Magic Lanthon

               

আসাদ লাবলু

প্রকাশিত ১০ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

নায়িকাদের মূলধন কি ‘সতীত্ব’?

আসাদ লাবলু


কোনো ধরনের জরিপের বরাত না দিয়েও বলা যায়, বর্তমানে বলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকাদের একজন দিপিকা পাড়ুকোন। এখন ক্যারিয়ারের তুঙ্গে আছেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই তারকা বলেছেন, বিয়ে করলে আমি অভিনয় ছেড়ে দিয়ে সংসারী হয়ে যেতে পারি। কারণ, আমার কাছে পারিবারিক সম্পর্কের চেয়ে কোনোকিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভালোপরিকল্পনা ও কারণ এক কথায় বলেছেন তিনি। এ রকম আরো কয়েকটি বাস্তবতা তুলে ধরবো; যেগুলো ধরে ধরে পরবর্তী আলোচনাটুকু করতে চাই।

ক. বিয়ের পর চলচ্চিত্র ছেড়েছেনবলিউডের এমন নায়িকাদের তালিকা দীর্ঘই। এর মধ্যে একটিতে ক্রমান্বয়ে আছেন টুইংকেল খান্না, গায়ত্রি যোশি, সোনালি বেন্দ্রে, আয়শা টাকিয়া, শিল্পা শেঠি। এই তালিকা আরো দীর্ঘ করতে ৮০ ও ৯০ দশকের নায়িকা নার্গিস দত্ত, সায়রা বানু, ববিতা, নিতু সিং, মিনাক্ষি শেষাদ্রি কিংবা মান্দাকিনির নামও বলা যেতে পারে।

খ. আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যম অনেকটা কৌতূহলের বশেই প্রশ্ন করেছেবলিউড নায়িকাদের মা হওয়ার বয়স কি ৩৭ বছর? উদাহরণ হিসেবে কয়েক নায়িকার নামও উল্লেখ করেছে তারা। এরা হলেনঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, মাধুরি দিক্ষিত, রানি মুখার্জি, শিল্পা শেঠি, কাজল দেবগন ও লারা দত্ত। বিষয়টি মোটেও কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়, তা আলোচনার দাবি রাখে।

গ. এবার ঢালিউডের দিকে আসা যাক। শাবনাজ, শাবনূর, পূর্ণিমা, হালযুগে সারিকা, আফসান আরা বিন্দু, সাহারা, শায়না আমিন, লামিয়াসহ সম্ভাবনাময় অনেক নায়িকা বিয়ের পর শোবিজ ছেড়েছেন।

ঘ. আর যারা টিকে আছেন; তারা টিকে থাকার জন্য বেশ কয়েকটি বিষয়ে সচেতন থাকেন। এই যেমন বেশিরভাগ সময়ই তারা প্রেমের সম্পর্ক স্বীকার করতে চান না; গোপন রাখেন। জোরালোভাবে সচেতন থাকেন রূপ, দেহ কিংবা যৌবন ধরে রাখা নিয়েও।

মোটামুটি এই কয়েকটি প্রবণতার উৎস খোঁজাই এই লেখার উদ্দেশ্য। সেক্ষেত্রে বাংলা চলচ্চিত্রের সংসার থেকে উদাহরণ টানা হবে। যদিও খুব বেশি উদাহরণ টানার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ, উপরে যতোটুকু বলেছি, তার আলোকেই চলচ্চিত্র সম্পর্কে মোটামুটি ওয়াকিবহাল দর্শকের মনে একাধিক উদাহরণ আপনা-আপনিই ফুটে উঠবে।

.

একটু পিছনে ফিরতে চাই; উপায়ও নেই। মূল খুঁজতে গেলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতেই হয়। স্বীকার করতেই হয়, যেসব দেশে সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ এক বিশেষ শ্রেণির জন্ম দিয়েছে, আমরা তার মধ্যে পড়ে গেছি। ফলে জটিল ও আপেক্ষিক এক প্রশ্ন ওঠে, এ রকম একটি পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিরাজমান সাংস্কৃতিক প্রবণতাকে আমরা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করবো। অনেকেই শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংস্কৃতিকে দেখতে আগ্রহী। কেউ কেউ আবার শ্রেণি বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুসন্ধানে উৎসাহী নয়। হালযুগের এ রকম একজন গবেষকের নাম অ্যান্ড্রু সার্টোরি।

শ্রেণীবিশ্লেষণ, ভাবাদর্শের সমালোচনা কিংবা ডিসকোর্স চর্চা, কোনোটাকেই তিনি যথেষ্ট বা যথার্থ মনে করেন না। কারণ সেগুলোর কোনোটাই বিশেষ বা স্থানিক ঘটনাপরম্পরাকে বিশ্বজনীন ইতিহাসে নির্দিষ্ট জায়গা দিতে পারে না। বলতে পারে না কেন একই সময় একাধিক দেশে একই রকম ঘটনা ঘটে যায়। তিনি ফিরিয়ে আনতে চান হেগেল-মার্ক্স অবলম্বনে এক বিশ্বজনীন কনসেপ্ট ইতিহাস যার মূল ভিত্তি হলো বিশ্ব-ইতিহাস নিয়ে সার্বিক দার্শনিক তত্ত্ব। তার কেন্দ্রে রয়েছে পুঁজি, বিমূর্ত শ্রম, উৎপাদন, বিনিময় ইত্যাদির চেনা ধারণাগুলো।

এক্ষেত্রে সার্টোরির প্রধান ও ঐতিহাসিক বক্তব্য হলো, কালচার বা সংস্কৃতির ইতিহাসও পুঁজির ভিত্তিতে অবস্থিত বিশ্বজনীন ইতিহাস হিসেবে লিখতে হবে।

আমার কাছে মনে হয়েছে, যে প্রবণতাগুলো খতিয়ে দেখা এই আলোচনার লক্ষ্য, সেগুলোর একটা বিশ্বজনীন রূপ আছে। কারণ বলিউড কিংবা ঢালিউড থেকে হাজার মাইল দূরের হলিউডের দিকেও কান দিয়ে শুনি, সেখানেও নারী-অধস্তনতার নানান কেচ্ছা রয়েছে। গেলো বছর সেখানকার সর্বোচ্চ উপার্জনকারী নায়িকা জেনিফার লরেন্স এক খোলা চিঠিতে লিখেছেন, ভালো মেয়ে হওয়ার দিন শেষ। এর কারণ পুরুষ অভিনেতার সঙ্গে তার পারিশ্রমিকের বৈষম্য। ওই খোলা চিঠিতে লরেন্স পারিশ্রমিক নিয়ে কোনো ছাড় দেবেন না, এমন ইঙ্গিত দিয়ে লেখেন, অন্যদের খুশি করার জন্য আমি আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে চাই না। ভালো মেয়ে হওয়ার দিন শেষ। আমার মনে হয় না কোনো অভিনেতাকে (পুরুষ) এই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়, তারা কোনো উচ্চবাচ্য ছাড়াই নিজেদের প্রাপ্য সবকিছু পায়।

বিশ্বজনীন রূপের আরেকটা নমুনা দেবো। চলচ্চিত্রে লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে গবেষণা করেছে জিনা ড্যাভিস ইন্সটিটিউট অন জেন্ডার ইন মিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নমুনা হিসেবে তারা নিয়েছে বলিউড, হলিউডসহ বিশ্বের লাভজনক ইন্ডাস্ট্রিগুলোর একশো ২০টি চলচ্চিত্র। তাতে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি বৈষম্যের কথা উঠে এসেছে। সেগুলোর মধ্যে প্রথম কয়েকটি এ রকম

প্রথমত, বিশ্বে গড়ে একজন নারী অভিনেতার বিপরীতে পুরুষ অভিনেতা থাকে দুই দশমিক ২৪ জন।

দ্বিতীয়ত, কোনো চলচ্চিত্রে সংলাপ কিংবা নাম আছে, এমন পাঁচ হাজার সাতশো ৯৯টি চরিত্রের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র ৩০ দশমিক নয় শতাংশ।

তৃতীয়ত, নারীচরিত্রের নেতৃত্ব থাকে মাত্র ২৩ দশমিক তিন শতাংশ চলচ্চিত্রে।

চতুর্থত, যৌন উত্তেজনা তৈরি করে এমন পোশাক-পরিচ্ছদ পুরুষদের চেয়ে নারী অভিনয়শিল্পীদের দ্বিগুণ বেশি পরানো হয়। এমনকি পুরুষের চেয়ে নারীচরিত্রকে পুরোপুরি কিংবা আংশিক উলঙ্গও হতে হয় দ্বিগুণ বেশি।

এই চিত্রটির মধ্য দিয়ে কেবল বিশ্বজনীন একটা রূপই আন্দাজ করা যায় না; সঙ্গে নারীর পণ্যমূল্য’ কোথায় সেটাও খানিকটা আন্দাজ করা যায়। আর এ কথাও বলা যায় যে, উল্লিখিত প্রবণতাগুলো নারীদের ভাগ্যেই বেশি দৃশ্যমান হয়। অর্থাৎ, এই প্রবণতাগুলোকে পরোক্ষভাবে লিঙ্গবৈষম্যের আওতায় আনতে খুব একটা বাধা থাকে না।

বিশ্বজনীন রূপের কথা বলছিলাম। কিন্তু মোটাদাগ’ শব্দটিরও অপর আছে। সংস্কৃতির দিক থেকে সেই অপর হলো, সংস্কৃতির ভাব-চিন্তা-কর্ম যেসব চেতনা কিংবা প্রয়োজন দ্বারা প্রভাবিত হয়, সেগুলো স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। বলতে চাচ্ছি, জেনিফার লরেন্স ও আমাদের নায়িকা পূর্ণিমা সমগোত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হলেও সেই দৃষ্টিভঙ্গির উপগোত্রীয় ব্যাপার-স্যাপার আছে। পূর্ণিমারা যেসব প্রতিবন্ধকতার ভিতর দিয়ে টিকে আছেন কিংবা ছিটকে পড়ছেন, লরেন্সদের সমাজে সেসব প্রতিবন্ধকতা ঘূর্ণিঝড়ের মতো সময়ের ব্যবধানে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সর্বস্তরের রাজা যিনি, পুঁজি কিংবা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যা-ই বলি না কেনো, তিনি নতুন-নতুন প্রতিকূলতা হাজির করছেন প্রতিনিয়ত। আর এসব প্রতিকূলতার রূপ স্থানিক ও কালিক জীবন ভেদে ভিন্ন, সে কথাই বলতে চাইছি।

এবার নমুনা দিয়ে এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে। ক’দিন আগেই একটি সংবাদ শিরোনামে দেখলাম পূর্ণিমা এখন কবিতা লিখছেন’। বেশ কৌতূহল জাগানিয়া বিষয়। শতাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করা এই নারী কেনো রুপালি পর্দা বাদ দিয়ে কবিতা লিখছেন! ক্যারিয়ার নিয়ে দোলাচলে পূর্ণিমা’এমন আরেকটি শিরোনাম আরো আগেই দেখেছিলাম। সংবাদটির শুরুতেই লেখা আছে, পুনরায় রুপালি পর্দায় ফিরবেন, নাকি সংসার সন্তান নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন, তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছেন তিনি। তবে ব্যক্তিগতভাবে পূর্ণিমার অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর পরিবার অসম্মতি প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।’

এখন কথা হলো, তিনি চলচ্চিত্রে ফেরেন আর না-ই ফেরেন, কবিতা লেখেন আর না-ই লেখেনএই অসম্মতি’টাই এই সমাজে পূর্ণিমাদের একটা বড়ো প্রতিবন্ধকতা। পরের খানিকটা আলোচনা এই অসম্মতি’ ধরেই করতে চাই।

.

এই না-রাজির উৎপত্তি কোথা থেকে? নিশ্চয় দৃষ্টিভঙ্গি। যখন কেউ চায় না যে, একজন নারী চলচ্চিত্রে অভিনয় করুক, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, তিনি আসলে চলচ্চিত্রের কোনো কোনো বিষয়কে নেতিবাচকভাবে দেখেন। এ নিয়ে ভয়ের জায়গাও আছে। ভয়টা কী রকম? বিষয়টা অনেকটা এ রকম যে, চলচ্চিত্রে অভিনয় করলে একজন নারীর খারাপ’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আর বাধাদানকারী মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গিতে নিশ্চয় খারাপ হওয়া বলতে এসব ভয় কাজ করে না যেওই নারী রুপালি পর্দায় গেলে মিথ্যাবাদী ও নিষ্ঠুর হয়ে যাবে, মানবিকতা হারাবে কিংবা ফৌজদারি কোনো অপরাধে লিপ্ত হয়ে যাবে! তাহলে কি সংসার বিমুখ হয়ে পড়ার ভয় কাজ করে? কিন্তু সেরকম হলে তো যেকোনো কর্মজীবী নারীকে নিয়েই সে আশঙ্কা হওয়ার কথা ছিলো। আমার মনে হয়, মূল ভয়টা যৌনতাবিষয়ক। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সতী নারী বলতে যা বুঝায়, এখানে সেই সতীত্ব হারানোর ভয় কাজ করে।

এখন এই ভয়টাকে কি অমূলক বলে উড়িয়ে দেবো, নাকি আমলে নেবো? উড়িয়ে দিতে চাইলে বলতে হবে, যে পুরুষ, ব্যক্তি কিংবা পরিবার কোনো নারীকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে অসম্মতি দেয়, তার যুক্তি নেই। অর্থাৎ, এই অসম্মতিটা একটা আজাইরা নিষেধাজ্ঞা। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই অসম্মতি পুরোপুরি আজাইরা না। বিংশ শতাব্দীর ৬০-এর দশকে চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপন নিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় মোলি হাস্কেলের ফ্রম রিভেঞ্জ টু রেপ : দ্য ট্রিটমেন্ট অব ওমেন ইন দ্য মুভিজ’ গ্রন্থটি। সেখানে তিনি বলেন, চলচ্চিত্র সমাজকে প্রতিফলন করে বা সমাজে চলচ্চিত্রের প্রভাব রয়েছে। সমাজকে প্রতিফলন করতে গিয়ে চলচ্চিত্রে নারীর যে সামাজিক নির্মাণ উঠে আসে, সেখানে সে হয় নন্দিত (কুমারী হিসেবে) অথবা নিন্দিত (পতিতা হিসেবে)।’১০

এটা ৫০ বছর আগের চিত্র হলেও বর্তমানে এ দৃশ্য খুব একটা পালটায়নি। এখনো দেখতে পাই, নায়িকার সঙ্গে সতীত্বের একটা পূর্বশর্ত থেকেই যায়। যে কারণে মূল নায়িকাকে কেউ ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষকের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার আগেই অবধারিতভাবে নায়কের আবির্ভাব ঘটে। ধর্ষক সফল হয় তখনই, যখন নায়িকা না হয়ে ওই নারী সহ-নায়িকা কিংবা নায়কের বোন হয়। এখানে নায়িকা ছাড়া অন্য কারো সতীত্ব হরণে কারো কিছু যায়-আসে না। নায়িকার সতীত্বের এতো দাম হওয়ার কারণ, তা নায়কের একান্ত। আর নায়ক হচ্ছে পুরুষ। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, নায়কের বোন কিংবা সহ-নায়িকাকে যৌনকর্মীর কাতারে ফেলা যায়, না হলে তা দেখে দর্শকের (অন্তত পুরুষের) মনে ক্রোধের পরিবর্তে সুড়সুড়ি জাগতো না।

যে চলচ্চিত্র বাজারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, সে চলচ্চিত্রের নায়িকা পণ্য হতে বাধ্য। এখন এই পণ্যের ব্যবহার নানারকম হতে পারে। একজন মানুষ হিসেবেও বাজারজাত করা যেতে পারে সেই নারীকে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সেই মানুষের তকমা নারী কিংবা নায়িকার গায়ে আমরা লাগাতে পারিনি। বরং তার বদলে কামকে পুঁজি করে যৌনতার তকমা লাগানো হয়েছে। আর এ কারণে কোনো বড়ো ব্যবসায়ী কিংবা করপোরেট কর্মকর্তাকে বিয়ে করলেও নারী নায়িকাকে অসম্মতির সামনে পড়তেই হয়।

.

লেখার শুরুতে নায়িকাদের মা হওয়ার বয়স নিয়ে কিছু কথা তুলেছিলাম। এবার এ নিয়ে খানিকটা আলোচনা করতে চাই। প্রথমেই প্রশ্ন হলো, জগতে এমন কী কী পেশা আছে, যেগুলোতে নারীকে বডি-ফিটনেস ধরে রাখতে হয়? উত্তরে কেবল ক্রীড়াবিদদের কথা বললেই হবে না, নায়িকাদের কথাও বলতে হবে। এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্রে (অবশ্যই আক্ষরিক অর্থে সব চলচ্চিত্র নয়) নায়িকাদের ফিটনেস ধরে রাখাটা জরুরি। আর এই ফিটনেস বলতে সুস্থতা যতোটা না বোঝায়, তার চেয়ে বেশি বোঝায় যৌবন ধরে রাখাকে। আবার যৌবন ধরে রাখা বলতে কেবল প্রজননে সক্ষমতা বোঝায় না। বরং আধুনিক’ সমাজ নির্ধারিত দেহের এক বিশেষ কাঠামোকে বোঝায়। প্রকৃতি থেকে এই কাঠামোর দূরত্বও কম নয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নারীদেহের যে কাঠামোটি সবচেয়ে জনপ্রিয়, তা মূলত ইউরোপিয় সৌন্দর্যতত্ত্ব থেকে ছড়িয়েছে। এর জনক বলা হয় ১৮ শতকের জার্মান বুদ্ধিজীবী জোয়াকিম উইনকেলমানকে। বিভিন্ন দেহ মানে নারী কিংবা পুরুষ উভয়ের কাছ থেকে অঙ্গ নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে একটি সঙ্কর আদর্শ নারীদেহ’ নির্মাণ করেন তিনি। উইনকেলমান-এর মাপকাঠি অনুযায়ী নারীর স্তন বেশি বড় হবে না, নিতম্ব ভারী হবে না, রোগা হতে হবে কিন্তু হাড় ফুটে উঠবে না।

আমাদের উপমহাদেশে এখন এই নারী দেহের চল সবচেয়ে বেশি। ফলে নায়িকাকে কেবল ফরসা হলেই চলে না, পিঠ হতে হয় বিপাশা বসুর মতো চওড়া, নাক হতে হয় সুচিত্রা সেনের মতো, নিতম্ব হতে হয় অন্য আরেকজনের মতো। এই সঙ্কর দেহ অর্জন এবং তা ধরে রাখার জন্য চলে নায়িকাদের নিরন্তর চেষ্টা। যার জন্য ইয়োগা থেকে আছে প্লাস্টিক সার্জারির ব্যবস্থা। আর তা ধরে রাখার জন্য তো মাতৃত্বটা একটু পিছিয়ে দেওয়া যেতেই পারে।

বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মাতৃত্বের আরেকটি নেতিবাচক মনস্তত্ত্ব সমাজে কিংবা দর্শকমনে গড়ে উঠেছে। সেটা হলোসন্তান হলে কোনো নারী আর যুবতী’ থাকেন না, মহিলা’ হয়ে যান। আর এ কারণেই হয়তো অনেক নায়িকা এমন একটা বয়সে গিয়ে সন্তান নেন, যখন আর ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা থাকে না। এই সন্দেহের পিছনে প্রধান একটা যুক্তি হলোআমাদের মধ্যে নায়িকা নিয়ে যে ধ্যানধারণা বা ডিসকোর্স রয়েছে, সেখানে বয়স একটা ব্যাপার। একটু বয়স্ক মনে হলেই আমি অনেক দর্শককে বলতে শুনেছিনা, অমুক অভিনেত্রী বুড়ি হয়ে গেছেন, তাকে আর নায়িকা হিসেবে মানায় না। আর ঠিক এই অভিযোগটা ফাঁকি দেওয়ার জন্যই চলে যৌবন ধরে রাখার চেষ্টা।

আরেকটা প্রবণতার কথা বলেছিলাম; নায়িকারা প্রেমের সম্পর্ক লুকাতে চান। এই নজির হলিউড, বলিউড, ঢালিউড সব ইন্ডাস্ট্রিতেই আছে; নতুন করে উদাহরণ দেওয়ার কিছু নেই। ধরুন, একজন নারী একযোগে দুই পুরুষের সঙ্গে প্রেম করেন। এক্ষেত্রে তাকে সবসময় সচেতন থাকতে হয়, এই প্রতারণার খবরটি যেনো প্রেমিকদ্বয় না জানতে পারে। জানাজানি হলেই অন্তত একজন প্রেমিক হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা আছে। আমার মনে হয়, নায়িকাদের বেলায়ও এমনটা ঘটে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একজন পুরুষ বাদেও পুরো দর্শকসমাজ তার একজন প্রেমিক হিসেবে কাজ করে। ফলে এই দর্শক-প্রেমিকের’ কাছে তাকে অন্য প্রেমিককে আড়াল করতে হয়। আর ফাঁস হয়ে গেলে দর্শক-প্রেমিক তাকে বাদ দিয়ে নতুন কোনো প্রেমিকার/নায়িকার সঙ্গে সম্পর্ক বাঁধতে পারে এই আশঙ্কা থাকে। আর বাজারে দর্শকের জন্য প্রেমিকা-নায়িকার তো কোনো অভাব নেই।

গণমাধ্যমে নায়িকা কিংবা তারকাদের বিয়ের খবর প্রচারের সময় একটা বাক্য প্রায়ই ব্যবহার করতে দেখা যায়, যেটা খুবই ইন্টারেস্টিং। ধরুন, এখন যদি চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও মডেল বিদ্যা সিনহা মীম কাউকে বিয়ে করেন, তাহলে অনেক গণমাধ্যমের শিরোনাম হবে এ রকমলাখো যুবকের হৃদয় ভেঙে বিয়ের পিঁড়িতে মীম’। এখানে খুব সহজেই বোঝা যায়, আক্ষরিক অর্থে লাখো পুরুষ মীমকে বিয়ের স্বপ্ন দেখেনি। কিন্তু অবিবাহিত কিংবা অপ্রেমাহিত মীমকে যখন ওই সব যুবক অবচেতনভাবে বউ কিংবা প্রেমিকা ভেবেছে, তখন সেই ভাবনায় কোনো শরিক ছিলো না। কিন্তু প্রেমিক কিংবা স্বামীর নাম জানাজানি হয়ে গেলে সেই যুবকের ভাবনা আধিপত্য হারায়।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, দর্শকের মনে এই অবুঝের মতো বুঝ আসলো কীভাবে। এর কারণ দুটো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুসন্ধান করা যেতে পারে। প্রথমত যেটা বলবো, সেটা একটু আগেই আলোচনা করেছি। অর্থাৎ, প্রকৃতিতে সে যে নারীকে দেখে, নায়িকার সঙ্গে তা মেলে না। তার সাধ্যের মধ্যে প্রকৃতিতে যা আছে, তা শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে তাকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ। কারণ, ফ্যাক্টরিতে বানানো পণ্যে যতো খুশি ডিজাইন করা যায়, কিন্তু ক্ষেতের পণ্যে ততো পারা যায় না। ফলে বাচ্চাকাচ্চাদের মতো দর্শকদের মধ্যেও দোকানি-জিনিস ভোগের একটা বাসনা তৈরি হয়। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি হলো, এই বাসনাকে ভোগবাদী সমাজের সৃষ্টি হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই সমাজ মানুষের মধ্যে প্রধানত দু-ধরনের বাসনা তৈরি করে। এর একটি বাসনা পূরণ হওয়া সম্ভব। এজন্য কেবল অর্থ বিলাতে হবে, যেমনটিভি, ফ্রিজ, স্মার্টফোন, বাইক, প্রসাধনসামগ্রী ইত্যাদি। দ্বিতীয় বাসনাটি পূরণ হওয়ার নয়। যেমন কোনো সুন্দর নায়িকার সঙ্গে রাত কাটানো। কিন্তু দ্বিতীয় বাসনাটির সবচেয়ে বড়ো গুণ হলো, সেটি ব্যক্তিকে প্রথম বাসনার প্রতি উৎসাহিত করে। একদিক থেকে দ্বিতীয় বাসনাটি অযৌক্তিক, তাই একে মোহও বলা যেতে পারে।

.

নায়িকাদের এই অধস্তনতাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো উপায় নেই। আধুনিক’ এই সমাজে এটি নারীদের সামগ্রিক বাস্তবতার খণ্ডিত অংশ। এই বাস্তবতার সূত্রপাত খুঁজতে হলে অনেক পিছনে ফিরে যেতে হবে। এক্ষেত্রে ভারতবর্ষের ইতিহাসে খোঁড়াখুঁড়ি করলে যা মিলবে

প্রাচীন ভারতে যখন মুদ্রার প্রচলন হয়নি, যখন উৎপন্ন ছিল কিন্তু পণ্য ছিল না, পণ্যবাহী সমাজের সূত্রপাত হয়নি, যখন আদিম সাম্যবাদী যৌথ সমাজ তখনও বিরাজিত, তখন যৌথ সামাজিক উৎপন্নসমূহকে বলা হত লক্ষ্মী এবং যৌথ সামাজিক সম্পদের ধারণাকে বলা হত সূর্য্য। সেই কারণে পূরাণাদিতে সূর্য্যরে প্রথম পত্নীর নাম বলা হয়েছে লক্ষ্মী। এই সেই অধ্যায় যখন নারী মানবসমাজের পরিচালিকা, সমাজ যৌথ, সাম্যবাদী ও মাতৃতান্ত্রিক।১২

অর্থাৎ, নারী জন্মগতভাবেই এমন পোড়াকপালি নয়। তবে নায়িকারা কি জন্মগতভাবে পোড়াকপালি? অনেকটা তা-ই। উত্থান-পতনের গল্পটা বাদ দিলে ভারতীয় উপমহাদেশে নায়িকাদের সামাজিক মর্যাদা কখনোই সন্তোষজনক ছিলো না। শুরুর দিককার এ গল্প তো সবারই জানানায়িকা হতে হিম্মত লাগতো। তবে শুরুর দিককার উল্লেখযোগ্য ইতিবাচকতা এই যে, তখনকার সময় নায়িকাদের স্তন ও নিতম্বের আদর্শ কোনো মাপ ছিলো না।

দিপিকা পাড়ুকোনের শুরুর সংলাপটা দিয়ে আলোচনার শেষটা করতে চাইপারিবারিক সম্পর্কের চেয়ে কোনো কিছুই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। যদি মেনেও নিই যে, পরিবারের গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি, তবে সেই গুরুত্ব টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কি কেবল নারীর ওপরই বর্তাবে? আর বর্তালেও কি অন্য সবকিছু একপাশে ফেলে দিয়ে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে? না, সবাইকে তা করতে হবে না, করতে হয়ও না। কেবল নায়িকাদের বেলায়ই এই ঝুঁকি বেশি থাকে। সতী নারী নির্বাচনের জন্য ভোট হলে এই সমাজ এখনো একজন নায়িকার চেয়ে একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীকে বেশি ভোট দিবে।

আরেকটা প্রশ্ন, নারী কি ইতিহাসের শুরু থেকেই বৈষম্য মেনে নিতে শিখেছে? না, মেনে নেওয়ার কথা নয়। নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে মেনে নেওয়া শেখানো হয়েছে; কখনো বাধ্য করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষক বা প্রভু কেবল পুঁজি ছিলো না, ছিলো ধর্মও। এখনো ভারতীয় উপমহাদেশে একটা দম্পতি যতোটা সামাজিক রীতিতে চলে, তার চেয়েও বেশি চলে ধর্মীয় রীতিতে। আর সেই ধর্মের দেবতা আর এখনকার পুরুষ একই সুচাগ্রে গাঁথা।

রাবণ একবার পরিব্রাজক বেশে সীতাকে অপহরণ করতে গিয়েছিলেন। পরনে ছিলো সূক্ষ্ম রক্তবসন। সীতা একাকিনী পর্ণকুটিরে বসেছিলেন। তার পরনে ছিলো অতি সূক্ষ্ম রেশমবস্ত্র। রাবণ তার সামনে গিয়েই বলতে শুরু করেন

হেমবর্ণে! তুমি পদ্মমাল্যধারিণী পদ্মিনীর ন্যায় বিরাজ করিতেছ। ... তোমার দন্তসকল সমচিক্কণ, পাণ্ডবর্ণ ও সূক্ষ্মাগ্র, নেত্র নির্মল, তারকা কৃষ্ণ ও অপাঙ্গ আরক্ত, তোমার নিতম্ব মাংসল ও বিশাল, ঊরু করিশুণ্ডাকার এবং স্তনদ্বয়-উচ্চ, সংশ্লিষ্ট, বর্তুল, কামনীয় ও তালপ্রমাণ।১৩

এই সময়ে এসে একজন অপরিচিত পুরুষ একজন নারীর দেহ নিয়ে এমন মন্তব্য করলে কী অবস্থা হওয়ার কথা, একবার চিন্তা করে দেখুন। কিন্তু অবাক হওয়ার মতই কথা, সীতা সামান্যতম লজ্জিত, সন্ত্রস্ত বা অপ্রতিভ হয়েছেন এমন কথা বাল্মীকি-রামায়ণে মেলে না।’১৪

সীতার এই নীরবতা যতোদিন না ভাঙবে ততোদিন পূর্ণিমা, শাবনূর কিংবা আফসান আরা বিন্দুরা চলচ্চিত্র আর সংসার একসঙ্গে চালিয়ে নিতে পারবেন না। বিয়ের পর বিন্দু বলেন, আমার পক্ষে আসলে একসঙ্গে দুটি বিষয় চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এখন থেকে নিজেকে পুরোপুরিভাবে পরিবারের কাজে নিয়োজিত করতে চাই।’ ... তবে দর্শকরা মিস করলে কী করবেনজানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বিন্দু।

লেখক : আসাদ লাবলু, কালের কণ্ঠ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

 

তথ্যসূত্র

১. http://goo.gl/5ikbE5; retrieved on 27.11.2015

২. http://goo.gl/Cl2myn; retrieved on 24.11.2015

৩. http://goo.gl/P5eaJi; retrieved on 23.11.2015

৪. চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০১৩ : ৫৬); বাঙালি সংস্কৃতির বিশ্বজনীন ইতিহাস’; জনপ্রতিনিধি; অনুষ্টুপ, কলকাতা।

৫. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১৩ : ৫৬)।

৬. http:/bangla.bdnews24.com/glity/article1040002.bdnews; retrieved on 20.11.2015

৭. http://goo.gl/42ccCd; retrieved on 28.10.2015

৮. http:/ww/w.kalerkantho.com/print-edition/rangberang/2015/11/10/288849; retrieved on 13.11.2015

৯. http://goo.gl/e33kg1; retrieved on 01.12.2015

১০. http:/ww/w.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/28773144; retrieved on 18.11.2015

১১. ঘোষদস্তিদার, গার্গী (১৪০৯ : ১২২); সুন্দরীর ঔপনিবেশিক অপর হটেনট ভেনাস’; হাওয়া ৪৯; হাওয়া ৪৯ প্রকাশনী, কলকাতা।

১২. খান, কলিম (১৪০৬ : ৬৭); লক্ষ্মীর পাঁচালি : ওয়েলফেয়ার ইকনমির ভূত-ভবিষ্যৎ’; দিশা থেকে বিদিশায়; হাওয়া ৪৯ প্রকাশনী, কলকাতা।

১৩. ভারতী, দিলীপকুমার (২০০২ : ৪২); ভারতের রূপসংস্কৃতি ও যৌনতা’; যৌনতা ও সংস্কৃতি; সম্পাদনা : সুধীর চক্রবর্তী; পুস্তক বিপনি, কলকাতা।

১৪. প্রাগুক্ত; ভারতী, দিলীপকুমার; (২০০২ : ৪২)।

১৫. http://primenews.com.bd/bn/?p=49738; retrieved on 28.11.2015

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন