আব্দুর রহমান আকন্দ
প্রকাশিত ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি’ : সরু গলিতে জীবন দেখা
আব্দুর রহমান আকন্দ

প্রাণের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক আত্মিক। কারণ প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য যেকোনো উপায়েই খাবারের প্রয়োজন। তাই ক্ষুধা প্রাণীর জৈবিক সত্তার অংশ। আদিম যুগে মানুষ ও পশুর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিলো না। টিকে থাকার জন্য এরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে সংগ্রামটা চালিয়ে যেতো। খাদ্যের জন্য উভয়েই প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলো; আবার কখনো একে অন্যের ওপরও। প্রাকৃতিক যেকোনো দুর্যোগ, মানুষ ও পশুকে এক করে ফেলতো। বেঁচে থাকার তাগিদে কখনো পশু মানুষের আবার মানুষ পশুর খাদ্যে পরিণত হতো। সময়ের সঙ্গে মানুষের এই পরিবর্তন হলেও মৌলিক অনেক ক্ষেত্রে কিন্তু মানুষ, পশুর বিপরীত ও সহাবস্থান এখনো আছে। বিবেক বুদ্ধির জোরে মানুষ পশু থেকে নিজেকে অনেক দূরে নিলেও ক্ষুধার অনুভূতি কিন্তু সব প্রাণীরই সমান। মানুষ ও পশু ক্ষুধার কারণে যেকোনো সময় একে অন্যের কতো কাছে আসতে পারে-অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘স্পর্শদোষ’ ছোটগল্পটি তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ইরানের নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি দেখতে দেখতে ঠিক একই ধরনের কথা মনে আসে। ‘স্পর্শদোষ’-এ ভজার সঙ্গে খেঁকী নামে কুকুরটির ফুটপাতে ধাক্কা অতঃপর দুটি প্রাণের আপসহীন দ্বন্দ্ব; ক্ষুধার কারণে বার বার একে অপরের কাছে আসা; একপর্যায়ে একজন অন্যজনকে বুকে টেনে নেওয়া, এসবের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালির। যদিও চলচ্চিত্রে এবং গল্পে কুকুর ও মানুষের প্রথম সাক্ষাৎটা মোটেও সুখকর ছিলো না। ‘স্পর্শদোষ’-এ ব্যস্ত ফুটপাতে ভজার হাঁটু এবং খেঁকীর থুতনির ধাক্কা; দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালিতে বালককে কুকুরের তাড়া; খাদ্যের জন্য খেঁকী-ভজার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া কিংবা বালকের কাছে কুকুরের বশ্যতা স্বীকার, একে অন্যের সংস্পর্শে আসা; অন্যদিকে খেঁকীর মৃত্যু-সবটাই ঘটে কেবলই খাবারের জন্য।
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে নিয়ে কিছু বলে নেওয়া জরুরি মনে করছি। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক অনন্য নাম আব্বাস কিয়ারোস্তামি। একাধারে তিনি চলচ্চিত্রনির্মাতা, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক, আলোকচিত্রী ও কবি। কিংবদন্তি এই চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের জন্ম ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন, তেহরানে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই প্যারিসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান আব্বাস। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে পদচারণা শুরু তার। দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি নিয়েই এ লেখা।
দুই.
দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালির শুরু টিনের কৌটা পা দিয়ে খেলতে খেলতে সরু গলি দিয়ে বালকের এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। বালক আপন মনে এগোতে থাকে। টিনের কৌটাটি এগিয়ে নেওয়াই যেনো তার একমাত্র কাজ। যেমন করে সময় মানুষকে মৃদু মৃদু ধাক্কায় এগিয়ে নিয়ে যায়; বালকও পায়ের মৃদু ধাক্কায় কৌটাটি এগিয়ে নিতে থাকে। হয়তো এই এগিয়ে নেওয়াটাই জীবন। এসবের মধ্যেই দ্রুত জীবনের সময় পার হয়ে যায়! চোখ বুজলেই কতশত স্মৃতি মনে ভিড় করেজ্জবন্ধুদের সঙ্গে খেলা, আম চুরি, স্কুল পালানো। মানুষ যে খুব বেশিক্ষণ এই ভাবনা নিয়ে থাকতে পারে, এমন নয়। কারণ সময় তাকে নতুন কিছুর দিকে ধাবিত করে। প্রতিনিয়ত সে এক অজানা রাস্তা, অজানা বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করে। সেই রাস্তা যেমন গোলাপের পাপড়ি বিছানো, তেমনই কণ্টকময়ও হতে পারে।
বালকের হাতে রুটি। বালক তার রাস্তায় আপন মনে চলতে থাকে। পৃথিবীর সব মানুষই যার যার রাস্তায় নিজের মতো করে চলতে চায়; অনেকে পারে, অনেকে পারে না। নানা কারণে নানা দিকে বাঁক নেয় সেই পথ। অনেক সময় জীবন থেমে যায়। যেমনটা থেমে গেছে নারায়ণগঞ্জের ত্বকী, কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লিপুদের জীবন। থামিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের পথচলা। এই হিংস্রতার শেষ কোথায় জানা যায় না। এই হিংস্রতার উৎসভূমিইবা কোথায়? হিংস্রতাও জৈবিকভাবে ধারণ করে। সুতরাং মানুষের বিপক্ষে মানুষের দানবীয় নির্মম হওয়ার প্রবণতা তার মধ্যেই লুকানো থাকে। তাই কখনো কখনো মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা, হত্যা, শাসন আরেকজনকে আনন্দ দেয়। এই প্রবণতাকে জৈবিকভাবে স্বীকার করে নিলেও, একে নিয়ন্ত্রণের দক্ষতাও তার থাকা জরুরি।
চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ১২ সেকেন্ডে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলা বালক বেওয়ারিশ কুকুরের সামনে পড়ে। ক্ষুধার্ত কুকুর তখন ধাওয়া করে বালককে। বালকের আর সামনে এগোনো হয় না। সে দৌড়ে আগের রাস্তা ধরে একটু পিছন ফিরে এসে দাঁড়িয়ে থাকে; অপেক্ষা করে কারো জন্য। যে তাকে কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করবে, গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা যখন চরমে, মানবতা যখন পদদলিত; বেঁচে থাকা যখন বেদনাদায়ক, ক্লান্তিকর, গ্লানিময়, অর্থহীন; ঠিক সেই মুহূর্তে ইংরেজ নাট্যকার স্যামুয়েল বার্কলে বেকেট তার নাটক ‘ওয়েটিং ফর গডো’১ নিয়ে হাজির হন বিশ্ব দরবারে। সেই থেকে চলছে গডো’র জন্য অপেক্ষা। গডো এসে গ্লানি, বেদনা সব দূরে সরিয়ে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগাবে। কিন্তু গডো আর আসে না। নাটকের প্রথম দৃশ্যের শেষে এক বালকের নিয়ে আসা গডো’র বার্তায় শুধু অপেক্ষাই প্রকাশ- He won’t come this evening; but he’ll come tomorrow. দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালির সেই বালকও কারো জন্য অপেক্ষা করে। তার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে; কেউ তাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয় না।
তিন.
গডো’র অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বালকের পাশ দিয়ে গাধাওয়ালা, সাইকেল চালক ও পথচারী যায়। তাদের সবার চলার গতি ভিন্ন ভিন্ন। বালক দাঁড়িয়েই থাকে। গতির বিপরীতে থাকে গতিহীনতা। আর এই দুটোর সমন্বয়েই জীবন। চলচ্চিত্রের পাঁচ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে এক বৃদ্ধকে পায়ে হেঁটে গলি ধরে আসতে দেখা যায়। বৃদ্ধ ও বালকের চলার খানিকটা রাস্তা একই। বৃদ্ধ হাঁটতে হাঁটতে যখন বালককে অতিক্রম করেন, তখনই সে (বালক) বৃদ্ধের পিছু নেয়। বালকের কাছে বৃদ্ধ এক অর্থে গডো হিসেবে হাজির হন। বৃদ্ধ তার রাস্তায় আপন মনে চলেন; বালকের দিকে তার কোনো খেয়াল নেই। কিন্তু কুকুরটি গলির যেখানে বসে আছে, তার আগেই বৃদ্ধ অন্য একটি গলিতে প্রবেশ করেন। বালকের গন্তব্য পর্যন্ত পাশে থাকেন না বৃদ্ধ।
বালক অসহায়ের মতো বৃদ্ধের চলে যাওয়া দেখতে থাকে। বালকের দৃষ্টির আড়ালে বৃদ্ধ চলে গেলে সে রাস্তার চতুর্দিকে দেখে নেয়, আর কেউ আছে কি না? কাউকে না পেয়ে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। গডো’র অপেক্ষা শেষ হয় বালকের। তারপর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত নিজেই পদক্ষেপ নেয়। সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মানুষই কোনো একজনের জন্য অপেক্ষা করে। যে তার বিপদ দূর করে দেবে, সামনে এগিয়ে নেবে। প্রকৃতপক্ষে কেউ আসে না; সঙ্কট উতরানোর জন্য নিজেকেই পদক্ষেপ নিতে হয়।
এবার কুকুরের বসে থাকার বিপরীত পাশ ধরে এগোতে থাকে বালক। কুকুরটি বালকের দিকে তেড়ে আসে। তৎক্ষণাৎ ওই বালক নিজেকে রক্ষার কৌশল হিসেবে এক খণ্ড রুটি তার দিকে ছুড়ে মারে। তাতে বেশ কাজও হয়; ক্ষিপ্ত কুকুরটি বশে আসে। সেই সুযোগে বালক চলতে শুরু করলে কুকুরটি লেজ নাড়তে নাড়তে তার সঙ্গে চলতে থাকে। কিছু সময় পর তারা বাড়ি পৌঁছায়।
বালক বাড়ির প্রধান ফটকে এসে কলিংবেল চাপে। কুকুরটি তখন বালকের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে। যেনো দুজনেই ফটকের কপাট খোলার অপেক্ষায়। ভিতর থেকে এক নারী এসে কপাট খুলে দেন এবং বালক ভিতরে ঢুকে যায়। তারপর ওই নারী রাস্তার এপাশ-ওপাশ দেখে ফটকটি বন্ধ করে দেন। বালকের সঙ্গে ভিতরে আর ঢোকা হয় না কুকুরের। কুকুরটি ফটকের সামনে বসে জিহ্বা বের করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে এবং জিহ্বা দিয়ে মুখ মোছে। এ পর্যায়ে কুকুরটি কোনো গডো’র অপেক্ষায়জ্জমাটির সঙ্গে মুখ লাগিয়ে শুয়ে থাকেজ্জযে তার ক্ষুধা নিবারণ করবে। কিন্তু ফটক খুলে সেই গডো আর আসে না। তাই নিজেকেই ক্ষুধা নিবারণের পথ বাতলে নিতে হয়। ফটকের সামনে শুয়ে থাকতেই অন্য আরেক বালক ওই গলি ধরে খাবার নিয়ে আসলে সে আবার ওই কুকুরটির আক্রমণের শিকার হয়। এ যেনো এক চক্র।
চার.
রাস্তার কুকুর আক্রমণ করে, আবার বশও মানে। সেই কুকুর সময়ের সঙ্গে একজনকে ছেড়ে আরেকজনের পিছু নেয়। কুকুরের এই আচরণ ব্যক্তিমানুষকে বিরক্ত, শঙ্কিত করে; একই সঙ্গে সভ্য সমাজে কুকুর দিনশেষে মানুষের কাছে ‘কুকুর’ই হয়ে ওঠে। কিন্তু এ প্রশ্ন কেউই তোলে না, রাস্তার কুকুরটিকে কেনো পথচারী বালককে আক্রমণ করতে হয়! আবার কুকুরের হাত থেকে বাঁচতে বালকইবা কেনো কৌশল অবলম্বন করে? ‘স্পর্শদোষ’-এ ভজার গচ্ছিত খাবার খেঁকী ভক্ষণ করতে গেলে তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয়। খেঁকীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলে সে দ্বন্দ্ব। খাদ্যের কারণে তারা একে অন্যের কাছে আসে, আক্রমণে উদ্যত হয়; খেঁকী সেই সময় ভজার মধ্যে আবিষ্কার করে নিজেকে। এই সহাবস্থান ও বৈপরীত্য কেবলই বেঁচে থাকার জন্য। কোনো না কোনোভাবে এই বেঁচে থাকাটাই তো জীবন।
টিকা
১. স্যামুয়েল বার্কলে বেকেট-এর ‘ওয়েটিং ফর গডো’ একটি অ্যাবসার্ডধর্মী নাটক। এটি ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ হয়। নাটকটি ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি প্যারিসের বামতীরের থিয়েটার ডে ব্যাবিলনে প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকের জন্য বেকেট ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।
লেখক : আব্দুর রহমান আকন্দ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
akondmcj25@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন