অবশ্যই শট্ বোঝা জরুরি। সিনেমার মূল উপাদানই হলো শট্। বলা হয়েছে সিনেমা একটি ভাষা এবং শট্ হলো তার বর্ণ। শটের দুটি ধরন-স্থির ও গতিময়। বইয়ে এগুলো নিয়ে সচিত্র আলোচনা করা হয়েছে। অ্যাকাডেমিক পড়ালেখায় ফটোজার্নালিজম নামে একটি কোর্সে শট্ নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছিলো। তবে এখানে শট্ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে; এই অধ্যায়টি আমার কোর্সেও অনেক কাজে লেগেছে।


পরের অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে অভিনয় নিয়ে। আমরা পর্দায় অভিনয় দেখে মুগ্ধ হই; এর পেছনে যে একজন অভিনয়শিল্পীকে এতো পরিশ্রম করতে হয় তা আমার চিন্তায় ছিলো না। অভিনয়ের জন্য চারপাশের চরিত্রগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন পড়ে। সেইসঙ্গে ক্যামেরা সম্পর্কেও ভালো বোঝাপড়া দরকার। ভালো অভিনয়শিল্পী হওয়ার প্রথম মন্ত্র ভালো পর্যবেক্ষক হওয়া। একজন অভিনয়শিল্পীর কী কী দক্ষতা থাকা প্রয়োজন সেসব নিয়েও এখানে আলোচনা করা হয়েছে। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ১৩-তে আজমেরি হক বাঁধনের কথা শুনেছিলাম। সেই আলোচনার সঙ্গে ভালো অভিনয়শিল্পী হওয়ার এই দক্ষতাগুলোর মিল পেয়েছি। অভিনয়ের তিন ধরনের রীতি নিয়ে এখানে আলোচনা হয়েছে-শাস্ত্রীয়, স্তানিস্লোভস্কি ও অনানুষ্ঠানিক। অভিনয় নিয়েও যে এতো এতো আলোচনা আছে, তা হয়তো এই বই না পড়লে জানতামই না! এই বিষয়গুলো আমার কাছে একেবারে নতুন। এগুলো পড়ে অন্য নানা বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে আমার।


পাঁচ.

একবার সিনেমার শুটিং দেখার সুযোগ হয়েছিলো আমার। সেখানে শট্ নেওয়ার আগে যে শব্দগুলো বলতো, সেটা নিয়ে এবারের অধ্যায়-‘লাইট-সাউন্ড-ক্যামেরা-অ্যাকশন। তবে তখন সিনেমায় এগুলো কীভাবে কাজ করে কিংবা কেনোইবা এই শব্দগুলো এভাবে ব্যবহার করা হয়, সেসবের কিছুই জানতাম না। এখানে এর প্রতিটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। শুটিং দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এগুলো মিলে যাওয়ায় বেশ ভালো লেগেছে। আমি বুঝতে পেরেছি আলো, শব্দ ও ক্যামেরা তিনটি একসঙ্গে কীভাবে কাজ করে দৃশ্য তৈরি হয়। এই আলোচনা শেষ করে লেখক খানিকটা রাগান্বিতভাবেই আরেকটি অধ্যায় শুরু করেছেন বলে মনে হয়েছে-‘পিকনিক আর শুটিং কিন্তু নয় এক। শুরুতে ওই যে বললাম একটু কেমন মনে হলেও এই অধ্যায়ের আলোচনা কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ! কীভাবে শুটিং শিডিউল করতে হয়, ক্যামেরার পেছনে যারা ক্রু আছে তাদের পরিচিতি ও তাদের কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। একটা সিনেমার পেছনে কতো মানুষ যে যুক্ত থাকে, তাদের যে কতো কাজ করতে হয়! এগুলো ভাবলে এখনো আমার বিস্ময় লাগে! অথচ কতো সহজেই দর্শক কোনো সিনেমাকে খারিজ করে দেয়। তবে সবমিলিয়ে আমার যেটা মনে হয়েছে, শুটিং পর্ব ঝামেলা ও পরিশ্রমের হলেও এতে একটা অন্যরকমের আনন্দ আছে, সেটা সৃষ্টির আনন্দ!


সিনেমার এতো এতো শট্ নেওয়ার পর সেগুলো ধারাবাহিকভাবে না সাজালে কোনো গল্পই তৈরি হয় না। সাংবাদিকতাতেও একই কথা খাটে; আপনার কাছে যতো তথ্যই থাকুক, সেগুলো কাঠোমোর মধ্যে সাজাতে না পারলে সংবাদ হয় না। ‘এডিটিং ছাড়া সব শট্ অচল শিরোনামে এই অধ্যায়টি পড়ে আমার এমনটি মনে হয়েছে। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে সংবাদের সঙ্গে সিনেমা সম্পাদনার মিল পেয়ে ভালো লেগেছে। এছাড়া এখানে এডিটরের কাজ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কেউ সিনেমা বানাতে চাইলে বা এডিটর হতে চাইলে, এ বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন।


ছয়.

সিনেমা কীভাবে বানাবো বইটির এগারো অধ্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে একটি সিনেমা নির্মাণের সব প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু শুধু সিনেমা তৈরি হলেই তো হবে না। সেই সিনেমা দর্শককে দেখাতেও হবে। কিন্তু কীভাবে দেখানো হবে? সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে অধ্যায় বারোতে-কোথায় দেখানো হবে তোমার সিনেমা?’ শুরুতেই লেখক বলেছেন, সিনেমা তৈরি করা হয় সিনেমাহলে গিয়ে দেখার জন্য; টেলিভিশন, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনসেটের ছোটো পর্দার জন্য নয়। অথচ দেখেন, আমরা সেই সিনেমা দেখি ফোনসেটে! তাও আবার পাইরেটেড। ইন্টারনেট খরচ ছাড়া সেখানে আর কোনো খরচও নেই। কিন্তু বইজুড়ে সিনেমা নির্মাণ নিয়ে যা পড়লাম, সেখানে এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, সিনেমা নির্মাণে টাকা লাগে। তাহলে এই টাকা ফেরত আসবে কীভাবে? এটা নিয়ে নতুন করে ভাবতে থাকি। সঙ্গে আরো একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়, ছোটোবেলায় সিনেমাহলে গিয়ে বড়ো পর্দায় দেখার আনন্দ তো ফোনের ছোটো মনিটরে পাই না!- অবশ্য এই চিন্তা এর আগে সেভাবে মাথাতেই আসেনি!


পরের অধ্যায়টিও আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। যেখানে বিশ্বের কয়েকজন ক্ষুদে ফিল্মমেকারের কথা আলোচিত হয়েছে। আমার বয়সের বা আমার থেকে অনেক কম বয়সের শিশু-কিশোররাও সিনেমা নির্মাণ করে খ্যাতি অর্জন করেছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষার্থী রাহী আব্দুল্লাহর কথাও বলা হয়েছে সেখানে। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সংখ্যা ২৪-এ তার একটা সাক্ষাৎকারও পড়েছিলাম। সেখানে তিনি বলছেন, ‘সত্যি চলচ্চিত্রকে যতোটা আপন করে নিয়েছি আর ভালোবেসেছি, অন্য কোনো কিছুর ক্ষেত্রেই তা হয়নি। আমি ঘুমাতে গেলেও ফ্রেম নিয়ে ভাবতাম। ডায়ালগের ছন্দ নিয়ে ভাবতাম। কিংবা কোনো পরিস্থিতিকে অন্যভাবে দেখানো যায় কিনা তা ভাবতাম। ... চলচ্চিত্র আমার কাছে আরেকটা ইন্দ্রিয়ের মতো। সিনেমা নিয়ে তার এই একাগ্রতা আমাকে মুগ্ধ করে। ভাবি কোনো কিছু করতে হলে, এ রকম মনোযোগ দিয়েই করতে হয়। তাহলেই সাফল্য আসে।


এই বইয়ে বিভিন্ন অধ্যায়ে লেখক অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে বার বার জোর দিয়েছেন সিনেমা দেখার বিষয়ে। তাই হয়তো অধ্যায় চৌদ্দতে তিনি কিছু সিনেমার তালিকা দিয়েছেন। বেশিরভাগ সিনেমা জগদ্বিখ্যাত নির্মাতাদের। শুধু সিনেমা দেখলেই হবে না, দেখার সঙ্গে নোট নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন। আমারও মনে হয় সিনেমা নির্মাণের জন্য সিনেমা দেখা জরুরি, তাহলে নতুন জ্ঞান তৈরি হয়। তার তালিকায় থাকা কিছু সিনেমা ইতোমধ্যে আমি দেখেও ফেলেছি ‘ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সাপ্তাহিক সিনেমা দেখার আয়োজনে, তবে নোট নেওয়া হয়নি। এখন থেকে নোট নেওয়ার চেষ্টা করবো বলে ঠিক করেছি। এছাড়া সিনেমা নিয়ে কিছু বইয়ের তালিকা দিয়েছেন তিনি। অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না কোন সিনেমা দেখবো বা কোন বইগুলো পড়বো! সেক্ষেত্রে এই তালিকা আমিসহ অনেকের জন্য অত্যন্ত কার্যকর দিকনির্দেশনা।


সাত.

সিনেমা বানাবো কীভাবে নিয়ে লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিলো এর শেষটা করবো কী দিয়ে? কারণ আমার মতো অর্বাচীনের কাছে এটাই সিনেমার প্রথম কোনো বই পড়া। বইটিতে সিনেমা ও তার নির্মাণ নিয়ে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে সচিত্র কিছু জিনিস যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা বুঝতে অনেক সাহায্য করেছে। বইটি ছোটোদের জন্য বলা হলেও আমার কাছে মনে হয়েছে সিনেমা নির্মাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে যেকেনো বয়সের মানুষের জন্যই এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে একটা কথা না বললেই নয়, বইটির দাম অনেক বেশি রাখা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। আমার মতো নতুন পাঠক ও দর্শকের পক্ষে এতো দামে এই বই কেনা প্রায় অসম্ভব।


তারপরও এ রকম একটা কাজের জন্য লেখককে মন থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। জয়তু লেখক ও নির্মাতা সৈয়দা নিগার বানু!

 

বইয়ের নাম     : সিনেমা কীভাবে বানাবো

লেখক           : সৈয়দা নিগার বানু

প্রকাশক         : আনন্দপাঠ, ঢাকা

প্রকাশকাল      : এপ্রিল ২০২৩

প্রচ্ছদ            : মোস্তাফিজ কারিগর

পৃষ্ঠাসংখ্যা          : ১১২

মূল্য                  : ৮০০ টাকা

 

লেখক : জেরিন আল জান্নাত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।


Jerinaljannat876@gmail.com

https://www.facebook.com/jerin.al.jannat.2025

 

তথ্যসূত্র

১. আব্দুল্লাহ, রাহী; ‘চলচ্চিত্র আমার কাছে আরেকটা ইন্দ্রিয়ের মতো; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার, সংখ্যা ২৪, জানুয়ারি ২০২৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ১৯৫-১৯৬।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন