Magic Lanthon

               

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

প্রকাশিত ০৫ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দর্শক-কথা

চলচ্চিত্র ও আমাদের সেই কাল

মুহাম্মদ হাসান ইমাম


বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমার একটা মিশ্র অনুভূতি আছে। আমি এর ভালো সময়টাও দেখেছি, খারাপটাও দেখেছি। খুব খারাপ লাগে যখন শৈশবের দিকে তাকাই, সেই ১৯৬১ থেকে ১৯৭০, মানে এই দশকটা। যদিও দশকের আলোকে সাহিত্য, শিল্পকলার বিচার হয় না। তবুও সুবিধার জন্য অনেক সময়ই দশক, শতক উল্লেখ করতে হয়। তো ওই সময়টা মানে মুখ ও মুখোশ-এর মাত্র চার বছর পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যে ম্যাচিওরিটি এসেছিলো, সেটাকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। এর কারণ হয়তো অনেক, সেসব বিশ্লেষণে যাচ্ছি না। তবে স্বাধীনতার পরে সাংঘাতিকভাবে আমাদের চলচ্চিত্র, পূর্ববর্তী সেই ধারা থেকে সরে আসে। কিছুদিন আগে টেলিভিশনে একটা সাক্ষাৎকারে প্রয়াত নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বলছিলেন, রংবাজ হচ্ছে একটা টার্নিং পয়েন্ট। আমিও বলি রংবাজ-এর জনপ্রিয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু সেই টার্নিং পয়েন্টের পরে আমরা তার থেকেও দূরে সরে এসেছি।

১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়তাম। আমার চলচ্চিত্র দেখার শুরু অবশ্য তখন থেকেই। যতোদূর মনে আছে, প্রথম চলচ্চিত্র দেখি ঢুলী, ভারতীয় বাংলা ছবি কিন্তু সেটির কথা একেবারেই মনে নাই। তবে যদ্দূর মনে আছে, তখন ভারতীয় ও বাংলাদেশি চলচ্চিত্র দেখা হতো। বাংলাদেশে আবার দুই রকম চলচ্চিত্রউর্দু ও বাংলা। সবমিলিয়ে এই তিন রকম চলচ্চিত্র শুরু করি আমরা শৈশবে। সেই শৈশবে, স্কুল জীবনে আমি না-হলেও একশো-দুইশো চলচ্চিত্র দেখেছি। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এই ৪৫ বছরে আমি পাঁচটা চলচ্চিত্রও দেখিনি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে। তার মানে আমি মোটেও বলছি না, এই ৪৫ বছরে পাঁচটা চলচ্চিত্রও হয়নি। অনেক চলচ্চিত্রই হয়েছে, সেগুলো ৬০র দশকের চেয়েও হয়তো অনেক ভালো। তাছাড়া এখন টেকনোলজির অনেক পরিবর্তন হয়েছেক্যামেরা ব্যবহার, পরিচালনা ও সম্পাদনায় অনেক আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে। কিন্তু জীবনের সমান্তরাল যে চলচ্চিত্র, তার আবির্ভাব কমে গেছে। তখন চলচ্চিত্রে যে জিনিসগুলো ছিলো, সেই বয়সটার কারণেই হয়তো তা ভালো লাগতো। আবার যারা ৫০-এর দশকে এ রকম বয়স পার করেছে, তারা হয়তো সেটাকে ভালো বলে।

কিন্তু আমার কথা হলো, শুধু সেকারণেই এসব চলচ্চিত্র ভালো লেগেছেএমন নয়। আমি বলতে চাই, মূলত আমরা শুরু করলাম সাগরিকা এবং উত্তম-সুচিত্রা দিয়ে। এর পাশাপাশি তালাশ, চান্দার মতো উর্দু চলচ্চিত্রও তখন তৈরি হতো। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাজার মোকাবিলায় বাংলাদেশে এই চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণ হয়। এর পাশাপাশি আবার জোয়ার এলো, কখনো আসেনি, ফেকু ওয়াস্তাগার লেন, হারানো দিন, তার পরে এতোটুকু আশা, মধুমিলন, আরো পরে ময়নামতি, ক খ গ ঘ ঙ, জীবন থেকে নেয়া আমাদের ৭০ দশকের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই চলচ্চিত্রগুলোর কথা নির্দিষ্ট করে বলছি এই জন্য যে, এগুলো নির্মাণ হয় অনেকটাই ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য; তবে সেটা ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এগুলো অনেকাংশে নামেও নকল ছিলো। এই চলচ্চিত্রগুলোর গল্প আহামরি কোনো বড়ো মানুষের লেখাও নয়। কিন্তু এগুলোর কাহিনি, গান ও পরিচালনা এতোটাই মনোমুগ্ধকর ছিলো যে, ওই সময়ে একটা বিরাট সংখ্যক দর্শককে তা আকর্ষণ করতে পেরেছিলো। সেই দর্শকের মধ্যে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে স্কুলগামী, তাদের চেয়ে একটু বয়স্ক ছেলেমেয়ে, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত ছিলো; তারা এসব চলচ্চিত্র দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে যেতো। এবং সেসময় প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার পরিবেশও ছিলো। তো এখন আমার ভাবতে খুবই আশ্চর্য লাগে, সেসময় মানে ওই বয়সে ক্লাস ওয়ান, টু, থ্রি, ফোরে আমি একা একা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখতাম; তাতে আমার বাড়ির কেউ কোনো আপত্তি করতো না। এখনকার পরিবেশে তার প্রশ্নই ওঠে না। এখানে শুধু চলচ্চিত্র নয়, সামাজিক পরিবেশ অনেকখানি দায়ী।

১৯৫৮১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের দিকে বা তারও আগে আমি অবশ্য বোন বা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে গেছি; তখন আমি নিতান্তই ছোটো ছিলাম। বুদ্ধি-বিবেচনার পর যেগুলো দেখি তাতে উর্দু তালাশ, চান্দা দিয়ে শুরু করতে হবে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় যে চলচ্চিত্রগুলো দেখেছি, তার শেষটা আমার মনে আছেসোল বাসাল, হ্যায় আপনা দিল। এগুলো দেখার পরেই সম্ভবত ১৯৬৫’র যুদ্ধের কারণে ভারতীয় চলচ্চিত্র আসা বন্ধ হয়ে গেলো। আমরা আস্তে আস্তে তখন বাংলাদেশি মানে পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের দিকে আকর্ষিত হলাম। এছাড়া অবশ্য অন্য কোনো উপায়ও ছিলো না। এর পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উর্দু চলচ্চিত্র আসা শুরু হলো। এগুলোর মধ্যে আওরাদ কি পেয়ার, আরমান, হাজার দাস্তান, রোড টু সোয়াতএই ধরনের আরো বহু চলচ্চিত্র আসে, সেগুলো দেখেছিও। পাকিস্তানি চলচ্চিত্রগুলো অনেকটাই আমরা দেখতাম গানের জন্য। কারণ ওই গানগুলো ছিলো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কিন্তু কাহিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চেয়ে এগিয়ে যেতে পারেনি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সেসময় পরিচালনা, কাহিনি, গান, নায়ক-নায়িকাসবদিক থেকেই খুব মনোমুগ্ধকর ছিলো। অনেক ক্ষেত্রেই নতুন মুখ হলেও তারা ভালো অভিনয় করেছে। কবরী, রাজ্জাক, সুজাতা, আদিল, রহমান, শবনম, শাবানা, সুলতানা, জামান, হাসান ইমাম, ববিতা, সুচিত্রা, সুচন্দার মতো অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীই ছিলেন নতুন। 

ওই সময়ের চলচ্চিত্রগুলো মনের মধ্যে একটা দাগ কেটে দেয়, সেই দাগ এখন পর্যন্ত মুছতে পারিনি। সেসব চলচ্চিত্রের সঙ্গে যখন স্বাধীনতার পরবর্তী চলচ্চিত্রের তুলনা করি, প্রেক্ষাগৃহে যাইতখন সাংঘাতিকভাবে আহত হই। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে অর্ধেক চলচ্চিত্র দেখে ফিরে এসেছি, এমন ঘটনাও প্রচুর আছে। তারপর ৮০’র দশকে আর যাওয়া হয়নি। এর পরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যা দেখা, সেটা হয়তো বিটিভিতে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়েছে। তো সেকারণেই বলছি যে, ৬০ দশকের চলচ্চিত্র শুধু আমার শৈশবে নয়, সেই সময়ে যারা যৌবনে ছিলো, আরো বয়স্ক যারা দেখেছেনকেউ বলবেন না সেগুলো খারাপ লাগতো। চলচ্চিত্রে সেই ধরনের গান, সেই সুরেলা কণ্ঠযেমন যদি বলি বশীর আহমেদের কথা, এই যে মারা গেলেন এর মধ্যেইআর নেই। বশির আহমেদ ভারত থেকে এসেছিলেন, ভালো বাংলা বলতেও পারতেন না। তিনি বাংলাদেশে আসলেন, বাংলা গান গাইলেনযারে যাবি যদি যা, পিঞ্জর খুলে দিয়েছিঅসাধারণ। এটা প্রথমে চলচ্চিত্রের গান ছিলো না। এই গানটা যখন হয়, তখনো আমি অনেক ছোটো, কিন্তু আমার খুব ভালো লাগতো। বশীর আহমেদ বলতে আমি সেই সময় পাগল ছিলাম। সেই বশীর আহমেদ যখন চলচ্চিত্রের গানগুলো গাইতেন, বিশেষ করে উর্দু গানগুলো গাইতেন; তখন আশ্চর্যের ব্যাপার হলো আমরা পাকিস্তান বিরোধী একটা আন্দোলন করছি, সেই আন্দোলনের মধ্যেও উর্দু চলচ্চিত্রের জমজমাট বাজার তখন পূর্ব পাকিস্তানে। এ মুহূর্তে দর্শন চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন সে ছবির সঙ্গীত পরিচালক। সব কটি গান একেবারে হিট। তাছাড়া চকোরী, চাঁদচাঁদনী, ছোটে সাহাব যথেষ্ট দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে।

সেসব চলচ্চিত্রের গান শুনে সবাই মুগ্ধ হতো। এগুলো বাংলাদেশের পরিচালক, প্রযোজকদেরই তৈরি করা; চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসাসফলও বটে। পশ্চিম পাকিস্তানেও সেই সব চলচ্চিত্র সাংঘাতিক চলেছে। এই বশীর আহমেদ স্বাধীনতার পরে গত ৪৫ বছরে আগের মতো সেই গান গাইতে পারেননি। এজন্য বশীর আহমেদকে শিল্পী হিসেবে দোষ দেওয়া যায় না। আমরা তার মুখে, তার কণ্ঠে সেই গান, সেই সুর তুলে দিতে পারিনিদু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এজন্য তার গান এবং তাকে শিল্পী হিসেবে চিনতেই পারেনি পরবর্তী প্রজন্ম।

তার মারা যাওয়ার পরে একটা অনুষ্ঠানের পুনঃপ্রচার দেখলাম টিভিতে, সর্বশেষ একটা অনুষ্ঠানে খুরশীদ আলমের সঙ্গে তিনি গান গেয়েছেন, সেখানেও ময়নামতি বা সেই সময়ের অন্যান্য চলচ্চিত্রের গানগুলোই গাইলেন। সেগুলো এখনো সাংঘাতিকভাবে জনপ্রিয়। জনপ্রিয় কাদের কাছে, যারা ওই চলচ্চিত্রগুলো দেখেছে। কিন্তু এখনকার প্রজন্ম, তারা বশীর আহমেদকে ওইভাবে পায়নি। এই বশীর আহমেদ যদি ভারতে থাকতো অথবা পাকিস্তানে যেতো, তাহলে সে এক নম্বরে থাকতো। ভারত থেকে তিনি কেনো চলে এসেছিলেন জানি না, কিন্তু তিনি মুম্বাইতেও গান করেছেন। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশে থেকে তিনি সেভাবে গাইতে পারেননি। এই বশীর আহমেদকে সামনে রেখেই আমরা বুঝতে পারি, তিনি যেমন সুন্দর গান পাননি, একইভাবে চলচ্চিত্রও সুন্দর পরিচালক, সুন্দর প্রযোজক, সুন্দর কাহিনি, সুন্দর গান পায়নি।

যে টার্নিং পয়েন্টের কথা আমরা রংবাজ দিয়ে বলছি, এরপর খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ হ বা এ জাতীয় কিছু চলচ্চিত্র ছাড়া সম্পূর্ণভাবে আমরা ধীরে ধীরে অস্তাচলের দিকে এগিয়ে গেছি। তার পরে এই চলচ্চিত্র সম্পূর্ণভাবে কেবল কুলি-মজুর ও সাধারণ মানুষের দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের বিনোদনের জন্য মোটা চাল ও মোটা কাপড় দরকার। আমরা প্রেক্ষাগৃহ ত্যাগ করলাম এবং পরবর্তী সময়ে আস্তে আস্তে তারাও আর এই চলচ্চিত্র দেখতে অভ্যস্ত থাকেনি। থাকলে তারা মনে করতো চলচ্চিত্র মানে এ রকমই। আজকেও বাংলাদেশের ব্যবসাসফল যেসব চলচ্চিত্র, সেসবের যারা দর্শক, তারা মনে করে চলচ্চিত্র এ রকমই হওয়া উচিত। এটা দর্শকের দোষ না, কারণ তাদের সামনে সেরকম সুন্দর চলচ্চিত্র দেওয়া হয়নি। দর্শক তৈরির দায়িত্ব চলচ্চিত্র যারা তৈরি করেন তাদের। আমাদেরকে যে রকম তারা তৈরি করেছিলেন। সুতরাং সেদিক থেকে দেখতে গেলে বলা যায়, সেই চলচ্চিত্র না থাকার জন্যেই দর্শক প্রেক্ষাগৃহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আজকে কী দেখছি, রাজশাহী শহরে তখন বর্ণালী সিনেমা, ‘কল্পনা, ‘অলকা, ‘উপহার সিনেমা’হল ছিলো। এই যে চারটি প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখা হতো, এর তিনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে বিল্ডিং, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর হচ্ছে; তার মানে কী চলচ্চিত্রের আর কোনো দর্শক নেই! এইসব প্রেক্ষাগৃহে কিন্তু আমরা ইংরেজি চলচ্চিত্রও দেখেছি। তখন প্রেক্ষাগৃহে ভারতীয় চলচ্চিত্রের উৎসবও হতো। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

এবার টেলিভিশন নাটকের সঙ্গে চলচ্চিত্রের একটা তুলনা করতে চাই। টিভি নাটকে বাংলাদেশ অনেক অগ্রসর ছিলো। বাংলাদেশের টিভি নাটক কিন্তু একসময় ভারতের দর্শককেও মুগ্ধ করেছে। তখন তারা কলকাতার নাটকের চেয়ে বাংলাদেশের নাটক বেশি দেখতো। বিশেষ দিনে তারা বসে থাকতো, কখন বাংলাদেশের নাটক সম্প্রচার হবে। এখন ভারতে অনেক চ্যানেল হয়েছে, সেখানকার নাটক, বিশেষ করে টেলিফিল্ম অনেক উন্নত। আমরাই এখন পিছিয়ে পড়েছি। আমাদের টেলিফিল্মগুলো এখনো গল্পের দিক থেকে সে পর্যায়ে যেতে পারেনি। সেখানকার গল্পকার, ঔপন্যাসিকরা অনেক ভালো গল্প লেখেন এবং সেগুলোকে আশ্রয় করে সেখানে যে ধরনের টেলিফিল্ম হয়, বাংলাদেশে তা হচ্ছে না। তবে তার পরও বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে যে নাটক টেলিফিল্ম হয়, সেগুলো একেবারে খারাপ না।

এখন যারা ঘরে বসে এই টেলিফিল্ম, নাটকগুলো দেখছে, তারা প্রেক্ষাগৃহে গিয়েও চলচ্চিত্র দেখতো, যদি তা ভালো হতো। সামাজিক নিরাপত্তা, প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ কিংবা অন্যান্য যেসব সমস্যা আছেসেজন্য হয়তো অনেক সময় প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া হয় না। তার পরও হয়তো মানুষ যেতো। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মাত্রাতিরিক্ত অল্প সময়ে অর্থ লাভের একটা চেষ্টা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রনির্মাতাদের টার্গেট হয়ে পড়ে পয়সা। আগে তারা ভালো চলচ্চিত্র করতো, ভালো কাহিনি নিতো, সেখানে ভালো গান থাকতো। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে চলে আসলো কীভাবে, কতো অল্প সময়ের মধ্যে বেশি পয়সা লাভ করা যায়। এই লুটেরা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিটাই আমাদের চলচ্চিত্রের মধ্যে ঢুকে যায়। যার ফলে আজ চলচ্চিত্রটা ধ্বংস হয়ে গেছে। এটাকে আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না আমি জানি না। আর এখনো আমরা ৬০-এর দশকের দিকে তাকিয়ে মর্মাহত হই এই জন্য যে, আমাদের জীবন-অভিজ্ঞতায় ওই সময়টিতে, ওই বয়সে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যে আলো ছড়িয়েছিলো, সেই আলো হঠাৎ এভাবে নিভে যাবে ভাবিনি। বরং সেটা আরো প্রজ্জ্বলিত হওয়ার কথা ছিলো। তাই এই সময়ের চলচ্চিত্র দেখে দুঃখ হয়।

তাত্ত্বিক দিক থেকে একটি কথা বলা হয়, সেটা হলো এথনোসেন্ট্রিজম অর্থাৎ নিজের যা, নিজের সম্প্রদায়ের যা, নিজের গোষ্ঠীর যাসেটার প্রতি মানুষের একটা স্বাভাবিক দুর্বলতা থাকে। সেই এথনোসেন্ট্রিজমের কারণেঅনেক সমাজবিজ্ঞানী, তাত্ত্বিকরা বলেছেনআপন সমাজ বা আপন সম্প্রদায় বা আপন সংস্কৃতিকে মানুষ সবসময় ভালোবাসে। সেই কারণেই আমরা নিজেদের চলচ্চিত্রকে ভালোবাসি, ভালোবাসতে চাই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমরা ভালোবাসতে চাচ্ছি, অথচ রাষ্ট্র-সমাজ সেই চলচ্চিত্র দিচ্ছে না। আমরা চলচ্চিত্র দেখতে উৎসুক। সুতরাং এখানে এথনোসেন্ট্রিজমের যে প্রশ্নটি সেটি আসছে না। আর একটা জিনিস আমি বলছি, মানুষ বাল্য বয়স কিংবা যৌবনে যে বিষয়গুলো দেখে, সেগুলো তাকে সারাজীবন আকর্ষণ করে রাখে। যেটাকে টেম্পরোসেন্ট্রিজম বা আমার কালের প্রতি অনুরাগ বা আমার সময়ের প্রতি অনুরাগ বলা হয়।

যারা ৫০-এর দশকে তাদের এই সময়টি পেয়েছেন, তাদের ওই দশকের গান ভালো লাগে। আবার তার আগের যারা তাদের কাছে ভালো লাগে সেই দশকের গান। সেটা যদি ধরি, তাহলে বলবো, যারা ২০ থেকে ৩০ বা ১৫ থেকে ৩০ এই বয়সে দেখেছেন, তাদের কাছেও হয়তো এসব ভালো লাগে। কারণ তারা তাদের যৌবনে সেটা দেখেছেন। অথচ আমি কিন্তু শিশু হিসেবে এবং পরে কৈশোরে সেই চলচ্চিত্র দেখেছি; সুতরাং আমার কাছে যে বিষয়গুলো সেসময় ভালো মনে হয়েছে, এখন দেখি সব মানুষই সেগুলোকে ভালো বলছে। তার মানে আমার কাছে যেটা মনে হয়, এটা শুধু টেম্পরোসেন্ট্রিজমের ব্যাপার না। কারণ ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি’ এবং সেই যে কাহিনি, খুবই সাধারণ কাহিনি হারানো দিন-এর; সেই কাহিনি আপনি চিন্তা করেন, সেই গান, সেই সুর এবং শিল্পীও বাংলাদেশেরএটার যে আবেদন তা আজকের কোনো গানে সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার তালাশ-এর মধ্যে বশীর আহমেদ যখন গাইছেন, ‘হাম রিকশাওয়ালা বেচারা।’ কিংবা নায়িকা শবনম ও নায়ক রহমান, তারা যে গানগুলো গাইছেন, সেই গানগুলোর মধ্যে আমরা যা পাইসেই সময় এসব গান মুখস্থ হয়ে যেতো। চলচ্চিত্র দেখে এসে তার সব গান মুখস্থ করা কিন্তু অনেক বড়ো ব্যাপার ছিলো।

আবার দেখেন, সেসময় এসব চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের চলচ্চিত্র রূপবান হলো, পরে গুনাই বিবি হলো। সালাহউদ্দিন সাহেবের রূপবান সাংঘাতিকভাবে জনপ্রিয় ছিলো। আমি নিজে ওই বয়সে এটা চার বার দেখেছি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে। তখন কতোইবা বয়স, ক্লাস ফোরে পড়ি। বলতে পারেন, আমি সেসময় একটু অতিরিক্ত স্বাধীনতাই ভোগ করতাম। কিন্তু আমি চলচ্চিত্র দেখে এসে তা গোপন করিনি। সারা দিন-রাত আমি এসব চলচ্চিত্রের গান গাইতাম। সব গান আমার মুখস্থ ছিলো। আবার অন্যদিকে হিন্দি চলচ্চিত্রের গান তো ছিলোই।

আজকে কাউকে যদি বলা হয়, ৭০-এর দশকে তিনি কী চলচ্চিত্র দেখেছেন বা ৮০র দশকে দেখেছেন বা ৯০-এর দশকে দেখেছেনতারা কিন্তু ঠিক ওইভাবে ভালো লাগাটাকে ব্যক্ত করতে পারবেন না। আর যেটা করবে, বিচ্ছিন্ন হয়তো দু-একটা চলচ্চিত্রের নাম বলবেন। তো চলচ্চিত্র নিয়ে ওই রকম ভালোলাগা ৪৫ বছরে তৈরি হয়নি বা এই ৪৫ বছরে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কোনো পজিটিভ টার্ন আমরা লক্ষ করছি না। কিন্তু সেই সময় আধুনিক, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ সমাজের উপযোগী নদী ও নারী, সুতরাং-এ কী  ছিলো, যা সাংঘাতিকভাবে আমাদের আকৃষ্ট করতো? শুধু আমাদের না, সমস্ত দেশের মানুষকে সেগুলো জাগরিত করে রাখতো। পাশাপাশি ছিলো লোককাহিনিভিত্তিক রূপবান, গুনাই বিবিরূপবান সেসময় এতোই চলেছিলো যে, তারপর এর রেশ ধরেই হলো আবার বনবাসে রূপবান। এদিকে গুনাই বিবির পর গুনাই। এই সময়ের চলচ্চিত্রগুলোকে দর্শক তার নিজস্বতার গুণেই গ্রহণ করেছিলো।

আমরা যদি পশ্চিমবঙ্গের উত্তম-সুচিত্রা বা অন্যান্যদের চলচ্চিত্রগুলো দেখি; তাহলে দেখবো ৫০-এর দশকে তাদের যাত্রা শুরু এবং ৭০ দশকের মধ্যে তারা জনপ্রিয়তায় চরম তুঙ্গে পৌঁছে গেছে। তিন দশক ধরে তাদের চলচ্চিত্রে যে ক্রমোন্নতি, তা একেবারে দেখার মতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ এখন এসে তারা কিছুটা অধঃপতিত হয়েছে। তবে ভালো চলচ্চিত্র যে হচ্ছে না, তা নয়। তবে সামগ্রিকভাবে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং সামাজিক চলচ্চিত্র তৈরির যে সুযোগ ছিলো, সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন অনেক চলচ্চিত্রই তৈরি হচ্ছে যেগুলো দর্শক ভালোভাবে গ্রহণ করে না। এগুলো পারিবারিকভাবে দেখার মতো সুস্থির চলচ্চিত্র না।

তারা আমাদের এক দশক আগে শুরু করে, তারও এক দশক পর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে, এখনো করছে। তাদের ভালোর পাশাপাশি কিছু খারাপও হচ্ছে। সেটা হলিউড-বলিউডেও হয়। সুতরাং একচেটিয়াভাবে কিছুই বলা যাবে না। কিন্তু আমাদের তিন-চতুর্থাংশ চলচ্চিত্রের অবস্থাই খারাপ। তবে এই একভাগ চলচ্চিত্র যে খুব ভালো হচ্ছে তাও বলা যাবে না। সেসময় আমাদের যারা চলচ্চিত্রনির্মাতা, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ছিলেন তাদেরকে আমরা মূল্যায়ন করতে পারিনি। তাদের শিক্ষাকেও গ্রহণ করতে পারিনি। শুধু তাই নয়, তাদের শিক্ষাকে গ্রহণ করার মতো তেমন কোনো প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে পারিনি।

ফলে তখন যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তাদের অনেককেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এখনকার প্রজন্ম তাদেরকে নামেও চেনে না। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত এতো জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও এর ওপর লিখিত বইপত্র খুবই কম। ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভালো চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগে যারা চলচ্চিত্র করেছেন তারাও যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে করেছেন, এমনটি নয়। তারা মূলত ন্যাচারাল ট্যালেন্ট ছিলেন। এ রকম সব দেশেই হয়। কিন্তু এই গুণাগুণকে শিক্ষা হিসেবে নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্য প্রতিষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সেই প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। কিন্তু ভারতে সঙ্গীত, নৃত্য বা এ রকম নানা বিষয়ের ওপর অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে চলচ্চিত্রনির্মাতা, গায়ক-গায়িকা নিজেরাই এগুলো করতে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশি কোনো নির্মাতা-শিল্পী এগিয়ে আসার ব্যাপারে অবশ্য আর্থিক সমস্যাও ছিলো। আবার সরকারিভাবেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে এখনো অনেক কিছুরই অভাব। আর যেটুকু প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে, সেটুকু আমাদের চাওয়ার সমান নয়।

বি এফ ডি সি’র কথাই ধরুন। এই বি এফ ডি সি তৈরিতে অনেক বরেণ্য ব্যক্তির অবদান আছে। কিন্তু সেই বি এফ ডি সি’র এমন কী পরিবৃদ্ধি ঘটেছে? এটাকে বর্তমানের সাপেক্ষে কতোটুকুইবা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি দ্বারা উন্নতি করা হয়েছে? অথচ আমাদের একটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আছে। এই মন্ত্রণালয়ের এগুলো দেখভাল করার কথা ছিলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা চলচ্চিত্র-নির্মাণের সেই প্রযুক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করাতে পারিনি। এজন্য যারা এই বিষয়গুলোতে অভিজ্ঞ, তাদের কাছ থেকে জেনে যে একটা নীতিমালা গ্রহণ করা হবে, সে চর্চাও এখানে একেবারেই নেই।

সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও এটা লক্ষণীয়। ছোটো বেলায় দেখেছি, গ্রামের যে বাড়িতে কিশোরী মেয়ে আছে, সে বাড়িতেই কমপক্ষে একটি হারমোনিয়াম ছিলো। যেখানেই যাই বিকালে ওই সব বাড়ি থেকে হারমোনিয়ামের সুর কানে আসতো। তখন সঙ্গীতের চর্চা ছিলো। গলায় সুর থাক আর না থাক, তারা গাওয়ার চেষ্টা করতো। সেসময় কাউকে গুণবান বা গুণবতী করার ক্ষেত্রে সঙ্গীতকে একটা বিষয় হিসেবে ধরা হতো। আমরা ধীরে ধীরে অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছি। অনেকে গিটার, বেহালা বা অন্যান্য যন্ত্রের দিকে গেছে। কিন্তু সেভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তারাও পায়নি। অথচ সঙ্গীত আমাদের জীবনে এতোটা জায়গা দখল করে আছে। সেদিক দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগই বা হলো কবে?

অথচ সবার আগে সঙ্গীত বিভাগ হওয়ার কথা ছিলো। যখন বাংলা, ইংরেজি বিভাগ হয়েছে, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, দর্শন, মনোবিজ্ঞান এসব যখন হয়েছে, সেসময়ই সঙ্গীত বিভাগ হওয়ার কথা, কিন্তু হয়নি। কোনো দাবিও ওঠেনি। মূলত আমাদের মধ্যে অনেক ফাঁক-ফোঁকর আছে। যে কারণে আমরা সার্বিকভাবেই সংস্কৃতি তথা সংস্কৃতির সমস্ত দিকগুলোতেই চর্চার ক্ষেত্রে একটা চরম অব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অথচ এই একই সময়ে আমরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক জিনিস করছি, যেগুলো হয়তোবা আমাদের অতোটা প্রয়োজন নেই বা সেগুলো এক অর্থে অপব্যয়।

(লেখাটি মুহাম্মদ হাসান ইমামের রেকর্ড করা কথা থেকে অনুলিখন করা হয়েছে)

লেখক : অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসান ইমাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়ান।

himam_ru@yahoo.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন