Magic Lanthon

               

সৈয়দা নিগার বানু, তাওকীর ইসলাম সাইক ও অন্যান্য

প্রকাশিত ২৫ জুন ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

প্রথম পর্ব.

“আমরা যদি ওদেরকে ডমিনেট করতে চাই তাহলে ফিল্ম হবে কিন্তু ‘গণসিনেমা’ হবে না”

সৈয়দা নিগার বানু, তাওকীর ইসলাম সাইক ও অন্যান্য


সৈয়দা নিগার বানু আপা হঠাৎ-ই ফোন করে জানালেন রাজশাহী আসছেন। তার সঙ্গে যে অনেক আগে থেকে পরিচয় ছিলো, এমন নয়। অল্প দিন হলো তার সঙ্গে কথা হচ্ছে, তাও মোবাইল ফোনে। ফলে তার সঙ্গে দেখা হওয়া নিয়ে আমাদের আগ্রহ ছিলো। তিনিও জানালেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সঙ্গে বসতে চান। আমরা জানালাম কেবল একবার বসলে হবে না, যে কয়েকদিন রাজশাহী থাকবেন আমাদের সময় দিতে হবে। নিগার আপার দিক থেকেও আমাদের এই আবদারে মৌন সম্মতি পাওয়া গেলো। জানুয়ারি ২০২৫-এ আপা যে কয়েকদিন রাজশাহীতে ছিলেন, প্রায় প্রতিদিনই তার সঙ্গে দেখা ও কথা হয়েছে নানা বিষয় নিয়ে। ওয়েস্ট লন্ডনের ফিল্ম স্কুলে পড়ালেখা করার আগে নিগার আপা মূলত টেলিভিশনেই কাজ করতেন। পড়ালেখা করে দেশে ফিরে সেটা আর করতে চাননি। তখন চলচ্চিত্রই তার প্রধান আরাধ্য। সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় আর থাকবেন না, ফিরে যাবেন নিজের শহর খুলনায়। সেখানেই শুরু হলো তার চলচ্চিত্রযুদ্ধ। পৈতৃক বাড়িতে গড়ে তুলেছেন চলচ্চিত্রের সংগঠন; বন্ধুদের কাছ থেকে মুষ্টির চালের মতো জমানো টাকায় সেখানেই গড়ে তুলেছেন চলচ্চিত্র দেখার থিয়েটার। আট বছর ধরে প্রত্যন্ত এক গ্রামে গিয়ে তাদের নিয়ে নির্মাণ করেছেন ‘গণসিনেমা’। সেই সিনেমা প্রকল্পে প্রযোজক থেকে দর্শক পর্যন্ত সবাই ওই গ্রামেরই। নিজে নির্মাণ করেছেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নোনা পানি (২০২৩)।

‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আখড়ায় বসে নিগার আপাই বললেন রাজশাহী নির্মাতা তাওকীর সাইক-এর সঙ্গে কথা বলতে চান। সাইক-ও তার মতোই চলচ্চিত্রযোদ্ধা! ঢাকার বাইরে রাজশাহীতে থেকে প্রতিদিন যুদ্ধ করে যাচ্ছেন চলচ্চিত্র নিয়ে। ‘শাটিকাপ’ খ্যাত তাওকীরকে নিগার আপার কথা বলতে তখনই দেখা করার আগ্রহ দেখালেন। কিন্তু তখন সম্ভব ছিলো না। ফলে পরেরদিন বসার সময় ঠিক করা হলো বিকেল পাঁচটায়। ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ নিগার আপা, তাওকীর, ফুটপ্রিন্টের নির্বাহী প্রযোজক অমিত রুদ্র ও ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ সম্পাদক কাজী মামুন হায়দার বসেছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আখড়ায়। সেখানেই দীর্ঘ আড্ডায় কথা হয় চলচ্চিত্র নিয়ে। সেই আলোচনার প্রথম পর্ব পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। [সম্পাদক]  


তাওকীর সাইক : ব্যাপারটা হলো কী আপা, আমরা যখন বন্যার পর পর খুলনায় এবার কাজ করতে গেলাম [২০২৪-এ দক্ষিণের ভয়াবহ বন্যার শেষের দিকে তাওকীর ও তার দল একটা চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে খুলনায় পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়নে যায়], সেখানে একটা অন্য ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছিসেখানে গল্প খুঁজে পেতে কষ্ট হয়েছে! কিন্তু আমরা যখন সিলেটে গিয়েছিলাম, সুনামগঞ্জের দিকে কাজ করেছি, ওখানে সবাই স্টোরিটেলার। সবার গল্প আছে এবং সেই গল্প তারা সুন্দরভাবে ন্যারেট-ও করতে পারে। অথচ খুলনায় যেখানে গেছি, সেখানকার মানুষগুলো নিজের কথাটা কীভাবে বলতে হবে সেটাও জানে না। এগুলোই আসলে বাস্তবতা।

সৈয়দা নিগার বানু : আমার নোনা পানি ফিল্মের ট্যাগ লাইনটা হচ্ছে, গল্পহীনতার গল্প। আমি কোনো গল্প বলছি না আরকি। আমি প্রথমেই বলে নিচ্ছি, এটা কোনো স্টোরি না। দর্শক হিসেবে আপনি এখানে কিছু ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন দেখবেন, ডকুমেন্টিং দেখবেন, ট্রিটমেন্ট দেখবেন। এর মধ্যে আপনি গল্প পেলে ভালো, মানে আপনি লাকি। না পেলে গালাগাল দিয়েন না। [হাসি]

সাইক : আপা, আপনার ওই সিনেমাটা আমরা দেখবো কীভাবে?

নিগার বানু : দেখানো তো সহজ, আবার সহজও নয়! আমি এই সিনেমাটা আপনাদের খুব বড়ো পরিসরে দেখাতে পারবো না, কারণ এর প্রোডিউসার এখনো এটা রিলিজ করার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে একটু ক্লোজ সার্কিটে দেখাতে পারবো। এই ধরেন, সিনেমাটা একটু দেখলেন, কথা বললেন, কিছু অ্যানালিসিস করলেন অর্থাৎ গবেষণার পার্ট হিসেবে সিনেমাটা দেখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কাজী মামুন হায়দার : আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়েছে, নিগার আপা যে ধরনের গল্প বলতে চান, মানে স্থানীয় যে গল্পটা তিনি বলতে চান; ওনার সঙ্গে কথা বলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টা মনে হয়েছে; উনি বাংলাদেশের ফিল্মের যে ভাষার কথা বলছেন; উনি কাল আমাকে উদাহরণ হিসেবে একটা কথা বললেন, বাংলাদেশের পাঁচজন ডিরেক্টরের পাঁচটা সিনেমা মিউট করে দিয়ে যদি কেবল ভিজ্যুয়ালটা দেখানো হয়, তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন, কোন কোন সিনেমা ও ডিরেক্টরের কাছ থেকে কোন কোন জিনিস নিয়ে উনি সিনেমাটা বানিয়েছেন। কিন্তু ওর মধ্যে খুব কম বৈশিষ্ট্য আছে, যেটা দেখে বলা যেতে পারে এটা বাংলাদেশের একটা সিনেমা, বাংলাদেশের ডিরেক্টরের সিনেমা। এসব উপাদানের উপস্থিতি সেখানে কম।

সাইক : তার মানে হলো, আমাদের নিজেদের কিছু নাই!

নিগার বানুু : নিজেদের কিছু নাই, ব্যাপারটা এমন নয়। আমাদের আছে, কিন্তু সেটাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় আনার সক্ষমতা আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি।

সাইক : আমরা আসলে ধার নিয়ে চলছি, ইরান থেকে, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে, বলিউড থেকে।

মামুন হায়দার : নিগার আপার এই কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রের ভাষা নির্মাণে আপার একটা স্ট্রাগল আছে। উনি এটা নির্মাণ করতে চান আসলে। উনি বলছেন, ওনার যুদ্ধটা চলচ্চিত্রের এই ভাষা নির্মাণের য্দ্ধু। এই বাস্তবতায় আমার যতোখানি মনে হয়েছে, সেখানে তার কাছে গল্প খুব বড়ো কোনো বিষয় নয়। গল্প যাইহোক না কেনো, আমি যদি ভাষাটা তৈরি করে দিতে পারি, তাহলে আমার সিনেমা ...।

নিগার বানু : আমি ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই মামুন ভাইয়ের কথাটা ধরে। মনে করেন, রাশিয়ান একটা রূপকথার গল্প, সেখানে রাজা-রানি সবাই আছে। আপনি রাশিয়ান ভাষাটা বাংলায় অনুবাদ করলেন, সেটা একটা ফ্লেভার। আবার সেটা পুরো গিলে ফেলে বাংলা ভাষায় লিখলেন, সেটা আরেকটা ফ্লেভার। তৃতীয়ত, শুধু গল্পের কনসেপ্টটা নিয়ে আপনি আপনার ভাষায় লিখলেন। তাহলে কোনটা অনেক বেশি বাংলাদেশি হবেসরাসরি অনুবাদ, না হজম করে উগড়ে দেওয়া গল্প, না শুধু ধারণাটা নিয়ে সম্পূর্ণ নিজের ভাষায় লেখা গল্পটি?

সাইক : অবশ্যই শেষেরটা।

নিগার বানু : এই শেষের ভার্সনটা যখন রাশিয়ানরা দেখবে না, তখন তারা বলবে, ইন্টারেস্ট্রিং তো বাংলাদেশে এ রকম গল্পও হয়! অথচ এখন যেগুলো হচ্ছে, সেটাকে সরাসরি কপি-পেস্ট বলবো না! তবে এটা বলতে পারি যে, তা আরেকটা মানুষকে নতুন কিছু দিচ্ছে না। না ভাবনার ক্ষেত্রে, না ক্রাফটের ক্ষেত্রে। ওগুলো দেখে কেউ বাংলাদেশকে বুঝতে পারবে না আসলে। যেমন, একটু খেয়াল করলে দেখবেন, বাংলাদেশে কোনো চেয়ারম্যানের পেছনে চামচা থাকে না। কোনো নায়িকা দুই বেণি করে দৌড়ে গান গায় না। বাসররাতে কেউ অকস্মাৎ গান গেয়ে ওঠে না। অথচ এগুলো আমাদের ভিজ্যুয়াল ট্রিটমেন্টে এমন হয়ে গেছে, মনে হয় এগুলো রিয়ালিস্টিক। আমরা এই তথাকথিত রিয়ালিস্টিকের ওপর দিয়ে হাঁটছি এবং এই ন্যারেটিভকে সত্য বলে মানছি। আমরা মনে করছি, এটাই রিয়ালিস্টিক!

মামুন হায়দার : এই বিষয়টা কিন্তু কেবল আমাদের এখানেই নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের গল্পও। আপনি যদি একটু খেয়াল করে দেখেন আপা, গত ২০ বছরে আমাদের এখানে বিয়ের যে প্রক্রিয়াহলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্তএটা পুরোপুরি চেঞ্জ হয়ে গেছে। এই বিয়ের অনুষ্ঠানে আর আমাদের বলে কিছু নাই!

নিগার বানু : এই যে আমি আপনাকে কাল বললাম না, আমি যখন গ্রামে সিনেমা দেখাতে যেতাম; রবিবারের দিন যেতে হতো। কারণ রবিবারের দিন ভারতীয় টিভি ‘জি বাংলা’য় বস্তাপঁচা সব সিরিয়াল চলে না, তাই! আমি তো রিমোট এলাকায় সিনেমা দেখাতাম, সেখানে আমাদের তথাকথিত ইন্টেলেক্ট সিনেমা কেউ পোঁছে [পাত্তা দেওয়া] না। আমার মা-ই তো আমার সিনেমা দেখে না, কী আর বলবো! মা বলে তোর সিনেমায় গল্প নাই, কিছু নাই! ফলে ঘরে ঘরে একই অবস্থা!

আমাদের সিনেমার তো কোনো দর্শক নাই; আমার দর্শক আপনি, আপনার দর্শক আমি।

অমিত রুদ্র : আপা, আরেকটা কথা, ‘রামায়ণ’ যখন বাংলায় করা হলো, মানে বাল্মীকির যে সংস্কৃত ‘রামায়ণ’; ওটা যখন কৃত্তিবাস বাংলায় লেখেন, ওটা কিন্তু সংস্কৃত ‘রামায়ণ’ থেকে একেবারে আলাদা। এটাকে একেবারে বাংলায়ন করা হয়েছে; গল্পে অনেকগুলো নতুন এলিমেন্ট ঢোকানো হয়েছে। এজন্যই আসলে বাঙালি এই ‘রামায়ণ’টাকে নিজের করে নিয়েছে। এখানে ধরেন দুর্গা ঢুকলো, লব-কুশের ছেলেদের কাহিনি ঢুকলো, ন্যাচারের বর্ণনা পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। পুরো একটা বাংলা ভার্সন আরকি।

নিগার বানু : এটার কারণ হলো, ব্যাপক মাত্রায় বাংলাভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছানো। দেখেন, এখন কোকাকোলা কেনো বাংলায় লিখছে কোকাকোলা! কারণ ও জানে আমার ভোক্তা যদি হয় ১০ জন, এর মধ্যে দুইজন মাত্র ইংরেজি জানে; বাকি আটজনকে আমার বাংলাতেই কোকাকোলা খাওয়াতে হবে। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, ওরা বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে এই কাজটা করছে, বরং যাতে ব্যবসা হয় সেটাই করবে/করছে। দেখেন বাংলায় কোকাকোলা লিখলো আর বাঙালি মুসলমানের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বোতলের গায়ে লিখলো, এটা একটি হালাল পানীয়! অ্যাজ ইফ বাঙালিরা হারামও খায়!

এখন আমরাও যদি মনে করিদেখেন আমাদের ডিরেক্টরদের একটা সুপ্ত বাসনা হলো, আমি আমার ফিল্মে এমন কোনো কথা বলবো, যে কথা আর কেউ বলেনি। আমার ফিল্ম এমন একটা আইডিয়াতে হবে, যেখানে গদার-টদার সব ভেসে যাবে, ঠিক আছে? আর সত্যজিৎ তো এটা ভাবতেই পারেনি!

আবার অনেকে মনে করে, জীবনে একটা ফিল্ম-ই বানাবো, ওটাই শেষ, ওটাই প্রথম। এই রকম একটা এজেন্ডা নিয়ে তো আমরা কাজ করছি! অন্যদিকে আবার অনেকে ফিল্ম তৈরি করছে, কিন্তু দেখানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। সবমিলিয়ে একটা হতাশাজনক অবস্থা আরকি। ফলে তখন সিনেমাটা হয় কী, কখনো ইস্যুভিত্তিক হয়ে যায়, কখনো অতিরঞ্জিত হয়ে যায়, আবার অনেক কম্প্রোমাইজ-ও থাকে, তাই না?

প্রোডিউসার, ডিস্ট্রিবিউটর কতো ধরনের লোক থাকে; তারা বলে এটা এভাবে না করে এইভাবে করেন। যিনি বলছেন, তিনি ভাবলেন মার্কেটে এ রকম প্রোডাক্ট বেশ চলছে, তাই গরুকে ঠিকই ঘাড় ধরে নদীতে নামাতে হবে; তাহলে হয়তো এই সিনেমার লগ্নি উঠে আসবে। কিন্তু আমার কী মনে হয় জানেন, যদি এই প্রোডিউসার বা ফাইন্যান্সার সিনেমার মার্কেট পলিসি এবং কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান রাখে আর ব্যবসায় সৃজনশীল হন, তাহলে তার পক্ষে প্রোডাক্ট টু প্রোডাক্ট যেকোনো প্রোডাকশন করা সম্ভব এবং বেচাও সম্ভব। কিন্তু তার বিক্রি করার ক্ষমতা কম বলে সে যদি আমাকে মোল্ড করে, এইটা একটা বড়ো সমস্যা। বাংলাদেশে সিনেমা বিক্রি করার মানুষও নেই। তা না হলে যেকোনো গল্প, যেকোনো ফিল্ম, অ্যাজ আ প্রোডাক্ট, তার সেলিং ভ্যালু আছে! এটা আমি বিশ্বাস করি।

‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ আখড়ায় দেওয়া ঘরোয়া আড্ডায় কথা বলছেন সৈয়দা নিগার বানু, তাওকীর সাইক, অমিত রুদ্র ও কাজী মামুন হায়দার

সাইক : অবশ্যই ভ্যালু আছে।

নিগার বানু : আমরা পারি না বলেই এতো কথা বলি। আর আমাদের এখানে তো প্রোডিউসার নেই, সবাই ফাইন্যান্সার।

মামুন হায়দার : আমাদের এখানে তো প্রোডিউসার কনসেপ্টই দাঁড়ায়নি, আপা! আমরা মনে করি, যে লোক টাকা দেয় সেই হলো প্রোডিউসার।

সাইক : আপা, সিনেমার ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে, ধরেন আমরা এখানে কাজ করছি, নানা কিছু করার চেষ্টা করছি, বুটিক ফিল্ম বানাচ্ছি। এটার একটা বড়ো উদ্দেশ্য হচ্ছে; আসলেই কি আমাদের সিনেমার কখনো কোনো চেহারা বা ভাষা তৈরি হবে না! যেটা দেখে মানুষ বলবে, এটা ওই দেশের ছবি! সেই চিন্তা থেকে আমরা একটা টেকনিক করার চেষ্টা করেছি, যেটা আমরা রিসেন্ট খুলনায় শ্যুট করে আসলাম। এটাকে আমরা বলছি, ‘ছিপ দিয়ে মাছ ধরা’। ‘ছিপ দিয়ে মাছ ধরা’র ব্যাপার হচ্ছে, মাছ উঠলে উঠতে পারে, কী উঠবে সেটা জানি না। আবার নাও উঠতে পারে।

এই প্রক্রিয়ায় আমরা যেটা করি, সেটা হচ্ছে, যেকোনো রিয়েল এন্সিডেন্টকে অ্যাজ আরলি অ্যাজ পসিবল ফিকশনে কনভার্ট  করা যায় কীভাবে, ওইটার একটু চেষ্টা করছি। এই প্রসেসে আমরা যেটা করি, ধরেন খুলনায় যেটা করলাম, ওখানে গিয়ে আমরা থাকতে শুরু করলাম, আমাদের মধ্যে একজন নানা বাস্তবতা নিয়ে ডকুমেন্টারি ফিল্ম শ্যুট করা শুরু করলো; আর আমরা এর মধ্যে দিয়ে গল্প খোঁজা শুরু করলাম। ওই জীবনটায় বাস করতে শুরু করলাম, ওদের সঙ্গে মিশতে শুরু করলাম। একপর্যায়ে ওখানেই গল্পটা বাড়তে থাকলো, ওখানকার মানুষজনকে অন বোর্ড করলাম আমরা ক্যামেরার সামনে-পেছনে। এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সিনেমাটা ওখানে ওভাবেই তৈরি হলো আরকি! আপা, এইটার মূল কারণই হচ্ছে, আমাদের যেনো একটা নিজস্বতা তৈরি হয়, নিজের একটা চেহারা তৈরি হয়। এখনো আমরা জানি না আসলে সেটা তৈরি হয়েছে কি না?

নিগার বানু : ইন্টারেস্টিং কাজ! সাইক, আপনাদের এই চিন্তার সঙ্গে একটু যোগ করছি। এনভায়রনমেন্ট থিয়েটার সম্পর্কে আপনাদের ধারণা আছে? আশীষ খন্দকার যেটা নিয়ে কাজ শুরু করলেন বাংলাদেশে। আর একটা হচ্ছে ডকুমেন্টারি ফিল্মের যে পাঁচটা ভাগ আছে, তার একটা হলো এনভায়রনমেন্ট ডকুমেন্টারি। যেমন ধরেন, যুক্তরাষ্ট্রে ৪০-এর দশকের ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত মায়া ডেরেন নামে একজন এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মমেকার ছিলেন।

পৃথিবীতে টোটাল ফিল্মকে তিনটা মেজর ভাগে ভাগ করা যায়—ফিকশন, ডকুমেন্টারি এবং এক্সপেরিমেন্টাল। যেহেতু ফিকশন জনরাটা বেশি পপুলার হয়েছেএর বাইরেও আরো অনেক জনরা আছে, সে সম্পর্কে আপনারাও জানেন। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, এনভায়রনমেন্টাল বিষয়টা হচ্ছে—এ ধরনের প্রচুর ডকুমেন্টারি আছে, যেমন, নানক অব দ্য নর্থ—এই ধরনের কাজ  যারা করেছে, তারা ওই নর্থে চলে গেছে, সেখানে তিন-চার বছর ওই লাইফস্টাইলের সঙ্গে থেকে শ্যুট করেছে।

মামুন হায়দার : লুই বুনুয়েল-ও তো তাই করেছেন।

নিগার বানু : যুক্তরাষ্ট্রের একজন চলে গেছেন নর্থ অ্যান্টার্কটিকায়! আপনি রাজশাহীর কিন্তু চলে গেছেন খুলনায়, ডাজনট ম্যাটার! ওই জায়গায় থাকার ফলে ওখানকার এনভায়রনমেন্টের যে গল্পটাএনভায়রনমেন্ট থিয়েটার হচ্ছে কোনো একটা জায়গায় গিয়ে, সেখানকার এনভায়রনমেন্টকে ইস্যু করে, ওখানকার যে সমস্যাটা সেটাকে পিক করে নাটক তৈরি করা। আপনারা তো নিশ্চয় জানেন সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যাজিট ট্রেন ফিল্ম মেকিং-এর কথা। বিষয় হচ্ছে, এই ধরনের কাজ কিন্তু সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে হচ্ছেন্যাশনাল ফিল্ম, ডায়াসপোরা ফিল্ম। ফলে আমরা কিন্তু নতুন কিছুই তৈরি করছি না। কিন্তু বিষয়টা হলো, আমাদের মতো করে করতে হবে।

দেখেন, থিউরিটিশিয়ান কারা? তারা হচ্ছে গিয়ে ছিপ দিয়ে মাছটা ধরে; কিন্তু মাছগুলো তৈরি করে দিই আমরা। ওরা শুধু ছিপ দিয়ে মাছটা ধরে। এখন আমরা যে ল্যাঙ্গুয়েজটা নিয়ে কথা বলছি, ধরেন খুলনায় আপনারা যে জিনিসগুলো পেলেননতুন-পুরনো যা কিছু পেলেন, তার সঙ্গে রাজশাহী যুক্ত হবে কিন্তু। কারণ প্রতি কুড়ি মাইল পর পর ভাষা চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতি ১০০ মাইল পর পর তো ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজও চেঞ্জ হতে হবে, ঠিক আছে? কিন্তু যদি আমি বলি, আপনি যে রাফকাট আমাকে দেখালেন সেটা ‘শাটিকাপ’-এরই আরেকটা ভার্সন।

সাইক : আপা, আসলে প্রোমোটা দেখে জাজ করবেন না প্লিজ!

নিগার বানু : জাজ না; এইটা কিন্তু পজেটিভ সাইন। এটা একটা ল্যাঙ্গুয়েজ হতে পারে কিন্তু!

সাইক : না ঠিক আছে। কিন্তু যে ছবি আমরা বানিয়েছি সেটা যদি ল্যাঙ্গুয়েজ হয়, তাহলে কিন্তু বিপদ আছে! [হাসি]

নিগার বানু : এটা হলো যে ছেলে ভালো, পড়ালেখায় ভালো, কিন্তু খুব দ্রুত লিখতে হয়েছে। ফলে হাতের লেখা খারাপ হয়ে গেছে। বিষয়টা এ রকম!

অমিত : [আড্ডার শুরুতে তাওকীর সাইক তাদের নতুন ফিচার ফিল্মের একটা প্রোমো দেখিয়েছিলেন নিগার বানুকে। নিগার বানু দেখে মন্তব্য করেছিলেন, একটু বেশি গতিশীল মনে হচ্ছে! তো সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতে অমিত রুদ্র বলেন] আমাদের প্রোমোতে গান যেটা শুনলেন, এই গানটা মূলত আমরা ওখানকার একটা যাত্রাদল থেকে নিয়েছি। গানটা একেবারেই র। মানে ওনাদের যে ভাইব্রেন্ট ব্যাপারটাওনাদের লাইফস্টাইল, চলাফেরা তো খুবই ভাইব্রেন্টওনাদের সাধারণ কথাবার্তাও অনেক বেশি ড্রামাটিক।

নিগার বানু : আমার নোনা পানির তিনটি ক্যারেক্টারের একটা হলো যাত্রা। ফলে আমাকে যাত্রাদলের সঙ্গে থাকতে হয়েছে বেশ অনেকটা সময় ধরে।

মামুন হায়দার : আমার আগ্রহ যেটা নিগার আপাকে নিয়ে, উনি যেটাকে ‘গণসিনেমা’ বলছেন মানে আপা প্রথমে একটা গ্রাম নির্ধারণ করছেন, তার পর সেখানে যাচ্ছেন, থাকছেন, দীর্ঘদিন সেখানে কাজ করে একটা সিনেমা নির্মাণ করছেন। অন্যভাবে বললে, একেবারে প্রোডিউসার থেকে শুরু করে দর্শক পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটার সঙ্গে ওই গ্রামের মানুষগুলো যুক্ত।

নিগার বানু : ধরেন, সাইকরা যে সিনেমাটা খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে নির্মাণ করলেন, সেই সিনেমাটার ক্যামেরার পেছনে আপনারা ছিলেন, তাই তো? আর আমার গণসিনেমার কনসেপ্টের আওতায় ‘শিকড়ের গল্প’ সিনেমার ক্যামেরার সামনে-পেছনে, ডানে-বামে সবই ওই গ্রামের ছেলেমেয়েরা ছিলোপার্থক্য শুধু এতোটুকুই কিন্তু! ফলে সিনেমা নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও ব্যাপ্তি সবই পাল্টে গেছে। সাইকদের সিনেমাটার শ্যুট করতে লেগেছে হয়তো তিন থেকে ছয় মাস, আর আমার লাগলো আট বছর!

মামুন হায়দার : আমার আগ্রহের জায়গা এই প্রক্রিয়াটা নিয়ে।

অমিত : এটা আপনি কোন এলাকায় করেছিলেন আপা?

নিগার বানু : আমি এটা খুলনাতেই করেছি। জায়গাটার নাম কাশিমপুর, এটা খুলনা-যশোরের বর্ডার। আমার কনসেপ্টটা হচ্ছে, ফিল্মের যে চারটা মেজর পার্টপ্রি-প্রোডাকশন, প্রোডাকশন, পোস্ট-প্রোডাকশন ও ডিস্ট্রিবিউশন, অর্থাৎ গল্প বলা, ফিল্ম মেকিং, ডিস্ট্রিবিউশন ও দর্শকএই যে চক্রটা, এটা একটা জনপদে তৈরি হবে। এই চারটি পার্ট এক জায়গায় হলে আমি ওই জনপদের গল্পটা জানতে পারবো। 

যেমন ধরেন, আমরা এই যে ড্রেস পরছি না, এই ড্রেস কি আমরা বানিয়েছি? বানাইনি। আমরা দর্জিকে বলেছি, তোমার এক্সপার্টিজটা তুমি আমাকে দাও, এইভাবে কাটিং করো। ঠিক একইভাবে ওরা আমাদের এক্সপার্টিজটাকে ব্যবহার করবে, আমরা এক্ষেত্রে আমাদের ব্রেনটা ইউজ করবো না। আমার কথা হলো, নিজের গল্প নিজেকে বলতে হয়। ফলে নিজের গল্প নিজে বলতে যাবো ফিল্মের মাধ্যমে, এটা একটা টেকনিকাল ল্যাঙ্গুয়েজ। তাই ওকে আগে ট্রেইন আপ করাতে হবে। কীভাবে ক্যামেরা ধরতে হয়, কীভাবে শট্ নিতে হয় ইত্যাদি। এটা যদি ওরা না করেফিল্ম মাধ্যমটা আমরা বেশি বুঝি, ফলে আমরা যদি ওদেরকে ডমিনেট করতে চাই তাহলে ফিল্ম হবে, কিন্তু ‘গণসিনেমা’ হবে না। গণসিনেমা, এ অনেক নির্মোহ কাজ।

মামুন হায়দার : আপা, এখানেই আমার জানার আগ্রহ। ধরেন তাওকীর একটা ক্যাটাগরিতে কাজ করেছে ...।

সাইক : আমরা আপার প্রোটোটাইপ করেছি। কারণ আমরাও তো চেষ্টা করেছি, ওখানকার লোকজনেরাই সবকিছু করুক।

মামুন হায়দার : ওটাই আমার জানার আগ্রহ। দুইজনেই যদি একটু বলেন আরকি। তবে আমার মনে হয়েছে, দুইজনের কাজের একটা মৌলিক পার্থক্যের জায়গা আছে। ওই বিষয়টা আপা যদি একটু বলেন, মানে কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় আপনি এগোলেন? আপার কাজটাকে আমার এথনোগ্রাফিক মনে হয়েছে; ওই জনপদের মানুষকে প্রতি মুহূর্তে অধ্যয়ন করা।

নিগার বানু : আমার এই কাজটা করতে আট বছর সময় লেগেছে। ৪০ মিনিটের একটা ফিল্ম ওদের দিয়ে বানাতে আমার মাত্র আট বছর সময় লেগেছে! ওখানে কিন্তু বিদ্যুৎও ছিলো না। বিষয়টা কী রকম দেখেন, আমি যখন পড়ালেখা করে আসলাম ইংল্যান্ড থেকে; তখন ভাবছি, এখন কী করবো! আমি বাংলাদেশের স্বাধীনধারার অন্য নির্মাতাদের মতো সিনেমা বানাবো, নাকি টেলিভিশনে চাকরি করবো?

এর আগে ‘প্যারালাল সিনে মুভমেন্ট’ (পি সি এম) নামে খুলনায় আমার ছোটো একটা প্রতিষ্ঠান ছিলো। ২০০০ সালে আমি ঢাকায় চলে গেলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। কারণ কেউ দেখার ছিলো না। তার পর আমি গ্রাজুয়েশন করলাম ২০১৩-তে। প্রথম কথা, আমি ইংল্যান্ডে থাকবো না, কারণ আমি স্যান্ডউইচ বানাতে চাই না। রুটির দোকানে দুইজন কাজ করেছে, কাজী নজরুল ইসলাম আর আমি [হাসি]! ফলে আমি ইংল্যান্ডে থাকবো না, বাংলাদেশে ফিরে আসতেই হবে। কিন্তু আমি ঢাকাতেও থাকবো না, চাকরিও করবো না। তাহলে আমাকে খাওয়াবে কে, রাখবে কে? তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম খুলনায় ব্যাক করবো। ১৪ বছর পর আমি খুলনায় ব্যাক করলাম।

এখন হয়েছে কী, আগে যেমন ঢাকা থেকে একে নিয়ে আসো, ওকে নিয়ে আসো, ফিল্ম ওয়ার্কশপ করো; ওয়ার্কশপ শেষ, সবাই যার যার মতো চলে গেলো! এই ধরনের কিছু করবো, নাকি অন্য কিছু? এই আমার সার্চ শুরু। তাহলে অন্য কী করবো আমরা?

ইংল্যান্ডে আমার বিষয় ছিলো এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম। তার মধ্যে আবার ছিলো ডায়াসপোরা ফিল্ম। তার পর একটা ছিলো ন্যাশনাল ফিল্ম। আমার থিসিস ছিলো অত্যর ফিল্ম মেকিং নিয়ে। ফলে যখন আমি এই জাতীয় বিষয় নিয়ে থিসিস করছি, এবং আমি কেনিয়াতে ছিলাম একটা সময়। আমি কিন্তু সেখানে টুরিস্ট ছিলাম না, আমি হচ্ছি গিয়ে পর্যটক। ধরেন, আমি আফ্রিকাতে গিয়ে আফ্রিকার মানুষের সঙ্গে থাকবো, জার্মানিতে গিয়ে জার্মানদের সঙ্গে থাকবো। ভাত খাবো না, বাংলাদেশিদের সঙ্গে, এশিয়দের সঙ্গে মিশবো না—এই হচ্ছে আমার স্টাইল। আমি কম দেশ ঘুরবো, কিন্তু বেশিদিন থাকবো।

অমিত : সাইড সিঙয়ের জন্য?

নিগার বানু : আই হেড সাইড সিঙ! টুরিস্ট কনসেপ্টে আমার পুরো এলার্জি। আমার জীবনে আমি মনে হয় বইমেলায় দুই বা তিন বার গিয়েছি। আর বাণিজ্যমেলায় তো জীবনেও যাইনি। ওই সব দেশে তাহলে আমি কী দেখেছি! আফ্রিকায় যখন ছিলাম, তখন গ্রামে আর উপশহরে ছিলাম বেশ কিছুদিন করে। একেবারে চোরচাট্টাদের জায়গা, একেবারে গুলিস্তানকেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি। ও দেশের মানুষের চুল তো একেবারে কোকড়ানো। ওখানে প্রায় প্রতিটা বাড়ির সামনে কোনো একটা রুম থাকলেই সেটাকে ওরা পার্লার করে ফেলে। মেয়েদের জন্য ওটা একেবারে খুবই পপুলার বিজনেস, আমাদের এখানকার বুটিক শপের মতো। এখন পার্লারে ওরা সিনেমাটাকে কীভাবে কাজে লাগিয়েছে, বলেন? সেটা খুবই ইন্টারেস্টিং! ধরেন, চুল কাটানোর অপেক্ষায় যে বসে আছে, সে তখন কী করবে? আমি ২০০৯ সালের কথা বলছি, তখনো ইউটিউব আজকের মতো এতো পপুলার হয়নি। তাহলে ওখানে তারা কী করে? চুল কাটছে, সেখানে একটা সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, আর সেটাই অনেকে মনিটরে লাইভ দেখছে। প্রায় প্রত্যেক পার্লারে একই অবস্থা। কিংবা কেউ আবার রেকর্ড করা চুল কাটানো মনিটরে দেখাচ্ছে, কিংবা যারা আগে চুল ঠিক করে গেছে তাদের রেকর্ড করা ফুটেজ ওরা বসে বসে সিনেমা দেখার আনন্দ নিয়ে দেখছে।

সৈয়দা নিগার বানু নির্মিত চলচ্চিত্র নোনা পানি

সাইক : মানুষ সেগুলো দেখছে?

নিগার বানু : যে চুল কাটানোর জন্য বসে আছে, সে কী করবে? সে ওটাই দেখছে। জার্মানিতে আমি অনেকগুলো শহরে ছিলাম। তখন টাকাপয়সা তেমন ছিলো না। ১০০ পাউন্ডের মতো ছিলো, কেবল বাসের টিকিট কেটে এই বন্ধুর বাসায়, ওই বন্ধুর বাসায় গেছি। ওখানে ফিল্ম শো হয় কেমন? ধরেন, পাড়ায় আমরা আড্ডা দিতে বসি না অনেকে মিলে, সেখানে ওদের ফিল্ম শো হয়। আমি ওই ধরনের একটা ফিল্ম শো’তে গেছি, দুই ইউরো দিয়ে টিকিট কাটতে হবে। চারটা ফিল্ম দেখাবে। কফি খাও কোনো সমস্যা নাই। একটা গ্যারেজের মতো জায়গা। একটা ফিল্ম দেখাচ্ছে, আমিও সবার সঙ্গে দেখছি, মনে হচ্ছে এই মনে হয় কিছু একটা হবে, এর পর মনে হয় কিছু হবে! কিছু আর হয় না।

একটা ফিল্মের কথা এখনো মনে আছে, একটা খালি বাড়ির দেয়াল দেখাচ্ছে। আমি মনে করেছি, দেয়াল দিয়ে শুরু করে নিশ্চয় টাইটেল দেখাবে, তার পর কাহিনি শুরু হবে। আমরা কেবল গল্প খুঁজি, তাই না? কিন্তু সাত-আট মিনিট ধরে কেবল দেয়াল দেখাচ্ছে! দেয়ালের মধ্যে ফাটা, ক্যামেরা ওই পাশ দিয়ে উঠছে, মানে টিল্ট আপ করছে। আমি মনে করছি, কিছু তো একটা দেখাবে, কিন্তু ওটা দেখাতে দেখাতেই সিনেমা শেষ হয়ে গেলো! মানে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিলো আরকি। দিজ অল আর এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম।

তখন আমি না বুঝেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফর্মে টিক চিহ্ন দিয়েছিলাম এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মে। ফিকশন বুঝি, ডকুমেন্টারি বুঝি, তাহলে এক্সপেরিমেন্টাল কী জিনিস, একটু দেখি, এই ছিলো আমার মনোভাব। শুরু হলো ক্লাস। থিউরি ক্লাসে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দর্শন পড়ানো শুরু হলো, পাশাপাশি এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মের নাড়িনক্ষত্র। এসবই আমাদের মানে আমরা যারা এশিয়ান ছিলাম, মানে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি আর ইন্ডিয়ান সবার মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমরা এই দুর্ভাগা চার বান্দা তখন এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মের সংজ্ঞা ঠিক করলাম‘যে ফিল্ম দেখে কিচ্ছু বুঝবো না, সেটাই হলো এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম’। আমাদেরকে সেসময় এতো এতো এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম দেখতে হতো যে, মাথা পুরো আউলিয়ে যেতো! ইউরোপ, আমেরিকায় এতো এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম আছে যে, সেসব দেখে আমরা একদম হয়রান হয়ে যেতাম।

আমরা তো এখনো গল্প খুঁজছি, স্টুপিডরা তো গল্পই খুঁজবেভাবটা এ রকম ছিলো অন্যান্য সহপাঠীদের। এখন আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট হলো এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম নির্মাণ, ফলে যেভাবেই হোক সেটা তো আমাদের বানাতে হবে। স্ক্রিপ্ট জমা দিতে হবে। স্ক্রিপ্ট মানেই তো আমাদের কেবল গল্প চলে আসে। তখন মায়া ডেরেন-এর গল্প তবুও কিছুটা বুঝতে পেরেছি, অন্যদেরটা কিছুই বুঝিনি। আর ওগুলোতে তো প্রচুর ন্যুডিটি। আমরা এই সূত্র মেনে কেমন করে ফিল্ম বানাবো। তখন বুঝেছিলাম, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফিল্মমেকার জন্ম দিতে পারে না, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে যেসব ফিল্ম দেখানো হচ্ছে, সেই সব ডিরেক্টরা কেউ ফিল্ম নিয়ে পড়ালেখা করেননি। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ভিন্নতা ছিলো। কারণ আমি ফিল্মের দর্শন ও কারিগরি দিক দুটোই শিখতে চেয়েছিলাম।

আমার প্রথম স্ক্রিপ্ট জমা দিলাম এ রকম যে, একটা ক্যারেক্টারের স্বপ্নগুলোকে প্রোর্ট্রেট করবো। সেই স্বপ্নগুলো দিয়েই তার বয়স বোঝাবো। স্ক্রিপ্টটা মোটামুটি দাঁড় করালাম; কিন্তু করবো কী করে! ওখানে একজন মানুষকে একটা ফিল্ম করতে হবে। আমরা যেমন বই নিই লাইব্রেরি থেকে, ওখানে তেমন করে ক্যামেরা নাও, লাইট নাও, আর স্টুডিওতে বসে কাজ করো। এর বাইরে যদি কাউকে নিতে চাও, তাহলে টাকা দিতে হবে। তখন টাকা পাবো কোথায়? নিজেই ঠিক মতো খেতে পাই না। টাকার জন্য তখন বিয়ে বাড়িতেও কাজ করেছি। সেখানে কাজ করলে ১৫ পাউন্ড করে পাওয়া যেতো।

আমি আর ভারতের একটা ছেলে মিলে ওয়েডিং ভিডিও করতাম। ইরানি, ভুটানিজ, পোলিশদের বিয়ের ভিডিও করতাম। কারণ এদেরও টাকাপয়সা কম, আমাদেরও টাকাপয়সা দরকার। ১৫ পাউন্ড করে দিতো, ভিডিওর পর এডিট করে দিয়ে দিতাম।

সাইক : পুরো বিয়ে ১৫ পাউন্ড!

নিগার বানু : ওদের বিয়ে তো এতো বড়ো না। এই ধরেন চার্চে গেলো, তার পর খাওয়া দাওয়া করেই শেষ। ফলে ওটা তখন ১৫ পাউন্ডে ম্যানেজ করা যেতো। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট হওয়ার কারণে যেকোনো সময় এডিটিং ল্যাবে আমরা কাজ করতে পারতাম।

যেটা বলছিলাম, একটা স্ক্রিপ্ট করে জমা দিলাম। তখন ওরা বললো, তুমি এটা কীভাবে করবে? এখন ধরেন, স্বপ্ন বলতে আমরা বুঝি একটু ঝাপসা হবে, ঘটনা পরম্পরা থাকবে না, লজিক থাকবে না, ক্যারেক্টারটা হয়তো পা উপরের দিকে করে হাঁটছেফলে তা ওভাবেই লেখা। তখন উনি আমাকে বলবেন, সাইকোলজির ব্যাখ্যা দাঁড় করাও। তুমি কেনো এইভাবে লিখলে? এগুলোর রুট কজ-টা কী? আমি বললাম, এগুলো এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম, এর আবার কজ কী? তখন আমার শিক্ষক বললেন, তোমার কী ধারণা এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মে কোনো লজিক লাগে না, কিছুই লাগে না! আসলে থিউরি ক্লাসগুলো থেকে তেমন কিছু নিতে না পারার কারণে আমার স্ক্রিপ্টটাও কেমন ক্লিশে হয়ে গিয়েছিলো। তারপর থেকে সিরিয়াস হয়ে ভাবতে শুরু করলাম। আমরা এশিয়রা কেনো এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মগুলোকে ঠিক ফিল্ম বলি না, বা গ্রহণ করতে পারি না। কারণ এর ভাষা একদম ভিন্ন। ফলে তখন থেকে নিজের চিন্তার বাউন্ডারি আরো বৃহৎ করার কাজে নামলাম। আসলে কাজ না করলে কিছুই বোঝা যায় না।

এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম আসলে কবিতার মতো, মানে আপনি যদি কবিতার ভাষা না জানেন, তাহলে তার মর্ম উদ্ধার করতে পারবেন না। ফলে প্রথমে ভাষাটা রপ্ত করতে হবে। অর্থাৎ আমি তো ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ জানি না, তাহলে আমি কী কবিতা লিখবো! আমি যে কবিতাটা লিখবো, সেটা ‘টিনের চালে কাক বসেছিলো’ এ রকমই হবে! ফলে আমরা যে কয়জন এশিয়ান ছিলাম ওখানে, তারা ওই বস্তাপঁচা ফিল্মগুলোই বানিয়েছিলাম আসলে। সবচেয়ে স্কোর কম ছিলো আমাদের। সত্যি তখন বুঝেছিলাম, ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজে আমরা কিছুই জানি না। ধরেন, হাসান আজিজুল হক যেভাবে বর্ণনা করেন, তার ভাষার যে গাঁথুনি; প্রতিটি অনুভূতি যে ভাষায় ব্যক্ত করেনএটা যে করতে পারে, সেই আসলে করতে পারে। আমি বলি না, রবীন্দ্রনাথ সবকিছু লিখে রেখে গেছেন! কেনো তিনি লিখতে পেরেছিলেন, কারণ তার ভাষার প্রতি দখলটা ছিলো। চলচ্চিত্রের ভাষার ওপর সেই দখল আমাদের নেই। যে ভাষাটা আমরা বাইরে থেকে শিখে আসি, সেটা তো বিদেশি চলচ্চিত্র ভাষা (ল্যাঙ্গুয়েজ), আমাদের তাহলে বাংলাদেশি ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজ খুঁজতে হবে। এই জায়গা থেকেই গণসিনেমার কনসেপ্টটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিলো। জানেন, আমি না সেসময় প্রতিদিন শিখছিলাম। একেক দিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরতাম আর ভাবতাম এরপরের দিন গিয়ে কী করবো? কোনভাবে গিয়ে কাজ করলে গণসিনেমার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠবে। এই ছিলো আমার নিত্যকার চ্যালেঞ্জ নিজের সাথে নিজের! কারণ ওই গ্রামে যখন আমরা গেলাম, ওরা প্রথমে ভাবলো, বোধ হয় কোনো এনজিও টাকাপয়সা দিতে এসেছে। পরে দেখলো, না, এরা তো টাকাপয়সা দেয় না, খালি উল্টোপাল্টা কথা বলে! তখন আর তারা আমাদেরকে সময় দিতে চাইতো না।

এর পর তারা ভাবলো, এরা বোধ হয় আমাদেরকে খ্রিস্টান বানাতে এসেছেমিশনারিচুল ছোটো, প্যান্ট-শার্ট পরা মেয়ে! ওই গ্রামটা ছিলো শিডিউল কাস্ট। ঋষি বা মুচি পেশাজীবী প্রধান। অবশ্য ওরা এখন বেশিরভাগই পেশা বদল করেছে। তারপর ধীরে ধীরে মানে তিন বছর পরে আমি ওদের কাছে ফিল্ম নির্মাণ বিষয়টা নিয়ে আসলাম। তার আগে ওদেরকে পিটিপ্যারেড করাতাম, নবান্ন উৎসব করতাম, ইংরেজি পড়াতাম, সিনেমা দেখাতামএই জাতীয় নানা কিছু করে একটা বিশ্বাস স্থাপন করেছিলাম। ওদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম, ভাই, আর যাইহোক আমাদের দিয়ে তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না!

অবশ্য এখন তারা মাঝে মাঝে ফোন করে খোঁজখবর নেয়। তারা এখন প্রচুর টিকটক আর ইউটিউবে রিলস বানাচ্ছে। তবে এই ফিল্ম নির্মাণ প্রক্রিয়া ছিলো তাদের হাতেখড়ি। আমার টার্গেট ছিলো একটা ফিল্ম ওরা বানাবে, তার পরের ফিল্মগুলো ওরা নিজেরা নিজেরা বানাবে। আস্তে আস্তে সেটা ইন্ডাস্ট্রির দিকে যাবে। ওরা এখন নিজেরা অডিও-ভিজ্যুয়াল কাজটা করতে পারছে। যদি বলেন, এটাই আমার অ্যাচিভমেন্ট। এই পুরো প্রক্রিয়াটা আমি কিন্তু করেছি উইদাউট অ্যানি ফান্ড। এটা ছিলো আমার পাইলট প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টে আমি সাকসেস হবো কি হবো না, তার কিছুই জানতাম না। এতে একটা কাজ হলো, একটা কনসেপ্ট দাঁড় করানো গেলোগণসিনেমা। এটা কমিউনিটি ফিল্ম না, অ্যাজিট ফিল্ম না, ন্যাশনাল ফিল্ম না, প্রচলিত যেকোনো ফিল্ম জনরা থেকে ভিন্ন। ক্যামেরার সামনে-পেছনে সবাই একটি জনপদের মানুষ, যারা তাদের গল্প তাদের মতো করে সিনেমায় বলতে চায় এবং দেখাতেও চায়। এই হলো মূল বিষয়।

মামুন হায়দার : আমার কথা হলো, এই মানুষগুলোকে এই পর্যায়ে কনভিন্সড করা নিয়ে! সেটা কীভাবে সম্ভব হলো, আরকি!

নিগার বানু : দেখেন, একবার তো আমাদের মার খাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো! ওরা শিডিউল কাস্ট, সার্বজনীন পূজা উৎসবের চাঁদা দেয়, কিন্তু মন্দিরে প্রবেশের কোনো অধিকার ওদের নেই। কারণ ওরা ঋষি, মুচির কাজ করে। আমরা একবার করলাম কী, অনেক বেশি সংস্কারবাদী হয়ে গেলাম! আমরা মন্দিরের ওখানে গেলাম, যারা ব্রাহ্মণ ছিলো তারা অনেক গল্প করলো আমাদের সঙ্গে। তারা মনে করে আমরা সাংবাদিক, ক্যামেরা আছে যেহেতু। সাংবাদিকের কিন্তু দাম আছে, বুঝলেন! তারা আমাদের সঙ্গে নানা ধরনের কথা বললো, মা দুর্গা সাম্যের প্রতীক, আরো অনেক কিছু বললেন। তখন আমি গ্রামে এসে সবাইকে বললাম, চলেন মন্দিরে যাই। কেউ আর যায় না, একজন স্কুল মাস্টার ছিলেনতিনি সেখানকার একমাত্র মাস্টার্স পাশতার বউ বললেন, আমি যাবো। ওনাকে আমরা মন্দিরে নিয়ে গেলাম। সেখানে ওই মাস্টারের বউকে দেখার পর ওরা তো অবাক! ওই মহিলা ওখানে কী করে! ১৩ বছর হলো ওই মহিলা গ্রামে বউ হয়ে এসেছে, একদিনও মন্দিরে যেতে পারেননি। তারা মন্দিরের কম্পাউন্ডেই যেতে পারবে না। আমি তো তাকে সাজগোজ করে নিয়ে গেছি। ওখানে যাওয়ার পর দেখছি, তার হাত কাঁপছে। জীবনের প্রথম উনি মন্দিরে গিয়ে পূজা দিচ্ছেন! এই ঘটনা দেখে ধীরে ধীরে পান্ডারা দাঁড়িয়ে গেলো। অন্যান্য মানুষও আসা শুরু হলো। তারা বলতে থাকলো এটা তো ঠিক হচ্ছে না! ‘বেদ’-এ তো ওভাবেই লেখা আছে, আপনারা তো এটা অমান্য করতে পারেন না! খুব বেশি কিছু হলো না, আমরা পূজা দিয়ে চলে আসলাম।

পরে ভাবলাম, পূজা দিয়ে তো আসলাম, পরে যদি কিছু হয়? আমাদের ফ্যান্টাসির জন্য তো পুরো পরিস্থিতিটা খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই পরে আবার ওদের সবার সঙ্গে বসলাম, কথা বললাম, যাতে ওরা কোনো ধরনের রিভেঞ্জ নিতে না পারে। আরো সমস্যা ছিলো, ধরেন একেবারে নিজেদের ঘরের গল্প বলা তো, সেটাও খুব সহজ ছিলো না। আর দীর্ঘ সময় ধরে যেহেতু কাজটা হয়েছে, শুরুতে যাদেরকে যে চরিত্রে ঠিক করা হয়েছিলো পরে দেখা গেলো দুই-তিন বছরে তারা বড়ো হয়ে গেছে। বেশ কয়েকজন মেয়ের পটাপট বিয়ে হয়ে গেলো! ফলে দল ভেঙে গেলো। আবার নতুন লোক খুঁজে নেওয়া এবং ওই লোকগুলোকে আবার নিয়ে আসা। এটা একটা লাগাতার প্রোসিডিউর। তার পরও ক্যামেরায় কাজ করানো ডিফিকাল্ট! ধরেন, আমি হচ্ছি ট্রেইনার, মাস্টার। এখন ওরা যখন আমাকে শট্ নেওয়ার কথা বলে, তখন আমার শিক্ষিত মন জাগ্রত হয়ে যায়। এই তো ভুল শট্ হয়ে যাচ্ছে, পরে তো আমি মেলাতে পারবো না। তখন আমি-ই আবার ভেবেছি, এ রকম করলে তো গণসিনেমা হবে না। সবমিলিয়ে এই বিষয়গুলোকে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সড করতে হয়েছে। তার পর এডিটিং প্যানেল ওখানে নিয়ে গিয়ে কাজ করেছি। বেসিক ফান্ডটা ওরা দিলো, শহরের কিছু মানুষ দিলো। শুটিংয়ের সময় যে একবেলা খাইয়েছে সেও প্রোডিউসার। ওখানে পূজার যে মেলা হয়েছিলো, সেখানকার দোকানগুলো থেকেও টাকা তোলা হয়েছিলো। তার মানে হলো চিন্তা থেকে শুরু করে সিনেমা বানানো পর্যন্ত পুরোটা অর্গানিক। এবং ওই গ্রামেই আমরা প্রথম প্রিমিয়ার করলাম।

ওখানেই কিন্তু আমরা অডিশন নিয়েছিলাম। তিন বৃদ্ধা ছিলো, যাদের বয়স ৮০ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে। তাদেরকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে আসতে হতো। আমরা তো ভয়ে ছিলাম, হঠাৎ না কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়! তবে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে আমরা সিনেমাটা দেখাতে পেরেছিলাম। এই ধরনের নানা স্ট্রাগল ছিলো। তবে ওখানে যা যা ঘটেছিলো, সেগুলোর আমি নোট নিয়েছিলাম। অনেকটা অ্যানথ্রোপলজির ফিল্ড নোটের মতো। খুলনা শহর থেকে প্রথমে আমাদের টিমে ২৯ জন মানুষ ছিলো। শেষ পর্যন্ত ছিলো নয় জন। শুরুতে সবার একটা ফ্যান্টাসি ছিলো, ভেবেছিলো গ্রামে যাবো ফটাফট শ্যুট করবো, শুটিংয়ের স্টিল ফেইসবুকে দিয়ে হ্যাডম দেখাবো। কিন্তু বিষয়টা তো সেরকম নয়। তাই ঝরতে লাগলো আর নতুন নতুন কয়েকজন যুক্ত হতে লাগলো!

কাশিমপুর গ্রামটার পাশেই একটা প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে, ‘ভরত ভায়না’। ওটা আসলে একটা বৌদ্ধিস্ট ইউনিভার্সিটি। আমাদের কনসেপ্টটা এ রকম ছিলো যে, ইউনিভার্সিটির পদতলেই অন্ধকার, মানে আলোর নিচেই অন্ধকার। প্রত্নতাত্ত্বিক ওই নিদর্শনটা দেখার লোভে শহর থেকে অনেকেই তখন আমাদের সঙ্গে ওখানে যেতো। ফলে টিম বড়ো হয়ে গেলো। কিন্তু কাজের কাজ খুব বেশি কিছু হতো না। তবে শুরু থেকে আমরা যেটা দেখতে চেয়েছিলাম সেটা ফাইনালি আট বছর পরে দেখতে পেয়েছিলাম। মানে ওটার ল্যাঙ্গুয়েজটা এ রকম হবে, কনসেপ্টটা এ রকম হবে। সবমিলিয়ে আসলে কাজ করতে করতেই কনসেপ্টটা তৈরি হয়েছিলোট্রায়াল অ্যান্ড এরোর।

এইভাবে আট বছর ধরে সময় দেওয়া একটা অন্যরকম ব্যাপার। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, এই আট বছরে অন্য আরো অনেক কিছু করতে পারতাম। একাধিক ফিল্ম হতে পারতো আমার। তবে এই জিনিসটা হয়েছে। আর এই জিনিসটা তো খুব গ্ল্যামারস না, মানুষজনও খুব একটা জানে না। ফিল্ম আর্কাইভের জার্নালে এটা নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সেটা ছাপাও হয়েছিলো। তখন ওরা এটা নিয়ে একটা ওয়ার্কশপ করাতে চেয়েছিলো। পরে নানা কারণে সেটা আর হয়নি।

সাইক : এটা খুব জরুরি ছিলো, হলে ভালো হতো।

মামুন হায়দার : আমি সাইকের কাছে একটা বিষয় জানতে চাইবো, এতোক্ষণ এই যে আমাদের আলাপ হলো, সেখানে তুমি (সাইক) যেভাবে কাজ করো আর আপা যেভাবে কাজ করেন, এর মধ্যে কোনো ধরনের সম্পর্ক কিংবা পার্থক্য খুঁজে পাও?

সাইক : ছোট্ট একটা গ্যাপ মনে হয়েছে আমার। যেটা বললাম, আমরা আপার প্রোটোটাইপ আরকি। নিগার আপা যেটা করেছেনউনি মাথা ব্যবহারের যে কথাটা বললেন, মানে মাথা সক্রিয় হয়ে যায়, এটা তো ভুল হচ্ছে, পরে মেলানো যাবে না। তার পরও আপনি মাথাটা মাইনাস করে রেখেছেন! আর আমরা যেটা করেছি, আমাদের মাথা দিয়ে ওদের গল্পটা বলার চেষ্টা করেছি। এটাই হচ্ছে এ দুটো বিষয়ের মূল পার্থক্য।

আমাদেরও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ছিলো ওই জোনের মানুষকে নিয়ে কাজ করার। কারণ ওরা কিছুটা শিখবে এবং পরে ওদের গল্প ওরাই বলার চেষ্টা করবে। আমাদের এ ধরনের ফিল্ম মেকিংয়ের টার্গেট কিন্তু দুইটাপ্রথমত, এই ল্যাঙ্গুয়েজটাকে একটা সহজ জায়গায় নিয়ে আসা, যেনো যে কেউ এটা ব্যবহার করে তার গল্পটা বলতে পারে। আর সেটার জন্য যে বেসিকটা জানা দরকার সেটা যদি তারা না জানে তাহলে তো সেটা করতে পারবে না। ফলে ওই জায়গাটাও একটু এগিয়ে নেওয়া। ওটার খুবই মিনিমাল একটা জায়গা আমরা করতে পেরেছিআমাদের টিমের থার্টি পারসেন্ট ছিলাম আমরা আর বাকি সেভেনটি পারসেন্ট ছিলো তারা। ক্যামেরা চালানোর ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে আমরা চেষ্টা করেছি ওখান থেকে মানুষ নেওয়ার। ফলে আমাদের আকাক্সক্ষার জায়গাটা একই। কিন্তু নিগার আপার প্রায়োরিটিটা হচ্ছে, ওদের গল্প ওরা বলেছে, বাইরের কোনো লোক ওখানে ২০ বছর ধরে থাকলেও সেটা সম্ভব নয়।

অমিত : এখানে সময়টাও একটা ব্যাপার। দীর্ঘ সময় ওদের সঙ্গে পার করা।

নিগার বানু : আমি যে সময় এই কাজটা শুরু করেছিলাম, সেটা তখন অত্যন্ত টাফ ছিলো। কিন্তু এখন অতো টাফ না। কারণ এখন গ্রাম-শহর যাই বলেন, সবাই কিন্তু মোবাইল ফোনসেট দিয়ে কাজ করতে পারছে। ফলে এখন ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করতে পারার বাতাবরণটা অনেক বেশি। এখন আর শটের অ আ ক খ শেখাতে হবে না। তারা ওটা নিয়েই আছে। এখন কাজ হলো কেবল ধরিয়ে দেওয়া। মানে বাক্য গঠনটা শেখানো। হাতের লেখা আলাদা হোক তাতে সমস্যা নাই।

আর যদি পার্থক্য বলেন তাহলে আমি বলবো, মিডল ক্লাস তো সবসময় ডমিনেটিং ক্যারেক্টার। ফিল্মের ক্ষেত্রে তো আরো বেশি ডমিনেটিং। আমরা যখন শিক্ষানবিশ হিসেবে তানভীর ভাই কিংবা তারেক ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি, তখন ট্রলি বয় যে ছিলো, সেও মনে করতো, এই মহিলা কিছু পারে না। সে-ও পারলে আমাদের ওপর ডমিনেট করতো। কিন্তু আমরা যে পড়ালেখা করে আসা মানুষ সেটা ও মাথাতেই রাখছে না। ও ভাবছে তার পজিশনটাকে সে কীভাবে হাজির করবে। তখন তাহলে আমরা কী করতাম, ওকে বোঝানোর জন্য একটু ক্লাসিক সিনেমা, ডিরেক্টরদের নাম-টাম বলতামমায়া ডেরেন, তারকোভস্কি, গদার [সবার হাসি]।

এই স্ট্রাগলগুলো ছিলো। ফলে এখন আমাদের যেটা করা সত্যি সত্যি জরুরিএখানে আমার একটা অবজারভেশন আছেযে ছেলে কিংবা মেয়েটা শহরের, কিংবা গ্রামের, শিক্ষাগত পার্থক্য আছে, হয়তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে, তাদের দুই পক্ষের ফিল্ম টেস্ট এক!

সাইক : সেটা তো আপা হতেই পারে, এটা একেবারে ইন্ডিভিজ্যুয়াল বিষয়।

নিগার বানু : না, মানে আমি বলতে চাচ্ছি, ফিল্ম চয়েজের ক্ষেত্রে মানে টেস্টের [দর্শক হিসেবে দুই পর্যায়ের মানুষের রুচি] ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কাছাকাছি।

সাইক : ও সরি, বুঝতে পারছি।

নিগার বানু : ওদের ফিল্ম লিটারেসি আলাদা করে দাঁড়ায়নি। বিষয়টা এমন যে, এই ক্ষেত্রে ওরা কমিউনিস্ট মানে সাম্যবাদী।

অমিত : সাম্যটা কোথায়? সাম্যটা হচ্ছে, আমরা ভাববো না। আমরা এতো ভাবাভাবির মধ্যে নাই, দেখলেই হলো।

নিগার বানু : কিন্তু দেখেন মানুষের ব্রেইনটা তো ভাবার জন্যই। ও যখন বলে ভাববো না, সেটাও তো ও ভেবেই বলছে। ওদের সমস্যা হলো, ওরা নিজের অ্যানালিসিস করার ক্ষমতাকে ব্যাহত করতে চায় স্বপ্রণোদিতভাবে। কারণ বোধ হয় আলস্য!

সাইক : আমার কাছে মনে হয়, এই বাজারের মধ্যে মানে যে বাজারে এখন আমরা সিনেমা নিয়ে আলাপ করছি; এই বাজারে ওই অডিয়েন্সকে একটা জায়গায় ফিরিয়ে আনা, মানে ধরেন, আমরা যেহেতু এটা করি, আমাদের তো মনে হয় আরেকটু সেন্সেবল সিনেমা মানুষের দেখা দরকার, কিংবা মাথাটাকে আরেকটু ইউজ করা উচিত। এই ধরনের অ্যাক্টিভিটিজ হলে এটা বেটারমেন্টের দিকে যাবে। বিপরীতে অন্য সিনেমা তো আমাদেরকে বাজে রুচিবোধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

(চলবে)


সৈয়দা নিগার বানু

snbanu@gmail.com

তাওকীর ইসলাম সাইক

Touqir.footprint@gmail.com

অমিত রুদ্র

arudra.footprint@gmail.com

কাজী মামুন হায়দার

kmhaiderru@gmail.com



টীকা

১. অ্যাজিট ট্রেন : এই ট্রেন ছিলো মূলত ভ্রাম্যমাণ প্রচার কেন্দ্র; যার মধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রক্রিয়াকরণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিলো। এছাড়াও সেখানে ছিলো ছাপাখানা, নাট্যমঞ্চ ও বক্তৃতার জায়গা। রুশ গৃহযুদ্ধের সময়টাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে জনগণের সামনে প্রচারের জন্য অ্যাজিট ট্রেনকে সোভিয়েত রাশিয়ার বলশেভিক সরকার প্রচার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলো তাদের মতাদর্শকে দূরবর্তী অঞ্চলে পৌঁছে দিতে। সোভিয়েত রাশিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এই ট্রেন নিয়মিত যাতায়াত করতো। জিগা ভের্তোভ ও আলেকজান্দার পুদোভকিন-এর মতো চলচ্চিত্রনির্মাতারা এই অ্যাজিট ট্রেনের জন্য কনটেন্ট নির্মাণ করেছেন সক্রিয়ভাবে।


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন