Magic Lanthon

               

শিলু হোসেন

প্রকাশিত ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সেভিং ফেস থেকে ‘অনার কিলিং’ একজন চিনয়ের চিন-পরিচয়

শিলু হোসেন


নারী, ধর্ম ও এক পবিত্র দেশ

কিছু সময়ের জন্য নারী-পুরুষ বিষয়টাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শুধু মানুষ কল্পনা করি। শব্দ হিসেবে যার অর্থ মানব, মনুষ্য, নর প্রভৃতি। এই মানুষের জন্যই এ ধরার সবকিছু। যখন যেটার প্রয়োজন পড়েছে, এই মানুষ তা-ই এখানে নিয়ে এসেছে। এভাবেই একটা সময় পৃথিবীতে কিছু মানুষের হাত ধরে মানুষের প্রয়োজনেই ধর্মের আবির্ভাব। সেই মানুষই একপর্যায়ে ধর্মের জন্য নিজেদের বিভক্ত করেছে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ নানা নামে। ধর্মের প্রয়োজনেই আবার মৌলবি, রাহাবর, ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু, ফাদার, পাদ্রি প্রমুখ নামধারী কর্তৃত্ববাদী শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে। এভাবে উচ্চ আসনে বসা এই মানুষদের কারণে একসময় অবহেলিত হতে থাকে ওই মানুষ-ই। অন্যদিকে এই মানুষকেই আবার নানা কারণ দেখিয়ে, শারীরিক কাঠামোগত দিক থেকে ভাগ করা হয়েছে নারী, পুরুষ শ্রেণিতে।

আর এই ভাগের পর থেকে দিনে দিনে নানা চর্চার মধ্য দিয়ে পুরুষ তার আধিপত্য দেখাতে শুরু করে। যা মরদ, ছেলে, লোক, মদ্দা, নর, মানুষ, জনএই সমার্থক শব্দগুলোর ব্যবহারের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। এই শব্দগুলোর অর্থ ভালোভাবে খেয়াল করলে একটা কর্তৃত্বের ছাপ ভেসে ওঠে। অন্যদিকে নারী নিয়ে ঠিক এর উল্টোটা চর্চা হতে থাকে। নারীর সমার্থক হিসেবে রমণী, কামিনী, অঙ্গণা, অবলা, ললনা, অর্ধাঙ্গী, বামা, মহিলা, স্ত্রীলোক, মেদি, পত্নী, মেয়ে প্রভৃতি শব্দের ব্যবহারে বিষয়টি বোঝা যায়। উদাহরণ হিসেবে এর মধ্যকার কয়েকটি শব্দের অর্থ দেখা যেতে পারেনরজাতির স্ত্রী (রমণী), কামার্ত নারী (কামিনী), বিলাসকারিনী (অঙ্গণা), সুদর্শনা নারী (ললনা) ইত্যাদি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, অর্থগত দিক থেকে পুরুষকে বুঝতে গেলে নারীর প্রয়োজন হয় না; কিন্তু নারীকে বুঝতে গেলে পুরুষের প্রয়োজন পড়ে। কারণ মানুষ পুরুষের উল্লেখযোগ্য সমার্থক শব্দ, অন্যদিকে মানুষ হিসেবে একজন নারীকে পুরুষের সংস্পর্শ ছাড়া পূর্ণ মানুষ বলা যায় না আর কি!

আগেই বলেছি, এমনভাবে পুরুষ প্রাধান্যশীল হয়েছে যে, বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে যেসব মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে তাদের একজনও নারী-মানুষ নন! আর এ কারণেই হয়তো খ্রিস্টানদের গির্জাতে কোনোদিন মাদার দেখা যায় না, হিন্দুদের মন্দিরে নারীপুরোহিতের মুখ থেকে শোনা যায় না মন্ত্র, নারী কণ্ঠে কোনোদিন প্রতিধ্বনিত হয় না আজান। দিনে দিনে নানারকম অনুশাসনে বড়ো হতে থাকা নারীরাও এসব বৈষম্যের জটিল সূত্রগুলো মেনে নিতে থাকে। যদিও এ লেখা ধর্মীয় বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করা নয়; ধর্মকে অভিভাবক মেনে পরিচালিত একটি দেশ এবং সে দেশে চর্চিত এ রকম বৈষম্য রোধে ধ্যানমগ্ন এক নারীকে নিয়ে।

দেশটির নাম পাকিস্তান; ধর্মজলে ধোয়া এক পবিত্র দেশ। এর প্রায় ৯৭ ভাগ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগে বহু বিভক্ত নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ শুরু থেকে ইসলাম ধর্মকে যেমন নগ্নভাবে ব্যবহার করেছেন, তেমনি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিরুদ্ধে নিজের পরিচয়কে স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী করার জন্য ধর্মকে যথেচ্ছভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আর তা ব্যবহারের আরো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক সুবিধা ও ক্ষমতা লাভ। এজন্য কেউ না চাইলেও তার ওপর ধর্মীয় নীতি জোর করে চাপিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি দেশটির রাজনৈতিক নেতা ও মোল্লারা। তাছাড়া এ রাষ্ট্রটি তৈরির মূলে সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের বদলে শুধু ধর্মকেই গ্রাহ্য করা হয়েছে। যার ফলে শুরু থেকেই এখানে একটা প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ কাজ করেছিলো, যা থেকে আজো সে দেশের মানুষ বের হতে পারেনি। যে কারণে জনগণের চেতনা স্তর এখনো নিচুই রয়ে গেছে; আর এই সুযোগেই সেখানে চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল ও সেনাবাহিনী করে চলেছে রাজত্ব।

এদিকে ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বরের (৯/১১) পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধে সঙ্গী হয় পাকিস্তান। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানসহ আফগান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সব ধরনের সাহায্য দেয় পাকিস্তান। আজকে পাকিস্তান একই সময়ে সন্ত্রাসীদের জন্মভূমি এবং দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী। এ রকম দ্বিমুখী নীতির এ দেশের ধর্মীয় শাসন যেনো একটু অন্যরকম। কখনো সন্ত্রাসীদের কথা রাখতে গিয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ হত্যা করে, কখনো আবার আমেরিকার চাপে সন্ত্রাসী নির্মূল করার অভিনয় করে। এছাড়া মানুষ হত্যাকে অনেক সময় তারা ধর্মের আবরণে ঢেকে হালাল করে নেয়। আর এ হত্যার প্রকোপ পুরুষের ক্ষেত্রে কম হলেও নারীদের রেহাই নেই কোনোমতে।

নারী অধিকারের কথা বলে এ দেশের আইনে (এমনকি ধর্মেও) নানাবিধ বিধান থাকলেও, তার প্রয়োগ ঘটে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। তাই নারীর অবস্থাটা আরো ভয়াবহ রূপে দেখা যায় সেখানে। যে কারণে সেখানে নারীদের সবসময় ভয়কে সঙ্গী করেই চলতে হয়। ধর্ষণ, দলগত ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, পারিবারিক নির্যাতন, জোরপূর্বক বিবাহ, এমনকি সম্মান রক্ষার্থে হত্যার (অনার কিলিং) মতো ঘটনা এখানে হররোজই ঘটে। পাকিস্তানের মোল্লারা (কর্তারা) যে এগুলো নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তাও নয়। তবে দেখার বিষয় হচ্ছে, সেগুলো কতোটুকু কার্যকর। তাছাড়া রাষ্ট্রকর্তাদের কঠোর চাপে তা সম্ভবও হয়ে ওঠে না। তবে কিছু নারী তো থাকেই, যারা সাহস না দেখালে নারীর বাকি অস্তিত্বটুকুও ধরে রাখা কঠিন। নারীর অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার তেমনই এক সৈনিক পাকিস্তানের চিনয়। যিনি শুধু নিজ দেশ নয়, বিশ্বের বিশেষ ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রের নারীদের অত্যাচার-নিপীড়ন, বেঁচে থাকার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে সাংবাদিকতার সঙ্গে বেছে নিয়েছেন চলচ্চিত্রকে।

নাম তার শারমিন ওবায়েদ-চিনয়

করাচিতে জন্ম চিনয়ের, ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে। লেখাপড়ার প্রাথমিক পাঠ চুকিয়ে তিনি পাড়ি দেন পশ্চিমে। সেখানে পড়াশোনা করা অবস্থায় তিনি লেখালেখির অভ্যাস গড়ে তোলেন। পশ্চিমে বসে ভাবতে থাকেন বিভিন্ন দেশের নারীর কথা, শিশুর কথা সর্বোপরি মানুষের কথা। তবে তার চিন্তাভূমির অধিকাংশ জায়গা দখল করে থাকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নারী ও শিশুরা। শুরুতে তার এই চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হয় লেখালেখি দিয়ে। শিক্ষাজীবনেই লেখালেখি করেন দ্য পেনসেলভেনিয়া ইনকোয়ারার (The Pennsylvania Inquirer), দ্য কোস্টসহ (The Coast) পাকিস্তানের বেশকিছু পত্রিকায়। এ সময় কানাডার সাপ্তাহিক দ্য কোস্ট-এ পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া আফগান উদ্বাস্তু শিশুদের দুর্দশা নিয়ে তিনি একটি প্রবন্ধ লেখেন।

কিন্তু প্রবন্ধ লিখে উদ্বাস্তু শিশুদের প্রকৃত অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে পারেননিএমন চিন্তায় অস্বস্তিতে ভুগতে থাকেন চিনয়। এই অস্বস্তি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, সঙ্গে বাড়তে থাকে কোনো বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা আরো বেশি সংখ্যক মানুষকে ভালোভাবে জানানোর আগ্রহ। তিনি ভাবেন, মানুষ সংবাদপত্র হাতে নিয়ে সংবাদ পড়ে পাতা বন্ধ করে দেয়। দেখা গেলো কারো চোখে সেসব সংবাদ পড়লোই না! আর চোখে পড়লেও সে বিষয়ে কোনো চিন্তার উদ্রেক হলো না। তাই চিনয় চাইলেন কোনো একটা বিশেষ মাধ্যম দিয়ে এ বিষয়টিকে আরো সামনে নিয়ে আসতে। যে কারণে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের রিফিউজি ক্যাম্পে আফগানিস্তানের উদ্বাস্তু মানুষ কীভাবে আছে, পাঠককে তা গুরুত্ব দিয়ে এবার জানাবেন না, দেখাবেন। কেননা চিনয় ততোদিনে জেনে গেছেন, সত্যকে উপস্থাপনের শক্তিশালী মাধ্যম চলচ্চিত্র; যদিও এ সত্যের নির্মাণ আছে কিন্তু সে নির্মাণ তো মানুষের জন্যেই। আর এ রকম চিন্তার মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রের সঙ্গে চিনয়ের পথচলা শুরু।

চিনয়ের মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে এসে। এবার তিনি ঝুঁকিটা নিয়েই ফেলেন; নির্মাণ হয় চিনয়ের প্রথম প্রামাণ্যচিত্র টেররস চিলড্রেন (Terror's Children)। তার এ সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিলো না, তা অল্প সময়ের মধ্যে প্রমাণ হয়। টেরর'স চিলড্রেন বিভিন্ন মহলে আলোচিত-সমালোচিত হতে থাকে, সঙ্গে পুরস্কারও জেতে বেশকিছু। এরপর যতোবারই নারী ও শিশুদের নিয়ে চিনয়ের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তখনই তিনি আর দেরি না করে ক্যামেরা নিয়ে সেখানে ছুটে গেছেন। এই নিরন্তর ছুটে চলাই হয়তো অ্যাক্টিভিস্ট, নির্মাতা চিনয়কে নিয়ে গেছে সাফল্যের চরমে। কারণ পাকিস্তানের প্রথম কোনো নির্মাতা হিসেবে তার হাতে উঠেছে অস্কারের সোনালি ট্রফি। তাও একবার নয়, দু দু'বার!

উইম্যান অব দ্য হলি কিংডম (২০০৫), আফগানিস্তান আনভেইলড (২০০৭), ইরাক : দ্য লস্ট জেনারেশন (২০০৮), পাকিস্তান'স তালেবান জেনারেশন (২০০৯), সেভিং ফেস (২০১২), অ্যা গার্ল ইন দ্য রিভার : দ্য প্রাইস অব ফরগিভনেসসহ (২০১৫) প্রায় ২০টি প্রামাণ্যচিত্র চিনয় নির্মাণ করেছেন এ পর্যন্ত। তার অধিকাংশ প্রামাণ্যচিত্রের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে নারী অসম্মানের চিত্র। পরিবারের সম্মান রক্ষার দোহাই দিয়ে বাপ, ভাই কীভাবে তাদের মেয়ে, বোনদের হত্যা করছে, সেসব কাহিনি বলার চেষ্টা করেছেন চিনয়। ঠিক এ রকম একটা বিষয় নিয়েই ২০১২ খ্রিস্টাব্দে চিনয় নির্মাণ করেন সেভিং ফেস। প্রামাণ্যচিত্রটি ওই বছরেই তথ্যচিত্র বিভাগে অস্কার জিতে নেয়। এই অস্কারের ট্রফিটি চিনয়ের উদ্দীপনাকে যেনো আরো বাড়িয়ে দেয়। সেই উদ্দীপনা নিয়েই তিনি ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন স্থানে। তার এ ঘুরে বেড়ানো, পরিশ্রম বৃথা যায়নি একটুও। কারণ এবারের ৮৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডেও সেরা তথ্যচিত্র নির্বাচিত হয়েছে তার অ্যা গার্ল ইন দ্য রিভার : দ্য প্রাইস অব ফরগিভনেস। এ প্রামাণ্যচিত্র ঝাঁকুনি দিয়েছে পাকিস্তানের সমাজকে, আইনকে।

ঝলসানো নারীর সেভিং ফেস

নিজের মুখাবয়বকে ভালোভাবে উপস্থাপনের জন্য কতোকিছুই না `মানুষ' (যদিও আগেই বলেছি, নারীর সমার্থক শব্দ হিসেবে `মানুষ' শব্দটি অভিধানে ব্যবহার করা হয় না। তার পরেও এখানে `মানুষ' বলতে নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝানো হয়েছে) করে। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সি জাকিয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি পুরোই উল্টো। মুখটাকে ভালোভাবে উপস্থাপনের পরিবর্তে কতো কৌশলই না তাকে করতে হয়, সেটা না দেখানোর জন্য। নিজের মুখটা দেখানোই এখন তার কাছে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার। সবসময় একটা চাপা শঙ্কা নিয়ে তিনি রাস্তায় হাঁটেন আর ভাবেন, এই বুঝি এলো-বাতাসে মুখের কাপড়টা সরে গেলো! এই বুঝি কেউ দেখে ফেললো! মাদকাসক্ত স্বামী পারভেজ মদের টাকা না পেয়ে একদিন জাকিয়ার মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেয়! সেই থেকে তার এ ভয়ঙ্কর বেঁচে থাকা।

এদিকে সময়ে-অসময়ে কোনো কারণ ছাড়াই স্বামী ইয়াসির অত্যাচার চালাতো রুখসানার ওপর। ঘটনাচক্রে একদিন ননদ, শাশুড়ি, স্বামী মিলে তার মুখে অ্যাসিড ছুড়ে; পরে গ্যাসোলিন ঢেলে মুখে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে যায় দগ্ধ রুখসানা; কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারে না। তার যে কোনো আশ্রয় নেই, সামর্থ্য নেই দুই ছেলে-মেয়েকে খাওয়ানোর! তাই বাধ্য হয়ে রুখসানাকে স্বামীর বাড়িতে ফিরতে হয়। শুরু হয় তার নতুন সংগ্রাম। যদিও রুখসানার প্রতি এই নির্মমতার কথা অস্বীকার করেন ইয়াসির। তার দাবি, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে রুখসানা একদিন রান্না করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেই মুখের উপর গ্যাসোলিন ঢেলে দেয় এবং দুর্ঘটনাবশত পাশে থাকা মোমবাতির আগুন তার মুখে ধরে যায়।

পাকিস্তানে প্রতিবছর জাকিয়া, রুখসানার মতো প্রায় একশোরও বেশি নারী অ্যাসিড নিক্ষেপের শিকার হয়। মামলা করলেও আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায় এসব নারীর পতিদেবতারা। এ রকম নারীর গল্প নিয়েই চিনয়ের সেভিং ফেস। পাকিস্তানে বেড়ে ওঠা আমেরিকা প্রবাসী প্লাস্টিক সার্জন ড. মোহাম্মদ জাবাদ এই প্রামাণ্যচিত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছেন। ড. জাবাদকে দেখা যায় পরম স্নেহ নিয়ে অ্যাসিডদগ্ধ নারীর চিকিৎসা করতে। তবে চিনয় এ প্রামাণ্যচিত্রে অ্যাসিডদগ্ধ নারীর চিরদুঃখের জীবনের বর্ণনার সঙ্গে আরেকটা সুখের খবরও দেখান; অ্যাসিড নিক্ষেপকারীর শাস্তি নিশ্চিতে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বিল পাস।

সেভিং ফেস-এ দেখা যায়, ইসলামাবাদের একটি হোটেলে অ্যাসিড সন্ত্রাস নিয়ে সম্ভাব্য আইন প্রণয়নের তাগিদ থেকে অ্যাসিড সারভাইভার'স ফাউন্ডেশন (Acid Survivor's Foundation) আলোচনার আয়োজন করে। যেখানে অ্যাসিড নিক্ষেপের শিকার কয়েকজন নারীকেও উপস্থিত করা হয়। উপস্থিত অ্যাসিডদগ্ধ নারীর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি অ্যাসিড সন্ত্রাসীদের শাস্তি এবং এ নিয়ে আইন প্রণয়নের কথা তোলেন। এ দাবিটি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হতে থাকে। আরেকটি সেমিনারে অ্যাসিডদগ্ধ রুখসানা অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিচার চেয়ে বলেন, `আপনাদের মধ্য থেকে কেউ অন্তত এগিয়ে এসে এই নিষ্ঠুর মানুষগুলোকে থামান, যারা আমাদের জীবনকে মৃত্যুসম করে রেখেছে। ও আমার দেশের মানুষ, আইনপ্রণেতা, সরকার তোমাদের কন্যারা আজ ন্যায্য বিচার চায়।'

রুখসানার এ কথায় অনেকেই এগিয়ে এসেছিলেন। যাদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের সংসদ সদস্য মারভি মেমন (Marvi Memon)। কয়েকজন অ্যাসিডদগ্ধ নারীর সঙ্গে দেখা করে মারভি মেমন তাদের জীবনের বীভৎস কাহিনি শোনেন। তাদের এই নির্মম গল্পে তিনি যেনো অন্যরকম হয়ে যান। মেমন বলেন, `আমরা একটি আইনের প্রস্তাব করেছি যা অ্যাসিড নিক্ষেপকারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেবে। সংসদে এ আইন পাশ করানোর জন্যে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।' এরপর থেকে সংসদে চলতে থাকে এই বিল পাসের নানা প্রক্রিয়া। কয়েক মাস পর মারভি মেমন সংসদে বিল উত্থাপনের ব্যবস্থা করেন। অ্যাসিড সম্পর্কিত যেকোনো ধরনের অপরাধের জন্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি অলিখিত বিল পাস করে পাকিস্তান জাতীয় সংসদ। এ বিল পাকিস্তানের অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের মুখের ঘা শুকাতে কাজে না দিলেও, তাদের মনের ঘা শুকিয়ে দেয় অনেকটা।

বিল পাসের পর থেকে রক্ত পিপাসু মানুষগুলো অ্যাসিড মারতে ভয় পেলেও, বিভিন্ন ধরনের অজুহাতে নারীদের খুন করতে দ্বিধা করছে না। আর এই অজুহাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ধরনটির নাম অনার কিলিং। পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বেশকিছু দেশের মানুষ এই ল্যাংড়া ওজরটি নারী হত্যার কাজে ব্যবহার করছে। তবে এ নিয়ে চিনয়রা যে কিছু করছে না, ভাবছে না, তা নয়।

আতঙ্কের নাম অনার কিলিং

নামটাই অদ্ভুত, অন্যভাবে ভয়ঙ্কর—‘অনার কিলিং; সম্মান রক্ষার তাগিদে কাউকে হত্যা। গোষ্ঠীর বা নিজ পরিবারের সম্মানহানির দায়ে কাউকে যদি ওই গোষ্ঠী বা পরিবারের অন্য সদস্যরা হত্যা করে এবং এই হত্যার মধ্য দিয়ে তাদের সম্মান ফেরত এসেছে বা সম্মান সংক্রান্ত জটিলতার প্রতিকার হয়েছে বলে মনে করে, তখনই অনার কিলিং হয়। পাকিস্তানে এটা কারো কেরি (Karo kari) নামে প্রচলিত। বর্বরোচিত হলেও সম্মান রক্ষার এ মহৎ কাজটি সেদেশে নতুন নয়। আবার এটা যে শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ তাও নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অনার কিলিং হরহামেশাই চলছে। এই নির্মমতা নারী-পুরুষ উভয়ের বেলাতেই। তবে পুরুষের ক্ষেত্রে মাত্রাটা একটু কম। সাধারণত নারীরাই এর প্রধান শিকার। পাকিস্তান ছাড়াও ভারত, জর্ডান, লেবানন, তুরস্ক, সিরিয়াসহ পশ্চিমের দেশগুলোতে এ ঘটনা রুটিনমাফিকই ঘটছে। বাংলাদশেও এই প্রবণতা কখনো কখনো লক্ষ করা যায়।

পরিবারের অমতে বিয়ে, অপেক্ষাকৃত নিচুবর্ণের কাউকে বিয়ে, বিবাহের পূর্বে সম্পর্ক, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, ধর্মীয় বিধিনিষেধ অমান্য, সমাজের বিধিনিষেধ অমান্য প্রভৃতি বিষয়গুলোকে অনার কিলিং-এর কারণ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়। নিয়মানুসারে পরিবারের বাবা, চাচা, স্বামী, ভাই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। মানুষের অন্ধবিশ্বাস আর গোঁড়ামির জোরে এ রকম হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বিগ্ন চিনয়। আর সে উদ্বেগের জায়গা থেকেই তিনি  হাত দেন অ্যা গার্ল ইন দ্য রিভার : দ্য প্রাইস অব ফরগিভনেস নির্মাণে।

প্রেমিকের হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান ১৮ বছর বয়সি সাবা। সম্পর্ক মেনে নেওয়ার কথা বলে বাড়িতে ডেকে আত্মীয়স্বজনেরা তার ওপর নির্মম অত্যাচার চালায়। সাবা পরিবারের সম্মানহানি করেছেএই অভিযোগ তুলে মাথায় গুলি করার পর বস্তাবন্দি অবস্থায় নদীতে ভাসিয়ে দেয় স্বজনরা এবং বলে, তারা ঠিক কাজই করেছে! তবে বেঁচে যান সাবা। স্বজনদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানি আইনের ছিদ্রপথ এতোই বৃহৎ যে, অপরাধীরা পার পেয়ে যায় অনায়াসেই।

পাকিস্তানি আইনে বলা হচ্ছে, কোনো খুন হওয়া ব্যক্তির বাবা-মা যদি খুনিকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে ওই খুনিকে মুক্তি দেওয়া যাবে। উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে : যদি কোনো বাবা তার মেয়েকে হত্যা করেন, তাহলে খুনের দায় থেকে মা ওই বাবাকে মুক্তি দিতে পারেন; আবার ভাই যদি তার বোনকে হত্যা করেন, তাহলে বাবা অথবা মা তার ছেলেকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন। এই আইন সাবার বেলাতেও মানা হয়। তবে সাবা বেঁচে যাওয়ায় অপরাধীরা একটু সমস্যায় পড়ে। পরে তাকে ক্ষমা করতে বাধ্য করা হয় তাদের। সাবার এ কাহিনিই চিনয়ের অ্যা গার্ল ইন দ্য রিভার : দ্য প্রাইস অব ফরগিভনেস। প্রামাণ্যচিত্রটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের আইনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সবাইকে নাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি এমন হয় যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সাক্ষাৎ করে এ রকম অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যে চিনয়কে আশ্বাস দেন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাকিস্তানে এ রকম অপরাধের শাস্তির বিধান থাকলেও, প্রতিবছর প্রায় এক হাজার নারী বিভিন্নভাবে সম্মানহানির শিকার হয় (পাকিস্তানের মানবাধিকার সংগঠনের ২০১৪-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী)। তার পরও চিনয়ের এ প্রামাণ্যচিত্র এসব নারীকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়।

এ তো গেলো এক সাবার ঘটনা। নারী নির্যাতনের আরো চিত্র আছে এখানে। পাকিস্তানের মুজাফ্ফরগড়ের মুখতারান বিবির কথা না বললেই নয়। নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েও নিজের প্রাণশক্তির মাধ্যমে বেঁচে থাকা এক সাহসী নারী তিনি। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে তার সঙ্গে ঘটে নির্মম সেই ঘটনা। মুখতারানের ভাই শাকুর পাশের গোত্রের সালমার সঙ্গে প্রেম করতো। গ্রামের মানুষ তাদের এ প্রেমকে অবৈধ যৌনমিলন বলে অভিযোগ তুলে বিচার বসায়। মোড়লরা বলতে থাকে, যৌনমিলনের বিচার হবে যৌনমিলন! এরপর পঞ্চায়েতের নির্দেশে ভাইয়ের পাপের শাস্তি হিসেবে মুখতারানকে পাশের গোয়ালঘরে নিয়ে ছয় জন ধর্ষণ করে। অপরাধের বিচার ও শাস্তির নজির হিসেবে ছেঁড়া কাপড়ে অর্ধনগ্ন অবস্থায় তাকে শখানেক মানুষের সামনে হাঁটানো হয়।

স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনার পর যেকোনো নারীর বেঁচে থাকাটাই যেনো আশ্চর্যের। কিন্তু মুখতারান বিবি অন্য নারীর মতো আত্মহত্যার পথ বেছে নেননি, ঘুরে দাঁড়িয়েছেন মৃত্যুর বিপরীতে। পাকিস্তানের গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে খবর প্রকাশিত হলে দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ধর্ষকদের শাস্তি দিতে মুখতারান আইনের আশ্রয় নিলে বিভিন্ন সময়ে হুমকি-ধামকি চলতে থাকে। কিন্তু এতোকিছুর পরেও মুখতারান ভেঙে পড়েননি। বরং নারীমুক্তির পথ খুঁজেছেন। নিজে লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও নারীমুক্তির জন্যে শিক্ষাকেই বেছে নিয়েছেন মুখতারান। বিদেশি অনুদান ও পাকিস্তান সরকারের সহায়তা নিয়ে মেয়েদের জন্যে গড়ে তুলেছেন দুটো স্কুল। নারী শিক্ষা, নারীর আইনগত সহায়তা, সবমিলিয়ে নারীর সার্বিক কল্যাণে কাজ করে চলেছেন মুখতারান। এ রকম মুখতারান, সাবা, জাকিয়া, রুখসানাদের নিয়েই চিনয়ের সেলুলয়েডের লড়াই।

সেলুলয়েডে চিনয়ের লড়াই

আগেই বলেছি, চিনয়ের চিন্তাভূমির অধিকাংশ জায়গা দখল করে আছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নারী ও শিশুরা। সেই চিন্তাভূমির মাটি আঁকড়ে ধরেই তিনি এগিয়েছেন নির্ভীকচিত্তে। অনার কিলিং, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপের আতঙ্কে যে দেশের নারীরা ভীতসন্ত্রস্ত, সে দেশের নারী হয়ে, সে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এ নিয়ে কথা বলাটা যেকোনো নারীর জন্যেই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু চিনয় এসব ঝুঁকিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। আর কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, নির্মম কাহিনিগুলোকে একের পর এক সেলুলয়েডে ফেলেছেন।

আগেই বলেছি লেখালেখিতে অভ্যস্ত চিনয় হুট করেই সেলুলয়েডের আশ্রয় নেননি। কাগজের পাতায় নারী, শিশুদের নিয়ে লেখালেখি করে ঠিক যুত করে উঠতে পারছিলেন না তিনি। কারণ তিনি আরো বেশি মানুষের কাছে, আরো সক্রিয়ভাবে যেতে চাচ্ছিলেন এসব সমস্যা নিয়ে। বিষয়টি অনেকটা ঋত্বিক ঘটকের মতো। সব শোষণের বিরুদ্ধে ঋত্বিক একসময় রাজনৈতিক দল করেছেন; লিখেছেন গল্প, কবিতা। শোষণের এই কথামালা নিয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য একপর্যায়ে গড়ে তোলেন গণনাট্য আন্দোলন। কিন্তু তাতেও তিনি সন্তুষ্ট থাকেননি। প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে আরো বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন চলচ্চিত্রকে।

কেনো একের পর এক মাধ্যম পরিবর্তন করছেনএমন প্রশ্নের জবাবে ঋত্বিক বলেন, আমি সিনেমার প্রেমে পড়িনি বিক্রম দা, আমি ওটাকে যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে দেখছি। কাল যদি সিনেমার চেয়ে আরো ধারালো কোনো অস্ত্র আসে, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাবো। ঋত্বিকের মতো চিনয়ও হয়তো ভেবেছেন কিংবা ভাবেননি। কিন্তু চলচ্চিত্র দিয়ে ঠিকই কাজ করে দেখিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ঋত্বিকের মতো চিনয়ও ভোলেননি। তাই লিখে যখন কাজ হলো না, তখন সবকিছুকে ক্যামেরায় ধরেছেন। কারণ চিনয়ের বুঝতে কষ্ট হয়নি, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সত্য নির্মাণে চলচ্চিত্রের চেয়ে ভালো মাধ্যম নেই। তবে এই ভালো মাধ্যমটির কাছে আসতে গিয়ে চিনয়ের কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়, যদিও সীমাবদ্ধতাগুলো পরবর্তী সময়ে তিনি কাটিয়ে ওঠেন।

দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকা আফগানিস্তানের আপামর মানুষ ৯/১১র পর মার্কিন আগ্রাসনে আরো নাস্তানাবুদ হয়। সেই সময় সবচেয়ে বড়ো দুর্গতির মধ্যে পড়ে নারী ও শিশুরা। তারা আশ্রয় নেয় পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানের উদ্বাস্তু শিবিরে। কিন্তু উদ্বাস্তুতা কি আর মানুষকে শান্তি দিতে পারে! সেখানে শুরু হয় আরেক নির্মম জীবন। শিবিরে শিশুদের ওপর কঠোর সব শর্ত আরোপ করা হয়। চিনয় এসব খবর ক্যালিফোর্নিয়ায় বসে পেতে থাকেন। তিনি বিচলিত, অস্থির হন; স্বপ্ন দেখতে থাকেন শিশুদের দুঃসহ জীবনের সেই চিত্র বিশ্বকে জানানোর জন্য। কিন্তু স্মিথ কলেজ থেকে আন্তর্জাতিক নীতি শিক্ষা ও যোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক করা চিনয়কে চলচ্চিত্র-নির্মাণের জন্য কেউ অনুদান দিতে চায়নি সেসময়। তাই বলে অবশ্য তিনি থেমেও যাননি।

চিনয় নিয়মিত এসব নির্মমতার খবর দেখতে, শুনতে থাকেন। একসময় এ নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের জন্য প্রস্তাব লিখে ফেলেন। সেখানে বর্ণনা করেন, কীভাবে দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যম ব্যবহার করে সংবাদের চেয়ে একটু ভিন্ন করে এসব বিষয় তুলে ধরবেন। তখন আফগানিস্তানে যে যুদ্ধটা চলছিলো সেটা আফগানদের জন্যে নয়, ওসামা বিন লাদেনের জন্যে। তাই তিনি প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে লিখলেন, এই প্রামাণ্যচিত্র ওসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমর কিংবা অন্য কাউকে নিয়ে নয়। এটা সেই লোকদের জন্যে যারা প্রায় ২০ বছর ধরে চলতে থাকা এই গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে, না খেয়ে ধুকে ধুকে মরছে। তাছাড়া চিনয় খুব সচেতনভাবে রাজনীতিকে তার প্রামাণ্যচিত্রের বিষয় করে তুলতে চাননি। একটা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজের ভিতরে লুকানো চিত্রকে তিনি ধরতে চেয়েছেন। সবমিলিয়ে পাকিস্তানে তখনকার পরিস্থিতি ও উদ্বাস্তু শিশুদের দুর্দশার চিত্রকে গুরুত্ব দিয়েই টেররস চিলড্রেন নির্মাণ করেন। আর এটাই ছিলো তার প্রথম পদক্ষেপ।

টেররস চিলড্রেন নির্মাণের পর চিনয়ের উদ্বেগ মোটেও কমেনি বরং বেড়েছে। নিজ দেশের এ রকম নানা সামাজিক সমস্যা নিয়ে চিনয় উদ্বিগ্ন হতে থাকেন। আগেই বলেছি, অধিকাংশ পাকিস্তানি নারীই অ্যাসিড নিক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে আছে। তাই চিনয় এবার এই নারীদের বাঁচানোর জন্যে উদ্যত হন। নির্মাণ করেন সেভিং ফেস। নিজ দেশের এইসব বীভৎস চিত্র সবার সামনে উন্মুক্ত করলে তার ব্যক্তিজীবনে কতোখানি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা নিয়ে চিনয় একটুও চিন্তিত ছিলেন না। চিনয়ের ভাষায়, প্রতিবছর আনুমানিক একশো জন নারী অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয় পাকিস্তানে। যখন মানুষ এই চিত্র দেখবে, তখন তাদের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি হবে এবং ধীরে ধীরে এর ভয়াবহতা কমে আসবে। তিনি চেয়েছেন এটা শিক্ষার উপকরণ হিসেবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক।

যদিও কিছু সমস্যার কারণে পাকিস্তানের বৃহৎ দর্শকের কাছে প্রামাণ্যচিত্রগুলো প্রদর্শন করতে পারছেন না চিনয়। তবে বসেও থাকছেন না। বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন দেশে তিনি এগুলো প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করছেন। বাইরের দেশে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে পাকিস্তানের একটা মহল মনে করছে, এ ধরনের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করার কারণে সারাবিশ্বের কাছে পাকিস্তান সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তবে চিনয় এসব কথা কানেও তুলছেন না। কারণ তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, পাকিস্তানসহ সারা পৃথিবীর নারীদের জীবনে যা ঘটছে তা জানানো তার দায়িত্ব। এসব কথা শুনে পালিয়ে আসার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে এ বিষয়গুলো আরো জোর দিয়ে মানুষকে জানানো।

বাংলাদেশের সহস্র মাইলের যাত্রায় চিনয়

এ পর্যায়ে চিনয় হয়তো একটু ক্লান্ত। নারীর ওপর অত্যাচার, হত্যার চিত্র দেখাতে দেখাতে তিনি যেনো হাঁপিয়ে ওঠেন। তাই হয়তো এর উল্টোটা সেলুলয়েডে ফেলে দুনিয়াবাসীকে জানিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু উল্টো চিত্রের সন্ধান কি এতো সহজ! তার পরও কিছু জিনিস তো আলো ছড়াবেই, চিনয় নিজেও তো সেই বাতিঘরেরই একজন। এরই মধ্যে দিনবদলের সত্যিকার খবর আসে বাংলাদেশ থেকেজাতিসংঘে বিশ্বের প্রথম অল উইমেন (সবাই নারী) শান্তিরক্ষী ইউনিট পাঠায় দেশটি। চিনয়ের জন্য নিশ্চয় সেটা মহা সুখবর। একটা সময় অবশ্য এই দেশ চিনয়ের দেশেরই অংশ ছিলো। কিন্তু পাকিস্তানের কর্তারা, মোল্লারা এ অঞ্চলটিকে শাসন-শোষণ করতে চেয়েছিলো নিজেদের মতো করে, চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলো তাদের মত-পথ; যেগুলো এই বাংলার মানুষ মানতে পারেনি। এ কারণে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

এই স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলার নারীর অবদান ভোলার নয়। যুদ্ধে তাদের নির্যাতনের মাত্রাও কম ছিলো না, কেননা পৃথিবীর প্রতিটা যুদ্ধে তো নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; এই যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম ছিলো না। এরপর বিধ্বস্ত দেশটাকে সুন্দর করে সাজাতে দেশের মানুষ একসঙ্গে কাজে নেমে পড়ে। যে কাজে নারীরাও পিছিয়ে থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধে যেমন তাদের অবদান ছিলো, পরিবার-সমাজ-দেশ গঠনেও তারা অবদান রাখলো। এর পর ধীরে ধীরে শিক্ষা, শিল্পসহ উন্নয়নের নানাবিধ ক্ষেত্রে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন এই নারী গার্মেন্টে কাজ করে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশ আয় করে তখন। শুধু তাই নয়, দেশের আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজেও রয়েছে তাদের সফলতা। তবে সেটা শুধু নিজ দেশেই নয়, বাইরের দেশেও।

আবার এর উল্টো চিত্র যে নেই তা নয়, এদেশেও অ্যাসিডে নারীর মুখ ঝলসে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষককে পিটিয়ে অন্ধ করে দেন স্বামী, নববর্ষের দিন লোকচক্ষুর সামনে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হয়, তনুদের হত্যা করা হয়, নারীদের ঘরে বসে থাকার জন্য নানা দফা দেয় (২০১৩ খ্রিস্টাব্দে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার চার নং দফা লক্ষণীয়) ধর্ম রক্ষাকর্তারা। তার পরও স্বপ্নটাই জিইয়ে থাকে, চিনয়ও সেটাকে সঙ্গী করে যেনো একটু জিরিয়ে নেন।

বছর কয়েক আগে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর কাজে বাংলাদেশে আসেন চিনয়। তখন তিনি বাংলাদেশি ওই নারীদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কারণ চিনয়ের ভাষায়, এ কৃতিত্ব শুধুই বাংলাদেশের। ১৯৮৯ থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ অংশ নেয়। এসব মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা দায়িত্ব পালন শুরু করে ২০১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে।

সাহসিকতার সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে কাজ করছে এই নারীরা। সেই দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় হাইতির মতো ভূমিকম্প বিধ্বস্ত ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীল দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের নারীরা জাতিসংঘের হয়ে কাজ শুরু করে। চিনয়ের কানে এ খবর পৌঁছায়। তিনি আগ্রহী হন, লোভ সামলাতে পারেন না নারীদের এই সফলতার কথা সবাইকে জানানোর। পরে ভারতের চলচ্চিত্রনির্মাতা গীতা গান্ধবীরকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশি এ নারীদের পিছন পিছন তিনি হাঁটলেন সুদূর হাইতি পর্যন্ত। সেখানে তাদের টিকে থাকা, দায়িত্বশীলতা, স্বপ্নসহ প্রতিদিনের চিত্র ক্যামেরাবন্দি করেন তারা।

স্বামী, সংসার, ছেলে-মেয়ে ছেড়ে হাইতির মতো দূরদেশে পুরো একবছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করাটা বাংলাদেশি নারীদের জন্যে মোটেও সহজ ছিলো না। কিন্তু এ নারীরা তা সহজ করে নেয়। আর তাদের টিকে থাকার এই চিত্র দিয়েই ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ হয় অ্যা জার্নি অব অ্যা থাউজেন্ড মাইলস : পিসকিপার্স। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সদর দপ্তরে প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শন করা হয়। তা দেখে অভিভূত হন মহাসচিব বান কি মুন। তিনি এই চলচ্চিত্রে উঠে আসা বাংলাদেশি নারীদের ট্রু এজেন্ট অব চেঞ্জ (দিনবদলের সত্যিকার কারিগর) বলে ভূষিত করেন। আর এখানেই চিনয় নতুন করে পরিস্ফুটিত হন। এই সফলতার কথা পৃথিবীকে জানানোর জন্যই চিনয়ও যেনো যুগ যুগ ধরে এ রকম সহস্র মাইল যাত্রা করতে চান।

চলার শেষ নেই চিনয়ের

চিনয়ের যেনো বিশ্রাম নেই; তার পথ বন্ধুর, সম্পূর্ণ অচেনা, সীমাহীন। এই পথে বিশ্রাম নেওয়াটা যেনো বেমানান। একইসঙ্গে চিনয় সৈনিকও, যে সৈনিক থামতে জানেন না; থামলেই তার বিপদ, পিছনে শত্রুপ্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী, ধর্মান্ধ। এই মানিসকভাবে অসুস্থ, ভাঁওতাবাজ, অন্ধ মানুষেরা সবসময় চিনয়ের মতো সমাজ, মানুষকে এগিয়ে নিতে চাওয়া অক্লান্ত পথিকদের থামিয়ে দিতে চেয়েছে। এর জন্য তারা ধর্ম রক্ষার ধুয়া তুলে রেস্তোরাঁয় ঢুকে খাবারের সামনে বসে থাকা মানুষকে (সম্প্রতি করাচির এক রেস্তোরাঁয় মানবাধিকারকর্মী, ইসলামি কট্টরপন্থা বিরোধী ও অ্যাক্টিভিস্ট খুররম জাকিকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীলরা) গুলি করে, কখনো আবার ঘাড়ে চাপাতির কোপ বসায়। এই অন্ধরা কেনো জানি বিশ্বাস করতে চায় না, ধর্মের ওপরে মানুষ; মানুষের জন্যই ধর্ম। উল্টো তারা বিশ্বাস করে ছুরি মানানোর রাজনীতিতে; তারা ছুরিকাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যে ব্যবহার করে ধর্মকে। আর এভাবেই এসব ধর্মরক্ষার দল পতাকা উড়িয়ে ধর্মের বালুতে শাণ দেওয়া অস্ত্র উঁচিয়ে ঘুরে-বেড়ায়।

তবে এসব নিয়ে চিনয় ভয়শূন্য। নারীর মুক্তি না দেখা পর্যন্ত এই ভয়কে তিনি কাছে ভিড়তে দেবেন না। পৃথিবীর সব নারীকে পথ দেখাতেই চিনয় চলতে চান হাজারো দেশের পথে, সে চলার সীমানা হয়তো চিনয়েরও জানা নেই।

লেখক : শিলু হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

shiluhossain40@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. হাক্কানী, হুসেন (২০১৫ : ৮); মোল্লা ও মিলিটারির কবলে পাকিস্তান; অনুবাদ : মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার, পিএসসি (অব.); বিজয় প্রকাশ, ঢাকা।

২. প্রাগুক্ত; হাক্কানী, হুসেন (২০১৫ : ৮)।

৩. খলিল, ইব্রাহীম; অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি থেকে ঋত্বিক : বিপ্লবের দুই ধারা; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ৮, বর্ষ ৪, জানুয়ারি ২০১৫, পৃ. ১৫০।

৪. http://bengali.cri.cn/941/2014/03/24/41s142853.htm; retrieved on  04.06.2016

৫. http:/ww/w.prothom-alo.com/we-are/article/785284/evsjv‡`‡k-QwewU-Avgiv-‡`Lv‡Z-Lye AvMÖnx; retrieved on 25.04.2016

৬. আজাদ, হুমায়ুন (২০১১ : ৪৩); রাজাকারের রাজনীতি; প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

তথ্য সহায়িকা

http:/ww/w.pakistanherald.com/profile/sharmeen-obaid-chinoy-1332; retrieved on 13.02.2016

http://asiasociety.org/blog/asia/interview-sharmeen-obaid-chinoy-first-pakistani-oscar-nominee; retrieved on 13.02.2016

http://goo.gl/10UeBo; retrieved on 04.04.2016

http:/ww/w.manobkantha.com/2015/08/17/58367.php; retrieved on 04.03.2016

http://goo.gl/ier7QY; retrieved on 04.03.2016

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন