Magic Lanthon

               

হালিমা খুশি

প্রকাশিত ২৬ মার্চ ২০২৪ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অ্যাড্রেস আননোন : ‘কিম’দের যে কথা আমাদের জানা নেই

হালিমা খুশি


‘আগুনে ঘুমাই, আগুনে খাই এ এ ...’

বাবা হত্যার প্রতিশোধ নিতে ষোড়শ লুই’কে হত্যার চেষ্টা করেন দেমিয়ের। পঞ্চদশ শতকের এই ঘটনার দায়ে তার কপালে জোটে জনসম্মুখে বীভৎস মৃত্যু। আর তাতেই টিকে যায় লুইয়ের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। এতে অবশ্য লুইয়ের কোনো পাপ কিংবা অপরাধ হয় না, কারণ তখন তিনি ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবেই সম্মানিত! অন্যদিকে রোমান ক্যাথলিকদের শোষণে আঙুল উঁচিয়ে প্রতিবাদ করায় ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ এনে প্রতিবাদীদের (ব্লাসফেমি প্রটেস্ট্যান্ট) অভিনব কায়দায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে মধ্যযুগে ধর্মদ্রোহীকে শাস্তি দেওয়ার ভার শাসককে নিতে হয়নি, কায়দা করে ধর্মদ্রোহীদের পাকড়াওকারীদের সামনে মুলা ঝুলিয়ে ঘোষণা করা হয়-যে যতো ‘ধর্মদ্রোহী’দের হত্যা করতে পারবে, তার উপহারে যুক্ত হবে ততজন নারী। মধ্যযুগের সেই কায়দায় এই সেদিন, মানে ২০০১ খ্রিস্টাব্দেও হাঁটলো যুক্তরাষ্ট্র; ওসামা বিন লাদেনের জন্য তারা ঘোষণা করলো ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার। সেই ফাঁদে পা দিলো পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। ঘোষিত ওই পুরস্কারের লোভেই নাকি ২০১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেন লাদেনের অবস্থানের তথ্য। আবার উল্টোভাবে ২০০৪-এ হুমায়ূন আজাদ, ২০১৪-তে ব্লগার রাজীব এবং ২০১৫ জুড়ে অভিজিৎ-ওয়াশিকুর-অনন্তকে একই কায়দায় হয়তো লোভে কিংবা ভয়ে কুপিয়ে হত্যা করে কেউ কেউ।

অথচ এ মানুষগুলো ভুলে যায়, অন্যায় অন্যায়ের জন্ম দেয়; আর অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি জন্ম দেয় প্রতিবাদের। তাই নিজের অস্তিত্বকে শাসকের আসনে দেখার লোভে কিংবা ভয়ে নানা পন্থায় হাঁটতে হয় শাসকগোষ্ঠীকে। গুম, ক্রসফায়ার বাড়াতে হয় বহুগুণে। ঠিক একই কারণেই হয়তো ২০১৪-তে উত্তর কোরিয়ার ৫০ নাগরিককে লঘু পাপে গুরুদণ্ড পেতে হয়। জাতীয়তাবোধের ধুয়া তুলে, দক্ষিণ কোরিয়ার সোপ অপেরা দেখার দায়ে, উত্তর কোরিয়া জনসম্মুখে তাদের ফাঁসি কার্যকর করে; যা থেকে বাদ পড়ে না ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির ১০ নেতাও।

মধ্যযুগে ষোড়শ লুই কিংবা আধুনিক যুগের মহামোড়ল যুক্তরাষ্ট্র, আজাদ-ব্লগারদের হত্যাকারী অথবা উত্তর কোরিয় রাষ্ট্র, প্রত্যেকেই হয়তো দেমিয়েরদের মধ্যে দেখতে পায় নিজেদের মুখোশের আড়ালের চেহারা, ধ্বংসের হাতছানি; সে কারণে শত বছরের ব্যবধান হলেও অবিকৃত থাকে তাদের মূলনীতি। অবলার মতো আমাদেরও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হয় দেমিয়ের কিংবা বিজয় দাশদের বীভৎস মৃত্যু। যেমন দেখেছে উত্তর কোরিয়ার গাদা গাদা ‘বোবা-অন্ধ-বিকলাঙ্গ’ মানুষের দল।

অথচ ৩৫ বছরের (১৯১০­-১৯৪৫) জাপানি উপনিবেশ থেকে নিজেদের আলাদা মানচিত্র অর্জনে কোরিয়ার ওই মানুষগুলোর ত্যাগ ছিলো। এই ত্যাগে ১৯৪৫-এ স্বাধীনতা অর্জন হয় ঠিকই, কিন্তু কোরিয়ানদের মুক্তি মেলে না। দীর্ঘ ঔপনিবেশিকতা ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিয়েছে তাদের মেরুদণ্ডের হাড়। সে কারণে স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরাধীনতার জালে আটকা পড়ে নিজেদের অজান্তেই। তবে এবার আর একটা নয়, একই সঙ্গে দুই উপনিবেশে বিভক্ত হয় কোরিয়া।

জাপানের বিরুদ্ধে লড়াই করা কিম ইল সুং ছিলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী; সোভিয়েত রাশিয়া সে কারণে কোরিয়ার উত্তর ভাগ থেকে জাতীয়তাবাদীদের হটিয়ে সমর্থন দেয় তাকে। অন্যদিকে জাপানি উপনিবেশকালে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে থাকা জাতীয়তাবাদী নেতা স্নিনমান রি’কে সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একসময় যে নেতারা একই মঞ্চে, একই লক্ষ্যে যুদ্ধ করেছে; যুদ্ধ শেষে তারাই আবার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে যুদ্ধ করেছে তিন বছর (১৯৫০-১৯৫৩)।

ঠিক যেমনটি করেছে গান্ধী, জিন্নাহ, নেহেরু। স্বাধীন ভারতবর্ষের জন্য তারা সবাই লড়াই করলেও, স্বাধীন হয়ে আর এক হতে পারেনি, যুদ্ধ করেছে নিজেদের ভিতরে এবং এখনো করছে। একই চিত্র কোরিয়ারও। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ‘কোরিয়া হেরাল্ড’-এর দেওয়া তথ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সদস্য ছয় লক্ষ ৩০ হাজার, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ায় ১২ লক্ষ। অর্থাৎ প্রত্যেকেই নিজেদের সামরিক খাতকে বলবান করায় মগ্ন। আর এই মগ্নতা নিয়েই খেলছে যুক্তরাষ্ট্র।

যেনো ঔপনিবেশিক-স্বাধীনতা

স্বাধীনতার পর দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর দুই মতাদর্শে কোরিয়ার দুই প্রান্তকে এগিয়ে নেওয়া; অন্য অর্থে, কে কাকে টপকিয়ে এগোতে পারে তার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলতে থাকে। একদিকে পুঁজিবাদ, অন্যদিকে সমাজতন্ত্র। কাঙ্ক্ষিত এই যুদ্ধই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লগিরি ফলানোর জন্য জরুরি ছিলো। কারণ ‘কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে যেমন মুনাফা লাভ সহজ হয়, তেমনি মুনাফার খোঁজে নামলে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো সহজ হয়। এর চেয়ে ভালো জুটি আর কী হতে পারে?’

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে স্টক মার্কেটের ধস ও মহামন্দায় ধসে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে (১৯৩৯-১৯৪৫) যুক্তরাষ্ট্রের মোট উৎপাদন বাড়ে ৬৫ শতাংশ এবং শিল্প উৎপাদন কয়েক ধাপে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ শতাংশে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পুরনো ভয়টা তাই তাদের পেয়ে বসে, যদি তাদের অর্থনীতি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়; সেজন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই পেন্টাগন পুঁজিবাদের নতুন ছক আঁকতে শুরু করে। যেখানে প্রধান হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্র ও সৈন্যের চাহিদা। স্কট নেয়ারিং-এর কথায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে-‘যুদ্ধ ও যুদ্ধের হুমকিকে তার [যুক্তরাষ্ট্র] পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অস্ত্র হিসেবে গণ্য [করা হয়]। এই যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের করণীয়ের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি, সুযোগ পেলেই এরা যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়।’ 

এরই অংশ হিসেবে যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য উসকে দেওয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়াকে; একই সঙ্গে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বন্ধুও বনে যায় তার। বিপরীতে ভাগ হয়ে শত বছরের বন্ধুত্ব রূপ নেয় শত্রুতায়। আবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি দৃশ্যত তাদের সম্পর্কের ‘গাঢ়ত্ব’ বাড়ায়। কিন্তু ফাঁকটা থেকেই যায়। যুদ্ধবিরতি মানেই যেকোনো সময়ে যেকোনো কারণে বেধে যেতে পারে এ যুদ্ধ। তার জন্য নিজেদের সামরিকভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। আবার মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দক্ষিণ কোরিয়াকে স্বাবলম্বী করার কৃতিত্বও বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের। একদিকে দক্ষিণ কোরিয়াকে তার বড়ো বাজারে পরিণত করা, অন্যদিকে কানে সবসময় কুমন্ত্রণা দেওয়া। কেননা যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করেই জানে, বাজার তৈরি করতে না পারলে আধিপত্যের খেলায় তারা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। কারণ সাম্রাজ্যবাদী নীতির নবীন কৌশলই হলো অন্য রাষ্ট্রের বাজার দখল করা।

অস্থিরতা না থাকলে ভালো কাটতি হবে না। আর এই অস্থিরতা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এই স্থিতির জন্য প্রয়োজন পড়ে নজরদারির; যে কারণে ১৯৬০-এর মাঝ দশকেই সারা দুনিয়াতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে; যাতে বিশ্বের যেকোনো খানে তারা ঝোপ বুঝে কোপ মারতে পারে। যে কাজটি ভালোমতো করতে এক দক্ষিণ কোরিয়াতেই তারা গড়ে তোলে কমপক্ষে ৪৫টি সেনা ক্যাম্প। যদিও তার সবকটি এখন দৃশ্যত নেই। তার পরও ঈগলের প্রতীকে এই মার্কিন ক্ষমতা বিস্তার হয়তো অস্বস্তিতে ফেলে দেশটির চলচ্চিত্রনির্মাতা কিম কি দুক’কে। তিনি নিজের পরিচয় খুঁজে ফেরেন তারই নির্মিত অ্যাড্রেস আননোন-এ। উপনিবেশ থেকে যে কোরিয়ার মুক্তি মেলেনি, তার চিহ্ন বহন করছে চলচ্চিত্রটির প্রত্যেকটি চরিত্র। যুদ্ধ সেখানে চলছে প্রতিনিয়ত, সহিংস কিংবা অহিংস রূপে। অথচ ভালো থাকবে বলে যে কোরিয়া নিজেদের মধ্যে দেওয়াল টানলো, তাদের সেই ভালো থাকা আর হলো কই! ভূত তাড়ানোর ওঝা নিজেই ভূত হয়ে হাজির হলো। তাই আয়, জি ডি পি বাড়লেও বাড়ে না কেবল স্বাধীন দেশের নাগরিকের কাজের সুযোগ। জাপানি উপনিবেশের মতো নারীদের বাধ্য করানো হয় যৌনসম্পর্কে, হোক না তা ভিন্ন আঙ্গিকে। কিম হয়তো প্রতীকে-প্রতীকে এই দৃশ্যমান অদৃশ্য যুদ্ধকে তুলে আনার চেষ্টা করেন।

যে পথ কখনো এক হওয়ার নয়

ঠিক শুরু থেকে শুরু করেন কিম। চলচ্চিত্রের শুরুতেই ইউ এস সিল মারা পুরনো কাঠ দিয়ে খেলনা বন্দুক বানাতে থাকে এক কোরিয়ান শিশু। এরপর নিজের বোনকে সমান্তরাল রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে, নিজে অন্য পাশে দাঁড়িয়ে সেই বন্দুক দিয়ে লক্ষ্য বস্তুতে আঘাতের অনুশীলন করে। গুলি বোনের মাথার উপরে থাকা টিনের পাত্রে না লেগে, লাগে তার ডান চোখে। একই বাড়িতে নষ্ট চোখ চুল দিয়ে ঢেকে রেখে বড়ো হতে থাকে ইউনাক (Eunok)। আর অন্তরে বাসা বাঁধে তার ক্ষোভ।

একটু খেয়াল করলে কিম-এর ব্যবহার করা প্রতীকগুলোর অর্থ পরিষ্কার হয়। যে কোরিয়ার মানুষ ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে জাপানি উপনিবেশে যাওয়ার পর থেকে নিজেরা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে স্বাধীনতার জন্য, তারাই স্বাধীনতা লাভের পর অন্যদের প্ররোচনায় ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ করেছে টানা তিন বছর। কিম সেটাই হয়তো দেখান প্রতীক দিয়ে। ভাইয়ের লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি গিয়ে বোনের চোখে লাগতেই পারে; কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন সেই বন্দুক তৈরি হয় ইউ এস সিল মারা পুরনো কাঠ দিয়ে।

ঠিক যেমনটা কোরিয়ার স্বাধীনতা লাভের শুরুতেই ঘটেছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সবে জাপানের উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়েছে কোরিয়া। সেই মুক্তি তাদের ঠেলে দিয়েছে নতুন এক দ্বন্দ্বে। যে দ্বন্দ্বে ঘি ঢেলেছে এক দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র। পরাজিত জাপান কিন্তু এই দুই পরাশক্তির হাতেই হস্তান্তর করেছিলো স্বাধীন কোরিয়াকে। এই দুই মতাদর্শ নিজেদের স্বার্থে সহোদর ভাই-বোনকে সমান্তরাল পথে এমনভাবে দাঁড় করিয়েছে, যে পথ কখনো এক হওয়ার নয়। তারপর ভাইয়ের হাতে বন্দুক দিয়ে গুলি চালিয়েছে বোনের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ চোখে। ফলে একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একপক্ষ বেড়ে উঠেছে, অন্যপক্ষ নতুন রঙের উপনিবেশে দেশের মানুষকে রাঙিয়েছে।

শেষ পক্ষের কথা বলেছেন কিম। তাই ইউ এস সেনার পোশাকের উপর ভেসে ওঠে চলচ্চিত্র অ্যাড্রেস আননোন-এর টাইটেল কার্ড। পরের শটে দক্ষিণ কোরিয়ার বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজ শস্য বাতাসে দোল খায় ঠিকই, কিন্তু আবহে বেজে ওঠে মার্কিন জাতীয় সঙ্গীত। এরপর কাট টু শটে মার্কিন সেনারা তাদের দেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে থাকেন দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমিতে।

‘কমফোর্ট উইমেন’ থেকে কেবল ‘ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস’

ইউ এস এয়ার ফোর্সের পরিত্যক্ত বাসের ভিতরে ছোটো সংসার চাঙ-গুক ও তার মায়ের। বাস, ছেলে চাঙ-গুক আর একটি ‘পোলারয়েড ক্যামেরা’ (Polaroid Camera) নিয়ে ওই নারীর পৃথিবী। চাঙ-গুকের মায়ের নিজের শারীরিক অস্তিত্ব ছাড়া বাকি তিনটি বিষয়ের সঙ্গে মিশে আছে তার কথিত স্বামী, ইউ এস এয়ারফোর্সের সেই সেনার উত্তরাধিকার। এগুলো তাকে এতো বছর পরেও এমন করে বেঁধে রেখেছে যে, তিনি চাইলেই সেই আকাক্সক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। তাইতো ‘স্বামী’কে ফিরে পাবেন, এ নিয়ে প্রতিদিন স্বপ্ন বোনেন নিজের ভিতরে। একের পর এক চিঠি ফেরত আসলেও সেই চিঠি আবারও পাঠাতে থাকেন স্বপ্নকে সঙ্গী করে।

তাই ছেলের চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু সুযোগ পেলেই তার ছবি তোলেন, তা পাঠিয়েও দেন ‘স্বামী’র ঠিকানাবিহীন ঠিকানায়। স্বপ্ন দেখেন অন্তত ছেলের ছবি দেখে, তার কথা মনে করেও যদি ‘স্বামী’ ফিরে আসে। দিনের পর দিন চিঠি ফেরত আসে, একই চিঠি, ছেলের ছবি নতুন খামে ভরে আবার পুরনো ঠিকানায় পাঠাতে থাকেন। চাঙ-গুক বাস্তবতা বোঝে, তাই মায়ের এই ঘোর মেনে নিতে পারে না। তার ভিতরে থাকা রাগ-ক্ষোভ-জিঘাংসা কখনো কখনো সহিংসতায় রূপ নেয়। তাই মাকে অপমান করে, মাঝে মাঝে মারতে তাড়া করে।

যতবারই চাঙ-গুক রণমূর্তি হয়ে মায়ের ঘোর ভাঙাতে হাজির হয়, ততবারই তার মা নতুন ঘোরে পড়ে আশ্রয় নিতে চান ‘স্বামী’র দেওয়া সেই বাসের ছাদেই। এতো কিছুর পরও তিনি স্বপ্ন দেখেন বাসের ছাদ মানে ভূমি থেকে উপরে উঠলে হয়তো তিনি আশ্রয়-রক্ষা পাবেন। কারণ কোরিয়ার আকাশ জুড়ে নিরাপত্তার নামে সারাক্ষণ যে মার্কিন বিমান উড়ে বেড়ায়, হয়তো সেই বিমানে চড়েই স্বপ্নের জীবনে ঢোকার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো সেই ইউ এস সেনা। তাইতো চাঙ-গুকের মায়ের কাছে বিমান না হোক তার দেওয়া বাস, সেই বাসের উঁচু ছাদ আশ্রয়স্থল হয়!

আগেই বলেছি, ৩৫ বছরের জাপানি শোষণ থেকে মুক্তি, স্বাধীন ও সমৃদ্ধ কোরিয়া গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি গাড়ে দক্ষিণ কোরিয়ায়। কোরিয়ার সব মানুষের মতো ‘কমফোর্ট স্টেশনের’ (যৌনপল্লী) বাসিন্দারা, যাদের ‘কমফোর্ট উইমেন’ (যৌনকর্মী) নামে ডাকা হতো, তারা ভেবেছিলো এবার বুঝি এই নরক থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু যে যুক্তরাষ্ট্রকে দেবদূত ভেবে তারা নরক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলো, তা ক্ষণিকেই মিইয়ে যায়। কেননা কমফোর্ট স্টেশন কেবল হাতবদল হয় মাত্র। আর কমফোর্ট উইমেনের জায়গায় তারা কখনো হয় ‘ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস’, কখনো ‘ইউ এন ম্যাডাম’, আবার কখনো ‘ওয়েস্টার্ন হোর’।

আবার ইউ এস প্রহরায় কমফোর্ট স্টেশনের জীবন থেকে কদাচিৎ দু-একজনের মুক্তি মিললেও মেলে না স্বাভাবিক জীবন। কারণ তারা তখন পরিবার-সমাজ-শরীরের বোঝা। যারা ফিরেছে তারা কেউ হয়তো ভুলতে পারেনি তার দুঃসহ অতীত; কেউবা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েছে, ভুগেছে যৌনরোগে, হারিয়েছে সন্তান ধারণের ক্ষমতা। অথচ দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাধীনতা অর্জনে রয়েছে এসব শরীরের বিন্দু বিন্দু কষ্ট-অপমান। চাঙ-গুকের মা তাদেরই একজন, যিনি তার শরীরে ধারণ করেছিলেন ঔপনিবেশিক অত্যাচার। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী কোরিয় সমাজ আর তাকে ধারণ করেনি। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনই এক যৌনকর্মী তাই জোর দিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের মৈত্রীতে তাদের বড় অবদান রয়েছে।’

ক্ষমতা হাতে নিয়ে ইউ এস সমর্থিত সামরিক সরকার ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে যৌনবৃত্তিকে অপরাধের আওতায় এনে তাদের কোরিয়-নীতিতে বলেছিলো, ‘যৌনকর্মীদের ভাড়া করা আমাদের সামরিক মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’ অবশ্য সেই সময়, মানে ৫০ থেকে ৮০ দশকের মধ্যে কোরিয়ায় যৌনকর্মীর সংখ্যা ছিলো প্রায় ১০ লক্ষ। ক্যাম্প শহরের আশেপাশে যারা থাকতো তাদের বেশিরভাগই যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতো। স্বাধীনতার আগেও যেমন কোরিয়ান নারীদের যৌন কাজে বাধ্য হতে হয়েছে, স্বাধীনতার পরেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বরং সুস্থতার ট্যাগ লাগাতে হয়েছে, শিক্ষা নিতে হয়েছে যৌন কাজের। যে কারণে এই নীতি কেবল লোক দেখানো ছাড়া মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনেনি। কোরিয়ার সামরিক জান্তা পার্ক চাঙ হি ‘বেজ কমিউনিটি ক্লিনআপ ক্যাম্পেইন’-এ ‘প্রস্টিটিউশন প্রিভেনশন ল’ ও ‘ট্যুরিজম প্রমোশন ল’ নামে দুটি আইন করলেও, আওতামুক্ত রাখে সেনা ক্যাম্প এবং সেটাকে সাজানো হয় স্পেশাল ট্যুরিজম ডিস্ট্রিক্ট হিসেবে। তাই কমফোর্ট স্টেশন না রাখলেও রাখতে হয় ক্যাম্প শহর। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার জি এন পি’র ২৫ শতাংশই আসে ক্যাম্প টাউন ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত দেহব্যবসা থেকে।

যে কারণে ১৯৭০-এর দশকে কোরিয়ান একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে বলতে শোনা যায়,

যে যৌনকর্মীরা ইউ এস সেনাদের কাছে তার শরীরকে বিকিয়ে দিয়েছে, তারাই সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তাদের উপার্জিত ডলারের বড়ো অবদান রয়েছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে। তাদের পিছে দাঁড়িয়ে তাদের ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস অথবা ইউএন ম্যাডাম বলো না।১০

অথচ ১২ বছরের এক শিক্ষার্থীকে ইউ এস মেরিন সেনা ধর্ষণ করলে তা নিয়ে যে পরিমাণ আন্দোলন হয়; তার বিপরীতে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে একজন যৌনকর্মীর যৌনাঙ্গে বোতল আর পায়ুপথে ছাতাসহ মৃত অবস্থায় পাওয়া গেলেও সেটা নিয়ে কোনো কথা হয় না।১১

তার মানে তারা যতই স্বাধীনতার জন্য লড়ুক না কেনো, অর্থনীতিতে অবদান রাখুক না কেনো, মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। তাই ‘প্রেমিক’ ইউ এস সেনা নিজ দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেসরা নিজের দেশে নিক্ষিপ্ত হয় ভাগাড়ে। ফলে কমফোর্ট স্টেশনে থাকা বা না থাকা আলাদা কোনো অর্থ বহন করে না। কারণ বাহিরটাও তখন তাদের জন্য হয়ে ওঠে অন্য এক কমফোর্ট স্টেশন। যেমনটি হয়েছে চাঙ-গুকের মায়ের ক্ষেত্রেও। খাওয়ার জন্য জমিতে পড়ে থাকা ধান কুড়াতে হয়, অন্যের বাগানের সবজি চুরি করতে হয়। আর ঘরে এসে মার খেতে হয় ছেলের হাতে। চাঙ-গুকের মতো ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে ১০ হাজার শিশুর জন্ম হয় দক্ষিণ কোরিয়ায়, পিতৃপরিচয়হীনতার সমস্যায় পড়ে তাদের শুনতে হয় ‘ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস বাস্টার্ড’।

২০১০-এর জুনে ইউ এস সেনাবাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ায় রেখে যাওয়া তাদের স্ত্রী-সন্তানদের খোঁজার উদ্যোগ নেয়। সে বছরই এক লক্ষেরও বেশি কোরিয়ান নারীদের ইউ এস সেনাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় এবং পাঠানো হয় ইউ এস এ-তে।১২ যে কারণে হয়তো চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে দেখা যায় চাঙ-গুকের মাকে সম্বোধন করে ইউ এস এ থেকে আসা চিঠি পড়ছে সেনাসদস্য। কিন্তু ততক্ষণে স্বপ্নের সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে চাঙ-গুকের মা নিজেও।

ইউনাক কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরেছে

এক হাতে কুকুরছানা অন্য হাতে ব্যাগ নিয়ে স্কুল ইউনিফর্ম পরা ইউনাক। বারান্দায় বসে টেডি’র (এক ধরনের পুতুল) চোখ লাগাচ্ছিলো মা। সেটা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে মায়ের হাত থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয় ইউনাক। চুল দিয়ে ঢাকা চোখ দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, চলচ্চিত্র শুরুর এক মিনিট চার সেকেন্ডে আঘাতপ্রাপ্ত চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শিশুটিই ইউনাক। দেখতে দেখতে জীবনের ১৮ বছর সে কাটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মনের ক্ষতটা রয়ে গেছে আগের মতোই। যেমনটা ‘স্বাধীন’ হওয়ার আগে ৩৫ বছর হয়েছে জাপানি উপনিবেশে, ‘স্বাধীনতা’র ২৫ বছর পরেও তাই; কোরিয়ার মানুষের বছর গুনে কেটেছে মাত্র।

ইউনাক তার জগতটা দুচোখ দিয়ে উপলব্ধি করতে চেয়েছে। তাই যখন শুনতে পেয়েছে সেনা হাসপাতাল তার চোখে হারিয়ে যাওয়া আলো ফেরাতে পারবে, তখন জিহুম-এর সঙ্গে প্রেম থাকা সত্ত্বেও বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছে ইউ এস সেনার ‘প্রেয়সী’ হওয়ার শর্ত। এই নষ্ট চোখের জন্য ইউনাক দৃশ্যত ভাইকে দায়ী করলেও, ইউ এস সিল মারা কাঠের তৈরি বন্দুক কিন্তু ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ ইউনাকদের অগোচরে চোখ নষ্ট করায় যারা ইন্ধন জোগায়, তারাই আবার আসে আলো ফেরানোর ত্রাতা সেজে। আর তাদের ফাঁদে পা দিয়েই এক চোখের বিনিময়ে তাকে ছাড়তে হয় সবকিছুই। অন্যদিকে ইউ এস সেনা পায় ‘ধর্ষণ’-এর সামাজিক স্বীকৃতি। তাই চাঙ-গুকের মা’র মতো ইউনাকের জন্য আলাদা করে কমফোর্ট স্টেশনের প্রয়োজন পড়ে না।

চাঙ-গুকের মা সবকিছু মেনে নিয়ে ওই আবর্ত থেকে বের হতে না পারলেও, ইউনাক কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরেছে। তার স্তনে লিখতে দেয়নি সেই ইউ এস সেনার নাম। কারণ ততদিনে কৃতজ্ঞতা রূপ নিয়েছে ঘৃণায়। বুঝতে বাকি থাকেনি ইউ এস সেনারা কেবল শুষে নিতেই জানে। তাই ইউনাক প্রতিবাদ করেছে, যে চোখের জন্য তাকে নতি স্বীকার করতে হয়েছিলো, তা সে নিজের হাতে নষ্ট করেছে। শেষ পর্যন্ত ফিরে গেছে আগের প্রেমিকের কাছে। কিম হয়তো এই ইউনাকদেরই খুঁজে ফেরেন প্রতিনিয়ত, যারা সংগ্রাম করবে; নিজেদের নিয়ে বাঁচতে শিখবে।

চাঙ-গুকের অনন্য প্রতিবাদ

লোকালয় থেকে খানিকটা দূরে, লাল আবরণের পরিত্যক্ত ইউ এস এয়ারফোর্সের বাস থেকে শুরু হয় চাঙ-গুকের সকাল। দক্ষিণ কোরিয়ার অন্য সব শিশুর মতো বিদ্যালয়ের জন্য নয়, তাকে তৈরি হতে হয় সেই কাজের জন্য সমাজ যেটাকে নিচু চোখে দেখে। এই লোকালয় বিচ্ছিন্নতা, বাস, কসাইয়ের সহকারী সব প্রতীকগুলো চাঙ-গুককে আমাদের সামনে হাজির করে সমাজের ভিতরে সমাজ-ভিন্ন এক মানুষ হিসেবে। অথচ এই ভিন্নতা তো চাপিয়ে দেওয়া। সে কারণে হয়তো তা মেনে নিতে পারে না চাঙ-গুক। তাই পদে পদে মানুষ-চাঙ-গুক তার অবস্থান জানান দেয়; সে প্রাণীর ওপর নির্মমতা মেনে নেয় না। প্রতিবাদ করে বন্ধুর ওপর সহিংসতার; কারণে-অকারণে হাত তোলে মায়ের ওপর।

কারণ ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস বাস্টার্ড পরিচয়ে বড়ো হতে থাকা চাঙ-গুক দেখেছে তাকে নিয়ে তার চারপাশের নির্মমতা; দেখেছে তার মাকে নিয়ে সমাজের নিম্নগামী চোখ। তাই হয়তো সবকিছুর মধ্যে থেকেও চাঙ-গুকের জগতটা শূন্যতায় ভরে থাকে। পুরো চলচ্চিত্রে সামান্য হাসির ঝিলিক দেখা যায় না তার চোখে। বিপরীতে আনমনে কখনো বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়। কিন্তু এর কোনো কিছু নিয়েই কিছু করার ক্ষমতা নেই চাঙ-গুকের। যেমনটা নেই দুই কোরিয়ার সাধারণ মানুষের। তারা এক হতে চায়, আবার সরকারি ইন্ধনে একে অন্যের বিরুদ্ধে কথাও বলে। চাঙ-গুক আর সাধারণ কোরিয়ান সত্তা একই ইঙ্গিতে, একই সুরে কথা বলে; সহিংস হয়ে ওঠে কিন্তু কেউ খোঁজ পায় না সেই নেপথ্যের।

অথচ এই চাঙ-গুক কিংবা সাধারণ কোরিয়ান-প্রত্যেকেরই স্ব স্ব অবস্থানে অবদান রয়েছে কোরিয়ার স্বাধীনতায়, অর্থনীতিতে। সেগুলোকে ছাপিয়ে যখন কোরিয়া অন্যের কথায় চলতে থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে কোরিয়ার ‘স্বাধীনতা’ কি কোরিয়ানদের ‘স্বাধীনতা’? তাই চাঙ-গুকেরা যতো বড়ো হয়, তার ভিতরের ভাগাড়টিও বড়ো হতে থাকে। নিজেও তৈরি করে দৃশ্য-অদৃশ্যমান নতুন এক ভাগাড়। তাই তার মনিব, মানে মায়ের ছেলেবন্ধুর কাছ থেকে সে পিস্তল কেড়ে নেয়; তার বাম পায়ে গুলি করে কুকুরের খাঁচায় ভরে নিয়ে যায়। অতঃপর তারই বানানো কুকুরের ফাঁসিমঞ্চে ঝুলিয়ে মারে। এই মঞ্চেই দীর্ঘদিন কুকুরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মারা হতো। আর সেই নির্মমতা না চাইলেও বাধ্য হয়ে দেখতে হতো চাঙ-গুককে। অসহায় এই প্রাণীর ওপর বিনা প্রয়োজনে এই নির্মমতা মেনে নিতে পারেনি সে। তাই কুকুরের মতো একই কষ্ট দিয়ে মনিবকে হত্যা করে চাঙ-গুক।

তারপর চলে আসে ইউ এস-এর দেওয়া বাস-বাড়িতে, সেখানে গরম পানিতে মাকে ধুইয়ে কেটে ফেলে তার স্তন; যেখানে তার বাবা দলিলের মতো লিখে গেছে তার সম্পত্তির অধিকার। চাঙ-গুক হয়তো মাকে শারীরিক সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছে, যা পারেনি মায়ের সেই ছেলেবন্ধু। এদিকে মায়ের কলঙ্ক মুছতে চাইলেও খুঁজে পায়নি নিজের মুক্তির পথ। তাই ক্ষিপ্রগতিতে মনিবের খাঁচাযুক্ত মোটরবাইক চালিয়ে নিজেকে সপে দিয়েছে প্রকৃতির কাছে; কিন্তু মাথা নোয়ায়নি। প্রাণহীন দেহের উপরের অংশ বরফে ঢুকে থাকলেও তার পা-যুগল ছিলো আকাশমুখী। আর সেই পায়ে ছিলো নাম-পরিচয়হীন বাবার ব্যবহৃত সেই মিলিটারি বুট। বাবার স্মৃতি হিসেবে চলচ্চিত্র জুড়ে সেই বুট চাঙ-গুক পরে বেড়ালেও, শেষ বেলায় তা আকাশমুখী করে আঘাত করেছে ইউ এস এয়ারফোর্সের দখলে থাকা কোরিয়ার আকাশকে।

শিকল ভাঙার গান

ইউনাকের ছেলেবন্ধু জিহুম। ইউ এস ক্যাম্প সংলগ্ন একটি ছোটো গ্রামে তারা থাকে। প্রতি সকালে কাজে যাওয়া-আসার পথে দেখা হয় ইউনাকের সঙ্গে। এমনই একদিন একাকী ফেরার পথে পোর্ট্রেট আঁকা একটি কাগজ ইউনাকের হাতে ধরিয়ে দেয় জিহুম। ইউনাক পোর্ট্রেটটি পছন্দ করলেও, যখন দেখে জিহুম মনের মাধুরী দিয়ে এঁকেছে তার সেই চোখ-ক্ষেপে যায় সে। এই চোখই তাকে সবার থেকে, সবকিছু থেকে দূরে, আলাদা করে রেখেছে। জিহুম কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ইউনাক তাই রাগে-অপমানে কষে চড় বসিয়ে দেয় তার গালে। জিহুমও তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চায়। কিন্তু এরই মধ্যে ইউনাকের সব থেকে কাছের বন্ধু, কুকুরছানাটি চুরি হয়ে যায়। ইউনাক ছবি এঁকে, হারানো বিজ্ঞপ্তি দিতে সাহায্য চায় জিহুমের কাছে। জিহুম একবাক্যেই রাজি হয়ে যায়। পরে ঝুঁকি নিয়ে সেই কুকুরছানাটি উদ্ধারও করে জিহুম। এভাবে একটু একটু করে কাছে আসে তারা দুজন।

জিহুমের বাবা চাকরি করতেন দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীতে; যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য ‘দেশের’ সঙ্গে। এখন তার অবসর। পেনশনে সংসার চলে না, তাই জিহুম স্কুলে যেতে পারে না। ইউ এস ক্যাম্প ‘ঈগলস্’-এর সামনে ‘হোমবয় শপে’ তাকে কাজে যেতে হয়। পাশে বসে দেখতে হয় হাসিমুখে বসে থাকা ইউ এস সেনা আর তার ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেসের যুগল ছবি আঁকানো। এ সবের কিছুই তাকে খুব একটা ভাবায় না। এমনকি তার প্রেয়সী যখন ইউ এস সেনার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, অন্তর্ক্ষোভ থাকলেও তখনো সে থাকে নিরুত্তাপ। কিন্তু যখন তার প্রেয়সীকে লোভের পাকে ফেলে প্রতিনিয়ত ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস বানানোর প্রক্রিয়া চালায় সেই সেনা, তখন ক্ষোভ আর ধরে রাখতে পারে না জিহুম, সহিংস হয়ে ওঠে।

যে জিহুম সব অন্যায় মাথা পেতে সহ্য করে নেয়, তার পোষা কুকুর বিক্রি কিংবা গুলি করে মুরগি মেরে ফেলা সহ্য করে-সেই জিহুম শেষ পর্যন্ত হাতে তুলে নেয় কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী তিরধনুক। তারপর আঘাত হানে ‘শান্তির দূত’ হয়ে আসা সেই দুর্বৃত্তদের ওপর, তার দ্বিতীয় লক্ষ্য হয় দুর্বৃত্তদের এই দেশীয় দোসররা। এই কাজটি কিন্তু চাঙ-গুকের মায়ের সেই কসাই ছেলেবন্ধু পারেনি। তিনি তির চালনা জানতেন, অনুশীলনও করতেন, পিস্তল কিনেছিলেন, মুখে নিন্দাও করতেন ইউ এস সেনার; কিন্তু এতো সব অস্ত্রের ব্যবহার করেছেন কেবল অসহায় কুকুরদের ওপর।

জিহুম জানে, তাদের বন্দুকের কাছে এই তিরধনুক নিতান্তই ক্ষুদ্র। তার পরও অন্যের দাক্ষিণ্যে নয়, দেশীয় অস্ত্রই হয়েছে তার প্রতিবাদের হাতিয়ার। সে কারণে ইউ এস সেনা যখন ইউনাকের বাড়ি থেকে বের হয়ে সবে সদর দরজা পার হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে জিহুমের তির এসে বিঁধে তার পুরুষাঙ্গে। কারণ এই বিশেষ অঙ্গটি তাদের বিশেষ শোষণ প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ। জিহুমের পরের তিরটি আর কোনো বিদেশি খলচরিত্রের জন্য নয়, তা বিঁধে দেশীয় এক শোষকের মেরুদণ্ড বরাবর।

এমনই আরেক দেশীয় দালালকে হত্যা করতে জিহুম ধরা দেয় পুলিশের কাছে। গলাধঃকরণ করে গোল করে পেঁচানো সেই তার, যা চাঙ-গুকের মায়ের ‘বাস-বাড়ি’র ছাদে টাঙানো ছিলো। জিহুম হয়তো কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে চেয়েছে। তাই ইউ এস এ’র দেওয়া বাসের ছাদের ঝুলে থাকা তার হয়েছে জিহুমের সে মুহূর্তের হাতিয়ার। কারণ একটাই, দেশকে দালাল মুক্ত করা, ইউনাকদের মুক্ত করা। ইউনাক ফিরেছে জিহুমের কাছে, সেই আগের ইউনাক হয়ে। ফিরতে পারেনি চাঙ-গুকের মা, ফেরাতে পারেনি তার ছেলেবন্ধু। অথচ তার সঙ্গে যা হয়েছে জিহুমের জীবনেও রয়েছে তারই পুনরাবৃত্তি।

আপস করেনি জিহুম

ব্যবসায় দক্ষ হলেও স্বনির্ভর গ্রাম কাঠামোর ভারতীয় উপমহাদেশ শাসনের যোগ্যতা তখনো তৈরি হয়নি ইংরেজদের। তাই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা দখল করেও মসনদে না বসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয় ইংরেজদের। দেশীয় লোকবল দিয়ে তৈরি করতে হয় তাদের প্রশাসন; যেখানে কেউ চাবুক মারবে, কেউ সেটার নির্দেশ দিবে, কেউবা আবার তাদের চর হবে। ক্ষমতা বিস্তারের এই কৌশল ভিন্ন চরিত্রে হলেও এটা এখনো রয়েছে বহাল তবিয়তে। ক্ষমতার আধুনিকতম বিস্তার এখন হয় তথ্য দিয়ে, সে কারণে হাতে রাখার প্রয়োজন পড়ে দেশীয় তথ্য-এজেন্টদের।

অ্যাড্রেস আননোন-এ এই দালাল, এজেন্টদের দেখা যায়। স্কুল ব্যাগ হাতে নিয়ে ছাত্ররূপী এই দালালরা বের হয় ঠিকই, তবে তাদের গন্তব্য ‘ঈগলস ক্যাম্প’। চলচ্চিত্রের পাঁচ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে নয় ডলারের বিনিময়ে তাদের কিনতে দেখা যায় ইউ এস থেকে প্রকাশিত পুরুষের লাইফ স্টাইল বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন ‘প্লেবয়’। কথোপকথনের ধরনে দৃষ্টি এড়ায় না সেনাদের সঙ্গে তাদের সখ্য। তবে এই ম্যাগাজিনও তারা কেনে জিহুমের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া টাকায়। জিহুম প্রতিবাদ করতে পারে না, কারণ হয়তো তারা ইউ এস এ’র ছত্রছায়ায় বলে। ঠিক যেমনটি পারেনি ভারতবর্ষের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তারা কেবল ইংরেজদের দোসর দেশীয় রাজা-জমিদারদের অত্যাচার সহ্য করেছে, বিরুদ্ধাচরণ করেনি। আবার যে যখন প্রতিবাদ করেছে, ক্ষতির হিসাবটা গুনতে হয়েছে অনেক বেশি।

জিহুমও সহ্য করতে করতে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি, যখন দেখেছে ইউনাককে ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস বানানোর পায়তারা করছে; তাকে ধর্ষণ করেছে। কারণ সে জানে, একসময় যুদ্ধ-বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, ধর্ষণের শিকার ও গৃহস্থালির কাজে নিযুক্ত গ্রামের দরিদ্র নারীরা কাজ করতো ওয়েস্টার্ন প্রিন্সেস হিসেবে। তাই ইউনাককে যদি তা বানাতে হয়, তবে তাকে আগে ধর্ষিতা বানাতে হবে। আর এর জন্য ‘প্লেবয়’-এর মতো ম্যাগাজিন দিয়ে একদিকে যেমন সেই মনন তৈরি করতে হয়, তেমনই অন্যদিকে আবার পিঠে হাত রেখে অভয়েও রাখতে হয়।

সে কারণে ইউনাককে ধর্ষণ করার শাস্তি দিতে কাঠের বন্দুক বানিয়ে জিহুম বড়ো দালালকে তাক করলেও সে নির্ভয়ে বলে-‘গুলি করো! করো! গুলি ছোড়ার মতো সাহস তোমার নেই! দেখি তুমি কেমন পারো!’। দালাল হয়তো বুঝতে পারেনি পরিস্থিতি ততদিনে সাহসটা তৈরি করে দিয়েছে জিহুমের। তাই গুলিটা জিহুম করে ঠিকই, কিন্তু দালালকে আঘাত না করে তা এসে বিঁধে তার ডান চোখে। এ হলো সেই কাঠ, যে কাঠের বন্দুকে নষ্ট হয় ইউনাকের ডান চোখ। একই কাঠ, কিন্তু ব্যক্তিভেদে কার্যকারিতা হয়েছে ভিন্ন। একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবো, ইউনাকের ভাইয়ের বানানো বন্দুকের কাঠে ইউ এস লেখা, আর জিহুমের কাঠের উপরে ভাসে ‘সতর্কতা’ (Caution) ‘বিপদ’ (Danger) সাংকেতিক ভাষা দুটি। এ ‘সতর্কতা-বিপদ’ কি কেবল জিহুমদের জন্য, তারা ইউ এস বিদ্বেষী বলে কিংবা নিজের সবকিছু নিয়ে নিজের মতো থাকতে চায় বলে? সেজন্যই কি ইউনাকের ভাই কিংবা দালালের কিছু না হলেও আঘাতপ্রাপ্ত হয় জিহুম? যদিও সেই আঘাত জিহুমদের দমিয়ে রাখতে পারে না।

স্বপ্ন নিয়ে বাঁচা

বাংলা দখল করে লর্ড ক্লাইভ যেদিন মীর জাফরকে মসনদে পুতুল সাজিয়ে বসালো, সেদিন দাঁড়িয়ে থাকা বাংলার সাধারণ মানুষ যদি একটি করে ঢিলও ছুড়তো, তবে ইংরেজ বাহিনী সেখানেই হয়তো ধ্বংস হয়ে যেতো। কিন্তু বাংলার মানুষ তা করেনি। তবে সেদিন না পারলেও, দাঁড়িয়ে থাকা ওই মানুষই সময়ের ব্যবধানে জন্ম দিয়েছে ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, সূর্যসেনের। যারা লড়াই করেছে, মেনে নেয়নি বেনিয়া শাসন-শোষণ।

ঠিক যেমনটি মেনে নেয়নি ইউনাক, জিহুম আর চাঙ-গুক। তারা প্রত্যেকে প্রত্যক্ষভাবে উপনিবেশকে না দেখলেও পরোক্ষভাবে সাক্ষী হয়েছে উপনিবেশের। প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গা থেকে প্রতিবাদ করেছে। কেউ চোখ নষ্ট করেছে, কেউ কারাগারে ঢুকেছে, কেউবা আত্মহননের মধ্য দিয়ে জানিয়ে গেছে তার প্রতিবাদ। এতকিছুর মধ্যেও নির্মাতা কিম কি দুক স্বপ্নকে জিইয়ে রেখেছেন, বলেছেন শিল্পের কথা। তাই নতুন করে বাঁচার স্বপ্নে ইউনাককে ফিরিয়ে এনেছেন জিহুমের কাছে।

লেখক : হালিমা খুশি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী

khushimcj@gmail.com 

তথ্যসূত্র

১.  http:/www.fbi.gov/wanted/topten/usama-bin-laden

২. ‘পাকিস্তানি গোয়েন্দাই লাদেনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে জানান’; প্রথম আলো, ১২ মে ২০১৫।

৩. www.banglatelegraph.com/2015/01/সামরিক-শক্তি-তুলনা/

৪. ফস্টার, জন বেলামি ও রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেনজি; ‘নজরদারির পুঁজিবাদ : একচেটিয়া-ফিন্যান্স পুঁজি, সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স ও ডিজিটাল যুগ’; ভাষান্তর : প্রতীক বর্ধন; প্রতিচিন্তা; সম্পাদনা : মতিউর রহমান; বর্ষ ৫, সংখ্যা ১, জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫, পৃ. ৪২, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।

৫. প্রাগুক্ত; ফস্টার, জন বেলামি ও রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেনজি (২০১৫ : ৩৮-৩৯)।

৬. প্রাগুক্ত; ফস্টার, জন বেলামি ও রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেনজি (২০১৫ : ৪২)।

৭. পোলারয়েড ক্যামেরা-এটি একটি বিশেষ ধরনের ক্যামেরা, যাতে ছবি তোলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পরিস্ফুটনসহ মুদ্রিত ছবি পাওয়া যায়।

৮. https://tinyurl.com/28by44kz

৯. https://tinyurl.com/28by44kz

১০. https://tinyurl.com/28by44kz

১১. https://tinyurl.com/28by44kz

১২. https://tinyurl.com/28by44kz



বি. দ্র. প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ম্যাজিক লণ্ঠনের ৯ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ হয়।




এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন