কাজী মামুন হায়দার
প্রকাশিত ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সানি, ম্যাজিক মামণি ও ‘পুতুলনাচ’ : এক ফালি পুরুষালি স্বীকারোক্তি
কাজী মামুন হায়দার

‘ম্যাজিক মামণি’ আইটেম সঙ-এর একটি দৃশ্য
এ লেখা কোনো জটিল তত্ত্ব নিয়ে নয়। এক আমজনতার সাধারণ পর্যবেক্ষণ এবং তার মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা মাত্র। আবারও বলছি, তত্ত্ব এর বিষয় নয়; এর বিষয় খুব সাধারণ—চলচ্চিত্রের ভিনদেশি এক নায়িকা, দেশি এক আইটেম সঙ এবং রাজশাহীর নওদাপাড়া বাসস্ট্যান্ডের মেলার ‘পুতুলনাচ’ (এলাকা ভেদে কোথাও একে ‘ভ্যারাইটি শো’ও বলা হয়)। আমি জানি না এই ‘গল্পটা’ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তবে এটা বুঝতে পারছি গল্পটা বলা জরুরি। এটা কেবল ‘পুতুলনাচ’, চলচ্চিত্র কিংবা গ্ল্যামারের বিষয় নয়; এর চেয়ে বেশি কিছু।
২.
ঘটনার দিন রাত ১০টায় যখন রাজশাহীর নওদাপাড়ায় বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মেলায় প্রবেশ করি, তখন সেটা পুরুষের মেলা হয়ে গেছে। যদিও মেলা সবসময় পুরুষের দ্বারা পুরুষের জন্যই ছিলো। তার পরও সম্প্রতি মফস্বল থেকে শহুরে মেলায় নারীর উপস্থিতি চোখে পড়ে; তবে সেটাও পুরুষ চায় বলেই হয়তো। যাক সে কথা, মেলায় তখন আমার চারপাশে নানা বয়সি স্বজাতির জটলা। এর বড়ো অংশের বয়স ১২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। আমার বয়সি, মানে ৩৭-৩৮ কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি, এই ধরেন ৪৫-৫০ বছরের অনেক পুরুষও চোখে পড়ে।
পাশাপাশি চারটে পুতুলনাচের প্যান্ডেল। এর ঠিক বছর খানেক আগে যখন রাজশাহীর পবা উপজেলায় গ্রাম্য এক মেলায় গিয়েছিলাম, সেখানেও ঠিক একই রকম পরিস্থিতি চোখে পড়েছিলো। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে লাল-নীল-সবুজ বাতিতে ভরে যায় এসব পুতুলনাচের মঞ্চ। সঙ্গে বাজতে থাকে ভারতীয় বাংলা-হিন্দি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় আইটেম সঙ। নওদাপাড়ার মেলাতেও তার ব্যতিক্রম দেখিনি। অল্প অল্প জায়গা নিয়ে কালো কাপড়ে ঘিরে এসব পুতুলনাচের প্যান্ডেল বানানো হয়েছে। এর মধ্যে মাঝারি মাপের একখানা মঞ্চ প্রস্তুত। মঞ্চের তিন পাশ বাঁশ দিয়ে ঘেরা। সম্মুখের ঠিক বিপরীত পাশে কি-বোর্ড, ড্রাম নিয়ে দু-তিন জন বসা। মঞ্চের তিন পাশে বাঁশের ঘেরাটা ঠিক এমন করে দেওয়া, যাতে বাইরের দিক থেকে চাইলেই কোনো দর্শক মঞ্চের কিনারায় এসে কোনো নারী শিল্পীকে স্পর্শ করতে পারে।
প্যান্ডেলের সামনের অংশে বাঁশ আড়াআড়িভাবে দিয়ে ফাঁক ফাঁক রেখে একধরনের উঁচু বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। বাঁশের সেই বেষ্টনী লাগোয়া একটি টেবিলে দুইজন লোক টিকিট নিয়ে বসে আছেন। ওই লোকদের ঠিক পিছনে এক হাত দূরত্বের মধ্যে কালো কাপড়ের একটি পর্দা টাঙানো। এই পর্দাটির বৈশিষ্ট্য হলো চাইলেই তা উপরে তোলা যায়। ফলে ভিতরের মঞ্চে কী হচ্ছে, তা প্যান্ডেলের বাইরে থাকা যে কেউ অনায়াসে দেখতে পারে। বাঁশের বেষ্টনীর একেবারে মাঝামাঝি প্যান্ডেলে ঢোকার রাস্তা। সেটাও বাঁশ দিয়েই তৈরি। প্যান্ডেলের অবকাঠামোয় পবা কিংবা নওদাপাড়ার মেলার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য পেলাম না।
এ ধরনের মেলায় রাত ১০টাকে পিক-আওয়ার বলা যেতে পারে। মেলার প্রধান ফটকে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে তা বুঝেছিলাম। দেখেছিলাম এই সময়টাতে দলে দলে লোক মেলায় ঢুকছে। এদের একটা বড়ো অংশকে খেটে খাওয়া মানুষ মনে হলো। অনেকেই হয়তো রিকশা জমা দিয়ে মেলায় ঢু মারতে এসেছেন। কিংবা সারাদিন দোকান বা কারখানায় কাজ করে মেলায় এসেছেন একটু ‘বিনোদন’ নিতে। পুতুলনাচের প্যান্ডেলের সামনে তখন খুব ভিড়। ৩০ টাকার টিকিট কিনে প্রত্যেকটা প্যান্ডেলের সামনে জনা চল্লিশেক পুরুষ তখন সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। আগের শো ভাঙলেই তারা সেখানে প্রবেশ করবে।
৩.
‘উহা’ কিন্তু নামেই কেবল পুতুলনাচ নয়, বাস্তবেও। পার্থক্য কেবল এই পুতুলের সবাই নারী এবং রক্তমাংসের মানুষ। এই নারীদের পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকে পুরুষের হাতে। কার পরে কে মঞ্চে নাচবে, কতোক্ষণ মঞ্চে থাকবে, এমনকি কতোখানি ‘কাপড় খুলবে’ তার পুরোটাই থাকে ওই পুরুষের হাতেই। ২০-২৫ মিনিট দৈর্ঘ্যরে একটা শো থেকে আরেক শো শুরুর মধ্যের সময়টাতে খানিকটা সময় পর্দা তুলে দিয়ে ওই নারীদের যেভাবে প্রদর্শন করা হয়, তা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে। শরীরের মধ্য ও উপরের অংশে সামান্য কাপড় পেঁচিয়ে সারিবদ্ধ ওই নারীরা যখন নানা অঙ্গভঙ্গি করে সামনের পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে, তখন সমুদ্রপাড়ে বিকিনি পরা ‘সুন্দরী’’দের কথা মনে পড়ে। পার্থক্য কেবল স্থানিক ও উপস্থাপনায়; উদ্দেশ্য ও চিন্তার জায়গায় কিন্তু এক ও অভিন্ন।
এবার পুতুলনাচ শুরু হয়। জনা পঞ্চাশেক পুরুষের চোখ তখন মঞ্চের দিকে। মাইকে যন্ত্রসঙ্গীত বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের শান্ত থাকার কথা বলছেন একজন ঘোষক। তার পরেই বিশেষণ ব্যবহার করে পুতুলনাচের ‘‘পুতুল’’দের নাম বলতে থাকেন তিনি। শুরুতেই শোনা যায়, সুদূর সুন্দরবন থেকে আগত চপলা হরিণ শাবক প্রিন্সেস সুরাইয়ার নাম। ১৫-১৬ বছরের মেয়েটি ব্লাউজ ও শর্টস পরে যন্ত্রসঙ্গীতের তালে মঞ্চে প্রবেশ করে। শুরুতেই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সে নিজে গান গাওয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু চারপাশে থাকা অন্যান্য পুতুলনাচের মঞ্চ থেকে আসা শব্দ তাকে টিকতে দেয় না। তাই বাধ্য হয়ে তাকে রেকর্ড করা হিন্দি গানের শরণাপন্ন হতে হয়। গানের ড্রামের বিটের সঙ্গে সঙ্গে যেনো সুরাইয়ার নাচের বিট বাড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই শুরু হয় উদ্দাম নৃত্য। এরই মধ্যে কিছু পুরুষ অবশ্য মঞ্চে টাকা ছুড়ে দিয়ে সুরাইয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে থাকে। সুরাইয়াও তাতে সাড়া দেয়। মঞ্চে এ সময় সুরাইয়া ছাড়াও দুজন পুরুষকে দেখা যায়, তারা মূলত দর্শক সারি থেকে সুরাইয়ার দিকে ছুড়ে মারা টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে থাকেন।
ড্রামের বিট বাড়তে থাকে, আমার মতো জনা পঞ্চাশেক পুরুষের একশো চোখ সুরাইয়ার দিকে নিবন্ধিত হয়। সুরাইয়াও যেনো উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকে। প্রথমে ব্লাউজ এবং এর অল্প সময়ের মধ্যে শরীরের সব বসন খুলে ছুড়ে ফেলে মঞ্চে। দর্শকের টাকা ছোড়া বেড়ে যায়। সুরাইয়া একের পর এক এই দর্শকের কাছে গিয়ে তাদের ‘সন্তুষ্ট’ করতে থাকে। কেউ কেউ সুরাইয়াকে একটু বেশি কাছে পেতে চায়, তাতে সে বাধা দেয়; কখনো কখনো ব্যর্থ হলে পাশে থাকা টাকা কুড়ানো পুরুষটি সুরাইয়াকে ‘‘নিরাপদ’’ দূরত্বে সরিয়ে নেয়। ঘোষক সক্রিয় হন, ‘ভাইয়েরা, শিল্পীরাও মানুষ। তাদের চোখ ভরে দেখুন, কিন্তু এমন কোনো আচরণ করবেন না যাতে তারা শারীরিকভাবে কষ্ট পায়। আপনাদের বিনোদনের জন্যই এই আয়োজন।’’ একসময় সুরাইয়ার ‘‘লীলা’’ সাঙ্গ হয়। একের পর এক রুপালি, ময়না, নাসরীন ও ডায়না মঞ্চে আসে। সুরাইয়ার মতো আচরণ করে, কেউ কেউ একটু বেশি করে। ততোক্ষণে অবশ্য পুরুষ দর্শক হিসেবে আমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি। আদিম প্রবৃত্তিগুলো খুব বেশি কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে রুপালি, ময়না, নাসরীন ও ডায়নার নগ্ন শরীর দেখছি। নিজের ভিতরে অদ্ভুত একটা ঘোর কাজ করছে, কেমন একটা অস্বস্তি! সেটা ঠিক কাম নয়, আবার কামহীনতাও নয়। কেমন একটা ঝাঁপসা অনুভূতি; তবে এতোকিছুর মধ্যেও একটা ভালোলাগা কিন্তু আছে।
এই অনুভূতির মধ্যেই একসময় নাচ শেষ হয়। আমি বেরিয়ে আসি। ততোক্ষণে ঘোষক পরের শো’’র জন্য সবাইকে টিকিট কেনার আহ্বান জানাতে শুরু করেছেন। সুরাইয়া-রুপালি-ময়না-নাসরীন-ডায়নারা আবার অর্ধনগ্ন শরীরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গেছেন। কালো পর্দা কিছুক্ষণ পর পর সরে যাচ্ছে। আমার মতো পুরুষ আবার উৎসাহ বোধ করছেন ভিতরে ঢোকার। আমি অবশ্য তখন পাশের পুতুলনাচের ফটকের সারিতে দাঁড়িয়ে গেছি সেখানকার কালো পর্দার পিছনের নারীদের দেখার জন্য। আগেই বলেছিলাম, অদ্ভুত এক অনুভূতি—ঠিক কামও নয়, কামহীনতাও নয়। নতুন নারী শরীরের ব্যাপারে একটা ঘোর।
আমার সঙ্গে আগের শো দেখেছে এমন কয়েকজনকেও পেলাম এই পুতুলনাচ দেখার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে নতুন পুতুলনাচের শো শুরু হয়ে যায়। ওই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখানে একটা নতুন বিষয় লক্ষ করলাম; হয়তো এটা নতুন না, স্বাভাবিক; অপেক্ষাকৃত একটু রোগা, বুক-নিতম্ব শুকনো এক নারী মঞ্চে এসে কেমন যেনো সহজ হতে পারছিলেন না। দর্শকরাই হয়তো তাকে খুব একটা ভালোভাবে নিচ্ছিলো না, এটাই বোধ হয় কারণ। তিনি কেমন জানি তার শারীরিক ‘দুর্বলতা’’য় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন। এই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার জন্য ওই নারী নাচের ফাঁকে ফাঁকে বারবার দর্শকের সঙ্গে হালকা হাসিঠাট্টা করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাতে দর্শক যে খুব একটা সাড়া দিচ্ছিলো এমন নয়। ব্লগে শামীমা মিতুর লেখা একটি উক্তি মনে পড়ছিলো—‘‘কী অদ্ভুত! স্তন আমার সেখানে আমার অধিকার নেই এবং স্তন নিয়ে আমার চিন্তা না থাকলেও জগতজোড়া মানুষের চিন্তার শেষ নেই!১ যদিও এই নারীকে তার স্তন নিয়েও চিন্তা করতে হয়। কারণ মানতে কষ্ট হলেও এ দিয়েই তার রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়। এটির প্রদর্শনীতে মঞ্চে বেশি টাকা উঠে তার থলেতে। পুতুলনাচের ওই নারী হালকা হাসিঠাট্টা করে রোজকার দিন পার করলেও সারা পৃথিবীর বহু ‘‘সচেতন’, ‘শিক্ষিত’, ‘‘ক্ষমতাবান’ নারীও কিন্তু তাদের ছোটো স্তন নিয়ে চিন্তিত! সে চিন্তা থেকে মুক্তির নানা পথও তারা বের করে ফেলেছেন। অনেকে সেই পথের যথাযথ ব্যবহারও করছেন।
‘তাহলে কি নারীর নিজ পছন্দ অনুযায়ী শরীরের আকার দিতে পারা একভাবে প্রকৃতির নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসা? ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক? র্বাবির মতো হয়ে উঠবার ইচ্ছেটি তাহলে কি স্বাধীন, সমাজবিচ্ছিন্ন ইচ্ছে?’২ মোটেও না। নারীবাদী বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কারভাবে বলা যায় এটা মোটেও ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়, কসমেটিক সার্জারি ভীষণ রকম সামাজিক চাহিদা মতো শরীর উৎপাদনের তরিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। সার্জারি করে যে শরীর নারীরা পেতে চান, সেই চাওয়াটি আপনা থেকে স্বাধীনভাবে তৈরি হয় না।’’৩ পুরুষরা চায় বলেই হয়। যদিও বিষয়টা এতোখানি সাদামাটাভাবে দেখারও সুযোগ নেই। তবে নারী শরীর নিয়ে যে রাজনীতি চলে তার সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক আছে। রাজনীতির প্রসঙ্গ আসায় তসলিমা নাসরিনের একটা কথা মনে পড়ে গেলো, ‘‘নারী অনেকটা দোপিঁয়াজা মাংসের মতো, একে খেতেও আনন্দ, অনেকটা আমের আচারের মতোও নারী, একে চেটেও আনন্দ।’৪
৪.
শেষ পর্যন্ত আইটেম সঙ নিয়ে কথা বললেন ভারতের প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী শাবানা আজমি। শেষ পর্যন্ত বলছি এই কারণে যে, এক আইটেম সঙ নিয়ে কম কথা হয়নি এই উপমহাদেশে! সেসময় কেনো জানি শাবানা আজমি, শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, স্মিতা পাতিল কিংবা সৌমিত্র, নাসিরুদ্দিন শাহ্-এর মতো অভিনয়শিল্পীরা টু শব্দটিও করেননি। সম্প্রতি ‘উইমেন অব ওর্থ’’ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাবানাকে কথা বলতে শোনা গেলো দাবাং টু’র ‘‘ফেভিকল সে’’ শিরোনামের গানটির একটি লাইন নিয়ে। শাবানা বলেন,
আইটেম গান নিয়ে আমার কিছুটা আপত্তি রয়েছে। যখন কোনো অভিনেত্রী বলবেন, ‘আমি তন্দুরি রুটি আমাকে অ্যালকোহলের সঙ্গে উপভোগ করো’, তখন অবশ্যই আমি এর প্রতিবাদ করব। কারণ এই কথাগুলো কোটি কোটি মানুষ শুনছে। একটি পাঁচ বছরের বাচ্চাও সেই গান শুনে, কথা শুনে মজা নিচ্ছে। এটা সত্যিই কি আমাদের সঠিক শিক্ষা দিচ্ছে? আমাদের চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই?৫
দায়বদ্ধতা ভিন্ন প্রসঙ্গ; কিন্তু এটা তো ঠিক যে এই ভাষায় মানে নারী ‘তন্দুরি রুটি, তাকে অ্যালকোহলের সঙ্গে খাওয়া যায়’’ বললে, নারীর যে ধারণায়ন বিকশিত হয়, তা চলতি ও বাজারি হয়ে ওঠে।
বিষয়টাকে দুভাবে দেখলে মনে হয় ভালো হয়। প্রথমত, আইটেম সঙের কথা, যা নিয়ে শাবানা নিজেই বলেছেন। দ্বিতীয়ত, এই কথাগুলো বলার সময় যে ধরনের অঙ্গভঙ্গি, অভিব্যক্তি উপস্থাপন করা হয় সেটা; সঙ্গে তার পোশাক ও কস্টিউমও গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্রের কম্পোজিশনের সূত্র অনুযায়ী পর্দায় স্থির বস্তুর চেয়ে গতিশীল বস্তু বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাই দর্শকের কাছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইটেম সঙের কথায় যাই থাকুক না কেনো, যিনি সেই গানের সঙ্গে নাচেন, তার শরীর অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শাবানা অবশ্য দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, আইটেম সঙ কিন্তু যতোটা না শোনার বিষয়, তার চেয়ে অনেকখানি দেখার। তাই দর্শক এখন নিয়মিত তা দেখেন। যেহেতু আইটেম সঙ এখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও সংক্রমিত, তাই দর্শক যেমন ‘ফেভিকল সে’’ দেখে, তেমনই ‘‘ম্যাজিক মামণি’’ও দেখে। কখনো ঘরে বসে টেলিভিশনে, সবসময় স্মার্ট ফোনের ছোটো স্ক্রিনে আবার কখনো কখনো প্রেক্ষাগৃহে (কখনো কখনো বলছি এই কারণে যে, ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাগৃহমুখী দর্শক এখন অনেক কমে গেছে) গিয়ে দর্শক এখন এসব আইটেম সঙ দেখে। আবার এই একই দর্শকের একটা বড়ো অংশ যখন নওদাপাড়া বাসস্ট্যান্ডের মেলার ‘পুতুলনাচ’’ বা যাত্রা দেখতে যায়—এর মিশ্রণে যা হয় তা আর রুপালি পর্দার বিষয় থাকে না; পর্দার বাইরে চলে আসে। আমাদের যাপিত জীবন, পারিবারিক জীবন, দাম্পত্য জীবন, সামাজিক জীবন, কর্মজীবন প্রতি মুহূর্তে কোনো না কোনোভাবে এর দ্বারা আক্রান্ত হয়।
৫.
শুরুতেই বলেছি এই আলোচনায় সানি লিওনি’কে নিয়ে কথা বলার ‘খায়েশ’ আছে। শব্দ হিসেবে খায়েশ-এর সঙ্গে কিন্তু খুব জোরালোভাবে পুরুষের একটা সম্পর্ক আছে। খুব সচেতনভাবে লক্ষ করলে দেখবেন ‘‘খায়েশ’’ শব্দটা নারীরা খুব কমই ব্যবহার করে। এ নিয়ে পরে কথা হতে পারে, তবে সানিকে নিয়ে আলোচনা এখনই শুরু করতে চাই। সেক্ষেত্রে সানিকে নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন দেখা যেতে পারে। সানি লিওনিকে ভারতছাড়া করার দাবি জানিয়েছে হিন্দু জনজাগ্রুতি সমিতি নামে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন।৬ তাদের দাবি, সানি তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট সানিলিওনিডটকম-এর মাধ্যমে অশ্লীলতার প্রচার চালাচ্ছে। যার ফলে ভারতের তরুণ সমাজের ক্ষতি হচ্ছে এবং নারীদের সম্মানহানি হচ্ছে। এছাড়া সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়, অনলাইনে সানির জনপ্রিয়তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চেয়েও বেশি, যা তাদের মতে অত্যন্ত ‘‘উদ্বেগজনক’’। বুঝলাম, সানির কারণে ভারতের জনগণের মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে; এই অশুদ্ধতা এতোই তীব্র যে তারা জনগণের সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও চিন্তিত। তাই সহজ সমাধান, সানিকে তারা ভারতছাড়া করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতোজন সানিকে জনজাগ্রুতি সমিতি ভারতছাড়া করবে?
কাননদেবী থেকে শ্রীদেবী, হালের শ্রদ্ধা কাপুর, কে এই পথে ধোয়া তুলসি পাতা! কে অভিনয়ের প্রয়োজন ছাড়া চলচ্চিত্রে তাদের শরীর ব্যবহার করেননি! পর্নো করে আসা সানি তো তবুও অনেক বিষয় খোলামেলা বলে-কয়েই করেন, কিন্তু অনেকে তো কেনো করেছেন, কী জন্য করছেন, তার যথাযথ উত্তরও দিতে পারবেন না। সিফনের শাড়ি পরে অপ্রয়োজনে বৃষ্টিতে ভেজা, সুইমিং কস্টিউম পরে সমুদ্র সৈকত মাত করা কিংবা হালের আইটেম সঙ—এর সবকিছুই তো সানি আসার বহু আগে থেকেই এই উপমহাদেশে জায়েজ করে ফেলা হয়েছে। আরেক নায়িকা মমতা কুলকার্নিকে তো ভাড়া করে এনে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা পুরো নগ্ন করে রাতভর নাচিয়েছিলো। তার প্রতিবাদে মাহামুদুজ্জামান বাবুর কণ্ঠে শোনা গিয়েছিলো—‘ভিনদেশি নর্তকী অশ্লীল নেচে যায়/ ধর্ষিতার হাহাকার বাতাসে কেঁদে যায়।’’৭ এটা সানি আসার অনেক আগের কথা; তাহলে সানির ঠিক দোষ কী বুঝলাম না!
বহুদিন আগে আরেকটি প্রতিবেদন পড়েছিলাম সানিকে নিয়ে— বাড়ি ভাড়া পাচ্ছেন না সানি। আবার সম্প্রতি আরেকটি প্রতিবেদন দৃষ্টি কেড়েছে— ‘আমি থাকলে সহশিল্পীর স্ত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।’৮ এই বক্তব্যটি অবশ্য সানির নিজের। একই প্রতিবেদনে তিনি আরো বলেছেন,
যখন আমি কোনো অভিনেতার সঙ্গে কাজ করি, তখন তার স্ত্রী কিংবা প্রেমিকার সঙ্গেও দেখা করি। বেশিরভাগ সময় নিজের সহশিল্পীর চাইতে তার সঙ্গিনীর সঙ্গেই ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে আমার। কিন্তু এরপরও আমি বুঝতে পারি তারা আমাকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কিন্তু আমি তাদের বলতে চাই, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী পেয়েছি। আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই।
যে বাসাওয়ালারা সানিকে বাসা ভাড়া দিতে চান না, কিংবা যে নারীরা তাদের পুরুষ সঙ্গীদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন তারা কি কেবলই সানিকেই ভয় পান, ঘৃণা করেন? বলিউডি দু-একজন ছাড়া কোন নারী অভিনয়শিল্পী এসব করছেন না—প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে? নারী শরীরের প্রতি ভাঁজে ভাঁজে যেখানে শত শত কোটি টাকা লুকিয়ে থাকে, সেখানে কেবল এক সানিকে নিয়ে তবে এতো কথা কেনো?
৬.
এবারেও আইটেম সঙ, তবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। প্রবন্ধের শিরোনামেই ‘ম্যাজিক মামণি’’ বলে একটি শব্দগুচ্ছের অবতারণা করেছিলাম। তার মাজেজা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। ইফতেখার চৌধুরী পরিচালিত অগ্নি ২’’র একটি আইটেম সঙের শিরোনাম এটি। গান শুরুর ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে অগ্নি ২’র নায়িকা মাহিয়া মাহি ও তার সহশিল্পীরা নাচের তালে তালে শরীরের উপরের অংশের কাপড় খুলে ছুড়ে দেন দর্শকের দিকে। এরপর স্বল্প বসনেই মাহি ও তার সহযোগী ছয় নারী শিল্পীর নাচ চলতে থাকে।
‘পুতুলনাচ’’ দেখার অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, সেখানে অংশ নেওয়া নারীরা মঞ্চে উঠার ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে অন্তত তাদের বসন খুলে ফেলেন না। মঞ্চে উঠে সাধারণত প্রথমে তারা নিজের কণ্ঠে একটি গান গাওয়ার চেষ্টা করেন। তারপর ধীরে ধীরে পরিবেশ করে তারা বসন খুলতে থাকেন। এই তুলনাটা আমি ঠিক কেনো করছি জানি না। তবে ‘‘ম্যাজিক মামণি’’ শিরোনামের গানটি আমি যতোবার দেখেছি, কেনো জানি ততোবারই আমার পুতুলনাচের সেই নারীদের কথা মনে হয়েছে। মাহি ও তার সহযোগীদের শারীরিক গঠনের মতো অবশ্য পুতুলনাচের ওই নারীরা নয়; তাদের চোখে-মুখে যদিও রাতের পর রাত জাগার চিহ্ন রয়েছে, সস্তা ফেস পাউডারে চোখের নীচের কালির দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা আছে; কারো শরীরে হয়তো মোটাতাজাকরণের ওষুধ খেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত মেদ জমেছে; তার পরও কোথায় যেনো একটা বড়ো ধরনের মিল রয়েছে মাহি আর পুতুলনাচের ‘পুতুল’’দের মধ্যে।
এই মিল অবশ্য আমি ইন্দো-কানাডিয়ান দামি অভিনেত্রী সানি লিওনির শরীরের মধ্যেও খুঁজে পাই। সবগুলো শরীরই কোনো না কোনোভাবে আমাকে কামুক করে; কারণে-অকারণে পুরুষ করে তোলে। তাতে অবশ্য দোষের কিছু নেই! কারণ আমি বা আমার মতো লক্ষ পুরুষ এই শরীর দেখে কামুক হবে, সেটাই তো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি চায়। তাহলেই একটা আইটেম সঙ সফল হয়। এজন্যই তো মুম্বাই থেকে গানের জন্য কম্পোজার, নাচের কোরিওগ্রাফার, পোশাক পরিকল্পনাকারী চড়া দামে ভাড়া করে এনে শরীরের প্রতি ভাঁজ স্পষ্ট করে তোলার ব্যবস্থা করা হয়।
আইটেম সঙ-এর দৃশ্যে সানি লিওনি ও প্রিয়ঙ্কা চোপডা
এটা অবশ্য নিশ্চিত করে বলা যায়, নওদাপাড়ার পুতুলনাচের ওই নারীদের জন্য মোটেও এতো আয়োজন থাকে না। তারা পোশাক নিয়ে চিন্তা করবেন কী, তারা তো একটু বেঁচে থাকার মতো ভাত, কাপড়, চিকিৎসার জন্য রাতের পর রাত হাজারো লোলুপ পুরুষের সামনে স্বল্প বসনে নাচগান করেন। এই বাস্তবতাটা না ঠিক বোঝানো সম্ভব নয়। যারা অবশ্য র্কুরাতুল-আইন-তাহ্মিনা ও শিশির মোড়লের ‘‘বাংলাদেশে যৌনতা বিক্রি : জীবনের দামে কেনা জীবিকা’৯ পড়েছেন, তারা কিছুটা হলেও এই জীবনের কথা বুঝতে পারবেন। যদিও কালো হরফে দুই-পঞ্চাশ লাইন পড়ে এই বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়।
৭.
এই আলোচনাটি শুরু করতে চাই একটা সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে। অন্য পুরুষের ক্ষেত্রে কী হয় জানি না; তবে যতো কথাই বলি না কেনো সানি, ম্যাজিক মামণি ও পুতুলনাচ দেখে কিন্তু পুরুষ হিসেবে আমি মজা নেওয়ারই চেষ্টা করি কিংবা করেছি। একটু অন্যভাবে বললে, এর কোনো কিছুই দেখার সময় আমাকে অপরাধবোধ কিংবা বড়ো ধরনের অস্বস্তিতে ফেলেনি। অন্য কেউ দেখে ফেলবে, সেই ভয়ে হয়তো কাপড়ে মুখ ঢেকেছি; কিন্তু ভিতর থেকে এই নারীদের জন্য কোনো দায় কাজ করেনি। তবে এ দেখে কখনো সামান্য ধর্ম ভয় কাজ করেছে। ‘‘পাপ’’, মৃত্যুচিন্তা কখনো কখনো উঁকি দিয়েছে। কিন্তু আমার মধ্যে কোনো অনুশোচনা কাজ করেনি। উল্টোদিকে, কী অদ্ভুতভাবে কেনো জানি এ সবকিছুর জন্য ওই নারীদেরই দোষ দিতে ইচ্ছা করেছে; আমি ভালো, ওরা খারাপ—এই চিন্তায় গা বাঁচাতে ইচ্ছা করেছে।
সাফাদ নূর-এ ইসলাম ও মির্জা তাসলিমা সুলতানা তাদের ‘‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা : নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা’১০ শিরোনামের প্রবন্ধে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন, অবমাননা, যৌন হয়রানি এই বিষয়গুলো মূল্যায়নে কখনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, বর্ণ, ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন। প্রায় সব ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের মাধ্যমে কেবল এসবের ভয়াবহতা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে বলেও তারা জানান। তাদের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে যেটা হয়েছে, কেবল পরিসংখ্যান প্রকাশের আড়ালে যে অপরায়ন তত্ত্বের জন্ম হয়েছে, সেটা অন্তরালেই থেকে গেছে। বিষয়টা অনেকটা এ রকম যে, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির নারী এসবের সঙ্গে জড়িত হয়েছে, অন্যরা যে যার শ্রেণি অবস্থান থেকে ভেবেছে আমরা তো নই; তাই এ নিয়ে তাদের চিন্তারও তেমন কিছু নেই। ফলে এ নিয়ে পরিসংখ্যানিক বুদবুদ হয়েছে, আলোড়ন হয়নি। এই শ্রেণিগত ব্যবধান অন্যান্য শ্রেণির ওপর যে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলছে তা আর আলোচনায় আসেনি বললেই চলে। এতে সানি, মাহি কিংবা করপোরেট অফিসের কোনো নারীকর্তা, বড়ো বড়ো কাজে থাকা ক্ষমতাবান নারীরা এক অবস্থানে; বিপরীতে পুতুলনাচের পুতুল নারীরা এক অবস্থানে পড়ে গেছে। আর এই দুইয়ের মাঝখানে যারা, মানে সাধারণ নারীরা কেবলই অধস্তনের শিকার হয়েছে।
তবে বর্তমানের উত্তরাধুনিকতাবাদী ব্যাখ্যা থেকে এটা মনে করার একটা সম্ভাবনা দেখা দেয় যে, নারী শুধু ক্ষমতাহীন ও ভিক্টিম নয়। চূড়ান্ত সামাজিক চাপের মুহূর্তেও নারী স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে এবং বাস্তবে রূপ দিতে পারে। রুয়ান্ডার যুদ্ধে দেখা গেছে একজন নারী, যিনি মা, সেবিকা বা শিক্ষিকা হিসেবে রক্ষক কিংবা প্রতিপালকের ভূমিকা পালন করছেন, আবার তিনিই রাষ্ট্রের নাগরিকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শত্রু এথনিক গোষ্ঠীর নারী, পুরুষ বা শিশুকে হত্যা, ধর্ষণ করতে সৈন্যদের সহায়তা করেছেন। আবার আবু গারিব কারাগারে ইরাকি নারী-পুরুষের ওপর মার্কিন নারী সেনারা নির্যাতন কিংবা আমাদের চেনাজানা পরিবেশের মধ্যে শাশুড়ির নির্যাতন, যৌনকর্মীদের সর্দারনি—সহিংসতায় নারীও যে সক্রিয় সেটাই স্পষ্ট করে। তবে এটাও ঠিক যে নারীর সক্রিয়তা ও অংশগ্রহণের স্বীকৃতির মানে এই নয় যে, চিরাচরিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নিষ্ক্রিয়-সক্রিয় মডেল পুরোপুরি অকেজো, বাতিলযোগ্য। বিষয়টিকে সেভাবে না দেখে বরং কোন পরিপ্রেক্ষিতে নারীর সক্রিয়তা আড়ালে থেকে যায়, তা জানা ভীষণ জরুরি। সক্রিয়তার প্রসঙ্গকে আনা এ কারণে আরো জরুরি, যাতে বিশ্ব রাজনৈতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ, অধিপতি পুরুষালি ডিসকোর্সকে কেউ এড়িয়ে না যায়। উপরের এই আলোচনায় এটা অন্তত স্পষ্ট হয় যে, নারী কোনো সমরূপ ক্যাটাগরি নয়, নারী শুধু নিপীড়নের শিকার নয়, বরং নানা পরিপ্রেক্ষিতে নারীও নিপীড়নকারী হতে পারে।১১
চূড়ান্ত সামাজিক চাপের মুহূর্তে নারীরা যেহেতু স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তাহলে মাহি, সানি, কারিনা, ঐশ্বরিয়াদের তো ওই চক্র থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ আছে। তার পরও তারা উঁচু হিল, লম্বা গাউন পড়ে, বক্ষ উঁচু করে কান-এর লালগালিচায় হাঁটেন নারীদের আরো ‘‘সুন্দরী করা’ পণ্যের প্রতিনিধি হয়ে। সানিকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বলেন, ‘আমার এই মেয়েটাকে ভালো লাগে। সানি লিওনির সাহস আছে। ও স্বাধীন, ওর যা করতে চায় তা করার অধিকার আছে।’১২ কোন সাহসের কথা প্রিয়াঙ্কা বলেন, যে সাহসে সানি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে নির্মিত (construct) শরীরখানি কোটি পুরুষের সামনে মেলে ধরেন? সানি পর্নোগ্রাফি করেছেন, সেটা ভালো না মন্দ, তা নিয়ে এখানে কথা বলতে চাই না। কিন্তু পর্নোগ্রাফি পর্নোগ্রাফিই। সেটা সবার কাছে পরিষ্কার। কিন্তু সেটাকে পুঁজি করে চরিত্রের প্রয়োজন না থাকার পরও নানা কারণে শরীর প্রদর্শন কী, তার উত্তর হয়তো সানিও দিতে পারবেন না। এই ক্ষমতাবান প্রিয়াঙ্কারাও অপ্রয়োজনে আইটেম সঙে শরীর দেখান, আবার পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান পুরুষ ওবামার সঙ্গে নৈশভোজ করেন। ওবামার সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার ছবি তাকে ক্ষমতাবান করে, সম্মানিত করে, এই সম্মান কি তার অপ্রয়োজনে অর্ধনগ্ন শরীর প্রদর্শনকে জায়েজ করে? এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। তবে পর্দায় তার এই অসংলগ্ন উপস্থিতি পুরুষ হিসেবে আমাকে কামুক করে, অন্য নারীকে তার মতো ভাবতে উৎসাহিত করে।
পুতুলনাচ কিংবা যাত্রার প্রিন্সেসদের তো যাওয়ার জায়গা নেই, তারা পতিতালয় থেকে পুতুলনাচে, না হয় তার উল্টোটা করেন। কিন্তু ব্রিটনি, ম্যাডোনা, জোলি, প্রিয়াঙ্কা, ঐশ্বরিয়া, সানি, মাহিদের তো এই সমস্যা নেই। তার পরও কেনো তারা স্রেফ অর্থের জন্য নিজের শরীরকে ব্যবহার করেন, বিকিয়ে দেন। প্রশ্ন উঠতে পারে চাইলেই কী তাদের এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে? কিংবা আমি সানি হবো—এটা কি কেবল আমার চাওয়ার ওপরই নির্ভর করে? আর আমি যদি সানি না থাকি, তাহলে কি সেই সাধারণ নারী হয়ে যাবো না, যারা কেবলই অধস্তনের শিকার? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে দেওয়া হয়তো সহজ। কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে এই প্রশ্নের মীমাংসা করা এতো সহজ নয়। তার প্রমাণ পুরুষ-নারী যেকোনো অবস্থান থেকে একটু মাথা ঠাণ্ডা রেখে চিন্তা করলে পাওয়া সম্ভব। তাই এর তাত্ত্বিক আলোচনা নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ নেই। আমি শুধু এতোটুকু বুঝি এই রথী, মহারথী নারীদের এতো সস্তায় টিভি, সংবাদপত্রের পাতা, ইন্টারনেটে পেয়ে, তাদের দেখে সাধারণ নারীদের ঢাকা শরীরের কোনো দাম পুরুষ হিসেবে আমার কাছে থাকে না; সে আমার স্ত্রী, বোন, মা, শিক্ষার্থী যেই হোন না কেনো; নারী শরীর আমাকে ধন্দে ফেলে।
৮.
‘কমিউনিস্ট, ট্রটস্কিবাদী বা মাওবাদী যাদের সঙ্গেই কাজ করুক না কেন, নারী সর্বদাই পুরুষের অধীনস্থ। ফলে, আমি বুঝেছি, নারীকে তাদের নিজের সমস্যা সমাধানের ভার নিজের হাতে নেবার জন্য প্রকৃত অর্থেই নারীবাদী হয়ে ওঠা প্রয়োজন।’১৩ সিমন দ্য ব্যোভওয়া’র এই বক্তব্য আমাকেও নাড়া দেয়। এই বক্তব্য শোনার পর খুঁজতে থাকি নারীবাদী বলতে সিমন কী বোঝাচ্ছেন। উত্তরও পেয়ে যাই,
আমার সংজ্ঞায়, নারীবাদী হলো সেই নারীরা—অথবা সেই পুরুষেরাও—যারা কখনো শ্রেণী সংগ্রামের লড়াইয়ের পাশাপাশি, কখনো বা শ্রেণীসংগ্রামের লড়াই ব্যতিরেকেই, নারীর অবস্থান বদলের জন্য চেষ্টা করছে, তাদের অভিষ্ট বদলগুলোকে পুরোপুরি সমাজবদলের ওপর নির্ভরশীল না করেই। [তাই] ... ঠিক এইখানে এবং এই মুহূর্ত থেকেই নারীর অবস্থানের জন্য লড়াই শুরু করতে হবে।১৪
মাহি. সানি, ঐশ্বরিয়া, কারিনা, ম্যাডোনাসহ সব নারীদের সামনে বোধ হয় এই সময়ে এসে এর বাইরে আর কোনো পথ খোলা নেই।
লেখক : কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।
kmhaiderru@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. http:/ww/w.istishon.com/?q=node/19309#sthash.vpAXXNfb.ndl12YLI.dpbs; retrieved on 02.06.2016
২. খন্দকার, নাসরীন (২০১১ : ২১); ‘‘পুতুল খেলার রাজনীতি : বারবি কাহিনী’’; প্রবল ও প্রান্তিক ১; সিরিজ সম্পাদক : রেহনুমা আহমেদ; পাবলিক নৃবিজ্ঞান, সন্ধি প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. প্রাগুক্ত; খন্দকার, নাসরীন (২০১১ : ২১-২২)।
৪. নাসরিন, তসলিমা; ‘‘নিজের গোলা শূন্য’; বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
৫. ‘‘কারিনার নাচ-গানে শাবানার আপত্তি’; প্রথম আলো, ১২ মার্চ ২০১৬।
৬. https://shorturl.at/Cu9C7; retrieved on 16.05.2015
৭. পুরো গানটি শুনতে এই লিঙ্কে যেতে পারেন : https://www.youtube.com/watch?v=-GO_TYXCHQY; retrieved on 20.05.2016
৮. https://shorturl.at/pxr06; retrieved on 06.06.2015
৯. কুররাতুল-আইন-তাহমিনা ও শিশির মোড়ল (২০০০); বাংলাদেশে যৌনতা বিক্রি : জীবনের দামে কেনা জীবিকা; সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড), ঢাকা।
১০. ইসলাম, সাফাদ নূর-এ ও মির্জা তাসলিমা সুলতানা (২০১১); ‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা : নারীবাদী দর্শনের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণ ভাবনা’; প্রবল ও প্রান্তিক ১; সিরিজ সম্পাদক : রেহনুমা আহমেদ, পাবলিক নৃবিজ্ঞান, সন্ধি প্রকাশনী, ঢাকা।
১১. উপরের আলোচনাটি—প্রাগুক্ত; ইসলাম ও সুলতানা (২০১১ : ১২-১৩), থেকে নেওয়া।
১২. https://shorturl.at/DGEus; retrieved on 25.12.2015
১৩. শোয়ার্জার, অ্যালিস (২০০০ : ৩২); সীমন দ্য ব্যোভওয়া-এর সঙ্গে কথোপকথন : দ্বিতীয় লিঙ্গের পরে; সম্পাদনা : আলম খোরশেদ; খনা, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
১৪. প্রাগুক্ত; শোয়ার্জার, অ্যালিস (২০০০ : ২৬)।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন