কবীর সুমন ও সুমন
প্রকাশিত ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
আমার মনে হয় না, সৃজিতও আমায় আর কাজ করতে ডাকবে
কবীর সুমন ও সুমন

বাংলা গানের জীবন্ত এক কিংবদন্তির নাম কবীর সুমন। সুমনের গান নিজেই তার পরিচয়। তার সমসাময়িক খুব কম শিল্পীই আছে, যারা সময়কে সুমনের মতো এতো অসাধারণভাবে গানে ধরতে পেরেছে। শিকড়ের টানে শিকড়ের জন্য গান করে চলেছেন সুমন। কবীর সুমন ভারতের ৬১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের জাতিস্মর-এর সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে। কবীর সুমনের সঙ্গে এ নিয়ে আড্ডায় মেতেছিলেন ভারতের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘স্টার আনন্দ’-এর জনপ্রিয় উপস্থাপক সুমন। কবীর সুমন-সুমন সেই আলোচনার ভিডিওটি ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকদের জন্য অনুলিখন করা হয়েছে। যে কেউ চাইলে অবশ্য https://www.youtube.com/watch?v=ibZJo2d-32Y; retrieved on 31.10.2016 লিঙ্কে ঢু মেরে আসতে পারেন মূল ভিডিওটি দেখার জন্য। আড্ডার দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশ করা হলো।
দ্বিতীয় পর্ব
সুমন : কিন্তু কবিয়ালদের গানগুলো সেইভাবে হাইলাইটেড হলো না, প্রশংসিত হলো না, সমালোচিতও হলো না; এই এতো না এর পরেও যে জাতীয় স্বীকৃতিটা তুমি পেলে কবীর দা ...। আমার মনে আছে, ১৯৯৪ সালে বিনু বিনোদ চোপড়া তার সিনেমায় কাজ করার জন্য তোমায় মুম্বাই নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা এও জানি যে সেটা হয়ে ওঠেনি। এখন পুরস্কার পাওয়ার পর, এই জাতীয় মঞ্চটাকে বাংলার কাজে বা হিন্দি সুরে তুমি ব্যবহার করবে? মানে আমি বলতে চাচ্ছি, এখন যদি তোমার বাজরনির বাড়ির সামনে প্রযোজকদের দীর্ঘ লাইন পড়ে-অবশ্য সেটা পড়াই স্বাভাবিক; কারণ এতো বড়ো স্বীকৃতি।
কবীর সুমন : না, এটা আমার মোটেও মনে হয় না। প্রথম কথা, আমার মনে হয় না, এটার জন্য একজনও আমাকে হায়ার করবে। তার কারণ, আমি খুব সরাসরি সৃজিতকে একদিন জিজ্ঞাসা করি, এই তুই যে তিনটা সিনেমা করলি, সেখানে তো আমাকে কাজ করতে বলিসনি; তো এখন বলছিস কেনো? ও আমার ছেলের মতো, আমি ওকে এটা বলতেই পারি। তখন সৃজিত আমায় বলেছিলো, সুমন দা আমাকে একটা জায়গায় আসতে হয়েছে-প্রডিউসার নট ওয়ান্টস ইউ। আমি আজকে টার্ম ডিকটেট করার মতো জায়গায় আসতে পেরেছি বলে বলছি। এটা কিন্তু সৃজিত চমৎকার বলেছিলেন। আজকের এই অনুষ্ঠানটি যারা দেখছেন, শুনছেন, তারা যেনো প্রত্যেকে মনে রাখেন, আমাকে দিয়ে এই কাজটি করানোর জন্য এই ছেলেটিকে হয়তো লড়াই করতে হয়েছে। সিনেমাটি যে সর্বাঙ্গীন সুন্দর হয়েছে তা বলবো না। আমার হয়তো অনেক কিছু বলার থাকতে পারে। আমার কাজ হয়তো আরো অন্যরকম হলে ভালো হতো। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, সৃজিত একা লড়াই করে আমাকে দিয়ে কাজটি করিয়েছেন; আদারওয়াইজ কিন্তু কোনো ইন্টারেস্ট নেই।
একটা জাতীয় পুরস্কার কিছুই বলে না; জাতীয় পুরস্কার অতো বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হচ্ছে, কবীর সুমনের এই পুরস্কারটা পাওয়া। যেখানে যতো রকমভাবে পাওয়া যায় ...। যেমন ধরো, আমি পাঁচ বছর ধরে আমার ক্ষমতার বাইরে গিয়ে-আমাকে জোর করে যে দলের মেম্বার করা হয়েছিলো-সেই দলের স্থানীয় ভালো নেতাদের দিয়ে যে উন্নয়নের কাজগুলো করলাম; অথচ ওই দলটা, ওই দলের নেতা, অন্য নেতারা বলছে, এই লোকটা টাকা নয়ছয় করেছে; এই লোকটা কোনো কাজ করেনি। এতো বড়ো মিথ্যা কথা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা বলতে পারছে! যেখানে ফলকের পর ফলক রয়েছে আমার কাজের; এই হচ্ছে একটা রাজ্য, এই হচ্ছে এই রাজ্যের নেতৃত্ব! সেখানে বাকি লোকেরা সব হঠাৎ অন্যরকম হয়ে যাবে, সেটা আমি ভাববো কী করে! প্রত্যেকে তো ভয় পাচ্ছে, গিল্ট কার হাতে, ফেডারেশন কার হাতে? বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘর করি; কেনো রে ভাই ঝামেলায় যাওয়া। এ লোকটা যাচ্ছে যাক, এ গলা যায় যাক-আমার বউ-বাচ্চা ভালো থাকলে হলো। আমি তোমায় সোজা কথা বলছি, আমরা এতদিন ধরে, সবাই মিলে উন্নয়নের কাজ করলাম; সেটা এক কথায় নস্যাৎ করে দিচ্ছে। এতো বড়ো অগণতান্ত্রিক, ফ্যাসিস্ট-দিস ইজ ফ্যাসিজম, নাথিং এলস। এটার জন্য আমায় যদি কেউ অ্যারেস্ট করে, তাহলে আমার কাঁচকলা এসে যায়। আমি কারো পরোয়া করি না; কারণ আমি কারো টাকায় চলি না। এবং কোথাও থেকে টাকা চুরি করিনি বা তোলা তুলিনি; আমার ছেলে-মেয়েরাও তোলেনি। কিন্তু এইটা যেখানে সম্ভব, সেরকম একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশে কবীর সুমন কাজ করবে, সেই পরিবেশটাই তো নেই। মূল সমস্যাটা তো এইখানেই। আগের আমলটাও এ রকমই ছিলো-অমুককে নিলে অমুক দাদা রেগে যাবে।
সুমন : কবীর দা, লোকসভা নির্বাচন, এই মুহূর্তে যদি ভেড়ির আওয়াজ পাওয়া যেতো, সেটা তুঙ্গ বিন্দুতে পৌঁছাতো। এ নিয়েও নানা জল্পনা চলছে, কবীর সুমন কী করবেন? কোনো নির্দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন করবেন কিংবা নিজে নির্দলীয় হয়ে দাঁড়াবেন, কংগ্রেস সমর্থন করবেন-এই এতো ইকোয়েশন। তোমার মনে আছে, এই কিছুদিন আগে তুমি বলেছিলে, একটা মঞ্চ করার কথা; এবং সেখানে জনগণের কাছে গিয়ে তুমি একটাই প্রার্থনা করবে-আমাকেও ভোট দিও না, কাউকেও ভোট দিও না। এখনো কি তুমি সেই মতে অটল রয়েছো?
কবীর : না। আমি খুব খোলাখুলি বলছি, আমার গণআন্দোলনের সহযোদ্ধা সমীর; আমি সমীরকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। আবার অন্যদিকে, এস ইউ সি আই-এর (সোশালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়া) যিনি ড. সামন্ত, তিনিও তো আমার গণআন্দোলনের সহযোদ্ধা; বুঝতে পেরেছো? কাজেই এখন যদি কেউ আমাকে বলেন, একটা মঞ্চে আসেন, আমি যাবো। গিয়ে বলবো, মানে আমি একটা গান শোনাবো। তারপর বলবো, আমি গণআন্দোলনের লোক, এরাও তাই; এদের সাহায্য করুন। আমি জানি, এরা খুব খারাপ লোক না।
সুমন : কিন্তু এস ইউ সি আই না কংগ্রেস? কংগ্রেস এজন্য বলছি যে, সৌমেন মিত্রের হয়ে তুমি ...
কবীর : সৌমেন দা; ওর কাছ থেকে আমি যে ভালোবাসা পেয়েছি; ও আমার অভিভাবকের মতো।
সুমন : মানে ওই পাঁচ বছর, তুমি সংসদ সদস্যে থাকার সময়?
কবীর : উনি যে কী স্নেহশীল, ভদ্রলোক! উনি আমাকে সহজ কথায় বললেন, কবীর আমার মঞ্চে একটা গান শোনাবে? আমি একশোবার যাবো। কারণ উনি সভ্য মানুষ, সভ্যভাবে আমার সঙ্গে কথা বলেন। উনি ভদ্রলোকের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলতে জানেন। তেমনই এস ইউ সি আই-এ আমার যে কমরেডরা, আমি তাদের পাশেও থাকবো। এখন বলি, এ কেমন ভালোবাসা কে জানে? কিন্তু আমি কোথায় যাবো? আমি এ রকম টাইপের লোক। আমি গণআন্দোলনের সঙ্গে আছি। গণআন্দোলনের কর্মী দাঁড়িয়েছে, আমি তাদের সমর্থন করবো। আমি একটা ভোট দু’ভাগ করে দেবো কী করে? তা তো জানি না।
এবারে ধরো, কালকে যদি প্রডিউসারদের লাইন পড়তো, তাহলে সিনেমাগুলো সেরকম হতে হতো। সব সিনেমায় আমাকে নিয়ে কী হবে? আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমার মনে হয় লোকে ভয় পায় যে, এ শালা আমার কথা শুনবে না, বুঝতে পেরেছো?
সুমন : এতো বড়ো বড়ো মানুষের কথাই শুনছে না, তো আমার কথা কী শুনবে?
কবীর : ধরো, এর মধ্যে যদি একটা আইটেম সঙ থাকে-তোমার বগলে ফুলের গোছা, হুল্লু হুল্লু হুল্লু- (নেচে নেচে গাইলেন)-এ রকম করতে হবে কিংবা রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বেহাল্লাপনা করতে হবে, সেটা তো আমাকে দিয়ে হবে না। এ রকম হলে চড় মারবো, থাপড়ে গালটা সমান করে দেবো; বুঝতে পেরেছো? এগুলো তো আমাকে দিয়ে হবে না। বেশিরভাগ জিনিস পিউরাইল, ইনফেন্টাইল মাইন্ডলেস জিনিস হচ্ছে। সঙ্গীতের পর সঙ্গীত তৈরি হচ্ছে; যেটা কেউ শোনেও না, মনেও রাখে না।
সুমন : জাতীয় প্ল্যাটফর্ম বা হিন্দিতে কাজ করার সুযোগ?
কবীর : যদি পাই আমার খুব ভালো লাগবে। আমাকে যার কাজে লাগবে, যিনি আমাকে প্রফেশনাল হিসেবে দেখবেন-দাদা হিসেবেও না, জ্যাঠা হিসেবেও না-স্রেফ প্রফেশনাল। বিনু বিনোদ চোপড়া আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন নাইনটিন ফোরটিটু লাভ স্টোরিতে একটা গান ডাব করার জন্য, যেটা শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় আমার আগে গেয়েছেন। আমি সেখানে গিয়ে সেটা শুনে বললাম, এটা তো শিবাজী বাবুর গলা মনে হচ্ছে; এটা কি ডামি ভয়েস, নাকি রিয়েল? ওরা বললো, রিয়েল ভয়েস। আমি বললাম, তাহলে আমি গাইবো না। ওরা বললো, কেনো? কারণ শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় একজন শিল্পী, তার একটা শ্বশুরবাড়ি আছে মশাই। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানে, তার পাড়ায় একটা পানের দোকান আছে, সেই পানের দোকানদারকে তিনি বলেছেন হয়তো, আমি বোম্বেতে (মুম্বাইতে) একটা হিন্দি সিনেমায় গান গাইছি। তার কী গর্ব! সেখানে আমি তার জায়গায় গেয়ে দেবো! আমি পারবো না। তখন তারা বললো, আপনি বাঙালি বলে করছেন না? আমি বললাম, তাহলে বাকি গানগুলো শোনান। সেখানে কুমার শানুর একটা গান ছিলো-এক লাড়কি কো/দেখা কো এইছা লাগা-আমার খুব ভালো লাগলো। আমি বললাম, এইটা আমি গাই? ওরা বললো, এটা না। আমি বললাম, কেনো না? ওরা বললো, কুমার শানু। আমি বললাম, ও; ইনিও তো বাঙালি!
তারপর আমি তাদের বললাম, বোঝার চেষ্টা করেন, আমাকে দিয়ে হবে না, আমি পারবো না। আমাকে যদি সত্যি আপনার দরকার হয়, তাহলে আমার জন্য প্রপার স্কেলে একটা গান তৈরি করুন না। একেবারে আমার জন্য করুন সেটা; অন্য কারো গান রাবার দিয়ে ইরেজ করার জন্য না। কাজেই আমার মনে হয় না, আমায় কেউ কাজ করতে ডাকবে। আমার মনে হয় না, সৃজিতও আমায় আর কাজ করতে ডাকবে। মাঝখান থেকে বরং-আমার পয়সা নেই, কাজটা করে দিন-এই পার্টি দুই-তিনটা আসতে পারে। তার মানেটা হলো, আমার পয়সা লাগে না। সবার পয়সা লাগে, একমাত্র সঙ্গীতকারদের পয়সা লাগে না, বুঝতে পেরেছো?
কিন্তু যদি হয়; তারা আমাকে ব্যবহার করুক না। যারা এই সিনেমার গানগুলো শুনবেন, সিনেমাটা দেখবেন; কবিয়ালের গানগুলো শুনুন, বাংলা আধুনিক গানগুলো শুনুন-ব্যবহার করুন না আমাকে। তাহলেই তো বর্তে যাই; শুধু আমি বর্তে যাই না, সঙ্গীতেরও ভালো হবে। আজকের এই যে পুরস্কার, এটা কবীর সুমনের একার পুরস্কার নয়, এটা বাঙালির পুরস্কার। এটা ওই সময়টার পুরস্কার; যে সময়টা অবহেলিত, লাঞ্ছিত। কবির লড়াই মানে-তোর বগলে ফুল/ আমার অমুকের মাথায় চুল-এই টাইপের বোকা বোকা কথা। কিন্তু বিষয়টা মোটেও তা নয়; একটা টেক্সট যদি আমরা একবার শুনি, যেমন ওই যজ্ঞেশ্বরীর গানটাহলে যদি হলে সখা অধিষ্ঠান/ হেরে মুখ গেলো দুখ/ দুটো কথা বলি প্রাণ। হায় হায় হায়, কী গান গেয়েছে মেয়েটি! আর এর মধ্যে যে সুর-হেরে মুখ গেলো দুখ/দুটো কথা বলি প্রাণ/ হলে যদি হলে সখা অধিষ্ঠান-সিরিয়াস লেখা। এটা কবির লড়াই না। অনেকে ভেবেছেন, কবির লড়াই মানে মারামারি-কাটাকাটি হবে। এ নিয়ে একজন শিল্পীর সঙ্গে বচসা হয়েছিলো, তিনি বুঝতেই পারছেন না-আমি তাকে বললাম, এর মধ্যে সুখী সংবাদ আছে, মারামারি নেই।
সুমন : এটা হয়তো ৬৭ সালে অনিল বাগচী মশাই যে সুর করেছিলেন; যেটা পরিচালনা করেছিলেন সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়। সেটা দেখে অনেক বাঙালির এই ধারণা হতে পারে, কবির লড়াইটাই হচ্ছে কবিগান।
কবীর : ওখানেও লড়াই চলে। কীর্তনে যেমন মাথুর, ওখানে সখি সংবাদ চলে। সেখানে সখি আর রাধিকার যে বিরহ, সেই বিরহের নদীটাকে পার করিয়ে দিচ্ছেন। যেমন এই গানটা-চিন্তা নাই চিন্তামণির বিরহ/ ঘুচিলো এতোদিনের পর/ অন্তরে চূড়াও গো কিশোরী/ হেরে অন্তরে বাঁকা বংশীধর। এটা অসামান্য একটা লেখা ভোলা ময়রার। এটা কিন্তু সখিদের গান, ভোলা ময়রা গাইছেন। এটা ঠিক কি না জানি না, তবে এই মর্মে অনুপুঙ্খ কোনো বিবরণ কোথাও নেই। বরং বাংলাদেশে আব্দুল হাই মশাই, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ বলে একটা মোটা বই করেছিলেন, তাতে কিন্তু গজলা গুইয়ের কথা আছে। তাদের কথা তুমি আজকে এখানে পাবে না। এখানে ঈশ্বরগুপ্ত মশাই আছেন, আরো কেউ কেউ লিখেছেন। কিন্তু এই জায়গাগুলো কী ছিলো উনারা বলেননি। আমার ধারণা, ওর যিনি প্রতিদ্বন্দ্বী, তাকে এই স্ট্যান্ডার্ডের গান বানিয়ে গাইতে হবে। আর বাধনদারকে বসে বসে এটা করতে হবে। এটাও ছিলো লড়াই।
সুমন : কবীর দা, ফিল্মটা রিলিজ হওয়ার আগে সরাসরি তুলনা করা হয়েছে-তুমি যাকে বার বার গুরু বলেছো-অনিল বাগচীর সঙ্গে তোমার বা মান্না বাবুর সেই সময়ের গানের সঙ্গে শ্রীকান্তেরও। ফলে বাঙালির তো এই প্রবণতাটাও ছিলো, একটা তুলনা করা। আজকে নিশ্চয় সবাই খুশি হবে যে, এই প্রজন্মেরও একটা সৃষ্টি এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারলো এবং তার স্বীকৃতি এলো।
কবীর : দেখো, এটা নিতান্তই-আবার বলছি, আমি জানি আমার মুখে এই কথাটা শুনে লোকে মুচকি হাসবে-গুরুদের আশীর্বাদ। অনেক জিনিস অ্যাক্সিডেন্ট হয়, তার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাকে এক কোটি দিয়ে গুণ করলেও অনিল বাগচীর মতো সুরকার হওয়া সম্ভব নয়; উনি এতো বড়ো মাপের সুরকার। কিন্তু এই গানগুলোর এভাবে তারা টেক্সট পাননি। তিনি (অনিল) ‘তুই আমায় দয়া করবি কি না বল’অসাধারণ একটা কম্পোজিশন করেছেন এবং মান্না দে সেটা যা গেয়েছেন স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়; হল কাঁপছে। কিন্তু আমি সে লাইনে যাইনি, আমি সরাসরি শ্যামা সঙ্গীতের লাইনে গেছি। (সুর করে গাইলেন) জেতেতে ফিরিঙ্গি বলে/ মুখ ফিরিয়ে যাবি চলে/ ভজন সাধন কাকে বলে/ জানিনে মাতুঙ্গি; এই এখানে খোলের বাজনা আরম্ভ হলো। অর্থাৎ আমি বাংলা শ্যামা সঙ্গীতের যে জায়গাটা, সেটা নিয়ে এসেছি। অনিল বাগচী যদি আজকে কোথাও থেকে এটা অলক্ষে শোনেন, আমার মনে হয় তিনি আমায় আশীর্বাদ করবেন। এবং শুধু আমাকে না, সহশিল্পীদের ও আমাদের শ্রীকান্তকেও।
উনি একটা থিমকে ধরে একভাবে এক্সপ্রেস করেছেন, আমি ওই থিমটাকে আরেকভাবে এক্সপ্রেস করেছি। মান্না দে যুগান্তকারী শিল্পী, তার কণ্ঠ এক বিশাল সম্পদ, ভয়ঙ্কর তার পাওয়ার। কিন্তু সবসময় সেই পাওয়ার দরকার হয় না। আমরা পাওয়ারে বিশ্বাসী নই; আমরা মুষ্টিযুদ্ধ করতে আসিনি, শিল্প করতে এসেছি। এইখানে শ্রীকান্ত যেভাবে গানগুলো গেয়েছেন, আমার মনে হয় সেগুলো অ্যাডিকুয়েট এই সিনেমার জন্য। আমি যদি সেই সময় মান্না দে’কে পেতাম, আমি তার শ্রীচরণে প্রণাম করে বলতাম, আপনি এ গান গাইবেন না। আমি বরং অনেক গান কিশোর কুমারকে দিয়ে গাওয়াতে চেষ্টা করতাম। কেনো জানো? ডাইরেক্টনেসের জন্য আবেগের দরকার নেই। আমার কথাটা বুঝতে পেরেছো? আমি ধনঞ্জয় বাবুকে দিয়েও গাওয়াতাম, কারণ তারও আবেগ নেই, স্ট্রেইট গাইতেন।
এটাও মনে রাখতে হবে, আজকের শিল্পীরা তাদের মতো করে মোকাবিলা করছেন। আজকের একটা গান যেভাবে হচ্ছে, সেখানে কোনো স্থিরতা নেই। আমি জানি না, বাঙালি কী বিচার করছে? আমার মনে হয়, প্রথম দিকে ওই রকম কথা হচ্ছিলো; আর সৃজিতরাও দুষ্ট তো, ও ইচ্ছে করে একটা টিজার মতো দিচ্ছিলো, যাতে লোকে ভাবে এটা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির রিমেক গোছের কিছু একটা হচ্ছে। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ছিলো অ্যান্টনির প্রণয় বৃত্তান্ত, বিবাহ এবং তার ট্রাজিক পরিসমাপ্তি। আর এই সিনেমাটা (জাতিস্মর) তো তা নয়। ওখানে (অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি) মূল বিষয়টা কবিয়ালদের গান নয়, মূল বিষয় ছিলো-(সুর করে গাইলেন) ‘আমি যে জলসা ঘরে’ বা ‘চম্পা চামেলি’ ইত্যাদি গান। এছাড়া ছিলো ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ ইত্যাদি গান। ওখানে আধুনিক গানগুলো প্রধান। কিন্তু সৃজিত বাবুর সিনেমায় আধুনিক গানগুলো কিন্তু প্রধান নয়।
সুমন : কবীর দা, আমরা অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি; আমার শেষ প্রশ্ন-এতো বড়ো একটা জাতীয় স্বীকৃতি-যে দলের সদস্য হিসেবে তুমি পাঁচ বছর কাটালে, তাদের কারো কোনো অভিনন্দন বার্তা, ফোন কি পেয়েছো?
কবীর : না, পাবোও না। কিন্তু আমার কী রকম মনে হয় জানো, রাস্তায় যদি কখনো মুকুল বা মদনের সঙ্গে দেখা হয় বা সৌগত দার সঙ্গে কিংবা দীনেশ ত্রিবেদী, তারা নিশ্চয় আমায় বলবেন গ্রেট। এটা হয়তো তারা দলের দিক থেকে বলবেন না, তবে মানুষ হিসেবে নিশ্চয় বলবেন, গ্রেট।
সুমন : এই সরকারের এমন একটা ভাবমূর্তি-তারা শিল্পের গুণগ্রাহী, শিল্পের পিছনে আছেন-তাহলে এখনো একটা অভিনন্দন বার্তা ...
কবীর : কেনো করবেন? এটা করতে গেলে ওদের যে শিফটটা নিতে হবে, সেই ফ্লেক্সিবিলিটি যদি তাদের থাকতো, তাহলে রাজ্যটার আজকে এই অবস্থা হতো না। ওটা বলার জন্য যে নমনীয়তা দরকার, সেটা যদি ওদের থাকতো, তাহলে আজকে রাজ্যের এই হাড়ির হাল হয়! তাহলে বিচারপতিকে অপমানিত হতে হয়? আমি কে হরিদাস পাল বলতো! ওরা বিচারপতিকে পাত্তা দেয় না। আমি কে, আমি তুচ্ছ-(সুর করে) ‘চম্পা চামেলি’।
কাজেই নমনীয়তা থাকলে কোনটা বড়ো-সভ্যতা না অহংবোধ; গণতন্ত্র বড়ো, না আমি কে হরিদাস পাল দেখিয়ে দেবো তোকে? কোনটা বড়ো-রাজনীতি না ব্যক্তিনীতি? এই জায়গাগুলোই তো এখন গুলিয়ে গিয়েছে। আমরা সবাই সবাইকে মারছি, ধরছি, গালমন্দ করছি-টেলিভিশন খোলার জো নাই। বাড়িতে ছোটোরা থাকলে আরো বন্ধ করে দিতে ইচ্ছে করে। এই রকম একটা জায়গায় হঠাৎ একজন সঙ্গীতকারকে তারাই অভিনন্দন জানাবে! আমার মনে হয়, এই এক্সপেক্টেশনটা বড়ো বাড়াবাড়ি।
সুমন : কবীর দা, আজকের খবরে আসি-১০ বছর পর ২০০৪ এ হয়েছিলো ২০১৪ এ-২০০৪ এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুরোধে আফজাল আমানুল্লাহ এসেছিলেন বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে। ২০১৪ সালে ১০ বছর পর আবার বিশেষ পর্যবেক্ষণে তিনি আসছেন এই রাজ্যে। এই নির্বাচনে কি বিশেষ কিছু আছে?
কবীর : আমার ভয় করছে, আমি যদি মিলাতে চাই তাহলে গত বারের সঙ্গে মিলাতে হয়, তুলনা করতে হয়-তখন এ রকম পরিবেশ ছিলো না। নির্বাচন কমিশনের লোককে চড় মারছে; এটা শুধু একবার না; তার পর আবার সাফাই গাওয়া হচ্ছে। এসব তো এভাবে ছিলো না, তবে ছোটো আকারে ছিলো। সি পি এম (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্কসিস্ট) কী বাড়াবাড়ি করেনি, অবশ্যই করেছে। কিন্তু এই রে এই বুঝি গেলো, এই বুঝি থাপ্পড় খেলাম, এই বুঝি মরলাম; একজন বিচারপতি বলছেন, ওই লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে কেনো! কিন্তু তিনি কী সুন্দর ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বোমা মারছেন, এটা করছেন। এটা কি! এটা তো ভয়াবহ একটা জায়গা! এই পরিবেশটাকে সামলাতে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী তিনিও নিশ্চয় সচেষ্ট হবেন। সবাই মিলে এটাকে কীভাবে ঠিক করবেন, আমি ঠিক জানি না।
সুমন : কবীর দা অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমায়। অবশ্যই অভিনন্দন, আমাদের সবার তরফ থেকে বাংলাকে আবার জাতীয় মঞ্চে, জাতীয় প্ল্যাটফর্মে গর্বিত করার জন্য। অনেক খারাপ থাকার মধ্যে এই খবরটা, সঙ্গীতের এই স্বীকৃতি, বাঙালি সঙ্গীতের স্বীকৃতি, কবিগানের সময়টার স্বীকৃতি-আমাদের ভালো থাকার সূচনা।
কবীর : নিশ্চয়, নিশ্চয়; একশোবার, একশোবার।
সুমন : কবীর দা, অনেক ধন্যবাদ।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন