Magic Lanthon

               

নাজমুল রানা

প্রকাশিত ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চতুর গৌতমের অলীক বাংলা-প্রেম নিয়ে ‘শঙ্খচিল’

নাজমুল রানা


ক্ষত আর শুকায় না


সবাই সবার মতো গুছিয়ে নিয়েছে, নতুন করে সংসার পেতেছে পুরনো শালিক। কোথাও যেনো আর কোনো ক্ষত নেই, সব খেয়ে ফেলেছে ইতিহাস। এমন একসময় প্রশ্ন জাগে মনে, আসলেই কি সব ক্ষত মুছে ফেলা যায়, কালের কালিমা দিয়ে লুকানো যায় সব দাগ? সবাই সবার মতো সবকিছু গুছিয়ে নিলেও অগোছালো থেকে গেছে অনেক কিছু। দেশভাগ তেমনই অগোছালো এক বিমূর্ত বেদনার নাম, এর ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ, তা বাড়ছেও দিনকে দিন। ৪৭-এর পচন এখন এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, অঙ্গপ্রতঙ্গ কেটে ফেলেও এ ঘাঁ থেকে নিস্তার নেই। তাই ‘ইতিহাসের অপরাধে’ একের পর এক ফেলানি খাতুন ঝুলছে কাঁটাতারে, বাড়ছে একেকটা দীর্ঘশ্বাস।


দেশভাগ নিয়ে কথা বলতে গেলেই বিভাজিত হৃদয়ে আরেকটা প্রশ্নের অনুরণন খেলে যায়, তৎকালীন প্রেক্ষাপটে দেশভাগ ছাড়া আদৌ কোনো উপায় ছিলো কি? এখন যারা দেশভাগ নিয়ে কাঁদছি; এপার বাংলা ওপার বাংলা বলে যপমাল্য যপছি; রাজনীতির ছকে নানাভাবে চলচ্চিত্র, গ্রন্থ, কবিতা কিংবা গল্পে বাংলা-প্রেম বিক্রি করছি; তারা কিংবা তাদের পূর্বসূরিরা এ বিভক্তি আটকাতে তখন কিছু করেছিলো কি? তারাও হয়তো তখন দেশভাগ নিয়ে সাপলুডু-ই খেলেছিলো। তখন হয়তো তাদের কাছে বাঙালি পরিচয় ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছিলো হিন্দু-মুসলিম পরিচয়; না হলে বুক কেটে খুঁটি গেড়ে দেশভাগ হতো না, এ কথা হলফ করে বলা যায়।

তৎকালীন দুটি দল, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দেশ থেকে ব্রিটিশ তাড়ানোর নাম করে নিজেদের কেটে ভাগ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলো-কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে। ব্রিটিশরাও মনে মনে এমনটাই চেয়েছিলো, এরাও পা দিয়েছিলো ব্রিটিশদের তৈরি ফাঁদে। ফলে হিন্দু-মুসলিম নাম ধারণ করে আলাদা আলাদাভাবে জিততে গিয়ে অজানতে হেরেছে উভয়ই। এই ‘হৃদয়ছেদি’ দেশভাগ ও পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে গৌতম ঘোষ নির্মাণ করেছেন শঙ্খচিল (২০১৬)। এই শঙ্খচিল-এর ডানায় ভর করেই দেশভাগ ও নব্য ‘বাংলা-প্রেমের প্রেমময় উপাখ্যান’ উল্টে-পাল্টে দেখার প্রচেষ্টা থাকবে এ প্রবন্ধে।


যতো দোষ র‌্যাডক্লিফ ঘোষ


লর্ড মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ পানশালা থেকে র‌্যাডক্লিফকে পাকড়াও করে ভারতে নিয়ে আসেন। এর আগে র‌্যাডক্লিফ কখনো ভারতে আসেননি, এমনকি দেশটি সম্পর্কে তিনি তেমন কিছু জানতেনও না। এই অজ্ঞতা নিয়ে একটা দেশ কেটে ভাগ করা যে খুব কঠিন ব্যাপার, সে কথা র‌্যাডক্লিফ অবশ্য মাউন্টব্যাটেনকে বলেছিলেনও! উল্টো র‌্যাডক্লিফকে রাজি করানোর জন্য মাউন্টব্যাটেন ৪০ হাজার রুপি দিতে চান; যেটা তৎকালীন একটা বড়ো অঙ্কের অর্থই বটে। কিন্তু টাকার চেয়েও র‌্যাডক্লিফকে অন্য একটি বিষয় বেশি প্রলুব্ধ করে; তা হলো-দুটি নতুন দেশ সৃষ্টির মোহ; যা তাকে রাতারাতি এনে দেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তাই ‘নেশাগ্রস্ত’ এই ব্রিটিশ আইনজীবী নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির এই মোহকে অস্বীকার করতে পারেননি।


দেশভাগ করতে এসে র‌্যাডক্লিফ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতের জেলাগুলোর মানচিত্র চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে কোনো পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র দেওয়া যায়নি; শেষ পর্যন্ত অফিস ও স্কুলে ব্যবহার্য সাধারণ মানচিত্র তুলে দেওয়া হয় র‌্যাডক্লিফের হাতে। অবাক করা বিষয় হলো, র‌্যাডক্লিফও কিছু না ভেবে সেই সাধারণ মানচিত্র দিয়েই একটি দেশকে ‘অসাধারণ’ভাবে ভাগ করে ফেলেন। ইঁদুরে কাটার মতো কুটকুট করে ভাগ হয়ে গেলো ভারতবর্ষ! দাঙ্গায় মারা গেলো এক কোটি মানুষ, উদ্বাস্তু হলো আরো অসংখ্য। তবে মহান র‌্যাডক্লিফ কখনোই তার প্রাপ্য ৪০ হাজার রুপি নেননি, কারণ তিনি নাকি একধরনের পাপবোধে ভুগতেন! যদিও ইতিহাসের নিক্তিতে তার এ অনুশোচনার কোনো মূল্য নেই। কারণ, যা ঘটার তা ঘটে গেছে।


র‌্যাডক্লিফ নিজেকে ক্ষমা করতে পেরেছেন কি পারেননি, সেটা মুখ্য নয়; মুখ্য হলো এখানে তার দায়ইবা কতোখানি। তিনি তো কেবল হুকুমের গোলাম, একটু খ্যাতির লোভে না হয় মানচিত্রটাকে রুটি মনে করে বানরের মতো ‘সমবণ্টন’ করেছিলেন। কিন্তু দেশ কেটে ভাগ করার এই পরিস্থিতি তৈরি করেছিলো কারা? ২০১৭-তে এসে সে কথা কারো না জানা থাকার কথা নয়। তাই গৌতমের শঙ্খচিল-এ যখন বি এস এফ (ভারত) সীমান্ত খুনের দায় ইতিহাস মারফত র‌্যাডক্লিফের কাঁধে চাপিয়ে বলে, ‘ওকে গুলি করেছে আমাদের ব্লাডি হিস্ট্রি।’ শুধু বি এস এফ’ই নয়, গৌতম বাংলাদেশি সাংবাদিকের ‘আমার মনে হয় র‌্যাডক্লিফ সাহেব দাগটা টানার সময় একটু নেশাগ্রস্ত ছিলেন’-এই ভাষ্য দিয়েও যখন বি এস এফ’কে একধরনের বৈধতা দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, নির্মাতা কি তবে ইতিহাস ও র‌্যাডক্লিফ’কে খলনায়ক বানিয়ে বি এস এফ তথা ভারতকে দায়মুক্তি দিচ্ছেন? যারা র‌্যাডক্লিফকে এদেশে টেনে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিলো, দেশ নিয়ে কাটাকুটি খেলেছিলো, তাদের কি আদৌ কোনো দায় নেই? মানচিত্রে একটা বিভাজক রেখা টানার দায়ে যে বি এস এফ আজ র‌্যাডক্লিফের দিকে আঙুল তুলছে, তার অজুহাত দিয়ে দায়িত্বের মোড়কে ফেলানি তথা মানুষ খুন করে কাঁটাতারে ‘কুকুরের’ মতো ঝুলিয়ে রাখছে। তারাও তো পারতো এই র‌্যাডক্লিফের তৈরি ক্ষত সারিয়ে তুলতে। তারা রূপসা ওরফে চম্পকেশ্বরীদের কাঁটাতারের ফাঁক থেকে হাত গলিয়ে চকলেট দেবে, কিন্তু তাদেরই গুলিতে মরে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানিকে মানুষের প্রাপ্য সম্মানের ছিটেফোঁটাও দেবে না। তাদের লাশ বাঁশে ঝুলিয়ে পশুর মতো নিয়ে যাবে, মরার পরও বুকে পিঠে লাথি মারবে; আর এসব করতে করতেই উদ্ধার করবে র‌্যাডক্লিফের চৌদ্দগুষ্ঠী।


চম্পকেশ্বরীর মাছ ধরে নেবে ভারত


শঙ্খচিল-এ রূপসা ওরফে চম্পকেশ্বরী তার বাবার কেজি দরে কেনা মাছ পানিতে ছেড়ে দেয়। অথচ তার সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য এ মাছগুলো খাওয়া জরুরি ছিলো। ‘জীব হত্যা মহাপাপ’-গৌতম বুদ্ধের এই মহাবাণীকে যদি চিরন্তনভাবে গৌতম মেনেও নেন, তার পরও তো কিছু জায়গায় দু-চারটে প্রাণী বধ করা ছাড়া মানুষের উপায় থাকে না। আপন জীবন না থাকলে জীবে দয়া নিরর্থক বৈকি? এ বাস্তবতা মেনেই হয়তো রূপসার মা বলেন, ‘আপনি বাঁচলে তবেই না প্রাণীর নাম।’ তবে রূপসার বাবা এ কথা মানতে নারাজ, তিনি রূপসার এ কাজকে সমর্থন করে যান মৌনভাবে। এটাকে তিনি নিছক ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই ভাবেন না, ভালোবাসার মোড়কে মেয়ের ক্ষতিই করেন অবশ্য।


আলোচনার স্বার্থে রূপসাকে রাষ্ট্র, রূপসার বাবাকে রাষ্ট্র সমর্থক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং তার মাকে যদি জনগণের ভূমিকায় দাঁড় করাই, তবে একটা সমীকরণ মিলে যায় অন্তত। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রামপাল। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বাগেরহাটে এক হাজার আটশো ৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে অনেক পরিবারকে উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশ (বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পি ডি বি) ও ভারতের (ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন-এন টি পি সি) মধ্যে। এই প্রকল্প হবে বাংলাদেশের পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মাত্র ৯-১৩ কিলোমিটারের মধ্যেই-যদিও সরকারের দাবি, এটি সুন্দরবনের বাফারজোনের ১৪ কিলোমিটার দূরে-যা সুন্দরবনের বনাঞ্চল, পরিবেশ ও জীবসম্পদের জন্য বিপজ্জনক। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের টিকে থাকার জন্যও আশঙ্কাজনক। আরো ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ সেটা নির্মাণ করতে যাচ্ছে সুন্দরবনের সন্নিকটে।


যে সুন্দরবনের পাশে এই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে, তাকে বলা হয় দক্ষিণাঞ্চলের ‘রক্ষা প্রাচীর’। নানারকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দক্ষিণাঞ্চলকে রক্ষা করে সুন্দরবন। এই সুন্দরবন যদি বিনাশ হয়, বাস্তুচ্যুত হবে লক্ষ লক্ষ মানুষ, বিপর্যস্ত হবে পরিবেশ। এ তো গেলো এক দিকের কথা; অন্যদিকে, এই প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য মোটেও লাভজনক নয়। মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে ভারতীয় এন টি পি সি ৫০ শতাংশ মালিকানা পাবে এবং পি ডি বি’কে এন টি পি সি থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পরিবেশ ও জনপদ নষ্ট করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্যের কাছ থেকে কিনতে হবে বাংলাদেশকে! এবং এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম হবে স্বাভাবিক বাজারমূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ পি ডি বি’কে ভর্তুকি দিতে হবে অথবা বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। তাছাড়া এই প্রকল্পের জন্য গৃহীত ঋণ এবং এর সুদের হারের লোকসান তো আছেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এন টি পি সি যদি এই প্রকল্প ভারত অংশের সুন্দরবনের আশেপাশে করতে চাইতো, তবে অনুমতি পেতো না; ভারতীয় আইনে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এই ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন নেই। সুদূর অতীতে ব্রিটিশ শাসনের কথা হয়তো সবার মনে আছে, তার সঙ্গে একটু মিলিয়ে নেওয়া যাক বর্তমানকে। ব্রিটিশরাও প্রথমে উপমহাদেশে এসেছিলো কোম্পানির হাত ধরে। তার পর একে একে বাজার থেকে মসনদ সবই নিয়েছিলো নিজেদের দখলে। এখান থেকে কাঁচামাল নিয়ে তারা ওখানে ড্যান্ডি গড়েছিলো, ঘটিয়েছিলো মহান শিল্পবিপ্লব। এবং সেই শিল্প কারখানায় উৎপাদিত পণ্যই আবার এখানে এসে বিক্রি করতো চড়া মূল্যে। ভারতের এন টি পি সি’র এদেশে আগমন তেমন কোনো বার্তা দিচ্ছে বৈকি? হয়তো আগের মতো প্রত্যক্ষ দেশ দখলে নেবে না তারা, কিন্তু বাজারটা দখলে নেবে নিশ্চয়। কারণ গোটা বিশ্ব এখন উপনিবেশ নয়, নব্য উপনিবেশ জ্বরে আক্রান্ত; যার প্রধান কাজ হলো বাজার দখল।  


স্বয়ং ভারত যে এন টি পি সি’কে অনুমতি দিচ্ছে না, বাংলাদেশ দিচ্ছে! উন্নয়ন দরকার, মানলাম; সেটা কার স্বার্থে? যে উন্নয়ন মানুষের কথা বলে না, অধিকাংশ মানুষ যে উন্নয়নের বিপক্ষে; সেই উন্নয়ন আদতে কতোটা উন্নয়ন? সুন্দরবনকে ধ্বংস করার এই মহাপরিকল্পনা রাষ্ট্র কার স্বার্থে নিচ্ছে সেটা অনেকটাই অনুমেয়। এখানে আমাদের রাষ্ট্র অবতীর্ণ হয়েছে চম্পকেশ্বরীর ভূমিকায়। যে কোমল হৃদয় চরম বদান্যতায় মাছ (জায়গা) ছেড়ে দিচ্ছে, ওদিকে ভারতীয় মহাজনেরা সে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে চরম কৌশলে। আর যিনি কেজি দরে মাছ কিনে আনেন (কেজি দরে মাছ কেনাকে টাকা বা ক্ষমতার জোরে করা ভোটের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে), মাছ নদীতে ছেড়ে দেওয়া দেখে তিনি হাসেন; তিনিও হয়তো জানেন, এ মাছ ছেড়ে দেওয়ার শেষ পরিণতি। তার পরও তিনি কিছুই বলেন না! কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতার বিরোধিতা করে টিকে থাকা যে দুষ্কর। কিন্তু চম্পকেশ্বরীর মা বিষয়টা বোঝেনও, প্রতিবাদও করেন। কিন্তু সে প্রতিবাদে কোনো কাজ হয় না। চম্পকেশ্বরীর টান যে ওই কাঁটাতার ভেদ করে আসা শঙ্খচিলের প্রতি, সে যে ও ছাড়া আর কারো দিকে তাকাবে না। বি এস এফ-এর দেওয়া কাচের চুড়ি হাতে বেলুন নিয়ে নাচের ভঙ্গিতে যে তাকে দারুণ দেখায়। সেই চুড়ির শেকল ভাঙার সাধ্য যে চম্পকেশ্বরীর থাকে না শেষ অবধি; তাই বিদ্যুৎ চালিত ‘ডিজিটাল’ পুতুলের মতো সেও যে চলে দোস্তের দূরনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ইশারায়!


সেবার আদলে এক ‘মানবিক’ বিজ্ঞাপন


শিল্প সৃষ্টিতে উদ্দেশ্য থাকে, আবার থাকেও না। তবে উদ্দেশ্যহীনতারও একধরনের উদ্দেশ্য থাকে, তা ভুলে গেলে চলে না। শিল্পের উদ্দেশ্য কিংবা উদ্দেশ্যহীনতা নিয়ে নানা মত আছে। সেই মত নিয়ে আছে দ্বিমতও। তবে যতো মত-পথই থাক, মানুষহীন শিল্প সৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ শিল্প সৃষ্টির আগাগোড়ায় মানুষ ছিলো, আছে; আর তা সৃষ্টিও হয় মানুষের হাতে। 


গৌতমের শঙ্খচিল শিল্প কি না কিংবা সেই শিল্প মানুষ না শিল্পের জন্য তা এই আলোচনার বিষয় নয়। তবে শঙ্খচিল-এ বাংলা-প্রেমের ধুয়া তুলে গৌতমের এজেন্ডাগুলোর কৌশলী পরিবেশন কিন্তু সাদা চোখেই ধরা পড়ে। ফলে এটা নিয়ে দর্শক হিসেবে মনের মধ্যে খচখচানিটা বার বার নাড়া দেয়। এই খচখচানি আরো তীব্র হয়, চিকিৎসার নিমিত্তে রূপসাকে নিয়ে তার বাবা-মার ভারত গমন এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে। শঙ্খচিল-এর এক ঘণ্টা ছয় মিনিট ৫০ সেকেন্ডে রূপসা কাঁটাতারের ফাঁক গলিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। গিয়ে ওঠে সুদীপ বাবুর কাছে, যিনি রূপসার বাবার সহকর্মী হেমন্ত বাবুর বন্ধু। তিনি রূপসা তথা বাদলদের জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করেন যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে। এক ঘণ্টা ১১ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে রূপসাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা রূপসার সেবা করে যান পরম মমতায়; নার্স থেকে আয়া সবার ব্যবহার অনুরূপ। এক কথায় চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই হাজির হন সাক্ষাৎ দেবতা রূপে! ঠিক তখনই বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা মনে পড়ে, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র নিয়ে দর্শকের মনে হাজির থাকে। কিন্তু এই দুই ভিন্ন চিত্রের মাঝখানে দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে থেকে খটকা লাগে, মনে হয় চিকিৎসা নিয়ে গৌতমের এই পরিবেশনা প্রচার পেরিয়ে প্রচারণা নয়তো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খানিকটা সময় নিতে হয়; হাজিরা দিতে হয় অন্তর্জালের কাছে; পেয়েও যাই কিছু সংবাদ। জার্মানভিত্তিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে (ডি ডব্লিউ) ‘পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা সংকট’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে কলকাতার চিকিৎসা ব্যবস্থার নানা সঙ্কটের চিত্র তুলে ধরেছে। যেখানে উঠে এসেছে বেসরকারি হাসপাতালের গলাকাটা ব্যবসা, রোগীদের চরম দুর্ভোগ, দালাল চক্রের হাতে জিম্মি সরকারি হাসপাতালের নির্মম বাস্তবতার চিত্র; পাশাপাশি চিকিৎসকদের অবহেলার বিষয়টি তো আছেই। যা নিয়ে নাকি সেখানকার খোদ মুখ্যমন্ত্রীও বেশ শঙ্কিত।


শুধু বিদেশি নয়, কলকাতার স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে চোখ রাখলেও সেখানকার চিকিৎসাসেবার নাজুক দশা নিয়ে ভূরি ভূরি সংবাদ চোখে পড়ে। যা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশাকেও হার মানায়! এ নিয়ে সবার আগে ‘আনন্দবাজার’-এর কয়েকটি শিরোনাম দেখে নেওয়া যাক-‘ওটিতে গোল, দাপট আয়ারও’ (১৯ মার্চ ২০১৭); ‘জোর করে টাকা নেওয়া হয়েছিল, মানলো অ্যাপেলো’ (২৩ মার্চ ২০১৭); ‘সর্দি-কাশিতে বিল হলো সাড়ে ছয় লাখ’ (২৩ মার্চ ২০১৭); ‘ছানি কেটে দৃষ্টিহীন ৩, শুরু তদন্ত’ (২৩ মার্চ ২০১৭); ‘ঘুষ দিতে না পারায় জুটলো না হুইল চেয়ার, ছেলের প্লাস্টিকের সাইকেলে হাসপাতালে রোগী’ (১৮ মার্চ ২০১৭)। কলকাতার আরেকটি জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদ পোর্টাল ‘এ বি পি আনন্দ’-এর কয়েকটি শিরোনাম ছিলো এমন-‘ফের চিকিৎসায় গাফিলতিতে মৃত্যু, হৃদরোগের চিকিৎসা করাতে পা বাদ দেওয়ার অভিযোগ’ (১৩ মার্চ ২০১৭); ‘কলকাতায় ভুল চিকিৎসা, অসাড় বাঁ হাত, শুকিয়ে যাচ্ছে আঙুল, স্বপ্নভঙ্গ বিহারের তরুণের’ (২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। এ উদাহরণগুলো দিয়ে নিশ্চয় সারা ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল্যায়ন করা ঠিক নয়; উল্টোভাবে রূপসার চিকিৎসার সেই স্বর্গীয় রূপও নিশ্চয় দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র নয়। তবে শঙ্খচিল দেখতে দেখতে শিল্পের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে গৌতমের এ পরিবেশনায় শিল্পভোক্তা দর্শক হিসেবে খচখচানিটা বাড়ে বৈ কমে না।


ভাল্ব ট্রান্সফার করতে হবে শুনে রূপসার বাবা যখন ঘাবড়ে যান, তখন সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ‘ভয় পাবেন না, এখন এসব সার্জারি অনেক অ্যাডভান্সড; তবে হ্যাঁ খরচ সাপেক্ষ। বিভিন্ন হসপিটালে প্যাকেজ আছে, আপনি চাইলে আমরা রেফার করে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি।’ এরপর এক ঘণ্টা ২৮ মিনিট দুই সেকেন্ডে বেসরকারি হাসপাতাল ‘নিউ হরিজন হসপিটাল প্রাইভেট লিমিটেড’-এ নেওয়া হয় রূপসাকে। যেখানে চিকিৎসা দেয় দেশের নামিদামি চিকিৎসকরা; তারাও অত্যন্ত আন্তরিক। সেখানে সবকিছু হয় যথাযথ নিয়ম মেনে। এরা যে কতোটা আন্তরিক তার প্রমাণ মেলে একজন নারী অভ্যর্থনাকর্মীর কথায়। যিনি রূপসার মাকে সান্ত্বনা দেন এই বলে যে-‘আপনি মেয়ের কাছে থাকুন, একদম টেনশন করবেন না, আমরা আছি।’ এদের আচরণে মনে হয়, টাকা নয়, সেবাটাই তাদের কাছে মুখ্য।


শঙ্খচিল-এ অনেকটা সময় ধরেই গৌতম কলকাতা তথা ভারতের মানবতাবাদী, সুশৃঙ্খল এই চিকিৎসা প্রক্রিয়া দেখান। সেই প্রক্রিয়ায় কী ভারতীয়, কী বাংলাদেশি সবাই সমানভাবে মানবতার ছায়াতলে জড়ো হয়। কিন্তু তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় বাংলাদেশিদের। অধিকাংশ সময় দালালের খপ্পরে পড়ে গুনতে হয় বেশি অর্থ। এমনকি অপহরণ, ধর্ষণ, খুনের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতে জন্মান্ধ মায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে চলন্ত ট্রেনের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হন খুলনার নার্গিস। ধর্ষকরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তারা ধর্ষণ শেষে নৃশংসভাবে নার্গিসকে খুনও করে। ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন যশোরের মহম্মদ মহসীন কবীর। যে কিনা তারই এক ভারতীয় বন্ধুর আশ্বাসে বাবার চিকিৎসার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। যে বন্ধুর আশ্বাসে কবীর ভারতে গিয়েছিলেন, সেই বন্ধুই লোক দিয়ে তাকে অপহরণ করে।


গৌতম কিন্তু শঙ্খচিল-এ সুকৌশলে সেই ভারতকে দেখান না! তিনি দেখান অতিথিপরায়ণ সেই ভারতকে, যারা ভিনদেশিদের প্রতি চরম সাহায্য-প্রবণ; ছিনতাইকারীকে গণধোলাই দিয়ে বিদেশিদের রক্ষা করে চরম মমতায় বিশ্বস্ত ত্রাতার মতো। এখন প্রশ্ন, গৌতম এটা কেনো করেন? শিল্পস্রষ্টা গৌতমের শিল্পে কেনো এতো অপ্রয়োজনীয় রঙ, সেই রঙের রোশনা-ই এতো কেনো? এর উত্তর পাওয়া বোধ হয় খুব কঠিন নয়। উত্তর খুঁজতে ‘বি বি সি বাংলা’র একটি প্রতিবেদনের সূত্র টানতে হয়-বর্তমানে ভারতে বিশেষ করে কলকাতায় বেসরকারি খাতে চিকিৎসা বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে; এর গুরুত্বপূর্ণ এক কথায় প্রধান ভোক্তা হলো বাংলাদেশিরা। এ তো গেলো কেবল চিকিৎসা খাত, এর বাইরে ভারতের পেঁয়াজ থেকে রসগোল্লা, সুচ থেকে ভ্রু পেইন্ট সব আসে  বাংলাদেশিদের কাছে। আর দিনরাত আমাদের বসার ঘরজুড়ে সেখানকার কড়া লিপস্টিক, স্ট্রেইট চুল আর কুচির ভাঁজ নষ্ট না করে শাড়ি পরা দিদি-বৌদিদের আনাগোনা তো আছেই। তাই চিকিৎসা নিয়ে গৌতম একটু বাড়াবাড়ি কিছু দেখালে খুব বেশি দোষের মনে হয় না!


গৌতমের আসা-যাওয়া ধর্মীয় তরিকায়


সীমান্ত পেরিয়ে রূপসাকে ভারতের টাকিতে নিয়ে যাওয়ার পর মুনতাসীর চৌধুরী বাদলের সঙ্গে সুদীপ বাবুর কথোপকথন দেখানো হয়। সুদীপ বাদলকে সাবধান করে বলেন, ‘তোমাদের এখানে হিন্দু পরিচয়ে থাকতে হবে।’ বাদল তখন অনেকটা অবাক হয়েই প্রশ্ন করেন, ‘হিন্দু পরিচয় কেনো? এদেশেও তো অনেক মুসলমান থাকে দাদা।’ তখন মানবিক সুদীপ অনুরাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বলেন, ‘কিন্তু তুমি যদি মুসলিম হও কোনোভাবেই আমার ভাইপো হতে পারো না!’ কথাটা খালি চোখে দেখলে খুব সহজ-সাবলীল, পরিস্থিতি অনুযায়ী যৌক্তিকই মনে হতে পারে। কিন্তু আতশি কাচে ভিন্ন কথা বলে। গৌতমের বাংলা-প্রেমের ফাঁকা বুলি কেনো জানি ম্লান হয়ে আসে! কারণ ওপার বাংলার লোক ‘বাঙালি’ নেবে, কিন্তু ‘মুসলিম’ নেবে না! তার মানে বাংলাদেশের বাঙালি আর মুসলিম তাদের কাছে দুটি ভিন্ন জিনিস। তারা বাঙালি সেবায় অন্তঃপ্রাণ কিন্তু মুসলিম? তাই হিন্দুকরণের পরামর্শটা গৌতম সুকৌশলে দেন সুদীপ বাবুর মাধ্যমে। যে অবলীলায় রূপসার বাবা মায়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বলেন, ‘মুনতাসীর চৌধুরী বাদল নয়, শুধু বাদল চৌধুরী; লায়লা, লীলা চৌধুরী। রূপসা, রূপসা চৌধুরী। হাসপাতালের ফর্মে এ নামগুলো লিখবে, কান্ট্রি ইন্ডিয়া, ধর্ম হিন্দু। আমি আগে থেকেই জানিয়ে রাখলাম, এখন দেখি তোমাদের জন্য দুটো ভোটার আইডি জোগাড় করা যায় কিনা।’


গৌতম যে অসহায় বাবাকে দেখান, তিনি সুদীপের উপদেশের ছলে দেওয়া আদেশকে উপেক্ষা করতে পারেন না। তিনি সুদীপের আদেশ মাথা পেতে নিয়ে বলেন, ‘আমি আর কী বলবো দাদা, আপনি যা ভালো মনে করেন।’ সত্যিই দাদারা যা ভালো মনে করে সেটাই কল্যাণকর। কারণ দাদারাই তো বাঙালিদের ভালো চায়। আর সেই ভালো বাদলদের বাধ্য হয়ে মেনেও নিতে হয়। বাদল রূপসার মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘তুমি রূপসার মা, এটাই তোমার ধর্ম। দেখো কোনো পাপ হবে না।’ মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে বাদল যে হিন্দুকরণকে বৈধতা দেন, তা পক্ষান্তরে গৌতমের বৈধতা দান প্রক্রিয়াই।


পাঠক এবার একটু মনের মানুষ-এর সঙ্গে মিলিয়ে নিই। লালনকে হিন্দু প্রমাণে যে প্রক্রিয়া গৌতম সেখানে প্রয়োগ করেছেন; শঙ্খচিল-এর হিন্দুকরণ প্রক্রিয়ায়ও কিন্তু তার ছাপ বিদ্যমান। মনের মানুষ-এ লালন মোল্লা ও পুরুতদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। জাত খুইয়ে বিতাড়িত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ার পরে সোলেমান ওরফে কালু তাকে জিজ্ঞাসা করে তার জাত কী-হিন্দু না মুসলমান? লালন বলেন, তার পরিচয় শুধুই ‘মানুষ’। একইভাবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কাছেও লালন বলেন, জগতে দুইটাই মাত্র জাত আছে, নারী আর পুরুষ এবং বাকি সব মানুষের অনাসৃষ্টি। এসব দেখে হয়তো খালি চোখে মনে হয়, গৌতম এমন এক লালনকে নির্মাণ করেছেন, যে সব জাতপাত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। কিন্তু গভীর চোখে দেখলে গৌতমের হঠকারিতা চোখ এড়ায় না।


মনের মানুষ শুরু হয় লালনের কল্পিত জন্মবৃত্তান্ত ও জাত খোয়ানোর মিথকে দৃশ্যায়নের মধ্য দিয়ে। একপর্যায়ে, কৃষ্ণপ্রসন্ন কবিরাজের ঘোড়া লালু নিয়েছিলো কি না, তা শনাক্ত করার জন্য কাজের মেয়ে বীণাকে ডাকা হয়। সে চিনতে পারে লালু মানে লালনকে। লালুর পরিচয় তার কাছে এ রকম-‘নিত্যবাবুর আখড়ায় যাত্রাপালায় নেতাই সেজেছিলো, দুহাত তুলে কী নাচ! খুব ভালো গান করতি পারে।’ এ দৃশ্যকল্প লালনকে হিন্দুকরণের পাটাতন গড়ে দেয়। মনের মানুষ-এ আরো দেখা যায়, ছোটোবেলা থেকেই বাউল-ফকিরদের প্রতি লালুর বিশেষ আগ্রহ, নিজেও গান বাঁধে। শুরুর দিকেই কবিরাজ কৃষ্ণপ্রসন্নর সঙ্গে কিশোর লালু যান গঙ্গাস্নানে। সন্ধ্যায় কবিরাজ মশাই তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বিশ্রাম করছেন, আর লালু গান শোনাচ্ছেন, ‘আর আমারে মারিস নে মা/বলি মা তোর চরণ ধরে/ননী চুরি আর করবো না।’ এটা লালনেরই গান, গোষ্ঠের রাখাল শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে এ গানের কাহিনি। আর এটাও মনে রাখার বিষয়, কৃষ্ণপ্রসন্ন বাবু লালুকে ঘোড়ার রাখাল হিসেবে সঙ্গে নিয়ে গেছেন গঙ্গাস্নানে।


তাই সচেতনভাবেই গৌতম এ গান ব্যবহার করেন, যা বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয় চলচ্চিত্রে। লালু তো এই গঙ্গাস্নানে গিয়েই বসন্তরোগে আক্রান্ত হন এবং সঙ্গীরা তাকে মৃত ভেবে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়। এক মুসলমান নারী তাকে নদী থেকে তুলে এনে সেবা-শুশ্রƒষার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। তাই ‘পরের মাকে’ই লালন মা বলে ডাকেন। দর্শক মনে লালনের জীবন ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে সাদৃশ্য তৈরিতে এ গান তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, একথা হয়তো কিছু না ভেবেই বলা যায়। এর পাশাপাশি নির্মাতা কোন লালনকে নির্মাণ করছেন সে বিষয়টিও অনেকটা স্পষ্ট হয়।


সেবা-শুশ্রুষায় লালু কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। বসন্তরোগ তাকে প্রাণে না-মারলেও কেড়ে নিয়েছে স্মৃতিশক্তি। নিজের নাম-পরিচয়-ঠিকানা কিছুই তিনি মনে করতে পারেন না। সিরাজ সাঁই এসেছেন লালনের প্রাণদাত্রী রাবেয়ার কুটিরে। তার মনে হয়, এর আগেও কোথায় যেনো তিনি লালুকে দেখেছেন। পরে একদিন নদীর কূলে বসে লালু গান করছে, পাশে এসে সিরাজ সাঁই বসেন; হঠাৎ তিনি বলে ওঠেন, ‘এইতো মনে পড়েছে!’ তিনি লালুকে ঝাঁকুনি দিয়ে ফের বলেন, ‘মনে পড়ে তোর নাম?’ হঠাৎ স্মৃতিশক্তি ফিরে আসে লালুর! তিনি গড়গড়িয়ে বলে দেন-‘লালন চন্দ্র কর’। এখানে নির্মাতা লালনকে কর বংশের ছেলে হিসেবে পুরো পদবিসহ প্রতিষ্ঠা করেন। অকস্মাৎ স্মৃতি ফিরে আসা লালুর হতচকিত কণ্ঠ দিয়ে শুধু লালু বা লালন নামটুকু বেরিয়ে আসে না, গৌতমের মর্জিমাফিক তা হয় ‘লালন চন্দ্র কর’৮। অবাক হলেন? না, ভড়কাবেন না, গৌতম এমনই! যে লালন আজীবন নিজের সবটুকু দিয়ে জাতপাতের ঊর্ধ্বে থাকতে চেয়েছেন, তাকেই তিনি হিন্দু প্রমাণ করতে একবিন্দু পিছপা হননি।


মা ভূমি থেকে মনের মানুষ, খোলনলচে

বদলে ফেলা গৌতম


গৌতমের চলচ্চিত্র-নির্মাণের সূচনা তেলেগু ভাষার মা ভূমির (১৯৭৯) মধ্য দিয়ে। মা ভূমিতে তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের তেলেঙ্গনা যুবক ভূমিহীন চাষি রামাইয়ার গল্প বলেন; যিনি বিদ্রোহ করেন সেখানকার ব্রিটিশ নিযুক্ত দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী গভর্নরের বিরুদ্ধে। রামাইয়া স্থানীয় জমিদার বাড়িতে আক্রমণ করে সব জমির দলিলপত্র পুড়িয়ে দেন, তেলেঙ্গনাকে স্বাধীন ঘোষণা করেন; ফিরিয়ে দেন ভূমিহারা কৃষকদের তাদের আপন ভূমি। পাশাপাশি প্রস্তুতি চলে বড়ো ধরনের কোনো লড়াইয়ের। গৌতম ১৯৮১-তে নির্মাণ করেন প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র দখল; সেখানে তিনি হাজির হন ভারতের মধ্যপ্রদেশের যাযাবর কাগমারা উপজাতি তরুণী আন্দি’কে নিয়ে। আন্দি’র বিয়ে হয় উচ্চবর্ণের কৃষক জগার সঙ্গে। বিয়ের পর তারা জমিদারের কাছ থেকে কিছু পতিত জমি ইজারা নিয়ে প্রাণপণে খেটে যান সেই জমিকে আবাদযোগ্য করে তুলতে। অকস্মাৎ জগা মারা যান, কিন্তু হাল ছাড়েন না আন্দি; তিনি চাষাবাদ চালিয়ে যান। ক্ষমতার পালাবদলে পরিবর্তন আসে ভূমি আইনে; আন্দি’র আবাদযোগ্য উর্বর জমির সবটুকুই কেড়ে নেয় শাসক। দখলদাররা আন্দি’র ঘরে আগুন দেয়, সর্বহারা আন্দি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তার যখন এ অবস্থা, তখন দীর্ঘ এক যুগ পর তাকে আবারও দলে ফিরিয়ে নিতে আসে কাগমারা সম্প্রদায়ের লোকজন। তারা আন্দি’কে বোঝায়, এই ভূমি চাষবাসের স্থায়ী জীবন তাদের নয়; পথই তাদের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু আন্দি সে কথা মানতে নারাজ, তিনি লড়াইটা করে যেতে চান শেষ অবধি। তাই তিনি থেকে যান আপন ভিটায়, ফের দুই সন্তানকে নিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।


তিন বছর বিরতিতে গৌতম এবার নির্মাণ করেন হিন্দি ভাষার পার (১৯৮৪)। পার-এর গল্প বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রামের। জমিদারের লোকজন সেই গ্রামের মানুষের ওপর হামলে পড়ে, তার ভাইয়ের হাতে খুন হন সবার প্রিয় স্কুলশিক্ষক। দিনমজুর নৌরাঙ্গিয়া এর প্রতিবাদে হত্যা করেন জমিদারের ভাইকে। এরপর নৌরাঙ্গিয়া ও তার গর্ভবতী স্ত্রী পালিয়ে আসেন কলকাতায়; শুরু হয় বাঁচার সংগ্রাম। কিন্তু কোনোভাবেই নৌরাঙ্গিয়া কাজ পান না। অর্ধাহারে-অনাহারে তাদের দিন কাটে। তাই একসময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামে ফিরে যাবে। কিন্তু গ্রামে ফিরে যেতে যে টাকার দরকার তাও তাদের কাছে অবশিষ্ট নেই। পরে এক দালালের মাধ্যমে তারা শুকরকে নদী পার করানোর কাজ পায়। ফলে নৌরাঙ্গিয়ার গর্ভবতী স্ত্রী বাধ্য হন এই অবস্থায় নদীতে নামতে। নদী পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছার পর অকস্মাৎ নৌরাঙ্গিয়ার স্ত্রী উপলব্ধি করেন তার গর্ভের সন্তান নড়াচড়া করছে না! হতবিহ্বল নৌরাঙ্গিয়া কান পাতেন স্ত্রীর উদরে, অকস্মাৎ শুনতে পান তার হার না মানা সন্তানের হৃদস্পন্দন। হিন্দির পর আবার বাংলা, গৌতম তিন বছর বিরতিতে কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস ‘মহাযাত্রা’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন অন্তর্জলী যাত্রা (১৯৮৭)। সতীদাহ প্রথার নির্মমতাই অন্তর্জলী যাত্রার উপজীব্য। মৃত্যু পথযাত্রী বৃদ্ধের সঙ্গে ঠাকুরের কথানুযায়ী বিয়ে হয় ব্রাহ্মণ কন্যার। স্বর্গের লোভে ব্রাহ্মণ বৃদ্ধের সঙ্গে কন্যাকে এক চিতায় তুলতে রাজি থাকলেও ঠাকুরের উদ্দেশ্য ভিন্ন; তার লোভ গহনায়। আর ব্রাহ্মণ কন্যাও নিরুপায় হয়ে সব মেনে নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ কন্যাকে চিতায় উঠতে হয় না, সে ভেসে যায় জলে।


পাঁচ বছর পর এবার মানিক বন্দ্যোপ্যাধায়ের উপন্যাস নিয়ে গৌতম নির্মাণ করেন পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৯২)। পদ্মা পাড়ের জেলেদের এক অনবদ্য আখ্যান মানিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। যেখানে স্বমহিমায় উপস্থিত হোসেন মিয়া, যার সব আয়োজন ময়না দ্বীপ-কেন্দ্রিক। তিনি অনাবাদি অবাসযোগ্য দ্বীপে একটা ভিন্ন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেন, যেখানে ধর্ম-প্রথা কথিত সামাজিক নিয়মনীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়, অগ্রাধিকার পাবে মানুষ; মানুষই এর শেষ কথা। দেখা, না-দেখার গল্প নিয়ে গৌতমের দেখা (২০০১)। দেখায় এই দেখা তিন ধরনের-এক. একজনের দেখার পর না-দেখা; দুই. একজনের একেবারেই না-দেখা; তিন. অন্যদের অনবরত দেখা। ২০০৩-এ আবার অরণ্যে বন এবং বনকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠা আদিবাসী জীবনের সংগ্রামের কথা বলেন গৌতম। যেখানে তিনি বোঝাতে চান, জঙ্গল মানেই শুধু মহুয়া আর আদিবাসী নারীর শরীর নয়, জঙ্গল মানে টিকে থাকার এক অবিরাম সংগ্রাম।


এর পর গৌতম আবারও নির্মাণ করেন হিন্দি ভাষার যাত্রা (২০০৬)। বাইজি লাজভান্তি ও লেখক দশরথ জগলেকা-এর জীবনের গল্প যাত্রা। লাজভান্তি’র জীবনী নিয়ে উপন্যাস লেখেন দশরথ; উপন্যাসটি জাতীয় পুরস্কার পায়। সেই পুরস্কার নিতে দিল্লিতে গিয়ে লেখক গোপনে দেখা করতে যান তার উপন্যাসের অনুপ্রেরণা লাজভান্তি’র সঙ্গে। ততোদিনে অবশ্য বাইজি নাচ ছেড়ে লাজভান্তি শরীর দোলানো হিপহপ নাচে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেন না লেখক। শেষ পর্যন্ত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। লেখকের সামাজিক অবস্থান, বাইজির বাসায় তার মৃত্যু-সবমিলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়। ‘সম্মান’ রক্ষায় আলমারিতে পুরে গোপনে লেখকের মরদেহ পাঠিয়ে দেন লাজভান্তি। যে বাইজি লাজভান্তির কাহিনি লিখে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া যায়, তার বাড়িতে মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না! এতো কিছুর পরও লাজভান্তিরা হেরেও জিতে যান। শেষ পর্যন্ত প্রথা, আধুনিকতা, পুঁজি, খ্যাতির বিপরীতে ভালোবাসার এক অসাধারণ গল্প হয়ে ওঠে যাত্রা। যাত্রার পর গৌতম নির্মাণ করেন কালবেলা (২০০৯)। কালবেলায় উপজীব্য নকশাল আন্দোলন। কলেজ পড়ুয়া অনিমেষ পরিস্থিতির খপ্পরে পড়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নকশাল বনে যান, স্বপ্ন দেখেন পরিবর্তনের; একসময় রাষ্ট্রযন্ত্রের তুমুল কষাঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় তার বিপ্লবের স্বপ্ন। এখানে শুধু রাষ্ট্রের নির্মমতা নয়, গৌতম দেখান নকশালদের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষমতার লোভ এবং অকস্মাৎ ভোল পাল্টানো পরিবর্তনের স্বপ্নবেচা কমিউনিস্টদের গল্প। কালবেলায় রাষ্ট্রের নির্মমতা যেমন উঠে আসে, তেমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয় নকশাল আন্দোলনও। কিন্তু নকশালরা কেনো নকশাল হয়, তার উত্তর মেলে না সেখানে।


মা ভূমি থেকে কালবেলা পর্যন্ত গৌতমের সব চলচ্চিত্রের অনেকাংশ জুড়েই মানুষ ছিলো, আবার কখনো কখনো রাষ্ট্র কাঠামোয় আঘাতও করেছেন তিনি। কিন্তু অকস্মাৎ গৌতম বদলে গেলেন, নিজের স্বভাবসুলভ সুর ছেড়ে গান ধরলেন ভিন্ন সুরে। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মনের মানুষ-এ তিনি হাজির হলেন এক ভিন্ন গৌতম রূপে। জাতপাতের ঊর্ধ্বে থাকা লালনকে দর্শকের সামনে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন ‘লালন চন্দ্র কর’ অর্থাৎ হিন্দু বলে! যা মানুষ লালনকে হাজির করে বিতর্কিত এক ধর্মীয় পাটাতনে। খেলাটার শুরু হলো এখান থেকেই। এর পর শূন্য অঙ্ক-এ (২০১৩) যে গৌতমের দেখা মেলে, সেখানে আমূলে নিজেকে বদলে ফেলেছেন ততোদিনে। মনের মানুষ-এ তার ধর্ম, জাতীয়তাবাদ স্পষ্ট হলেও রাষ্ট্র, পুঁজি, ক্ষমতা তথা করপোরেটের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলার বিষয়টি অতোটা স্পষ্ট ছিলো না; যতোটা ছিলো শূন্য অঙ্ক-তে। জনকল্যাণের কথা বলে রাষ্ট্র যেমন মানুষের বুকের উপর চেপে বসে জগদ্দল পাথরের মতো, খুবলে খুবলে খায়; ঠিক তেমনই শূন্য অঙ্ক মানুষের কথা বলার ছলে জায়েজ করে রাষ্ট্র ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শাসন-শোষণকে।


শূন্য অঙ্ক’র বুনন নিখুঁত, কৌশলী। সেখানে রাষ্ট্র-পুঁজির তরিকায় কোনটা জায়েজ, না জায়েজ, উচিত, অনুচিত যেমন আছে, তেমনই আছে ‘সবার উপরে রাষ্ট্র সত্য।’ শূন্য অঙ্ক-এ রাকার মাওবাদী সমর্থক প্রেমিক এবং অগ্নি বোসের ভাই পবনকে খুন করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী; যারা নির্যাতিত আদিবাসী, খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলতো। এই মৃত্যুগুলোর মধ্য দিয়ে যে ভয়ের সংস্কৃতির শুরু, তা পরবর্তী সময়ে অগ্নির মতো দায়িত্ববান ও ‘সৎ’ রাষ্ট্রপ্রেমী করপোরেট খাদেম তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর গৌতমও রাষ্ট্রের সেই ভীতসন্ত্রস্ত অগ্নি বোস তৈরির প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে যান পুরোদমে। তিনি অগ্নিকে আদর্শ হিসেবে দেখান চলচ্চিত্রজুড়ে, তিনি কোনো ঝামেলায় জড়ান না, সব মানিয়ে চলেন। রাষ্ট্র সমর্থিত বক্সাইট উত্তোলনাগ্রহী কোম্পানির হয়ে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যান ‘অসভ্য’ আদিবাসীদের সভ্য করার তাগিদে। যদিও সেই বক্সাইডে সভ্য আদিবাসীর জীবন কেবলই বিপন্ন হয়। গৌতম কেবল রাষ্ট্রঘোষিত জনদরদি করপোরেট ‘রাজাবাবু’কে দেখিয়েই থামেন না, তিনি শেষ অবধি হার না মানা আদিবাসীদের হেরে যাওয়ার গল্প দেখান। রাষ্ট্র যাদের মাওবাদী ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করে। মানুষের জন্য লড়াই করা মাওবাদী সাবিত্রীর মৃত্যু শেষ অবধি রাষ্ট্রকেই জয়ী করে। শুধু রাষ্ট্রকে জয়ী করেই ক্ষান্ত থাকেন না গৌতম, তিনি পশ্চিমা মতবাদও কায়েম করেন ‘ভালো মুসলিম’, ‘খারাপ মুসলিম’ চিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে। মানালিতে গিয়ে অগ্নি ও তার স্ত্রী ওঠেন কবির চৌধুরীর বাড়িতে। কবির-লায়লা দম্পতির একমাত্র সন্তান যুদ্ধবিধ্বস্ত কাশ্মীরে ছবি তুলতে গিয়ে গুম হন। ফলে লায়লা চরমভাবে অমুসলিম বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন, তার কাছে হিন্দু মানেই কাফের। বিপরীতে অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী কবির উদারমনা, তিনি মুসলিম অথচ ‘হারাম’ ঘোষিত মদ পানে তার আটকায় না। এক কথায় কবির পশ্চিমা ডিসকোর্সের নিক্তিতে আদর্শ মুসলিম। যিনি ছেলে শোকে মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত স্ত্রীর কষ্ট না বুঝে বরং শান্তির অগ্রদূতদের তরিকা মেনে মৌলবাদী বলে শ্লেষ করেন!


সর্বশেষ গৌতম হাজির হয়েছেন শঙ্খচিল নিয়ে। কাঁটাতারের এপারের আর্তনাদ ওপারে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। আর ওপার থেকে নিয়ে এসেছেন পরম বন্ধুত্বের নস্টালজিক সুবাতাস। শঙ্খচিল-এ দেশভাগ নিয়ে প্রবন্ধ লেখার তাগিদ থেকে বাদল চৌধুরী পুরনো কাগজপত্র ঘাটতে থাকেন; যাতে লেগে আছে ইতিহাসের ধুলো। আর এই ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে তার হস্তগত হয় দেশভাগকালীন একটি চিঠি, যার পুরোটা জুড়ে আছে দেশভাগের নির্মম বাস্তবতা। বাদলের চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে; মেয়ে রূপসা আঁতকে উঠে চিৎকার করে বলে, আমি দেশ ছেড়ে কোত্থাও যাবো না বাবা। দর্শকও হয়তো চোখ মোছেন, ফিরে যান ৪৭-এ; ঝাপসা হয়ে আসা স্মৃতিগুলো আরেকবার ঘষামাজা করেন সযতনে। ঠিক এই সুযোগটাই নেন গৌতম! শঙ্খচিল-এ বাংলাদেশের বাঙালি দেশভাগ নিয়ে কেঁদেকেটে ‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর ওপর রাগ করো, তোমরা তো ভাই বুড়ো খোকা ভারতে কেটে ভাগ করো’ জাতীয় কবিতার চরণ আওড়ালেও ভারতীয় বাঙালিরা থাকে নির্বিকার।


ভারতও কি তবে চায় রূপসার মতো

‘অসুস্থ-অনুগত’ বাংলাদেশ?


গৌতমের শঙ্খচিল-এ যে চম্পকেশ্বরীকে দেখানো হয়, তার সঙ্গে ভারতের সীমান্তরক্ষী বি এস এফ জওয়ান অর্জুন সিং রানার গলায় গলায় ভাব। তিনি চম্পকেশ্বরীকে ডাকেন মিট্টি বলে; আর চম্পকেশ্বরী তাকে সম্বোধন করে দোস্ত বলে। দোস্ত তাকে চুড়ি, গ্যাস বেলুন কিনে দেয়, আর সে দোস্তের জন্য নিয়ে যায় মায়ের তৈরি করা নাড়ু, আচার। এ ভাবের একটা কারণ অবশ্য গৌতম শঙ্খচিল-এ স্পষ্ট করেছেন, তা হলো চম্পকেশ্বরীর সমবয়সি একটি মেয়ে আছে বি এস এফ জওয়ানের; যে থাকে সুদূর রাজস্থানে। তাই ‘পেয়ারি বেটি’ চম্পকেশ্বরীর প্রতি তার পিতৃসম টান। এই টান মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’কে। স্বাভাবিকভাবে হয়তো এ দৃশ্যায়ন যৌক্তিক ও আবেগঘন। এর বাইরে গিয়ে আপাত অপ্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন জাগে মনে-আচ্ছা, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত অবাঙালিদের কেনো মোতায়েন করে? শঙ্খচিল-এর ১২ মিনিট ১৯ সেকেন্ডে বি জি বি কর্মকর্তার ভাষায়, ‘এই গ্রামটায় বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়া মিলেমিশে আছে। কোনটা কারা বা কে, আমাদেরই গুলিয়ে যায়। ইন্ডিয়ার বি এস এফ-এরও ওই একই সমস্যা, ওদের মধ্যে আবার অবাঙালি বেশি; যার ফলে গ্রামের লোকদের সঙ্গে কমিউনিকেশনে সমস্যা হয়।’ বাঙালিদের যেখানে গুলিয়ে যায়, অবাঙালিদের তো সেখানে দিকভ্রান্ত হওয়ারই কথা।


সমস্যা হবে জেনেও ভারত বাঙালি অধ্যুষিত সীমান্তে অবাঙালি নিয়োগ করে কেনো-তা অনেকটা অনুমান করা যায় সীমান্তে ঘটে যাওয়া এবং ঘটমান ঘটনা দেখে। অবাঙালিরা হয়তো বাঙালিদের আর্তনাদ ও চোখের জলের ভাষা বুঝতে অক্ষম, ফলে গুলি করতে হাত কাঁপে না! কাঁটাতারে ঝুলে থাকা লাশও হয়তো তাদের কাছে আলাদা কোনো আবেদন তৈরি করে না। অথচ সেই অবাঙালি বি এস এফ জোয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশি চম্পকেশ্বরীর ভাবের যে চিত্রায়ণ করেছেন গৌতম, স্বাভাবিকভাবেই তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাঙালির প্রতি অবাঙালি অস্ত্রধারীর এই দরদ ঠুনকো ঠেকে! গৌতম তো ইঁচড়ে পাকা নন, বরং পরিপক্ক এক শক্তিশালী নির্মাতা। তার এই মন ভোলানো উপস্থাপন কৌতূহলী করে।


উত্তর খুঁজতে থাকি। চম্পকেশ্বরী শঙ্খচিল-এ উপস্থিত স্বয়ং রাষ্ট্রের ভূমিকায়, সে কথা আগেই বলেছি। তার জন্য বি এস এফ জওয়ান কাচের চুড়ি কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে নিজ দেশের সঙ্গেও ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেন। কারণ দেশের সীমান্ত রক্ষার যে ‘পবিত্র’ দায়িত্ব তার কাঁধে অর্পিত, রূপসা তথা চম্পকেশ্বরীর জন্য তিনি তাতেও আপস করেন। রূপসারা অবৈধভাবে ভারত প্রবেশ করছেন জেনেও তিনি না জানার ভান করেন। অথচ শঙ্খচিল-এর শুরুতেই দেখানো হয়, এই বি এস এফ-ই অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে একজনকে গুলি করে হত্যা করে, যার লাশ কাঁটাতারে ঝুলে থাকে ফেলানির মতো। এখানেই ঘটনার শেষ নয়, এই মহান মানবিক বি এস এফ জওয়ান আবার চম্পকেশ্বরীকে দেখতে হাসপাতালেও ছুটে যান। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যারা মানুষকে বিনা বিচারে আগে-পিছে না ভেবেই পাখির মতো গুলি করে, সেই বাহিনীর সদস্য অর্জুন সিং রানা কেনো এতোবেশি রূপসা দরদি? উত্তরটা অতো সহজ না হলেও বেশি জটিল নয়। বি এস এফ এখানে হাজির হয় ভারতের ভূমিকায়; তারা ভারত দরদি চম্পকেশ্বরীকেই চায়, যে সদা অনুগত থাকবে তাদের প্রতি। নিজেদের প্রয়োজনে তারা যাকে সীমান্ত বেড়া খুলে দেবে, হাসপাতালে ভর্তি করাবে; আবার দেখতেও যাবে সব বৈধ-অবৈধতার বিধান ভেঙে।


তারপর সেবা-শুশ্রুষার ভারও তারা নেবে, একদিন অতি যত্নে চম্পকেশ্বরীর পরাণ পাখি খাঁচা ছাড়া হবে। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তার বাবা-মাকে ধরে নিয়ে যাবে পবিত্র আইনের রক্ষকেরা; তখন সন্তানের জন্য বাধ্য হয়ে অবৈধ পথে পা বাড়ানো বাবা-মা’র দিকে ঘুরেও তাকাবে না মানবতা। সব মানবতা উপচে পড়বে চম্পকেশ্বরীর কফিনে। দরদ ভরে চোখ মুছতে মুছতে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কফিন’ সীমান্তের এপারে পৌঁছে দেবে অর্জুন সিং রানারা! অবাধ্য, অসহায়কে গুলি করে আর অনুগতকে সেবা দিয়ে জয়ী হবে গৌতমের ভারত। অনুগত-অসুস্থ রূপসাকে তারা নেবে, ফেলানিদের কাঁটাতারে ঝুলিয়ে; নিরুপায় মানুষকে জেলে পুরে, কফিনে দেবে পুষ্পসিক্ত অশ্রুজল! 

 

ভারত কেটে ভাগ করা ছাড়া

অন্য উপায় ছিলো কি?


ঋত্বিক ঘটকের মতো অধিকাংশ সাধারণ মানুষই দেশভাগকে মেনে নিতে পারেনি, চায়নি দেশ কেটে ভাগ হোক; সহস্র বছর ধরে গড়ে ওঠা আত্মীয়তায় ছেদ পড়ুক। শখ করে কেউ পিতৃভূমি ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে চায় না, নিজভূমে পরবাসী হয়ে বেঁচে থাকাটাও কারো কাম্য নয়; এ সত্য অনুধাবন করতে কারো মহাজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাই শঙ্খচিল-এ দেশভাগ প্রসঙ্গে স্মৃতিকাতর বাদলের কান্না এবং চম্পকেশ্বরীর আতঙ্কে কুঁকড়ে যাওয়া দেখে অধিকাংশ দর্শকের মনে একই প্রশ্নের ঐকতান ওঠে, এই আত্মছেদি দেশভাগ কি এড়ানো যেতো না? সত্যিই কি দেশভাগ অনিবার্য ছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়। ব্রিটিশদের এদেশ শাসনের অন্যতম মূলনীতি ছিলো ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’। এই সত্য কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারাও উপলব্ধি করতে পেরেছিলো। তাই তারাও একসময় বলতো, ‘উই ডিভাইড অ্যান্ড দে রুল।’ কিন্তু একটা সময় এসে তারাও এই সত্যটা ভুলে গিয়ে সবকিছুর জন্য একে অন্যকে দায়ী করতে থাকলো; এতে সুযোগ নিলো ধূর্ত ব্রিটিশরা। তারা চুপে চুপে ভারত কেটে ভাগ করার পথে হাঁটতে লাগলো। আর ভারত কেটেকুটে ভাগের দাবিটাও তোলালো ভারতের নেতাদের দ্বারাই! আশ্চর্য করা বিষয় হলো নেহেরু, সরদার প্যাটেলের মতো ‘দেশপ্রেমী’ নেতারাও দেশভাগ প্রসঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলো মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে; তাদের চোখে-মুখে লেপ্টে ছিলো ক্ষমতাসনে বসার তীব্র আকাক্সক্ষা।


একপর্যায়ে ব্রিটিশরা নিজেদের শাসনব্যবস্থাকে অটুট রাখতে এবং ব্রিটিশ বিরোধিতা যাতে মাথাচড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেই নিমিত্তে তাদের এজেন্ট কর্তৃক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে সাম্প্রদায়িকতার সহিংস আগুন। ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য সে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে থাকে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কেউই ব্রিটিশদের এ চাল বুঝতে না পেরে, অথবা জেনে-শুনে-বুঝে একে অন্যের বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থান নেয়। ফলে কলকাতায় যে দাঙ্গার শুরু হয় তা নোয়াখালি-বিহারসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে, একধরনের অনিবার্যতা পায় দেশভাগের দাবি।১০


অনেকে এই দেশভাগের জন্য মুসলিম লীগ তথা জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বকে অন্ধভাবে দায়ী করে থাকে। কিন্তু জিন্নাহর আগেই দ্বিজাতি তত্ত্বের তপ্তমন্ত্র উচ্চারণ করেছিলো হিন্দুসভার নেতা বীর সাভারকার। তার মতে, মুসলমানরা ভারতে বাস করে বলেই যে পূর্ণ নাগরিক অধিকার পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেছে, তা নয়। সাভারকার-এর আরেক সহযোগী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভারতবর্ষ অখণ্ড থাকলেও বাংলাকে অবশ্যই দুই টুকরা করতে হবে, কেননা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের আধিপত্য মেনে নেবে না।১১ শঙ্খচিল যে বাংলা-ভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সে বাংলা-ভাগের অনিবার্যতার উত্তর অনেকটাই বিদ্যমান শ্যামাপ্রসাদের দাবিতে, শ্যামাপ্রসাদের মতো হয়তো অনেক মুসলিমও তখন হিন্দুদের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি ছিলো না। তাই বাংলা-প্রেমকে ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছিলো মুসলিম-হিন্দু জাতির বড়োত্বের লড়াই।


এই হিন্দু-মুসলিম লড়াইটা একসময় অনেক বেশি বড়ো হয়ে উঠলো; দাঙ্গা ও হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ যে মাত্রায় আগুনের লেলিহান শিখা হয়ে তরবারি অথবা ত্রিশুল হাতে গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়লো, দেশভাগ ছাড়া আর কোনো গত্যান্তর রইলো না। অবশেষে সব দোষ জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ঘাড়ে চাপিয়ে ভারত ভাগ হলো। যদিও শেষ অবধি দেশভাগ করেও দাঙ্গা থামানো যায়নি। ‘ক্ষমতালোভী’ জিন্নাহ-নেহেরু-প্যাটেল-শ্যামাপ্রসাদরা হয়তো সাময়িক জিতে গেলো, কিন্তু হারলো ভারতবর্ষ। আর সবশেষে জয়ী হলো ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’।


বাঙালি স্লোগানে সব লুকানো যায় না


রূপসার মৃত্যুর পর নীতিবান মুনতাসীর চৌধুরী বাদলের হুশ ফেরে। তিনি সব সত্য বলে দেন; এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করে। জোর গলায় নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করেন তিনি। যখন হাসপাতালের অভ্যর্থনাকারী বাদলের হিন্দুত্ব প্রমাণে ভোটার আই ডি’র প্রসঙ্গ তোলেন; তখন বাদল আরো জোর গলায় বলেন, ‘কোনো আইডি নেই, একমাত্র আইডি আমি একজন বাঙালি।’ এ কথা শুনে হয়তো সব বাঙালির মনে এক স্মৃতিময় আবেগ ধক করে ওঠে, তারা ফিরে যান ৪৭-এ; মনে মনে হয়তো গৌতমের মতো র‌্যাডক্লিফকে দু-চার বার গালাগালিও করেন। সব পরিচয় ছাপিয়ে বড়ো হয়ে ওঠে বাঙালি পরিচয়। এই ধক করা আবেগের ঝাঁকুনি দিয়ে গৌতম হয়তো আগেকার সব কৌশলী চতুরতা আড়াল করতে চান নীরবে। কিন্তু আঁচলে যে পূর্ণিমা চাঁদ ঢাকা যায় না, সে কথার প্রমাণ তিনি দেন শঙ্খচিল-এর দুই ঘণ্টা এক মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে; রূপসার লাশ গোরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় যখন একজন মুসলিম হেমন্ত বাবুকে বলেন, ‘শোনেন সব আপনার জন্যিই হয়েছে, ইন্ডিয়া ভক্তি। ও দেশেই থাকেন না।’ এই সংলাপ স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে ভারতের ‘পক্ষ-বিপক্ষ’ বলে যে দুটি রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়েছে, তার একটি বিশেষ পক্ষকে শক্তভাবে সমর্থন করে। শঙ্খচিল-এর শঙ্খচিল কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশের বাঙালির কাছে আসে না, বসে এক বিশেষ বাড়ির জাম অথবা কাঁঠাল গাছে। যা তার কাছে আপন, বাকিরা পর। যাহোক এই কথা শোনার পর হেমন্ত বাবু বিড়বিড় করে বলেন, ‘নিজের দেশ ছেড়ে কোথায় যাবো?’ তার এই অসহায় আকুতি এদেশের সংখ্যালঘুদের করুণ অবস্থার সার্বিক চিত্র হয়ে ওঠে; নির্মম-পাষণ্ড রূপে ধরা দেয় অপরেরা। কেউ যদি গৌতমকে প্রশ্ন করে বসেন, ওপারের মুসলিম তথা সংখ্যালঘুরা ভালো আছে তো? গৌতম কী বলবেন জানি না, তবে এটা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার, কোনো দেশেই সংখ্যালঘুরা আদতে ভালো নেই; সংখ্যাগুরুর তাপে।


ভাবার বিষয় হলো, চলচ্চিত্রজুড়ে ভালো মানুষি দেখিয়ে আসা গৌতম হঠাৎ করে শেষের দিকে এসে একজন টুপি পরা বাঙালি মুসলিমকে দিয়ে কেনো এ কথা বলিয়ে নিলেন? তিনিও কি ইঙ্গিতে বলতে চান এদেশের মুসলিমরা এতো সাহায্য সহযোগিতা করার পরও ভারত বিদ্বেষী, তারা সদা ধর্মীয় মেলবন্ধন ছুঁয়ে পাকিস্তানেই যেতে চায়। তা না হলে শঙ্খচিল-এ অবৈধ অনুপ্রবেশ করেও যে আতিথেয়তা বাদলেরা পায় ভারতে, বাংলাদেশে বৈধভাবে থেকেও তার কিঞ্চিৎও পান না হেমন্ত বাবুরা! তিনি তো যা করেছেন অসুস্থ চম্পকেশ্বরীর ভালোর জন্যই করেছেন। ভালোর প্রতিদান এতো মন্দ কেনো এখানে? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো গৌতমেরই ভালো জানা, তবে পুরো চলচ্চিত্রে হিন্দু বাবুদের দেবতা রূপে উপস্থাপনের পর শেষে এসে মুসলিমের এই রহস্যজনক উপস্থাপন যে ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়; তা অস্বীকার করার উপায় আছে কি! মুসলিমকে এখানে তিনি দুইভাগে ভাগ করেছেন মধুর চাতুর্যে, একজন সংস্কৃতিমনা ভালো মুসলিম (বাদল), অন্যদল হিংসাতুর, ভীষণভাবে ভারত ও হিন্দু বিদ্বেষী। তবে বাঙালি হিন্দুরা সবাই ভালো, সে হোক ওপার কিংবা এপারের; হোক বি এস এফ কিংবা চিকিৎসক।


ততোদিনে বড়ো হয়েছে মনের দেয়াল 


শঙ্খচিল দেখে মনে হয়, কাঁটাতার তুলে দিলেই হয়তো সব সমস্যার সমাধান হবে, জটিলতা ছাড়াই এক হয়ে যাবে বাংলা। কোথাও কোনো বিবাদ ঘটবে না, সবাই সবকিছু বিনা বাক্যে মেনে নেবে; সবার পরিচয় হবে এক-‘বাঙালি’! আসলে কী পরিস্থিতি এতোটাই সরল! এতোদিনে বাইরের কাঁটাতারের চেয়ে বড়ো হয়েছে মনের দেয়াল। কাঁটাতার তুলে দিলেও মনের সেই দেয়াল উচ্ছেদ করবে কে? কারণ এতদিনে বাঙালি পরিচয় ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে হিন্দু, ভারতীয় বাঙালি, বাঙালি মুসলিম। এছাড়াও ওপারের বাস্তবতায়, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে বাংলাদেশিরা এখন আর বাঙালি নয়, মুসলমান। তাই শুধু এক ভাষার সেøাগান তুলে কাঁটাতারের এপার-ওপারকে কী এক করা সম্ভব আদৌ!


লেখক : নাজমুল রানা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন।


ranamcj.ru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র


১. নায়ার, কুলদীপ; ‘বিভাজনরেখা এবং র‌্যাডক্লিফের অনুশোচনা’; বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৩ আগস্ট ২০১৬।

2.http://www.bd-pratidin.com/home/printnews/165228; retrieved on 12.02.2017

3. https://goo.gl/nM48a2; retrieved on 02.03.2017

4. https://goo.gl/g3qV46; retrieved on 08.03.2017

5. http://www.bbc24news.com/7180?q=print; retrieved on 10.03.2017

6. https://goo.gl/f36qpM; retrieved on 10.03.2017

7.http://www.bbc.com/bengali/news/2014/08/140801_sm_kolkata_hospitals_bangladeshis_amitabha; retrieved on 12.03.2017

8.http://www.banglanews24.com/art-literature/news/bd/152867.details; retrieved on 01.04.2017

৯. হায়দার, কাজী মামুন; “দেখা, না-দেখা, ভিন্ন ভিন্ন দেখা নিয়ে ‘দেখা”; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, সংখ্যা ১২, বর্ষ ৬, পৃ. ২৮৯।

10. http//bangla.samakal.net/2016/08/23/232383/print; retrieved on 10.04.2017

11. http://www.bd-pratidin.com/mohan-bijoy-dibosh-songkha/2013/12/16/32402; retrieved on 15.04.2017

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন