বিউটি মন্ডল
প্রকাশিত ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পিঙ্ক : রাষ্ট্র ও ক্ষমতার নগ্ন চরিত্রের আড়ালে আবেগীয় নারী-বন্দনা
বিউটি মন্ডল

সামাজিক চেহারায় নারী ‘ধূসর কঙ্কাল’
নারী নিয়ে ভালো-মন্দ যাই বলি না কেনো, অনেকের মনে হতে পারে, এতো কথার দরকার কী? এ তো বহুকাল ধরেই শুনে আসছি। এতো প্রচার, আন্দোলনের পরও নারীর প্রতি বৈষম্য কিন্তু এখনো দূর হয়নি। বাহ্যিক চেহারায় হয়তো কিছু পরিবর্তন এসেছে। একবিংশ শতাব্দীতে সারাবিশ্ব যখন বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে চলছে, তখনো নারীর অধিকার নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়; বুঝতে অসুবিধা হয় না, আমরা মানসিকভাবে কোথায় আছি। আসলে শৈশব থেকেই ব্যক্তিমানুষের চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা, কাজ-কর্ম, সংস্কৃতিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ‘তুমি নারী’, ‘তুমি পুরুষ’। যেমনটা সম্প্রতি বাংলাদেশের শিশুশ্রেণির পাঠ্যবইয়েও দেখতে পাই। যেখানে শিশুদের বলেই দেওয়া হয়েছে কার পোশাক কেমন হবে, কারা কী ব্যবহার করবে। বাংলা বর্ণ পরিচয়ে দেওয়া হয়েছে, ও-তে ওড়না। এমনকি ছবি এঁকে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে ওড়নাটা কে পরবে!
এই পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা নারীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান না দিয়ে অবলা, দুর্বল হিসেবে দেখতেই পছন্দ করে। জন্মের সময় এ নারী তো জানে না, সে নারী নাকি পুরুষ। কিন্তু জন্মের পর পদে পদে তাকে টিপ পরিয়ে, পুতুল খেলিয়ে, রান্নাবাটি ধরিয়ে, বাইরে বেরুনোর নানা বাধ্যবাধকতা দিয়ে সামাজিকভাবে ক্রমশ নারী করে তোলা হয়। তার সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় নানা ‘কোড অব কন্ডাক্ট’। লিঙ্গের কৃত্রিম ধারণা ও বিভাজন আরোপ করে তারই সমাজ। আচরণ, আলাপচারিতা, সাহিত্য, দর্শন, গান, কবিতা, ঠাট্টা, পোশাক নির্বাচন-এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে চলে লিঙ্গ নির্মাণ।
সমাজে পুরুষের আরোপিত এ বৈষম্যের পাশাপাশি বন্ধ হয়নি নারীর ওপর পৈশাচিক নির্যাতন। প্রতিনিয়ত তথাকথিত মামা-কাকা নামধারী পুরুষের হাতে ধর্ষিত হচ্ছে নারী। এমনকি নিজের স্বামীর কাছেও ধর্ষিত হয় তারা! শারীরিক সম্পর্কে নারীর সম্মতি আছে কি নেই, তা জানার প্রয়োজনই বোধ করে না অধিকাংশ পুরুষ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করে, যৌন হেনস্তার অধিকারও পুরুষের আছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগের অধিকার নারীর নেই। বিশেষ করে সে পুরুষ যদি ক্ষমতাবান হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। অভ্যন্তরীণ এসব অত্যাচারের খবর গণমাধ্যমে তেমন উঠেও আসে না। অধিকাংশ সময় ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখিয়ে ধর্ষক পার পেয়ে যায়। নারীরাও নির্লজ্জ, পাপিষ্ঠা, নষ্টা, অসতী, কুলটা শব্দে ভূষিত হওয়ার ভয়ে মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে পারে না। রাষ্ট্র, সমাজ, এমনকি তার পরিবারও অনেক সময় তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কঠিন হয়ে পড়ে নারীর বেঁচে থাকা। এ বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী নির্মাণ করেছেন হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র পিঙ্ক (২০১৬)। যার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন নারীর সামাজিক অবস্থান; প্রশ্ন তুলেছেন নারীবিষয়ক ডিসকোর্স নিয়েও। পিঙ্ক বর্তমান সমাজ, নারী, নারীর জীবনকে কীভাবে প্রতিফলিত করে কিংবা আদৌ করে কি না তা তুলে আনার চেষ্টা থাকবে এ প্রবন্ধে।
চেনা সুরে অচেনা গল্প পিঙ্ক
কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত নির্মাতা অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই কলকাতায় জন্ম অনিরুদ্ধের; ডাকনাম টনি চৌধুরী। অল্প সময়ের মধ্যে টনি বাংলা ভাষায় বেশকিছু ভালো চলচ্চিত্র দর্শককে উপহার দিয়েছেন। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে তার অন্তহীন (২০০৮) সেরা বাংলা চলচ্চিত্রসহ চারটি বিভাগে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেয়। পিঙ্ক বলিউডে নির্মিত অনিরুদ্ধের প্রথম চলচ্চিত্র। সমালোচকদের মতে, অনিরুদ্ধের অন্য সব চলচ্চিত্রের চেয়ে পিঙ্ক একটু আলাদা। এবার দেখা যাক ‘একটু আলাদা’ পিঙ্ক-এ ঠিক কী আছে।
মিনাল, ফালাক আর আন্দ্রিয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের তিন কর্মজীবী নারী। চাকরির সুবাদে একই ফ্ল্যাটে বসবাস করেন তারা। একদিন তারা রক শো’তে গেলে দেখা হয় পুরনো বন্ধু বিশ্বজ্যোতির সঙ্গে। এরপর বিশ্বজ্যোতির অনুরোধে দুই বান্ধবীকে নিয়ে এক রিসোর্টে ডিনারে যান মিনাল। বিশ্বজ্যোতির সঙ্গে তার বন্ধু রাজিব ও রনাকানন্ধও (ডাম্পি) যোগ দেয়। ঘটনার একপর্যায়ে রাজিব ও ডাম্পি ধর্ষণের চেষ্টা করে মিনাল ও আন্দ্রিয়াকে। আত্মরক্ষার তাগিদে রাজিবের মাথায় বোতল দিয়ে আঘাত করেন মিনাল। এ ঘটনায় রাজিব আহত হলে ঘাবড়ে গিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসে মিনাল’রা। এরপর রাজিব ও তার বন্ধুরা প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে; হুমকি দিতে থাকে মিনাল, ফালাক আর আন্দ্রিয়াকে। মিনাল এ ব্যাপারে পুলিশের কাছে গেলে অভিযোগ নেয় না পুলিশ। বিষয়টি জানতে পেরে রাজিবরাই উল্টো মিনালের নামে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে। মিনাল’কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে সবাই তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঠিক তখনই তাদের পাশে দাঁড়ান আইনজীবী দীপক শেহগাল।
দীপকের সাহায্যে জামিনে মুক্তি পান মিনাল। কিন্তু মামলার কার্যক্রম শুরু হলে নানাভাবে দোষারোপ করা হয় মিনাল’দের। ক্ষমতা আর টাকার প্রভাবে রাজিবরা রিসোর্টের মালিক, কর্মচারী, চিকিৎসক ও পুলিশকে নিজেদের দলে টেনে নেয়। সবাই সাক্ষ্য দেয় মিনাল’দের বিপক্ষে। বাদী পক্ষের আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন মিনাল’দের চরিত্র, পেশা, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। তাদের আইনজীবী দীপক বিষয়গুলোকে যুক্তি দিয়ে নাকচ করে দেন। এভাবেই কাহিনির জল গড়ায় বাস্তব আর সামাজিক পরিস্থিতিকে সঙ্গী করে।
নারী, তোমার পাশে কেউ-ই নেই
আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিলাম
দরজায়, তখন গোধূলি। আমার গালে
লাল হয়ে বসে গেছে দাদাজানের চড়ের
দাগ। বেয়াদব, দাদাজান বললেন,
তুই কেমনে তাদেরে তোর শরীর
ছুঁইতে দিলি?
... চইলা যা, আর
আসিস না, দাদাজান বলেছিলেন। আমি তাঁর
ফেরানো পিঠ পেরিয়ে গেলাম। পার হলাম
সদ্য তুলে আনা লিচুভর্তি হলুদ ঝুড়ি।
সিঁড়িতে বসে চালের গুড়ি টালতে থাকা
আমার মায়ের পাশ ঘেঁষে ফিরলাম,
মা একবারও চোখ তুলে দেখলো না
আমাকে ...১
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধে এক ধর্ষিতার (বীরাঙ্গনা) জীবনের গল্প এটি; যিনি যুদ্ধের পর পরিবারের কাছে ফিরলেও গ্রহণ করেনি কেউই। উল্টো তাকেই সেই ঘটনার জন্য দায়ী করে নির্যাতন করা হয়। যুদ্ধের পর এমন প্রায় ১০ লক্ষ নারীকে বীরের মর্যাদা দেয় রাষ্ট্র। বীর থেকে নারীর উপাধি দেওয়া হয় বীরাঙ্গনা। কিন্তু এর পবরর্তী সময়ে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। বীরাঙ্গনাদের মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় অনেকেই। কেড়ে নেওয়া হয় শেষ আশ্রয়টুকুও। স্বাধীনতা যুদ্ধের আজ ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। বদলেছে চারপাশ; সঙ্গে মানুষ ও প্রকৃতি। কিন্তু আজও ধর্ষিতাদের পরিস্থিতি বদলায়নি।
ধর্ষণের মতো একটি ঘটনা নিঃসন্দেহে ধর্ষিতার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। লজ্জা ও ভয় তাকে বেঁধে ফেলে। কাউকে কিছু বলতে পারেন না তিনি। ফলে প্রথমেই তার মাথায় ধর্ষকের শাস্তির কথা চিন্তাতেও আসে না। তিনি বিষয়টাকে ভুলে থাকতে চান। অধিকাংশই সেসময় তার সব থেকে কাছের মানুষটির সান্নিধ্য চায়। কিন্তু একজন ধর্ষিতা কি তার কাছের মানুষগুলোকে পাশে পান? চলচ্চিত্রে ২৫ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে দেখা যায়, যৌন হয়রানির কথা বলতে গেলে ফালাকের প্রেমিক অধ্যাপক জাবেদ তার পাশে দাঁড়াননি। উল্টো ছেলেদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য তাকেই দোষারোপ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এছাড়া আদালতে যখন বাদী পক্ষের আইনজীবী প্রমাণের চেষ্টা করেন ফালাকরা বেশ্যাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত, তখন জাবেদ তার সঙ্গে সব সম্পর্ক পর্যন্ত ছেদ করেন। অন্যদিকে মুখে কিছু না বললেও বাদী পক্ষের আইনজীবী যখন একের পর এক মিনালকে প্রশ্ন করতে থাকেন, তখন তার বাবা আদালত থেকে বেরিয়ে যান। শুনানি শেষে মিনালের বাবা তার বান্ধবীদের বলেন, মিনালের সবকিছু গুছিয়ে দিতে। তার মুখাবয়ব দেখে মনে হয় এসব ঘটনার জন্য মিনালই দায়ী। মেয়ের এহেন কর্মে তিনি লজ্জিত; একই সঙ্গে দুঃখিতও।
মনে পড়ে যায় ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ভাড়াবাড়ির মালিকের ছেলের কাছে ১৭ বছর বয়সি কারিশমা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা। যেখানে ধর্ষণের ফলে মেয়েটি গর্ভবতী হয়। ঘটনা জানাজানি হলে সব দোষ তার ওপর চাপিয়ে কারিশমার মা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন।২ বুঝতে অসুবিধা হয় না, চেতনে-অবচেতনে সমাজে কীভাবে চলে পুরুষতান্ত্রিক চর্চা। যে সমাজব্যবস্থা সংসার সুখী হওয়ার সমস্ত দায় নারীর কাঁধে চাপিয়ে দেয়, হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রাখে ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে’র মতো ছবক। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পাঠ্যপুস্তকে থাকে লিঙ্গবৈষম্যের পাঠ! ফলে এ সমাজে নারীও নারীকে বোঝে না সহজে। সে কারণেই হয়তো নিত্তনৈমিত্তিকভাবে এসব ঘটনা ঘটছে, ঘটবে!
চলচ্চিত্রে মিনালের বাবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে মেয়ের প্রতি হওয়া অন্যায়ের কোনো প্রতিবাদ করেন না। মেয়েকেও কিছু বলেন না। কেবল নীরবে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। অবশ্য সবসময় যে ধর্ষিতা নারীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া কিংবা নীরবে মেনে নেওয়ার ঘটনা ঘটে, তেমন নয়। অনেক পরিবারই চায় ধর্ষকের শাস্তি হোক। তাই শেষ পর্যন্ত তারা শরণাপন্ন হয় আধুনিক রাষ্ট্রের শেষ আশ্রয়স্থল থানা-আদালতে। কিন্তু সেখানেও অধিকাংশ সময় থাকে পুরুষতন্ত্রের সেই ‘ভূত’। কেননা আদালতে যাওয়ার আগেই পুরুষ-পুলিশের জেরায় আরেকবার তাকে ধর্ষিত হতে হয়।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা পুলিশ চেষ্টা করে নির্যাতিত পরিবারকে টাকাপয়সা দিয়ে, ভয় দেখিয়ে কিংবা ধর্ষক-ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে বিষয়টা মিটিয়ে ফেলতে। অনেক সময় সবকিছু ছাড়িয়ে মামলা আদালতে উঠলে নারীর মুখের কথা নয়, শরীর দিয়ে প্রমাণ করতে হয়, সে ধর্ষিত হয়েছে। বিচারের নামে চলে চরম ‘নিষ্ঠুরতা’। বিবাদী পক্ষের আইনজীবী প্রাণপণে চেষ্টা করেন নারীকে বহুগামী, চরিত্রহীন, বারবনিতা প্রমাণের। চলে ‘অশালীন’ প্রশ্নের ঝড়। এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই আরো একবার ধর্ষণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় ওই নারী। ধর্ষিতাকে বর্ণনা করতে হয় ঘটে যাওয়া বীভৎস আখ্যান। একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে ডাক্তারি পরীক্ষা দিতে গিয়েও। পাশাপাশি যতো দিন যায়, পরিবারকে শুনতে হয়-‘পোশাক, আচার-আচরণের কারণেই মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে।’ যুক্তি দেওয়া হয়, ‘অন্য মেয়েরা কেনো ধর্ষণের শিকার হয় না।’ চলচ্চিত্রে পুলিশ ও বাদী পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্যেও একই কথা শোনা যায়। অথচ ভারতে বেশিরভাগ ধর্ষণের মামলাতেই দেখা গেছে, ধর্ষিতা সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি পরেছিলেন। অর্থাৎ শরীর প্রদর্শন বা তথাকথিত আধুনিক পোশাক না পরে, ভারতীয় নারীর ‘আদর্শ’ পোশাক হিসেবে পরিচিত সালোয়ার কামিজ পরেই নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে!
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২০ মিনিট ৪১ সেকেন্ডে আদালতে মিনালের চরিত্র নিয়ে বাদী পক্ষের আইনজীবীকে বিভিন্ন মন্তব্য করতে দেখা যায়। আর বাইরে চলে এই ঘটনার সরাসরি সম্প্রচার। যদিও গণমাধ্যমে ঠিক কী সম্প্রচার হচ্ছে সেটা দেখানো হয় না। ফলে কোনো নারী ধর্ষিত হলে পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজের গণমাধ্যমে কীভাবে তা সম্প্রচার হয় এবং মিনাল, ফালাক, আন্দ্রিয়ার পরিবারের জন্য তা কতোটা পীড়াদায়ক সেটাও জানা যায় না। বোঝা যায় না রাজিবরা সেগুলো দেখে কতো উল্লাস করে! বর্তমানে কোনো নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও গণমাধ্যম কেনো জানি সুযোগ পেলেই তার চরিত্র নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে! সম্প্রতি খুন হওয়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু কিংবা কলেজ ছাত্রী তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অন্তত তাই বলে। আসলে গণমাধ্যম এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেতে ওঠে তাদের কাটতি বা টি আর পি বাড়ানোর খেলায়। আর ধর্ষণের খবর পেলে চলে ‘সৃজনশীলভাবে’ আরো একবার পাঠককে দিয়ে ধর্ষণ করার মতো সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়া। সেজন্যই হয়তো তরুণী ধর্ষণ, যুবতী ধর্ষণ, রাতভর ধর্ষণ, পালাক্রমে ধর্ষণ, জঙ্গলে ধর্ষণ-এমন নানা বিশেষণে তা সংবাদে উপস্থাপন করে তারা। যা পুরুষ পাঠককে ছদ্ম-সঙ্গমের খোরাক জোগায়। কিন্তু পিঙ্ক-এ এসব ঘটনার সংবাদ প্রকাশ নিয়ে নির্মাতার অবস্থান ঠিক পরিষ্কার নয়। ভারতের গণমাধ্যম এক্ষেত্রে ঠিক কী করে, তা কৌশলে আড়ালেই রেখে দেন নির্মাতা।
ভাবছি কতোটা নির্ভয়ে বলা যায় ...
বিচারক সত্যজিৎ দত্ত উপযুক্ত প্রমাণ না থাকায় হত্যা চেষ্টার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন মিনালকে। শাস্তি দেন রাজিবদের। আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ায় মিনাল, ফালাক আর আন্দ্রিয়া একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। কৃতজ্ঞতা জানায় তাদের আইনজীবী দীপককে। মামলায় হেরে গিয়েও বাদী পক্ষের আইনজীবী হাত মেলান দীপকের সঙ্গে। এরপর একে একে সবাই বেরিয়ে যায় আদালত থেকে। সবশেষে দীপক যখন বের হন, তখন দরজায় অপেক্ষায় থাকা এক নারী পুলিশ অশ্রুসিক্ত নয়নে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। দীপকও হাত মেলান। সঙ্গে করুণ আবহসঙ্গীত পরিস্থিতিকে যেনো আরো ভারী করে তোলে। পিঙ্ক-এর এসব দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে, ভারতের নারীরা প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তার উম্মোচন এবং মিনালের মতো নিরাপরাধ নারীদের বিচার পাইয়ে দেওয়ায় দীপকের প্রতি সবার এতো সম্মান। নারী পুলিশের আইনের প্রতি কতো অগাধ বিশ্বাস! অথচ বাস্তব অবস্থা মোটেও সেরকম নয়। মিনালরা যেভাবে হাসে, আবেগে সুখের কান্না করে; ভারতের বেশিরভাগ নারী এই হাসি হাসতে পারে না। তাদের সারাজীবনে কেবল কান্না আর আতঙ্কই থেকে যায়। এর একটি বড়ো কারণ-ভারতে ধর্ষণবিরোধী আইনে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকা। এক্ষেত্রে কখনো বিচারক যদি মনে করেন, ধর্ষকের অপরাধ ততোটা গুরুতর নয়, যতোটা ধর্ষিতা বলছে, সেক্ষেত্রে অপরাধীর লঘু শাস্তি তিনি দিতে পারেন!৩
সম্প্রতি মুম্বাইয়ের সর্বোচ্চ আদালত আলোচিত নির্ভয়া ধর্ষণ মামলার রায়ে অভিযুক্ত সবার ফাঁসির রায় দিয়েছেন। এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে পুরো ভারতবর্ষ। কিন্তু এই রায়ের ঠিক আগের দিন মুম্বাই হাইকোর্টের দেওয়া ২০০২ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের দাঙ্গায় বিলকিস ধর্ষণ মামলার রায় নিয়ে একটি বিতর্ক শুরু হয়। ওই ঘটনার সময় বিলকিস পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিলেন; তার চোখের সামনে মা, মেয়ে, ছোটোভাইসহ পরিবারের ১০ সদস্যকে হত্যা করা হয়। কিন্তু মামলার রায়ে অভিযুক্ত ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। প্রশ্ন উঠেছে, দুটি ঘটনাই নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ভয়াবহতম দৃষ্টান্ত; দুটি ঘটনার মধ্যে তুলনা করাটা নিষ্ঠুরতা ও অপ্রয়োজনীয় হলেও কেনো একটি ঘটনায় ফাঁসি এবং আরেকটি ঘটনায় যাবজ্জীন কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হলো?৪ ফলে বিলকিস মুসলমান হওয়ায় তিনি প্রকৃত বিচার পাননি-এমন প্রশ্ন বিরোধী দল তুললেও সেটা একেবারেই অমূলক ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ গুজরাটের ওই দাঙ্গার সময় সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেসময় দাঙ্গা দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি সেটা নেননি, বরং তার দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলো বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে এ মামলার রায়ে কেনো সবার ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন হয়, সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না।
তাছাড়া ভারতের বিচার বিভাগ নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাঁটির পর দেখা যায়, কলকাতা হাইকোর্টে প্রতিদিন একজন বিচারকের দায়িত্বে থাকে একশো ৬৩টি মামলা। এতে বিচারক একটি মামলার শুনানির জন্য সময় পান মাত্র দুই মিনিট!৫ কিন্তু পিঙ্ক-এর বিচারক সত্যজিতের আচরণ দেখে মনে হয়, ভারতে ধর্ষিতা নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য বিচার বিভাগ ও আইনজীবীরা কতো তৎপর! তাদের হাতে সময়ও আছে অঢেল। ফলে এভাবে প্রতিনিয়ত ধর্ষিতারা বিচার পাচ্ছে। কিন্তু ঘটনা কি আসলে তাই? ভারতে প্রতি ২২ মিনিটে একটি ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে।৬ অর্থাৎ এক দিনে ৬৫ জন, এক মাসে এক হাজার নয়শো ৬৩ জন এবং এক বছরে ধর্ষিত হয় ২৩ হাজার পাঁচশো ৬৪ জন নারী। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে শুধু নয়াদিল্লিতেই ছয়শো ৩৫টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। এতে মাত্র একজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন!৭ আবার দিল্লির মেডিকেল শিক্ষার্থী গণধর্ষণের পর সারা ভারত যখন প্রতিবাদে সরব, ঠিক তখনই উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য পাঞ্জাবে ঘটে আরেকটি ধর্ষণের ঘটনা। পুলিশ এ ঘটনায় ছয় জনকে গ্রেপ্তার করলেও, তাদের বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। সেজন্যই হয়তো ছয়শো ৩৫টি মামলার বিপরীতে একটিতে বিচার পেয়ে সান্ত্বনা খুঁজে পায় নির্যাতিতারা! পিঙ্ক-এ মিনালদের হাসি সেই একজনের মধ্যেই পড়ে, বাকিদের কথা অধরাই থেকে যায়। নির্মাতা অনিরুদ্ধ রায়ও বিচার না পাওয়া নারীদের কথা বেমালুম ভুলে যান।
এখন প্রশ্ন হলো, বিচারব্যবস্থার বিলম্ব কিংবা ছয়শো ৩৫টি মামলার মধ্যে একজনের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণ কী? সেটা কি মামলার অতিরিক্ত চাপ, নাকি ভারতের সরকার, আইনব্যবস্থা অপরাধীদের বিচার করতে ব্যর্থ? বিচারব্যবস্থার এই যে হাল, অনিরুদ্ধ রায়ের চলচ্চিত্রজুড়ে কোথাও তার লেশমাত্র নেই! বরং নির্মাতা দেখাচ্ছেন, দীপক শেহগালের মতো আইনজীবীরা নারীদের বিচার পাইয়ে দেয়। মানুষ তাদেরকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করে। শুধু আইনজীবী না, পিঙ্ক-এ বিচারককেও নির্মাতা ‘মহান’ রূপে উপস্থাপন করেন। চলচ্চিত্রজুড়ে বিচারকের নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যবহারের দিকে নজর রাখলে বিষয়টা স্পষ্ট হয়।
চলচ্চিত্রে দেখা যায়, রাজিব রাজনীতিবিদের ভাইয়ের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও শাস্তি পান। তার মানে ভারতের বিচারব্যবস্থা কতো শক্তিশালী; রাজনীতিবিদরাও এ থেকে রেহাই পায় না। রাষ্ট্রের সবকিছু ঠিকঠাক চলে এবং রাষ্ট্রের প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে দেখা যায়, ধর্ষণ ও নারী নিগ্রহের অভিযোগ রয়েছে-এমন দুইশো ৬০ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়।৮ শুধু তা-ই নয়, সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশে নিম্নবর্গের দুই হিন্দু নারীকে ধর্ষণের পর গাছে ঝুলিয়ে হত্যার পরও অভিযুক্তদের কোনো বিচার হয়নি। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও নেয়নি পুলিশ। কেনো নেয়নি সেটা হয়তো বুঝতে খুব বেগ পেতে হয় না। কারণ তাদের পিছনে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।৯
কিন্তু পিঙ্ক-এ দেশটির সমাজব্যবস্থা নিয়ে নানা কথা থাকলেও, বিচারব্যবস্থা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় না! বরং বিচার শেষে দেশটির সরকার ও বিচার বিভাগ নিয়ে আশার আলোই দেখানো হয়। মহা আয়োজন করে পিঙ্ক দেখানো হয় জাতিসংঘ ও ভারতে পুলিশের হেডকোয়াটারে। এসব দেখে প্রশ্ন আসতেই পারে, বিশ্ব ও রাষ্ট্র কর্তাদের পিঙ্ক দেখানোর জন্য কেনো এতো আয়োজন? উল্টো দিকে দিল্লিতে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের ঘটনায় বি বি সি নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ইন্ডিয়া’স ডটারকে নিষিদ্ধ করে ভারত সরকার।
পিঙ্ক ও ইন্ডিয়া’স ডটার দুটিতেই ভারতে নারীরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তা উঠে এসেছে। একটি কল্পিত কাহিনিচিত্র অন্যটি বাস্তবনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র। রাষ্ট্র ভারত যদি ন্যায় বা নির্যাতিতাদের পক্ষেই থাকে, তাহলে কেনো ইন্ডিয়া’স ডটার নিষিদ্ধ হয়? অবশ্য নিষিদ্ধের কারণ হিসেবে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ‘দিল্লী গণধর্ষণের ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে কেউ বাণিজ্যিক মুনাফা করবে, সরকার তা হতে দেবে না। দোষী সাব্যস্ত ধর্ষণকারীর সাক্ষাৎকার নিয়ে বিবিসির এ রকম বিতর্কিত প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা ঠিক হয়নি।’১০ এখন প্রশ্ন হলো, প্রামাণ্যচিত্রটি বিতর্কিত হওয়ার জন্যই কি নিষিদ্ধ করা হলো, নাকি ভারতের বাস্তবচিত্র তামাম দুনিয়ার মানুষ জেনে যাবে বলে? বিষয়টা স্পষ্ট হয় ধর্ষিতার বাবার কথায়-
ভারতে কি চলছে তা প্রকাশ হয়েছে এ প্রামাণ্যচিত্রে। কিভাবে অপরাধীরা এখনও বেঁচে আছে? কেনো এখনও ওদের ফাঁসি হলো না? মেয়েদের কি পরা উচিত, কি নয় সেটা নির্ধারণ করার ওরা কে? যদি আমাদের মেয়েরা বেঁচেই না থাকে, তাহলে বেটি পড়াও, বেটি বাঁচাও-এর মতো সরকারী প্রচারের অর্থটা কী?১১
আসলে প্রামাণ্যচিত্রটিতে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও নারীর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রের ইতস্তত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সমাজে শাসন, ভয়, অনুশাসন না থাকলে রাষ্ট্র থাকবে না। বিশ্ব দরবারে ভারতের যে ইমেজ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে, তাতে এই ঘটনায় দেশটির মাথা হেঁট হতে পারে-সরকারের এমন আশঙ্কা অমূলক নয়! আর এই ইমেজ ধরে রাখতে গেলে এসব ঘটনার প্রকাশ খানিক বেমানানই বটে!
তবে প্রচারণার (Propaganda) অজুহাতে শুধু ইন্ডিয়া’স ডটার না, এমন অনেক চলচ্চিত্র আছে, রাষ্ট্রতন্ত্রের শিখিয়ে দেওয়া নিয়ম ভাঙলেই খড়গ চলেছে সেটির ওপর। যেমনটা হয়েছিলো ফায়ার (১৯৯৬), আনফ্রিডম-এর (২০১৫) বেলায়ও। ভারতে সমকামিতার আইনি বৈধতা থাকলেও কাহিনিতে তা উপস্থিত থাকায় চলচ্চিত্র দুইটি নিষিদ্ধ করা হয়। ফায়ার-এ অভিনয়ের কারণে শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাসকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। এভাবে নির্মাতার পাশাপাশি সতর্ক করে দেওয়া হয় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবাইকেই। যেনো কেউ এ রকম দুঃসাহস আর না দেখায়। রাষ্ট্রও বুঝিয়ে দেয়, তার ক্ষমতার ভিতে আঘাত হানে এমন কোনো সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে কথা না বলাই ভালো। তাই হয়তো সাত-পাঁচ ভেবে সমাজ-রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া নিয়মকানুন ভাঙার সাহস দেখাননি নবীন নির্মাতা অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীও।
জলের উপরে পানি নাকি পানির উপর জল
আদালত চলছে। বাদী পক্ষের আইনজীবী মিনালদের ওপর দোষ চাপানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। প্রশ্ন তুলছেন তাদের পোশাক, শরীর, হাসি, হাঁটাচলার ভঙ্গি, আগ্রহ ও পেশা নিয়ে। দীপক বাদী পক্ষের আইনজীবীর কথা শুনছেন মনোযোগ দিয়ে। এরপর আসে তার কথা বলার পালা। যুক্তি ও বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে দীপক স্পষ্ট ভাষায় নাকচ করে দেন বাদী পক্ষের আইনজীবীর অভিযোগ। একই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেন সমাজে প্রচলিত নারীবিষয়ক কিছু ডিসকোর্স। দীপক সেই ডিসকোর্সকে রুল হিসেবে উল্লেখ করে বলেন-
রুল নম্বর ১
কোনো নারীর কোনো পুরুষের সঙ্গে কোথাও একা যাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে কোনো রিসোর্ট বা টয়লেট ব্যবহারের জন্য তো নয়ই। এটা করলেই মানুষের ধারণা হয়, মেয়েটি নিজের ইচ্ছায় ওখানে গেছে। অর্থাৎ তাকে স্পর্শ করার লাইসেন্স পুরুষ পেয়ে গেছে।
রুল নম্বর ২
পুরুষের সঙ্গে কোনো নারীরই হেসে কথা বলা উচিত না। যদি কোনো হাসির কথাও হয়, তাহলে দুঃখ দুঃখ মুখ করে তাদের থাকতে হবে! কিংবা অন্যের গায়ে স্পর্শ করে কথা বলা যাবে না কোনো নারীর। কেননা পুরুষরা ওটাকে ইশারা (শারীরিক সম্পর্কের) বলে ধরে নেয়। ...
রুল নম্বর ৩
কোনো পুরুষের সঙ্গে বসে কোনো নারীর মদ খাওয়া উচিত না। তাহলে পুরুষ মনে করে যেহেতু সে আমার সঙ্গে বসে মদ খাচ্ছে, সেহেতু সে আমার সঙ্গে শুতেও দ্বিধা করবে না! তার মানে মদ খাওয়া নারী খারাপ চরিত্রের অধিকারী, পুরুষ না। আবার কোনো পুরুষ পরিবার থেকে আলাদা থাকলে প্রশ্ন ওঠে না, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে ওঠে। এমনকি কোনো নারী রাত করে বাড়ি ফিরলেও তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটাও নারীর চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়!
প্রচলিত এসব ডিসকোর্স উপস্থাপনের মাধ্যমে নির্মাতা তুলে ধরেছেন সমাজে কারা খারাপ আর কারা ভালো নারী হিসেবে পরিচিতি পায়। যেমনটা বলেন, ইন্ডিয়ান’স ডটার-এর ধর্ষক মুখেশ সিং। তার ভাষায়-
ভদ্র মেয়েরা কখনো রাত নয়টার দিকে বাইরে ঘুরে বেড়ায় না। ধর্ষণের জন্য একটা ছেলে যতোটা দায়ী, একজন মেয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী। মেয়েদের দায়িত্ব ঘরের কাজ করা, সংসার সামলানো। রাতে ডিসকো নাচে যাওয়া, বারে ঘুরে বেড়ানো, আজেবাজে কাজ করা, ভুলভাল পোশাক পরা তাদের কাজ নয়। এ ধরনের মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার অধিকার অন্যদের আছে। ভারতে মাত্র ২০ শতাংশ মেয়ে ভালো।
মুখেশ সিং-এর মতো পিঙ্ক-এর দুই ঘণ্টা এক মিনিট ১১ সেকেন্ডে একই কথা বলেন রাজিব। তার ভাষায়, ‘ভালো মেয়েরা মদ খায় না, তারা কোনো পার্টিতে যায় না।’ মুখেশ ও রাজিবের কথায় আরো একবার প্রমাণ হয়, এই সমাজব্যবস্থা কাদেরকে খারাপ নারী মনে করে। সেজন্য দীপক প্রমাণ করার পরও রাজিব নিজের বোন পার্টিতে গিয়ে মদ খায়, সেটা বিশ্বাস করেন না। কারণ সেটা খারাপ নারীদের কাজ! ভালো ঘরের নারীরা এগুলো করে না। তাহলে নারীকে নিয়ে এতো প্রশ্ন, গল্প কেনো? নারী-পুরুষ শরীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে যে আলাদা সেটা সকলেই জানে, বিশ্বাসও করে। তার পরও আধিপত্যশীল পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারী-পুরুষের স্বাভাবিক পৃথক সত্তাকে কর্তৃত্বের রাজনীতিতে ফেলে দেশ-কাল-সমাজভেদে প্রতিনিয়ত নির্মাণ করে চলে। আর সমাজ-কর্তৃত্বের কেন্দ্রে যেহেতু পুরুষের অবস্থান, তাই এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নারীর চেহারা নির্মিত হয় ‘প্রান্তিক’ হিসেবে। কেননা এ বিশ্ব সবসময়ই ছিলো পুরুষের অধিকারে, পুরুষ যে রূপ দেয় পৃথিবী সে রূপেই সজ্জিত হয়। পাশাপাশি নানাভাবে নারীর এই সামাজিক একপেশে নির্মাণকে বৈধতা দেওয়া হয়। এই বৈধতা দেয় পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র-শিক্ষা-ধর্ম-সংস্কৃতি নামের শক্তিশালী সব প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে নির্মাণ হয় নানা ডিসকোর্স। যার শিকার হয় মিনালরা। সেই জন্যই হয়তো মিনালদের চরিত্র নিয়ে কথা বললে আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ মনে হয়।
তবে এই ‘স্বাভাবিক’ মনে হওয়া নারীবিষয়ক ডিসকোর্সগুলো কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। তাই হঠাৎ করে ডিসকোর্স-বিরোধী কিছু হলে খটকা লাগে, নিয়ন্ত্রণদাতাদের মেনে নিতেও কষ্ট হয়। তবু কোনো কোনো নির্মাতা চলচ্চিত্রে, লেখক তার প্রবন্ধে, কবি তার কবিতায় এই ডিসকোর্স ভাঙার চেষ্টা করেন। চেষ্টা করেন নারীর এই অবস্থা থেকে উত্তরণের। কিন্তু নির্মাতা অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী যে শুধু প্রচলিত ডিসকোর্স ভাঙ্গার চেষ্টা করেছেন তা নয়, চলতি ডিসকোর্সের হয়ে কথাও বলেছেন। জনগণের মধ্যে পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে যে ডিসকোর্স দাঁড়িয়ে গেছে-পুলিশ মানেই খারাপ, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ; পিঙ্ক-এর বাইরে যেতে পারেনি। সেজন্যই হয়তো চলচ্চিত্রজুড়ে সব পুলিশই কোনো না কোনোভাবে মিনালের বিপক্ষে কথা বলেছে। এমনকি সেখানে যে নারী পুলিশকে দেখা যায়, তিনিও মিনালের বিপক্ষেই কথা বলেন। তাহলে কি নির্মাতা বলতে চান, নারীরা নারীর প্রতি সহমর্মী নয়? নাকি নারী-পুরুষ ব্যাপার নয়, পুলিশ একটা রাষ্ট্রিক সিস্টেমের নাম, যেখানে গেলে সবাই ‘রাবণ’ হয়।
পিঙ্ক-এর এক ঘণ্টা ১৩ মিনিট আট সেকেন্ডে নারী পুলিশ কর্মকর্তা আদালতে বলেন, ‘আমি নারী পুলিশ হওয়ায় মামলা নারীর বিরুদ্ধে হয়েছে শুনে, সরাসরি অ্যাকশনে যাওয়ার পরিবর্তে তদন্ত শুরু করি।’ তিনি যে নারীর প্রতি সহমর্মী সেটা এ কথার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও, তার কাজে কিন্তু বিপরীত চিত্রের দেখা মেলে। বরং মিনালকে বিপদে ফেলতে যা যা করণীয় তার সবকিছুই করেন ওই নারী পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু ওই পুলিশ সদস্য কেনো সেটা করছেন, কে তাকে দিয়ে এটা করাচ্ছে কিংবা কেনো তিনি অসদুপায় অবলম্বন করেন, সেটা দেখানো হয় না। কিংবা চলচ্চিত্রে রাজনীতিবিদের প্রভাবের ইঙ্গিত থাকলেও তাদের বিচারের মুখোমুখি করেননি নির্মাতা। এখানে যদি নারী পুলিশ ক্ষমতাবানদের কথা না মানতেন তাহলে কী পরিণাম হতো? তিনি কি চাকরি হারাতেন নাকি মিনালের মতো যৌন নিগ্রহের শিকার হতেন? নির্মাতা কিন্তু এইসব বিষয় নিয়েও কোনো কথা বলেননি। পিঙ্ক দেখে কেবল এটা মনে হয় যে, নারী পুলিশ টাকার জন্যে অসদুপায় অবলম্বন করেন। শুধু পুলিশি ডিসকোর্সের কারণে এভাবেই নির্মাতা নারীকে নারীর চোখে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন।
বলো দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে
পিঙ্ক-এর শুরু থেকেই রাজিব ও তার বন্ধুরা হুমকি দিতে থাকে মিনালদের। ফলে তাদের স্বাভাবিক হাসিখুশির জীবনে নেমে আসে অশান্তির ছায়া। প্রথমে কাউকে কিছু বলতে না পারলেও ৩১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে পুলিশের কাছে অভিযোগের জন্য যান মিনাল। নিজের এলাকার ঘটনা নয়, এই অজুহাতে মিনালকে অন্য থানায় মামলা করতে বলেন পুলিশের কর্মকর্তা। তিনি বিরক্ত হন এবং মামলা করলে নারী হিসেবে কী কী অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে সেটা বলেও মিনালকে ভয় পাইয়ে দেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন,
আপনার তো কিছুই হয়নি, তাহলে মামলা করবেন কেনো? আপনার ওপরেই তো এখন আমার রাগ হচ্ছে; এতো সুন্দর একজন মেয়ে আপনি, ওদের সঙ্গে কেনো গেলেন? আপনি নিজের ইচ্ছায় ছেলেদের সঙ্গে যাচ্ছেন, মদও খাচ্ছেন। আপনারা তো এভাবে সবই করেন। কিন্তু যখন কিছু ঘটে, তখন আমাদের পিছনে লাগেন; রাস্তায় রাস্তায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বলেন-আমরা নিরাপদ না।
পুলিশের এ ধরনের বক্তব্য শুনে মনে হয়, ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির মতো ঘটনা ঘটার পরই পুলিশের কাছে অভিযোগের জন্য যেতে হবে। এর আগে তাদের কিছুই করার নেই! ফলে একজন নারী কতোটুকু হেনস্তার শিকার হলে পুলিশ মামলা নিবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া ঘটনা এড়াতে ছেলেদের সঙ্গে কোথাও না যাওয়া এবং গেলেও মদ না খাওয়ার মতো যে নসিহত পুলিশ করেন, সেটাও মনে প্রশ্ন জাগায়। তাহলে কি নারীরা সবসময় অন্দরমহলেই থাকবে? অন্দরমহলে থেকেও কোনো নারী যদি হয়রানির শিকার হন, তাহলেও কি পুলিশ কর্মকর্তারা বিরক্ত হবেন? নাকি হয়রানির পর চুপ থাকলেই তারা বেশি খুশি হন?
প্রথম পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ না নেওয়ায় মিনাল বিষয়টা তার কর্মক্ষেত্রের এক দিদিকে জানান। সেই দিদির সুপারিশে তিনি ৩৪ মিনিট ১০ সেকেন্ডে দেখা করেন এক সহকারী পুলিশ কমিশনারের (এ এস পি) সঙ্গে। এ এস পি আশ্বাস দিয়ে মিনালকে বলেন, ‘সুরজকুন্ডে (যেখানে ঘটনাটি ঘটে) এখনো কোনো এফ আই আর করেনি ওই ছেলেরা। আপনি দিল্লিতে একটা জিরো এফ আই আর করে রাখেন। বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে থামিয়ে দেওয়া যাবে।’
কিন্তু পরে তার এই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কিছুই করতে দেখা যায় না। বরং মনে হয়, তিনি ক্ষমতাবানদের হয়েই কাজ করছেন। কারণ মিনাল ওই পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার পরই রাজিবরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অথচ তার কাছে মিনালের আসার কথা রাজিবদের জানার কথা নয়। আবার ওই পুলিশ কর্মকর্তা আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজিবদের থামানোর কথা দিলেও পরে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেন না। বরং এ এস পি’র কাছে অভিযোগের পরদিনই রাস্তা থেকে মিনালকে উঠিয়ে নিয়ে যায় রাজিব ও তার বন্ধুরা। গাড়িতে উঠিয়ে নেওয়া দেখে দীপক ৪১ মিনিট চার সেকেন্ডে ফোন করেন পুলিশ ইমারজেন্সিতে। সেখানে কর্মরত এক নারী পুলিশকে তিনি মিনালকে নিয়ে যাওয়া গাড়িটা খুঁজতে বলেন। বর্ণনাও দেন গাড়ির। কিন্তু পুলিশ সব থানায় জানানোর পরও গাড়িটি আর খুঁজে পায় না। এরপর দীপক নিজের পরিচিত এক পুলিশকে ফোন করে বিষয়টা জানান। সেই পুলিশ খোঁজ নিয়ে দীপককে জানান, তেমন কোনো রিপোর্ট কোনো থানায় হয়নি।
দীপকের পরিচিত ওই পুলিশের কথা শুনে প্রশ্ন জাগে, ইমারজেন্সিতে দায়িত্বরত পুলিশ কি তাহলে দীপকের অভিযোগের কোনো গুরুত্বই দেননি? নাকি পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তা মিথ্যে বলে দীপককে আশ্বাস দিয়েছেন? মনে আরো খটকা লাগে যখন ঘটনার পরের দিন দীপকের পরিচিত ওই পুলিশ কর্মকর্তা রাজিবদের বিরুদ্ধে মিনালের অভিযোগের কথা শুনে চিন্তিত হন। টেলিফোনের অন্য প্রান্তের পুলিশ যখন বলেন, রাজিব রাজনীতিবিদের ভাইয়ের ছেলে এ অবস্থায় কী করণীয়; তখন এই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ফোন রেখে দিতে বলেন। তারপর তিনি ফোন দেন উপর মহলের এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে। কথা বলেন। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেন না। তার মানে ততোক্ষণে তিনিও ক্ষমতাবানদের পক্ষ নিয়ে ফেলেছেন।
পিঙ্ক-এ পুলিশের এমন ভূমিকা দেখে মনে হয়, শুধু নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাই নয়, উপর মহলও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আর এভাবেই হয়তো রাজিবরা পার পেয়ে যায়, পার পায় না কেবল মিনালরা। তাই ভুয়া অভিযোগপত্র দাখিল করে ৪৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে মিনালদের ফ্ল্যাটে যায় পুলিশ। ভালোভাবে ডেকে ঘর থেকে বের করে আনা হয় তাকে। কিন্তু মিনাল বাইরে এসে বুঝতে পারেন, তাকেই আটকের জন্য পুলিশ এসেছে। তিনি বার বার বলতে থাকেন, ‘অভিযোগ তো আমি করেছি, তাহলে আমাকেই কেনো ধরে নিয়ে যাচ্ছেন।’ পুলিশ তার কথা কানে তোলে না।
পিঙ্ক-এ পুলিশের ভূমিকা এ রকমই বিতর্কিত। তার পরও জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রদর্শন করা হয় এটি। বাহবা দেওয়া হয় চলচ্চিত্রের কলাকুশলীদের। ভারতীয় পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এটি তাদের সদর দপ্তরেও দেখায়; যাতে পুলিশ চলচ্চিত্রটি দেখে কিছু শিখতে পারে।
পিঙ্ক ও এ সংশ্লিষ্ট এতো সব ঘটনা দেখে অনিরুদ্ধের মেধার প্রশংসা না করে পারা যায় না। কারণ পুলিশের এতো সব নেতিবাচক উপস্থাপনার বিপরীতে অসাধারণভাবে তিনি রাষ্ট্র ও তার সহিংস চরিত্রকে আড়াল করতে পেরেছেন! ফলে পিঙ্ক দেখে সাধারণ দর্শকের কাছে পুলিশ খারাপ হলেও রাষ্ট্র ঠিকই তার মঙ্গলকামী চরিত্রকে বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে! একই সঙ্গে রাষ্ট্র আর পুলিশ দর্শকের কাছে আপাত পরিণত হয়েছে দুটি ভিন্ন জিনিসে; পুলিশ যে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা সংঘটনের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত তাও মুছে গেছে। পুলিশ-রাষ্ট্রের টম অ্যান্ড জেরি খেলায়, রাষ্ট্রকে দুর্নামের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনিরুদ্ধের পুরস্কার পাওয়া উচিত। কোনো না কোনোভাবে অনিরুদ্ধ সেটা হয়তো পেয়েছেনও।
নো মিনস নো!
আদালতে দুই পক্ষের আলোচনা-সমালোচনা, তর্কবিতর্ক শেষ হয়। বাদী পক্ষের আইনজীবী নিজের যুক্তি উপস্থাপন করে বিচারকের কাছে মিনালদের সাজা দাবি করেন। বিপরীতে দীপক চুপ থাকেন। চুপ থাকা দেখে বিচারক তার বক্তব্য জানতে চাইলে দীপক বলেন,
নো। নো ইয়োর অনার। না, কেবল একটা শব্দই না, এটা নিজেই একটা পরিপূর্র্ণ বাক্য। একে কোনো ধরনের তর্ক বা ব্যাখার প্রয়োজন নেই। না’র মানে না-ই হয়। আমার মক্কেল বলেছেন, না (এক ঘণ্টা ৪৩ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে আদালতে শেহগাল যখন মিনালকে প্রশ্ন করেন, তোমাকে যখন ধর্ষণের চেষ্টা করে, তখন তুমি কী করেছো? তখন মিনাল বলেন, আমি না বলেছি)। এই ছেলেদের অবশ্যই বোঝা উচিত, না এর মানে কেবল না-ই হয়। না বলা কোনো নারী, তার পরিচিত হোক, অপরিচিত হোক, গার্লফ্রেন্ড হোক, যৌনকর্মী হোক কিংবা তার নিজের ঘরের বউ হোক-না মানে না-ই। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, এটা বন্ধ করুন।
আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ‘না’র কোনো মূল্য নেই। না’র হাহাকার কেবল না’র মধ্যেই হারিয়ে যায়। নারী ধর্ষিত হয় প্রতিদিন, প্রতিরাতে। কিন্তু তার ‘না’ কেউই শোনে না। ধর্ষণ ছাড়াও দাম্পত্য সম্পর্ক, প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কে বলপূর্বক যেসব সহবাসের ঘটনা ঘটে, সেগুলো সামনে আসে না। কিংবা কেউ জানেই না এটা অন্যায়, জুলুম-এটা ধর্ষণ। আবার এসব ধর্ষক বুঝতেও চায় না, যে নারীর ওপর সে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করছে, সে সেটা প্রতিরোধ করতে কেবল একটি শব্দই বলে চলে-‘না’। কারণ এর চেয়ে আর কোনো উপযুক্ত শব্দ পৃথিবীতে নেই, যেটা দিয়ে বোঝানো সম্ভব, নারী রাজি নয়। পিঙ্কজুড়ে নির্মাতা অনিরুদ্ধ দর্শককে সেটা খুব ভালোভাবেই বোঝান; তবে তা কেবল রাষ্ট্র আর ক্ষমতাবানের সঙ্গে সমঝোতা করে।
লেখক : বিউটি মন্ডল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
beautymcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. ‘যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে কী করেছিলেন আপনি? বাড়িতে ফিরেছিলেন?’ এই শিরোনামের কবিতাটি তারফিয়া ফয়জুল্লাহ’র সিম কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া; অনুবাদ : লুনা রুশদী। আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ৪ জুলাই ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘আলোকিত বাংলাদেশ শুক্রবার’-এ প্রকাশিত।
2. https://goo.gl/wuE0Zf; retrieved on 04.03.2017
3. https://goo.gl/5NeH1J; retrieved on 28.02.2017
4. http://www.bbc.com/bengali/news-39837139; retrieved on 11.05.2017
5.http://www.old.al-ihsan.net/fulltext.aspx?subid=5&textid=69672; retrieved on 04.03.2017
6. https://goo.gl/MBUa1n; retrieved on 04.03.2017
7. http://oldsite.dailyjanakantha.com/news_view_all.php?nc=17&dd=2013-01-01; retrieved on 04.03.2017
8. https://principalsanaullah.blogspot.com/2012/12/blog-post_2238.html; retrieved on 25.02.2017
9. http://www.onnodiganta.com/article/detail/3270; retrieved on 04.03.2017
10. https://www.dailyjanakantha.com/details/article/113152;retrieved on 27.02.2017
11. https://www.dailyjanakantha.com/details/article/113152; retrieved on 27.02.2017
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন