Magic Lanthon

               

হিরু মোহাম্মদ

প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

পোশাকি-ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের আর্তনাদ এবং নির্মাতা ইবনে মিজানের পুনর্পাঠ

হিরু মোহাম্মদ


রূপকথা থেকে বাস্তবতা


ছোটোবেলায় আপনজনদের কাছে রূপকথার গল্প শোনেনি কিংবা বড়োরা ছোটোদের কাছে সেই গল্প বলেনি-এমন লোক খুব কমই আছে। সেটা শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব যেকোনো অবস্থান কিংবা শ্রেণির লোকই হোক না কেনো। এখন অবশ্য প্রযুক্তির বদলৌতে শিশুরা রূপকথার সেই গল্প-কাহিনি শোনার চেয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করে। তাই তাদের কাছে ‘টম অ্যান্ড জেরি’, ‘ওগি’, ‘মেগা পাওয়ার রেনঞ্জার’, ‘গোপাল ভাঁড়’ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু এখন না হয় শত শত টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট রয়েছে, যখন এসব ছিলো না; তখন এই শিশুদের, কখনো কখনো বড়োদের কল্পনার জগতে ভাসার অন্যতম মাধ্যম ছিলো ওই রূপকথার এসব গল্প-কাহিনি। যা সময়ের সঙ্গে কল্পনার রাজ্যকে প্রসারিত করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের জীবনে। তাই হয়তো কল্পনার জগতে ভাসতে ভাসতে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, নকশা করেছিলেন আকাশে উড়ার যন্ত্রের। যা একদিন বাস্তব-সত্য হয়ে ধরা দেয় উড়োজাহাজ হয়ে। শুধু রূপকথার গল্প-কাহিনি নয়, চিত্রকলা, নাটক, সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং শিল্পের অন্য সব মাধ্যমও মানুষকে কল্পনায় ভাসায় আবার বাস্তব-সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়।


দৃশ্যগত মাধ্যম চলচ্চিত্র অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে এই দিক থেকে খানিকটা এগিয়ে। নীল আর্মস্ট্রং তার দল দিয়ে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে চাঁদে পা রাখেন, তার অনেক আগে অবশ্য ফ্রান্সের চলচ্চিত্রনির্মাতা জর্জ মেলিয়ে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে A Trip to the Moon চলচ্চিত্রে মানুষকে চাঁদে নিয়ে যান। তিনি শুধু মানুষকে চাঁদে নিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং সেই মানুষকে দিয়ে চাঁদের মানুষদের মেরেছেনও। আবার তাদের ফিরিয়েও নিয়ে এসেছেন পৃথিবীতে। মেলিয়ে দর্শককে ফ্যান্টাসি দেখিয়েছেন, একই সঙ্গে মানুষের কল্পনার জগৎকে প্রসারিতও করেছেন। এসব কাজ মেলিয়ে এমন একসময় শুরু করেছিলেন, যখন চলচ্চিত্র চলমান চিত্রের বেশি কিছু দেখাতে না পারায় গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছিলো। The Kingdom of the Fairies (1903), The Merry Frolics of Satan (1906)প্রভৃতি চলচ্চিত্রে ফ্যান্টাসি দিয়ে চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দেন মেলিয়ে। তিনি দর্শককে বুঝিয়ে দেন চলচ্চিত্র শুধু চলমান চিত্রই নয়, ঢের কিছু। এসব চলচ্চিত্রের চরিত্রের সঙ্গে দর্শকও আকাশে ওড়ে, বাতাসে ভাসে, পাতালে চলে যায়, হাওয়া হয়ে যায়। ফলে ফ্যান্টাসির টানে দর্শক চলচ্চিত্রে ভিড়তে থাকে।



ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি, বিভিন্ন চলচ্চিত্র কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে ফ্যান্টাসি। তবে আর্থসামাজিক অবস্থাভেদে যেমন মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা লক্ষ করা যায়, তেমনই ভিন্নতা দেখা যায় ফ্যান্টাসির ধরনেও। ফোক-ফ্যান্টাসি ও পোশাকি-ফ্যান্টাসি নামে দুটি উল্লেখযোগ্য ধারার উপস্থিতি দীর্ঘদিন লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে। দেব-দৈত্য, জ্বীন-পরী, রাক্ষস-খোক্ষস, রাজা-প্রজা, সাধু-সন্ন্যাসী, পীর-ফকির প্রভৃতির কাহিনি নিয়ে ফোক-ফ্যান্টাসি। আর পোশাকি-ফ্যান্টাসির ক্ষেত্রে অবশ্য স্থান-কাল, পাত্র-পাত্রী, সংস্কার-সংস্কৃতি, ইতিহাস বা ভৌগোলিকতাকে চূড়ান্তভাবে অস্বীকার করে পোশাক-আশাকের চাকচিক্য, জৌলুশ, প্রসঙ্গে-অপ্রসঙ্গে মারামারি, সংঘাত-সংঘর্ষ প্রভৃতির প্রাধান্য দেখা যায়। এই দুই ধারার চলচ্চিত্র বাংলাদেশে অনেকটা সময়জুড়ে রমরমা অবস্থানে ছিলো। তাতে সাইদুর রহমান মুকুল, অশোক ঘোষ, আজিজুর রহমান, ইবনে মিজানসহ অনেক প্রতিনিধিত্ব করেন। এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে ইবনে মিজান। এজন্য স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বাংলা ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের ‘মুকুটহীন রাজা’ বলা হয়। এই আলোচনা মূলত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, তাতে ফ্যান্টাসি এবং ইবনে মিজান ও তার ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রকে ধরে।


শিকড়ের কাছে গিয়ে পথ দেখালো রূপবান


সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী নির্মাণের পরের বছর আবদুল জব্বার খাঁনের মুখ ও মুখোশ (১৯৫৬) দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয়। জব্বার খাঁনের হাত ধরে যে বাংলা চলচ্চিত্রের সূচনা, তার ভিতকে দৃঢ় করতে বেশকিছু শিল্পমনস্ক মানুষ চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসেন; তাদের অন্যতম এ. জে. কারদার, ফতেহ লোহানী, এহতেশাম, সালাহউদ্দিন, মহিউদ্দিন, জহির রায়হান প্রমুখ। তারা চলচ্চিত্রকে গ্রহণ করে শিল্পমাধ্যম হিসেবে এবং নির্মাণ করে বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র। এ ধারা চলে মুখ ও মুখোশ থেকে ৬০-এর দশকের প্রথম দুই বছর। কিন্তু এর পর থেকে দেখা দেয় উল্টো চিত্র, বিশেষ করে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে। এই সময় বাংলা চলচ্চিত্রে অস্তিত্বের সঙ্কট দেখা দেয়! বাংলাদেশের চলচ্চিত্র থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে মুম্বাই, লাহোর ও হলিউডের চলচ্চিত্রের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ে।



চলচ্চিত্র শুরু থেকে প্রাযুক্তিক মাধ্যম, তাতে অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় এবং সেই অর্থ দর্শককে চলচ্চিত্র দেখিয়ে প্রযোজকের পকেটে আনতে হয়। আবার সেই অর্থ দিয়েই পরিচালক, প্রযোজক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। কিন্তু সেসময় ঢাকাই চলচ্চিত্রের নির্মাতারা যেসব বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে আসছিলো, সেগুলো দর্শক কম গ্রহণ করছিলো; বিপরীতে তারা নাচ-গানে ভরপুর হিন্দি ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র জোরালোভাবে গ্রহণ করতে থাকে। তাই দর্শকের কথা এবং নিজেদের আর্থিক বিষয়টা মাথায় রেখে ঢাকার নির্মাতারা উর্দু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে। এই প্রবণতাকে আরো বেগবান করে উর্দু ভাষার চান্দা (১৯৬২) ও তালাশ (১৯৬৩)-এর আর্থিক সাফল্য। এতদিন যারা ঢাকাই বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে আসছিলো, তাদের অনেকেই উর্দুতে চলচ্চিত্র নির্মাণে ঝুঁকে পড়ে; এই ভেবে যে, উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে পুরো পাকিস্তানের দর্শক ধরা সহজ হবে।


তাই ঢাকার নির্মাতারা ৫০-এর দশক থেকে চলচ্চিত্রের যে ধারা তৈরি করেছিলো, তা বাদ দিয়ে নাচ-গানে ভরপুর উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে পুঁজির কাছে হার মানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ! যে বাংলার জনগণ ৫২’র ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার জন্য সংগ্রাম করে জীবন দিতে দ্বিধা করেনি, তারাই মুনাফার টানে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুতে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে। এটাই হয়তো পুঁজির স্বার্থকতা; তবে তা পরাজিত করে শিল্পী ও শিল্পকে। প্রকৃত শিল্পী ও তার শিল্প সবসময়ে কাঠামোবদ্ধ সমাজের বাইরে গিয়ে মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, মুক্তির কথা বলে। যখন সাধারণ মানুষের রাস্তায় নেমে অন্যায়-অবিচার-শোষণ-নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে পারে না, তখন একমাত্র প্রতিবাদের ভাষা হয় তাদের শিল্প। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মধ্যে তার তেমন কোনো ছাপ পাওয়া যায় না-সারাদেশে অস্থির অবস্থা, আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনে বাংলার মানুষের গণতন্ত্র চাপা পড়ে আছে এবং জনগণ শোষিত হচ্ছে। কিন্তু এর প্রতিবাদে চলচ্চিত্র তৈরি করতে দেখা যায়নি ঢাকার নির্মাতাদের!


এদিকে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকার নির্মাতারা বাংলা ভাষার বিপরীতে উর্দুতে চলচ্চিত্র নির্মাণে হিড়িক জমায়, তা ভুল প্রমাণ করে দেয় সালাহউদ্দিনের রূপবান (১৯৬৫)। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর ব্যবসায়িকভাবে পাকিস্তানের আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। যারা এতদিন বাংলা চলচ্চিত্র ব্যবসা না করায় ‘অবহেলা’ করে উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণে ভিড় জমিয়েছিলো, তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে রূপবান দেখিয়ে দেয়, বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হতে পারে। দর্শকের ঢল নামানো এই চলচ্চিত্রটি লোককাহিনিনির্ভর-১২ দিনের শিশু রহিমের সঙ্গে ১২ বছরের মেয়ে রূপবান-এর বিয়ে এবং তাদের প্রেমের চড়াই-উতরাই। ১২ দিনের শিশু রহিমকে বিয়ে করে বনবাসে যায় রূপবান এবং তাকে লালনপালন করতে থাকে। কিন্তু বড়ো হলে রহিম প্রেমে পড়ে অন্য এক নারীর। রূপবান আর রহিমের অসম প্রেম এবং নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষে তাদের মিলন ঘটে। কিন্তু চলচ্চিত্রের এই আখ্যান, অভিনয়শৈলী, সংলাপ সেসময় খুব সহজে মেনে নেয়নি ঢাকাই চলচ্চিত্র কারখানা। রূপবান নির্মাণের সময় এ নিয়ে খুব অবজ্ঞাসূচক ও খারাপ ভাষায় কথা বলতে থাকে অন্যরা। এর প্রমাণ মেলে রূপবান চরিত্রে অভিনয় করা অভিনয়শিল্পী সুজাতার বয়ানে-‘এই ছবিতে অভিনয় করার সময় আমাকে অনেক ঝামেলা ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এফডিসিতে ঢুকলেই আমাকে দেখে অনেকে বলত, এই দেখ যাত্রার নায়িকা যাচ্ছে। এর কপালে কী আছে কে জানে? অনেকেই মুখটিপে হাসত।’


রূপবান ঢাকাই নির্মাতাদের বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন পথ খুলে দেয়। তারা এবার চলচ্চিত্র নির্মাণে দেশীয় সংস্কৃতি ও লোককাহিনির কাছে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেন। তারা বুঝতে পারেন, এদেশের লোককাহিনি, কথামালা, লোকসঙ্গীত, লোকবিশ্বাস মানুষের জীবন ও কর্মের মূল কেন্দ্র। রূপবান দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে যে ধারার শুরু, সেই ধারা অনেক নির্মাতা গ্রহণ করে; বাদ পড়ে না খান আতাউর রহমান, জহির রায়হানের মতো নির্মাতারাও। সময়ের পরিক্রমায় ফোক-ফ্যান্টাসির পাশাপাশি পোশাকি-ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের ধারাও যোগ হয়। বারে বারে যেনো আসে ফিরে স্বপ্নের দিন।


পুঁজির টানে যখন ঢাকাই নির্মাতারা উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র নির্মাণে উত্তাল, ঠিক তখন ইবনে মিজান চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন। সবার সঙ্গে মিজানও গা ভাসিয়ে উর্দু ভাষায় আওর গাম নেহি (১৯৬৪) নির্মাণ করেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে চলচ্চিত্রটি দর্শক পর্যন্ত আসেনি। প্রথম চলচ্চিত্রেই বড়ো বাধা পান ইবনে মিজান। এরপর উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণের চিন্তা আর তিনি মাথায় আনেননি। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ইবনে মিজানের শিল্প-সাহিত্য, লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে আলাদা ভালোলাগা আগে থেকেই ছিলো। সেই ভালোলাগা থেকেই নির্মাণ করেন একালে রূপকথা (১৯৬৫)। তার এই ভালোলাগার মাত্রাকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় রূপবান-এর সাফল্য। তাই রূপবান-এর ধারাবাহিকতায় তিনি নির্মাণ করেন আবার বনবাসে রূপবান (১৯৬৬)। দর্শককে নির্মল আনন্দ আর প্রেক্ষাগৃহমুখী করার ক্ষেত্রে রূপবান-এর মতো আবার বনবাসে রূপবানও (১৯৬৬) বেশ সাড়া ফেলে। রূপবান-এর হাত ধরে সাধারণ মানুষের প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তার ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে ইবনে মিজানের চলচ্চিত্র। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইবনে মিজান আরো নির্মাণ করেন জরিনা সুন্দরী। তার চলচ্চিত্রে উঠে আসে বাংলার চিরচেনা যাত্রা ও লোক সংস্কৃতির মতো বিষয়, যা দেখে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ তাদের সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে যায়, ফ্যান্টাসিতে ভাসে।


শিক্ষকতা ছেড়ে চলচ্চিত্রে আসা ইবনে মিজান শুধু ফোক-ফ্যান্টাসি দিয়ে দর্শককে অবাস্তব, মিথ, কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যাননি! তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে হয়। তাই বাস্তবকে বুঝে সরাসরি ‘রাষ্ট্রকাঠামো’র বিরুদ্ধে না গিয়ে, ফোক-ফ্যান্টাসির মাধ্যমেই বাংলার জনগণকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধাচারণের আভাস দেন শহীদ তিতুমীর (১৯৬৮)-এ। মনে করিয়ে দেন, বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা! যে বাংলার জনগণ ইংরেজদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো, লাঠি হাতে লড়াই করেছিলো আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে। ইবনে মিজান তার চলচ্চিত্রে স্মরণ করিয়ে দেন, অধিকার, স্বাধীনতা কোনোটাই আপনা-আপনি আসে না। এর জন্য সংগ্রাম করতে হয়; স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয়।


১৯৬৯-এর উত্তাল সময়ে ইবনে মিজান পাতালপুরীর রাজকন্যা, নাগিনীর প্রেম নির্মাণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের বছর নির্মাণ করেন আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী, কত যে মিনতি। কত যে মিনতি তার ফোক-ফ্যান্টাসির বাইরে গিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৭১-এ যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলে নতুন রূপে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হতে থাকেন তিনি। এবার ফোক-ফ্যান্টাসির বাইরে গিয়ে নির্মাণ করেন একাধিক চলচ্চিত্র। তার মধ্যে নিশান (১৯৭৭) বাংলা চলচ্চিত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বাংলার মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় নিশান-এর গান-সংলাপ। নিশান দিয়ে তিনি পোশাকি-ফ্যান্টাসি নামে নতুন ফর্মের যাত্রা শুরু করেন। মিজান হিন্দি কালা আওর গোরার অনুকরণে নিশান নির্মাণ করেছিলেন।



৮০’র দশককে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই সময়ে প্রচুর চলচ্চিত্র যেমন নির্মাণ হয়; একই সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যাও। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতা ও দর্শকের চাহিদাটা ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন ইবনে মিজান। ফলে চলচ্চিত্র জীবনের মোক্ষম সময়টা কাজে লাগিয়েছিলেন এই দশকে। এই সময়ে তিনি জীবনের অধিকাংশ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার প্রতিটি চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে সফলতাও পায়। এই সময়ে দর্শকের ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের কদর দেখে রাখাল বন্ধু (১৯৬৮) ও জরিনা সুন্দরী রিমেক করে রঙ্গিন রাখাল বন্ধু (১৯৮৬) ও রঙ্গিন জরিনা সুন্দরী (১৯৮৭) করেন। চলচ্চিত্র দুটি দর্শকের মধ্যে খুব সাড়া ফেলে। এই দশকে জংলী রানী (১৯৮০), চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা (১৯৮৪), সাপুরে মেয়ে, আলাল দুলাল (১৯৮৯) নামে আলোচিত সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ইবনে মিজান। সবমিলিয়ে ৮০’র দশক বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের পাশাপাশি ইবনে মিজানের চলচ্চিত্রেরও স্বর্ণযুগ হয়ে আছে।


রাখাল বন্ধু, নিশান ও চন্দন দ্বীপের রাজকন্যার ফ্যান্টাসি


ইবনে মিজান তার ক্যারিয়ারে যতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তার প্রায় সবই ফোক-পোশাকি-ফ্যান্টাসিধর্মী। এর বাইরে দু-একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও সবার কাছে তিনি ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের নির্মাতা হিসেবে বেশি পরিচিত। আগেই বলেছি, এসব চলচ্চিত্রের বেশিরভাগই ব্যবসাসফল। এখন প্রশ্ন জাগে, কেনো একজন নির্মাতা সারাজীবন ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এবং তা ব্যবসাসফলও হয়; তার চলচ্চিত্রে তাহলে কী এমন আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য তার রাখাল বন্ধু, নিশান ও চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা নামে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো ঘুরেফিরে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।


বাংলার লোকবিশ্বাসে পীর, দরবেশ, ওলি-আওলিয়ার একধরনের লোকপ্রিয়তা আছে। অলৌকিক ক্ষমতা ও গুণমুগ্ধ আচরণের জন্য সাধারণ লোকেরা তাদের শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে এবং তাদের কথা বিশ্বাস করে। কখনো কখনো তারা মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা বলে দিতে পারে এমন কথাও প্রচলিত আছে। এ রকম এক দরবেশের ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে ইবনে মিজান শুরু করেন রাখাল বন্ধু। যেখানে দরবেশ মন্তব্য করেন, দুই বন্ধুর একজন রাজা, অন্যজন হবেন রাজার বাবা। শেষ পর্যন্ত দরবেশের ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যায়। নিশান-এর বিষয় সিংহাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং জমজ ভাইয়ের কারিশমা। দুই ভাই সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের হলেও একজনকে আঘাত করলে অন্যজন আঘাত পান। একজন পরোপকারী অন্যজন ভয়ঙ্কর ডাকাত। শেষে গিয়ে দুই ভাই মিলে বাবার হারানো সিংহাসন উদ্ধার করেন। জাদুবিদ্যা চন্দন দ্বীপের রাজকন্যায় বিষয়। যেখানে এক জাদুকরী মোহিনী পছন্দ করে রাজপুত্রকে। কিন্তু রাজপুত্র মোহিনীকে পছন্দ করে না, একপর্যায়ে মোহিনী ক্ষুব্ধ হয়ে জাদু দিয়ে রাজপুত্রকে অন্ধ করে দেয়। ঘটনাক্রমে অন্ধ রাজপুত্রের প্রেম হয় চন্দন দ্বীপের রাজকন্যার সঙ্গে। শেষে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি পায় রাজপুত্র এবং মিলন হয় চন্দন দ্বীপের রাজকন্যার সঙ্গে।


রাখাল বন্ধু, নিশান ও চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা ১৯৬৮, ১৯৭৭ ও ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হলেও কিছু বিষয়ে অন্তমিল লক্ষ করা যায়। প্রথমত, প্রতিটি চলচ্চিত্রেই রয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র-সেনাপতি রাজাকে মেরে ফেলে অথবা মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করে। ক্ষমতার শীর্ষে যাওয়ার এ দ্বন্দ্ব চিরকালের, তাতে কতো মানুষ জীবন দিলো কিংবা সাধারণ মানুষের কী হলো, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্র-ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ! মিজানের চলচ্চিত্রে তার ইঙ্গিত আছে। এটা হতে পারে, তার এ তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় দেশে ওই রকম অবস্থা ছিলো। রাখাল বন্ধু নির্মাণের সময় স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতায়, নিশান-এর সময় সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং সামরিক শাসক হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা-এর সময়। এরা সবাই অগণতান্ত্রিক উপায়ে অন্যভাবে বললে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যা যা করা দরকার তাই করেছিলেন।


দ্বিতীয়ত, তিনটি চলচ্চিত্র ভিন্ন ভিন্ন সময়-সমাজ-বাস্তবতায় নির্মিত হলেও দৃশ্যত নারীর উপস্থাপন একই রকম। রাখাল বন্ধু-তে রাখালকে না পাওয়ায় ফুল নিজেকে শেষ করে দেন, আবার চন্দন দ্বীপের রাজকন্যায় অন্যকে শেষ করে দিতে দ্বিধা করেন না জাদুকরী মোহিনী। তারা দুজনেই প্রেমে অন্ধ হয়ে কেউ নিজেকে শেষ করে দেন, কেউ অন্যকে। এদিকে নিশান-এও নারীর কোনো স্বতন্ত্র অবস্থান নেই। পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে নারীরা সবসময় অবহেলিত, নির্যাতিত এটা মানতে হয়! কট্টরপন্থি ও উদারপন্থি দুই ধরনের লোকেরাই নারীদের ‘মঙ্গলের’ কথা বলে তাদের কব্জায় আনে নিজেদের স্বার্থে। কট্টরপন্থিরা ধর্ম-সমাজের অনুশাসনের ছাঁচে ফেলে নারীদের পর্দার নামে ঘরে বন্দি করে রাখে। অন্যদিকে উদারপন্থিরা নারী স্বাধীনতার কথা বলে স্বাধীনতা হরণ করে, নারীদের যথেচ্ছা ব্যবহার করে। এই চিন্তার বাইরে যেতে পারেননি ইবনে মিজান। এছাড়া প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রের শুরুতে দেখানো হয় মন্দের জয়, তারপর প্রেম-ভালোবাসার দ্বন্দ্ব, নাচ-গান, শেষে গিয়ে ভালোর জয়। চলচ্চিত্রজুড়ে ভালো-মন্দ, প্রেম-ভালোবাসার ছড়াছড়ি থাকলেও কেনো জানি সাধারণ মানুষের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। অথচ এই মানুষেরাই যুগ যুগ ধরে লড়াই-সংগ্রাম করে সমাজ-সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে। তাদের জীবনের কোনো ছাপ তিনটি চলচ্চিত্রে নেই।


ফ্যান্টাসির পিছনের ফ্যান্টাসি!


৬০-এর দশকের মাঝামাঝি শুরু হয়ে ৭০-এর দশকে নিজেকে আরো প্রসারিত করে, ৮০’র দশকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র। আবার ৯০-এর দশকের শেষের দিকে পড়তে শুরু করে, একুশ শতকের গোড়াতে এসে ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এখন প্রশ্ন, কেনো ৬০-এর মাঝামাঝি থেকে ৮০’র দশকের শেষ পর্যন্ত ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের রমরমা অবস্থা ছিলো। এর উত্তর খোঁজার জন্য ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য এবং সেই সময়ে দেশের রাজনৈতিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে! মূলত ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রে উঠে আসে অলৌকিক ঘটনা, লোকগাঁথা, উপকথা, জাদু, অসম প্রেম-ভালোবাসা, নাগ-নাগিনীর প্রেম, রাজ-রাজাদের উদ্ভট কাহিনি প্রভৃতি। আপাত যার সঙ্গে বাস্তব জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া দায়। ‘সামগ্রিক পর্যালোচনায় লক্ষ করা যায় যে, উনিশ’শ আশির দশকের অধিকাংশ চলচ্চিত্রে বর্ণিত ‘শিল্পের ব্যাপার’টি তীব্রভাবে অনুপস্থিত। তার পরিবর্তে অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা এবং অনেকক্ষেত্রে সামাজিক ও সংস্কৃতির রুচির গ্রহণযোগ্যতার পরিপন্থি উত্তেজক পোশাকি চলচ্চিত্রের নির্বিঘ্ন প্রসার লাভ ঘটেছে।’


যখন এরশাদের সামরিক সরকার দেশে উন্নতি, অগ্রগতির হাজারো আশার বাণী শুনিয়ে উল্টো পথকে জায়েজ করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তখন দেশের শিল্প-স্রষ্টারা ফ্যান্টাসির মধ্যে ভাসছে। একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ফ্যান্টাসি অন্য দিকে শিল্পমাধ্যমেও ফ্যান্টাসি। এতে দুই ফ্যান্টাসির ফারাক বোঝাটা মুশকিল হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদী সমাজে যেহেতু সবকিছু প্রচারের মাধ্যমে চলে, যতো প্রচার ততো প্রসার। এক্ষেত্রে কোনো বিষয়কে বার বার উপস্থাপন করলে, সেটা বাস্তব হয়ে ধরা দেয়; তা সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, বাস্তব-অবাস্তব যাই হোক না কেনো! সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ইবনে মিজান নির্মাণ করেন পোশাকি-ফ্যান্টাসি রাজ নর্তকী (১৯৮১)। যা সাধারণ মানুষকে ফ্যান্টাসিতে ভরে রাখে। রাষ্ট্রকাঠামো যেমন গণতন্ত্রের বিপরীতে গিয়ে উন্নতি আর আশার কথা বলে মাতিয়ে রাখছে, তেমনই তারুণ্যকে বাস্তবতার বাইরে অবাস্তব প্রেম-ভালোবাসার ফ্যান্টাসিতে ভাসায় ইবনে মিজান লাইলী মজনু (১৯৮৩)। যেখানে শুধু কাল্পনিক প্রেম; বাস্তবতা নেই। প্রেমের জোয়ারে ভেসে যায় সবকিছু, দর্শকের প্রেমের বাইরে কিছু চিন্তা করার সুযোগ নেই লাইলী মজনুতে। কিন্তু ‘একজন শিল্পী হচ্ছেন তার লক্ষ্যের অনুসারী। তার কোনো ব্যক্তিসত্তা নেই। এমনকি তিনি অতিমানবও বটে। একজন শিল্পী তিনিই তার কাজ এবং তার কাজেই তিনি।’ যদি শিল্পীর অবস্থান তার শিল্পের মধ্য দিয়ে সমাজে উঠে আসে, সেক্ষেত্রে কী স্বৈরশাসকের বির্মূত সরল নীতি চর্চা শুরু করেন ইবনে মিজান; তার স্থান-কাল-পাত্রের কোনো পরিপ্রেক্ষিত প্রায় বিবেচনায় না এনে!


কিছু মানুষের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের সবকিছু ব্যবহার হচ্ছে, এটা মেনে নিতে না পেরে পুরো দেশ আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছে; ১৯৮৯-এ ছাত্র-শ্রমিক সবাই যখন গণতন্ত্রের সংগ্রামে দিশেহারা, তখনই ইবনে মিজান নির্মাণ করেন আলাল দুলাল। আলাল দুলাল-এ তিনি তুলে ধরেন, জাদু দিয়ে মানুষকে পাখি বানিয়ে অপশক্তির বিজয় এবং বন থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে শিশুকে রাজা বানানোর ফ্যান্টাসি। চলচ্চিত্রের এই ফ্যান্টাসি দিয়ে বাস্তবের এরশাদ সরকারের ক্ষমতা আরোহণের ফ্যান্টাসিকে অনেকটা বৈধতা দেওয়া হয়। বন থেকে শিশুকে ধরে নিয়ে গিয়ে রাজা বানানো হচ্ছে। তার মানে ‘ভাগ্যে’ থাকলে যে কেউ রাজা বা শাসক হতে পারে; সে শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক বা সেনা যে কেউ। এই ফ্যান্টাসি নিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণে ধুম পড়ে যায় আশির দশকে। সেটা অনেক জায়গায় ‘রাষ্ট্রের ফ্যান্টাসি’কে ছুঁয়ে যায়। আর এই পরিস্থিতির অগ্রভাগে ছিলো ইবনে মিজানের চলচ্চিত্র।


ফ্যান্টাসির হালচাল, ফ্যান্টাসির দর্শক


বর্তমানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দর্শক কমে গেছে, বিশেষ করে ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের দর্শক তো নেই-ই। চলচ্চিত্র সমালোচকরা মনে করে, বর্তমান চলচ্চিত্রে রুচি, সুস্থতা, পরিচ্ছন্নতা লক্ষ করা যায় না। তাই বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রেক্ষাগৃহে আসে না, ফলে চলচ্চিত্রের এই ভগ্নদশা। কিন্তু এটাকে কোনোভাবেই পুরোপুরি সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। কারণ ৫০ ও ৬০-এর দশকের শুরুর দিকটায় ‘শিল্পবোধ ও রুচিশীল’ বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও সেটা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত দর্শক ভালোভাবে নেয়নি।


সন্দেহ নেই, সেই ১৯৬০ দশকে সিনেমা হলে যেত মূলতঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দর্শকেরাই। তারা যদি সত্যি সত্যিই শিল্পসম্মত, জীবন ঘনিষ্ট, রুচিশীল ছবি দেখতে পছন্দ করতেন, তাহলে এসব ছবি বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করতো নিঃসন্দেহে। তা হয়নি বলেই দৃশ্যপট বদলে যায় খুব দ্রুত। তখনকার পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, বিনোদন উপকরণে ভরপুর উর্দু এবং হিন্দি ছবির দাপটে এসব শিল্পসম্মত বাংলা ছবি টিকতে পারছিল না। সহজ কথায় বলা যায়, তখনকার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারছিল না।


তার মানে ৬০-এর দশকের দ্বিতীয় ভাগে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিনে মধ্যবিত্ত নয়, বিশেষ করে নিম্নবিত্তের লোকেরাই প্রেক্ষাগৃহে ভিড় জমিয়েছিলো। ইবনে মিজান হয়তো এটা বুঝতে পেরেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মূল দর্শক নিম্নবিত্ত। তাই তার মূল লক্ষ্য ছিলো নিম্নবিত্তের দর্শকের দিকে।


ইবনে মিজান তার প্রতিটি চলচ্চিত্রে তুলে আনেন নিম্নবিত্ত শ্রেণির সুখ-দুঃখ, কল্পনা, যা তারা প্রতিনিয়তই কোনো না কোনোভাবে লালন করে। তার চলচ্চিত্র মধ্যবিত্ত দর্শক সেভাবে গ্রহণ না করলেও সেগুলো ব্যবসাসফল হয়েছে। অন্যান্য অনেক কারণের সঙ্গে এ ধরনের চলচ্চিত্রের সফলতাও বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে, আনাচেকানাচে শত শত প্রেক্ষাগৃহ গড়ে উঠার পিছনের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে যেখানে সারাদেশে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ২৩৯টি ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে তা গিয়ে দাঁড়ায় ৭৬৭টি। সাধারণ মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করে বিনোদনের আশায় প্রেক্ষাগৃহে ছুটে এসেছে।


ফ্যান্টাসির গুমোর ফাঁস


বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগ মাত করা ফোক ও পোশাকি-ফ্যান্টাসির অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীন। একসময়ে দাপটে চলা ফোক-ফ্যান্টাসি-পোশাকি চলচ্চিত্রের ফর্মুলা এতো অল্প সময়ে তার শৌর্যবীর্য হারিয়ে ইতিহাস হয়ে যাবে, এটা ভাবতেই অবাক লাগে। কিন্তু এটা বাস্তব যে, ফোক-ফ্যান্টাসি-পোশাকি চলচ্চিত্র যেমন উত্তাল স্রোতে ভেসে এসেছিলো, আবার সেই স্রোতেই ভেসে গেছে। এ ধারাকে আঁকড়ে ধরে তার যথাযথ ব্যবহার করতে পারেনি বাংলাদেশের নির্মাতারা। ফ্যান্টাসিকে একরকমের ফ্যান্টাসি হিসেবেই নিয়েছিলো তারা। কিন্তু ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র তো শুধু ফ্যান্টাসি নয়, ফ্যান্টাসির এক একটা ইমেজ দর্শককে বার্তা দেয়, ঘোর লাগায়; অনেক সময় এসব ইমেজ কোনো কোনো চলচ্চিত্রকে অনন্যও করে তোলে।


আসলে ইমেজ হচ্ছে বাস্তবতার ফাংশানাল এক্সপ্রেশন বা অভিব্যক্তি। যখনই একটি ইমেজ নির্মিত হচ্ছে তখন তা সরাসরি একটি দেশ-কালের প্রতিনিধিত্ব করছে। ইমেজটির বাস্তবতা স্টুডিওতে সেট ফেলে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে না কি প্রতিদিনের যাপিত জীবন থেকে ছেঁকে নেওয়া হয়েছে সেটি কিন্তু ভিন্ন ব্যাপার এবং দর্শক চেতনে এবং অবচেতনে এই বাস্তবতা বা তার প্রতিবিম্বের ভেতর কীভাবে কোনো সত্যের সন্ধান করতে পারেন, একটি চ্যালেঞ্জই বটে।


এই চ্যালেঞ্জটা নিতে পারেনি বাংলাদেশের ফোক-ফ্যান্টাসি-পোশাকি চলচ্চিত্রের নির্মাতারা। ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র অচেনা-উদ্ভট হবে এটাই স্বাভাবিক, সেই অচেনা-উদ্ভট কাহিনিকে চলচ্চিত্রে সত্য করে তোলাটাই নির্মাতার কাজ। যা দর্শককে ঘোরের মধ্যে রাখবে; তারা উদ্ভট সব চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের নির্মাতারা সেই ঘোর তৈরি করতে পারেনি। এই ব্যর্থতা ঘোচাতে বরং তারা এসব চলচ্চিত্রে নানা অনুষঙ্গ যোগ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে কাহিনির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নাচ-গান। কখনো কখনো সেই নাচ-গান ‘অশ্লীলতা’র তকমাও পেয়েছে। এ অভিযোগ থেকে বাদ পড়েনি ইবনে মিজানের জংলী রাণী, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যার মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও।


ফোক-ফ্যান্টাসি-পোশাকি চলচ্চিত্রের অচেনা-উদ্ভট কাহিনিকে বাস্তব করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেট। এ ধরনের চলচ্চিত্রে নির্মিত বাস্তবতার বড়ো অংশ নির্ভর করে সেটের ওপরে। সেট যতোটা বাস্তবের কাছাকাছি যেতে পারে, ততোটাই দর্শকের কাছে যেতে পারে চলচ্চিত্র। সেট যদি বাস্তবতাকে ছুঁতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে চলচ্চিত্রের মান, নির্মাণ ও নির্মাতার রুচি নিয়ে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্মাতারা সেট নির্মাণে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলো বলে মনে হয় না। ইবনে মিজান, যার নির্মাতা জীবনের প্রায় সব চলচ্চিত্রই ফ্যান্টাসিধর্মী, তার অনেক চলচ্চিত্রের সেট বাস্তবতাকে ছুঁয়ে যেতে পারেনি। লাইলী মজনুর মতো দর্শকনন্দিত চলচ্চিত্রের সেটেও বাস্তবতা বলে কিছু নেই! রাজপ্রাসাদ, ডাকাতের আস্তানা কিংবা মরু অঞ্চলের সেটে চলচ্চিত্রের যে বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে অবাস্তব, অবিশ্বাসের ছাপ বেশি। চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, আলাল দুলাল-এর সেটেও উদ্ভট-অস্বাভাবিক ইমেজ উঠে এসেছে। কিন্তু দর্শক তো উদ্ভট-অস্বাভাবিক কাহিনিকে চলচ্চিত্রের বাস্তবতায় সত্য করে দেখতে চায়। ফলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই উদ্ভট-অস্বাভাবিক কাহিনির উদ্ভট বাস্তবতা দিয়ে দর্শককে ধরে রাখা সম্ভব হলেও, পরে তা আর সম্ভব হয়নি। ততদিনে অবশ্য দর্শক ধরে ফেলেছে ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রে ফ্যান্টাসি বলে কিছু নেই, আছে শুধু নির্মাতার ‘বাচ্চা ভুলানো চালাকি’।


বর্তমানে বাংলাদেশের ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের ভগ্নদশা আলোচনা করতে গিয়ে ভারতের দক্ষিণী চলচ্চিত্রের নির্মাতা রাজা মৌলির কথা না বললেই নয়। মৌলি ভারতের প্রধান চলচ্চিত্র কারখানা বলিউডের বাইরের নির্মাতা, যিনি কিনা ফ্যান্টাসিধর্মী বাহুবালি : দ্য বিগিনিং (২০১৫) ও বাহুবালি কনক্লুশন (২০১৭) দিয়ে সারা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। একে একে গুড়িয়ে দিয়েছেন বলিউড বক্স অফিসের অনেক রেকর্ড। মৌলি তার চলচ্চিত্রে স্বকীয়তা ও আত্মতৃপ্তির পাশাপাশি ব্যবসায়িক দিকটাও মাথায় রাখেন।


তাই বলে তিনি বাজারের দাস হতে চান না। তার কাছে বাজার চলচ্চিত্রের অংশ হলেও চলচ্চিত্র বাজারের চেয়ে ঢের কিছু! তিনি চলচ্চিত্রকে সবটুকু উজাড় করে দিতে চান, সদা ডুবে থাকেন সৃষ্টির ঘোরে। যে কারণে তিনি নির্মাতা-স্রষ্টা মৌলিকে গুলিয়ে ফেলেন না ‘ব্যবসাসফল মৌলি’র সঙ্গে। নিজেকে পণ্যের উৎপাদক ভাবেন না মৌলি; স্রষ্টা হিসেবে পরিচয় করাতেই বেশি ভালোবাসেন।


কিন্তু বাংলাদেশে ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রনির্মাতাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। তারা মৌমাছি আর ফুল বিক্রেতার মতো চলচ্চিত্র বনে যায় ফুলে ফুলে ঘুরে সুবাস নেওয়া আর বিক্রির কাজটা করার জন্য। কেউ চলচ্চিত্র বনের মালি হতে চায় না; চায় না নতুন কিছু সৃষ্টি করতে। বরং তারা বাছবিচার না করে একই মালসামানা নিয়ে হাজির হয় চলচ্চিত্র বাজারে। উদ্দেশ্য একটাই-মুনাফা। তাদের তাড়নাটা শিল্পের প্রতি ভালোবাসা কিংবা সৃষ্টির নয়। ফলে এ থেকে অনেকে ভালো উৎপাদক হিসেবে ব্যবসা করেছে, নিজেদের পাল্টে দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলাদা কোনোকিছু দিতে পারেনি! এ প্রসঙ্গে ইবনে মিজানের নামটা প্রথমদিকে চলে আসে। তিনি বাংলাদেশে এ ধরনের চলচ্চিত্রের মুকুটহীন রাজা হয়ে বসে আছেন। তিনি চাইলে হয়তো ‘মুকুট’টা পরতে পারতেন; হয়তো চাননি। কারণ ‘রাজা’ ইবনে মিজানের কাছে চলচ্চিত্র ব্যবসা ছাড়া আলাদা কিছু ছিলো না। তার ভাষায়, ‘আমার চলচ্চিত্র নিয়ে আত্মবিশ্বাস আছে, আমি জানি আমার চলচ্চিত্র কী। আমার প্রত্যেকটি চলচ্চিত্র চলেছে, ব্যবসা করছে; তাহলে তো সবই ঠিক আছে।’১০


ইবনে মিজানের বাইরে গিয়ে অন্য নির্মাতারাও যে নতুন কিছু তৈরি করেছে, তেমনটা চোখে পড়ে না! ফলে একসময় ফোক-ফ্যান্টাসি-পোশাকির ফর্মুলা চলচ্চিত্র দেখে দেখে দর্শকের কাছে তা চোখের বালিতে পরিণত হয়। দর্শক তো নতুন কিছু দেখতে, উপভোগ করতে চায়; কিন্তু তাদের এই চাওয়া-পাওয়াটা বুঝতে পারেনি বাংলাদেশের বিক্রেতারূপী নির্মাতারা। অথচ রাজা মৌলি তা করেননি, তিনি বিক্রেতার সঙ্গে স্রষ্টা হতে চেয়েছেন। তাই তার প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রে উঠে আসে স্বতন্ত্র গল্প-কাহিনি ও উপস্থাপন কৌশল। এই ভিন্নতা মৌলিকে সাহসী করে তোলে। যার জন্য বাহুবালি : দ্য বিগিনিং-এ পুরো গল্প না বলেও মুক্তি দেওয়ার সাহস দেখান তিনি। তার বিশ্বাস ছিলো, নতুন কিছু দিতে পারলে দর্শক অবশ্যই সেটা গ্রহণ করে। বাংলাদেশের নির্মাতারা এই আত্মবিশ্বাস, স্বকীয়তা ও উপস্থাপন কৌশলের কারিশমা দেখাতে পারেনি। তাই ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র সময়ের জোয়ারে ভেসে এসে, আবার উল্টো স্রোতে চলে গেছে। এই স্রোতকে নির্মাতারা না পেরেছে তখন কাজে লাগাতে, না পারছে এখনো!


তবুও ইবনে মিজান-ই রাজা


ইবনে মিজানের চলচ্চিত্র নিয়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা হলেও হতে পারে, তবু দিন শেষে তিনিই ‘রাজা’! কারণ প্রত্যেক নির্মাতার উদ্দেশ্য থাকে তার চলচ্চিত্রকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার! যা দেখে দর্শক আলোড়িত হবে, বাস্তব-অবাস্তবতায় মিশে যাবে। চলচ্চিত্রের টানে ছুটে আসবে প্রেক্ষাগৃহে। এ দিক থেকে ইবনে মিজানের অবস্থান অনেক উঁচুতে। তিনি দর্শককে চলচ্চিত্র দেখিয়েছেন, আলোড়ন তুলেছেন তাদের মধ্যে। এক্ষেত্রে তার নিজস্ব কৌশলকে কাজে লাগিয়েছেন। যা দর্শককে ফ্যান্টাসি জগতে ভাসিয়ে প্রেক্ষাগৃহে ধরে রেখেছে। কিন্তু ৯০-এর দশকের শেষে এবং একুশ শতকে যারা চলচ্চিত্রপাড়ায় ফ্যান্টাসি নিয়ে এসেছে, তারা না পেরেছে ফ্যান্টাসি করতে, না পেরেছে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টানতে! ফলে ঢাকাই চলচ্চিত্র কারখানায় ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের খরস্রোতা নদী আজ হয়েছে মরুভূমি। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ফোক-ফ্যান্টাসি-পোশাকি চলচ্চিত্রনির্মাতাদের ইবনে মিজানের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।


 

লেখক : হিরু মোহাম্মদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।


Hirumohammad.ru301@gmail.com

 

তথ্যসূত্র


১. ইসলাম, আহমেদ আমিনুল (২০০৮ : ১২৪); ‘১৯৭০ ও ১৯৮০ দশকের চলচ্চিত্রপ্রবাহ’; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আর্থসামাজিক পটভূমি; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

২. প্রাগুক্ত; ইসলাম (২০০৮ : ১৩৩)।

৩. ‘এখনো অভিনয় ভালোবাসি’; কালের কণ্ঠ’র শুক্রবারের ক্রোড়পত্র ‘কথায় কথায়’ ১১ আগস্ট ২০১৭।

৪. প্রাগুক্ত; ইসলাম (২০০৮ : ২১৬)।

৫. হোসেন, রফিক; ‘বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের যথার্থতা নির্ণয়’; হালখাতা; সম্পাদনা : শওকত হোসেন; বাবুল অডিও, ১৩৭, আজিজ সুপার মার্কেট (নিচতলা), শাহবাগ, ঢাকা।

৬. শুভ, শাতিল সিরাজ; ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দর্শক: রুচির বিচারে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সমান’; মাধ্যম, সম্পাদনা : তুষার আব্দুল্লাহ; ইনস্টিটিউট মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন স্টাডিজ, ক-৭২ দক্ষিণ বাড্ডা, গুলশান, ঢাকা; ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, পৃ. ৪৫।

৭. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৩৯৭); ‘চলচ্চিত্র প্রযোজনা, পরিবেশনা ও প্রদর্শন’; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৮. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ১০৯); ‘প্রামাণ্যচিত্র : সত্যবিষয়ক সমস্যা ও বিবেচনা’; সিনেমা; ধানমন্ডি, ঢাকা।

৯. রানা, নাজমুল; ‘দক্ষিণী রাজার বিজয় উপাখ্যান আমাদের বেহাত সাম্পান’; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়,  বর্ষ ৬, সংখ্যা ১১, জুলাই ২০১৬, পৃ. ৯৪।

১০. https://www.youtube.com/watch?v=u3Qp2e-7-yw;retrieve on 12.9.2017

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন