মোহাম্মাদ আলী মানিক
প্রকাশিত ১০ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্রে বাবা : যাপিত জীবন থেকে আলাদা করা মুশকিল
মোহাম্মাদ আলী মানিক

প্রিয়
হিলদিতা, আলেইদিতা, কামিলো, সেলিয়া ও এর্নেস্তো—
তোমরা যখন এই চিঠি পড়বে তখন আর আমি তোমাদের মধ্যে থাকব না। আমার কথা তোমাদের প্রায় কিছুই মনে পড়বে না, আর ক্ষুদে দুটোর তো কোন কিছুই মনে পড়ার কথা নয়। তোমাদের বাবা এমন একজন মানুষ হয়ে উঠেছে—যে তার চিন্তা ও কাজে এক, এবং অবশ্যই সে তার নিজস্ব চিন্তাধারার প্রতি হয়ে উঠেছে বিশ্বস্ত। তোমরা হয়ে ওঠো ভাল বিপ্লবী। ভাল করে পড়াশোনা কর যাতে প্রযুক্তিবিদ্যায় দখল আসে, যে প্রযুক্তিবিদ্যা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়। একথা মনে রেখো যে, বিপ্লবই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এছাড়া একক ব্যক্তি হিসেবে আমাদের আলাদা কোনও মূল্য নেই। সর্বোপরি, এই পৃথিবীর যে কোনও অংশে যে কোনও মানুষের বিরুদ্ধে যে কোনও অন্যায়-অবিচার সংঘটিত হলে তা গভীরভাবে অনুভব করার চেষ্টা করবে। এটাই একজন বিপ্লবীর সবচেয়ে বড় গুণ।
চিরবিদায়, সোনারা, যদিও তোমাদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। বিরাট [অনেক] চুম্বন ও বিপুল ভালবাসা।১
চে গুয়েভারা এই চিঠি লিখেছিলেন তার সন্তানদের উদ্দেশে। অবিনাশী এই বিপ্লবী যুদ্ধের ময়দানে থেকে যেমন সন্তানদের মঙ্গল কামনা করেছেন; তেমনই বিশ্বের নিপীড়িত, শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, তার সন্তানরাও যেনো আদর্শ বিপ্লবী হয়ে ওঠে। বিপ্লবী চে গুয়েভারা হয়তো সামগ্রিক বিবেচনায় তার সন্তানদের জন্য এই কামনা করেছিলেন। যদিও চে’র এই চাওয়ায় অনন্যতা আছে। তিনি নিজের, পরিবারের ও সন্তানদের কথা ভাবেননি; ভেবেছিলেন বিশ্বমানবতার কথা, মানব কল্যাণের কথা।
চে’র এই চাওয়া একদিকে যেমন ভিন্ন রকমের, অন্যদিকে একেবারেই গতানুগতিক। যা অধিকাংশ বাবাই চায়—তার ইচ্ছেতেই সন্তান বড়ো হবে। সমাজ পরিবর্তনের দিশারি হয়েও বাবা চে কিন্তু চলতি কাঠামোর বাইরে আসতে পারেননি; পারেননি সেই কাঠামো ভাঙতেও! যদিও তিনি এক জীবনে অনেক কাঠামোই ভেঙেছিলেন। তার পরও চে কী কারণে যেনো এই ডিসকোর্সের বাইরে আসতে পারেননি, যেখানে সামগ্রিকতার (সন্তান, মা) কোনো মূল্যায়ন হয় না।
চে’র মতো আমাদের দেশের অধিকাংশ বাবাই তাদের সন্তানকে নিজের ইচ্ছের কাছে সপে দিতে চান। উৎপাদন উপকরণের মালিকানা যেহেতু তার হাতে থাকে, সেজন্য এটা নিয়ে বল প্রয়োগ করাও তার জন্য সহজ হয়। আর সহজ হবেই না-বা কেনো, আর্থিক ভিত্তির বাইরেও পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে বাবা ও তার ইচ্ছের চর্চা চলে প্রতিনিয়ত। সেই চর্চা গণমাধ্যম, বিশেষ করে চলচ্চিত্র কীভাবে অব্যাহত রাখে তা-ই এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয়। এ লক্ষ্যে উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়নের মাধ্যমে বাবাকেন্দ্রিক তিনটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র—মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের জন্মদাতা (১৯৯২), রাজ্জাকের বাবা কেন চাকর (১৯৯৭) ও মনতাজুর রহমান আকবরের বাবা কেন আসামীকে (২০০০) বেছে নেওয়া হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে স্বীকৃত কোনো বক্স অফিস (চলচ্চিত্রের ব্যবসার খতিয়ান রাখে এমন প্রতিষ্ঠান) নেই। তার পরও সাধারণ পর্যবেক্ষণ ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি খুঁজে বাবাকেন্দ্রিক ব্যবসাসফল এ তিনটি চলচ্চিত্র বাছাই করা হয়।
গণমাধ্যমে পুরুষ রিপ্রেজেন্টেশন
ব্যক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সমাজ। ব্যক্তি-মানুষ অনুশাসনের মাধ্যমে সমাজে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলে। আধুনিক সমাজ গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই গড়ে ওঠে অনুশাসনের কৌশল। এই কলাকৌশল ব্যক্তির রক্তমাংসে পুশ হয় না, হয় চেতনায়। ফলে ব্যক্তি-মানুষ সেই অনুশাসনে বাঁধা পড়ে স্বাভাবিক নিয়মেই। তাই টিকে থাকে সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে মিশেল ফুকোর ভাষ্য হলো, ‘আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র আদৌ সার্বভৌমত্বের ছক মেনে চলে না, চলে অনুশাসন বা ডিসিপ্লিনের ছকে।’২ তার মানে দাঁড়ায়, অনুশাসন সার্বভৌমত্বকে টিকিয়ে রাখে। যা দিয়ে রাষ্ট্র সমাজকে অধীনস্ত, রূপান্তর ও বিকশিত করে।
আদিম সমাজে নারীরা শিকারে নেতৃত্ব দিতো; সমবেতভাবে জমি তৈরি, বীজ বোনা, ফসল কাটা ও ঘরে তোলার কাজ করতো। সেই সময়ে নারীর মর্যাদা ছিলো পুরুষের চেয়ে বেশি। তাদের কথা মান্য করা হতো। কিন্তু দাস সমাজে এসে নারীর সেই অবস্থান পালটে গেলো। পুরুষ নারীকে ‘তার সম্পদ, তার জন্য ভোগ্য পণ্য হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু’৩ করলো। শুরু হলো নারীর ওপর পুরুষের শোষণ-অত্যাচার। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে এসেও নারীর ওই অবস্থার কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না। আর তারই ধারাবাহিকতায় নারীর ভোগবাদী উপস্থাপনের চরম রূপ দেখা যায় পুঁজিবাদী সমাজে। সময়ের বিবর্তনে শিকারে নেতৃত্ব দেওয়া নারীই এই সমাজে এসে হলো সৌন্দর্য সামগ্রী, মমতাময়ী মা, পুরুষনির্ভর সত্তা, যৌন বস্তু, প্রসাধনপ্রিয়, কলহপ্রিয়, গৃহিণী, স্ত্রী, শারীরিক-মানসিকভাবে দুর্বল ও যৌনকর্মী।
আমাদের সমাজে নারী কারো মা, বোন কিংবা মেয়ে হিসেবে; বিপরীতে একইভাবে পুরুষও কারো বাবা, সন্তান কিংবা ভাই হিসেবে জীবন অতিবাহিত করে থাকে। তার মানে নারী-পুরুষ উভয়কেই ভিন্নভাবে একই ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তাহলে গণমাধ্যম শুধু পুরুষকেই কেনো কর্মঠ, পেশিবহুল, শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করে? তাহলে কি সমাজ তার নিজ প্রয়োজনেই ‘পুরুষের’ এই ডিসকোর্স চালু রেখেছে? বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা যাক। বাংলা একাডেমির ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধান অনুযায়ী, ‘হ্যান্ডসাম (Handsome) শব্দটির অর্থ সুশ্রী। যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে সুদর্শন, সুপুরুষ; আর নারীর ক্ষেত্রে সুগঠিত দেহ, প্রাণশক্তি ও মর্যাদার অধিকারিণী অর্থ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, আমাদের সমাজে সুদর্শন-সুপুরুষ অর্থে হ্যান্ডসাম শব্দটি ব্যবহার হলেও, ‘সুগঠিত দেহ, প্রাণশক্তি ও মর্যাদার অধিকারিণী’ অর্থে কোনো নারীর ক্ষেত্রে তা কখনোই ব্যবহার হতে দেখা যায় না।
অন্যদিকে ইংরেজি ‘সেক্সি (Sexy) শব্দটির ব্যবহার নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। বাংলা একাডেমির ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধানে এর অর্থ করা হয়েছে ‘লিঙ্গঘটিত; যৌনতাঘটিত; যৌন আবেদনময় ও যৌন আকর্ষণপূর্ণ’। অভিধানের এই অর্থগুলোর কোথাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি শব্দটি কোন লিঙ্গের জন্য ব্যবহার করা হবে। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা ব্যবহার হয় নারীর যৌন আবেদন বোঝানোর জন্য। তার মানে, অভিধানে কোনো শব্দের অর্থ যাই থাকুক না কেনো, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার স্বার্থ রক্ষা করেই ওই শব্দের অর্থ নির্মাণ করে, অর্থাৎ শব্দের মাধ্যমে নারী-পুরুষের অবস্থান নির্ধারণ করে।
বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে বাংলা ‘মাল’ শব্দটির পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যার আভিধানিক অর্থ-জিনিসপত্র, ধনসম্পদ, কুস্তিগির, মদ, উঁচু জমি। কিন্তু পুরুষের কাছে এসে এই ‘মাল’ হয়েছে ইংরেজি ‘সেক্সি’র সমার্থক। বর্তমান সময়ে পুরুষের মুখে ‘মাল’ শব্দটি শুনলে আভিধানিক অর্থের পরিবর্তে প্রথমেই মনে পড়ে ‘৩৬—২৪—৩৬'’ মাপের কোনো নারী-শরীরের কথা। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ‘স্মার্ট (Smart)। বাংলা একাডেমির ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধান এর অর্থ দিয়েছে—উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন, কেতাদুরস্ত, দক্ষ, তীক্ষ্মধী, ক্ষিপ্র, চটপটে, কঠোর ইত্যাদি। কিন্তু অভিধানের কোথাও উল্লেখ নেই, শব্দটি নির্দিষ্ট কোন লিঙ্গের জন্য। অথচ পুরুষের ক্ষেত্রে হরহামেশাই এই শব্দের ব্যবহার দেখা গেলেও সাধারণত নারীর ক্ষেত্রে তা খুব একটা দেখা যায় না, বরং অনাগ্রহটাই চোখে পড়ে।
তার মানে, ভাষা ব্যবহার করে আমাদের চারপাশকে অর্থপূর্ণ করে তোলা হয়। এই অর্থপূর্ণ করে তোলাকে স্টুয়ার্ট হল বলছেন রিপ্রেজেন্টেশন। রিপ্রেজেন্টেশন হলো ‘‘ভাষাকে ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের কাছে দুনিয়াকে অর্থপূর্ণভাবে বলা বা উপস্থাপন করা।”৪
এই ভাষা হতে পারে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, পেইন্টিং ইত্যাদি। রেপ্রিজেন্টেশনের ধারণা সেই ভাষাকে এবং এর অর্থকে সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে। অর্থবহনকারী শব্দ, ধ্বনি, ও ইমেজকে আমরা চিহ্ন নামক সাধারণ পরিভাষায় বর্ণনা করে থাকি। আমরা আমাদের মধ্যে যেসব ধারণা ও সেগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ধারণাগত সম্পর্ক নিয়ে ঘুরি-ফিরি, চিহ্ন সেগুলোকে রেপ্রিজেন্ট করে অথবা প্রতিনিধিত্ব করে এবং এ গুলো একত্রে আমাদের সংস্কৃতির অর্থ-পদ্ধতি তৈরি করে।৫
এটি ধারণা ও ভাষার সঙ্গে একান্তই সম্পর্কিত, যা আমাদের সামনে বাস্তব বা কল্পনার বস্তু, ঘটনা ও মানুষ নির্দেশ করার সামর্থ্য রাখে। এটি এমন একটি বিষয় যার সঙ্গে ভাষার ব্যবহার, ইমেজ ও সাইন সম্পৃক্ত।
রুপালি জগতে (চলচ্চিত্র) শক্তিশালী পুরুষের উপস্থাপন করা হয়; একজন পুরুষ কাকতালীয়ভাবে হাজির হয়ে একজন নারীকে ধর্ষণের হাত থেকে উদ্ধার করে। কিন্তু ১০—১২ জন পুরুষের (সহ-অভিনেতা) বিপরীতে একজন পুরুষের (নায়ক) দেহপ্রতিম আধিপত্য প্রকাশ করে, যা কখনোই সত্য নয়। আবার কোনো কোনো চলচ্চিত্রে শেষের দৃশ্যে ৫০—১০০ সহ-অভিনেতার বিপরীতে নায়ক উদ্ধার করে নায়িকাকে। তার মানে পুরুষ শক্তিশালী। মেয়েরা কেবল উদ্ধার হয়, শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। তাহলে বিভিন্ন চিহ্নের মাধ্যমে ক্ষমতাবান হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করা হচ্ছে পুরুষকে। উলটোদিকে নারীকে ভোগের বস্তু, পণ্য, গৃহকর্মী, মমতাময়ী মা, কর্মবিযুক্ত/পেশাহীন, পুরুষনির্ভর সত্তা ইত্যাদি হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করা হচ্ছে।
বাবা/পিতার নানা রূপ
পিতার সমার্থক শব্দ হিসেবে সাধারণত ব্যবহার হয় জনক, জন্মদাতা, বাবা, আব্বা, বাপ। এর মধ্য থেকে ‘বাপ’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায় “‘চর্যাপদ ২০”’-এ। ১২০০ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধদের রচিত চর্যাপদের ‘মূল পখলি বাপ সংঘারা”’ বাক্যে ‘বাপ’ ব্যবহৃত হয় বাবা অর্থে। ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে এসে বড়ু চণ্ডীদাস ‘‘পিতা”’ শব্দটি জনক অর্থে ব্যবহার করেন এভাবে—“বীর পিতা শ্রীবসুল’। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ১৬০০-তে জনক ও বাবা শব্দের সমার্থক হিসেবে ‘পিতা’ ব্যবহার করেন। আধুনিক যুগের শুরুতে অর্থাৎ ১৮০২-এ উইলিয়াম কেরি প্রথম ‘বাপ”’কে ‘পিতৃস্থানীয় প্রভাবশালী”’ ব্যক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন এভাবে—“তখন তোমার কোন বাপে রাখে তাই দেখিব’। চণ্ডীদাসের মতো ১৮৩৯-এ “শিশু সেবধি’ পত্রিকা পিতাকে ‘সৃষ্টিকারী’ অর্থে লেখে—“উপদ্রব জনক সে ব্যক্তি হয়’।
উইলিয়াম কেরির অনুসরণে পিতাকে “‘প্রভু’ অর্থে ব্যবহার করে ১৮৮০-তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন, ‘“তুমি কি গো পিতা আমাদের’। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে কাজী নজরুল ইসলাম আব্বা শব্দটি পিতা অর্থে ব্যবহার করেন এভাবে—“রেখেছ আব্বা ইবরাহিম সে আপনা রুদ্র পান’। আবার ১৯৩১-এ এসে উইলিয়াম কেরিকে অনুসরণ করে তিনিও বাবা শব্দটিকে অধিকতর শক্তিশালী অর্থে ব্যবহার করে বলেন, ‘মদ্দা-মেয়ে পুরুষের বাবা’। জীবনানন্দ দাশ ১৯৪২-এ রবীন্দ্রনাথের মতো বলেন, “‘আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুশিয়াসের মতো আমাদেরও প্রাণ মূক করে রাখে ’।৬
কিন্তু এই শব্দগুলো পিতার সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও শব্দ “‘পিতা’র সঙ্গে জনক, জন্মদাতা, বাবা, আব্বা’র বৈশিষ্ট্যগত ফারাক আছে। সমাজে ‘পঞ্চপিতা”’ বলে একটি ধারণায়ন আছে। পঞ্চপিতায় পিতা হলেন—জন্মদাতা, অন্নদাতা, ভয়ত্রাতা, শ্বশুর ও দীক্ষাগুরু বা শিক্ষক।
জন্ম দিলেই পিতা—এমন চিন্তা সমাজে আইনিভাবে সিদ্ধ হলেও বাস্তবে পিতা হয়ে ওঠার জন্য জন্ম দেওয়া আবশ্যক নয়। যদিও ব্যক্তি প্রথমে ‘“জনক”’, তারপর “‘পিতা’”। কারণ পিতার সঙ্গে প্রথমত যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো দায়িত্ব-কর্তব্য, তারপর আবেগ, অনুভূতি। যদিও পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে জন্ম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে “‘পিতা”’ হয়ে ওঠার বাধ্যবাধকতা কাজ করে। কিন্তু সব জন্মদাতাই পিতা হয়ে ওঠে না।
একজন পিতা একই সঙ্গে আরো অনেকগুলো সম্পর্কে জড়িত থাকেন; প্রথমত, তিনি কারও স্বামী, কারও ভাই, কারও ছেলে। এগুলোর মধ্যে থেকে যে দুটি সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা হলো—বাবা ও স্বামী। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, একই ধরনের কাজ নারী করলেও পিতার পরিচয়ের দরকার পড়ে কিংবা পিতার অভাব অনুভূত হয়। পিতার পরিচয়েই পরিচিতি পায় সন্তান। আধুনিক যুগের শুরু থেকে পিতাকে “‘পিতৃস্থানীয় প্রভাবশালী”’, ‘“সৃষ্টিকারী”’, ‘“প্রভু’”, “‘অধিকতর শক্তিশালী’”, ‘“ভয়ত্রাতা”’, “‘দীক্ষাগুরু’” হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছে। পিতা পরিবারে যেমন প্রভাবশালী ব্যক্তি, তেমনই সমাজেরও। সমাজে পিতা মানেই পরিবারের প্রধান, সিদ্ধান্ত প্রদানকারী, অর্থ উপার্জনকারী, নিরাপত্তার ছায়া আরো অনেক কিছু। রাষ্ট্র যেমন তার কর্তৃত্ব, নিপীড়ন, শোষণ টিকিয়ে রাখার জন্য গ্রামসি”’র ভাষায়, প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে ভয়তন্ত্র টিকিয়ে রাখে; একইভাবে পরিবার নামের রাষ্ট্রে পুরুষ-পিতা তার “‘ভয়তন্ত্র’” বহাল রাখে। সে কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিতা প্রবেশ করার মুহূর্তেই বাড়ির পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে যায়। টিভির শব্দ কমে যায়, রিমোট হাত পরিবর্তন হয়। আবার একই সঙ্গে কখনো বাবা কেবল জন্ম দিয়েই খালাস; কখনো হয়ে ওঠেন শিক্ষক। গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রও পিতার এই চলতি ডিসকোর্স দ্বারাই প্রভাবিত।
বাবাই সব
বাবা কেন চাকর-এ বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি পরিবারের কর্তা; সব দায়িত্ব-কর্তব্য তার। পরিবারের সদস্যরা কে কোথায় কী করছে তিনি তার খোঁজ রাখেন। খাবার টেবিলে একদিন বাবা বড়ো ছেলে শাকিলকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘“ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন চলছে, নতুন কোনো কাজ-টাজ কিছু পেলে?”’ উত্তরে শাকিল বলেন, “‘বাবা নতুন টেন্ডারের জন্য আমি তোমাকে যে স্টেটমেন্ট তৈরি করে দিতে বলেছিলাম?’” বাবা বলেন, “‘সেটা তো আমি কালই তৈরি করে দিয়েছি; কী সানু (মা) দাওনি ওকে?’ মা বলেন, ‘এই দেখ ভুলেই গিয়েছিলাম।’
জন্মদাতাতেও আমরা একই ঘটনা দেখি, কৃষক বাবা রহমত হোসেন পরিবারের কর্তা। ছেলে আশরাফ হোসেনের ডাক্তারি পড়া, অর্থ উপার্জন এবং পরিবারের প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন বাবা। ছেলে ডাক্তারি পড়া শেষ করে বাড়িতে এসেছে। বাবার ইচ্ছা, গ্রামের গরিব-দুঃখি মানুষের জন্য হাসপাতাল হবে। সেখানে রোগব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষকে সেবা দেবে ছেলে। কিন্তু গ্রামের বিত্তবানরা সাহায্য না করায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছিলো না। একপর্যায়ে রহমত হোসেন জমি বন্ধক রেখে হাসপাতালের সরঞ্জামাদি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। রহমত বলেন, “‘আরে সবাই তো আর ডাক্তার আশরাফ হোসেনের বাপ রহমত হোসেন না। আমার পোলায় ডাক্তার হইছে, জিনিসপত্রের অভাবে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা হইবো না, এইটা আমারে দেখতে হইবো!’ রহমত আরো বলেন, ‘ডাক্তার পোলা আমার জামা, পোলার হাসপাতাল হইবো আমার কাপড়।’
ছেলে হাসপাতালের সরঞ্জাম কিনতে শহরে গেলে সেখানে বিপত্তি ঘটে। ছেলের দেরি দেখে শহরে যান বাবা। গিয়ে দেখেন, ছেলে দ্বিতীয় বিয়ের আসরে বসে আছে। এসব সহ্য করতে না পেরে বাবা তার স্ত্রী ও ছেলের বউকে বলেন, “‘শুধু জানি গ্রাম ছাইড়্যা যাইতে হইবো ..., মানুষ জানার আগে এই গ্রাম ছাইড়্যা, এই এলাকা ছাইড়্যা চইল্যা যাইতে হইবো।’” এদিকে বাবা কেন আসামীতে বাবা চোর হওয়ায় ছেলে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনা দেখে ওই ছেলের বন্ধু মাকে বলে, ‘“করিম ঠিকই করেছে মা, চোরের ছেলে হয়ে ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গিয়ে ভালোই করেছে। আমার বাবা চোর হলে আমিও তাই করতাম।’” অথচ বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে ছেলেটি তার বাবাকে দেখেইনি।
উপরের তিনটি ভিন্ন ঘটনায় বাবার যে রিপ্রেজেন্টেশন, সেখানে বাবাই পরিবারের সবকিছু। প্রথম দুটি ঘটনা থেকে তৃতীয়টির পার্থক্যের জায়গা বাবার প্রভাবের ধরনে। প্রথম দুটিতে বাবার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি দেখা গেলেও, তৃতীয়টিতে ছেলেটি সংস্পর্শ না পেয়েও নিজের মধ্যে বাবাকে ধারণ করেছে প্রথাগতভাবেই। বাবা কেন চাকর-এ দেখি বাবা পরিবারের সবকিছু দেখাশোনা এবং যাবতীয় কাজ নিজে করেন। এতো কাজের মধ্যেও দায়িত্ববান বাবা ছেলের টেন্ডারের স্টেটমেন্ট লিখে দিতে পারলেও, মা তা কেবল ছেলের হাতে দিতে ভুলে যান। ফলে দায়িত্ববান বাবার পাশে মা হয়ে ওঠেন দায়িত্বজ্ঞানহীন।
জন্মদাতায় বাবার ইচ্ছাতেই ছেলে চিকিৎসক হন। আবার জমিজমা বিক্রি করে ছেলের জন্য হাসপাতাল করার সিদ্ধান্তও তারই। অন্যদিকে ছেলে ‘কুকর্মে’ জড়িয়ে পড়লে সমাজে মুখ দেখাতে না পারার ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারেও বাবাই সিদ্ধান্ত নেন। অথচ পরিবারের অন্য সদস্যদের এসব ক্ষেত্রে মতামত জানারও কোনো প্রয়োজন মনে করেন না তিনি।
তৃতীয় ঘটনায় বাবা চোর হওয়ায় তার ছেলের সঙ্গে খেলতে, পড়তে চায় না কেউই। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে আত্মহত্যা করতে হয়। অর্থাৎ বাবার পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্মফলের দায়ও নিতে হয় সন্তানদের! এদিকে বাবা জেলে থাকায়, মা উপার্জন করে সন্তানের যাবতীয় ভরণপোষণ করলেও মায়ের পরিচয়ে তারা পরিচিত হতে পারে না। ফলে ‘স্বামী বিদেশে আছে—এমন কথা বলে মাকে যেমন তার সম্মান রক্ষা করতে হয়; তেমনই সন্তানদের রক্ষা করতে হয় পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজের নিপীড়নের হাত থেকে।
বাবার ত্যাগ অনন্য
আগেই বলেছি, পিতা—জন্মদাতা, অন্নদাতা, শিক্ষাগুরু। এই শব্দগুলোর সঙ্গে একধরনের সম্প্রদান কারক জড়িত। পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে পিতাই যেহেতু অর্থ উপার্জন করে, সেহেতু সেটার ‘যথাযথ’ ব্যবহার, মানে খরচ করার ক্ষমতা থাকে তার কাছেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পিতা/বাবা একচ্ছত্র অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন এবং এই বলেই তিনি মূলত পরিবারের প্রধান। তাই ‘দাতা’ শব্দটির মানে আপাত স্বার্থ ত্যাগ করে কোনো কিছু দেওয়া মনে হলেও, এটা একধরনের ক্ষমতা প্রয়োগেরই ভিন্নরূপ; অন্য অর্থে একে সামাজিক ক্ষমতাও বলা যেতে পারে।
বাবা কেন চাকর-এ বাবা তার শেষ সম্বল পেনশনের দুই লক্ষ টাকা বড়ো ছেলে শাকিলকে দেন ব্যবসার জন্য। কিন্তু মেয়ের বিয়ের জন্য সেই টাকা চাইতে গেলে ছেলে তা দিতে অপরাগতা জানায়। এ সময় ছেলের বউয়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মা বলেন,
অপরাধ শাকিল করেনি, অপরাধ করেছে তোমার শ্বশুর। সারাজীবন চাকরি করে, কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছে। ছেলেমেয়েদের সুখের জন্য বাড়ি বানিয়েছে। নিজের সাধ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশের দিকে কোনো দিন খেয়াল করেনি। এ সবই তো অপরাধ। আর সবচেয়ে বড়ো অপরাধ করেছে জীবনের শেষ সম্বল দুই লাখ টাকা শাকিলের হাতে তুলে দিয়ে।
আরেক দৃশ্যে শাকিলের বউকে বলতে শোনা যায়, “‘আমাকে যদি বাড়িতে রাখতে চাও, তাহলে তোমার বাবা-মাকে রাখা যাবে না।”’ এ কথা শুনে বাবা বলেন, “‘আমি তোমাদের কাছে অনুরোধ নিয়ে এসেছি, একটা রাত তোমাদের কাছে ভিক্ষা চাচ্ছি। এ বাড়ি, সয়-সম্পত্তি সবই আমি করেছি তোমাদের জন্য, সন্তানের সুখের জন্য, শান্তির জন্য। এ বাড়ি থেকে তোমরা কেনো যাবে!’” আবার জন্মদাতাতে বাবা বলেন, “‘সারাজীবন আমি নিজের লাইগ্যা কী করছি? মাইনসে কয়, রহমত মিয়ার এতো জমিজমা; এতো ধান-পাট পায়; কিন্তু দুইটা ভালো জামা-কাপড় কোনো দিন পইর্যা দেখলো না।’
বাবা কেন আসামীতে দেখি, আমজাদ হোসেন গাড়ি চালক। একদিন মালিকের ছোটো ভাই গাড়ির মধ্যে অবৈধ জিনিস নিয়ে উঠলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। এ সময় গাড়ির মালিক, চালক আমজাদকে প্রলোভন দেখায় মিথ্যা বলার জন্য। একপর্যায়ে আমজাদ বলেন, ‘“সত্য বলার জন্য আমার যদি শাস্তি হয়, সেই শাস্তির জন্য আমার এতোটুকু দুঃখ থাকবে না। কিন্তু আমাকে দুঃখ-যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে তখন, যখন আমার সন্তানরা জানবে আমার মিথ্যা সাক্ষীতে একজন খুনি আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। আমি একজন অপরাধীকে আরো অপরাধ করার জন্য সুযোগ করে দিয়েছি।’
প্রথম ও দ্বিতীয় ঘটনায় দেখুন, নির্মাতা বাবাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেনো বাবা নিজের জন্য কিছুই করেন না, তার যা কিছু সব সন্তানের জন্য। এমনকি ব্যক্তি হিসেবে বাবার যে আদর্শ তাও ঢেকে দেওয়া হচ্ছে সন্তানের দোহাই দিয়ে। তৃতীয় ঘটনায়ও তার প্রমাণ পাই, এখানে ব্যক্তি আমজাদের আদর্শ ও নৈতিকতার পরিচয় না করিয়ে তাকে পরিচয় করানো হয় একজন আদর্শ বাবা হিসেবে। তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিবেন কি দিবেন না, এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার; কিন্তু সেখানেও দেওয়া হয় সন্তানের দোহাই।
বাবা সবসময় সন্তানের ভালো চায়, বাবার সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নেয়, সবকিছুতে বাবা অন্যদের চেয়ে বেশি জানে—এই অনুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবার আগে দরকার পড়ে বাবার ত্যাগকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার। উলটোভাবে, অর্থনৈতিক ভিত্তির কারণে এমনিতেই বাবার একধরনের সামাজিক ক্ষমতা থাকে, যার বলয়ে সবকিছু তার ইচ্ছে মতো হয়। ফলে এই ত্যাগ এমন মাত্রায় হতে হয়, যাতে সবাইকে ছাড়িয়ে তিনি একা অনন্য হয়ে উঠতে পারেন।
ক্ষমতার ভিতর-বাহির
বাবা কেন চাকর-এ আমজাদ চৌধুরী এবার স্ত্রীর চিকিৎসা ও হুইলচেয়ার কেনার জন্য ছেলেকে ব্যবসা করতে দেওয়া পেনশনের দুই লক্ষ টাকা ফেরত চান। এই টাকা নিতে ছেলে বাবাকে তার অফিসে আসতে বলেন। যাওয়ার সময় সঙ্গে করে ছেলের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে যান বাবা। তার ইচ্ছে সামনে বসিয়ে ছেলেকে খাওয়াবেন। অফিসে গিয়ে সেই খাবার ছেলের সামনে নিজে পরিবেশনও করতে থাকেন তিনি। এদিকে ব্যবসায়িক অংশীদার আসবে বলে বাবাকে অভ্যর্থনা কক্ষে গিয়ে বসতে বলেন ছেলে শাকিল। এ সময় হঠাৎ করেই তার ব্যবসায়িক অংশীদার সেখানে ঢুকে পড়েন। তারপর বাবাকে কাজের লোক মনে করে বলেন, “‘তো ইয়ে, বুড়ো মিয়াকে তো আগে দেখিনি, নতুন চাকর বুঝি?’
এরপর ক্লোজ শটে পর্দায় বার বার দেখানো হয় বাবার মুখ। আবহে বাজতে থাকে রণসঙ্গীতের মতো একটি পিচ (pitch)। সময়ের সঙ্গে আবহসঙ্গীতের মাত্রা তীব্র হতে থাকে। এরই মধ্যে ছেলে বলেন, ‘“মিস্টার হাসান, আপনি বরং কাজের কথায় ...।” কথা আটকিয়ে বন্ধু বলেন, ‘“এটাও কাজের কথা। আমিও এ রকম বিশ্বস্ত লোক খুঁজছিলাম অনেকদিন ধরে। তা বুড়ো মিয়া, তুমি কি আমার বাড়ি থেকে খাবার এনে দিতে পারবে?’” এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আবহসঙ্গীত পরিবর্তিত হয়ে একটি করুণ সুর বাজতে থাকে। আবারও ক্লোজ শটে বাবার মুখ দেখানো হয়। এর পরের শটে বাবা-ছেলের চোখাচোখি হলে ছেলে চোখ নামিয়ে নেন। করুণ সুর তীব্র হয়। একপর্যায়ে ছেলে বলেন, ‘“এখনো দাঁড়িয়ে আছো? যাও না রিসিপশনে গিয়ে বসো।’
বাবা বাইরে এসে দেয়ালে দুই হাত লাগিয়ে হেলান দেন। এ সময় আবহে প্রতিধ্বনিত হয় ‘নতুন চাকর বুঝি’। বাবা ডান হাত দিয়ে বুক চেপে ধরেন। এ অবস্থায় বাবা সিঁড়ির রেলিংয়ে বুক ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে নীচে নামতে থাকেন, ক্যামেরা লো-অ্যাঙ্গেল আর আবহে করুণ পিচ। সিঁড়িতে নামার মাঝামাঝিতে আবহে গান শুরু হয়, ‘আমার মতো এতো সুখী ...’। বাবা বাসায় ফিরে যাওয়ার সময় পুরো রাস্তা জুড়ে আবহে গান চলে আর ফ্ল্যাশব্যাকে দেখানো হয় সন্তানদের নিয়ে তার সব সুখস্মৃতি। বাসায় এসে দেয়ালে টাঙানো পুরো পরিবারের ছবি স্পর্র্শ করে বাবার কান্না দেখানো হয়, এবং স্ত্রীকে গিয়ে বলেন, ‘“সানু, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার পেয়ে গেছি। আমি আমার ছেলের চাকর হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছি।’” পুরো এই প্রক্রিয়াটি এক ঘণ্টা ৫৭ মিনিট আট সেকেন্ডে শুরু হয়ে চলে টানা চার মিনিট চার সেকেন্ড ধরে।
বিপরীতে, এক ঘণ্টা ২৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে শুরু হওয়া এক মিনিট ২৫ সেকেন্ডের দৃশ্যটির ইমেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বউ তার শাশুড়িকে তীর্যক কণ্ঠে মা মা বলে ডাকতে ডাকতে কাছে আসে। সেসময় অসুস্থ শাশুড়ির সেবা করছিলো গৃহকর্মী। বউয়ের ডাক শুনে শোয়া থেকে উঠে বসেন তিনি। বউ তীর্যক কণ্ঠে বলতে থাকেন, “‘এভাবে তো সংসার চলতে পারে না মা, কাল সাতশো টাকার বাজার করিয়েছি। আজ আব্দুল বলছে, বাজার নাই। ... একটা লোকের সামান্য আয়ে এতোগুলো বেকার লোককে টানা কি সম্ভব? তাছাড়া ওই আব্দুল শয়তানটা বাজারের নামে টাকাপয়সা লুটপাট করে খাচ্ছে।’” ক্যামেরা ক্লোজ শটে; মা বলেন, ‘“বউমা, তুমি কি আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে এসেছো?’” আবহে বাজে রণসঙ্গীতের মতো পিচ। পরে ক্লোজ শটে বউয়ের মুখ, তিনি বলতে থাকেন, ‘“সংসারে টাকা তো দিতে হচ্ছে আমাকেই। ... আর খরচ কোথায় কীভাবে হচ্ছে তা জানতে চাইলে কি দোষ হয়ে যাবে?’” বাবা আড়ি পেতে এসব শোনেন। মাকে অসুস্থ দেখায়। একপর্যায়ে তিনি আঁচল থেকে চাবি খুলে বউয়ের হাতে দিয়ে বলেন, “‘এই নাও সংসারের চাবি। আমার স্বামী যখন সংসার থেকে অবসর নিয়েছে আমাকেও নিতে হবে।’” বউ চলে যায়। মা কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় ঢলে পড়েন। বাবা ওই ঘরে প্রবেশ করলে আবহ পরিবর্তিত হয়ে করুণ সুর বাজতে থাকে।
জন্মদাতাতে বাবা তার সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে ছেলেকে গ্রামের হাসপাতালের জন্য সরঞ্জাম কিনতে শহরে পাঠান। ফিরে আসতে দেরি দেখে ছেলের খোঁজে শহরে যান বাবা। সেখানে গিয়ে দেখেন, ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য বর সেজে বসে আছে। এ সময় বাবা ছেলের কাছে যেতে চাইলে, ছেলের বন্ধু তাকে বাধা দেয়। কথোপকথনের একপর্যায়ে সেই বন্ধু অন্যদের বলে, “‘আরে আশরাফদের বাড়ির পুরনো চাকর।’” দুই মিনিট ১২ সেকেন্ডের এ দৃশ্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চাকর বলার সময় ক্লোজ শটে বাবার চোখেমুখে বিস্ময় দেখানো হয়। আবহে বাজে আলোড়িত হওয়ার মতো সঙ্গীতের একটি পিচ। বাবা ছেলের দিকে তাকান। বন্ধু (ছেলের) বলে, ‘“আরে মেডিকেলে পড়ার সময় দেখেছি, প্রায়ই ও এটা ওটা নিয়ে আসতো।”’ অনুষ্ঠানের এক অতিথি ক্যামেরার ক্লোজ শটে বলেন, ‘“... চাকর হয়ে ওর এতো বড়ো সাহস!’” আরেক অতিথি বলেন, “‘বের করে দাও ওকে।’” বাবা ছেলের দিকে তাকান। তারা আবার বলে, “‘বের করে দাও ওকে।’” আবার ক্লোজ শট্; বাবা চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ তোলেন। একপর্যায়ে অতিথিরা হাত উঠিয়ে সমস্বরে বলতে থাকে, ‘“বের করে দাও ওকে।’
বিপরীতে, এই চলচ্চিত্রে (জন্মদাতা) সংসার চালানোর জন্য অন্যের বাসায় কাজ করেন মা। একদিন অপমান করে তাকে গৃহকর্ত্রী ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। ২৫ সেকেন্ড মেয়াদি এই দৃশ্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গৃহকর্ত্রী ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার সময় আবহে বাজে করুণ সুর। গৃহকর্ত্রী বলে, “‘যাও যাও ...। দুটো কাপড়ে বাড়ি দিতে হাঁপিয়ে যায়, আবার কাজ করবে!’” মা করজোড়ে মিনতি করে বলেন, “‘আমারে তাড়াইবেন না মা। যতো কষ্টই হোক আমি কাম করুম।’” মা বলতে থাকেন, ‘“আল্লাহ, তিন তিনটা জায়গা ঘুইরা কোনো খানে একটা কাম পাইলাম না। কাজ যাও পাইলাম, তাও চইল্যা গেলো। এহন আমি এই অন্ধ মানুষটারে (স্বামী) কী খাওয়ামু আল্লাহ?’
উপরের দুটি ঘটনাতেই সন্তান তার বাবার পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। মাকে চরম অপমান করে ছেলের বউ ও অন্যরা। তাতে সন্তানদের কোনো দায় দেখানো হয় না। অথচ এই বাবা-মা জীবনের সবটুকু দিয়ে ওই সন্তানদের বড়ো, ‘শিক্ষিত’ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তান বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাবা-মা উভয়ের অবদান থাকলেও কিংবা অন্যভাবে বললে, বিশেষ করে মায়েদের অসম্ভব কষ্টের সম্মুখীন হতে হলেও ওই দুজনকে সমানভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হয় না কেনো? বাবা কেন চাকর-এ যেখানে বাবার অপমানের দৃশ্য চার মিনিট চার সেকেন্ড দেখানো হয়, বিপরীতে ছেলের বউয়ের কাছে মাকে অপমানিত হওয়ার দৃশ্য দেখানো হয় এক মিনিট ২৫ সেকেন্ডে। জন্মদাতাতেও বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি উপস্থাপনে একই অনুপাত দেখা যায়। যদিও উপস্থাপনের এই সময়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার পরও অন্যান্য অনেকগুলো দিকের মতো এটিও তো কোনো না কোনো বার্তা দেয়।
যাও পাখি বলো তারে
বাবা কেন চাকর-এ মা’র মৃত্যুর খবর দিতে গেলে শাকিল তার বাবাকে পাগল বলে আখ্যায়িত করে। আবার মায়ের লাশ দেখে দাফন করতে চাইলে বাবা বলেন, ‘“পাপ! আরে বেঈমান, বেঁচে থাকতে অত্যাচারে অত্যাচারে মাকে যখন পঙ্গু করে দিয়েছিলি, তখন পাপ হয়নি? অবহেলায়, অযত্নে, অপমানে যখন মরণের দিকে ঠেলে দিয়েছিলি তখন পাপ হয়নি? এখন মৃত মায়ের লাশ ধরলে কি তোদের পাপ মুছে যাবে ভেবেছিস?’” অনুশোচনার একপর্যায়ে ছেলে বলে, “‘আমার মা মরে যায়নি, আমার মাকে তিল তিল করে যন্ত্রণা দিয়ে আমি মেরে ফেলেছি।”’ ছেলে ভুল বুঝতে পেরে পা ধরে ক্ষমা চাইলে বাবাকে বলতে শোনা যায়, “‘ওরে ওঠ, বাবা-মারা কোনোদিন সন্তানের ওপরে অভিমান করে থাকতে পারে না। তোর মা তোদের জন্য দোয়া করে গেছেন।’
জন্মদাতাতে বাবা ছেলেকে শহরে পাঠানোর পর ছেলে মিথ্যা মামলার আসামি বনে যায়। এরপর থেকে ছেলে কোনো খোঁজখবর রাখে না বাবা-মায়ের। খেয়ে না খেয়ে অনাহারে জীবন অতিবাহিত করে বাবা-মা। জীবনের শেষ সময়ে এসে বাবা তার নাতি ও ছেলের সন্ধান পান। ছেলেকে আদালতে হাজির করা হয়েছে, এমন সংবাদ শুনে, মা-বাবা আদালতে ছুটে যান। সেখানে ছেলেকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় আবহে হালকা মেজাজের সঙ্গীত বাজতে থাকে। বাবা খুশিমাখা কণ্ঠে বলেন, ‘“আশরাফ, আমার হারায়ে যাওয়া রত্ন আশরাফ।”’ বাবার এই কথা বলার মধ্যেই মা বলেন, ‘“এই তো, এই তো আমাগোর আশরাফ’।” ছেলে বলে ওঠে, “‘মা, আমার অপরাধের শেষ নেই।”’ এর উত্তরে বাবাকে বলতে শোনা যায়, ‘“আমরা নিজেগোর কষ্ট দেখছি, কিন্তু তোর কষ্ট বুঝতে পারি নাই।’
বাবা কেন আসামীতে খলনায়ক ধরে নিয়ে আসে ছেলেকে। ছেলে পেশায় পুলিশ। খবর পেয়ে বাবা সেখানে উপস্থিত হয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন। একপর্যায়ে ছেলে মায়ের হত্যাকারীকে গুলি করতে উদ্যত হলে বাবা বলে ওঠেন, “‘... আমি তোর মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নিজের হাতে একটা ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করে রেখেছি। ওই ফাঁসির মঞ্চে দেলোয়ারকে (হত্যাকারী) ঝুলিয়ে আমি আমার প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে চাই। ... আমার চাওয়াটা পূরণ কর বাবা (ছেলে)।”’ ছেলে মায়ের খুনিকে বাবার তৈরি ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যায়। এ সময় সেখানে পুলিশ হাজির হলে ছেলে কৌশলে পুলিশের দিকে অস্ত্র তাক করে বলে,
‘সরি স্যার, মৃত্যুর আগে আমার বাবা তার জীবনের একমাত্র শত্রুকে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে মারতে চায়, এ চাওয়া আমরা দুই সন্তান মিথ্যা হতে দিবো না। ... আমার বাবার সেই ইচ্ছেটাকে সত্যি করার জন্যে আমি যদি আইনের কাছে অপরাধী বলে প্রমাণিত হই, তবু আমি আমার বাবার ইচ্ছেটাকে সত্যি করবোই।
উপরের তিনটি ঘটনা যেনো একই সুতোয় গাঁথা। তিন পরিস্থিতিতেই ক্ষমতার কেন্দ্রে দেখা যায় বাবাকে। ছেলের অবহেলায় মায়ের মৃত্যুর পর তাকে ক্ষমা করা, দীর্ঘ সময় অজ্ঞাতে থেকে ফিরে আসলে ছেলেকে বুকে টেনে নেওয়া, বাবার কথায় আইন হাতে তুলে নেওয়া—সবক্ষেত্রে বাবাকেই প্রধান ভূমিকা নিতে দেখা যায়। প্রথম ও তৃতীয় ঘটনায় বাবা এসব সিদ্ধান্ত নেন মায়ের মৃত্যুকে পুঁজি করে। অথচ বাবা কেন চাকর-এ অসুস্থ মা যখন ছেলের বউয়ের হাতে নিগৃহীত হন, তখন প্রতিবাদ না করে আড়ালে দাঁড়িয়ে বাবাকে তা শুনতে দেখা যায়! কিন্তু মায়ের মৃত্যুর সুযোগে নিজেকে মহৎ হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি মাকে সেই গতানুগতিক ক্ষমাশীল, সর্বংসহা হিসেবে তুলে ধরতে তিনি ছাড়েন না। তৃতীয় ঘটনায় মায়ের মৃত্যুর জন্য যেমন একজনকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চান বাবা, তেমনই কারাগার থেকে বের হয়ে ঠিক সময়ে বাড়িতে ফিরলে স্ত্রীকে বাঁচাতে পারতেন—এমন ন্যারেটিভ হাজির করা হয়। বুঝতে কষ্ট হয় না, জীবনে-মরণে স্বামীই স্ত্রীর ত্রাতা।
একটি অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাবা কতোটা গুরুত্ব বহন করেন আর কেনোই-বা চলচ্চিত্রে বাবার এমন রিপ্রেজেন্টেশন, একটি ঘটনা বললে পাঠক হয়তো তা অনেকখানি উপলব্ধি করতে পারবেন। আর আমার এতোক্ষণের আলোচনাও আশা করি পরিষ্কার হবে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটে পরিচিত এক দোকানে অন্য একজনকে দেখে জানতে চাইলাম, এটা তো সাইফুল ভাইয়ের দোকান, আপনি? অচেনা লোকটি বললেন, ‘“সাইফুল আমার ছোটো ভাই; দোকানঘরটা আমার। সে ভাড়া নিয়ে এখানে বসতো।”’ তা দোকান ভাড়া তো পাচ্ছিলেন, হঠাৎ দোকানদারি করার প্রয়োজন হলো কেনো? মনটা খারাপ করে বললেন, “‘আগে তো ঘুরেই বেড়াতাম; দোকান ভাড়া আর টুকটাক কাজ করে সংসার ভালোই চলতো। এখন মেয়েরা বড়ো হচ্ছে; তাদের বিয়ের সম্বন্ধ আসাও শুরু করেছে। এখন পাত্রপক্ষ জানতে চায়, মেয়ের বাবা কী করে? তাই ওদের কথা ভেবেই দোকানদার হয়ে গেলাম!’
লেখক : মোহাম্মাদ আলী মানিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
manikmcjru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. গুয়েভারা, এর্নেস্টো চে (২০০৫ : দশ); চে গুয়েভারার ডায়েরী : বলিভিয়ার ডায়েরী; ভাষান্তর : অরুণ রায় ও কল্পতরু সেনগুপ্ত; ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
২. ফুকো, মিশেল (২০০৬ : ৩০); মানবপ্রকৃতি : ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা; ভাব-ভাষান্তর : আ-আল মামুন; রোদ, রাজশাহী।
৩. রনো, হায়দার আকবর খান (২০০৮ : ২০); মার্কসবাদের প্রথম পাঠ; গণপ্রকাশন, ঢাকা।
৪. স্টুয়ার্ট, হল; ‘রেপ্রিজেন্টেশন’; ভাষান্তর : ফাহমিদুল হক; যোগাযোগ; সম্পাদক : ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; ঢাকা, সংখ্যা-৮, ২০০৭, পৃ. ৯।
৫. হক, ফাহমিদুল (২০১১ : ৩৯—৪০); ‘রেপ্রিজেন্টেশন, প্যারিস ম্যাচ ও ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’; অসম্মতি উৎপাদন; সংহতি প্রকাশন, ঢাকা।
৬. গোলাম মুরশিদ, সম্পা. (২০১৩); বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান : তিন খণ্ড; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন