Magic Lanthon

               

নাজমুল রানা

প্রকাশিত ২৮ জুলাই ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বাকিটা ব্যক্তিগত-এর মোহিনী

ইট-পাথরের ফ্রেমে বাঁধা জীবনে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তির খোঁজ

নাজমুল রানা


গতিময় নগরের অন্তঃসারশূন্য মানুষ

পাশাপাশি হাঁটছে সবাই। গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগছে, নাক স্পর্শ করে যাচ্ছে অন্য কারও গায়ের ঘ্রাণ। চোখে চোখ পড়ছে; কিন্তু হচ্ছে না ভাবের বিনিময়। চোখ-মুখ জুড়ে শুধু অস্থিরতা, সব পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক অদৃশ্য টান শরীরে। কোনো দিকে তাকানোর সময় নেই; নেই কাউকে নিয়ে ভাবার অবসর। কোনো কিছুতেই বিকার নেই। সমস্ত বিকার জনতার, নির্বিকার কেবল ব্যক্তি। ব্যক্তিসত্তা জনতাপিণ্ডে বিলীন। মনেহয় যেন অসংখ্য অকেজো অসাড় নার্ভের ঘাত-প্রতিঘাতে প্রত্যেকের নার্ভেই সাড়া জাগে এবং একটা-কি-দুটো তারে তীব্র ঝংকার ওঠে। আবার জনতার বাইরে এসে যখন ব্যক্তি আপনসত্তা নিয়ে দাঁড়ায়, তখনো সে ভীষণ একা, শূন্যপুরোপুরি নির্জীব।

রক্তমাংসের আড়ালে চাপা পড়ে তার অতৃপ্ত কোমল হৃদয়। নগরের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উপরে উঠতে গিয়ে একসময় ব্যক্তি নিজেকে হারিয়ে ফেলে কোনো অন্ধকার চোরাগলিতে, পুঁজি গ্রাস করে নেয় তার মানবিক স্বভাবটুকু। একটা সময় সে মন নামক কিছু একটা যে আছে, সেটা হয়তো ভুলেই যায়দিনে দিনে হয়ে ওঠে ভীষণ যান্ত্রিক। এরপর শুধু অর্থ-বিত্তের পিছনে ছোটা। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরঙ্গ মুহূর্তে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গম কালেও মানুষ পুঁজির কথাই ভাবে! ভাবে, কী করে আরো একধাপ উপরে ওঠা যায়।

আর শেষাবধি যেটুকু মানবিক সম্পর্ক অবশিষ্ট থাকে তাও বাহ্যিক, হাসতে হয় তাই হাসা; কাঁদতে হয় তাই কাঁদা! কঙ্কালের উপর শুধু একটা মানব-খোলস পরে ঘুরে বেড়ানো আর কি। মানে পুঁজিতন্ত্রই আপন ক্ষমতা বলে নির্ধারণ করে দেয়, ব্যক্তি কী করবে আর কী করবে না। এই পুঁজিকেন্দ্রিক নগরজীবনে পাশের বাসায় কী ঘটলো তার খবর কেউ রাখে না! এক বাসায় যখন শোকের মাতম, পাশের বাসায় তখন চলে মাস্তি। কারণ মহানগরে প্রতিষ্ঠান বড় ইনস্টিটিউশন বড় জনসভা বড় কিন্তু ব্যক্তি ছোটো মানুষ নগণ্য। পুঁজির চাকা ঘোরাতে গিয়ে বিকল হয়ে পড়ে মানব-চাকা, বাস-ট্রামের ইঞ্জিনের বিকট শব্দের নীচে চাপা পড়ে মনুষ্য হৃদয়ের অতৃপ্ত হাহাকার। এই হাহাকার ঘোচাতে মানুষের সামনে খোলা রাখা হয় কিছু কৃত্রিম উপায়পানশালায় যান নিজেকে হালকা করুন, দুঃখগুলো ছুড়ে ফেলুন নর্তকীর পায়ে। আর মস্তিষ্কে চাহিদারূপী স্বপ্ন তো আছেই। ফলে অতৃপ্ত হাহাকার আদৌ ঘোচে না। মানুষ দেহের পর দেহ পালটায় একটু প্রশান্তির প্রত্যাশায়, সেখানেও কাঙ্ক্ষিত তৃপ্তি অধরাই থাকে; মনের সঙ্গে মন মেলে না কখনো। শুধু দেহের সঙ্গে দেহটাই মেলে। অন্যদিকে একদল মানুষ এই পুঁজির তোড়েই তলিয়ে যায়, ভাসতে চেয়ে দেহের সর্বোচ্চ শক্তিটুকু ব্যয় করে; খড়কুটা আঁকড়ে ধরতে ধরতেই একসময় হারিয়ে যায় গতিময়তার অতল গহ্বরে।

এই উদ্ভট গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বিষাদের শহরের সব ছেড়ে পালাতে চায়, কিন্তু পারে না। এক অদৃশ্য পুঁজীয়-গতির সুতোয় সে আটকে যায় বার বার। তাই সে বাস্তবের মধ্যে থেকেও এক অদ্ভুত অবাস্তব ঘোরে প্রবেশ করে, আপনার মতো করে আপন পৃথিবী সাজায়। কিন্তু নগরের বিদঘুটে গতির টানে সে ঘোরেও ভাটা পড়ে, তবে রেশটা থেকেই যায়, যা তাকে বার বার টেনে নিয়ে যায় আমার আমিত্বের কাছে। যদিও সে আমিত্বের বা আত্মসত্তার নাগাল হয়তো মেলে না কোনো দিনই। বাকিটা ব্যক্তিগতর তথ্যচিত্র-নির্মাতা প্রমিত রায় এই মানুষদেরই একজন। তাকে ও বাকিটা ব্যক্তিগতকে ধরেই এগিয়ে যাবে এই আলোচনা, থাকবে আত্মানুসন্ধায়ী মানুষের স্বরূপ উদঘাটনের প্রচেষ্টা।

চেতনের মাঝে অবচেতনের এক অদ্ভুত খেল

বাকিটা ব্যক্তিগতর প্রমিত রায় তথ্যচিত্র-নির্মাতা। তিনি প্রেম নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে চান, মাঠে নেমে পড়েন ক্যামেরা নিয়ে। এ নিয়ে প্রমিত কথা বলেন কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তের ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে। তাতে মহানগরের নানা সমস্যা যেমন উঠে আসে, তেমন উঠে আসে প্রেম নিয়ে নানা মানুষের নানা মত। আর এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই তিনি এক অদ্ভুত অবাস্তব ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েন। এই ঘোরটা চলতে থাকে চলচ্চিত্রের প্রায় পুরোটা জুড়েই। প্রমিতের এই ঘোর অনেকটা অকস্মাৎ জগত-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো। মাঝে মাঝে অবশ্য অনেক মানুষেরই এ রকম হয়অস্থিরতা, হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আপন কল্পনার অদৃশ্য ভুবনে তারা ঢু মারে খানিকটা সময়ের জন্য।

এই ঘোরের মধ্যেই প্রমিতের দেখা হয় জ্যোতিষ তৃতীয় ভিগুসহ বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে। জ্যোতিষ ভিগুর সূত্র ধরেই প্রমিত পান প্রেমের গ্রাম মোহিনীর সন্ধান। প্রমিত সেখানে যান, থাকেনও কিছুটা সময়; দেখা পান সম্পার। তবে কিছুক্ষণ পর ঘোর ভেঙে গেলে বাধে বিপত্তি। হারিয়ে যায় প্রমিতের মোহিনী। তারপর আবার সেই বাস্তবতায় ফেরা। কিন্তু ঘোরটা লেগেই থাকে চোখে। তাই তিনি মোহিনী আর সম্পাকে খুঁজে ফেরেন। একপর্যায়ে সম্পার মতো দেখতে একটি মেয়েকে খুঁজেও পান। কিন্তু সেই সম্পা আর এই নগরের গলিতে খুঁজে পাওয়া মেয়েটায় যোজন যোজন ফারাক। একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়, এ ফারাক শুধু একই চেহারায় ভিন্ন দুই নারীর নয়, এ ফারাক মানুষের আপন সত্তার আকাক্সক্ষা ও বাস্তবতার, অপ্রাপ্তির, অপূর্ণতার, মেনে নিতে না পারার।

তবে হিসাব মেলাতে না পারার এই পরিস্থিতি কিন্তু নতুন নয়। সময়ে শুধু এর ধরন বদলেছে। ফরাসি বিপ্লব, রেনেসাঁ দিয়ে যে সভ্যতার শুরু তাকে অল্প দিনেই বিপন্ন করেছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু সেই ফারাক মেনে নিতে পারেনি অনেকেই। তাই সেই অস্থিরতা, বিবর্ণতা শিল্পীর তুলি ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ করেছিলো সেলুলয়েডকে। না বলতে পারা কষ্ট-বেদনা-ক্ষোভ ২০ শতকের প্রথমভাগে জার্মানিতে বেরিয়ে এসেছিলো অভিব্যক্তিবাদ (এক্সপ্রেশনিজম) নামে। যুদ্ধের ভয়ঙ্কর নির্মমতা পরবর্তী সময়ে এই ধারাকে আরো শক্তিশালী করেছিলো। তখনকার শিল্পী, সাহিত্যিক ও নির্মাতারা হয়তো প্রমিতের মতো আধুনিকতা, সভ্যতার নামে দুঃসহনীয় বাস্তবতা থেকে পালাতে চেয়েছিলেন অভিব্যক্তিবাদের হাত ধরে; হয়তো তারাও খেলতে চেয়েছিলেন তাদের দেখা মোহিনীর মোহময় মাঠে।

এই ২০ শতকের দ্বিতীয় দশকেই ফ্রান্সে জন্ম হয় আরেক ধারার, যার নাম পরাবাস্তববাদ (সুররিয়ালিজম)। এ ধারার উদ্ভবের কারণটাও ওই একই; যুদ্ধ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অস্থিরতা; বিশ্বযুদ্ধের কষাঘাতে ভেঙে চুরমার হওয়া স্বপ্ন। তাই এ ধারার শিল্পী, সাহিত্যিক ও নির্মাতারাও সোচ্চার হয়ে ওঠেন এই ঠুনকো সভ্যতার গলাবাজির বিরুদ্ধে। তারাও অস্থির, অস্থিতিশীল মানব মনের অবদমিত কামনা-বাসনাকে তুলে আনেন তাদের শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে। তাদের সৃষ্টিকর্মে স্থান পায় দৃশ্যমান বাস্তবের আড়ালে লুক্কায়িত অদৃশ্য বাস্তবতা, যা থাকে মনের অবচেতনে।

অভিব্যক্তিবাদ ও পরাবাস্তববাদ ধারার কাছাকাছি সময়ে লাতিন আমেরিকায়ও যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো অস্থিরতা, দারিদ্র, দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছিলো, ঠিক তখনই ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদু-বাস্তববাদ নামক আরেকটি ধারার সৃষ্টি হয়। যেখানে বাস্তব ঘটনা বা সমাজবাস্তবতাকে উপস্থাপন করা হয় অবাস্তব চরিত্রের সংমিশ্রণে; মানে, মানুষ চলমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে কল্পনা জগতে অবচেতনে তার নিজের মতো করে যে নিজস্ব বাস্তবতা নির্মাণ করে সেটা তুলে ধরা হয়। এর কাহিনি উপস্থাপনে কল্পনা আর সত্যের সংমিশ্রণ ছাড়াও রয়েছে আঁকাবাঁকা এবং গোলকধাঁধাময় কাহিনীক্রম : দক্ষকালপরিবর্তন; স্বপ্ন আর রূপকথার মিলিজুলি ব্যবহার; অভিব্যক্তিবাদী, কখনও বা পরাবাস্তববাদী বর্ণনা; চমক, এমনকী আকস্মিক শক্, বিভৎস আর ব্যাখাতীতের উপস্থিতি। এই সবগুলো ধারাতেই শিল্পী, সাহিত্যিক ও নির্মাতারা পারিপার্শ্বিক অস্থিরতা, বিদ্যমান কাঠামোকে মেনে নিতে না পেরে বিকল্প পথের সন্ধান করেছিলেন; যে পথ আত্মমুক্তির, আত্মানুসন্ধানের।

প্রমিত ও পুরো বাকিটা ব্যক্তিগত জুড়ে যে অস্থিরতা বিদ্যমান তার সঙ্গে একটা নিগূঢ় যোগসূত্র রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অস্থিরতারপুঁজি ও আধিপত্যের। এই আধিপত্যবাদী পণ্যায়িত বিশ্ব নিজের প্রয়োজনে শান্ত পৃথিবীকে যেমন অশান্ত রণপ্রান্তরে ঠেলে দিয়েছিলো, ঠিক তেমনই প্রতিনিয়ত অস্থির করে তোলে প্রমিতের মতো মহানগরের হাজারো নাগরিক জীবন। এই পুঁজির তাড়া খেয়ে হাজারো প্রমিত অবচেতন ঘোরে নিজেকে খুঁজে ফেরে, বাস্তবে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে হৃদগহনে একটা নিজস্ব পৃথিবী সাজায়। যেমন সাজিয়েছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পূর্ব ও পরবর্তী সময়ের জার্মান, ফরাসি ও লাতিন আমেরিকার নির্মাতা, শিল্পী ও কবি-সাহিত্যিকরা; অভিব্যক্তিবাদ, পরাবাস্তববাদ কিংবা জাদু-বাস্তববাদে। জার্মান-ফরাসি-লাতিন নির্মাতাদের মতো এই অস্থিরতাই হয়তো নির্মাতা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যকে টেনে নিয়ে গেছে বাকিটা ব্যক্তিগতর পথে, দাঁড় করিয়েছে মোহিনীর মোহময় সুবাতাসে।

মানুষ মানিয়ে নেয়, নিতে হয় (!)

প্রমিত প্রেম নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে একপর্যায়ে অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে অবাস্তব জগতে তলিয়ে যান। আর সেই জগতের সূচনা লগ্নেই দেখা হয় জ্যোতিষ তৃতীয় ভিগুর সঙ্গে, এক কথায় বললে ভিগুর হাত ধরেই প্রমিত সেই জগতে প্রবেশ করেন। ভিগু তাকে প্রেমের গ্রামের খোঁজ দেওয়ার কথা বলে বাড়িতে নিয়ে যান। শহরের অদূরে এক বস্তিতে দুই স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বাস করেন। আর সেখানেই ভিগুর দুই স্ত্রীর সঙ্গে প্রমিতের পরিচয়, যার মধ্যে প্রথম জনের বয়স ৪৫-এর কোঠায় আর দ্বিতীয় জন সবে ২০ পার করেছেন।

তাদের সঙ্গে প্রমিতের কথা হয় যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। লক্ষ করার বিষয় হলো, প্রমিত এখানেও প্রেম খোঁজেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে ভিগুর দ্বিতীয় স্ত্রী বলেন, দু-বউ তো কী হয়েছে? খেতে পরতে দিচ্ছে তো। এ কথার প্রতিবাদ করে প্রথম স্ত্রী বলেন, হুঁ, যখন গতরটা থাকবে না, তখন বুঝবি। গতরটা না থাকলে মানে যৌবন ফুরিয়ে গেলে ভিগুর কাছে দ্বিতীয় স্ত্রীর যে মূল্য থাকবে না সেটা প্রথম স্ত্রী বুঝতে পেরেছেন; তিনিও হয়তো একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছেন। বয়সের পার্থক্যে ব্যক্তির চিন্তায় যে তারতম্য ঘটে সেটা তার অভিজ্ঞতারই ফল। আর জীবনে যে যতো ঠেকেছে, সে ততোই শিখেছে। ভিগুর দ্বিতীয় স্ত্রী যেটা বলেছেন, হয়তো এটা তার অদূরদর্শিতা কিংবা তিনি জীবন-বাস্তবতাকে অতোটা কাছ থেকে দেখেননি। জীবন কিংবা প্রেম বলতে তিনি হয়তো দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকাটাই বোঝেন! জীবনের এই মৌলিক চাহিদাটুকুও হয়তো এর আগে পূরণ হতো না তার। তাই মৌলিক চাহিদা, মানে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই যার কাছে স্বপ্নের মতো, তার কাছে ভিগু তাকে কবে ছুড়ে ফেলে দেবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

আবার ভিগুর প্রথম স্ত্রী, যিনি জীবনের নির্মমতা হাড়ে হাড়ে টের পেলেও ভিগুকে ছেড়ে যাননি অথবা যেতে পারেননি। তিনি সবকিছু বোঝেন; জানেন ভিগুর সঙ্গে তার যে সম্পর্ক সেটা গতর মানে নিছক কামের। যে কামটা প্রত্যহ বৈধতা পায় প্রেমের নামে; হয়তো সে কারণেই শরীরের সঙ্গে শরীর বিনিময়টাকে তিনি প্রেম বলে মেনে নিয়েছেন! তার পরও তিনি ভিগুর সঙ্গেই আছেন, বয়ে বেড়াচ্ছেন সংসারের ঘানি। তাই কেনো ভিগুকে ছেড়ে যান নাএ প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিরুত্তর কেঁদে যান। যে কান্নার মানে হয়তো আলাদা করে বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। সমাজের নিম্নবিত্তরাও প্রথমে ভিগুর দ্বিতীয় স্ত্রীর মতো শোষণটা বোঝে না, স্রোতে গা ভাসিয়ে চলতে থাকে অবলীলায়; ভাবে এই তো বেশ আছি। দু-বেলা দু-মুঠো খেতে পারছি তো! যখন শিকলে পা আটকে যায়, তখন তাদের ভালো থাকার ঘোর ভাঙে। ভিগুর প্রথম বউয়ের মতো তারাও তখন শোষণটা বোঝে, তবে ততোক্ষণে বেরিয়ে আসার একটি পথও আর খোলা থাকে না।

আবার এই জ্যোতিষের কথার সূত্র ধরেই প্রেমের গ্রামের ঠিকানার খোঁজে প্রমিত যান মল্লিকা-অবনীশ দম্পত্তির কাছে। তাদের বাস কোনো পেঁচানো-গোচানো সঙ্কীর্ণ গলি রাস্তার বস্তিতে নয়, তারা থাকেন অভিজাত পল্লির বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। এক কথায় শিক্ষিত আধুনিক মধ্যবিত্তের সব বৈশিষ্ট্যই এই পরিবারে বিদ্যমান। কিন্তু ভিগুর দুই স্ত্রীর মতো মেনে বা মানিয়ে নেওয়ার দৃশ্য সেখানেও চোখে পড়ে। তবে মল্লিকা-অবনীশের প্রেমটা একটু অন্যরকম, তারা জেনে-বুঝেই সবকিছু মুখ বুজে মেনে নেন! তাদের কাছে যেকোনো মূল্যে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখাই বড়ো কথা, সবকিছু মেনে নিয়ে এক ছাদের নীচে মেকি হাসি হেসে আজীবন থেকে যাওয়াটাকেই তারা ভাবেন জীবন!

খাঁচার বিহঙ্গ খোঁজে আসমানি নীড়

নগর জীবনটাকে বইতে বইতে একসময় এই জীবনের কারাগারেই আটকে যায় মানুষ। একটা সময়ে এসে সেই মানুষই মহানগরের রুটিনমাফিক জীবনের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। প্রমিতও এই নগুরে সম্পর্কের মানে খুঁজতে গিয়ে সেই মানুষের খোঁজ পান; দেখেন তার চারপাশে প্রেমের নাম করে যে সম্পর্কগুলো টিকে আছে তার ভিত্তি ভীষণ নড়বড়ে, ঠুনকো। প্রমিত যে প্রেমের খোঁজে ভিগু ও তার দুই স্ত্রী কিংবা মল্লিকা-অবনীশের কাছে যান, গিয়ে দেখেন সেই প্রেম নেই সেখানেও; যা আছে তা প্রেমের মোড়কে অন্যকিছু। সেখানে প্রেম ধরা দেয় তিনভাবেকারো কাছে তা দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকা; কারো কাছে নিখাদ কাম। আবার কেউ ভাবে সবকিছু মেনে নিয়ে যেকোনো মূল্যে একসঙ্গে থাকামানে ভিতরে যা-ই থাক, বাহিরটা চাকচিক্যময়। এসব দেখে প্রমিত অস্থির হয়ে ওঠেন, প্রেম খোঁজার তৃষ্ণা বেড়ে যায়। সে কারণেই তিনি চারপাশে বেড়ে ওঠা মহানগরের পুঁজির দেয়াল, গতির কারাগার, বিলবোর্ড জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চাহিদার মোহময়তা ও বিচ্ছিন্নতার টান ভেঙে বেরিয়ে আসতে চান। গতির টানে হারিয়ে যাওয়া বেগতিক নিজস্ব পরিচয়টাকে আবারও তুলে আনতে চান।

সেজন্যই প্রমিত হয়তো মোহিনীর সন্ধান পেয়ে সেখানে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তবে নগরও তাকে ছাড়তে চায় না, আঁকড়ে ধরে অক্টোপাসের মতো। তার সন্দেহ জাগে, ভয় হয় যদি হারিয়ে যায় সব, নগরের বিত্ত, চাকচিক্য। তাই হয়তো মোহিনীতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে প্রমিতকে বলতে শোনা যায়, যতোই অ্যাবসার্ড লাগুক, আমার জেদ চেপে গেছে। আমাকে যেতেই হবে মোহিনী। এই জেদটা কি প্রমিতের নিছক জেদ? না, ঠুনকো সম্পর্কের খাঁচা ভেঙে মুক্ত আসমানের শুভ্রনীল দিগন্ত স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ? যে আকাঙ্ক্ষা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রমিত যখন হন্যে হয়ে প্রেমিকার খোঁজ করছেন, তখন চলচ্চিত্রের ১১ মিনিট দুই সেকেন্ডে মুক্ত আকাশে দুটি বিহঙ্গের স্বাধীন ওড়াউড়ি কিংবা যখন শহরের অস্থির গতিময়তা ভেদ করে প্রমিত উপরে তাকায়, তখন একটি শিশুর নির্ভাবনায় দোলনায় দোল খাওয়ার দৃশ্য (৩৯ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড) উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে।

নাগরিক প্রমিতের মতো প্রত্যেকেরই বুকের ভিতর হয়তো একটা মোহিনী থাকে। যেখানে সে খাঁচায় বন্দি জীবন ছেড়ে উড়াল দিতে চায়। মাঝে মাঝে নিজের অগোচরে মানুষ তার ভিতরে থাকা জাদুকরী মোহিনীতে যায়ও হয়তো; আবার হারিয়েও ফেলে নিজের অজান্তেই। তবুও সে নিত্য মোহিনীকে খোঁজে, খাঁচাটা ভেঙে ডানা মেলে উড়াল দেয় আসমানে। যদিও প্রায় মানুষকেই বাধ্য হয়ে জীবনের প্রয়োজনে দিনের শেষে পুরনো খাঁচাটায়ই ফিরতে হয়।

একজনের কাছে পরশ পাথর, অন্যের কাছে ছাই

ব্যক্তিভেদে সবকিছুর সংজ্ঞায়ন আলাদা, মূল্যায়নও সম্পূর্ণ ভিন্নসে কথা আগেই বলেছি। তাই একজনের কাছে যা পরশ পাথর অন্যের কাছে সেটা হয়তো ছাই। প্রমিত তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে প্রেম নিয়ে কথা বলেন অনেকের সঙ্গে। এক বৈষ্ণব প্রেমের ধারণা দিতে গিয়ে বলেন, নারায়ণ প্রেমই তো হলো রাধাকৃষ্ণের প্রেম, যে যেমন জানে। কিছুক্ষণ পরে এই বৈষ্ণবই বলেন, চৈতন্য মহাপ্রভু কী বললেনগদা নাই, শঙ্খ নাই, চক্র নাই, প্রেম অস্ত্র। ভালোবাসা, যে ভালোবাসাটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, উদ্দেশ্য ছাড়া। তার মানে প্রেমের মধ্য দিয়েই মিলবে ঈশ্বরের দেখা, মানুষকে ভালোবাসাই ঈশ্বর প্রেমের নামান্তর। তিনি এখানে ভালোবাসা ও প্রেম একই অর্থে ব্যবহার করেন।

তবে তার কথায় একটা জিনিসের ইঙ্গিত স্পষ্ট, তা হলো, নিঃস্বার্থ প্রেম। মানে সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ভালোবাসতে হয়। যদি প্রেমে দৈহিক দিক মানে কাম এসেও থাকে তা হবে গৌণ, আত্মাই থাকবে মুখ্য। আবার আরেক সাধককে এ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি প্রেমকে ইঙ্গিত করে বলেন, সংযম সাধনাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সাধনা। এখানেও দেহ নয়, আত্মাই মুখ্য হয়ে ওঠে। বৈষ্ণব ও সাধক পেরিয়ে প্রমিত যখন সাধারণ মানুষের কাছে যান প্রেমের সংজ্ঞা জানতে, তাদের একজন বলেন, সেক্স তো বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। আমি চাইলে একশো ২০ টাকা দিয়ে সোনাগাছি থেকে সেক্স কিনতে পারবো, কিন্তু প্রেমটা তো ওভাবে কেনা যাবে না। তার উত্তরটাও অনেকটা সাধকের মতোই। তিনিও প্রেমকে বিচার করতে চান কাম বা দেহের বাইরে দাঁড়িয়ে। আরো কয়েকজন সাধারণ মানুষ প্রায় একই উত্তর করেন। কিন্তু প্রমিতের বন্ধুর ভাষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, শরীর অবধি পৌঁছানোর ইচ্ছে ছাড়া, যাই হোক অ্যাট লিস্ট সেটাকে আমি প্রেম বলবো না। তিনি আরো বলেন, যারা প্লেটোনিক কথাটা ইউজ করে তারা আসলে একটা ...। একদম আমি সেটা দেখেছি, আমি খুব স্পষ্ট করে বলছি, কোনো এক্সেপশন নেই, এটা হচ্ছে একদম বাংলায় যাকে বলে ভণ্ডামি। একটা চালাকি, এটা একটা রাস্তা। তার মানে আত্মা নয়, এখানে দেহটাই মুখ্য। মানসিক আবেগ থাকতে পারে, কিন্তু প্রেমটা ঘটে দেহের মাঝে দেহের সঞ্চালনেই।

শহুরে-শিক্ষিত বাউল দর্শনে বিশ্বাসী লম্বা চুল-দাড়িওয়ালা এক যুবক প্রমিতের বন্ধুর মতো দেহকে প্রাধান্য দিলেও তার উদ্দেশ্য ভিন্ন, তিনি দেহসাধনার মধ্য দিয়ে পরমাত্মাকে পেতে চান। ১৪ মিনিট তিন সেকেন্ডে তিনি বলেন, আমার যেকোনো জিনিসে বডি ইজ ভেরি ইম্পরটেন্ট। আমার বডি ছাড়া কিছুই নেই। মানে দেহ ছাড়া কিছু নেই। তার মানে তিনি দেহটাকে এগিয়ে রাখেন ঠিকই কিন্তু সেটা নিছক কামের জন্য নয়। তিনি দেহসাধনার মধ্য দিয়ে আত্মিক উৎকর্ষ লাভ করার কথা বলেন। নিজের মধ্যে বস্তুকে ধারণ করে উত্থিত হতে চান ঊর্ধ্বপানে, সাধনার সর্বোচ্চ সোপানে। যেখানে গেলে তার দেখা মেলে আপনার মাঝে যে বিরাজ করে। তার এই দর্শনকে আরো একটু শক্তপোক্ত করতে তিনি গান ধরেন, দেহ জমিন রাখলি পতিত, আবাদ করে দেখলি না।

প্রপঞ্চ হিসেবে প্রেম শব্দটির বানানরীতি এক হলেও এর অর্থ কিন্তু একেকজন ধারণ করছে একেকভাবে। বৈষ্ণবের কাছে যে প্রেম নিঃস্বার্থ, সাধকের কাছে সে প্রেম সংযম। আবার সাধারণ মানুষ যখন বলছে, টাকা দিয়ে দেহ কেনা গেলেও প্রেম কেনা যায় না; প্রমিতের বন্ধু তখন বলছে দেহ অবধি না পৌঁছালে সেটা প্রেমই না। অন্যদিকে শহুরে বাউল দেহের সাধনা করেই নির্বাণ লাভের পথ খোঁজেন। তার মানে একজনের কাছে যেটা মহা-হাতিয়ার অন্যজনের কাছে সেটা মূল্যহীন, ঘুণে ধরা পাটকাঠি। যে জাদুর ছড়ির ছোঁয়ায় একজন যেতে চান সাধনার সর্বোচ্চ শিখরে, অন্যজন সেটাকে দেখেন ভণ্ডামি রূপে। ব্যাপারটা এমন, যে রাবণ একজনের কাছে অসুর, অন্যজনের কাছে সেই রাবণেই জাগে মহাসুর। এইসব প্রেমের সংজ্ঞায়নে প্রমিত সন্তুষ্ট নন, তাই হয়তো তিনি ছোটেন মোহিনীর পানে তার কাঙ্ক্ষিত প্রেমের সন্ধানে।

আবার প্রমিত ও অমিত মোহিনীতে গিয়ে যে প্রেম করেন সেখানেও আছে ভিন্নতা। মোহিনীতে গিয়ে অমিত-পলির মধ্যে যে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে সেখানে প্রেমের চেয়ে কামটাই বেশি। সুযোগ পেলেই অমিত পলিকে আড়ালে নিয়ে জড়িয়ে ধরেন, চুমু খান, এমনকি শারীরিক মিলনেও লিপ্ত হন; জৈবিক চাহিদাটাই সেখানে মুখ্য। অন্যদিকে প্রমিত-সম্পার প্রেম এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রমিত সম্পাকে নিয়ে খুনসুটিতে মাতেন; ঘুরে বেড়ান, অবাক বিস্ময়ে সম্পার চোখে চোখ রাখেন। নিজেকে যতোটা পারা যায় বিলীন করে দেন সম্পার ভিতরে। অনুভবের সাগরে ঢেউ তোলে মৃদুমন্দ দখিনা সমীরণ। তবে এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে না কাম, মনের চেয়ে অধিক গুরুত্ব পায় না শরীর।

আর অমিত ও প্রমিতের প্রেমের এ পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় মোহিনী থেকে ফিরে আসার পর; প্রমিত যখন আবার যেতে চান, যাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকেন। অমিত তখন বলেন, বাড়ি থেকে বিষয়টা মেনে নিচ্ছে না। একটা গ্রামের মেয়ে। প্রেমটা করলে তো বিয়েটা করতে হবে তাকেই। ... আমি যাবো না। ক্যামেরাটা অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নে। ওসব অদ্ভুতুড়ে জায়গায় আমি যাবো না। ছেড়ে দে আমাকে, আমাকে ছেড়ে দে। আবার যখন মোহিনী গ্রাম খুঁজে না পেয়ে প্রমিত পাগলের মতো এখানে সেখানে ছুটে বেড়ান, তখনো অমিত অনেকটা ভাবলেশহীন; যদিও কিছুটা হতাশভাব তার নাকে মুখে ফুটে ওঠে, তবে সেটা তেমন কিছু নয়; হয়তো সেটা পথের ক্লান্তির। এখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, তবে প্রেম কীশরীরের কাছে শরীর নাকি মনের কাছে মন? এক কথায় হয়তো এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটুকু হলফ করে বলা যায়, প্রেমের একপর্যায়ে মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষকে দেহ অবধি নিয়ে যায় ঠিকই; তবে নিছক শরীরের চাহিদার চেয়ে প্রেম ঢের কিছু।

তবে আরো একটা কথা থেকেই যায়, যে প্রমিত অন্যরকম প্রেমের খোঁজে মোহিনীতে যান; সেই অন্যরকম প্রেমটাও কি শেষ পর্যন্ত অন্যরকম থাকে? যদি অন্যরকমই হবে তবে কেনো প্রমিতকে মোহিনী থেকে ফেরার পথে সম্পাকে বলে আসতে হয়, রাজু থেকে সাবধানে থেকো? তার মানে পুরোটা সময় ভিন্ন কিছু দেখিয়ে এসে নির্মাতা শেষ পর্যন্ত আর শেষরক্ষা করতে পারলেন না! অসাধারণ করতে গিয়েই হয়তো নিজের অজান্তেই আটকে যান গতানুগতিক ফ্রেমে কিংবা শেষে এসে অদক্ষতার পরিচয় দেন। ফলে উতরে গিয়েও প্রদীপ্তের আর উতরানো হয় না!

মানুষ আছে বলেই জগৎ আছে

আমি আছি বলেই জগত আছে। আমি শুনি বলেই সঙ্গীত মধুর হয়, আমি দেখে পরিতৃপ্ত হই বলে, কাননে ফুল ফোটে। আমি না থাকলে কোথায় থাকতো তোমার জগত, কি করে বিকশিত হতো সঙ্গীতের মাধুর্য, কি কারণে ফুটতো ফুল। সমস্ত জগতের সার পদার্থ আমি। কথাগুলো আহমদ ছফার মরণ বিলাস উপন্যাসের। শুনে একটু খটকা লাগতে পারে। ভাবতে পারেন, তবে আমি না থাকলে কি আর জগৎ থাকবে না! সব শেষ হয়ে যাবে? উত্তরে যদি বলি, হ্যাঁ, থাকবে না। হয়তো আপনি প্রত্যুত্তরে বলবেন, আমি মরে যাওয়ার পরও জগৎ থাকবে শুধু আমি থাকবো না। সেটাও হয়তো একদিক থেকে ঠিক। কারণ আমাদের গতানুগতিক ভাবনায় মানুষ চলে যায় ঠিকই, কালের সাক্ষী হয়ে হাজার মানুষের পদচিহ্ন বয়ে চিরন্তন রূপে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে জগৎ। মানুষ না থাকলে জগতের কী আসে যায়, জগৎ থাকবেই।

এবার একটু উলটো করে ভাবুন। যদি আপনি একক ব্যক্তির দিকে তাকান, তবে দেখবেন একজন মানুষ শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার জগতও শেষ হয়ে যায়। যদি প্রশ্ন করেন কীভাবে, উত্তরটাও খুব সহজ। আপনার কাছে জগতের অর্থ যা, অন্যের কাছে হয়তো তা ভিন্ন, কখনো বিপরীত। আপনি যেটাকে পাপ বলেন, অন্যজনের কাছে সেটা হয়তো চরম পুণ্যের। আপনি যে ফুল দেখে মুখ ফিরিয়ে নেন, অন্যজন হয়তো নয়ন ভরে সে ফুলের সৌন্দর্য চরম তৃষ্ণা নিয়ে পান করে। তার মানে প্রত্যেক মানুষের আলাদা একটা জগৎ আছে। বাহ্যিক দিক থেকে আমরা একই আকাশের নীচে বেড়ে উঠলেও, একই হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিলেও প্রত্যেকে আলাদা আলাদা জগতকে ধারণ করি; নিজের মতো করে সারাজীবন সে জগতকে বয়ে বেড়াই নিজের মধ্যে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে ছফার ওই কথা তো টিকেই যায়। বাকিটা ব্যক্তিগতও আমাদের সামনে হাজির হয় একই বাস্তবতা নিয়ে। প্রমিত প্রেম নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে যেমন নিজের স্বপ্নের সন্ধান করেন, যাকে আখ্যায়িত করেন প্রেম কিংবা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় বলে; যেটা ব্যক্তির নিজের মধ্যে বিদ্যমান আলাদা জগতের ইঙ্গিত করে। ঠিক তেমনই তার মাধ্যমে আমরা দেখি অভিন্ন জগৎ-এ বসবাসকারী কিছু ভিন্ন জগৎ বহনকারী মানুষকে, যারা প্রমিতের মতো সদা ব্যস্ত আপনার আপন মানে ব্যক্তিগত জগৎ গোছাতে।

এ তো গেলো একক ব্যক্তির কথা। এবার যদি ব্যক্তিকে সামষ্টিকভাবে দেখা যায়, তাহলে এই ব্যক্তি এককের সমষ্টি নিয়েই কিন্তু বাহ্যিক জগৎ। সবার ভিন্ন ভিন্ন জগৎ মিলেই কিন্তু একক দৃশ্যমান অভিন্ন জগৎ গড়ে ওঠে। মজাটা জমে এই অভিন্নতার মধ্যে ভিন্নতায়। কিন্তু এই একক ব্যক্তিরা যদি শেষ হয়ে যায়, তবে আর জগৎ থাকে কোথায়? আর যদি বাহ্যিকভাবে থেকেও থাকে, সে জগৎ মূল্যহীন নিশ্চয়। কারণ মানুষ স্রষ্টাকে ডাকে বলেই একই সঙ্গে ঈশ্বর-আল্লাহ-ভগবান নামে কারো অস্তিত্ব টিকে থাকে। মানুষ পূজার নৈবেদ্য সাজায় বলেই মন্দিরে কিংবা তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলে। মানুষ ভোরের আলোয় মুগ্ধ হয় বলেই প্রতিদিন অপূর্ব বিমুগ্ধতা নিয়ে ভোর আসে। তাই মানুষের জন্যই জগৎ, জগতের জন্য মানুষ নয়। এদিক দিয়ে মানুষ দাবি করতেই পারে, করাটা যৌক্তিকও যে, আমি আছি বলেই জগৎ আছে।

আর এই ব্যক্তি-মানুষ পৃথিবীতে টিকে থাকে তার দৈহিক অস্তিত্ব দিয়ে। এখানেও প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি দৈহিক অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়? এর উত্তর নিয়েও হয়তো বিতর্ক আছে। তবে সব বিতর্কের শেষে এটা হলফ করে বলা যায়, যে মারা যায় তার কাছে আপন অস্তিত্ব অবশ্যই শেষ হয়ে যায়। মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে জগৎ কী করলো না করলো, তাতে তো তার কিছু আসে যায় না। দৈহিক সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তারও পরিসমাপ্তি ঘটে। তাই বাকিটা ব্যক্তিগততে প্রমিতের প্রেমিকার খোঁজ, উদগ্রীব বাসনায় মোহিনীতে ছোটা, সেখানে গিয়ে সম্পার সঙ্গে প্রেম; এসব কিছুর পিছনে কারণ একটাইআপনার জগতকে আপন হাতে গড়ে নেওয়া। কারণ ব্যক্তি হারিয়ে গেলে তার জগতও তো হারিয়ে যাবে। তাই শুধু প্রমিত নয়, সব মানুষই এমন করে ছোটে নিজ জগতের প্রয়োজনে।

পরলোকে বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী যে-ই হোক না কেনো, মানুষ জানে তার সমাপ্তি মানেই জগতের সমাপ্তি। ঠিক লালনের শুনি মরিলে পাবো বেহেস্তখানা/ তাই শুনে আর মন মানে না/ বাকির আশায় নগদ পাওনা/ কে ছাড়ে এ ভুবনেএই কথার মতো। বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে বাকিটা ব্যক্তিগতর যখন ১৪ মিনিট তিন সেকেন্ডে প্রমিত রায়ের প্রেম বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে একজন বলেন, আমার যেকোনো জিনিসে বডি ইজ ভেরি ইম্পরটেন্ট। আমার বডি ছাড়া কিছুই নেই। মানে দেহ ছাড়া কিছু নেই। তার মানে আপনি যদি প্রেমও করতে যান সেখানেও দরকার দেহের।

হয়তো অনেকেই বলবেন, প্রেম হলো আত্মিক বিষয়, এতে আত্মার টানে আত্মা ছুটে আসে। মানলাম, যদি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়, দেহ ছাড়া আপনার আত্মা কোথায় থাকে? এর অস্তিত্বইবা কী? তার উত্তরটা জানা নেই। হয়তো কোনো সদুত্তর পাওয়া সম্ভবও না। তবে যদি আপনি আত্মায় বিশ্বাসীও হন, তবে আপনাকে এটুকু স্বীকার করতেই হবে, দেহই আপনার অস্তিত্বের জানান দেয়। তবে এটা ঠিক যে দেহ ও আত্মা মিলেমিশে একাকার, তাই দুটোকে আলাদা ভাবে পোস্টমর্টেম করতে গেলে মানুষই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় স্বীয় সারসত্তা থেকে। কিন্তু বলতেই হয়, দেহই যেহেতু আপনার বাহ্যিক অস্তিত্বের জানান দেয়, তাই দেহ আছে বলেই আপনি আছেন, আর আপনি আছেন বলে আছে জগৎ।

পথের মাঝেই পথ হারিয়ে

আবার খুঁজে ফেরা

যে পথের মাঝে আমরা পথ খুঁজে পাই, সে পথের মাঝেই তা হারিয়ে ফেলি নিজের অজান্তেই। পাওয়ার সময়টুকু এতো সংক্ষিপ্ত যে, চোখের পলকেই তা হারিয়ে যায়হারানোর আক্ষেপটুকুই চিরন্তন হয়ে থাকে। প্রমিতের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটে। তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি ঘোরে ডুবে গিয়ে যে জগতের সন্ধান পান, তা আবার সেই পথের মাঝেই হারিয়ে ফেলেন, যদিও চলচ্চিত্রে এই ঘোরটা চলতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। এই ঘোরেই প্রেমের গ্রাম মোহিনীর সন্ধান মেলে, সে কথা আগেই বলেছি। আর ঘোর ভাঙলে সে মোহিনীও হারিয়ে যায়। প্রমিত যে পথে গিয়ে মোহিনী, সম্পা, ঠাম্মা, ভবেন দাকে খুঁজে পেয়েছিলেন, সে পথে হন্যে হয়ে খুঁজেও আর তাদের দেখা মেলে না।

তবুও প্রমিত খুঁজে যান, হারানো সম্পাকে খুঁজে পেতে আবার পথকেই করেন অবলম্বন। নগরীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা ও গতির দেয়াল ভেদ করে আবারো ফিরতে চান সেই মোহিনীতে। অর্থ-বিত্ত-বৈভব নয়, শুধু মোহিনীর মোহে; উভয় ক্ষেত্রেই যদিও মোহ থাকে, তবে দুটোই ভিন্ন ধরনের। একটা মহানাগরিক লালসা-লোভ ও অন্তঃসারশূন্য ভালো থাকার মোহ। যার পিছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ তার শেষ মানবিক অনুভূতিটুকুও হারিয়ে ফেলে। মেকি হাসি হাসতে হাসতে কখন জানি আসল হাসিটাই মিইয়ে যায়। অবকাশ হয় না কাউকে নিয়ে ভাবার, এমনকি নিজেকে নিয়েও নয়। আর অন্যটা হলো নিজেকে নিয়ে ভাবা, নিজের কাঙ্ক্ষিত জগতে ফিরে আসা। সেজন্যই হয়তো প্রমিত মোহিনীকে হারিয়ে ফেলার পরও সেখানে যেতে চান সব ছেড়ে। আপনা আপনিই বলে ওঠেন, আমি আবার যাবো, ... আর ডকুমেন্টারি বানাতে যাবো না। মোহিনীতেই থেকে যাবো। সম্পা, পলি, ভবেন দা, ঠাম্মা এদের সঙ্গে। তাই ছবিটা এখানেই শেষ করছি। আশা করি আপনারা ছবিটা দেখবেন, তবে আমাকে আর দেখতে পাবেন না।

আর প্রমিতের মতো এই মোহিনীর পথ একটা সময় এসে মহানগরের অনেক নাগরিককেই টানে হয়তো, কিন্তু মানুষ বিত্ত-বৈভব ও গতির মোহের অদৃশ্য মায়াজাল ছিঁড়ে বেরুতে পারে না। তখন তারাও হয়তো প্রমিতের মতো হারানো পথের মাঝেই পথ খুঁজে ফেরে।

মোহিনীতেও আছে সহনীয় দুঃখ

মানুষের কল্পনার জগৎ গড়ে ওঠে বাস্তবের ওপর ভিত্তি করে। তবে সে জগৎ ভিন্ন, কারণ মানুষ বাস্তবতায় যেখানে আটকে যায় সেখানেই সে নেয় কল্পনার আশ্রয়। অবাস্তবকে আপন কল্পনায় বাস্তব রূপ দেয় নিজের মতো করে। সে কালো কাককে হয়তো ইচ্ছে মতো সবুজ বানায় কিংবা চড়ুইয়ের গায়ে মেখে দেয় দোয়েলের রঙ; অথবা দোয়েলের শিসটা তুলে দেয় কোকিলের চঞ্চুতে, এই আর কি!

প্রমিত ঘোরের মধ্যে যে মোহিনী গ্রামে যান, সেটা কি বাস্তবের গ্রাম থেকে ভিন্ন কিছু? উত্তরটা হ্যাঁ-ই হবে! কারণ প্রমিত যে মোহিনীর খোঁজ ঘোরের মধ্যে পান, সেটা দেখতে হয়তো বাস্তবের গ্রামের মতোই, তবে বাস্তব নয়। এই মোহিনী নিজের মতো করে প্রমিতের কল্পনায় ঢেলে সাজানো। নির্মাতা প্রদীপ্ত কাঙ্ক্ষিত, এক কথায় বললে প্রমিতের অনুগত মোহিনীকেই দেখিয়েছেন বাকিটা ব্যক্তিগততে। প্রমিত যা যা যেভাবে চেয়েছেন মোহিনীতেও তা ঠিক সেভাবেই রয়েছে।

মোহিনীতেও আছে তাঁতি, মাঝি, শিক্ষক, ম্যারেজ রেজিস্ট্রার, ভ্যান চালক ভবেন, ঠাম্মা, সম্পা, পলিসহ নানা পেশার নানা লোক। সেখানেও নানা সমস্যা, সঙ্কট, সুখ-দুঃখ আছে। আছে গ্রামীণ চিরায়ত উৎসব দোল, ঝুলন, পূজা-পার্বণ, আছে বুলানগান কিংবা হাপু (হাপু হলো একধরনের কমেডি ধাঁচের খেলা। যিনি হাপু দেখান, তিনি একটা বিশেষ ভঙ্গিতে লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করতে করতে নানাধরনের হাস্য-রসাত্মক কথা গানের সুরে বলেন ও ব্যঙ্গাত্মক শব্দ করেন)। প্রমিত মোহিনীতে যান অন্তঃসারশূন্য নগর জীবনটাকে ঝেড়ে ফেলে আপন সারসত্তার খোঁজে, একটু পূর্ণতা পাওয়ার মোহে। তবে সেখানেও আছে অপূর্ণতার সুর, যা পূর্ণতা পায়নি কখনো; পাবেও না হয়তো কোনোদিন। এজন্যই মোহিনীর ম্যারেজ রেজিস্ট্রার কিছুটা ম্লানবদনেই বলেন, প্রবল ইচ্ছে ছিলো যে আমি অভিনেতা হবো, নাটক করবো। তার অভিনেতা হওয়া হয়নি। কারণ জীবন ও জীবিকার তাগিদ। কিন্তু এ নিয়ে তার মধ্যে কোনো অতৃপ্তি কিংবা হতাশা নেই। ব্যাপারটা এমন, হলে হয়তো ভালো হতো কিন্তু না হলে ক্ষতি নেই। আবার যিনি তাঁতি, তিনিও একসময় যাত্রায় অভিনয় করতেন; সেটা ছেড়ে তাকে আবারও তাঁত বোনায় ফিরতে হয় ওই জীবিকার প্রয়োজনেই।

বিপরীতে হাপু দেখান যিনি, তিনি কিন্তু বাপ-দাদার পেশা এখনো আঁকড়ে আছেন শুধু ভালোবাসা থেকেই। হাপু দেখাতে গিয়ে লাঠির আঘাত পিঠে লাগে, চির ধরে যায়। তার পরও তিনি হাপু দেখান, কারণ অন্যকে মজা দিয়ে তিনিও মজা পান। আবার এই মোহিনীতে স্বপ্নও বাসা বাঁধে পাখির ডানায়। একজন কৃষক যার ফসলের মাঠে পোকা ধরেছে, চাষবাসের অবস্থা ভালো না। তার পরও তিনি তার স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ঘোরাফেরা, একটা বাড়ি করা। আস্তে আস্তে দেখি এই চাষ থেকে হয় কি না। তার মানে তিনিও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন।

মোহিনীতে অভাব আছে সেটা ঠিক, তবে গতিময় মহানগরের উদ্ভট অমানবিক চাহিদা নেই। মানে মানুষের প্রয়োজন আছে, তবে প্রয়োজন অতিক্রান্ত নিষ্প্রয়োজনীয় বিদগ্ধ কামনা-বাসনা, উগ্র-উন্মাদ মোহবৃত্তি নেই। সেই মোহবৃত্তি নেই বলেই হয়তো মোহিনীর মানুষ নির্দ্বিধায় বলতে পারে, আমরা সবাই প্রেম করি। আমরা সবসময় প্রেম করি। প্রেম না করে আমরা থাকতে পারি না। প্রেম না করলে আমরা বাঁচতে পারবো না। ... গত বছর অতি ফলন, এ বছর কম ফলন, দু-বেলা দু-মুঠো পেট ভরে খেতে পাইনাকো; তবুও আমরা প্রেম করি, প্রেম আমাদের করতেই হবে। তার মানে তাদের যাপিত জীবনে অভাব আছে, কিন্তু অভাবটাকে তারা মেনে নিয়েছে জীবনের অংশ হিসেবেই; তা কখনো উদ্ভট চাহিদায় রূপ নেয়নি। সে কারণেই হয়তো তারা হাঁসের পালকের পানির মতো অভাব ঝেড়ে ফেলে মেতে ওঠে মিলনের উল্লাসে। নগরীর অর্থ-বিত্ত-মর্যাদা মাতাল নাগরিকের মতো তারা গতির অস্থিরতায় গা ভাসায় না।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রমিত মোহিনীতে যে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি কিংবা সত্তার খোঁজে ছোটেন; সেটা কি সেখানেও মেলে? আর মিললেও কি তাকে ধরে রাখা যায় নির্বিবাদে, নিরাপদে? উত্তরটা হয়তো না। কারণ নিরাপদে থাকলে যে স্বস্তি আর স্বস্তি থাকে না, যে ক্ষণিকের তাকে চিরসুতোর বাঁধনে বাঁধতে গেলে সে তার মহিমাই খুইয়ে বসে। প্রমিতের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সে যখন সম্পাকে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের চেহারাটা দেখতে শুরু করে কাঙ্ক্ষিত চোখের দর্পণে, তখনই তাকে নিয়ে শুরু হয় কাড়াকাড়ি। রাজু নামের একজন এসে প্রমিতকে বলে, আপনি সম্পাকে ছেড়ে দিন না, আমি ওকে ভালোবাসি। তার মানে স্বস্তির কোথাও স্বস্তি নেই, এক মুহূর্তের জন্য তাকে পেলেও সদা ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়; কখন যে আবার হারিয়ে যায়।

সব শেষ হয়ে যায়, শুধু অপেক্ষাই থাকে

স্যামুয়েল ব্যাকেটের ওয়েটিং ফর গডোর গডোর জন্য অপেক্ষার কাহিনি হয়তো অনেকখানি পুরনো হতে বসেছে। তবে গডোর জন্য যে অপেক্ষা তা কিন্তু চিরন্তন। বাকিটা ব্যক্তিগতর শুরু কিংবা শেষ এই গডোরূপী মোহিনীর অপেক্ষা দিয়েই। যেখানে গেলে মানুষ মুক্তি পায়অস্থিরতা, নগরের উদ্ভট গতিময়তার করাল গ্রাস থেকে। প্রমিত অনেক খোঁজাখুঁজির পর মোহিনীতে যাওয়ার রাস্তার সন্ধান পান, নাজিরপুরে নেমে মোহিনীতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভ্যান নিয়ে আসেন মোহিনীর পথপ্রদর্শক ভবেন। 

ভ্যানে মোহিনীতে যাওয়ার পথে প্রমিত ভবেনকে প্রশ্ন করেন, আপনি কী করে জানলেন বলুন তো আমরা আসবো? ভবেনের উত্তর, অনেকক্ষণ থেকে দেখছি যে আপনারা ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কোথাও যাচ্ছেন না। ... তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে আপনারা মোহিনীতে যাবেন। খুব অল্প লোকই ওখানে যায়। আর যারা যায়, ওই রকমই অপেক্ষা করে। আর যারা অপেক্ষা করে তারাই মোহিনীতে পৌঁছুতে পারে। ঠিক তাই, অপেক্ষা ছাড়া কেউই পৌঁছতে পারে না কাক্সিক্ষত স্বস্তির রাজ্যে।

একটু প্রশান্তির জন্য মানুষকে যুগের পর যুগ অপেক্ষা করতে হয়, বুদ্ধের মতো ধ্যানে মগ্ন হতে হয় অশ্বত্থ তলায়, নির্বাণ লাভের প্রত্যাশায়। তবে কাঙ্ক্ষিত নির্বাণ মেলে কি? হয়তো মেলে না কখনোই। তবুও মানুষ ছোটে, হাতের নাগালে পেতে আপন অস্তিত্বের খোঁজ। কিন্তু গডোরূপী প্রশান্তি থাকে অধরাই। তবু মানুষ অপেক্ষা করে প্রমিতের মতো, অপেক্ষাই করতে চায়; অপেক্ষা করার মাঝে আছে এক অদ্ভুত বিপন্ন নেশা। ঠিক প্রমিতের মতোই তারা আবারও যেতে চায় মোহিনীতে।

প্রমিতের মোহিনী কিন্তু নিছক মোহিনী নয়। সব মানুষই তার মতো করে আপন মোহিনীকে ধারণ করে বক্ষ গহনে লুক্কায়িত অদৃশ্য আত্মায়, হয়তো ভিন্ন কোনো রূপে, ভিন্ন কোনো নামে। পেয়েও হারানোর পর প্রমিতের মতো সবশেষে হয়তো সবাই-ই বলে, আমি আবার যাবো। গতবার আমরা অপেক্ষা না করে নিজেরাই চলে গেছিলাম, সেই জন্যই মোহিনী খুঁজে পাইনি। এবার অপেক্ষা করবো। সব মানুষই এভাবে অপেক্ষা করে তাদের কাঙ্ক্ষিত গডো কিংবা মোহিনীর জন্য, হয়তো পায় না কখনোই, হতাশা ভিড় করে। সব শেষ হয়ে যায়, ফুরিয়ে যায়, তবুও ওই অপেক্ষাই থাকে।

স্বপ্নের কাছে যাওয়ার অবিরত চেষ্টা

তথ্যচিত্র-নির্মাতা প্রমিত রায়ের স্বগতোক্তির মধ্য দিয়ে শুরু বাকিটা ব্যক্তিগতর। তিনি প্রেম নিয়ে তথ্যচিত্র বানাবেন বলে ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। একপর্যায়ে প্রমিত যেমন ঘোরে ঢুকে পড়েন, ঠিক তেমনই নির্মাতা প্রদীপ্তও দর্শকদের ঘোরের মধ্যে ফেলেন তার নির্মাণশৈলী দিয়ে। কাহিনিচিত্র হলেও বাকিটা ব্যক্তিগতর নির্মাণ ঢঙ অনেকটা তথ্যচিত্রের মতোই। কখনো ক্যামেরা কাঁপছে, এদিক ওদিক বেঁকে যাচ্ছে, কখনো আবার কাঁপতে কাঁপতেই প্যান করছে অবলীলায়। চলচ্চিত্র জুড়েই ক্যামেরার এমন চালনশৈলী ধরে রেখেছেন প্রদীপ্ত। ফলে ফিকশনটাও ভালো করে খেয়াল না করলে প্রামাণ্যচিত্রের মতোই মনে হয়। ঘোর লাগে দর্শক-চোখে, তৈরি হয় নতুন বিভ্রম; পর্দায় চলচ্চিত্রের কাহিনি যতোটা সামনে গড়ায়, বিভ্রমও বাড়ে ততোটাই। একসময় হয়তো দর্শক ভুলেই যায়, নির্মাতা প্রদীপ্ত তার চলচ্চিত্রে আরেক নির্মাতার গল্প বলেছেন, তার ক্যামেরার চোখ দিয়েই পর্দায় তুলে এনেছেন নিজের কাঙ্ক্ষিত ইমেজ কিংবা গল্প। আর এই বিভ্রম একপর্যায়ে দর্শককে এমন মাত্রায় ছুঁয়ে যায় যে, সেও ছুটতে থাকে অমিতের (প্রমিতের ক্যামেরা-সঞ্চালক) সঙ্গে কলকাতার রাস্তায়, ভিগুর বাড়ির এলোমেলো গলি কিংবা মোহিনীতে। এখানে ক্যামেরা শুধু অভিনয়শিল্পীদের ধারণ করে না, ঘটনার অনুঘটক হয়ে নিজেই হয়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র চরিত্র। যেমনটা হতো ফ্রান্সের সিনেমা ভেরিতে ধারায়। বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বাস্তব অতিরিক্ত কোন সমাজ-সত্যের প্রকাশ ঘটাতো এই ধারার ক্যামেরা চালন-পদ্ধতি দিয়ে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রদীপ্ত পুরো চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন ক্যানন সেভেন ডি (এটি একটি সেমি প্রফেশনাল ক্যামেরা, ১৮ মেগাপিক্সেলের এ ক্যামেরাটিতে ১০৮০পি এইচ ডি ফরম্যাটে সেকেন্ডে ২৪, ২৫ কিংবা ৩০ ফ্রেমের ভিত্তিতে ভিডিও করা যায়) মডেলের ক্যামেরা ব্যবহার করে। যা আরো একবার প্রমাণ করলো প্রযুক্তি বড়ো কথা নয়, রক্তে সৃষ্টি-নেশা আর চোখে অবারিত স্বপ্ন থাকলে মামুলি কিছু দিয়েও হতে পারে বৃহতের যাত্রা, একবিন্দু শিশির কণায়-ই উঠতে পারে সপ্ত-সমুদ্রের ঢেউ; শিল্পীর সৃষ্টির প্রয়াস থাকে মস্তিষ্কে, প্রযুক্তির অসাড় যান্ত্রিক কারাগারে নয়।

এই বাকিটা ব্যক্তিগতর মাধ্যমেই ছোটো পর্দায় কাজ করা (এর আগে তিনি সোপ অপেরা ও বিজ্ঞাপন নির্মাণ করতেন) প্রদীপ্ত নিজ-সৃজনের ছায়া ফেলেন রুপালি পর্দায়আত্মপ্রকাশ করেন চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে। আর তিনি প্রথমেই করেছেন বাজিমাত; জিতে নিয়েছেন ভারতের ৬১তম চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র শাখার পুরস্কারটি। তবে এ সাফল্যকে দু-হাতের মুঠোয় পুরতে প্রদীপ্তকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। অধিকাংশ সাফল্যের পিছনে যেমন লুকিয়ে থাকে একমুঠো হতাশা কিংবা বাধা-বিপত্তির গল্প, এর পিছনেও তেমন একটা গল্প আছে। প্রদীপ্ত বাকিটা ব্যক্তিগতর কাজ শুরু করেন ভারতীয় বাংলা চ্যানেল তারা টিভির প্রযোজনায়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মাঝ পথে এসে তারা টিভি টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয়; বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণ কাজ। তবে প্রদীপ্ত দমবার পাত্র নন, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দ্বারস্থ হন ট্রাইপড এন্টারটেইনমেন্ট নামে প্রযোজনা সংস্থার; তারা টাকা দিতে রাজি হয়। এবং শেষ পর্যন্ত তাদের প্রযোজনায় শেষ হয় নির্মাণ কাজ। তবে এখানেই শেষ নয়, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও নানা জটিলতার কারণে চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে সময় লাগে আরো তিন বছর। তার এই নির্মাণ কাহিনি কিছুটা হলেও মিলে যায় সত্যজিতের পথের পাঁচালী নির্মাণের সঙ্গে; যে চলচ্চিত্র সত্যজিতকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দিয়েছিলো, টাকার অভাবেই সেই চলচ্চিত্রের কাজ বন্ধ ছিলো দীর্ঘদিন।

শেষটা তো এমন হতেই পারে!

জীবন মানেই তো যন্ত্রণা/ বেঁচে থাকতে বোধহয় শেষ হবে না। বাউল সালামের মতো জগৎ বাস্তবতাও হয়তো প্রতিক্ষণ এ কথাই বলে। যে যন্ত্রণা নিয়ে মানুষ জন্মায়, সে যন্ত্রণার ভার বইতে বইতেই তার অবসান ঘটে; কখনো নির্বাণ বা মুক্তি মেলে না। কিন্তু মুক্তির প্রচেষ্টা কি থেমে থাকে? মানুষ মুক্তি খোঁজে আমৃত্যু; সে ছুটে বেড়ায় নানা মত-পথে। কেউ মক্কা, কাশী কিংবা গয়ায় যায়। নির্দিষ্ট কোনো কাঠামো-মত-পথে হয়তো মানুষের এই মুক্তি সম্ভবও নয়। তার পরও মানুষ মুক্তি খুঁজে ফেরে। সেটা কখনো তার নিজের মধ্যে, ঘোরের মধ্যে। প্রমিতও হয়তো তাই খুঁজেছে, ঘোরটা ভাঙতেই আবার একা হয়ে পড়েছে। এই একা হয়ে পড়ার সময় থেকেই আবার মানুষ নতুন কোনো মত-পথের সন্ধান করে। এই সন্ধান করাটা অনেক সময় দৃশ্যমান হয়, আবার কখনো হয় না। আর এই অদৃশ্যমানতাই বোধ হয় নির্মাতা প্রদীপ্তের কাছে ব্যক্তিগত হয়ে থাকে। 

 

লেখক : নাজমুল রানা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

ranamcj.ru@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. ঘোষ, বিনয় (১৯৭৩ : ৪৯); মেট্রোপলিটন মন-মধ্যবিত্ত-বিদ্রোহ; ওরিয়েন্ট লংম্যান লিমিটেড, কলকাতা।

২. প্রাগুক্ত; ঘোষ, বিনয় ( ১৯৭৩ : ৫৩)।

৩. মুখোপাধ্যায়, সৌগত (২০০০ : ২২০); ম্যাজিক রিয়ালিজম; ধ্রুবপদ বুদ্ধিজীবীর নোট বই; সম্পাদনা : সুধীর চক্রবর্তী; নবযুগ, ঢাকা।

৪. ছফা, আহমদ ( ২০০৪ : ৬২); মরণ বিলাস; খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা।

৫. আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৮৬); চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্য প্রকাশ, ঢাকা।

৬. http://kothatobolarjoûei.blogspot.com/2012/02/blog-post_3019.html; retrieved on 20.08.2015

৭. http://goo.gl/R0VpH3; retrieved on29.11.2015

৮. http://goo.gl/HQYtdU; retrieved on29.11.2015

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন