Magic Lanthon

               

ফারুক আলম

প্রকাশিত ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

পরিবারের পরিহাস ও বেলাশেষ-এর জৈবিক নিষিদ্ধ অনুভূতি

ফারুক আলম


একজন লেখকের বিধবা স্ত্রীর করুণ আর্তি ভরা আবেদন প্রকাশক মনোযোগ দিয়ে শুনলেন; শুধুই শুনলেন। বিপন্ন বিধবাকে কিছু বলতে পারলেন না। বৈধব্যের প্রগাঢ় অসহায়ত্ব মুখের ভাষায় শুধু প্রকাশ হলো না, ভাবে ভাবনায় বর্ণনায় বাস্তবতায়সঙ্কট দেখা মিললো সর্বত্র। বিবেকবান সুশিক্ষিত প্রকাশক বিশ্বনাথ মজুমদার তার ব্যস্ত জীবনের বাহন, ক্ষণিক থেমে থাকা গাড়ির জানালার কাচ দিয়ে লেখক অপূর্ব বন্দোপাধ্যায়ের স্ত্রী বিথী বন্দোপাধ্যায়কে দ্বিতীয়বার দেখে দুর্ভাবনায় পড়লেন। গাড়ি দ্রুত চললো, সঙ্গে ভাবনাটাও। অতঃপর নিশ্চুপ থাকলেন। চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যের কংক্রিটের ভবনগুলো ও নির্বিকার ঘুমে কাতর শরীর এলিয়ে সর্বাঙ্গে শায়িত চির পরিচিত কুকুরটির নির্লিপ্ততার সঙ্গে দর্শকের অতলান্তিক ভাবনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলে। আধুনিক সভ্যতার শহুরে দরদালানে বসবাসরত নাগরিক মানুষের ভিতরের কুকুরটা অপর মানুষের বিপদে অধিকাংশ সময় ইট-কাঠ-পাথরের মতো নিষ্ক্রিয় থাকে বলে, আমরা বিষয়টাকে খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়ে থাকি। আমি-আমরা, তুমি-তোমরায় ভাগ করে ফেলি জীবন-জগৎ। অন্যের বিপন্ন বিধবা স্ত্রীর কী হবে, তা না ভাবলেও আমাদের চলে। এখানে আমরা দেখি শেষবেলায় আমাদের সংবেদনশীল ব্যক্তিটি নিজের স্ত্রীর জীবনের ভাবনায় তাড়িত হন।

এসব একান্ত সাংসারিক ব্যক্তিগত ভাবনার সঙ্গে সংযুক্ত হয় আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। রাষ্ট্র-সমাজ কাঠামোতে আটকে থাকা পরিবারের সঙ্কট, স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও রসায়ন, বুনিয়াদি প্রথাগত চিন্তা কাঠামো থেকে মুক্তি ও বন্ধন। দূরবীক্ষণযন্ত্র, শক্তিশালী ইলেক্ট্রনিক ক্যামেরা ও শব্দযন্ত্র দিয়ে চলমান জীবনের প্রথাগত নিয়ন্ত্রণ। প্রকৃতিপুঞ্জে মানবিকতার সেতুবন্ধন। এমনকি দুই বাংলার বিচ্ছেদে মিলন-বিরহের অন্তর্জ্বালা।

দুই.

মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে পরিবার নামক প্রাথমিক সংগঠনের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। পরিবার বাদে মানুষ চলতে পারে কি না তার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কালক্ষেপণের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়েছে। এক কথায় বলা যায়, পরিবর্তনশীল জগতের সবকিছুই পরিবর্তনশীল। পরিবার বলতে, আদিম মানুষ যা বুঝতো তা সামন্ত সমাজে অচল। আবার পুঁজিবাদী সমাজে সে ধারণা বদলেছে একেবারে। তবুও ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ যখন নয়া নয়া কৌশলে টিকে থাকার পদ্ধতি অবলম্বন করে, তখন পরিবার হয়ে ওঠে মানুষের বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোতে নিশ্চিতভাবে শক্তিশালী কাঠামো হলো পরিবার। পরিবারের কাঁধে ভর দিয়ে রাষ্ট্র চলছে বললে অত্যুক্তি হয় না।

পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে সবকিছু পুঁজি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; সবকিছু পুঁজির জন্য। মানবিকতার কোনো মানদণ্ড নেই। বিচার, ধর্ম, আদর্শ বা জীবনাচার নির্দিষ্ট কাঠামোতে বন্দি। অর্থের চিন্তা তাই সব কাজে অনেক বড়ো হয়ে দেখা দেয়। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের উৎপাদনের চালিকাশক্তি বিজ্ঞান হলেও চিন্তাশক্তি তথাকথিত ধর্মের কার্নিশে আটকা পড়ে আছে। এই ধর্ম মানুষের অন্তরে উসকে দেয় সেই ভোগবাদীতাকে। মানুষের ভিতরে পণ্যের জন্য বেঁচে থাকার মনোভাব সৃষ্টিতে সহায়তা করে। ধর্ম যদি কখনো বাজার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতো, তবে তখনই তাকে বিদায় নিতে হতো। বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় জয়জয়কার হয়েছে ভোগবাদের বড়ো সংরক্ষক মিডিয়ার। মিডিয়ার মালিক হলো করপোরেট পুঁজি। মালিকের স্বার্থ হাসিলে তাই মিডিয়া দেয় মানুষের ভোগবাদী চিন্তা কাঠামোর বুনিয়াদি রূপ; গড়ে তোলে পুঁজির কর্মক্ষেত্রশক্তিশালী বাজার ব্যবস্থা। বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাষ্ট্র ক্ষমতা ও চিন্তা কাঠামো। চিন্তা কাঠামো কী পরিমাণ জীবন বিমুখ হলে বেদের মেয়ে জোস্না চলচ্চিত্র না দেখতে পারার কারণে মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে, সম্ভবত তা মানুষের বোধের বাইরে। আর এসব অবক্ষয়ের কারণে পণ্যের উপযোগিতার প্রশ্ন অবান্তর। প্রয়োজন শুধু চাহিদা সৃষ্টি। ক্রমান্বয়ে যুক্তিহীন আচরণে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদের উপজাত নানান প্রজাতির জঙ্গিবাদসহ সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে পৃথিবী। এ রকম একটা প্রেক্ষাপটে আমরা বেলাশেষের দর্শকেরা সঙ্কটাকীর্ণ।

নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বেলাশেষের কাহিনি মজুমদার পরিবারের একান্ত পারিবারিক দ্বন্দ্ব; তবুও তা সর্বজনীন। বিশ্বনাথ মজুমদারের কাছে মৃত লেখক অপূর্ব বন্দোপাধ্যায়ের স্ত্রী এসে তার বিপদের কথা বললে কাহিনির শুরু হয়। লেখকের স্ত্রী জানান, তার স্বামী কোথায় কোথায় টাকাপয়সা রেখে গেছেন তিনি তা জানেন না। এখন পরিবারের বড়ো দুর্দিন, হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই। আছে শুধু লেখকের রেখে যাওয়া লেখার কিছু পাণ্ডুলিপি। এসব দিয়ে যদি কিছু টাকাপয়সা পাওয়া যায়? বিশ্বনাথ বাবু তার কথা শোনার পর মনে হয় নিজেকে নিয়ে সক্রিয় হন। মৃত্যুর পর তার স্ত্রীরও তো একই অবস্থা হবে। বহুবার বলেও তিনি তার স্ত্রীকে ব্যাংকে পাঠাতে পারেননি। বাইরের কোনো অর্থ উপার্জনের কাজে লাগানো যায়নি। স্ত্রী আরতি স্বামী, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি আর সংসার নিয়েই ব্যস্ত। এর বাইরে কিছু বুঝতে চান না, বুঝবেনও না। কাজেই জীবিত অবস্থায় তাকে স্বাবলম্বী দেখতে গেলে বিবাহবিচ্ছেদ হলো একমাত্র পথ। মজুমদার বাবু তাই করবেন। আইনি ব্যবস্থা নিলেন, স্ত্রীকে বাড়িটা ও সঞ্চিত অর্থের একটা বড়ো অংশ দিলেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী শুভ বিজয়াতে ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে বসলেন; তিনি তার কথা জানালেন।

এদিকে মজুমদারের ছেলের দাম্পত্য জীবন সুখের নয়। বৌমার সঙ্গে প্রায়ই তার ঝগড়া হয়। আবার সুপর্ণা রক্ষিত নামে বেশ কেউকেটা গোছের এক মহিলা, যিনি সেন্ট জোসেফ স্কুলের বোর্ড অব ডিরেক্টরের চেয়ারপারসন, বারীন তার সঙ্গে বারে বসে আড্ডা দেন। সেসব অবশ্য বৌমাও জানেন। আর জানেন বলেই তিনি বলেন, বারীন মজুমদার, আমি তোমার মা নই যে, মুখ বুজে সব সহ্য করে যাবো। ছেলে-মেয়ের মুখ চেয়ে পড়ে আছি বলে মনে করো না এভাবেই সারাজীবন থাকবো। মজুমদারের বড়ো মেয়ে কাবেরী (বুড়ি) ও তার জামাই জ্যোতিরিন্দ্রের মধ্যে মিল নেই। বলা যায়, দুজন দুজনকে পছন্দ করে না। স্বামীকে সন্দেহ করে স্ত্রী; সবসময় প্রশ্ন করে, বকাবকি করে। জ্যোতির তা নিয়ে খুব একটা কষ্ট আছে বলে মনে হয় না। সে কষ্ট পাওয়ার লোকই না। সবসময় হাসিঠাট্টা, তামাশা নিয়ে থাকে। মেজো মেয়ে মালশ্রী (মিলি) স্বামী বিজনকে ভালোবাসে না। অন্য পুরুষের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক। তার সঙ্গে গোপনে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। বিজনের ভালোবাসা ও বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের আলোচনা মিলির চিন্তা জগতকে বদলে দেয়। তিনি তার প্রেমিককে বলেন, জানো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে আমার বড়ো চিপ লাগে। মনে হয় এখানে আমি একি করছি? তখন তার সেই প্রেমিক বলেন, বিজনের কাছে থাকো না কেনো? উত্তরে মিলি বলেন, হ্যাঁ তাই থাকবো। তিনি (প্রেমিক) আবার জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে আমরা কী করি? মিলি বলেন, অ্যাফেয়ার করি, চিট করি, ফোনে মিথ্যা কথা বলি, আমি বিজনকে আর তুমি তোমার পরিবারকে। ছোটো মেয়ে পিউ ও তার স্বামী চলচ্চিত্র নিয়ে এতো ব্যস্ত, নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর সময় তাদের নেই। ফিরে তাকায় তখন, যখন বাবা-মায়ের সঙ্কট ঘনীভূত হতে থাকে।

তিন.

বিচারকের অনুরোধে শান্তিনিকেতনের বাড়িতে ১৫ দিনের জন্য বেড়াতে যায় মজুমদার পরিবার। এসে সবার সবকিছু বদলে যায়। বাবা-মায়ের ঘরে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন লাগানো হয়। শোনা হয় তাদের কথা, দেখা হয় তারা একান্তে কী আচরণ করেন। বিশ্বনাথ বাবু বলেন, আমাদের মাঝে কখনো কি প্রেম ছিলো, নাকি সবটুকু অভ্যাস? জবাবে আরতি দেবী যা বলেন তা আরো চমৎকার। তার কথাতে বোঝা যায়, সংসারের সবকিছুর সঙ্গেই তার প্রেম। কাহিনির চরিত্রগুলোর ভিতরের মানুষটা বদল হতে থাকে। শান্তিনিকেতনে থাকতে থাকতে সবাই ঠিকঠাক হয়ে সংসারের নিয়মের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেয়। মিলির ফণাতোলা গোখরা সাপের রাগ মিলিয়ে যায়। সেও বিজনকে প্রশ্ন করে, আগে কেনো সে তার ভালোবাসার কথা বলেনি। আফসোস আর আত্মপীড়নে শুদ্ধ হয় মিলি, স্বামীকে নিয়ে সুখে থাকার অঙ্গীকার তার। গোপন প্রেমিককে না করে দেয় সে। পিউ খুব সহজ মানুষ; একটু আদরে যে ছলকে ওঠে সহজে, সরল কথায় তার মনের মানুষের সঙ্গে মিলন ঘটে।


বিশ্বনাথ বাবু থেকে যান শান্তিনিকেতনে। সবাই যে যার বাড়িতে কাজেকর্মে ব্যস্ত। বলা যায়, সবাই তার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তাকে ছাড়াই দৈনন্দিন কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পৃথিবীর কোনো কাজ অবশ্য কারো জন্য আটকে থাকে না। এটা যে পৃথিবীর নিয়ম তার সবচাইতে বড়ো প্রমাণ আরতি দেবী নিজেই। তিনি এখন মেয়েদেরকে সেলাই শিখিয়ে অর্থ উপার্জন করেন। ব্যাংকে নিজেই লেনদেন করেন। কিন্তু বিবাহের ৫০ বছর পূর্তির আগেই বিশ্বনাথ বাবু বাড়ি ফিরে আসেন। সবাইকে নিয়ে অর্ধশত বছরের বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে বেলাশেষের সমাপ্তি হয়।

কাহিনিতে স্বামীত্ব একটা বড়ো উপাদান। নিজের ভিতরের স্বামীত্বের দায় বিশ্বনাথ বাবুকে কখন সচেতন করলো? তার অভিব্যক্তি প্রকাশের ইঙ্গিত স্পষ্ট হলো তখন, যখন পূজা উপলক্ষে ডাকা হলো মেয়েদেরকে; সঙ্গে তাদের স্বামী-সংসার, ছেলে-মেয়ে। ছেলে এখন মজুমদার অ্যান্ড সন্স’ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। সেও জেনেছে, বাবা কিছু একটা ঘোষণা দিবেন। মা সবাইকে ডাকলেন। মিলিকে নিমন্ত্রণ করার ভাষায় তার আন্তরিক আয়োজন ও আবেদন ফুটে ওঠে। কিন্তু বিশ্বনাথ মজুমদার যে কী জানাবেন, সে বিষয়ের বিন্দু বিসর্গ অনুমান কারো ছিলো না। মা আরতি দেবী অনুমান করেছিলেন, বিশ্বনাথ বাবু হয়তো তার সম্পতির একটা উইল করে সবার সামনে তার ভাগবাটোয়ারার ঘোষণা দিতে চান। তাই তিনি বলেন, যাক মতি ফিরেছে তাহলে। সবার সামনে উইলটা পড়ে শোনাতে চাও? তার পরও কী যে হতে যাচ্ছে কেউ জানে না। সবাই তবুও একত্র হলো। মায়ের ধারণার সঙ্গে একমত হয়ে বাবার সম্পত্তির কে কতোটুকু পাবে সেসব উদ্বিগ্নতা ছাপিয়ে সবাই আনন্দ উৎসবে আবেগাপ্লুত; হইচই আনন্দ।

পারিবারিক সভায় বসলেন বাবা বিশ্বনাথ মজুমদার। আনুষ্ঠানিকভাবে কথা শুরু করলেন। কিন্তু তিনি যা বললেন, তাতে সবার শুভ বিজয়ার রেশ কেটে গেলো; সবাই ভেঙে পড়লো; কেউ কাঁদলো, কেউ মন খারাপ করে বসে থাকলো। শুভ বিজয়ার দিনই যে বিসর্জনের দিন, সে শাশ্বত জ্ঞানের অনিত্যতার প্রমাণ হলো। এমন একটা ঘোষণায় দর্শক-শ্রোতাদেরও ভালো লাগার কথা নয়। এটি ছিলো আনন্দঘন মহাড়ম্বরের মধ্য দিয়ে মহাবিষাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। তিনি যা বললেন, তা অবিশ্বাস্য। মজুমদার তাদের ৪৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান চান। তিনি কারো কোনো কথা শুনতে চান না। তবুও মেজো মেয়ে মিলি নীরব থাকতে পারলো না, প্রতিবাদ করলো। আধুনিক মানুষের জীবনগতি কতো দ্রুত বিধিবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিকতার ধারায় মিশে যায় এবং প্রচলিত চিন্তা কাঠামোতে সামান্য টোকা দিলেও যে সে ছেড়ে দেয় না তার প্রমাণ রাখলো মিলি। ব্যক্তি মানুষ কে কী করছে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত। যে ব্যক্তি তার কর্মকাণ্ডের কৈফিয়ত অন্য কাউকে দিতে রাজি নয়, সেই ব্যক্তিই কাউকে সমাজের প্রচলিত ধারার ব্যত্যয় ঘটাতে দেখলে বিপরীতধর্মী ভিন্ন প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া দেখায়; খড়গহস্তে তেড়ে আসে। মিলির আচরণে তা আরো একবার প্রমাণ হলো। তিনি সমাজের নিয়মকানুনের বিপরীত স্রোতের আধুনিক নারী, ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অথচ তিনি বাবার স্বাধীন চিন্তার প্রতিবাদ জানালেন কঠোর ভাষায়।

বিশ্বনাথ বাবু যখন বললেন, আমি তোমাদের মাকে ডিভোর্স দিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো; থাকবো শান্তিনিকেতনের বাড়িতে। তোমাদের মায়ের নামে এই বাড়ি লিখে দিয়েছি। আমার অর্থের বড়ো একটা অংশ তাকে দিয়েছি। তাতে তার চলে যাবে। তখন মিলি বড়ো ভাইয়ের মতো নীরব থাকতে পারলেন না, তিনি বললেন, বাবা এটা করতে পারে না। তিনি বড়ো বোন বুড়ি কিংবা ছোটো বোন পিউয়ের মতো কাঁদতে শুরু করলেন না, সরাসরি বাবাকে আক্রমণ করলেন। বাবা পরিবারের সব সদস্যের নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখেন। স্ত্রী আরতিও ছেলে-মেয়ে সবার অবস্থাদৃষ্টে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বিশ্বনাথকে অনুরোধ করেছিলেন একটা কিছু করার জন্য।

মিলি বাবাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যান। তিনি জোর গলায় বললেন, বাবা তুমি এটা করতে পারো না। মাকে না জানিয়ে কোর্টে পিটিশনটা জমা দিয়ে তুমি ঠিক করোনি বাবা। মা তোমার স্ত্রী। তুমি তাকে কিছু জানালে না? বিশ্বনাথ বাবু সাফ জানিয়ে দিলেন, আমি কারো কাছে কোনো উত্তর দিতে বাধ্য নই। মিলির কথার পর কথা তাকে উত্যক্ত করলো। তিনি যেনো কিছুটা অবাক হলেন। তারপর তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তুমিও কি বাধ্য স্ত্রীর মতো বিজনকে সবকিছু জানাও? তুমি ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করো, তাই না মিলি? মোক্ষম প্রশ্ন। প্রশ্নের মধ্যেই জবাব। ব্যক্তিস্বাধীনতা যে নিছক কথার কথা তা প্রমাণ হতে সময় লাগলো না। মিলি নিজেই স্ববিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ। তিনি পরিবারতন্ত্র টিকিয়ে রাখার এক নাছোড়বান্দা হয়ে মাঠে নামলেন। মনের ঝাল ঝাড়ার জন্যে বাবাকে এহেন কথা নেই যা তিনি বলেননিWhat would you prove baba? You have used my mother last fifty years. You are selfish. খুব স্বার্থপর, কাপুরুষ।

এই বাদানুবাদের কথা পিউ সহ্য না করতে পেরে স্থান ত্যাগ করেন। বড়ো বোন এসে মিলির প্রতিবাদ করেনতুই এমনটা করতে পারিস না মিলি। মিলি তবুও নিজের অন্তরে পুষে রাখা পরিচর্যিত বিশ্বাস মাড়িয়ে সামাজিক আইনের পক্ষে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দাঁড়ান। প্রমাণ করেন, আমরা কেউ নিজের বিশ্বাসের পরিচর্যা করি না, পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলি, পরিস্থিতির শিকার বলে পরিতৃপ্ত হই।

চার.

বেলাশেষের ভাবনায় জারিত হয় স্বামীর দায়িত্ববোধ ও স্ত্রীর কর্তব্যপরায়ণতা। এখানে দায়িত্ববোধের পরাকাষ্ঠার কষ্টি পাথরে যাচাই হবে স্বামীত্ব! একটি পরীক্ষণ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের। স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রী বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কতোটুকু স্বয়ংসম্পূর্ণ? পারিবারিক দায়িত্ব কর্তব্যের পরীক্ষায় স্ত্রীরা পাস করে এসেছে বরাবরই। স্বামীরা পরীক্ষা নিতে কসুর করেনি। অতীতে স্ত্রীদেরকে স্বামীর মৃত্যুর পর পিত্রালয়ে আশ্রয় নিতে হতো। ডাকসাইটে যৌবনবতীর কর্তৃত্বপূর্ণ রসময় জীবন পেরিয়ে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পথের পাঁচালীর দুর্গার পিসির মতো অনেককেই অসহায় বেদনাদায়ক জীবন যাপন করতে হতো। পরবর্তী সময়ে পুরুষতন্ত্রের কী যে হলো! বিধবা রমণীতে রমণ করে করে তার কি মনোদৈহিক বৈকল্য দেখা দিলো, নাকি মনে হলো তার নিজের স্ত্রীকেও অন্যে ভোগ করতে পারে; নাকি সেসময় ভোগের ভাগবাটোয়ারায় অসন্তুষ্ট হয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অথবা সম্ভোগের সামাজিক দুর্ভোগে আক্রান্ত হয়ে বিপন্নতার হাত থেকে নিজেরা রেহাই পেতে, স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় স্ত্রীর সহমরণের বিধান দিয়েছিলো পুরুষ কূলচূড়ামণির দল? নাকি নারীরাও স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করে পুরুষদের ভোগের দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে শুরু করেছিলো বলে সহমরণের সহজ ব্যবস্থা করেছিলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ?

এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর ও আলোচনা বেলাশেষের বিদগ্ধ দর্শকেরা অন্তরে উপলব্ধি করতে পারে। তারা ধর্ম, সমাজ, সংস্কারকে সাক্ষী রেখে আইনের ঘরে নিজেকে বন্দি করে কারাবাসী হয়ে, রাষ্ট্রকাঠামোর শক্তিশালী পূতপবিত্র কাঠামো পরিবারের জয়গানে নিজের স্ত্রীর প্রতি শুধু দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে পালন হয়েছে কি না তার পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। পিতৃদেবের সুপুত্র, মাতৃত্বের অহঙ্কার, গুরুদেবের একান্ত বাধ্য, সমাজের চির বিশ্বস্ত এই আমরা নির্বিষ সাপের মতো নির্জীব-নিবীর্য স্বামীত্বের সফলতা নিয়ে স্ত্রীকে দিতে চাই নিরাপদ আশ্রয় ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা (যেহেতু রাজা রামমোহনের প্রচেষ্টায় ইংরেজরা স্ত্রীর সহমরণকে বেআইনি, দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছিলো এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ প্রচলন করেছিলেন); যার ফলে স্বপ্নময় স্বর্গরাজ্য নিয়ে তারা বেলাশেষে নিমগ্ন হলে সব বাস্তবতা নির্মিলিত চক্ষু মেলে প্রশ্ন করে, এই সুখ চেয়েছিলে বুঝি?

বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ সম্পর্কিত একটা ডিসকোর্স তৈরি হয়েছে বেলাশেষেতে। ভারতবর্ষ বিয়ের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এখানকার স্বল্প বিকাশমান পুঁজির কারণে সামন্ততান্ত্রিকতা সেই ইঙ্গিত দিবে এটাই স্বাভাবিক। ইউ এস এ ও ব্রিটেনের উদাহরণ দেখানো হয়েছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সিরিয়াল নাটকগুলো থেকে আবালবৃদ্ধবনিতা বিয়ে সম্পর্কে কতো নেতিবাচক ধারণা নিচ্ছে, তা বুঝতে পারা গেছে। সংসার করতে গেলে শোষণের কথা ভাবলে চলে না, সে কথাও স্পষ্ট হয়েছে। মানুষের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা নাকি সংসারএমন একটা লা-জওয়াব প্রশ্নে আটকে গেছি আমরা।

পাঁচ.

বেলাশেষে পরিচালনা করেছেন নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়; প্রযোজনায় প্রভাত রায়, এম কে মিডিয়া ও উইনডোজ; কাজল চক্রবর্তীর কাহিনিতে চিত্রনাট্য রূপ দিয়েছেন নন্দিতা রায়; নিবেদনে অতনু রায়চৌধুরী এবং অভিনয়ে : সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, সোহিনী সেনগুপ্ত, সীমা মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী, খরাজ মুখোপাধ্যায়, অপরাজিতা আঢ্য, শংকর চক্রবর্তী ও ইন্দ্রণী দত্ত। গঠন ও শৈল্পিক গুণে নাটকের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও নাট্যকলাকে বাদ দিয়ে চলচ্চিত্রের কাহিনি অগ্রায়ণ অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে কাহিনির নাট্যরূপ চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিরায়ত (ক্ল্যাসিক) ধারণা অনুযায়ী কাঠামোগত দিক দিয়ে মিলনাত্মক (কমেডি) নাটক/কাহিনির দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট) বিষাদের (ট্রাজিক) পটভূমিতে গড়ে ওঠে ও এগিয়ে চলে। বেলাশেষের কাহিনি এগিয়েছে তেমনই চিরায়ত ধারায়। প্রাসঙ্গিক গান ও কৌতুক বিরতি (কমিক রিলিফ) দিয়ে উদ্বেগ (টেনশন) কমিয়ে পুনর্বিন্যস্ত কাহিনিকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে তার দ্বন্দ্বের শিখরে (ক্লাইম্যাক্স)।

মূল দ্বন্দ্ব পরিণতিতে পেয়েছে মিলনাত্মক সমাপ্তি। বাবা-মার পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের সাংসারিক সঙ্কটের সহকাহিনি (সাবপ্লট) সমৃদ্ধ করেছে পারিবারিক মূল কাহিনিকে (মেইন প্লট)। কাহিনি তার মিলনাত্মক সমাপ্তির দিকে পৌঁছেছে ধীরে ধীরে। একে একে সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে। ছেলে বারীন বৌকে গাড়িতে নিয়ে কোপাই নদীর উপর সেতুতে এসে দাঁড়ালো। আলাপ-আলোচনার ভিতর দিয়ে দাম্পত্য সমস্যার সমাধান হলো। যে স্ত্রী তাকে বলেছিলো, আমি তোমার মায়ের মতো সহ্য করবো না। আমার একটা জীবন আছে। সে হাতে হাত রাখলো। দুহাত এক হয়ে গাড়ির গিয়ারে চাপ দিলো; এগিয়ে চললো গাড়ি। মনের মানুষের সঙ্গে মনের দূরত্ব ঘুচে গেলো। প্রকৃতির নৈসর্গিকতার মধ্যে এগিয়ে চললো জীবন ও জগৎ। এমনি করে একান্তে অথচ খোলামেলা আলোচনা হলো মিলির সমস্যার। বিজন নির্জনে বললেন, তিনি সব জানেন অথচ বাধা দেননি। কারণ তিনি ভালোবেসে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন। হলোও তাই, ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসার প্রাচীরের অবমুক্তি ঘটলো। দূর হলো নিকট, অধরাকে গেলো ধরা।

বাকি থাকলো বিশ্বনাথ বাবুর বাড়ি ফেরা। তিনি একাকী বাস করতেন শান্তিনিকেতনের বাড়িতে। ততোদিনে স্ত্রী আরতি সত্যিই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। স্বামীর ইচ্ছানুযায়ী তিনি এখন একা চলতে পারেন। চিরায়ত ধারণার সঙ্গে মিল রেখে এখানে রয়েছে পরিণত চরিত্র (রাউন্ড ক্যারেক্টার) ও অপরিণত চরিত্র (ফ্লাট ক্যারেক্টার)। ভিন্নভাবে বললে প্রধান (মেজর) ও অপ্রধান (মাইনর) চরিত্র। নায়কের (প্রোটাগনিস্ট) বিপরীতে খলচরিত্র (অ্যান্টাগনিস্ট) নেই। আছে হাস্যরসের চরিত্র বড়ো জামাই জ্যোতিবিহীন গতিশীল অঘটনঘটনপটীয়সী জ্যোতির্ময় ও বাড়ির কাজের লোক গণেশায়। আছে পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টিতে অনন্য সাধারণ মানব শিশুগণ। দাম্পত্য কলহে নিত্য বিবাদে ভালো আছে তিন ছেলে-মেয়ের বাবা-মা জ্যোতি ও বুড়ি। পিউ ও পিলু কাজের মধ্যে ভুলে গিয়েছিলো নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের কথা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। সবার চিন্তার পুনর্বিন্যাস চলচ্চিত্রটিকে নিয়ে যায় তার পরিণতিতে। বিশ্বনাথ মজুমদার বেশিদিন একাকী বাস করতে পারলেন না। অবশেষে তিনি ফিরে আসলেন ফেলে যাওয়া সংসারে। ক্ষমা চাইলেন স্ত্রী আরতির কাছে। উল্টো রথের দড়ির টানে এখন সবাই সোজা পথে হাঁটছে। হাঁটছে সবাই পা ফেলে ফেলে, আইনকানুন মেনে বৃত্তাবদ্ধ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর রেখাকে স্পর্শ করার স্পর্ধা আর কেউ কখনো দেখাবে না।

পারিবারিক আড্ডায় ইচ্ছা পূরণ আসরে সবাইকে চারটি ইচ্ছার প্রকাশ করতে বলা হয়। আরতি দেবীর পালা এলে উনি কলকাতা থেকে যেতে চান ফরিদপুর, তার জন্মস্থানে; অতঃপর শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহ। বাংলাদেশের মা মাটি মানুষের প্রতি তার নাড়ির টান, তার অন্তরের অনুভূতি প্রকাশিত ইচ্ছার মধ্যে প্রগাঢ় হয়ে ধরা দেয়। সচেতন দর্শকের মনে দুই বাংলার বিচ্ছেদের যন্ত্রণা জেগে ওঠে। যে ষড়যন্ত্রে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সীমানা অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো তার বিষবাষ্পের কালো ফণা হয়ে, মানব সভ্যতাকে আর কতো কালো ছোবল হানবে সেসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা থাকলেও, মনুষ্য বসবাসযোগ্য এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অভ্যস্ত মানুষ সবসময় নতুন করে বাঁচতে চায়। এখানে কাহিনির সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকলেও কষ্ট কল্পে দুই বাংলার বন্ধনকে পারিবারিক বন্ধন হিসেবে দেখতে কোথাও কোনো বাধা নেই।

ছয়.

বেলাশেষেতে নৈসর্গিক প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিচারালয়, লাইব্রেরি, পারিবারিক পরিবেশ, শিশু ও বৃদ্ধ, মদের ব্যবহার, দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং ক্যামেরা ও শব্দযন্ত্রের খুবই শক্তিশালী প্রতীকী ব্যবহার কাহিনিকে ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছে। সামাজিক বন সৃজন, নদী, টুপটাপ গাছের পাতা ঝরা আমাদেরকে সৃষ্টি ও ধ্বংসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা জানি, জন্ম, সৃষ্টি ও মৃত্যুতে প্রকৃতি পুঞ্জের টিকে থাকা নির্ভর করে এবং পরিপূর্ণতা পায়। বিচারালয় সুশৃঙ্খল নীতি-নৈতিকতাকে উপস্থাপন করে; উত্থাপন করে মানুষ আশ্রিত নানা কূটকৌশলে ন্যায়কে এড়িয়ে অন্যায় করার মানবিক প্রবণতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট। এখানে বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রক শক্তির জয়গান গেয়েছে। তাইতো বিশ্বনাথ বাবু যখন বলেছেন, আমি ডিভোর্স চাই ধর্মাবতার; তখন আরতি দেবীকে প্রশ্ন করেছেন বিচারক, আপনি কী চানকর্তার ইচ্ছাই কর্ম। উনি যা চান আমি বরাবরই তাই চেয়ে এসেছি, এখনো তাই চাই। সাব্যস্ত হলো, ১৫ দিন ধরে দুজন ঘুরবে, একান্তে থাকবে, তারপর প্রয়োজন হলে তবে বিবাহবিচ্ছেদ হবে। লাইব্রেরি ও বই আমাদের সঞ্চিত জ্ঞানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর মশারি নিরাপদ ঘুমের কথা বলে।

মদের প্রসঙ্গ এলে আমরা বুঝি মানুষ বাস্তবের কঠোর সংগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মদ খেয়ে ভুলে যেতে চায় তার কর্তব্য, কর্ম কিংবা এলেবেলে ভাবনায় কাটিয়ে দিতে চায় জীবন। দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে বিজন তার শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখেন, বলেন শ্বশুর হাত নেড়ে নেড়ে শ্বাশুড়িকে কিছু একটা বলছে; আবার শাশুড়ি কথা বললেও তিনি একইভাবে বর্ণনা করেন। বড়ো জামাই জ্যোতি মন্তব্য করেন, সব হয়ে গেলো, ওই দূরে একান্তে তারা সব কথা বলে ফেলবে। বাইনোকুলারের হাত থেকে রেহাই নেই কারো। তা যতো দূরেই যাই না কেনো, সমাজের বাইনোকুলার আমাদের আচরিত ক্রিয়াকর্ম অনুসরণ করে এবং নিয়ন্ত্রণে আনে। তেমনিভাবে ক্যামেরা ও শব্দযন্ত্র লাগিয়ে আমাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা বা বুদ্ধিমুক্তির চিন্তা যতোই বলি না কেনো, তা শুধুই কথার কথা, আসলে আমরা সবাই চার দেয়ালে বন্দি এবং আমাদের ওপর প্রতিষ্ঠানের খবরদারি চলছে। কাঠামোর বাইরে যাওয়ার চিন্তা করলে তাকে খাঁচায় ভরে কড়া নজরদারিতে রাখা হবে।

মধ্যবিত্ত কখনো তার খাঁচা ভেঙে বের হয় কি না সে প্রশ্নও তোলা হয়েছে। কারণ বিশ্বনাথ বাবুরা অলীক স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত। তিনি বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বলেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক লেখক ও প্রকাশকের মতো। লেখক থাকে ভিতরে, প্রকাশক থাকে বাইরে। তুমি আমার জীবনের লেখক আরতি। বিশ্বনাথ বাবুরা অনেক পড়ালেখা করে অনেক জ্ঞান অর্জন করে স্বাধীন হওয়ার ভাবনায় ভাবিত হতে পারেন; কিন্তু সত্যিকারের স্বাধীন হতে হলে যতো শক্তি দরকার তা তাদের নেই। এর জন্য যতো পরিশ্রমী, যতো ত্যাগী হতে হয়, তা তারা হতে পারেন না বলে স্বাধীন হতেও পারেন না। তার বিদেশি বন্ধু প্যাট্রিক যা পারেন, তিনি তা পারেন না। এখানেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার ও কলোনিয়াল ভাবধারার। দেখানো হয়েছে, এখানকার মানুষ স্বাধীনতার থেকে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তায় আস্থাশীল, নিরবচ্ছিন্ন নিরাপদ মনোদৈহিক সম্পর্কে বন্দি।

আমরা যদি বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায়ের কাঁটাতার-এর (২০০৫) রুকসানার প্রশ্নটা তুলে ধরিতাহলে এখন আমি কী করবো? ঠিকানার সন্ধান যে কতো কঠিন তা রুকসানা বুঝেছে। আগে নিজের একটা দেশ থাকতে হবে, সেই দেশে একটা ঠিকানা থাকতে হবে। তার পর আইনের লোকেরা কথা শুনবে, নচেৎ নয়। তারা ঠিকানাবিহীন মানুষের কথা শুনতে যাবে কোন দুঃখে! শোষণের হাতিয়ার রাষ্ট্রযন্ত্রই তো আজকে একমাত্র মানুষের ঠিকানার নিশ্চয়তা প্রদান করে। ঠিকানা হারানো পিরানিকে ঠিকানাহীন মজিদ বলছে, আমাদের কোনো ঠিকানা নেই, কোনো দেশ নেই। দেখো, বাতাসের কোনো ঠিকানা নেই। এপারের বাতাস সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে ওপারে যাচ্ছে। মেঘ কিংবা রোদ, এদের কোনো দেশ নেই। এক দেশের মেঘ অন্য দেশে যাচ্ছে। সূর্যের রোদ সব দেশেই যাচ্ছে।’ মজিদ আরো বলছে, বাঁচতে হলে আজ থেকে নিজেকে বদলে ফেলো পিরানি। গরীব মানুষের কোনো নাম নেই, কোনো ধর্ম নেই।’

সাত.

মধ্যবিত্তের সমাজ সঙ্কট, সংসার যন্ত্রণা ও মনোদৈহিক পীড়ার সাবলীল উপস্থাপন এবং তার সরল সমাধান করা হয়েছে বেলাশেষেতে। কিন্তু মানুষের সমস্যার কী হবে? কাঁটাতার কিংবা কাল-এর (২০০৭) মতো চলচ্চিত্রে সেই নিরেট বাস্তবতা উপস্থাপিত। একইভাবে আমরা যদি অপর্ণা সেনের পরমা (১৯৮৪) বা পারমিতার একদিনকে (২০০০) একটু স্মরণ করি, তাহলে সহজ গাণিতিক সমাধানগুলো এক এক করে নাগালের বাইরে চলে যাবে। আমরা বুঝতে পারি, মানুষের গড়ে তোলা মানব সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ যেদিন থেকে পুঁজির খপ্পরে আটকে গেছে, সেদিন থেকে সবকিছুই জড়িয়ে গেছে কাঁটাতারের বেড়ায়।

 

লেখক : ফারুক আলম, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। একটি বেসরকারি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। তার প্রকাশিত ছড়ার বই গোলাপ-কাঁটা’।

falamsmc@gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন