নাঈম রেজা ও আলি আহমেদ নিশান
প্রকাশিত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রেক্ষাগৃহ : বিনোদনের সেই কাল এবং স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচল
নাঈম রেজা ও আলি আহমেদ নিশান

বিনোদনে চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের বিনোদন
বিনোদনকে মানুষের মৌলিক চাহিদা বললে হয়তো ভুল হবে না। কারণ পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া দায়, যিনি বিনোদন ছাড়া থাকতে পারেন। তবে বিনোদনের সংজ্ঞাটা একেকজনের কাছে একেকরকম। কারো কাছে বিনোদন মানে এক পশলা বৃষ্টিতে ভেজা, কারো কাছে একই বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে বই পড়া; কিংবা আজ বৃষ্টি হবে না-এমন মনে করেও কেউ বিনোদিত হতে পারে। আবার কারো কাছে ভোরবেলা নদীর ধারে হাঁটাও বিনোদন। কেউ ঘুরে বেড়ায়, কেউ নেশা করে, প্রেম করে, সারাদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুখ গুঁজে বসে থাকে-এগুলোর মধ্যে নিশ্চয় তারা বিনোদন খুঁজে পায়। আবার কিছু মানুষ বছরের পর বছর একই নিয়মে প্রার্থনা-উপাসনা করে, নামাজ পড়ে, পূজা-অর্চনা করে আনন্দ পায়। কিছু মানুষ সারাজীবন কেবলই টাকার পিছনে ছোটে, সেটাও নিশ্চয় তাদের বিনোদন দেয়। কিছু মানুষ আবার যা উপার্জন করে তার পুরোটাই খরচ করে। এর মধ্যেও তারা নিশ্চয় বিনোদন খুঁজে পায়।
কেউ গান গেয়ে বিনোদন খোঁজে, কেউ গান শুনে; কেউ নেচে, কেউ নাচ দেখে; কেউ কবিতা লিখে, কেউ পড়ে। মানুষের বিনোদন পাওয়ার পন্থায় বৈচিত্র্য আছে বলেই, তার সামনে বিনোদনের এতোগুলো মাধ্যম। তাই বিনোদন নিছক নাচ-গান, কবিতা নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু; মানুষের জীবনের অংশ। আর সেই জীবনজুড়ে থাকে শিল্প। শিল্পের সব শাখা নিয়ে নির্মাণ হয় চলচ্চিত্র। সঙ্গীত থেকে ছন্দ, চিত্রকলার দৃশ্যরূপ, আলোকচিত্রের বাস্তবতা, স্থাপত্যের গঠন, উপন্যাসের আখ্যান, নাটকের অভিনয়, ব্যালের নাচের গতি-সব নিয়েই চলচ্চিত্র। তাই একজন মানুষ যে রুচিরই হোন না কেনো, চলচ্চিত্র থেকে কিছু না কিছু বিনোদন তো পাবেনই।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনের প্রধান জায়গা হলো প্রেক্ষাগৃহ। প্রেক্ষাগৃহের মতো গণতান্ত্রিক জায়গা দ্বিতীয়টি পাওয়া মুশকিল। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে শুধু নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ যায়, ক্লাবগুলোতে যাওয়া মানুষদের রকমফের থাকে, এমনকি স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়েও মানুষ দু’দলে ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহের বিষয়টা একেবারেই আলাদা। এখানে সমাজের সব ধর্ম, শ্রেণি, পেশার মানুষ আসে, একসঙ্গে চলচ্চিত্র দেখে। একটা দুঃখের দৃশ্যেও প্রাণখুলে হাসার স্বাধীনতা এখানে মানুষের আছে। চলচ্চিত্র ভালো লাগলে পুরোটা, না লাগলে যেকোনো সময় বেরিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতাও দর্শকের থাকে।
তাই প্রেক্ষাগৃহের মতো একটি প্রতিষ্ঠান কোনো এলাকায় প্রতিষ্ঠার মানে শুধুই তা একটা ব্যবসা বা নিছক বিনোদনের স্থান নয়। সেখানে প্রতিষ্ঠা হয় নতুন দর্শন, চিন্তাধারা, সংস্কৃতির। যতদিন এই প্রেক্ষাগৃহ থাকে, এই দর্শন, চিন্তা, সংস্কৃতি প্রবাহমান থাকে। সেই প্রবাহে সেখানকার মানুষরা নেয়ে ওঠে। তাই ঠিক কী ধরনের চিন্তাভাবনা নিয়ে কোনো স্থানে একটি প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা হয়, সেটা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলায় বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠা হয় চারটি প্রেক্ষাগৃহ। সময়ের পরিক্রমায় এই প্রেক্ষাগৃহগুলোর গড়ে ওঠা এবং এর নানা দিক দেখার চেষ্টা থাকবে এ লেখায়।
চম্পাবাঈয়ের চাঁপাই
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কথা বলার আগে জেলাটির নামকরণ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করছি। ইতিহাস জানান দেয়, জেলাটির নামকরণের পিছনে কিছু মানুষের বিনোদন সংশ্লিষ্টতা ছিলো। আজকের জনবহুল চাঁপাইনবাবগঞ্জ কিন্তু এককালে ছিলো গহীন জঙ্গল। সেই গহীন জঙ্গলে ছিলো হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের বাস। মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহারভূমি হওয়ায় তারা নিয়মিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে মন্ত্রী-মিত্রদের নিয়ে শিকারে আসতো। যতোদূর জানা যায়, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার অন্যতম নবাব সরফরাজ খাঁ (রাজত্বকাল ১৭৩৯-৪০ খ্রিস্টাব্দ) একবার শিকারে এসে যে স্থানটিতে ছাউনি ফেলেছিলেন, তা-ই পরে ‘নবাবগঞ্জ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে অধিকাংশ গবেষকের মতে, নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলেই (রাজত্বকাল ১৭৪০-৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ‘নবাবগঞ্জ’ নামকরণ হয়।১
এদিকে বর্তমানের নবাবগঞ্জ শহর থেকে পাঁচ-ছয় মাইল দূরে ছিলো মহেশপুর নামে একটি গ্রাম। কথিত আছে নবাব আমলে এই গ্রামে ‘চম্পাবতী’ মতান্তরে চম্পারাণী বা চম্পাবাঈ নামে এক বাঈজী বাস করতেন। তার নৃত্যের খ্যাতি আশপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নবাবদেরও প্রিয়পাত্রী ছিলেন। তার নাম থেকেই ‘চাঁপাই’ শব্দটি এসেছে বলে অনেকে মনে করে।
চম্পাবাঈয়ের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এক শহর। এখানকার মানুষ ও মানুষের সংস্কৃতি এখানকার আমের মতোই মিষ্টি। আলকাপ, গম্ভীরা, মেয়েলি গীত এগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। এছাড়াও অনেক আগে থেকেই এখানে থিয়েটার বা মঞ্চনাটক ইত্যাদির আয়োজন করা হতো। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে এখানে সর্বপ্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয়। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের দিকে ‘এক্সপ্রেস থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এখানে পাকাপোক্তভাবে মঞ্চনাটকের যাত্রা শুরু। তারপর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনেক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাট্যশালাও গড়ে উঠেছে। কখনো কখনো এসব নাট্যশালা রূপ নিয়েছে প্রেক্ষাগৃহের। ‘গুলশান’ এবং ‘উদয়ন’ নামে প্রেক্ষাগৃহ দুটি যে জায়গায় গড়ে উঠেছিলো, সেখানে একসময় মঞ্চনাটকের আয়োজন করা হতো।
শুরুটা নির্বাক যুগেই
নির্বাক চলচ্চিত্রের সময় থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলচ্চিত্রের পথচলা শুরু। সময়টা দেশভাগেরও কিছু আগে। তখন মানুষ একে বলতো বায়োস্কোপ। পর্দায় ছবি দেখানো হতো আর পাশ থেকে একজন ধারাভাষ্য দিতেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রবীণ শিক্ষক শ্রী মোহিত কুমার দাঁ এর ভাষ্যমতে,
জেলায় প্রথম বায়োস্কোপ দেখানো শুরু হয় পৌরসভার অধীন হুজরাপুর এলাকায় পতিতপাবন দাশ মহাশয়ের গোলাবাড়ি চত্বরে। দ্বিতীয়বার বায়োস্কোপ দেখানো হয় পৌরসভার অধীনে কাঁঠালবাগিচা মহল্লায়। বর্তমানে সেখানে ফজলু নামে জনৈক ঠিকাদারের বাড়ি রয়েছে। সেসময় বায়োস্কোপ দেখার এই আয়োজন করেছিলেন জমিদার অবনী ভট্টাচার্য।
এখানে বলে নেওয়া ভালো চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা অত্যন্ত প্রাচীন একটি পৌরসভা। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে এই পৌরসভা প্রতিষ্ঠা হয়।
জেলায় তৃতীয়বারের মতো বায়োস্কোপ দেখানো হয়, পুরাতন বাজারে নিবারণ চন্দ্র সাহার জায়গায় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে। দাউদ ওরফে পাটপোড়া দাউদ (বীমার টাকা পেতে নিজেই নিজের বিশাল পাটের গুদামে আগুন দিয়েছিলেন দাউদ। এরপর থেকে তিনি ‘পাটপোড়া দাউদ’ নামে পরিচিত) নামের একজন তার গুদামে কার্নিভাল (তখনকার দিনে একই সঙ্গে জুয়াখেলা ও বায়োস্কোপ দেখার ব্যবস্থাকে কার্নিভাল বলা হতো) আয়োজন করেন।
শ্রী মোহিত কুমার জানান, প্রথম দিকে ফাঁকা জায়গায় বায়োস্কোপ দেখানোর ব্যবস্থা হলেও পরে তা ঘরে স্থানান্তর করা হয়। তবে ঘরের মধ্যে দর্শকের বসার জন্য কোনো চেয়ারের ব্যবস্থা ছিলো না। দর্শক তিনটি ক্যাটাগরিতে সেখানে বসতো। প্রথম শ্রেণির দর্শক বসতো বাঁশের মাচানে। দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য মাটি কিছুটা উঁচু করে মাদুর বিছানো থাকতো, আর তৃতীয় শ্রেণির দর্শককে মাটিতে বসেই দেখতে হতো বায়োস্কোপ। সেসময়ে চলচ্চিত্র দেখার বর্ণনা করতে গিয়ে মোহিত বলেন, ‘দু’আনা পয়সা দিয়ে আমরা তখন সামনের সারিতে গিয়ে বসতাম। কারণ আমাদের চিন্তা ছিলো, যে নাচছে পোশাকের ফাঁক দিয়ে যদি তার শরীরের গোপন অংশ একটু দেখতে পাই! কিন্তু আদৌ তা হতো না। এখন সেকথা মনে হলে হাসি পায়।’
‘মিলন ছবিঘর’ এর সেই কাল ও অন্যান্য
আইয়ুব খানের সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের ধারে (১৯৫৬’র আগে) একটি টিনের চালা ঘরে কো-অপারেটিভ ব্যাংক নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিলো। পরে সেই ব্যাংক উঠে গিয়ে সেখানে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় (আগে এই কলেজটি শহরের হরিমোহন স্কুলের সঙ্গে ছিলো)। কলেজে শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ায় কিছুদিন পর সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয় কলেজটি। ছেড়ে যাওয়া কলেজের সেই ঘরেই পরে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘মিলন ছবিঘর’ নামের প্রেক্ষাগৃহ। এই ‘মিলন ছবিঘর’য়েই চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র দেখানো শুরু হয়। কিন্তু এই ছবিঘর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সেসময় ঠিক কোন ব্যক্তির উদ্যোগে এই ছবিঘরটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায় না।
অন্যদিকে সৌদামিনী সাহা নামে এক জমিদারপত্নী চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংস্কৃতি চর্চার জন্য শহরের হরিমোহন স্কুলের সামনে কিছু জমি দান করেন। স্থানীয়দের উদ্যোগে সেসময় ওই জমিতে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়। ঘরটি পরে স্থানীয়দের ক্লাব ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে সেখানেই নির্মিত হয় ‘কোরাইশী হল’। ‘কোরাইশী হল’-এ তখন নিয়মিত থিয়েটার দেখানো হতো। যতোদূর সম্ভব, এই হলটির নাম পরিবর্তিত হয়ে পরে ‘মামুন হল’ হয়। তবে ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে ড. মাযহারুল ইসলাম তরু বলেন, ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তদানীন্তন মহকুমা প্রশাসক আল মামুন সানাউল হক, (সি এস পি) জনসাধারণের সহায়তায় এখানে একটি টাউন হল প্রতিষ্ঠা করেন। মহকুমা প্রশাসকের স্মৃতি রক্ষার্থে তার নামানুসারে এ হলের নাম ‘মামুন হল’ রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি ব্যবহার করা হয় সিনেমাহল হিসেবে।২
যতোদূর জানা যায়, ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে রাজশাহীর রাজা মিয়া নামের এক ব্যক্তি প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে ব্যবহারের জন্য ‘মামুন হল’ ভাড়া নেন। তিনি প্রায় এক দশক এই প্রেক্ষাগৃহ দিয়ে ভালো ব্যবসা করেন। পরে আখতার ইমাম নামে এক ব্যক্তি প্রেক্ষাগৃহটি ভাড়া নেন। তিনি ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে এর নাম রাখেন ‘গুলশান’ সিনেমাহল। প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আখতার ইমামের সঙ্গে আরো কয়েকজন সেসময় এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলো। আখতার ইমাম মূলত ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ব বাংলায় আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জেই স্থায়ী হন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রুহুল আমীন নামে এক ব্যক্তি ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে আখতার ইমামের সঙ্গে ‘গুলশান’ সিনেমাহলে যুক্ত হন। পরে এই রুহুল আমীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ‘গুলশান’ খুব ভালো ব্যবসা করতে থাকে। ৯০-এর দশকের শুরুর দিকে চলচ্চিত্রের ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার সেই সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়। যদিও এই সময়ে সালমান শাহের কিছু চলচ্চিত্র আশার আলো নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়; কিন্তু সে আলোও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে সালমানের মৃত্যু চলচ্চিত্র ব্যবসার মন্দাভাবে নতুন হাওয়া যোগ করে। এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে তখন চারটি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা। এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে ‘গুলশান’-এর ব্যবসা একেবারেই কমে আসে। এতদিন পর্যন্ত ‘গুলশান’ কিন্তু ওই ‘মামুন হল’ ভাড়া নিয়েই চলছিলো। ব্যবসা মন্দা হওয়ায় টাউনহল কর্তৃপক্ষ প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে বিপণীবিতান নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ‘গুলশান’ একেবারে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ‘গুলশান’ সিনেমাহলের জায়গায় এখন বহুতল বিশিষ্ট বিপণীবিতান ‘ক্লাব সুপারমার্কেট’।
নতুন দেশে নতুন প্রেক্ষাগৃহ ‘উদয়ন’
‘মিলন ছবিঘর’ বন্ধ হওয়ার পর কো-অপারেটিভের জায়গাটিতে অন্য কিছু তৈরি হয়েছিলো কিনা সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে এখানে সাবের মীর নামে জনৈক জুতা ব্যবসায়ী চালু করেন ‘উদয়ন সিনেমাহল’। সাবের মীর ‘উদয়ন সিনেমাহল’ নির্মাণ করলেও নিজে এটি দেখাশোনা করতেন না। এর দায়িত্ব ছিলো মূলত তার বড়ো ছেলে মো. সাইদুর রহমান নজরুলের ওপর। ধীরে ধীরে সাবের মীরের অন্য ছেলেরাও এটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।
পরবর্তী সময়ে সাইদুর রহমান নজরুল কো-অপারেটিভের ভাড়ার জায়গা ছেড়ে এবং পরিবার থেকে আলাদা হয়ে নতুন এক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের চিন্তা করেন। এজন্য তিনি ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে ‘উদয়ন’ ছেড়ে চলে আসেন। এরপর তিনি ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন ১৪০০ আসনবিশিষ্ট প্রেক্ষাগৃহ ‘রাজমহল’। এটিই এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের একমাত্র চালু প্রেক্ষাগৃহ।
সাইদুর রহমান নজরুলের ছেড়ে আসার পর ‘উদয়ন’ চলে যায় ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম সমিতি’র মালিকানায়। আম সমিতি কিছুদিন চালানোর পরে প্রেক্ষাগৃহটি কো-অপারেটিভ ব্যাংকের কাছে আবার হস্তান্তর করে। ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ‘উদয়ন’ বন্ধ হয়ে যায় ২০১১ খ্রিস্টাব্দের দিকে। বর্তমানে এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে।
‘সন্ধ্যা’ এখন ‘সন্ধ্যা কমিউনিটি হল’ এবং ...
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বার বার ‘গুলশান’ সিনেমাহলের অংশীদার রুহুল আমীনের (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমীন এখন অবশ্য আলহাজ্ব রুহুল আমীন) নাম আসছিলো। বিভিন্ন লোকের সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে যখন কথা হচ্ছিলো, তারা রুহুল আমীনের সঙ্গে কথা বলার জন্য বার বার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। এ ধরনের একটা পরিস্থিতিতে রুহুল আমীনের সঙ্গে কথা বলা খুব জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু কোনোভাবেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত প্রবীণ শিক্ষক মোহিত কুমার দাঁ’র কাছ থেকে রুহুল আমীনের ফোন নম্বর পাওয়া যায়। তারপর রুহুল আমীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বেশ কয়েকবার। কিন্তু ফোনে তাকে পাওয়া যায় না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে রুহুল আমীন রাজনীতিতে সক্রিয়, সঙ্গে রড, সিমেন্টের ব্যবসা করেন। ফোনে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তার বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে সেখানে যাই, একাধিকবার তার বাড়ি ও দোকানে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শুনে মনে হয়েছিলো, তার কাছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রেক্ষাগৃহের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। তাই লেগে থাকতে হয়, তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। শেষ পর্যন্ত তাকে একদিন ফোনে পাওয়া যায়। ফোন রিসিভ করে তিনি জানান, এখন কথা বলতে পারবেন না রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত আছেন এবং তিনি পরে কথা বলতে বলেন। সেই অনুযায়ী, ঘণ্টা তিনেক পর তাকে আবার ফোন দেওয়া হয়। তিনি এবার ফোন রিসিভ করেন, কিন্তু প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন বলে সাফ জানিয়ে দেন। তার ভাষায়, ‘আমি এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। ২০০১ সালে হজ্ব করতে যাওয়ার আগে আমি সিদ্ধান্ত নিই, এ ব্যবসার সঙ্গে আমি আর থাকবো না। হজ্ব থেকে ফিরে যতো দ্রুত সম্ভব আমি সিনেমাহলের ব্যবসা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। তারপর থেকে সিনেমাহলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। এ নিয়ে আমি কোনো কথাও বলতে চাই না।’ অনেক অনুরোধের পর তিনি ‘গুলশান’ ও ‘সন্ধ্যা’ নামের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে ফোনেই অল্প কিছু তথ্য দেন। তিনি কোনোভাবেই দেখা করতে রাজি হন না। ফলে শেষ পর্যন্ত তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
অন্যদিকে রুহুল আমীন ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে ‘সন্ধ্যা’ নামে আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেছিলেন। এ সময় তার সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন মনজুরুল ইসলাম নামের একজন। শূন্য দশকের ব্যবসায়িক মন্দায় এ প্রেক্ষাগৃহটিও টিকে থাকতে পারেনি। ‘সন্ধ্যা’ বন্ধ হয়ে যায় ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন। তারপর থেকে এটি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। ‘সন্ধ্যা’ সিনেমাহল এখন ‘সন্ধ্যা’ কমিউনিটি হল।
স্মৃতির ডানায় ভর করে বেঁচে থাকা
‘রাজমহল’-এ যেদিন দেলওয়ারের সঙ্গে কথা হয়, তখন তিনি প্রেক্ষাগৃহের প্রথম শ্রেণির গেইটে বসেছিলেন। ততক্ষণে ধ্যাততেরিকি-এর তিনটাÑছয়টার শো শুরু হয়ে গেছে। দেলওয়ারসহ প্রেক্ষাগৃহের তিনÑচারজন কর্মচারী মিলে সেখানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। মূলত দেলওয়ার নয়, ‘উদয়ন’-এর একজন পুরনো কর্মচারী আ. সালাম ‘রাজমহল’-এ কাজ করেন, এই জেনে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য সেদিন সেখানে যাওয়া হয়েছিলো। দেলওয়ারের পাশেই সালামকে পেয়েও যাই। ‘রাজমহল’-এ এখন সালাম বুকিং ক্ল্যার্ক হিসেবে কাজ করেন। কুশল বিনিময়ের পর সালামের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই চলচ্চিত্র ও প্রেক্ষাগৃহ সংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে রাজি হন না। নানাভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কোনো ফল পাওয়া যায় না। সালামের এই আচরণ দেখে নিজ থেকেই কথা বলার জন্য দেলওয়ার এগিয়ে আসেন। একসময় ‘সন্ধ্যা’ সিনেমাহলে কাজ করতেন দেলওয়ার হোসেন। বর্তমানে তিনিও বুকিং ক্ল্যার্ক হিসেবে কাজ করছেন ‘রাজমহল’-এ। নিরুপায় হয়ে দেলওয়ারের সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করি। স্মৃতি হাতড়িয়ে পুরনো দিনের কথা বলতে থাকেন দেলওয়ার। তার ভাষায়, “ছোটবেলায় আম্মা, খালা, ফুফুর সাথে ‘উদয়ন’-এ আমরা সিনেমা দেখতে আসতাম। সিনেমা দেখতে দেখতে তখন একমাত্র খাবার জিনিস ছিলো বাদাম। মা বাদাম কিনে দিতো, আমরা সেটাই তিন ঘণ্টা ধরে সিনেমা দেখতাম আর খেতাম। মায়েদের সঙ্গে অনেক বাচ্চা-কাচ্চাই তখন সিনেমা দেখতে আসতো।”
দেলওয়ার বলেন, ‘আগে যখন আমরা সিনেমা দেখতে আসতাম, তখন সিনেমাহলের সামনে দুই-তিনটা গরুর গাড়ি থাকতোই। দূর থেকে মানুষজন গরুর গাড়িতে চড়ে সিনেমা দেখতে আসতো। সিনেমা শুরু হবে তিনটায়, কিন্তু মানুষ দেড়টার সময় এসে বসে থাকতো। অথচ এখন তার উল্টা অবস্থা।’ ট্রেনে করেও সেসময় অনেক লোক চলচ্চিত্র দেখতে আসতো বলে জানান দেলওয়ার। অনেকে রাতে চলচ্চিত্র দেখতে এসে আর ফিরে যেতে পারতো না, তখন স্টেশনেই রাত কাটাতো। দেলওয়ারের ভাষায়, ‘এখন পাওয়া যায় কিনা জানি না, তখন স্টেশনে সোঁপ [মাদুর] ভাড়া পাওয়া যেতো। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসলেও তখন মানুষ ছবি দেখতে আসতো। আরেকটা মজার বিষয় হলো, অনেক মহিলা সিনেমাহলে আসতো একেবারে ছোটো বাচ্চা নিয়ে। হঠাৎ বাচ্চা কেঁদে উঠলে, সেই মা তার মুখ চেপে ধরতো বা বেশি কান্নাকাটি করলে বাইরে চলে আসতো; আবার কেউ কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে বাচ্চাকে সামলাতো আর উঁকি দিয়ে দিয়ে দেখতো। যাতে কারো ডিস্টার্বও না হয়, সিনেমা দেখাও মিস না যায়। তবে তখন আরেকটা বিষয় ছিলো, সিনেমাহলে মহিলাদের আলাদা মর্যাদা দেওয়া হতো। সিনেমা শেষ হলে সবাই জায়গা ছেড়ে দিতো মহিলা দর্শক বের হওয়ার জন্য। তারা যেনো নিরাপদে, সম্মানের সাথে বের হয়, সেজন্য সিনেমাহলের লোকজনও সবসময় সচেতন থাকতো।’
আগের দিনের চলচ্চিত্রের গানের খুব প্রশংসা করেন দেলওয়ার। তার ভাষায়, “আগে মানুষের কাছে সিনেমার গান খুব পছন্দের জিনিস ছিলো। সিনেমা মুক্তির আগেই তারা রেডিওতে এসব গানের কিছু অংশ শুনতো। তারপর সেই গান পুরো শোনা ও দেখার জন্য আসতো সিনেমাহলে। আর সিনেমা দেখে গান গাইতে গাইতে বের হয়ে যেতো। আর এখন গান শুরু হলে দর্শক প্রস্রাব করতে যায়। আর এ গানের কী শুনবে; এখনকার গান তো-‘আকাশ থাইক্কা পড়লো রে, ধররে সালারে, মাররে সালারে’। এ গানে সুরও নাই, রসও নাই।”
সালাম যেখানে কথা বলতে চাচ্ছিলেন না, সেখানে দেলওয়ার যেনো কথার ঝুঁড়ি নিয়ে বসেছিলেন। নানা বিষয় নিয়ে একের পর এক কথা বলতে থাকেন তিনি। কখনো তার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, আবার কখনো যেনো তিনি আবেগী হয়ে পড়ছিলেন। চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণারও আগে খুব মজার ছিলো বলে জানান দেলওয়ার। তার ভাষায়, ‘তখন বড়ো বড়ো সব পোস্টার আসতো। সেই পোস্টার লাগানোর জন্য যখন সিনেমাহলের লোকজন যেতো, তখন জনগণ তাদের বাড়ির দেয়ালে একটা সিনেমার পোস্টার লাগানোর জন্য অনুরোধ করতো। এছাড়া ভ্যানে দোচালা ঘরের মতো বানিয়ে সেখানে পোস্টার লাগিয়ে আমরা মাইকিং করতাম। মাইকিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে লিফলেটও বিতরণ করা হতো। এগুলো নেওয়ার জন্য মানুষের সে কী আগ্রহ! আমরাও তখন প্রচার করে খুব আনন্দ পেতাম, মানুষের ওই আগ্রহ দেখে ক্লান্ত হওয়ার সুযোগ ছিলো না। আর তখন তো সিনেমাহলের মানুষদের আলাদা চোখে দেখা হতো, মানুষজন খুব সম্মান করতো আমাদের। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি আর নাই। মাইকিং করার সময় কেউ তাকায়ও দেখে না। বরং খারাপ ভাষায় নানা কথা বলে। একটা পোস্টার লাগানোর জায়গা পাওয়া যায় না। পোস্টার লাগালেও একদিনের মধ্যে ছিঁড়ে ফেলে। পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে, চিনে ফেলবে এই ভয়ে আমরা অনেক সময় মুখ ঢেকে প্রচার চালাই। সিনেমাহলে চাকরি করি এই কথা শুনলে মানুষ বিয়ে পর্যন্ত দিতে চায় না। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়; মনে হয়, চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেলো।’
প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কাজের জন্য মাঝে মাঝেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে যেতে হতো। এরই মধ্যে একদিন বসা হয়েছিলো জেলা সদরের বিশ্বরোড এলাকায়। সেখানে উপরে পলিথিন দেওয়া ঝুপড়ি চায়ের দোকান। লোক সবসময় গম গম করছে। ইচ্ছে করেই সেখানে গিয়ে বসি, যদি কারো কাছ থেকে প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়। দোকানিকে চায়ের কথা বলে, সেখানে বসে থাকা দুই-একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে ভাব জমিয়ে প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু খুব একটা কাজ হচ্ছিলো না। বাইরের বেঞ্চিতে বসে এদিকে নজর রাখছিলেন একজন বয়স্ক লোক। একপর্যায়ে তিনি কথা বলার আগ্রহ দেখান। তার নাম মো. আব্দুল মান্নান। পেশায় একটি কীটনাশক কোম্পানির প্রতিনিধি। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায়। অফিসিয়াল একটি কাজে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসেছেন। মান্নান খুব কম বয়স থেকেই প্রেক্ষাগৃহে নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখতেন। গোমস্তাপুর থেকে সেই সময় নিয়মিত ‘উদয়ন’ ও ‘গুলশান’ প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখতে আসতেন তিনি।
চলচ্চিত্র নিয়ে চা দোকানের অনেকের কথা শুনে, মান্নান খানিকটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। স্মৃতি হাতড়িয়ে বলতে থাকেন তার চলচ্চিত্র দেখতে আসার নানা কথা। তার ভাষ্যমতে, “১৯৭৯-৮০ সালের দিকে আমরা তিন-চার বন্ধু ছিলাম হাইস্কুলের ছাত্র। দুপুর ১২টার দিকে তখন রহনপুর থেকে একটা লোকাল ট্রেন ছেড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৌঁছাতো সোয়া তিনটার দিকে। আমরা সকাল ১০টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে হেঁটে রহনপুর পৌঁছাতাম, তারপর ট্রেন ধরে চাঁপাই আসতাম। স্টেশন আসতে বেশিরভাগ দিন ট্রেন লেট করতো, তাই তড়িঘড়ি করে ট্রেন থেকে নেমে আমরা দৌড় দিতাম ‘উদয়ন’ সিনেমাহলের দিকে তিনটার শো ধরার জন্য। তখন তো দুই-তিন টাকা ছিলো টিকিটের দাম। প্রত্যেকটা সিনেমায় হলের সামনে এতো ভিড় হতো যে, এসে লাইন ধরে টিকিট কাটতে কাটতে বেশিরভাগ দিন সিনেমার প্রথম অংশ মিস হয়ে যেতো। ছয়টায় শো শেষ হলে আমরা ‘উদয়ন’ থেকে বের হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতাম, ‘গুলশান’-এ নয়টার শো শুরু হওয়া পর্যন্ত।”
৫৩ বছর বয়সি মান্নান যেনো কথা বলতে বলতে খানিকটা হাঁপিয়ে যান। নিজের ও আমাদের জন্য রঙ চায়ের কথা বলেন। চা পান করতে করতে এবার কথা চলতে থাকে। মান্নান বলেন, “ছয়টার সময় বের হয়ে ছাতু খেয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে কখন যেনো নয়টা বেজে যেতো। আমরা ‘গুলশান’-এ যেতাম রাত নয়টা থেকে ১২টার শো সিনেমা দেখার জন্য। সিনেমা দেখা তখন আমাদের কাছে নেশার মতো ছিলো। নিয়মিত কাস্টমার হওয়ায় ‘গুলশান’-এর আ. মতিন নামে একজন টিকিট-চেকারের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক হয়। সপ্তাহের শেষের দিকে সিনেমা দেখতে গেলে অনেকদিনই সে আমাদের ফ্রি ঢুকতে দিতো। আমিও ভদ্রতা করে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ছাতু তাকে খেতে দিতাম। তখন সব শো-ই প্রায় ফুলহাউস থাকতো। ১২টায় শো শেষ হলে আমরা আবার ঘুরেফিরে স্টেশনে যেতাম। রাত আড়াইটার দিকে একটা ট্রেন ছিলো চাঁপাই থেকে রহনপুরে। সেই ট্রেনে বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশিরভাগ দিন ফজরের আজান শোনা যেতো, কোনোদিন সকাল হয়ে যেতো। আমার টার্গেট ছিলো বাবা ঘুম থেকে ওঠার আগে বাড়ি পৌঁছানো।” এই কথা বলে মান্নান উচ্চস্বরে হাসতে থাকেন। তিনি আরো জানান, এভাবে প্রত্যেক শুক্রবারই তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলচ্চিত্র দেখতে আসতেন। ট্রেনের ভাড়া, প্রেক্ষাগৃহের টিকিট সবমিলিয়ে ১০-১২ টাকা হলেই তখন দুটো চলচ্চিত্র দেখা যেতো।
সবশেষে দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে মান্নানের চিন্তাভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সিনেমা তৈরির জন্য মেধাবী পরিচালক ও অভিনয়শিল্পী বাংলাদেশে আছে। কিন্তু সিনেমা যারা বানায় তাদের মানসিকতার উন্নতি দরকার। দর্শকের চাহিদা, রুচির সাথে সাথে সিনেমার ধরনেরও পরিবর্তন দরকার। এখন আর সেই যাত্রাপালা মার্কা সিনেমা মানুষ দেখবে না, যুগোপযোগী সিনেমা বানাতে হবে। দর্শক সিনেমাহলে গিয়ে ঠকতে ঠকতে এমন এক জায়গায় চলে এসেছে যে, এখন ভালো কোনো সিনেমা হলেও তারা আর ভরসা পাচ্ছে না। তাই দর্শকের কোনো দোষ নেই।’ কথা শেষ করে সেদিনের মতো মান্নানের কাছ থেকে বিদায় নিই।
আমায় ডেকো না
শুরুতেই বলা হয়েছে, কোনো এলাকায় প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ হওয়া মানে শুধু প্রেক্ষাগৃহই নয়, সেখানে শুরু হয় নতুন সংস্কৃতির, নতুন চিন্তা, মূল্যবোধ। চাঁপাইনবাবগঞ্জেও প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের সঙ্গেই সেখানকার মানুষের জীবনে নতুন এক সংস্কৃতি যোগ হয়। ধীরে ধীরে তাদের বিনোদনের পুরাতন মাধ্যমগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে চলচ্চিত্র ও তা দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার অভ্যাস। একপর্যায়ে মানুষের কাছে তাদের চিরচেনা মঞ্চনাটক, আলকাপ, গম্ভীরার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র ও প্রেক্ষাগৃহ। ফলে ব্যক্তি-মানুষের জীবনের ভালো-খারাপ, আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হতে থাকে প্রেক্ষাগৃহ। পয়লা বৈশাখ, ঈদ, বড়োদিন, পূজা, জন্মদিন সবক্ষেত্রেই প্রেক্ষাগৃহ অন্য অনেক অনুষঙ্গের সঙ্গে আলাদা গুরুত্ব নিয়ে হাজির থাকে। বিয়ে করলে শালা-শালিদের নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখা তো অলিখিত রেওয়াজই হয়ে গিয়েছিলো। এভাবেই সময়ের সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে প্রেক্ষাগৃহ ও চলচ্চিত্রের গ্রহণযোগ্যতা কেবলই বেড়েছে, সঙ্গে বেড়েছে দর্শকও।
কালের আবর্তে বাংলাদেশের সেই প্রেক্ষাগৃহ, চলচ্চিত্র নিয়ে উন্মাদনা সবই এখন কেবলই স্মৃতি। কারো মত, চলচ্চিত্রের মানহীনতা, গল্প নেই, অভিনয় হয় না; কেউ কেউ বলেন, এর জন্য দায়ী প্রযুক্তির বিকাশভি সি আর, সিডি, ভি সি ডি, ডিস, ইন্টারনেট, স্মার্ট মোবাইলফোন। কারণ যাইহোক দেশজুড়ে কয়েকশ প্রেক্ষাগৃহের মৃত্যু যে দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলেছে তা বলতে দ্বিধা নেই। সন্ধ্যা হলেই ঘরে ঘরে বিদেশি সোপ অপেরার রাজত্ব কিংবা মাদকের ছড়াছড়ি পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে অনেক কিছু জানান দেয়। অন্যদিকে স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচলে দুই প্রজন্ম এখন প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কেবলই হতাশার কথা বলে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষও এই পরিস্থিতির বাইরে নয়।
লেখক : নাঈম রেজা ও আলি আহমেদ নিশান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
nissan.mcj26@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. তরু, ড. মাযহারুল ইসলাম (২০০৭ : ৮); গৌড় থেকে চাঁপাই, প্রাইম পাবলিকেসন্স, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
২. তরু, ড. মাযহারুল ইসলাম (২০০৯ : ৩৪); চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, আনন্দধারা, ঢাকা ।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন