কাজী মামুন হায়দার
প্রকাশিত ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘দর্শকের মুখ’ : চলচ্চিত্রের প্রায়োগিক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা
কাজী মামুন হায়দার

চলচ্চিত্রশিল্পে প্রধানত দুটি অংশ থাকে-একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত; আরেকটি তার বিপণন, প্রদর্শন। প্রথম অংশে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা, প্রযোজক ও কলাকুশলী; দ্বিতীয় অংশে পরিবেশক, প্রেক্ষাগৃহ ও দর্শক। চলচ্চিত্রের একশো ২০ বছরে এসে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, এটা পুঁজি প্রাধান্যশীল মাধ্যম। তাই সেই পুঁজি ফেরত পেতে দর্শকের ওপর নির্ভরতার কোনো বিকল্প থাকে না। দর্শক গাঁটের টাকা খরচ করে দেখে বলেই চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। চলচ্চিত্রশিল্পের এই দ্বিতীয় অংশটি নিয়ে বাংলাদেশে মৌলিক গবেষণার সংখ্যা খুব বেশি নেই। এই পরিস্থিতিতে ‘বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার যাচাই : দর্শক প্রবণতা ও সন্তুষ্টির মাত্রা বিশ্লেষণ’ শিরোনামে একটি গবেষণা সম্পন্ন করেন তানিয়া সুলতানা ও আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান। এই গবেষণার আওতায় দেশের মোট তিনশো ৫০ জন দর্শকের ওপর জরিপ পরিচালিত হয়। এছাড়া ছয় জন পরিচালক, প্রযোজক-পরিবেশক, প্রদর্শক ও গবেষকের নিবিড় সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষকদের ভাষায়, ‘সেই গবেষণাপত্রের ব্যাপক পরিমার্জনের ফল এই বই’-‘দর্শকের মুখ’।
নিবেদন-এ লেখক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের উদ্যোগে তারা কাজটি শুরু করেন দুই বছর আগে, ১৪২০ বঙ্গাব্দে। গবেষণাকর্মটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয় ১৪২২ বঙ্গাব্দে। সুতরাং এই বইতে দর্শক ও বিশেষজ্ঞদের তখনকার মতামতই প্রকাশ হয়েছে। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে অনেক কথাই তাই এখন অসার মনে হতে পারে। লেখকের এই বিনয় কিংবা আশঙ্কা কোনোটিই পাঠক হিসেবে আমাকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। কারণ সামাজিক বিজ্ঞানের যেকোনো গবেষণাই মুহূর্তের মধ্যে খারিজ আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চলচ্চিত্রের মতো প্রযুক্তি ও শিল্প সংশ্লিষ্ট মাধ্যমেও এটা একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ নিয়ে বিনয় ও শঙ্কা প্রকাশের কিছু নেই।
মুখবন্ধ ও সবার শেষের সংযোজনসহ মোট আটটি অধ্যায় রয়েছে এই গ্রন্থে। মূল আলোচনা শুরুর আগে ‘মুখবন্ধ’ ও ‘দর্শকের মুখ’ নামে দুইটি শিরোনামে গবেষণার সারকথা বলা হয়েছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে রয়েছে প্রথম অধ্যায়ে ‘নকশা’, দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘পাটাতন’, তৃতীয়তে ‘দর্শকের কণ্ঠ’, চতুর্থতে ‘বচনামৃত : দর্শকের চেহারা’, পঞ্চমে ‘পর্দা উন্মোচন’ ও সবশেষে ‘সংযোজন’। প্রতিটি অধ্যায়ের নাম নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়, যা লেখকের সৃজনশীলতারই প্রকাশ। মোটাদাগে তিনটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে এই গবেষণাটি সম্পন্ন হয়-প্রথমত, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দর্শকের চাহিদা, পছন্দ-অপছন্দ, চলচ্চিত্র দেখার জায়গা, মাধ্যম প্রভৃতি সম্পর্কে জানা। দর্শকের নিবাস, লিঙ্গ, বয়স বা পেশার ভিত্তিতে তাদের রুচির মিল-অমিল খুঁজে দেখা। দ্বিতীয়ত, দর্শক-রুচি ও সামগ্রিক চলচ্চিত্রশিল্প সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোষ্ঠীর মনোভাব জানা ও তার সঙ্গে প্রকৃত দর্শক-রুচির তুলনা করা। তৃতীয়ত, বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রচারণার অধিকতর কার্যকর মাধ্যম ও কৌশল অনুসন্ধান করা। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও ঢাকা এই পাঁচটি প্রধান ভৌগোলিক এলাকায় ভাগ করে নমুনা বাছাইয়ের জন্য নির্বাচন করা হয়। তবে জনসংখ্যা বিবেচনায় কেবল ঢাকা শহরের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে বলে ধরে নিয়ে রাজধানীর বাইরের একটি উপজেলা ও খোদ রাজধানীকে দুইটি আবাসিক এলাকায় ভাগ করে চূড়ান্ত নমুনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অন্য চার বিভাগ থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি করে উপজেলা শহর নমুনা হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। উপজেলা শহর বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সেখানে শহরের বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশেপাশের গ্রামগঞ্জে যেখানে প্রেক্ষাগৃহ নেই, সেখানকার লোকেরাও চলচ্চিত্র দেখতে আসতে পারেন।
এছাড়া নিবিড় সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে চলচ্চিত্রনির্মাতা মতিন রহমান; লেখক, নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন; প্রযোজক-পরিবেশক মো. হাবিবুর রহমান ও মিয়া আলাউদ্দিন; প্রদর্শক খালেদ আহম্মেদ শাম্মী এবং চলচ্চিত্র গবেষক ও সমালোচক ফাহমিদুল হকের।
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘পাটাতন’-এ চলচ্চিত্রের বাজার ও ভোক্তা এবং গবেষণার একটি পূর্বপাঠ পর্যালোচনা করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের দর্শকের ক্ষেত্রে কখনো তাদের আর্থ-সামাজিক কিংবা ভূরাজনৈতিক অবস্থান, কখনোবা ব্যক্তির নিজস্ব রুচি কিংবা অবসর প্রভৃতি সবই প্রভাবিত করে দর্শক কখন, কোথায়, কীভাবে, কাদের সঙ্গে তা উপভোগ করবে। দর্শকের কাছে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বিশালাকার প্রেক্ষাগৃহ থেকে চলচ্চিত্র পৌঁছে গেছে মানুষের বসার ঘরে এবং তারপর হাতের মুঠোয়। এই পরিস্থিতিতে প্রেক্ষাগৃহে তারাই যেতে চান, যাদের অন্য বিকল্প সীমিত। তবে বসার ঘর কিংবা মুঠোফোনের মতো সহজলভ্য সুযোগ থাকার পরও দর্শক যে প্রেক্ষাগৃহে যায় কিংবা যেতে বাধ্য হয় তার প্রমাণও কিন্তু ভূরি ভূরি। কিন্তু এ নিয়ে মানে দর্শকরা কোন ধরনের চলচ্চিত্র দেখে, কেনো দেখে কিংবা কীভাবে বা কোন বাস্তবতায় তা দেখে, তার প্রভাবটাইবা তাদের ওপর কেমন, অথবা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের অপরাপর বিষয়গুলো তাতে কীভাবে প্রভাব রাখে প্রভৃতি এখনো বাংলাদেশে গবেষণার বিষয় হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়নি। সেই দিক বিবেচনায় এই গবেষণা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় অধ্যায়ের নাম ‘দর্শকের কণ্ঠ’। এখানে সাতটি এলাকার ৫০ জন করে তিনশো ৫০ দর্শকের ওপর করা জরিপের একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষক বলছেন, প্রতিটি এলাকায় ১৫ জন নারী এবং ৩৫ জন পুরুষ দর্শকের কাছ থেকে জরিপ প্রশ্নমালার মাধ্যমে উত্তর সংগ্রহ করা হয়। কোনো এলাকায় অন্য লিঙ্গের উত্তরদাতা পাওয়া যায়নি। নারী ও পুরুষের বাইরে অন্য কোনো লিঙ্গের (বিশেষ করে হিজড়া) প্রতি গবেষকের এই সংবেদনশীলতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। জরিপে দর্শকের পছন্দের চলচ্চিত্রের তালিকায় এক নম্বরে ছিলো ‘সামাজিক চলচ্চিত্র’। এরপরেই তাদের পছন্দ প্রেম-কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র। এই ধারাবাহিকতায় পরের দিকে রয়েছে যথাক্রমে অ্যাকশন ও ভূতের চলচ্চিত্র।
চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহের ব্যাপারে দর্শকের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র দেখার প্রবণতা সর্বাধিক। এছাড়া তারা চলচ্চিত্রের গান এবং চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠানও পছন্দ করে। চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের গান ও বিজ্ঞাপন উপভোগের স্থান হিসেবে জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ দর্শক নিজ বাসার কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে নারীর হার পুরুষের চেয়ে বেশি। তবে চায়ের দোকানে বসে সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শক চলচ্চিত্র বা এ সংক্রান্ত বিষয় উপভোগ করে বলে জানিয়েছে। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার হার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে খুব কম। পুরুষের তুলনায় নারী দর্শকের ক্ষেত্রে এই হার আরো হতাশাব্যঞ্জক। নারী-পুরুষ মিলে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার হার রাজধানীতে বেশি। রাজধানীর বাইরে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার হার কম হওয়ার অন্যতম কারণ ওইসব এলাকায় প্রেক্ষাগৃহ না থাকা।
চলচ্চিত্র ও এ সংক্রান্ত নানা বিষয় দেখার সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম টেলিভিশন। তবে টেলিভিশনের বাইরে ট্যাব বা মোবাইল ফোনসেট, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার, সিডি বা ডি ভি ডি প্লেয়ারের মতো তুলনামূলক নতুন প্রযুক্তিতে পুরুষ দর্শক উল্লেখযোগ্য হারে চলচ্চিত্র ও এ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানাদি দেখে থাকে। এর পরও যারা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখে তাদের বেশিরভাগই আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করে। এক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা পরিবারের অন্য সদস্য বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে চলচ্চিত্র দেখতে বেশি পছন্দ করে। পুরুষদের একটা বড়ো অংশের চলচ্চিত্র দেখার সঙ্গী পছন্দের তালিকায় রয়েছে বন্ধুবান্ধব। এই দর্শকের বেশিরভাগ আনন্দ লাভের জন্য চলচ্চিত্র দেখে থাকে। এর বাইরে অনেকে সময় কাটানো, কোনো কিছু জানা, ক্লান্তি দূর করার জন্যও চলচ্চিত্র দেখে। নারী-পুরুষ দর্শকের অধিকাংশ নতুন চলচ্চিত্র সম্পর্কে তথ্য পেয়ে থাকে টেলিভিশনে প্রচারিত বিজ্ঞাপন, গান ও এ-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান থেকে। এছাড়া বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনও নতুন চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যদিও আগের দিনে রেডিও, সংবাদপত্র, মাইকিং ও প্রেক্ষাগৃহ ফেরত দর্শক এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। এখন এর কোনোটিই খুব একটা কাজ করে না। তবে বর্তমানে নতুন মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেট, ফেইসবুক জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রে অবশ্য পুরুষরা এগিয়ে।
নতুন চলচ্চিত্র আসার পর তা দেখে বেশিরভাগ দর্শক এখন প্রেক্ষাগৃহে না গিয়ে অনলাইন থেকে ডাউনলোড, কিংবা ক্যাবল লাইনে দেখার অপেক্ষায় থাকে। কিছু পুরুষের প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার আগ্রহ থাকলেও নারীদের পরিমাণ সবচেয়ে কম। এছাড়া এই অধ্যায়ে দর্শকের পছন্দের নায়ক-নায়িকা, পছন্দের চলচ্চিত্র, সেখানে ভালোলাগার উপাদান, বিভিন্ন দেশের বা ভাষার চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শকের আগ্রহ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জরিপের ফলাফল হাজির করা হয়েছে।
বিদেশি চলচ্চিত্রের সঙ্গে দেশীয় চলচ্চিত্রের পার্থক্য যাচাই করতে গিয়ে সর্বাধিক দর্শক বলেছে, চলচ্চিত্রের মূল দুর্বলতা কাহিনি ও চিত্রনাট্যে। এছাড়া বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীদের দুর্বল ও বৈচিত্র্যহীন অভিনয়, শুটিং ও নির্মাণশৈলী, নায়ক-নায়িকাদের ফিটনেস সমস্যা, মেকআপ এবং কস্টিউমের নিম্নমান নিয়ে দর্শক কথা বলেছে। জরিপের এই সংখ্যাতাত্ত্বিক ফলাফল থেকে এটা বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষ নিয়মিত চলচ্চিত্র উপভোগ করে চলেছে। কিন্তু এই উপভোগ নির্দিষ্ট কোনো মাধ্যম ও পরিসরে আবদ্ধ না থেকে নিত্য নতুন পথ ও পন্থায় চলছে। তবে চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকসমাজের আগ্রহ, পছন্দ, রুচিবোধ, চাহিদাসহ সার্বিক বিষয় ও দর্শন প্রবণতায় যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে; যা দর্শকের লিঙ্গ, পেশা, বয়স, এলাকা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে।
‘বচনামৃত : দর্শকের চেহারা’ নামের অধ্যায়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ছয় জনের নিবিড় সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এতে চলচ্চিত্র নিয়ে নবীন ও প্রবীণের অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে। নির্মাতা মতিন রহমানের সঙ্গে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে হাজির হয়েছেন কামার আহমাদ সাইমন। প্রযোজক-পরিবেশক মো. হাবিবুর রহমান ও মিয়া আলাউদ্দিনের সঙ্গে চিন্তার ভিন্নতা দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রথম সিনেপ্লেক্সের মালিক, চলচ্চিত্র প্রদর্শক খালেদ আহমেদ শাম্মী’র। আর সার্বিক দিক নিয়ে কথা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ওপর নজর রাখা গবেষক ফাহমিদুল হক।
গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল ও উপসংহার নিয়ে করা হয়েছে পঞ্চম অধ্যায় ‘পর্দা উন্মোচন’। এখানে মূলত জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য ও নিবিড় সাক্ষাৎকারগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে একটি সিদ্ধান্তের দিকে পৌঁছানো হয়েছে। প্রথমেই কথা হয়েছে ‘সামাজিক চলচ্চিত্র’ নিয়ে; কারণ দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে এ ধরনের চলচ্চিত্র। যদিও চলচ্চিত্র অধ্যয়নে সামাজিক চলচ্চিত্র বলে কোনো ধারার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু দর্শক ঠিকই তার মতো এ ধারাটি সৃষ্টি করে নিয়েছে। দর্শকের পছন্দের শীর্ষে থাকা এই সামাজিক চলচ্চিত্র একান্তই বাংলাদেশিদের এবং সেই সঙ্গে পুরনো। জাকির হোসেন রাজু তার ‘বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমা : জঁরা ও জাতীয়তার বন্ধনে’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সামাজিক ধারার শুরু ১৯৬০ দশকের ‘আধা-শহুরে সামাজিক প্রেক্ষাপটে মফস্বলী মধ্যবিত্তের জীবন যাপনকে পর্দায় তুলে ধরার মাধ্যমে।’ রাজু আরো বলেন, ১৯৯০ দশকে অ্যাকশনধর্মী ছবি বাণিজ্যিক সিনেমার প্রধান ধারা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ছবির ‘ঐতিহ্যবাহী’ ধারা ম্রিয়মাণ হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের দর্শকের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র। এই জনপ্রিয়তার মাত্রা পুরুষের চেয়ে নারী দর্শকের বেলায় অনেক বেশি। কলকাতার চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক বৈচিত্র্যময় উন্নতির পাশাপাশি এসবের সঙ্গে বাংলাদেশি দর্শকের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকতর সাদৃশ্য ও পরিচিতি এই জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকার বেলায়ও ভারতীয় চলচ্চিত্রের-বিশেষত কলকাতার চলচ্চিত্রের-অভিনয়শিল্পীরা এগিয়ে আছেন। বাংলাদেশে কলকাতার চলচ্চিত্রের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার পিছনে সেখানকার চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি সার্বিক পরিবর্তন বহুলাংশে দায়ী। ১৯৯০ দশকেও কলকাতার চলচ্চিত্র কারখানার অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ ছিলো। তারা টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশি চলচ্চিত্র রিমেক পর্যন্ত করেছে। চলচ্চিত্রনির্মাতা সাইমন কলকাতার ঘুরে দাঁড়ানোকে প্রধানত চারটি বিষয়ের সমন্বয় হিসেবে দেখেন-এক. দুই দশক ধরে আন্তর্জাতিক মানের ফিল্ম ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে ক্রমাগত চলচ্চিত্র কলাকুশলী তৈরি করা; দুই. সাহসী বিনিয়োগ ও নতুন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ; তিন. কলকাতার চলচ্চিত্র কারখানাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রণোদনা; চার. প্রেক্ষাগৃহের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন। এই চারটি বিষয়কে সাইমন ‘আপাত সরল কিন্তু জটিল উত্তরণ’ বলে চিহ্নিত করে বলেন, এই পরিবর্তন থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে।
দর্শকের বিচারে ভিনদেশি চলচ্চিত্রের সঙ্গে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের মূল পার্থক্যের জায়গা কাহিনি ও চিত্রনাট্যে। দর্শকের মতে, বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা দুর্বল ও বৈচিত্র্যহীন অভিনয়। তবে এ কথাও ঠিক, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যতোটা খারাপ তার চেয়ে খানিকটা বেশি করে দর্শকের মধ্যে চাউর আছে। সমাজে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে, আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র সম্পর্কে নেতিবাচক যে প্রকট মনোভাব তা এই কাঠামোবদ্ধ ধারণা তৈরির পিছনে অনেকখানি দায়ী। এছাড়া ঢাকাই চলচ্চিত্র ‘অশ্লীলতা’র যুগ পেরিয়ে ‘সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের যুগে’ ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু দর্শকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিচ্ছেদ রয়েই গেছে। ফলে দর্শকের একটা বড়ো অংশ দেশে নির্মিত চলচ্চিত্র না দেখেই রায় দিচ্ছেন, এর কোনো কিছু ভালো না।
এছাড়া বাংলাদেশি চলচ্চিত্র পিছিয়ে পড়ার ব্যাপারে সৃজনশীলতার সঙ্কট ও দক্ষতার অভাবকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্মাতা সাইমনের ভাষ্যমতে, আর সব কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত হতে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও চর্চার মধ্য দিয়ে যাওয়ার এক প্রকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও চলচ্চিত্রের মতো জটিল মাধ্যমের বেলায় তা নেই। তাই পুরো চলচ্চিত্রশিল্প দীনতায় ভোগার অন্যতম কারণ মাধ্যমটিকে ঠিকমতো বোঝার বা জানার চেষ্টা না করেই বেশিরভাগ তরুণ নির্মাতা হয়ে উঠার চেষ্টা করছেন। তবে শুধু নতুনদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে এর বিপণনের বিষয় নিয়ে প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনাকে নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় ভাবার ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন।
‘পর্দা উন্মোচন’ অধ্যায়ে আরো কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণা, প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে দর্শকের ঘরমুখীনতা এবং বিচিত্র দর্শকসমাজ নিয়ে। সবশেষে ‘দর্শকের কাছে পৌঁছাতে যা যা করণীয়’ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গ্রন্থটির শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে জরিপে অংশগ্রহণকারী দর্শকের জনমিতি, ফলাফল সারণি ও জরিপ প্রশ্নমালা। এছাড়া সবশেষে ‘দোহাই’ শিরোনামে রয়েছে গ্রন্থপুঞ্জি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান মন্দাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তানিয়া সুলতানা ও আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামানের এই গবেষণাগ্রন্থটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জানা মতে, দর্শকের অবস্থান থেকে চলচ্চিত্রের সার্বিক অবস্থাকে দেখার এমন গবেষণা বাংলাদেশে চোখে পড়েনি। চলচ্চিত্রের মূল জিনিস দর্শক হলেও নির্মাতা-প্রযোজকরা দর্শককে মাথায় রেখেছেন বলে মনে হয় না। দর্শক তাদের মাথায় থাকলে প্রযোজক, পরিচালক সমিতির উদ্যোগেই এ ধরনের গবেষণা নিয়মিত হওয়ার কথা ছিলো।
আগেই বলেছি, মূল গবেষণা থেকে গ্রন্থটি করার সময় বিভিন্ন অধ্যায়ের নামকরণের ক্ষেত্রে লেখকের সৃজনশীলতার ছাপ রয়েছে। তবে গ্রন্থটি পড়তে গিয়ে দু-একটা জায়গায় পাঠক হিসেবে খানিকটা অমসৃণতা আটকে দিয়েছে। ‘দর্শকের কণ্ঠ’ অধ্যায়ে সংখ্যাতাত্ত্বিক উপস্থাপনার পাশাপাশি লেখকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ যুক্ত থাকলে হয়তো আরো ভালো লাগতো। আর একটি বিষয় না বললেই নয়, ‘বচনামৃত : দর্শকের চেহারা’য় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ছয় জনের সাক্ষাৎকার নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ধরনের গবেষণা গ্রন্থের ধারাবাহিকতায় হঠাৎ করে ছয় জনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে। এজন্য শেষের ‘সংযোজন’-এ এগুলো যুক্ত করলে ভালো হতো। এই গ্রন্থের সহলেখক আতিকুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে পুস্তক সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত। তার এই অভিজ্ঞতার ছাপ গ্রন্থটির পাতায় লক্ষণীয়। বানান ভুল নেই বললেই চলে, প্রচ্ছদটিও ভালো হয়েছে।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিবছর এ ধরনের বেশ কয়েকটি গবেষণা সম্পন্ন করে আসছে। পরে তারা এসব গবেষণা গ্রন্থাকারেও প্রকাশ করে। তবে দুঃখের বিষয় হলো এসব গবেষণা ও তা থেকে প্রকাশিত বেশিরভাগ গ্রন্থের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় অনেক গবেষণার বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামগ্রিক গবেষণার ফলাফলে খুব বেশি কিছু পাওয়া যায় না। এই রকম একটি বাস্তবতায় নিঃসন্দেহে ‘দর্শকের মুখ’ পাঠক, গবেষকের মধ্যে আশা জাগিয়েছে।
বইয়ের নাম : দর্শকের মুখ
লেখক : তানিয়া সুলতানা ও আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান
প্রকাশক : বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ : ফাল্গুন ১৪২২, ফেব্রুয়ারি ২০১৬
প্রচ্ছদ : আবদুল্লাহ অপুর আলোকচিত্র অবলম্বনে শিবু কুমার শীল
মূল্য : ১৫০ টাকা
লেখক : কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।
kmhaiderru@yahoo.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন