মাহামুদ সেতু
প্রকাশিত ০৬ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘কোথায় গেলে পাবো তারে’
বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণা নিয়ে আলাপচারিতা
মাহামুদ সেতু

৬০ কোটি রুপির ভারতীয় পিকে (২০১৪) এখন (অক্টোবর ২০১৫) পর্যন্ত সাতশো কোটি রুপির বেশি আয় করে ব্লকবাস্টার হিট। এ চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগেই একশো কোটি রুপির ব্যবসা নিশ্চিত করে ফেলেছিলো শুধু টিভি ও গানের স্বত্ব বিক্রি করে। কীভাবে সম্ভব এটা! মুক্তির আগেই ৮৫ কোটি রুপিতে চলচ্চিত্রটির টিভি-স্বত্ব কিনে নেওয়ার ‘দুঃসাহস’ কীভাবে দেখায় কোনো চ্যানেল! চ্যানেলটি এই ‘দুঃসাহস’ দেখাতে পেরেছে, কারণ তারা জানতো এটি ব্যবসাসফল হবেই হবে। তা এই নিশ্চয়তা তারা পায় কোথা থেকে! আসলে মুক্তির আগেই পিকে মানুষের মধ্যে যে পরিমাণ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলো, তাতে গণমাধ্যমের পাকা ব্যবসায়ীদের এটা না বুঝতে পারার কোনো কারণ-ই ছিলো না। পিকে মুক্তির পাঁচ মাস আগেই নির্মাতা একটি পোস্টার মুক্তি দেন, যেখানে দেখা যায় প্রায় নগ্ন আমির খানকে। ব্যস, এই এক পোস্টারেই বাজির শুরু। গণমাধ্যমগুলো উঠে পড়ে লাগে পোস্টারের মাজেজা জানার জন্য; শুরু হয় আলোচনা। সেই আলোচনার পরিণতি সাতশো কোটি রুপির ব্যবসা।
পিকের মতো একই আধেয় ধর্ম, ধর্ম-ব্যবসা নিয়ে আরেকটি চলচ্চিত্র বলিউডে নির্মাণ হয় ২০১২ খ্রিস্টাব্দে, ওএমজি : ওহ মাই গড!। দায়িত্ব নিয়ে বলছি—আধেয়, নির্মাণশৈলীসহ চলচ্চিত্রের মান বিচার সংশ্লিষ্ট যেকোনো দিক বিবেচনায় পিকের চেয়ে ওএমজি : ওহ মাই গড! বেশ খানিকটা এগিয়ে। কিন্তু এই চলচ্চিত্রটি পিকের ব্যবসার আশপাশেও যেতে পারেনি। নিঃসন্দেহে পিকের নায়ক আমির খান ব্যবসা সফলতার জন্য বড়ো ধরনের নিয়ামক। কিন্তু তার মানে এই নয়, চলচ্চিত্র দুটির ব্যবসার অনুপাত ৬ : ১ হবে। কারণ ওএমজি : ওহ মাই গড!¬-এর অক্ষয় কুমার ও পরেশ রাওয়ালও কিন্তু ব্যবসার বাজারে কম যান না। তার মানে আধেয়, নির্মাণশৈলী, তারকা অভিনেতার বাইরেও ব্যবসার জন্য আরো কিছু লাগে!
এ অবস্থা শুধু বলিউডের নয়, সারাবিশ্বের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশেও শুধু আলোচনার বদৌলতে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র ‘ব্যবসা’য় উতরে গেছে। অনন্ত জলিলের চলচ্চিত্রগুলোকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। খোঁজ-দ্য সার্চ (২০১০) মুক্তির আগে যেভাবে ঢাকাসহ দেশের বড়ো বড়ো শহরে বিপুল সংখ্যক বিলবোর্ড-বিজ্ঞাপন লাগানো হয়েছিলো সেটা লক্ষণীয়। পরবর্তী সময়ে একই অভিনেতা-প্রযোজকের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নিয়ে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ধরনের ‘উদ্ভট’ আলোচনা হয়েছে তা ওই চলচ্চিত্রের ব্যবসার পথকে অনেকখানি প্রশস্ত করেছে। অথচ মান বিচারে এসব চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রই হয়ে ওঠেনি।
অবশ্য চলচ্চিত্র নিয়ে যে বিরাট আকারে প্রচার-প্রচারণা চালাতেই হবে—এমনও নয়। কোনো নির্মাতা দাবি করতেই পারেন, তার চলচ্চিত্র কে দেখলো, না-দেখলো তাতে তার কিছু আসে যায় না। তিনি শিল্পী হিসেবে শিল্প সৃষ্টি করবেন। তবে এটা তো সত্যি, শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিও বটে। যে কারণে অন্তত এর উদ্দিষ্ট দর্শককে হলেও জানাতে হয়, তাদের জন্য একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে; যা এই তারিখে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ‘নতুন’ কিছু, অন্য ধরনের কিছু আছে। আর এটুকুও যদি না করা হয়, তাহলে চলচ্চিত্র-নির্মাণের সার্থকতা কোথায়? কিন্তু শিল্প দূরে থাক, ইন্ডাস্ট্রি হিসেবেই বাংলাদেশে যেসব নির্মাতা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, তারাইবা দর্শককে তা যথাযথভাবে জানাচ্ছেন কি?
ঢালিউডের মতো খুঁড়িয়ে চলা ইন্ডাস্ট্রিতেও বর্তমানে বছরে ৪০—৪৫টি চলচ্চিত্র হচ্ছে। এর সবগুলোই একেবারে ফেলনা নয়। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কোথায়? চলচ্চিত্রের মান, নকল প্রবণতা, গল্প ও দক্ষ অভিনয়শিল্পীর অভাব—এসব ছাপিয়ে যে সমস্যাটি বড়ো হয়ে ধরা দিচ্ছে সেটা হলো, চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে যথাযথভাবে দর্শককে জানানো মানে প্রচার (Publicity)। প্রচারণার (Propaganda) কথা বাদই দিলাম, যথাযথ প্রচারটাই হচ্ছে না! মনে রাখতে হবে, আজকের দুনিয়ায় বিজ্ঞাপন ছাড়া পণ্য অচল। আর প্রলোভন ছাড়া অচল বিজ্ঞাপন। তাই চলচ্চিত্র সম্পর্কে শুধু তথ্য জানানোর জন্য প্রচার চালালে হবে না, বরং দর্শককে আগ্রহী করে তুলতে মাঠে নামতে হবে। কিন্তু ঢালিউডের নির্মাতাদের কর্মকাণ্ডে মনে হয়, দর্শকদের আগ্রহী করা দূরে থাক, তাদের জানানোরও দরকার নেই!
প্রচারের সেকাল-একাল
অত্রত্য ক্রাউন থিয়েটারে অদ্য রাত্রি হইতে এক অদ্ভূত দৃশ্য প্রদর্শিত হইবে। ব্রেডফোর্ড সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানী এরূপ সজীব চিত্র প্রদর্শন করিবেন যাহা দেখিয়া নিতান্ত বিস্ময় জন্মিবার সম্ভাবনা। গত বছর গ্রীক ও তুরস্কের যে ভীষণ যুদ্ধ হইয়াছে তাহাও অন্যবিধ আশ্চার্য বিষয় যেন ঠিক কার্য্যক্ষেত্রে যাইয়া প্রত্যক্ষ করিতেছি বলিয়া নাকি বোধ হইবে। আমরা আগামীবার ইহার বিশেষ বিবরণ প্রকাশ করিব। আগামী বুধবার পর্যন্ত প্রত্যহ রাত্রি ৮ ঘটিকা হইতে এই ক্রীড়া প্রদর্শনের কথা রহিয়াছে।১
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ এপ্রিল সাপ্তাহিক ‘ঢাকা প্রকাশ’-এ প্রকাশিত বিজ্ঞাপন এটি। এ দিনই প্রথম ঢাকাবাসী আশ্চর্য ‘ক্রীড়া’—চলচ্চিত্রের স্বাদ পায়। ঢাকার ক্রাউন থিয়েটার-এ প্রদর্শিত এ চলচ্চিত্রের টিকিটের দাম ছিলো আট আনা থেকে তিন টাকা পর্যন্ত। টিকিটের উচ্চমূল্য থেকেই ধারণা করা যায়, উচ্চবিত্ত ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণির মানুষের জন্য সেসময় এই ‘ক্রীড়া’ অধরাই ছিলো। সেজন্যই চলচ্চিত্রের উদ্দিষ্ট উচ্চবিত্ত দর্শকের জন্য বিজ্ঞাপনটিও এসেছে তাদেরই গণমাধ্যম সংবাদপত্রে।
১৮৯৮-এ ঢাকায় চলচ্চিত্রের প্রদর্শন শুরু হলেও প্রথম প্রেক্ষাগৃহ ‘পিকচার হাউজ’ নির্মাণ হয় ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে। পরে চলচ্চিত্রের দর্শক বৃদ্ধি ও ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ‘সিনেমা প্যালেস’, ১৯২৭-এ ‘লায়ন সিনেমা’ এবং এর পরের দুই বছরের কোনো এক সময়ে প্রতিষ্ঠা হয় ‘মুকুল’। এসব প্রেক্ষাগৃহে প্রধানত মুম্বাইয়ের (বোম্বাই) চলচ্চিত্রই দেখানো হতো। কারণ দেশীয় চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক নির্মাণ তখনো শুরু হয়নি। আর ৩০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে উত্তেজক নাচগান ও মারপিটনির্ভর হিন্দি চলচ্চিত্র দেখতেই প্রেক্ষাগৃহগুলোতে বেশি ভিড় জমাতো শহুরে খেটে খাওয়া মানুষ।২
ব্যবসায়িকভাবে প্রেক্ষাগৃহ চালুর শুরু থেকেই পোস্টার-ব্যানার সাঁটিয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে চলচ্চিত্রের প্রচার চালানো হতো। অনেক সময় ছড়িয়ে দেওয়া হতো চলচ্চিত্রের সংলাপসহ লিফলেট-হ্যান্ডবিল। এর সঙ্গে কবি বুদ্ধদেব বসুর ছেলেবেলায় চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার স্মৃতিচারণ মিলে যায়। তার ভাষায়, ‘... ঘোড়ার গাড়ি বেরোয় ছাদের উপরে চলে ব্যাগপাইপ আর ঢাকের বাদ্যি আর ভেতরে বসে দুটি লোক মুঠো মুঠো ছড়িয়ে যায় বাংলায় আর ইংরেজিতে ছাপা হলদে লাল সবুজ কাগজে হ্যান্ডবিল।’৩ তাছাড়া বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত দ্য লাস্ট কিস-এর (১৯৩১) প্রচারের জন্য কাহিনি ও স্থিরচিত্র সম্বলিত বুকলেটও প্রকাশ করা হয়েছিলো।
অন্যদিকে পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান প্রচারের জন্য সপ্তাহখানেক আগেই সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রের পোস্টার-ব্যানার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে পাঠিয়ে দিতো। এসব পোস্টার কোনো প্রেক্ষাগৃহে নির্দিষ্ট চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরুর কমপক্ষে তিন—চার দিন আগ থেকে লাগিয়ে দেওয়া হতো এলাকার জনবহুল স্থানে। আর চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর সময় একটি বিশাল আকারের ব্যানার লাগানো থাকতো প্রেক্ষাগৃহের সামনে। ৪০—৬০ ফুট লম্বা এই ব্যানার বাঁশ বা কাঠের ফ্রেমে লাগানো হতো। বেশিরভাগ প্রেক্ষাগৃহ রাস্তার পাশে হওয়ায় এই ব্যানার সহজেই মানুষের দৃষ্টি কাড়তো। নির্দিষ্ট প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী শেষ হলে প্রেক্ষাগৃহ-মালিককে প্রিন্টের সঙ্গে ওই ব্যানারটিও পরিবেশককে ফেরত দিতে হতো, এখনো তাই করা হয়। প্রথমদিকে ক্যানভাসের ওপর চিত্রকর হাতে এঁকে এসব বড়ো ব্যানার তৈরি করতেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা সুভাষ দত্তসহ অনেক বড়ো বড়ো চিত্রশিল্পীর আঁকার হাতেখড়ি কিন্তু এসব ব্যানারে তুলি চালিয়েই হয়েছিলো। এমন সব বড়ো ব্যানার অবশ্য বর্তমানেও আছে, তবে তা পি ভি সি শিটের ওপর কম্পিউটারনির্ভর প্রিন্টে তৈরি করা হয়।
ব্যানার-পোস্টার-মাইকিং ছাড়াও শুরুর সময় থেকেই চলচ্চিত্রের প্রচারের জন্য পত্রিকায় সচিত্র বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। তবে চলচ্চিত্রকে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে যেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৬০-এর দশক পর্যন্ত। এর আগে শুধু বড়ো বড়ো শহরেই প্রেক্ষাগৃহ ছিলো। একদিকে দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ না হওয়ায় প্রেক্ষাগৃহে মূলত ইংরেজি ও উর্দু চলচ্চিত্র প্রদর্শন হতো। অন্যদিকে ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে তখনকার দিনে চলচ্চিত্র দেখাকে গ্রামীণ বেশিরভাগ মানুষ পাপ হিসেবেও গণ্য করতো। ফলে তখনো কেউ উপজেলা পর্যায়ে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণে উদ্যোগী হননি। কিন্তু লোককাহিনিনির্ভর রূপবান (১৯৬৫) নির্মাণ হওয়ার পর এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।৪ গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে নির্মিত রূপবানকে সাধারণ মানুষ নিজেদের বলে গ্রহণ করে। আজকের মতো গণমাধ্যমের বাড়াবাড়ি না থাকায়, সেসময় হয়তো সাধারণ মানুষের মুখে মুখেই রূপবান-এর জয়গান পৌঁছেছিলো।
অন্যদিকে পোস্টার-ব্যানার নিয়ে ঢোল পেটানোর পর শুরু হয় মাইক নিয়ে পাড়া-মহল্লায় চলচ্চিত্রের প্রচার। এলাকাভেদে গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা-ভ্যান, পরবর্তী সময়ে টেম্পুতে করে মাইক নিয়ে প্রচার চলে চলচ্চিত্রের। রিকশার হুডের সঙ্গে দু-পাশে কাঠের বড়ো ফ্রেমে চলচ্চিত্রের পোস্টার লাগানো থাকতো, আর সামনে-পিছনে থাকতো মাইক। অন্যদিকে ভ্যানের উপর বাঁশের চাটাই দিয়ে দোচালা ঘরের মতো তৈরি করে তার দুই পাশে কিংবা গরুর গাড়ির ছইয়ের সঙ্গেও লাগানো হতো বড়ো পোস্টার। এসব গাড়ির ভিতরে বসে একজন কাহিনি-সংক্ষেপসহ চলচ্চিত্রের প্রচার চালাতেন। এছাড়া বিশেষ উপলক্ষ, যেমন : ঈদ, পূজা কিংবা কোনো প্রেক্ষাগৃহে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেও থাকতো কিছু অতিরিক্ত আয়োজন। এক্ষেত্রে সাধারণত কাঠের ফ্রেম দিয়ে টেম্পু সাজিয়ে ব্যান্ড দলসহ প্রচার চালানো হতো। চলচ্চিত্রের সেই মাইকিং শোনার জন্য টেম্পুর পিছনে ছুটতো শিশু-কিশোররা। অনেক সময় নারীরাও উঁকি মারতেন চলচ্চিত্রের পোস্টার দেখার জন্য। আবার কোথাও কোথাও মধ্যবিত্ত দর্শককে আকর্ষণ করার জন্য ‘শুধু মাত্র বুদ্ধিজীবীদের জন্য’—এ কথা বলেও মাইকিং করা হতো।৫
তবে চলচ্চিত্রকে গণমানুষের কাছে নিয়ে যেতে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছে বেতার। ১৯৩৯-এ যাত্রা শুরু করলেও স্বাধীনোত্তর সময়েই মূলত বাংলাদেশ বেতার শক্তিশালী গণমাধ্যম হয়ে ওঠে। তখন শুরু হয় বেতারে চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন প্রচার। এ বিজ্ঞাপনগুলোর আবার বিশেষ ঢঙ ছিলো—চলচ্চিত্রের গান, বিশেষ বিশেষ সংলাপের সঙ্গে কাহিনির অংশবিশেষ বর্ণনা করতেন কথক। মূলত এভাবে ক্লাইম্যাক্স দিয়ে দর্শকমনে একটা অপূর্ণতা তৈরি করা হতো, যাতে তারা প্রেক্ষাগৃহে যান। তাছাড়া শুধু বিজ্ঞাপনই নয়, চলচ্চিত্রের গান নিয়ে অনুষ্ঠান, মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের রিভিউ—এমন নানাধরনের অনুষ্ঠানও প্রচার হতো বেতারে। চলচ্চিত্র মুক্তির কমপক্ষে ১৫ দিন আগ থেকে এ ধরনের প্রচার শুরু হতো, চলতো মুক্তির ১০Ñ১৫ দিন পর পর্যন্ত। আর সেসময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছেই সহজলভ্য হওয়ায় বেতার চলচ্চিত্রের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়। বর্তমানে যেমন স্যাটেলাইট টিভির ‘কল্যাণে’ ভারতীয় বাংলা-হিন্দি চলচ্চিত্রের গান ‘বাংলার ঘরে ঘরে’ বাজতে শোনা যায়, ৮০-৯০-এর দশক জুড়ে বেতারের বদৌলতে বাংলা চলচ্চিত্রের গান চারিদিকে শোনা যেতো। এসবের ফলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলচ্চিত্র নিয়ে আলাদা একটা আগ্রহ জন্মে।
এ তো গেলো মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মানুষের কথা। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্য শুরু থেকেই দৈনিক, সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন প্রচার হতো। ১৯২০-এর দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’, ‘সোনার বাংলা’, ‘চাবুক’ ও ‘আমান’-এ নিয়মিত চলচ্চিত্রবিষয়ক সংবাদ, আলোচনা-সমালোচনা ও বিজ্ঞাপন ছাপানো হতো। আর ৩০-এর দশকে শুধু চলচ্চিত্র নিয়েই একটি ত্রৈমাসিক আত্মপ্রকাশ করে। ‘চিত্রকলা’ নামের এই ত্রৈমাসিকটিই বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা।৬ এরপর ৫০-এর দশকে অনিয়মিতভাবে ‘সিনেমা’, মাসিক ‘ছায়াবাণী’, ‘রূপছায়া’, ‘ছায়াছবি’, ‘সচিত্র সন্ধানী’, ‘মৃদঙ্গ’, ‘রমনা’ ও সাপ্তাহিক ‘চিত্রালী’ প্রকাশ হয়। ‘চিত্রালী’ সেসময় বাংলাদেশের প্রধান চলচ্চিত্র পত্রিকা হয়ে ওঠে। ১৯৭০-এ ‘চিত্রালী’তে যোগ দেন আহমাদ জামান চৌধুরী, যিনি পরবর্তী সময়ে আজাচৌ নামে চলচ্চিত্রবিষয়ক কলাম ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’ লিখে বিখ্যাত হন। ১৯৭৮—৯৮ পর্যন্ত তিনি ‘চিত্রালী’র সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।৭ সেসময়টাতে বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা বলতে সবাই ‘চিত্রালী’কেই বুঝতো। অন্যদিকে ‘চিত্রালী’র সমসাময়িকে বাংলাদেশের প্রভাবশালী ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর বিজ্ঞাপনের একটি বড়ো অংশই ছিলো চলচ্চিত্র।
তাছাড়া ৮০’র শুরু থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনেও চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন তথা ট্রেলার চালানো শুরু হয়। তখন অবশ্য কেবল উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের ঘরেই টিভি সেট শোভা পেতো। ফলে এই শ্রেণির দর্শককে লক্ষ্য করেই টিভিতে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো। যদিও গ্রামে ধনাঢ্য কোনো ব্যক্তির বাড়িতে টিভি সেট থাকলে সেখানে অন্যরাও ভিড় করতো। সেসময় চলচ্চিত্রের গান নিয়ে বি টি ভি’র ‘ছায়াছন্দ’ তো অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। পরে ২১ শতকের শুরুর দিকে টেলিভিশন সহজলভ্য হলেও ততোদিনে ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির কোমর ভেঙে গেছে। সে থেকে টেলিভিশনের মতো ব্যয়বহুল মাধ্যমে দেওয়ার মতো কোনো চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনই আর পাওয়া যায় না। আবার এমনও হতে পারে, টিভিতে যে চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে, তা নির্মাতাদের মনেই নেই! যেসব কারণে বাংলাদেশে এখনো প্রধানত আগের সেই পোস্টার-মাইকিংয়েই চলে চলচ্চিত্রের প্রচার!
প্রচারেই প্রসার—বিপরীতে ঢালিউড
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। যদিও দেশটিতে মোট ১৮টি আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, যেখানে গড়ে প্রতিবছর দেড় থেকে দুই হাজার চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। এতোগুলো ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে বলিউডই বিশ্ব বাজারে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। দেশটি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি থেকে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে আয় করে আট বিলিয়ন ডলার।৮ অন্যদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি হলিউড। এই দুই ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষস্থান দখলের পিছনে তাদের সংস্কৃতি কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ‘মান’ যেমন কাজ করছে, তেমনই সেগুলোর সফল বিপণনেরও রয়েছে সমান অবদান। চলচ্চিত্রশিল্পের শুরু থেকেই হলিউড নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের প্রচারের দিকেও নজর দিয়েছে। সেই ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দেই দ্য প্লিজার সিকার চলচ্চিত্রের প্রচারে ট্রেলার তৈরি হয় হলিউডে, সেই থেকে আজও চলচ্চিত্রের প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার ট্রেলার।৯
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হলিউড-বলিউডে বর্তমানে চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয়ের কমপক্ষে অর্ধেকের সমান টাকা প্রচারে ব্যয় করা হয়। তবে সবাই যে করে এমন নয়; সাধারণত বড়ো বড়ো প্রযোজকেরাই এটা করতে পারেন। যার বদৌলতে সফলতার সোনার হরিণটাও তাদের ঘরেই যায়। উদাহরণ হতে পারে বলিউডের আশিকি টু (২০১৪)। নয় কোটি রুপির এ চলচ্চিত্রটির প্রচারের জন্যই আরো সাত কোটি রুপি খরচ করা হয়; ফলাফল একশো দুই কোটি রুপি আয় করে আশিকি টু ব্লকবাস্টার হিট!১০
বলিউডের নির্মাতারা চলচ্চিত্র নিয়ে একদিকে টিভিতে ট্রেলার-গান, সংবাদপত্রে বিশেষ প্রতিবেদন-বিজ্ঞাপন, ব্যানার-পোস্টার, বেতারে বিজ্ঞাপনের মতো প্রচলিত বা প্রথাগত গণমাধ্যমনির্ভর প্রচার চালান। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে ক্যাম্পেইন, গেম শো, রিয়ালিটি শো, মেগাসিরিয়ালের মধ্যে বিশেষ পর্ব ঢুকিয়ে দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত আপডেট দেওয়া, কার্টুন তৈরি, ম্যাগাজিন ছাপানোসহ ভিন্ন ধারার প্রচারও চালান। তাছাড়া ভারতে অনেকগুলো সঙ্গীতনির্ভর টিভি চ্যানেল রয়েছে যেগুলো সারাদিন মুক্তি প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্রের গানই শুধু বাজায়। আর ফাঁকে ফাঁকে চলচ্চিত্রটির বিজ্ঞাপন তো চলেই। ফলে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে না গিয়ে পারেই না!
হলিউড-বলিউডের বিপরীতে ঢালিউডে চলচ্চিত্রের প্রচারের জন্য বর্তমানে কী করা হয়—এবার সে প্রসঙ্গে আসা যাক। যদিও ওই দুই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ঢালিউডের যোজন যোজন ফারাক, তার পরও প্রচারের কাঠামোগত জায়গা থেকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতেই পারে। তারও আগে বলে রাখা ভালো, ঢালিউডে চলচ্চিত্রের প্রচার দূরে থাক নির্মাণের জন্যও হয়তো পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকে না। তা না হলে শিল্প-নির্দেশনা, সেট নির্মাণ, পোশাক পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলো এই ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো গড়ে ওঠেনি কেনো? যাক, এটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
ঢালিউডে চলচ্চিত্রের প্রচারে এখনো যে পোস্টার ও মাইকিং মূল ভূমিকা পালন করে তা তো আগেই বলেছি। এর বাইরে সম্ভবত অনন্ত জলিলই সর্বপ্রথম প্রচারের জন্য ঢাকা জুড়ে বিলবোর্ড লাগান। এই মাধ্যমগুলো প্রচারে মূল ভূমিকা রাখছে বলার কারণ, শুধু এই মাধ্যমগুলোতেই সাধারণ মানুষ চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানতে পারে। এসবের বাইরে সবার কাছে চলচ্চিত্রকে পৌঁছে দেওয়া যাবে এমন কোনো একক মাধ্যম বর্তমানে ঢালিউড ব্যবহার করে না।
কিন্তু প্রচার মাধ্যমের এ দুরবস্থা কেনো? দুনিয়ার সবাই যখন ফুল স্পিডে সামনে যাচ্ছে, তখন ঢালিউডের প্রচার কেনো রিভার্স গিয়ারে চলছে? ৭০—৮০’র দশকে ঢালিউড যখন রমরমা, সেসময় গণমানুষের কাছে যাওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী গণমাধ্যম ছিলো বেতার। চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনও তাই ওই মাধ্যম নির্ভর ছিলো। এখন বাংলাদেশ বেতার একরকম অকার্যকর, অন্যদিকে বাণিজ্যিক এফ এম বেতারগুলোর সিংহভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এগুলোতে প্রচার চালানোও হয়তো তেমন ফলপ্রসূ হবে না। কিন্তু বর্তমানে তো ঘরে ঘরে টেলিভিশন সেট এবং এক বেতারের স্থানে সবমিলিয়ে ২৬টি টিভি চ্যানেল রয়েছে। তাহলে যুগোপযোগী ও ‘প্রকৃত’ এই প্রচার মাধ্যমটি ব্যবহার করছেন না কেনো? টিভি ব্যয়বহুল তাই? কিন্তু বিজ্ঞাপন তো ব্যয় নয়, বিনিয়োগ। মুক্তবাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু পণ্য ভালো হলেই চলে না, পণ্যের প্রচারে চটকও থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে ঢালিউডি চলচ্চিত্রের যে মান, সে মানের পণ্য বানালাম আর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিলাম ব্যস, এতেই ব্যবসা হয়ে যাবে ভাবাটা মূর্খতা বৈ কিছু নয়।
ইদানীং আবার ডিজিটাল চলচ্চিত্রের প্রচারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউব নির্ভর ডিজিটাল প্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সংবাদপত্রেও কদাচিৎ চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন নয়, প্রতিবেদন থেকেই পাঠক চলচ্চিত্র দেখার প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তো পত্রিকা পড়ে না, ইউটিউবও দেখে না, তাহলে তারা চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে জানবে কোথা থেকে?
বলিউডের ছয়শো কোটির উপরে আয় করা বাজরাঙ্গি ভাইজান (২০১৫) সাড়ে তিন কোটি মানুষ টিকিট কেটে দেখেছেন।১১ এরা সবাই নিশ্চয়ই মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত নয়? এই গণিতটা ঢালিউডের নির্মাতাদেরও বুঝতে হবে। কারণ শুধু উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত দর্শক চলচ্চিত্রের সফলতার জন্য যথেষ্ট নয়। চলচ্চিত্রনির্মাতা খান আতাউর রহমানের মতে, অতীতে ব্যবসায়িক সাফল্যের মাপকাঠি ছিলো সিনেমাহলের থার্ড ক্লাস আগে পূরণ হচ্ছে কি না।১২ এ মাপকাঠি এখনো সমান কার্যকর। কিন্তু কেনো যেনো ঢালিউডের বর্তমান নির্মাতারা ঠিক তাদের কাছে চলচ্চিত্রকে পৌঁছানোর জন্য আর প্রচার চালান না।
প্রচারের বর্তমান প্রবণতা : এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে
ক. প্রচার কৌশল আছে কি?
২০১৫’র ঈদুল ফিতরে মুক্তিপ্রাপ্ত অগ্নি ২’র ব্যবসা সফলতার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমেই এসেছে। চলচ্চিত্রটি প্রথম আলোচনায় আসে ‘ম্যাজিক মামনি’ নামে আইটেম সঙ অনলাইনে মুক্তি দিয়ে। গানটি মুক্তি দেওয়ার প্রথম ছয় দিনেই চার লক্ষ ৬১ হাজার ৪৮০ বার দেখা হয়।১৩ গণমাধ্যমগুলোও এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকেও এ নিয়ে বেশ আলোচনা চলে। এখন প্রশ্ন, এর বাইরে অগ্নি ২’র প্রচারে আর কী কী করেছে এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান? সাধারণ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পোস্টার, মাইকিং, চলচ্চিত্র নিয়ে সংবাদপত্রে রুটিন কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত হিসেবে চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর বেশকিছু প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত থেকে ক্যাম্পেইন করেছে কলাকুশলীরা। তাহলে কি এই প্রচারেই ব্যবসা করেছে অগ্নি ২? ব্যাপারটা হয়তো মোটেও তেমন নয়; কারণ প্রচারের এ কৌশলগুলো বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও অনেকখানি পুরনো। চলচ্চিত্রটির ব্যবসা সফলতার পিছনে সম্ভবত ঈদ উৎসবের সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রয়েছে। কারণ শুধু ঈদ উপলক্ষেই অনেক অনিয়মিত দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যায়।
একই কারণে অগ্নি ২’র মতো ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত লাভ ম্যারেজও প্রচারের ক্ষেত্রে তেমন কিছু না করেই ব্যবসাসফল হওয়ার দাবি করতে পারছে। দুটি চলচ্চিত্রই শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। অন্যদিকে মুক্তির আগ থেকেই পদ্ম পাতার জল নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। কিন্তু শেষ নাগাদ মাত্র ২৬টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় এটি।১৪ যদিও মাত্র এ কয়টি প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা দিয়ে কোনো চলচ্চিত্রের সফলতা-ব্যর্থতার হিসাব করা সম্ভব নয়, তার পরও পদ্ম পাতার জল ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ। সেক্ষেত্রে প্রথম যে প্রশ্নটি ওঠে, পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ না পেয়েও নির্মাতা কেনো চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিলেন? তবে কি ব্যবসা তার উদ্দেশ্য নয়? কারণ ব্যবসায়িক পূর্বপরিকল্পনা থাকলে মাত্র ২৬টি প্রেক্ষাগৃহের জন্য নিশ্চয় নির্মাতা চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতেন না। কেননা শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিয়েও পদ্ম পাতার জল-এর বিনিয়োগ সাড়ে তিন কোটি টাকা তুলে আনা কষ্টকর।
সাধারণ হিসাবে, মফস্বলের একটি প্রেক্ষাগৃহে টিকিটের দাম ৫০ টাকা হলে সেখান থেকে প্রযোজক পান মাত্র আট—নয় টাকা।১৫ সে হিসাবে শুধু প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করে চলচ্চিত্রটির মূলধন তুলে আনতে কম করে হলেও ৩০ লক্ষ দর্শক দরকার। সেখানে পদ্ম পাতার জল নির্মাতার এমন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী! ছুঁয়ে দিলে মন-এর প্রদর্শনী উপলক্ষে নির্মাতা শিহাব শাহীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে গত ৯ জুন তিনি ম্যাজিক লণ্ঠন পরিবারের সঙ্গে এক ঘরোয়া আড্ডায় বসেন। সেখানে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য আসলে কোনো নির্মাতার এফ ডি সি’তে ঘোরাঘুরির দরকার নাই। তার ছয় মাস থেকে এক বছর ঘোরা দরকার কাকরাইলে পরিবেশকদের অফিসে অফিসে। কারণ, নির্মাণ করার আগে তাকে চলচ্চিত্রের বিপণন-পরিবেশনের রাজনীতিটা বুঝতে হবে।’
বিপণনে ব্যর্থ হলেও প্রচারের দিক থেকে একরকম ‘সফল’ই ছিলো পদ্ম পাতার জল। শুরু থেকেই গণমাধ্যম, প্রধানত সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় ছিলো এটি। কিন্তু এই আলোচনা কোন শ্রেণির দর্শকের জন্য? নিঃসন্দেহে তারা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র দেখার সেই ৩০ লক্ষ মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত দর্শক কই!
খ. দর্শকের খোঁজে
কেনো জানি মনে হচ্ছে, ঢালিউডের প্রযোজক-পরিবেশক-নির্মাতারা ডিজিটাল চলচ্চিত্রের জন্য ডিজিটাল প্রচার চালিয়ে সব হয়ে গেছে ভেবে নিচ্ছেন। কিন্তু অনলাইনে ছাড়া ট্রেলারের অধিক দর্শক সংখ্যা কোনোভাবেই চলচ্চিত্রের প্রচার সফল হওয়ার মানদণ্ড হতে পারে না। কারণ, কিছু আগে যে ৩০ লক্ষ দর্শকের হিসাব দেওয়া হলো, সে পরিমাণ দর্শক কখনোই মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে প্রেক্ষাগৃহে আনা সম্ভব নয়। যে ১৯৬০—৭০ দশককে ‘ভালো’ বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ বলা হয়, সেসময়ও এই মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা বাংলা চলচ্চিত্র তেমন একটা দেখতেন না। ‘সহজ কথায় বলা যায়, তখনকার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারছিল না জীবনঘনিষ্ঠ বাংলা ছবিগুলো। সেই শূণ্যস্থান পূরণ করতে নাচে-গানে ভরপুর উর্দু ছবি নির্মাণ শুরু [হয়]।’১৬ আর তারা যদি বাংলা চলচ্চিত্র দেখতেনই তাহলে আসিয়া (১৯৬০), সূর্যস্নান (১৯৬২), কখনো আসেনি (১৯৬১), নদী ও নারীর (১৯৬১) মতো চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হলো কেনো? তখনকার মতো এখনো তারা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে টিকিট কেটে ঢালিউডের ‘অ-চলচ্চিত্র’ দেখেন না; বাড়িতে আরাম করে শুয়ে-বসে স্যাটেলাইট চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের সৌজন্যে কিংবা একপ্রকার বিনা পয়সায় পাইরেটেড ডিভিডি, এর সঙ্গে হালে অনলাইনে বিদেশি ‘ভালো’ চলচ্চিত্র দেখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
ফলে এ শ্রেণির দর্শকের জন্য আপনি যতোই সংবাদপত্রে প্রতিবেদন করুন, বিজ্ঞাপন দিন, অনলাইনে ট্রেলার ছাড়ুন-এর ফলে অনলাইন-অফলাইনে যতো আলোচনাই হোক না কেনো, প্রেক্ষাগৃহের আসন ফাঁকাই থেকে যাবে। কারণ, বাংলাদেশি প্রেক্ষাগৃহের ‘ছারপোকা সমৃদ্ধ শক্ত কাঠের চেয়ার’ তাদের জন্য অনুপযুক্ত! তার পর যে আলোচনার আতিশয্যে ‘গাছে কাঁঠাল থাকতেই গোঁফে তেল দিতে শুরু করেন’ প্রযোজক-পরিবেশক-নির্মাতা, সে আলোচনার করুণ সমাপ্তি ঘটে; ঢালিউড হারায় মেধাবী কোনো নির্মাতাকে। শিহাব শাহীনের ভাষায়, ‘আমি আর কীভাবে সিনেমা বানাবো?’ বিপরীতে ওই ৩০ লক্ষ দর্শক হচ্ছেন সেই দর্শক যারা প্রেক্ষাগৃহের তৃতীয় শ্রেণিতে বসে চলচ্চিত্র দেখেন, যার পকেটের টাকায় প্রযোজক লাভসহ লগ্নি ঘরে তোলেন, সেই নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ। কিন্তু নির্মাতা ব্যয়হীন বলে অনলাইনে যতো ট্রেলারই চালান না কেনো পয়সা খরচ করে তা দেখা নিম্নবিত্তের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে তাদের কাছে চলচ্চিত্রটির খবরই আর হয়তো পৌঁছায় না।
২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ঢালিউডের আলোচিত কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো : জিরো ডিগ্রী, অচেনা হৃদয়, ছুঁয়ে দিলে মন, ইউটার্ন, অগ্নি ২, পদ্ম পাতার জল। চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় বইলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো আলোচনা দেখা যায়নি। মোদ্দা কথা হলো, ঈদের চলচ্চিত্র বলে লাভ ম্যারেজ ও অগ্নি ২ যা কিছু দর্শক পেয়েছে, বাকিগুলো নিম্নবর্গের দর্শক দেখেনি বলেই হয়তো ব্যবসার এই ভরাডুবি।
গ. গণমাধ্যম কাকে জানায়, কী জানায়?
নিম্নবিত্ত দূরে থাক উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত দর্শকইবা গণমাধ্যম থেকে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র সম্পর্কে কতোটুকু জানতে পারছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত’ শ্রেণির ‘মুখপত্র’ হিসেবে পরিচিত ‘প্রথম আলো’কে নেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ের ‘প্রথম আলো’র প্রতিদিনের বিনোদন পাতা ও বৃহস্পতিবারের বিনোদন ক্রোড়পত্র ‘আনন্দ’র সংবাদ। সাধারণ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কোনো চলচ্চিত্র মুক্তির আগের (বাংলাদেশে সাধারণত শুক্রবার চলচ্চিত্র মুক্তি পায়) দিন মানে বৃহস্পতিবার ‘আনন্দ’য় স্ট্যান্ডিং ম্যাটার (সংবাদপত্রের নির্দিষ্ট পাতায় নিয়মিত নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর যে সংবাদ প্রকাশ করা হয়) হিসেবে ‘নতুন ছবি’ বিভাগে চলচ্চিত্রটির খবর প্রকাশ হয়। এছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব চলচ্চিত্র সম্পর্কে দর্শককে আগ্রহী করে তোলার মতো কোনো সংবাদ তারা প্রকাশ করে না। বড়ো জোর মুক্তির পরের দিন চলচ্চিত্রটির কোনো অভিনয়শিল্পীর সাক্ষাৎকারের দেখা মেলে ‘প্রথম আলো’তে। দেখা যাচ্ছে, এসবের বাইরে নির্মাতা তার চলচ্চিত্র নিয়ে নতুন-ভিন্ন কোনো ‘সংবাদ’ জন্ম দিতে পারেন না, উলটোভাবে গণমাধ্যমও হয়তো আগ্রহ দেখায় না।
আগে যে ছয়টি চলচ্চিত্রের কথা বলেছিলাম, তার মধ্যে কেবল জিরো ডিগ্রী ও অগ্নি ২-ই যা একটু প্রচারের আলোয় এসেছে। জিরো ডিগ্রী মুক্তির আগের দিন ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ‘আনন্দ’র প্রথম পাতাজুড়ে চোখে পড়ে ‘‘জিরো ডিগ্রী’র খেল’ শিরোনামের ফিচারটি। আর যথারীতি চলচ্চিত্রটি মুক্তির পরদিন তারা ‘টালিউডের বাণিজ্যিক ছবিতে আগ্রহ নেই’ শিরোনামে অভিনেত্রী জয়া আহসানের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। এর আগে চলচ্চিত্রটি নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে—‘‘জিরো ডিগ্রী’ রেডিওতে’ (১৮ ডিসেম্বর ২০১৪), ‘জিরো ডিগ্রীর রেডিও পার্টনার এবিসি রেডিও’ (১৬ ডিসেম্বর ২০১৪), ‘জিরো ডিগ্রীর গান মোবাইলে’ (৮ ডিসেম্বর ২০১৪), ‘সেপ্টেম্বরে আসছে ‘জিরো ডিগ্রী’’ (১ মে ২০১৪), ‘‘জিরো ডিগ্রী’তে রুহির পাঁচ রূপ’ (৩ এপ্রিল ২০১৪), ‘শুটিংয়ে আহত জয়া’ (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪), অভিনেত্রী রুহির চরিত্র নিয়ে ‘অন্য রুহি’ (২৩ নভেম্বর ২০১৩), ‘জিরো ডিগ্রীতে রুহির অন্তর্ভুক্তির নেপথ্যে’ (২৯ অক্টোবর ২০১৩), ‘চলচ্চিত্র প্রযোজক মাহফুজ’ (২৮ অক্টোবর ২০১৩) ও ‘‘জিরো ডিগ্রী’তে মাহফুজ, জয়া ও রুহি’ (২৭ অক্টোবর ২০১৩) শিরোনামে সংবাদগুলো ।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে এতো সংবাদ প্রকাশ করার নেপথ্য কারণ হয়তো সাইকো থ্রিলার জিরো ডিগ্রীর উদ্দিষ্ট দর্শক মধ্যবিত্ত। তাছাড়া ‘প্রথম আলো’র একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মালিকানাধীন এবিসি রেডিও’র জিরো ডিগ্রীর মিডিয়া পার্টনার হওয়াটাও এটির প্রচারের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। অবশ্য জিরো ডিগ্রী নিয়ে ‘প্রথম আলো’র রাজনৈতিক অর্থনীতি দেখা এ আলোচনার বিষয় নয়। তাছাড়া মোটাদাগে গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে মাত্র, ঘটনাকেই নিজ গুণে সংবাদ হয়ে উঠতে হয়। জিরো ডিগ্রীর নির্মাতা, প্রযোজনা-পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান এখানেই ব্যর্থ। তারা মুক্তির মাস দেড়েক আগে থেকে এটিকে প্রতিবেদনের বিষয় করে তুলতে পারেনি!
২০১৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর থেকে নানা কারণেই জিরো ডিগ্রী সংবাদ উপাদান হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেটাও যথেষ্ট নয়। কারণ গণমাধ্যমের বিশাল সংখ্যা ও বাজারের এই যুগে, কোনো সংবাদ উপাদানকে টিকিয়ে রাখতে না পারলে, তা সংবাদের প্লাবনে কোথায় হারিয়ে যাবে বলা মুশকিল। সেজন্য চলচ্চিত্রের প্রচারে মুক্তির আগের এক—দেড় মাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এ সময়কালে ‘প্রথম আলো’তে জিরো ডিগ্রী নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে মাত্র দুটি। আর যে দুটি সংবাদ দর্শকমনে চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে আগ্রহ জন্মাতে পারে বলে মনে হয়েছে, এর একটি প্রকাশ হয়েছে ৩ এপ্রিল ২০১৪-তে ‘‘জিরো ডিগ্রী’তে রুহির পাঁচ রূপ’ শিরোনামে এবং অন্যটি এক বছরের ব্যবধানে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫-তে ‘‘জিরো ডিগ্রী’র খেল’ শিরোনামে। এ দুটি ছাড়া বছর জুড়ে যে সংবাদগুলো প্রকাশ হয়েছে তার বেশিরভাগই তথ্য, দর্শক আকর্ষিত হওয়ার মতো কিছু নেই বললেই চলে।
অন্যদিকে প্রচলিত ঘরানার বাণিজ্যিক বাংলা চলচ্চিত্রের প্রচারের দুর্দশা উপলব্ধি করা যায়, যখন জিরো ডিগ্রীর সঙ্গে একই দিন বিগ ব্রাদার নামের আরেকটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায় তখন। ‘প্রথম আলো’র আনন্দ’য় ‘নতুন ছবি’ বিভাগের রুটিন আলোচনার বাইরে বিগ ব্রাদার আর কোনো জায়গা করে নিতে পারেনি। অবশ্য এ ঘরানার চলচ্চিত্র নিয়ে ‘প্রথম আলো’ সংবাদ প্রকাশ করতে বিশেষ আগ্রহীও নয়। তাতে হয়তো তাদের ‘জাত’ থাকে না! কারণ, ভিনদেশি হলিউড-বলিউডের জন্যই আনন্দ’র শেষপৃষ্ঠা বরাদ্দ রাখা হয়। সেখানে খুঁজে বের করতে হয় নিজ দেশের ঢালিউডকে। এ থেকেই তাদের ‘জাত’ চেনা যায়! আবারও বলছি, ‘প্রথম আলো’র দোষ-গুণ বিচার করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।
অগ্নি ২ মুক্তি পায় ১৮ জুলাই ২০১৫, ঈদুল ফিতরের দিন। চলচ্চিত্রটির সফলতার পিছনে ঈদ তো ছিলোই, এর বাইরে ভূমিকা রেখেছে এর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ-এর ব্যবসায়িক রাজনীতি। অনেকেরই হয়তো জানা আছে, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহের ডিজিটাল প্রক্ষেপণ যন্ত্র জাজ-এর মালিকানাধীন। ফলে সেসব প্রেক্ষাগৃহে জাজের চলচ্চিত্র চালানো একপ্রকার বাধ্যতামূলক। তাছাড়া এসব প্রেক্ষাগৃহে জাজের কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার কমপক্ষে এক মাস আগে থেকেই শো শুরুর আগে নিয়মিতভাবে তার ট্রেলার চালানো হয়। ফলে প্রেক্ষাগৃহের নিয়মিত দর্শকের মধ্যে তা নিয়ে আগ্রহ তৈরির চেষ্টা চালু থাকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জাজের বাইরের কারও চলচ্চিত্র এ সুবিধা পায় না।
যাহোক, এসব রাজনীতি বাদ দিলে অগ্নি ২ নিয়ে ‘সংবাদ’ হওয়ার মতো এক ‘ম্যাজিক মামনি’ ছাড়া তেমন কোনো আলোচনা নির্মাতা জন্ম দিতে পারেনি। অবশ্য জাজ-মাহি দ্বন্দ্বের জেরেও এটি অল্পবিস্তর আলোচনায় আসে। তবে হ্যাঁ, চলচ্চিত্র মুক্তির আগে এ রকম চটকদার সংবাদ-কাহিনি সব ইন্ডাস্ট্রিতেই দেখা যায়। সেগুলোতে চলচ্চিত্রটিকেই ফোকাস করা হয়। জাজ-মাহি দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটি হয়নি। তাদের দ্বন্দ্বটাই গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। সেজন্যই মাহিকে বাদ দিয়ে জাজ-এর নতুন নায়িকা নির্বাচন করাটা বেশি কাভারেজ পেয়েছে। কিন্তু অগ্নি ২’র প্রচারের জন্যই যদি এ দ্বন্দ্বের নাটক করা হতো, তাহলে চলচ্চিত্রের সংবাদই গুরুত্ব সহকারে প্রচার হতো। অর্থাৎ, অগ্নি ২ সংবাদ হতে পারেনি, মাহি-জাজ দ্বন্দ্বের উপজাত হয়েই থেকেছে মাত্র। তাছাড়া জুন মাসে আইটেম সঙ ‘ম্যাজিক মামনি’ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর থেকে ঈদের আগ পর্যন্ত এক মাসে মোটে দুটি সংবাদে অগ্নি ২’র কথা এসেছে। একটি, ১১ জুলাই নায়িকা মাহিকে নিয়ে ‘মাহি বললেন ভিন্ন কথা!’, যেখানে মূলত জাজ-এর সঙ্গে মাহির সম্পর্কের টানাপড়েনই গুরুত্ব পেয়েছে। এরপর ১৪ জুলাই ছাপা হয় অগ্নি ২’র নায়ক ওমের সাক্ষাৎকার। তবে চলচ্চিত্রটি নিয়ে প্রচারণামূলক একমাত্র সংবাদটি হয় ঈদের দিন অগ্নি ২’র ছয়টি শো চালানো নিয়ে—‘এক প্রেক্ষাগৃহে ৬টি শো’ শিরোনামে ২২ জুলাই ‘প্রথম আলো’র বিনোদন পাতায়।
জিরো ডিগ্রী ও অগ্নি ২ ছাড়া বাকি চলচ্চিত্রগুলো প্রচারের আলো দূরে থাক ছায়াও মাড়াতে পারেনি। যদি পারতো তাহলে যে ‘ইউটার্ন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রশিল্পেরই ইউটার্ন হতে পারতো’ (চলচ্চিত্রটি দেখে অনলাইনে দর্শকদের দেওয়া মত ও পরিচিত কয়েকজনের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে এ কথা বলছি) তা লোকে দেখেনি কেনো? ২০১৫’র ২৯ মে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। মুক্তির এক মাস আগ থেকে শুরু করে ১৫ দিন পর পর্যন্ত পত্রিকা ঘেঁটে দুটি মাত্র সংবাদ উদ্ধার করা গেছে। একটির অবস্থান বরাবরের মতোই ‘আনন্দ’র ‘নতুন ছবি’ বিভাগে। অন্যটি নায়িকা আইরিনের সাক্ষাৎকার, যেটি চলচ্চিত্র মুক্তির পরের দিন বিনোদন পাতায় ছাপায় ‘প্রথম আলো’। যেনো এছাড়া চলচ্চিত্রটি নিয়ে সংবাদ করার মতো আর কোনো কিছু ছিলো না!
অন্যদিকে অচেনা হৃদয় মুক্তির আগের দিন ২১ মে আনন্দ’র ‘নতুন ছবি’ বিভাগে সংবাদ ও মুক্তির পরের দিন নায়িকা প্রসূন আজাদের সাক্ষাৎকার ছাপানো হয়। এছাড়া চলচ্চিত্রটি নিয়ে আর কোনো সংবাদ নেই! আর ১০ এপ্রিল মুক্তি পায় ছুঁয়ে দিলে মন। চলচ্চিত্রটি নিয়ে একমাত্র সংবাদটি প্রকাশ হয় মুক্তির দিনেই। এদিন ‘প্রথম আলো’র বিনোদন পাতায় ছিলো প্রযোজক সারা যাকেরের সাক্ষাৎকার। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রত্যেকটি চলচ্চিত্র মুক্তির আগের এক মাস থেকে পরের ১৫ দিনের মধ্যে শুধু এ ধরনের দু-একটি সংবাদই প্রকাশ হচ্ছে। আর এই সংবাদগুলো মানুষকে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী করা দূরে থাক, যথাযথ তথ্য জানাতেও ব্যর্থ।
উৎসব-আনন্দে প্রচার তারতম্য
মানুষ টিকিট কেটে চলচ্চিত্র দেখবে, আর তা থেকেই প্রযোজক মুনাফাসহ তার লগ্নি ফেরত আনবেন—সারা পৃথিবীতেই এটা অনেক পুরনো পদ্ধতি। বর্তমানে এর বাইরে নানা উপায়ে চলচ্চিত্রে লগ্নি করা পুঁজি ফেরত আসার পথ বের হয়েছে। বলিউড-হলিউড তো শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ করে না, বরং ব্র্যান্ড তৈরি করে। ‘জেমস বন্ড’, ‘সুপারম্যান’, ‘স্পাইডারম্যান’ শুধু কাল্পনিক কোনো চরিত্র নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা পুঁজি বিকাশে ভূমিকা রাখে। হলিউডের মতো একইভাবে বলিউডেও ‘ধুম’, ‘কৃষ’ ছাড়াও আমির-শাহরুখ-সালমানদের চলচ্চিত্রগুলোকে ব্র্যান্ড আকারেই বাজারে ছাড়া হয়। অন্যদিকে প্রচারণার জন্য চলচ্চিত্রের পাশাপাশি একই নামে বাজারে ভিডিও গেম, পোশাক, খেলনা, কমিক তো আছেই; যা থেকেও যথেষ্ট আয় হয়। এর বাইরে চলচ্চিত্রের টিভি-স্বত্ব, ডিভিডি-স্বত্ব, গানের স্বত্ব রয়েছেই। হলিউডের সুপারম্যান সিরিজের ম্যান অব স্টিল-এর (২০১৩) কথাই ধরুন, এর নির্মাণব্যয়ের অর্ধেক ১০ কোটি ডলার উঠে এসেছে ডিভিডি-স্বত্ব থেকে।১৭ আর বলিউডের কাহানি (২০১২) তো তার নির্মাণব্যয়ের পুরোটা শুধু টিভি-স্বত্ব বিক্রি করেই তুলে নেয়।১৮ অন্যদিকে কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিই মন্দায় পড়ে চলচ্চিত্রের টিভি-স্বত্ব বিক্রি না হওয়ায়।
কিন্তু ঢালিউডে দর্শকের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপরের কোনোটাই গড়ে ওঠেনি। অবশ্য এ কথাও ঠিক, স্বত্ব থেকে যতো আয়ই হোক, প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের হাউসফুল উপস্থিতিই হয়তো নির্মাতার মূল চাওয়া থাকে। আর চলচ্চিত্রের প্রকৃত স্বাদ পেতে হলেও দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে এসেই সেটা দেখতে হয়। কারণ, ওই অন্ধকার বড়ো ঘরে চলচ্চিত্রের ইমেজগুলো আপনাকে যেভাবে নির্মিত বাস্তবতার স্বাদ দেয়, টিভি-ডিভিডি’তে তা পাওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখা বাংলাদেশের মানুষ একরকম ছেড়েই দিয়েছে। চার দশক ধরে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে এখন রাজশাহীর একমাত্র প্রেক্ষাগৃহ ‘উপহার সিনেমা’র পাহারাদার মো. জাহাঙ্গীরের মত এ রকম, ‘গরিব-দুখিরা এখনকার এই বই দেখে না, এই বই তারা আগে দেখেছে।’১৯ সেক্ষেত্রে এসব প্রেক্ষাগৃহবিমুখ মানুষকে ফেরাতে কী করছে গণমাধ্যমগুলো?
বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকার বিনোদন পাতা, টিভি চ্যানেলগুলো নিয়মিত চলচ্চিত্র নিয়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কিন্তু এর মধ্যে ঢালিউডের কয়টি সংবাদ থাকে? সাধারণ সময় দূরে থাক, দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের সময়েও চলচ্চিত্র নিয়ে তেমন কোনো ভিন্ন আয়োজন চোখে পড়ে না। অথচ হলিউড, বলিউড এ সময়গুলো খুব ভালোভাবেই কাজে লাগায়। গত ঈদুল ফিতরের আগের এক সপ্তাহের সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের কথাই বলি। ‘প্রথম আলো’র ১০-১৭ জুলাই পর্যন্ত সংখ্যাগুলোতে বিনোদন পাতায় সর্বমোট ৪১টি সংবাদ প্রকাশ হয়। এর বাইরে ১৬ জুলাই ঈদ উপলক্ষে বিনোদন নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘ঈদ বিনোদন’ও ছিলো। এই ৪১টি সংবাদের মধ্যে ঢালিউডের চলচ্চিত্র নিয়ে সংবাদ ছিলো মাত্র ১১টি।
এগুলোর মধ্যে ১০ জুলাই ছিলো মিশা সওদাগরের সাক্ষাৎকার ‘১৫ বছর ধরেই ঈদে আমার ছবি’ ও ‘বাড়ি ফিরলেন রাজ্জাক’; ১১ জুলাই মাহিয়া মাহিকে নিয়ে সংবাদ ‘মাহি বললেন ভিন্ন কথা’; ১৩ জুলাই ‘চ্যানেল আই’-এর জন্য কবরীর নাটক পরিচালনা নিয়ে সংবাদ ‘অনুরোধে পরিচালনায়’; ঈদে মুক্তি প্রতীক্ষিত অগ্নি ২-এ অভিনয় করা টালিউডের নায়ক ওম-এর সাক্ষাৎকার ‘পদ্মা নদী দেখে মন ভরে গেছে’ ও প্রয়াত নায়ক সালমান শাহকে নিয়ে ‘সালমানের গানে নতুনদের নাচ’ সংবাদ দুটি প্রকাশ হয় ১৪ জুলাই; ১৫ জুলাই চলচ্চিত্র নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ তিনটি হলো—যৌথ প্রযোজনার রকেট-এর শুটিং শুরু নিয়ে ‘মিম-সোহমের ঝটপট শুটিং’, বৃহন্নলার পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে ‘‘বৃহন্নলা’র জয়’ ও ‘সেন্সর ছাড় পেলো ‘অনিল বাগচীর একদিন’’; ১৬ জুলাই প্রকাশ হয় ‘টিভিতে ‘অল্প অল্প প্রেমের গল্প’’ এবং ১৭ জুলাই মাহির নিজ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে চলচ্চিত্র-নির্মাণ নিয়ে সংবাদ ‘মায়ার বাঁধনে মাহি’ প্রকাশ হয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের অন্যতম বড়ো উৎসব ঈদ উপলক্ষে তিনটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেও সেগুলো নিয়ে বিশেষ কোনো আয়োজন ‘প্রথম আলো’ করেনি! শুধু অভিনয়শিল্পীদের একটি করে সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে! অন্যদিকে ১৬ জুলাই প্রকাশিত ১০ পাতার ‘ঈদ বিনোদন’ ক্রোড়পত্রটিতে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের ভিড়ে ঈদে মুক্তি প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র স্থানই পায়নি!
একই অবস্থা ঈদুল আযহার সময়ও! ১৮Ñ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রকাশিত ‘প্রথম আলো’র বিনোদন পাতাগুলোতে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নিয়ে যে সংবাদগুলো এসেছে সেগুলো এমন—যৌথ প্রযোজনার আশিকীর (২০১৫) কলকাতায় মুক্তি উপলক্ষে ১৮ সেপ্টেম্বর নায়িকা নুসরাত ফারিয়ার সাক্ষাৎকার ‘রাতে আমার ঘুম আসে না’; ১৯ সেপ্টেম্বর ‘ঈদে চলবে ‘গাড়িওয়ালা’!’, অবশ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটি কোনো প্রেক্ষাগৃহে নয়, চলবে ‘চ্যানেল আই’-এ। ২০ সেপ্টেম্বর রয়েছে চিত্রনায়িকা অমৃতা খানের ফিরে আসার সংবাদ ‘ফিরছেন অমৃতা’; ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হয় ‘হাসান আজিজুল হকের গল্প নিয়ে সিনেমা’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি। ঈদে মুক্তি প্রতীক্ষিত কোনো চলচ্চিত্র নিয়ে প্রথম সংবাদ প্রকাশ হয় ২৩ সেপ্টেম্বর; সেখানে টিভি অভিনয়শিল্পী শাহরিয়ার নাজিম জয় পরিচালিত প্রার্থনা নিয়ে তার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়—‘গল্পই ‘প্রার্থনা’র প্রাণ’। ঈদের আগের দিন ২৪ সেপ্টেম্বর মুক্তি প্রতীক্ষিত চারটি চলচ্চিত্র নিয়ে প্রকাশ হয় ‘ঈদের যত ছবি’ শিরোনামে প্রতিবেদন।
আর ঈদের ছুটি শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘প্রথম আলো’র বিনোদন পাতায় চলচ্চিত্র নিয়ে সংবাদটি ছিলো ‘শুটিং দেখে ঈদ বিনোদন!’, যেটা মূলত চলচ্চিত্রের শুটিং দেখতে আসা মানুষদের নিয়ে করা। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হয় দুটি প্রতিবেদন—‘ভালো-মন্দে ঈদের ছবির বাজার’ ও ‘ঈদের সময় দর্শকদের সামনে আসতে খুশি লাগে’ শিরোনামে ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত রাজা বাবুর নায়িকা অপু বিশ্বাসের সাক্ষাৎকার। ঈদে চট্টগ্রামের প্রেক্ষাগৃহের হালচাল নিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হয় ‘প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আসবে তো?’।
বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড়ো উৎসব ঈদ, স্বাভাবিকভাবেই এই সময়টাতে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি ব্যবসা করে। অথচ এই সময়ের চলচ্চিত্র নিয়েও গণমাধ্যমগুলোর কোনো আগ্রহ নেই, দায়সারা একটা—দুটি প্রতিবেদন করেই ছেড়ে দিয়েছে। তার মানে কি ‘প্রথম আলো’ তার পাঠক মধ্যবিত্তকে এই চলচ্চিত্রগুলোর উদ্দিষ্ট দর্শক মনে করছে না? এমন হলে তো নির্মাতা আর গণমাধ্যমের অবস্থান বিপরীতমুখি হয়ে গেলো! কারণ নির্মাতা তার চলচ্চিত্রের ট্রেলার অনলাইনে ছাড়ছেন মধ্যবিত্ত দর্শককে উদ্দেশ্য করে, কিন্তু গণমাধ্যম সেই চলচ্চিত্রকে মধ্যবিত্তের বলে মেনে নিচ্ছে না। এর মানে, হয় নির্মাতার উদ্দিষ্ট দর্শক নির্ধারণ ভুল, নয় তো সেই দর্শকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বেছে নেওয়া মাধ্যমটি ভুল, নয় তো গণমাধ্যমের অবস্থান ভুল। ভুল যারই হোক, তার খেসারত দিতে হচ্ছে ঢালিউড-কারখানাকে।
উলটোদিকে টিভি চ্যানেলগুলোতে সরাসরি বিনোদন সাংবাদিকতা কদাচিৎ চোখে পড়ে। তারা বরং চলচ্চিত্র নিয়ে আলাদা অনুষ্ঠান করে। এ ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে একুশে টিভির ‘সিনে হিটস’, দেশ টিভির ‘সিনেমা এক্সপ্রেস’, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির ‘বিগ পিকচার’, চ্যানেল আই-এর ‘আমার ছবি’, যমুনা টেলিভিশনের ‘শোবিজ টু-নাইট’ প্রভৃতি। কিন্তু সেক্ষেত্রে সমস্যা হলো, এসব অনুষ্ঠানের সামান্য অংশ জুড়ে থাকে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের—অনেকটা প্রাইম টাইম সংবাদের সঙ্গে পাঁচ মিনিটের আবহাওয়া সংবাদ সøটটির মতো। পাঁচ মিনিটের আবহাওয়া সংবাদ দিয়ে যেমন আইলা-সিডরের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করা সম্ভব নয়, তেমনই এসব অনুষ্ঠান দিয়েও বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক বাড়নো যাবে না।
অবশ্য কেউ বলতে পারেন, ঢালিউডে এতো পরিমাণ চলচ্চিত্র প্রতি সপ্তাহে মুক্তি পায় না যে, শুধু সেগুলো নিয়েই অনুষ্ঠান সাজিয়ে ফেলা সম্ভব। তা শুধু মুক্তিপ্রাপ্ত বা প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র নিয়েই কেনো অনুষ্ঠান হবে? চলচ্চিত্র-কারখানা মানে চলচ্চিত্রের মুক্তি আর তার ব্যবসায় কিংবা এর পাত্রপাত্রীদের নানা কর্মকাণ্ড নয়, এর একটি সামগ্রিকতা আছে। চলচ্চিত্রকে বুঝতে হলে সেই সামগ্রিকতায় প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু কার এতো দায় পড়েছে যে ঢালিউড নিয়ে খাটতে যাবেন! এর চেয়ে বলিউডের কোন চলচ্চিত্রটি কতো টাকার ব্যবসা করলো, কোন তারকা কার সঙ্গে কী করলেন, কার ঘর ভাঙলো, কারটা জোড়া লাগলো সে নিয়ে সংবাদ করা অনেক সহজ—জাস্ট, কপি অ্যান্ড পেস্ট! বলিউডের সংবাদের জন্য ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর অনলাইন পোর্টাল ঘাঁটুন, ঢালিউডের জন্য তো নির্মাতাদের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আর ব্যক্তিগত ‘সুবিধা নেওয়া’ সম্পর্ক আছেই। আর খুব বেশি হলে দূরালাপনিতে কোনো তারকার সাক্ষাৎকারটা নিয়ে নিলেই হয়। এই হচ্ছে বিনোদন সাংবাদিকতা!
এতো কথা বলছি এ কারণে যে, চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণা নিয়ে বাংলাদেশের নির্মাতাদের নতুন করে ভাবতে হবে, সঙ্গে তার মাধ্যম নিয়েও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, শুধু প্রচারই শেষ কথা নয়। প্রচারের গুণে দর্শককে হয়তো প্রেক্ষাগৃহ পর্যন্ত আনা যায়, ধরে রাখা যায় না। চলচ্চিত্র ভালো না হলে দর্শক তো সেটা দেখবেই না, বরং অন্যদেরও অনুৎসাহিত করবে। তার মানে, যৌগিক শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সফলতাও যৌগিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে। আক্ষেপ, ঢালিউডি নির্মাতারা আজও এটা বুঝলেন না!
পথের দিশা?
‘চলচ্চিত্রের দেশ’ ভারতে অনেকগুলো টিভি চ্যানেল আছে, যেগুলোকে এক অর্থে চলচ্চিত্রের চ্যানেলই বলা চলে। এর কোনোটিতে সারাদিন চলচ্চিত্র দেখানো হয়, কোনোটিতে চলচ্চিত্রের গান, তারকাদের সাক্ষাৎকার, আলোচনা, মুক্তি প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র নিয়ে অনুষ্ঠান; মোট কথা শুধু চলচ্চিত্র নিয়ে হরেক রকম আয়োজন থাকে এসব টিভি চ্যানেলে। বাংলাদেশেও চলচ্চিত্রভিত্তিক এমন চ্যানেল এখন সময়ের দাবি—বললে ভুল হবে, কারণ সেসময় অনেক আগেই চলে গেছে। অবশ্য এখানে যতো টিভি চ্যানেল আছে সেগুলোর সুযোগই তো নির্মাতারা নিতে পারছেন না!
আশার কথা, জাজ মাল্টিমিডিয়া ২০১৬-তে বাংলাদেশেও চলচ্চিত্রভিত্তিক একটি টিভি চ্যানেল খোলার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, শতাধিক প্রেক্ষাগৃহের প্রক্ষেপণ যন্ত্রের মালিকানাকে কাজে লাগিয়ে জাজ যেভাবে নিজেদের চলচ্চিত্রকে অধিক সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে, এভাবে যদি টিভি চ্যানেলটিকেও নিজেদের কাজে ব্যবহার করে, তাহলে সেটি কিন্তু ‘বরে শাপ’ হবে!
অন্যদিকে যে নির্মাতা তিন কোটি, পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, তিনি এর প্রচারের জন্য কতো বরাদ্দ রাখছেন? বাংলাদেশের কোনো নির্মাতাই হয়তো এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে পারবেন না—সমস্যাটা এখানেই। চলচ্চিত্রের প্রচারে বরাদ্দ রাখতে হবে। পাঁচ কোটি টাকার চলচ্চিত্রের জন্য এক কোটি টাকা তো প্রচারে ব্যয় করাই যায়। সে টাকায় চলচ্চিত্রের শুরু থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন কৌশলে, বিশেষ করে মুক্তির এক মাস আগে থেকে টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে। যে চ্যানেলের যে অনুষ্ঠানে টি আর পি বেশি—সেটা সংবাদ, টক শো বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান হতে পারে—সেগুলোর মাঝে মাঝে ট্রেলার চালানো যেতে পারে।
তাছাড়া নির্মাতা চাইলে কোনো টিভি চ্যানেলকে মিডিয়া পার্টনার হিসেবেও নিতে পারেন। বলিউডে যেটা এখন হরহামেশাই হচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশেও কিছু কিছু চলচ্চিত্রের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে কোনো কোনো গণমাধ্যমকে দেখা যাচ্ছে। তবে সেগুলো শুধু ওই চলচ্চিত্রের ব্যানার-পোস্টার পর্যন্তই। চলচ্চিত্রটির প্রচারের জন্য আলাদা কোনো পদক্ষেপ কিন্তু ওই গণমাধ্যমগুলোকে নিতে দেখা যায় না। অথচ শুধু কাগজে-কলমে মিডিয়া পার্টনার না হয়ে, চলচ্চিত্রটি নিয়ে নানাধরনের প্রচারমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করাটাই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
প্রতিষ্ঠিত টিভি চ্যানেলের বাইরে আরেক ধরনের টিভি চ্যানেল বর্তমানে বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়, ক্যাবল অপারেটরদের পরিচালিত ‘লোকাল টিভি চ্যানেল’। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় চায়ের দোকানে সারাদিন এই লোকাল চ্যানেল চালানো হয়, যেগুলোতে একটার পর একটা চলচ্চিত্র চলতেই থাকে। লোকজনও চায়ের সঙ্গে ‘টা’ হিসেবে এই চলচ্চিত্র গলাধঃকরণ করেন। চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য এই চ্যানেলগুলোও নির্মাতারা ব্যবহার করতে পারেন। প্রত্যেক জেলা শহরে হাতেগোনা কয়েকজন ক্যাবল অপারেটর থাকেন। নির্মাতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অল্প টাকায় চলচ্চিত্রের ট্রেলার চালাতে পারেন। যদিও এই চ্যানেলগুলো আইনিভাবে বৈধ নয়, আবার একই সঙ্গে এও ঠিক যে, আইন আর আইনের প্রয়োগে রয়েছে বিস্তর ফারাক! বড়ো কথা হলো, এ চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে চলচ্চিত্রকে খুব সহজেই একেবারে নিম্নবর্গের দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
যদিও পুরনো কাসুন্দি, তার পরও ঘাঁটছি, এতো টাকা লগ্নিকারী প্রযোজক তার চলচ্চিত্রের বিপণন কৌশল ঠিক করার জন্য আলাদা জনবল নিয়োগ করতে পারেন। যারা পণ্য হিসেবে আপনার চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব খুঁজে বের করে প্রচারের কৌশল নির্ধারণ করবেন। সব কথার এক কথা, যথাযথ প্রচারের পিছনে ব্যয় করার জন্য হাতের মুষ্টিটা খুলতে হবে। তবেই আপনার চলচ্চিত্র মানুষের মধ্যে ঘোর তৈরি করতে পারে, যে ঘোর ভাঙাতে তাকে প্রেক্ষাগৃহে যেতে হবে। অন্যথায়, এ ‘ব্যবসা’ ছেড়ে আপনাকে অন্য কোনো ‘ধান্দা’ খুঁজতে হবে!
লেখক : মাহামুদ সেতু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
msetu.mcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. http:/ww/w.mediapage24.com/others/cinema_history_details/15; retrieved on 25.11.2013
২. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৩৯৪Ñ৩৯৫); ‘চলচ্চিত্র প্রযোজনা, পরিবেশনা ও প্রদর্শন’; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৩. বুদ্ধদেব বসু, উদ্ধৃত; হায়াৎ, অনুপম (২০০৯ : ৭৯); পুরানো ঢাকায় চলচ্চিত্র; ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা।
৪. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৪০৪)।
৫. http://arts.bdnews24.com/?p=1757; retrieved on 01.09.2015 লিঙ্কটির কমেন্ট অংশ দেখুন।
৬. প্রাগুক্ত; হায়াৎ, অনুপম (২০০৯ : ৬০)।
৭. http://goo.gl/73fJaj; retrieved on 09.09.2015
৮. http://goo.gl/aUFQLD; retrieved on 03.09.2015
৯. https://en.wikipedia.org/wiki/Trailer_%28promotion%29; retrieved on 08.09.2015
১০. সেতু, মাহামুদ; ‘পুঁজির বানে ভাটির টানে এ কেমন বলিউড’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ৮, বর্ষ ৪, পৃ. ৮৪।
১১.http://goo.gl/e7oSxY; retrieved on 01.12.2015
১২. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৪০৩)।
১৩. http://goo.gl/S0dOV4; retrived on 08.09.2015
১৪. ‘তবু ‘পদ্ম পাতার জল’...’; প্রথম আলো, ২৪ জুলাই ২০১৫।
১৫. www.ekalerkantho.comarchiev=yäsrch_date=06-08-2015; retrieved on 08.08.2015
১৬. শুভ, শাতিল সিরাজ; ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দর্শক : রুচির বিচারে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সমান’; মাধ্যম; সম্পাদনা : তুষার আবদুল্লাহ; ঢাকা, বর্ষ ১, সংখ্যা ১, পৃ. ৪৭।
১৭. https://en.wikipedia.org/wiki/Man_of_Steel_%28film%29#Home_media; retrieved on 15.09.2015
১৮. https://en.wikipedia.org/wiki/Kahaani; retrieved on 15.09.2015
১৯. মো. জাহাঙ্গীর; ‘গরিব-দুখিরা এখনকার এই বই দেখে না, এই বই তারা আগে দেখেছে’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ৯, বর্ষ ৫, পৃ. ২৭৫।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন