মাজিদ মিঠু
প্রকাশিত ১১ মার্চ ২০২৪ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র
বাণিজ্যিক বিচলনে শিল্পের বলি
মাজিদ মিঠু

‘প্রাচীনতম শিল্পকলা উদ্ভূত হয়েছিল ‘শাস্ত্রীয় আচার’-এর (Ritual) প্রয়োজনে¾প্রথমে জাদুবিদ্যা এবং পরে ধর্মীয় উপলক্ষ্যে।’১ পরে বহুকাল পর্যন্ত এই শিল্পকলা বাঁধা ছিলো ধর্ম ও কিছু নির্দিষ্ট মানুষের নিগড়ে, যেনো শিল্প শুধু শিল্পের জন্যই। রেনেসাঁর কালে এসে সৌন্দর্য সম্পর্কিত সেক্যুলার আচারগুলো বিকশিত হতে শুরু করে। আরো পরে যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের হাত ধরে শিল্পকলা তার নঞর্থক ধর্মতত্ত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়েছে সামাজিক। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত হয় শিল্পকলা, কিন্তু সমাজ বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র নামক যে প্রতিষ্ঠানের জন্ম, তা শিল্পের সেই বৃহত্তর মুক্তির পথে আবারও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সার্বভৌমত্ব, অনুশাসন আর প্রশাসনিকতার ঘেরাটোপে ‘নাগরিক’ মানুষ যেমন জাতীয়তা নামক এক নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাঁধা পড়ে, তেমনই শিল্পও। শাস্ত্রীয় আচার যেমন শিল্পের টুঁটি চেপে রেখেছিলো চার্চ, নিষিদ্ধ গুহা ও পবিত্র স্থানের ধুয়া তুলে, তেমনই আজও শিল্প বাঁধা জাতীয়তা নামক ‘পবিত্র’ কাঁটাতারের বেড়ায়। শিল্পের গায়েও লেবেল লাগছে স্বদেশি-বিদেশির!
অথচ শিল্পের যে সর্বজনীন শক্তি তা এ কাঁটাতারের ঊর্ধ্বে। আচার, ভাষা, সংস্কৃতির হাজারো ব্যবধান সত্ত্বেও শিল্প যে আবেদন তৈরি করে, যে যোগাযোগ ঘটায় তাতে তো বাঁধ দেওয়া যায় না। শিল্প কথা বলে নিজের ভাষায়; সেই আলতামিরা গুহার চিত্রকল্পও আজকের মানুষের সঙ্গে কথা বলে; ভিঞ্চি’র ‘মোনালিসা’ বা জয়নুলের ‘মনপুরা ৭০’ বাংলার ও ফ্রান্সের সবার সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারে। গান, কবিতা, সাহিত্য, চলচ্চিত্রও যোগাযোগ করে, নিজের ভাষায় কথা বলে। তাই শিল্পকে জাতীয়তা বা রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে আটকে রাখা যায় না। কিন্তু আজ তাই হচ্ছে, ‘মোনালিসা’ দেখতে সেই ফ্রান্সের লুভ্যর মিউজিয়ামে যেতে না হলেও তা সেখানে বন্দি, জয়নুল শুধুই বাংলাদেশের, পণ্ডিত বিরজু মহারাজ ভারতের আর শেখ সাদী পারস্যের। এ যেনো কাচ ঘেরা বিশাল ঘরে শিল্পকে মুক্তি দেওয়া, যেখানে গ্যাস ভরা বেলুন আকাশ দেখতে পেলেও উড়ে গিয়ে আটকে যায় সেই ঘরের ছাদে। তার যেনো মুক্তি নেই। আদতে শিল্পের কি মালিকানা হয়?
প্রশ্ন উঠতে পারে, এক মোনালিসা তবে কী করে সবার হবে? জয়নুলকে কী করে ভাগ করবো? মিশরের পিরামিড কেনো আর কী করেইবা বিশ্বভ্রমণ করবে? না, কথা সেখানে নয়, কথা হলো শিল্পের মালিকানার দাবি নিয়ে। তবে বলবেন, এটা কী করে সম্ভব? মালিকানা ছাড়া কি কিছু হয় নাকি? আর যদি হয়ই তবে তো সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। কেননা রাষ্ট্র, জাতীয়তা নামক প্রতিষ্ঠানগুলো যতদিন থাকবে ততদিন তো শিল্পের মুক্তি অসম্ভব! কিন্তু শিল্পের যে ধারাগুলো বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাতেই ভাগাভাগি করা যায়, সেখানেও তো সেই জাতীয়তা, সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আর তার সঙ্গে অর্থের ব্যাপার থাকলে তো কথাই নেই।
চলচ্চিত্রের কথাই ধরুন। ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্তিম প্রান্তে প্রযুক্তিজাত এ শিল্পমাধ্যমের যাত্রা শুরু। আজ তা যেমন শিল্প¾আর্ট ও ইন্ডাস্ট্রি দুই হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, জন্মক্ষণে তা ছিলো না, ছিলো শুধু প্রযুক্তিজাত অভিনব এক পণ্য। ধীরে ধীরে তা যেমন অন্যান্য শিল্পের গুণাবলি আত্মস্থ করেছে, তেমনই মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে হয়ে উঠেছে এক অনন্য শিল্পমাধ্যম। চলচ্চিত্র নামক এ শিল্পমাধ্যমটিও জাতীয়তা তথা রাষ্ট্র কাঠামোর বাধ্যবাধকতার ঊর্ধ্বে নয়। বরং শিল্পের অন্যান্য শাখার তুলনায় চলচ্চিত্রের সঙ্গে ব্যবসার সম্পর্ক বেশি হওয়ায় এ বাধ্যবাধকতার সীমানা আরো প্রসারিত। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ব্যবসা, মালিকানার মতো বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এটিও বন্দি ভূখণ্ডভিত্তিক বিভাজনে। এক দেশের চলচ্চিত্র অন্য দেশে চলতে গেলে যেমন নানা বাধা-বিপত্তি-নিষেধের বেড়াজাল পেরোতে হয়, তেমনই রাষ্ট্রীয় সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে মিলেমিশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলেও আসে সেই বাধা।
এই বাধা অতিক্রম করার পন্থা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সমঝোতার ভিত্তিতে শুরু হয় যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র-নির্মাণ। ততদিনে চলচ্চিত্র শিল্প হয়ে উঠলেও প্রযুক্তি ও ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত শুরুর যে চিন্তা তা থেকে বের হতে পারেনি। অথবা রাষ্ট্র শিল্পের ধুয়া তুললেও চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক দিকটিকেই হয়তো মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাই চলচ্চিত্র একনিষ্ঠ শিল্প হয়ে ওঠার সুযোগই পায়নি।
২.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই মূলত একাধিক রাষ্ট্র মিলে চলচ্চিত্র-নির্মাণের প্রথা শুরু হয়। তখন একদিকে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন উপনিবেশ রাষ্ট্রগুলো মুক্ত হতে শুরু করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যের উত্থান শুরু হয়।
নব্য উদারবাদ অর্থনীতির যুগে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো ভূখণ্ডভিত্তিক উপনিবেশ স্থাপনের পরিবর্তে অন্য রাষ্ট্রের বাজার দখলের মাধ্যমে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি বহাল রেখেছে। ... যুদ্ধের পরপরই ইউরোপ ও জাপানের উৎপাদনব্যবস্থা ধসে পড়ায় এ সময় দুনিয়ার মোট উৎপাদনের ৬০ শতাংশই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ... ফলে সারা দুনিয়াই নজরদারির আওতায় চলে আসে, নিম্নোক্ত তিনটি মাধ্যমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই নজরদারি প্রক্রিয়া : ১. সমরবাদ/ সাম্রাজ্যবাদ/ নিরাপত্তা, ২. করপোরেটভিত্তিক বিপণন ও মিডিয়াব্যবস্থা, ৩. ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন।২
একদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই একচেটিয়া প্রকোপের হাত থেকে বাঁচতে তখন বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রগুলো যৌথতার নীতিতে চলা শুরু করে, অন্যদিকে গঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি বিচলনকেন্দ্রিক বন্ধু রাষ্ট্রের যাত্রা। এই যখন বিশ্বব্যবস্থা, তখন যৌথতার নীতিতে দ্বৈত শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যৌথ উৎপাদনে চলে আসে। এর একদিকে ছিলো চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী গণমাধ্যম ব্যবহার করে অন্য দেশের ওপর সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চমানের মুনাফা অর্জনের অভীপ্সা; বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র থেকে বাঁচতে অপরাপর দেশগুলো ভঙ্গুর চলচ্চিত্রশিল্প উন্নয়ন ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র-নির্মাণ। ১৯৫০ থেকে ৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শুধু ইতালি ও ফ্রান্স যৌথভাবে নির্মাণ করে প্রায় আটশো চলচ্চিত্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে বৈজ্ঞানিক ও প্রাযুক্তিক সম্পদকে সামরিক পরিসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘‘ফলে জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ প্রয়োজন হয়¾বেসামরিক বিজ্ঞানী, শিল্প ও ঠিকাদারদের সরকারের ক্রমবর্ধমান ও গোপন জালের মধ্যে আনা হয়।’৩ ফলে যুদ্ধ পরবর্তী সামরিক নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র কোম্পানিগুলো ইউরোপের মতো দেশগুলো থেকে তাদের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রারূপে যুক্তরাষ্ট্রে নিতে পারেনি। আর এই জমে থাকা টাকার সঠিক ব্যবহার হিসেবে তারা বেছে নেয় যুক্তরাজ্য ও ইতালির মতো দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ চলচ্চিত্র-নির্মাণের পদক্ষেপ। যেখান থেকে পরবর্তী সময়ে তারা বিপুল মুনাফা ঘরে তোলে।
তাছাড়া একই সময়ে ‘আন্তর্জাতিক রেভেনিউ সার্ভিস’-এর নীতিমালা অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের সাহায্যার্থে যে মার্কিন নাগরিকরা দেশের বাইরে যাবেন, পাঁচশো ১০ দিন বা ১৮ মাস পর্যন্ত তাদের আয়ের ওপর কোনো কর আরোপ করা হবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে মানবাধিকার কর্মীদের জন্য এ আইনটি প্রযোজ্য হলেও দেখা যায়, এ সময়ের মধ্যে হলিউড অভিনেতা, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকাররাও এর সুবিধা ভোগ করে। এ সুযোগে অন্য দেশের সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তারাও অঢেল মুনাফা তুলেছে নিজেদের ঘরে।৪ ফলে এ সময় ইউরোপ ও হলিউডে বিপুল পরিমাণ যৌথ চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। যার অধিকাংশেরই উদ্দেশ্য ছিলো দেশের সীমানা ডিঙিয়ে বিদেশি নামিদামি চলচ্চিত্রশিল্পীদের নিয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র-নির্মাণ। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ উদ্যোক্তারা ছিলেন মুনাফার দিক দিয়ে সফল।
আজকের সমাজব্যবস্থায় এই মুনাফাকেন্দ্রিক লেনদেনের হাত ধরে শিল্পের মুক্তি নিয়ে তাই আশঙ্কা থেকেই যায়। শিল্পীকে বেঁধে ফেলা হয় হাজারো শর্তে¾অন্যের সংস্কৃতি রক্ষা, নিজের সংস্কৃতির বিকাশ, মহাজনের সুদসহ আসল ফেরত, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বৃদ্ধির যে মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়, তার ভারে জন্ম নেয় কুঁজো শিল্প। তাও মন্দের ভালো, এক-দুইটা কাঁটাতার তো পেরুনো যাবে!
৩.
স্বাধীনতার পর পরই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা। একই বছর বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় ঋত্বিক ঘটক নির্মাণ করেন তিতাস একটি নদীর নাম। কিন্তু ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রও আর এগোয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলচ্চিত্র দুটি উভয় দেশেই ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হলে যৌথ প্রযোজনায় আগ্রহ হারান প্রযোজকরা। ‘তবে প্রধান কারণ ছিল ছবির ভাষা নিয়ে ভারত সরকারের আপত্তি। বাংলা ভাষায় যৌথভাবে ছবি নির্মাণের ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ঐ সময় বিধি নিষেধ আরোপ করেছিলেন।’৫ ফলে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজেন তরফদারের পালঙ্ক মুক্তির মধ্য দিয়ে বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ চলচ্চিত্র-নির্মাণ। অবশ্য এ সময় অন্য কোনো দেশের সঙ্গেও যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র-নির্মাণের প্রয়াস দেখা যায় না।
ক্ষমতার পালাবদলে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনা প্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তিনি ক্ষমতায় আসার পর যৌথ চলচ্চিত্রের চাকা আবারও সচল হয়। মূলত ৮২’র শেষের দিক থেকেই বাংলাদেশের প্রযোজক-পরিবেশকদের যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র-নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যায়। অন্যভাবে বললে তাদের আগ্রহী করে তোলা হয়। ফলে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণ হয় দূরদেশ এবং ১৯৮৪-তে মুক্তি পায় শক্তি। এর মধ্য দিয়ে আবারও যৌথ প্রযোজনার পথ খুলতে থাকে। এবার অবশ্য ভারত ছাড়াও পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাংলাদেশ। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কের সঙ্গেও চলতে থাকে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র-নির্মাণ।
বিভিন্ন দেশের বড়ো বড়ো তারকা সমৃদ্ধ সেই সব চলচ্চিত্র ব্যবসায়িক দিক থেকে সফলতাও পায়। যৌথ প্রযোজনার যখন এই অবস্থা, তখন ১৯৮৪-তে এরশাদ প্রশাসন যৌথ প্রযোজনায় দেশীয় স্বার্থ বিবেচনা করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। যেখানে স্থানীয় শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ রাখাসহ কয়েকটি বিধান রাখা হয়। কিন্তু ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে সেই নীতিমালা বাতিল করে নতুন যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয় সেখানে অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে ‘অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের মধ্যে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুসম্পর্ক স্থাপন’কে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়। দৃশ্যত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক বন্ধন সুদৃঢ় ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির কথা বলা হলেও মূলত বিশ্বশক্তি ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কাছে এরশাদ তার সামরিক শাসনের বৈধতা অর্জনের কৌশল হিসেবেই তা ব্যবহার করতে থাকেন। নবগঠিত সার্ক-এ তার অগ্রণী ভূমিকা পালন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যান্য কৌশলের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনাকেও তিনি ব্যবহার করতে থাকেন সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে। ফলে তখন যেমন যৌথ প্রযোজনার মাধ্যমে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে এরশাদ সরকারের একধরনের সখ্য গড়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায়, তেমনই যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও অন্যতম কৌশল হিসেবে যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রকে কাজে লাগানো হয়। যেখানে যৌথ প্রযোজনার আড়ালে চলে অবৈধ সরকারের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা।
ফলে তখন নিয়মিতভাবে উল্লেখযোগ্য হারে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তির অপেক্ষায় ছিলো যৌথ প্রযোজনার ১১টি চলচ্চিত্র। একই বছর সরকারি অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ হয় সাতটি যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র এবং অনুমোদন চেয়ে আবেদন জমা পড়ে ১৮টি। কিন্তু ৮৬’’র সেই নীতিমালার কারণে পরে যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র হ্রাস পেতে থাকে। কারণ নীতিমালায় চলচ্চিত্রের উন্নয়নের চেয়ে এরশাদ সরকারের ভাবমূর্তি উন্নয়নের নীতিই প্রাধান্য পায়। তাছাড়া ৮২’’র পর থেকে যৌথ চলচ্চিত্র নির্মাণের যে জোয়ার বইছিলো তাতেও প্রধান লক্ষ্য ছিলো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বেশি বেশি চলচ্চিত্র-নির্মাণ। কিন্তু এতে চলচ্চিত্রের শৈল্পিক ও কারিগরি মানের দিকে কোনো নজর ছিলো না। ফলে চার বছর পার হতে না হতেই ব্যবসায়িক দিক থেকেও চলচ্চিত্রগুলো নুইয়ে পড়তে শুরু করে। আর ‘যৌথ প্রযোজিত ছবির কোন কোনটি বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করলেও শিল্প নৈপুণ্যের দিক থেকে বিশেষ কোন প্রশংসার দাবি করতে পারেনি।’৬ তার পরও ৮৭ থেকে ৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রতি বছর কমপক্ষে পাঁচটি যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। ৯০-এ এরশাদ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় আবার পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এ সময় চলচ্চিত্র প্রযোজনায় বিভিন্ন দেশের অংশীদারিত্ব কমে আবারও ভারতকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে এরশাদ সরকারের ‘‘ইমেজ বিল্ডিং গেম’’-এর ফলে দেশীয় চলচ্চিত্র ৯০-এর দশকে এসে সঙ্কটের মুখে পড়ে। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো নায়িকা সঙ্কট। এছাড়া অর্থনৈতিক টানাপড়েন আর কলাকুশলীর অভাব তো রয়েছেই। ফলে এবার বি এফ ডি সি যৌথ প্রযোজনায় যেতে বাধ্য হয়। এই সময়টিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়িকা সঙ্কটের স্থান পূরণে হাজির হন কলকাতার ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। একে একে নির্মাণ হয় সাগরিকা, স্বামী কেন আসামী, পদ্মা নদীর মাঝি, মেয়েরাও মানুষ, রাঙা বউ-এর মতো বেশকিছু চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র ব্যবসায় যখন ভাটির টান, তখন এ চলচ্চিত্রগুলো অন্তত চলচ্চিত্র ব্যবসার পালে কিছুটা হাওয়া লাগায়।
সুতরাং কার্যকারণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে যৌথ প্রযোজনার পিছনে সাংস্কৃতিক লেনদেন, জাতিগত সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হলেও এর আড়ালে কখনো রাষ্ট্রীয় স্বার্থ উদ্ধার, সামরিক শাসনের বৈধতা আদায় বা পুঁজির স্ফীতিই মুখ্য ছিলো বলে প্রতীয়মান হয়। তার মানে কখনো নিজের প্রয়োজনে, কখনো অংশীদার রাষ্ট্রের প্রলোভনে চলেছে এই যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্রের যাত্রা। এতো কিছুর ভিড়ে চলচ্চিত্র উন্নয়ন বা শিল্পের লেনদেনের জন্য যে যৌথ চলচ্চিত্র হয়নি তা বলাই বাহুল্য।
নব শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় দেড় যুগ যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নিয়ে তেমন একটা কথা শোনা যায়নি। দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র-নির্মাণ আবারও শুরু হয়েছে ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মে আমি শুধু চেয়েছি তোমায় মুক্তির মধ্য দিয়ে। ২০১৫’’র শুরুতেই মুক্তি পায় আরেকটি চলচ্চিত্র, রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট। তাছাড়া নির্মাণাধীন ও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যেই আবার ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানি নিয়ে পরিবেশক ও নির্মাতাদের মধ্যে শুরু হয়েছে যুদ্ধ। কিন্তু কী এমন হলো যে এখন এসে যৌথ চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও আমদানির দিকে ঝুঁকছে ঢাকাই চলচ্চিত্রের নির্মাতা-পরিবেশক-অর্থলগ্নীকারীরা; আর সঙ্গে ছায়ার মতো রয়েছে রাষ্ট্র নিজেও! অন্যদিকে অংশীদার রাষ্ট্রকেও প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয় এর কার্যকারণ সম্পর্ক কী বা কেমন।
৪.
৯০ দশকের শেষ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের মাঝ পর্যন্ত ঢাকাই চলচ্চিত্রের দুর্দশার কাল বলা যায়। সালমান শাহ’’র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে ক্ষতির সম্মুখীন ঢাকাই চলচ্চিত্র হয়েছিলো, মান্নার মৃত্যুতে তা প্রকট হয়। একদিকে নায়ক-নায়িকা সঙ্কট, ভালো গল্প, চিত্রনাট্যের অভাব, তার ওপর দুর্বল নির্মাণশৈলী আর অশ্লীলতা, কাটপিসের প্রকোপে চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকের বৈচিত্র্য কমে এ সময় তা একশ্রেণির দর্শকে নেমে আসে। ফলে ৯০-এর দশকেও প্রেক্ষাগৃহের যে সংখ্যা সাড়ে ১২শো ছিলো, তা এখন তিনশো ৫০টি!
২০০৭ খ্রিস্টাব্দে সরকারি হস্তক্ষেপে ‘‘অশ্লীলতা’’ বন্ধ হলে ঢাকাই চলচ্চিত্রের চেহারা বদলাতে শুরু করে। নব শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরু থেকে আবারও আশার আলো দেখতে পায় ঢাকাই চলচ্চিত্র। পুঁজি যে ফেরত আসছে এমন নয়, তবে একটা চলচ্চিত্রিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। যে পরিবেশের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটা হলো লেখাপড়া জানা, তরুণ শিক্ষিতরা আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে চলচ্চিত্রে যুক্ত হচ্ছে। এদের অনেকে আগামীর নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, সম্পাদক, ক্যামেরা-সঞ্চালক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এমনকি হাতে হাতে থাকা স্মার্টফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে তরুণরা চলচ্চিত্রের ইমেজে নিজেদের বুঁদ করে রাখছে। যেটা যেকোনো দেশের চলচ্চিত্র এগিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্র্ণ বিষয়। ঝুঁকি আছে জেনেও অনেক অর্থলগ্নীকারক আবারও চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হচ্ছেন। যদিও প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি এখনো বিলুপ্ত হয়নি। নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের অবস্থাও তৈরি হয়নি। সরকার কিছুটা হলেও চলচ্চিত্রের দিকে নজর দিচ্ছে, প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের কথা ভাবছে। বি এফ ডি সি’র আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া চলছে। সবমিলিয়ে আশানুরূপ অবস্থায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র না পৌঁছলেও আশা জাগানিয়া একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
ঠিক এমনই এক অবস্থায় জোরেশোরে উঠছে ভারতের টালিগঞ্জের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র-নির্মাণের কথা। আমদানি করা হয়েছে ভারতের হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রও। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় আপত্তি জানিয়ে যে ভারত সরকার সেই ৭৫-এ যৌথ প্রযোজনা বন্ধ ঘোষণা করেছিলো, সেই তারাও অতি উৎসাহ প্রকাশ করছে। কিছুদিন আগেও তিস্তা চুক্তি নিয়ে এক কথায় না বলে দেওয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক (১৯-২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) বাংলাদেশ সফরে ব্যবসায়ী, কূটনীতিক ও আমলাদের চেয়ে সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের ব্যক্তিদেরই বেশি চোখে পড়েছে। তারা এসে বলছে যৌথতার কথা, দুই বাংলার মিলনের কথা! কিন্তু কেনো? সময়ের কোন পরিপ্রেক্ষিতে যৌথ প্রযোজনা আবশ্যক হয়ে উঠলো? এমন কোন দড়িতে টান পড়ছে যে যৌথ প্রযোজনা প্রসঙ্গে এতো উতলা হয়ে উঠছে তারা? এ নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার জন্য টালিগঞ্জের চলচ্চিত্রের বাজার একটু ঘুরে আসা যেতে পারে।
টালিগঞ্জের গত এক দশকের চলচ্চিত্রের দিকে দেখলে তাতে দুটি ধারা লক্ষণীয়। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের প্যারালালে একটা ধারা টালিগঞ্জে দাঁড়িয়েছে যাকে আমরা বলছি ‘‘আর্ট ফিল্ম’’। নির্দিষ্ট কিছু দর্শক নিয়ে এ চলচ্চিত্রগুলো চলে কিছু মাল্টি সিনেপ্লেক্সে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ধারার যে চলচ্চিত্র সেগুলো মূলত হলিউড, বলিউড আর তামিলের রিমেক করা। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি যেমন বদলেছে তেমনই দর্শক বিভিন্ন মাধ্যমে মূল চলচ্চিত্র আগেই দেখে ফেলায় টালিগঞ্জের এসব চলচ্চিত্র দর্শক হারিয়েছে। সর্বোপরি পুঁজি ও শিল্পের সমন্বয় হচ্ছে না। ফলে ‘বেশির ভাগ বাংলা ছবিই চলছে না। গত দু’’বছরে শুধুমাত্র [টালিগঞ্জের বাণিজ্যিক ধারার] দুটি ছবিই প্রযোজকের ঘরে টাকা ফেরত আনতে পেরেছে। ... সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মুখে টলিউড।’৭
সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত অরুন্ধতী, তামিল মাগাধিরা’র রিমেক রাজ চক্রবর্তীর বিগ বাজেটের যোদ্ধা লাভ তো দূরের কথা, বিনিয়োগের অর্ধেকও ফেরত আনতে পারেনি। আর গেমও প্রযোজকের ঘরে ফেরত আনতে পারেনি আশানুরূপ পুঁজি। এভাবে একের পর এক বড়ো বাজেটের চলচ্চিত্র ফ্লপ হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের জেলা পর্যায়ের অনেক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। এর আগে তবুও টালিগঞ্জের অনেক চলচ্চিত্র স্যাটেলাইট টেলিভিশনে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার করে মোটা অঙ্কের একটা অর্থ পেতো প্রযোজক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো রিয়েলিটি শো নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে পরিচালক, কলাকুশলী থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আর্থিক চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র এখন ভেন্টিলেটরে।
টালিগঞ্জের বাংলা চলচ্চিত্রের অভ্যন্তরীণ বাজারের এই যখন অবস্থা, তখন এ থেকে উত্তরণে তাদের দরকার একটা যুতসই বাজার। যেখানে এই রিমেক, বস্তাপচা চলচ্চিত্রগুলোও গেলানো যাবে। সেজন্যই ভেন্টিলেটর থেকে ওঠার প্রেসক্রিপশনে ‘‘বাংলাদেশে বাংলা ছবি রিলিজ করা’র৮ বিষয়টি থাকছে প্রথম দিকেই। কারণ, ভারতীয় টিভি চ্যানেল আর পাইরেসির বদৌলতে বাংলাদেশের ১৬ কোটি দর্শক তো প্রস্তুত ভারতীয় হিন্দি আর বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য। তাহলে বৃহৎ এই চলচ্চিত্র ভক্তকুলকে বিনা পয়সায় তা দেখিয়ে লাভ কী? আর এ দর্শক তো শুধু দর্শক না, ভারতীয় পণ্যের এক বিশাল ভোক্তাও। তাই ভেন্টিলেশন থেকে বেরোতে ১৬ কোটির এ বাজারের চেয়ে ভালো পথ আর কী হতে পারে! যা তৈরিই আছে, শুধু প্রয়োজন প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ঢোকার সুযোগ। সম্প্রতি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে আসা গায়ক-নির্মাতা অঞ্জন দত্তের কথাতেও তার প্রমাণ মেলে, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা ব্যবসা ‘‘হুমকি’’র মুখে পড়েছে। তামিল ও হিন্দি সিনেমার প্রতিই ঝুঁকছে পশ্চিমবঙ্গের দর্শক। তাই তাদের অনেকের নজর বাংলাদেশের বাজারে।’৯
এতে দোষের কিছু নেই, কেননা পুঁজির ধর্মই তো তাই; প্রথমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কৌশলে, আর তাতে কাজ না হলে জোর করে আধিপত্য বিস্তার। তাই আপাত দৃষ্টিতে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি, দুই বাংলার মানুষের প্রাণের মিলন কথাগুলোর আড়ালে পুঁজির হাতছানিই চোখে পড়ে। যদিও চলচ্চিত্রের তথা শিল্পের কোনো দেশ, কাল ভেদ নেই, তবুও জাতীয়তাবাদের কাঁটাতারে যে ভূখণ্ডভিত্তিক ‘‘নিজের চলচ্চিত্র’’ ডিসকোর্স রয়েছে তাতে প্রশ্ন ওঠে, পুঁজির এই বিচলন চক্রে ‘‘নিজেদের’’ চলচ্চিত্র ক্ষতির সম্মুখীন হবে না তো?
কেননা আমরা দেখছি, বর্তমান ঢাকাই চলচ্চিত্রও ভুগছে। কাহিনি, নির্মাণশৈলী, শিল্পনির্দেশনা কোনো দিক দিয়েই দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টানতে পারছে না। আর পুঁজি তথা ব্যবসার প্রশ্নে কাঁটাতারের বেড়া খুব বেশি শক্তিশালী নয়। তাই বাংলাদেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংস্থা শুধু পুঁজি বাড়াতে ঝুঁকছে টালিগঞ্জের দিকে। এখানে এসে যৌথ প্রযোজনায় উভয়পক্ষের উদ্দেশ্যই মিলে যায়। কিন্তু ‘‘মাৎস্যন্যায়’’ টার্মটি ভুলে গেলে চলবে না। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় উদ্দেশ্য এক হলেও কার জোর কতোখানি তা বিবেচনা করেই সম্পর্কে জড়ানো উচিত। না হলে জোর যার মুল্লুকও তার হবে। তাই যৌথ প্রযোজনাকে যে অতি আবেগী সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে ‘‘স্বার্থ’’ সিদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা আবশ্যক।
অতীতে বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার সুখ-দুঃখ উভয় স্মৃতিই আছে। তাই সাবধান। তবে এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকায় থাকতে হবে সরকারকেই। কেননা সুষ্ঠু নীতিমালা, আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করতে না পারলে গোড়ার গণ্ডগোলটা থেকেই যাবে। আর চলচ্চিত্রের যেটুকু শিল্পের (art) তা সে নিজ গুণেই অর্জন করে নিবে। তাকে তো আর বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা যাবে না!
৫.
১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মুক্তি পায় যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র শক্তি ও মিস্ লংকা। কিন্তু চলচ্চিত্র দুটি ১৯৮২-তেই উর্দু ভাষায় বাসেরা ও নাদানী নামে পাকিস্তানে মুক্তি পায়। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র অবিচার মুক্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে অবিচার করা হয়। কেননা ভারতে প্রদর্শনের সময় চলচ্চিত্রের টাইটেল কার্ডে দুই জন পরিচালকের মধ্যে বাংলাদেশের সৈয়দ হাসান ইমামের নাম পর্যন্ত ছিলো না। তাছাড়া ৮০’’র দশকে ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলোর অধিকাংশই অংশীদার রাষ্ট্রের ভাষায় নির্মাণ করা হয়।
হিন্দি বা উর্দুতে নির্মিত এসব ছবি বাংলায় ‘‘ডাব’’ করার পর তা এদেশের দর্শকদের কাছে তেমন কোন আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। ... এ ছাড়া যৌথ প্রযোজিত ছবিতে এদেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের বিদেশী শিল্পীদের তুলনায় অতি নগণ্য চরিত্র দেওয়া হয় এবং এর ফলে স্বদেশে ও বিদেশে এদেশের শিল্পীদের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়।১০
যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নিয়ে তৎকালীন সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকার পরও ঠিক কেনো এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো তা প্রশ্ন জাগায়। এক্ষেত্রে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের ভূমিকাইবা কী ছিলো সেগুলোও জানা জরুরি।
১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে অংশীদার রাষ্ট্রের কলাকুশলী ও শিল্পী সংখ্যা সমানুপাতিক হারে হওয়াসহ কিছু বিষয়ে যে নীতিমালা করা হয়, তা বাতিল করে ১৯৮৬-তে আরেকটি নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার; বিজ্ঞপ্তি নং¾এফ এস/৯ এফ-৮/৮৪/৫৭৪১১ (২০)। নীতিমালায় তৎকালীন এরশাদ সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, ‘উন্নতমানের ছবি উৎপাদনের জন্য কারিগরী বিশেষ দক্ষতা অর্জন, চিত্র শিল্পের উন্নীতকরণ এবং দেশের বাহিরে ছবির বাজার সম্প্রসারণ। অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের মধ্যে ছবির মাধ্যমে সুসম্পর্ক স্থাপন অন্যতম সুবিধা হিসাবে গণ্য করা হবে।’’১১ কিন্তু তৎকালীন যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রের মান দেখে মনে হয় না কারিগরি দক্ষতা অর্জন, চিত্রশিল্পের উন্নয়ন ও দেশের বাইরে বাজার সম্প্রসারণ এরশাদ সরকারের উদ্দেশ্য ছিলো। বরং বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের কারিগরি ও শৈল্পিক মান দেখে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, অংশীদার রাষ্ট্রকে তাদের হিস্যার চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তৎকালীন সরকার ‘‘সুসম্পর্ক স্থাপন’ করতে চেয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশকে ছোটোও হতে হয়েছে। তাই এটা বলতে বাধা নেই যে, যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের মানোন্নয়নের চেয়ে গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নই মুখ্য বিষয় ছিলো।
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ‘‘সুন্দরবন ফিল্ম সোসাইটি’’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘যৌথ প্রযোজনার ছবির ব্যাপারে সরকারের কোন বিরোধ নেই। কিন্তু যৌথ প্রযোজনার মৌলিক শর্ত¾এ পর্যন্ত কেউই প্রতিপালন করেন নি।’’১২ মুখে এসব বললেও নীতিমালা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রশাসন কিন্তু কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আর তথ্য মন্ত্রণালয়, বি এফ ডি সি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় প্রযোজক-নির্মাতারা কখনোই শিল্পসম্মত, আন্তর্জাতিক বাজার তৈরিতে সক্ষম¾এমন চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হননি; ফলে সুযোগ নিয়েছে অংশীদার রাষ্ট্র।
অধিকাংশ ছবি সম্পূর্ণরূপে অথবা এসব ছবির বিরাট অংশই বিদেশে চিত্রায়িত হয়েছে। অপরদিকে বিদেশে যৌথ ছবির প্রদর্শন বাবদ বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে এমন কোন প্রমাণও পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সকল প্রকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে অবৈধভাবে¾দেশের প্রচলিত আইনকে লংঘন করে অর্থ পাচার হয়েছে বিদেশে। যৌথ ছবির নামে বাংলাদেশের দর্শকরা এতদিন যা দেখেছেন, তা প্রকৃতপক্ষে বাংলায় ‘ডাব’’ করা বিদেশী ছবি। ভিডিও রাইটও ছিল বিদেশি প্রতিপক্ষের অনুকূলে।১৩
বিনিময়ে লাভবান হয়েছে প্রভাবশালী কয়েকজন পরিচালক ও প্রযোজনা সংস্থা আর বাস্তবায়ন হয়েছে সরকারের জনবিমুখ পররাষ্ট্রনীতি।
৮৬’’র নীতিমালা অনুযায়ী যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের মূল নেগেটিভ বাংলা ভাষায় প্রস্তুত করার কথা বলা হলেও আদতে তা হয়নি। অংশীদার রাষ্ট্রের ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, পরে তা ডাব করা হয়েছে বাংলায়। এভাবে শিল্পী, কলাকুশলীদের সমঅংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ব্যবসা পর্যন্ত সবকিছুই করা হয়েছে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে। ফলে বাংলাদেশের নির্মাতা, প্রযোজকরা প্রতারিত হয়েছেন। সরকারের অবহেলা ও অংশীদার রাষ্ট্রের বিশ্ব বাজারে একচেটিয়া কর্তৃত্বের সুযোগে বাংলাদেশকে না জানিয়েই চলচ্চিত্রের স্বত্ব বিক্রি, ভিডিও ক্যাসেট বিক্রি ও গান থেকে ভারত, পাকিস্তান অবৈধভাবে মুনাফা অর্জন করেছে। ফলে ৯০ দশকের পরে যৌথ প্রযোজনায় আবারও ভাটার টান পড়ে। দীর্ঘ বিরতির পর সাম্প্রতিক সময়ে আবারও যৌথ প্রযোজনার বিষয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বর্তমান সরকার। ১৭ জুলাই ২০১৪-তে ‘‘যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ নীতিমালা ২০১২ (সংশোধিত)’’ জারি করা হয়।
এই নীতিমালায় আবহমান বাংলা, বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সুষ্ঠু প্রতিফলন ঘটানো, উন্নতমানের ছবি উৎপাদনের জন্য কারিগরি বিশেষ দক্ষতা অর্জন, চিত্রশিল্পের উন্নীতকরণ এবং দেশের বাইরে চলচ্চিত্রের বাজার সম্প্রসারণকে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের জনগণের সঙ্গে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুসম্পর্ক স্থাপনকে রাখা হয়েছে অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে। শুটিং লোকেশন, শিল্পী ও কলাকুশলীর অংশগ্রহণের ব্যাপারেও রয়েছে সেই সমানুপাতিক হিসেবে বাধ্যবাধকতা। তবে চলচ্চিত্রের ভাষা, পরিস্ফুটন, মুদ্রণ, সম্পাদনা, শব্দ সংযোজন, পুনঃসংযোজন ও নেগেটিভ প্রসেসিং বিষয়গুলোতে যৌথ প্রযোজকদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। ৮৬’’র নীতিমালায় অবশ্য এ কাজগুলো বি এফ ডি সি’তে করা বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছিলো। চলচ্চিত্রের মূল প্রিন্ট বাংলা ভাষায় করার যে বাধ্যবাধকতা ৮৬’’র নীতিমালায় ছিলো, তাও শিথিল করা হয়েছে বর্তমানে। সেখানে অন্য ভাষার ক্ষেত্রে শুধু বাংলা বা ইংরেজি সাবটাইটেল থাকলেই চলবে। তবে চলচ্চিত্র অনুমোদন ধারায় রয়েছে বড়ো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বি এফ ডি সি’’তে আবেদন থেকে শুরু করে শিল্পী নির্ধারণ, চিত্রনাট্য অনুমোদন বিষয়ে পার হতে হবে অনেকগুলো ধাপ।
তাছাড়া বর্তমান নীতিমালায় জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, বৈদেশিক সম্পর্ক, অশ্লীলতা বিষয়ে যে অবস্থান নেওয়া হয়েছে তার অনেকগুলোই আপেক্ষিক। ‘‘নৈতিকতা বিবর্জিত’, ‘‘জঘন্য পথ’’, ‘‘নষ্ট ও অনৈতিক চরিত্র’, ‘‘নোংরা ও অশ্লীল’, ‘‘ঐতিহ্য, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির অশোভন দিক’’ ইত্যাদি শব্দ ও শব্দগুচ্ছের সঠিক অর্থ ও প্রয়োগ নির্ধারণ না করেই নীতিমালায় এসব বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যা নীতিমালাটি বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে কোনো চলচ্চিত্রের সেন্সরের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ চাইলেই স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে পারবে।
সংশোধিত এ নীতিমালা জারির দুই মাস আগে ১৬ মে মুক্তি পায় যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র আমি শুধু চেয়েছি তোমায় এবং নীতিমালা জারির ছয় মাসের মাথায় মুক্তি পায় রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট। দেখা যাক, দীর্ঘ বিরতির পর মুক্তিপ্রাপ্ত এ দুটি চলচ্চিত্রে নীতিমালার বাস্তবায়ন কতোটুকু এবং বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার অবস্থা।
৬.
৮২-তে যখন নতুন করে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র শুরু হলো তখন প্রেক্ষাগৃহ মালিক ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব মহলেই একটা আত্মতুষ্টির রেখা দেখা দিয়েছিলো। কেননা সেই সময়ের বেশকিছু চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়। যেমনটি দেখা যাচ্ছে বর্তমানেও। আমি শুধু চেয়েছি তোমায় ও রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট মুক্তির পর প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের মুখে হাসি ফুটেছে অনেকখানি। প্রযোজনা সংস্থার অধিকর্তারা বলতে শুরু করেছেন, চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে এবং অন্তত মূল পুঁজি ঘরে ফেরাতে যৌথ প্রযোজনার বিকল্প নেই। প্রেক্ষাগৃহগুলোতে দর্শকের ভিড় দেখে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘‘বাংলা সিনেমার দিন ফিরলো বলে’’। কিন্তু এতো কিছুর ভিড়েও শুভঙ্করের ফাঁকিটা চোখ এড়াচ্ছে না।
৮২’’র পর কিছুদিনের মধ্যেই যেমন মুখ থুবড়ে পড়েছিলো যৌথ প্রযোজনা, তার ইঙ্গিতও এ দুটি চলচ্চিত্র দিচ্ছে। কেননা সমঅংশীদারভিত্তিক চলচ্চিত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে শৈল্পিক বিবেচনা নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক লেনদেনই প্রধান হয়ে উঠছে। ১৯৮৬’’র নীতিমালার তুলনায় ২০১২’’র সংশোধিত নীতিমালা অনেকাংশে নমনীয়। আর এ নমনীয়তার সুযোগে শুরু হয়েছে অনিয়ম ও ফাঁকিবাজি। যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে শিল্পী সংখ্যা সমানুপাতিক রাখার কথা উভয় নীতিমালায় থাকলেও, বর্তমান নীতিমালায় ‘‘চলচ্চিত্রের নির্মাণের জন্য নিয়োজিত মুখ্য শিল্পী এবং কলাকুশলীর সংখ্যা, যৌথ প্রযোজকগণই যৌথ প্রযোজনা চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন’’ বলে একটি ফাঁক রাখা হয়েছে। আর এই ফাঁক কাজে না লাগিয়ে পারে অংশীদার রাষ্ট্র! আমি শুধু চেয়েছি তোমায়-এ মূল চরিত্রের দুজনই অংশীদার রাষ্ট্রের শিল্পী। এছাড়া সহশিল্পীর সংখ্যাতেও করা হয়েছে যথেষ্ট ছলচাতুরী।
এবার অন্যান্য বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমি শুধু চেয়েছি তোমায়-এর বাংলাদেশে ব্যবহৃত পোস্টারে পরিচালক হিসেবে অশোক পতি ও অনন্য মামুনের নাম থাকলেও ভারতে ব্যবহৃত পোস্টারে বাংলাদেশি পরিচালক, গীতিকার ও খোদ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নামও ছিলো না। নীতিমালা সংশোধনের পর মুক্তিপ্রাপ্ত রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট-এর ক্ষেত্রে ঘটেছে আরো ভয়ঙ্কর ঘটনা। ভারতের পোস্টারে বাংলাদেশি পরিচালকের নাম তো নেই-ই, বাংলাদেশে ব্যবহৃত পোস্টারে কোনো পরিচালকের নামই ব্যবহার করা হয়নি। অথচ চলচ্চিত্রের ভগবান হলেন পরিচালক। এটা অনেকটা ৮৭’র অবিচার-এরই পুনরাবৃত্তি; যেখানে হাসান ইমাম এর শিকার হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক বিষয়টি নিয়ে দেশের চলচ্চিত্র মহলে সমালোচনার ঝড় উঠলেও অযাচিতভাবেই আবারও সরকারকে দেখা গেছে নির্লিপ্ত। এছাড়া বর্তমানেও প্রশ্ন উঠেছে আগের মতো বিশাল অঙ্কের টাকা পাচারের। কিন্তু এর বিরুদ্ধেও কোনো পদক্ষেপ নেই।
১৯৮২ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে যে যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রগুলো মুক্তি পেয়েছে তার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলচ্চিত্রের গল্প, চিত্রায়ণ, সঙ্গীত, শিল্পনির্দেশনাসহ কারিগরি ও শৈল্পিক মানের দিকে কোনো নজর দেওয়া হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে দর্শক আগ্রহ হারিয়েছে। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র দুটি দেখলেও তার প্রমাণ মেলে। শুধু প্রাযুক্তিক উন্নয়নে নজরকাড়া বিদেশি পর্যটন সাইটের চকচকে উপস্থাপন ছাড়া চলচ্চিত্র দুটিতে নতুন কিছু নেই বললেই চলে। নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে ‘‘অপরিহার্যতা ব্যতিত কোন পুরানো বা নির্মাণাধীন বিদেশী অথবা বাংলাদেশী চলচ্চিত্র থেকে যে কোন ধরনের নকল করা’’ যাবে না। অথচ আমি শুধু চেয়েছি তোমায়-এর কাহিনি তৈরি হয়েছে তামিলের আরিয়া : মি. পারফেক্ট চলচ্চিত্রকে কাটছাঁট করে। দৃশ্যায়নেও চেষ্টা করা হয়েছে হবহু অনুকরণের। গানগুলোর চিত্রায়ণেও এই অনুকরণ প্রবণতা ছিলো। ‘‘পাক্কা ঘুঘু মাল এ বান্দা’ গানটি নকল করা হয়েছে আরিয়া থেকেই; আর ‘‘তুমি যদি আমাকে/ কাছে এসে ভালোবাসো’ গানটির কিছু অংশের চিত্রায়ণ নকল করা হয়েছে বলিউডের জ্যাকপট-এর ‘কাভি জো বাদাল বারসে’ গান থেকে। সেখানে নায়িকা সানি লিওনির পোশাকের রঙ ছিলো সাদা, তা বদলে কেবল লাল রঙের পোশাকে সাজানো হয়েছে শুভশ্রীকে।
তাছাড়া নীতিমালায় আবহমান বাংলা-বাঙালি সংস্কৃতি-কৃষ্টির সুষ্ঠু প্রতিফলন ঘটানোর কথা বলা হলেও আমি শুধু চেয়েছি তোমায় ও রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট-এ তার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া দায়। দুটি চলচ্চিত্রের কাহিনিতেই গ্রাম গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার ভিতরে বাংলাদেশের গ্রাম অনুপস্থিত। দুটি চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে গ্রাম মানেই দু-দলের মারামারি, অত্যাচারী ও প্রভাবশালী পরিবারের দাপট আর গ্রামের সাধারণ মানুষ সেখানে দর্শক, না হয় হাসির পাত্র। দুটি গল্পই ত্রিভুজ প্রেমের, যেখানে হালকা আবেগী পরিবেশে নায়ক-নায়িকার চাওয়া-পাওয়া ফুটিয়ে তোলাই যেনো মূল উদ্দেশ্য।
যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেশের জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শৈল্পিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টার কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে তারও কোনো নিদর্শন নেই এ চলচ্চিত্র দুটিতে। সম্প্রতি একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে বাংলাদেশে আসা কলকাতার অভিনেতা ও পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নিয়ে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন,
এখন পর্যন্ত যে কয়টা যৌথ প্রযোজনা আছে, দেখেছি; সেগুলো বাংলা ছবি বলেই মনে হয়নি আমার কাছে। মনে হয়েছে সাউথ ইন্ডিয়ান ছবি। তো দুই বাংলা মিলে যখন কাজ করবে, সেখানে দুই বাংলার সাহিত্য নিয়ে সিনেমা হওয়া দরকার, দুই বাংলার ইতিহাস নিয়ে কাজ হওয়া দরকার, দুই বাংলার মাটি নিয়ে কাজ হওয়া দরকার। ... সেটা কেনো সাউথ ইন্ডিয়ার মতো হবে।১৪
অন্যদিকে চলচ্চিত্র চিত্রায়ণের লোকেশন ব্যবহারে সমানুপাত রাখার কথা বলা হলেও তা মানা হয়নি। আমি শুধু চেয়েছি তোমায়-এর বেশিরভাগ চিত্রায়ণ হয়েছে অংশীদার রাষ্ট্রের লোকেশনে। একটি গানের শুটিং ছাড়া পুরো কাজই হয়েছে বাংলাদেশের বাইরে। রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট-এর চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়েছে বিদেশি লোকেশন। এ চলচ্চিত্রটিতেও বাংলাদেশের চেয়ে অংশীদার রাষ্ট্রের লোকেশন গুরুত্ব অনেক বেশি।
আর একটি বিষয় না বললেই নয়, যৌথ প্রযোজনার নব এ যাত্রায় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানই সর্বেসর্বা হয়ে উঠছে। নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই শিল্পী নির্বাচন, লোকেশন নির্ধারণসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই হয়েছে অনিয়ম। চলচ্চিত্রের আধেয়ের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অনুকরণে সবকিছু ছাপিয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে ব্যবসা। রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট-এর বাংলাদেশি প্রযোজনা সংস্থার অধিকর্তা আব্দুল আজিজের কথায় তা আরো স্পষ্ট হয়। তার কাছে যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রের যুক্তি হলো, ‘‘বিগ বাজেটের ছবি করলে জয়েন্ট ভেঞ্চার ছাড়া সম্ভব নয়, অধিকতর ব্যবসা করার জন্য যৌথ প্রযোজনাই শ্রেয়।’ তার মানে আব্দুল আজিজরা নীতিমালার ধার ধারেন না! তিনি আরো বলেন, ‘‘কোন দেশের কতজন আর্টিস্ট অভিনয় করবে তা নির্ভর করে গল্প এবং শ্যুটিং লোকেশনের উপর। এবং ডিরেক্টর সব সময়ই যে কোন একজন হয়।’’ তার অবস্থান আরো পরিষ্কার হয় এই কথায় যে, ‘‘জাজ এখন থেকে ১০০% মুভি জয়েন্ট ভেঞ্চার করবে। আর তা না করতে পারলে বিডিতে সিনেমা বানানো বন্ধ করে দিবো।’১৫
এতক্ষণে এটা নিশ্চয় স্পষ্ট যে যৌথ প্রযোজনার মূল ও একমাত্র লক্ষ্য ব্যবসা। তা যেমন অংশীদার রাষ্ট্র চায়, তেমনই বাংলাদেশের প্রযোজনা সংস্থাগুলোও চায়। এখানে চলচ্চিত্রের উন্নয়ন হয়তো হবে। কিন্তু তার শৈল্পিক দিক শঙ্কা মুক্ত নয়, এমনকি এ ব্যবস্থা থেকে দেশীয় চলচ্চিত্রের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
৭.
১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে কানাডায় যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নিয়ে পরিচালিত এক সমীক্ষায় এর বেশকিছু ইতিবাচক দিক উঠে আসে। এতে বলা হয়েছে, চলচ্চিত্রে যৌথ প্রযোজনার ফলে কোনো দেশের ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তি সবল হয়, অংশীদার রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ভোগ (চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও বাজারজাত করার দিক থেকে) করা যায় এবং অংশীদার রাষ্ট্রের বাজারসহ অন্যান্য বাজারে প্রবেশের সক্ষমতাও তৈরি হয়। একই সঙ্গে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রজেক্টে অংশগ্রহণের সুবিধা থাকে এবং কম খরচে কাক্সিক্ষত লোকেশন ব্যবহার করা যায়। অংশীদার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চলচ্চিত্রের প্রাযুক্তিক দিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণের মান বিনিময় ও বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়া সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নেও এটি কাজ করে। ১৬
তবে এ লক্ষ্য তখনই অর্জন করা সম্ভব, যখন এই অংশীদারিত্ব হবে সুষম ও প্রকৃতার্থেই যৌথ। আর যদি তা না হয়, যৌথ প্রযোজনা হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রীয় একাধিপত্য, সাংস্কৃতিক বৈরিতা ও শোষণের মাধ্যম। নামমাত্র যৌথ প্রযোজনার কথা বলে অংশীদার রাষ্ট্রের চলচ্চিত্র বাজার দখল, নিজেদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়াসহ জাতীয়তাবাদের মোড়কে চলতে পারে এই আধিপত্যের বিস্তার। এটি রোধ করতে অংশীদার রাষ্ট্রের মধ্যে অবশ্যই যুগোপযোগী, স্পষ্ট আইন ও তার প্রয়োগের যেমন বিকল্প নেই; তেমনই যৌথ প্রযোজনার সঙ্গে জড়িত নির্মাতা, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের দৃঢ় নৈতিক অবস্থানও জরুরি।
লেখক : মাজিদ মিঠু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
mayid.mithu@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. বেঞ্জামিন, ওয়াল্টার; ‘যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলা’; ভাষান্তর : জাকির হোসেন মজুমদার ও মোহাম্মদ আজম; যোগাযোগ; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; সংখ্যা ৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ৫৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
২. ফস্টার, জন বেলামি ও রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেনজি; ‘‘নজরদারির পুঁজিবাদ : একচেটিয়া-ফিন্যান্স পুঁজি, সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স ও ডিজিটাল যুগ’; প্রতিচিন্তা; সম্পাদনা : মতিউর রহমান; জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫, পৃ. ৩৭-৩৯, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
৩. প্রাগুক্ত; ফস্টার, জন বেলামি ও রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেনজি (২০১৫ : ৩৯)।
৪. en.wikipedia.org/wiki/International_co-production
৫. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ২৭০); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
৬. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ২৭৩)।
৭. http://goo.gl/8fw4Ty
৮. http://goo.gl/8fw4Ty
৯. http://www.jugantor.com/tara-jilmil/2015/04/30/256767#sthash.dtdoeaJC.dpuf
১০. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ২৭৪)।
১১. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ২৭১)।
১২. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ২৭৪)।
১৩. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ২৭৪-২৭৫)।
১৪. http://www.priYo.com/2015/05/19/148527
১৫. http://goo.gl/XNXA4m
১৬. https://en.wikipedia.org/wiki/Co-production_(media)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন