তাসনিয়া মিন্নি
প্রকাশিত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
নির্মাতা বিমল ও কানাগলির শোষিতের জীবনগাঁথা
তাসনিয়া মিন্নি

ভেবে দেখেছো কী
ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের আগমন ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রায় মধ্যগগনে। বিজ্ঞানের ক্রম উন্মোচনে এখানে চলচ্চিত্র আসে; আর বুর্জোয়া সমাজ-অর্থনীতির নিয়মে অচিরেই তা বাণিজ্যে-পণ্যে পরিণত হয়। আবার পরবর্তী দুই দশকেই তা শিল্প বা আর্ট হিসেবেও আকার নিতে থাকে। হয়তো ঔপনিবেশিকতার কারণেই জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের এ আগমন। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুলাই মুম্বাইয়ে প্রথম চলচ্চিত্র দেখানো হয়। ধীরে ধীরে শুরু হয় সারাদেশে তার প্রদর্শন। প্রথমদিকে এসব চলচ্চিত্রের প্রদর্শন করতো কেবল ইংরেজরা। এ দেখে এই সময়ই চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন ঢাকার মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন। ব্রিটিশ নাগরিক স্টিফেন্স-এর নিয়ে আসা সব চলচ্চিত্রই দেখতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে নিজেই শুরু করেন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। পরে অবশ্য হীরালাল শুধু চলচ্চিত্র দেখিয়েই ক্ষান্ত হননি, নির্মাণেরও চেষ্টা করেন; আর এক্ষেত্রে সফলও হন। পরে হীরালালের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে ভারতবর্ষে আরো অনেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণে আসেন। দাদাসাহেব ফালকে, ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে ভারতীয় চলচ্চিত্রে সোনালি সময় বলে যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা অবশ্যই ৫০ ও ৬০-এর দশক। এ সময় সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, গুরু দত্ত, মৃণাল সেন ও রাজ কাপুরের মতো কিংবদন্তিরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তবে এরা বাদেও আরো একজন এই স্বর্ণালি যুগের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। তিনি বিমল রায়। প্রথম ভারতীয় হিসেবে দো বিঘা জমিন দিয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবও জয় করেন তিনি। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে নব্য-বাস্তববাদ ধারায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও দেশ-বিদেশে সমালোচকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা পায়। তবে কান-এ সেটাই বিমলের শেষ যাত্রা ছিলো না। পরে ওই উৎসবে প্রদর্শিত হয় বিমলের আরো দুটি চলচ্চিত্র বিরাজ বৌ (১৯৫৫) ও সুজাতা (১৯৬০)।
জীবনের ৩০টি বছর বিমল সঁপে দিয়েছিলেন কেবল চলচ্চিত্রেই। অতি সাধারণ গল্পকেও তিনি রূপ দিয়েছেন চলচ্চিত্রিক আঙ্গিক ও বাঙালির আবেগে অসাধারণ করে। কম সময়ে মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রি থেকে একের পর এক বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রের জন্ম দিয়েছেন তিনি। বিমল রায় বাংলা গল্প ও উপন্যাসের স্বাদ বহু অবাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন সেইসব হিন্দি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। দো বিঘা জমিন-এর কাহিনি নেওয়া হয় সলিল চৌধুরীর ‘রিকশাওয়ালা’ গল্প থেকে। এছাড়াও শরৎচন্দ্রের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন পরিণীতা, বিরাজ বৌ ও দেবদাস।
একজন বিমল রায়
ঢাকার ছেলে বিমলের জন্ম ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই সূত্রাপুরের এক জমিদার বাড়িতে। জমিদার বাবার ছেলে হিসেবে আজকের পুরান ঢাকায় ভালোই কাটছিলো বিমলের শৈশব। জীবনে প্রথম বাধা আসে কৈশোরের মাঝামাঝি, যখন বিমল কলেজের ছাত্র। ওই সময় বাবাকে হারান তিনি। তারপর বাবার সম্পদ নিয়ে শুরু হয় নানা জটিলতা; জমিদারির এস্টেট ম্যানেজারের কাছে একপর্যায়ে সর্বস্বান্ত হয় তার পরিবার। নিরুপায় বিমল বেঁচে থাকার তাগিদে মা ও ছোটো ভাইকে নিয়ে চলে যান কলকাতায়।
জমিদারের ছেলে হিসেবে কিছু সুবিধা ব্যক্তি জীবনে পেয়েছিলেন বিমল। সেই সূত্রে ছোটোবেলাতেই ক্যামেরার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারপর থেকেই ক্যামেরার প্রতি একটা ঝোঁক তৈরি হয় বিমলের। সেই ঝোঁক কলকাতায় গিয়ে পেশা হিসেবে তার কাজে লেগে যায়। ঘটনাক্রমে পরিচয় হয় বিখ্যাত নির্মাতা প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে। ছবি তুলতে জানার কারণে কাজ পেয়ে যান বড়ুয়ার দলে। চলচ্চিত্রের প্রচারের জন্য ছবি তুলতে শুরু করেন বিমল। কাজে আগ্রহ দেখে কিছুদিনের মধ্যেই নির্মাতা নীতিন বোস তাকে সেই সময়ের বিখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নিউ থিয়েটার্সে ডেকে নেন সহকারী ক্যামেরাম্যান হিসেবে। স্থিরচিত্র থেকে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে বিমলের। এরপর এই পথে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।
বিমলের জীবনে বড়ো সুযোগ আসে আরো কিছু সময় পরে, ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। প্রমথেশ বড়ুয়ার দেবদাস-এ সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজের সুযোগ পান তিনি; সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাবও পান। এরপর নিউ থিয়েটার্সের অনেক চলচ্চিত্রে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজের সুযোগ পান তিনি। প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি (১৯৩৭), মায়া (১৯৩৬), বড় দিদিতেও সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন বিমল। এই সুযোগগুলো বিমলের জীবনে নতুন স্বপ্নের বুনন শুরু করে। ৩০ দশকের শুরুতে ব্রিটিশ সরকারের হয়ে How Kerosene Tins Are Made I Grand Trunk Road নামে দুটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন তিনি। কিন্তু শুধু সিনেমাটোগ্রাফি দিয়ে কেমন জানি মন ভরছিলো না বিমলের। স্বপ্নের পূর্ণতা আসে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে। যে নিউ থিয়েটার্স তাকে ফটোগ্রাফার থেকে সিনেমাটোগ্রাফার করেছিলো, সেই তাকে নির্মাতা হওয়ার সুযোগ করে দেয়। নিউ থিয়েটার্সের প্রযোজনায় বিমলের পরিচালনায় ১৯৪৪-এ মুক্তি পায় তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উদয়ের পথে। প্রথম চলচ্চিত্রেই সমালোচকদের নজরে আসেন তিনি। পরের বছর বিমল উদয়ের পথে হিন্দি ভাষাতেও হামরাহি নামে নির্মাণ করেন।
দেশভাগের পর অশোক কুমারের উদ্যোগে বিমল রায় বোম্বে টকিজ-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পান। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিতে ভুল করেননি তিনি। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বোম্বে টকিজ থেকে বিমল নির্মাণ করেন মা। লীলা চিটনিস, ভারত ভূষণ ও শ্যামা অভিনীত এই চলচ্চিত্রের গল্প ছিলো একেবারেই গৎবাঁধা মেলোড্রামা; কিন্তু চলচ্চিত্রটি উতরে গিয়েছিলো বিমলের হাতের ছোঁয়াতেই। পরের বছর শরৎচন্দ্রের ‘পরিণীতা’ উপন্যাস অবলম্বনে পরিণীতা (১৯৫৩) নির্মাণ করেন বিমল।
এরপর ‘বিমল রায় প্রোডাকশন’ নামে নিজেই প্রযোজনা সংস্থা খুলে বসেন বিমল। এই প্রযোজনা সংস্থারই প্রথম চলচ্চিত্র ছিলো দো বিঘা জমিন। পরিণীতা ও দো বিঘা জমিন নির্মাণের কাজ বিমল একসঙ্গেই শুরু করেছিলেন। পরিণীতা ছিলো বড়ো বাজেটের চলচ্চিত্র, আর দো বিঘা জমিন কম পয়সায় কোনো রকম কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো। তবে পরিণীতা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা না হলেও দো বিঘা জমিন ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। যার মধ্য দিয়েই ভারত উপমহাদেশে নব্য-বাস্তববাদ ধারার জন্ম ইতিহাস অনেকখানি পাকাপাকি হয়।
এর পরে বিমল একে একে শরৎচন্দ্রের গল্প নিয়ে হিন্দি ভাষায় নির্মাণ করেন বিরাজ বউ (১৯৫৪) ও দেবদাস (১৯৫৫), বাপ-বেটি (১৯৫৪), নৌকরি (১৯৫৪)। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত প্রমথেশ বড়ুয়ার দেবদাস দিয়েই সিনেমাটোগ্রাফারের পাশাপাশি পরিচালনায় বিমলের হাতেখড়ি হয়েছিলো। হয়তো দেবদাস নিয়ে তার কোনো অপ্রাপ্তি কিংবা ভিন্ন চিন্তা ছিলো। সেটা পূরণ করতেই ২০ বছর পর বিমল নিজেই নির্মাণ করেন দেবদাস; এবার অবশ্য বাংলায় নয় হিন্দিতে। এসব চলচ্চিত্রে বিমলের শিল্পী সত্তার পূর্ণ পরিচয় থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে খুব একটা সফল হয়নি। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করেন মধুমতী ও ইয়েহুদি। বাণিজ্যিকভাবে অবশ্য এ দুটি চলচ্চিত্রই ছিলো সুপারহিট। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নাকি একটি অতি সাধারণ গল্প বিমলকে দিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। অনেকে মনে করে, ঋত্বিকের হয়তো কৌতুহল ছিলো বিমল আদৌ সে গল্প দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন কিনা, সেটা দেখা। বিমল অবশ্য এতে ব্যর্থ হননি। ওই সাধারণ গল্প দিয়েই অসাধারণ মধুমতী তৈরি হয় বিমলের কুশলী হাতে। সাধারণ গল্প থেকে নির্মিত মধুমতীর মূল আর্কষণ ছিলো গান; যেগুলোর সুর দিয়েছিলেন আরেক বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী। নিছক বিনোদনের জন্য নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ক্যামেরার কাজ ও সুরের জন্য হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন পায়। ৫০ বছর পর মধুমতী আজও একইভাবে চর্চিত।
বাণিজ্যিক সাফল্যের চূড়া থেকে নেমে এসে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে বিমল আরেকবার তার নব্য-বাস্তববাদী সত্তার পরিচয় রাখেন সুজাতায়। এখানে তিনি সমাজে প্রচলিত ‘জাতের নামে বজ্জাতি’র রূপ উন্মোচন করেন। এরপর বিমলের শিল্পী সত্তার এক নতুন দিকের পরিচয় পাওয়া যায় পরখ (১৯৬০) এ। মধুমতী, সুজাতা ও পরখ দিয়ে ফিল্মফেয়ারের সেরা নির্মাতার দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক করেন বিমল। প্রথমটির শুরু ছিলো ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে দো বিঘা জমিন, ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে পরিণীতা ও ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বিরাজ বউ। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সাগরিকা চলচ্চিত্রটি অবলম্বনে বিমল নির্মাণ করেন হিন্দি প্রেমপত্র। তবে বাংলায় সাগরিকা সুপারহিট হলেও প্রেমপত্র খুব একটা ব্যবসা করেনি।
বিমল পরিচালিত শেষ কাহিনিচিত্র বন্দিনী (১৯৬৩)। এরপর তিনি বেশকিছু চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনা ছাড়াও বিমল Immortal Stupa (1961), Life and Message of Swami Vivekananda (1964) ওGautama The Buddha (১৯৬৭) সহ বেশকিছু তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তবে তিনি Amrit Kumbhও The Mahabharata নামের দুটি তথ্যচিত্রের কাজ সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। বেশ কিছুদিন ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকার পর ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি ৫৬ বছর বয়সে জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেন বিমল রায়।
‘বিমলদা জীবনযাপন করতেন না, সিনেমাযাপন করতেন’
বিমল রায় চলচ্চিত্রের সঙ্গে এমনভাবে সময় অতিবাহিত করতেন, যেনো এর বাইরে আর কিছুই তার নেই। সবকিছু ভুলে মিশে যেতেন কাজের সঙ্গে। তিনি নিজে যেমন কাজে ডুবে থাকতেন অন্যকেও ডুবিয়ে রাখতেন। তার সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করতেন কবি, লেখক, গীতিকার, চলচ্চিত্রনির্মাতা ও সংলাপ লেখক গুলজার। বিমলের সহকারী হিসেবে গুলজার চলচ্চিত্র জগতে কর্মজীবন শুরু করেন। গীতিকার হিসেবে তার বন্দিনী (১৯৬৩)-তে তিনি গান লেখেন প্রথম। এখান থেকেই শুরু, তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। পেয়েছেন অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, দাদাসাহেব ফালকেসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। চলচ্চিত্রে বিমলের ডুবে থাকা নিয়ে গুলজারের মন্তব্য ছিলো এমন-‘বিমলদা জীবনযাপন করতেন না, সিনেমাযাপন করতেন’।১
সারাজীবন চলচ্চিত্রের সঙ্গে থাকা এই মানুষটি সম্মান ও মর্যাদাও পেয়েছেন অনেক। মস্কোয় ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিমল অন্যতম জুরি ছিলেন। তিনি কিছুকাল ফিল্ম গিল্ড অফ ইন্ডিয়ার সহ-সভাপতি এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির সভাপতি ছিলেন। চিত্রগ্রাহক থেকে নির্মাতা পরে প্রযোজক হয়ে ওঠা বিমলের কাজের সঠিক মূল্যায়ন আজও হয়েছে কিনা বলা মুশকিল। তবে তার কাজে সামাজিক দায়বদ্ধতার ছাপ সুস্পষ্ট। বাংলা গল্প-উপন্যাসের প্রতি বিমলের গভীর আগ্রহ দেখেই সেটা বোঝা যায়। এ কারণেই হয়তো তিনি বার বার চাইতেন তার চলচ্চিত্রে বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য উঠে আসুক। পলাশীর যুদ্ধ, শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের জীবন নিয়ে বিমল তথ্যচিত্র বানাতে চেয়েছিলেন। নেহরুর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ ও তারাশংকরের ‘মহাশ্বেতা’র কাহিনি নিয়েও চলচ্চিত্র বানানোর ইচ্ছা ছিলো তার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিমল তা নির্মাণ করে যেতে পারেননি। যা পেরেছেন এর মধ্যে অঞ্জনগড়, পরিণীতা, দো বিঘা জমিন, দেবদাস, সুজাতা, বন্দিনী, কাবুলিওয়ালা এখনো বলিউডের ক্ল্যাসিক পর্যায়ে পড়ে। তাই ভারতীয় চিত্রসমালোচক থেকে সাধারণ চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক, সব স্তরের মানুষের চেতনায় বা অচেতনে বিমল কোথাও না কোথাও ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনও।
নিউ থিয়েটার্স-এ নতুন জীবন
১৯৩০-এর দশকের প্রথম দিক। সমগ্র বিশ্ব তখন চলচ্চিত্র নিয়ে মেতে উঠেছে। সেসময় বাংলাও তা থেকে খুব একটা পিছিয়ে ছিলো না। যদিও বাংলায় চলচ্চিত্র নামক মাধ্যমটি তখনো ভালোভাবে দাঁড়াতে শেখেনি; সবে একটি-দুটি করে চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে শুরু করেছে। নির্বাক যুগের শেষ ও সবাক যুগের সবে শুরু, এই সন্ধিক্ষণে চলচ্চিত্রের পথে পা বাড়ালেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার। যিনি সবার কাছে বি এন সরকার নামে পরিচিত। চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি প্রথম পা রাখলেন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ‘চিত্রা’ আর ‘নিউ সিনেমা’ নামে দুটো প্রেক্ষাগৃহ তিনি নির্মাণ করেন। কিন্তু সেখানে দেখানোর জন্য চলচ্চিত্রের যোগান তেমন ছিলো না। তাই প্রমথেশ বড়ুয়া ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে বি এন রায়কে উদ্ধুদ্ধ করে দুজনে মিলে স্থাপন করলেন ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্মক্রাফট’ নামে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। পরে তারা এই কোম্পানির নাম পাল্টে রাখেন নিউ থিয়েটার্স।
নিউ থিয়েটার্স থেকেই নির্মিত হয় প্রমথেশ বড়ুয়ার বিখ্যাত চলচ্চিত্র দেবদাস (১৯৩৫)। আগেই বলেছি, এই চলচ্চিত্রে সিনেমাটোগ্রাফারের কাজ করেন বিমল। এরপর টানা ১০ বছর সিনেমাটোগ্রাফারের কাজ করে নিজেকে তিনি তৈরি করেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। প্রমথেশ বড়ুয়া ছাড়াও নিউ থিয়েটার্সের আরো অনেক নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেন তিনি। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণে দীর্ঘদিনের একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিলো বিমলের। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রথম নির্মাণ করেন উদয়ের পথে (১৯৪৪)। শ্রেণিসংগ্রামভিত্তিক বলিষ্ঠ চলচ্চিত্র উদয়ের পথে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছিলো ওই সময়ের চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছ থেকে। পরের বছর চলচ্চিত্রটির হিন্দি সংস্করণ হামরাহী নির্মাণ করেন তিনি। ৪০ দশকের শেষে দেশভাগের পর নিউ থিয়েটার্সের প্রতিপত্তি কমতে থাকে।
এই সময় অশোক কুমারের উদ্যোগে মুম্বাইয়ে হিমাংশু রাই-দেবিকা রানীর প্রতিষ্ঠিত ‘বম্বে টকিজ’-এ যোগ দেন বিমল রায়। বিমল রায় সম্পর্কে বি এন সরকারের মূল্যায়ন এমন-‘নিউ থিয়েটার্স ছেড়ে অনেকেই অন্যত্র ছবি তৈরি করেছেন, কিন্তু বিমলবাবুই একমাত্র যিনি এন টি-র বাইরে ছবি করে সুনাম ও খ্যাতি পেয়েছিলেন।’২ বিমল রায়ও অবশ্য বি এন সরকার ও নিউ থিয়ের্টাসকে আজীবন স্মরণ করেছেন চরম কৃতজ্ঞার সঙ্গে। বিমল রায় বলতেন, ‘তার এই খ্যাতির শিখরে উঠার পথ দেখিয়েছিলো নিউ থিয়েটার্সই।’ তিনি আরো বলেন, ‘বি এন সরকার যদি সেসময় আমায় সুযোগ না দিতেন তা হলে হয়তো আমাকে ক্যামেরায় লেন্সে চোখ লাগিয়েই বাকি জীবন কাটাতে হতো।’৩
পাশাপাশি বিমল-সত্যজিৎ
আজকে যে তরুণ নির্মাতারা কান জয়ের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের অনেকেই হয়তো সত্যজিৎ রায়ের অর্জনের কথা জানেন। কান উৎসবে আমাদের উপমহাদেশীয় অর্জনের কথা বললে পথের পাঁচালি মানবিক দলিল (১৯৫৬) হিসেবে পুরস্কার প্রাপ্তির কথাই শোনা যায় বেশি। অথচ উপমহাদেশের প্রথম কান জয় করে বিমলের দো বিঘা জমিন। সেই ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে কান উৎসব জয় করেছিলো দো বিঘা জমিন; পথের পাঁচালিরও দুই বছর আগে। চলচ্চিত্রটি পেয়েছিলো প্রি ইন্টারন্যাশনাল বা সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার। বিমলের অর্জন সেবারই শেষ নয়। এই কান উৎসবেই প্রদর্শিত হয়েছে বিমলের আরো দুটো চলচ্চিত্র। দুটোই প্রতিযোগিতা বিভাগে-বিরাজ বৌ (১৯৫৫) ও সুজাতা (১৯৬০)।
যে নব্য-বাস্তববাদের প্রভাবের কথা পথের পাঁচালি সম্পর্কে বলা হয়, সেই প্রভাবে সরাসরি প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র কিন্তু দো বিঘা জমিন। এ তথ্যও আজ অনেকের কাছে নতুন মনে হতে পারে। কিন্তু এটাই সত্যি। বিমল রায় সম্পর্কে স্বয়ং সত্যজিতের ভাষ্য এমন-
তার প্রথম চলচ্চিত্র উদয়ের পথে, এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্য থেকে কাঁটাগাছগুলি সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন বিমল রায়। চলচ্চিত্রের জন্য সম্পূর্ণভাবে উপযোগী ছিলো এমন বাস্তববাদ প্রকাশ। তিনি নিঃসন্দেহে একজন অগ্রগামী মানুষ ছিলেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি নিজের ভিতরের কথাগুলো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন, তার নির্মিত দো বিঘা জমি যা আজীবন ভারতীয় সিনেমার শীর্ষস্থান দখল করে থাকবে।৪
সত্যজিৎ রায় নাকি তার পথের পাঁচালি নির্মাণের আগে বাইসাইকেল থিভস্ অসংখ্যবার দেখেছেন। আবার একই রকম তথ্য পাওয়া যায় বিমল রায় সম্পর্কেও; তিনিও নাকি এই চলচ্চিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নির্মাণ করেন দো বিঘা জমিন। তাই স্বাভাবিকভাবেই দো বিঘা জমিন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উঠে আসে বাইসাইকেল থিভস্ ও পথের পাঁচালির প্রসঙ্গ।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস নতুন দিকে মোড় নেয় নিও রিয়েলিজম বা নব্য-বাস্তবতাবাদ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এই আন্দোলনের পুরোধা ভিত্তোরিও ডি সিকা নির্মাণ করেন বাইসাইকেল থিভস্। চলচ্চিত্রের কাহিনির সময়কাল ১৯৪৮, দেশ ইতালি। তখন কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। পরাজিত শক্তি ইতালি তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ দুর্বল। চারদিকে বেকার মানুষের আনাগোনা। কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছোটাছুটি করছে এদিক-সেদিক। এই রোম শহরের এক নগণ্য শ্রমিক একটা কাজ পায়, যে কাজে তার শর্ত থাকে একটা বাইসাইকেলের। বহু কষ্টে সেই সাইকেল জোগাড় হলেও কাজ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে সেটা চুরি হয়ে যায়। ছেলেকে নিয়ে রোমের রাস্তায় রাস্তায় তিনি সেই সাইকেল খুঁজে বেড়ান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও সেটার সন্ধান মেলে না। নিরুপায় হয়ে তিনি একটা সাইকেল চুরির চেষ্টা করে হাতেনাতে ধরা পড়েন। এরপর ছেলের সামনেই বাবাকে মারধর করা হয়। চলচ্চিত্রের এই ধারায় স্টুডিওর বাইরে কম বাজেট, অপেশাদার অভিনেতা; আরোপিত কোন সেট, লাইটের ব্যবহার ছিলো না।
এই ধারাকেই বুকে নিয়ে সত্যজিৎ নির্মাণ করেন তার পথের পাঁচালি। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অপু ও তার পরিবারের জীবনই পথের পাঁচালির মুখ্য বিষয়। অপুর বাবা পুরোহিত হরিহর রায়। পুরোহিত ও কবিরাজি করে তার আয় সামান্য, তবে তিনি লেখাপড়া জানেন। তাই কিছু যাত্রাপালা লিখে আরো উপার্জনের স্বপ্ন দেখেন। পরিবারের তীব্র অর্থ সঙ্কটের সময়েও তিনি তার প্রাপ্য বেতন আদায়ে মালিককে তাগাদা দিতে পারেন না। হরিহরের সামান্য আয়ে যখন আর সংসার চলে না, তখন তিনি শহরে যান কাজের সন্ধানে। কাজ খুঁজে ফিরে আসতে তার কয়েক মাস সময় লেগে যায়। এতদিনে বদলে গেছে অনেক কিছু। মেয়ে দুর্গা মারা গেছে, বর্ষায় ভেঙে গেছে ঘরবাড়ি। তাই একপর্যায়ে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয় অপুদের পরিবার।
অন্যদিকে দো বিঘা জমিন-এর কাহিনি এগিয়েছে দুই বিঘা জমিকে কেন্দ্র করে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শম্ভু মাহাতো। স্ত্রী-সন্তান ও বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ছোটো সংসার শম্ভুর। কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা শম্ভুর সম্পদ বলতে কেবল দুই বিঘা জমি। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ ও দিন-রাত পরিশ্রম করে ওই দুই বিঘা জমিতে ফসল ফলান শম্ভু। সেই যুদ্ধপথকে আরো বন্ধুর করতে শম্ভুর সামনে আসে স্থানীয় এক জমিদারের কারখানা তৈরির স্বপ্ন। জমিদারের স্বপ্ন আর শম্ভুর বেঁচে থাকার মধ্যে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় ওই দুই বিঘা জমি। কারণ, জমিদারের মোট জমির মাঝখানে একটা অংশে পড়েছে শম্ভুর জমিটা।
শম্ভু যেহেতু জমিদারের কাছ থেকে আগে বেশ ধার-দেনা করেছেন। তাই জমিদার ভাবে খুব সহজেই জমি বিক্রি করতে রাজি হয়ে যাবেন শম্ভু। কিন্তু শম্ভু যখন জমি বিক্রি করতে রাজি হন না, তখনই শুরু হয় বিপত্তি। এই জমি বাঁচাতেই শম্ভুকে গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে হয়। কিন্তু শহরে গিয়েও শেষরক্ষা হয় না শম্ভুর।
বাস্তববাদের পথে নতুন নন সত্যজিৎ
ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাস্তবতা এসেছে ধাপে ধাপে এবং ক্রমান্বয়ে। কিন্তু সত্যজিৎ রায় ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই পরম্পরাকে কেনো জানি বিশেষ স্বীকার করেননি। বিভিন্ন নির্মাতার এদিক-ওদিক প্রশংসা করলেও সত্যজিৎ তার চলচ্চিত্র জীবনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের কোনো ভূমিকার কথাই বলেননি। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে সত্যজিৎ আসলে ভারতীয় বাস্তবজাত। কারণ, পথের পাঁচালিতে এমন কিছুই নেই যা বিচ্ছিন্নভাবে, খণ্ডিতভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্রে আগে দেখা যায়নি। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যে বাস্তববাদের কথা পথের পাঁচালি সম্পর্কে বলা হয়, তার পূর্বাভাস ১৯৪০-এর দশকে, এমন কি ১৯৩০-এর দশকেই ছিলো। আমরা যদি ১৯৩০-এর দশক থেকে পর পর সাজিয়ে যাই, তাহলে দেখবো এক ধরনের বাস্তববাদী ধারা পথের পাঁচালির আগেই ভারতীয় চলচ্চিত্রে এসেছে। নির্বিশেষ মানবিকতা এ চলচ্চিত্রের গোড়া থেকেই ছিলো, বিশেষত জাতিধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ও প্রতিবাদ।
১৯৪১-এর নয়া সংসার এ ধারার সূত্রপাত করলো, খাজা আহমেদ আব্বাসের হাতে। এর পরে একে একে আসে উদয়ের পথে (১৯৪৪), ধরতি কি লাল (১৯৪৬), নীচানগর (১৯৫০), তথাপি (১৯৫০), ছিন্নমূল (১৯৫০), নাগরিক (১৯৫২), দো বিঘা জমিন (১৯৫৩), মুন্না (১৯৫৪), এ চলচ্চিত্রগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পথের পাঁচালি একাধিক উপাদানকেই চলচ্চিত্রে এনেছিলো। গান ছাড়া ছবির দৃষ্টান্ত ছিলো মুন্না-অনেকের মতে, এ ধরনের প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র এটি।৫
১৯৫০-এ নির্মিত নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল, বাংলা চলচ্চিত্রের বাস্তববাদী ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। চলচ্চিত্রে অভিনয় করেনি এমন মানুষদের সেখানে পর্দায় দেখা যায়। এ চলচ্চিত্রে কোনো পেশাদার অভিনেতা ছিলো না। কোনো মেকআপ নয়, কোনো আউট-টেক, গান নয়; ছিলো আড়াল করা ক্যামেরা, ছিলো আঞ্চলিক ভাষা। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, পথের পাঁচালি’র অভিনবত্ব বলতে সাধারণভাবে যা বলে, তার বেশিরভাগই ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের আগে ভারতীয় চলচ্চিত্রে পাওয়া যায়। ঋত্বিক ঘটক বাংলার তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ত্রিশের দশকের বাস্তববাদী ধারার পরম্পরাকে স্বীকার করেছেন। এর দুর্বলতাকে, অবাস্তবতা সত্ত্বেও, এই ধারার যথার্থ তিনি মানেন।৬ তাইতো বাইসাইকেল থিভস্ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঋত্বিক বলেন, ‘একটা বাইসাইকেল থিফ তৈরি হয় পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে ঘনযোগ সুত্রের মাধ্যমেই-চমক লাগানোর চেষ্টার দ্বারা নয়। আমাদের বাইসাইকেল থিফ পথেঘাটে ছড়িয়ে আছে। শ্রদ্ধা নিয়ে খুঁজলে দেখব, তার ইতালীর ঘটনার সঙ্গে, গল্পের সঙ্গে কোনও যোগই নেই, অথচ তার মতোই দেশের মরমের কথাটি সে বলছে।’৭ ঋত্বিকের এ লেখা প্রকাশিত হয় ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে। এর এক বছর পরেই বিমল রায় লেখেন, ‘... আমরা সুনিশ্চিন্তভাবে বলতে পারি যে আমাদের চলচ্চিত্র বাস্তববাদের পথে অনেকখানি এগিয়ে গেছে-বাস্তবতার অনুকূল আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে।’৮
তবে এ যাবৎ যে বাস্তববাদী, নব্য-বাস্তববাদী উপাদান ভারতীয় চলচ্চিত্রে ছড়িয়ে ছিলো, তার থেকে পথের পাঁচালি কয়েকটি দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইতালির নব্য-বাস্তববাদ থেকেও দূরে। এর আগের সব চলচ্চিত্রের বিষয় বড়লোক-গরীব, মালিক-শ্রমিক, জমিদার-চাষীর দ্বন্দ্বের প্রত্যক্ষ শ্রেণিসংঘাত-প্রায় সব চলচ্চিত্র শেষ পর্যন্ত ছিলো মিলনাত্মক। কিন্তু পথের পাঁচালি ও দো বিঘা জমিন-এর সমাপ্তি নানার্থব্যঞ্জক। পথের পাঁচালিতে একদিকে ছিন্নমূল হয়ে একটি পরিবারের ভেসে যাওয়া, অন্যদিকে ওই ভেসে যাওয়ার মধ্যেও ভবিষ্যতের আশা। তেমনি দো বিঘা জমিন-এর মধ্যেও একটি বিষাদ আছে : কাহিনির প্রথমে ফেটে যাওয়া জমি ও শেষে হারানো জমি-একটা ট্র্যাজেডিকেই নিয়ে আসে। প্রথম দৃশ্যের ফেটে যাওয়া জমি আর সবুজে ভরে চাষীকে বাঁচায় না। জমিদারের ঋণ শোধ করতে শম্ভু ও কানাইয়ার কলকাতায় যাওয়া, রিকশা টানা, মারাত্মক আহত হওয়া, শেষ পর্যন্ত কারখানা তৈরির জন্য দুই বিঘা জমি হারানো, এক কঠোর বাস্তবকে তুলে ধরে। যা চলচ্চিত্রটিকে ভারতীয় বাস্তববাদী চলচ্চিত্রের পরম্পরায় এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত করে তোলে-এর পরের ধাপই যেনো পথের পাঁচালি।
জমি নেই তার জমিদারি
শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’
কহিলাম আমি, ‘তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই’
‘চেয়ে দেখ মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই।’
শুনি রাজা কহে, ‘বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা ৯
কবিতাটির সময় ছিলো সামন্তবাদী জমিদার-জোতদারের। সেকালে ‘রাজা’দের বাগানকে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সমান করার বিলাসী খেয়াল পূরণের জন্য ‘উপেনদের’ জমি এভাবে গ্রাস করা হতো। সামন্তবাদী-উপনিবেশবাদী সমাজব্যবস্থার বদল হয়েছে। গোটা বিশ্বে এখন পুঁজিবাদের রাজত্ব, অনেকে বলে সেটা ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে। কিন্তু তার পরও জমি নিয়ে ‘জমিদারি’ খেলা শেষ হয়নি। এই খেলা কেবল নতুন রূপ পেয়েছে। পুঁজিবাদের আর্শীবাদে তৈরি হয় শহর। আর জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে কৃষক হয় শ্রমিক। গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে আবাস বদলালে কী আর ভাগ্যের বদল হয়! পুঁজি যেমন তাদের গ্রাম থেকে, জমি থেকে উচ্ছেদ করে; পুঁজি তেমনই তাদেরকে শহর থেকেও উচ্ছেদ করে। দেশ, সরকার, রাষ্ট্রও সর্মথন করে পুঁজির এই দৌরাত্ম্য। এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে আমাদের চারপাশে। তবে তাদের চরিত্রটা এতো পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে না সবার চোখে, কারণ সরকার যা করে সবকিছুতেই লাগানো থাকে জনকল্যাণের লেবেল। যেমনটা হয়েছে কর্ণফুলিতে, নর্মদা নদীতে বাঁধ কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির সময়ও।
রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কর্ণফুলি নদী প্রবাহে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুমান করে এক আদিবাসী শিক্ষার্থী এর বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করে। খুব দ্রুত পাহাড়ের ছাত্রসমাজ বাঁধ নির্মাণ বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। একের পর এক মামলা ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দমিয়ে দেওয়া হয় আন্দোলন। ফলে খুব সহজেই পাহাড়িদের জনমতকে উপেক্ষা করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। এবং ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শেষও হয়। ফলাফল যা হবার তাই হলো, ডুবে যায় পাহাড়ের ৫৪ হাজার একর উর্বর জমি। উচ্ছেদের শিকার হয় লাখো মানুষ। পানিতে তলিয়ে যায় অনেক জনপদ। হাজার হাজার পাহাড়ির রক্ত ও চোখের জলে তৈরি হয় কাপ্তাই হ্রদ। তবে এই কাপ্তাই হ্রদ এখন আর শুধু পাহাড়িদের দুঃখ নয়। এটিই বর্তমানে হয়ে দাঁড়িয়েছে সারা চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতারও কারণ। যে কারণে এখন চট্টগ্রামের দুঃখ নামে পরিচিত কাপ্তাই হ্রদ।
ভারতের মরুভূমি অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পশু-পাখি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় নর্মদা নদী বাঁধ প্রকল্প। নর্মদা নদীর বিভিন্ন অংশে তৈরি করা হবে তিন হাজার একশো ৭৫টি ড্যাম। এই ড্যাম নির্মাণের ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমি হারিয়ে যেতো পানির নিচে। এক লক্ষের উপর পরিবার হতো বাস্তুহারা। ফলে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে মেধা পাটকরের নেতৃত্বে ভারত জুড়ে শুরু হয় নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, এই চুক্তি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় সরকার।
২০১০ খ্রিস্টাব্দে এসে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন রামপালে দুটি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির চুক্তি করে। এই প্রকল্প হবে বাংলাদেশের পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মাত্র ৯-১৩ কিলোমিটারের মধ্যেই। এই প্রকল্প সুন্দরবন ও সংলগ্ন মানুষ, জনপদ ও বনাঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর এবং ভৌগোলিকভাবে বেমানান ও অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক। দেশজুড়ে চলছে আন্দোলন প্রতিবাদ। তবুও সরকার এই প্রকল্পে থেকে সরে আসতে নারাজ। দো বিঘা জমিন-এর শম্ভু এই হাজারো ঘর-বাড়ি-জমি হারানো মানুষের প্রতিনিধি। হাজার হাজার বছর ধরে পুঁজির হাতে এভাবেই সর্বশান্ত হয় শম্ভুরা।
‘আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি’
দো বিঘা জমিন-এর ৩১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে শম্ভু শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে তিন মাসের জন্য কলকাতা শহরে রওনা দেন। পরিবারের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, বৃদ্ধ বাবা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে মাটির ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে যখন শম্ভু এগিয়ে চলেন, তখন সেই রাস্তা যেনো তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে আরো দৃশ্যমান করে। সঙ্গে চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীত মনে করিয়ে দেয়, অর্থহীন মানুষ আসলেই কতো অসহায়। একসময় সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে, তিনি যখন অচেনা শহরে ছেলেকে নিয়ে প্রবেশ করেন, তখন ব্যস্ত শহরে বেসামাল হয়ে পড়েন শম্ভু। রাস্তায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে তিনি যখন দেখেন, মাথার পাশ থেকে চোর তাদের শেষ সম্বল ঝোলাটাও নিয়ে গেছে, তখন তাকে বলতে শোনা যায়, ‘হায়রে শহর, তুই কিছু দেসইনি, উল্টো সব কেড়ে নিলি।’ চলচ্চিত্র খানিক এগিয়ে গেলে বোঝা যায়, আসলে তখনো শম্ভু কিছু হারাননি; সেটা ছিলো ব্যস্ততা আর স্বার্থসিদ্ধির বিচিত্র কলকাতা শহরের ‘নজরানা’ মাত্র। কারণ এর পরের দৃশ্যেই সেখানে হাজির হন পুলিশের এক হাবিলদার। তিনি এসে জিজ্ঞাসা করেন, তারা কী করছে? শম্ভু জানান, খোলা আকাশের নিচে তিনি এবং তার ছেলে ঘুমাচ্ছিলেন কিন্তু চোর সবকিছু কেড়ে নিয়ে গেছে। পুলিশ চুরি হওয়া মালের কোনো সন্ধান দিতে পারে না। সেই মাল ফিরে পেতে কী করতে হবে কিংবা আদৌ পাওয়া যাবে কিনা, সেই বিষয়েও কোনো কথা বলে না। তিনি কেবল বলেন, ‘ঠিক আছে, এখান থেকে চলে যাও।’ শম্ভু যখন পুলিশকে জিজ্ঞেস করেন, তারা কোথায় ঘুমাবে? তার উত্তরে পুলিশ জানান, সেটা তিনি জানেন না, তবে তাদের সেখান থেকে চলে যেতে হবে।
এটাই রাষ্ট্রের আসল রূপ; আশা দেখিয়ে, উন্নয়ন, সুখ প্রাপ্তির কথা বলে মানুষকে দিন দিন নিঃশেষ করা হয়। একসময় উন্নয়নের যাঁতাকলে পড়ে তারা এসব মেনেও নেয়। প্রতিদিন বাড়ে তীরহীন, চালহীন মানুষের সংখ্যা। গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা, সিরিয়ার শরণার্থীদের নিয়ে কলরব হয়, এক দেশ আরেক দেশের সমালোচনা করে। কিন্তু নিজের দেশের খেটে খাওয়া মানুষকে তারাও যে দিন দিন শোষণ করে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলছে, তারাও যে নিজ দেশে আগে থেকেই শরণার্থী হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে কেউ ভাবে না। ত্রাতা রাষ্ট্রগুলো দেখেও সেটা দেখে না। এই মানুষগুলো কোথায় যাবে, কী খাবে; ভাব দেখে মনে হয় কোনো কিছুই জানে না দেশের নেতারাও। তারা কেবল জানে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষায় সরকারি জায়গাগুলো আবর্জনা আর ‘নোংরা’ মানুষ থেকে দূরে রাখতে হবে। সেজন্যই হয়তো কোনো ধরনের পরিকল্পনা না করেই ভিক্ষুক মুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়। হকারবিহীন ফুটপাত রাখতে টহল দেওয়া হয়। একসময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে, কোনোরকমে রাত্রি যাপন করতে শম্ভুর মতো ঠাঁই নেন শহরের কোনো নানি/খালার পুরনো ভাঙ্গা বাড়ি বা বস্তিতে। যাদের সেই সামর্থ্যটুকুও থাকে না, তাদের স্থান হয় ফুটপাত, ওভার ব্রিজের নিচে।
তবে এসব দৃশ্য নিপুণভাবে তুলে ধরার পরও দো বিঘা জমিন-এ বিমলের দক্ষতার পরিসীমা দেখা তখনো শেষ হয় না। তিনি দেখান, মানুষ লক্ষ্য পূরণের জন্য কী কী করতে পারে। কতো সহজেই মানুষ নিজেকে বদলে ফেলে নিমিষেই। চলচ্চিত্রে এক ঘণ্টা ২৮ মিনিটে দেখা যায়, প্রেমিকার রিকশার পিছনে প্রেমিক আরেকটি রিকশা নিয়ে ধাওয়া করছে। হাসতে থাকা প্রেমিককে রিকশায় নিয়ে দৌড়ে চলেন শম্ভু। আনন্দে পুলকিত প্রেমিকার কাছে পৌঁছাতে প্রেমিক আরো জোরে রিকশা টানতে বলেন শম্ভুকে। অন্যদিকে প্রেমিকাও তার রিকশা চালককে আরো জোরে চালাতে বলেন। দুটো রিকশা যখন কাছাকাছি হয়, তখন প্রেমিক আরো জোরে শম্ভুকে রিকশা টানতে বলেন। শম্ভু প্রাণপণে রিকশা টেনে চলেন, কিন্তু কোনোভাবেই আগের রিকশার কাছে আর পৌঁছাতে পারেন না। তখন শম্ভুর রিকশায় থাকা প্রেমিক বলেন, তোমাকে এক আনা দিবো জোরে টানো। শম্ভু আরো জোরে টানেন। তিনি আবার বলেন, আরো জোরে টানো দুই আনা দিবো। শম্ভু গতি বাড়িয়ে দেন। চলচ্চিত্রে তখন এক ভিন্ন ইমেজের দেখা মেলে। রাস্তায় দেখা যায়, শম্ভুর সঙ্গে একটি ঘোড়ারগাড়িও যাচ্ছে। তখন ছুটে চলা শম্ভু আর ঘোড়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। ফ্রেমে দুজনকেই এক মনে হয়।
শম্ভুর রিকশায় থাকা প্রেমিক তার প্রেমিকার কাছে যেতে দুই আনা থেকে বাড়াতে বাড়াতে ছয় আনা দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। শম্ভুর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তিনি অবাক হয়ে বলে ওঠেন, ছয় আনা! যাকে দুই আনা পেতে সারাদিন নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করতে হয়, সেখানে স্বল্প সময়ে তিনি ছয় আনা পেয়ে যাবেন ভাবতে পারেন না। প্রেমিকার রিকশা পেরিয়ে খানিক সামনেও চলে যান শম্ভু। কিন্তু প্রেমিক তার প্রেয়সীকে ছুঁতে পারেন না। লোভে পড়া শম্ভুও ছয় আনা নিতে পারেন না। কারণ তার আগেই তার রিকশা রাস্তায় ভেঙে পড়ে। নিঃশেষ হয় শম্ভুর স্বপ্নও।
গ্রাম থেকে শহরে আসা অধিকাংশ মানুষের স্বপ্ন এভাবেই ভেঙে যায়। পরিস্থিতি তাকে মানুষ থেকে অমানুষ, মানবিক থেকে যন্ত্রে পরিণত করে। একসময় টাকার পিছনে ছুটতে ছুটতে শম্ভুরা কখন মানুষ থেকে পশুতে পরিণত হয় সেটা বলতে পারে না। উন্নয়নের জোয়ারে হয়তো অনেক মিল-কারখানা হয়েছে; কিন্তু যে মানুষগুলোর জমি স্বল্প দামে কিনে জমিহীন করা হয়েছে, নাম মাত্র বেতন দিয়ে যে শ্রমিকদের দাসে পরিণত করা হয়েছে তাদের খবর কেউ রাখে না। কারণ তারা উন্নয়নের জোয়ারে সাঁতার না কাটতে পেরে পিছিয়ে গেছে! ফলে দেশের উন্নয়নে হাজার হাজার মিল-কারখানা হলেও শম্ভুদের কিছু আসে যায় না। কারণ সেগুলোর মালিক বা অংশীদার তারা নয়। তারা কেবলই দাস। ফলে সান্ত্বনা হিসেবে তারা ফেলে আসা নবান্ন উৎসব, গ্রামীণ মেলা আর বৃষ্টির আনন্দের কথা স্মৃতিচারণ করে। আর নিজের ভাগ্যকে বিদ্রুপ করে রবীন্দ্রনাথের মতোই বলে চলে, ‘আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে’।
‘মানুষ সত্য, তবু সত্য মানুষের চেয়ে গভীর’
দো বিঘা জমিন-এ দৃশ্যত দুটি পক্ষ। একটি ধনী অন্যটি গরিব। একপক্ষ অত্যাচারী অন্যটি অত্যাচারিত। ঘটনার শুরু একটি কারখানা তৈরি নিয়ে। কারখানা তৈরির সেই আশায় বাধ সাধেন শম্ভু। চলচ্চিত্রের ১৪ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে শম্ভুকে জমিদার ডেকে বলেন, ‘তোকে একটি খুশির সংবাদের জন্য ডেকেছি। আমি ঠিক করেছি, গ্রামকে শহরে বদলে দেবো। এখানে মিল বসাবো। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ আসবে। তোদের সবার ভালো হবে।’ জমিদার যাই বলুন, শম্ভু বুঝতে পারেন, এ ভালো তার জন্য নয়। এ কারণে জমি দিতে রাজি হন না শম্ভু। শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে জমিদারের পা পর্যন্ত ধরেন; কান্নাকাটি করেন। কিন্তু জমিদারের মন গলে না। উল্টো ধার নেওয়া টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেন জমিদার। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে তিনি বলেন, ‘আজ যে পা ধরেছে, সে কাল সিনা উঁচু করে বলবে জমি বেচবো না।’ এটার অর্থ তিনি স্বার্থ হাসিলের জন্য যা যা করা প্রয়োজন করবেন। নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য কিছু মানুষের আশা আকাক্সক্ষাকে ধ্বংস করতেও তিনি পিছুপা হবেন না। কারণ জমিদার যেকোনো মূল্যে চলতি অবস্থাকেই টিকে রাখতে চান। আর এতেই তার স্বার্থ হাসিল হয়।
ফলে নিজের সুখকে স্থায়ী করার লক্ষ্যে জমিদার টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে আদালতে তোলেন শম্ভুকে। অভিযুক্ত শম্ভুকে আদালতে দাঁড় করিয়ে বাধ্য করা হয়, হ্যাঁ-না জবাব দেওয়ার জন্য। তার কোনো কথা শোনা হয় না-শোনে না উকিল, জনতা, এমনকি জজ সাহেবও। কিন্তু যাদের জন্য এই জমিদারি ব্যবস্থা চালু থাকে তাদের চলচ্চিত্রে দেখা যায় না। ভালো থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে কাদের জন্য শ্রমিকদের শিল্প কারখানায় রাত-দিন কাজ করিয়ে নেওয়া হয়, মূল্যবান শ্রম পানির দামে কারা শোষণ করে, কারা তাদের তৈরি জিনিসপত্র ভোগ করে, সেটাও অস্পষ্টই থেকে যায়। পুরো চলচ্চিত্র দেখলে মনে হয়, কৃষকের একমাত্র শত্রু জমিদার ও মহাজন। কিন্তু তার উপরে যারা আছে, যারা জমিদার বানায়, তাদের এমন আচরণে বাধ্য করে, তাদের ইঙ্গিত থাকে না।
১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভের পর ইংরেজরা নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের কৌশল গ্রহণ করে। সেই নীতির ধারাবাহিকতায় করা হয় সূর্যাস্ত আইন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (জমিদার সূর্যাস্তের আগে নির্ধারিত কর দিতে ব্যর্থ হলে তার জমিদারি নিলামে উঠানো হতো)। লর্ড কর্নওয়ালিস সেসময় বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই ভূস্বামীগণকে আমাদের সহযোগী করিয়া লইতে হইবে। যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিত মনে ও সুখে শান্তিতে ভোগ করিতে পারে তাহার মনে উহার কোনরূপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগিতেই পারে না।’১০ এর ফলে জমিদারির ৫০ ভাগ মাত্র ২৫ বছরের মধ্যেই হাতবদল বা মালিকানা বদলে গিয়েছিলো। এই ব্যবস্থার প্রভাবে তাঁতি, আমিন, ফটকাবাজদের হঠাৎ জমিদার হয়ে যাওয়ার সুযোগ মিলে। সেটা কেনো ইংরেজরা করেছিলো তারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ভারত স্বাধীনের পর জমিদারদের ক্ষমতা হ্রাস পায়। কিন্তু অল্প সময়ে যারা সম্পত্তির পাহাড় গড়ে তাদের সংখ্যা কমেনি। চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে জমিদারের চারপাশের কয়েকজন মানুষ কলকারখানা স্থাপনের জন্য জমিদারকে নানাভাবে পরামর্শ দিতে দেখা যায়। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না বলেও, কেউ কেউ জমিদারকে লোভ দেখায়। জমিদার সুযোগ হাত ছাড়া করেন না। সেই চাপ পড়ে শম্ভুদের ওপর। চলচ্চিত্রের ২৫ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে শম্ভু যখন জমিদারের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, সেটা ভেবে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন তারই এলাকার এক ভাই দাওয়ায় বসে হুকা টানেন আর শম্ভুকে তা খেয়ে যেতে বলেন। শম্ভু খেতে চান না। তখন তার সেই ভাই বলেন, ‘যে হুকা ছেড়ে যায় সে তো অভাগা।’ শম্ভু ফিরে এসে হুকাতে টান দেন। তখন রূপক অর্থে জমিদার আর শম্ভুকে আলাদা মনে হয় না। কারণ জমিদারের হয়তো ক্ষমতা, টাকা আছে; কিন্তু তাকে চালনা করে অন্য কেউ। সময়ের পরিক্রমায় জমিদারের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো মধ্যসত্ত্বভোগীরা জমিদারকেও নিঃস্ব করে দেয়। ফলে জমিদারিও ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। কিন্তু যে মধ্যসত্ত্বভোগীদের এতো ক্ষমতা, তাদের কথা আড়ালেই থেকে যায়। দো বিঘা জমিন-এ বিমলও কেনো জানি তাদেরকে আড়ালেই রেখে দেন।
বিমল বন্দনায় যবনিকা
আজ থেকে ৬৩ বছর আগে বিমল দো বিঘা জমিন নির্মাণ করেন ‘রিকশাওয়ালা’ গল্প থেকে। চলচ্চিত্রটি নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বিমলের বৈশিষ্ট্য হয়, বাংলা সাহিত্যকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হাজির করা। বহু বাংলা গল্প ও উপন্যাসকে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন। অথচ আজ এতো বছর পর কলকাতা-ঢাকার চলচ্চিত্র কারখানার দিকে তাকালে গল্পের অভাব দেখা যায়-মৌলিক গল্পের অভাব এখন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড়ো সঙ্কট। ঢাকাই চলচ্চিত্রের বেশিরভাগই এখন ভারতের তামিল, তেলেগু চলচ্চিত্রের স্রেফ কপি-পেস্ট। তাই হাতেগোনা কতিপয় চলচ্চিত্র ছাড়া প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে অধিকাংশ সময় নিরাশ হয়ে ফিরতে হয় দর্শককে। ৯০-এর দশকের পর ঢাকাই চলচ্চিত্রের যে পতনের ধারা শুরু হয়েছিলো, তা এখন চরম পরিণতির দিকে। অন্যান্য অনেক সমস্যার অন্যতম, কাহিনির যে সঙ্কট, তা হয়তো খুব সহজেই কাটানো যেতো বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার থেকে। যেটা সেই ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে বুঝেছিলেন বিমল; অথচ এতো বছর পরও সমৃদ্ধ এই সাহিত্য ভাণ্ডার নিয়ে ঢাকার নির্মাতারা সেটা করতে পারছে না। নব্য-বাস্তববাদ ছুঁয়ে বিমলের অনন্যতা হয়তো সেখানেই।
লেখক : তাসনিয়া মিন্নি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
তথ্যসূত্র
১. গুলজার (২০০৭ : ১৪); ‘বিমল রায়’; গুলজার পান্তাভাতে, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
২. চক্রবর্তী, পিনাকী (২০০৮ : ৭২); ‘নিউ থিয়েটার্সের কর্ণধার বি এন সরকার : জীবন ও সাধনা’; চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিউ থিয়েটার্স, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী (২০০৮ : ৭২)
৪. http://bit.ly/2lckyZS; retrieved on 10-09-2017
৫. বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থপ্রতিম (১৯৯৭ : ৭২); “সবাক ছবি‘পথের পাঁচালী’র দিকে”; ভারতীয় চলচ্চিত্রের রূপরেখা, বাণীশিল্প, কলকাতা।
৬. প্রাগুক্ত; বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৯৭ : ৭৬)।
৭. প্রাগুক্ত; বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৯৭ : ৭৬)।
৮. প্রাগুক্ত; বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৯৭ : ৭৬)।
9. http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/sub-editorial/2014/12/01/17799.html; retrieved on 23.9.2017
10. http://bit.ly/2cloLkc; retrieved on 12.9.2017
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন