ইব্রাহীম খলিল
প্রকাশিত ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
উল্টো করে দেখা নায়করাজ রাজ্জাক
ইব্রাহীম খলিল

মুছে যাওয়া দিনগুলো
পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিড়েও একসময় কলকাতার কিছু স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীদের আধিপত্য ছিলো! কোনো নাটকের আয়োজন করা হলে সাধারণত সেখানে অভিনয় করতো নারীরাই। তেমনই এক স্কুল কলকাতার খানপুর হাইস্কুল। সেবার পুজো উপলক্ষে আয়োজিত স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিক্ষক রথীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী একটু বেঁকে বসলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, নারীচরিত্র বর্জিত নাটক করার! এজন্য তিনি বেছে নিলেন নাটক ‘বিদ্রোহী’! কিন্তু, তখন নতুন সমস্যা হলো, এ নাটকের নায়ক কে হবে? প্রথম দিকে কাউকেই খুঁজে পেলেন না তিনি।
অবশেষে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এক কিশোরকে ধরে নিয়ে এলেন শিক্ষক রথীন্দ্রনাথ। কিন্তু ওই কিশোরের অভিনয়ে তেমন কোনো আগ্রহই নেই। কারণ সে বিভোর হয়ে থাকে ফুটবল খেলায়; স্বপ্ন দেখে তুখোড় গোলরক্ষক হওয়ার! পড়ার বাইরে তাকে যতটুকু পাওয়া যায়, সেটা কেবল ওই ফুটবল মাঠেই! কিন্তু শিক্ষক রথীন্দ্রনাথও নাছোড়বান্দা, তিনি সেই কিশোরকে জোর করেই নামিয়ে দিলেন নাটকের অভিনয়ে! এই শুরু, এরপর সেই কিশোর আর অভিনয় ছাড়েনি। যৌবনে পেশা হিসেবে বেছে নেন অভিনয়কেই। যৌবন পেরিয়ে যখন বার্ধক্য এলো, তখন যেনো তার অভিনয়ে আরো ক্ষিপ্রতা এলো। বার্ধক্যে তিনি যখন জরাজীর্ণ, তখনো তার মাথায় কেবলই অভিনয়! কারণ অভিনয় আর চলচ্চিত্র ছাড়া সারাজীবনে তিনি আর কিছুই করেননি; এ দুটোই ছিলো তার সাধনা। তার ভাষায়, ‘আমার প্রেম, আমার ভালোবাসা, আমার সবকিছু অভিনয় আর চলচ্চিত্র। এ ছাড়া আমি আর কিছু জানি না, পারি না। আল্লাহ আমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছেন। অনেক কিছু করতে পারতাম। করিনি।’১ আর এজন্যই তিনি পেয়েছেন অগণিত মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা; হয়েছেন মধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্নের কাক্সিক্ষত নায়ক। চলচ্চিত্র জগতের এ ‘সাধকের’ নাম আব্দুর রাজ্জাক ওরফে নায়করাজ রাজ্জাক।
রাজ্জাক থেকে নায়ক রাজ্জাক
ভারতের কলকাতায় ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি টালিগঞ্জের নাগতলাপাড়ার ৮ নম্বর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রাজ্জাক। তিন ভাই আর তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোটো। শৈশবেই বাবা আকবর হোসেন এবং মা নিসারুন্নেছাকে হারান তিনি। শিক্ষক রথীন্দ্রনাথ জোর করে অভিনয় করানোর পর অভিনয় নিয়েই থাকার ইচ্ছে হয় তার। কলেজ জীবনে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগও পেয়ে যান তিনি। অজিত ব্যানার্জি পরিচালিত রতন পাল বাঙ্গালী (১৯৫৮)-তে পকেটমারের ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে রঙ্গিন দুনিয়ায় পা রাখেন রাজ্জাক। তার অভিনীত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র পঙ্ক তিলক। মঙ্গল চক্রবর্তীর পরিচালনায় এই চলচ্চিত্রে তিনি এক ছাত্রের ভূমিকায় অভিনয় করেন। তৃতীয় চলচ্চিত্র শিলালিপিতে রাজ্জাক একটি গানের দৃশ্যে ২০ টাকার পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছিলেন অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে। অল্প পরিশ্রমে ২০ টাকা পেয়ে রাজ্জাকের নিজের প্রতি আস্থা আর উৎসাহ বেড়ে যায় বহুগুণে। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, টালিগঞ্জে তিনি ঠিক সুবিধে করতে পারবেন না। এখানে থাকলে তাকে কেবল ‘এক্সট্রা শিল্পী’ হয়েই থাকতে হবে। ফলে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ট্রেন চেপে চলে যান মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে)। তখন দু-চোখে তার কেবলই নায়ক হওয়ার স্বপ্ন। মুম্বাই গিয়ে অভিনয় শেখার জন্য এক বছরের কোর্সে ভর্তি হন ‘ফিল্মালয়’ নামের এক চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রতিষ্ঠানে। তখন ওখানে ক্লাস নিতেন দিলীপ কুমার, শশধর মুখার্জিরা। কিন্তু সেখানকার তাত্ত্বিক, পদ্ধতিগত শিক্ষা অস্থির রাজ্জাকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়। পরে বলিউডে অভিনয়ের সুযোগ না পেয়ে তিনি ফিরে আসেন কলকাতায়।
কলকাতায় এসে এবার বিয়ে করে কিছুটা থিতু হওয়ার চেষ্টা করেন রাজ্জাক। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরা থেকে দলে দলে মুসলিমরা পাড়ি দেয় পূর্ব পাকিস্তানে। রাজ্জাকও স্ত্রী খায়রুন্নেসা (লক্ষ্মী) ও শিশুপুত্র বাপ্পারাজকে নিয়ে ওই দাঙ্গার সময় ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২৬ এপ্রিল ঢাকায় পৌঁছান রাজ্জাক। তখন ঢাকায় তার চেনাজানা কেউ নেই। সঙ্গে শুধু নিয়ে এসেছেন পীযূষ বসুর একখানা চিঠি এবং পরিচালক আবদুল জব্বার খান ও শব্দযন্ত্রী মনি বোসের ঠিকানা। স্ত্রী ও সন্তানকে স্টেডিয়ামে উদ্বাস্তুর ভিড়ে রেখে রাজ্জাক গিয়ে দেখা করেন আবদুল জব্বার খানের সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই তিনি রাজ্জাককে কাজ দেওয়ার আশ্বাস দেন। রাজ্জাক পরে কমলাপুর এলাকায় মাসিক ৮০ টাকা ভাড়ায় বাসা নেন। উদ্বাস্তু রাজ্জাকের তখন আশ্রয় মেলে ঠিকই, কিন্তু জীবিকা অর্জনের কোনো পথ খুঁজে পান না। কেবল একা একা ঘুরে বেড়ান এফ ডি সি’তে, দেখা করেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা সুভাষ দত্ত, সৈয়দ আওয়াল, এহতেশামদের সঙ্গেও। কিন্তু ভরসা পাওয়ার মতো কিছুই পান না রাজ্জাক। শেষ পর্যন্ত তিনি নাটকে অভিনয় শুরু করেন। তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ঘরোয়া নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকের কাছে বেশ জনপ্রিয় হন। পরে আবদুল জব্বার খান ‘ইকবাল ফিল্মস’ নামের একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে তাকে কাজের সুযোগ করে দেন।
রাজ্জাক ‘ইকবাল ফিল্মস’-এ প্রথমে পরিচালক কামাল আহমেদের উজালায় (১৯৬৪) সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। সহকারী হিসেবে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র পরওয়ানা; কিন্তু নায়ক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রাজ্জাক চলচ্চিত্রটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ হওয়ার পর সেটি ছেড়ে দেন।২ অবশেষে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রের জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান রাজ্জাক। সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে আখেরি স্টেশন-এ অভিনয় করেন তিনি। ঢালিউডের চলচ্চিত্রে ওটিই রাজ্জাকের প্রথম কোনো অভিনয়।৩ পরে সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের বাংলাদেশি প্রথম পূর্ণাঙ্গ কমেডিনির্ভর চলচ্চিত্র তেরো নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন-এ অভিনয় করেন তিনি।
১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে রাজ্জাককে ডেকে পাঠান জহির রায়হান। রাজ্জাকের সঙ্গে সাক্ষাতের শুরুতেই জহির বলেন, “আমি ‘বেহুলা’ বানাচ্ছি, সুচন্দা এই ছবির নায়িকা বেহুলা আর আপনি হলেন নায়ক লখিন্দর। আপনাকে নায়ক বানিয়ে দিলাম, যান আজ থেকে আপনি নায়ক।”৪ এর পর রীতিমতো রিফিউজি থেকে নায়ক বনে যান রাজ্জাক। কারণ বেহুলা (১৯৬৬) ব্যবসায়িক সফলতা পাওয়ার পর তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে জুলেখা (১৯৬৭), নিশি হল ভোর (১৯৬৮), বাঁশরী (১৯৬৮), ময়নামতি (১৯৬৯), মনের মত বউ (১৯৬৯), নীল আকাশের নীচে (১৯৬৯), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), টাকা আনা পাই (১৯৭০), রংবাজ (১৯৭৩), ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০), আলোর মিছিলসহ (১৯৭৪) বেশকিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের ‘বিশেষত্ব’ দেখান রাজ্জাক। শুধু তাই নয়, সেসময় হঠাৎ করে তখনকার আরেক জনপ্রিয় নায়ক রহমান এক দুর্ঘটনায় পা হারালে চলচ্চিত্রশিল্প অনেকটা রাজ্জাকের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বলতে গেলে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি একাই টেনে গেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রকে। রাজ্জাক মোট পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। কি যে করি (১৯৭৬), অশিক্ষিত (১৯৭৮), বড় ভাল লোক ছিল (১৯৮২), চন্দ্রনাথ (১৯৮৪) ও যোগাযোগ (১৯৮৮) চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি এ পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাও লাভ করেন। রাজ্জাক তার জীবদ্দশায় প্রায় চারশো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি ১৬টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছেন।
যখন তিনি নায়করাজ
মহানায়ক (উত্তম কুমার), বিগ বি (অমিতাভ বচ্চন), কিং খান (শাহরুখ খান), মিস্টার পার্ফেকশনিস্ট (আমির খান)-এর মতো ‘নায়করাজ’ও একটি উপনাম/উপাধি। বিগ বি বলতে যেমন অমিতাভ বচ্চনের অবয়ব মাথায় আসে তেমনই নায়করাজ বললে রাজ্জাককেও চিনতে অসুবিধা হয় না। কারণ রাজ্জাক বাংলাদেশে নায়করাজ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু তিনি এ উপাধি কীভাবে পেলেন? এটা কি তার অর্জিত নাকি তার ওপর অর্পিত? প্রশ্ন জাগতে পারে, অধিকাংশ উপাধিই তো অন্যদের আরোপ করা। এটা তো কোনো ডিগ্রি নয় যে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেই অর্জন হয়ে যাবে। কথা সত্য, তবে একজন মানুষকে তখনই কোনো উপাধি দেওয়া হয় যখন তিনি সেটার যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে নায়ক রাজ্জাক এক্ষেত্রে নায়করাজ উপাধি পাওয়ার যোগ্য কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখানো সহজ নয়। কারণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মানসপটে তিনি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে তিনি কীভাবে নায়করাজ হলেন সেটা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।
প্রথমদিকে রাজ্জাককে দিয়ে জহির রায়হান কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে সেগুলো বেশ ব্যবসাসফল হয়। এরপর সুভাষ দত্তের আবির্ভাব-এ কবরীর বিপরীতে অভিনয় করেন রাজ্জাক। তখন থেকেই রাজ্জাক-কবরীর রোমান্টিক জুটি বেশ খ্যাতি পায়। নির্মাতারা এ জুটিকে নিয়ে একের এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকে। ফলে মাত্র সাত বছরেই নায়ক হিসেবে শত চলচ্চিত্রের মাইলফলকে পৌঁছে যান রাজ্জাক! ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দেই ক্যারিয়ারের ১০১তম চলচ্চিত্র হিসেবে প্রতিনিধি মুক্তি পেলে রাজ্জাক ‘নায়করাজ’ উপাধি পান।৫ এখন প্রশ্ন হলো, তাকে কে এই উপাধি দিলো? এ প্রসঙ্গে মৃত্যুর আগে রাজ্জাক তার সর্বশেষ জন্মদিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
যে সাংবাদিকরা আমাকে পাত্তা দিত না, আমার ফিচার ছাপত না, একদিন সেই সাংবাদিকরা হুট করেই রাতারাতি লেখা শুরু করলেন ‘নায়করাজ রাজ্জাক’। যারা লিখছেন তাদের জিজ্ঞেস করলাম, এ উপাধি কই পেলেন আপনারা? তখন তারা বললেন, উত্তম কুমার যদি মহানায়ক হতে পারে তা হলে আপনি নায়করাজ হতে পারবেন না কেন? তখন থেকে নায়করাজ হয়ে পথচলা শুরু আমার।৬
অভিনয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েই রাজ্জাক এই উপাধি অর্জন করেন। যারা তাকে পছন্দ করতো না, তাকে নিয়ে লেখালেখি করতো না, তারাই একসময় তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে নায়ক রাজ্জাকের নায়করাজ হওয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক। তবে রাজ্জাকের এই নায়করাজ হয়ে ওঠা নিয়ে এর বিপরীত বক্তব্যও আছে। মানে নিন্দুকেরা যে তাকে এ উপাধি দেয়নি সেটা রাজ্জাক আরেক সাক্ষাৎকারেই স্পষ্ট করে গেছেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক নিজেই ‘নায়করাজ’ হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে বলেন,
এক দল সাংবাদিক হঠাৎ করে দিয়েছে। তার মধ্যে মেইন ছিল আহমেদ জামান চৌধুরী। আমার খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড, চিত্রালীতে ছিল। বললাম, ‘কী এটা?’ বলল, ‘এটা আপনার প্রাপ্য।’ ‘আমি তো এখনো উপযুক্ত হইনি।’ বলল, ‘না, এখন হয়েছেন।’ তখন আমার ১০০তম ছবি হয়েছে। ... অহংকার নেই আমার, বাট ‘নায়করাজ’ বলায় আমি গর্বিত। এখন সব জায়গায় এটা চালু হয়ে গেছে। আবদুর রাজ্জাক না লিখে ‘নায়করাজ রাজ্জাক’ লিখে।৭
এখন প্রশ্ন হলো, রাজ্জাককে উপাধি দেওয়া এই আহমদ জামান চৌধুরী কে? যার কারণে সারা বাংলাদেশের মানুষ তাকে নায়করাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই মন্দাবস্থায় আহমদ জামান চৌধুরীকে অনেকেরই না চেনার কথা। চলচ্চিত্রের সেই স্বর্ণালী যুগে দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘চিত্রালী’র সম্পাদক ছিলেন আহমদ জামান চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি রাজ্জাকের অন্তরঙ্গ বন্ধুও! তিনি মোটেও রাজ্জাককে অবহেলা করতেন না। ফলে প্রশ্ন জাগে, তাহলে জামান চৌধুরী বন্ধু হওয়ার কারণেই কী রাজ্জাককে এ উপাধি দিয়েছেন? হয়তো সেটা হতে পারে তবে এটা ঠিক, তখন গোটা বাংলাদেশে অভিনয়শিল্পী হিসেবে রাজ্জাকের সাফল্য ছিলো ঈর্ষণীয়। সেসময় তিনি অনেক ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সমসাময়িক প্রায় সব নায়িকার সঙ্গেই কাজ করেছেন তিনি। রাজ্জাকের সঙ্গে কোনো কোনো জুটি সুপারহিট হলেও একটি জুটিও ফ্লপ করেনি। ফলে তার অধিকাংশ চলচ্চিত্রই ছিলো ব্যবসাসফল।৮ সেই সময় তার মতো এমন জনপ্রিয়তাও পায়নি অন্য কোনো নায়ক। ফলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে রাজ্জাকই যে নায়করাজ উপাধি পাওয়ার যোগ্য, সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
অনুকরণ ও অনুসরণের রাজ্জাক
কাজী জহির নির্মিত প্রেমনির্ভর চলচ্চিত্র অবুঝ মন (১৯৭২)। রাজ্জাক-শাবানা অভিনীত এ চলচ্চিত্রে দেখা যায়, দরিদ্র যুবক মাসুম তার বন্ধু বিজয়ের সহায়তায় ডাক্তারি পাশ করে গ্রামে আসেন মানুষের সেবা করতে। মাসুমকে ভালোবাসে তার সহপাঠী ডা. রাবেয়া। কিন্তু মাসুম সেটি জানে না। পথে ট্রেনে তার পরিচয় হয় জমিদারকন্যা মাধবীর সঙ্গে। পরিচয় রূপ নেয় প্রেমে। কিন্তু তারা দুজন ভিন্ন ধর্মের মানুষ। বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। মাধবীর বাবা জমিদার হওয়ায় তা ছিলো তাদের মিলনের পথে আরেকটি বাধা। জমিদারের অনুরোধে গ্রাম ছেড়ে চলে যায় মাসুম। মাসুমের বন্ধু বিজয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় মাধবীর। কিন্তু তাদের প্রেম মরে না। মাসুম-মাধবীর প্রেমের কথা জানতে পেরে তাদের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চান বিজয়। ঠিক সেই সময় তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় দৃষ্টি হারান। মাসুম তাকে নিজের একটি চোখ দান করেন। মাধবীকে অনুরোধ করেন বিজয়কে ভালোবাসতে। মাধবী সেই কথা মেনে মাসুমের সঙ্গে রাবেয়ার জীবন যুক্ত করে দেন।
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় কি যে করি। রাজ্জাক-ববিতা অভিনীত এ চলচ্চিত্রটির নির্মাতা জহিরুল হক। এই চলচ্চিত্রে অত্যাচারী বাবার হাতে মাকে জীবন দিতে দেখে শৈশব থেকেই পুরুষের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয় ববিতার। কিন্তু তার দাদার করা উইল অনুসারে সম্পত্তি পেতে হলে বিয়ে করতে হবে। তাই তিনি এক ফাঁসির আসামীকে বিয়ে করেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে আদালতে খালাস পান সেই আসামী। এর পর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। অবশেষে সেই আসামী রাজ্জাককে মন থেকে গ্রহণ করেন ববিতা।
অন্যদিকে মোহাম্মদ মহিউদ্দিন নির্মিত বড় ভালো লোক ছিল (১৯৮২)-তে গ্রামের এক দরবেশের ছেলে রাজ্জাক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। ট্রাক দুর্ঘটনায় বাবার অকাল মৃত্যুতে গ্রামে আসেন রাজ্জাক। তিনি আধ্যাত্মিক শক্তিকে স্বীকার না করলেও তার মধ্যে সেটির প্রকাশ দেখা যায়। গ্রামের এক মেয়ে ভালোবাসে এক ট্রাক চালককে। কিন্তু সেই মেয়েকে দেখে তার প্রতি প্রলুব্ধ হন রাজ্জাক। এই ঘটনার পর তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা চলে যায়। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সুপথে ফিরে আসেন তিনি এবং মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মিত চন্দ্রনাথ-এ (১৯৮৪) দেখা যায়, কাশিতে গিয়ে দরিদ্র তরুণী সরযূ’র সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণ জমিদার চন্দ্রনাথের। পরে সরযূকে ভালোবেসে বিয়ে করে গ্রামে নিয়ে আসেন তিনি। গ্রামে এসে জানতে পারেন, সরযূর মায়ের চরিত্র নিয়ে বদনাম রয়েছে। শেষে সমাজের চাপে সরযূকে ত্যাগ করে আবারও কাশিতে পাঠিয়ে দেন চন্দ্রনাথ। একই সঙ্গে নিজেও গৃহত্যাগী হন। বেশ কয়েক বছর পর অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে অবশেষে তাদের মিলন হয়।
রাজ্জাক অভিনীত প্রথমদিকের এ ধরনের অধিকাংশ চলচ্চিত্রেই দেখা গেছে, ক্লিনশেভ, কালো চুল, বড়ো কপালের চেহারা; শহুরে, একই সঙ্গে রোমান্টিকও। তিনি প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলেন। আসলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের আমলে আমদানি নিষিদ্ধ করলে এদেশে ভারতের চলচ্চিত্র প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় উত্তম-সুচিত্রা আর সৌমিত্রে বুঁদ হয়ে থাকা পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত বাঙালি রাজ্জাককে খুঁজে পায় উত্তম কুমার হিসেবেই। অন্যদিকে রাজ্জাকের বাচনভঙ্গি, অভিনয় আর চালচলনেও ছিলো উত্তম কুমারের ছায়া। অবশ্য এটা যে রাজ্জাক নিজে বুঝতেন না, সেটাও কিন্তু নয়। তারপরও এ ধরনের চলচ্চিত্র মানুষ পছন্দ করায় এবং উত্তম কুমারকে তিনি নিজেও আইডল ভাবায়, সেটা হয়তো নিজের অজান্তেই পুনরাবৃত্তি করেন।
তবে প্রথমদিকের কিছু চলচ্চিত্রে গণ্ডির বাইরে গিয়েও অভিনয় করেছেন তিনি; যেমন, জীবন থেকে নেওয়া, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রথম অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র রংবাজ-এ (১৯৭৩) রাজ্জাক হাজির হয়েছেন একেবারেই ভিন্ন রূপে। রোমান্টিক নায়ক বলে খ্যাত রাজ্জাক রংবাজ-এ নিজের খোলনলচে একেবারে পাল্টে দিয়েছেন। এসব চলচ্চিত্রে নায়ক হয়ে ওঠার একটা প্রবণতাও তার মধ্যে লক্ষ করা যায়। তবে তার সময়কালে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা। যদিও অনেকে মনে করে, সেসময় হাতেগোনা কয়েকজন অভিনয় করায় কোন ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই রাজ্জাক এক ধরনের ফাঁকা মাঠে অবস্থান করে নিয়েছিলেন।৯ কিন্তু রাজ্জাকের সমসাময়িক নায়ক আলমগীর নিঃসন্দেহে একজন শক্তিমান অভিনয়শিল্পী। এছাড়া জাফর ইকবাল, বুলবুল আহমেদ, সোহেল রানা, ফারুকের অভিনয় দক্ষতা ও জনপ্রিয়তা ফেলে দেওয়ার মতো ছিলো না। কিন্তু তাদের সবার মধ্যে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে ছিলেন রাজ্জাক। রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি বাধা জনপ্রিয় নায়িকা কবরী মনে করেন, জনপ্রিয়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘রাজ্জাকের ভাগ্যও কাজ করেছে। কারণ অনেক মেধাবী এবং সৃষ্টিশীল পরিচালকের সাথে রাজ্জাক কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ... সুযোগ না পেয়ে সিনেমা জগতেই অনেক মেধাবী হারিয়ে গেছে।’১০
অবশ্য নিজের জনপ্রিয়তা আর অভিনয় সম্পর্কে রাজ্জাকের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ-‘নির্মাতার নির্দেশে কখনো কখনো নিজেকে ভেঙ্গে-চুর [ভেঙ্গে-চুরে] নতুন করে গড়ে তুলেছি। কখনো রোমান্টিক হিরো, কখনো সামাজিক, কখনো বা অ্যাকশন হিরো। স্বভাব সুলভভাবে উতরে গেছি প্রতিটি চরিত্রে।’১১ তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, রাজ্জাক অভিনীত অধিকাংশ চলচ্চিত্র বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে, ব্যবসাসফলও হয়েছে; আর তাতে হয়তো রাজ্জাক নিজেকে সফল অথবা সেরাও ভাবতে পারেন; বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় হয়তো তিনি সেরাও। কিন্তু তিনি আদৌ অভিনয়ের ক্ষেত্রে নিজেকে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন কিনা, তা নিয়ে বোধ হয় ভাবার অবকাশ আছে। কারণ উত্তম কুমারের অবয়ব, বাচনভঙ্গিতে অভিনয় করায়, প্রথম জীবনের চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি অনুকরণ থেকে বের হতে পারেননি। শেষদিকে তিনি যেসব সামাজিক বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তাতেও নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়ের ছাপ রেখে যেতে পারেননি। তার সমসাময়িক টালিগঞ্জে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বলিউডে অমিতাভ বচ্চন, হলিউডে টম হ্যাংকস যেভাবে শুরু থেকে আজাবধি অভিনয়ে প্রতাপ, স্বতন্ত্র আর বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন তার কিছুই করতে পারেননি রাজ্জাক।
এর কারণ অবশ্য রাজ্জাকের ‘সফলতা’র বয়ানেই লুকিয়ে আছে। চলচ্চিত্রে নায়করাজ হয়ে ওঠার পিছনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘১৯৬৪ সালে আমি এদেশে আসার পর থেকেই নিজেকে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রেখেছি অভিনয় জগতে। ছোট-বড় কোনো চরিত্রের প্রতিই আমার না ছিল না। ... ১৯৬৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা ২৫ বছর প্রায় ৩৫০টি ছবিতে আমি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করি।’১২ এ পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়, আসলে রাজ্জাক কতো ব্যস্ত একজন তারকা ছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে রাজ্জাক অভিনীত ২০টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়!১৩ তার মানে তিনি মাসে প্রায় দুটি করে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন! আর তাতেই প্রশ্ন ওঠে, তার দ্বারা স্বতন্ত্র কিছু করা সম্ভব কি না? কারণ কোনো চরিত্র অনুধাবন বা চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে সময়ের প্রয়োজন। তা না হলে সেটা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব নয়। ফলে এ কথা বলা যেতেই পারে, তিনি কেবল চলচ্চিত্রে অভিনয়ই করে গেছেন, কখনো চরিত্রাভিমুখী হতে পারেননি। কারণ অভিনয়ে কোনো চরিত্রে প্রবেশের জন্য সেসময়টুকুই তিনি দিতে পারেননি! ফলে রাজ্জাক অভিনীত অধিকাংশ চলচ্চিত্র ব্যবসা করলেও অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি কতটুকু মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কোথায় ছিলেম, এলেম হেথায়
৯০ দশকের শেষের দিকে ঢালিউডের চলচ্চিত্রে নামের ক্ষেত্রে ‘কেন’ শব্দটির বেশ আধিক্য দেখা যায়; যেমন, স্বামী কেন আসামি, শান্ত কেন মাস্তান, বাবা কেন আসামি। রাজ্জাকও ঠিক এ রকম একটি সময়ে ‘কেন’ দিয়ে নির্মাণ করেন বাবা কেন চাকর (১৯৯৭)। এই চলচ্চিত্রে রাজ্জাকই ছিলেন কেন্দ্রীয় অভিনয়শিল্পী। এটি রাজ্জাকের সর্বশেষ ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রও। পরের বছরই চলচ্চিত্রটি তার প্রযোজনায় কলকাতায় রিমেক করেন স্বপন সাহা। সেখানেও কেন্দ্রীয় চরিত্রে রাজ্জাকই অভিনয় করেন। এছাড়া টালিগঞ্জের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তও ছিলেন। একসময়কার দাপুটে গৃহকর্তা কীভাবে সংসারে ক্রমেই গুরুত্বহীন হয়ে বাড়ির চাকরে পরিণত হয়, সেই কাহিনি নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বেশ প্রশংসা পান রাজ্জাক। পরে ঢালিউডের চলচ্চিত্রে ‘অশ্লীলতা’ প্রবেশ করতে থাকলে তিনি নিজেকে চলচ্চিত্র থেকে গুটিয়ে নেন।
‘অভিনয়ের’ টানে এরপর তিনি পাড়ি জমান টালিগঞ্জে। জীবনের শুরুতে সেখানে জায়গা না পেয়ে ফিরে আসলেও এবার তিনি সমাদর পান। একে একে অন্নদাতা, জন্মদাতা, হিরো, এরই নাম প্রেম-এ অভিনয় করেন। মজার বিষয় হলো বাবা কেন চাকর, অন্নদাতা, জন্মদাতা ছিলো একই ধাঁচের চলচ্চিত্র। এ তিনটি চলচ্চিত্রেই সংসারে দাপটওয়ালা গৃহকর্তা থেকে পরিবারে অবাঞ্ছিত সদস্য হয়ে পড়ার কাহিনি তুলে ধরা হয়। ফলে প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে বাবা কেন চাকর ভারতে জনপ্রিয়তা পেলেও পরেরগুলো আর সেভাবে ব্যবসা করতে পারেনি। কারণ এসব চলচ্চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে মানুষকে আবেগতাড়িত করলেও মানুষের হৃদয়ে কোনো বোধোদয় ঘটায় না। বরং ক্রমাগত উপদেশের কারণে সবকিছু কেমন যেনো খেলো হয়ে ওঠে। ফলে চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের চোখের পানিতে দর্শকের বুক ভাসলেও অভিনয়শিল্পী হিসেবে টালিগঞ্জে তার অবস্থান পাকাপোক্ত হয় না। ফিরে আসেন দেশে।
রাজ্জাক তার জীবনে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনাসহ প্রায় চারশো চলচ্চিত্রে অভিনয়সহ ১৬টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পারিচালনা করেন। প্রথম জীবনের অধিকাংশ চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তা পেলেও শেষের দিকে কেবল বাবা কেন চাকর ছাড়া অন্য কোনো চলচ্চিত্র তেমন জনপ্রিয়তা কিংবা অবস্থান করে নিতে পারেনি। চলচ্চিত্রাধিক্যে ভরা তার সমগ্র জীবনই ছিলো অভিনয়ের পিছনে ছুটে চলা। তবে তার জনপ্রিয়, অনুকরণীয় ও আদুরে অভিনয় এবং বছরে ২০টি চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার চিত্র দেখে প্রশ্ন জাগে, সারাটা জীবন আসলে তিনি অভিনয়শিল্পী নাকি কেবল নায়ক-তারকা হতে চেয়েছিলেন?
হরি, দিন যে গেলো সন্ধ্যা হলো
১৯৬০-এর দশকে উর্দু চলচ্চিত্রের আধিপত্য থেকে বাংলা চলচ্চিত্রকে উদ্ধারের পিছনে রাজ্জাকের বেশ অবদান রয়েছে। বেহুলায় চাঁদ সওদাগরের পুত্র লখিন্দর রূপে তার আবির্ভাব হয়েছিলো। সেসময় ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি না হওয়ায় তিনি দর্শককে উত্তম কুমারের অভাব বুঝতে দেননি। অভিনয়, চালচলনে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনিই বাংলাদেশের উত্তম কুমার। বাংলাদেশের দর্শকও তাকে সেভাবেই গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে রাজ্জাক উর্দু চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেও টিকে ছিলেন। সেসময় উর্দু চলচ্চিত্রকে বিদায় জানিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠায় কার্যকরী ভূমিকাও পালন করেন তিনি। ৭০-এর দশকে তিনি যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে তখন অভিনয় করেন অনন্ত প্রেম (১৯৭৭)-এ। রাজ্জাকের পরিচালনা ও প্রযোজনায় এটি বেশ আলোচিত হয়। তবে অনন্ত প্রেম¬-এ রাজ্জাকের অভিনয় মোটেও আলোচনায় ছিলো না। এটি রাজ্জাক ও ববিতাকে ছাপিয়ে আলোচনায় আসে তাদের একটি চুম্বন দৃশ্য নিয়ে। কারণ এর আগে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রে এ রকম কোনো দৃশ্যের অবতারণা হয়নি। এ নিয়ে রাজ্জাক এক স্মৃতিচারণে বলেন,
সন্ধ্যায় শুটিং ইউনিটে ফিরে ববিতার খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলাম, ববিতা কাঁদছেন। কী ব্যাপার পপি, কী হয়েছে? ... ববিতা আরও জোরে কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘রাজ্জাক ভাই, ওই দৃশ্যটিতে বোধ হয় কাজ করা ঠিক হলো না। আমার তো এখন আর বিয়ে হবে না।’ আমি পপিকে আশ্বস্ত করে বললাম, ‘ছবিটির সম্পাদনা শেষ হোক। তুমি দেখে নিয়ো। যদি তোমার কাছে মনে হয় যে দৃশ্যটি খারাপ লাগছে, তবে আমি এ দৃশ্যটি ফেলে দেব।’ সম্পাদনা শেষে ববিতা ওই দৃশ্যটি দেখে বলল, ‘নাহ্, ঠিক আছে।’১৪
শেষ পর্যন্ত অনন্ত প্রেম সেন্সরে জমা দেওয়ার সময় চুম্বন দৃশ্যটি রাখেননি রাজ্জাক। তবে ফলাও করে চুম্বন দৃশ্যের ছবি দিয়ে সংবাদপত্রে প্রচারণা চালানো হয়। ‘আজ সেই কাক্সিক্ষত শুক্রবার, অনন্ত প্রেম সিনেমা মুক্তির প্রতীক্ষিত দিন। চুম্বন দৃশ্যের প্রথম ঢাকাই চলচ্চিত্র, ঢাকার ছবিতে চুমু এলো’-এ রকম নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করে প্রচার করা হয়। প্রেক্ষাগৃহে এসে সেই চুম্বন দৃশ্য না পেয়ে দর্শক হতাশ হলেও চলচ্চিত্রটি বেশ আলোচনায় আসে এবং ব্যবসা করে। এ সময় যৌনতা ও ফ্যান্টাসিধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও অনন্ত প্রেম যেনো তার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করে। অথচ এই রাজ্জাকই ৯০ দশকের শেষ দিকে চলচ্চিত্রে ‘অশ্লীলতা’র অভিযোগ তুলে নিজেকে সরিয়ে নেন। প্রশ্ন জাগে, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় রাজ্জাককে কেনো চুম্বন দৃশ্য সম্বলিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলো! সেটা কি কেবলই ব্যবসা? সেটা হতেই পারে; কারণ রাজ্জাকের নিজের ভাষ্য, তিনি জাত ব্যবসায়ী। তার জন্মই ব্যবসায়ী পরিবারে।১৫
অন্যদিকে আলোচনার জন্ম দেওয়া চুম্বনের দৃশ্যটি শ্লীল নাকি অশ্লীল সেটা হয়তো তর্ক সাপেক্ষ। তবে রাজ্জাকের ভাষ্যানুযায়ী এ দৃশ্যটি ছিলো চরিত্রের প্রয়োজনে। ফলে সেটা মোটেই অশ্লীল নয়। প্রশ্ন হলো, তাহলে চলচ্চিত্র মুক্তির আগেই তিনি কেনো নিজে থেকেই সেই চুম্বনের দৃশ্যটি কেটে বাদ দিলেন? সেটা সেন্সরে ‘অশ্লীলতা’র দায়ে আটকে দেবে সেজন্য? নাকি এই দৃশ্যটি চলচ্চিত্রটিতে আছে কি নেই, সেটা নিয়ে একটা ধোঁয়াশা তৈরি করে ব্যবসার জন্য? অথচ সেই চুম্বনের দৃশ্যকে পুঁজি করেই কিন্তু সংবাদপত্রে প্রচারণা চালানো হয়!
রাজ্জাক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে অদ্বিতীয়। রাজ্জাকের মতো এমন কিংবদন্তি তারকা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আর আসবে কিনা, সেটা নিয়েও অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম মনে করেন,
‘রাজ্জাকের সমসাময়িক অন্যরাও ভাল করেছেন। কিন্তু তাঁরা কেউ রাজ্জাকের জনপ্রিয়তার কাছে যেতে পারেননি। আর এখনকার জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে যদি সাকিব [শাকিব] খানের কথা বলি। এসব জনপ্রিয়তা সাময়িক। কিন্তু রাজ্জাকের জনপ্রিয়তা দীর্ঘ সময়ের। ... সুতরাং তিনি কালোত্তীর্ণ হতে পেরেছেন।’১৬
হয়তো অধিকাংশ চলচ্চিত্রনির্মাতা, গবেষকও এমনটা মনে করেন। আসলে রাজ্জাক কেবল অভিনয় নয়, কীভাবে চলচ্চিত্র সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, সেই চিন্তাও করেছেন। ফলে তার দীর্ঘ চলচ্চিত্রিক জীবনের নানা পর্যবেক্ষণ থেকে সৃষ্ট অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্জাক সর্বশেষ জন্মদিনে তরুণ নির্মাতাদের উদ্দেশে বলেছিলেন,
... আগে ছবির বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়। দেখ কতরকম লোক আছে। এখানে একেকজনের মন-মেজাজ একেকরকম। তাদের মন-মেজাজ বুঝে ছবি বানাও। হলে দর্শক বাড়াও। শুধু সিনেপ্লেক্সে তোমার ছবি চলবে আর পেনড্রাইভ বা ডিস্কে করে নিয়ে গিয়ে ফেস্টিভ্যালে দেখাবে। তারা সার্টিফিকেট দিল। দেশে এসে ভালো নির্মাতার খেতাব নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন। এতে কী লাভ? এসব ছেড়ে দর্শক বাড়ানোর ছবি বানাও। এতে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচবে।১৭
চলচ্চিত্রশিল্প বাঁচানো নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। তবে ৯০ দশকের শেষের দিকে ঢালিউডের চলচ্চিত্রে ‘অশ্লীলতা’র আগমন ঘটলে তিনি যেভাবে অভিমান করে এ খাত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তাতে চলচ্চিত্রের প্রতি তার দায়িত্বহীনতাই প্রকাশ পায়। ধরে নিলাম, তিনি ‘অশ্লীলতা’র বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছেন, অনেক আন্দোলনও করেছেন। কিন্তু ‘অশ্লীল’ চলচ্চিত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি ‘সুস্থধারা’র কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি! এমনকি তার রাজলক্ষ্মী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। বরং এ সময় তাকে অভিনয়ের জন্য ঢালিউড ছেড়ে টালিগঞ্জের দিকে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। ফলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে আজ যে দর্শকহীনতা সেটার জন্য নায়করাজের দায়টাও যে কোনো অংশে কম নয়, সেটা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়।
তার পরও রাজ্জাক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নে অনেক ভেবেছেন। এফ ডি সির উন্নয়ন, বহিরাগতদের আগমন বন্ধ করতে অনেক আন্দোলনও করেছেন। শিল্পীদের অধিকার নিয়েও বেশ সোচ্চার ছিলেন তিনি। হয়তো তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে সে চেষ্টা তার অব্যাহত ছিলো। অন্যদিকে চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসাও ছিলো আমরণ। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন,
এখনকার আর্টিস্টদের ডিমান্ড দেখলে ছবি একেবারেই ছেড়ে দিতে মন চায়। অথচ আমি, ফারুক সাহেব আর পারভেজ সাহেবরা কীভাবে শুটিং করেছি! শুনলে অবাক হবে। আমরাও কিন্তু তখন ডিমান্ড করতে পারতাম। কিন্তু করিনি। কারণ আমরা নিজেদের ফিল্মের লোক মনে করতাম। মনে করতাম আমরাই তো সিনেমা। এটা তো আমারই সম্পদ। কয়েকজন এক রুমে থেকেছি আমরা। একই নৌকায় কয়েকজন রাত পার করেছি কক্সবাজারে। এখন আর্টিস্টরা সেখানে পাঁচ তারকা হোটেল খোঁজে। অথচ তাদের হাতে সিনেমা থাকে না।১৮
তবুও তুমিই সেরা
রাজ্জাকের লাশ শহীদ মিনারে রাখা হলে অনেকগুলো বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল তা সরাসরি সম্প্রচার করে। ধারাবর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে নানাজনের টুকরো-টুকরো নানা প্রতিক্রিয়াও টেলিভিশনে দেখানো হয়। একসময় একজন বোরখা পরা নারী একটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে এসে অঝোরে কাঁদছিলেন। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু বলতে পারলেন, তার মর্মার্থ হলো এমন-রাজ্জাক তার নায়ক ছিলেন। সে নায়ককে তিনি আর কখনো দেখবেন না। তার দুই কন্যাও কোনোদিন রাজ্জাককে নায়ক হিসেবে আর পাবে না।১৯
আসলে নায়করাজ রাজ্জাকের এ রকম হাজারো ভক্তকূল রয়েছে। যারা জানে তিনি আর কখনোই ফিরে আসবেন না, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা থাকতে পারে; ব্যক্তিজীবনেও রাজ্জাকের অনেক দোষত্রুটি থাকতে পারে। হয়তো তার অভিনয়ে অনেক অনুকরণ ও একঘেয়েমি ছিলো, কিন্তু ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে তিনিই সেরা। আর সেই সেরাটা তিনি কাজের মাধ্যমেই অর্জন করেছেন। তিনিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের নায়করাজ; তিনিই বাংলাদেশের উত্তম কুমার। দর্শকের হৃদয়পটে তাই বুড়ো রাজ্জাক নয়, স্মৃতি হয়ে থাকবে সদা হাস্যোজ্জল তরুণ নায়করাজ রাজ্জাক।
লেখক : ইব্রাহীম খলিল, তিনি জাগো বাংলা সংবাদপত্রে সহসম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
ibrahimrumcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
1. https://goo.gl/DXVdHx; retrieved on 28.08.2017
2. https://goo.gl/UT1H3N; retrieved on 10.09.2017
3. https://goo.gl/KHt9QA; retrieved on 10.09.2017
4.http://www.kalerkantho.com/home/printnews/535340/2017-08-24; retrieved on 10.09.2017
5. https://goo.gl/3K68TF; retrieved on 10.09.2017
6. https://goo.gl/rteRyn; retrieved on 10.09.2017
7. http://www.kalerkantho.com/online/entertainment/2017/08/22/534880; retrieved on 10.09.2017
8. http://www.bd-pratidin.com/editorial/2017/09/07/261866; retrieved on 10.09.2017
9. http://www.bbc.com/bengali/news-41034602; retrieved on 10.09.2017
10. http://www.bbc.com/bengali/news-41034602; retrieved on 10.09.2017
১১. রাজ্জাক (২০১৬ : ২৬৪-২৬৫); ‘যেভাবে আমি নায়করাজ’; চিত্র পরিচালক ও তারকাদের আত্মকথা; সম্পাদনা : অনুপম হায়াৎ; তৃণলতা প্রকাশ, ঢাকা।
১২. প্রাগুক্ত; রাজ্জাক (২০১৬ : ২৬৫)।
13. https://goo.gl/cKPTEr; retrieved on 10.09.2017
14. https://bangla.bdnews24.com/glitz/article1382806.bdnews; retrieved on 10.09.2017
১৫. প্রাগুক্ত; রাজ্জাক (২০১৬ : ২৬৬)।
16. http://www.bbc.com/bengali/news-41034602; retrieved on 10.09.2017
17. https://goo.gl/rteRyn; retrieved on 10.09.2017
18. https://goo.gl/rteRyn; retrieved on 10.09.2017
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন