শাহরিনা অরিন
প্রকাশিত ২৮ জুলাই ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
দেখা অতঃপর লেখা
পুঁজি-রাষ্ট্রের খেলায় অহল্যার বিনির্মাণ
শাহরিনা অরিন

বাস্তব জীবনের সঙ্গে সঙ্গে কল্পনাতেও ব্যক্তির একটা জগৎ থাকে। সেই কল্পনার জগতকে ব্যক্তি নানাভাবে সাজায় গোছায়, সম্ভব-অসম্ভব সব চিন্তা-ভাবনা জড়ো করে। ব্যক্তির ওই অদেখা জগতেও কিন্তু খানিকটা রহস্য-রোমাঞ্চ উপস্থিত; অনেকটা সেলুলয়েডের জীবনের মতো। যেখানে বাস্তব-অবাস্তব, সম্ভব-অসম্ভব সবকিছুই সময়ের জন্য বাস্তব হয়ে হাজির হয়। চলচ্চিত্রের বাস্তবতা আর জীবনের বাস্তবতা কাছাকাছি বসবাস করে। তাই হয়তো চলচ্চিত্র জীবনের বাস্তব ও কল্পনার প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান শিল্পমাধ্যম হয়ে উঠেছে। এজন্যই পর্দায় আমরা যখন যা দেখি, অনেক সময়ই সেখানে বাস্তব-অবাস্তব গুলিয়ে যায়। এই বাস্তব-কল্পনার দোটানার সঙ্গে রহস্য-রোমাঞ্চের গন্ধ সবসময়ই আমাদের আন্দোলিত করে।
সেই রহস্যের মোড়ক নিয়েই ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই ইউটিউবে মুক্তি পায় অহল্যা। ‘রামায়ণ’-এর অহল্যা উপাখ্যান অবলম্বনে নির্মাতা সুজয় ঘোষ ১৪ মিনিট দৈর্ঘ্যরে অহল্যা বিনির্মাণ করেন। বাঙালি হলেও মূলত হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রনির্মাতা সুজয় এই প্রথম বাংলা চলচ্চিত্রে হাত দিলেন। কয়েক বছর আগে ভারতীয় টিভি চ্যানেল ‘স্টার জলসা’য় নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অবশ্য বাংলা ভাষায় একটি ‘সুপারন্যাচারাল থ্রিলার’ নির্মাণের ইঙ্গিত করেছিলেন।১ হয়তো অহল্যাই সেই ‘সুপারন্যাচারাল থ্রিলার’।
যাই হোক, প্রশ্ন উঠতে পারে, অহল্যার ক্ষেত্রে বিনির্মাণ বা ডিকন্সট্রাকশন কথাটি কেনো আসছে? সুজয় কী করেছেন সেখানে! সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে একটু জানা দরকার এই বিনির্মাণ-ইবা কী? তাত্ত্বিকভাবে কোনো সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় মূল কাহিনির ভাব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কাহিনির বক্তব্যের ঊর্ধ্বে উঠতে পারাকে বিনির্মাণ বলা হয়ে থাকে। অবশ্য এটাও ঠিক ‘ডিকন্সট্রাকশন মানে ডেস্ট্রয় করা না। ডিকন্সট্রাকশন হলো, একটা বিষয়কে তার আর্কিওলজিকাল ও জেনিওলজিকাল অ্যানালিসিস দিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যার সম্ভাবনা তৈরি করা।’২ এই যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ আর সত্যজিতের চারুলতার কথায় যদি আসি; ‘নষ্টনীড়’-এর কাহিনি আর চরিত্রগুলো ঠিক রেখে সত্যজিৎ নির্মাণ করলেন চারুলতা। কিন্তু ‘নষ্টনীড়’-এ যে ভূপতি শেষ পর্যন্ত চারুকে ছেড়ে মৈশুর গিয়েছিলেন, চারুলতায় সেই ভূপতিই সবকিছু মেনে নিয়ে চারুকে কাছে টেনে নিয়েছেন; মেনে নিয়েছেন চারুলতা-অমলের প্রেম। রবীন্দ্রনাথের সময়কে সত্যজিৎ ধরেছেন ঠিকই কিন্তু সেই সময় থেকে খানিকটা এগিয়ে পুরুষ-ভূপতিকে উপস্থাপন করেছেন।
অন্যদিকে চারুলতার (১৯৬৪) ৪৮ বছর ব্যবধানে কলকাতার অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায় নির্মাণ করেন চারুলতা ২০১১। সেখানে তিনি এবার সত্যজিতের চারুলতাকে খানিকটা এগিয়ে উপস্থাপন করলেন। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে চৈতি বোসের একাকিত্ব, সঞ্জুর সঙ্গে অবাধ মেলামেশা শারীরিক সম্পর্কে গড়ায়। সেই সম্পর্কের চূড়ান্ত রূপ অন্তঃসত্ত্বা চৈতি। কোনো প্রশ্ন না করে সেই চৈতিকেও মেনে নেন স্বামী বিক্রম। রবীর ‘নষ্টনীড়’ থেকে সত্যজিৎ হয়ে অগ্নিদেবের চারুলতার কাহিনি হয়তো একই, কিন্তু ভূপতিতে পার্থক্য যোজন যোজন।
২.
অহল্যা যখন এতো সাড়া ফেলে দিচ্ছে, তখন খুব আগ্রহ নিয়ে তা দেখলাম। দুই- আড়াই ঘণ্টায় যেখানে একটা চলচ্চিত্র হয়, সেখানে মাত্র ১৪ মিনিটে পুরো একটা কাহিনি, মন্দ কী! মনে হলো খুব অল্প সময়ে রোমাঞ্চকর বিনোদনের জন্য এটি চমৎকার। আগাগোড়া রহস্যে ঠাসা অহল্যা নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করার মতো। শেষ পর্যন্ত না দেখলে বোঝার জো নেই এর শেষটা কেমন। দৈর্ঘ্য কম হলেও অতৃপ্তি বোধ হলো না কোথাও। অল্পবয়সি সুন্দরী অহল্যা, তার বৃদ্ধ স্বামী গৌতম সাধু আর তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা ইন্দ্র সেন—এই তিন চরিত্র নিয়ে অহল্যা। যেখানে জাদুর পাথর আর অহল্যার রূপ-যৌবনের ফাঁদে ধরাশায়ী হয়ে গড়ে ওঠে শিল্পী গৌতম সাধুর একেকটি সৃষ্টি। সেই ফাঁদে পড়ে ইন্দ্র সেনও ‘জীবন্ত’ পুতুল হয়ে ওঠেন। এভাবেই গড়ে ওঠে কাহিনি।
চলচ্চিত্রটি যেহেতু ‘রামায়ণ’-এর অহল্যা উপাখ্যান নিয়ে নির্মিত; তাই এক ফাঁকে সেই কাহিনিটাও পড়ে ফেললাম। ব্রহ্মার মেয়ে অহল্যার রূপে মুগ্ধ ছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। আর ওদিকে ব্রহ্মা তার মেয়েকে গচ্ছিত রাখেন বৃদ্ধ ঋষি গৌতমের কাছে। গৌতম নির্দিষ্ট সময় পর অহল্যাকে ব্রহ্মার কাছে ফিরিয়ে দেন, তাও একদম ‘অক্ষত’ অবস্থায়। আর এতে খুশি হয়েই গৌতমের সঙ্গে অহল্যার বিয়ে দেন ব্রহ্মা। কিন্তু ধ্যান-তপস্যাতে মগ্ন গৌতম অহল্যার প্রতি উদাসীন। এদিকে রূপ-যৌবনে পরিপূর্ণ অহল্যা ছটফট করে কামতৃষ্ণায়। এই সুযোগে গৌতমবেশে ইন্দ্র হাজির হন অহল্যার কাছে, লিপ্ত হন সঙ্গমে, তৃপ্ত করেন অহল্যাকে। অহল্যা হয়তো সব বুঝেও মেনে নেন এ ‘অন্যায়’কে। এভাবে চলতে চলতে গৌতমের কাছে ধরা পড়েন দুজনেই। গৌতমের অভিশাপে পাথর হয়ে যান অহল্যা। পরে দেবতা রামের স্পর্শে তার অভিশপ্ত পাথর-জীবন শেষ হয়।
এখন কথা হলো, চলচ্চিত্রে এর বিনির্মাণ কীভাবে হলো? এখানেও কাহিনি আর চরিত্র তো মোটামুটি একই! ‘রামায়ণ’-এ মূল ঘটনা বা দুষ্কর্ম ঘটান ইন্দ্র, আর শিকার হন অহল্যা। অপরাধ বিবেচনায় ইন্দ্র হয়তো একটু বেশিই দোষী। তাই গৌতমের অভিশাপে ইন্দ্রের সারা শরীর ভরে যায় যোনিতে। ইন্দ্র যেহেতু জগতে ‘ধর্ষণ’ প্রথার সূচনা করেন, তাই তার দায় নিতে হয় দুজনকেই। এমনকি ইন্দ্রকে যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ষিত হতে হবে বলে অভিশাপও দেন গৌতম। তিনি অহল্যাকে অভিশাপ দেন পাথর হয়ে যাওয়ার। অন্যদিকে সুজয় তার অহল্যায় পুরো বিষয়টাকেই উল্টে দেন। এখানে গৌতম সাধু আর অহল্যা মিলে ফাঁদ পাতেন ইন্দ্রকে ধরার; ফলে শিকার হন ইন্দ্র, যাকে জাদুবলে পুতুল বানিয়ে ফেলা হয়। ষড়যন্ত্রের শিকার এক নারীর বিপরীতে এমন নারীচরিত্র নির্মাণ হয়েছে যিনি নিজেই ষড়যন্ত্রকারী। সেই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা আবার ‘মহাসাধু’ গৌতম নিজেই, যিনি দুষ্কর্মটি করান অহল্যাকে দিয়ে।
সবশেষে সব ষড়যন্ত্রের দায় ভোগ করতে হয় লোভে পড়া পুলিশ-ইন্দ্রকে। সেখানে কোনো দায়ই থাকে না অহল্যা ও গৌতমের! দুইটি ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে একই অহল্যাকে নিয়ে কাহিনির দু-রকম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ‘রামায়ণ’-এর সাধু এখানে ‘অসাধু’ শিল্পী, ষড়যন্ত্রকারী। যে কিনা নিজের শিল্পকে গড়ে তোলেন অহল্যাকে টোপ বানিয়ে। এই যে সাধু-শয়তান খেলা এবং খুব সহজেই সেই খেলায় কাউকে পুতুল বানানো—ঠিক ব্যক্তিকে নিয়ে যেমনটি করে রাষ্ট্র ও সমাজ। আর এভাবেই হয়তো ‘রামায়ণ’-এর অহল্যা উপাখ্যানকে ছাপিয়ে সুজয়ের অহল্যা নতুন অর্থ তৈরি করে।
৩.
পরিপাটি কিন্তু যৌনাবেদনময়ী পোশাকে কলিংবেলের শব্দে দরজা খুলে পর্দায় হাজির হন অহল্যা। তার ওই চোখধাঁধানো রূপ দেখে পুলিশ কর্মকর্তা ইন্দ্র কিছুক্ষণের জন্য যেনো থমকে যান। এরপর তিনি ইন্দ্রকে যখন ভিতরে নিয়ে যান, তখন অহল্যার আকর্ষণীয় শরীর দেখানোর সঙ্গে আবহে বাজতে থাকে, ‘এসো এসো, আমার ঘরে এসো ...’। কেমন মায়াবী এক আহ্বান, রহস্যের অন্ধকূপে পা দিতে যাচ্ছেন ইন্দ্র। তাকে নানা ভঙ্গিমায় চোখের চাহনিতে, শরীরের স্পর্শে বার বার আকর্ষণ করেন অহল্যা। ইন্দ্রও বার বার কামুক দৃষ্টিতে দেখেন অহল্যাকে, অস্বস্তিও বোধ করেন।
অহল্যার রূপ-যৌবন দেখে স্বভাবতই বৃদ্ধ সাধুর মেয়ে বলে মনে হয় ইন্দ্রের। কিন্তু সাধুর স্ত্রী জেনে তিনি খানিকটা বিব্রত হন। বিষয়টা সামলে নিয়ে সাধু বলেন, ‘সবাই এই রকম ভুলই করে। আর এই পাগল মেয়েটাকেও তো আমি বলে বলে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। শি শুড মুভ অন। শি শুড গো অ্যান্ড ফাইন্ড সামবডি হু হ্যাজ মোর লাইফ ইন হিম। মেয়েটা আমার মধ্যে কী যে দেখেছে তা তো আমি জানি না। আর এমন তো নয়, আই অ্যাম ভেরি গুড ইন বেড!’ তবে সাধু তার শিল্প সৃষ্টির পুরো কৃতিত্বটা কিন্তু অহল্যাকে দিতে ভোলেন না। কৃতজ্ঞতার সুরে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার সবকিছু সৃষ্টি কিন্তু ওরই (অহল্যা)। এভরি ইঞ্চ অব হার ইন্সপায়ারস মি। উইদাউট মাই ওয়াইফ আই অ্যাম নাথিং।’ সেটা অবশ্য চলচ্চিত্রের শেষে গিয়ে বুঝতে কষ্ট হয় না। অহল্যার যৌনাবেদনের টোপে ইন্দ্রও অন্য পুতুলগুলোর মতোই ‘জীবন্ত’ মূর্তি বনে যান।
৪.
নিরুদ্দেশ হওয়া অর্জুন রায়কে খুঁজতেই গৌতম সাধুর বাড়িতে পুলিশ কর্মকর্তা ইন্দ্রের আগমন। অর্জুন মূলত মডেল হওয়ার জন্য শিল্পী সাধুর বাড়িতে এসেছিলেন। সাধুর বাড়িতে ম্যান্টেলপিসে (কারুকাজ করা ছোটো আলমারির মতো তাকবিশেষ) বিভিন্ন ব্যক্তির অবয়বের পুতুলের সঙ্গে অর্জুনের পুতুলও সাজানো; এরা সবাই অহল্যার যৌনাবেদনের ফাঁদে পা দিয়ে ‘জীবন্ত’ মূর্তি হয়েছেন। নতুন কাউকে দেখলেই বাঁচার আকুতি জানিয়ে রক্ষা পাওয়ার জন্য ছটফট করে এই মূর্তির আড়ালে থাকা জীবন্ত মানুষগুলো। ইন্দ্রকে দেখেও তারা এমনটি করেন; ম্যান্টেলপিস থেকে আপনা আপনিই পড়ে যায় মূর্তি। অর্জুনের নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে এবার সাধু অদ্ভুত এক গল্প শোনান ইন্দ্রকে। তার জাদুর পাথরের ব্যবহারে অর্জুন নাকি অন্য বেশ ধারণ করে গা ঢাকা দিয়েছেন। যদিও তার সেই গল্প ইন্দ্রের বিশ্বাস হয় না। আর এই অবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই সাধু সেই পাথরের টোপটি ফেলেন ইন্দ্রের ওপর।
ইন্দ্রের মনে ধাঁধা ঢুকিয়ে তাকে গৌতমের বেশে পাঠানো হয় অহল্যার কাছে। সুযোগকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে কামে লিপ্ত হন ইন্দ্র। অবাক লাগে, ‘অন ডিউটি’তে যিনি মদ্যপানে অস্বীকৃতি জানান, তিনি নারীভোগের সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন! আর তার পরিণতি হয় অর্জুনের মতোই। ইন্দ্রও শুরু করে বাঁচার জন্যে একই ধরনের আকুতি। কিন্তু তা তখন আর শুনতে পায় না কেউই। শিকারগুলোর মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। ইন্দ্র পুলিশ কর্মকর্তা, যার আসলে নিজের কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার টিকে থাকার হাতিয়ার। আবার মডেল অর্জুন, যে কিনা পণ্য কেনা-বেচার মাধ্যম মানে পুঁজির হাতিয়ার। রাষ্ট্র, পুঁজি এদের উভয়কেই ব্যবহার করে নিজেদের প্রয়োজনে। এরা প্রকৃত অর্থেও সেই ম্যান্টেলপিসে সাজিয়ে রাখা একধরনের ‘পুতুল’-ই।
অহল্যার অহল্যা, ইন্দ্র, সাধুকে দেখতে দেখতে নানা চিন্তা মাথায় আসে। নারীভোগের কামনা, সৌন্দর্য দিয়ে পুরুষকে আকর্ষণ; শিল্প সৃষ্টির জন্যে নিজের স্ত্রীকে ব্যবহার, নারীর প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে জীবন্তপুতুল বনে যাওয়া—এসবের মধ্যে কোথায় যেনো বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার মিল আছে। কখনো রাষ্ট্র, কখনো গণমাধ্যম, আবার কখনোবা মানবিক সম্পর্ক—১৪ মিনিটে অহল্যা অস্থির করে তোলে। আবার দেখতে উদ্যত হই। কয়েকবার দেখাও হয়। ছোটো ছোটো চিন্তাগুলো আরো ঘনীভূত হয়। মনে হয়, আমরাও তো ইন্দ্র-অর্জুনের মতো অনেককাল থেকেই রাষ্ট্র নামক পরিস্থিতির ফাঁদে আটকা পড়ে মূর্তি হয়ে গেছি। সাধু-অহল্যার মতোই সেই রাষ্ট্রের আছে অসীম ক্ষমতা। আর আমরা সেই ক্ষমতার প্রয়োগকে মেনেও নিয়েছি। আমরা মনে-প্রাণে ধরেই নিয়েছি ‘কল্যাণকামী’ রাষ্ট্র কখনো আমাদের অমঙ্গল চাইবে না নিশ্চয়ই!
আর সেই সুযোগে রাষ্ট্র আমাদের গ্রাস করে ফেলেছে, দখল করে নিয়েছে মনোজগত। তাই ‘জনকল্যাণকামী’ ক্রসফায়ারে আজ নিরপরাধ কারো মৃত্যু হলেও আমরা তা নিয়ে কথা বলতে চাই না। কারণ এই ক্রসফায়ারের মাহাত্ম্য দেখিয়ে একসময় এই রাষ্ট্রই আমাদেরকে সন্ত্রাস থেকে ‘বাঁচিয়েছে’। আমরা বুঝিনি, এভাবে সন্ত্রাস নির্মূল করা যায় না। এর জন্য সবার আগে সহিংস নয়, রাষ্ট্রের ইতিবাচক ভূমিকা লাগে। কিন্তু এটা বুঝে উঠার আগে আমরা ম্যান্টেলপিসে সাজানো সাধুর আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন শিল্পকর্ম হয়ে গেছি। আমাদের চিৎকার এখন আর কেউ শুনছে না। একইভাবে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে রাস্তায় পেট্রোলবোমা ছোড়া হয়, যেখানে-সেখানে অস্ত্রের খনি পাওয়া যায়; আর দিনের পর দিন নাস্তিক ব্লগার বলে চাপাতির কোপে খণ্ড-বিখণ্ড হয় মানুষ ।
৫.
অন্যদিকে বর্তমানের মহাপ্রতাপশালী গণমাধ্যমের একটা ছায়াও দেখা যায় অহল্যায়। গণমাধ্যমের ব্যাপ্তি এতোই বিশাল যে, এর মায়াজালের বাইরে থাকা কঠিন। এর মোলায়েম ছোঁয়ায় যে ধীরগতির বিষক্রিয়া চলে তা মানুষকে এক ভয়ঙ্কর লোভ, মোহ, আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ফেলে দেয়। গণমাধ্যম নিজে প্রতিনিয়ত ব্যক্তির মধ্যে তা চর্চা করতে থাকে। অহল্যা দেখতে দেখতে তাই গৌতম ঘোষের শূন্য অঙ্ক-এর কথা মনে পড়ে যায়। আদিবাসীদের উন্নয়নের কথা বলে বহুজাতিক কোম্পানি পাহাড়ে থাকা বক্সাইট উত্তোলন করতে চাইলে সেখানকার আদিবাসীরা জানায়, তাদের এগুলোর দরকার নেই। কারণ কোনো অভাব নেই তাদের। বিষয়টা তাদের ভাষায় এ রকম, ‘সাহেব, আমাদের আকাশে আলো আছে, নদীতে জল আছে, জঙ্গলে জানোয়ার আছে, আর মহুয়া গাছে মধু আছে। আমাদের কীসের অভাব?’
কিন্তু রাষ্ট্র তাদের ‘উন্নয়ন’ করবেই। আদিবাসীরাও নাছোড়বান্দা। একপর্যায়ে বক্সাইটের খোঁজে আসা বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তাকে তাই দেখা যায়, সিকিউরিটি ফোর্স সরিয়ে প্রত্যেকটি আদিবাসী গ্রামে একটা করে টেলিভিশন দেওয়ার পরামর্শ দিতে। কারণ তা-ই মানে টেলিভিশনই লোভ ছড়াবে আদিবাসীদের মধ্যে। তখন পাহাড়, মহুয়া আর ঝরনার মায়া ছেড়ে তারা ছুটবে বহুজাতিক কোম্পানির দাস হওয়ার জন্য। সঙ্গে নগদ অর্থ প্রাপ্তি ও উন্নয়নের নামে হাসপাতাল, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লোভ তো আছেই। বিষয়টা রূপক অর্থে হলেও বাস্তবতার একেবারে কাছাকাছি। গণমাধ্যম এভাবেই ব্যক্তির লোভ-লালসাকে বাড়িয়ে দেয়, অন্য চিন্তা-ভাবনা থেকে দূরে রাখে। এই লোভ আর নেশায় একবার বুঁদ হলে তা থেকে বের হওয়া কঠিন।
বর্তমানে দেশে সোপ অপেরা বা টিভি সিরিয়ালের যে ভয়ঙ্কর প্রচলন, তাতে এর প্রভাব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এগুলো মানুষকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করছে যে, মানুষ নিজের জীবনকে পর্যন্ত বিকিয়ে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে আমাদের নিজস্বতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বলতে আর কিছুই থাকছে না। সোপ অপেরাগুলোর নামে এখন পা থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যবহার্য সব জিনিস বাজারে পাওয়া যায়। ‘কিরণমালা’ দেখতে না পেয়ে কলেজ ছাত্রীর আত্মহত্যা৩, কিরণমালা-জামা না পেয়ে আত্মহত্যা৪, ‘কিরণমালা’ দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রী মারামারি করে হাসপাতালে৫ কিংবা সিরিয়াল নিয়ে বিবাহবিচ্ছেদ—গণমাধ্যমে আসা এসব ঘটনা আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আসলে গণমাধ্যম আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? ক্রমাগত এগুলো দেখে দেখে একধরনের নেশা আর স্বপ্নে ডুবে যেতে থাকে দর্শক, যে ‘স্বপ্ন’ চাহিদা হয়ে ধরা দেয় দর্শকের কাছে।
অহল্যাতেও অর্জুন-ইন্দ্রদের ‘স্বপ্ন’ মায়া হয়ে হাজির হয়, যেমনটা সাধারণ মানুষকে নিয়ে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম করে। সাধারণ মানুষ এর মায়ায় পড়ে বের হওয়ার পথ হারিয়ে ফেলে। শত চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তারা ছাড় পায় না। গণমাধ্যমের নানা উপাদান কিংবা সোপ অপেরার ন্যারেটিভ দর্শকের জীবনে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, সেই স্বাভাবিকতা একপর্যায়ে সঙ্কট সৃষ্টি করে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিন-চার ঘণ্টা টেলিভিশনের সামনে থাকা, ছোটো-বড়ো সবার হাতে ‘অপ্রয়োজনে’ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মুঠোফোন আমাদের শঙ্কিত করে। কিন্তু সেই শঙ্কা নিয়ে গলাফাটা চিৎকার করলেও গৌতম-অহল্যার বানানো জীবন্ত মূর্তিগুলোর মতো সেটা আর এখন কেউই শুনতে পায় না!
৬.
গতানুগতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দেখে আমরা যারা অভ্যস্ত, অহল্যা তাদের কাছে অন্যরকম বিনোদনের খোরাক জোগাবেই। দেখা শেষে অনেকক্ষণ একটা রহস্যের রেশ যেনো রয়েই যায়। মনে হয় শেষ হলো না, আরেকটু কিছু হলে বোধহয় ভালো হতো। সুজয় কাহিনিতে টুইস্ট আনার পাশাপাশি অভিনয়শৈলী, সংলাপ, আবহসঙ্গীত, পোশাক বৈচিত্র্যে নান্দনিকতার ছাপ রেখেছেন। দুটি শটে পোশাকে ভিন্নতা রেখে সাদা-কালোর দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। চরিত্রগুলোর সঙ্গে অভিনয়শিল্পী সবাই বেশ মানানসই। যদিও অহল্যার চরিত্রে রাধিকা আপ্তে’র উচ্চারণে কিছুটা জড়তা ছিলো। তার পরও তার অভিনয় প্রশংসার দাবি রাখে। আর গৌতমরূপী সৌমিত্র তো অনবদ্য।
লেখক : শাহরিনা অরিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ador.haque.skp@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. https://www.youtube.com/watch?v=q71-gWfHpZ4; retrieved on 19.10.2015
২. মামুন, আ-আল; ‘প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র সমালোচনা’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ষ ৩, সংখ্যা ২, জানুয়ারি ২০১৪, পৃ. ২২০।
৩. http://www.somoyerkonthosor.com/archives/275861; retrieved on 27.08.2015
৪. http://www.deshebideshe.com/news/details/53663; retrieved on 27.08.2015
৫. http://m.prothom-alo.com/bangladesh/article/390073; retrieved on 27.08.2015
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন