Magic Lanthon

               

অধরা মাধুরী

প্রকাশিত ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘নায়িকা’-শিল্পী দ্বন্দ্ব এবং কঙ্কনা রানওয়াত

অধরা মাধুরী


বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি, চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

পুরুষতান্ত্রিকতা ও নারীবাদদুটি ধারণা; দুই ধরনের ডিসকোর্সও বলা যায়। যদিও নারীবাদ বিষয়টি খুব বেশি পুরনো নয়। উদার (মানবতাবাদী) বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী নারীবাদ : এ-মতবাদের উদ্ভব ঘটে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের ভিন্ডিকেশন অব দি রাইট্স্ অব ওম্যান-এ (১৭৯২), এবং পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে জন স্টুয়ার্ট মিলের দি সাবজেকশন অব উইমেন-এ (১৮৬৯)।ভিন্ডিকেশন অব দি রাইট্স্ অব ওম্যানকে নারীবাদী আন্দোলন বা নারীবাদের প্রথম মহা ইশতেহার বলা হয়। আবার মার্কিন ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স-এর সঙ্গে তুলনা করে এটাকে নারীবাদী স্বাধীনতার ঘোষণাও বলা হয়ে থাকে। এদিকে বঙ্গদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নারীশিক্ষার সূচনা হয় ১৮৪৯-এ, আর ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে দাবি ওঠে ভারতীয় নারীদের ভোটাধিকারের।

তবে বর্তমানে নারীবাদ শব্দটির কিছু অতিব্যবহার অথবা অপব্যবহারের ফলে অধিকাংশ মানুষ একে পুরুষতান্ত্রিকতার বিপরীত হিসেবে দেখে। নারীবাদ, পুরুষতান্ত্রিকতার বিপক্ষে তো অবশ্যই, প্রতিদ্বন্দ্বীও বটে; তবে বিপরীত বা সরাসরি উল্টো নয়। সাম্যের পক্ষের এই দর্শনকে বিভ্রান্তিমূলক অপব্যাখ্যা করে অনেকে বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছে। একটি কথা পরিষ্কার করে বোঝা প্রয়োজন, পুরুষতান্ত্রিকতা বিশ্বাস করে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বে। আর নারীবাদ সমাজে নারী-পুরুষের সমঅধিকারে বিশ্বাসী। প্রকৃত নারীবাদ নারীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ বা আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা করে না।

সমাজের অংশ হিসেবে এর প্রতিটা স্তরে যে বৈষম্য প্রতিনিয়ত দেখা যায়, তারই একটি স্পষ্ট প্রতিবিম্ব উন্মোচন হয় গণমাধ্যমে। তা সে সংবাদ বা বিনোদন মাধ্যম যাই হোক। তবে চিন্তার বিষয় হলো, এটা ঘটে একটি চক্রের মধ্যে। সমাজে বৈষম্য আছে বলে গণমাধ্যমে তা প্রকাশ-প্রচার হয়। আর গণমাধ্যমে প্রকাশ-প্রচার হয় বলেই অধিকাংশ মানুষের চিন্তাভাবনার কাঠামো সেভাবে তৈরি হয়। এই চক্র না ভাঙলে পরিবর্তন আনা সম্ভব না। তাই গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপন নিয়েও সম্প্রতি আলোচনা খুব কম হয়নি। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে সংবাদ উপস্থাপন, গান, নাটক, চলচ্চিত্রসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীকে পণ্য-বস্তু হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। আবার একই সঙ্গে সৃজনশীল আরেকটি পক্ষ নিজেদের শ্রম দিয়ে চলেছে সামাজিক সাম্য ও শিল্পের মিল ঘটানোর লক্ষ্যে।

আর এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে চলেছে সারাবিশ্বের এক শ্রেণির চলচ্চিত্রকর্মী। তারা বিচিত্র ধরনের শিল্পের সংযোজন, প্রচার ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রতিনিয়ত চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব ও মান রক্ষার চেষ্টা করছে। এই আলোচনায় ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হবে চলচ্চিত্রে নারী হিসেবে অভিনয়শিল্পী ও নায়িকার অবস্থান।

চলচ্চিত্রের নারী ও নায়িকা

নারীকে বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই দেখা যায় লাস্যময়ী এক প্রতিমার মতো; যাকে দেখে নায়ক মুগ্ধ হন, সঙ্গে দর্শকও। আর নায়ক মাত্রই যেহেতু আদর্শ পুরুষ, তার সঙ্গিনী হিসেবে নায়িকার কাছে দর্শকের চাওয়া-পাওয়া অনেকটা পুতুলের মতো সুদর্শনা; বাড়ির শান্ত-শিষ্ট-ভদ্র-ত্যাগী প্রভৃতি গুণ সম্পন্ন বউয়ের মতো। দৃষ্টিধারী সবার সন্তুষ্টির কারণ হবে যে সুদর্শনা।

সুদর্শনা এই নারীদের পণ্য হিসেবে বিবেচনা আর ব্যবহারের যে প্রবণতা তার শক্তিশালী উদাহরণ বর্তমান বলিউড-ঢালিউডের প্রমোশনাল আইটেম সঙ। চলচ্চিত্রের কাহিনিতে আদৌ এর প্রয়োজন থাক বা না থাক, শরীর ও দেহ সম্পর্কিত উগ্র লিরিকের সঙ্গে পর্দায় স্বল্পবসনা নারীদের একটি চাঞ্চল্যকর গান থাকতে হয়। এই গান দর্শক সমাজে ব্যাপক পরিচিতি পায়, বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে বাজতে থাকে; আর পর্দায় উপস্থিত আকর্ষণীয়ার গুণে চলচ্চিত্রটি ব্যবসার ইঙ্গিত দেয় মুক্তির আগেই। এই ধারা চলতে চলতে একসময় হঠাৎ ঘুম ভাঙে সমালোচকের, অভিনয়শিল্পী হিসেবে নারীর আলাদা অস্তিত্ব এবং তার দাবি নিয়ে কথা শুরু হয় তখন।

শুধু প্রমোশনাল আইটেম সঙ নয়। অধিকাংশ ব্যবসায়িক চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে যে পুরুষ অভিনয়শিল্পী থাকেন তিনিই নায়ক, আর নায়িকা হলেন তার সঙ্গিনী। তাকে নির্বাচন করা হয় সে হিসেবেই, অভিনয়শিল্পী হিসেবে নয়। তাই বলিউডের একটি সাধারণ চিত্র হলো প্রতিষ্ঠিত কোনো নায়কের হাত ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে অল্পবয়স্ক নতুন নায়িকার আগমন। যেমন : রাব নে বানা দি জোড়ি (শাহরুখ খান ও অনুশকা), গজনি (আমির খান ও অসিন), ওম শান্তি ওম (শাহরুখ খান ও দীপিকা), বারফি (রণবীর কাপুর ও ইলিয়ানা ডিক্রুজ), রকস্টার (রণবীর কাপুর ও নারগিস ফাকরি), মহেঞ্জো দারো (ঋত্বিক রোশান ও পুজা হেগড়ে) ইত্যাদি। এর উল্টো চিত্র দেখা যায় খুব কমই। প্রতিষ্ঠিত কোনো নারী অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে নতুন নায়কের চলচ্চিত্র, ব্যবসায় সফলতা দেখে না সহজে; আইয়া (রানি মুখার্জি ও পৃথ্বিরাজ), অ্যালোন (বিপাসা বাসু ও করণ সিঙ গ্রোভার) এ ধরনের নিয়ম ভাঙা কয়েকটি চলচ্চিত্র। অভিজাত ঘর সাজাতে যেমন গুরুত্ব পায় নতুন টেবিল ক্লথ, পর্দার কাপড় বা সদ্য কিনে আনা সুদৃশ্য আসবাব; তেমনই নতুন ঘরে পুরোনো পর্দা বা আসবাব ততোটাই বেমানান। অর্থাৎ কাঠামোটা পুরুষের, নারী সেখানে অলঙ্কার মাত্র।

অভিনয়শিল্পী (নারী বা পুরুষ) একজন পরিপূর্ণ সত্তা। শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রে তাদের স্বাতন্ত্র্য ও গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ চলচ্চিত্রেই নারীর উপস্থাপন ও চরিত্রের ধরন বারবার একটি প্রশ্ন তুলে আনেনারীকে পর্দায় কী হিসেবে আনা হচ্ছে? অর্থাৎ শুধু চেহারা-শরীর সর্বস্ব নারীরা গণমাধ্যমে নিজেদের পণ্য করে তুলেছেবারে বারে যে নারী আয়নায় মেকাপ ঠিক আছে কি-না দেখে নেয়, চিন্তিত থাকে চুলটা ঠিকঠাক আছে কি-না, সে কোনো স্বাধীন সত্তার প্রতিক হতে পারে না। সে আর কিছুই নয়, নিজ দেহের নজরদারিতে বন্দী।

নায়িকা ডিসকোর্স : চলচ্চিত্র দৃশ্যের ফুলদানি বিশেষ

বীর নায়কের সহযোগী নায়িকা। তাই নায়কের আবির্ভাবের পরেই আসে নায়িকার প্রসঙ্গ, তার আগে নয়। নায়িকা বলতেই নির্দিষ্ট কিছু কাঠামো চলে আসে চোখের সামনে। একটি কাঠামো তার আকর্ষণীয় শরীরের, আরেকটি চলচ্চিত্রের কাহিনিতে তার চিরচেনা অবদান। অভিনেত্রী একজন শিল্পী, আর নায়িকাকে সাধারণত দেখা হয় বিশেষ ধরনের শিল্পের খোঁজে! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নায়িকা উপস্থিত হয় নায়কের সহায়ক হিসেবে, যা চলচ্চিত্র দৃশ্যের ফুলদানি বিশেষ। অধিকাংশ নির্মাতা ও দর্শকের চোখ অন্তত দীর্ঘদিন থেকে এভাবেই দেখে আসছে।

দ্য ফার্স্ট মুভি স্টার নামে পরিচিত কানাডিয়ান-আমেরিকান অভিনয়শিল্পী ফ্লোরেন্স লরেন্স-এর (১৮৮৬-১৯৩৮) হাত ধরে চলচ্চিত্র জগতে নারীর আগমন । মঞ্চের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রে প্রথম নারী অভিনয়শিল্পী হিসেবে নতুন দরজা খুলে দেন ফ্লোরেন্স। তবে শিল্পকে উপেক্ষা করে নারীকে দৃষ্টি বিনোদনের উৎস তৈরির বাণিজ্যিকীকরণের শুরু কোথায় এটা বলা কঠিন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক সিটির হোটেলগুলোর মালিকরা তাদের ভ্রমণকারীদের আরো বেশি সময় ধরে রাখার কৌশল হিসেবে নারীদের সুইমস্যুট-নির্ভর একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেটাই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আদি নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়।

এরপরে নারীর সৌন্দর্য ও শরীরনির্ভর প্রতিযোগিতার বুম হয়। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নানা ধরণের প্রতিযোগিতা হতে থাকে। এরপর একে একে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রথম সুন্দরী প্রতিযোগিতা শুরু হয় মিস ওয়ার্ল্ড (১৯৫১ সালে), মিস ইউনিভার্স (১৯৫২ সালে), মিস ইন্টারন্যাশনাল (১৯৬০ সালে) নামে।

১৯০৬ থেকে ১৯২১-এর মধ্যে শিল্প বা প্রতিযোগিতার নামে নারীর যে বাণিজ্যিকীকরণ হয়নি এমনটা বলার অবকাশ নেই। তবে গত শতকের প্রথমাংশেই যে বিভিন্ন ছদ্মবেশে এ সংস্কৃতি প্রকাশ পেতে থাকে তা দাবি করা যায়। বলিউডের বিখ্যাত পরিচালক করণ জোহর ২০০৩ ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে চলচ্চিত্র জগতে আগ্রহী তরুণীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,

আমার দুঃখ লাগে যখন দেখি এত এত সুন্দর মুখ, আর তারা সবাই অভিনেত্রী হতে চায়। এটা আমাকে ব্যথা দেয়, কারণ এটা তারা চায় শুধু টাকাপয়সা আর স্বীকৃতির জন্যে। আসলে এটা তোমার চাওয়া উচিত শিল্পের জন্যে। আমি জানি, আমাদের বেশিরভাগ অভিনেত্রী মডেল হতে পারবে না, কিন্তু মডেলরাও অভিনেত্রী হতে পারবে না।

সেখানে প্রতিযোগীদের প্রতি জোহরের মুখে প্লিজ অভিনয় করো কথার মধ্যে প্রকাশ পায়একজন অভিনেত্রী হতে সুন্দর মুখমণ্ডল আর শরীর ছাড়াও কিছু প্রয়োজন। শিল্পীর চাই অন্তর্দৃষ্টি, শিল্পকে চিনতে পারার যোগ্যতা, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা আর সর্বোপরি শিল্পকে দৃশ্যমান করার প্রতিভা। তবে চলচ্চিত্রজগতে (সমগ্র বিশ্বেই) নারী ও পুরুষ অভিনয়শিল্পীদের বর্তমান চিত্র তুলনা করার জন্য প্রাসঙ্গিক একটি তথ্য হাজির করতে চাই২০১৬ খ্রিস্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বলিউডে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতা সালমান খান (৫৫ কোটি) এবং অভিনেত্রী কঙ্কনা রানওয়াত (১১ কোটি)।

চলচ্চিত্রে লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে গবেষণা করেছে জিনা ড্যাভিস ইন্সটিটিউট অন জেন্ডার ইন মিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নমুনা হিসেবে তারা বেছে নেয় বলিউড, হলিউডসহ বিশ্বের লাভজনক ইন্ডাস্ট্রিগুলোর একশো ২০টি চলচ্চিত্র। এতে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি বৈষম্যের কথা উঠে এসেছে। সেগুলোর মধ্যে প্রথম কয়েকটি এ রকম

প্রথমত, বিশ্বে গড়ে একজন নারী অভিনেতার বিপরীতে পুরুষ অভিনেতা থাকে দুই দশমিক ২৪ জন।

দ্বিতীয়ত, কোনো চলচ্চিত্রে সংলাপ কিংবা নাম আছে, এমন পাঁচ হাজার সাতশো ৯৯টি চরিত্রের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র ৩০ দশমিক নয় শতাংশ।

তৃতীয়ত, নারীচরিত্রের নেতৃত্ব থাকে মাত্র ২৩ দশমিক তিন শতাংশ চলচ্চিত্রে।

চতুর্থত, যৌন উত্তেজনা তৈরি করে এমন পোশাক-পরিচ্ছদ পুরুষদের চেয়ে নারী অভিনয়শিল্পীদের দ্বিগুণ বেশি পরানো হয়। এমনকি পুরুষের চেয়ে নারীচরিত্রকে পুরোপুরি কিংবা আংশিক উলঙ্গও হতে হয় দ্বিগুণ বেশি। এভাবেই চলচ্চিত্রে নারীকে উপেক্ষা করে তার শরীরকে যৌনতার প্রতীক বানিয়ে অবমূল্যায়ন করা হয়।

চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে নারী, নাকি ব্যবসার?

নায়িকাকে বারবার নায়কের সঙ্গিনী হিসেবে সম্বোধন করা হলেও বিষয়টি ভালো করে ভেবে দেখা জরুরি যে, প্রকৃতপক্ষেই চলচ্চিত্রে নারীর প্রয়োজনীয়তা কোথায়। নারী কি কেবলই পর্দা ও পোস্টারের দৃষ্টি আকর্ষক; চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনের কৌশল! নাকি এমন কোনো অবদানের জন্য নারীকে প্রয়োজন, যাকে অন্য কোনো শারীরিক কাঠামো দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ ভূমিকাটি শুধু শারীরিক নয়, প্রকৃতির কোনো চরিত্রের জন্যই সেখানে নির্দিষ্ট অভিনয়শিল্পীর প্রয়োজন। তাই শরীর হিসেবে নারীকে নয়; একজন মানুষ প্রয়োজন, যিনি নারী ও অভিনয়শিল্পী। সেই ভূমিকা চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য শৈল্পিক অংশ।

এখন প্রশ্ন হলো, ইন্ডাস্ট্রিনির্ভর বর্তমান চলচ্চিত্রগুলো শুধুই কি ব্যবসার জন্য লাস্যময়ী নারীদের পর্দায় প্রদর্শন করছে, নাকি চলচ্চিত্রে তার বিশেষ ভূমিকা আছে? এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, নারীচরিত্রকে কেন্দ্র করে ভারতে শিল্পগুণ সমৃদ্ধ অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছেনো ওয়ান কিলড্ জেসিকা, সাত খুন মাফ, মাদার ইন্ডিয়া, ওয়াটার, ফায়ার, কুইন, মেরি কম, ব্ল্যাক, মারদানি, অর্থ, মির্চ মাসালা, দ্য লাঞ্চবক্স, ইংলিশ ভিংলিশ, কাহানি, পার্চড্, অন্তর্জলী যাত্রা, গয়নার বাক্স, ইতি মৃণালিনী, মন্দ মেয়ের উপাখ্যান প্রভৃতি। ইন্ডাস্ট্রিতে দেখাও মিলেছে তীক্ষè প্রতিভা সম্পন্ন অনেক নারী অভিনয়শিল্পীরনারগিস, বৈজয়ন্তি মালা, সায়রা বানু, মধুবালা, মিনা কুমারী, সুচিত্রা সেন, অপর্ণা সেন, রেখা, শাবানা আজমি, স্মিতা পাটেল, টাবু, বিদ্যা বালান, কঙ্কনা রানওয়াত, দীপিকা পাড়কোন প্রমুখ।

চলচ্চিত্রশিল্প আজ বৈচিত্রময় বিকাশের শীর্ষে দাঁড়িয়ে আরো সামনে এগিয়ে চলেছে। তাই নির্মাতা ও দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গিটা আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। সময় এসেছে নায়িকা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একজন অভিনেত্রীকে দেখার; একজন নারীকে তার চিন্তার এবং নারী অভিনয়শিল্পীকে তার শিল্পের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করার।

প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীর অবদানের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় একটি চলচ্চিত্র। মৃণাল সেন চলচ্চিত্রকে প্রায় সিম্ফোনিক অর্কেস্ট্রার মতো বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ প্রত্যেকটি যন্ত্রের নিখুঁত অবদানের মধ্য দিয়েই শিল্পের যথাযথ বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অর্কেস্ট্রাতে প্রত্যেকটি যন্ত্রের যেমন পৃথক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, চলচ্চিত্রেও তেমনই প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীর প্রয়োজন স্বতন্ত্র। তার পরেও ইন্ডাস্ট্রিনির্ভর অধিকাংশ চলচ্চিত্রে নারীকে ব্যবসার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের জন্য নির্মাতারা এমন কোনো চরিত্র তৈরি করে না, যার জন্য চলচ্চিত্র অর্কেস্ট্রার সুর কেটে যাবে। নারীকে বিকল্প হিসেবে রাখা হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যে নারীকে সহজেই আরেকটি নারীর শারীরিক কাঠামো দিয়ে প্রতিস্থাপন করে দেওয়া যায়।

যে ইন্ডাস্ট্রি নারীর এ উপস্থাপন সমর্থন ও ব্যবহার করে, স্বভাবতই তারা চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা এবং নির্মাণের সময় নারীকে সজ্ঞানে বা অভ্যাসবশত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাখার চর্চা থেকে বিরত থাকে। ফলে চলচ্চিত্রের কাহিনিকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দেয়, আর ঘটনা প্রবাহের খুঁটি হিসেবে কাজ করে যে চরিত্রগুলো, সেখানে পুরুষের আধিপত্যের চর্চা চলতে থাকে। এই চর্চা দর্শক মনেও এমন শক্ত ভীত করে নিয়েছে, পর্দায় যখন কোনো আকর্ষণীয়ার প্রবেশ ঘটে, একজন নারী দর্শকের চোখও তাকে একজন পুরুষের দৃষ্টি দিয়েই বিচার করে। এ দৃষ্টি নারী দর্শক নিজে থেকে পায়নি, দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারী মনের গহীনে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে। তাই দীর্ঘদিনের ওই বস্তাপচা কাঠামো থেকে একটু সরে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু দেখার চেষ্টা থাকবে আলোচনার এই পর্বে। বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে বর্তমান অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে মূলধারা থেকে কিছুটা আলাদা এবং জটিল কেন্দ্রীয় নারীচরিত্রে সফলএমন একজন অভিনয়শিল্পী কঙ্কনা রানওয়াতকে নিয়ে এগোবে এই প্রচেষ্টা।

সঙ্কোচেরই বিহ্বলতা নিজেরে অপমান

সম্প্রতি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় পুরস্কার (২০১৬) পেয়েছেন কঙ্কনা রানওয়াত। যদিও প্রথম চলচ্চিত্র গ্যাংস্টার (২০০৭) মুক্তির পর থেকেই শিল্পী হিসেবে আলোচিত হন তিনি। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের হিমাচল প্রদেশের ছোটো শহর ভাম্বলাতে জন্ম নেওয়া কঙ্কনার ভাষ্যমতে, দিনে ১৮ ঘণ্টা তিনি পড়াশোনা করতেন চিকিৎসক হওয়ার জন্য। তবে সেই স্বপ্নটা ছিলো কঙ্কনার বাবা-মার। শিক্ষিকা মা ও ব্যবসায়ী বাবার তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে মেজো সন্তান কঙ্কনা ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী চলার পর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন; নিজের জীবন থেকে অন্য কিছু চান তিনি। পরিবারের সঙ্গে অনেকটা জেদ করেই পড়াশোনায় এক বছরের বিরতির অনুমতি নিয়ে দিল্লিতে এক বান্ধবীর কাছে চলে আসেন কঙ্কনা। তখনো তার অজানা তিনি কী করতে চান। নিশ্চিত শুধু একটি বিষয়ে, তিনি সব বাঁধনের বাইরে এসে স্বাধীন চিত্তে খুঁজে দেখতে চেয়েছিলেন তার জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য। তবে জীবনের পথ তো কল্পকাহিনির মতো সুগম আর সুনিশ্চিত নয়। কঙ্কনাও তার ব্যতিক্রম না।

কঙ্কনার অবয়বে বিচিত্র নারীরা

২০০৬ খ্রিস্টাব্দে গ্যাংস্টার-এ বারের নৃত্যশিল্পী সিমরান চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বলিউডে কঙ্কনা রানওয়াতের পথচলা শুরু। জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রে কঙ্কনা হাজির হন একজন সন্ত্রাসী এবং গায়কের ছদ্মবেশে থাকা পুলিশ কর্মকর্তার প্রেমের দ্বান্দ্বিক অনুভূতিতে বিভ্রান্ত মাদকাসক্ত নারী হিসেবে। আর এই চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রে তিনি স্বকীয়তা তুলে ধরেন। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে নতুন অভিনেত্রী বিভাগে ফিল্মফেয়ার ও আইফাসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কারের মাধ্যমে তিনি অভিনয়ে সফলতার স্বীকৃতি পান বলিউডে। এছাড়া ২০০৬ খ্রিস্টাব্দেই ও লামহেতে সানা আজিম, ২০০৭-এ লাইফ ইন অ্যা মেট্রোতে নেহা, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্যাশন-এ সোনালি চরিত্রে অভিনয় করে নির্মাতা ও দর্শকের কাছে কঙ্কনা গ্রহণযোগ্যতা পান। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে তানু ওয়েডস্ মানুতে তনুজা ত্রিবেদী, ২০১৩ তে শুট আউট অ্যাট ওয়াডালাতে বিদ্যা জোশি, ২০১৪ তে কুইন-এর রানি মেহরা, ২০১৫-তে তানু ওয়েডস্ মানু রিটার্নস্-এ তনুজা ও প্রতিভার চরিত্রে পর্দায় ধরা দেন শিল্পী কঙ্কনা।

ক. অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিক উপস্থাপন

গ্যাংস্টার, ফ্যাশন-এর সিমরান ও সোনালিসহ আরো কিছু চরিত্রে কঙ্কনাকে দেখা যায় নানা দ্বন্দ্বে আক্রান্ত মাদকাসক্ত নারীর চরিত্রে। তবে চরিত্রগুলোর অস্বাভাবিক উপস্থাপনের ভঙ্গিতে সূক্ষ্ম পরিমিতি বোধ বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। তার চোখের স্থির দৃষ্টির অভিব্যক্তি থেকে চিৎকার করে উঠা অসহায় কান্না, সবটা দিয়েই প্রকাশ পেয়েছে চরিত্রের ভিন্নতা, একই সঙ্গে পূর্ণতাও। ফ্যাশন-এ এমন দৃশ্যের একাধিক উদাহরণ দেখা যায়রেস্টুরেন্টের বাথরুমে সোনালির (কঙ্কনা) সঙ্গে মেঘনা মাথুরের (প্রিয়াঙ্কা চোপড়া) প্রথম দেখা হওয়ার দৃশ্যে প্রায় এক মিনিট কুড়ি সেকেন্ডের কথোপকথন চলে, যার অধিকাংশই ক্যামেরার ক্লোজ শটে থাকে কঙ্কনার মুখমণ্ডল। এ সময় তার অভিব্যক্তিতে একই সঙ্গে ব্যর্থতা, ক্ষোভ, আর পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতার এক মিশ্র উপস্থাপন দেখা যায়। সেই সঙ্গে চোখের তীক্ষè দৃষ্টি আর অঙ্গভঙ্গিতে ফুটে ওঠে মাদকাসক্তের চিহ্ন; যা চরিত্রটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে ফুটিয়ে তোলে। কঙ্কনার মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি, দৃশ্যের প্রয়োজনে পৃথক অঙ্গভঙ্গি আর চোখের ব্যবহারের আরো কিছু দৃশ্যের কথা উল্লেখ করা যায়উন্মাদের মতো বিভিন্ন জায়গায় মাদকদ্রব্য খোঁজার সময় সোনালির অস্থিরতা, সেবনের সময় চকচক করে ওঠা চোখ আর পরের মুহূর্তে দুফোটা অশ্রুর সঙ্গে নেমে আসে অসুস্থ প্রশান্তি।

এই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম পরিমিতির ব্যবহারই চরিত্রগুলোকে অনন্যতা দান করেছে। যেমনটি বলেছেন মৃণাল,

ফিল্মে অভিনয়টা ফিল্মের সমগ্রতার অন্যতম উপাদান। যখনই অভিনয়ের ফলে অভিনেতা অন্য উপাদানগুলোর সঙ্গে ঐক্যতান সৃষ্টি না করে বিশিষ্ট হয়ে পড়েন তখনই সেই সমগ্রতা ব্যাহত হয়। আবার সেই অখণ্ড সমগ্রতার মধ্যে থেকেও অভিনেতাকে ত বিশিষ্ট হতেই হবে, নইলে আর তার ক্ষমতার প্রতিফলন কোথায় ঘটবে।

তাই চলচ্চিত্রের সমগ্রতার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে দৃশ্যের প্রয়োজনে শিল্পী কঙ্কনা কখনো কখনো অন্য সব উপাদানের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। আবার কখনো উপস্থিতির তীব্রতা দিয়ে দর্শকের সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে নিয়েছেন নিজের দিকে। মৃণাল সেনের কথার জের ধরে বলাই যায়, নিঃসন্দেহেই এটি একজন সংবেদনশীল অভিনয়শিল্পীর বৈশিষ্ট্য।

খ. আটপৌরে নারীর অসাধারণত্ব

১০ বছরের কর্মজীবনে কঙ্কনা নিজেকে বিচিত্র ধরনের চরিত্রে পর্দায় উপস্থাপন করেছেন। তিনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে এমন চরিত্রে হাজির হয়েছেনঅধিকাংশ কন্যা-স্ত্রীকে যেমন রূপে ভারতের সাধারণ মানুষ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু চলচ্চিত্রের কাহিনির সঙ্গে ওই চরিত্রগুলোই হয়ে ওঠে অসামান্য কোনো নারী। অবশ্য সেখানে নির্মাতার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ওই চরিত্রকে পর্দায় সফলভাবে তুলে আনা আর সামান্য থেকে অসামান্য হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করা অবশ্যই অভিনয়শিল্পীর দক্ষতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমন চরিত্রের উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পাওয়া কুইন-এর রানি মেহরার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

কুইন-এর কাহিনি শুরু হয় রানি মেহরা নামের এক তরুণীর বিয়ে ভেঙে যাওয়া দিয়ে। এতে উৎসবমুখর রানির পরিবারে নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা। এরপরেই ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে সবার বাধ্য মেয়ে চিরচেনা রানি মেহরা। মধুচন্দ্রিমার পরিকল্পনা অনুযায়ী একাই প্যারিস ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অচেনা পরিবেশে রানির অসহায়ত্ব, ধীরে ধীরে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, একা একা বাঁচতে শেখা আবার নতুন বিচিত্র মানুষের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত বন্ধুত্বএসবের মধ্য দিয়েই পরিবর্তিত হতে থাকেন রানি। মানসিকভাবে তিনি ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন।

চলচ্চিত্র জুড়ে এই পরিবর্তনগুলোকে অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠস্বরের ব্যবহার, মৌখিক অভিব্যক্তি প্রভৃতির মাধ্যমে উপস্থাপন করেন কঙ্কনা। রানির যে ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথাবিজয়তিনি বিয়ের একদিন আগে রানিকে একটি রেস্টুরেন্টে ডেকে তার অপারগতার কথা জানান। কঙ্কনা এ সময় রানির কষ্ট-অপমান-বিভ্রান্তির মিশ্র অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন এক দৃশ্যমান অস্থিরতা আর কণ্ঠস্বরের ব্যবহারের মাধ্যমে। প্যারিসে যাওয়ার পরে অপরিচিত আলাদা এক পরিবেশে রানি একা এসে উপস্থিত হন। অপ্রস্তুত, অবাক আর ভীত অভিব্যক্তির কিছু মিশ্র বহিঃপ্রকাশ দর্শককে বুঝিয়ে দেয় রানির মানসিক অবস্থা, একই সঙ্গে তার চরিত্রের অভ্যন্তরীণ কিছু বৈশিষ্ট্য ও বেড়ে ওঠা।

এক রাতে প্যারিসের অপরিচিত রাস্তায় ছিনতাইয়ের শিকার হন রানি। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতের ব্যাগটা তিনি রক্ষা করেন। সেই সময় ছিনতাইকারীর সঙ্গে হাতাহাতির যে দৃশ্য, সেখানে কঙ্কনা একই সঙ্গে জেদ, অসহায়ত্ব আর মানসিক দৃঢ়তা উপস্থাপন করেন। ছিনতাইকারী রানির ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে চাইলে অবাক হওয়া এবং ভয়ের অভিব্যক্তির সঙ্গে চিৎকার দিয়ে নিজের জন্য লড়াই শুরু করেন। ভিনদেশে এই পরিস্থিতিতে রানির সিদ্ধান্তের যে অটল অবস্থান তার প্রকাশ ঘটে এই দৃশ্যে। তিনি নিজের সমস্ত শারীরিক ও মানসিক শক্তি এক করে ব্যাগ আঁকড়ে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়েন, দুই পা দিয়ে নিজের হাত চেপে ধরে অসহায় কিন্তু দুর্বলতাহীন চিৎকার করতে থাকেন। ওই দৃশ্যে রানির প্রতিক্রিয়া, চরিত্রটির লড়াকু বৈশিষ্ট্য ও দৃঢ়তার একটি সফল বহিঃপ্রকাশ। চলচ্চিত্র জুড়েই এমন আরো দৃশ্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এখানে চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যটির কথা না বললেই নয়। যে দৃশ্যে রানিকে আবার বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেও তিনি বিজয়কে না করে চলে যান। সঙ্গে ওই অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট ফুটে ওঠে তার অর্জিত আত্মবিশ্বাস।

গ. একই পর্দায় দুই রূপে

এ পর্যায়ে তানু ওয়েডস্ মানু রিটার্নস প্রসঙ্গে বলা যায়। এতে কঙ্কনা দুজন বিপরীতধর্মী নারীচরিত্র রূপায়ণ করেন। খেলোয়াড় প্রতিভা আর অদ্ভুত এক বিবাহ বিচ্ছেদের পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত তনুজা। অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠস্বর আর অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে সেখানে কঙ্কনা তুলে ধরেছেন ভিন্ন দুটি চরিত্র। সাধারণ চরিত্রগুলোকে কঙ্কনা কী ধরনের বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও সরল করে তুলে ধরেন তার উদাহরণ ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে এই চলচ্চিত্রকে তিনি কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন চরিত্র বলে মনে করেন।১০

আলাদা চলচ্চিত্রের জন্য দুটি চরিত্র চিত্রায়ণ হয়তো খুব ব্যতিক্রম কিছু নয়। কিন্তু একই চলচ্চিত্রে এ ধরনের কাজের জন্য প্রত্যেকটি অঙ্গভঙ্গি, সংলাপের উচ্চারণ আর আঞ্চলিকতার টানসবগুলো বিষয়ের প্রতি তাকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়েছে। কেননা চলচ্চিত্রের পটভূমি পূর্ণতা পায় যখন তনুজা ও প্রতিভাএকই চেহারার দুই নারী তাদের চরিত্রের সব বৈপরীত্য নিয়ে একে অন্যের মুখোমুখি হয়। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তনুজা ও প্রতিভা দেখতে একই ধরনের, কিন্তু হুবহু না। তাই দুটি চরিত্রের উপস্থিতিতে প্রত্যেকটি দৃশ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অভিব্যক্তির পার্থক্য রক্ষা করেছেন কঙ্কনা। কেননা চরিত্র দুটির বৈপরীত্য রক্ষা করা না গেলে গল্পের চরম বিন্দুতে তা আকর্ষণ হারিয়ে ফেলতো। দ্বৈত চরিত্রে যেসব শিল্পী অভিনয় করে, একই দৃশ্যে দুই জনের চরিত্রে অভিনয়ের সময় তাকে সামনে আরেকজনকে কল্পনায় নিয়ে সংলাপ দিতে হয়। এ রকম দৃশ্যেও কঙ্কনা যে ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বাস্তব অভিব্যক্তি ও প্রতিক্রিয়া উপস্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

চাকচিক্যের বাইরের শক্তিশালী নারী

একজন মানুষের জীবনদর্শন আর পেশাগত কর্মজীবন প্রচণ্ডভাবে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এ দুটি ভিন্ন বিষয়। পেশাগত পরিচয় বা কর্ম সবসময় একজন মানুষের প্রকৃত সত্তাকে প্রতিফলিত করতে পারে না। তবে শুধু পেশা নয়, মানুষ হিসেবে তার সমস্ত বিচিত্র কর্মের পিছনে সর্বাধিক শক্তিশালী ভূমিকা রাখে তার ব্যক্তিজীবনের চিন্তাভাবনা ও দর্শন। কঙ্কনা রানওয়াত অভিনয়শিল্পী হলেও প্রথমে তিনি একজন স্বাধীনচেতা নারী। তাই ব্যক্তিকে চিনতে, শুধু তার শিল্পের বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ন যথেষ্ট নয়।

শিল্পী হিসেবে কঙ্কনা বরাবরই নিজেকে গতানুগতিক চরিত্রের বাইরে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে সমসাময়িক কোন অভিনেত্রীকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেনএমন প্রশ্নের উত্তরে জানান, অন্যান্য অভিনেত্রীরা যেখান থেকে অভিনয় শুরু করেছেন সেখানেই আছেন।১১ তার মানে তাদের চরিত্রে বিচিত্রতা নেই। এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কঙ্কনা বলেন, তিনি যে ধরনের চরিত্রকে পর্দায় উপস্থাপন করেন তেমনটি অন্যদের মধ্যে দেখেন না। তাই নিজেকে সমসাময়িক অন্য অভিনেত্রীদের সঙ্গে তুলনা করতে চান না কঙ্কনা। একক ঘোষণায় একজন শিল্পীকে শ্রেষ্ঠ বলা যায় না, এ কথা সত্য। তবে কঙ্কনার কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া, পিছিয়ে পড়া ও ফিরে এসে বলিউড কুইন খেতাব পাওয়ার যে পথচলা তা থেকে অন্তত এটুকু ধারণা করা যায়, এ সফলতার পিছনে শক্তি ছিলো তার অর্জিত আত্মবিশ্বাস। কঙ্কনা নিজেই বলেন, জীবনে তার যে অবস্থান, আত্মবিশ্বাস আর মানসিক শক্তি সবই তার অর্জিত। ১৭ বছর বয়সে কঙ্কনা যখন মুম্বা

আসেন, তার থেকে বয়সে অনেক বড়ো ইন্ডাস্ট্রিরই এক ব্যক্তির কাছে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে তার মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা হয়। ঘটনাটি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় কঙ্কনার। সেদিন ওই অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে সেই ব্যক্তিকে পাল্টা আঘাত করে, ওখান থেকে পালিয়ে পুলিশের কাছে কঙ্কনা অভিযোগ করেছিলেন। সবাইকে জানিয়ে কঠিন রাস্তা দিয়ে ঠিক কাজের সাহস করেছিলেন তিনি। কঙ্কনার ভাষায়, সেদিন আমি বুঝেছিলাম আমার ভিতরে কতোটা শক্তি আছে, এই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সফল হওয়ার জন্য।১২

হঠাৎ একটি ঘটনাতে কঙ্কনার এ উপলব্ধি হলেও, এই চেতনা একদিনে তৈরি হয়নি তার। গণমাধ্যমে তিনি অকপটে তার ব্যক্তিজীবনের কথা বলার জন্য বেশ আলোচিত। নিজের শৈশব ও পরিবারের বিষয়ে বেশ খোলামেলাভাবেই কঙ্কনা বলেন, ভারতের মতো দেশে আর দশটা সাধারণ পরিবারের মেয়ের থেকে তার শৈশব খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু নয়। এনডিটিভির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, এটা স্বীকার না করে উপায় নেই যে আমরা প্রচণ্ডভাবে লিঙ্গবৈষম্যকারী একটি দেশে বাস করি। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার পরিবারে বোনদের থেকে বরাবরই ভাইদের গুরুত্ব বেশি দেওয়া হতো। শুধু কন্যা সন্তান হওয়ার কারণেই তিনি পরিবারের অনাকাক্সিক্ষত শিশু হিসেবে বিবেচিত হন। কঙ্কনা বলেন, এসব ঘটনা আমি এতো বিস্তারিত জানি, কারণ যতোবার বাসায় কেউ না কেউ বেড়াতে আসতো অথবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে, প্রত্যেকবার এই গল্পগুলো করা হতো আমার সামনেই। এসব তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই স্বীকার করেন ও মেনে নেন কোনো ক্ষোভ প্রকাশ না করেই। কিন্তু সঙ্গে এ কথাও বলেন যে, নিজের ভিতরে তিনি অনুভব করতেন, ভাইদের তুলনায় কোনো অংশেই তার যোগ্যতা কম নয়। এই উপলব্ধিই তাকে কঠিন রাস্তায় সফলতার কাছে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন কঙ্কনা।

সমাজে নারীকে উপস্থাপনের ধারা, ভালো মেয়ের সংজ্ঞায়ন আর নারীবাদ নিয়েও কথা বলেন তিনি। ভারতের প্রেক্ষাপটে কঙ্কনা রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের কথা বলেন। অন্য কারো মতো হতে চেষ্টা করার এই প্রবণতা, ছোটোবেলা থেকেই একটা বাচ্চা মেয়ের মধ্যে দিতে থাকে সমাজ। এভাবেই সমাজ মেয়েগুলোকে প্রতিনিয়ত অন্যের জন্য নিজেকে তৈরি করতে শেখায়।

কঙ্কনার বোন রঙ্গোলি অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। রঙ্গোলির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কঙ্কনা বলেন, ভালো মেয়ের সংজ্ঞাটা পরিবর্তন করা প্রয়োজন, কারণ খারাপ মেয়েগুলোই আজকের ভালো মেয়ে। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিৎকার করে। যারা নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করে। যারা অকারণে কারো কর্তৃত্ব, কারো শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয় না তাদেরকেই ভালো মেয়ে বলতে চেয়েছেন কঙ্কনা। কঙ্কনা মনে করেন, হিরোর সংজ্ঞাটাও পরিবর্তন হওয়া দরকার। ইন্ডাস্ট্রিতে তৈরি হওয়া চলচ্চিত্রগুলোতে জেদি ও একরোখা প্রেমিকদের যেভাবে হিরো বানিয়ে তোলা হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গিই এমন মানুষদের অনুপ্রাণিত করে যারা রঙ্গোলির ওপর অ্যাসিড ছুড়ে মেরেছিলো।১৩

কঙ্কনা বলেন, তার বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, প্রচলিত কাঠামোর নায়িকা না হওয়ার কারণে যারা টিটকারী করে, যারা তার ইংরেজি উচ্চারণের জন্য তাকে অবমূল্যায়ন করে, তাদের জবাব দেওয়ার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো তাদের ভাষায় জবাব না দেওয়া। ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যে তোমাকে অপমান করার চেষ্টা করছে, তাকে তুমি তার ভাষায় কখনো প্রতিহত করতে পারবে না। কারণ সেটা তার আয়ত্ত করা কৌশল। তাকে তোমার নিজের কৌশলে ভুল প্রমাণ করে দিতে হবে। রাস্তা যতোই কঠিন হোক। আর এটাই সঠিক রাস্তা।১৪ ওই সাক্ষাৎকারে নারীবাদ আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গে কঙ্গনা বলেন,

নারীবাদ আসলে কী, সেটা আগে জানা জরুরি। নারীবাদ যদি এই হয় যে, কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে তাকে বিভিন্ন প্রমাণ আর প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ধরে রাখতে হবে, তাহলে আমি নারীবাদী নই। নারীবাদ যদি এই হয়, আমাদের সমাজের কতিপয় পুরুষের অত্যাচারের জন্য প্রতিনিয়ত পুরো পুরুষ সমাজকে দোষারোপ করা, তাহলেও আমি নারীবাদী নই। এ সময়ে আমাদের উচিত সমাজের নারীবাদী পুরুষদের উৎসাহিত করা। কারণ এর মধ্যে দিয়েই প্রকৃত নারীবাদ দিক নির্দেশনা পাবে।১৫

সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই

প্রযুক্তিনির্ভর মানুষের বিনোদন জগতের বিশাল অংশ দখল করে আছে চলচ্চিত্র। সৃজনশীল মানুষের সমারোহ ঘটে সেখানে। আর এই মাধ্যম ব্যাপকভাবেই মানবপ্রকৃতি ও সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখে। এর প্রমাণ দেখা যায়, যাবতীয় উৎসব, তার ফ্যাশন, সামগ্রিক জীবনাচরণ থেকে ব্যক্তিগত জীবনে। তাই আলোচনা শুধু একজন কঙ্কনাকে নিয়ে নয়, সব কঙ্কনাকে প্রশ্ন তুলতে হবে নিজের অবস্থান নিয়ে। আর এই কঙ্কনা শুধু একজন শিল্পী বা অভিনেত্রী নন। পেশাগত পরিচয়ের আগে তারা একেকজন নারী। তারও আগে কঙ্কনারা প্রত্যেকে স্বতন্ত্র মানুষ।

লেখক : অধরা মাধুরী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চা করেন।

adharamadhuri18@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. আজাদ, হুমায়ুন (২০১৩ : ৩৭৩); নারীবাদ, ও নারীবাদের কালপঞ্জি; নারী; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

২. খন্দকার, নাসরিন (২০১১ : ১৪); পুতুলখেলার রাজনীতি : রারবি কাহিনী; প্রবল ও প্রান্তিক ১; সিরিজ সম্পাদক : রেহনুমা আহমেদ; পাবলিক নৃবিজ্ঞান, সন্ধি প্রকাশনী, ঢাকা।

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/Florence_Lawrence; retrieved on 27.08.2016

৪. হক, ফাহমিদুল (২০১১ : ৫১); আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি; অসম্মতি উৎপাদন : গণমাধ্যম বিষয়ক প্রতিভাবনা; সংহতি প্রকাশনী, ঢাকা।

৫. রাঙ্কল, সুসান; সৌন্দর্য উৎপাদন; অনুবাদ : সেলিম রেজা নিউটন; চন্দ্রাবতী; সম্পাদনা : সুস্মিতা চক্রবর্তী; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বর্ষ ১, সংখ্যা ১, ফেব্রুয়ারি ২০০৬, পৃ. ১৫১।

৬. http://www.themeshnews.com/top-10-most-expensive-bollywood-actresses-in-2016/ ; retrieved on 18.09.2016 I http://top101news.com/2015-2016-2017-2018/news/entertainment/music-movies/bollywood/richest-most-expensive-actors-bollywood/10/; retrieved on 18.09.2016

৭. http://www.huffingtonpost.com/soraya-chemaly/20-mustknow-facts-about-g_b_5869564.html; retrieved on 20.11.2016

৮. সেন, মৃণাল (১৯৯২ : ৯৩); নাসির, স্মিতা, ওম, শাবানা; সিনেমা, আধুনিকতা; সম্পাদনা : শিলাদিত্য সেন; প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস্ প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

৯. প্রাগুক্ত; সেন (১৯৯২ : ৯৩)।

১০. https://www.youtube.com/watch?v=U0UNvoRitTg; retrieved on 20.11.2016

১১. https://www.youtube.com/watch?v=N2xo0PdWSk0; retrieved on 20.11.2016

১২. https://www.youtube.com/watch?v=8iZJ5S_OZqQ; retrieved on 19.11.2016

১৩. https://www.youtube.com/watch?v=BcepjaLg57Y; retrieved on 19.11.2016

১৪. https://www.youtube.com/watch?v=8iZJ5S_OZqQ; retrieved on 19.11.2016

১৫. https://www.youtube.com/watch?v=8iZJ5S_OZqQ; retrieved on 19.11.2016


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন