কাজী মামুন হায়দার
প্রকাশিত ১১ মার্চ ২০২৪ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বৃত্তাবদ্ধ ‘বৃত্তের বাইরে’ : বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের ফাঁদে চলচ্চিত্র গুমরে কাঁদে
কাজী মামুন হায়দার

কারণ জীবনের গরজে যা-কিছু জীবনের,
তাই থাকে শিল্পে
ইতিহাসের ভেতর শব্দরা এখনো ফুরোয়নি,
শব্দরা জ্বলছে ... জ্বলছে ... জ্বলছে ...১
২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি। জার্মানির বিশ্বখ্যাত বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অর্থাৎ ‘গোল্ডেন বিয়ার’-এর জন্য মনোনীত চলচ্চিত্রের নাম ঘোষণায় মঞ্চে আসলেন জুরি বোর্ডের প্রধান। বহুল আকাক্সিক্ষত সেই নাম ঘোষণা হলো¾ট্যাক্সি, পরিচালক ইরানের জাফর পানাহি। পুরো দর্শকসারি করতালিতে ফেটে পড়লো, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলেও মঞ্চে সেই পুরস্কার নিতে কেউ এলো না। মানে, এতো বড়ো অর্জনের পুরস্কার নিতে আসেননি পানাহি।
আসেননি বললে অবশ্য কিছুটা ভুল বলা হবে, আসলে তাকে আসতে দেওয়া হয়নি। অন্যভাবে বললে, জাফর চাইলেও হয়তো আসতে পারতেন না। কারণ নির্মাতা-জাফরের নিজ দেশের বাইরে যাওয়ার অধিকার নেই। কেবল তাই নয়, অধিকার নেই চলচ্চিত্র-নির্মাণেরও। কিন্তু তার পরও কীভাবে যেনো জাফর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন¾দিস ইজ নট অ্যা ফিল্ম, ক্লোজড কার্টেন, ট্যাক্সি।
জাফরের অপরাধ তিনি রাষ্ট্রকে, পুঁজিকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন তার চলচ্চিত্র দিয়ে। যেমন দিয়েছিলেন তুরস্কের ইলমাজ গুনে, আফ্রিকার উসমান সেমবেন কিংবা ভারতের ঋত্বিক কুমার ঘটক। এই জাফর-গুনেদের সংখ্যা কম, কিন্তু জাফর-গুনে-ঋত্বিক হওয়ার ভান করে অনেকে। এদের অনেকের চিৎকার শোনা যায়, কিন্তু সেই চিৎকারে কোনো অনুরণন সৃষ্টি হয় না। ফলে চলচ্চিত্র হয়তো হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জাফর-গুনে-ঋত্বিক সৃষ্টি হয় না!
দেশে দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে। কখনো রাষ্ট্র নিজে, আবার কখনো অদৃশ্য-রাষ্ট্র, মানে পুঁজিপতি-করপোরেটরা এসব ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অবশ্য সাহসী অরুন্ধতী এই কথাগুলো রাখঢাক করে বলেননি; তার ভাষায়,
এই দেশ [ভারত] নরেন্দ্র মোদী নয় আসলে চালাচ্ছেন আম্বানি, টাটার মত বড় বড় শিল্পপতিরা। এই ‘বেনিয়ারাজ’, বড় বড় মিডিয়া হাউস থেকে ছোট ছোট শিল্প, সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। ... ফোর্ড ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য পৃথিবীটাকে পুঁজিবাদের রমরমার জন্য সুরক্ষিত করে তোলা।২
তার পরও সেই রাষ্ট্রে দাঁড়িয়েই অরুন্ধতীর মতো কেউ কেউ এ কথা বলার (২৩ মার্চ ২০১৫ ভারতের গোরখপুরে দশম সিনেমা অব রেসিসটেন্সের প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন) সাহস করেন। যেমনটি করেন, করতেন জাফর, ঋত্বিক কিংবা গুনে। তবে নতুনদের মধ্যে এই আগুনের ফুলকি যাদের মধ্যে দেখা যায়, এদের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত সেই আগুনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। তাই পুড়ে গেছেন। কিন্তু শিল্পের নৈর্ব্যক্তিক অবস্থানের ওপর এই চাপ এখনো আছে, হয়তো থাকবেও।
২.
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ হয় স্বাধীনোত্তর সময়ের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র মসিহ উদ্দিন শাকের ও শেখ নেয়ামত আলীর সূর্য দীঘল বাড়ী। এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। কিন্তু সমস্যার কথা হলো, ভালো ছবি, দেশের বাইরে প্রশংসা পেলেও নিজ দেশে তা দেখানো যায়নি। সূর্য দীঘল বাড়ী নাটোরের একটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার পর ঢাকায় মুক্তি দিতে সময় লেগেছিলো এক বছর। আর হারুন অর রশীদের মেঘের অনেক রং (১৯৭৬) তো মাত্র তিন দিন দেখিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।
এই অনিয়ম, অস্থিরতা মেনে নেয়নি সেই প্রজন্মের চলচ্চিত্রপাগল তরুণেরা। ভাবতে অবাক লাগে, ৮০’র দশকের শুরুতে সামান্য একটা ফিল্ম-অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করা কয়েক তরুণ চলচ্চিত্র-নির্মাণে বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের রিলে রেসের আলোকবর্তিকাটি হাতে তুলে নেন। আগের প্রজন্মের পরিচালকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে এরা ভেবেছিলেন, দর্শক যদি চলচ্চিত্রটা না-ই দেখে, তবে তা নির্মাণ করে লাভ কী? দর্শক হয়তো চলচ্চিত্রটা দেখতে চাচ্ছে; কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে প্রদর্শক ও পরিবেশকরা। তারা ব্যবসায় ন্যূনতম ঝুঁকি নিতে রাজি নন। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নতুন এক সুর¾‘বিকল্পধারা’। এই আন্দোলনের অন্যতম পুরুষ মানজারে হাসীন মুরাদ-এর ভাষায় যার লক্ষ্য ছিলো,
শুরুতে একেবারে ঘোষণা দিয়ে হলেও বিকল্পধারার ছবিগুলোকে দেখে সচেতন দর্শকের মনে হয়েছিল, এই ধারার ছবিগুলো সমাজভাবনা-রাজনৈতিক ভাবনা দ্বারা তাড়িত। সমাজ সচেতন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজ এগুলো এবং তার ফলেই এই ছবিগুলো সমাজমনস্ক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ হতে পেরেছিল। আর এর মধ্য দিয়ে একসময় আমাদের বিকল্পধারার ছবিগুলো হয়ে উঠেছিল বা এই ধারা সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়েছিল কেবল বাণিজ্যিকতাবিরোধী নয়, প্রতিষ্ঠানবিরোধী¾Anti-Establishment.৩
শুরু হলো ১৬ মিলিমিটারে চলচ্চিত্র-নির্মাণের পথ চলা। প্রথম কথা, প্রদর্শন-পরিবেশন নিয়ে কোনো নির্ভরতা নেই, আছে স্বাধীনতা। ইচ্ছেমতো প্রজেক্টর কাঁধে নিয়ে ছুটে চলা। আর ফরম্যাটটি আধা পেশাদারি হলেও নির্মাণব্যয় কম। যদিও দৈর্ঘ্য ও প্রদর্শন পদ্ধতি¾দুটো নিয়েই ঝুঁকি ছিলো; তার পরও নির্মাণ হলো মোরশেদুল ইসলামের আগামী। ইতিহাসের প্রায়োগিক নির্মাণের শুরু। এটা কোনো সাধারণ ইতিহাস নয়, একটা পরিবর্তন, অনেকের ভাষায় একটা ‘বিপ্লবের’ ইতিহাস। যে বিপ্লব পুঁজির বিরুদ্ধে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে!
সেই ৮০’’র দশকের শুরুতে যে আগুন ছিলো, তা ২৯ বছর পরে এসে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে কেনো জানি নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। দাউদাউ করে জ্বলা সেই আগুন এখন তুষের আগুনের মতো অবশিষ্ট নিয়েও টিকে নেই। গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের বৃত্তের বাইরের কপালে সূর্য দীঘল বাড়ী কিংবা মেঘের অনেক রং-এর মতোই ঘটনা ঘটলো, কিন্তু কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করলো না। ‘বিপ্লবী’’দের কেউ একটা প্রতিবাদের আওয়াজ পর্যন্ত তুললো না। অথচ সেই বিপ্লবীদের সবাই তখন বহাল তবিয়তেই ছিলেন! ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার মাত্র একটি সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পেয়ে দুই সপ্তাহ পর হারিয়ে গেলো বৃত্তের বাইরে।
চারটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার, বিভিন্ন উৎসবে প্রশংসিত, অস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনীত বৃত্তের বাইরে আর কেউ দেখতে পেলো না। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লি. তাদের অন্যান্য চলচ্চিত্রের মতো টেলিভিশনে এটার কোনো ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার পর্যন্ত করলো না। বের হলো না সিডি-ডিভিডি, ইন্টারনেট খুঁজেও খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না চলচ্চিত্রটি নিয়ে। নিঃশব্দে হারিয়ে গেলো চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের উৎপাদ বিপ্লবের নির্মিত বৃত্তের বাইরে।
৩.
কী আছে বৃত্তের বাইরেতে¾যে কারণে চলচ্চিত্রটিকে এভাবে অকালে জীবন দিতে হলো! হরিপদ বাঁশুরিয়া পেশায় কুমার। বিধবা মেয়ে, নাতি ও মুসলমান পালক ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। শখের বাঁশিবাদক হরিপদের বাঁশিবাদন নিয়ে এলাকায় নামডাক আছে। তাই নিয়ে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেটা চোখে পড়ে ‘শিল্প-সাহিত্য’’ নিয়ে কাজ করা ঢাকার ‘‘সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’-এর। তারা গ্রামীণ এই প্রতিভাকে সারাদেশের মানুষের কাছে পরিচয় করাতে চায়। তাই হরিপদকে গ্রাম থেকে শহরে নিয়ে আসা হয়।
হরিপদকে নিয়ে চলতে থাকে প্রচার-প্রচারণা, স্পন্সরের খেলা। কিন্তু গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধে সুর তোলা হরিপদ শহরের নিয়ন বাতিতে সুর হারাতে থাকেন। গ্রামের ‘নামহীন-গোত্রহীন’’ হরিপদ যখন শহরের বড়ো বড়ো বিলবোর্ডের উপাদান; তাকে নিয়ে যখন ‘‘বুদ্ধিজীবী’’দের বাংলার সংস্কৃতি খোঁজার প্রতিযোগিতা; অর্থাৎ হরিপদ যখন ‘ব্যবসা’র জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত; তখন মুক্ত বাতাসের আশায় গ্রামে পালিয়ে আসেন তিনি। বিপ্লব ফ্রেমের পর ফ্রেম সাজিয়ে সাধারণ উপস্থাপনায় সংস্কৃতি নিয়ে পুঁজির এই খেলা অসাধারণভাবে তুলে আনলেন বৃত্তের বাইরেতে। কিন্তু সবাইকে দেখাতে পারলেন না।
এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, বৃত্তের বাইরের কাহিনি একেবারেই গৌণ¾এখানে মুখ্য হয়ে আছে বক্তব্য। বলা যায়, বক্তব্যের প্রতিরূপায়ণ ঘটাতে যতটুকু কাহিনির ছাল-বাকল দরকার ততটুকুই চলচ্চিত্রটিতে রেখেছেন বিপ্লব। ফলে এখানে তিনি একই সঙ্গে হাজির হয়েছেন সমাজ-সমীক্ষক ও অঁতর চলচ্চিত্রকার হিসেবে।৪ এছাড়া ‘‘সংস্কৃতি’ সমীক্ষকগণ করপোরেট সংস্কৃতির লুক্কায়িত চেহারা উন্মোচন করেছেন বহু আগেই। বিপ্লবের কৃতিত্ব তিনি সমকালীন বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতায় লুকিয়ে থাকা করপোরেট সংস্কৃতির অন্দরমহলটিকে চলচ্চিত্রকলার সাহায্যে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, অক্ষরকেন্দ্রিক রচনার বদলে।’৫ যেহেতু এটা দৃক মাধ্যম, তাই বিপ্লব বাস্তবের কাছাকাছি গিয়ে বাস্তবকে ছুঁয়েছেন অনেকখানি।
৪.
এটা তো সত্যি যে, গত ৫০ বছরে আমাদের দর্শক, যখন যেখানে যেভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের যে উপাদান পেয়েছে, সেটাকে সেইভাবে আশ্রয় দিয়েছে। এতো দুর্বলভাবে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোকেও আমাদের দর্শক কিন্তু গ্রহণ করেছে। তাহলে সেই দর্শক কেনো ছুটে গেলো? সুস্থ-অসুস্থ ধারার ধুয়া তুলে সুশীল সমাজ যেটা করলো¾যারা (নিম্নবিত্ত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ) এতো বছর ধরে নানাভাবে এই ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রেখেছিলো, তাদেরকে ‘অসুস্থ’ বললো। এটা বলে তারা যেটা করলো, মধ্যবিত্তকে প্রেক্ষাগৃহে ফেরানোর চেষ্টা করলো।
অন্যদিকে বিকল্পধারা বলে যে ধারাটির সৃষ্টি হলো, সেটা বুঝতে গেলেও মধ্যবিত্তের মানসচরিত্র বুঝতে হবে। এই বিকল্প বলতে মধ্যবিত্ত মূলত নিজেকেই সবার আগে বিকল্প ঘোষণা করেছে। তার মানে সেখানে মধ্যবিত্তের গল্প বলার একধরনের চেষ্টা ছিলো, আর সেটাই হয়ে গেলো বিকল্পধারার চলচ্চিত্র। অথবা মধ্যবিত্ত যখন যেভাবে নিম্নবর্গকে রিপ্রেজেন্ট করবে, সেই রিপ্রেজেন্টেশনের মধ্য দিয়ে একটা বিকল্পভাব চলে আসবে। এর সফল উদাহরণ ছিলো সূর্য দীঘল বাড়ী। এই চিন্তা কিন্তু একেবারে পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা। ধরুন, এই বিকল্প বলে যেসব পরিচালক সারা পৃথিবীতে কাজ করেছে, তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন বাদে প্রায় সবাই কিন্তু মূলধারার চলচ্চিত্রেও সফল ছিলেন। যেমন : জাপানের আকিরা কুরোসাওয়া’র কথাই ধরুন, মূলধারার চলচ্চিত্রেও তিনি সফল। আর এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ তো চার্লস চ্যাপলিন। অথচ আমাদের এখানে তা হলো না। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাতারাও বিকল্পই থেকে গেলো, ফলে চলচ্চিত্রটা আর দাঁড়ালো না। দর্শকও থাকলো না।
৫.
‘দেশ’’ এবং ‘‘আনন্দবাজার’’ গোষ্ঠী এককাট্টাভাবে পশ্চিমবাংলার শিল্পসংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ পত্রিকাগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পশ্চিমবাংলার প্রগতিশীল মানুষজন অনেক দিন থেকে অনেক ধরনের অভিযোগ উত্থাপন [করলেও এ] গোষ্ঠীর সাফল্য এ জায়গায় যে তারা পত্রপত্রিকা ইত্যাদির ব্যবসাকে অবলম্বন করে একটা বিশাল পরিমাণ পুঁজি সঞ্চয় করতে পেরেছে। প্রায় পনের বছর ধরে পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্টের বৈরী সরকার ক্ষমতাসীন থাকার পরেও আনন্দবাজারের গায়ে আঁচড়টি লাগেনি। একটু[ও] কমেনি আনন্দবাজারের পুঁজির প্রতাপ। তারা পশ্চিমবাংলার শিল্পসংস্কৃতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে।৬
ছফা কথাগুলো বলার সাহস দেখিয়েছিলেন, সেই ১৭ বছর আগে (এই লেখাটি প্রথম প্রকাশ হয়, ‘‘আজকের কাগজ’’, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪০৫/১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ)। পশ্চিমবঙ্গের মতো একই অবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও গত দেড় দশক পার করছে। আমাদের পুরো বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ যেনো কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি। অবস্থাদৃষ্টে কখনো কখনো মনে হয়, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের মাথা তাদের কাছে বন্ধক রেখেছেন। এই গোষ্ঠীর কেউ টেলিভিশন চ্যানেল চালায়, সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও কৃষির উন্নয়নে তাবেদারি করে। কেউ মাদকের বিরুদ্ধে, অ্যাসিডের বিরুদ্ধে, সব ভালোর সঙ্গে নিজেদের আলো করে যুক্ত রাখে। আবার কেউ পুরো শিল্পকে ‘ফাউন্ডেশন’’ (রূপসজ্জার শুরুতে ফাউন্ডেশন বলে একধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করা হয়, যা ত্বকের রঙ ফর্সা বা উজ্জ্বল করে, দাগ লুকিয়ে রাখে) বানিয়ে প্রত্যেক দিন বিক্রি করেন। আর আমাদের ‘‘নপুংসক বুদ্ধিজীবী’রা তাদের জীবন-যৌবন দিয়ে এগিয়ে নেন এসব গোষ্ঠীর কেরামতি।
এই কথাগুলো বিপ্লব ধারণ করেছিলেন অসাধারণ ন্যারেটিভে তার বৃত্তের বাইরেতে। কিন্তু সবাইকে সেটা দেখাতে পারলেন না। আগেই বলেছিলাম, অনেকে আগুন নিয়ে খেলেছেন, কেউ কেউ আগুন ধরিয়েছেনও, কিন্তু আগুনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। বিপ্লবের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আর যারা ওই তরুণকে ২৯ বছর আগে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার (anti-establishment) তকমা লাগিয়ে কুকুরের মলদ্বারে পেট্রোল লাগিয়ে দেওয়ার মতো করে ছেড়ে দিয়েছিলেন, তারা কেউ একটা বার চিন্তাও করলেন না, এই তরুণের প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার দৌড় কোথায় গিয়ে শেষ হবে।
তাই জীবনের সবটুকু দিয়ে বিপ্লবরা চলচ্চিত্রকে সামনে এগিয়ে নিতে চান। সোয়েটার বানানোর মতো সুতোয় একটা একটা করে বুনন দিতে থাকেন। কারণ তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিলো¾To express our solidarity with the anti fundamentalism and democratic struggle of our people along with the struggle against all forms of social injustice. বলা হয়েছিলো,To preserve the present pro people and progressive characteristic in the making and exhibition of Short films.৭ চলচ্চিত্র দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করবেন, প্রোলেতারিয়েতের মুক্তি আনবেন বলে এই তরুণরা একটা ঘোরের মধ্যে এসব, মানে চলচ্চিত্র সংসদ করেন, ফেডারেশন করেন। নিজেকে প্রতিক্ষণ আইজেনস্টাইন, গদার, ঋত্বিক, তারকোভস্কি মনে করতে থাকেন; শিল্পের স্বাধীনতা খোঁজেন। বৃহৎ অংশের মত প্রতিষ্ঠার জন্য কখনো কখনো জীবন বাজি রাখেন। উদ্ভট জীবন যাপন করেন, রাতভর স্ক্রিপ্ট লেখেন, একে দেখান, ওকে দেখান। একটু ইতিবাচক সমর্থনের জন্য দু-হাতে ফ্রেম বানিয়ে চিত্রনাট্যের চিত্রকল্প মানুষকে টেনে ধরে বসিয়ে শোনান। উদ্দেশ্য থাকে একটাই, স্বপ্নের একটা সেলুলয়েডিয় রূপ দেওয়া।
এদের সবাই যে পারেন, তা নয়। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ খ্যাত মুহম্মদ খসরু নিজেই পারেননি! তাই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে কেবল সম্মাননা স্মারক নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। যাক সেসব কথা, তবে বিপ্লব পেরেছিলেন। স্বপ্নডানায় (২০০৭) তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলো ফিনিক্স পাখি হওয়ার। কিন্তু বৃত্তের বাইরেতে এসে বিপ্লব আর ফিনিক্স পাখি হতে পারলেন না। সেই যে আগুনে পুড়ে গেলেন, আর জন্ম নিলেন না। কারণ বৃত্তের বাইরে যে সত্যি সত্যি প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করেছিলো; ভণ্ডামির মুখোশটা খুলে দিয়েছিলো।
৬.
বিপ্লব কিন্তু তাদের (প্রযোজক-পরিবেশক) কথা নাও শুনতে পারতেন। তিনি বৃত্তের বাইরে আর প্রজেক্টর নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারতেন তারেক মাসুদের মতো সিনেমার ফেরিওয়ালা হয়ে। এতে কিছুটা হলেও খুলে দিতে পারতেন ওদের মুখোশের পাটাতন। চলচ্চিত্র হিসেবে বৃত্তের বাইরের সে ক্ষমতা তো ছিলো। কেবল পর্দা কালো করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শব্দবিহীন বসে থাকা ‘‘আঁতেলিয়’ চলচ্চিত্র ছিলো না বৃত্তের বাইরে। এখানে সাধারণের কথা ছিলো, ছিলো ঢাকা শহরে নিয়ন বাতির তেজে চাঁদের আলো হারিয়ে যাওয়ার কথা।
জাফরকে কিন্তু থামানো যায়নি, তিনি কেকের ভিতরে পেনড্রাইভে করে বার্লিনে পাঠিয়ে ছিলেন তার চলচ্চিত্র। গুণে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে ছিলেন, আর ঋত্বিক তো শেষ দিন পর্যন্ত লড়াইটা করে গেলেন। যেমনটা ৮০’’র দশকের সামান্য ফিল্ম-অ্যাপ্রিসিয়েশন করা তরুণরাও পেরেছিলো, ১৬ মিলিমিটার ক্যামেরা আর প্রজেক্টর দিয়ে। দেখিয়েছিলো আগামী, হুলিয়ার তেজ। বিপ্লব কেনো জানি পারলেন না! কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের ভাষায়,‘ ‘... শিল্পীরা পৃথিবীর কোন দেশে খুব একটা আনন্দে খেয়েছে আর থেকেছে এমনটা কেউ দেখাতে পারবেন! মদিলিয়ানির মতো শিল্পী একটা ব্রেডরোল খাবার জন্য ক্যাফেতে বসে সাদা কাপড়ে ছবি এঁকে দিতেন। সেই ছবিগুলি পরে কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে।’’৮ অথচ বিপ্লব যে কী ভাবলেন ঠিক বোঝা গেলো না!
৭.
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে প্রেক্ষাগৃহ থেকে ড্রয়িংরুমে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে উপরের আলোচিত ওই তিন গোষ্ঠীর একটি। যদিও স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদৌলতে সেই ৯০ দশকের শেষের দিক থেকেই ড্রয়িংরুমে চলচ্চিত্র দেখা শুরু হয়েছে। তবে সেটা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার ছিলো না। এই গোষ্ঠী টেলিভিশনে চলচ্চিত্রের ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার শুরু করলো, চলচ্চিত্রের উন্নয়ন করবে বলে। ‘‘যাদের কোনো ছবি পুরো সপ্তাহ কোনো জেলাশহরের সিনেমা হলে পর্যন্ত চলে না! তারা প্রত্যেক ঘরে ঘরে সিনেমা রিলিজ দিয়ে জোর গলায় চিৎকার করছেন, আমরাই সিনেমাকে বাঁচিয়ে রেখেছি’৯ বলে। তাদের এই কথায় নাচুনিবুড়ি মধ্যবিত্ত সেই মজে গেলো। তাদের আনন্দ একটাই, ড্রয়িংরুমের সোফায় হেলান দিয়ে চা খেতে খেতে চলচ্চিত্র দেখবেন।
তারা চলচ্চিত্র দেখা শুরু করলেন ঠিকই, কিন্তু তা চা-নাস্তাতেই কেবল শেষ হলো না, বিজ্ঞাপনের কল্যাণে রাতের খাবার পর্যন্ত গড়ালো। মধ্যবিত্ত অবশ্য তাতেও খুশি, যাক ‘চলচ্চিত্র’ অন্তত তাদের কথা বলছে তো; সেটা চলচ্চিত্র হোক আর না-ই হোক, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাদের শুকরিয়া এই নিয়ে যে, অন্তত মুনমুন-ময়ূরীর ‘‘অশ্লীল’’ শরীর তাদের দেখতে হচ্ছে না। আর এদিকে তাদের (মধ্যবিত্ত ও প্রযোজনা সংস্থা) এই আনন্দে বন্ধ হতে থাকলো একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ। তবে কেবল তাদের কারণেই প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়েছে¾এমন দায় পুরোটা তাদের দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না। কিন্তু তারা চলচ্চিত্রের উন্নয়নের কথা বলে অবনতির এ দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার একনিষ্ঠ কর্মী বিপ্লব শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর সেই প্রতিষ্ঠানের কাছেই যান। কারণ সেই প্রতিষ্ঠান তাকে স্বপ্ন দেখায় প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার। বিপ্লব স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে ফেলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন যে প্রতিষ্ঠানের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে হাজির হবে, প্রতিষ্ঠান তা বুঝে উঠতে পারে না। আর যখনই বুঝে ওঠে, তখনই সে তার establishment চরিত্র নিয়ে হাজির হয়ে বিপ্লবের স্বপ্নকে মাটিতে গুঁড়িয়ে দেয়। অসহায় বিপ্লব তা কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন! আর বিপ্লবের স্বপ্নদাতা ৮০’’র দশকের সেই চলচ্চিত্রিক মহান পুরুষরা কৌশলে ফাঁকা জায়গায় দু-হাঁটুর মাঝখানে মুখ লুকিয়ে ‘প্রাকৃতিক বড়ো কাজ’টি করার মতো বলতে থাকেন, ‘‘নিশ্চয়ই আমাকে কেউ দেখছে না!’
৮.
লগ্নি ফেরত নিয়েও কেনো জানি কোনো কথা বলে না বৃত্তের বাইরের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লি.। প্রেক্ষাগৃহে তো দেখালোই না, বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে টেলিভিশনেও চলচ্চিত্রটি দেখানোর প্রয়োজন তারা মনে করলো না। তাহলে এই পুঁজি ফেরত আসলো কী দিয়ে? পুঁজির যে বৈশিষ্ট্য তাতে সে বিনিয়োগ হবে অথচ বাধা পেয়ে ফেরত আসবে না¾এমন ভাবা প্রায় অসম্ভব। অবশ্য বিপ্লব বৃত্তের বাইরেতে এই পুঁজি ফেরতের কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। চলচ্চিত্রটিতে সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আদিবাসীদের নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ভূমিমন্ত্রী উদ্বোধন করেন প্রদর্শনীটি। প্রদর্শনী উদ্বোধনের গণমাধ্যম কাভারেজ নিয়ে সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের পরিচালকের সঙ্গে এক্সিকিউটিভের যে কথোপকথন চলে তা অনেকটা এ রকম¾
এক্সিকিউটিভ : এই অনুষ্ঠানের চিফ গেস্ট সিলেকশনটা প্রোপার হয়নি স্যার¾ইনফরমেশন, কালচার কিংবা ফরেন মিনিস্টার হলে পাবলিসিটিটা আরো বেশি ভালো হতো।
পরিচালক : তাই?
এক্সিকিউটিভ : আমার তাই মনে হয়।
পরিচালক : টঙ্গীতে আমাদের পোলট্রি ফার্মে কয় বিঘা সরকারি জমি বরাদ্দ আছে জানো? ছয় বিঘা। এবং দখলে আছে কতো বিঘা সেটা জানো?
এক্সিকিউটিভ : নাহ্!
পরিচালক : ২২ বিঘা।
এই আলোচনা থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না বৃত্তের বাইরের ‘সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’ ঠিক কী জন্য, কীভাবে শিল্পের এই পূজা করে। আমি জানি না একইভাবে হয়তো অনেকেরই পুঁজি ফেরতের হিসাব পাওয়া যাবে। মহামতি গুন্টার গ্রাস তো বলেই গেছেন, ‘শিল্প হচ্ছে আপসহীন এবং জীবন হচ্ছে সম্পূর্ণ আপসের।১০ তাই জীবনের প্রয়োজনে শিল্পের জন্য একটু আপোস করলে ক্ষতি কী!
৯.
আবার গুন্টার গ্রাসে ফিরে যাচ্ছি, ‘‘জীবন হচ্ছে সম্পূর্ণ আপসের’’; আসলেই তো তাই। আগেই বলেছি তিন প্রতিষ্ঠানের একটি শিল্পকে ‘ফাউন্ডেশন’ বানিয়ে বিক্রি করছে। চিত্রকলা, সঙ্গীতের পর তারা এখন মাঠে নেমেছে যৌথ শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্র নিয়ে। উদ্দেশ্য, দেশের নবীন চলচ্চিত্রনির্মাতাদের মেধাকে পুঁজি করে প্রেক্ষাগৃহবিমুখ দর্শককে আবারও প্রেক্ষাগৃহে ফেরানো। আর সেই লক্ষ্যে পাঁচ তরুণ নির্মাতাকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র-নির্মাণে তারা সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে।
একটু খেয়াল করুন, এই প্রকল্পে নির্মাতা বিপ্লব ও তার বৃত্তের বাইরেকে দেখতে পান কি না? এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে শিল্পমান সম্পন্ন ও সুস্থ বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে ‘‘বেঙ্গল চলচ্চিত্র উন্নয়ন ফোরাম’’ সারাদেশের চলচ্চিত্রনির্মাতাদের চিত্রনাট্য জমা দেওয়ার আহ্বান জানায়। প্রকল্পের উপদেষ্টাদের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে ‘অনন্য মৌলিক ভাবনা ও চলচ্চিত্রিক সম্ভাবনার’’ ভিত্তিতে একশো ২৬টি চিত্রনাট্য থেকে পাঁচটি চিত্রনাট্য চূড়ান্ত হয়।১১
২০১৫’’র ২ মার্চ সন্ধ্যায় এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। মন্ত্রী নিজে এই পাঁচ নির্মাতার নাম ঘোষণা করেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল চলচ্চিত্র উন্নয়ন ফোরাম-এর আহ্বায়ক আবুল খায়ের, চেয়ারপারসন লুভা নাহিদ চৌধুরী, প্রকল্প উপদেষ্টা মানজারে হাসীন মুরাদ, প্রকল্প সমন্বয়ক এন রাশেদ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক নবনীতা চৌধুরী, বিকল্পধারার নির্মাতা ও চলচ্চিত্র সংসদকর্মী মোরশেদুল ইসলাম।
বেঙ্গলের মুখপাত্রের ভাষায়, ‘‘এই প্রকল্পের ইতিবাচক দিক ছিল, দেশের প্রতিটি এলাকা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাড়া পেয়েছি আমরা। তরুণ নির্মাতারা চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবছেন, চিত্রনাট্য নিয়ে নিরীক্ষা করছেন। আমরা প্রচুর আগ্রহী নির্মাতার সন্ধান পেয়েছি, এটা আমাদের প্রকল্পের সার্থকতা।’ এই প্রকল্পের চূড়ান্ত চিত্রনাট্য ও চলচ্চিত্রের প্রস্তাব নির্বাচনে জুরি বোর্ডের সদস্য ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, মানজারে হাসীন মুরাদ, মোরশেদুল ইসলাম, নুরুল আলম আতিক ও সাজ্জাদ শরীফ।
বেঙ্গলকে নিয়ে তৈরি এই প্রতিবেদন থেকে যদি key term গুলো বের করা যায়, তাহলে কী দাঁড়ায় একটু দেখা যাক¾প্রকল্প, সারাদেশের চলচ্চিত্রনির্মাতা, অনন্য মৌলিক ভাবনা, নির্মাতার সন্ধান, শিল্পমান সম্পন্ন ও সুস্থ বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র ও প্রধান অতিথি তথ্যমন্ত্রী। এখন বৃত্তের বাইরের সঙ্গে আরেকবার মিলিয়ে দেখুন। এ নিয়ে আর কিছু লিখতে চাই না, কিংবা লেখার প্রয়োজন মনে করছি না।
১০.
বেঙ্গলের সেই অনুষ্ঠানে আমাদের চলচ্চিত্রের বাঘা বাঘা ব্যক্তিরা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। প্রমাণ করেছেন শিল্পের প্রতি, চলচ্চিত্রের প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা।
ছবি বেঙ্গল
যে মানুষগুলো একসময় লড়াই করেছিলেন পুঁজির বিরুদ্ধে, anti-establishment বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলেছিলেন¾সেই মানুষগুলো এখন কেমন জানি ম্যাদনা হয়ে গেছেন। অবশ্য ততদিনে অনেকে চলচ্চিত্র ছেড়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বড়ো কর্তা বনে গেছেন। কিংবা কেউ হয়তো চলচ্চিত্র দিয়ে কিছু হবে না¾এমনটি ভেবে ফরমায়েশি কাজ করছেন। আর অল্প কয়েকজন মেনে নিতে না পেরে নিজেকে তুলে নিয়ে হারিয়ে গেছেন। তবে একটা বড়ো অংশ এখনো সক্রিয় আছেন, টিকে আছেন; একেই হয়তো বলে স্বার্থগত সঞ্চালন। পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেওয়া, আপস করা। অনেকটা আপনার বিচিতে আঘাত লেগেছে, আপনি সঙ্গে সঙ্গে তার আশপাশে নেই। আপনার বিচি নিরাপদ তো আপনার দৌড়-ঝাঁপ দেখে কে!
১১.
আমাদের আলসারের ব্যাথা দিন দিন অসহ্য হয়ে উঠছে। স্ফীতোদের সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদকে শ্লেষ আর বিদ্রুপে বিদ্ধ করে এই ব্যথাকে চিরে চিরে দেখার মতো সময় শেষ হয়ে এসেছে, সেই বিলাসিতা আমাদের পোষায় না। পুঁজিবাদের গতর রোজই একটু একটু করে মোটা হচ্ছে, উপমহাদেশের বিভিন্ন পয়েন্টে [বিভিন্ন রাষ্ট্রে পুঁজিবাদের মদদপুষ্ট সরকার] মোতায়েন তাদের নপুংসক ও পঙ্গু কুকুরগুলোর দাঁতের ধারও বাড়ছে। অবস্থা এমন যে, এদের কামড়ে আলসার-ভোগা মানুষের জলাতঙ্ক হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তাদের হাত থেকে অস্ত্র নিয়ে তাদের দিকে তাক করতে না পারলে আমাদের আলসার ও সম্ভাব্য জলাতঙ্ক থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নেই।১২
কথাগুলো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের; এই কথাসাহিত্যিক লিখেছেন মাত্র দুইটা উপন্যাস, গোটা তিরিশেক ছোটোগল্প আর কিছু প্রবন্ধ। তাকে নিয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি আগুন নিয়ে খেলেছেন, আগুনের ওপর নিয়ন্ত্রণও রেখেছেন। তাকে গুনে, ঋত্বিক, পানাহির সাহিত্যিক-বন্ধু বলা যায় সহজে। তাই ইলিয়াস জলাতঙ্কের হাত থেকে বাঁচতে অস্ত্র নিয়ে দাঁতে ধারওয়ালা কুকুরদের মারার কথা বলেছেন; পালিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়ার কথা বলেননি।
বিপ্লব এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, তিনি আদর্শের সঙ্গে আপস করবেন না। গতানুগতিক ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন না। তার ভাষায়, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য পুঁজির অভাব হয় না, কিন্তু এই ধরনের অফট্রাকের চলচ্চিত্র নির্মাণে অনেক সময়ই ঝুঁকির সম্ভাবনা থাকে। তারপরও আমি পিছিয়ে যাবো না। আমি জানি না, বিপ্লব পিছিয়ে গেছেন কি না; তবে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের পর বিপ্লব আজ পর্যন্ত কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেননি কিংবা করেননি। এর কারণ আমাদের জানা নেই, কিন্তু আমরা এটা জানি যে, বন্দি পানাহি চলচ্চিত্র বানিয়েছেন, একের পর এক ফ্লপ চলচ্চিত্রের পরও ঋত্বিক বানিয়েছিলেন। এখন আপনারাই বলুন, বিপ্লবের কী করা উচিত।
লেখক : কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।
তথ্যসূত্র
১. ‘ফ্রান্সিস মার্তিগা’র কবিতাটি অনুবাদ করেছেন আসফার হোসেন। বাংলায় শিরোনাম ‘‘রাজনীতিবিমুখ রাজনৈতিক নন্দনতত্ত্বের উদ্দেশ্যে’।
৩. মুরাদ, মানজারে হাসীন; ‘বিকল্পধারা চলচ্চিত্র আন্দোলনের দুই দশক: একটি মূল্যায়ন’; অন্যছবি (শর্ট ফিল্ম ফোরাম-এর চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা); সম্পাদনা : আকরাম খান; বর্ষ ১১, সংখ্যা ১, সেপ্টেম্বর ২০০৪, পৃ. ৫, শাহবাগ, ঢাকা।
৪. আউয়াল, সাজেদুল (২০১০ : ১৩৫); ‘‘বৃত্তের বাইরে : অনতিক্রান্ত বৃত্তের চলচ্ছবি’; চলচ্চিত্রকলা; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
৫. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১০ : ১৩৬)।
৬. ছফা, আহমদ; ‘‘বিষয় গ্রন্থ : পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার আনন্দবাজার গোষ্ঠী’; আলোকিত বাংলাদেশ-এর শুক্রবারের ক্রোড়পত্র ‘আলোকিত বাংলাদেশ’ : শুক্রবার’, ৩০ মে ২০১৪।
৭. প্রাগুক্ত; মুরাদ, মানজারে হাসীন (২০০৪ : ১৪)।
৮. http://www.istishon.com/node/10430
৯. https://bangla.bdnews24.com/blog/goonjohnr/163217
১০. গুন্টার গ্রাস [১৯২৭-২০১৫]; সমকাল-এর শুক্রবারের সাহিত্য ক্রোড়পত্র ‘কালের খেয়া’, ১৭ এপ্রিল ২০১৫।
১১. http://bangla.bdnews24.com/glitz/article932894.bdnews
১২. ইলিয়াস, আখতারুজ্জামান; ‘‘গুন্টার গ্রাস এবং আমাদের গ্যাস্ট্রিক আলসার’; সমকাল-এর শুক্রবারের ক্রোড়পত্র ‘‘কালের খেয়া’, ১৭ এপ্রিল ২০১৫।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন