কুমার সাহানি
প্রকাশিত ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘আমি কখনো কোথাও নিউ ওয়েভের অংশ ছিলাম না, হতে চাইও না’
কুমার সাহানি

ভারতের নবতরঙ্গ বা প্যারালাল চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা কুমার সাহানি। তার জন্ম পাকিস্তানের সিন্ধুতে হলেও বেড়ে ওঠা ভারতের মুম্বাইয়ে। কেননা তাদের পরিবারকে দেশভাগের নির্মমতার শিকার হতে হয়েছিলো। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে পড়ালেখা করা সাহানি স্নাতক করেছেন মুম্বাই (বোম্বে) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ থেকে ভর্তি হন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়া’তে (এফ টি আই আই)। সেখানে চিত্রনাট্য ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর চলচ্চিত্রকে আরো গভীরভাবে জানতে, বুঝতে ১৯৬৭-তে ফ্রান্স সরকারের বৃত্তি নিয়ে পাড়ি জমান সেখানকার ইন্সটিটিউট দেস হাউটেস এটুডেস সিনেমাটোগ্রাফিকস (আই ডি এইচ ই সি) এ। সেখানে গিয়ে তার পরিচয় ঘটে জগতখ্যাত সব চলচ্চিত্রনির্মাতাদের সঙ্গে। তাদের কারো কারো সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও হয় তার। শেষ পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সে থিতু হননি; ফিরেছেন মাতৃলয়ে ১৯৬৯-এ।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে হাতেখড়ি হয় সাহানির। এরপর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য মায়া দর্পণ নির্মাণের পর তিনি তরঙ্গ (১৯৮৪), খেয়াল গাথা (১৯৮৯), কসবা (১৯৯০), চার অধ্যায় (১৯৯৭), দ্য বেম্বু ফ্লুট (২০০০) ও অ্যাজ দ্য ক্রো ফ্লাইস (২০০৪) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এসব কাজের মধ্য দিয়ে সাহানি তৈরি করেছেন তার নিজস্ব চলচ্চিত্র ভাষা। ভারতীয় নানা শিল্পের ঐতিহ্য, মানবতাবাদ, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, রিলিজিওন ও আধ্যাত্মিকতার মতো বিষয়গুলো সাহানির চলচ্চিত্রে গুরুত্ব সহকারে বিষয়বস্তু হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়েই তিনি ইউরোপের মডার্নিটি ধারণাকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে এগিয়েছেন কাউন্টার মডার্নিটির দিকে।
কুমার সাহানি তার ব্যক্তিগত বোঝাপড়া ও চলচ্চিত্র দর্শন নিয়ে নানা মাধ্যমে কথা বলেছেন। তার এই সাক্ষাৎকারটি ইমেইল ও ফোনযোগে নভেম্বর ২০১৩ থেকে মার্চ ২০১৪ সময়ের মধ্যে নেওয়া। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অপর্ণা ফ্রাঙ্ক (Aparna Frank)। পরে সেটা প্রকাশ হয় ‘Synoptique’ নামে অনলাইন ফিল্ম অ্যান্ড মুভিং ইমেজ স্টাডিজ জার্নালে। সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে ভাব-ভাষান্তর করে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পাঠকের জন্য প্রকাশ করা হলো।
ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর : সোহাগ আব্দুল্লাহ
অপর্ণা ফ্রাঙ্ক : পুরনো অনেক সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধে আপনি ‘আইডেন্টিটি’ ও ‘সংস্কৃতি’র মতো বিষয়গুলোর সহজ সংজ্ঞায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেইসঙ্গে ‘বহুসংস্কৃতিবাদ’ শব্দটি নিয়েও। এ জায়গা থেকে অনেকটা কৌতূহলবশতই জানতে চাচ্ছি ‘ভারতীয় সিনেমা’র মতো শব্দগুচ্ছ দিয়ে আপনি ঠিক কী বোঝেন?
কুমার সাহানি : আপনি হয়তো এটা জানেন, পরিচয় ও সংস্কৃতির বিষয়টা ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শের ফসল। আমার এখনো মনে আছে, ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের আগ পর্যন্ত যেসব ফর্ম [ব্যক্তিগত নানা বিষয়আশয় নিয়ে] পূরণ করা হতো, সেখানে কেবলই জাতীয়তা নয়, আমার জাতি, বর্ণ, ইত্যাদি নানা বিষয় জানতে চাওয়া হতো। এ কারণেই আমি এ ধারণাগুলোকে পুরোপুরি ও মৌলিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমি কখনোই কোনোভাবে বহুসংস্কৃতিবাদ কিংবা অন্য কোনো মতাদর্শ গড়ে তুলতে চাই না—যেসব ধারণার কারণে লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে নৃশংসতা করা হয়েছে। করপোরেট বহুসংস্কৃতিবাদ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মানবতার জন্য সবচেয়ে হুমকির; এসব বিষয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিরোধী হিসেবে কাজ করে। এখন কথা হচ্ছে, ভারতীয় চলচ্চিত্র আমার কাছে বা আপনার কাছে, অন্য যে কারো কাছে কিংবা যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে, তাদের কাছে ঠিক কী? এটা কি এক ধরনের আধিপত্য থেকে নাকি অন্য কারো কাছ থেকে এসেছে? আমি আর আমার গুরুদের—ঋত্বিক ঘটক, ডি ডি কোসাম্বি১, জল বালাপোরিয়া২ এবং তাদের গুরু—আইজেনস্টাইন, আইনস্টাইন, রহমত খান৩ এর কাছে ‘ভারতীয়’ এর মতো ভৌগোলিক যেসব নাম রয়েছে, তার মানে দাঁড়ায় আত্মমুক্তি। আত্মমুক্তির প্রতিটি পদক্ষেপ আত্মোপলব্ধি এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে তার সবগুলো বিষয় চার অধ্যায় (১৯৯৭) এ দেখতে পাওয়া যায়। এর বহুমাত্রিকতাই আমাদেরকে শৃঙ্খলা, সাহিত্যিকতা, চিত্রকল্প বা দর্শন কিংবা প্রাক্সিসের যেকোনো সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়।
অপর্ণা : আপনি ‘ভারতীয় সংস্কৃতি' ও ‘আইডেন্টিটির' মতো দমনমূলক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর বদলে আপনি ব্যক্তি স্বাধীনতার উপায় হিসেবে আইডেন্টিটি ও সংস্কৃতির কথা বলে থাকেন—এমনকি সেটাকে পুনরায় সংজ্ঞায়িতও করেছেন। ভৌগোলিক নাম ‘ভারতীয়’মানে ঋত্বিক ঘটক এমনকি আইজেনস্টাইনের জন্যও আত্মমুক্তি ছিলো—এমনটাই বলতে ও বোঝাতে চান কি?
সাহানি : হ্যাঁ, আমি ‘ভারতীয়’ বা ‘রাশিয়ান’এই অর্থে ব্যবহার করেছি, যা বৈশ্বিক পুঁজির বিরোধী। যখন আইজেনস্টাইন Que Viva Mexico-তে কাজ করছিলেন [চলচ্চিত্রটির কাজ ১৯৩২-এর দিকে আইজেনস্টাইন শুরু করেছিলেন, মুক্তি পায় ১৯৭৯-তে], তখন তিনি নিজেকে সেই সংস্কৃতি ও নির্দিষ্ট ইতিহাসে নিমজ্জিত করেছিলেন মেক্সিকান হিসেবে। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি ‘রাশিয়ান' বা ‘মেক্সিকান' দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এটা ছিলো আত্মমুক্তির চিন্তা। যা অর্জন করা আসলেই খুব কঠিন। আপনি ‘ভারতীয়' বা ‘রাশিয়ান' বলেন কেবল এ কারণে, যেনো নিজেকে উপলব্ধি করতে পারেন, সীমাবদ্ধ বা বন্দি না করেই। ‘ভারতীয়', ‘আমেরিকান' ইত্যাদি নামগুলো আপনাকে একটা পরিচয়ে আবদ্ধ করে, যদি সেগুলো রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে উপর থেকে নিচে ব্যবহার করা হয়—‘রাশিয়ান রাষ্ট্র' বা ‘আমেরিকান রাষ্ট্র'—যা হাস্যকর বিষয়। এটা একে অন্যকে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। যা কাউকে কখনো কখনো বঞ্চিত করে, দানব করে তোলে।
অপর্ণা : আপনি Hou Hsiao-Hsien [তাইওয়ানের চলচ্চিত্রনির্মাতা] এর চলচ্চিত্র সম্পর্কে লিখেছেন। আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে (১৯৬৩-৬৮) ব্রেসন ও ঘটকের [ফরাসি চলচ্চিত্রনির্মাতা রবার্ট ব্রেসন এবং ঋত্বিক ঘটক] কাছে অধ্যয়ন করেছেন; মে ১৯৬৮-এর মতো সময়ের সাক্ষী হয়েছেন [এই সময় ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে সেখানে শ্রমিকসহ অন্যরা অংশ নেয়। একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ডি গল-এর পতন হয়]; Miklós Jancsó [হাঙ্গেরিয়ান চলচ্চিত্রনির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার] এর সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন। এসব কারণে বিশ্ব চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের সঙ্গে আপনার গভীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সবমিলিয়ে এমন মানসিক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, এ ধরনের বিষয় কি বর্তমানের ভারতীয় চলচ্চিত্রে ঘটতে দেখছেন?
সাহানি : আমি এ ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত যে, তরুণ সহকর্মীরা বিশ্ব চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখবে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা বলতে পেরে খুশি হয় যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আমার প্রজন্মের কাজ থেকে তারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। আত্মোপলব্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অনেকটাই সহজাত। এবং আমি বিশ্বাস করি, আমার থেকে বয়সে ছোটো সহকর্মীরা, আমার শিক্ষার্থীরা, এমনকি যাদের এই মুহূর্তে চলচ্চিত্র নির্মাণের মনোবাসনা আছে, তারা স্বাধীনতাকে উদযাপন করতে পারবে।
অপর্ণা : জরুরি অবস্থায় [প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫-১৯৭৭ জরুরি অবস্থা জারি করেন] ‘Framework’এ প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোতে আপনি চলচ্চিত্র ও শিল্পের যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ে দৃঢ় সংশয় প্রকাশ করেছেন। যার মধ্যে বাস্তববাদ, আধুনিকতা ও আঁভগার্দ অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই ধরনের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে—আমরা ভারতীয় চলচ্চিত্রের শতবর্ষ স্মরণ করছি; এর প্রযুক্তিগত সাফল্য, বৃহত্তর শিল্প হিসেবে এর একত্রীকরণ কিংবা এর নান্দনিক অবদান—এ নিয়ে আপনার মতামত জানতে আমি খুবই কৌতূহলী।
সাহানি : আমি মনে করি, বাস্তববাদ ও আধুনিকতা, এমনকি আঁভগার্দ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দশকে নিজেদের কমবেশি নিঃশেষ করে ফেলেছে। এক অর্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কারণ বাস্তবিক অর্থেই নতুন অনেক রাষ্ট্র ভিন্ন ভাষাগত সম্প্রদায়ের মধ্যে একত্রিত হতে চায় না। নারী, অ-শ্বেতাঙ্গের জন্য এ সময়টা ছিলো নতুন ধরনের বিজয়ের, যা আমাদেরকে বৈশ্বিকভাবে উত্তরাধুনিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে; যখন ইউরোপীয় আলোকায়ন ও তার ফলাফল ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ হচ্ছিলো। নতুন এক ধরনের চিহ্ন (ঝরমহ), স্থানকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী দেশ, মেট্রোপলিটন কেন্দ্রে উপস্থিত হতে শুরু করেছিলো তখন। ১৭৭১ [আমেরিকান বিপ্লব], ১৭৮৯ [ফরাসি বিপ্লব], ১৯১৭ [অক্টোবর বিপ্লব], ১৯৪৭ [ভারতের স্বাধীনতা] ও এর পরের সময়টাতে যে ধরনের সামাজিক পরিবর্তন এসেছিলো, তার সঙ্গে প্রযুক্তিগত অর্জনের সামঞ্জস্য যদি না থাকে, তাহলে সেটা সবসময় একটা প্রশ্নের কারণ হয়ে থাকবে। নান্দনিক ও নৈতিক উন্নয়নকে মূল্যায়নের জন্য সভ্যতার বিকাশ প্রক্রিয়ায় ইতিহাস ও স্মৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অপর্ণা : প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ককে আরেকটু বিশদভাবে বর্ণনা করবেন কী?
সাহানি : আপনি কোসাম্বির লেখাপত্রে এটা খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন—কৃষিতে প্রযুক্তির আগমন পুরুষ ও নারীর মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ক, বিভিন্ন পেশা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং শিল্পে এর প্রতিফলনকে পরিবর্তন করে দেয়। যখন এই পরিবর্তনগুলো শিল্পে আনা হয়, তখন আপনার আশপাশে এর বিস্ময়কর সব উদ্ভাবন রয়েছে, যেমন বৈদিক শিল্পে অজন্তা একটা চমৎকার উদাহরণ। বৈদিক শিল্পে অসাধারণ নানা অভিব্যক্তি আছে, যেটা যেকোনো শিল্পেই হওয়া উচিত। তাদের শিল্পের স্বতন্ত্র অতুলনীয়; প্রতিটি পাতা, আঙুলের প্রতিটি মুদ্রা, এতো যত্ন সহকারে করা! তাদের স্বকীয়তা রয়েছে এবং তা তারা করে চলেছে। আপনি এর উদাহরণ জাপানেও দেখতে পাবেন—লোটাস গার্ডেনে। এই স্বকীয়তার ব্যাপারে আমি উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
অপর্ণা : মায়া দর্পণ (মিরর অব ইলিউশন, ১৯৭২), ভারতীয় নবতরঙ্গ চলচ্চিত্র হিসেবে সমাদৃত। এটা মে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের পর চলচ্চিত্রের অলঙ্কারশাস্ত্রে অনন্য ও বিকল্প হিসেবে হাজির হয়। কারণ এটা বলে, ‘স্বাধীনতা হলো প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি’; এবং সেটা আদর্শগত বা রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা থেকে আলাদা। প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে এর দর্শনগত ধারণাটি ভিজ্যুয়ালি/সিনেমাটিকালি পরিবেশনের ক্ষেত্রে আপনার জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিলো?
সাহানি : ব্যক্তিগত নোটে আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইবো। জ্যাক কেবাডিয়ান, যিনি রবার্ট ব্রেসনের প্রথম সহকারী ছিলেন; তাকে সঙ্গে নিয়ে আমি জ্যঁ লুক গদার-এর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। গদার তখন আন্তরিকতার সঙ্গে কেবাডিয়ান ও আমাকে তার চলচ্চিত্রে কাজ করার কথা বলেন। ফ্রান্সের অভিবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে গদার তখন '৬৮ পরবর্তী সময়ের ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে হাজির করতে চেয়েছিলেন। ভিয়েতনামের প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও ইউরোপের চলচ্চিত্রনির্মাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুশীলনকে সম্মিলিত করে ক্রিস মার্কার যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন সেটাও আমার খুব পছন্দ হয়েছিলো। যাইহোক, আমাদের সামনে তখন যে সমস্যাটি দেখা দিয়েছিলো সেটা গদার কিংবা বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির নয়। বিষয়টা হলো, তখন মূলত প্যারিস, লন্ডন, কিংবা নিউ ইয়র্কের অবস্থান থেকে অ-ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে যথাযথভাবে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ কারণেই আমি ভারতে ফিরে আসি। আমি ভেবেছিলাম, অন্যের দুঃখ, প্রেম, সৌন্দর্য ও রঙকে স্বাধীনভাবে বিস্তৃত করতে যেকোনো প্রচেষ্টায় বৃত্তের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজে পাবো। আর একটা বিষয়, অবশ্যই আমি কখনো কোথাও কোনো নিউ ওয়েভের অংশ ছিলাম না, হতে চাইও না।
অপর্ণা : একটু বলবেন, ঠিক কেনো তখন অ-ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা কঠিন বা জটিল বলে মনে হয়েছিলো? কারণগুলো কী রাজনৈতিক, নাকি রিসোর্সের ব্যাপারস্যাপার ছিলো?
সাহানি : বিষয়টা এমন নয় যে, তারা অ-ইউরোপীয়দের জন্য সংগ্রাম করেনি। অবশ্যই করেছে। আমার এখনো মনে আছে, যখন প্যারিসে গিয়েছিলাম তখন সেখানে ভিয়েতনামের জন্য বিক্ষোভ হয়েছিলো। এবং আমি ভাবছিলাম, তাদের নিজেদেরই তো অনেক সমস্যা, তারা কেনো সেগুলো নিয়ে কথা বলছে না? যেনো সমস্যাগুলো কেবল ভিয়েতনামেই ছিলো; আর পশ্চিমা বিশ্বে সেসবের কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেনো তারা প্রথমে নিজেদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেনি এবং ভিয়েতনামকে তাদের নিজেদের সমস্যার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখছে না। তারপর হঠাৎ করেই বড়ো ধরনের ঘটনা ঘটলো '৬৮-এর মে মাসে। সেসময় দারুণ কিছু ঘটলো! জার্মানিতে চলে যাওয়ার জন্য ডি গল’কে৪ চাপ দেওয়া হলো। ঘটনাটা নিজেই একটা বড়ো অর্জন ছিলো। এবং ১৯৬৮’র মে মাসের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, তার বিরাট প্রভাব ছিলো। আমি জিগা ভের্তভ-দের কাজগুলো দেখেছি মানে তাদের চলচ্চিত্র দেখেছি, কিন্তু তা নিয়ে খুব একটা ভাবিনি।
অপর্ণা : ইতিহাস নিয়ে আপনার আগ্রহ সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র, যা কোসাম্বির মার্কসবাদী নৃতত্ত্ব ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়-এর রচনা থেকে এসেছে। আপনার কোন চলচ্চিত্রকে আপনি কোসাম্বি/চট্টোপাধ্যায়ের কাজের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করবেন? আপনি কী কোসাম্বিকে নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান না?
সাহানি : বোধ করি কোসাম্বি ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়৫ যদি জীবিত থাকতো তাহলে তারাই এই প্রশ্নের উত্তর দারুণভাবে দিতে পারতো। আমি এটা বিশ্বাস করি, তাদের কাজ আমার সব চলচ্চিত্রে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা, বিমূর্ততা ও চিহ্ন তৈরির ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি কোসাম্বিকে নিয়ে একটা চলচ্চিত্রের কথা ভেবেছিলাম। তবে অবশ্যই, সেটা জীবনীনির্ভর কোনো কিছু ছিলো না। তার জীবন নিয়ে অনেক কিছুই করার ছিলো। কারণ তিনি অনেক বিষয়আশয় পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং আমাকে সেসব ‘রেকর্ড’করতে এবং তার একটা মন্তাজ তৈরি করতে বলেছিলেন।
অপর্ণা : কেনো ‘চিহ্ন' বললেন ‘প্রতীক' বা ‘রূপক' না বলে?
সাহানি : একটা চিহ্ন উপবৃত্তাকার (elliptical) হতে পারে; চিহ্ন প্ররোচক (persuasive) হতে পারে এবং সেটা ব্যাখ্যা করাও যেতে পারে। এটা দর্শকের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে প্রকাশের সুযোগ দেয় এবং শিল্পীর কাছ থেকে দর্শকের তরফে এক ধরনের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়; তাকে সেই চিহ্নটা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রতীকের ন্যায় চিহ্ন কোনো পরম, স্থির বস্তু বা অর্থের সঙ্গে আবদ্ধ নয়। এখানকার শিল্প ও সাহিত্যের একটা নীতির নামকরণ করা হয়েছে ‘ব্যঞ্জনা’। আমি বিশ্বাস করি, এটা অন্যান্য সংস্কৃতিতেও বিদ্যমান। ব্যঞ্জনা বলতে বোঝায় এমন অর্থ যা একটা ইমেজ বা বাক্যাংশের নির্মাণ থেকে উদ্ভূত বা পরিবর্তিত হয়; যা আমাদের অভিজ্ঞতাকে প্রতিনিয়ত গভীরতর করে। আমার মনে হয়, চিনারা এটাকে পরোক্ষ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র৬ অষ্টপদী বা আইকন কিংবা এ দৃষ্টিকোণ থেকে আন্দোলনের কথা বলেছিলেন; যেগুলো এক অর্থে আমাদের সভ্যতার বিদ্যমান লেয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত—তান্ত্রিক, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব, সুফি।
অপর্ণা : The Bamboo Flute (২০০০), Bhavantarana (Immanence, ১৯৯১) ও Khayal Gatha (The Khayal Saga, ১৯৮৯) এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় আপনাকে এ ধরনের শিল্পকলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছিলো। মিউজিশিয়ান, পেইন্টার ও ড্যান্সারদের সঙ্গে আপনার কোলাবোরেশন সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলবেন কী? এই শিল্পকলাগুলো চলচ্চিত্রে লুকিয়ে থাকা মিথ্যা কোনো কিছুকে কি বের করে আনে?
সাহানি : আমি দীর্ঘ সময় নিয়ে ওই শিল্পীদের সঙ্গে চলচ্চিত্রে কাজ করেছি, অথচ সেইসব চলচ্চিত্র বুঝতে পারিনি ... এখনো পর্যন্ত। সেই সূত্রে ভিভান সুন্দরম৭-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আমার একটা সম্পর্ক ছিলো। তার ও গীতা কাপুর৮-এর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে। ভিভানের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে আমি ইউরোপ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ককে বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি তার খালা, অমৃতা শের-গিল৯’কেও অনেক ভালোভাবে চিনি। সিমলা, প্যারিস ও বুদাপেস্টের অভিজ্ঞতা আমার কাছে পুনর্জন্মের ঘটনার মতোই ছিলো!
আমি পিনা বাউশ১০ ও অনীশ কাপুর১১ এর সঙ্গেও কাজ শুরু করেছিলাম; চলচ্চিত্রে আমাদের সেই কাজের অভিজ্ঞতা সবার জন্য নতুন দিগন্ত প্রসারিত করেছিলো বলেই আমি বিশ্বাস করি। পিনা বেঁচে নেই আর অনীশের সঙ্গে কাজের জন্য কোনো ধরনের ফান্ডিং নাই বলে আমি বেশ হতাশ বোধ করছি। আকবর পদমসে১২ আমার কাছে শিক্ষকের মতোই ছিলেন; তার সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে। চার অধ্যায়-এর প্রতিটি ফ্রেমে সোমনাথ হোরে১৩-এর কাজ এবং কে কে মহাজন১৪-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অব্যক্ত যোগাযোগে উঠে এসেছে।
মায়া দর্পণ-এ চন্দ্রা১৫ প্রথমে ভরতনাট্যম১৬ ডিসিপ্লিন থেকে নৃত্যের কোরিওগ্রাফ করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন দেখতে পেলেন, আমি এতে খুব একটা সন্তুষ্ট নই, তখন তিনি তা বাদ দেন। এবং মূল শিডিউলের শুটিংয়ের পরে আমরা ময়ূরভঞ্জ ছৌ১৭-এ ঠিকঠাক তাল খুঁজে পেয়েছিলাম রাজস্থানের সুদূর আলওয়ার-এ। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ও পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া১৮ দুজনই অতুলনীয় উদারতার সঙ্গে নিজেদের সবটুকু ওই চলচ্চিত্রে দিয়েছিলেন। আমি মনে করি, আমাদের সঙ্গীতে (সাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যের সংমিশ্রণ) একটা অনাবিষ্কৃত আন্দোলিত সমুদ্র রয়েছে। সময়ের সঙ্গে যা নিজেকেই তৈরি করেছে, এমনকি তা অদৃশ্যও হয়ে যায়। মন্তাজ ও সুরের নানারকম বিস্তারের (modulation) ক্ষেত্রে এটা সত্য নয় কি?
মোদ্দাকথা হলো, অন্য শিল্পমাধ্যম নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যাবে না, এটা যেনো এক ধরনের সামাজিক বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। অন্য শিল্পমাধ্যমকে কিছুটা হলেও আপনার রূপান্তর ও অতিক্রম করতে হবে; জাক্সটাপজিশন (পরস্পর বৈপরীত্য) ও মন্তাজের মাধ্যমে আপনি সেই নির্দিষ্ট কাজের ঐক্য অতিক্রম করেন; এবং আপনাকে এটা করতেই হবে। কারণ তা যদি না করেন, আপনি সেটাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবেন না। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র আমার চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, এটা তাকে নিয়ে করা চলচ্চিত্র নয়। বরং এমন কিছু, যা তাকে অতিক্রম করে ও তার অঙ্গভঙ্গির বাইরে যায়। সবমিলিয়ে তা একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। ফলে আমি বিস্তারিত পরিকল্পনা করি, কিন্তু সেটা কাগজকলমে নয়, আমি যাদের সঙ্গে কাজ করি তাদের সঙ্গে। এমনকি আমার চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে এটা বেশি হয়। এটাই শট্গুলোকে প্রকাশ হতে দেয়। যখন সম্পাদনার প্রসঙ্গ আসে তখন বিক্ষিপ্ত বা যে পরিস্থিতিতেই থাকি না কেনো, পরম মনোযোগ ও একাগ্রতার প্রয়োজন হয়।
অপর্ণা : ব্যবসা প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার সমালোচনামূলক অবস্থানকে আমলে নিয়েই জানতে চাচ্ছি, আপনি কি ভারতীয় বা হলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র দেখেন? আপনি কি প্রেক্ষাগৃহে, মাল্টিপ্লেক্সে যান?
সাহানি : অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে কিছু নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়, যে কারণে কখনো কখনো আরো নিবিড়ভাবে চলচ্চিত্রের জন্য অভিনয়শিল্পী নির্বাচন করতে সক্ষম হই। আমি খুবই পছন্দ করি, যখন আমার কোনো শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র দেখতে থিয়েটারে বা কোনো প্রদর্শনীতে যেতে বলে—বিশেষ করে তাদের নিজেদের কাজ দেখতে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত মান অনেক উন্নত হয়েছে, কিন্তু আমি জানি না এটা আদৌ কোথাও যাচ্ছে কিনা।
অপর্ণা : ৭০ দশকে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন সেই তুলনায় চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে এখন আপনি কোন ধরনের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে মনে করেন?
সাহানি : ১৯৭০-এর দশকে পুঁজি সবেমাত্র কোথাও কোথাও বিশেষ কোনো রেজিমের পতন, একইসঙ্গে স্বৈরশাসকদের উত্থানেও সাহায্য করছিলো। এটা প্রথম বিশ্বসহ অন্যদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। মায়া দর্পণ-এর পরে, আমার দ্বিতীয় কাহিনিচিত্র তরঙ্গ (১৯৮৪) নির্মাণ করতে ১২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। গত দশকে আর্থিক মূলধন ও শিল্প মূলধন উভয় ক্ষেত্রে ধস নেমেছিলো। আমি নিশ্চিত, আপনিও ব্যক্তিগতভাবে একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন; যেমনটা প্রত্যেক মার্কিন নাগরিককে যেতে হয়। এই পতন মানুষে মানুষে সম্পর্কে বড়ো ধরনের অস্থিতিশীলতা, শব্দের সঙ্গে শব্দের, চিত্রের সঙ্গে চিত্রের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। এটা আমাদের জীবনকে দখলে নিয়েছিলো। গত এক দশকে আমি কোনো চলচ্চিত্র শেষ করতে পারিনি (অথবা শুরু করতে পারি এমন অনেকগুলো চলচ্চিত্র নিয়ে কেবল কাজ করেছি)!
অপর্ণা : ডিজিটাল মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
সাহানি : আমি আকবর পদমসের সঙ্গে ডিজিটাল চলচ্চিত্র অ্যাজ দ্য ক্রো ফ্লাইস (২০০৪) নির্মাণ করেছি। এসব চলচ্চিত্র পোস্ট-প্রোডাকশনে অনেক সময় নেয়; তবে ডিজিটাল চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আমি আরো মনোযোগী হবো। এই মাধ্যমের নান্দনিক সম্ভাবনাগুলো কী, তা আমি আবিষ্কার করতে চাই। এইসব চলচ্চিত্রের নান্দনিক সম্ভাবনা কী হতে পারে তার কিছু ইঙ্গিত ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে, তবে এটা কেবল যাত্রার শুরু। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা এই ধরনের কোনো বিষয় যা আগে ঘটেছিলো কিংবা সবসময়ই ঘটে—সেগুলোকে ডিজিটাল চলচ্চিত্রে নিয়ে আসা। রঙ, টেক্সচার, ফর্মের একঘেয়েমি হ্রাসের জন্য আপনাকে কঠোরভাবে চেষ্টা করতে হবে। পরিতাপের বিষয় হলো, বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের বাস্তবতায় ডিজিটাল ইমেজের দুর্দান্ত যে সম্ভাবনা ছিলো, দিনকে দিন তা হ্রাস পাচ্ছে; একইসঙ্গে আগেরকার চলচ্চিত্রেরও অনেক কিছু লোপ পেয়েছে। এই ধরনের চর্চা চলতে থাকলে চলচ্চিত্রে দুর্বৃত্তদের আধিপত্য কায়েম হবে। তবে আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি যে দিন এই বিস্ময়কর প্রযুক্তি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।
অপর্ণা : ভারতীয় চলচ্চিত্রের শতবর্ষ উদ্যাপনে কোন ধরনের চলচ্চিত্রগুলো আবারও দেখা কিংবা পুনরুদ্ধার করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
সাহানি : হেনরি ল্যাংলোইস১৯-এর মতো, আমিও মনে করি সেলুলয়েডে শ্যুট করা প্রতিটি ফ্রেমই সংরক্ষণ করা উচিত। এখন মিডিয়াতে ইমেজের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ইমেজও সংরক্ষণ করা দরকার। তবে সেটা কীভাবে, আমি ঠিক জানি না। যেকোনো কিছু আলোকচিত্রে ধারণ করা কিংবা রেকর্ড করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ঘটনাই অনন্য। সিনেমাটোগ্রাফি ও ইমেজিংয়ের ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ও সুফি শিল্প সব চর্চায় মৌলিক নীতি হয়ে ওঠে। প্রবাহমান বিশ্বের উদ্যাপন ও রূপান্তরের প্রতিটা জীবন্ত মুহূর্ত তার স্বতন্ত্র পূর্ণতা ও বিনাশকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
অপর্ণা : মণি কাউল তার এক সাক্ষাৎকারে খুব দরদ দিয়ে একটা বিষয় বলেছিলেন, কীভাবে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে আপনারা দুজন অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছিলেন। আপনি কী মণি কাউলের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বের ব্যাপারে কিছু বলবেন?
সাহানি : এফ টি আই আই-তে শেষ বছরে আমাদের থাকার সেভাবে কোনো জায়গা ছিলো না। আমরা একসঙ্গে অনেক ঘোরাঘুরি করেছি, অন্যদের সঙ্গে থাকার জায়গা ভাগাভাগি করেছি। বলা চলে আমরা এক অর্থে ‘দেরিতে ওঠা সমিতি’গঠন করেছিলাম। কারণ আমরা ঘুমানোর জন্য সেভাবে কোনো জায়গাই খুঁজে পেতাম না। ফলে রাস্তার কুকুররাই একপর্যায়ে আমাদের বন্ধু হয়ে গেলো! এটা খুবই মজার ঘটনা ছিলো! আমার এখনো মনে আছে মণির সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাতের ঘটনাটা, তখন সে খুবই অসুস্থ। আমরা নানা ধরনের চিহ্ন ও সংকেত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতাম। পরস্পর বিরোধী হলেও সেখানে আইজেনস্টাইন কিংবা সঙ্গীতের নানা বিষয় আমাদের মনোযোগের জায়গায় ছিলো। মণির ঝোঁক ছিলো মেটাফিজিক্সের দিকে, আর আমার কোসাম্বির প্রতি।
সাক্ষাৎকারের লিঙ্ক : https://www.proquest.com/docview/2036320847?sourcetype=Scholarly%20Journals; retrived on: 03.12.2024
সোহাগ আব্দুল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে কিছুই করছেন না।
abdshohag.bd@gmail.com
https://www.facebook.com/abd.shohag.3
টীকা
১. ডি ডি কোসাম্বি (১৯০৭-১৯৬৬) বিখ্যাত মার্কসবাদী নৃতাত্ত্বিক ও গণিতবিদ। তিনি ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি’ (১৯৫৬) ও ‘মিথ অ্যান্ড রিয়ালিটি : স্টাডিজ ইন দ্য ফরমেশন অব ইন্ডিয়ান কালচার’ (১৯৬২) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লেখক। কুমার সাহানির অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন।
২. পন্ডিত জল কে বালাপোরিয়া, বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও ধ্রুপদী সঙ্গীত খেয়ালের গোয়ালিয়র ঘরানার শিক্ষক ছিলেন।
৩. ওস্তাদ রহমত খান, খেয়ালের গোয়ালিয়র ঘরানার অন্যতম প্রবক্তা।
৪. ডি গল, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ছিলেন ১৯৫৯-১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন।
৫. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৯৩), মার্কসবাদী দার্শনিক। ‘লোকায়ত’ (১৯৫৯), ‘ইন্ডিয়ান এথিজম’ (১৯৬৯) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লেখক।
৬. গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র (১৯২৬-২০০৪), কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী ও ওড়িশি ঘরানার শিক্ষক।
৭. ভিভান সুন্দরম, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর ও ভিডিও ইনস্টলেশন শিল্পী।
৮. গীতা কাপুর, তাত্ত্বিক ও ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসবিদ। ‘হোয়েন ওয়াজ মডার্নিজম : এসেজেস অন কনটেম্পোরারি কালচারাল প্রাকটিস ইন ইন্ডিয়া’ (২০০০) বইয়ের লেখক।
৯. অমৃতা শের-গিল (১৯১৩-১৯৪১), ভারতের প্রভাবশালী আধুনিক শিল্পীদের একজন। তার চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে, ‘হলদি গ্রাইন্ডার’ (১৯৩০), ‘ইয়ং ম্যান উইদ আপেল’ (১৯৩২), ‘গ্রুপ অব থ্রি গার্লস’ (১৯৩৫), ‘ব্রহ্মচারিজ’ (১৯৩৭), ‘উইমেন অন চারপয়ে’ (১৯৪০) ও ‘এলিফেন্টস’ (১৯৪০)।
১০. ফিলিপিনা ‘পিনা’ বাউশ (১৯৪০-২০০৯), পারফর্মার, আধুনিক নৃত্যের উদ্ভাবক ও শিক্ষক।
১১. অনীশ কাপুর, বিখ্যাত ভাস্কর ও ইনস্টলেশন শিল্পী।
১২. আকবর পদমসে, শিল্পী ও ভাস্কর।
১৩. সোমনাথ হোরে (১৯২১-২০০৬), স্বনামধন্য মুদ্রণকার ও ভাস্কর। তার গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ওউন্ডস’সিরিজ (১৯৭১) ও ‘মাদার উইদ চাইল্ড’, ‘ব্রোঞ্জ স্কাল্পচার’ (১৯৭৪)।
১৪. কে কে মহাজন (১৯৪৪-২০০৭) বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার। কুমার সাহানির বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেরই সিনেমাটোগ্রাফি তিনি করেছেন।
১৫. চন্দ্রলেখা (১৯২৮-২০০৬), কোরিওগ্রাফার। মায়া দর্পণ-এ নাচের ক্রম রচনা করেছিলেন।
১৬. ভরতনাট্যম, শাস্ত্রীয় নৃত্যের একটি ধরন, যা তামিলনাড়ুতে (দক্ষিণ ভারত) উদ্ভুত হয়েছিলো।
১৭. ময়ূরভঞ্জ ছৌ, উড়িষায় চর্চা করা লোকজ, মার্শাল নৃত্যের একটি উপশ্রেণি ছৌ। পশ্চিমবঙ্গে ছো হিসেবে পরিবেশিত।
১৮. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, নন্দিত বাঁশিবাদক ও সুরকার।
১৯. হেনরি ল্যাংলোইস (১৯১৪-১৯৭৭), ফরাসি চলচ্চিত্র অ্যাক্টিভিস্ট, সিনেফিলিয়া ও চলচ্চিত্র সংরক্ষণে কাজ করেছেন।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন