Magic Lanthon

               

অনিক ইসলাম

প্রকাশিত ১০ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দর্শক-কথা

কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে একদিন

অনিক ইসলাম


৯০-এর দশকে জন্ম নেওয়া আমাদের প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ছিলো একটি উচ্চমাত্রার বিতর্কিত বিষয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি এমন অনেক সকালের সাক্ষী যেখানে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা পাক-ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে ধুন্ধুমার বিতর্কে মশগুল থাকতেন। তাদের কেউ কেউ ১৯৭১-এ ভারতের অবদানকে ইঙ্গিত করে দাবি করতেন রাষ্ট্রটি আমাদের অত্যন্ত বড়ো মাপের শুভাকাক্ষী, আবার কাউকে বলতে শুনতাম দেশটি আমাদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু। স্বাধীনতার এতো পরেও এমন বিতর্ক আমাকে যেনো কতকটা বিভ্রান্ত করে দিতো। এবং এই তর্ক ২০১৫-তে এসেও থামেনি বরং তা ভিন্ন পথে গতি লাভ করেছে। তবে বন্ধু কিংবা শত্রু নয়, দরকারি এক প্রতিবেশী হিসেবে আমার মানসে উপস্থিতি ছিলো ভারতের, যাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ব্যতিরেকে শান্তিতে বসবাস করা মুশকিল। এই একই সূত্র নিশ্চয় ভারতের বেলায়ও সত্য বলে বিবেচিত। ঘটনাক্রমে ভারতের বিভিন্ন অংশে অনেকবারই ঘোরা হয়েছে আমার। তবে এবারের কলকাতা সফরের উদ্দেশ্য ছিলো দুটিচিকিৎসা আর ভ্রমণ।

আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে, কলকাতা শহরের একটা আলাদা গন্ধ আছে। এটা বেশ অদ্ভুত এক ব্যাপার। এ রকম করে কোনো শহরের স্বতন্ত্র একটি গন্ধ-পরিচয় থাকতে পারে, তা প্রথম যখন ধরতে পেরেছিলাম ভীষণ আনন্দ হয়েছিলো, মনে হয়েছিলো বেঁচে আছে শহরটা। খুব বেশি যান্ত্রিক না হয়েও কলকাতার মানুষেরা নিজেদের জন্য আলাদা একটি গাইড বুক যেনো তৈরি করে নিয়েছে। সবাই জানে কতোটুকু তার দায়িত্ব আর কোনটুকু বিলাসিতা। বেশিরভাগ মানুষকেই দেখেছি শহরের সম্পদ, সৌন্দর্য আগলে রাখতে সদা প্রস্তুত, নিত্য আন্তরিক। এটাই হয়তো শহরটিকে প্রতিনিয়ত বাঁচার প্রাণশক্তি যুগিয়ে যাচ্ছে। তবে এটা ঠিক, কসমোপলিটান কলকাতার সৌন্দর্য সদ্য গজিয়ে ওঠা বহুতল ভবনগুলোতে নয়, তা বরং খুঁজে পাওয়া যায় দুটো ভবনের মাঝের ফাঁকা জায়গাটুকুতে। তাই বলে শহরবাসীকে হাঁপিয়ে উঠতে যে দেখিনি, তা নয়। বিশ্বায়নের এই হাঁস-ফাঁসে একটু দম ফেলতে শহুরে মানুষেরা প্রায়ই দাঁড়িয়ে পড়ে রাস্তারধারের কোনো খাবারের দোকানে; চলে খাওয়া আর ধুন্ধুমার আড্ডা, তর্ক, গান। এই আড্ডাগুলো পারফিউমের বোতল থেকে বের হওয়া সুগন্ধের মতো, মুহূর্তেই প্রাণ ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। এই সুযোগে জানিয়ে রাখি, কলকাতা শহরের স্ট্রিট ফুডের কোনো তুলনা হয় না।

প্রত্যেকবার ভেবে রাখি “সিনেমার দেশভারতে গিয়ে সিনেমা দেখবো। কিন্তু নানাবিধ কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। আমি খালি চোখে দেশে ফিরি। তবে এবার চিকিৎসার মধ্যে একদিনের বিরতি পেয়ে বাবাকে বললাম, চলুন সিনেমা দেখে আসি। প্রস্তাব শুনে বাবা আমার চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে বিছানায় উঠে বসলেন, আমরা সোৎসাহে বেরিয়ে পড়লাম। ওখানে তখন ভরা বর্ষা, ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় রাস্তায় নেচে বেড়ানো বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে সন্ধ্যায় অফিস শেষের মুক্ত তরুণীর মতো মনে হচ্ছিলো। যেনো সে মেঘ থেকে সদ্য মুক্তি পেয়েছে। ভারী বর্ষণের মধ্যে এক ছাতার নীচে আশ্রয়প্রার্থী বাবা আর আমি শরীরের প্রায় অর্ধেকটা ভিজিয়ে উপস্থিত হলাম ভারতীয় উচ্চমধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের অত্যন্ত পছন্দের মাল্টিপ্লেক্স আইনক্স-এ । তাও ভালো, মাল্টিপ্লেক্সটা আমাদের হোটেলের একদম সামনেই ছিলো!

সিনেপ্লেক্সটি যেখানে অবস্থিত সে জায়গাটি ই এম বাইপাস নামে পরিচিত। পিয়ারলেস হাসপাতালটাও খুব কাছে ওখান থেকে। আইনক্স গ্রুপ এখন পর্যন্ত সারা ভারতে মোট ৫৫টি শহরে শাখা খুলেছে। সবমিলিয়ে তাদের মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা একশো একটি। আর সিনেমা প্রদর্শনের জন্য তাদের স্ক্রিন আছে তিনশো ৯৩টি। মাল্টিপ্লেক্সটিতে তখন পোস্টার ঝুলছিলো বাহুবলি আর বাজরাঙ্গি ভাইজান-এর। বিশালাকৃতির পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ের প্রথম তিন তলা শপিং মল আর একদম উপরের দু-তলা জুড়ে মাল্টিপ্লেক্স। উদ্দেশ্য সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মানুষ যেনো সিনেমা দেখার পাশাপাশি তাদের সংসারের সাপ্তাহিক বাজার-সদাইও এখান থেকে সেরে নিতে পারে। আইডিয়াটিকে বেশ জুতসই লাগলো। আসলে পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারাটা খুব জরুরি। এসব যখন ভাবছিলাম, তখন বাবা আমাকে টিকিটের লাইনে দাঁড়াতে বললেন, পাছে হাউসফুল না হয়ে যায়। অবাক হয়ে দেখি খুব বেশি ভিড় নেই টিকিটের সারিতে, খুব বৃষ্টি হচ্ছে তাই হয়তো। পরে মনে পড়লো, ইন্টারনেট থেকে টিকিট কেনার চল বেড়েছে এখন। তবে একটি বিষয় বেশ চমকপ্রদ লাগলো, তা হলো টিকিট কাটার সারিতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা সংখ্যায় অনেক বেশি। আবার অনেক মেয়েকে দেখলাম একদম একা সিনেমা দেখতে এসেছেন। এক হাতে হেলমেট, আরেক হাতে টিকিট নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হেঁটে চলেছেন সিনেমাহলের দিকে। বাংলাদেশে অবশ্য এটা এখনো বেশ দূর কল্পনা। যাই হোক আমি তখনো খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছি কোনটা দেখবো, বাজরাঙ্গি ভাইজান না বাহুবলি! কারণ দুটোরই বেশ প্রশংসা সেসময় পড়ছিলাম কলকাতার দৈনিকগুলোতে। শেষ পর্যন্ত জয় হলো সালমানের পাগলামি“রই। সেই  শৈশব থেকে আমাদের বিনোদনের সঙ্গী ও, তাই একটা আলাদা ভালোবাসা তো আছেই।

বাজরাঙ্গি ভাইজান-এর দুটো টিকিট প্লিজ, বলতেই আমার হাতে বিল আসলো চারশো রুপির। বাংলাদেশি টাকায় সেটা তখন প্রায় ছয়শোর মতো। এটা শুনে আমার অতি উৎসাহী সিনেমাপ্রেমী বাবা হঠাৎ উদাস হয়ে পড়লেন। দ্রুত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ওহহো! আমার তো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, একদম ভুলে গেছি। আর তাছাড়া হিন্দির কী-ইবা বুঝি আমি! তুমি বরং সিনেমাটা দেখে আসো। আমি কাজটা শেষ করে একটু বিশ্রাম নিই রুমে।আমি বুঝলাম, টিকিটের দাম শুনে বাবার হঠাৎ জেগে ওঠা সিনেমাপ্রেম পালিয়েছে। হাসি লাগলো আবার দুঃখও হলো, এ মাল্টিপ্লেক্সগুলো এমনকি মধ্যবিত্তেরও নয়। যাক, বাবাকে বিদায় দিয়ে টিকিট কেটে উঠে গেলাম পাঁচ তলায়। গিয়ে দেখি আধা ঘণ্টার মতো বাকি আছে আগের শো-টা শেষ হতে। কাউকে চিনি না, জানি না, একদম একা; আমার বেশ সুবিধাই হলো, ঘুরে ঘুরে সব দেখার। যতোটুকু মনে হলো, দর্শক যারা এসেছে তাদের বেশিরভাগই হয় প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী কিংবা দলবেঁধে আসা বন্ধুরা। চারিদিকে তাকিয়ে বাবা-মা-সন্তান মিলে কেউ এসেছেন বলে মনে হলো না। তবে কি সিনেমা ড্রইংরুম থেকে সোজা বেডরুমে ঢুকেছে? অথচ সিনেমা সংস্কৃতি একদম অন্যরকম ছিলো আমাদের উপমহাদেশে। যেখানে ভিন্ন ভিন্ন উৎসবের পরে সিনেমাহলই পারিবারিক জমায়েতের অন্যতম জায়গা ছিলো। শেষ পর্যন্ত মনে হলো, এটাই হয়তো এখনকার শহুরে সিনেমাহলগুলোর সংস্কৃতি। কিন্তু মফস্বলের সিনেমাহলগুলোও কি খুব আলাদা এখন?

যে জায়গায় বসে আমি শো শুরুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সেই জায়গাটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিলো না। ঠিকমতো বসার কোনো ব্যবস্থাই নেই সেখানে। প্রায় সবাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো, এছাড়া পরিবেশটাও কেমন জানি অন্ধকার। এ দেখে আমি অবশ্য বেশ আশাহতই হয়েছিলাম। মনে হচ্ছিলো বাইরেই যদি এমন হয়, তাহলে ভিতরে আবার কেমন হবে। আবার ভাবছিলাম, বাইরের পরিবেশ নিয়ে হয়তো মাথাব্যথা নেই কর্তৃপক্ষের। তবে ভিতরে ঢুকে ভুল ভাঙতে বেশিক্ষণ লাগেনি। পরে অবশ্য খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম বাইরের অংশে পুনর্নির্মাণের কাজ চলছিলো।

আসলে মুনাফাই শেষ কথা“ হওয়ায় এই যুগের সিনেমা, সিনেমাহলের চরিত্রটাই যেনো পালটে গেছে। আগে কোনো এলাকায় সিনেমাহল গড়ে উঠতো এমন ব্যক্তির হাত ধরে, যার শুধু বিত্তই না সিনেমাপ্রেমও ওই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। অর্থাৎ শুধু ব্যবসাই একটি সিনেমাহল গড়ে ওঠার একমাত্র কারণ হতো না। যে কারণে আমরা দেখেছি যশোরের মণিহার“-এর মতো সিনেমাহল তৈরির পর, শুধু তার স্থাপত্য দেখাতেও বাবা-মা তাদের সন্তানদের কিংবা বড়ো ভাইবোনেরা ছোটোদের সেখানে নিয়ে যেতেন। ৮০-র দশকে তৈরি হওয়া সিনেমাহলটিতে ঢোকার মুখেই চোখে পড়ে একটি মনোরম ফোয়ারা। সিনেমাহলটিতে উপরে উঠতে হয় সাপের মতো পেঁচানো সিঁড়ি বেয়ে আর তার দেয়াল জুড়ে আছে মনোমুগ্ধকর সব ভাস্কর্য। সিনেমার প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এটা করা যায় না, যে সময় শুধু সিনেমা দেখার একটা সুযোগ পেলেই বর্তে যেতো দর্শক। আর এখন সিনেমাহল ছোটো হতে হতে ঠাঁই নিয়েছে এমন একটি পরিসরে, যেখানে প্রজেক্টরের সাহায্যে শুধু সিনেমাটা দেখানো গেলেই হয়। আসলে পরিবার থেকে দূরে সরে একা হতে থাকা মানুষের আর সিনেমাহলের প্রয়োজন পড়ছে না, প্রয়োজন পড়ছে শুধু সিনেমার।

আগেই বলেছি, ভারতে এটা আমার প্রথম সিনেমা দেখা, তাই বেশ উত্তেজনা বোধ করছিলাম কেমন হবে এখানকার সিনেমাহল! কারণ আমি জানতাম, শিল্প ও বাণিজ্য দুইভাবেই সিনেমা ভারতীয়দের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি বলা হয়, নানা ভাষা, সংস্কৃতির ভারতবাসীকে এক সূত্রে গেঁথে রাখার পিছনে একটা বড়ো ভূমিকা যেমন ক্রিকেটের, তেমনই সিনেমারও; বিশেষ করে বলিউডের। এছাড়াও সম্পূর্ণ অচেনা এসব মানুষের পাশে বসে সিনেমা দেখতে কেমন লাগবেএমন নানা বিষয় ভাবতে ভাবতে প্রবেশ করলাম মাল্টিপ্লেক্সের ভিতরে। ঢুকেই প্রথম যে বাক্যটা আমার মাথায় আসলো তা হলো, Film is a really serious thing to Indians। একদম ছবির মতো সাজানো থিয়েটারের ভিতরটা। প্রযুক্তি আর সৃষ্টিশীলতা যেনো গলাগলি করে আছে সেখানে। আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে বসার ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা থেকে নিরাপত্তাসবকিছুতেই পেশাদারি ও আন্তরিক একটি আবহ। মখমল দিয়ে মোড়ানো মেঝেটা এমনই পরিষ্কার, সেখানে সুচ হারালেও খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম স্ক্রিন আর সাউন্ড সিস্টেম কেমন হবে তা দেখার জন্য। সেখানে আমাকে আবারও অবাক হতে হলো। এতো স্বচ্ছ, ঝকঝকে, পরিষ্কার স্ক্রিন আমার কল্পনাতেও ছিলো না! মনে হচ্ছিলো, এটা সিনেমাহলের ভিজ্যুয়াল পর্দা নয়, চোখের সামনে ঘটতে থাকা কোনো চলমান বাস্তবতা। আর সাউন্ড সিস্টেম একদম পারফেক্ট, কোথাও শব্দের বাড়াবাড়ি নেই। সিনেমা দেখা সত্যিই আনন্দের এখানে। গোটা থিয়েটারে মেয়েরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করছেন; সিনেমা শুরুর পরও কোনো অংশে বাড়াবাড়ি রকমের চিৎকার কিংবা আপত্তিকর কোনো শব্দ কানে এলো না। তবে এ রকম ভাবার কারণ নেই, এই অবস্থা সারা ভারতের সিনেমাহলের। আমি অবশ্য একটি সিনেমাহল দেখেই সেই মূল্যায়নের দুঃসাহসও দেখাচ্ছি না। শুধু ভালো লাগার কথা বললাম আর কি! আমার কাছে মনে হয়েছে, অন্তত সিনেমাহল নিয়ে কিছু ব্যাপার ভারতের কাছ থেকে শেখার আছে আমাদের। 

যাক সেসব কথা, আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক ঘটনার সাক্ষী, যেখানে শুধু সিনেমাহলের পরিবেশের কারণে আমাদের দেশের অনেক নারী সিনেমাহলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তারা নিজেকে সেখানে নিরাপদ বোধ করেন না। আর গুণগত মানের কথা না হয় বাদই দিলাম। এমন তো নয় যে, আমাদের এখানে ভালো সিনেমাহল কিংবা সিনেমাহলের ভিতরে-বাইরে সুস্থ পরিবেশ ছিলো না। যশোরের মণিহার’ থেকে শুরু করে ঢাকার মধুমিতা’, বলাকা’, পূর্ণিমা’, সনি’, শ্যামলী’ ইত্যাদি সিনেমাহলের কিন্তু কিংবদন্তি অবস্থান ছিলো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শক শিক্ষিত হয়ে উঠলো কি না, তা নির্ধারণ করে দেয় কোনো দেশের সিনেমা এগিয়ে যাওয়ার মাপকাঠিকে। এই শিক্ষা মানে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নয়, বরং সিনেমায় আত্মসমালোচনাকে উপভোগ করতে শেখা কিংবা নানাধরনের মতাদর্শকে সিনেমায় স্থান দিতে পারার সহিষ্ণুতাটুকু অর্জন করা। বাজরাঙ্গি ভাইজান দেখতে গিয়ে যেটার খোঁজ ভারতের নতুন প্রজন্মের মধ্যে ওই অল্প সময়েই পেয়েছি আমি। গল্পের প্রোটাগনিস্ট কট্টর একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ, যে ঘটনাচক্রে ভারতে হারিয়ে যাওয়া একটি মেয়েশিশুকে পাকিস্তানে তার বাবা-মার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় নামে। দুই দেশের মধ্যকার আজন্ম বৈরিতাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে থাকে সিনেমাটির কাফেলা। এখানে সালমান হিন্দু দেবতা হনুমানের এমনই কট্টর ভক্ত যে মুসলমান শব্দটিও ঠিকমতো উচ্চারণ করতে চায় না, পাছে ধর্ম নষ্ট হয়ে যায়! সিনেমার পাকিস্তান অংশে একটি দৃশ্য আছে, যেখানে পাকিস্তানি পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বাসের ছাদে লুকিয়ে থাকে বাজরাঙ্গি ভাইজানরূপী সালমান খান, হারিয়ে যাওয়া মুন্নী/শাহিদা এবং স্থানীয় পাকিস্তানি সাংবাদিক নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। সেই বাজরাঙ্গি ভাইজানকে মুসলিম সাংবাদিক যখন জিজ্ঞেস করেন, তিনি কীভাবে এই বোবা মেয়ের বাবা-মাকে খুঁজে বের করবেন? জবাবে বাজরাঙ্গি ভাইজান বলেন, তার হনুমান দেবতা আছেন না, তিনিই সাহায্য করবেন! এ কথা শুনে সাংবাদিক নওয়াজউদ্দিন তাকে খানিক ব্যঙ্গের সঙ্গে অনেকটা মজা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করেন হিন্দু দেবতা বাজরাঙ্গি তাকে সাহায্য করবে, এই পাকিস্তানেও! নওয়াজউদ্দিনের করা এই ব্যঙ্গের প্রত্যুত্তরে আমি সিনেমাহল ভর্তি দর্শককে তুমুল হর্ষধ্বনিতে মেতে উঠতে দেখেছি, যেনো তারাও কট্টর হিন্দু বাজরাঙ্গি ভাইজানকে ব্যঙ্গ করছে।

বাইরে থেকে যা পড়ি-শুনি, তাতে ভারতের কোনো সিনেমাহলে বসে আমি অন্তত এমন দর্শক প্রতিক্রিয়া আশা করিনি। অবশ্য সমগ্র ভারত হয়তো এ উদাহরণের প্রতিনিধিত্বও করে না। তবে সিনেমায় এ রকম আরেকটি মুহূর্তের কথা না বলে পারছি না, যেখানে পাকিস্তানি ইমাম বিদায় বেলায় খোদা হাফেজ’ বললেও তার কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকেন বাজরাঙ্গি ভাইজান। কারণ তার পক্ষে মুসলিমদের ভাষায় খোদা হাফেজ বলা সম্ভব নয়। তখন তার নীরবতায় ইমাম সাহেব বলেন, আচ্ছা তোমাদের ধর্মে বিদায় বেলায় কী বলে? বাজরাঙ্গি ভাইজান উত্তরে জয় শ্রীরাম’ বললে, ইমাম হিন্দুদের কেতা মেনে তা বলেই বিদায় নেন। এই দৃশ্যে ইমামের তথা ইসলাম ধর্মের সহনশীলতা আরো একবার প্রতিষ্ঠা হয়। এবং আমাকে আবারও অবাক করে দিয়ে তুমুল হর্ষধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় গোটা থিয়েটার। মনে হয়, দর্শক যেনো ধর্মের এই রূপটাকেই খুঁজছেন, তা সে যে ধর্মের রূপেই আসুক।

এর মধ্যে একটা কথা বলে রাখি, দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিটের বিশাল সিনেমাটির শেষের অংশটুকু ভীষণ ক্ষুধা নিয়ে দেখতে হয়েছে আমাকে। আর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে সেই সময় সিনেমার বিভিন্ন হাসির দৃশ্যে আশপাশের সিট থেকে আমার গায়ে উড়ে উড়ে আসছিলো, শহরে গিয়ে এফিডেভিট না করেই নাম পরিবর্তন করা পপকর্ন’। মানে আমাদের ভুট্টার খই আর কি! পেটটাকে পুরোই খালি রাখতে হলো; কারণ মধ্য বিরতিতে থিয়েটারের ছোটো ক্যান্টিনটাতে খাবারের গায়ে যে প্রাইজট্যাগ আমি দেখেছি, তা রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং ভীতি জাগানিয়া। এ দেখে আরেকবার মনে হলো, এ মাল্টিপ্লেক্স মধ্যবিত্তের হতেই পারে না! একটু ধারণা দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে, দুইশো মিলিলিটার পেপসির দাম সেখানে একশো ৮০ রুপি!

এভাবেই নানা ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতা মিশিয়ে শেষ হলো ভারতীয় সিনেমাহলে আমার প্রথম সিনেমা শো, বাজরাঙ্গি ভাইজান। কিছু বিষয়কে মনে হলো দ্রুত আমাদের সিনেমাশিল্পে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে মন্দ হয় না, যেমন সিনেমাহল ব্যবস্থাপনা ও সিনেমাশিল্পটাকে অত্যন্ত সিরিয়াসভাবে নেওয়ার মানসিকতার চর্চা। আবার নিশ্চিতভাবেই কিছু ব্যাপার থেকে দূরে থাকতে চাই। তার মধ্যে একটি হলো, যে কারণে আমার বাবা সিনেমা দেখতে না পেরে হোটেলে ঘুমিয়ে রইলেন, আর আমি গোটা সিনেমা দেখে ফেললাম অথচ পেটে একটা দানাপানিও দিতে পারলাম না। সিনেমাহলে আধুনিকতা আনার ফলাফল যেনো এই না হয়! যাই হোক সিনেমা শেষে ফিরতি হাঁটা ধরলাম হোটেলের দিকে। ওমা তখনো দেখি বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, তবে এবার সে কাকভেজা করতে চায় না আমাকে। এবার সে চুল, চোখ, গাল, শরীরে মেখে স্মৃতি হয়ে ফিরতে চায় ঘরে।

লেখক : অনিক ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করেছেন।

anikislam.ru@gmail.com  

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন