দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন
প্রকাশিত ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘বুড়ো বয়সের রাজ্জাক দেখতে বিচ্ছিরি’ এবং নাবালক বাংলা চলচ্চিত্রের হঠাৎ আঁতকে ওঠা?
দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন

বিচ্ছিরি রাজ্জাক এবং
ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের রাজা, স্বর্ণালি যুগস্রষ্টা নায়করাজ রাজ্জাক। তার প্রসঙ্গ আসতেই বার বার পুরনো দিনের কথা মনে পরে যায় সবার। ৬০-এর দশকে উর্দু চলচ্চিত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য চুরমার করে এ দেশে বাংলা চলচ্চিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব, তাদের অন্যতম নায়করাজ। তিনি সেই সময় শুধু তার অভিনয়, নাচ আর ব্যক্তিত্ব দিয়েই দর্শকের মোহবিষ্ট করেছিলেন ঠিক তা নয়, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেন তার ফ্যাশন, প্যাশন আর ব্যক্তিগত ইমেজের মাধ্যমে। সেই সময় রাজ্জাকের চুলের স্টাইল, বড়ো কলারের শার্ট, টাইট প্যান্ট আর অক্সফোর্ড সু ছিলো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের স্বপ্নের ফ্যাশন। এক কথায়, সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের অনবদ্য মেলবন্ধন এ নায়ক কথায়-বার্তায়, চলনে-বলনে, স্টাইলে চিরকালই অনুকরণীয়। সেই কিংবদন্তি ২১ আগস্ট ২০১৭ চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রাজ্জাকের মৃত্যুর পর তসলিমা নাসরিনের ফেইসবুক স্ট্যাটাসের সমালোচনায় ঝড় তোলা একটি লাইন ‘বুড়ো বয়সের রাজ্জাক দেখতে বিচ্ছিরি’ কে শিরোনাম করেই লেখাটা শুরু হোক।
রাজ্জাকের মৃত্যুর পর তার ছোটো ছেলে সম্রাট বলেন, ‘... বাবাকে আমি বলেছিলাম, বাবা ২০১৯ সাল পর্যন্ত অমিতাভের কোনো শিডিউল ফাঁকা নেই। তুমি কেন কাজ করছো না? তখন বাবা বলেছে, আমার জন্য বিষয় বানাও, আমি কাজ করবো। আমি বলতাম, এই শরীর নিয়ে কাজ করবে কীভাবে? ডায়েট করতে হবে। বাবা তখন ডায়েটের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেছিলো।’ এটাই বাংলা চলচ্চিত্রের সাধারণ সত্য-নায়কের বয়স ৪০-৪৫ পার হতেই চলচ্চিত্রে তিনি প্রধান চরিত্র হওয়ার ক্ষমতা হারান। আর নায়িকা মাত্রই তো বিয়ের পর জনপ্রিয়তা কমে যায়। এজন্য বিয়ের খবর লুকানোর প্রবণতায় আক্রান্ত কেউ কেউ। আর সন্তান জন্মের পর নায়িকার মুটিয়ে যাওয়া যেনো বিশাল লজ্জার বিষয়। ওই সময়গুলোতে নায়িকারা যতোটা পারে আড়ালেই থাকে। নায়ক বা নায়িকা হতে হলে, অবিবাহিত, অল্পবয়সী, ছিপছিপে গড়নের হতে হবে এটাই অলিখিত সংবিধান।
চলচ্চিত্র নাকি বাস্তবতার দর্পণ! তাহলে কেনো সেখানে জীবনের এ পরম বাস্তবতাকে অস্বীকার করা? কেনোইবা একঘেয়ে চিত্রনাট্য? তথাকথিত সৌন্দর্যই কেনো চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক খুঁটি? বিবাহিত, সন্তানে মা বা বাবা কিংবা মোটাসোটা একজন বৃদ্ধা বা বৃদ্ধের গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র বানালেই কেনো তা হয়ে ওঠে বাজারবিমুখ বিকল্প চলচ্চিত্র কিংবা ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র! নায়করাজের মৃত্যুর পর এমন অনেকগুলো প্রশ্নই ভাবাচ্ছে আমাকে।
আমার জানা নায়করাজ
আমাদের প্রজন্মের তেমন কেউই প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে তার চলচ্চিত্র দেখিনি কখনো। টেলিভিশন পর্দায় দেখেই অভ্যস্ত নায়করাজকে। কৈশোরে প্রতি শুক্রবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেখানো হতো বাংলা চলচ্চিত্র। স্কুল ছুটির দিনে, উৎসব-পার্বণে চলচ্চিত্র দেখা ছিলো অন্যতম বিনোদন। তখনো রাজ্জাকের চলচ্চিত্রগুলোকে হারানো দিনের চলচ্চিত্র হিসেবেই দেখানো হতো। আর সালমান-শাবনূরই তখন পর্দা কাঁপাচ্ছে। সবই ৯০-এর দশকের কথা।
রাজ্জাকের আলোচিত সবশেষ চলচ্চিত্র হিসেবে মনে পরে বাবা কেন চাকর (১৯৯৭)-এর কথা। পুরনো চলচ্চিত্র ছাড়া নায়করাজ সম্পর্কে বাকি যতোটুকু জেনেছি তা নানা সময়ের ‘ফিল্মি টকশো’ থেকে। বাদবাকি জানাটুকু সাম্প্রতিক। যা জেনেছি সেটা তার মৃত্যুর পর পত্র-পত্রিকা পড়ে। যেমন, রাজ্জাক চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন কলেজ জীবনে। সেসময় রতন লাল বাঙালি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া পঙ্কতিলক ও শিলালিপি নামে তিনি আরো দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। রাজ্জাক ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমান। প্রথমদিকে রাজ্জাক তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ১৩ নম্বর ফেকুওস্তাগার লেন চলচ্চিত্রে একটি ছোটো চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। জহির রায়হানের বেহুলায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন তিনি।
৬০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ৭০-এর দশকেও তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের প্রধান অভিনয়শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অভিনয় জীবনে তিনি আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা এবং বড় ভালো লোক ছিলসহ প্রায় তিনশোটি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বেশ দাপটের সঙ্গেই ঢালিউডে সেরা নায়ক হয়ে অভিনয় করেন রাজ্জাক। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ অসংখ্য সম্মাননা রাজ্জাক অর্জন করেন। এছাড়াও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
মোটামুটি দেশের সব পত্রিকায় এই ছিলো নায়করাজের সংক্ষিপ্ত জীবনী। কথাবার্তাও প্রায় এক ঘরানারই ছিলো সবখানে।
৭০ ও ৮০’র দশকের অভিনেতাদের সাম্প্রতিক
অবস্থা : তুলনায় বলিউড ও ঢালিউড
বলতেই হবে গত এক দশকে বলিউডের ‘বাজারি’ চলচ্চিত্রের দর্শক বেশ আধুনিক। মূলত দর্শক আধুনিক নয়, সেখানে রুপালি পর্দার বাণিজ্যিক কাহিনিগুলো গৎবাঁধা রীতি ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। বলিউডে ‘বুড়ো’ অমিতাভের ভূমিকাকে ভেবেই এখন চিত্রনাট্য লেখা হয়। এবং প্রতিটি চলচ্চিত্রের কাহিনিতেই আছে ভিন্নতা। তাই তো এই বয়সেও অমিতাভের রয়েছে পিকু, পিংক, চিনি কম হে, নিঃশব্দ, ভূতনাথ, ব্ল্যাক-এর মতো অসংখ্য দর্শক ও সমালোচক নন্দিত চলচ্চিত্র। অমিতাভের তুলনায় জয়া, রেখা বা হেমা, এক কথায় ‘বুড়ো’ নায়িকারা খানিকটাই পিছিয়ে। তবে এর পরও জয়া বচ্চনের কাভি খুশি কাভি গম বা কাল হো না হো-এ ছিলো বেশ শক্তিশালী চরিত্র। আর রেখা তো পরিনিতায় আইটেম সঙ দিয়ে দর্শকের মন জয় করেছিলেন। হেমা মালিনী ভগবান-এ ছিলেন প্রধান চরিত্র; তবে চলচ্চিত্রে বেশ অনিয়মিত হলেও নৃত্যশিল্পী হিসেবে এখনো হেমা মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন।
এদিকে গুরুত্ববহ পার্শ¦চরিত্রে ধর্মেন্দ্র লাইফ ইন এ মেট্রো’র মতো চলচ্চিত্র ছাড়াও আরো বেশকিছুতে মোটামুটি নিয়মিত রয়েছেন। অন্যদিকে বুড়ো বয়সেও দুর্দান্ত নাসিরুদ্দিন শাহ্। ইসক্ কিয়া বা ডেরইসক্ কিয়া কিংবা ডার্টি পিকচার-এ বড়ো পর্দা কাঁপিয়েছেন তিনি। এছাড়া গত বছরের বেশ আলোচিত চলচ্চিত্র ছিলো শাবানা আজমি অভিনীত নিরজা। যেখানে পার্শ্বচরিত্রে শাবানা ছিলেন অনন্য। এছাড়া ঋষি কাপুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে হাজির ছিলেন লাভ আজকাল বা হামতুম-এর মতো ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে। সম্প্রতি শ্রী দেবীকেও নিয়মিত বড়ো পর্দায় পাবো বলেই মনে হচ্ছে মম বা ইংলিশ-ভিংলিশ দেখার পর। এসব চলচ্চিত্রে তার প্রধান চরিত্রগুলো ছিলো বয়স উপযোগী। অমিতাভের আদর্শ শারীরিক গঠন থাকলেও ধর্মেন্দ্র, নাসিরুদ্দিন বা ঋষি কাপুরের শরীরের যথাযথভাবেই বয়সের ছাপ স্পষ্ট। এবং তাদেরকে যে চরিত্রগুলোর জন্য নির্বাচন করা হয়, সেই চরিত্রের চাহিদাও থাকে ঠিক তেমন। চলচ্চিত্রের গল্পের ভিন্নতাই এতো বিচিত্র বাজার নির্মাণ করেছে সেখানে।
কিন্তু বাংলাদেশের দর্শকের জন্য বাণিজ্যনির্ভর চলচ্চিত্র মানেই পূর্ব পরিচিত সব গল্প। বাঁধাধরা কাহিনির ফরমেটে ফেলে চলচ্চিত্র নির্মাণের ফলেই নায়ক-নায়িকা হতে হলে, অবিবাহিত, অল্পবয়সী, ছিপছিপে গড়নের হতে হয়। সম্প্রতি অপু বিশ্বাস সন্তান জন্মের পর তার কৃশকায় গড়ন হারিয়েছেন, তাই তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র করা অসম্ভবএমনই বক্তব্য দিয়েছেন তার স্বামী শাকিব খান। মানে অভিনয়ের খাতা থেকে নাম বাদ পড়ার সময় এসে গেছে তার। এভাবেই হয়তো হারিয়ে গেছেন শাবনূর, মৌসুমি, পপি, পূর্ণিমা প্রমুখ। প্রধান চরিত্র বা নায়িকার ভূমিকায় এখন তারা ‘কুৎসিত’। আর নায়ক-নায়িকা কেন্দ্রিক কাহিনিগুলোতে পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকা এতোটাই নগণ্য, যেখানে অভিনয় প্রতিভা প্রদর্শনের তেমন কোনোই অবকাশ থাকে না। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অভিনয়শিল্পীরা হয়ে পড়ে বেকার।
নায়কদের অনেকে প্রযোজনা ব্যবসা কিংবা রাজনীতিতে সরব হয়ে ওঠে; আর নায়িকারা বদলে ফেলে পেশা। এমন কী পেশার প্রতি সম্মান এবং মূল্যবোধও। অধিকাংশ নারী অভিনয়শিল্পীই ‘হিজাব’-এর আড়ালে চলে যায়। স্বল্প পোশাকের জন্য সবচেয়ে আলোচিত একসময়ের নায়িকা ময়ূরীও এখন পর্দানশীল। বড়ো পর্দার আড়ালে যে জীবন, সেখানে নায়িকাদের সম্মান এনে দেয় পর্দানশীলতা। কিন্তু বলিউডে বার্ধক্যেও অপরিবর্তনীয় জিন্নাত কিংবা হেলেনকে এখনো সম্মানের সঙ্গেই গ্রহণ করেন দর্শক। বুড়ো বয়সেও হেলেনকে আমরা মুহাব্বাতিন এবং হাম দিল দে চুকে সনম-এর মতো খ্যাতনামা চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে দেখতে পাই। এতো গেলো বিতর্কিত অভিনেত্রীদের আত্মকাহিনি।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানার বরাতে শোনা যায়, ‘এখন এই বয়সে এসে নিজের এই চরিত্রগুলো দেখলে বিব্রত হতে হয়। এছাড়া আমি নিজেও আমার লাইফ স্টাইল বদলে নিয়েছি। জানি দর্শকের ভালোবাসাতেই আজ আমি শাবানা হয়েছি। কিন্তু সবকিছু তো একটা সময়ের সৌন্দর্যের ওপরেও নির্ভর করে।’ সম্প্রতি রাজনীতিতে শাবানার স্বামীর আগমন ও নির্বাচনী প্রচারণায় তার অংশগ্রহণ এবং শাবানার ধর্মপ্রচার ও যথারীতি পর্দানশীলতা সমালোচক মহলে হারিয়ে যাওয়া এ অভিনেত্রীকে আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে। অন্যান্যদের মধ্যে কবরী রাজনীতিতে সরব হলেও বড়ো পর্দা থেকে বহু দূরে। ববিতাকে কালেভদ্রে দেখা যায় রুপালি পর্দায়। সুচন্দা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, নূতন, অঞ্জনা সবাই হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। নায়কদের মধ্যে ইলিয়াস কাঞ্চন, ফারুক, আলমগীর এবং রাজ্জাকের ভিতর আলমগীরই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে ছিলেন। একসময়ের দুর্দান্ত জনপ্রিয় নায়ক ওয়াসিম, জাভেদ, সোহেল রানাও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
‘বুড়ো বয়সের রাজ্জাক দেখতে বিচ্ছিরি’ এ কথা কি নতুন কিছু?
‘বুড়ো বয়সের রাজ্জাক দেখতে বিচ্ছিরি’ মেনে নিতে আপত্তির কী আছে? কেনো তথাকথিত সৌন্দর্য থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পারেনি বাংলা ভাষার (কলকাতা ও ঢাকা উভয় ইন্ডাস্ট্রি) চলচ্চিত্র? প্রশ্ন জাগতে পারে, কেনো দুই দেশের বাঙালির কথা বলছি; কেননা খেও বাজারি গল্প ছাড়াও ঋতুপর্ণ ঘোষের ভাষায় ‘বুদ্ধিবৃত্তিক’ (conceptual) চলচ্চিত্রেরও ব্যবসায়িক সফলতা তৈরি হওয়ায় কিছুটা ভিন্ন উদাহরণও তৈরি হয়েছে কলকাতায়। তবে তা হয়ে থাকলেও টালিগঞ্জের বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রের নায়ক বা নায়িকার গল্পও প্রায় একই। প্রসেনজিৎ, চিরঞ্জিতের সৌভাগ্য এটাই যে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চলচ্চিত্রের নির্মাতারা বাজারকে পুনঃনির্মাণ করেছে। সিনেপ্লেক্স সংস্কৃতির আগমনও ছিলো এ প্রজন্মের জন্য আশির্বাদের মতো। তাই গত এক কি দেড় দশক ধরে খেও চলচ্চিত্রের নায়কেরাও মাঝ বয়সে এসে এখন আর বেকার হয়ে পড়ছে না। যার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ প্রসেনজিৎ। ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরেই ‘বুদ্ধিবৃত্তিক চলচ্চিত্র’-এ প্রসেনজিতের উপস্থিতি। উৎসব (২০০০), চোখের বালি (২০০৩), দোসর (২০০৬), সব চরিত্র কাল্পনিক (২০০৯), নৌকাডুবি (২০১০)-ঋতুর এ কাজগুলোই বদলে দিয়েছিলো প্রসেনজিতকে। পরবর্তী সময়ে মনের মানুষ, অটোগ্রাফ, ২২ শে শ্রাবণ, অপরাজিতা তুমি, জাতিস্মর, জুলফিকার, প্রাক্তন, ক্ষত প্রভৃতি চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত অভিনেতা হিসেবেও প্রসেনজিতকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন বাজার। নায়িকাদের মধ্যে ঋতুপর্ণাকেও চারুলতা ২০১১, রাতের রজনীগন্ধা, রাজ কাহিনীতে অসাধারণভাবে পাওয়া গেছে। তবে অর্পিতা চট্টোপধ্যায়, ইন্দ্রানী হালদার, রচনা ব্যানার্জি, প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদীরা হারিয়ে গেছেন বড়ো পর্দা থেকে।
ঢালিউডে অবশ্য নির্মাতা রাজ্জাক গতানুগতিক ধারাটা ভাঙবার কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন বাবা কেন চাকর (১৯৯৭) দিয়ে। নিজের প্রতিষ্ঠান রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন প্রযোজিত এ চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছিলেন রাজ্জাক স্বয়ং। বাংলা চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় বাবা চরিত্রটিকে নিয়ে এসেছিলেন রাজ্জাক নিজেই। বাবা কেন চাকর বাঙালির আবেগকে শতভাগ স্পর্শও করতে পেরেছিলো। এটি এতোটাই বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছিলো যে, পরবর্তী সময়ে তা টালিউডে নির্মাণ করা হয়।
তবে এই উদাহরণ মোটাদাগে একটিই। ঢাকার গৎবাঁধা চলচ্চিত্রশিল্প বলিউড কিংবা টালিউডের মতো সেই বাজার পুনঃনির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে এ পর্যায়ে রাজ্জাকের অভিনয় নিয়েও কিছুটা সমালোচনা করতে চাই। পুরো অভিনয় জীবনে রাজ্জাক নিজেকে কিছু নির্দিষ্ট চরিত্রে অভিনয়ের মধ্যেই আবদ্ধ রেখেছেন। চরিত্রের বৈচিত্র্য তার অভিনয়ে খুব একটা দেখা যায় না। তিনি কলকাতার উত্তম কুমারের মতোই ‘আদর্শ নায়ক’ চরিত্র। সুতরাং সৌন্দর্য সেখানে গুরুত্ব বহন করবেই।
অবশ্য টালিউডের অতীত ইতিহাসটা এমনই! যদিও কিছুটা ব্যতিক্রম বলিউডের অভিতাভের মতো টালিগঞ্জে ৮৫ বছরেও আধিপত্য রেখেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই বয়সেও সৌমিত্রকে মুখ্য চরিত্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে অনেক নির্মাতা। সৌমিত্র অভিনীত দেখা, অংশুমানের ছবি, শূন্য অঙ্ক, পুনশ্চ, বেলাশেষে, পোস্ত এর উপযুক্ত উদাহরণ। এর পর পরই রয়েছেন মিঠুন চক্রবর্তী, পরাণ বন্দোপাধ্যায়। মিঠুনের তাহাদের কথা, কালপুরুষ, তিতলি, নোবেল চোর, শুকনো লঙ্কা, আমি সুভাষ বলছি, নকশাল এবং পরাণের প্রলয়, সিনেমাওয়ালা নিঃসন্দেহে আলোচনার দাবি রাখে।
মমতা শঙ্কর এবং সুপ্রিয়া দেবীর ক্ষেত্রেও গত এক দশকের বাজারের এ পরিবর্তনটা কাজের বেশ সুযোগ এনেছে। তবে প্রয়াত মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জীবনের শেষ উদাহরণও ভোলার মতো নয়, ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে হঠাৎই অবসর নেন। এরপর সুচিত্রা অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন। ফলে তিনি খুব একটা জনসমক্ষে আসেননি আর। জানা যায়, একবার তো বিশাল কালো চশমায় মুখ ঢেকে বইমেলায়ও গিয়েছিলেন ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু জানাজানি হওয়ার পর পালিয়ে বাঁচেন তিনি। অবশ্য উত্তম কুমারের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে নাকি রাতের অন্ধকারকেই সুচিত্রা বেছে নিয়েছিলেন। এমনকি ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য সুচিত্রা মনোনীত হলেও, ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সশরীরে পুরস্কার নিতে দিল্লি যাওয়ায় আপত্তি জানানোর কারণে তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। কিন্তু কেনো এ অন্তরীণ জীবন? অনেক কারণের একটা হয়তো এই যে, তিনি তার বুড়ো বয়সের চেহারাটা বরাবরই আড়ালে রাখতে চেয়েছেন!
কিন্তু তারকারা বার্ধক্যে কেনো আড়ালে চলে যাবে? কেনো হারিয়ে যাবে? তাহলে বিচ্ছিরি চেহারার বাস্তবতাকে বাঙালি চলচ্চিত্র কবে সাদরে গ্রহণ করতে শিখবে? বুড়ো বয়সে তো মানুষ দেখতে যুবকের মতো থাকবে না, তেমন তথাকথিত আকর্ষণীয় চেহারাও থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে বিচ্ছিরি চেহারার বাস্তবতাকে বাঙালি চলচ্চিত্র কখনই সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই শুধু বুড়ো বয়স নয়, মাঝ বয়স থেকেই তারকারা পেশা বদল শুরু করেন। এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যান। অসম্ভব রকমের মেধাবী আর বড়ো মাপের শিল্পী হলেও ‘মূলধারা’ চলচ্চিত্রের ‘নায়ক’ বা ‘নায়িকা’দের তরুণ বয়সে জমানো নাম, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি- এক জীবনে যা যা অর্জন করেছেন, সে পুঁজি নিয়েই মধ্য বয়সে এসে কেউ টেলিভিশন মিডিয়ায় ঠাঁই খোঁজেন, আবার অনেকেই রাজনীতিতে পাড়ি জমান; কেউ কেউ আবার চলচ্চিত্র মাফিয়া হওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। আর যারা তা না করেন তারা চলচ্চিত্রে নিষ্ক্রিয়, একঘেয়ে, অর্থহীন কিছু পার্শ¦চরিত্রে অভিনয় করেন। এর বাইরেও কেউ হয়তো অভিনয়কে ‘পাপ’ মনে করে পরবর্তী সময়ে ‘তওবা’ করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে ধর্মভীরু জীবনযাপন শুরু করেন। কিন্তু যদি বাজারি চলচ্চিত্রের গল্পগুলো সত্যিকারের বাস্তবতার কাছাকাছি হতো, তবে হয়তো অভিনয়শিল্পীদের জীবনের গল্পগুলোও অন্যরকম হতো।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের একটা সুসময়ের সম্ভাবনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত প্রায় তিন দশকের চলচ্চিত্রের নিম্নমানের বাজার থেকে পরিত্রাণের পথ আপাতত একটাই, দর্শকের মন ও চোখ উভয়কেই উদার করা এবং বিচক্ষণভাবে প্রস্তুত করা। এক কথায়, বাজারকে পুনঃনির্মাণ করা।
লেখক : দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ব্যক্তিগত প্রযোজনা সংস্থা ‘এ্যাপিফানিয়া ফিল্ম প্রোডাকশন’চালাচ্ছেন।
dipamahbuba@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন