আমিনুল ইসলাম
প্রকাশিত ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ব্ল্যাক-এ মানবীয় যোগাযোগের রূপায়ণ
আমিনুল ইসলাম

ভূমিকা
এটি আমার ও আমার শিক্ষকের গল্প। এটি দুজন অপূর্ণাঙ্গ মানুষের জীবনের গল্প। ঈশ্বরই এ দুজনকে অপূর্ণাঙ্গ করেছে। দুজনই তাদের নিয়তির সঙ্গে লড়াই করেছে। সম্ভব করেছে অসম্ভবকে। আমার এই গল্পের জগতটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। যে জগতের শব্দ হারিয়ে যায় নৈঃশব্দের মাঝে, আলো হারিয়ে যায় অন্ধকারের মাঝে। এটা আমার জগৎ। যেখানে কোনো কিছু দেখা যায় না, শোনাও যায় না। আমার এই জগতের একটি মাত্র নাম রয়েছে। আমার গল্পের নাম হলো ব্ল্যাক।
কথাগুলো ব্ল্যাক-এর মূলচরিত্র মিশেল ম্যাকনিলি’র। সে তার জীবনের গল্প লিখছে টাইপরাইটারে। ভয়েস ওভারে ভেসে উঠছে তারই কণ্ঠস্বর। মিশেল তার এই জগতটির নাম দিয়েছে ব্ল্যাক বা অন্ধকার। জগতটি অন্ধকার, কারণ সেখানে শব্দ নেই, আলো নেই। এই অন্ধকার মানে একধরনের অনিশ্চয়তা। এই অন্ধকার মানে বিচ্ছিন্নতা। এই বিচ্ছিন্নতা দুনিয়া ও পরিপার্শ্ব থেকে। এটি পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্নতা। এটি জাগতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা। এই বিচ্ছিন্নতা মানবিক জগৎ থেকেও। এই বিচ্ছিন্নতা দূর করতে, ব্যক্তির মধ্যে বাস্তবতার উপলব্ধি, সেই উপলব্ধির প্রকাশ, বস্তু জগতের সঙ্গে, জগতের জৈব ও মানবিক সত্তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়াই হলো যোগাযোগ। এই যোগাযোগ বা সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি হয়ে ওঠে সামাজিক জীব। আর তা না হলে, সে রয়ে যায় বন্য প্রাণীরূপে। কাজেই এটা জোর দিয়ে বলা যায়, যোগাযোগ মানুষকে সামাজিক করে তোলে।১ যোগাযোগ সক্ষমতার কারণে সে অন্ধকার থেকে আলোর জগতে আসে।
বর্তমান আলোচনায় যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে, মানবীয় সত্তা বিকাশের মূল হাতিয়ার যোগাযোগ। এটি একটি আধুনিক সমাজ বিন্যাসেরও হাতিয়ার।২ যোগাযোগ ছাড়া মানুষের মন সত্যিকার অর্থে বিকশিত হয় না। এই সক্ষমতা না থাকলে একজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে মানুষ হয়ে ওঠে না। তার মন রয়ে যায় অস্বাভাবিক ও অবিকশিত। সে এমন এক অবস্থায় থাকে, তখন তাকে না বলা যায় মানুষ, না বলা যায় হিংস্র প্রাণী।৩ ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্ক-সংযোগগুলোর প্রসার ঘটে স্থানিক পরিসরে। সম্পর্ক-সংযোগ জোরদার হয় সময়ের পরিসরে। এই প্রসার ও জোরদার হওয়ার মধ্য দিয়ে মানসিক চিন্তা কাঠামোতে একধরনের ঐক্য সাধন ও প্রসারণ হয় এবং সজাগ হয়ে ওঠে। যোগাযোগ ক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক সত্তাকে বিকশিত, সম্প্রসারিত ও পূর্ণতা দান করে। কেননা এই যোগাযোগের মাধ্যমেই ব্যক্তি জগতের সবকিছুর সঙ্গে এক রকম সংযোগ স্থাপন করে। এই সংযোগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ই। ব্যক্তির যোগাযোগ দক্ষতা যতো উন্নত হয়, তার বুদ্ধিমত্তাও ততো উন্নত। হ্রাস পায় তার আচরণের জড় যান্ত্রিকতা ও পাশবিকতা।৪
যাহোক, মানুষের বেঁচে থাকা মানেই যোগাযোগ করা। মানবীয় যোগাযোগ অতিসূক্ষ্ম ও সৃজনশীল কিছু প্রক্রিয়ার সমষ্টি।৫ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে—সংকেত চিহ্ন ও অর্থময়তা। মোটা দাগে যোগাযোগ হলো তথ্য ভাগাভাগি করে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো একটা লক্ষ্যকে সামনে রেখে ধারণা ও জ্ঞানের বিনিময় করা হয়; বার্তার সাহায্যে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়; বার্তার মাধ্যমে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সাধন হয়; বিভিন্ন উদ্দেশ্য বা বোঝাপড়া ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়।৬ সর্বোপরি এটি এমন একটি কৌশল যাতে মানবীয় গুণাবলীগুলো বিকশিত হয় এবং টিকে থাকে।৭
যেকোনো শিল্পই মানবীয় যোগাযোগের এক একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। শিল্পে যোগযোগকর্ম হচ্ছে শিল্পস্রষ্টা বা প্রেরকের কাছ থেকে পাঠক-দর্শক-শ্রোতার বা প্রাপকের কাছে বার্তা ও শিল্পগত মূল্যবোধ প্রেরণ। এক্ষেত্রে শিল্পস্রষ্টা ও তার প্রাপকের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল সম্পর্ক স্থাপন হয়। শিল্পের মধ্যে বার্তা প্রোথিত থাকায় শিল্পী প্রেরক হিসেবে এবং দর্শক-শ্রোতা-পাঠক প্রাপক হিসেবে মিথস্ক্রিয়া করে। আর সেই বার্তাগুলো হচ্ছে—বাস্তব জগতের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, তথ্য, ধারণা ও মূল্যবোধ। শৈল্পিক তথ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সাধারণত দ্বিমুখী যোগাযোগ সাধিত হয়। কেননা শিল্পতত্ত্বের ধারণা অনুযায়ী শিল্পকর্মের অস্তিত্ব এবং এর সামাজিক ভূমিকা শুধু শিল্প সৃষ্টিকারীর (প্রেরকের) বিষয় দিয়েই নয়, বরং প্রাপকের যোগ্যতা ও সামর্থ্য দিয়েও নির্ধারণ হয়। প্রাপকের ঐতিহাসিক, দলীয় কিংবা একক অভিজ্ঞতা শিল্প বিষয়ের সঙ্গে এমন এক মিথস্ক্রিয়া করে যা কোনোক্রমেই একমুখী যোগাযোগ নয়, বরং শিল্প ও প্রাপকের মধ্যে সংলাপের সৃষ্টি করে। যাহোক, শৈল্পিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় শিল্প (প্রেরক) ও প্রাপকের মধ্যে তিন ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর সেই সম্পর্কগুলো ঠিক এ রকম—শিল্পস্রষ্টা-বাস্তবতা, শিল্পস্রষ্টা-প্রাপক ও শিল্পস্রষ্টা-সৃষ্টিমূলক প্রক্রিয়া। এছাড়া আরো তিন ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেমন : প্রাপক-শিল্পকর্ম, প্রাপক-বাস্তবতা ও প্রাপক-শিল্পস্রষ্টা।৮
চলচ্চিত্র একটি শিল্পমাধ্যম। যে মাধ্যমে দৃশ্যমান হয় মানুষের জীবনের গল্প। ফুটে ওঠে সমাজ-বাস্তবতার ছবি। এই শিল্প সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয় বাচনিক ও অবাচনিক ভাষা, শব্দ, ইমেজ, স্থির ও চলমান ছবি। মোটা দাগে এটি যোগাযোগেরও মাধ্যম। যোগাযোগের প্রশ্নে এই মাধ্যম উদ্দীপিত করে মানুষের বেশিরভাগ ইন্দ্রিয়কে। আর সেসব ইন্দ্রিয় মানুষেরও যোগাযোগ মাধ্যম। বর্তমান আলোচনায় ব্ল্যাক-এর (২০০৫) শিল্পগুণ বিচার করা হবে না; বিশ্লেষণ করা হবে না অভিনয়শিল্পীদের দক্ষতা। এখানে নির্মাতার গল্প বয়ান কৌশল ও দক্ষতাও খতিয়ে দেখা হবে না, বিশ্লেষণ করা হবে না কারিগরি কোনো দিক। সর্বোপরি আলোচনাটি মোটেও ব্ল্যাক-এর সমালোচনা নয়। বরং ব্ল্যাক-এ মানবীয় যোগাযোগের যে রূপায়ণ, কেবল তারই বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠবে মানবীয় সত্তা বিকাশের মাধ্যম হিসেবে যোগাযোগের গুরুত্বের জায়গাটি।
যোগাযোগের ধারণায়ন
যোগাযোগ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘কমিউনিকেশন’। এই কমিউনিকেশন শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘কমিউনিকেশিও’ থেকে। ‘কমিউনিকেশিও’র মূল হলো ‘কমিউনিস’। কমিউনিস-এর মানে সাধারণ। অর্থাৎ কোনো বিষয় বা ধারণা সম্পর্কে একটি সমাজের অনেকের বা সবার চেনা-জানা বা পরিচয় আছে এমন। যোগাযোগ শব্দটির অর্থময়তা দ্বি-মাত্রিক। প্রথমত, যোগাযোগের মানে হলো কোনো তথ্য, ধারণা, জ্ঞান, বিশ্বাস, বোধ, দক্ষতা ইত্যাদি কারো মধ্যে সঞ্চারিত করা। ১৪ শতকের দিকে এই শব্দটি দিয়ে কোনো কিছু দেওয়া বা বিনিময় করাকে বোঝানো হতো। আর এই দেওয়া বা বিনিময় ছিলো মূলত বস্তুগত উপাদান। এছাড়াও এটি অনুভবযোগ্য বিভিন্ন বিষয় যেমন তাপ, অনুভূতি কিংবা কোনো কিছুর নড়াচড়াকেও বোঝাতো। ১৬ শতকের দিকে এসে তথ্য, ধারণা ও জ্ঞানের বিনিময় বোঝাতে ব্যবহৃত হতো যোগাযোগ শব্দটি; যেমন, বক্তব্য বা লিখন কৌশলকে বোঝাতো। পরবর্তী সময়ে এটি যান্ত্রিক বা বৈদ্যুতিক মাধ্যমকে নির্দেশ করতো। ১৯ শতকের শেষের দিক এবং ২০ শতকের গোড়ার দিকে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র যেমন টেলিগ্রাফ, টেলিফোন কিংবা সম্প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে দূরবর্তী কোনো স্থানে তথ্য সঞ্চারণের কৌশল কিংবা ব্যবস্থাকে বোঝাতো। কাজেই আধুনিক অর্থে এই শব্দটির অর্থময়তা যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।৯ দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ শব্দটির মানে মূলত সম্পর্ক, সংযুক্তি এবং অংশগ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৪ শতকের শেষের দিকে দুজন ব্যক্তির মধ্যে মিল থাকার বিষয়কে বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হতো। ১৫ শতকের মাঝামাঝির দিকে এটি ব্যবহৃত হতো আন্তঃব্যক্তিক সংযোগ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, পারস্পরিক সংযুক্তি ও সম্পর্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ঘাত-প্রতিঘাত ইত্যাদি বোঝাতে। আর ১৬ শতকে যোগাযোগ বলতে বোঝানো হতো কোনো কিছু বিনিময় করা, অংশগ্রহণ করা কিংবা মালিকানা নিশ্চিত করার ক্রিয়াকে।
যোগাযোগ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘কমিউনিকেশন’-এর আরেকটি শিকড় নিহিত ল্যাটিন ‘কমিউনিকেয়ার’ শব্দটির মধ্যে। এই কমিউনিকেয়ার মানে হলো অনেকের কাছে পরিচিত বা বোধগম্য করে তোলা, অনেকের সঙ্গে বিনিময় করা; একাধিক ব্যক্তির মধ্যে সঞ্চার করা; কোনো কিছু জানানো, প্রেরণ করা কিংবা অন্যকে তথ্য প্রদান। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যোগাযোগ মানে হচ্ছে মূলত কোনো দূরবর্তী স্থানে সংকেত বা বার্তা পাঠানো; যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।১০ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই দূরবর্তী স্থান ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন নতুন প্রযুক্তি আবির্ভাবের পর। কাজেই প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগ হলো ভিন্ন ভিন্ন বার্তার মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি, স্থান কিংবা জনগণের মধ্যে সংযোগ স্থাপন।
যোগাযোগকে উপলব্ধি করার প্রশ্নে আরেকটি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি হলো ‘ক্রিয়া-পরম্পরার বিন্যাস ও অর্থময়তা সৃজন’।১১ এই ‘ক্রিয়া-পরম্পরার’ মানে হলো বিভিন্ন শব্দ-ধারণা-ভাবনা-চিন্তা-অঙ্গভঙ্গি-চাহনি-বস্তু-প্রদর্শনীকে অর্থপূর্ণ উপায়ে সাজানো বা বিন্যাস করা। যাহোক, এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যোগাযোগ হলো—বিনিময়, অংশগ্রহণ, বন্ধুত্ব ও বিশ্বাস ধারণ। এসব প্রত্যয় বা ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন, যুথবদ্ধভাবে কোনো কিছু সৃষ্টি করা, এমন কিছু নির্মাণ করা যেখানে জগতের সবকিছুর অস্তিত্ব ব্যক্তির কাছে বোধগম্য হয়ে উঠবে।
মানবীয় যোগাযোগ একটি সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়। যোগাযোগ কৌশল উপলব্ধি, ব্যাখ্যা ও আলোচনার ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত প্রত্যয় বা শব্দবন্ধগুলো হলো—‘তথ্য’, ‘বার্তা’, ‘অর্থময়তা’, ‘প্রতীকবদ্ধকরণ বা কোডিং’১২‘সেন্স’, ‘ফ্যাকাল্টি’, ‘মডালিটি’, ‘চ্যানেল’, ‘মিডিয়া’, ‘ম্যাটারিয়াল কালচার’, ‘ক্যাপাসিটি’, ‘স্কিল’, ‘ডিসকোর্স’, ‘কোড’, ‘আর্ট’, ‘কগনিশন’, ‘প্রসেস’, ‘ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘মেন্টাল রিপ্রেজেন্টেশন’১৩ ইত্যাদি।
যোগাযোগের বেশিরভাগ তত্ত্ব ও মডেল মূলত মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া, জ্ঞান অর্জন, চিন্তা-অভিজ্ঞতা ও চৈতন্যের মাধ্যমে নিজ জগৎ ও পরিপার্শ্ব সম্পর্কে টের পাওয়া এবং বুঝতে পারার সঙ্গে সম্পর্কিত। রয়েছে অবাচনিক প্রক্রিয়া যেমন : ঘ্রাণ, অঙ্গ সঞ্চালন, দেহভঙ্গি ও দর্শন। এছাড়াও মানুষ বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে যোগাযোগ করে।১৪ এসব উপায়ের মধ্যে রয়েছেভাষাতাত্ত্বিক, সঙ্গীত, লজিকাল বা গাণিতিক, স্থানিক, শারীরিক দেহভঙ্গি ও ব্যক্তিগত বুদ্ধিবৃত্তি। অন্যদিকে প্রাণিকুল যেসব চ্যানেলে যোগাযোগ করে তার মধ্যে রয়েছে দৃষ্টি, শব্দ, ঘ্রাণ, স্পর্শ, কম্পন ও বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র।১৫ মোটা দাগে মানুষের যোগাযোগ চ্যানেলটি অডিও-ভিজ্যুয়াল; অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে স্পর্শ ও ঘ্রাণ। এসব মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
গোড়ার দিককার দার্শনিকগণ মনে করতেন, ভাষা এমন এক কৌশল যা আমাদের বিমূর্ত চিন্তার প্রকাশকে সম্ভব করে তোলে।১৬ কিন্তু মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম কেবল ভাষা নয়। অন্যান্য উপায়েও সে যোগাযোগ করে। যোগাযোগের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে ব্যবহার করে পঞ্চ ইন্দ্রিয়। সেই ইন্দ্রিয়গুলো হলো দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ। ভাষার ব্যবহার ছাড়া মানুষের অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যম বা উপায়কে মোটা দাগে বলা হয় অবাচনিক যোগাযোগ। অবাচনিক যোগাযোগকে উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যেসব প্রত্যয় ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে রয়েছে—‘প্রক্সেমিক্স’, ‘হেপ্টিক্স’, ‘ক্রোনোমিক্স’, ‘কাইনেসিক্স’, ‘ফিজিক্যাল অ্যাপিয়ারেন্স’, ‘ভোকালিক্স’ ও ‘আর্টিফেক্টস’।১৭ যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘প্রক্সেমিক্স’ স্থান বা পরিসরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে হেপ্টিক্স হলো স্পর্শের মাধ্যমে যোগাযোগ। আর ‘ক্রোনোমিক্স’ হলো যোগাযোগে সময়ের ব্যবহার। ‘কাইনেসিক্স’ হলো শারীরিক গতিবিধির দৃশ্যমান দিক। এছাড়া ভোকালিক্স হলো বাচনিক কথার উল্টো দিক। এবং আর্টিফেক্টস হলো বিভিন্ন সাংকেতিক বার্তার মাধ্যম হিসেবে অন্যান্য অর্থপূর্ণ সংকেতকে প্রভাবিত করা।
মানুষ শব্দের জগতেই বাস করে। সেই জগতটাকে অনেক সময় তারা সচেতনভাবে খেয়াল করে, কখনো করে না। মানুষ খেয়াল করুক আর নাই করুক, প্রকৃতিতে রয়েছে বৈচিত্র্যময় সব শব্দরাজিপানির শব্দ, বাতাসের শব্দ, পাখির কিচিরমিচির, বিভিন্ন প্রাণীর ডাক, গাছের শব্দ, আগুনের শব্দ ইত্যাদি। অন্যদিকে মানব নির্মিত পরিবেশেরও রয়েছে বৈচিত্র্যময় শব্দ। যেমন: চিরুনির শব্দ, পিচঢালা কিংবা কাঁচামাটিতে গাড়ি চলার শব্দ, শহরের মোড়ের শব্দ, গ্রামে ছনের তৈরি কুটিরের শব্দ, মসজিদ-মন্দির-গির্জার শব্দ এবং উঁচু দালানের শব্দ। মানব দেহ নিঃসৃত শব্দ—হৃদকম্পন, শ্বাসপ্রশ্বাস, পদধ্বনি, পোশাক পরিধান, চলাফেরা, চিৎকার-চেঁচামেচি ইত্যাদি। সচেতনভাবে সব শব্দ মানুষ খেয়াল করে না। অথচ এসব শব্দের সন্নিবেশেই নির্মিত হয় মানবীয় পরিবেশ, সমাজ, চৈতন্য ও বোধের কাঠামো; নির্ধারিত হয় মানবীয় সত্তার প্রকাশ। জগতের অন্যান্য প্রাণীও বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমেই যোগাযোগ করে। কিন্তু মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেসব শব্দের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে না। মানবীয় সমাজ সৃষ্টি ও ক্রিয়াশীল রাখার প্রশ্নে মূল চালিকাশক্তি এমন একটি শব্দ-আবহ বা অভিজ্ঞতা যেখানে সবার বোধগম্যতা রয়েছে।
মানবীয় যোগাযোগকে বুঝতে হলে আমাদের বৈচিত্র্যময় শব্দ ও মানবজীবনে এর সম্পর্ক, মানুষের ক্রিয়া ও অভিজ্ঞতায় সেই শব্দের অস্তিত্বকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে। কেননা মানবীয় মিথস্ক্রিয়ার কাঠামো ও অভিজ্ঞতার পুরোটা জুড়ে রয়েছে বৈচিত্র্যময় শব্দ। জন্মের পরপরই একটি মানব শিশু দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে শব্দের মাধ্যমে। মানুষ কেবল শব্দের জগতেই বাস করে না। বরং তার বসবাস দৃশ্য জগতেও। ল্যান্ডস্কেপ, সিস্কেপ, সিটিস্কেপ, মরুভিস্তা, রাস্তা, স্থাপত্যশৈলী ও স্থানিক বিন্যাস, বাগান, বন, বাহারী রঙের গাছগাছালি, বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগৎ ইত্যাদি আমাদের দৃশ্যমান জাগতিক অনুধাবন ও যোগাযোগকে প্রভাবিত করে। দর্শনশক্তি দিয়ে আমরা এ সবকিছুর আকার, আকৃতি, রঙ ও নড়াচড়া অনুধাবন করি।১৮
মানুষের মুখভঙ্গি, চোখ, চাহনি, দেহভঙ্গি, পোশাক-পরিচ্ছদ, খোদাইশিল্প, দালান, চলচ্চিত্র, স্থিরচিত্র, কম্পিউটারের পর্দা, নৃত্যকলার প্রদর্শনী, রাজনৈতিক মিছিল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতি-অনুষ্ঠান, জনসমক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তি বা দলের মিথস্ক্রিয়া, পতাকা, মানচিত্র, সংকেত-ভাষা ইত্যাদি দৃশ্যমান যোগাযোগের অংশ।১৯ কাজেই দেখা যাচ্ছে, মানুষের চারপাশে দৃশ্যমান জগৎ খুবই বৈচিত্র্যময়।
দেহ নড়াচড়া ও স্থানিক পরিসরে অবস্থানের মাধ্যমে যোগাযোগ সাধন হয়। দেহের বিভিন্ন অংশের অবস্থান ও বিন্যাস বৈচিত্র্যময় বার্তা সঞ্চার করতে পারে। যেমন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রকাশ পায় পারস্পরিক বন্ধুত্ব, শত্রুতা, একে অন্যকে মেনে নেওয়া বা না নেওয়া, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কিংবা সন্তুষ্টি প্রকাশ।
চোখের একটি মাত্র পলক দুই ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগ শুরু করে। অনেক সময় এই পলক যোগাযোগ শুরুর চেয়েও বেশিকিছু করে। চোখের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় রাগ, শত্রুতা, স্নেহ, শুভেচ্ছা, গম্ভীরতা, রসিকতা, সন্দেহ, লজ্জা, বিরক্তি কিংবা ভালোবাসা। আর পুরো মুখমণ্ডল প্রকাশ করে আনন্দ, ভয়, যন্ত্রণা, শোক, অভ্যর্থনা, মানসিক আঘাত, আকর্ষণ, লজ্জাভাব, সহমর্মিতা ও মনোযোগ ইত্যাদি। এই মুখভঙ্গির মাধ্যমে ব্যক্তি কল্পনাতীত বার্তা সঞ্চার করতে পারে। মাথা, কনুই ও জিহ্বার নড়াচড়া ও হাঁটার ধরনেও বার্তা সঞ্চার হয়। মাথা নড়াচড়ার মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ, আগ্রহ, অনাগ্রহ, সহানুভূতি ও মমতা প্রকাশ পায়। আর ব্যক্তির হাঁটার ধরনেও যোগাযোগ বার্তা জ্ঞাপন করে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের গতিবিধি, হাসপাতালে নার্সের ঘোরাফেরা, সেনাবাহিনীর মার্চ, ধর্মানুরাগীর উপাসনালয়ে ঢোকার ধরন ইত্যাদি যত্ন, সহানুভূতি, বিরক্তি, আনন্দ, তাড়াহুড়া, শিথিলতা ও পারস্পরিক আকর্ষণ প্রকাশ করে। হাসপাতালে নার্স বা ডাক্তারদের দৃশ্যমান চলাফেরা প্রকাশ করে রোগীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। একইভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের গতিবিধিও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্কের মাত্রা ও ধরন প্রকাশ করে।২০
চোখ ও মুখের চাহনি, হাত, বাহু ও অন্যান্য অঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমেও বার্তা বিনিময় করা সম্ভব। তবে হাত ও বাহুর সঞ্চালনকে পৃথক করা সম্ভব নয়। এই দুই অঙ্গের সঞ্চালন চোখ, মুখমণ্ডল, মাথা, পা ও অন্যান্য সঞ্চালন একই সঙ্গে ঘটে। বলা যায়, হাত মুখের মতোই কথা বলে। কোনো দাবি জানানো, প্রতিশ্রুতি দেওয়া, কোনো কিছু খারিজ বা নাকচ করা, কাউকে হুমকি দেওয়া, ভীতি প্রকাশ, প্রশ্ন তোলা, অস্বীকার করা, আনন্দ-দুঃখ-ইতস্তত প্রকাশ, দায় স্বীকার, ধৈর্য ধারণ, পরিমাপ, পরিমাণ, সংখ্যা, সময়, আনন্দ-উত্তেজনা, নিষেধ, অনুমোদন, বিস্ময়, কিংবা লজ্জার প্রকাশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যক্তি হাতের ব্যবহার করে।
মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি, চাহনি ও দেহভাষা ব্যবহার করে যোগাযোগের দৃশ্যমান পন্থাই হলো সাংকেতিক ভাষা। সাংকেতিক ভাষা তিন রকমের হয়—প্রাথমিক বা মৌলিক সাংকেতিক ভাষা, বিকল্প সাংকেতিক ভাষা ও অতি সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত সাংকেতিক ভাষা। প্রাথমিক সাংকেতিক ভাষা অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার মতোই পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখানে কোনো শব্দ বা কানের ব্যবহার হয় না। মূলত বধির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই ভাষার ব্যবহার হয়। দেশ ও সংস্কৃতি ভেদে সংকেত ভাষাও ভিন্ন হয়।২১ অন্যদিকে বিকল্প সংকেত ভাষা কেবল বিশেষ কোনো পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যবহার হয়। অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষিতে এর ব্যবহারকারীরা সাধারণত বাচনিক ভাষাই ব্যবহার করে। যেমন : উপাসনালয়ে পুরোহিতগণ নৈঃশব্দের ব্যবহার করেন।
সাংকেতিক ভাষার আরেকটি ধরন হলো ফিঙ্গার স্পেলিং। হাত নড়াচড়ার মাধ্যমে কোনো শব্দ বানান করার কৌশলই ফিঙ্গার স্পেলিং। এই ভাষা সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সংকেত ভাষায় ফিঙ্গার স্পেলিং বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়। সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে বোঝাতেই এই কৌশল ব্যবহৃত হয়। কারণ ব্যক্তি বা স্থানকে অন্য কোনো প্রতীক বা সংকেত দিয়ে প্রকাশ করা কঠিন। ফিঙ্গার স্পেলিং-এ বাচনিক স্বর কিংবা লেখনির ব্যবহার করা হয়। সাধারণত জন্মগতভাবে কোনো কিছু শিখতে সক্ষম নয়—এমন মানুষের ক্ষেত্রে ফিঙ্গার স্পেলিং-এর ব্যবহার করা হয়। এখানে ত্বক, কণ্ঠস্বর ও বর্ণমালার ব্যবহার করা হয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে।২২
জগতের সমস্ত জৈব সত্তা তাদের পরিবেশ ও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে পারস্পরিক স্পর্শের মাধ্যমে। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ জটিল, বহুমাত্রিক ও বহুমাধ্যমিক। এটি বিদ্যমান প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে শক্তিশালী ও তাৎক্ষণিক। প্রাণিজগতে স্পর্শ যোগাযোগ হয় ব্যাপক মাত্রায়। দেহের বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করে। এসব অঙ্গের মধ্যে রয়েছে নাক, দাঁত, ঠোট, জিহ্বা, বাহু, পা, থাবা, পায়ের পাতা ও যৌনাঙ্গ। পরস্পরকে স্পর্শ ও অনুভব করার জন্য তারা বৈচিত্র্যময় উপায়ে এসব অঙ্গের ব্যবহার করে। এজন্য তারা একে অন্যের প্রতি ঝুঁকে যায়, একে অন্যকে আলতো করে স্পর্শ করে, চাপ দেয়, ধাক্কা দেয়, হালকা আঘাত করে, জড়িয়ে ধরে কিংবা দেহের বিশেষ কোনো অঙ্গ লেহন করে। এসব ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা একে অন্যকে যন্ত্রণা লাঘব করা, শান্ত করা, সন্তান লালন করা, জুটিবদ্ধ হওয়া, যুদ্ধ করা, কারো অধীনস্ত হওয়া, খেলা করা, অভ্যর্থনা জানানো, সতর্ক করা, অন্যকে আকৃষ্ট করা, আশ্বস্ত করা এবং নতুন সম্পর্কের প্রস্তাব করা ইত্যাদি বার্তা দিতে চায়। ঠিক একইভাবে মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো স্পর্শ ও অনুভবের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া। অন্ধ ও বধির লোকজন সাধারণত যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্পর্শের ব্যবহার করে বেশি।
এ গল্প ব্ল্যাক-এর
হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র ব্ল্যাক-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে এক নির্বাক, অন্ধ ও বধির বালিকা এবং তার শিক্ষককে ঘিরে। এটি মূলত বালিকা ও তার শিক্ষকের সম্পর্কের গল্প; তার মানবিক সত্তা বিকাশের গল্প; ঈশ্বর সৃষ্ট দুজন অপূর্ণাঙ্গ মানুষের গল্প। এই দুই প্রধান চরিত্রই জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলে। দুজনই ভিন্ন এক জগতের বাসিন্দা। গল্পের একপর্যায়ে সেই শিক্ষকও আলঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত হয়। ভারতীয় নির্মাতা সঞ্জয়লীলা বানশালি ব্ল্যাক নির্মাণ করেন হেলেন কেলারের জীবন-সংগ্রামকে উপজীব্য করে।
ব্ল্যাক-এর শুরুতেই দেখা যায়, মূলচরিত্র মিশেল ম্যাকনিলিকে। যার জন্ম একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারে। অন্ধ ও বধির মিশেল তার এক শিক্ষকের খোঁজ করছেন। ২০ বছর আগে এই শিক্ষকের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শিক্ষককে খোঁজা ও স্মৃতি রোমন্থনের একপর্যায়ে মিশেলের সঙ্গে শিক্ষক দেবরাজ সাহাইয়ের দেখা হয় একটি মানসিক হাসপাতালে। দেবরাজ বর্তমানে আলঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত। তিনি অতীতের সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছেন। মিশেলকে তিনি চিনতে পারেন না। এরই একপর্যায়ে মিশেল তার শৈশব, শিক্ষক ও জীবনের স্মৃতিচারণ করতে থাকেন। এগিয়ে যায় চলচ্চিত্রের গল্প।
গল্পে দেখা যায়, মিশেল জন্মের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারায়। ফলে তার জগৎ হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ অন্ধকারময়। জগতের অন্য সবকিছু থেকে সে বিচ্ছিন্ন। কারণ মিশেল কোনো কিছু দেখতে ও শুনতে পায় না; পারে না নিজেকে প্রকাশ করতে। এভাবে সে যতো বড়ো হতে থাকে, নিজেকে নিয়ে তার মধ্যে হতাশার মাত্রা বাড়তে থাকে। ক্রমেই তার আচরণ হতে থাকে সহিংস। মিশেলের বাবা-মা—পল ও ক্যাথরিন, তাদের সন্তানের সহিংস আচরণ নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেন না। মিশেলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন তার বাবা-মা হতাশার চূড়ান্তে, তখনই পরিবারে আগমন ঘটে বৃদ্ধ শিক্ষক দেবরাজ সাহাইয়ের।
একদিন মিশেল একটি আগুনের বাতি ঘরের মেঝেতে ফেলে দেয়। এতে করে বাড়িতে আগুন লেগে যায়। আরেকদিন তার ছোটো বোনকে ভয়ানক আঘাত করে। একপর্যায়ে মিশেলের বাবা সিদ্ধান্ত নেন, তাকে কোনো শিশু-আশ্রমে রেখে আসবেন। কিন্তু মা তাতে সায় দেন না। তিনি স্বামীকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে কন্যার আচরণ ঠিক করতে শেষবারের মতো চেষ্টার অনুরোধ জানান তার কাছে। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে তারা বধির ও অন্ধদের স্কুলের একজন শিক্ষকের খোঁজ করেন। তারা এমন একজন শিক্ষকের সন্ধানও পান। এই শিক্ষকই দেবরাজ সাহাই। অবশ্য দেবরাজ মানুষ হিসেবে একটু অদ্ভুত কিসিমের, খানিকটা খ্যাপাটেও। নিজেকে তিনি একজন জাদুকর মনে করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনিও হতাশাগ্রস্ত মানুষ। তবে নিজ কাজের প্রশ্নে দেবরাজ খুবই নিবেদিত। মিশেলকে আলোর জগতে আনা, তার জীবনে আলো ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নেন এই দেবরাজ।
প্রথমে শিক্ষক দেবরাজকে মেনে নিতে পারে না মিশেল। বিভিন্নভাবে তাকে অপদস্ত করে। দেবরাজও শুরুতে কোনো কিছু শেখানোর ব্যাপারে মিশেলের প্রতি খানিকটা কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনিও মিশেলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এদিকে ক্রমেই মিশেলের বন্য আচরণ কমে আসতে থাকে। শেখানোর ক্ষেত্রে কঠোরতার জন্য মিশেলের বাবাও শুরুতে দেবরাজকে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু পরে মেনে নেন। কেননা শিক্ষকের সংস্পর্শে এসে মিশেলের আচরণে তারা বেশ ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করেন।
বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে দেবরাজ মিশেলের কাছে আলো ও শব্দের জগতটি পরিচিত করতে থাকেন। ক্রমে মিশেলও ধারণা লাভ করতে থাকে তার নিজ সম্পর্কে; শেখে অর্থপূর্ণ শব্দ উচ্চারণ। এভাবে দেবরাজ সার্বক্ষণিক সঙ্গীতে পরিণত হয় মিশেলের। তিনি তার শিক্ষার্থীকে নিয়ে উচ্চ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, মিশেল একদিন স্নাতক পাস করবে। প্রতিদিন মিশেলকে কলেজে নিয়ে যান দেবরাজ। পড়া তৈরিতে সহায়তা করেন। পরীক্ষায় পাসের ক্ষেত্রে মিশেলের ব্যর্থতার পর দেবরাজ হতাশ হন না।
দেবরাজ একপর্যায়ে মিশেলের ব্যাপারে কিছু কঠোর পন্থা অবলম্বন করেন। মিশেলের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা চিন্তা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। গোড়ার দিকে মিশেলের বাবা এই কঠোর পন্থা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি দেবরাজকে তার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। এজন্য তিনি একরকম জোরই করেন। কিন্তু দেবরাজ তার শিক্ষার্থীকে ছেড়ে যেতে রাজি হন না। তাই তিনি মিশেলের বাবার কঠোর নির্দেশ সত্ত্বেও সেই বাড়িতে একরকম লুকিয়ে থাকেন। এর মধ্যে মিশেলের বাবা ব্যবসায়িক কাজে ২০ দিনের জন্য বাড়ির বাইরে যান। তার আগে তিনি মিশেলকে একটি শিশু-আশ্রমে রেখে আসতে চান। মিশেলের মা এবারেও তাতে সায় দেন না। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও মিশেলকে শিশু-আশ্রমে রাখার ব্যাপারে তিনি মত দেন।
এদিকে দেবরাজও নাছোড়বান্দা। তিনিও শিক্ষার্থীকে ছেড়ে যাবেন না। তিনি বাড়িতে লুকিয়ে থাকেন। মিশেলের বাবা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি আবার পাঠদান শুরু করেন। এই ২০ দিনে মিশেলকে কিছু শব্দ ও মানবিক আচরণ শেখাতে সক্ষম হন দেবরাজ। কিন্তু মসিবতে পড়েন এসব শব্দের মানে বোঝাতে। তিনি শিক্ষক, মা, পানি ইত্যাদি শব্দ শেখালেও এসব শব্দের তাৎপর্য ও বহুমাত্রিক অর্থময়তা বোঝাতে পারেন না। অন্যদিকে মিশেলের বন্য আচরণ বহাল থাকে। এভাবে একপর্যায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত দেবরাজ মিশেলকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজ বাক্সপেটরা নিয়ে মিশেলদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। যাওয়ার আগে মিশেলদের বাড়ির সামনে ঝরনায় মিশেলকে নিক্ষেপ করেন। তখনই ঘটে এক ‘অলৌকিক’ ঘটনা। হঠাৎ করেই দেবরাজের শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে মিশেল। বুঝতে শুরু করে শেখানো কয়েকটি শব্দের অর্থময়তা। সে তার বাবা ও মাকে চিনতে পারে। উচ্চারণ করতে পারে এসব শব্দের প্রথম বর্ণও। অতি সামান্য হলেও বোঝা যায়, এই উচ্চারিত বর্ণ দিয়ে মিশেল আসলে কী বলতে চায়। মিশেলের বাবা-মা তা দেখে আপ্লুত হন। এবং সিদ্ধান্ত নেন মিশেলের শিক্ষক হিসেবে দেবরাজকে রেখে দেওয়ার।
এরপর মিশেলের শেখার মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। তার মধ্যে মানবীয় সত্তা বিকশিত হতে শুরু করে। অনেকটাই স্বাভাবিক হতে থাকে মিশেলের আচরণ। নিজের ভালো-মন্দ লাগা, চাওয়া ও ইচ্ছাকে মিশেল প্রকাশ করতে শেখে। এমনকি সে একটু একটু করে নাচতেও পারে। মিশেলের বয়স বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তার কলেজে ভর্তির বয়স হয়। কিন্তু বধির ও অন্ধ হওয়ায় মিশেলকে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তি করতে রাজি হয় না। ভর্তির প্রশ্নে দেবরাজ কলেজের অধ্যক্ষকে মিশেলের একটি মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের অনুরোধ করেন। সেই পরীক্ষায় পাস করে মিশেল মানবিক বিভাগে স্নাতক করার জন্য ভর্তির সুযোগ পায়। ওই কলেজে মিশেলই ছিলো প্রথম কোনো শিক্ষার্থী যে কিনা দেখতে ও শুনতে পেতো না। মিশেলের পড়াশোনার জন্য দেবরাজও মিশেলের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে থাকতে শুরু করেন।
দুই বছর পর দেখা যায়, মিশেল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিতে পারেনি। কোনো বিষয়ে সে পাস মার্কও পায়নি। কিন্তু তার শিক্ষা লাভের স্পৃহা ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের স্বপ্ন থাকে অটুট। তবে মিশেলের এই ডিগ্রি অর্জন করতে না পারা ও কলেজের পড়া আত্মস্থ করতে না পারার মূল কারণ ছিলো প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা। সমস্যা ছিলো পড়া ও লেখাতেও। মিশেলের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি মিশেলের প্রথম বর্ষের সমস্ত পাঠ্যবই ব্রেইলে রূপান্তর করেন। কিন্তু মিশেল পড়াশোনা না করে কলেজ ছেড়ে বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। অভিমান করে দেবরাজের ওপর।
এবার গল্প মোড় নেয় অন্যদিকে। মিশেলের জীবনে হাজির নতুন এক চ্যালেঞ্জ। দেবরাজ আলঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত হন। প্রথমে তিনি অধ্যক্ষের কার্যালয় ভুলে যান। তার স্মৃতি থেকে মিশেলও হারিয়ে যেতে থাকে। লিখন দক্ষতা বাড়াতে আইসক্রিম পার্টির আয়োজন করে মিশেলকে সেখানে ছেড়ে চলে যান দেবরাজ।
এরপর দেখা যায়, মিশেলের সঙ্গে তার বোন সারার সম্পর্ক ভালো হচ্ছে। অনেক বিষয়েই মিশেলকে হিংসা করতো সারা। কেননা বাবা-মা মিশেলের একটু বেশি যত্ন নিতেন। সারার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মিশেল ‘ভালোবাসা’ অন্তর্নিহিত গভীর মাত্রা তার দেহ মনে গভীরভাবে অনুভব করে। এই ভালোবাসা এর আগে সে কখনোই অনুভব করেনি। মিশেল তাই দেবরাজকে তার ঠোঁটে চুমু খেতে বলেন। যদিও দেবরাজ তা করতে চান না। মিশেলের পীড়াপীড়ির একপর্যায়ে দেবরাজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও মিশেলের ঠোঁটে চুমু খান। দেবরাজের দিক থেকে এই চুমু খাওয়া কোনো ভালোবাসার প্রকাশ কিংবা কোনো জৈবিক তাড়না নয়। কেবলই শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের দায়িত্ব পালন। কিন্তু এই চুমু খাওয়ার পর দেবরাজের মধ্যে একধরনের আত্মগ্লানিবোধ কাজ করতে থাকে। এই গ্লানিবোধ ও খারাপ লাগা থেকেই মিশেলকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন দেবরাজ।
এদিকে কলেজে ভর্তির ১২ বছর পর মিশেল স্নাতক ডিগ্রি অর্জনে সক্ষম হয়। এমনকি সে স্নাতক সমাপনী ক্লাসে বক্তৃতাও করে। যদিও এই বক্তৃতায় সে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কালো পোশাক পরেনি। তার এই সাফল্যের জন্য সে বাবা-মা ও শিক্ষককে ধন্যবাদ জানায়। অনুষ্ঠানে মিশেল ঘোষণা দেয়, কেবল তখনই সে সমাপনী কালো গাউন পরবে যখন দেবরাজের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে। যাতে করে দেবরাজই প্রথম তার স্নাতক পাস শিক্ষার্থীকে দেখতে পান।
এরপর মিশেলের সঙ্গে যখন দেবরাজের সাক্ষাৎ হয়, তখন তিনি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি। অতীতের সমস্ত স্মৃতি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। মিশেল স্নাতক সমাপনী কালো গাউন পরে দেবরাজের সামনে যায়। বিজয়ীর নৃত্যভঙ্গি করে। এভাবে দেবরাজকে বোঝানোর চেষ্টা করে, সে স্নাতক সম্পন্ন করেছে। বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে। দেবরাজের হাত ধরে মিশেল বাইরে যায়। বৃষ্টিতে ভেজে। তারা দুজন এক সঙ্গে পানি শব্দটির প্রথম বর্ণ উচ্চারণ করে। গল্পের শুরুর দিকে মিশেল তার শিক্ষক দেবরাজের কাছ থেকেই এই পানি শব্দটির মাধ্যমেই বিভিন্ন শব্দ ও তার মানে বুঝতে শুরু করেছিলো। সেই দেবরাজ আজ বৃষ্টির পানিতে ভিজতে গিয়ে তার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কথা বলতে ও বুঝতে শিখছেন।
শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, একদল লোক কালো পোশাক পরে হাতে মোমবাতি নিয়ে চার্চে ঢুকছে, সঙ্গে মিশেলও। ভয়েস ওভারে দেবরাজকে উদ্দেশ্য করে মিশেলের লেখা একটি চিঠি পড়ে শোনানো হয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, আজ ছিলো শিক্ষার্থী মিশেলের মতোই তার শিক্ষক দেবরাজের বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। এই বিদ্যালয়ে পাঠ শুরু হয় ‘B-L-A-C-K’ দিয়ে।
ব্ল্যাক-এর যোগাযোগ রূপায়ণ
ব্ল্যাক-এর শুরুতেই মিশেল প্রশ্ন তোলে, ‘একজন ব্যক্তি অন্ধকারে থাকতে পারে কতোক্ষণ, কতো ঘণ্টা, কতোদিন? আমি এই অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম ৪০ বছর। আমার চার বছর লেগেছে স্নাতক সমাপনী পরীক্ষা দিতে। ১২ বছর ধরে প্রতি রবিবার আমি গির্জায় গিয়েছি। কিন্তু সেই রবিবার ছিলো বিশেষ একটি দিন। ওইদিন আমি অনুভব করেছিলাম, ঈশ্বর আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন। এই ১২ বছরে আমার একটিই মাত্র প্রার্থনা ছিলো—আমার শিক্ষক আবার আমার কাছে ফিরে আসুক। এই শিক্ষক আমার কাছে ফেরেশতার মতন। আমার প্রার্থনা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগেছে। এবং সেই প্রার্থনা কবুল হতেও লেগেছে অনেক সময়। এমনকি সেই রবিবারও আমি আমার শিক্ষককে খুঁজে পাইনি। সেই সন্ধ্যায় আমি আর সারা বাড়ি ফিরে আসছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই ..।’ এভাবেই ব্ল্যাক-এর গল্প শুরু। সাক্ষাৎ হয় মিশেল ও তার শিক্ষক দেবরাজের। যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সাক্ষাৎ মানে মিশেল ও দেবরাজের মধ্যে সংযোগ স্থাপন। অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে মিশেলের সংযোগ হয় ঈশ্বরের সঙ্গে। মিশেল যে প্রার্থনা করেছিলো তথা বার্তা পাঠিয়েছিলো তা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছায়। এবং ঈশ্বর তাতে সাড়া দেন। এই যোগাযোগ অনুভবের, এই যোগাযোগ অবাচনিক, এই যোগাযোগ অদৃশ্য। এর মাধ্যমটি সংজ্ঞায়নের ঊর্ধ্বে।
তবে শুরুতে দর্শকের সঙ্গে মিশেলের যোগাযোগ হয় দেহভঙ্গির মাধ্যমে। কালো চশমা, হাতে লাঠি থেকে অডিয়েন্স বুঝতে পারে মিশেল শারীরিক দিক থেকে ভিন্নভাবে সক্ষম একজন ব্যক্তি। সে দেখতে পায় না, শুনতে পারে না। এমনকি কথাও বলতে পারে না। অর্থাৎ সে পঞ্চ ইন্দ্রিয়—দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ—এর যথাযথ ব্যবহার করতে পারে না। এসব ইন্দ্রিয় কিন্তু একেকটি যোগাযোগ চ্যানেল। এসব চ্যানেলের মাধ্যমেই পরিবেশ ও পরিপার্শে¦র সঙ্গে মানুষ কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে। এই সংযোগই তার মানবিক সত্তা বিকাশে সহায়তা করে। কিন্তু মিশেলের ক্ষেত্রে বাস্তবতাটি ভিন্ন। মানবীয় পরিবেশ, সমাজ, চৈতন্য ও বোধের কাঠামোটি নির্মাণ হয় বৈচিত্র্যময় শব্দের সমন্বয়ে। নির্ধারিত হয় মানবীয় সত্তার প্রকাশ। শ্রবণ ইন্দ্রিয় সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারার কারণে মিশেলের কাছে তার পরিবার ও পারিপার্শ্বের শব্দ-আবহ বা অভিজ্ঞতা বোধগম্য ছিলো না।
প্রথমেই আসা যাক যোগাযোগীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ব্ল্যাক’ নামকরণের বিষয়টিতে। যেকোনো মানবীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে রঙ অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। ‘ব্ল্যাক’-এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘কালো’ বা ‘অন্ধকার’। যোগাযোগকে যদি অর্থময়তার প্রকাশ, সঞ্চারণ ও বিনিময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে চলচ্চিত্রটি যে অর্থময়তার যোগাযোগ করে তা হলো মিশেল ও দেবরাজের অদম্য শক্তি, তাদের জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, মৃত্যুময়-অবস্থা, দুঃখ-যন্ত্রণা, সহিংস আচরণ, অন্ধকার ও নেতিবাচকতায় পরিপূর্ণ। কিন্তু ব্ল্যাক নেতিবাচকতা নিয়ে কথা বলে না। এটি আশার কথা, সম্ভাবনার কথা, প্রেরণার কথা বলে। চলচ্চিত্রটি আসলে মিশেলের অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর জগতে আসার গল্প। একজন অপূর্ণাঙ্গ মানুষ থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।
পশু ও মানুষ উভয়ই সামাজিকভাবে নিজেদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম আবেগীয় প্রকাশ, কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে বিভিন্ন সাংকেতিক বার্তা সৃজন ও প্রেরণ করে। তবে এই বার্তা সৃজন ও ব্যবহারে মানুষ পশুর চেয়ে খানিকটা এগিয়ে। কেননা মানুষ আরো কিছু কৌশল উদ্ভাবন করেছে। আর সেই কৌশলের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সাংকেতিক ও কণ্ঠনিঃসৃত ভাষা। এসব যোগাযোগ মানুষের সামাজিক যোগাযোগকে সম্ভব করে তোলে। শুধু তাই নয়, এই ভাষার মাধ্যমে মানুষ তার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও নিজ অস্তিত্ব সম্পর্কে বিমূর্ত, প্রতীকী ও সৃজনশীল চিন্তার প্রকাশ করতে পারে। ওরাং ওটাং-এর জিহ্বা ও বাক উচ্চারণে সহায়ক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মানুষের মতোই। অথচ তারা কথা বলে না। মানুষের মতোই তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও অনুপাত। অথচ তারা কোনো জটিল চিন্তা করে না। মস্তিষ্ক কাঠামো যথাযথ হওয়া সত্ত্বেও তারা কোনো সৃজনশীল চিন্তা ও ভাষা উৎপাদন করে না। কাজেই বলা যায়, ওরাং ওটাং এমন কিছু যা স্রেফ প্রাণী নয়, আবার মানুষও নয়।২৩ অন্যদিকে জৈব সত্তা বিবেচনায় মানুষ এক ধরনের প্রাণী। কিন্তু ওরাং ওটাং-এর চেয়ে মানুষ উন্নত প্রাণী। তাত্ত্বিকভাবে ওরাং ওটাং হয়তো যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু সামাজিক মিথস্ক্রিয়া করতে পারে না। এই সামাজিক মিথস্ক্রিয়া আসলে মানবীয় আচরণের বিনিময়। ব্ল্যাক-এ মিশেলও শিক্ষক দেবরাজ আসার আগে এটি অপূর্ণাঙ্গ সত্তাই ছিলো। তার মধ্যে মানবীয় সত্তা বিকশিত হয়নি। তার আচরণ ছিলো ‘পশুর’ মতোই সহিংস। দেবরাজ মিশেলের মধ্যে যোগাযোগ বোধের সঞ্চার করার ফলেই তার আচরণে পরিবর্তন আসে।
ভাষা মানুষের চিন্তা প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এটি চিন্তা প্রকাশের মাধ্যমের চেয়েও বেশি কিছু। আদতে এটি মানবীয় চিন্তা গঠনের মূল উপাদান। কম্পিউটারের প্রোগ্রামের মতোই জগৎ সম্পর্কে মানুষের চিন্তা প্রতীকবদ্ধ হয় ভাষার মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে মানুষের চিন্তা সঞ্চিত ও প্রকাশিত হয়। ব্যক্তি যে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষার মাধ্যমেই তার বাহ্যিক বাস্তবতা সম্পর্কে বোধ কাঠামোটি তৈরি হয়। ভিন্ন সংস্কৃতির দুজন মানুষ কেবল দুটি আলাদা ভাষায় কথা বলে না, বরং দুটি পৃথক অনুভূতির জগতে বাস করে।২৪ সংস্কৃতি মানুষের আচরণের আঙ্গিক নির্মাণ করে। আর সেই আঙ্গিকের মূল শিকড়টি নিহিত তার জৈব সত্তা ও মানস কাঠামোতে। প্রাণী হিসেবে মানুষ এক আশ্চর্য জৈবিক কাঠামো। এর রয়েছে দুর্দান্ত এক ইতিহাস। তবে জীবজগতের আর সব প্রাণী থেকে মানুষ একটু আলাদা কিসিমের। প্রাণী হিসেবে মানুষ কেবল এক জৈব সত্তাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জীবজগতে কেবল মানুষই এই জৈব সত্তার সম্প্রসারণ বা বিকাশ সাধন করতে সক্ষম হয়েছে।
আর সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বিভিন্ন নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে নিজেকে আলাদা করেছে। মানুষের সত্তার এই সম্প্রসারণ তার কাজ ও আচরণকে করেছে উন্নত ও পরিশীলিত। যেমন ধরা যাক কম্পিউটারের কথা। এই কম্পিউটার আসলে মানব মস্তিষ্কেরই সম্প্রসারিত রূপ। একইভাবে মোবাইল ফোন ও টেলিফোন কণ্ঠস্বরের সম্প্রসারিত রূপ। অন্যদিকে চাকা মানুষের পায়ের সম্প্রসারণ। ঠিক একইভাবে ভাষা নির্দিষ্ট সময় ও স্থানিক পরিসরে মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ ঘটায়। আর লিখন পদ্ধতি সম্প্রসারণ ঘটায় মানুষের ভাষার। এসব কিছুর উপস্থিতি দেখা যায়, ব্ল্যাক-এ। এখানে শিক্ষক দেবরাজ তার শিক্ষার্থী মিশেলের হাতে লিখে জাগতিক শব্দ, বস্তু ও নাম সম্পর্কে ধারণার সঞ্চার করেন। ফলে মিশেলের মধ্যে একধরনের ভাষিক ধারণার জন্ম হয়। এই ভাষা সক্ষমতা না থাকার কারণে মিশেলের শৈশবকে ওরাং ওটাং-এর সঙ্গেই তুলনা করা যায়। তার মধ্যে স্বাভাবিক মানবীয় সত্তার বিকাশ ঘটেনি।
প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ বর্তমানে জৈব সত্তার সম্প্রসারণ এতো মাত্রায় ঘটিয়েছে, সে তার মানবিক সত্তার পরিচয়টি ভুলে যেতে বসেছে। যাহোক, মানুষের মানবিক সত্তার প্রকাশ ও বিকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন যোগাযোগ দক্ষতা, কৌশল ও মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ নিজেই নির্মাণ করে। অন্যদিকে পরিবেশও তার মানবিক সত্তার বিকাশ ও প্রকাশকে প্রভাবিত করে, আদল দেয়। এই পরিবেশ বা চারপাশের জগৎ নির্মাণ করতে গিয়ে সে আসলে তার জৈব সত্তার সম্ভাব্য কাঠামোটি নির্মাণ করে নেয়। আর এভাবেই বস্তি, মানসিক হাসপাতাল, জেলখানা, শহর, উপশহর কিংবা মানুষের মধ্যে একেবারেই ভিন্ন কিসিমের মানবিক সত্তার বিকাশ ঘটে। ঠিক একইভাবে ব্ল্যাক-এ শৈশবে মিশেল ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারে না। আর এই না পারার কারণে সে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। কিন্তু তার কলেজের অধ্যক্ষের আবিষ্কার করা ব্রেইল পদ্ধতির পড়াশোনার কারণে সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে সক্ষম হয়।
যোগাযোগের প্রশ্নে মানুষের চোখ, কান ও নাক খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। মানবিক সত্তার বিকাশ ও প্রকাশের দিক থেকে চিন্তা করলে নাকের তুলনায় চোখ ও কানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ চোখ ও কানের ব্যবহার বেশি করেছে। কেননা চোখ ও কান উভয়ই তুলনামূলক বেশি জটিল তথ্য প্রতীকাবদ্ধ করতে পারে। সহায়তা করে বিমূর্ত চিন্তা করতে। অন্যদিকে নাক গভীরভাবে আবেগকেন্দ্রিক এবং সৃষ্টি করে ইন্দ্রিয় পরিতুষ্টিকারী উদ্দীপনা। ফলে নাক সৃষ্ট উদ্দীপনা মানুষকে জটিল চিন্তা করতে সহায়তা করে না। কিন্তু পশু জগতে নাকেরই ব্যবহার বেশি করতে দেখা যায়।
দৃষ্টি ও শ্রবণ অঙ্গের ব্যবহার সক্ষমতা ও প্রবণতা মানবীয় সত্তার বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ঘ্রাণের সক্ষমতার ভিন্নতা প্রাণিকুল ও মানবজাতিকে সত্তাগতভাবে আলাদা করেছে। মানুষের যদি ইঁদুরের মতো ঘ্রাণ সক্ষমতা থাকতো, তাহলে সে অন্যের প্রতি রাগ বা ক্ষোভকে শুঁকতে পারতো। কোনো ব্যক্তি কারো বাড়ি বেড়াতে গেলে এবং সেখানে সংঘটিত আবেগীয় ব্যাপার-স্যাপার পাবলিক রেকর্ডের বিষয়বস্তুতে পরিণত হতো। কেননা এই ঘ্রাণ-সক্ষমতা ও শরীর নিঃসৃত গন্ধ তা সম্ভব করতো। ফলে মানবীয় সামাজিক জগতে ঘটে যেতো ভয়াবহ ঘটনা।
নাকের বদলে চোখের ব্যবহার বেশি করার ফলে মানুষ ও তার পরিবেশের সঙ্গে পারস্পরিক সংজ্ঞাটি ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। অন্য যেকোনো অঙ্গের তুলনায় মানুষ তার চোখ দিয়ে বেশি পরিমাণ তথ্য গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারে; করতে পারে বিমূর্ত চিন্তাও। ফলে সে জটিল ও কার্যকর পরিকল্পনা করতে সক্ষম হয়। অথচ ঘ্রাণশক্তি মানুষকে কেবল আবেগীয় ও অনুভূতিগত চাহিদাই মেটায়। বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা চিন্তাগত ক্রিয়ায় তেমন ভূমিকা পালন করে না। কাজেই মানবীয় সত্তার বিকাশের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে চোখ ও কান একথা জোর দিয়েই বলা যায়। মানুষ এই দুই ইন্দ্রিয় ব্যবহারে সক্ষম হওয়ার ফলে বিভিন্ন রকম শিল্প সৃজনে সক্ষম হয়েছে। মানব সভ্যতার অনন্য অবদান গল্প, কবিতা, চিত্রকলা, সঙ্গীত, স্থাপত্য ও নৃত্য মূলত দর্শন ও শ্রবণের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষের যোগাযোগ ক্রিয়া ও সক্ষমতা নির্ভরশীল এই দুই অঙ্গের ওপর।
যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা : এক. দূরত্ব সম্পর্কিত বার্তাগ্রাহী ইন্দ্রিয়—চোখ, কান ও নাক; দুই. নিকটবর্তী বার্তাগ্রাহী ইন্দ্রিয়—ত্বক, স্পর্শ, চামড়া, মেমব্রেন ও মাসল। বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উদ্দীপক বা বার্তা গ্রহণ ও বার্তার পরিমাণ এবং সেই বার্তা মস্তিষ্কে প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে মানুষের বয়সের সম্পর্ক রয়েছে। স্পর্শগত ইন্দ্রিয় নার্ভ ও মানুষের জীবনের বয়স একই। কোনো জৈব সত্তাকে জীবন বা প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার প্রশ্নে মৌলিক শর্তটি হচ্ছে, তা কোনো উদ্দীপকের প্রতি সাড়া প্রদান করতে সক্ষম হবে। ব্ল্যাক-এর মূলচরিত্র মিশেল চোখ ও কানের ব্যবহারে সক্ষম নয়। এই দিক থেকে বিবেচনা করলে মিশেল সব অর্থেই প্রাণী ছিলো। কিন্তু তার মধ্যে মানবিক সত্তার বিকাশ ঘটেনি।
মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত চেতনাটি হলো দৃষ্টি। এই চেতনার বিকাশ ঘটে সব শেষে। চোখ ও কান কী পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারে তা বিজ্ঞানীরা আজো পরিমাপ করতে পারেনি। তবে সাদামাটাভাবে বলা যায়, মানুষের মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত শ্রবণবিষয়ক স্নায়ু যে পরিমাণ এলাকা জুড়ে রয়েছে তার প্রায় ৮০ গুণ বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে দর্শনবিষয়ক স্নায়ু।২৫ কাজেই বলা যায়, কানের তুলনায় চোখ প্রায় ৮০ গুণ বেশি তথ্য কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পাঠাতে সক্ষম। মানুষের চোখ যেসব কাজ করতে সহায়তা করে তার মধ্যে রয়েছে—খাদ্য ও বন্ধু চিহ্নিত করা এবং ব্যক্তির অবস্থান থেকে কোনো বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করা; কোনো রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়াই কোনো স্থানে স্বাভাবিক চলাচল করতে পারা; কোনো হাতিয়ার বানাতে পারা; নিজেকে ও অন্যকে দেখভাল করতে পারা এবং অন্যের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে পারা। কাজেই দেখা যাচ্ছে, চোখের ব্যবহার করতে সক্ষম না হওয়ার কারণে মিশেল বাবা-মা ও দেবরাজকে চিনতে পারেনি, মেনে নিতে পারেনি বন্ধু হিসেবে। শুধু তাই নয়, সে স্বাভাবিক চলাচলেও সক্ষম ছিলো না। আগুন থেকে মিশেল তার অবস্থান সে নির্ণয় করতে পারেনি। ঘরের মেঝেতে বাতি ফেলে দিলে বাড়িতে আগুন লেগে যায়। আর মিশেল তো নিজের দেখভাল করতেও সক্ষম ছিলো না। নিজের ছোটো বোনের জীবনও সে বিপদে ফেলে দিয়েছিলো।
স্নায়ুতন্ত্রে তথ্য সংগ্রহের প্রশ্নে মানুষের চোখই প্রধান মাধ্যম। তবে চোখ শুধু তথ্য সংগ্রহই করে না, তথ্য প্রদানও করে। যেমন কাউকে শাস্তি দেওয়া, উৎসাহিত করা কিংবা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চোখের একটি দৃষ্টিই যথেষ্ট। আবার কারো প্রতি চোখ ছোটো বা বড়ো করে তাকালে আগ্রহ ও অনাগ্রহ প্রকাশ পায়। ব্ল্যাক-এ কোনো কিছুর নাম শেখানোর প্রশ্নে দেবরাজ ফিঙ্গার স্পেলিং-এর আশ্রয় নিয়েছেন। ফিঙ্গার স্পেলিং-এর মাধ্যমে মিশেলের হাতে ‘শিক্ষক’, ‘বাবা’, ‘মা’, ‘পানি’ ইত্যাদি শব্দ লিখে দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি মূলত মিশেলের চারপাশের জগতের সবকিছু একটি করে নাম দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই নামের মাধ্যমেই মিশেল জাগতিক অভিজ্ঞতার বিনিময় করতে শিখেছে। এবং ওই নামের বস্তু ও ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছে।
চারপাশের বিভিন্ন লোকজন, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা, বই, চিঠিপত্র, ভ্রমণ ও শিল্পকর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষের চৈতন্য, চিন্তা ও ভাষা ইত্যাদির মাধ্যমে একধরনের উদ্দীপনার জন্ম নেয়; নির্মাণ করে ব্যক্তির জাগতিক বাস্তবতা সম্পর্কে একটি বিশেষ কাঠামো। আর এই কাঠামোটি ব্যক্তির মানবিক সত্তার বিকাশ নিশ্চিত করে। ঠিক একইভাবে যদি একটি সামাজিক গোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করি, তাহলে দেখতে পাওয়া যায়, যোগাযোগ তথা বিভিন্ন যোগাযোগীয় উপাদান (সাহিত্য, শিল্প, প্রতিষ্ঠান) প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তির চিন্তা কাঠামোর বাহ্যিক কিংবা দৃশ্যমান প্রকাশ। বিভিন্ন প্রতীক, সংকেত, ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা ও সেসব কিছুর বাস্তবতা মন থেকে উদ্ভাসিত হয়। এই উদ্ভাসিত হওয়ার পরপরই এগুলো আবার মনের ওপরেই ক্রিয়া করে। ফলে জন্ম নেয় নতুন চিন্তার। কাজেই মানবীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাটি এমন এক হাতিয়ার, এমন এক উন্নত উদ্ভাবন, যার উন্নয়নে গোটা মানবজাতির ওপর প্রভাব পড়ে; বদলে ফেলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মপ্রণালি।২৬
ঠিক একইভাবে মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো স্পর্শ ও অনুভবের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া। অন্ধ ও বধির লোকজন সাধারণত যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্পর্শের ব্যবহার করে বেশি। শিক্ষক হিসেবে দেবরাজ সেই কাজটিই করেছিলেন। মিশেলের সঙ্গে যোগাযোগের প্রশ্নে শুরু থেকেই তিনি স্পর্শের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। এবং সেভাবেই যোগাযোগ কৌশলগুলো শিখিয়েছিলেন।
আগেই বলেছি, ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্ক-সংযোগগুলোর প্রসার ঘটে স্থানিক পরিসরে। সম্পর্ক-সংযোগ জোরদার হয় সময়ের পরিসরে। এই প্রসার ও জোরদার হওয়ার মধ্য দিয়ে মানসিক চিন্তা কাঠামোই একধরনের ঐক্য সাধন ও প্রসারিত হয় এবং সজাগ হয়ে ওঠে। কাজেই এটা জোর দিয়ে বলা যায়, যোগাযোগ ক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক সত্তাকে বিকশিত, সম্প্রসারিত ও পূর্ণতা দান করে। কেননা এই যোগাযোগের মাধ্যমেই ব্যক্তি জগতের সবকিছুর সঙ্গে একরকম সংযোগ স্থাপন করে। এই সংযোগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ই। ব্যক্তির যোগাযোগ দক্ষতা যতো উন্নত হয়, তার বুদ্ধিমত্তাও ততো উন্নত হয়। হ্রাস পায় তার আচরণের জড় যান্ত্রিকতা ও পাশবিকতা। মিশেলের জীবনে তার কলেজ, শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার
বাহ্যিক জগৎ ও মানবীয় যোগাযোগকে পৃথকভাবে উপলব্ধি করার প্রশ্নে সুস্পষ্ট কোনো বিভাজন রেখা নেই। যোগাযোগ ছাড়া মানুষের মন সত্যিকার অর্থে বিকশিত হয় না। যোগাযোগ সক্ষমতা না থাকলে একজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে মানুষ হয়ে ওঠে না। তার মন থাকে অস্বাভাবিক ও অবিকশিত। সে এমন এক অবস্থায় থাকে, তখন তাকে না বলা যায় মানুষ, না বলা যায় হিংস্র প্রাণী। আমাদের সামাজিক অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যোগাযোগ। বিভিন্ন ক্রিয়া-কৌশলের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজ, অন্যের ও পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। অর্থপূর্ণ ও যৌক্তিক বাচনিক ও অবাচনিক বিন্যাসের মাধ্যমে মানুষ যোগাযোগ করে। একজন পূর্ণাঙ্গ মানবীয় সত্তা হিসেবে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই যোগাযোগ সক্ষমতা থাকতে হবে।
ব্ল্যাক-এর মিশেল দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারিয়ে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার বয়স সাত বছর পর্যন্ত সেই বিচ্ছিন্নতায় জোড়া লাগেনি। তবে এসময় তার মন জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলো না। শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি হারানোর আগে অতি শৈশবেই বেশকিছু প্রতীক, সংকেত তার মনোজগৎ ধারণ করেছিলো। কিন্তু তার মানবিক আচরণের প্রকাশ ছিলো খুবই অবিন্যস্ত, অগোছালো, অপরিশীলিত ও অনিয়ন্ত্রিত। চিন্তা কাঠামো ছিলো একেবারেই বিচ্ছিন্ন। ব্ল্যাক-এর এই গল্প একটি সুস্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। জাগতিক বাস্তবতা, ব্যক্তির মন ও তার বিকাশ এবং যোগাযোগ ধারণার তাৎপর্যকেই তুলে ধরে।
লেখক : আমিনুল ইসলাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে পড়ান। সম্প্রতি তার প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মানবীয় যোগাযোগ’।
mukul.ru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. Park, R. E. (1966); 'Reflections on Communication and Culture'; Reader in Public Opinion and Mass Communication; in Berelson, B., and Janowity, M. (eds); Second edition, The Free Press, The Nwe York City.
২. Erikssion, K (2011); Communication in Modern Social Ordering: History and Philosophy; The Continuum International Publishing Group, Nwe York.
৩. Cooley, C. H. (1966); 'The Significance of Communication'; Reader in Public Opinion and Mass Communication; in B. Berelson, M. Janowity (eds); second edition, The Free Press, Nwe York .
৪. Tattersall, R. (2014); 'Communication and Human Uniqueness'; The Evolution of Social Communication in Primates: A Multidisciplinary Approach; in M. Pina & N. Gontier (eds); Springer, London.
Blancke, S. (2014); 'Lord MonboddoÕs Ourang-Outang and the Origin and Progress of Language'; The Evolution of Social Communication in Primates: A Multidisciplinary Approach, in M. Pina & N. Gontier (eds); Springer, London.
৫. Sapir, E. (1966); Communication; Reader in Public Opinion and Mass Communication; in B. Berelson & M. Janowity (eds); second edition, The Free Press, Nwe York.
৬. প্রাগুক্ত; Cooley, C. H. (1966).
৭. প্রাগুক্ত; Sapir, E. (1966).
৮. ইসলাম, আমিনুল (২০১৫); মানবীয় যোগাযোগ; পলল প্রকাশনী, ঢাকা।
৯. প্রাগুক্ত; Erikssion, K (2011).
১০. প্রাগুক্ত; Erikssion, K (2011).
১১. প্রাগুক্ত; Erikssion, K (2011)..
১২. Hall, E. T. (1990); The Hidden Dimension; Anchor Books Editions, USA.
১৩.Finnegan, R (2002); Communicating : The multiple modes of human interconnection; Routlege, London and Nwe York.
১৪.Gardnar, 1983 cited in Finnegan (2002).
১৫. প্রাগুক্ত; Finnegan, R (2002).
১৬. প্রাগুক্ত; Blancke, S. (2014) & Tattersall, R. (2014).
১৭. প্রাগুক্ত; Finnegan, R (2002).
১৮. প্রাগুক্ত; Finnegan, R (2002).
১৯. প্রাগুক্ত; Finnegan, R (2002).
২০. প্রাগুক্ত; Finnegan, R (2002).
২১. প্রাগুক্ত; Finnegan, R (2002).
২২. প্রাগুক্ত; Finnegan, R (2002).
২৩. প্রাগুক্ত; Blancke, S. (2014).
২৪. প্রাগুক্ত; Hall, E. T. (1990).
২৫. প্রাগুক্ত; Hall, E. T. (1990) & Finnegan, R (2002).
২৬. প্রাগুক্ত; Cooley, C. H. (1966).
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন