শাবানা আজমি : ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘বৃহৎ এই বিনোদন কারখানা চায়, কেবল একই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ হোক’
শাবানা আজমি : ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর শফিকুল ইসলাম

প্রচলিত সমাজ বাস্তবতার মতো পুরুষ প্রাধান্যশীলতার ব্যাপক প্রভাব চলচ্চিত্রেও বিদ্যমান। এখন পর্যন্ত নির্মিত বিশ্বের অধিকাংশ চলচ্চিত্রই পুরুষ চরিত্রকেন্দ্রিক। ওই চরিত্রকে ধরেই চলচ্চিত্রের কাহিনি এগোয়। প্রয়োজনে নারীরা পর্দায় আসলেও তারা কাহিনির সঙ্গে কতোটা সংশ্লিষ্ট তার গুরুত্ব বোঝাই মুশকিল। নারী যেনো কাহিনিতে থেকেও নেই। পর্দায় যখন ক্ষমতাসীনদের প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র নিয়ে পুরুষ হাজির হয়, তখন নারী আসে কেবল পুরুষের ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হওয়ার জন্য, তার কাছে নত হওয়ার জন্য! তবে সমাজে যখন নারীদের নানা অধিকার নিয়ে কথা উঠেছে, তখন এর সুর ভেসে উঠেছে চলচ্চিত্রের পর্দায়ও। বৃহৎ এই গণমাধ্যমটিতে নারীর অবস্থা, অধিকার, আকাক্সক্ষা, ক্ষমতা সবই ধীরে ধীরে উঠে এসেছে। পুরুষ প্রাধান্যশীলতার প্রকটতর অঞ্চল ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র কারখানাতেও তার উপস্থিতি মেলে। এবং সেটাও অনেকাংশে উঠে এসেছে নির্মাতার সৃষ্ট সেই পুরুষ আধিপত্যশীল চরিত্রের মধ্য দিয়েই। গতানুগতিক এই নারী চরিত্রের বাইরে গিয়ে মানুষ হিসেবে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া এক অভিনয়শিল্পীর নাম শাবানা আজমি।
শাবানা আজমি তার অদম্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন অভিনয়ের পরতে পরতে। একের পর এক অভিনয় করেছেন প্যারালাল সব চলচ্চিত্রে। ভারতে তার অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই বাণিজ্য প্রাধান্যশীল কাঠামো থেকে শিল্পমাধ্যমটি কিছুটা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। শাবানা আজমি এতে নতুন রূপ, অন্যরকম আঙ্গিক দিয়েছেন। একশোটির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। জীবন্ত কিংবদন্তি এই অভিনয়শিল্পীর প্রাপ্তিও অনেক। রেকর্ড সংখ্যক ‘ন্যাশন্যাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট অ্যাক্ট্রেস’ এবং ‘ফিল্মফেয়ার বেস্ট অ্যাকট্রেস অ্যাওয়ার্ড’ পান পাঁচ বার। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করেন। এছাড়া ‘গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড’সহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মানসূচক পদক জমা হয়েছে শাবানা আজমি’র ঝুলিতে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের লৌহমানবী খ্যাত শাবানা আজমির জন্ম ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের হায়দারাবাদে। বাবা কাইফি আজমি ভারতের বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক এবং মা শওকত আজমি ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংগঠনের (আই পি টি) সদস্য। বাবা-মা দুজনেই কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য হওয়ায় ছোটোবেলা থেকেই বামপন্থি ও সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠেন শাবানা আজমি। যে ধারণাগুলো পরবর্তী সময়ে তার পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক বোধগুলোকে গভীরভাবে জাগ্রত করে। যার প্রভাব শাবানা অভিনীত প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রে লক্ষণীয়।
মুম্বাইয়ের কুইন মেরি স্কুলে শাবানা আজমির শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক পাশ করেন তিনি। এরপর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে অভিনয়ের ওপর পুনে’র ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে পড়ালেখা করেন। আর এ সময়ই জয়া ভাদুড়ি’র অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন শাবানা আজমি। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে খাজা আহমদ আব্বাসের ফাসলার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন শাবানা। একই বছরে অভিনয় করেন কান্তিলাল রাঠোড়ের পরিণয়-এ। তবে এই দুটি চলচ্চিত্রের আগেই শাবানা অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র শ্যাম বেনেগালের অঙ্কুর (১৯৭৪)। অঙ্কুর-এ অভিনয়ের পর আর পিছনে ফিরতে হয়নি তাকে। একের পর এক চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত সব চরিত্রে পর্দায় হাজির হয়েছেন শাবানা।
বলিউডে ‘দক্ষ’ অভিনয়শিল্পীর অভাব হয়তো কখনো ছিলো না। কিন্তু এতোসব অভিনয়শিল্পীর ভিড়ে শাবানা সবসময় নিজস্ব দীপ্তিতে উজ্জ্বল থেকেছেন। সত্যজিৎ রায়ের মতো খুঁতখুঁতে নির্মাতাও তার অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। সত্যজিৎ তার শতরঞ্জ কি খিলাড়ির (১৯৭৭) খুরশিদ বেগমের ভূমিকায় বেছে নেন তাকে। এছাড়া মহেশ ভাটের আর্থ (১৯৮২), শ্যাম বেনেগালের সুসমান (১৯৮৭), অন্তরনাদ (১৯৯১), মৃণাল সেনের খন্ডহর (১৯৮৩), জেনেসিস (১৯৮৬), একদিন আচানক (১৯৮৯), গৌতম ঘোষের পার (১৯৮৫), দীপা মেহতার ফায়ার (১৯৯৬) এর মাধ্যমে অন্যতম সেরা অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছেন শাবানা। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে-নিশান্ট (১৯৭৬), অমর আকবর অ্যান্টনি (১৯৭৭), পারভারিশ (১৯৭৭), জুনন (১৯৭৮), স্বামী (১৯৭৮), আপনে পারায়ে (১৯৮০), অবতার (১৯৮৩), ভাবনা (১৯৮৪), ম্যায় আজাদ হু (১৯৮৯), গডমাদার (১৯৯৯), স্যরি ভাই! (২০০৮), জাজবা (২০১৫), চক অ্যান্ড ডাস্টার (২০১৬) ও নিরজা (২০১৬)। বলিউডের বাইরে শাবানা হলিউডের মাদাম সাওসাটজকা (১৯৮৮) ও সিটি অব জয় (১৯৯২) এ অভিনয় করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বিখ্যাত কবি জাভেদ আখতারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের রাজ্যসভার নির্বাচিত সদস্য শাবানা শিশু অধিকার, মানবধিকার, এইডস বিষয়ে সচেতনতা নিয়ে কাজ করছেন এবং মৌলবাদিতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধে কাজও করে যাচ্ছেন।
২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘ফিল্মফেয়ার’-এর জ্যেষ্ঠ সম্পাদক রাঘবেন্দ্র সিং এবং ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে ইন্ডিয়ান-আমেরিকান কমিউনিটি ম্যাগাজিন ‘খবর’-এর জন্য ভিরেন মায়ানী আরেকটি সাক্ষাৎকার নেন শাবানা আজমি’র। ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকার দুটি বাংলায় ভাব-ভাষান্তর করা হয়েছে।
প্রথম অংশ
ফিল্মফেয়ার : উদ্বেগী মায়ের ভূমিকায় নিরজাতে আপনার অভিনয় দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
শাবানা : আমি নিরজার জন্য এতো প্রশংসা পেয়ে অবাকই হয়েছি। চলচ্চিত্রটির নির্মাতা রাম মাদভনি’কে আমি ঠাট্টা করে মুঠোফোনে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলাম, ‘আমি কী এর আগে কখনো এ ধরনের চলচ্চিত্রে কাজ করিনি! তাহলে এতো বেশি প্রশংসার কারণ কী?’ তবে বর্তমানে মুঠোফোনের আবির্ভাব অনেক কিছুকে সহজ করে দিয়েছে। আপনার কাজ যদি আমার পছন্দ হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে একটি বার্তা পাঠিয়ে দিই। আগে টেলিফোনে কল করতে হতো, আপনি কখনো বাড়িতে না থাকলে কাজের লোককে বলে রাখতেন; যা আর কেউ জানতো না, ওভাবেই থাকতো। কিন্তু এখন আপনি যাকে যখনই ফোনে বার্তা পাঠান, তিনি অবসর সময়ে তা পড়ে নেন। তাই সব প্রশংসাই এখন মুঠোফোনের প্রাপ্য। তাই এ নিয়ে এতো বেশি উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু এটা সত্য, নিরজার প্রতিক্রিয়ায় প্রশংসাটা বেশিই হয়েছে; এতোটা আশা করিনি। রাম মাদভনি আমায় বলতেন, নিরজার কাহিনি অপহরণ নিয়ে, কিন্তু এর মূলটা মা-মেয়ের সম্পর্কের মধ্যে। তাই মায়ের ভূমিকা যদি ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা না যায়, তাহলে পুরো চলচ্চিত্রই মার খেয়ে যাবে। মায়ের চরিত্রটা সুন্দরভাবে লেখা হয়েছে, আপনি চরিত্রের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাবেন।
ফিল্মফেয়ার : এই চলচ্চিত্রে আপনার প্রিয় দৃশ্য কোনটি?
শাবানা : অনেকগুলো পছন্দের দৃশ্যের মধ্যে অপহরণের দিন সকালে নিরজাকে (সোনমকে) ঘুম থেকে যখন জাগাতে যাই এবং তার পাশে শুয়ে পড়ি-এই দৃশ্যটির কথা উল্লেখ করবো। রাম মাদভনি চায়নি এটা কোনো সাদামাটা দৃশ্য হোক। এখনো আমি যখন ঘুম থেকে উঠি, আমার মায়ের বিছানায় যাই; কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার পাশে ঘুমাই। আমি দৃশ্যটা ওইভাবেই করার প্রস্তাব দেই, রাম রাজিও হয়। কিন্তু বিষয়টা আমরা সোনমকে আগে বলিনি। ওই দৃশ্যটার শুটিং যখন শেষ হলো, সোনম তো একেবারে অবাক! তবে এর কৃতিত্ব সোনমকেও দিতে হবে, কারণ আমার সঙ্গে ওভাবেই সে অভিনয়টা চালিয়ে গেছে। এখন অবশ্য নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আমার পরামর্শটা কাজে লেগেছিলো।
ফিল্মফেয়ার : যে ধরনের চলচ্চিত্র এখন নির্মিত হচ্ছে সে পরিপ্রেক্ষিতে এই সময়টা কি ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য রোমাঞ্চকর না?
শাবানা : হ্যাঁ, সবধরনের চলচ্চিত্রই এখন নির্মাণ হচ্ছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, আমি কেবল আর্টফিল্মেই কাজ করি। এটা কিন্তু ঠিক নয়। বৃহৎ এই বিনোদন কারখানা চায়, কেবল একই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ হোক। কিন্তু সেটা তো স্বৈরতান্ত্রিক। দর্শকের একটা পছন্দ আছে। সুতরাং আপনার চলচ্চিত্র যদি কেবলই বাণিজ্য প্রাধান্যশীল হয়, তাহলে আপনি চলচ্চিত্রের মাঝ পথেই আটকে যাবেন; এ পথে বেশি দূর এগোতে পারবেন না। আজকের বেশিরভাগ নির্মাতাই শহরে বেড়ে উঠা এবং তারা পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত-করণ জোহর, জয়া আখতার, ফারহান আখতার, অয়ন মুখার্জী প্রমুখ। তাই তাদের চিন্তা-চেতনা ও আগ্রহ ওই বলয়ের ভিতরেই সীমাবদ্ধ। তারা যদি শুধু বুর্জোয়া শ্রেণিকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। কারণ বুর্জোয়ারাও তো ভারত গঠনের অংশ। তবে এখানে অনুরাগ কাশ্যপ ও বিশাল ভরদ্বাজের মতো নির্মাতারাও আছেন। হিন্দি চলচ্চিত্র থেকে গ্রাম হারিয়ে গেছে এবং সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ছোটো ছোটো শহর। মেহবুব খান, শ্যাম বেনেগাল, সত্যজিৎ রায়ের মতো নির্মাতাদের কাছে গ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, কারণ ওটাই ছিলো তাদের বাস্তবতা।
ফিল্মফেয়ার : আপনি কি ওই ধরনের চলচ্চিত্রের অভাববোধ করছেন?
শাবানা : এটা ভুল ধারণা যে, প্যারালাল চলচ্চিত্রের সময় শেষ হয়ে গেছে। মূলত এটাকেই স্বাধীন চলচ্চিত্রের অবতার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে প্যারালাল চলচ্চিত্র মানে এই নয়, আপনি কেবল গ্রাম নিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। এটা এমন একটা নির্দিষ্ট চেতনাকে বোঝায়, যা বক্স অফিস সূত্রকে অনুসরণ করে না। এই ক্ষেত্রে মাসান-এর কথা বলা যায়। আরেকটি আন্ডাররেটেড চলচ্চিত্র কিসা (ইন্দো-জার্মান পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র, ২০১৩)। আদিত্য চোপড়া’র দম লাগাকে হাইশাও একটি দারুণ নজির। যদি কোনো নির্মাতা বুঝতে পারে, একটি ছোটো শহর কিংবা একজন ব্যক্তির গুরুত্ব আছে, তখন তার কাছে প্রথাগত নায়ক-নায়িকা খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। আর এটা কিন্তু সময় পরিবর্তনের আভাস দেয়। ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, তাদের হাতে টাকা আছে, আকাক্সক্ষা আছে। সবকিছুই চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত করতে হবে।
ফিল্মফেয়ার : এখন তো নারীদের নিয়ে চলচ্চিত্রের ছড়াছড়ি, তাই না?
শাবানা : হ্যাঁ, অভিনয়ে এ বিষয়ে নেতৃত্ব দানকারী নারীরা চলচ্চিত্রে স্বীকৃতি পেয়েছে; সেখানে তারা এখন শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। এটা তাদের সুযোগ করে দিয়েছে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ারও। এই নারী অভিনয়শিল্পীরা এখন পারিশ্রমিককে প্রাধান্য না দিয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে নির্মাতাদের। যদি সোনম কাপুর বিনাপয়সাতেও নিরজাতে কাজ করে-তবে সে এটা করেছে-কারণ এটা তাকে চমৎকার একটি কাজের সুযোগ পাইয়ে দিয়েছে। আর অনেক সময় পার করে সে পুরস্কারও পেয়েছে নিরজার জন্য। একটি চলচ্চিত্রে পারিশ্রমিক বিসর্জন বিনিময়ে তার থলেতে জমা পড়েছে অনেক সম্মান, প্রাপ্তি। অথচ দর্শক তাকে কেবল একজন ‘ফ্যাশনেবল নায়িকা’ হিসেবেই চিনতো! সোনমের এই অর্জন অন্য নারী অভিনয়শিল্পীদের এ ধরনের কাজের ব্যাপারে উৎসাহিত করবে।
ফিল্মফেয়ার : প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এবং দীপিকা পাড়ুকোন হলিউডে অভিনয় করেছেন। তাদের অর্জনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শাবানা : আমি প্রথম শার্লি ম্যাকলেইন-এর সঙ্গে পশ্চিমা মাদাম সাওসাটজকা (১৯৮৮)-এ কাজ করি। এরপর ১৪টি বিদেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। নাটক কিংবা চলচ্চিত্র যা-ই বলি না কেনো, নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে সবক্ষেত্রে এশিয়ার অভিনয়শিল্পীদের চাহিদা আছে। এখন প্রশ্ন, কেনো একটি জাতিকে বিবেচনায় আনা হয়? কেনো সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ককেশিয়া অঞ্চলের অভিনয়শিল্পীরা পায়? এটা ঠিক যে, একজন ভারতীয় হিসেবে প্রিয়াঙ্কা মোটেও এই অবস্থাকে এগিয়ে নেননি। তবে এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এখন নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে কাউকে কোনো চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করার মানে কী? ইরফান খানের ক্ষেত্রে যেটা আমি দেখেছি। তিনি যে চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হন, সে চরিত্রে একজন ভারতীয় দরকার। এটা নিঃসন্দেহে ভালো। তাই বলে এটা নিয়ে উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। পশ্চিমাদের গল্পের অংশ হয়ে উঠার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে এখন ভারতীয়রা অনেক ভালো করছে।
ফিল্মফেয়ার : দেশের নতুন নির্মাতাদের সঙ্গে কাজে অবশ্যই তাদের তুষ্ট করতে হয় ...
শাবানা : হ্যাঁ, আমি অবশ্য তোষামোদি বুঝি। অনেকেই বলে, ‘আমাদের এতো সাহস হয়নি যে, আমরা আপনাকে প্রস্তাব দিবো।’ আমি কী ডাইনি! তবে আমি খুশি এ কারণে যে, নির্মাতারা আমার কাছে বাজে কোনো চরিত্র নিয়ে আসে না। আমি কিন্তু নবীন নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। আমি ইউক্রেনিয় এক নির্মাতার চলচ্চিত্রে কাজ করেছি, যেটা মাত্র তিনটি শটে সম্পন্ন। এটা অনেকটা মঞ্চনাটক করার মতো।
এখন তো অনেকে ওয়েবে চলচ্চিত্র মুক্তি দেয়। এটাতে আমি বেশ আনন্দ পাই। এক দশকের বেশি সময় আগে, গুগলের জন্য লস অ্যাঞ্জেলসে বেন রেখি’র ওয়াটারবর্ন নামে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করি। চলচ্চিত্রটি সামাজিক মাধ্যমগুলোতে মুক্তি পায় ১০ বছর আগে। আজও মানুষ এটা নিয়ে কথা বলে। কোনো ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়া এখান থেকে লস অ্যাঞ্জেলসে গিয়ে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আসার কথা এখন কেউ ভাবতেই পারবে না। সব ধরনের আরাম-আয়েশ বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেখানে কাজ করা মোটেও সুখকর ছিলো না। কিন্তু আমি এটা করেছিলাম। সুতরাং কোথায় কী করতে হবে সে বিষয়ে আমার নিজস্ব একধরনের বোঝাপড়া আছে। আমি নিরাজ গয়ানের সঙ্গে কাজ করতে চাই, আমার সন্তান ফারহান আখতার ও জয়া আখতার, শাকুন বাত্রা, রিতেশ বাত্রা, বিক্রমাদিত্য মোটওয়ান এবং অনুরাগ কাশ্যপ-এর সঙ্গেও কাজ করতে আগ্রহী।
ফিল্মফেয়ার : ফারহান বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তার বহুমুখীতার কোন বিষয়টি (অভিনয়শিল্পী, গায়ক, নির্মাতা) আপনি উপভোগ করেন?
শাবানা : আমার ছেলে হিসেবে ফারহানকে আমি বেশ পছন্দ করি। সে প্রাণবন্ত, মজার, প্রেমিক-সবই। জয়া ও ফারহানের মধ্যে মিল নেই। আমি ওটা বেশ উপভোগ করি। আমার জীবনে এই দুজনের উপস্থিতির জন্য আমি অবশ্য হানি ইরানিকে (জাভেদ আখতারের প্রথম স্ত্রী) কখনো ধন্যবাদ দিতে পারিনি; সেটা আমি ওদের (জয়া ও ফারহান) বলেছি।
ফিল্মফেয়ার : সম্প্রতি আপনি তো ‘কাইফি ওর ম্যায়’ (Kaifi Aur Main) নাটকের জন্য মাসব্যাপী বিশ্বভ্রমণ শেষে ফিরলেন। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।
শাবানা : ১৬টি শহরে আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। প্রত্যেকটি প্রদর্শনী ছিলো হাউজফুল। আমাদেরকে বলা হয়েছিলো, ওই সময়ে আমেরিকায় কিছুই হয়নি। এমনকি শেষকৃত্যানুষ্ঠানও রেখে দেওয়া হয়েছিলো ছুটির দিনের জন্য। কিন্তু এর মধ্যেই আমরা বুধবার ও বৃহস্পতিবার প্রদর্শনী করেছি এবং ওই শোও দর্শকে পরিপূর্ণ ছিলো। এর মধ্য দিয়ে আমার বাবা কাইফি আজমি ও মা শওকত আজমি’র প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান জানানো হয়। এছাড়া এই সফরের জন্যই জাভেদ আর আমি অনেকদিন পর একসঙ্গে ভ্রমণের সুযোগ পাই; ব্যস্ততার কারণে সাধারণত যা কখনোই সম্ভব হয় না।
জাভেদ ছাড়া অবশ্য কোনো পেশাদার অভিনয়শিল্পীর পক্ষে নাটকের এই অংশটুকু ভালোভাবে করা সম্ভব হতো না; কারণ জাভেদ আমার বাবার (কাইফি আজমি) মেজাজ, ভাষা ও কবিতা বোঝে। তাই যখন জাভেদ বাবার কবিতা পাঠ করে, তখন সে এটার মর্ম বুঝতে পারে। অভিনয়ের পর তাৎক্ষণিক প্রশংসাটা সন্তুষ্ট হওয়ার মতো ছিলো।
ফিল্মফেয়ার : জাভেদ আখতারের সঙ্গে আপনার দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের গোপন রহস্যটা কী?
শাবানা : (হাসি) জাভেদের সঙ্গে ওই ধরনের পরিস্থিতিতে কখনোই আমাকে পড়তে হয়নি। তাহলে দ্বন্দ্বের প্রশ্নটা কোথা থেকে আসবে? মেয়েরা আমার কাছে এসে বলে, ‘আপনি এমন একজনকে বিয়ে করেছেন যিনি রোমান্টিক সব গান লেখে। তিনি নিশ্চয় কতো রোমান্টিক!’ আমি বলি, তার শরীরে রোমাঞ্চের ছিটেফোঁটাও নেই! (হাসি) তার যুক্তি, যদি তুমি একজন সার্কাসের শিল্পী হও কিংবা ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম করো, তাহলে কি তুমি নিজের বাড়িতেও সার্কাসের মতো ঝুলে থাকো? আমাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো রোমান্টিকতা নেই। এই সম্পর্কটা পারস্পারিক বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে গড়ে উঠেছে। জাভেদ প্রায়ই বলে, ‘শাবানা আমার কাছে একজন ভালো বন্ধু। এমনকি বিয়েও আমাদের বন্ধুত্বকে নষ্ট করতে পারেনি।’ আমরা শুধু বন্ধু, আমাদের দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি একই। অনেকক্ষেত্রে আমার বাবার সঙ্গে তার মিল রয়েছে। এমনকি আমাদের দুজনের অতীতও একই রকম। আমি প্রায়ই বলি, আমরা আনুষ্ঠানিক বিয়েও করতে পারতাম।
ফিল্মফেয়ার : আপনি কি আর দশজন স্ত্রীর মতো, যারা কেবল রান্নাবান্না ও সাংসারিক বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকে?
শাবানা : কখনোই না! আগে থেকেই আমি এগুলোতে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এগুলো আমার প্রচুর সময় নষ্ট করেছে। তবে এটা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপায়ও আমার জানা আছে। যখন আমি দূরে থাকি, কাজ করি, তখন আমি তাকে কখনো বলি না, তোমার খাবার খেয়ে নাও, ঔষধ খাও কিংবা অন্যান্য কিছু। কিন্তু আমি বেশ সংসারী। তবে তার (জাভেদ) একজন কাজের লোক আছে, সেই ওর দেখাশোনা করে। কেবল ওর পোশাক-পরিচ্ছেদ পরার বিষয়টি আমি খেয়াল রাখি। মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত লাগে, যখন আমি থাকি না, সে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য ভুলভাল কোর্তা পরে চলে যায়। আমি খুবই অবাক হই, সে এমনই মানুষ, বাড়ি এবং কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার পোশাক আলাদা করতে পারে না।
আমি এখনো তার ব্যাগ গুছিয়ে দিই। যখন আমরা একসঙ্গে ভ্রমণে বের হই, আমিই সবকিছু দেখি। সে মূলত কিছুই করে না। একজন স্বামীর কাছে আপনি যতোটুকু আশা করতে পারেন, তার কিছুই পাবেন না তার কাছে। যদি তার কোর্তার কোনো বোতাম হারিয়ে যায়, তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যাথা থাকে না। তবে একটা বিষয় হলো, আমার জন্মদিন ছাড়া আর কোনো বিশেষ তারিখই সে মনে রাখে না। অন্যান্য ক্ষেত্রে আমার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সে তার নিজের কাজ করেই চলে। এছাড়া যখনই আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়, সে তার কোবরার মতো বিষদাঁতগুলো বের করে বলে, ‘আমার বউয়ের কাছে আর কারো যাওয়ার সাহস নেই।’ তবে আমাদের সম্পর্কটা খুব নিরাপদ। সে সবসময় আমাকে বলে, ‘আমার পাশে যদি একজনও দাঁড়ায়, সেটা তুমি; তাই আগের কথায় কিছু মনে করো না।’ আসলে দম্পতি হিসেবে যদি একে অন্যের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সবকিছুই ভালো লাগে।
ফিল্মফেয়ার : বিনোদন জগতের মানুষের বিয়ে বেশি দিন টিকে না কেনো?
শাবানা : আমি মোটেও সেটা মনে করি না। আমি একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা অন্য কারো সঙ্গে ‘সফল বিয়ে’ করতে পারতাম। শিল্পী হিসেবে, যখন সে কোনো কিছু লেখে বা আমি কোনো চরিত্রে অভিনয় করি, তখন আমরা চরিত্রগুলোর ওই পৃথিবীতে থাকতে পছন্দ করি। আমরা মানসিকভাবে সমস্যায় থাকি এবং দুঃখভরা মন নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। এমতাবস্থায় শুধু একজন শিল্পীই তার সঙ্গীর মনের অবস্থা বুঝতে পারে; সে জানে এ সময় তার কী প্রয়োজন। আমি আমার পরিবারে সেটা দেখেছি। কারণ, আমার বাবা-মা দুজনই লেখক, অভিনয়শিল্পী ছিলেন। ঠিক যেমন জাভেদ আর আমি। শিল্পী হিসেবে আমরা একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা কখনো একে অন্যের কাজে বাধা দিই না; কিন্তু একে অন্যের কাজে প্রভাবিত হই। কারণ আমরা পরস্পরের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। জাভেদ সবসময় আমাকে ভালো কিছু করতে উৎসাহ দেয়; অবশ্য আমিও দিই। সে অনেক বড়ো মনের মানুষ। জাভেদ ও আমি আমরা পরস্পরের সমালোচক, সমর্থক। সে নিরজাতে আমার অভিনয় পছন্দ করেছে। আমার সফলতায় সে এতো খুশি হয়, যেমনটা গর্বিত হয় বাবা তার সন্তানের অর্জনে। এটা আমার খুব ভালো লাগে।
দ্বিতীয় অংশ
খবর : একজন নারীবাদী হয়ে, আপনি অনেক প্রভাবশালী নারীচরিত্রে অভিনয় করেছেন। ভারতে নারীবাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
শাবানা : আসলে দেখুন, ভারতে যুগপৎ ভিন্ন ভিন্ন শতাব্দী অবস্থান করে। আমাদের এখানে যেমন ১৮ শতকের মানুষ আছে, তেমনই আছে ২১ শতকের। এই মানুষগুলো নানা ভাষাভাষী, ধর্ম, জাতি-গোষ্ঠী ও শ্রেণি থেকে আসায় তাদের বৈশিষ্ট্যে বেশ সংমিশ্রণ রয়েছে। এই বিষয়গুলো নারীর অবস্থানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। স্বাধীনতার ৬৩ বছর পর আমরা একজন নারী প্রেসিডেন্ট, ক্ষমতাসীন দলে একজন নেত্রী, বিরোধী দলে একজন নেত্রী এবং লোকসভায় একজন নারী স্পিকারকে পেয়েছি। এটাইবা কম কীসে।
আবার একই সঙ্গে, ভারতে এখনো নারী ভ্রুণ নষ্ট করা হচ্ছে। শুধু গ্রামাঞ্চলেই নয়, এটা এখন মুম্বাই এমনকি হরিয়ান, পাঞ্জাব, গুজরাট শহরের আনাচে-কানাচে অহরহ ঘটছে। অথচ এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এখনো ভারতে প্রসূতি মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ। তাই সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধিটাও অসম। আমি মনে করি, ভারতে ইতোমধ্যে নিজেদের রক্ষায় শক্তিশালী নারী আন্দোলন গড়ে উঠেছে। কিন্তু যদি আপনি নারীর অপুষ্টি, মাতৃমৃত্যু হার, নারী ভ্রুণ হত্যা নিয়ে ভাবেন, দেখবেন সেখানে এখনো অনেক কিছুই পাওয়ার এবং করার প্রয়োজন আছে।
কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্রে নারীর উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে; এটা নিঃসন্দেহে ভালো দিক। এছাড়া আমরা নারী সংরক্ষণ বিল নিয়ে কথা বলতে পারি; যেটা এতো বছর পরও গৃহীত হচ্ছে না। যদিও আমাদের অনেক কিছুই অর্জন হয়েছে; কিন্তু এখনো দীর্ঘ পথ চলার বাকি।
খবর : অঙ্কুর (১৯৭৪) থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আপনার অধিকাংশ চলচ্চিত্রেই কোনো না কোনো বার্তা রয়েছে। আপনি একটি স্ক্রিপ্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঠিক কোন কোন বিষয়ে খেয়াল রাখেন?
শাবানা : আসলে আমি এমন একটি পরিবেশে বড়ো হয়েছি, যেখানে আমার বাবা-মা বিশ্বাস করতেন, শিল্পকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। আমার বাবা তার কবিতায় এবং মা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সেটা করতে চেয়েছেন। তারা যে আমাকে অভিনয় শিখিয়েছেন, বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়; তবে এটা শেখার মতো পরিবেশ আমার পরিবারে ছিলো। কারণ শিশুরা দেখেই শেখে। আমার বাবা প্রগতিশীল লেখক সমিতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
চলচ্চিত্রে যখন কাজ শুরু করলাম, তখন আমি বুঝলাম, একজন অভিনয়শিল্পীর কাজও নয়টাÑপাঁচটা চাকরির মতো, যার বাইরে তার আর কিছুই করার থাকে না। একজন ব্যক্তি হিসেবে আপনি তখন সমাজের অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবেন না। তখন আপনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আয়েশি ঘরে ফিরে বলবেন, চলচ্চিত্রে আমি যে চরিত্রে অভিনয় করি, তার বাইরে গিয়ে আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না। এর বাইরে অবশিষ্ট যা কিছু থাকবে তা আপনি আপনার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারবেন। আর এভাবেই আমার সচেতনতা জোরালো হয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পেরেছি। এটাই ছিলো আমার পটভূমি। এছাড়া আমি যেসব চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি, সেগুলো আমাকে বিভিন্ন কাজ শুরু করতে প্রভাবিত করেছে; আর এসব চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের জন্যও ছিলো না। তার মানে এই নয় যে আমি বিনোদনের বিপক্ষে। আমি মনে করি, যেকোনো কিছুর শেষটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অপক্বতা ভিন্ন জিনিস।
খবর : ফায়ার-এ আপনার অভিনয় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে এনেছে, যেটার জন্য সম্ভবত এক শ্রেণির দর্শক প্রস্তুত ছিলো না। এ নিয়ে প্রথমে আপনার অনুভূতি কেমন ছিলো এবং ফায়ার-এ যখন আপনি সমকামি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব পেলেন, তখন আপনার চিন্তা কী ছিলো?
শাবানা : যখন আমি ফায়ার-এর স্ক্রিপ্টটা হাতে পাই, এই বিষয়ে আমার মতামত দেওয়া নিয়ে অতোটা তাড়াহুড়ো ছিলো না। তবে স্ক্রিপ্টটি আমার বেশ ভালো লেগেছিলো। কিন্তু আমি জানতাম, এটা নিয়ে কথা উঠবে। তাই আমি এ নিয়ে মতামত জানাতে এক মাস সময় নিই। আমি ভাবলাম, আমার জন্য এটা করা কি ঠিক হবে? বিষয়টি আমি জাভেদকেও জানালাম। সে বলল, দেখো এ কাজ করতে তোমাকেই বাইরে যেতে হবে। যদি তুমি নিজেকে রক্ষা করতে পারো, করো। কারণ এটা নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠবেই। আমিও বললাম, হ্যাঁ। তারপর সে বলল, ঠিক আছে, এগিয়ে যাও। আমার মেয়ে জয়াও স্ক্রিপ্টটি পড়লো। আমি বললাম, এই ধরনের সমকামি সম্পর্কে আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত। সে (জয়া) তখন বললো, এটা কোনো ব্যাপার! তখন বুঝতে পারলাম, নতুন প্রজম্মের কাছে এটা আদৌ কোনো সমস্যা নয়।
ভারতের মতো জায়গায় সবার আচরণ এক হবে না, সেটা আমি জানি। সবার প্রতিক্রিয়াও একই রকম নয়। এ নিয়ে কেউ আন্দোলন করবে, কেউ বিক্ষুব্ধ হবে, কেউ বিভ্রান্ত হবে। কিন্তু এটাও ঠিক জিজ্ঞাসার একটা জায়গা তৈরি হবে। আর এটাই চলচ্চিত্রটি করতে পারে-সচেতনতা বাড়বে এবং মানুষ প্রশ্ন তুলবে। আমি জানতাম, দীপা মেহতা এটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করবেন। তাই এই বিশ্বাস থেকেই ফায়ার নিয়ে আমার খুব একটা দুশ্চিন্তা ছিলো না। এটা নান্দনিক ও সংবেদনশীলভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছিলো।
অবশ্যই, ফায়ার-এ ধর্মভিত্তিক বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়েছিলো। আমি বোঝাতে চাচ্ছি, আজ অনেক বছর পরেও এই বিষয়টি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ ফায়ার-এ যে বিষয়গুলো উঠানো হয়েছিলো সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যে কথাগুলো উঠছে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার; এগুলোকে কার্পেটের নিচে চেপে রাখার ফল কখনোই ভালো হবে না। এটা নিয়ে প্রথমত আপনাকে কথা বলতে হবে, বিশেষ করে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে। যদিও আমরা এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো চেপে রাখতে পছন্দ করি, আর তখনই তা আমরা এড়িয়ে চলি। এটা আদৌ সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে না।
আমার কাছে ফায়ার শুধু সমকামিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। আপনি যদি এই দুই নারীকে বিবেচনা করেন, তাহলে ‘অন্য’ মানে অন্য জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, দেশ নিয়ে যে সমানুভূতি তার ধারণাকে আপনি আরো প্রসারিত করতে পারবেন। একটি দ্রুত বর্ধমান অসহনীয় বিশ্বে আমার মনে হয়, শুধু এটা সহ্য করাটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের চেয়ে ভিন্ন মতাদর্শীরাও এটা গ্রহণ করছে।
খবর : আপনি তো বস্তির জীবন অনেক কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের সঙ্গে আপনার কাজের অভিজ্ঞতাটা কেমন?
শাবানা : বেশ। প্রথমেই আমি ‘নভেরা হক’ সংস্থার কথা বলবো, যারা মুম্বাই শহরে ৪০ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে পুনর্বাসন করেছে। এটা এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো একক পুনর্বাসন প্রকল্প; যাদের জন্য আমি কাজ করেছি। বস্তির এই মানুষগুলো জাতীয় পার্কে বসতি গড়েছিলো। পরে সুপ্রিম কোর্ট মোট তিন লক্ষের মধ্যে থেকে ৩০ হাজার পরিবারকে অন্যত্র পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে বলে রায় দেন। সে অনেক কথা। যাইহোক আমরা ৪০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসন করেছিলাম। এই বস্তিগুলোর জন্য সরকারের নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব থাকে। অথচ সরকার তাদেরকে ধ্বংস করছে। আর এটা তারা করেছে কোনো কারণ ছাড়াই। ফলে বস্তিগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। কারণ মানুষ তো আর গ্রামে ফিরে যাচ্ছে না। সর্বোচ্চ তারা হয়তো সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অন্য কোথাও যেতে পারবে। যার কারণে প্রথম বস্তিতে পানি, বিদ্যুৎ থাকলেও দ্বিতীয়টা আর কিছুই পায় না। আপনি দিনের পর দিন বস্তিগুলোকে খারাপ করে তুলছেন, কোনো সমস্যারই সমাধান করছেন না।
গ্রাম থেকে মানুষ শহরে বসতবাড়ির খোঁজে আসে না, আসে কাজের সন্ধানে। তারা কাজ পেলেও থাকার জায়গা পায় না। এখন যদি সরকার বস্তিবাসীদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে আবাসন সুবিধার ব্যবস্থা না করে, তবে বাজার মূল্যে বস্তিবাসীদের জন্য তো আর জমি কেনা সম্ভব নয়। সুতরাং বস্তিকে ঘিরে অবৈধ যে চক্রটা গড়ে উঠেছে তা সক্রিয়ই থাকে।
গ্রাম থেকে কোনো লোক মুম্বাইয়ের বস্তিতে আসার পর কী ঘটে? মূলত ওই ব্যক্তি জমি, স্ত্রীর গহনা বা সর্বস্ব বিক্রি করে শহরে আসে। সেরকমই এক ঘটনা বলি, এক ব্যক্তি এক লক্ষ রুপি নিয়ে এক বস্তিতে এসেছিলো। বস্তির মালিক ওই লোককে বললো, আপনি আমাকে টাকা দেন, আমি আপনাকে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিবো। একথা শুনে লোকটি মালিককে টাকাটা দেয়। বস্তির মালিক ওই টাকা থেকে অর্ধেক নিয়ে বাকিটা তাকে ফেরত দেয় এবং এক বছরের জন্য ওই বস্তিতে তার থাকা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এক বছর পর সেই বস্তি মালিকের আর দেখা পাওয়া যায় না। ফলে ওই লোকটি আবারও উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে।
এখন তো সেই টাকার পরিমাণ অনেক। বস্তিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ করা হয়, তারা কর দেয় না। কিন্তু তারা আমার-আপনার চেয়ে তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ বিল এবং পানির মূল্য পরিশোধ করে। কিন্তু এই কর জায়গা মতো যায় না। কারণ সরকার সবসময়ই তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং বলে, তাদের কোনো বৈধতা নেই। তাই চক্রটি সক্রিয়ই থাকে। সরকার যদি সত্যিই কর ঠিকমতো পেতো, তবে অর্থনীতিটাও এগিয়ে যেতো। তাই মূল সমস্যাটা হলো জমির ব্যবহার নিয়ে। অন্যদিকে সরকার বলতেই থাকে, জমি নেই। যদিও এটা মোটেও সত্য নয়। কারণ, আরবান ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট-এর অধীনে যে জমি সরকারকে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে থেকে মাত্র .০১ শতাংশের সুষ্ঠু ব্যবহার করা হয়েছে।
মুম্বাই শহরটা মূলত বাড়ি নির্মাণ ব্যবসায়ীদের অনুকূলে এবং তাদের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের একটা যোগসূত্র রয়েছে। আর এটাই এখানে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। আমি মনে করি, এখন গ্রামেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সেখানকার লোক চাকরির খোঁজে শহরে না আসে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই বস্তিবাসীদের জন্য কে কথা বলবে। বাকিরা সবাই বলে, এরা খারাপ, এরা শহরকে ধ্বংস করছে। কিন্তু এরাই তো এই শহরের কাজের মানুষ। যে বালক আপনাকে প্রতিদিন দুধ এনে দেয়, সংবাদপত্র দিয়ে যায় কিংবা যারা ব্যাংকে কাজ করে, কিছু শিক্ষক-এরা সবাই ওই বস্তিরই বাসিন্দা। মুম্বাই এর মতো শহরেও এদের শতকরা ৫০-৭০ ভাগ লোক বস্তিতে থাকে। এরা যদি কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে মুম্বাই শহর তো অচল হয়ে যাবে। যারা বিভিন্ন রকম সেবা দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে তো আপনি একপাক্ষিক সম্পর্ক রাখলে হবে না। কারণ এই মানুষগুলোই শহরকে সচল রাখে।
সূত্র : http://www.filmfare.com/features/filmfares-exclusive-interview-with-the-industrys-iron-lady-shabana-azmi-14077-4.html; retrieved on 19.01.2017
http://www.khabar.com/magazine/features/an_interview_with_shabana_azmi; retrieved on 19.01.2017
শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
shafiqulislamru32@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন