Magic Lanthon

               

জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘শহিদ’ : কেবল রূপালি পর্দার নায়ক নন

জাহাঙ্গীর আলম


হঠাৎ করে বোমা হামলা। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, অসংখ্য হতাহত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ক্লু খুঁজে পাচ্ছে না। সরকার থেকে চাপ আসছে, তদন্তের দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। হঠাৎই কয়েকজন গ্রেপ্তার। তারা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করে। কিন্তু গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের পরিবারের দাবি, কয়েক মাস আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদেরকে তুলে নেওয়া হয়েছিলো। এ নিয়ে তখন থানায় তারা সাধারণ ডায়েরিও (জি ডি) করেছিলো। যদিও থানায় জি ডি’র নথি এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বোমা হামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কারাগারে বছরের পর বছর পচে মরছে। পরিবারের দাবি অনুযায়ী গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা যদি নির্দোষ হয়, তাহলে প্রকৃত অপরাধীরা কারাগারের বাইরে রয়েছে। হয়তো তারা পরবর্তী হামলার ছক কষতে বসেছে।


উপরের কাল্পনিক এই ঘটনা যে কেবল বাংলাদেশেই ঘটবে এমন নয়। অন্তত হানসাল মেহতা পরিচালিত শহিদ দেখলে তেমনই মনে হয়। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে হিন্দি ভাষার শহিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী শহিদ আজমির জীবন অবলম্বনে নির্মিত।


দুই.


সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে, বিশেষত ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাই হামলায় অভিযুক্ত কয়েকজনের আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময় শহিদ আজমি পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাই  (বোম্বে) দাঙ্গার সময় ১৪ বছর বয়সে শহিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে টাডা (Terrorist and Disruptive Activities (Prevention) Act¾TADA) আইনে গ্রেপ্তার হয়ে তাকে দিল্লির তিহার কারাগারে থাকতে হয় সাত বছর। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় শহিদের বিরুদ্ধে। যদিও তা প্রমাণ হয়নি। পরে তিনি ছাড়া পান। কারাগারে থাকতেই শহিদ পড়ালেখা শুরু করেন। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে আসামি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ের কুরলায় নিজ কার্যালয়ে চার আততায়ীর গুলিতে নিহত হন শহিদ। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ৩২ বছর। সাত বছরের পেশাগত জীবনে তিনি ভারতের বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী হামলায় গ্রেপ্তার ১৭ জনকে বেকসুর খালাস করেন। 


রাষ্ট্রযন্ত্রের কবল থেকে শহিদ আজমি যাদের রক্ষা করেছিলেন, তাদের চোখে নিশ্চিতভাবে তিনি নায়ক ছিলেন। যদিও হানসাল মেহতা’র এ চলচ্চিত্রে সতর্কতার সঙ্গে তার অনায়কোচিত উপস্থাপন; যেখানে নাটকীয় ঘটনার পরিবর্তে তিনি বাস্তব জীবনের চালচিত্রকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

শহিদ আজমির চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাজকুমার রাও। একদিকে শহিদ লড়াকু মানুষ, অন্যদিকে রোমান্টিক অথচ লাজুক এক প্রেমিক। বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া এক সন্তানের মা মরিয়মের সঙ্গে প্রেমের দৃশ্যে তার অভিনয় অনবদ্য। তাই হয়তো ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতা হন রাজকুমার রাও। আর সেরা নির্মাতার পুরস্কারও পান হানসাল মেহতা।



হানসালে’র চলচ্চিত্রে সত্যের প্রতি শহিদ আজমির দায়িত্ববোধ তুলে ধরা হয়েছে। বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে যেখানে দেখানো হয়, জঘন্য অপরাধের বিপরীতে একজন নায়কের নির্মাণ; এর পরিবর্তে হানসাল দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের অবিবেচক কর্মকাণ্ডের শিকার নিরীহ মানুষ। এছাড়া তথাকথিত গ্ল্যামার ছাড়াই আজমি আদালতে জয়ী হয়েছেন। এজলাসে বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথার চেয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে মামলায় জিতেছেন।


তিন.


শহিদ স্বল্প বাজেটের চলচ্চিত্র। স্বল্প পরিসরে শুটিং বলেই ক্লোজ-মিডক্লোজের ব্যবহার বেশি। এতে একটা দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে চলচ্চিত্রের চেহারায় তা ছাপ ফেলেনি, বরং চমৎকারভাবে মিলে গেছে এর বিষয়ের সঙ্গে। দুটো উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এক. ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস। মুম্বাইয়ের কুরলা এলাকায় ছোট্ট অফিস ঘরে পর পর গুলির শব্দ। একজন কর্মীর অস্ফুট আর্তনাদ, শহিদ ভাই। ব্যস এতোটুকুই। কারা গুলি করলো, কে গুলি খেলো, কিছুই জানা যায় না। এভাবেই চলচ্চিত্রের শুরু। দুই. ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাই দাঙ্গার দৃশ্য। দাঙ্গার দৃশ্য বলতে সচরাচর যা দর্শক এতদিন পর্দায় দেখে এসেছে, একেবারে তার বিপরীত দৃশ্যকল্প তুলে ধরেন হানসাল। একটি জ্বলন্ত শরীরের ছুটে যাওয়া; ছোটো ছোটো দৃশ্যে আধো অন্ধকার, আধো আলোয় কেবল ধারালো অস্ত্রের ওপর হাই-লাইট; উদভ্রান্ত, ভীত মানুষের আর্তনাদ আর ছুটে বেরিয়ে যাওয়া; ছোট্ট ঘরে জনাপাঁচেক মানুষের দমবন্ধ করে বসে থাকা। সবমিলিয়ে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে আসে। দাঙ্গার ভয়াবহতা আচ্ছন্ন করে।  


চলচ্চিত্রটিতে শহিদকে দেবতা বা ফেরেশতা হিসেবে দেখানো হয়নি। কিশোর বয়সে কাশ্মীরে জঙ্গি প্রশিক্ষণ, এমনকি তিহার কারাগারে থাকার সময় বিদেশি পর্যটক অপহরণের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ওমর শেখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। ওমর শেখ তার মগজ ধোলাইয়ের যথেষ্ট চেষ্টা করেন। অন্যদিকে আরেক হাজতি গোলাম নবীর অনুপ্রেরণায় কারাগারের ভিতর পড়ালেখা শুরু করেন শহিদ। গোলাম নবীর চেষ্টাতেই তিনি কারাগার থেকেও মুক্তি পান।


মুম্বাইয়ে বাড়িতে ফেরার পর শহিদের জীবনসংগ্রাম আরো তীব্র হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি তাকে আয়-রোজগার করতে হয়। কিন্তু লক্ষ্য ছিলো তার নির্দিষ্ট। পড়ালেখা শেষে তিনি আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন। মকবুল মেনন নামের এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অধীনে কাজও করেন কয়েক মাস। তখন তার উপলব্ধি-‘দুনিয়া টাকার জন্য পাগল হয়ে গেছে। আমি শুধু টাকার জন্য আইনজীবী হইনি।’ শহিদ ও তার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর কথোপকথন :

 

জ্যেষ্ঠ : শহিদ, কীভাবে আমাদের আয় হয়?

শহিদ : মামলা থেকে।

জ্যেষ্ঠ : গফফারের মামলার কী হলো?

শহিদ : তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি মিথ্যা কথা বলেছেন। পুলিশ ঠিকই বলেছে। তিনি দোষী।

জ্যেষ্ঠ : আমি জানি।

শহিদ : তাহলে তার পক্ষে আমরা লড়ছি কেনো?

জ্যেষ্ঠ : কারণ সে আমাদের মক্কেল।

শহিদ : যদি আমরা জানি মক্কেল দোষী, তাহলেও তার পক্ষে কাজ করবো?

জ্যেষ্ঠ : তুমি আমাকে আইন শেখাতে চাও? মামলা নেওয়ার পর আমরা কী করি?

শহিদ : প্রথমে আমরা তথ্য জোগাড় করি।

জ্যেষ্ঠ : তথ্য জোগাড় করার পর সেগুলো বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করি। আইনের বড়ো বড়ো বই পড়ে মামলা চালাতে গেলে সব সময়ই হারবে। 

শহিদ : আর সাক্ষী?

জ্যেষ্ঠ : তারা আমাদের হাতের খেলা। এ অফিস জনসেবার জন্য নয়।


পরে শহিদ স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস শুরু করেন। এটা একেবারে পরিষ্কার শহিদের কাজ তার কাছে নিছকই পেশা বা রোজগারের পথ নয়। শহিদ আদালতের শুনানিতে একবার বলেন, ‘তুমি যদি সন্ত্রাসবাদের দিকে যাও, আমি বিরোধিতা করবো। তার মানে এই নয় যে, আমরা কোনো নিরীহ ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়াই কারাগারে ঠেলে দেবো।’ যেসব দরিদ্র মানুষের মধ্যে শহিদ তার নিজের প্রতিফলন দেখতেন, সেসব মামলায় তিনি লড়তেন। হানসাল তার চলচ্চিত্রে বিষয়গুলো অতিরঞ্জিত না করে, বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন।


চার.


কিশোর শহিদকে টাডা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো, যা ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে বাতিল করা হয়। শহিদ যখন আইনজীবী, তখন তার মক্কেলদের গ্রেপ্তার করা হতো পি ও টি এ (দ্য প্রিভেনশন অব টেররিজম অ্যাক্ট) অথবা এম সি ও সি এ (দ্য মহারাষ্ট্র কন্ট্রোল অব অরগানাইজ ক্রাইম অ্যাক্ট) আইনে। পেশাগত নৈতিক অবস্থান থেকে শহিদ আসামি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করেন। সাধারণত বেশিরভাগ আইনজীবীর কাছে মক্কেল দোষী না নির্দোষ, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। কিন্তু শহিদ-এ দেখা যায়, শহিদের ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান রয়েছে। তিনি শুধু সেই মামলায় লড়েন, যখন তিনি বিশ্বাস করেন মক্কেল নির্দোষ।


নির্মাতা হানসাল চমৎকারভাবে এখানে বিচার প্রক্রিয়া তুলে ধরেছেন, যা ঐতিহ্যগতভাবে হিন্দি চলচ্চিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। রাঘব-বোয়ালের সঙ্গে চুনোপুঁটির লড়াই, স্যাটায়ারের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের জন্য আদালতের ‘মাহাত্ম্য’ ফুটে উঠেছে। নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে এসব বিষয়ের উপস্থাপন চলচ্চিত্রটিকে অনন্য করেছে। দর্শক দেখতে পায়, এজলাসে যেখানে জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেখানে আইনজীবীরা উচ্চকণ্ঠে ঝগড়াও করছেন। তবে পরস্পরের যুক্তিতর্ক তারা শুনছেন না। আপাতভাবে বিদ্বেষ ছাড়াই পুলিশ তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করছে, সাক্ষীরা মিথ্যা বলছে।


তিহার কারাগারে থাকার সময় শহিদ যার অনুপ্রেরণায় পড়ালেখা শুরু করেছিলেন, সেই গোলাম নবী তাকে বলেছিলেন, সমাজকে বদলাতে হলে সমাজের ভিতর থেকে বদলাতে হবে। তবে সমাজের ভিতরে থেকে সিস্টেমের অংশ হয়ে উঠার আশঙ্কা অমূলক নয়, যদি না লক্ষ্য স্থির থাকে। শহিদ যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, জীবনের যে লক্ষ্য স্থির করেছেন, কিছুই তাকে টলাতে পারেনি।


সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্তদের পক্ষে মামলা পরিচালনার সময় শহিদ ফোনে একাধিকবার হুমকি পেয়েছেন। কিন্তু তিনি ভীত হননি। পরিবারের সদস্যরা ভয় পেয়ে পুলিশ প্রহরার কথা বলেছেন। কিন্তু শহিদ এ বিষয়ে পুলিশকে কখনো কিছু বলেননি। এমনকি তিনি সাধারণ ডায়েরিও (জি ডি) করেননি। তবে কি পুলিশের ওপর তার আস্থা ছিলো না? নিজেও কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেননি। এক্ষেত্রে তিনি কি অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী ছিলেন? চলচ্চিত্রে অবশ্য এর উত্তর পাওয়া যায় না।


মামলার শুনানিতে শহিদ সবসময় তথ্যপ্রমাণ এবং এর যথাযথ উপস্থাপনের ওপর জোর দেন। আসামিদের জামিন আবেদন বার বার নামঞ্জুর হলেও তিনি হাল ছাড়েননি; তাদের আশার কথা শুনিয়েছেন। শুনানিতে শহিদ ব্যক্তিগত আক্রমণেরও শিকার হয়েছেন। প্রতিপক্ষের আইনজীবী যখন তার অতীত জীবনে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার কথা উল্লেখ করেন, শহিদ তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তখন তিনি প্রতিপক্ষকে প্রশ্ন করেন, ‘এখানে কি আমার বিচার হচ্ছে, নাকি অন্য কারো? কেউ কারাগারে থাকলেই সন্ত্রাসী হয়ে যায় না। তাহলে তো শিবাজী, ভগৎ সিংকেও সন্ত্রাসী বলতে হয়।’ প্রতিপক্ষ তখন প্রশ্ন করেন, শহিদ নিজেকে কি শিবাজী, ভগৎ সিং-এর সঙ্গে তুলনা করছেন? শহিদ বলেন, ‘তাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করছি না। শুধু বলতে চাই আপনি আমাকে অভিযুক্ত করছেন।’ এ রকম উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পর পরই শহিদ নিজেকে সামলে নেন। ফের সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন।


হুমকি-ধমকি ও শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, শহিদকে শারীরিকভাবে লাঞ্চনার শিকার হতে হয়। একবার আদালত থেকে বের হওয়ার সময় কয়েক ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালায়। তারা শহিদের মুখে কালি লেপ্টে দেয়। তাদের কথোপকথনে বোঝা যায়, শুনানিতে তাদের নেতার নাম (মহারাজ শিবাজী) উল্লেখ করায় তারা নাখোশ। অপ্রত্যাশিত এ ঘটনায় শহিদের মধ্যে রাগ বা ক্ষোভ দেখা যায় না। চলচ্চিত্রে এই একবারই তাকে হতাশ হতে দেখা যায়। আবহসঙ্গীত ও ক্লোজআপ শটে হানসাল চমৎকারভাবে বিষয়টি ফুটিয়ে তোলেন।


পাঁচ.


বাস্তব জীবনে শহিদ আজমিকে বার বার একথা শুনতে হয়েছে-কেনো তিনি সন্ত্রাসীদের পক্ষে মামলা লড়েন? নির্মাতা এক সাংবাদিককে দিয়ে শহিদকে এ প্রশ্ন করান। জবাবে শহিদ বলেন, ‘আপনি কি মনে করেন পুলিশ সবসময় ঠিক পথে চলে? তাহলে তো বিচারব্যবস্থারই প্রয়োজন হতো না। পুলিশ আপনাকে গ্রেপ্তার করলো আর আপনি অপরাধী হয়ে গেলেন!’ সেই সাংবাদিককে লক্ষ্য করে শহিদ আরো বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না যে, আপনি সত্যিটা জানেন না। অন্ততপক্ষে ঘটনার আশপাশ দিয়ে তো সত্য অনুসন্ধান করবেন। সাধারণ মানুষের মতো আপনিও একই কাজ করছেন!’ আরেক প্রশ্নের জবাবে শহিদ বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের পক্ষে মামলা লড়ি। তাদের অনেকেই আইনজীবীর ফি দিতে পারে না। ন্যায়বিচার পাওয়ার মতো তাদের আর্থিক সক্ষমতাও নেই। আমি তাদের জন্য আদালতে কাজ করি, সন্ত্রাসীদের জন্য নয়।’


সাংবাদিকের পরের প্রশ্ন-লাইমলাইটে থাকার জন্যই আপনি এগুলো করেন? তবে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি শহিদ। একপর্যায়ে ওই নারী সাংবাদিক জানান, তার এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাকে এসব প্রশ্ন লিখে দিয়েছেন। শহিদ তখন বলেন, ‘আপনার সিনিয়রকে বলবেন, যেনো সত্য জানার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন না লিখে যেনো সত্য খোঁজার চেষ্টা করেন।’


শহিদ আজমি সেসব মানুষের পক্ষে আদালতে লড়েছেন, যাদের বলির পাঠা হিসেবে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। অথচ জঘন্য কাজের জন্য যারা দায়ী, তারা মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তারা পরবর্তী হামলার ছক কষছে; অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে কারাগারে ঢোকানো হচ্ছে। এসব সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান। আদালতে শুনানির একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, ‘শুধুমাত্র ম্যাথুউ, ডোনাল্ড, সুরেশ বা অন্য কোনো নাম না হওয়ার কারণে ওই সব মানুষকে কারাগারে রাখা হচ্ছে।’


নামের শক্তিশালী ক্ষমতা রয়েছে। শহিদ শব্দের মূল, আরবি থেকে উর্দুতে এসেছে। এর দুটি অর্থ-সাক্ষী ও মহৎ কাজের জন্য জীবন উৎসর্গ। শহিদ আজমি উভয়ই ছিলেন।

 

লেখক : জাহাঙ্গীর আলম, প্রথম আলো পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।


alam_rumc05@yahoo.com

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন