Magic Lanthon

               

রোকেয়া প্রাচী

প্রকাশিত ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অভিনয় ও পেশাদারিত্ব

রোকেয়া প্রাচী

 

কথামালা ৬

১২৩, রবীন্দ্র কলাভবন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

২৯ মার্চ ২০১৭

বিকেল সাড়ে চারটা

 

 

সঞ্চালক-১ :

                                             যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,

                                             সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,

                                             যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,

                                             যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,

                                             মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্থরে,

                                             দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা

                                             তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,

                                             এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।

 

সঞ্চালক-২ : আজ ২৯ মার্চ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ, ১৪২৩ বঙ্গাব্দের ১৪ চৈত্র। উপস্থিত সকলকে বসন্তের শেষ বেলার শুভেচ্ছা। কথামালা সঞ্চালনায় সঙ্গে আছি আমি হারুন-অর-রশিদ।


সঞ্চালক-১ : আমি অধরা মাধুরী। আজ আমরা বহুদিনের প্রত্যাশিত ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৬ আরম্ভ করতে চলেছি। শুরুতেই শোকের সঙ্গে স্মরণ করতে চাই নির্মাতা ইবনে মিজান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক মিজু আহমেদকে। তারা দুজন সম্প্রতি জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে শুরু করছি আজকের আয়োজন।


২০১৫’র এপ্রিলে সর্বশেষ কথামালা ৫ অনুষ্ঠিত হয়। পরের এই দুই বছর নানা অস্থিরতা ও শোক পেরিয়ে নিজস্ব ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ম্যাজিক লণ্ঠন আজ কথামালা ৬ আয়োজন করতে পেরেছে। আয়োজনটা মূলত করা হয়েছিলো ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ এপ্রিল। কিন্তু সব প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী স্যারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরে আর সেটা করা সম্ভব হয়নি।


সঞ্চালক-২ : এর পর বছরের শেষ অংশে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আকতার জাহানের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর হত্যাকাণ্ড যেনো বিভাগের সবকিছুকে স্থবির করে দেয়। এর বাইরে দেশজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জঙ্গি তৎপরতা সবার জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহকে অনেকখানি থমকে দেয়।


সঞ্চালক-১ : এ সবকিছু ঘটছে আমাদের জীবনেই; আমরা যারা সাধারণ মানুষ, যারা শত শোকের মধ্যে থেকেও থেমে থাকতে চাই না। কেননা জীবনের উৎসব কোনো বাধা মানে না, থেমে থাকে না কোনো দুর্ঘটনার গণ্ডিতে। জীবনের সেই তাগিদে এতো সব ঝড় পেরিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রকাশ হয় ম্যাজিক লণ্ঠন-এর ১২তম সংখ্যা। ২০১১-তে যাত্রা শুরু করে ম্যাজিক লণ্ঠন প্রথমবার কথামালার উদ্যোগ নেয় ২০১২-তে। এরই ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্র জগতের পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে ম্যাজিক লণ্ঠন ইতোমধ্যে পাঁচটি কথামালা আয়োজন করতে সফল হয়েছে। প্রথম কথামালায় অতিথি ছিলেন নূরুল আলম আতিক।


সঞ্চালক-২ : পরবর্তী সময়ে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর আমন্ত্রণে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন নির্মাতা আবু সাইয়ীদ, গোলাম রাব্বানী বিপ্লব, অভিনয়শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, পরিচালক ও অভিনয়শিল্পী কাজী হায়াৎ। সর্বশেষ কথামালায় কাজী হায়াৎ কথা উপস্থাপন করেন ‘বাংলাদেশে ডিজিটাল সময়ের চলচ্চিত্র : কী পেলাম কী হারালাম’ এই বিষয়ে। এবারের কথামালায় আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী।


সঞ্চালক-১ : চলচ্চিত্র জগতে রোকেয়া প্রাচী যাত্রা শুরু করেন ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে, মোরশেদুল ইসলামের দুখাই- এর মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা চলচ্চিত্রকে উপস্থাপনকারী অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম রোকেয়া প্রাচী। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে তার অভিনীত মাটির ময়না কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। চলচ্চিত্র জগতে কুড়ি বছরের পথচলায় অনন্য অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি তিনি পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আজকের কথামালায় তিনি কথা উপস্থাপন করবেন ‘অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’ নিয়ে। এবারে মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি আজকের অতিথি রোকেয়া প্রাচীকে। (হাততালির মাধ্যমে রোকেয়া প্রাচীর মঞ্চে আসন গ্রহণ) আমাদের আয়োজন মূলত দুটি পর্বে সাজানো হয়েছে। শুরুতেই থাকছে অতিথির কথা উপস্থাপন এবং তারপর সবার অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর পর্ব।


সঞ্চালক-২ : আয়োজনের এ পর্যায়ে সম্মাননীয় অতিথির হাতে স্মারক প্রদান করবেন ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সহকারী সম্পাদক মাহামুদ সেতু।



সঞ্চালক-১ : মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সহকারী সম্পাদক মাহামুদ সেতুকে। (দর্শকের হাততালি)


সঞ্চালক-২ : ধন্যবাদ মাহামুদ সেতুকে।


সঞ্চালক-১ : আয়োজনের মূল অংশে যাওয়ার আগে শুভেচ্ছা বক্তব্য নিয়ে আসছেন ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সহকারী সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল। মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি ইব্রাহীম খলিলকে।


ইব্রাহীম খলিল : শুভ অপরাহ্ন। ম্যাজিক লণ্ঠন আয়োজিত কথামালা ৬-এ যারা উপস্থিত হয়েছেন আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। অভিনন্দন জানাই আমাদের অতিথি অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচীকে; যিনি ঢাকা থেকে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর ডাকে সাড়া দিয়ে কথা উপস্থাপনার জন্য হাজির হয়েছেন। আজকের আলোচনার বিষয় ‘অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’। প্রায় এক বছর আগে ঠিক একই বিষয় ও অতিথি নিয়ে আমরা কথামালা আয়োজনের সব কাজ প্রায় সম্পন্ন করি। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে সেটা সেসময় করা সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের আলোচনার বিষয় ও আলোচক পরিবর্তন হয়নি। কেনো হয়নি সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আমরা যারা চলচ্চিত্র দেখি কিংবা লেখালেখি করি, তারা নিশ্চয় সহজেই এর গুরুত্ব অনুভব করতে পারছি।


আমরা যদি একটু অতীতে ফিরে যাই তাহলে দেখবো, আজকে চলচ্চিত্র যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে কোনো একক মানুষের হাত নেই। অসংখ্য মানুষ প্রাযুক্তিকভাবে স্থিরচিত্রকে চলমান করার জন্য চেষ্টা করেছে। ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দে গণিতবিদ অ্যাথানাসিয়াস কিরচার ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ নামের একটি প্রক্ষেপণ যন্ত্র তৈরি করেন। যার মাধ্যমে হাতে আঁকা কিছু ছবি দিয়ে যিশু খ্রিস্টের জীবনী তুলে ধরা হয়। এর পর অনেক পথ পেরিয়ে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে টমাস আলভা এডিসন আবিষ্কার করেন কিনেটোস্কোপ। কিন্তু আমরা বর্তমানে চলচ্চিত্র বলতে যেটাকে বুঝি, সেটার আবিষ্কার ফ্রান্সের লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাতে। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে এর পথচলা শুরু হয়। সেসময় সেটা দেখে মানুষ অবাক হয়েছিলো। কীভাবে এটা সম্ভব হলো। কিন্তু কিছুদিন পর সেই রেশও কেটে যায়। কারণ সেখানে শুধু প্রযুক্তি ছিলো; গল্প ছিলো না, অভিনয় ছিলো না।


উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের আগমনও একই সময়ে ঘটে। কিন্তু আজ এতদিন পরও আমাদের চলচ্চিত্র সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি। কয়েকদিন আগের ছোট্ট একটা ঘটনা বলি। বিনোদপুরে (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি বাজার) গিয়ে ১১টার দিকে রাতের খাবারের জন্য বসেছি। আমার টেবিলে আগে থেকেই এক ভদ্রলোক বসে ছিলেন, বয়স ৬০-৬৫ হবে। উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এতো রাতে কেনো খেতে এসেছো? আমি বললাম, আমরা একটা সংগঠন করি ম্যাজিক লণ্ঠন নামে, সেখানে কাজ করতে একটু দেরি হয়ে গেলো, তাই। তিনি জানতে চাইলেন, এটা কী ধরনের সংগঠন, কাজ কী? আমি বললাম, চলচ্চিত্রবিষয়ক সংগঠন, আমরা চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি করি। উনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, কিছু মনে করো না, তোমরা কি কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ, জসীম উদ্দীন এদের লেখা পড়ো? আমি বললাম, পড়ি, তবে খুব বেশি না। তখন উনি বললেন, কাজী নজরুল ইসলাম ওনার বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে একটি বেদনাদায়ক চিঠি লেখেন; ওই চিঠিতে একটা কথা আছে-‘ভিক্ষে যদি কেউ তোমার কাছে চাইতেই আসে, অদৃষ্টের বিড়ম্বনায় তাকে ভিক্ষা না দাও কুকুর লেলিয়ে দিও না।’ তো তোমরা সিনেমা নিয়ে কাজ করছো ভালো কথা। কিন্তু বর্তমানে সিনেমার যে পরিস্থিতি, যারা অভিনয় করছে, তাদের অবস্থা তো খারাপ! আমি বেশ কয়েকদিন সিনেমাহলে গেছি, সিনেমাও দেখেছি; কিন্তু এখন আর যেতে ইচ্ছা করে না। কারণ তারা যে ধরনের সিনেমা বানাচ্ছে, অভিনয় করছে, সেটা বলার মতো নয়। মানুষকে বিনোদন দিতে হবে ভালো কথা, কিন্তু সেটা এভাবে! তার পরও তোমরা এগুলো নিয়ে কাজ করছো, ভালো কথা; দেখা যাক কী হয়।


চলচ্চিত্র নিয়ে এটা একজন সাধারণ মানুষের সাধারণ মন্তব্য; তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে যারা অভিনয় করছে, তারা যে অভিনয় করছে সেটা দর্শক বুঝে ফেলছে। কারণ যে দায়িত্ববোধ নিয়ে এই কাজটা করা দরকার সেটা তাদের নেই। এই আর কি, কথা আর না বাড়াই। আমাদের মধ্যে আজ অতিথি হিসেবে হাজির হয়েছেন অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী; উনি আলোচনা করবেন। আমরা সবাই তার আলোচনা শোনার জন্য বসে আছি। অনেকের মনে হয়তো অনেক কথাই আছে, অনেক প্রশ্নও আছে। সেগুলোর সমাধানও এই আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে। এই তো, আবারও সবাইকে ধন্যবাদ।



সঞ্চালক-১ : ধন্যবাদ ইব্রাহীম খলিলকে। এবারে আমরা সরাসরি চলে যাবো আয়োজনের মূল অংশে। ‘অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’ বিষয়ে কথা উপস্থাপন করবেন আজকের অতিথি প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী। একটা কথা আরেকবার মনে করিয়ে দিই। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সবার অংশগ্রহণে থাকবে প্রশ্নোত্তর পর্ব। কথা উপস্থাপন চলাকালে আপনাদের সবার কাছে একটি করে সাদা কাগজ পৌঁছে যাবে। সেখানে আপনাদের প্রশ্ন, নাম এবং নিজের বিভাগ লিখে আমাদের প্রতিনিধিদের হাতে দিয়ে দিবেন। এবারে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি রোকেয়া প্রাচীকে ‘অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’ নিয়ে তার কথা উপস্থাপনের জন্য।


রোকেয়া প্রাচী : অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। আপনাকে (শব্দযন্ত্রের অপারেটরকে লক্ষ্য করে) বিশেষ ধন্যবাদ, আমার সাউন্ডের যন্ত্রটা ঠিক করে দেওয়ার জন্য। কারণ আপনার সাহায্য ছাড়া আমি অন্যদের কাছে ঠিক মতো পৌঁছাতে পারবো না। এক বছর আগে আমার আসার কথা ছিলো। কিন্তু আসা হয়নি। এবার মনে মনে ভাবছিলাম, গতবার যেহেতু আসা হয়নি, এবার হবে তো? তখনই মামুন হায়দার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমিও মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম, এখানে আসার জন্য। এখানে আপনাদের প্রত্যাশা কতোটা পূরণ করতে পারবো জানি না; কিন্তু আপনাদের সঙ্গে সময় কাটানোর আকাক্সক্ষাটা আমার অনেক তীব্র ছিলো নানা কারণে। কারণ আমি আপনাদের কথা অনেক শুনেছি। সেই শোনা থেকে আপনাদের চর্চার কথা জেনেছি। সে কারণেই আমার মনে হয়, আর দশটা জায়গায় গিয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলার চেয়ে এই জায়গার অভিজ্ঞতাটা আমার ভিন্ন হবে। তো, অনেক ধন্যবাদ মামুনকে এবং ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সবাইকে।


আমার জন্য নির্ধারিত বিষয় ‘অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’। আমি জানি না, এখানে কোনো অভিনেতা রয়েছেন কি না। তিনি যেকোনো মাধ্যমের অভিনেতা হতে পারেন। তা যে মাধ্যমেরই থাকেন না কেনো, অভিনয় না করলেও পেশাদারিত্ব ভীষণ জরুরি; সে আপনি যে জায়গায় কাজ করেন না কেনো। যিনি এই সাউন্ডের যন্ত্রটা ঠিক করে দিলেন, তিনি যদি তার কাজে পেশাদার না হন, তাহলে আমি আপনাদের কাছে পৌঁছাতে পারবো না। সে কারণেই আমার মনে হয়, কী অভিনয়ের শিল্পী, কী গানের শিল্পী, কী কবিতার শিল্পী, কী শিক্ষক, কী সাংবাদিক কিংবা একজন ব্যক্তিমানুষের পেশাদারিত্ব ভীষণ প্রয়োজন। ঘরে যে মানুষটি থাকেন তার জন্যও পেশাদারিত্বের প্রয়োজন রয়েছে। যিনি পর্দার সামনে কিংবা পর্দার পিছনে তার জন্যও পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। অর্থাৎ একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। পেশাদারিত্ব অবশ্যই থাকতে হবে। একজন ভালো অভিনয়শিল্পী, গানের শিল্পী যদি তার কাজের ক্ষেত্রে পেশাদারি না হন, তাহলে তার শিল্পীসত্তা একসময় মুখ থুবড়ে পড়বে। তাহলে শুরুতেই পেশাদারিত্বটা কী, সেটা নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি। কিংবা অভিনয় নিয়েও কথা বলতে পারি। অভিনয় নিয়ে বরং আমি আগে কথা বলি।


অভিনয় কী? কেনো আমরা বলি অভিনয়? অভিনয় শব্দটা ব্যবহার করছি কেনো? এই প্রশ্নগুলো নিশ্চয় সবার মনে আছে। আমার এতো বছর কাজ করার পরও মনে হয়, কেনো অভিনয় করছি? অভিনয়শিল্পী, এই শব্দটা আমার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এর মানে হলো, যিনি আমাকে দেখেন, তিনি দেখছেন আমি একটা চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তার কাছে উপস্থাপন করছি। তিনি কিন্তু জানেন, পর্দায় বা মঞ্চে যে চরিত্রে আমাকে দেখছেন আমি সে চরিত্র নই। কারণ তিনি কাস্টিং লিস্ট দেখেন অমুক অভিনীত। এই মঞ্চে অমুক অমুক অভিনয় করছেন। সব দর্শক জানেন, শ্রোতারা জানেন এই সিনেমা, মঞ্চ, নাটকে এই এই অভিনেতা-অভিনেত্রী কাজ করছেন। বিশ্বাসযোগ্য করে দর্শক এটা দেখছেন; তার কাছে হয়তো এটা অভিনয়, কিন্তু আমার কাছেও কি সেটা অভিনয়? কখনোই না। আমি অভিনয় করতে পারি না। আমি যদি অভিনয় করি তাহলে ওই চরিত্রের সঙ্গে আমার যে বিশ্বাসযোগ্যতার সম্পর্ক সেটা ব্যাহত হবে। কিন্তু দর্শক তো অভিনয়টাই দেখতে এসেছে। দর্শক ভালো অভিনয় দেখতে চায়। দর্শক বলে, উনার অভিনয়টা খুব খারাপ, উনি অনেক বাজে লোক, উনি অনেক অসাধারণ। দর্শক নানান চরিত্রের বিশেষণে তাকে বিশেষায়িত করছে। কিন্তু আমি আসলে একটা মিথ্যা চরিত্রকে ধারণ করছি, কীভাবে করছি? তাহলে সেই চরিত্রটা আসলে কে?


আমি অদেখা-অচেনা-অপরিচিত একটা মানুষকে আমার কাছে নিয়ে আসছি। এবং সেই মানুষটাকে দর্শকের কাছেও পৌঁছে দিচ্ছি। সেই মানুষটার জন্য দর্শক কষ্ট পাচ্ছে, তার প্রতি ভালোবাসা হচ্ছে, মায়া লাগছে এবং দর্শকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। নায়িকার জন্য অনেক দর্শক পাগল হয়ে যায়। অনেক মায়ের কষ্ট হয় সেই বাচ্চাটা মারা গেলে। অনেক তরুণের মধ্যে যুদ্ধের স্পৃহা জেগে ওঠে, যখন হিরো ভিলেনকে মেরে ফেলে। তাহলে এগুলো কী করে সম্ভব? অভিনয়টা কী করে অভিনয় হয়ে উঠছে?


আসলে ভালো অভিনয়, মন্দ অভিনয় বলে কিছু নেই; অভিনয় হচ্ছে একটা বিহেভিয়ার। আমি একটা চরিত্রের মতো কথা বলছি, হাঁটছি। তাহলে চরিত্রের মতোটা কী? আসলে চরিত্রের মতো করেও কিন্তু কিছু নেই। চরিত্র চরিত্রই। অর্থাৎ একজন স্ক্রিপ্ট-রাইটার চরিত্রের জন্ম দিয়েছেন, ডিরেক্টর সেই চরিত্রকে অনুমোদন করেছেন। কিন্তু স্ক্রিপ্ট-রাইটার একটি চরিত্রের জন্ম দিলেই তার জন্মটা পরিপূর্ণ হয় না। একজন পরিচালককে সেই চরিত্রটি অনুমোদন করতে হয়। অর্থাৎ চরিত্রটিকে একজন পরিচালক যেমন করে দেখতে চান-সেটাই হচ্ছে চরিত্রের কাঠামো। আর একজন শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে, তিনি সেখানে ভারপ্রাপ্ত। সেই চরিত্রটিকে, সেই ইমেজটিকে গ্রহণ করে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর জন্য আমি একজন ভারপ্রাপ্ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত; তার দৃষ্টিতে হয়তো দায়িত্বশীল কেউ। যদি আমি দায়িত্বের সঙ্গে আমার কাজটি ফুলফিল করতে পারি, তাহলে যে চরিত্রটা উনি আমাকে দিলেন, ওই চরিত্রটা একটা অবয়ব পাবে এবং তখন আমি ভালো অভিনয়ের স্বীকৃতিটা পাবো।


আমি রোকেয়া প্রাচী মনে করলাম, ডিরেক্টর যা খুশি ভেবেছেন তাতে আমার কী; আমি আমার মতো করে চরিত্রটাকে ফুটিয়ে তুলবো, এর কোনোই সুযোগ নেই। একজন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল কর্মীর দায়িত্ব হচ্ছে পরিচালক যেমন করে চরিত্রটিকে দেখতে চান, তেমন করে ধারণ করা। চরিত্রটিকে নিজের মধ্যে নিয়ে যাওয়া। অনেকটা একজন মা যেমন করে সন্তান ধারণ করেন, তেমন করে; একেবারে প্রথম দিন থেকে শুরু করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানো পর্যন্ত। তার মানে এখানে কিন্তু আমার অভিনয়ের কোনো সুযোগ নেই। একজন পরিচালক ভাবলেন এই চরিত্রের বয়স হবে ৩৫-৪০ বছর। তাহলে আমার পর্দায় বয়স হতে হবে ৩৫-৪০ বছর। আমার সত্যিকার বয়স যাই হোক না কেনো, দর্শককে বিশ্বাস করাতে হবে আমার বয়স ৩৫-৪০ বছর। সেটা আমি মোটা হয়ে করবো, নাকি চিকন হয়ে করবো, আমার হেয়ার স্টাইল দিয়ে করবো, নাকি কস্টিউম ডিজাইন দিয়ে করবো-এটাই হচ্ছে পরিকল্পনা। পরিচালক ভাবলেন এই চরিত্রের গায়ের রঙ হবে চাপা। তাহলে সেরকমই হতে হবে। পরিচালক ভাবলেন, এই মেয়েটির চুল হবে সোজা, চুলটা সোজাই হতে হবে। চরিত্রের কাঠামোতে যদি মেরুদণ্ডের সমস্যা থাকে, তাহলে মেরুদণ্ডের সমস্যা নিয়ে সে কেমন করে হাঁটবে-নিশ্চয় সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাঁটবে না। চরিত্রের একটু অ্যাজমার প্রবলেম রয়েছে, তাহলে সে কেমন করে কথা বলবে? তার কথার মধ্যে অনেক পজ থাকবে, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কিছু সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যাও থাকবে। চরিত্রের কাহিনি বলছে, এই চরিত্রের সোশাল স্ট্যাটাস মধ্যবিত্ত। তাহলে তার পোশাক, চলন, বিহেভিয়ার, ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ-সেরকমই হবে।


গল্পের দৃশ্যায়ণের মধ্যে আছে, চরিত্রটি খুব উঁচু করে কথা বলবে, একজনের মেরুদণ্ডের সমস্যা, একটু শ্বাসকষ্ট, গায়ের রঙ একটু চাপা, মধ্যবিত্ত, একটু চাপা স্বভাবের-এখন তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা এক্সপ্রেশন কেমন হবে? এই বিষয়গুলো বা অঙ্গগুলো ঠিক করার দায়িত্ব যে অভিনেতাকে এর জন্য নিয়োগ করা হয়েছে তার; সে তার ভারপ্রাপ্ত। আমি মনে করি না, একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী যখন স্ক্রিপ্ট পেয়ে যায় কিংবা যখন তাকে বলা হয় এই চরিত্রটি আপনাকে দিলাম, পরের কোনো চরিত্রেই সে অভিনেতা হয়ে গেছে। এটা বলার কোনো কারণ নেই। আমরা যখন কোথাও চাকরি করি, তখন তো আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাই না? অভিনয় অনেকটা সেরকম আমার কাছে। এটা আমার অভিমত, এটা অঙ্কের হিসাবের মতো। আপনারা হয়তো আমাকে পরে প্রশ্ন করতে পারেন, যদি সবই অঙ্ক হয়, তাহলে ইমোশনটা কোথায়? তাহলে আর কিছু কি নেই, সবই কি অঙ্ক?


হ্যাঁ, এ অঙ্কগুলো সত্য। এতোক্ষণ আমরা তো অঙ্ক দেখলাম, বাইরের একটা অবয়ব দেখলাম। এখন এই মানুষটার মনের খবরটাও তো আমাকে নিতে হবে। কারণ একজন মানুষ বা একটা চরিত্রের মনের এবং বাইরের দুটি সত্তাই থাকবে। তাহলে তার মনটা কেমন? ইমোশনটা কেমন? ইমোশন চরিত্রের অঙ্গ, তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজের অঙ্গ। এই অঙ্গগুলো একজন শিল্পীর নিজস্ব প্রক্রিয়া। এটাকে বলা যায় এক্সসারসাইজ, শিল্পীর প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতিটা কেউ এক সপ্তাহ ধরে নেয়, কেউ একমাস ধরে করে, কেউ ছয় মাস ধরে করে, আবার কেউ এক বছর ধরে করে। এখন ধরুন, আমি একটা সিনেমার জন্য নির্বাচিত হলাম। সিনেমার অঙ্কগুলো আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো। আমি বুঝে গেলাম। আমি অঙ্কটা নিয়ে খুব পড়াশোনাও করলাম। চরিত্রটা কেমন হবে আমি বুঝেও গেলাম। সব বোঝার তিন দিন পর আমি আরেকটা চরিত্রে অভিনয় করলাম চার দিন। তারপর আবার পাঁচ দিন আরেকটা চরিত্রে অভিনয় করলাম। তারপর আবার আমি তিন দিন চলে গেলাম আরেকটা কাজ করতে। তারপর আবার দুই দিন চলে গেলাম আরেকটা কাজ করতে। এই যে চরিত্রটার সঙ্গে আমার যে একটা বন্ধুত্ব হলো, চেনাপরিচয় হলো, সেটা কিন্তু মাঝখানের এই ২০ দিনে-আমি যখন অন্য চরিত্রের মধ্যে চলে গেলাম তখন-কিন্তু ভাটা পড়ে গেলো। তাই না? আজকে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো, আমি যদি আগামী ছয় মাস হাই-হ্যালো না করি, সম্পর্কের মাত্রা বাড়বে? কখনোই বাড়বে না। চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের একটা প্রয়োজন রয়েছে। চরিত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হবে, চেনাপরিচয় হবে, দেখা হবে। আমরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে গল্প করবো; অনেকটা বন্ধুত্বের মতো চা-কফি খাওয়া হবে, হাত ধরাধরি হবে, মনের মধ্যে শিহরণ হবে, প্রেম হবে, ভালোবাসা হবে। চরিত্রটা আমার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ব্যাঙ-ব্যাঙ করবে; আমাকে বিরক্ত করবে, আমার সঙ্গে থাকবে; তবেই চরিত্রটা আমার হবে। তারপরই আপনি আমার মধ্যে চরিত্রটা দেখতে পাবেন। চরিত্রটা যদি আমাকে বিরক্ত না করে, অন্য মানুষের কাছ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন না করে দেয়, তাহলে কী হবে? আমরা যখন গভীর প্রেমে পড়ে যাই, তখন কী হয়? এখানে সব প্রেমে পড়া বয়সের ছেলে-মেয়েরা আছেন। প্রেমে পড়ার যদিও কোনো বয়স নেই, যে কেউ যেকোনো বয়সে প্রেমে পড়তে পারে। প্রেমে পড়লে কী হয়, আমরা সবকিছু ছেড়ে দিই না? একদম আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে প্রেমে পড়ি, সবকিছু ভুলে যাই না? যাই কি? হ্যাঁ, বলেন না কেনো? এটাই তো সত্যি প্রেম, তাই না? কাজেই চরিত্রের সঙ্গে যদি আমার আকাশ-বাতাস কাঁপানো প্রেম না হয়, চরিত্রটা আসবেই না; এটাই সত্যি।


আমরা যেমন কোথাও গভীর অবগাহনে চলে যাই, তেমনই সেই চরিত্রের সঙ্গে প্রেমটাকেও গভীর অবগাহনে নিয়ে যেতে হবে। সারাক্ষণ চরিত্রটা আমাকে টানবে, অন্য কাজ থেকে আমাকে সরিয়ে নিয়ে আসবে। আমাকে ত্যাগী করতে বাধ্য করবে-চুল কেটো না, ভ্রু প্ল্যাগ করো না, নেইলপলিশ লাগিও না, আমরা যে নখের অনেক রকম স্টাইল করি, সেটা করো না। নখ বড়ো করো না, নিজেকে আরো প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলো, অন্য কাজ থেকে আলাদা করে ফেলো। সে আমাকে হাত ধরে টানবে। প্রেমে পড়লে তো অনেক মেয়ে চাকরি ছেড়ে দেয়, পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, দেয় না? অনেক ছেলে বাবা-মাকে ছেড়ে দেয়, দেয় না? এগুলো সত্যি কথা। চরিত্রের সঙ্গে প্রেমটা আরো ভয়ঙ্কর! যদি আপনার প্রেম গভীর হয়, আপনার চেহারা পাল্টে যাবে। তাকে আপনার সঙ্গে, আপনার ঘরে রাতে আবিষ্কার করবেন, সকালে আবিষ্কার করবেন, দিনে আবিষ্কার করবেন। সে আপনাকে সব খাবার খেতে দিবে না। চরিত্রটা যদি আপনাকে বলে, নো, এই ফুডটা তোমার জন্য না, আপনি খেতে পারবেন না। এটাই সত্যি। এই সত্যিটার সঙ্গে যেদিন পরিচয় হবে, সেদিনই দর্শক দেখতে পাবে একটা ভালো অভিনয়।


শিল্পীর কাজ হবে সেই চরিত্রটার সঙ্গে বসবাস, অবগাহন করা। এছাড়া চরিত্রটা হয়তো স্ক্রিনে ৩৫, ৫০, ৮৫ ডিগ্রি স্কেলে নড়াচড়া করবে। আপনারা বলবেন, রোকেয়া প্রাচী আপা; আপনারা আমাকে খুঁজে পাবেন, চরিত্রকে নয়। এ কারণে আমরা বলি, অভিনয়টা ভালো হয়নি; কিংবা অভিনয়টা খুব ভালো। অভিনয় কখনো খুব ভালো হয় না, অভিনয় কখনো খুব খারাপ হয় না। শিল্পী তার দায়িত্বে ফেল করে যায়। ধরেন, এতোকিছু করার পর আপনার জীবনে একটা প্রচণ্ড দুর্ঘটনা ঘটে গেলো। এমন কেউ মারা গেলো, এমন কোনো বিপর্যয় ঘটলো, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। কিন্তু আপনার বাবা মারা গেলে কি আপনি প্রেমিকের হাত ছেড়ে দেন? আপনার স্বামীর হাত ছেড়ে দেন? মা তার সন্তানের হাত ছেড়ে দেয়? দেয় না। তাহলে জীবনে দুর্ঘটনা, বিপর্যয় বা যেকোনো ঘটনাই ঘটুক না কেনো, সেটা তার আরেকটা পার্ট। আর চরিত্রের সঙ্গে তার প্রেম, সেটা তার শিল্পের আরেকটা পার্ট। এ দুটো পার্ট রেললাইনের মতো একসঙ্গে চলবে। জীবনে যেটাই ঘটুক, রাতে আপনি বিছানায় স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলবেন। চোখের পানি মুছে সকালবেলা যখন সেটে যাবেন, আপনি তখন সেই চরিত্র; এটাই সত্যি। তাই যদি প্রকৃত অর্থে চরিত্রের সঙ্গে সত্যিকারের সম্পর্কটা তৈরি হয়, ডুব দিতে হবে গভীর সাগরে। চরিত্রকে ভালোবাসতে হবে।


আপনি চরিত্রকে দেখতে পেলে দর্শকও আপনার মধ্যে তাকে দেখবে। আপনি দেখতে না পেলে দর্শক কোনোদিনও দেখবে না। দেখতে দেখতে এমন একটা অবস্থা হবে, আপনি দেখতে বাধ্য হবেন চরিত্রটা আমি। যখন আপনি এটা বলতে পারবেন, তখন সামনে যারা দেখবে তারাও বিশ্বাস করবে। কেননা আপনি তো একটা মিথ্যাকে উপস্থাপন করছেন, চরিত্র তো আসলে আপনি না। চরিত্রগুলোকে যদি আপনি সত্য করে নেন, জীবনের অংশ করে নেন, তবেই সেই চরিত্রটা সত্যি হবে, বাস্তব হবে আমার চোখে, আমার ভাষায়।


এবার পেশাদারিত্বের কথায় আসি। পেশাদারিত্বটা আসলে কী? পেশাদারিত্ব কি এ রকম যে, একটা ছবি তুললাম এতো টাকা নিবো, একদিন শুটে গেলে আমাকে এতো টাকা দিতে হবে? কোনোভাবেই না। সেটা অন্য জিনিস। সেই পেশাদারিত্ব আর এই পেশাদারিত্বের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য আছে। পেশাদারিত্ব মানে হচ্ছে, এতোক্ষণ আমি যে কথাগুলো বললাম, সেই কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা। আমি যদি একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হতে চাই, তাহলে আমার পেশাদারিত্ব হবে একজন নিউ-কামার ডিরেক্টরকেও সেরকমই সম্মান করা, যেমনটা একজন প্রতিষ্ঠিত বা সিনিয়রকে করতে হয়। একজন শিল্পীর পেশাদারিত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে, তার পরিচালকই সব। পরিচালকের বাইরে তার একটা নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না চরিত্রের জন্য-এটা হচ্ছে প্রথম শর্ত। আমার পেশাদারিত্ব হচ্ছে, সেই শর্তটাকে ধারণ করা।


জীবনে আসলে ডিসিপ্লিনের কোনো বিকল্প নেই। একজন শিল্পীর পেশাদারিত্ব কি শুধু সেটে? না। একজন শিল্পীর প্রতিদিনের জীবনে সেটাকে আনাই হচ্ছে পেশাদারিত্বের প্রথম শর্ত। আমি ঘুম থেকে উঠলাম দুপুর ১২টায়, ঘুমালাম রাত তিনটায়, এটা পেশাদারিত্ব নয়। একজন ক্রিকেট প্লেয়ারকে আমরা অনেক সময় বলি, আরে ও তো ফিট না। ফিটনেস কি তাহলে শুধু ক্রিকেট প্লেয়ার আর ফুটবল প্লেয়ারের? না। ফিটনেস কিন্তু একজন সাংবাদিকের, একজন শিক্ষকের, একজন অভিনেতার, একজন গানের শিল্পীর, একজন কো-অর্ডিনেটরের-সবার দরকার। একজন ফটোগ্রাফারেরও। কাজেই আমার প্রতিদিনের জীবন কোন গতিতে চলে, কোন ধারাবাহিকতায় চলে, তার ওপর কিন্তু নির্ভর করছে আমার সমস্ত ক্যারিয়ার এবং আমি পেশাদার কি না সেটাও।


একজন পেশাদার মানুষের প্রতিদিনের জীবন হবে ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা। তাহলে কি সে যন্ত্রমানব? মোটেও না। কিন্তু পেশাদারিত্বের সঙ্গে সে যখন তার জীবনকে সাজাবে, তখন এই সাজানো জীবন তাকে একটা সুনির্দিষ্ট দিক-নিদের্শনা দিতে পারবে। এবং সেই দিক-নিদের্শনাটা হবে শৈল্পিক, মৌলিক ও সংস্কারপূর্ণ। একজন শিল্পী যদি বেহিসাবি, এলোমেলো ও মিসফিট হয়-মিসফিট শব্দটা বলছি আমি এ কারণে, আমাকে একটা চরিত্রের জন্য মনোনীত করা হলো, কিন্তু সেই চরিত্রের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন, সেটা কেনো সম্ভব নয়? একজন অভিনেতার যেমন ভয়েস ঠিক থাকতে হবে, তেমনই তার ফিজিকাল ফিটনেসও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিনেতার স্বপ্রক্ষেপণ খুব গুরুত্বপূর্ণ, এনার্জি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার এনার্জি নেই, আমি একটু পর পর হাঁপিয়ে যাচ্ছি, আমার একটু গরমে হাইপারটেনশন হয়, একটু রাত হয়ে গেলে সমস্যা হচ্ছে, মাসেল ফুল করছে, কাশি হচ্ছে-সেটে এই বিষয়গুলো বিরক্তিকর। এগুলো কীভাবে ঠিক হবে? শুধু মুরগি খেলে? নিশ্চয়ই না। এটি হচ্ছে প্রতিদিনের জীবন যাপনের প্রণালির ফলাফল।


একজন শিল্পী বয়স ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাববেন, এটা খেলার মাঠ। অতিরিক্ত প্লেয়ার তো সবাই চেনেন, তাই না? খেলার মাঠে অতিরিক্ত প্লেয়ার থাকে। অতিরিক্ত প্লেয়ার মানে কিন্তু অতিরিক্ত অভিনেতা না। অতিরিক্ত প্লেয়ার মানে হচ্ছে, যেকোনো সময় তাকে ডাকা হবে, ডাকা মানে সে ওই মুহূর্তে মাঠে নামবে এবং গোল করবে। তাই অতিরিক্ত প্লেয়ার মানে হচ্ছে, স্ট্রাইকার যেমন দায়িত্বশীল একজন, সেও তেমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার। আমরা অভিনয়শিল্পীরা অতিরিক্ত প্লেয়ারের মতো। আজকে আমার হাতে একটা সিনেমা আছে, আমি সেই সিনেমার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ধরে নিলাম, এই বছর আমার হাতে কোনো সিনেমা নেই। তাহলে কি আমি সারাদিন খাবো-দাবো, ঘুমাবো, ধুমপান করবো, অ্যালকোহল নিবো, সবজি খাবো না, ডাল খাবো না; উল্টাপাল্টা জীবন অতিবাহিত করবো? মোটেও না। আমি প্রস্তুত থাকবো, যেকোনো সময়ে যেকোনো পরিচালক আমাকে ডাকতে পারে যেকোনো চরিত্রের জন্য। কিংবা না ডাকুক। যেহেতু একজন শিল্পী হিসেবে আমি নিজেকে দাবি করছি, আমার প্রথম শর্ত হবে, আমি যতোদিন নিজেকে শিল্পী বলবো আমার জীবন যাপন প্রণালিতে আমাকে অবশ্যই ফিট থাকতে হবে। এবং এই ফিট থাকতে হলে আমার জীবন যাপনে একটা সামাজিক ডিসিপ্লিন প্রণালি রাখতে হবে। আমরা সামাজিক কেনো হয়েছি? আমরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক কিছু রিপ্রেজেন্ট করি। আমি এমন জীবন যাপন প্রণালিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম; আমাকে দেখে একজন সাধারণ মানুষ ভাববে ওহ শিল্পীরা বুঝি এ রকমই? না, তা নয়।


আমি শিল্পীদের জন্য এবং তাদের পক্ষে পজিটিভ ক্যাম্পেইন করতে পারি; কিন্তু কোনো নেগেটিভ ক্যাম্পেইন করার অধিকার আমার নেই। কাজেই সেই দায়িত্বও আমার ওপর এসে পড়ে যে, আমার জীবন যাপন প্রণালি যদি ততোখানি সুন্দর না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আমার কাছ থেকে ভুল বার্তা পাবে। অভিনয় বাদ দেন; একজন শিল্পীকে দেখে আরেকজন শেখে। একজন শিল্পী অনেক দিন সাধারণ মানুষের কাছে গল্পের উপকরণ হিসেবে থাকে। একজন শিল্পী যখন রাস্তাঘাটে কথা বলেন, তখন আরেকজন গিয়ে বলেন, ওখানে দেখলাম উনি এভাবে কথা বলছেন-শিল্পীরা এ রকমই। শিল্পীরা এ রকমই; এই পরিবেশ সৃষ্টির অধিকার আমার নেই। আমার পেশাদারিত্ব বলে, আমার দায়িত্ব হচ্ছে শিল্প, শিল্পসমাজকে রক্ষা করা, তাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন এবং তার বাইরের সামাজিক জীবন যাপনকে ধারণ করা।


আমি এখন অভিনয় করছি, হয়তো একদিন অভিনয় করবো না। তাহলে কি আমার পেশাদারিত্ব থাকবে না? নিশ্চয়ই থাকতে হবে। আমি হয়তো একদিন ডিরেকশন দিবো না, তাহলে কি আমার পেশাদারিত্ব ছেড়ে দিবো? না। আমি হয়তো শুধু মা হিসেবে থাকবো, আমি হয়তো পলিটিক্স করবো, আমি হয়তো টেলিভিশনে উপস্থাপনা করবো, একটা বুটিক শপ দিবো। এখানে কোনো পেশাদারিত্বের প্রয়োজন নেই? আছে। আমি মনে করি, পেশাদারিত্ব যেমন আমার সামাজিক দায়দায়িত্বের একটা বিষয়, তেমনই একজন শিল্পী হিসেবেও অবশ্যই আমাকে পেশাদারিত্ব বহন করতে হবে। এবং সেই পেশাদারিত্ব বহন করার জন্য আমি যদি অভিনয়শিল্পী হই, আমার প্রথম এবং শেষ পেশাদারিত্ব আমার পরিচালক, আমার ইন্ডাস্ট্রি, আমার ইউনিট অনুযায়ী চলা। সেখানে আমি কতোটা নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে আছি, সেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক আমাকে বললেন, এই চরিত্রে আপনি লিপস্টিক দিতে পারবেন না। কিন্তু আমি ধরে নিলাম, না আমাকে তো লিপস্টিক না দিলে সুন্দর লাগবে না, আমাকে তো গ্ল্যামারস লাগবে না, আমি কেনো তাহলে কম গ্ল্যামারস হবো, আমার তো সারাজীবন পড়ে আছে। এটা হচ্ছে আমার অভিনয়শিল্পী হিসেবে যেমন অসততা, তেমনই পেশাদারিত্বেও অসততা। আমি খুব ভালো অভিনয়শিল্পী কিন্তু আমার ডিরেক্টরের কথা শুনলাম না, সেটা তো আমার অসততা। কাজেই একজন অসৎ শিল্পী কখনো পেশাদার শিল্পী হতে পারে? না। সততা, নিয়ম-শৃঙ্খলা, জীবন যাপনে সুশৃঙ্খল হওয়া খুব প্রয়োজন। সেটা খাদ্যাভাসেও প্রয়োজন। পেশাদারিত্বটা ছোটো ছোটো সব বিষয়ে প্রয়োজন। আপনি আপনার প্রোডাকশন-বয়ের সঙ্গে কীভাবে কথা বলছেন, সেই আচরণটাও কিন্তু পেশাদারিত্বকে নির্দেশ করে। এটা খুবই জরুরি। কেননা ইন্ডাস্ট্রিতে আপনি একা নন। আপনি যে সেটে শুটিং করছেন, সেই সেটটা আপনার না। আপনি এটা ব্যবহার করছেন। কাজেই সেই সেটটা যখন আপনি ব্যবহার করছেন, সেটার মধ্যে দায়িত্ববান হওয়ার ডিসিপ্লিনও আপনার। সেটা আপনাকে পালন করতে হবে।


আমরা আসলে পেশাদারিত্বের ছোটো ছোটো ফর্মুলাগুলোকে বাদ দিয়ে শুধু কে কতো টাকা পাই কিংবা আমি এতো বছর কাজ করছি; ইন্ডাস্ট্রিতে তো আমি সিনিয়র তাই টাকাটা আমাকে একটু আগে দিবেন, কিংবা আমাকে আগে ছেড়ে দিবেন-এসব জায়গায় পেশাদারিত্ব দেখাই। কিন্তু সেটাই কেবল পেশাদারিত্ব নয়। সেটে আমাকে একজন ডিরেক্টর যখন ডাকবেন সকাল সাতটায়, তাহলে কেনো আবার আমাকে কল দিয়ে সেটা উনি মনে করিয়ে দিবেন। কিংবা কেনো আমি সকাল সাতটার জায়গায় ১০টার সময় যাবো। আমি জানি না এখানে উপস্থিত অনেকে হয়তো ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেন, আমি তাদের সবার ক্ষেত্রেই সময় নিয়ে এ কথা বলছি।


ধরেন, একটা দিন কোথাও কাজ করবেন বলে আপনাকে সকাল সাতটায় ডাকা হয়েছে। আপনার কাজের সময় অনুযায়ী সেটা যদি রাত ১০টায় প্যাকাপ হওয়ার কথা থাকে, আপনি ১০টার আগে বলতে পারবেন না আমাকে আগে ছাড়তে হবে। কারণ আপনি দিনটা তাকে মানে ওই ডিরেক্টরকে দিয়ে দিয়েছেন, এই দিনটা তার। আপনি অ্যাগ্রি (agree) করেছেন তার সঙ্গে। আপনি যখন তার সঙ্গে চুক্তি করবেন যে, সে আপনার ডিরেক্টর, তাহলে সারাদিনই সে আপনাকে মেকআপ নিয়ে বসিয়ে রাখার অধিকার রাখে। আপনি তাকে কিছুই বলতে পারেন না। সে মনে করতেই পারে, আজকে আমার শিল্পী মেকআপ নিয়ে চৈত্র মাসের প্রচণ্ড গরমে বসে থাকবে। অবশ্যই আপনাকে সেটা করতে হবে। আপনি বলতে পারেন না, আমি তো একজন বড়ো অভিনেত্রী, কেনো আপনি আমাকে সারাদিন মেকআপ নিয়ে বসিয়ে রেখেছেন। দিনটা তার মানে ডিরেক্টরের, ফলে সিদ্ধান্তও তার। হ্যাঁ, এই প্রক্রিয়ায় সে যদি আপনাকে এমন কোনো কাজ করতে বলে যেটা অসামাজিক, অন্যায়, রাষ্ট্রদ্রোহী-সেটা নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি পেরিফেরি, ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে থাকেন, তাহলে সেখানে পরিচালককে সম্মান দেওয়া কিংবা তার ভাবনাটাকেই সম্মান দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এটাও একধরনের পেশাদারিত্ব।


আমরা অনেক সময় চিন্তা করি, অভিনয় করে ফেললাম চরিত্রটা তো শেষ, কাজেই তারপর আর আমার দায়িত্ব নেই। কিংবা পরিচালকের সঙ্গে আমার কোনোরকমের কোনো সখ্য নেই। সেটাও ঠিক নয়। সিনেমাটা যতোদিন বেঁচে থাকবে, সেই সিনেমার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা অবিচ্ছেদ্য। কেনো এ কথা বলছি? কারণ ওই সিনেমায় আমি যা করেছি, সেটা আমি অন্য কোথাও করতে পারি না। সেই কস্টিউমটা-আমাদের এখানে কস্টিউম নিয়ে সঙ্কট আছে, সাধারণত শিল্পীরা নিজেরাই কস্টিউম দেয়-আমি অন্য কোনো সিনেমায় ব্যবহার করতে পারি না। বেশিরভাগ শিল্পী-যদিও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমি এটাকে অন্যায় বলবো না-ওই একই কস্টিউম হয়তো সে অন্য কোথাও রিপিট করে। কিন্তু উচিত হচ্ছে, যখন আমি যেই ছবিতে অভিনয় করবো, আমি সেই কস্টিউম অন্য কোথাও রিপিট করবো না। পেশাদারিত্বের এই যে জায়গাগুলো, ছোটো ছোটো হয়তো, কিন্তু যখন আপনি সবগুলো জায়গা ঘুরে আসতে পারবেন, তখন দাবি করতে পারেন আপনি একজন পেশাদার শিল্পী। এর একটা শর্তও যদি পূরণ করতে না পারেন, তাহলে পেশাদারিত্বের সংজ্ঞাটা আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আর যদি আপনি পেশাদার না হন, তাহলে কখনো প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠবেন না। কিংবা শিল্পমাধ্যমের কোনো একজন ব্যক্তি হয়ে ওঠাও খুব কঠিন। তাই আমার মনে হয়, কোনো ব্যক্তি যে মাধ্যমেই থাকুক, তাকে একশো ভাগ সেই কাজের প্রতি সৎ, নিষ্ঠাবান, আস্থাবান, দায়িত্বশীল ও অনুগত হয়ে কাজ করতে হবে। এই কাজগুলো করার ক্ষেত্রে শটকাট যে রাস্তাগুলোর কথা আমরা বলি সেগুলো ঠিক নয়। শিল্পের ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো শটকাট পথ নেই। আপনাকে পরিশ্রম করে প্রথমে অভিনয়, তারপর পেশাদারিত্ব অর্জন করতে হবে। যদি তা না হয়, যদি বিকল্প রাস্তা খুঁজতে যান, তাহলে হবে না।


এবার আমার কাজের অভিজ্ঞতায় আসি। দুখাই আমার প্রথম চলচ্চিত্র। আমি তখন মঞ্চে কাজ করতাম। তখনো টেলিভিশনে কাজ করা হয়নি। মঞ্চ থেকে সরাসরি দুখাইতে। যেহেতু আমি মঞ্চের অভিনয়শিল্পী, ফলে ভিতরে ভিতরে আমার মধ্যে একধরনের কনফিডেন্ট ছিলো-আমি তো এতো বছর মঞ্চে কাজ করেছি। মোরশেদুল ইসলাম একজন গুণী চলচ্চিত্রনির্মাতা এবং চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আমি মনে করি উনি ভীষণ ভালো একজন শিক্ষক। প্রথম দিন তিনি আমাকে বললেন, কস্টিউম পরো, চলো আমাদের সঙ্গে। প্রথম দিন ঘুরি, দ্বিতীয় দিন ঘুরি, তৃতীয় দিনও ঘুরি; খালি ঘোরাফেরাই করি। উনি আমাকে লেন্স বোঝান, লাইট বোঝান, ক্যামেরা বোঝান, ক্রেনের উপর থেকে লেন্সের কাজ বোঝান-শুটিং আর হয় না।


আমি মনে মনে একটু একটু বিরক্ত হই, আমি তো অভিনয় করতে এসেছি। আমার আজকে শুটিং নাই, কিন্তু আমি কস্টিউম পরে বসে আছি! এই রৌদ্রের মধ্যে-আমার গায়ের রঙ এমনি চাপা, আমি আরো কালো হয়ে যাচ্ছি, চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। সারাদিন ধরে কাদামাটি, পথঘাট পার হচ্ছি-প্রথম দিন না হয় ভাবলাম অ্যাডভেঞ্চার। দ্বিতীয় দিন একটু একটু অস্থির লাগছে, তাহলে আমি কী করছি? উনি আমাকে বলছেন, আসো, এদিকে আসো, এই দেখো-লেন্সে এই পারফরমেন্স। এই লেন্সের জন্য এই লাইটটা দিতে হচ্ছে। আমি লেন্সের কী বুঝি তখন! উনি বললেন, না, লেন্স বুঝতে হবে। তৃতীয় দিন উনি আমাকে ক্রেনে উঠিয়ে দিলেন, একদম পুরো ক্রেনের উপর। উনি বলছেন, ক্রেনের উপর উঠে দেখো, উপর থেকে দেখতে কেমন লাগছে? ওই পারফরমেন্সটা কী হচ্ছে? লেন্সটা বোঝো-তিনটা শটে তিন রকম লেন্স। আমার তো মাথা পুরা ঘোরে। ক্লোজে এক লেন্স, মিড শটে এক লেন্স, আবার ক্রেনের উপর এক লেন্স-এসব আমি কেনো বুঝবো?


আমি তো নিজেকে মাস্টার ভাবছি; মঞ্চে কাজ করে তো মাস্টার হয়ে গেছি! তারপরে আমার শটের দিন আমি শট্ দিলাম। উনি বললেন, খুব ভালো হয়েছে, ওকে। আচ্ছা, আরেকটা নিবো। খুব ভালো হয়েছে, ওকে। অনেক ভালো হয়েছে। আরেকটা নেবো, এইবার তুমি অনেক কিছু করবা না, শুধু রান্নাটা করবা। আমি বললাম, আচ্ছা। বললেন, এইটাও ভালো হয়েছে। তখন আমি এন জি শটও বুঝি না। এন জি শট্ মানে হচ্ছে ‘নট গুড শট্’। রাতের বেলা দেখলাম, সব গুড শট্ আমার। আর পরের দিন দেখি সবার এন জি শট্। আমার তো মন খারাপ হয়ে গেলো, কারণ আমার কোনো এন জি শট্ নাই! মোরশেদ ভাই আমাকে কিছুই বলছেন না। আমিই বললাম, আমি এতো খারাপ! তো দেখলাম সবাই হাসছে।


পরে মোরশেদ ভাই আমাকে বোঝালেন। আমার তিনটা শটের মধ্যে উনি দাগ দিলেন। আমি বললাম, দাগ দিলেন কেনো? উনি বললেন, আমি ফাইনালি এই শটটা লাগাবো। আমি বললাম, কেনো? উনি বললেন, প্রথম শটে তুমি কিছু অ্যাক্টিভিটিস করেছো, যেটা শটের জন্য প্রয়োজন নেই। এই লেন্সে ওটা কাভার করে না। আমি বললাম, সেকেন্ড শট্? উনি বললেন, সেকেন্ড শটেও তুমি এতোকিছু করেছো যে, আমি তোমার এক্সপ্রেশনটা পাইনি, কেবল অ্যাক্টিভিটিসটা পেয়েছি। আমি বললাম, তিন নম্বর? বললেন, তিন নম্বর শটে আমি সবই পেয়েছি। তো আমি বললাম, পার্থক্যটা কী?


তখন উনি আমাকে বোঝালেন, আমরা যখন কথা বলি তখন কি অনেক কিছু করি? অনেক কিছু করি না। আমরা স্ট্রেইট একটা মানুষের চোখের দিকে তাকাই, তাকিয়ে তাকে কমিউনিকেট করি। কথাটা শুধু তাকেই বলি। এবং তাকে যে আমি বলছি, এটা সেও বোঝে আমিও বুঝি। অ্যাকশন অ্যান্ড রিঅ্যাকশনটা হয়। উনি আমাকে বললেন, তোমার কিছু করার দরকার নেই; তুমি শুধু এটুকুই করো। আর যে লেন্সে আমি তোমাকে দেখছি, সেই লেন্সে তুমি হাতে কী অ্যাক্টিভিটিস করছো সেটা পাচ্ছি না। কারণ তোমাকে এতোটুকু শটে ধরে রেখেছি। কাজেই হাতটা এখানে আসছে না। তোমার ফোকাস, কনসেনট্রেশনটা শুধু এক্সপ্রেশনেই থাকতে হবে। তখন আমি বুঝলাম, অভিনয়টা আসলে এতো চিন্তা করে, কৌশল করে করার বিষয় নয়। অভিনয়টা ধারণ করতে হয়।


আমি যদি একজন মানুষকে বিশ্বাস করে কথা বলি, ইমোশনাল আদান-প্রদানটা যদি হয়, তাহলেই আমার ভিতরের মানুষটা কথা বলবে। তার ভিতরের মানুষটাও কথা বলবে। আর যদি আমার ভিতরের মানুষটা কথা না বলে, তাহলে হাত কিছু করবে, পা কিছু করবে; নানান দিকে আমার চোখ-হাত-পা নাড়াচাড়া করবে। অনেক সময় কনফিডেন্স না থাকলে আমরা হাত নিয়ে বিপদে পড়ে যাই না, হাত কোথায় রাখবো? হাত কেনো আমার চিন্তায় আসবে? যদি আমি সেই চরিত্রটার কাছে পৌঁছাতে পারি, তাহলে হাত তো কোনো ফ্যাক্ট না। এটা হচ্ছে সেই মানুষটাকে ধরা। অভিনয় করতে গেলে আমাকে বুঝতে হবে পরিচালক কোন শটটা কোন লেন্সে নিচ্ছে। অ্যাট ওয়ান পয়েন্ট একজন অভিনয়শিল্পীকে পরিচালকের সঙ্গে এই কমিউনিকেশনটাও তৈরি করে ফেলতে হবে। এখন আমি আসলে কোন শটে আছি। আমরা যদি সবাই মিলে একটা মাস্টার শটে থাকি; তখন কিন্তু আমার পা, আমার হাত, আমার শাড়ি সবকিছুই ফ্যাক্টর। আমাকে অবশ্যই তখন সবকিছুর প্রতি নজর দিতে হবে। কিন্তু যখন শুধু আমি ক্যামেরায় ক্লোজ শট্ দিচ্ছি, সেখানে কতোটা পরিমিতভাবে, কতোটা ভিতরের ইনার ফিলিংসটুকু দিতে পারি-এই টেকনিকাল জ্ঞানটুকু একজন অভিনয়শিল্পীকে সময়ে, কাজের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করে নিতে হবে। এটাও কিন্তু একজন অভিনয়শিল্পীর পেশাদারিত্ব। কারণ তিনি লেন্স, ক্যামেরার সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছেন।


শুধু চরিত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হলেই সবকিছু সম্পূর্ণ হবে না; সেই সঙ্গে ক্যামেরাকে আমার বন্ধু বানিয়ে নিতে হবে। যখন লেন্সের সঙ্গে কথা বলছি, আমি তো আসলে লুকটা লেন্সকে দিচ্ছি। কাজেই লেন্সকে যদি সেই বন্ধু ভাবতে না পারি, তাহলে যখন লেন্সের দিকে তাকাবো তখন সেই তাকানোটা তো মিথ্যা হয়ে যাবে। সে কারণে চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি আমার ক্যামেরার সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে হবে; লেন্সের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে হবে।


আমি যে সেটে কাজ করছি, ধরে নিচ্ছি এই বেডরুমটা আমার। বেডরুমের এই খাটটা আমার, খাটের হাতলটা আমার। এই ঘরটা যদি আমার হয়, তাহলে হাতলটা আমি কেমন করে ধরবো? প্রতিদিন আমি খাটে কেমন করে বসি, কেমন করে ঘুমাই, সেটা কিন্তু আমার স্পর্শ দেখেই বোঝা যাবে। আর যদি আমি হঠাৎ করে একটা বেডরুমে যাই, সেই বেডরুমটাকে স্পর্শ করি-এই দুটোর মধ্যে কিন্তু আকাশপাতাল পার্থক্য। তাহলে সেই সেট, সে ঘর, সে প্রপস-পুরো জিনিসটাকে আমার করে নিতে হবে। আমি সেই খাটটাকে যখন স্পর্শ করবো, দর্শক বুঝবে এখানে গত ৩০ বছর ঘুমিয়েছি। আমি যখন সেখানে আমার পানের বাটা ধরবো, দর্শককে বিশ্বাস করতে হবে, এই পানের বাটা অন্তত পাঁচ হাজার বার খুলেছি, পান বানিয়েছি। আমার স্পর্শ দেখে দর্শক সেটা বুঝবে।

আমরা যখন একটা নতুন মোবাইল ফোনসেট কিনি, যখন সেটা ব্রাউজ করি, তখন আমার হাতে কিন্তু জড়তা থাকে। আমি কি ঠিক বলছি? যখন ফোনটা পুরনো হয়ে যায়, আমরা কিন্তু এমন করেই (অঙ্গভঙ্গি দিয়ে বুঝিয়ে দেন) বুঝতে পারি কোথায় কী। তার মানে ফোনটার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। একটা বই যখন আমি বার বার পড়বো, তখন আমি কথা বলতে বলতে প্রয়োজনীয় পাতাটায় চলে যেতে পারবো। আর যদি নতুন কড়কড়া একটা বই হয়, আমাকে কিন্তু খুঁজতে হবে পাতাটা। কাজেই আমার সেট, আমার প্রপস, আমার হতে হবে। সিনেমায় যেটা আমার ঘর, সেটা সেট ডিজাইনারের ঘর নয়; সেটা আমার ঘর হতে হবে। যে শাড়িটা আমি পরছি, সেটা হয়তো গাউছিয়া থেকে কেনা হয়েছে। কিন্তু দর্শককে বুঝতে হবে এই শাড়িটা পরে বহু রাত আমি বিছানায় চোখের পানি ফেলেছি। এই ফিলিংসটা দর্শককে পেতে হবে। আর ওই ফিলিংসটা তখনই দর্শক পাবে, যখন ওই শাড়িটাকে আমি আমার করে নিতে পারি। এছাড়া সম্ভব নয়।


এখন একটা মজার প্রশ্ন আপনারা করতে পারেন-আমার কো-অ্যাক্টর প্রেমিক আমার সামনে, তাহলে কী সত্যি সত্যিই তার সঙ্গে প্রেম করতে হবে, নিশ্চয় না। একজনকে আমায় খুন করতে হবে, তবে কী খুন করেই প্রমাণ করবো যে, আমি শ্রেষ্ঠ খুনি, নিশ্চয় না। শিল্পীর কাজ হচ্ছে, শিল্পের মাধ্যমে জিনিসটাকে নিজের করে নেওয়া। আমার চরিত্র একটা চরিত্রকে ভালোবাসে-ভালোবাসাটা কিন্তু আমার চরিত্রের সঙ্গে সেই চরিত্রের। ধরেন, আমি আমার চরিত্রকে পরিপূর্ণভাবে তৈরি করলাম। কিন্তু আমার কো-আর্টিস্ট তিনি তার চরিত্রকে তৈরি করেননি। তখন সেই দায়ভারটা কিন্তু তার, সঙ্কটটা তার হবে। এখন এই সঙ্কট আমাদের হয়। এটা শিল্পের সঙ্কট, অভিনয়ের সঙ্কট।


সেজন্য বলেছি, সততা। আমি যদি ভালোবাসতে গিয়ে সত্যিই ভালোবেসে ফেলি, তবে তো আমি রোকেয়া প্রাচী প্রেমে পড়লাম, চরিত্রটা কিন্তু প্রেমে পড়লো না। তাহলে তো আমাকে যদি কাউকে খুন করতে বলা হয়, আমি খুন করবো। রেইপ সিনে রেইপ হয়ে যাবে! নিশ্চয় সেটা স্বাভাবিক নয়, সেটা শৈল্পিক নয়। তার মানে অভিনয়, পেশাদারিত্ব, শিল্প হচ্ছে এক্সট্রিমলি সততার জায়গা-অ্যাকশন, কানেকশন, কমিউনিকেশন, স্পনটিনিউয়াস বিহেভিয়ার। এখানে আপনি একটা মিথ্যা দিবেন, ওই মিথ্যাটাই সত্যি হয়ে পর্দায় বার বার কথা বলবে। মিথ্যা হচ্ছে সত্যির চেয়েও ভয়ঙ্কর। সত্যিও কখনো কখনো এতো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে না। কাজেই একজন অভিনয়শিল্পীকে সততা দিয়ে এই কাজটা করতে হবে। সেটা না হলে পরিচালক ব্যর্থ হন, অভিনেতারা ব্যর্থ হন, একটা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।


একটু আগে একজন বলছিলেন, উনাকে নাকি এক পরিচিত দর্শক বলেছে, এখন যে অভিনয়গুলো হয় সেগুলো ভালো লাগে না। ভালো না লাগার কারণটা কী? কারণ হচ্ছে, আমরা যারা কাজ করছি, তারা সবাই সবাইকে টাচ করছি না। আমরা সবাই সবাইকে সেই ইমোশনের জায়গায় নিতে পারছি না। যখন একটা ইমোশনাল ঘটনা ঘটছে; ধরি আমরা যদি এই মুহূর্তে শুনি, অন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা হামলা হয়েছে; কিংবা হলি আর্টিজানের কথাই বলি। সেখানকার ঘটনা দেখে আমরা সবাই চোখের পানি ফেলেছি না? সিলেটের ঘটনায় যারা মারা গেছে, তাদের জন্য কি আমাদের চোখের পানি পড়েনি? পড়েছে। তার মানে আমাদের যে ইমোশনটা সেটা ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে রিঅ্যাক্ট করেছে। সেই রিঅ্যাকশনটা যদি আমাদের মধ্যে না হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমার মনই নেই চরিত্রে, আমার মন অন্য জায়গায়।


আমি এসেছি, কস্টিউম পরেছি, মেকআপ নিয়েছি, আজকে সারাদিন কাজ শেষ করবো; তারপর চলে গেলাম। প্রতিদিন নাটক যাচ্ছে, অনেক কাজ যাচ্ছে। এমন করে করে যখন আমরা ফাঁকি দিতে থাকবো, অবহেলা করতে থাকবো, তখন দর্শক আর আমাদের কানেক্ট করবে না। কাজেই নিজের সঙ্গে আমার যেমন কানেকশন, তেমনই আমার চরিত্রের সঙ্গে, আমার কো-আর্টিস্টের সঙ্গে, আমার ইউনিটের সঙ্গে, আমার ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে-এই সম্পর্কটা বোঝা খুব জরুরি। আমি একা খুব ভালো অভিনয় করলাম, আমার অঙ্ক সব ফুলফিল করলাম, আমি অনেক ইমোশনাল পারফরমেন্স করলাম, আমি একশো ভাগ সৎ, একশো ভাগ পেশাদার অভিনয় করলাম-কিচ্ছু হবে না তাতে। কারণ আমি একা একটা সিনেমাকে, একটা নাটককে কখনোই শৈল্পিকভাবে দর্শকের কাছে নিতে পারবো না।


এটা একটা টিম-ওয়ার্ক। এই সততা, পেশাদারিত্ব টোটাল টিমের মধ্যেই থাকতে হবে। যিনি লাইটটা দিচ্ছেন-লাইটটা একটু এমন করলে এক রকম, লাইটটাকে একটু ঘুরালে আরেক রকম। এখন উনি লাইট দিচ্ছেন, কিন্তু আমি ভাবছি আমার তো ঠেকা না। আমার এতো দরকার কী? আমাকে এখানে দাঁড়াতে বলেছে, আমি এখানে দাঁড়াবো; লাইট নিয়ে ভাবনার দরকার কী? কিন্তু আমারও রেসপনসিবিলিটি আছে। উনি লাইটটা এইভাবে রেখেছেন; মানুষ তো, কোনো কারণে হয়তো এক সেন্টিমিটার এদিক-সেদিক হয়ে যেতে পারে। আমি যদি ঘুরে লাইটটাকে ব্যালেন্স করতে পারি, তাতে ক্ষতি নেই তো। বা আমি এতো ইমোশনাল হয়ে গেলাম যে, কো-আর্টিস্টকে সরিয়ে, ব্লক করে আমার পারফরমেন্সটা করছি। সেটিও কিন্তু ঠিক হলো না। কারণ আমি যখন এটা করছি, এর মধ্যে দুটো জিনিস কাজ করছে-প্রথমত, শিল্পী হিসেবে আমার অপেশাদারিত্ব এবং দ্বিতীয়ত, কো-আর্টিস্টকে একটুখানি বেকায়দায় ফেলার একটা টেকনিক। সেটা আরো ভয়ঙ্কর অসততা।


কাজেই একজন শিল্পীকে আপাদমস্তক ভাবতে হবে; আমি যখন কাজ করছি তখন আমাকে চুলচেরাভাবেই সৎ থাকতে হবে; দায়িত্বশীল থাকতে হবে। আমরা পারতপক্ষে যেটা করি, অনেক সময় চিন্তা করি না আমার কো-আর্টিস্ট যিনি আছেন, তিনি হয়তো নতুন কিংবা প্রবীণ; তিনি কী করছেন বা তাকে একটু কো-অপারেট করা দরকার আমার। আমরা হয়তো করছি না; ভাবছি আমার তো দায় পড়েনি, ইগনোর করছি। এই যে ইগনোর করছি, এটাই হচ্ছে আমার অপেশাদারিত্ব। এটা অনুচিত; এটা একধরনের ক্রাইম। কারণ যে লোকটা একটা দৃশ্যে শুধু ট্রেতে করে এক কাপ চা দিয়ে যাচ্ছে, পুরো সিনেমাতে-এটুকুই তার শট্। আমার কাজ তার কাছ থেকে চা’টা নেওয়া। এখন আমি প্রোপারলি নিলাম না, তাহলে তো বেকায়দায় পড়বে বেচারা। কাজেই আমারও কিন্তু দায়িত্ব তাকে ওখানে হেল্প করা। তার সঙ্গে সমানভাবে কমিউনিকেশনটা করা। যাতে একটা দৃশ্যের যিনি শিল্পী, তিনিও সেখানে শতভাগ দিতে পারেন। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কাজটা অবহেলা করি।


ধরেই নিচ্ছি, আমি বড়ো অভিনয়শিল্পী আর উনি একজন এক্সট্রা আর্টিস্ট। আমরা অটোমেটিকালি এই ডিসটেন্সটা তৈরি করে ফেলি। এবং সেটা পর্দায় যখন দেখি, ওই যে ডিসটেন্সটুকু আমি মনে মনে তৈরি করেছি কিংবা অবহেলা তৈরি হয়েছে, সেটা কিন্তু দর্শক দেখতে পায়। যে খালা আমার বাসায় প্রতিদিন চা দেয় আমাকে, তার সঙ্গে কী আমার কোনো সম্পর্ক নেই? অবশ্যই আছে। তাহলে পর্দায় যে খালা আমাকে চা দিচ্ছে, আমরা তার সঙ্গে সম্পর্কটা তৈরি করতে পারি না কেনো? আমরা সেখানেও একটা শ্রেণি-বৈষম্য তৈরি করি। মেইন ক্যারেক্টার বাবা, মেইন ক্যারেক্টার হিরো-এই কেমিস্ট্রিটা হিট করতে পারলেই হলো? নো। এই কেমিস্ট্রি শুধু হিরো বা মেইন আর্টিস্টের সঙ্গে না; এই কেমিস্ট্রি যে ড্রাইভার আমার গাড়ির দরজাটা খুলে দিবে তার সঙ্গেও হতে হবে। কারণ প্রতিদিন আমার ড্রাইভার গাড়ির দরজাটা খুলে দেয়, এটা কিন্তু একটা অটো সিস্টেম। গাড়িটা থামে তিনি বেরিয়ে আসেন, একটা টাইমিং থাকে কিন্তু আমাদের। এই টাইমিংটাতো আমরা রিহার্সেল করে করি না। এটা রিলেশনশিপ, এই রিলেশনশিপটা যদি প্রাত্যহিক জীবনে আমার ড্রাইভারের সঙ্গে হয়, তাহলে পর্দায় হবে না কেনো?


কিন্তু পর্দায় আমি সচেতনভাবে শ্রেণি-বৈষম্যের জায়গায় আছি, শটে আমরা কীভাবে মনোযোগ দিবো! এই যে ছোটো ছোটো জিনিস আমাদের মধ্যে কাজ করে, একজন হিউম্যান বিঙ হিসেবে ছোটো ছোটো শ্রেণি-বৈষম্য আমাদেরকে গ্রাস করে। আমরা ছোটো ছোটো জায়গাগুলোকে ইগনোর করতে থাকি। এটা আপনারা আপনাদের প্রাত্যহিক জীবনে বা অভিনয় করবার সময় প্র্যাক্টিস করে দেখবেন। এই ছোটো ছোটো জায়গাগুলো কাজ করে না। ফলে কেমিস্ট্রিটা হয় না। কিন্তু এই কেমিস্ট্রিটা হওয়া উচিত সবচাইতে বেশি। এই জায়গাগুলোতে আমরা ভীষণভাবে অন্য মানুষ হয়ে যাই। এই ইগনোরেন্সগুলো কমিয়ে ফেলতে হবে। এটাও কিন্তু একজন অভিনয়শিল্পীর দায়িত্ব। এটাও পেশাদারিত্বের মধ্যে পড়ে।


আমার মনে হয়, সব কথার বড়ো কথা হচ্ছে, মানুষ হিসেবে আপনি যদি অসাধারণ হতে পারেন-অসাধারণ মানুষ তো শুধু নোবেল পেলে হয় না-একজন ভালো মানুষ অসাধারণ মানুষ। একজন সাধারণ মানুষও অসাধারণ মানুষ। একজন সৎ মানুষই বড়ো মানুষ। সুন্দর মানুষই ভালো মানুষ। আর ভালো মানুষ না হলে অভিনয়শিল্পী, গানের শিল্পী বা যেকোনো শিল্পী হওয়াই খুব কঠিন। এবং পেশাদারিত্ব তো আরো অনেক কঠিন ব্যাপার। অনেক ধন্যবাদ। আমার মনে হয়, প্রশ্ন জমা হয়ে গেছে। আমরা প্রশ্নোত্তরে যেতে পারি। (দর্শকের হাততালি)



সঞ্চালক-১ : ধন্যবাদ, রোকেয়া প্রাচীকে তার কথা উপস্থাপনের জন্য। ইতোমধ্যে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন ভারত থেকে আগত কবি তৃপ্তি সান্ত্রা ও তার জীবনসঙ্গী মৃদুল কান্তি সরকার। মৃদুল কান্তি সরকার নকশাল আন্দোলনের একজন সারথি। আমরা তাদেরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। (দর্শকের হাততালি)

এবার আমরা আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বে চলে যাবো-সবার অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রশ্নোত্তর পর্বের প্রশ্নগুলো পৌঁছে গেছে মঞ্চে। এখন আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিবেন কথা উপস্থাপনকারী রোকেয়া প্রাচী।


তন্বী দাস, ফোকলোর বিভাগ : একজন অভিনয়শিল্পীর অভিনীত কোনো চরিত্র তার বাস্তবজীবনে কতোটুকু প্রভাব ফেলে?


রোকেয়া প্রাচী : খুব ইম্পোর্টেন্ট প্রশ্ন। অনেকখানি প্রভাব ফেলে, যদি চরিত্রের সঙ্গে তার সম্পর্কটা গভীর হয়। অনেক প্রভাব ফেলে, কারণ সেই চরিত্রটা তাকে ডিসটার্ব করে-এ কথা আগে বলেছি। আমার জীবনে এ রকম ঘটেছে, তাই আমি এটা বিশ্বাস করি। যদি চরিত্রটার সঙ্গে শিল্পীর দেখা হয়, কথা হয়, সম্পর্ক হয়; তাহলে শিল্পীর জীবনটা অনেকখানি এলোমেলো হয়ে যায়। তার কষ্ট হয়, দহন হয়। আমি যখন মাটির ময়না করেছিলাম, আমার প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছে, প্রচণ্ড। অসম্ভব স্ট্রেস যেতো আমার। আমাকে তারেক ভাই বলেছিলেন, মাটির ময়নার আয়েশা চরিত্রটা হচ্ছে এ রকম। কখনো কখনো মানুষ যখন হতাশ হয়ে যায়, সে জীবন থেকে নিজেকে উইদড্রো করে। এই উইদড্রোটা মানে কিন্তু খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেওয়া নয়, কাজকর্ম করা ছেড়ে দেওয়া নয়, একজন ভিতরের অন্তর্গত মানুষ হিসেবে নিজেকে উইদড্রো করা। এবং এটা যখন কোনো মানুষ করে, তখন তার মধ্যে অনেক ওলোটপালোট হয়ে যায়। তো মাটির ময়নার চরিত্রটা করতে গিয়ে আমি একসময় আবিষ্কার করলাম, আমার ওয়েট বাড়ছে। তারেক ভাই আমাকে বললেন, এই যে একটু একটু ওয়েট বাড়ছে এটা আমি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাই। আমার কিন্তু মাটির ময়নার সময় একটু ওয়েট বাড়লো এবং নিজেকে ছেড়ে দিলে যে উপসর্গগুলো মানুষকে ডিসটার্ব করে, আমার সেটা হয়েছে।


সেসময় আমার কারো সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগতো না। এবং বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে তখন আমার সম্পর্কটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। অনেকদিন সেই মাটির ময়নার আয়েশা থেকে বেরুতে আমার কষ্ট হয়েছে। এটা তখনই হবে, যদি চরিত্রের সঙ্গে শিল্পীর বন্ধুত্ব হয়, দেখা হয়ে যায়। দেখা না হলে এটা হবে না এবং এটা ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে। অনেক সময় অনেক শিল্পী কিন্তু চরিত্রের প্রেমে পড়ে যায়। এটা খুবই স্বাভাবিক। আমরা অনেক শিল্পীর জীবনেই এটা দেখি। আমার জীবনে মাটির ময়না একটা অদ্ভুত অধ্যায়, তখন সে চরিত্রটা আমাকে পেয়ে বসেছিলো। আমি নিজেকে খুব উইদড্রো করে ফেলেছিলাম নিজের ভিতর। আমার ওয়েট বেড়ে গিয়েছিলো। উইদড্রো করলে মানুষ যখন নিজেকে ছেড়ে দেয়, তখন একটা ওয়েটি ভাব চলে আসে। সেটা আমাকে ভুগিয়েছিলো অনেকদিন। আমি কি আপনার উত্তর দিতে পেরেছি তন্বী?


প্রদীপ দাস, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপনি পেশাদারিত্বের খাতিরে একজন শিল্পীর মতো করে জীবন যাপন করলেন। কিন্তু শিল্পীসত্তার বাইরেও তো আপনি একজন মানুষ। আপনার আর দশটা মানুষের মতো চায়ের দোকানে বসতে, পাগলামো করতে, রেস্টুরেন্টে যেতে বা খালি গলায় গাইতে ইচ্ছে করে না? শিল্পীসত্ত্বার বাইরে সেই সত্তাটাকে আপনি কীভাবে বাঁচাবেন?


রোকেয়া প্রাচী : খুবই ভালো প্রশ্ন। আমি কেনো শিল্পীসত্তার বাইরের আমার যে চরিত্র, সেটাকে বাঁচাবো না? অবশ্যই থাকবে আমার শিল্পীসত্তার বাইরের চরিত্র। আমি কিন্তু বলেছি, পেশাদারিত্ব মানে হচ্ছে জীবনাচারে আপনাকে অবশ্যই সুশৃঙ্খল একজন মানুষ হতে হবে। আমি অবশ্যই চায়ের দোকানে বসে চা খাই, গলা ছেড়ে গান গাই, বৃষ্টিতে ভিজি। কিন্তু আমি বিনা কারণে রাত জাগি না, আমি সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠি, আমি পারতপক্ষে অকারণে আড্ডাবাজি করি না, আবার কাজের জন্য আমি রাতভর জেগে থাকি। আমি এমন খাবার খাই না, যেটা একজন মানুষকে সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে ঝামেলায় ফেলে দেয়। তেমন খাবার তো ডাক্তাররাই খেতে নিষেধ করে। তেমন জীবন যাপন তো আপনাকে সুস্থ থাকার জন্য ডাক্তাররাই বলে।


কাজেই শুধু সুস্থ স্বাভাবিক জীবনাচার, সুশৃঙ্খল জীবনাচার একজন অভিনয়শিল্পীর জন্যই প্রযোজ্য নয়। আপনার সুন্দর করে বেঁচে থাকার জন্যও দরকার। আপনি যদি ঠিকঠাক খাবার না খান, আপনার কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে, আপনার প্রেসার বেড়ে যাবে, আপনার কিডনির প্রবলেম হবে। আপনি যদি রাত জাগেন, আপনার চোখের নিচে কালি পড়বে, চোখ ডেবে যাবে। একজন শিল্পীর যদি চোখের নিচে কালি পড়ে বা একজন শিল্পী যদি রাত জাগে, তার ফিজিকাল অন্য অনেক বাজে রকম উপসর্গ তৈরি হবে। আপনি অভিনয় তো দূরের কথা, একজন অন্য মানুষ হিসেবেও বাঁচতে পারবেন না।


কাজেই সুশৃঙ্খল জীবন যাপন যেমন একজন পেশাদার শিল্পী, একজন মানুষের জন্য প্রয়োজন; তেমনই খালি গলায় গান গাওয়া, চায়ের দোকানে যাওয়া, বৃষ্টিতে ভেজা, রাস্তায় বসে থাকা, গল্প করা-এগুলোও খুব স্বাভাবিক। প্রকৃতির কাছে যাওয়া, প্রকৃতির মতো হয়ে যাওয়াটাও খুব জরুরি। এগুলো কিন্তু আমি করি। সুশৃঙ্খল হওয়া মানেই একদম কঠিন-কঠোর না। সুশৃঙ্খল মানে হচ্ছে সুন্দরের মধ্যে থাকা, স্বাভাবিক স্বস্তির জীবন যাপন করা। এমন কাজ না করা, যেটা দেখে অন্য মানুষ কপাল কুঁচকে তাকাতে না পারে। পাবলিক নুইসেন্স না করা। আমি বোঝাতে পেরেছি? ধন্যবাদ।


জাহিদ হাসান তূর্য, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন অভিনয়শিল্পী কতোটা সফলতা লাভ করে?


রোকেয়া প্রাচী : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন অভিনয়শিল্পী অনেকখানি সফলতা লাভ করে, অনেকখানি। বাংলাদেশ খুব ছোটো জায়গা, পুরো মাঠটাই ফাঁকা। যেই আসছে সেই গোল করতে পারছে। সেখানে আমরা মোটামুটি সবাইকেই একশোতে ওভাররেটেড করে দিচ্ছি, অভিনয় পারুক আর না পারুক। এটা শুনতে যতোই খারাপ লাগুক। বরং এইটা যদি আপনি পুরো ভারতবর্ষ বলেন, তাহলে চায়ের ছাকনির মতো টেকা মুশকিল হয়ে যেতো। আজকে আমরা অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী। কিন্তু আপনি যদি সত্যিকার অর্থে ফিল্টার করেন, হিসাবনিকাশ করেন, তাহলে রেটিং কিন্তু খুব কম হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে সবাই অভিনয়শিল্পী হয়ে যাচ্ছে এবং সবাই ভালো নম্বর নিয়ে মোটামুটি জি পি এ ফাইভ পেয়ে যাচ্ছে। সে জি পি এ ফাইভ পাওয়ার যোগ্য হোক বা না হোক। যার উচ্চারণ ভালো নেই, সেও অভিনয় করছে; যার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ হচ্ছে না, সেও অভিনয় করছে; তার মেধা, মনোযোগ নেই, তবুও অভিনয় করছে। এটা বাংলাদেশেই সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভবটাকে পাল্টে দিতে হবে। যোগ্যতাসম্পন্ন শিল্পীদের আরো বেশি কাজ করতে হবে, আরো আসতে হবে।


নিশান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ডুব-এর কাজ ঠিকই এগোচ্ছে, পোস্টার রিলিজ হচ্ছে। এটা কি প্রচারণার নতুন কোনো রাস্তা বলে মনে হয়? ইরফান খানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা যদি কিছু বলেন।


রোকেয়া প্রাচী : অনেক ধন্যবাদ। এই প্রশ্নটা আসলে একজন সাংবাদিকের, বোঝাই যাচ্ছে (হাসি)। সাংবাদিক হিসেবে একদম শতভাগ কারেক্ট জায়গায় প্রশ্ন করেছেন। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে ডুব-এর কাজ এগোচ্ছে। আমি শব্দটার সঙ্গে একমত নই। কোনো প্রতিকূলতাই নেই। বাংলাদেশে যেকোনো প্রচার-প্রচারণাই সিনেমার জন্য পজিটিভ। কাজেই প্রতিকূলতা শব্দটা এখানে যাচ্ছে না। বরং যা কিছু ঘটেছে সব ডুব-এর জন্য পজিটিভ। আর সবকিছু নিয়ে কথা হবেই। কথা হওয়া মানেই বেঁচে থাকা, কথা হওয়া মানেই গতি। কথা বন্ধ মানে তো মৃত্যু। কথা হবে, ডিবেট হবে, তারপরে একটা পর্যায় মানুষ যাবে। সমাজে এখন সবাই কথা বলছে, প্রশ্ন করছে-এটা একটা ভালো দিক।


আর ইরফান খানের সঙ্গে অভিনয় করার অভিজ্ঞতার কথাটা ভালো প্রশ্ন। বলার অপেক্ষাই রাখে না ইরফান খান এখন সারা পৃথিবীতে খুব বড়ো একজন অসাধারণ মাপের অভিনয়শিল্পী। তার সঙ্গে আমার চরিত্র ছিলো তার স্ত্রীর। ইরফানের সঙ্গে পর্দায় জুটি হয়ে কাজ করতে আমার অসাধারণ লেগেছে। তিনি ভীষণ, ভীষণ রকমের পারফেকশনিস্ট। যেটা আমরা কথার কথা হিসেবে বলি। উনি হচ্ছেন আসলেই পারফেকশনিস্ট। পুরো শুটিং সময়ে উনার কেবল একটা দিকেই নজর ছিলো-সেটা হচ্ছে ওনার গেটআপ, মেকআপ, কস্টিউম, চরিত্র ও পারফরমেন্সটা কোন স্টাইলে হবে। এর বাইরে ওনার কোনো মনোযোগ ছিলো না। এটাকেই বলে প্রফেশনালিজম।


উনি হান্ড্রেড পারসেন্ট অনেস্ট ছিলেন, হান্ড্রেড পারসেন্ট পারফেকশনিস্ট ছিলেন এবং নিজের সবটুকু হান্ড্রেড পারসেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এবং কো-আর্টিস্টের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে সহযোগিতা করেছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু আসলে করার নেই। এটুকু করতে পারলেই হয়। এবং এটাই হচ্ছে শিল্পীর কাজ, উনি এটাই হান্ড্রেড পার্সেন্ট করেছেন। আমাদের উচিত এটুকুই করা। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি শিখেছি ওনার কাছে থেকে কীভাবে হান্ড্রেড পারসেন্ট দেওয়া এবং নেওয়া যায়। খুবই ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। আর উনি তো ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের পারফরমার। আমরা যখন কোরাস গাই, যে স্কেলটা হয়, সেই স্কেলেই কিন্তু সবাইকে গাইতে হবে। কেউ বি-ফ্ল্যাটে, কেউ জি-শার্পে গেলে হবে না। তো ইরফান খান যদি বি-ফ্ল্যাটে অভিনয় করেন, আমার তো বি-ফ্ল্যাটেই যেতে হবে। আমি চেষ্টা করেছি উনার সঙ্গে অ্যাকশন-রিঅ্যাকশনটা করার। উনাকে কমিউনিকেট করার এবং সেটা হান্ড্রেড পারসেন্ট অনেস্টলি। ডুব করেও আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। ডুব-এর চরিত্রটা আমাকে অনেক ভুগিয়েছে, অনেক। ডুব-এর চরিত্রটা খুবই ইনার মনস্তাত্ত্বিক টাইপের একটা চরিত্র ছিলো। সেই চরিত্রটাও আমাকে অনেকদিন ঘুমাতে দেয়নি, কষ্ট দিয়েছে।


কিছু কিছু চরিত্রের ভিতর নারীসত্তা থাকে, কিছু কিছু চরিত্রের ভিতর নারীসত্তার অপমান থাকে। আমি ওই চরিত্রটা যখন করবো, তখন ওই অপমানটা আমাকে স্পর্শ করে, সেটা আমাকে কষ্ট দেয়। ডুব করার সময় আমি পর্দার সামনে যেমন কেঁদেছি, পর্দার পিছনেও আমার কান্না পেয়েছে। কারণ চরিত্রটার ভিতরে কান্না ছিলো। এটা আমার খুব ভালো অভিজ্ঞতা।


মাসুদ চৌধুরী, শিক্ষক, চারুকলা বিভাগ : অভিনয় ও পেশাদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবিকার বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন?


রোকেয়া প্রাচী : জি স্যার, এটা খুব ভালো প্রশ্ন। জীবিকার প্রশ্ন হচ্ছে আমার রুটিরুজির জায়গা। সেখান থেকে আমার রুটিরুজি হবে। আমার কিছু অর্থনৈতিক সাপোর্ট আসবে। কিন্তু সেটাই আমার পেশাদারিত্ব নয়। আমার পেশাদারিত্ব হচ্ছে, আমি সততা দিয়ে দায়িত্বের সঙ্গে কাজটি করবো। আর দায়িত্ব ও সততার সঙ্গে কাজটি করতে পারছি বলেই আমি কিছু টাকা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি। টাকা অর্জন করার জন্য কিন্তু আমি দায়িত্বের সঙ্গে অভিনয়টা করছি না। আমি দায়িত্ব নিয়ে ভালোভাবে আমার কাজটা করতে পেরেছি বলেই আমাকে আজকে মানুষ এই কাজটা করবার জন্য একটু সম্মান করে, ভালোবাসে এবং কাজটা করে আমি একটু পয়সা পাই। এটাই হচ্ছে পেশাদারিত্বের সঙ্গে আমার জীবিকার সম্পর্ক। আমি যদি ভালোবেসে হান্ড্রেড পারসেন্ট দায়িত্ব নিয়ে কাজটা না করতাম, আমার যদি এই পেশাদারিত্ব ঠিক না থাকতো, আমার জীবিকা মার খেতো টুডে অর টুমোরো।


তাছাড়া বাংলাদেশে জীবিকা হিসেবে অভিনয়কে বেছে নেওয়ার বাস্তবতা একশো ভাগ রয়েছে। বাংলাদেশই একমাত্র জায়গা যেখানে যে কেউই অভিনয় করে মিনিমাম দু’হাজার টাকা ইনকাম করতে পারে, যেটা ভারতে সম্ভব না। আপনি যদি কলকাতাও যান, তাহলে আপনাকে যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে, অ্যাক্টরস গিল্ডের মেম্বার হয়ে তারপরে অভিনয় করতে হবে। আর বাংলাদেশে, যে কেউ! আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে বলছি, যে কেউ যেকোনো ডিরেক্টরের কাছে গিয়ে একটা পাসিং শট্ দিয়ে মিনিমাম এক হাজার টাকা পেতে পারে। বাংলাদেশেই সম্ভব অভিনয়কে জীবিকা হিসেবে নেওয়ার। এটা বলবো আমাদের বাংলাদেশের একধরনের সুবিধা, যেটা ভবিষ্যতে গিয়ে অসুবিধায় পর্যবসিত হয়।


(চলবে)


rokeyarachylife@gmail.com

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন