হায়দার রিজভী
প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
'এখনকার নির্মাতাদের খালি মগজটা নাই'
হায়দার রিজভী

আগে থেকেই তার সঙ্গে কথা বলার সময় নির্ধারণ করা ছিলো। সন্ধ্যা ছয়টায় যখন হায়দার রিজভীর বাসায় পৌঁছাই, তখন তিনি মাগরিবের নামাজ পড়ছিলেন। বাসার তত্ত্বাবধায়ক আমাদের সেই ঘরেই নিয়ে যান। আমরা ঘরের এক পাশে থাকা সোফায় গিয়ে বসি। মেরুন রঙের টানা লম্বা সোফা; তার পাশেই একটা বইয়ের আলমারি রাখা। ঘরে ঢোকার দরজার ঠিক পাশেই একটা চেয়ারে বসে রিজভী নামাজ পড়ছিলেন। অল্প সময় পর নামাজ শেষ করে তিনি সরাসরি সোফায় এসে বসেন। কালো প্যান্ট চেক শার্ট পরা রিজভীর সঙ্গে সামান্য কুশল বিনিময় করেই কথা শুরু হয়। রিজভীর বাবা পাকিস্তান আমলের সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। ছেলেকে ইন্টারমেডিয়েট পাসের পর বিলেতে পাঠান ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে পড়তে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তা না করে, তিনি অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যান। পরে অভিনয়ের ওপর ডিপ্লোমা করে দেশে ফিরে আসেন রিজভী। তার ভাষায়, ‘তখন অভিনয় নিয়ে এতোই ঘোরের মধ্যে ছিলাম যে, কুয়াশার মধ্যে শেক্সপিয়রের সংলাপ বলতে বলতে লন্ডনের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কতো দিন যে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি!’
দেশে ফিরে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সেখানে প্রযোজনার পাশাপাশি অনেকগুলো টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেন। এছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম নাট্যদল ‘থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন রিজভী। চাকরি আর অভিনয় ভালোই চলছিলো। এরই ফাঁকে সুযোগ হয় বিদেশে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করার। উচ্চতর শিক্ষার জন্য পোল্যান্ড সরকারের বৃত্তি নিয়ে চলে যান সেখানে। পরিচালনার ওপর (১৯৭৬-৮০) চার বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করেন পোল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ন্যাশনাল ফিল্ম স্কুল ইন লড্জ’ বা ‘লড্জ ফিল্ম স্কুলে’। সেখানে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে Prussian Officer নামে গ্রাজুয়েট ফিল্ম নির্মাণ করেন। এরপর বিভিন্ন সময় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন স্টিফেন স্পিলবার্গ, রোমান পোলানস্কি, আন্দ্রে ভাইদা, লার্স ভন তিয়ার-এর মতো বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের সঙ্গে। পরে নিজে পোলিশ ভাষায় নির্মাণ করেন Nursery Rhymes নামে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। দীর্ঘদিন পোল্যান্ড থাকাকালীন রিজভী বেশকিছু টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করেন। বর্তমানে দেশে ফিরে শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও পড়ান। গত ১ মার্চ ২০১৭ গুণী এই নির্মাতা, চলচ্চিত্রশিক্ষকের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে কথা বলেছেন রাজীব আহসান ও জাবের হাসান। চলতি সংখ্যায় সেই আলোচনার প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, ক্রিয়েটিভ থিঙ্কিং-এর ক্ষেত্রে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা কতোটা ভূমিকা রাখে? বাংলাদেশে যেমন এই কিছুদিন হলো অ্যাকাডেমিকভাবে ফিল্ম পড়ানো শুরু হয়েছে; কিন্তু একসময় অনেকে বলতো ফিল্ম আসলে পড়ার জিনিস না; পড়ে কিছু হয় না! আবার দেখা যায়, ইউরোপের বড়ো বড়ো ফিল্ম স্কুল থেকে বড়ো বড়ো ফিল্মমেকাররা বের হয়েছে! তাহলে এর গুরুত্বটা মানে ...।
হায়দার রিজভী : অবভিয়াসলি; এতদিন মানে স্বাধীনতার পর থেকে যদি ধরি, তাহলে তুমি এখানে একজন পরিচালকও পাবে না-জহির রায়হান সাহেবকে ধরো, উনি তো স্বাধীনতার আগের। মনে করো জহির রায়হানকেই ধরলাম; শিক্ষিত মানুষ, এম এ পাস করেছেন, লেখক-বাসায় বড়ো ভাই লেখক ছিলেন। কিন্তু হাউ ক্যান দিস পারসন বিকাম অ্যা গ্রেট ডিরেক্টর? হি ক্যান নট বিকাম অ্যা গ্রেট ডিরেক্টর। আই ডোন্ট থিঙ্ক সো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কোন জায়গা থেকে আপনি এটা মনে করছেন?
রিজভী : একজন ফিল্মমেকারের দিক থেকে; তুমি আমাকে বলো, জহির রায়হান সাহেবের সিনেমা নিশ্চয় তোমরা দেখেছো? আমাকে তোমরা উনার ফিল্ম থেকে একটা দৃশ্য বলো, যেটাকে আমি অ্যানালাইসিস করতে পারি; বলো পারবো, ক্লাসরুমে?
ম্যাজিক লণ্ঠন : কেনো স্যার, স্টপ জেনোসাইড?
রিজভী : বলো, ওটা থেকে কোন সিনটা তুমি অ্যানালাইসিস করবে, বলো আমাকে? আমি জহির রায়হান সাহেবকে খুব সম্মান করি; ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয়ও ছিলো। কিন্তু আমি ওই সেন্স-এ বলছি না। জহির রায়হান সাহেব কে ছিলেন, সেটা বাদ দাও; তার কাজ? আমাকে তোমরা বলো স্টপ জেনোসাইড-এর এমন কোন দৃশ্যটা আছে, যেটা নিয়ে আমরা অ্যানালাইসিস করতে পারি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ওই সময়ে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য এই ফিল্মটা তো কাজ করেছে। এক দিক থেকে দেখলে অবশ্য এটা প্রোপাগান্ডা ফিল্ম।
রিজভী : দেখো, আই অ্যাম সরি ভাই। আই ডোন্ট বিলিভ, ইটস অ্যা প্রোপাগান্ডা ফিল্ম। লেনিন কী করলেন-তিনি বললেন, সিনেমা ইজ দ্য বিগেস্ট ফর্ম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। এজন্য উনি টাকা ঢাললেন, এটা করলেন, ওটা করলেন। সোসিও-রিয়ালিজম সময় থেকে দুই-একটা সিনেমা আসবে; যেমন : মাই ফার্স্ট টিচার, ক্রিংস অব লাইয়িং। কিন্তু প্রায় ৬০ বছরের ইতিহাসে এ ধরনের কয়টা সিনেমার নাম তুমি বলতে পারবে? সোসিও-রিয়ালিজম বাদ দিয়ে আমাদের গুরু তারকোভস্কি যখন শুরু করলেন, তখন থেকে শুরু করে হলিউডের পরিচালকরা ...। বার্গম্যান ওর সম্পর্কে কী বলেন জানো তো!
ম্যাজিক লণ্ঠন : ঠিক জানি না স্যার, বলেন একটু।
রিজভী : বার্গম্যান বলেন, তারকোভস্কি প্রোবাবলি ইজ দ্য ডিরেক্টর অব অল টাইম। আমার সাধারণ জ্ঞানে বার্গম্যানের ওপর পৃথিবীতে খুব কম পরিচালক আছে! আমাদের আরেক গুরু কুরোসাওয়াও ওর প্রশংসা করেছেন। এটাও ঠিক, একজন পরিচালক-বার্গম্যান নিজের ক্ষেত্রে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন-নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি ছাড়া ভালো সিনেমা করতে পারে না। বার্গম্যানের একটা গল্প তোমরা জানো কি না? একবার বার্গম্যানকে সুইডেনের ট্যাক্স অফিস বললো, আপনি একশো ১০ টাকা ট্যাক্স দেবেন। বার্গম্যান বললেন, আমি কামাই করছি একশো টাকা, আপনি আমার কাছে একশো ১০ টাকা চাচ্ছেন কীভাবে? ট্যাক্স অফিস বললো, আপনাকে একশো ১০ টাকা দিতেই হবে। বার্গম্যান আবারও একই কথা বললেন। ট্যাক্স অফিসও নাছোড়বান্দা। এই নিয়ে নানা কথাবার্তা। একপর্যায়ে বার্গম্যান রেগে জার্মানি চলে গেলেন। জার্মানি গিয়ে বার্গম্যান একটা সিনেমা করলেন; সেই সিনেমা দেখে মোটেও মনে হয় না এটা বার্গম্যানের! খুবই সাধারণ একটা সিনেমা। একদম সাধারণ, যেখানে সবকিছু ঠিকঠাক আছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, এটা কিন্তু আব্বাস কিয়ারোস্তামির ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। তিনি যখন ফ্রান্সে গিয়ে সিনেমা করলেন, সেখানে পারসিয়ান যে কালচার সেটা পাওয়া যায়নি। কিয়ারোস্তামি এ ধরনের সিনেমা নিয়ে নিজেই বলতেন-এ ধরনের সিনেমা করা মানে গাছ আছে কিন্তু শিকড় নেই।
রিজভী : কথা ওইটাই; তুমি-আমি যদি বাংলা ভাষায় সিনেমা না করি ...।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আপনার ব্যক্তিগত জীবনে আসি। আপনি তো পোলিশ ভাষায় সিনেমা, সিরিয়াল বানিয়েছেন?
রিজভী : আমি তোমাদেরকে আমার ডিপ্লোমা ফিল্ম প্রুসিয়ান অফিসার দেখাবো; ওখানে আমি জোর করে গ্রামের একটা শটের মধ্যে একজন নারীর গরু নিয়ে যাওয়া দেখিয়েছি। আমার দেশের কথা, মায়ের কথা আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি। জানো, শটটা শেষ হয়ে গিয়েছিলো, আমি দৌড়ে ওই নারীর কাছে গিয়ে তাকে আবার বাড়িতে ঢুকে গরুটা নিয়ে বের হতে অনুরোধ করি। ওখানে তো আমার দেশের কিছু পাওয়া যায় না, কী করবো বলো!
ম্যাজিক লণ্ঠন : যে কথাটা বলছিলাম স্যার, আপনি তো পৃথিবীর বড়ো ফিল্ম স্কুলগুলোর একটার ছাত্র ছিলেন; যেখান থেকে পৃথিবীর বড়ো বড়ো মাস্টার ফিল্মমেকাররা বের হয়েছে। আমাদের দেশে তো এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান ছিলো না। এটা না থাকার কারণেই কি বিশ্ব চলচ্চিত্রে আমাদের কোনো অবস্থান নাই? কিংবা এটা কি একটা কারণ হতে পারে?
রিজভী : আই অ্যাগ্রি ইট। শোনো, কতো খ্রিস্টাব্দ হবে ঠিক মনে নাই। আমি, কবির ভাই (নির্মাতা আলমগীর কবির)-আর্কাইভে তখন রউফ সাহেব বলে একজন কিউরেটর ছিলেন-তিনি একদিন আমাকে বললেন, কতো পড়াশোনা করে আসছেন, একদিন ক্লাস নেন। তখন আমি তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, জাকির হোসেন রাজু, মোরশেদুল ইসলাম এদের সঙ্গে ওখানে আলাপ করতাম। তিন মাসের একটা কোর্স করানো হতো।
তারেক মাসুদ মারা যাওয়ার তিন সপ্তাহ আগে হবে; ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বাসায় একটা দাওয়াতে সে (তারেক মাসুদ) আমাকে বলছে, ভাইয়া আপনার হয়তো মনে নাই, আমার আছে; সেসময় আপনি অনুপ্রাণিত করার মতো দুই-একটা কথা বলতেন। এখন যেমন তোমাদের বলছি।
মূল কথা হলো, ওই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আই ইউ বি বলো কোথাও ফিল্মের কোনো রাইট কারিকুলাম নাই। কোন ইউনিভার্সিটিতে ফাইন আর্টসের ইতিহাস পড়ানো হয়? পোলিশ ফিল্ম স্কুলে তিন দিন ধরে অ্যাডমিশন টেস্ট হলো। ফাইনাল বোর্ড বসেছে, সেখানে একজন বয়স্ক মহিলা প্রফেসর ছিলেন। তিনি হিস্ট্রি অব আর্টস পড়াতেন। পরীক্ষা সেপ্টেম্বরে হচ্ছিলো। উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা আপনি সামারে কী করলেন? আমি খুব গর্বের সঙ্গে বললাম, আমার ছোটো বোন ব্রাসেলসে থাকে, তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। প্রফেসর বললেন, ও আপনি ব্রাসেলসে ছিলেন, নিশ্চয় ওখানকার মিউজিয়ামে গিয়েছিলেন? আমার বাঙালি চাপা তো আছেই; বললাম জি।
উনি বললেন, ভেরি গুড। আচ্ছা, মিউজিয়ামে ঢোকার পর একটা বিরাট ক্যানভাস আছে, দেখেছেন? ওটা কার ছবি? আমার অবস্থাতো খারাপ, চাপা শেষ। আমি এটা-ওটা বলছি। উনি তখন সরাসরি বললেন, আপনি তাহলে সেখানে যাননি। তখন কী আর উপায়; আমি বললাম, জি ম্যাডাম স্বীকার করছি, যাইনি। কী করবো প্রায় ছয়-সাত জন নাম করা প্রফেসর বসে আছেন, তাদের সামনে আর কতোক্ষণ মিথ্যা কথা বলা যায়! ওই মহিলা পরে চার বছরের কোর্সের দুই বছর আমাদের হিস্ট্রি অব আর্টস পড়িয়েছেন। উনি করতেন কী একটা বাক্স নিয়ে আসতেন। ওর ভিতর বিখ্যাত সব ছবির ছোটো ছোটো কার্ড থাকতো। উনি একেকটা কার্ড বের করে জিজ্ঞাসা করতেন, বলো দেখি এটা কার ছবি?
শোনো, রুবেন্স বা ভ্যানগগের অনেক ছবি আছে, যেগুলো ওই মিনিয়েচার সাইজে ধরা সহজ নয়! এখন অবশ্য আমি ধরতে পারি। তার নানাধরনের ছবি দেখতে দেখতে ভ্যানগগের স্ট্রোকটা আমি ধরে ফেলেছি। তুমি আমাকে এখন এদের যেকোনো মিনিয়েচার ছবি দাও-সময় নেবো হয়তো-বলতে পারবো। এটাই হলো শিক্ষা।
দেখো, চারুকলার কাজ না দেখলে লাইট, কম্পোজিশন কী করে বুঝবা! আমি ক্লাসে তোমাদের একটা পেইন্টিং দেখিয়েছি না-সূর্যের আলো-আমাদের ভাষায় যেটা সোর্স লাইট। আমি এখনই এখানে র্যামব্রান্টের পোট্রেট বসাই; অন্যদিকে চালু করি গডফাদার-এর কালার, টেক্সার সব। ওই যে কোয়েন্টিন টারান্টিনো (আমেরিকান নির্মাতা, লেখক ও অভিনয়শিল্পী) বলে না, আমি সবকিছু চুরি করি। সবার কাছ থেকে আমি চুরি করি। (সামনে টেবিলে থাকা একটা কাগজ তুলে নিয়ে সেটা দেখে বলতে থাকেন) I steal from every movie ever made, Tarantino has been famously quoted as saying. The dance sequence in `Pulp Fiction' is lifted right out of Godard's `Bande a© Part'. উনি (কোয়েন্টিন টারান্টিনো) এতো বড়ো শিল্পী এটা বলতে পারেন। আমি হয়তো লজ্জায় বলতাম না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : গদারও কিন্তু একই ধরনের কথা বলেছিলো। তার কথাটা এ রকম-আমরা যেমন নানা জনের মন্তব্য কোট করি, তেমনই আমি সিনেমাতেও অনেকের অনেক ফুটেজ থেকে কোট করি।
রিজভী : আমি বলতে চাই, উনারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এটা দোষের কিছু না। কথা হচ্ছে, সিনেমা আমার ইতিহাস; বিশ্ব সিনেমা আমার কালচার। আমাকে যদি কোনো আমেরিকান, রাশিয়ান, ইউরোপিয়ান বলে যে, এটা তোমাদের কী করে হয়! আমি বলবো, নো; এই গ্রিফিথ থেকে শুরু করে আজকের টারান্টিনো সবাই আমার। এটাই সিনেমা। আমার অধিকার আছে ওদের দ্বারা প্রভাবিত, অনুপ্রাণিত হওয়ার। এরাও তাই করছে। টারান্টিনো জানেন যে, উনার সিনেমাগুলো সেই লেভেলের, যেখানে উনাকে কেউ বলতে পারবে না আপনি কপি করছেন। অনেক লেখক আছে না, যেমন আমাদের বাচ্চু ভাই মানে শামসুর রাহমান; উনার কাছ থেকে আমি শুনেছি; উনি বলতেন, অনেক সময় লিখতে গিয়ে রবী ঠাকুরের ওই কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমি লিখেছি। শব্দ ব্যবহার করেছি। তুমি পড়ো ওই কবিতাটা, ওখানে ওই শব্দটা আছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : অনুপ্রাণিত হওয়াটা আসলে দোষের কিছু না। তার মানে সারা পৃথিবী থেকে আমরা নিতে পারি। কিন্তু স্যার, আমাদের এখানে ফিল্মের ল্যাঙ্গুয়েজটা যে দাঁড়ায়নি; ল্যাঙ্গুয়েজটা যে রপ্ত হয়নি-এটার কারণটা কী একটু বলবেন? কিংবা ফিল্মে ল্যাঙ্গুয়েজটাইবা কী?
রিজভী : আমি যখন প্রত্যেকবার মাস্টার্সে ক্লাস নিই, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, আমাকে বলো দেখি সিনেমাটা কী? তুমি বিশ্বাস করো একজন হয়তো বলে-সিনেমা হলো চলমান চিত্রের মাধ্যমে গল্প বলা। চলমান চিত্র; তুমি আগামীকাল চলো এফ ডি সি’তে কোনো ডিরেক্টরকে এই কথাটা জিজ্ঞাসা করো, কেউ তোমাকে সাধারণ এই কথাটা বলতে পারবে না। এই সংজ্ঞাই যদি তারা না বলতে পারে, তাহলে তারা কী করে সিনেমার ভাষা বুঝবে? ইউ হ্যাভ টু লার্ন।
কালকেই কুব্রিক সম্পর্কে একটা ডকুমেন্টরি দেখছিলাম বাসায় বসে। যে কেউ ওর বাসায় আসলে কুব্রিক তাদেরকে বলতো, চা-কফি-হুইস্কি যা নিবা নাও; চলো এখন সবাই মিলে জন ফোর্ড-এর ওই সিনেমাটা দেখি। বাসায় ছোটো একটা প্রজেক্টর রুম ছিলো, সেখানে সিনেমা চলতো।
এই যে আরেক ভদ্রলোক টারান্টিনো, আমার সাধারণ জ্ঞানে বলে উনি এখন বিশ্বের গ্রেটেস্ট ফিল্ম ডিরেক্টর। উনি ফিল্মের একটা নতুন ভাষার চেষ্টা করছেন। কিলবিল মনে আছে তোমাদের। তুমি যদি ফিল্মমেকার হতে চাও; তবে অবশ্যই তোমাকে কিলবিল দেখতে হবে। আর যদি না হতে চাও-খালি পয়সা কামাবা-তাহলে কোনো কথা নেই। কিলবিল-এ কয়টা মিডিয়াম উনি ব্যবহার করেছেন-কমিক্স মানে জাপানিজ অ্যানিম, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট, কালার আর নাটক। তোমরা কি সার্জে লিওনি’র (sergio leone) সিনেমাগুলো দেখেছো-ফেইসফুল অব ডলার। সেখানে যে ধরনের ক্লোজআপ দেখানো হয় (অভিনয় করে দেখান) আর মিউজিক-ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ। দূরে লঙ শটে একটা ঘোড়া দৌড়ে আসছে সবকিছুর মধ্যে একটা নাটকীয়তা। নাটকীয়তা মানে অপেরা। অপেরাটা কী, আমাদের দেশের যাত্রা। যাত্রা ইজ অপেরা, তাই না? গেয়ে, নেচে, হেসে কোনো কিছু উপস্থাপন করা।
তাই কোনো নির্মাতা সিনেমা বানালে, সিনেমার শিক্ষার্থী হিসেবে আমার একশো বার অধিকার আছে তোমার দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার। আমি চুরি করবো, তোমার কাছে শিখবো। আমাদের নির্মাতাদের প্রতিভা আছে-প্রতিভা তো এমন একটা জিনিস, যার মাপকাঠি নেই-কিন্তু এদের কেউ হোমওয়ার্ক করে না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, হোমওয়ার্ক তো অত্যন্ত জরুরি। আপনি তো ইউরোপের অনেক প্রোডাকশনের সঙ্গে কাজ করেছেন, সেখানকার হোমওয়ার্কটা ঠিক কী ধরনের হয়?
রিজভী : রোমান পোলানস্কি’র ট্যাস বলে একটা সিনেমা ছিলো অনেক আগের। আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। ফ্রান্সে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিলো। প্রথম দেখায় আমি তার সঙ্গে ভাঙা ভাঙা পোলিশে কথা বলছিলাম। তিনি খুব অবাক হয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি পোলিশ কোথা থেকে শিখেছো? আমি বললাম, স্যার, আপনি যে স্কুল থেকে পাশ করেছেন, আমি সেখানকার ছাত্র। তখন তিনি তার বন্ধুবান্ধবদের কথা জিজ্ঞাসা করলেন-কে কোথায় আছে? তাদের খোঁজখবর নিলেন। তখনো তো পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসন চলছে, সেখানে তার যাওয়া-আসা বন্ধ ছিলো। যাক, পোলানস্কি বললেন, তোমার নাম বলছো হায়দার, তার মানে তুমি মুসলমান? আমি বললাম, হ্যাঁ স্যার। তারপর বললেন, তোমাকে দিনে কয়বার নামাজ পড়তে হয়? আমি বললাম, পাঁচবার। উনি বললেন, গুড। তাহলে তুমি কী হতে চাও? আমি বললাম, স্যার আমি চলচ্চিত্রকার হতে চাই। তারপর পোলানস্কি বললেন, যেহেতু তুমি তোমার ধর্ম ঠিক মতো পালন করছো না, তাহলে সিনেমা ধর্ম পালন করো। আমি বললাম, সেই ধর্ম কী করে পালন করবো স্যার? তিনি বললেন, রোজ একটা করে সিনেমা দেখবে। তোমার এখন থেকে পাঁচ ওয়াক্ত পালনের দরকার নেই, এক ওয়াক্ত পালন করো।
তার মানে তুমি যদি ফিল্মমেকার হতে চাও, তাহলে প্রত্যেক দিন একটা করে সিনেমা দেখো। পোলানস্কি বললেন যে, খালি সিনেমা দেখলে হবে না, দেখার পর সেটা কেনো ভালো লাগলো, কী কারণে-গল্প, সিনেমাটোগ্রাফি, অভিনয়, কস্টিউম, সাউন্ড ডিজাইন ভালো বা খারাপ সেটা একটা কাগজে লিখবা; তারপর ভুলে যাবা।
আসলে এইসব লোকের কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। পোলানস্কি বলেন, সিটিজেন কেইন ও এইট অ্যান্ড হাফ-এর পর সিনেমা বানানো ধৃষ্টতা! আমি তখন তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তাহলে আপনি সিনেমা বানান কেনো? পোলানস্কি বলেছিলেন, তাই বলে ধৃষ্টতা দেখাবো না! পোলানস্কির ট্যালেন্ট দেখেছো? ওই সিনেমায় একটা চরিত্র আছে ঠিক বোঝা যায় না, মহিলা না পুরুষ! ওখানে একটা দৃশ্য আছে এ রকম যে, উনি আলমারি থেকে জিনিস, কাপড় বের করে সেটা খালি করছেন। সিটিজেন কেইন-এ ঠিক ওই রকমের একটা দৃশ্য আছে। পোলানস্কি বলেন, আমি চুরি করছি, ওই যে দেখো, ওখান থেকে নিয়ে করেছি। তাই বলে তো তিনি হুবহু তা করেননি।
ধরো একটা গল্প; এখানে আমরা ছয় জন আছি; যদি আমরা স্ক্রিপ্ট করে সিনেমা করি; তাহলে কয়টা সিনেমা হবে-ছয়টা। নিঃসন্দেহে ছয়টা ডিফারেন্ট সিনেমা হবে। নিউ ওয়েভের আঁদ্রে বাঁযা এইটা প্রমাণ করে দেখালেন।
আমার বাবা সরকারি কর্মচারী ছিলেন; আমি তার ঘরে জন্মোছি। উনি খুব নামাজ-রোজা করতেন, সৎ লোক ছিলেন; সেটা আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। প্রত্যেকের বাবা-মা তাদের সন্তানদের অনন্য শিক্ষা দেন, যেটা অন্যদের মধ্যে থাকে না। তুমি জন্মে প্রাচুর্য দেখেছো, আমি দেখিনি। তুমি কোনো দিন বাপ-মায়ের কাছে মার খাওনি, আমি খেয়েছি। তোমার লাল রঙ ভালো, কিন্তু আমার নীল। যেমনটা বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ আর সত্যজিতের পথের পাঁচালী; তোমার কাছে কী মনে হয় না সত্যজিৎ একটা নতুন গল্প লিখেছেন।
সহকারী হিসেবে আমি বেশ কয়েকজন নামকরা পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি এবং তাদের ডিসিপ্লিন দেখেছি। ডিসিপ্লিনের প্রয়োজন আছে, এটা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। তোমার যদি ডিসিপ্লিন থাকে, তুমি অসৎ হতে পারবে না। যারা অনেক ডিসিপ্লিন, তারা জানে তাদের শেষটা কোথায়। ব্যালে থিয়েটারের মানুষদের গল্প শুনে বিশ্বাস হয় না, এরা মানুষ। আমি ওদের একজনের সঙ্গে তার শৈশব নিয়ে কথা বলেছিলাম। তিনি বললেন, আমার যখন ছয় বছর বয়স, তখন আমার বাবা আমাকে ব্যালে স্কুলে ভর্তি করে দেন। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা যাই হোক না কেনো, আমাকে সকাল আটটায় স্কুলে পৌঁছাতে হতো। কাপড় চেঞ্জ করে ব্যান্ডেজ করে দিতো বুড়ো আঙুলটা। এরপর আমাকে বলা হতো, কাঠের তৈরি মেঝেতে সেই পা দিয়ে আঘাত করার জন্য। এতে রক্ত বের হওয়ার উপক্রম হতো, নখ ফেটে যেতো। পরের দিন এসে শিক্ষককে সে কথা বললে, তিনি বলতেন, এই যে এখন বের হয়ে যাবা আর ফিরবা না স্কুলে। আমরা কাঁদতাম তাতে কাজ হতো না। শিক্ষক বলতেন, আধা ঘণ্টার জায়গায় কমপক্ষে ১০ মিনিট করো; কিন্তু বন্ধ রাখা যাবে না-দিস ইজ ডিসিপ্লিন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, অনেক সময় দেখা গেছে, কোনো কোনো নির্মাতা ব্যক্তিগত জীবনে অগোছালো; কিন্তু তাদের কাজে ডিসিপ্লিন ছিলো।
রিজভী : লার্স ভন তিয়ার-এর নাম শুনেছো নিশ্চয়?
ম্যাজিক লণ্ঠন : উনার সঙ্গে তো আপনি মনে হয় কাজ করেছিলেন?
রিজভী : সে এক অদ্ভুত পাগল! ইয়া বড়ো বড়ো নখ। উনি প্লেনে, লিফটে উঠতেন না ভয়ে; ফোবিয়া ছিলো-পড়ে মারা যাওয়ার। গাড়ি করে উনি কোপেনহেগেন থেকে আসলেন ইউরোপা বলে একটা সিনেমা করতে। আমরা ২৯ রাত শুধু রাতের দৃশ্যগুলো ধারণ করেছি। ওগুলো ছিলো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট আর ট্রেনের মধ্যে যে যাত্রীরা ছিলো, তারা কেবল কালার। আমার মনে হতো ওই ভদ্রলোক-আমি অবশ্য কনফার্ম না-খুব বেশি মাত্রায় ড্রাগস নেন। কিন্তু এ লোকের ডিসিপ্লিন অন্য রকমের। উনি হোটেলে এক তলার উপরে থাকবেন না। হোটেল থেকে আমাদের শুটিং স্পট ছিলো ৬০ কিলোমিটার দূরে। ইউনিটের সব লোকজন সেখানে থাকে, কিন্তু তিনি ওখানে থাকবেন না। শুটিং শুরু হতো আটটায়; উনি ঠিক সাড়ে সাতটায় হোটেলের সামনে গাড়িতে এসে বসতেন এবং ঠিক সময় শুটিংয়ে হাজির হতেন।
ওই সিনেমার বিশাল এক স্টোরি বোর্ড ছিলো। আমাদের সঙ্গে একজন পোলিশ নারী প্রোডাকশন ম্যানেজার ছিলেন। উনি রাতে আমাকে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করছেন, আচ্ছা কালকে যে আমরা শুট করবো সেখানে কি রেলের ইঞ্জিনটা লাগবে? কারণ ফ্রেমে তো খালি লোকজন দেখছি। আসলে আমিও গাধা, বললাম, চলো যাই উনাকে (নির্মাতা) জিজ্ঞাসা করি। প্রধান সহকারী হিসেবে আমি একমাত্র লার্স ভন তিয়ার’কে এটা জিজ্ঞাসা করতে পারতাম। অন্যরা জিজ্ঞাসা করলে তিনি গালাগালি করতেন।
যাক, রাতে হোটেলে পৌঁছে আমি লার্স ভন তিয়ার’কে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রোডাকশন আমাকে বলছে কালকে যে দৃশ্যটা করা হবে, সেখানে রেলের ইঞ্জিনটা লাগবে না কি? আসলে কী আর বলবো, এসব লোকের স্মরণ শক্তি এতো ভালো, মানে পুরো সিনেমাটা তো উনার মাথার ভিতরে আছে! আমাকে বললো, হায়দার, তুমিও দেখি অলস মানুষ! আমি বললাম, কেনো, কী হলো? উনি তখন বললেন, লুক অ্যাট দ্য ড্রইং এগেইন। তারপর আমি দেখলাম, পুরনো স্টিম ইঞ্জিনের মুখে গোলের মতো একটা থাকে না, সেটা ড্রইংয়ের মধ্যে আছে! আমি তো লজ্জায়! তারপর প্রোডাকশনের ওই মেয়েকে আমি বেশ বকাঝকা করলাম।
লার্স ভন তিয়ারও নিজে ক্যামেরা অপারেট করেন; এটা অবশ্য স্পিলবার্গও করেন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আচ্ছা, আপনি স্পিলবার্গের সঙ্গে না কোন সিনেমাটা করেছিলেন?
রিজভী : সিন্ডলার্স লিস্ট। যাইহোক এটা বলার উদ্দেশ্য হলো, একটা দৃশ্যে লার্স ভন তিয়ার ভাঙা চার্চের ছাদে উঠে শুট করবেন। সেখান থেকে তিনি একটা বিয়ের দৃশ্য দেখাবেন। শট্ নেওয়ার জন্য তিনি সেই চার্চের ছাদে উঠেছেন, সেখান থেকে ওয়াকিটকিতে আমাকে বলছেন, হায়দার, থার্ড রো-তে যে বৃদ্ধ নারী আছে, ওকে তুমি পাঁচ সেন্টিমিটার বাম দিকে সরিয়ে দাও। আমি সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দিলাম।
তারপর তিনি আবার বলেন, ওই যে পঞ্চম রো-তে শার্ট পরা যে লোকটা আছে, ওকে পাঁচ সেন্টিমিটার সরিয়ে দাও। আমি হেঁটে পঞ্চম রো-এর ওই লোকের কাছে গিয়ে এমনি এমনি কথা বললাম, কিন্তু সরতে বলিনি। কারণ আমি ভাবছিলাম, ওই ব্যাটা আমারে হাইকোর্ট দেখাচ্ছে, দেখি আমি করবো না। আচ্ছা বলো তো, পাঁচ সেন্টিমিটার মানে আর কতো, সামান্য। তাই আমি ভাবলাম, দেখি কিছু করবো না, ও বুঝতে পারে কি না। ও অবশ্য ওখান থেকে দেখছে, আমি গেছি, কথা বলছি। তোমরা বিশ্বাস করবা না(!), তারপর আমি ওখান থেকে পাঁচ কদম গেছি; আবার ওয়াকিটকিতে ফোন, হায়দার, আই রিকোয়েস্টেড ইউ টু মুভ দিস পারসন ফাইভ সেন্টিমিটার। হোয়াই ডোন্ট ইউ ডু ইট? ইউ কান্ট ডু ইট। তারপর তিনি বললেন, তোমার শরীরটা বোধহয় ভালো না, তাহলে আমি নিচে নেমে এসে এটা করি। আমি আর কী করবো, লজ্জায় পড়ে গিয়ে আবার ঠিক করলাম।
এটা হলো কী, যেকোনো ফ্রেমে; উপর থেকে দেখা ফ্রেম তো, অনেকটা দাবা খেলার মতো; যতো উপর থেকেই তুমি দেখবে, বুঝতে পারবে সেখান থেকে একটা সোলজার সরালেও। ও তো ওখান থেকে অন্য কিছু দেখছে না, ও দেখছে কম্পোজিশনটা। এজন্যই আমি তোমাদের বার বার বলছি, প্লিজ পেইন্টিং দেখো, পেইন্টিং দেখো, পেইন্টিং দেখো। কারণ কম্পোজিশনটা বুঝতে হলে পেইন্টিংয়ের বিকল্প নেই। কম্পোজিশন করা হয় নান্দনিকতার জন্য, আর তো কিছুই না। তোমাদের ফরাসি এডগার ডেগাস (Edgar Degas) মনে আছে? ওই যে নাচছে? এর অর্ধেক কাটা।
ম্যাজিক লণ্ঠন : Dancers in blue.
রিজভী : হ্যাঁ; আছে না কাটা কাটা। ওই ব্যাটা পেইন্টিং করতে গিয়ে অর্ধেক কাটলো কেমনে! কিন্তু ওই যে কাটছে, ওর মধ্যে একটা ডায়নামিজম আছে না, নাচের একটা ... আছে না? এই হলো শিল্পী। আমি তো বলি, এরা জিনিয়াস না, পরিশ্রমী। আমি বার বার বলেছি, পরিশ্রমের বিকল্প নাই। ফাঁকি দিয়ে অনেক টাকা হবে, নাম হবে, গাড়ি-বাড়ি সব হবে; কিন্তু আমার কাছে সম্মানটা পাবে না! এটা আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে আমার গুরুজনরা, শিক্ষকরা-ব্যাড ওয়ার্ক ইজ ব্যাড ওয়ার্ক। এখনো আমাদের দেশের পরিচালকরা ব্যবহার করে আন্ডারগ্রাউন্ড ফিল্ম, ওভারগ্রাউন্ড ফিল্ম, মেইনস্ট্রিম ফিল্ম, ডাউনস্ট্রিম ফিল্ম কী কী সব! তুমি আমাকে একটা কথা বলো-ইজ সিনেমা আর্ট?
ম্যাজিক লণ্ঠন : অবশ্য আর্ট, তবে বিজনেসও স্যার।
রিজভী : বিজনেস নিয়ে পরে আসছি। তবে আর্ট নিয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই? আর্ট কলেজে যারা ছবি আঁকে, সবাই তো ভালো আঁকে না; খারাপ শিল্পীও আছে। তাহলে তাদের কাজকে কী বলবে তুমি-ননআর্ট বলবে?
ম্যাজিক লণ্ঠন : না, সেগুলোও অবশ্যই আর্ট।
রিজভী : তাহলে আর্ট ফিল্ম হলো কী করে! আমার কথা হচ্ছে, আমি যদি স্বীকার করে নিই, সিনেমা ইজ অ্যান আর্ট ফর্ম, তাহলে দুটো জিনিস থাকে-একটা গুড ফিল্ম, অন্যটা ব্যাড ফিল্ম; ব্যাড আর্ট, গুড আর্ট। বাংলাদেশের পরিচালকদের কাছে ইদানীং শুনছি, তারা আর্ট ফিল্ম, প্যারালাল ফিল্ম, আন্ডারগ্রাউন্ড ফিল্ম, মেইনস্ট্রিম ফিল্ম-কতো কী বানাচ্ছে। টাইটেল দিতে গেলে তো অনেক কিছুরই টাইটেল দেওয়া যায়। কিন্তু আমার কথা হলো ...।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আর একটা কথা যদি আপনি বলতেন, সেটা হলো ইমেজের গুরুত্বটা মানে আমাদের এখানে এই যে, কথা বেশি হয়।
রিজভী : উহ্, আমাদের দেশে একটা অদ্ভুত প্রবণতা আছে, আই অ্যাম সিওর, তুমি এই ধরনের নাটক কিংবা সিনেমা দেখেছো, যেখানে একজন ভদ্রলোক চা খাচ্ছেন, আরেক চরিত্র ঢুকে বলছে, আরে রহিম ভাই চা খাচ্ছেন? (সবার হাসি) এই দৃশ্য দেখার পর আমার ইচ্ছে হয়, পরিচালককে একটা চটকানা দিই। আরে গাধা, আমি কি অন্ধ? অন্ধ হলে তো আমি দেখতামই না! আবার কখনো সংলাপে বলে, আপনাকে না লাল রঙের শাড়িতে কী মানিয়েছে! আরে গাধা, দর্শক অন্ধ না, তাকে এসব বলার দরকার নেই। আর যদি বলতেই হয়, তাহলে অন্যভাবে বলো। সেসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, খালি বকোর বকোর বকোর-সবকিছু বলে দেওয়া।
ওর (রাজীব আহসানকে দেখিয়ে) মাস্টার্স ফিল্ম পাপেট-এ, ওরা নৌকার উপরে বসে আলাপ করছে এবং ফোনের জন্য অপেক্ষা করছে। এখন সেখানে যদি এমন ফালতু সংলাপ থাকতো-আচ্ছা ভাইয়া, কেমন লাগছে, চা খাবেন-তাহলে আমি রাজীবকে বলতাম বাতিল। কিন্তু ওখানে মাত্র দুই-একটি কথার মাধ্যমে ওদের মধ্যে টেনশনটা বাড়ানো হয়েছে-দিস ইজ সিনেমা। সিনেমা কী? সিনেমা আমাদের দেখায় কী করে ছবি বা ইমেজ কথা বলে। নৌকার ওই দৃশ্যটা দেখে দর্শকের কিছুটা অস্বস্তি হবে-দিস ইজ অ্যা সিনেমা। তোমরা তারকোভস্কির মিরর দেখেছো? সেখানে একটা ভেজা পায়ের দৃশ্য আছে, সেটা আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মাজিদ মাজিদি’র বারান-এ এই ধরনের একটা দৃশ্য আছে। তাহলে উনিও তারকোভস্কির কাছ থেকে ধার করেছেন।
রিজভী : টালিগঞ্জের আসা যাওয়ার মাঝেতেও এই ধরনের একটা দৃশ্য আছে। আমাদের স্মৃতি, মানে ধরো, তুমি ক্লাস নাইনে পড়ার সময় যে মেয়েটাকে পছন্দ করতে, তার চেহারা কি এখনো তোমার মনে আছে? তোমাকে কাগজ-কলম দিলে তুমি তার চুল, হাত, নাক, মুখের বর্ণনা সেই সময়ের মতো দিতে পারবে? না। কারণ আস্তে আস্তে সব মুছে যায়, হারিয়ে যায়, ঝাপসা হয়ে আসে। আমি তারকোভস্কি কিংবা কুরোসাওয়াকে জিনিয়াস বলবো না কেনো-এরা বলছে না, আমাকে দেখাচ্ছে অনেক কিছু। আসা যাওয়ার মাঝেতে কেবল পায়ের ছাপ কেনো, শেষে মেয়েটা কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেলো। দৃশ্যত ওরা স্বামী-স্ত্রী; কিন্তু ওরা কি আসলেই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আছে, না সব স্মৃতি হয়ে আছে এখন। টালিগঞ্জে ঋতুপর্ণ ঘোষের পর আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত বলে ওই একটা ছেলের কাজ আমার ভালো লেগেছে। ইটস অ্যা ব্রিলিয়ান্ট ফিল্ম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, কিম কি দুক নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
রিজভী : ওহ, হি ইজ ওয়ান অব দ্য জিনিয়াস। আমার কথা হচ্ছে ভাই, আমাদের দেশে কী নেই! এই সুজলা-সুফলা দেশ! আমার দেশে দৃশ্য, ইমেজ নেই? আমি আর একটা জিনিস বলবোজ্জযদিও গ্রামে আমি খুব কম থেকেছিজ্জগ্রামের চাষির বাড়িতে যে সিদ্ধ চাল আছে তার একটা গন্ধ থাকে না? আমাকে তোমরা বলো, সত্যজিৎ রায় অশনি সংকেত-এ ১৯৭৩-এ যে বাংলার মুখ আমাকে দেখিয়েছেন, আর কোনো পরিচালক আমাকে সেই বাংলা দেখাতে পেরেছে? এক জীবনানন্দ দাশ লিখে গেছেন, আর সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন আমাদের বাংলার মুখ। ক্যান ইউ ইমাজিন? ইউ আর অ্যা বাঙালি; তুমি এই দেশে জন্ম নিয়েছো, এখানেই বড়ো হয়েছো, তাহলে তুমি কেনো পারবে না ওর চেয়ে সুন্দর করে আমার দেশকে, মাটিকে দেখাতে!
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আপনি তো অনেক দিন ধরে পড়াচ্ছেন, আপনার ছাত্রের সংখ্যা এখন কম না। আপনার পর্যবেক্ষণ থেকে বলুন, চলচ্চিত্রের এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঠিক কোন জায়গাটার অভাব আছে বলে মনে হয়? কিংবা যে কারণে তারা ভালো কোনো কাজ দেখাতে পারছে না।
রিজভী : এক কথায় পরিশ্রম; ওরা পরিশ্রম করতে চায় না। আর একটা বিষয় হলো, ল্যাক অব ডিসিপ্লিন। যার সঙ্গে কথা হয় সেই বলে-এটা এই কারণে পারলাম না, ওটা ওই কারণে পারলাম না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার আমরা তো অনেক সময় সিনেমা দেখি Judgemental মন নিয়ে।
রিভজী : দেখো, একটা কথা আমি সবসময় বলি, কথাটা অবশ্য নিউওয়েভের গুরু আঁদ্রে বাঁযা’র। তিনি বলতেন, যখন কোনো সিনেমা দেখবে, শিশু মন নিয়ে দেখবে। এর কিন্তু খুব সুন্দর কারণ আছে। ধরো, তোমার হয়তো মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, জাহিদুর রহিম অঞ্জনের সঙ্গে খুব খাতির আবার রাজীবকেও তুমি খুব ভালো করে চেনো-তার একটা সিনেমা দেখতে গেছো, এখন তুমি ভাবছো, রাজীব তো একটা পাড় মাতাল, এই চিন্তা নিয়ে তুমি যদি ওর সিনেমা দেখো, তাহলে কী হবে?
আমাদের দেশে অনেক দিন আগে-তখন খান আতা বেঁচে ছিলেন-রবার্ট ওয়াইজ একবার এসেছিলেন। বিখ্যাত চলচ্চিত্র সাউন্ড অব মিউজিক-এর পরিচালক রবার্ট ওয়াইজ-উনার সবচেয়ে বড়ো পরিচয়, উনি সিটিজেন কেইন-এর এডিটর-তার কথাটা তুললাম কারণ আছে। ত্রুফো তার ‘অন ত্রুফো আদার’ বইতে এক জায়গায় লিখছেন, রবার্ট ওয়াইজ অলসো ইজ অ্যান অতর (Auteur)।
আমার ঠিক মনে আছে, ২৭ নম্বর রোডে ফিল্ম আর্কাইভে রবার্ট ওয়াইজ তার স্ত্রীসহ বসা, তার পাশে বসে আছেন আতা ভাই। ত্রুফোর বইয়ের ওই কথা আমি রবার্ট ওয়াইজকে বললাম। উনি আশ্চর্য হলেন, বিষয়টা জানতেন না তিনি। আমি তাকে বললাম, ইয়েস স্যার, আপনি চাইলে আপনাকে আমি সেটা দেখাতে পারি। ওয়াইজ তখন তার বউকে বলছেন, ডিড ইউ হেয়ার, হোয়াট হি ছে? ত্রুফো তার সেই লেখায় বলছেন, আমি রবার্ট ওয়াইজের একটা সিনেমা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে-গল্পটা একটা সাবমেরিনের মধ্যে। সিনেমাটা দেখে বেরিয়ে এসে বললাম, বাহ্ কী সুন্দর সিনেমা! কিন্তু হঠাৎই আমার মনে হলো, আরে পুরো সিনেমাতে তো একজন নারীও নেই! অথচ এটা আমার মনে হলো, সিনেমা দেখে বের হওয়ার পর! (সবাই হাসি) সো হি ইজ অ্যা গুড ডিরেক্টর। কারণ ত্রুফো ওই সিনেমা দেখার সময় এমনই ঘোরের মধ্যে ছিলেন যে, তখন তার মনেই হয়নি এই সিনেমার মধ্যে কোনো নারীচরিত্র নেই। সিনেমায় কোনো নারীচরিত্র থাকবে না, এটা তো ফরাসিরা ভাবতেই পারে না।
এই গল্পটা বলার কারণ হলো, ত্রুফো কিন্তু জানেন না, চেনেন না রবার্ট ওয়াইজ কে? কোথাকার কোন আমেরিকান ডিরেক্টর রবার্ট ওয়াইজ! কিন্তু ত্রুফো দেখেছে রবার্ট ওয়াইজের সিনেমাটা। আমরা আনফরচুনেটলি বেশিরভাগ সময় ব্যক্তি পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : অনেক সময় হয়, যেমন ধরেন, আমরা সত্যজিৎ রায়ের কোনো সিনেমা দেখছি; এক্ষেত্রে আগে থেকেই একটা ধারণা থাকে সিনেমাটা ভালো হবে, কারণ উনি অনেক বড়ো নির্মাতা। তার মানে শিশু মন নিয়ে দেখা অনেক সময় মুশকিল হয়ে যায়।
রিজভী : আই অ্যাগ্রি উইথ ইউ। আমি নিজেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা পারি না। ২০০০-এ জীবনে প্রথমবারের মতো সুযোগ হলো আন্দ্রে ভাইদার প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করার। সিনেমার নাম ঞযব The Condemnation of franciszek klos। উনার তখন বেশ বয়স। সেটে এসে বসলেন-সামনে মনিটর; আমি উনার ডান দিকের একটা চেয়ারে বসে আছি। উনি মনিটর দেখে, সেখানে আঙুল দিয়ে বাড়ি দিচ্ছেন। আমি বিষয়টা খেয়াল করলাম, একজন অ্যাক্টর ফ্রেমের বাইরে চলে গেছে; আমি তাকে বললাম, স্যার, আমি কি গিয়ে ওকে ফ্রেমে ইন করতে বলবো? তখন উনি বললেন, তুমি করবে, ঠিক আছে যাও। আমি বুঝলাম বয়স হয়ে গেছে তো!
এল আকৃতির একটা সেট সাজানো হয়েছে। সেই সেটের মধ্যে একটা বার, সেখানে নয় জন অভিনেতা। সেটের দুই দিক খোলা। আমি এখন এই সেট দেখে ভাবছি, এই লোকটা কীভাবে এটা সাজাবে! পরে দেখলাম সব ঠিকঠাক মতোই উনি সাজালেন। এই গল্পটা বললাম এ কারণে যে, দুপুর একটা বাজলেই তিনি শুটিং বন্ধ করে দিতেন। আমি ভাইদাকে স্মরণ করিয়ে দিতাম, স্যার একটা বাজে। উনি বললেন, ওহ, তাহলে শুটিং বন্ধ করো আর আমাকে দেড়টার দিকে খাবার দিতে বলো। এটা বলে তিনি চলে গেলেন, ফিরলেন সোয়া দুইটার দিকে।
মজার ব্যাপার হলো, ফিরে এসে ওই ভদ্রলোক একবারও বলতেন না, তোমরা খেয়েছো, কি খাওনি? একমাস উনার সঙ্গে কাজ করলাম, কিন্তু মনে হলো ধন্যবাদ বলে কোনো শব্দ আন্দ্রে ভাইদার জানা নেই! একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, উই আর অ্যা টিম অ্যান্ড হি ইজ আওয়ার লিডার। তাই তার এই বিষয়টা আমার ভালো লাগেনি। কাজের সময় ভাইদা কখনো ধন্যবাদ বলে কোনো শব্দ ব্যবহার করতেন না। তবে গল্পের সময় ক্যামেরাম্যান ও অন্যান্যদের প্রশংসা করতেন। ওই সিনেমায় ক্যামেরাম্যান ছিলেন পিয়ানিস্ট-এর সেই ক্যামেরাম্যান। উনার নাম Pawel Edelman ।
কিন্তু স্পিলবার্গ কাজ শেষে ওয়াকিটকিতে জোর করে বলতেন, থ্যাঙ্ক ইউ। আমরাও তখন জোর দিয়ে বলতাম, থ্যাঙ্ক ইউ। আসলে সবার একটা নিজস্বতা আছে। সিনেমা দেখার ক্ষেত্রেও সবাই আলাদাভাবে দেখে। আমরা আমাদের শিক্ষাদীক্ষার বাইরে গিয়ে কোনো সিনেমা দেখতে পারি না, সেটা সম্ভবও না।
এই যে কিছু দিন আগে শামীম আখতারের সিনেমা রিনা ব্রাউন দেখলাম; ওইখানে একটা চরিত্রে আমি অভিনয়ও করেছি। আমাকে শামীম দেখার জন্য ডাকলো, আমি গেলাম। সিনেমা দেখার কিছুক্ষণ পর আমি ভুলে গেলাম যে, এই সিনেমায় আমি অভিনয় করেছি। শামীম আবার বন্ধু মানুষ, আমাকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। আই অ্যাম নট অবজেক্টিভ অ্যাবাউট ফিল্ম। তোমরা হয়তো পারো; কিন্তু আমি পারিনি। এই অবজেক্টিভ থাকাটা সত্যি বড়ো কঠিন কাজ। এটা মুখে বলা যায়, কিন্তু করাটা কতোদূর সম্ভব। এই যে আমাদের অঞ্জনের সিনেমা মেঘমল্লার ...।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এই ধরনের সিনেমাগুলো নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। মানে, যে সিনেমাগুলো নিয়ে অনেক বেশি জেনেছি; যেমন : তারেকের মাটির ময়না, অঞ্জনের মেঘমল্লার; এই ধরনের হয়তো আরো কিছু সিনেমার নাম বলা যাবে। এই সিনেমাগুলো দেখে শেষ পর্যন্ত আসলে আপনার এক্সপেরিয়েন্স কী? মানে একদম সিনেমার জায়গা থেকে-সেটা বাংলাদেশি কি ফ্রেন্স-বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়।
রিজভী : তুমি যদি তারেক মাসুদের কথা ধরো; ওর একটা খুব সুন্দর জিনিস ছিলো-যে জিনিসটা ওকে দ্বন্দ্বে ফেলতো, কষ্ট দিতো, সেটা নিয়ে ও কাজ করতে চাইতো। আর্কাইভে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের দিকে তারেকের সঙ্গে আমার দেখা হতো; তখন ও আমাকে বলতো, ভাইয়া, বাবা আমাকে জোর করে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দিতো; না গেলে মারধর করতো। ওর মধ্যে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সেই অভিজ্ঞতাটা ছিলো। তারেকের কাজগুলো খেয়াল করে দেখো, সব জায়গায় ও আস্তে আস্তে ঢুকে যায়। এটা অত্যন্ত ভালো গুণ, ভালো দিক। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মত হলো, ক্যাথরিনের জন্য তারেক অনেক জায়গায় মার খেয়েছে-আই থিঙ্ক সি ওয়াজ নট অ্যা গুড ইনফ্লুয়েন্স অন হিম। এ নিয়ে অবশ্য আমি ক্যাথরিনের সঙ্গেও তর্ক করতে পারি। সোজা বাংলায় বললে, ক্যাথরিন জানতো কোন জিনিস ইউরোপিয়ানরা খাবে, তখন সিনেমার মধ্যে ওইটা ঢুকাতো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, ক্যাথরিন এটা সচেতনভাবে করতো?
রিজভী : তারেকের প্রতিভাকে ক্যাথরিন ঠিক এইভাবে বিক্রি করতো। ধর্ম, আমাদের রঙ-মনে আছে মাটির ময়নার ওই কাপড় ঝোলার কথা-আমাকে বলতো ওই রকম কাপড় কোন মাদ্রাসায় ঝোলে! মৌলবি সাহেব নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ বলে, নাজায়েজ সব কাপড় সরিয়ে দিলো। যেহেতু ক্যাথরিন এডিটর ও প্রোডিউসার; সি হ্যাড রাইট টু ডু ইট। বাট আই টোল্ড, দিস ইজ দ্য মোস্ট সিরিয়াস প্রবলেম ...। আমি বাংলাদেশের সিনেমাগুলোতে দেখি, দর্শক টানার জন্য আমরা খুব সহজে কম্প্রোমাইজ করি।
আয়নাবাজি দেখার সময় আমার মনে হয়েছিলো, ওই ড্রোন শটগুলোর কী দরকার? অমিতাভ রেজা নাকি এখন বলছে, ওগুলো না দিলেও হতো। আমার ধারণা, সে প্রডিউসার শাওনের ইনফ্লুয়েন্সে এটা করেছে। আমি যদি এখনই রাশেদ জামানকে ফোন করে বলি, বাবা তুমি এই শটগুলো কেনো দিলে? তখন ও স্যার স্যার বলে, আর কিছুই বলতে পারবে না। একইভাবে, তারেক মাসুদ মেইক সারটেইন কম্প্রোমাইজ।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, সত্যজিতের আমল থেকে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ মিলে বাঙালি নির্মাতাদের মধ্যে আপনার পছন্দের নির্মাতা কে?
রিজভী : সত্যজিৎকে বাদ দিলে এক্ষেত্রে আমার পছন্দের নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ। সত্যজিৎ আমার কাছে এক নম্বর। রবী ঠাকুরের লেখা যদি তুমি বাংলা ভাষা থেকে বের করে দাও, তাহলে এ ভাষা খুব গরিব হয়ে যায়। আমাকে হয়তো কেউ গাল দিতে পারে। তার পরও আমি বলি, সত্যিকারের বাঙালি কেউ যদি হয়ে থাকে তাহলে তিনি সত্যজিৎ রায়। কারণ বাংলা সাহিত্য থেকে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে এর প্রাচুর্য কমে যায়; কিন্তু চলচ্চিত্র থেকে সত্যজিতকে বাদ দিলে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ক্ষতি হয়ে যাবে। তাহলে তোমরা বলো, হু ইজ গ্রেটার? আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত হলো, সত্যজিৎ রায়কে বাদ দিলে বিশ্ব চলচ্চিত্র গরিব হয়ে যাবে। ভাবো তাহলে, কোথায় তিনি!
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে কুরোসাওয়া একটা মন্তব্য করেছিলেন-যে ব্যক্তি সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখে নাই, সে সূর্যের উদয়-অস্ত কিছুই দেখে নাই। স্যার, ওই সময়ে সত্যজিতের প্যারালালে যারা সিনেমা করেছে-যেমন : ঋত্বিক, মৃনাল সেন-ওদের আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন।
রিজভী : মৃনাল সেন ইজ অ্যা গুড, হার্ডওয়ার্কিং মেকার। কিন্তু মৃনালকে আমি এ প্লাস দেবো না, এ দেবো। তবে রায় হলো এ প্লাস।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তাহলে ঋত্বিকের গ্রেডিং কী হবে?
রিজভী : শোনো, তোমরা বাঙালি ফিল্মমেকাররা খুবই সেন্টিমেন্টাল। তবে নিঃসন্দেহে ঋত্বিক একজন অত্যন্ত ভালো ফিল্মমেকার; কিন্তু হি ডিড নট হ্যাভ ডিসিপ্লিন। সোজা বাংলায় যদি বলি, একটা বোতল খেয়ে যে নিজের কাজ ভুলে যেতে পারে-আই অ্যাম সরি-আমার তাকে নিয়ে কিছু বলার নেই। তাহলে পেটের খিদায় পাথর বেঁধে ভ্যানগগ ছবি এঁকেছেন কীভাবে! আপনি যদি একটা বোতল পেয়েই আপনার কাজ ভুলে যান ...।
আজকে তোমরা ইউরোপ, আমেরিকা, সাউথ আমেরিকা যেখানেই যাও, বাংলাদেশটা কোথায় তাদের চেনাতে কষ্ট হয়। তোমরা বিশ্বাস করো; আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তুমি কোন দেশের লোক? আমি এটা ওটা বলতে বলতে বললাম, সত্যজিতের কথা; তখন ওরা আশ্চর্য হয়ে বলে, দেখেছি, দেখেছি তার সিনেমা দেখেছি!
ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে থ্রু ফিল্মমেকার হি ভিজ্যুয়ালাইজড, দেশটা কোথায়?
রিজভী : তোমরা বিশ্বাস করো, পথের পাঁচালীর কিছু কিছু অংশে আমি এখনো গ্রামের গন্ধ পাই। সিনেমায় তো দুইটা ইন্দ্রিয় শ্রবণ ও চোখ কাজ করে। কিন্তু পথের পাঁচালীতে আমি এর বাইরেও আরেক ইন্দ্রিয় দিয়ে গন্ধ পাই। এটা কিন্তু মোটেও আমি বানিয়ে বলছি না; তা না হলে কোনো ভালো কাজ দেখে আমরা কাঁদি-হাসি, কেনো-একই তো! তাহলে ওই গন্ধটা পাওয়াও তো সম্ভব।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, বাঙালি নির্মাতাদের মধ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষকে তো আপনি সত্যজিতের পরে পরেই বলছেন, সেটা ঠিক তার কী বিশেষত্বের কারণে?
রিজভী : ঋতুপর্ণ আমার আরেক প্রিয় শিল্পী কোয়েন্টিন টারান্টিনো’র মতো। ঋতুপর্ণের সিনেমাগুলো তোমাদের দেখানোর পর আমি বলে দিতে পারি, এটা এখান থেকে নেওয়া, ওটা ওখান থেকে নেওয়া। তোমরা ঋতুর বাড়িওয়ালি দেখেছো? একই সঙ্গে তোমরা নিশ্চয় কুরোসাওয়া’র সেভেন সামুরাই, রসোমনও দেখেছো? তোমরা অন্ধ ছেলের কাহিনি নিয়ে মাজিদির কালার অব প্যারাডাইস দেখেছো?
কুরোসাওয়া-যাকে শুধু আমি না, আমার গুরুজনেরা ডাকে সানসেহ মানে অ্যাম্পায়্যারার-মার্টিন স্করসিস, স্পিলবার্গ, লুকাস সবাই ওকে সানসেহ মানে দ্য অ্যাম্পায়্যারার বলে। আমি তার যে দুটো সিনেমার কথা বললাম, সেখানে তিনি আবেগ আনার জন্য প্রকৃতিকে কী সুন্দর ব্যবহার করেছেন। একইভাবে মাজিদি সাহেব তার কালার অব প্যারাডাইস-এ; তোমাদের মনে আছে কি না অন্ধ ছেলেকে কার্পেন্টারের কাছ থেকে ফেরত আনার সময় জঙ্গল থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ আসে, এটা কীসের শব্দ ঠিক বোঝা যায় না; কিন্তু এটা অশনি সঙ্কেত, ঘোড়া আসছে, গাছ নড়ছে-দ্যাটস মাজিদি ইউজেস ইট।
ঋতুর বাড়িওয়ালিতে কাজের মেয়েটাকে ছেলেটা চুমো খাচ্ছে আর টপ শটে দেখা যায়, বাড়িওয়ালি শাড়ি নিয়ে হেঁটে আসছেন; তারপর দেখা গেলো ঝড়। ৪০-৪৫ বছরের ওই নারী, পুরুষ বলতে ঠিক কী বোঝায় জানেন না; কিন্তু ভিতরে তো সেটা আছে। ওই চুমাচুমি দেখে উনার মধ্যে যে ঝড়টা ...। আই হ্যাভ অ্যাবসুলেটলি কনফার্ম টুডে, আমার যেটা বিশ্বাস, অ্যা গুড ফিল্মমেকার, ইউ হ্যাভ টু বি অ্যা গুড স্টুডেন্ট অব ফিল্ম হিস্ট্রি। এছাড়া কোনো উপায় নাই। আমি যদি ধার না করি, চুরি না করি, অনুপ্রাণিত না হই; তাহলে অনেক পেশা আছে, আমি সেটা করতে পারি, ফিল্ম করার দরকার নাই।
আমি তো নতুন কোনো কিছু করতে পারবো না। কেউ একটা লাল রঙ করেছে, আমি সাদাটা করে দেখাই না। কারণ আমি সাদা রঙ পছন্দ করি। কিংবা আমি কথায় কথায় উত্তেজিত হয়ে মার দিই চরিত্রকে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কিন্তু চুরিটা হওয়ার পরও ফিল্মটা সবকিছু মিলিয়ে একজনের নিজস্ব হয়ে উঠতে হবে।
রিজভী : অনেক পরিচালক এসে তোমার কাছে বলতে পারে, ভাই আমি এই সিনেমাটা, ডকুমেন্টারিটা অবজেক্টিভ করেছি; এর মধ্যে সাবজেক্টিভ কিছু নেই। এখন আমার প্রশ্ন, আপনি যে ক্যামেরাটা এখানে এইভাবে বসালেন, এই উচ্চতায় বসালেন, এটা কোথা থেকে আসলো; এটা তো আপনি। এই যে একটা শটের জন্য আপনি বিশেষ লেন্স ব্যবহার করলেন, এটা কোথা থেকে আসলো; এটা তো আপনি। আমার কথা হচ্ছে যে, দেয়ার ইজ নো সাচ থিঙস অ্যাজ অবজেক্টিভ ইন ফিল্মস। উই আর অল সাবজেক্টিভ। উই থিঙ্ক রিয়েলি ইট নট পসিবল টু বি অবজেক্টিভ। আমার কথা হচ্ছে যে, মেকিং টুডে ইন বাংলাদেশ সিনেমা ইটস নট ভেরি ডিফিকাল্ট। এখন তুমি যা চাও, তাই করে ফেলা সম্ভব। আমাকে তুমি বলো, এই ধরনের শট্ দরকার, আমি ব্যবস্থা করে দেবো। ঢাকায় বসে এখনই ফোন করলে সেই প্রযুক্তি চলে আসবে। যেকোনো লেন্স, ক্যামেরা, ট্রাইপড এখন চাইলেই পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এখনকার নির্মাতাদের খালি মগজটা নাই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, গল্প বলার স্বাধীনতা কি আছে?
রিজভী : আছে তো, কেনো নেই? সমস্যা কোথায় বলো?
ম্যাজিক লণ্ঠন : এই যে ফারুকীর ডুব নিয়ে যা হচ্ছে, এটাকে কি আপনার সমস্যা মনে হয় না?
রিজভী : ফারুকীর ডুব-এর কথা বলছো? আমাকে বলো দেখি ভাইটি, ইজ ইট নট ক্রিয়েটেড বাই হিজ প্রডিউসারস?
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, এটা যদি একধরনের মার্কেটিং পলিসি হয়, তা কি খুবই শিশুসুলভ? আপনার কাছে ঠিক কী মনে হয়?
রিজভী : বিলিভ মি; আই এক্সপেক্টেড। আমরা তো ম্যাচিউরড দর্শক, সুতরাং আমরা যদি ওই সব শুনে-দেখে ওই সিনেমা দেখতে যাই, তাহলে আমি তোমার বুদ্ধি নিয়ে একটু প্রশ্ন তুলবো না! এখন কথা হচ্ছে, উনার মানে হুমায়ূনের দ্বিতীয় বেগম সাহেবা বলছেন, আমি তো কোনো দিন উনাকে ফারুকীর সঙ্গে দেখিনি। ইজ ইট অ্যান অ্যাগ্রিমেন্ট? আমি এখানে খালি একটা কথা বলি, আমি তো এইটটি ফাইভে বি টি ভি ছাড়লাম; অনেক সময় হয় না মিথ্যা কেউ হঠাৎ আইকনিক ফিগার হয়ে যায়; আমিও তখন সেরকম, বিলেত থেকে কেবল ফিরে এসেছি, জুলফি ছিলো, কথায় কথায় ইংরেজি বলতাম।
এখনো মনে আছে, সেই সময় হাফ হাতাওয়ালা শার্ট ও পায়জামা পরা হুমায়ূন আহমেদ সাহেব একদিন আমার অফিসে এসে জিজ্ঞাসা করছেন, মুসা সাহেব এসেছেন? আমার সঙ্গে তখন আরেক প্রযোজক মুসা আহমেদ বসতেন। আমি বললাম, না। আমি উনাকে ঠিক তেমন একটা পাত্তা দিইনি। তারপর উনি বাইরে কোথায় যেনো চলে গেলেন। তাই বলে কি তিনি কোনো ছোটো লেখক! শরৎচন্দ্রের মতো উনিও মধ্যবিত্ত বাঙালি পাঠকের আইকন হয়ে গেছেন। কিন্তু আমার কাছে উনি খুব সস্তা। আমি একজন ফিল্মমেকার হিসেবে বলবো, উনি মিডিওকার।
আমি মার খেয়েছি আমার মায়ের হাতে শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ পড়ার জন্য। আমি না ঘুমিয়ে বইয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে গল্পের বই পড়েছিলাম, এ কারণে মা আমাকে মার দিয়ে বলেছে, ঘুমা। শরৎচন্দ্রকে যদি আজকে আমি বাংলা সাহিত্য থেকে বাদ দিই, তাহলে আমাদের কি খুব ক্ষতি হবে? কোনো ক্ষতি হবে না। একইভাবে বাংলা সাহিত্য থেকে হুমায়ূন সাহেবকে বাদ দিলেও কোনো ক্ষতি হবে না, রাখলেও কোনো লাভ হবে না। এখন দেখি প্রায়ই তার উক্তিগুলো মানে উনি এই বলেছেন, ওই বলেছেন বলে চিৎকার করে। তবে ভদ্রলোকের একটা গুণের কথা আমি নিশ্চয় বলবো, উনি নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত লোকের চিন্তাধারাকে ধরতে পেরেছিলেন। আমাদের আবদুল্লাহ আল মামুন মানে অভিনেতা, নাট্যকার মামুন ভাইয়েরও এই গুণটি ছিলো। বাংলাদেশ টেলিভিশনে উনি আমার সিনিয়র ছিলেন। আমরা একসঙ্গে থিয়েটার করতাম। মামুন ভাই নাটকের জন্য খুব সস্তা সস্তা সংলাপ লিখতে পারতেন। আগের দিন কথা হতো, পরেরদিন মামুন ভাই নাটক নিয়ে চলে আসতেন, বলতেন পড়ো।
আমি এই কথাটা কেনো বলছি, কারণ আমার এক সহকর্মী মুসা আহমেদ একটা অনুষ্ঠান করতেন ‘ছায়াছন্দ’ নামে, সেখানে সিনেমার গান দেখানো হতো। ও আমাকে বলতো, দোস্ত তুই তো গুলশানের দিকে যাবি? আমার কাছে গাড়ি আছে, আগে এফ ডি সি চল, তারপর তোরে নামাই দিয়ে আসবো। তার আগের রবিবারে আমি একটা টেলিভিশন নাটকে পাগলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আমার বিপরীতে ছিলো ফেরদৌসী আপা আর ডলি আনোয়ার। ডলি আমাদের দলের মানে থিয়েটারের মেয়ে ছিলো।
তখন এফ ডি সি’তে ঢুকেই বাম দিকে একটা পুকুর ছিলো। এখন হয়তো অনেকেরই সেটা মনে নেই। ওই পুকুরটার পাশেই লাইট দিয়ে শুটিং চলছিলো। আমি আর আমার দোস্ত মুসা সিগারেট খেতে খেতে এডিটিং ভবনের দিকে যাচ্ছি, কারণ ওখান থেকে আমাদের ‘ছায়াছন্দে’র জন্য রিল দেবে। হঠাৎ কে যেনো ওই পুকুরের পাড় থেকে বলছে, শুটিং বন্ধ; তারপর একজন মহিলা এসে আমার হাত ধরে ফেলেছে। আমার তো খারাপ অবস্থা, দেখি ববিতা! সে এখন বলতেছে, ও-মা আপনি! আমার সঙ্গে আপনাকে অভিনয় করতে হবে; আপনাকে আমি ছাড়বো না; আপনাকে এই করতে হবে, ওই করতে হবে ...। আমি তো লজ্জায়! খালি বলছি, থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ ...। তখন দেখি আমার দোস্ত মুসা কয়, ওই হালা তুই কার লগে ইংরেজি কইতাছোস! আমার অবস্থা চিন্তা করে দেখো। নায়িকার এই কাণ্ড দেখে শুটিং বন্ধ করে দিয়ে, অন্যরা চলে আসছে।
এই গল্পটা আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা কি আবদুল্লাহ আল মামুনের কোনো সিনেমা কিংবা নাটক দেখেছো?
ম্যাজিক লণ্ঠন : সারেং বউ দেখেছি।
রিজভী : হুমায়ূন আহমেদের লেভেলের না এসব?
ম্যাজিক লণ্ঠন : শেষের দিকের কাজগুলো ভালো হয়নি।
রিজভী : হুমায়ূন আহমেদ সাহেবেরও দুই-একটা কাজ আছে, যেগুলো দেখলে মনে হয় না উনার কাজ-সেগুলো এতো খারাপ! এগুলো হলো আমাদের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইমেজ।
(চলবে)
রাজীব আহসান ও জাবের হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করছেন।
leenjaber01@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন