লেসটার জেমস পেরিস; ভাব-ভাষান্তর : তাকিয়া সুলতানা ও জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত ২৮ জুলাই ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বিদেশির চোখে ভারতীয় চলচ্চিত্র
লেসটার জেমস পেরিস; ভাব-ভাষান্তর : তাকিয়া সুলতানা ও জাহাঙ্গীর আলম

‘একজন বিদেশির চোখে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্তসার’ বিষয়ে যখন আমাকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো, তখন আমার মনে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিলো; বিশেষত এ বিষয়ে কথা বলার ব্যাপারে একজন বহিরাগতের সীমাহীন জটিলতা রয়েছে। ১৬টি ভাষায় নির্মাণ হয় ভারতীয় চলচ্চিত্র। আমরা এও জানি, ভারত সর্বাধিক চলচ্চিত্র-নির্মাণকারী দেশ।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি সার্বিক জরিপ করার পর, আমার বিশ্বাস জন্মেছে যে, এ নিয়ে কথা বলতে গেলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। সেগুলো হলো—চলচ্চিত্রের ইতিহাস, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানী এবং সর্বোপরি চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা—অন্তত সেই সব চলচ্চিত্র, যেগুলো পরবর্তী ধারাকে প্রভাবিত করেছে। অবশ্য এগুলো নিয়েই আমি আলোচনা করবো। সত্যি বলতে, এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য একেবারেই সাধারণ। এখানে কয়েকটি ইস্যু নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি—ঝগড়া করতে নয় বরং প্রাসঙ্গিক।
ভারতে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে। জাতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে ভারতের রয়েছে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক ইতিহাস। ভারতীয় চলচ্চিত্র তার সম্ভাবনার কতোটা কাজে লাগাতে পেরেছে—এ কথার মাধ্যমে আমি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের কথা নয়, বরং শৈল্পিক চলচ্চিত্র সৃষ্টিতে আত্মনিবেদনের বিষয়টিও তুলে ধরছি। এটা আমার একটা অনুমান, যা পরে খতিয়ে দেখবো।
বিপুল সংখ্যক দর্শকের কাছে আবেদন ও চলচ্চিত্র কেমন হওয়া উচিত—সে বিষয়ে অনুধাবন, গল্প, থিমেটিক আধেয়ের ভিত্তিতে পৃথিবীর আর কোনো চলচ্চিত্র আমাদের (শ্রীলঙ্কা) নিজস্ব চলচ্চিত্রের ওপর এতো দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলেছে কি না সে বিষয়ে আমার সংশয় রয়েছে। তার কারণটাও ইতিহাস। শুরুতে নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে আমাদের সাধারণ দর্শক চলমান ছবির জাদুতে মুগ্ধ হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর ৯০ দশকের শেষের দিকে লুমিয়ের ভাইদের কয়েকটি চলচ্চিত্রের প্যাকেজ কলম্বোর সরকারি মিলনায়তনে দেখানো হয়। তখন সামাজিক উৎসব হিসেবেই বেশি গুরুত্ব ছিলো এ প্রদর্শনীর। তবে এর মধ্যে চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সম্ভাবনার কিছু নির্দেশকও ছিলো।
শ্রীলঙ্কায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বণ্টন ও প্রযোজনার শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ার কাজটি করলেন এক ভারতীয় নাগরিক। তার নাম জে. ফ্রেমজি মদন (J. Framji Madan)। বিস্ময়করভাবে কলকাতা শহরের এ ব্যক্তি উপলব্ধি করেছিলেন ব্রিটিশ শাসিত শ্রীলঙ্কা (ব্রিটিশ সিলন) দর্শক পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময়। তার ব্যবসা কয়েক বছরের মধ্যে খুব দ্রুতই প্রসার লাভ করে এবং তিনি দেশের সর্ববৃহৎ প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করতে সক্ষম হন। ‘এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস’ নামের ওই অনন্য সাধারণ প্রেক্ষাগৃহে এক হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা ছিলো। দুই মাস আগে আমাদের ওখানে নতুন ভারতীয় চলচ্চিত্র নিয়ে উৎসব ও ঋত্বিক ঘটক রেট্রোস্পেক্টিভও হলো। ফ্রেমজি ছিলেন চতুর ব্যবসায়ী। তার নেটওয়ার্কের প্রধান কেন্দ্র এলফিনস্টোনকে ঘিরে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের বন্যায় স্থানীয় বাজার ভাসিয়ে দিলেন। যদিও ফরাসি, ব্রিটিশ ও আমেরিকান চলচ্চিত্র পরিবেশনার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। তবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, স্থানীয় দর্শকরা ভারতীয় চলচ্চিত্রের থিম ও গল্প সহজেই বুঝতে পারবে। সর্বোপরি সেগুলো আমাদের সংস্কৃতি থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়; সেগুলো সহজে গ্রহণযোগ্য, বোধগম্য ও উপভোগ্য।
তখন থেকেই ভারতীয় চলচ্চিত্র ও শ্রীলঙ্কার দর্শকের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা বিশেষত বোম্বাইয়ের (মুম্বাই) হিন্দি ও মাদ্রাজের (চেন্নাই) তামিল চলচ্চিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের প্রজন্মে যারা মধ্যবিত্ত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত, তারা ধরেই নিয়েছিলো দেখার মতো একমাত্র বিষয় হচ্ছে আমেরিকান চলচ্চিত্র। আমরা অবশ্য সব ধরনের চলচ্চিত্রই দেখতাম—হালকা আনন্দদায়ক, ওয়েস্টার্ন, গ্যাংস্টার; এমনকি সমসাময়িক নাটকও। একটা চলচ্চিত্র কেমন হওয়া উচিত—এ ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আগেই গড়ে উঠেছিলো; স্বাদ ও সংবেদনশীলতা একটা নির্দিষ্ট ধরনে, একটা নির্দিষ্ট চলচ্চিত্র-নির্মাণের সুরে বাঁধা ছিলো। আমাদের কোনো জাতীয় চলচ্চিত্র ছিলো না। অন্যদিকে, সাধারণ দর্শকের ঝোঁক ছিলো দক্ষিণ ভারত থেকে আমদানি করা তামিল চলচ্চিত্রের প্রতি। তবে আমাদের ধারণা ছিলো, এগুলো পুরনো বস্তাপচা। অন্যদিকে, আমেরিকান চলচ্চিত্রগুলো একচেটিয়াভাবে শহরের ভালো প্রেক্ষাগৃহগুলোতে প্রদর্শন হতো। তীব্র সাংস্কৃতিক বিভাজন দর্শককে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন অনুমাননির্ভর ধারণাও চালু ছিলো।
একদিন আমাদের এক বন্ধু গতানুগতিক তামিল বা হিন্দি চলচ্চিত্র দেখার বিষয়ে উৎসাহিত করে। ও বলেছিলো, কিছু না হোক অন্তত ভিন্ন অভিজ্ঞতা তো হবে। আমরা ওর সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে যাই, তারপর যা দেখি তা সত্যিই আতঙ্কিত হওয়ার মতো। এই ঘটনা আমাদের বিস্মিত করে, তবে চোখের সামনে একটা ভিন্ন পৃথিবীর দ্বার খুলে দেয়। চলচ্চিত্র-নির্মাণে অদক্ষতা দেখে আমরা বিরক্ত হলাম—সেট, পোশাক, যাত্রার ঢঙে অভিনয়, মেকআপ, হাস্যরস, সাব-প্লট দেখে রীতিমতো ভয় পাই। তবে এটা পরিষ্কার যে, আমরা ছিলাম নিতান্তই সংখ্যালঘু। কারণ ভারতীয় ওই চলচ্চিত্রই দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলো। এই চলচ্চিত্রে একেবারে ভিন্ন একটা ভাষা—যাত্রার মতো। এগুলো আমাদের ধর্মীয় রীতি ও ঐতিহ্যের কাছাকাছি এবং পর্দায় যাদের দেখা যায়, তাদের সহজেই আমরা চিহ্নিত করতে পারি। তা সত্ত্বেও আমরা সেগুলো সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছি। আজ এটা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে—শুধু খারাপ চলচ্চিত্র নির্মাণই এটার একমাত্র কারণ, নাকি আমরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার ছিলাম।
মহান চলচ্চিত্রনির্মাতা সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে শ্যাম বেনেগাল একটি চিত্তাকর্ষক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেখানে প্রয়াত এ নির্মাতা বলেছিলেন, ‘আমরা এ সময়ের ভারতীয় চলচ্চিত্রের কঠিন সমালোচক ছিলাম—আমরা সেগুলোকে পেয়েছিলাম মিথ্যা, অবাস্তব, মানহীন, অদক্ষভাবে নির্মিত বাণিজ্যিক হিসেবে’— এক্ষেত্রেও সেটাই প্রাসঙ্গিক। আমেরিকান চলচ্চিত্রে বুঁদ হওয়া ছাড়াও ১৯৪০-এর দশকের শুরুর দিকে আমরা কলম্বো ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করি। সেখানে ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সব কালোত্তীর্ণ নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্র আমদানি করা হয়। এগুলো ছিলো হলিউডের চলচ্চিত্রের বিকল্প। কাজেই শিল্প সৌন্দর্য ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে ভিন্ন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে আরো বেশি পরিণত, যা ইউরোপে কালোত্তীর্ণ চলচ্চিত্রের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিমা চলচ্চিত্রের প্রতি আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে, চলচ্চিত্র কেমন হওয়া উচিত—সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা প্রখর হয়েছিলো। আমাদের কাছে ভারতীয় চলচ্চিত্র ছিলো প্রায় শূন্য পর্দা। নিজের ক্ষেত্রে শিক্ষাটা পেলাম, যখন আমার প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তি পেলো। দর্শকের বৃহৎ অংশই এটা দেখে বিরক্ত হলো। তাদের জিজ্ঞাসা—এটা কি একটি চলচ্চিত্র? এবং তারা এটা প্রত্যাখ্যান করলো, যার প্রভাব ছিলো ভয়ানক। গল্পটা একীভূত হবে এবং একটা ভিন্ন শৈলী ধারণ করবে—এটাই তাদের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য—প্রথাগত ভারতীয় চলচ্চিত্র। ৫০-এর দশকে আমরাও বক্স অফিসে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সাফল্যের কারণ বুঝতে ব্যর্থ হই; বিশেষত হিন্দি চলচ্চিত্রের। যেগুলোর ভাষা এখানে কেউ বোঝে না। আর তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার কারণ সহজেই বোধগম্য, কারণ তামিল জনগোষ্ঠীর বড়ো একটি অংশ শ্রীলঙ্কায় রয়েছে। তবে শান্তারাম, রাজ কাপুর, বিমল রায়, মেহবুব খান বা গুরু দত্তের চলচ্চিত্র আমরা খুব কমই মিস করতাম।
তবে প্রথম যে বিষয়টি আমাদের আঘাত করলো সেটি হচ্ছে, এসব চলচ্চিত্রে দর্শকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যদিও সংলাপের কোনো শব্দই দর্শকের বোধগম্য ছিলো না। কিন্তু এ চলচ্চিত্রগুলো একটি মৌলিক বিষয়ে সফল হয়েছিলো। তারা ভাষার বাধা অতিক্রম করতে পেরেছিলো। যদিও সেগুলো হলিউডি চলচ্চিত্রের দ্বারা প্রভাবিত। তার পরও তারা ভিন্ন একটা ধারার জন্ম দেয়, যার সঙ্গে পশ্চিমা চিরায়ত চলচ্চিত্রের সম্পর্ক ছিলো কম। এটাও স্পষ্ট ছিলো যে, এসব নির্মাতারা নিজেদের কাজে কুশলী ছিলেন এবং হিচককের মতোই চাতুর্যপূর্ণভাবে দর্শককে প্রভাবিত করতে পারতেন। সবকিছুরই সমালোচনা করেন (cynic)—এমন একজন, ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোকে নাকচ করে দিয়ে বলেন—সেগুলো না ভারতীয়, না চলচ্চিত্র। তবে এটা বিতর্কের বিষয় এবং আমি যেসব নির্মাতাদের কথা উল্লেখ করেছি, তাদের জন্য এ রকম সমালোচনা যথাযথ নয়।
একটা কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে, তারা ছিলেন মূলত মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অংশীদার, যেখানে কল্পজগতের নির্বুদ্ধিতা বক্স অফিসে সফল হওয়ার একমাত্র রেসিপি। এ মাধ্যমটিতে তারা কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। অনেকের মতো মেহবুব খান নিম্ন পর্যায়ের কর্মী থেকে ইন্ডাস্ট্রির প্রাণপুরুষে পরিণত হন। কিছু গল্প ও থিম নির্বাচনে তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে তাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতাও ছিলো। কিন্তু তারা বাস করতেন ভিন্ন দুই পৃথিবীতে এবং প্রথা ভাঙতে তারা সম্পূর্ণরূপে অনিচ্ছুক বা অসমর্থ ছিলেন। যেসব নির্মাতাদের নাম উল্লেখ করেছি, তাদের কাজের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ আমার অভিপ্রায় নয় বা আমি তার যোগ্যও নই। ভারতীয়রাই সেই কাজটা করছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, এ সময়ের চলচ্চিত্র সম্পর্কে কিছু মন্তব্য আমি করতে পারি এবং তা অনধিকারচর্চা হবে না। কারণ তারা সেই প্রথাটিকেই অস্বীকার করেছিলেন, যার মধ্যে তারা ডুবে ছিলেন।
সান্তারাম তার দো আঁখি বারা হাত (১৯৫৭, টু আইস টুয়েলভ হ্যান্ডস) চলচ্চিত্রে থিম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন একজন পরোপকারী জেলারকে; যিনি দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামিকে সংশোধন করতে সফল হয়েছিলেন এবং এটি করতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারান। এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সান্তারাম বার্লিনে ‘সিলভার বিয়ার’ পদক জয় করেন, কিন্তু তা বক্স অফিসে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। দ্রুতই দিক বদল করে তিনি ঝনক ঝনক-এর মতো দর্শক নন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। মেহবুব খান মাদার ইন্ডিয়াতে প্রথাগত জনপ্রিয় ধারাকে আপন দক্ষতায় ব্যবহার করেন, যা এটিকে দিয়েছে শক্তিশালী আবেগীয় ক্ষমতা। চলচ্চিত্রটি অস্কারে মনোনয়ন পায় এবং মস্কোতে নার্গিস সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। কান উৎসবে মেহবুব খানের সেরা সিকোয়েন্সের রেট্রোস্পেক্টিভ হয়েছিলো, যা ইউরোপের কিছু সমালোচকের প্রকাশনা থেকে এসেছিলো।
রাজ কাপুরও চলচ্চিত্রে বিভিন্ন রূপে হাজির হয়েছেন। উপরিতলে পর্দায় তাকে একজন প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী হিসেবে সমাজের বিরুদ্ধে রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা প্রকাশ করতে দেখা গেলেও, আসলে তিনি এর মধ্য দিয়ে কোনো পরিবর্তনের দিশা দিতে পারেননি। হলিউডের গতানুগতিক যুক্তির ধার না ঘেঁষে চলা অজেয় নায়কদের মতোই তাকে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে গানের সঙ্গে রূপকথা ও ফ্যান্টাসি মিলিয়েও তিনি হাজির হন পর্দায় এবং সবমিলিয়ে তিনি সফল।
গুরু দত্তও বাণিজ্যিক ধারার প্রথাগত চলচ্চিত্রের ভিতরেই কাজ করেছেন এবং সেটাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এটা বিস্ময়কর কিছু নয় যে, তিনি ফ্রান্সে অনুসরণযোগ্য কাল্টে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু বিমল রায়ের দো বিঘা জমিন (টু একরস অব ল্যান্ড) সঙ্কেত দিচ্ছিলো বিপ্লব প্রায় আসন্ন। স্পষ্টতই তা ইতালির নব্য-বাস্তববাদী আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত। চলচ্চিত্রটি কৃষক পরিবারের দারিদ্রের জন্য গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরের মানবিক ও সংবেদনশীল পাঠ (স্থানীয় এক সমালোচকের ভাষায় ভারতীয় রিকশার সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে ডি সিকা’র বাইসাইকেলের)। এটা ছিলো বাণিজ্যিক ধারার একজন সম্মানিত নির্মাতার প্রথম চলচ্চিত্র, যেখানে ফর্মুলাভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রতারণাপূর্ণ কৌশলকে পরিহার করা হয়েছে। তিনি প্রচলিত ধারায় ছেদ টানেন এবং তার চলচ্চিত্রে ভারতীয় ঐতিহ্য প্রতিফলিত হয়। বহিরাগত হিসেবে এ প্রশ্নই মনে আসে কেনো তা আরো আগে ঘটেনি।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের সূচনায়—১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে নির্বাক যুগ পর্যন্ত—ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী এ সময়কালে এক হাজার তিনশো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। নির্বাক যুগ ইউরোপ, ব্রিটেন, রাশিয়া, আমেরিকা এমনকি জাপানের অসংখ্য মাস্টার পিস দ্বারা সমৃদ্ধ। বস্তুত নির্বাক যুগেই চলচ্চিত্র সর্বজনীন ভাষা লাভ করে—ব্যাকরণ গঠিত হয়, সংজ্ঞায়িত করা হয় সৌন্দর্যকে—যা চলচ্চিত্রকে ছোটো বাক্সে প্রদর্শন থেকে শিল্পে উন্নীত করেছিলো। কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়ে রচিত কোনো গ্রন্থেই গুরুত্ব সহকারে এ ধরনের কোনো কাজের উল্লেখ নেই। চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে সামাজিক ট্যাবুই কি এর জন্য দায়ী? অথবা সেই সব পথপ্রদর্শক, দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির স্বপ্নচারী মানুষ, যারা শুধু বাণিজ্যিক কারণেই চলচ্চিত্রে আগ্রহী হয়েছিলেন?
এমনকি শব্দ সংযোজনের পর ১৯৩১-৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অসাধারণ ও আকর্ষণীয় সব অর্জনের রেকর্ড রয়েছে। যেসব চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে, সেগুলো নির্মাণ করেছে সংবেদনশীল ও মেধাবী নির্মাতাদের একটা দল, যাদের সাহস ছিলো সময়ের সবচেয়ে প্রোথিত ইস্যুগুলোকে মোকাবিলা করার। সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় যাই হোক না কেনো, সব বিষয়ে তাদের আগ্রহ ছিলো। এর মাধ্যমে ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র-নির্মাণকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। যদিও ভারতীয় চলচ্চিত্র পশ্চিমের প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়াতেই পারেনি। তবে এর ব্যাপ্তি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাসহ সব স্থানেই জোরালোভাবে ছড়িয়েছে।
ভারতীয় জনপ্রিয় চলচ্চিত্র (অসম্মান করে বললে মসলা) বিপুল জনসাধারণের হৃদয় জয় করার বিমুগ্ধকর ক্ষমতা হারায়নি। আমরা যারা ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রে বিশ্বাসী এবং ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র অনুশীলন করি—তাদের ওই সব চলচ্চিত্রের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হওয়া হয়তো বৈধ। তবে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এর সফলতার কারণগুলো উপলব্ধি করা উচিত। অনুমান করা কঠিন—হয়তো আমি ভুল করছি—বাণিজ্যিক ধারার ভারতীয় চলচ্চিত্র বিশ্বের প্রথাগত কোনো চলচ্চিত্রের মধ্যেই পড়ে না। এটি শিল্পের বিভিন্ন শাখার মিশ্রণ—সরল গল্প, একমাত্রিক চরিত্র, গান ও নাচের অদ্ভুত ব্যবহার। এটা আসলে চলচ্চিত্রের নামে যাত্রা বা অপেরা। পণ্য হিসেবে উৎপাদন ও মোড়কজাতকরণে এগুলোর সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে অবজ্ঞা করা হয়, যদিও তা প্রয়োগ হয় পশ্চিমা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। কিন্তু এটাকে অবহেলা করা মানে এমন কিছুকে অবহেলা করা, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনা। এটার পরিমাপক হয়তো চলচ্চিত্রের সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে হয় না, কিন্তু এটাকে অবহেলা করা বোকামি হবে। এটা একটা নিজস্ব ধরন তৈরি করেছে, যা এ অঞ্চলের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বাধা অতিক্রম করেছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে সেই বিপ্লব ঘটে গেলো—কলকাতা শহর থেকেই তা হলো। পথের পাঁচালী—যে চলচ্চিত্র দেখার অপেক্ষায় ছিলো সারাবিশ্ব। একজন সত্যিকারের সমালোচক এর সারাংশ করেছেন এভাবে—‘একটি বুদ্ধিদীপ্ত চলচ্চিত্র এবং দৃঢ় অন্ধকারাচ্ছন্ন অনুভূতির একটি গ্রামীণ কবিতা—ভারতীয় জীবনের আলোকিত বহিঃপ্রকাশ, যা সারাবিশ্ব বুঝতে পারে।’ সত্যজিৎ রায়, যার স্মৃতির উদ্দেশে এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবটি (এই উৎসবের অংশ হিসেবে তিনি বক্তৃতা করছেন) উৎসর্গ করা হয়েছে। তিনি মানব অস্তিত্বের অপরিহার্যতাকে স্ফটিক বানিয়েছেন—এমন আবেগ, গভীরতা ও গতিময়তা দিয়েছেন, যা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম নির্মাতাই পেরেছেন। এবং তা এ কলকাতা থেকে, বাংলা থেকেই হয়েছে। তিনি বিশ্বের সঙ্গে কথা বলেছেন। পুরো বিশ্ব তাকে বুঝতে পেরেছে এবং আপন করে নিয়েছে।
সত্যজিতের চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, চরিত্রগুলোতে মানবজীবনের সব দিক নকশিকাঁথার মতো প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্বের মহান নির্মাতাদের মধ্যে সত্যজিৎ রায় অনন্য স্থান অধিকার করে থাকবেন। তিন মহান বাঙালি পরিচালক—সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক (যিনি নিজে তার শক্তিশালী ও উপমানির্ভর শৈলী তৈরি করেন) ও মৃণাল সেন (যার কাজের বেশিরভাগই তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে)—ভারতে চলচ্চিত্রের বিবর্তন ঘটিয়েছেন; তৈরি হয়েছে ভারতীয় চলচ্চিত্র যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। ভারতে প্রতিটি অঞ্চল থেকে নতুন প্রজন্মের নির্মাতার উত্থান ঘটেছে; নিজস্ব অঞ্চল, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার দিকে যাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ। যদিও সেগুলোর আবেদন সর্বজনীন, আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসিত।
এটা আমার কথা বলার আওতা নয়, এ অনন্য আন্দোলন বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও আমার নেই। প্রথমত, আমি সব চলচ্চিত্র দেখিনি। আর সেগুলো সম্পর্কে পড়া, কখনোই চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়। কিন্তু বাংলায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন; হিন্দিতে শ্যাম বেনেগাল, কেতন মেহতা, গোবিন্দ নিহলানির কাজের মুখোমুখি হওয়া; দক্ষিণী রাজ্যের শাজি এন কারুণ যার পিরাভি শ্রীলঙ্কার ক্ষুব্ধ কান্নার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, গিরীশ কার্নাড, আদুর গোপালকৃষ্ণাণ—যাদের ন্যারেটিভ আজকের দিনে তাদের সবচেয়ে উদ্ভাবনকারী চলচ্চিত্রনির্মাতা বানিয়েছে; অরবিন্দ—অনেক ভালোবাসা তার জন্য, তিনি এখন আর আমাদের মধ্যে নেই; বালু মহেন্দ্র, যিনি প্রথম আমার সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় কাজ করেন; কুমার সাহানি ও মনি কাউল চলচ্চিত্রের প্রথাগুলোকে পুনরায় আবিষ্কার করেছেন। তাদের সঙ্গে কাজ করে ভারতীয় চলচ্চিত্র সম্পর্কে যে কারো ধারণা তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন হতে বাধ্য।
বস্তুত যেকোনো দেশের জাতীয় চলচ্চিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এটা খুবই প্রশংসনীয় একটি দল। দলটির প্রত্যাশা এমন—বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের আধিপত্য যদি শেষ নাও হয়, অন্তত তাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। দুঃখের বিষয় হলো, এসব চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ খুবই কম। এমনকি পাইরেসিও এক্ষেত্রে কাজে লাগে না। আমি মৃণাল সেন সম্পর্কে প্রথম শুনেছিলাম কারলভি ভারি’তে জর্জ সাদাউল-এর কাছ থেকে, যিনি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ওয়েডিং ডে (বাইশে শ্রাবণ) দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ও অরবিন্দের চলচ্চিত্র কেনো আমাদের টোকিওতে দেখতে হয়? যতোক্ষণ পর্যন্ত না কোনো বাস্তবানুগ উত্তর পাওয়া যাচ্ছে, এ প্রশ্ন বার বার প্রতিধ্বনিত হবে।
নব্য ভারতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলন এরই মধ্যে ভারতের চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিবর্তন করেছে। শুধু ভারতে নয়, সমগ্র উপমহাদেশে তা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এটাকে পরিচর্যা ও উৎসাহিত করা। ভারতের চিরায়ত শিল্পের উৎস থেকে চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা উদ্ভাবনের জন্য প্রচুর মেধাবী ও স্বপ্নদর্শী নির্মাতাও রয়েছেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইরিন নিকলসন লন্ডনে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র কর্ম (১৯৩৩) দেখেন এবং লেখেন—হলিউডের অ্যান্টিথিসিস হচ্ছে ভারতীয় চলচ্চিত্র। স্মরণাতীত কাল থেকে ভারতের নিজের সংস্কৃতি, বর্ণ ও ধর্মীয় শিক্ষা রয়েছে; নতুন মাধ্যমে শৈল্পিক ঐতিহ্য প্রবাহিত না হলে নিজের কোনো চলচ্চিত্র গড়ে উঠবে না। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে যে চলচ্চিত্রটি তৈরি হয়েছিলো, আজ তরুণ নির্মাতাদের কাছে সেটাই ঐতিহ্য। আমি জানি তারা এ মহান দেশটির বিবেক হয়ে উঠবেন, যেহেতু সেটাই চলচ্চিত্রশিল্পের প্রধান কাজ।
(প্রবন্ধটি ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারিতে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘চলচ্চিত্রের শতবর্ষ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তৃতা থেকে অনুলিখন করা।)
দায়স্বীকার :‘An eye to India’ শিরোনামে লেসটার জেমস পেরিস-এর এই প্রবন্ধটি ‘100 Years of Cinema’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া। প্রবন্ধ সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন প্রবোধ মৈত্র। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে নন্দন, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, ১৯৯৫।
লেখক : লেসটার জেমস পেরিস, শ্রীলঙ্কার প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। তিনি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ এপ্রিল ব্রিটিশ উপনিবেশিত শ্রীলঙ্কার কলম্বোর দিহাইদালায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৯ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত স্বল্পদৈর্ঘ্য ও কাহিনিচিত্র মিলে তিনি প্রায় ২৮টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—Rekava (1956), Gamperali“a (1963), Golu Hadawatha (1968), Nidhanaya (1970), Kali“ugaya (1982), Yuganthaya (1983), Awaragira (1995) and Wekande Walauwa (2002).
অনুবাদক : তাকিয়া সুলতানা, গোটা তিনেক চাকরি ছেড়ে বর্তমানে অবসর সময় কাটাচ্ছেন; জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।
rumitakia@gmail.com
alam_rumc05@yahoo.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন