মাহামুদ সেতু
প্রকাশিত ২২ আগস্ট ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পুঁজির বানে ভাটির টানে এ কেমন বলিউড!
মাহামুদ সেতু

প্রসঙ্গ বলিউড
বলিউড; বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং ভারতের প্রধান চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। ফি বছর এখানে গড়ে একশো ৫০টির উপর চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। বাজার মূল্যে যেগুলোর দর হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যায়। জয়জয়কারের এই গল্প মেলে ধরতে গণমাধ্যম যারপরনাই ব্যস্ত। আমরা দেখি, প্রত্যেক বছরই কোনো না কোনো চলচ্চিত্র ব্লকবাস্টার, সুপারহিট, হিট তকমা পাচ্ছে। আলাদাভাবে খোলা হচ্ছে শত কোটি, দুইশো কোটি, পাঁচশো কোটির ক্লাব। যে চলচ্চিত্র যতোশো কোটি রুপি আয় করে সেগুলো সেই ক্লাবে ‘আসন’ পায়। কিন্তু এ ধরনের আসনে প্রতিবছর কয়টি চলচ্চিত্র উপবিষ্ট হয়?
প্রতিবছর মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা যদি (অন্তত) একশো ৫০টিও ধরি, তার পরও এর এক-দশমাংশ অর্থাৎ ১৫টি চলচ্চিত্রও কিন্তু উপরিউক্ত কোনো ক্লাবের সদস্যপদ পায় না। ক্লাবের হিসাব বাদ দিই। কারণ সব চলচ্চিত্রই তো শত কোটি আয় করবে না, বড়োজোর লাভসহ মূলধন তুলে আনবে। অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে পুঁজি সবসময় বাড়ে, সেটা বাদ দিলেও ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে চলচ্চিত্রকে অন্তত পুঁজি তো ফেরত আনতে হবে। তারপর কোনোটি যদি শত-পাঁচশত কোটি আয় করে, সেটা উপরি। তবে বলিউডের বেলায় লাভ দূরে থাক, শুধু মূলধন তুলে আনতে পারছে এমন চলচ্চিত্রের সংখ্যাও কিন্তু খুবই কম।
বলিউড বক্স অফিসের ওয়েবসাইট (www.boxofficeindia.com) ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিবছর মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের মাত্র এক-চতুর্থাংশ লাভসহ মূলধন ফেরত আনতে পেরেছে। বাকিগুলো মূলধন তো তুলতেই পারেনি বরং একেবারে ‘বিধ্বস্ত’ (বক্স অফিসের ভাষায় ডিজাস্টার—যার অর্থ চলচ্চিত্রটির নির্মাণ ব্যয়ের অর্ধেকও ওঠেনি) অবস্থায় পড়েছে। ২০১৪ সাল শেষ না হওয়ায় (লেখা চলাকালে) ‘২০১১—১৩ সাল পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের একটি তালিকা’১ পেশ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
|
বছর |
সর্বকালের সেরা ব্লকবাস্টার |
ব্লকবাস্টার |
সুপারহিট |
হিট |
সেমিহিট |
অ্যাভারেজ |
অ্যাভারেজেরনীচে |
ফ্লপ |
বিধ্বস্ত |
মোট |
|
২০১৩ |
১ |
৪ |
২ |
৫ |
৫ |
৪ |
৭ |
৩৫ |
১২১ |
১৮৪ |
|
২০১২ |
০ |
৩ |
৫ |
৭ |
৯ |
৩ |
৩ |
১৬ |
১১৯ |
১৬৫ |
|
২০১১ |
০ |
২ |
৩ |
৮ |
৩ |
৪ |
৫ |
২০ |
১১৪ |
১৫৯ |
গণিতের হিসাবে, বলিউডে ২০১৩ সালে ৮৪.৭৯ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮১.৮২ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ৮৪.২৮ শতাংশ চলচ্চিত্রই ব্যর্থ। যার মধ্যে আবার ২০১৩-তে ৬৫.৭৭ শতাংশ, ২০১২-তে ৭২.১৩ শতাংশ এবং ২০১১-তে ৭১.৭০ শতাংশ চলচ্চিত্র তাদের মূলধনের অর্ধেকও তুলতে পারেনি। অর্থাৎ, বিধ্বস্ত চলচ্চিত্রের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে বলিউড। তাহলে এ রকম ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও বলিউডকে নিয়ে গণমাধ্যমের এতো আওয়াজের উৎস কী? আওয়াজ বলতে বোঝাচ্ছি বলিউডের জয়জয়কার, বিশ্বের অন্যতম বড়ো ইন্ডাস্ট্রির তকমা দেওয়া—এসব আর কি।
যাহোক ‘বিধ্বস্ত চলচ্চিত্রের’ এতো বড়ো সংখ্যা আসলেই আশ্চর্যজনক। সাধারণত ফ্লপ হওয়া মানেই চলচ্চিত্রের মূলধন ফেরত আনতে না পারা। সেক্ষেত্রে বিধ্বস্ত হলে তার কী অবস্থা হয় সেটা তো পাঠক বুঝতেই পারছেন! আর সংখ্যার হিসাবে বলিউডের বার্ষিক খতিয়ানে তো সেই বিধ্বস্ত চলচ্চিত্রেরই জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে। তাহলে এই ইন্ডাস্ট্রির জয়রথ ছুটছে কীসের উপর চড়ে, ৮—১০টি ‘অতিসফল’ চলচ্চিত্রের ঘাড়ে করে? কিন্তু এভাবে একটি ইন্ডাস্ট্রি কতোদিন চলতে পারে? এমন হতে থাকলে তো নতুন নির্মাতা-প্রযোজক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, চলচ্চিত্র-নির্মাণ সংখ্যা কমে আসবে। কিন্তু আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, বলিউডে এমনটিও হচ্ছে না। বরং বিধ্বস্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র-নির্মাণও বেড়েই চলেছে। তাহলে কি এই ইন্ডাস্ট্রি ‘পুঁজি’র স্বাভাবিক নিয়ম মেনে প্রসারিত হচ্ছে না?
সেক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো চলে আসে, সেগুলো হলো—সফল হচ্ছে কোন চলচ্চিত্রগুলো, সেগুলোর গল্প কেমন, কলাকুশলী, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, নির্মাতা কারা? বিপরীতে ব্যর্থ চলচ্চিত্রের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের উদ্দেশ্যই বা কী? চলচ্চিত্র ব্যর্থ হলেও তারা নির্মাণ করা থামিয়ে দেননি কেনো—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা থাকবে এই প্রবন্ধে।
‘মানি মেকস্ মানি’
বলিউডে ২০১১—১৩ পর্যন্ত তিন বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত পাঁচশো আটটি চলচ্চিত্রের মধ্যে ব্লকবাস্টার, সুপারহিট ও হিট—এই তিন শ্রেণিতে মাত্র ৪০টি চলচ্চিত্র স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে পাঁচশো কোটি রুপি আয় করে সর্বকালের সেরা ব্লকবাস্টার হয়েছে ২০১৩ সালের ধুম : থ্রি। আর ওই বছর ব্লকবাস্টার হয়েছে চেন্নাই এক্সপ্রেস, কৃষ থ্রি, ইয়ে জওয়ানি হে দিওয়ানি ও আশিকি টু; সুপারহিট হয়েছে গ্রান্ড মাস্তি ও ভাগ মিলখা ভাগ; হিট হয়েছে রাম-লীলা, রনঝনা, শুদ্ধ দেশি রোমান্স, চশমে বাদ্দুর ও জলি এল এল বি। একইভাবে ২০১২ সালে ব্লকবাস্টার হয়েছে এক থা টাইগার, দাবাং টু ও রাউডি রাঠোর; সুপারহিট হয়েছে অগ্নিপথ, হাউজফুল টু, বারফি!, ওহ মাই গড! ও রাজ থ্রি; হিট হয়েছে ককটেল, যাব তাক হে জান, বোল বচ্চন, সান অব সরদার, কাহানি, ইশক্জাদে ও ভিকি ডোনার।
অন্যদিকে ২০১১ সালে ব্লকবাস্টার হয়েছে রেডি ও বডিগার্ড; সুপারহিট হয়েছে মার্ডার টু, সিংহাম ও দ্য ডার্টি পিকচার; হিট হয়েছে রা. ওয়ান, ডন টু, জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা, ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা, মেরে ব্রাদার কি দুলহান, দিল্লি বেলি, তানু ওয়েডস্ মানু ও হন্টেড থ্রিডি। মোটাদাগে এই চলচ্চিত্রগুলোর নাম আমাদের দেশীয় বলিউডি দর্শকদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। প্রায় সকল বলিউডি দর্শকই হয়তো এই চলচ্চিত্রগুলো দেখে থাকবেন।
স্বাভাবিকভাবে চলচ্চিত্রগুলো মুক্তির আগেই আমরা সেগুলোর নাম শুধু শুনিই না বরং আত্মস্থ করে ফেলি। এগুলো দেখার জন্যও জনগণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু এর বিপরীতে আরেকটি বাস্তবতা আছে। সেটি হচ্ছে, এইগুলোর বাইরে আর কতোগুলো চলচ্চিত্রের নাম আপনি জানেন? আগেই বলেছি, গত তিন বছরে চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে পাঁচশো আটটি। ধরে নিলাম, আমি বা আপনি বড়োজোর ৫০টির নাম বলতে পারবো। তাহলে বাকি সাড়ে চারশো চলচ্চিত্রের জন্য কি প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়নি? যদি সেটি না করা হয়, তাহলে কেনো করা হলো না? দর্শক যদি চলচ্চিত্রের নামই না জানে, তাহলে সেগুলো নির্মাণ করে লাভ কী? তবে কেউ বলতে পারেন—বাংলাদেশে তো প্রচার চালায় না। তাই এ নিয়ে তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে। কথা ঠিক। তবে বাংলাদেশের মানুষ যে পরিমাণে ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখে সে পরিমাণে দেশীয় চ্যানেলও দেখে না। তাছাড়া বাংলাদেশের গণমাধ্যমও বলিউডকে যথেষ্ট ‘কাভারেজ’ দেয়। ফলে এই দিক থেকে হিসাব করলেও বাংলাদেশি দর্শকের এ সম্পর্কে জানার কথা। তার ওপর ইন্টারনেট-মশাই তো আছেনই।
আবার ওই গণমাধ্যমের কাভারেজ পাওয়া বড়ো বড়ো তারকা অভিনয়শিল্পীরাই কিন্তু এসব সফল চলচ্চিত্রের ‘প্রাণ’। ওই চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম সফল চারটি করে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন তারকা অভিনেতা শাহরুখ খান ও সালমান খান। বাকিগুলোর মধ্যে অজয় দেবগন, অক্ষয় কুমার ও হৃত্বিক রোশন তিনটি করে চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। রণবীর কাপুর, ইমরান খান, ইমরান হাশমি ও বিদ্যা বালান দুটি করে এবং আমির খান, বিবেক ওবেরয়, সাইফ আলি খান ও রণবীর সিং একটি করে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে ছিলেন। এছাড়া ধর্মেন্দ্র ও তার পুত্রদ্বয়-সানি ও ববি দেওল একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। অবশিষ্টগুলোর মধ্যে হন্টেড থ্রিডি (২০১১), তানু ওয়েডস্ মানু (২০১১), ভিকি ডোনার (২০১২), জলি এল এল বি (২০১৩), চশমে বাদ্দুর (২০১৩), রনঝনা (২০১৩), ভাগ মিলখা ভাগ (২০১৩), শুদ্ধ দেশি রোমান্স (২০১৩), আশিকি টু (২০১৩) ও ইশকজাদেতে (২০১২) হয় একবারে নবীন, না-হয় অপরিচিত জুটি কাজ করেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ সফল চলচ্চিত্রে ‘সফল’ অভিনয়শিল্পীদেরই পুনরাবৃত্তি রয়েছে। অবশ্য গোটা দশেক চলচ্চিত্রে নতুনদের অংশগ্রহণ থাকলেও সেগুলো বড়ো ব্যানারে নির্মিত, তাই প্রসঙ্গ ভিন্ন। অর্থাৎ, প্রথম অনুসিদ্ধান্ত—বড়ো তারকারা চলচ্চিত্রের সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তাহলে প্রশ্ন, নয় কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত আশিকি টু (২০১৩) একশো ১০ কোটি রুপি আয় করে ব্লকবাস্টার হলো কীভাবে? কারণ এখানে তো তারকা নেই। সেক্ষেত্রে এখানে কোন ‘ফ্যাক্টর’ কাজ করেছে? মূলত বলিউডের বড়ো একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, ভাট ভাইদের—মহেশ ভাট ও মুকেশ ভাট— ‘বিশেষ ফিল্মস্’-এর ব্যানারে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। আর বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বলেই তারা নয় কোটি রুপির চলচ্চিত্রের প্রচারে সাত কোটি রুপি খরচ করতে পারে।২ যার ফল, আশিকি টুর প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ৭৫ কোটি রুপি আয়। এর মধ্যে টিভি স্বত্ব থেকে ২২ কোটি, হোম ভিডিও স্বত্ব থেকে পাঁচ কোটি এবং গানের স্বত্ব থেকে পাঁচ কোটি রুপি আয় করে। আর প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন থেকে আয় করে ২৮ কোটি রুপি। এ থেকে বোঝা যায়, ‘বিশেষ ফিল্মস’ বিশেষ কোনো চলচ্চিত্র না বানালেও বিপণনটা বিশেষ ভালো করেই বোঝে। যার ফল হয় সুপারহিট, এমনকি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের আগেই লাভ ঘরে তুলে। অর্থাৎ দ্বিতীয় অনুসিদ্ধান্ত, বলিউডে কোনো চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন না করেও ব্যবসাসফল হতে পারে!
আশিকি টুর ব্যবসাসফল হওয়া কিংবা বিপণনের আরেকটি বড়ো দিক এর সঙ্গীত। এর ট্রেইলার মুক্তি দেওয়ার আগেই গানগুলো বাজারে ছাড়া হয়; সেগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পায়। ফলে চলচ্চিত্রটির প্রচারে এটি বিরাট ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র মনপুরার কথা মনে পড়ে। ওই চলচ্চিত্রটিও আগে গান বাজারে ছেড়ে প্রচার চালায়। এই প্রচারের গুণেই এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মনপুরা চার কোটি টাকা আয় করে।৩ যদিও এর বাইরে অন্যান্য কারণও ছিলো। তার পরও সুনির্দিষ্ট বিপণন কৌশল সাজালে যেকোনো চলচ্চিত্র সফল হতে পারে—এটা সব নির্মাতা-প্রযোজকদের বুঝতে হবে। যাহোক, আশিকি টুর গানগুলো যথেষ্ট শ্রুতিমধুরও ছিলো। চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত পরিচালক ও শিল্পীদের ফিল্ম ফেয়ার, স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় পুরস্কার অর্জন থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এভাবে প্রতিটি চলচ্চিত্রেই কোনো না কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিপণন কৌশল সাজানো হয়।
২০১২ সালে আট কোটি রুপি ব্যয়ে কাহানি নির্মাণ হয়। এটি একশো চার কোটি রুপি আয় করে সুপারহিট হয়। এতে অভিনয় করে বর্ষসেরা অভিনেত্রী হন বিদ্যা বালান। বিদ্যার আগের চলচ্চিত্র দ্য ডার্টি পিকচারও সুপারহিট হয়, সঙ্গে বিদ্যা নিজেও! চলচ্চিত্রটি অবশ্য এ-রেটেড (১৮ বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের জন্য) অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছিলো। এখানে মজার ব্যাপার হলো, কাহানির নির্মাণ আগেই শেষ হয়েছিলো। তবে সেটিকে দ্য ডার্টি পিকচার-এর পরে মুক্তি দেওয়া হয়। এর পিছনেও ছিলো ওই নির্দিষ্ট বিপণন কৌশল।
পরিবেশকদের যুক্তি ছিলো কাহানির গর্ভবতী চরিত্রে বিদ্যাকে দেখার পর দ্য ডার্টি পিকচার-এ তার যৌন সুড়সুড়িমূলক অভিনয় দর্শকদের পছন্দ হবে না।৪ অন্যদিকে নারীনির্ভর গল্প হওয়ায় কাহানিকে ২০১২-তে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পরের দিনই মুক্তি দেওয়া হয়। আবার চলচ্চিত্রটির নির্মাণ ব্যয়ের পুরোটাই অর্থাৎ আট কোটি রুপিতে এর টিভি স্বত্ব কিনে নেয় ‘স্টার টিভি’, যেটা আবার বলিউডি কোনো নারীনির্ভর চলচ্চিত্রের জন্য সর্বোচ্চ। ফলে চ্যানেলটি নিঃসন্দেহে কাহানির প্রচার সেভাবেই চালায়, যাতে সর্বাধিক দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে নিতে পারে। আর নারীনির্ভর হওয়ায় গণমাধ্যমে চলচ্চিত্রটির প্রচার হয়তো দর্শকদের সহানুভূতি পেতে সমর্থ হয়। অবশ্য সহানুভূতি না পেলেও, বিদ্যাকে নিয়ে গণমাধ্যমের উচ্চবাচ্য যে দর্শকদের আগ্রহকে তুঙ্গে তুলে দেয়, তার প্রমাণ চলচ্চিত্রটির ব্যবসা সফলতা। আবার এ সবকিছুই অর্থাৎ, বিদ্যার প্রতি মানুষের আগ্রহ কিংবা চলচ্চিত্রটি নিয়ে আগ্রহ তৈরির পিছনে ভূমিকা কিন্তু প্রযোজক-পরিবেশকদের টনটনে ব্যবসায়িক জ্ঞান, মানে হিসাব করে চলচ্চিত্র মুক্তির তারিখ নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া আর কি। অর্থাৎ তৃতীয় অনুসিদ্ধান্ত, অন্য যেকোনো পণ্যের মতো সুনির্দিষ্ট বিপণন কৌশল ঠিক করে চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণা চালালে সেটিও সফল হয়।
আবার এ-রেটেড হিসেবে সর্বোচ্চ আয় করা গ্রান্ড মাস্তিতেও তেমন বড়ো মাপের কোনো তারকা নেই। এটিও সুপারহিট। অবশ্য চলচ্চিত্রটিতে থাকা যৌন সুড়সুড়ি দর্শক টানতে হয়তো সহায়ক হয়েছে; অনেকটা দ্য ডার্টি পিকচার-এর মতো। যদিও এই চলচ্চিত্রগুলোতে গল্পের প্রয়োজনে যৌনতা এসেছে, নাকি ব্যবসার প্রয়োজনে—তা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
অন্যদিকে রনঝনাতেও কোনো তারকা অভিনয়শিল্পী নেই। তবে এর প্রযোজক ‘ইরোস ইন্টারন্যাশনাল’, বিশ্বের ৫০টি দেশে যার নেটওয়ার্ক রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, অন্য যেকোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো এই প্রতিষ্ঠানটিও কোনো লস্ প্রজেক্টে বিনিয়োগ করবে না। একইভাবে হিট হওয়া জলি এল এল বির প্রযোজক ‘ফক্স স্টার স্টুডিও’। এটি আবার ‘মিডিয়া মুঘল’ রুপার্ট মারডকের প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রেও আগের কথাই প্রযোজ্য। ব্যবসায় ‘ধরা খাওয়া’ তাদেরও কাজ না। এই চলচ্চিত্রগুলোর ক্ষেত্রে অভিনেতা বা পরিচালকের চেয়ে গণমাধ্যম কাভারেজ এবং কতোগুলো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড়ো প্রযোজকদের প্রতিটি চলচ্চিত্রই একসঙ্গে কয়েক হাজার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আশিকি টুকে একসঙ্গে দুই হাজার আটশো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়। তাছাড়া বড়ো প্রযোজকদের নিজস্ব স্টুডিও, টিভি চ্যানেল, পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান থাকায় সবমিলিয়ে তাদের সফলতার হারও বেড়ে যায়। কারণ এখানে খরচ নিজেদের মধ্যেই থাকে। যেমন রুপার্ট মারডকের ‘টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফক্স’। ভারতে এর নিজস্ব টিভি নেটওয়ার্ক ‘স্টার’, স্টুডিও হচ্ছে ‘স্টার স্টুডিও’। ফলে চলচ্চিত্রের টিভি স্বত্ব নিয়ে তাদেরকে আলাদা করে ভাবতে হচ্ছে না। পাশাপাশি প্রচারের খরচও গায়ে লাগছে না। ফলে লাভটা সবসময় তাদেরই। তাহলে অনুসিদ্ধান্ত চার-চলচ্চিত্রের ব্যবসা সফলতায় বড়ো ব্যানার তথা, প্রযোজক অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।
অনুসিদ্ধান্তের অনুফল
এতক্ষণ যে অনুসিদ্ধান্তগুলো আমরা পেলাম তার ভিত্তিতে আসন্ন একটি চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হবে কি না—পরীক্ষা হয়ে যাক। তারকা অভিনেতা আমির খান অভিনীত পিকে এখনো (লেখাটির কাজ চলার সময়—সেপ্টেম্বর ২০১৪) মুক্তি পায়নি। তবে গণমাধ্যমে এরই মধ্যে চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিরাট আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এর নির্মাতা রাজকুমার হিরানি, যিনি বলিউডের সর্বকালের দ্বিতীয় ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস্-এরও নির্মাতা। আবার ওই থ্রি ইডিয়টস্-এও মূল চরিত্রে রূপদান করেন আমির খান। ফলে এই জুটির আসন্ন পিকেও যে সফল হতে যাচ্ছে তা নিয়ে সবাই প্রায় নিশ্চিত। চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল হলে প্রথম অনুসিদ্ধান্ত—বড়ো তারকা জুটির উপস্থিতির গুরুত্ব প্রমাণ হবে।
আবার তৃতীয় অনুসিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট বিপণন কৌশল ঠিক করে প্রচার-প্রচারণার দিক থেকেও পিকে যথেষ্ট এগিয়ে। চলচ্চিত্রটির প্রচারের জন্য মুক্তি দেওয়া আমির খানের নগ্ন শরীরের পোস্টারটি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আর আলোচনায় আসার জন্যই নির্মাতা চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগেই দুই—তিন সপ্তাহ পর পর এভাবে আট—দশটি পোস্টার মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।৫ সে লক্ষ্যে এ পর্যন্ত তিনটি পোস্টার মুক্তিও পেয়েছে। এতে করেই চলচ্চিত্রটি গণমাধ্যমে যে পরিমাণ ‘কাভারেজ’ পেয়েছে, তাতে যে এটি ব্যবসায়িক সফলতা পাচ্ছে তা সহজেই বলা যায়। অবশ্য চলচ্চিত্রটি ব্যবসায়িক সফলতা পাচ্ছে, না-বলে যদি বলি সফলতা পেয়েছে তবেও ভুল হবে না। কারণ ৬০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত পিকে এরই মধ্যে একশো কোটি রুপি আয় করে ফেলেছে। শোনা যাচ্ছে, মুক্তির আগেই পিকের স্যাটেলাইট স্বত্ব বিক্রি হয়েছে ৮৫ কোটি রুপিতে এবং গানের স্বত্ব ১৫ কোটি রুপিতে।৬ অবশ্য এজন্য নির্মাতাদেরকে পিকের স্বত্ব ক্রেতাদের নিশ্চয়তা দিতে হয়েছে চলচ্চিত্রটি দেশের বাজারেই কমপক্ষে তিনশো কোটি রুপির ব্যবসা করবে।৭ অর্থাৎ, পিকে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন না করলেও কোনো আর্থিক ক্ষতি নেই। মানে দ্বিতীয় অনুসিদ্ধান্তও প্রমাণিত।
পিকে-এর তিনটি পোস্টারের ছবি দিতে হবে
এবার দেখি, চতুর্থ অনুসিদ্ধান্ত অনুযায়ী পিকের প্রযোজক কে বা কারা। চলচ্চিত্রটির তিন প্রযোজকের একজন নির্মাতা হিরানি নিজেই। দ্বিতীয় প্রযোজক বিনোদ চোপড়া ফিল্মস্, যেটি থ্রি ইডিয়টস্-এরও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। আর তৃতীয় প্রযোজক হিসেবে রয়েছে ওয়াল্ট ডিজনির মালিকানাধীন ইউ টি ভি মোশন পিকচারস্। অর্থাৎ পিকে চতুর্থ অনুসিদ্ধান্তও মেনে চলেছে। আর বড়ো ব্যানারে নির্মিত বলেই তো জোর গলায় তিনশো কোটি রুপি আয় করার ঘোষণা দিতে পারে পিকে। এখন অপেক্ষা, পিকে কয়শো কোটি রুপি আয় করে কোন্ ক্লাবের সদস্য হয়।
‘দিজ আর নাইন্টি নাইন’
চলচ্চিত্র-নির্মাণ, পরিবেশন ও প্রদর্শন—সবই ব্যবসা। আর যেকোনো ব্যবসার মতো চলচ্চিত্রের ব্যবসাতেও লাভ-ক্ষতি আছে। আছে বলেই বাংলাদেশে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চলচ্চিত্র-নির্মাণ কমে যাচ্ছে, শিল্পীরা বেকার হচ্ছে। কারণ, দেশটির চলচ্চিত্রের বাজার পড়ে গেছে; ভোক্তারা দেশীয় চলচ্চিত্র ‘খাচ্ছেন’ না (যদিও ইদানীং অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে)। বিপরীতে বলিউড প্রসারিত হচ্ছে, বাজার বড়ো হচ্ছে। দেশের বাজার পার করে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার বাজারেও বলিউড জায়গা দখল করে নিচ্ছে। তাহলে তো বলাই যায়, বলিউডের পালে লাভের বাতাস লেগেছে এবং অনবরত লাগছে। তবে পরিসংখ্যান কিন্তু সে কথা বলছে না। সেখানে গড়ে কমপক্ষে ৮০ ভাগ চলচ্চিত্র মূলধনই তুলতে পারছে না। অথচ চলচ্চিত্রের নির্মাণ সংখ্যাও কিন্তু কমছে না। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন, বলিউডের সফলতার রহস্য কী অথবা বাংলাদেশের মতো সেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ সংখ্যা কমছে না কেনো?
সেসব রহস্যের সমাধানের আগে ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ চলচ্চিত্র ও সেগুলোর নির্মাতাদের সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া দরকার। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় সরাসরি সেসব নির্মাতাদের সম্পর্কে বা তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যাওয়ার কারণ জানা কিছুটা কঠিনই। তার পরও ইন্টারনেট ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন থেকে যতোটুকু জানা সম্ভব তার ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যেতে পারে। অবশ্য এই তিন বছরে যে পরিমাণ চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে তার সবগুলো নিয়ে আলোচনা করাও সম্ভব নয়। সেজন্য প্রত্যেক সালের জানুয়ারি—জুন ও জুলাই—ডিসেম্বর অর্থাৎ প্রতি ছয় মাস অন্তর ঐচ্ছিকভাবে একটি করে চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করবো।
| বছর | জানুয়ারি—জুন | জুলাই—ডিসেম্বর |
| ২০১৩ | রাজধানী এক্সপ্রেস | সত্য টু |
| ২০১২ | প্লেয়ারস্ | আই অ্যাম টুয়েন্টি ফোর |
| ২০১১ | হোস্টেল | চতুর সিং টু স্টার |
সাধারণভাবে দেখা গেছে, এই সব বিধ্বস্ত চলচ্চিত্রগুলোর প্রায় অধিকাংশতেই অপরিচিত বা স্বল্প-পরিচিত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কাজ করেন। এমন আরো কয়েকটি চলচ্চিত্র হচ্ছে—মাই টার্গেট আই এস (২০১১), জিয়ারাত (২০১১), মেরি মার্জি (২০১১), মাই হাজব্যান্ডস্ ওয়াইফ (২০১১), শীতল ভাবি ডট কম (২০১১), হাম দো আনজানে (২০১১), আশিকি ডট ইন (২০১১), সুইট লাভ (২০১২), হানসা (২০১২), দ্য লস্ট টেপ (২০১২), দ্য ফরেস্ট (২০১২), সিক্সটিন (২০১৩), ইশ্ক অ্যাকচুয়ালি (২০১৩), শর্টকাট রোমিও (২০১৩), হাম হে রাহি কার কে (২০১৩) ইত্যাদি। এ চলচ্চিত্রগুলোর অভিনেতা-অভিনেত্রী যেমন অপরিচিত, তেমনই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বা নির্মাতারাও গণমাধ্যমে খুব একটা পরিচিত নন। এই বিধ্বস্ত চলচ্চিত্রগুলোর প্রযোজকদের অনেকেরই প্রযোজনা একটি করে অর্থাৎ প্রথম প্রযোজনা। যেমন হাম হে রাহি কার কের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘গোয়েল স্ক্রিনক্রাফট্’, শর্টকাট রোমিওর ‘সুসি গণেশ প্রোডাকশনস্’, সত্য টুর ‘ম্যামথ মিডিয়া’ প্রভৃতির একমাত্র কাজ এগুলো। আর এসব চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হলেও তাদের গল্পগুলো কিন্তু বৈচিত্র্যপূর্ণ।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে র্যাগিং-এর শিকার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা নিয়ে নির্মিত হোস্টেল (২০১১)। ধরে নিলাম, হোস্টেল-এর কাহিনির পাশাপাশি অভিনয়শিল্পী, পরিচালক—সবাই অপরিচিত হওয়ায়, এটি ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু চতুর সিং টু স্টার? এতে তো সঞ্জয় দত্তের মতো তারকা উপস্থিত। তাহলে এটি ব্যর্থ হলো কেনো? সমালোচকদের মতে, এটি নাকি কোনো চলচ্চিত্রই হয়নি! এর কাহিনি গড়ে উঠেছে এক নেতার হত্যা মামলা নিয়ে, যার তদন্ত করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা চতুর সিং। চতুর সিং (সঞ্জয় দত্ত) তদন্ত করতে গিয়ে যেসব হাস্যকর কাজ করেন তা নিয়েই চলচ্চিত্রটি। তবে চতুর সিং টু স্টার-এ সঞ্জয় দত্তের মতো বড়ো তারকা থাকলেও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘পেন ইন্ডিয়া’ ও ‘লোটাস পিকচার’ অ-তারকা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে একই সময়ে অর্থাৎ ২০১১’র জুলাইয়ে আরেকটি কমেডি চলচ্চিত্র বলিউডে হিট হয়। এর প্রযোজক ছিলেন আমির খান ও ইউ টিভি মোশন পিকচারস্। তো বুঝতেই পারছেন, হিট না হয়ে উপায় নেই! এই হিট দিল্লি বেলির (২০১১) কাহিনি তিন রুমমেট—তাশি, নিতিন ও অরুপকে নিয়ে। এরা একটি পার্সেল একজনের বদলে আরেকজনকে পৌঁছে দেন। ওই পার্সেল ফেরত পেতে তাদের হাস্যরসাত্মক কর্মকাণ্ডই দিল্লি বেলির কাহিনিকে এগিয়ে নিয়েছে। এই কাহিনিকে কিন্তু সমালোচকরা পাঁচে চার—সাড়ে চার দিয়েছেন। বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের চলচ্চিত্র বলে কথা! বড়ো তারকা না থাকার পরও হিট। অর্থাৎ বড়ো প্রযোজক থাকার চতুর্থ অনুসিদ্ধান্তটি আবারো প্রমাণিত।
মূলত বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের চলচ্চিত্র যেখানে প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছার আগেই মূলধন তুলে নেয়, সেখানে ছোটো প্রযোজকদেরগুলো প্রেক্ষাগৃহে চলেই না। মনে হতে পারে, যে চলচ্চিত্রে তারকা নেই, ‘ভালো পরিচালক’ নেই, ‘ভালো গল্প’ নেই—সে চলচ্চিত্র দর্শক কেনো দেখবে? উত্তর হিসেবে বলবো, অনেক চলচ্চিত্র আছে যেগুলোর সঙ্গে সুপারহিট চলচ্চিত্রগুলোর গল্পের খুব পার্থক্য নেই। আন্ডারওয়ার্ল্ডনির্ভর সত্য টুর কথাই ধরুন। এর পরিচালক রাম গোপাল ভার্মা, এ জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তিনি বলিউডে সুপরিচিত। তার সত্য টুর প্রিকুয়েল সত্য (১৯৯৮) কিন্তু সুপারহিট ছিলো। অবশ্য সেটি ভার্মা ও ভরত শাহ্র প্রযোজনা ছিলো। এই ভরত শাহ্ পরবর্তীকালে দেবদাস (২০০২) প্রযোজনা করেন। বোঝাই যাচ্ছে, সত্যের সফলতার পিছনেও এই বড়ো প্রযোজকরাই ছিলো। তাহলে কি সত্য টুর ব্যবসায়িক ব্যর্থতার জন্য ছোটো ব্যানারই দায়ী?
তবে সমসাময়িক আন্ডারওয়ার্ল্ড চলচ্চিত্রগুলোও হিট, সুপারহিট হচ্ছে; গ্যাংস্টার, জান্নাত, জান্নাত টু সেই গোত্রেরই চলচ্চিত্র। এমনকি সালমান খান অভিনীত ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জনকারী ওয়ান্টেডও কিন্তু এক প্রকারে আন্ডারওয়ার্ল্ড চলচ্চিত্রই। আর এসব চলচ্চিত্রের গল্পে তেমন মৌলিক কোনো পার্থক্য কিন্তু নেই। প্রত্যেকটিরই গল্পের ধরন ‘গ্যাং ওয়ার’। তবে সফলতা যেনো শুধু বড়ো প্রযোজকদের চলচ্চিত্রের জন্যই বরাদ্দ!
আবার মুম্বাই হামলা নিয়ে ২০১৩-তে ভার্মা নির্মিত দ্য অ্যাটাক অব টুয়েন্টি সিক্স/ইলেভেন ব্যবসায় ব্যর্থ হয়। কেনো? এটি কি ভালো চলচ্চিত্র নয়? এখানে নিরপরাধ মানুষদের নির্মম হত্যাকাণ্ড দেখানো হয়েছে। টুয়েন্টি সিক্স/ইলেভেন-এর মুম্বাই হামলা যেভাবে সারাবিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলো, চলচ্চিত্র টুয়েন্টি সিক্স/ইলেভেন কিন্তু সেটা পারলো না। কারণ এখানে না কোনো তারকা আছে, না আছে বড়ো প্রযোজক। বলতেই পারেন, দর্শক না দেখলে চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হবে কীভাবে? আর এ জাতীয় ‘ভালো’ চলচ্চিত্র দর্শক দেখে না! তারা দেখে মাসালা চলচ্চিত্র; যেগুলো আবার বড়ো প্রযোজকরা বানায়। ফলে সেগুলো তো হিট হবেই।
কিন্তু এই ধারণাও পুরোপুরি ঠিক না। ২০১৩ সালের সেরা কাহিনিচিত্র হিসেবে পুরস্কৃত হয় জলি এল এল বি। সাধারণভাবে এই পুরস্কার প্রাপ্তিই বলে দেয় এর ইতিবাচকতা। ব্যতিক্রম হিসেবে চলচ্চিত্রটি সে বছর হিটও হয়। সাধারণত পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো ‘ম্যাড়ম্যাড়ে’ হয়, ফলে ‘সাধারণ’ দর্শকদের অনীহা থাকে। অথচ মজাটা এখানেই! কারণ জলি এল এল বির প্রযোজক রুপার্ট মারডকের ‘ফক্স স্টার স্টুডিও’। এবার বুঝে নিন চলচ্চিত্রটির সফলতার রহস্য।
আবার ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া আই অ্যাম টুয়েন্টি ফোর বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। এর গল্প বর্তমান সাইবার জগতের প্রেক্ষাপটে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তব। সাইবার স্পেসে যে কেউ তার পরিচয় গোপন রেখে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। হরহামেশা এমন হচ্ছেও। এমন গল্প নিয়েই আই অ্যাম টুয়েন্টি ফোর। সেখানে একজন লেখক অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক মেয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। কিন্তু সমস্যা বাধায় লেখকের বয়স। মেয়েটির যেখানে ২২, লেখকের ৪২। তাই লেখক মিথ্যা বলেন, তার বয়স ২৪! গল্পটি ধীরলয়ের হলেও ভিন্ন ধারার ও সময়োপযোগী। অথচ ব্যবসার মানে তা বিধ্বস্ত হলো। তাহলে কি আবারো সেই বড়ো পুঁজির আশীর্বাদ না থাকাই কাল হলো আই অ্যাম টুয়েন্টি ফোর-এর জন্য?
এই ২০১২ সালেরই আরেকটি ব্যর্থ চলচ্চিত্র প্লেয়ারস্। তবে এখানে আমাদের অনুসিদ্ধান্তগুলোর প্রায় সবগুলোই বিদ্যমান ছিলো। ‘ভায়াকম এইটিন মোশন পিকচার’-এর মতো বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, অভিষেক বচ্চন ও বিপাশা বসুর মতো তারকা (যদিও গণমাধ্যমের বক্তব্য মতে, তারা মাঝারি মানের তারকা!), আব্বাস ও মাস্তানের মতো নামি পরিচালক—সবই ছিলো। তাহলে এটা ব্যর্থ হলো কেনো? গণমাধ্যমে চলচ্চিত্রটি নিয়ে অনেক আলোচনাও ছিলো। তার পরও এটি ব্যর্থ। অবশ্য গণমাধ্যম অন্য কথা বলছে, তাদের ভাষায়, এই তারকারা তারকা হলেও কখনো কোনো চলচ্চিত্রে সফলতা পাননি! তাই প্লেয়ারস্-এ শিকে ছিঁড়েনি! সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—ব্যর্থ হওয়ার পরও তারা তারকা হন কীভাবে?
এবার আসি, ২০১৩ সালের দুই ‘এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের কাছে। এর একটি চেন্নাই এক্সপ্রেস ও অন্যটি রাজধানী এক্সপ্রেস। প্রথমটি সাড়ে চারশো কোটি রুপি আয় করে, আর দ্বিতীয়টি মূলধনের অর্ধেকও তুলতে পারেনি। কিন্তু কেনো এমন হলো? দুটি চলচ্চিত্রের গল্পই ট্রেনে চলতে থাকে। চেন্নাই এক্সপ্রেস চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকার পরিচয় হয় ট্রেনে, এরপর নায়িকাকে বাঁচাতে নায়কের কারসাজি; অন্যদিকে রাজধানী এক্সপ্রেসে নায়ক নিজে বাঁচতে পালায়। নাচ-গান-অ্যাকশন সবই তো এক! মানে ওই একই গল্প। তাহলে পার্থক্য কোথায়? আবারো সেই পুঁজি, ‘স্টারইজম’, গণমাধ্যমের কাভারেজ! জানা কথা, চেন্নাই এক্সপ্রেস-এর সফলতার পিছনে রয়েছেন শাহরুখ খান, যিনি বলিউডের ‘বাদশাহ’। তো তার অভিনীত চলচ্চিত্র তো সফল হবেই, এ আর এমন কি! রাজধানী এক্সপ্রেস-এর ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টোটা।
তাহলে সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ছোটো বাজেটের চলচ্চিত্র ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে বড়ো বাজেটের নামিদামি তারকাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র চোখ বুজে ব্যবসাসফল হয়ে যাচ্ছে। হচ্ছে বলেই বলিউডের ‘বাদশাহ’ খ্যাত শাহরুখ খান জোর গলায় বলতে পারেন, ‘আমি থাকলেই সিনেমা হিট’।৮
অতঃপর ‘আইটেম-নিউজ’
প্রথমত, ‘শাহরুখের দেওয়ালি উপহার’৯ সংবাদ শিরোনামটি শুনে মনে হতে পারে বলিউড তারকা শাহরুখ হয়তো দেওয়ালিতে কাউকে কিছু উপহার দিচ্ছেন। কিন্তু না, এই দেওয়ালিতে তার অভিনীত হ্যাপি নিউ ইয়ার (২০১৪) মুক্তি পাচ্ছে, তা নিয়েই তিন কলামের এই প্রতিবেদন। এক কলামে চলচ্চিত্রটির পোস্টার এবং সংবাদের শুরুতেই শাহরুখ-দিপিকার আলিঙ্গনরত একটি বড়ো ছবি। অর্থাৎ সংবাদটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ! কিন্তু আসলেও কি তাই? সংবাদটিতে মূলত শাহরুখের ক্যারিয়ার, তার চলচ্চিত্রের ব্যবসা সফলতা, হ্যাপি নিউ ইয়ার-এর প্রচার-প্রচারণার জন্য গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে। এক কথায় এটিকে সংবাদ না বলে বিজ্ঞাপন কিংবা আরো শৈল্পিকভাবে (!) ‘আইটেম-নিউজ’ বলা যায়।
নিউজটা লাগবে
‘আইটেম-নিউজ’ বললাম কেনো? ‘আইটেম সঙ’ বিষয়টির সঙ্গে এখন কমবেশি সবাই পরিচিত। এই বস্তুটি চলচ্চিত্রের অংশ হয়ে নয়, বরং ‘আইটেম গার্ল’দের সু-উন্নত বুক-নিতম্ব দুলিয়ে উদ্দিষ্ট দর্শকের মনোরঞ্জন করা তথা টিকিটের বিক্রি বাড়ানোর জন্যই হাজির হয়। তেমনই ‘আইটেম-নিউজ’গুলোও এমনভাবে করা, যাতে সংবাদটির পাঠক চলচ্চিত্রটির দর্শকে পরিণত হয়। সম্প্রতি (অক্টোবর ২০১৪) বলিউডে মুক্তি পাওয়া ব্যাং ব্যাং চলচ্চিত্রের প্রচারণায় অংশ নিয়ে অভিনেতা হৃত্বিক রোশন বিভিন্ন নায়ক-নায়িকাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। সেসব ঘটনা আবার ভারতে তো বটেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ-সম্প্রচার করা হয়। আবার দেখা যায়, মুক্তি পাবে এমন চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীর ‘সুসম্পর্ক’ নিয়ে নানারকম সংবাদ চাউর করে দেওয়া হয়। তবে শুধু সুসম্পর্কই নয় , ‘কুসম্পর্ক’ কিংবা অন্য কারো সঙ্গে বিরোধও তখন গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।
কিছুদিন আগে এক অভিনেত্রীর খোলামেলা ছবি প্রকাশের ঘটনা ভারতের গণমাধ্যমে আলোড়ন তোলে। এরপর এর প্রতিবাদে এবং মাধ্যমটির সমালোচনা করে সেই অভিনেত্রীর বিভিন্ন বক্তব্য অন্যান্য গণমাধ্যম যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রচার করে। বিষয়টি তখন চলচ্চিত্র ছেড়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নারীর মর্যাদা—এমন সব বিষয় পর্যন্ত গড়ায়। সেসময় প্রথমোক্ত গণমাধ্যম, যেটি ওই ছবি প্রকাশ করে; তারা দাবি করে ওই অভিনেত্রী এসব সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন ‘কাভারেজ’ পাওয়ার জন্য। কারণ তখন তার একটি চলচ্চিত্র মুক্তির অপেক্ষায় ছিলো। তাই আলোচনায় আসার জন্যই তিনি এমনটি করেছেন। আগেও ওই অভিনেত্রীর এ ধরনের অনেক ছবিই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি যে ছবিটি নিয়ে সমালোচনার শুরু, সেটিও এক বছর আগে থেকেই অন্য ওয়েবসাইটে রয়েছে। ফলে, এই সমালোচনা যে গণমাধ্যমের আলোচনা তথা মানুষের মগজ দখলের উদ্দেশ্যে, সে ব্যাপারে ওই গণমাধ্যমটি নিশ্চিত ছিলো।১০
আর এ ধরনের ‘আইটেম-নিউজ’ যে চলচ্চিত্রের সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা হালে বাংলাদেশে অনন্ত জলিল প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলোর দিকে খেয়াল করলেও বোঝা যায়। অনন্তর চলচ্চিত্র নিয়ে যতোই তামাশা করা হোক, সেগুলো কিন্তু ব্যবসা করছে। কারণ, গণমাধ্যম তাকে হাস্যরসের পাত্র বানালেও একইসঙ্গে তার প্রতি দর্শকের আগ্রহও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে দর্শক চলচ্চিত্র না দেখলেও, অনন্তকে দেখতেই প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছেন। ফল, চলচ্চিত্র হিট! এই সফলতায় চলচ্চিত্রের ভূমিকা কতোটুকু? বলিউডেও একই ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমের প্রচারই আসল পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নির্মিত ধুম সিরিজ, থ্রি ইডিয়টস্, ম্যায় হু নার মতো চলচ্চিত্র নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘আইটেম-নিউজ’-এর আধিক্য এবং পরবর্তী সময়ে সেসব চলচ্চিত্রের ব্যবসা সফলতা সেটাই প্রমাণ করে।
তবে ‘আইটেম-নিউজ’ যদি হয়ই তাহলে ইন্ডাস্ট্রিতে মুক্তি পাওয়া সব চলচ্চিত্র নিয়েই তো হওয়ার কথা। অথচ তেমনটি কিন্তু হচ্ছে না। হ্যাপি নিউ ইয়ার-এর সঙ্গে একই দিন বলিউডে আরো দুটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। আপনি কি সেগুলোর নাম জানেন? জানেন না! জানবেন কীভাবে, গণমাধ্যম তো সিডি কাণ্ড, কাবাব মে হাড্ডি নামে ওই দুটি চলচ্চিত্রের নামই প্রকাশ করেনি!১১
এখন আপনি যদি বলেন, ‘আইটেম-নিউজ’ হতেই পারে; সেক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, ওই চলচ্চিত্র দুটি নিয়ে কোনো সংবাদ না হওয়া। কারণ সাধারণ সংবাদের মতো ‘আইটেম-নিউজ’ প্রকাশ করতে হলে গণমাধ্যমকে সব চলচ্চিত্র নিয়েই ‘সমান গুরুত্ব’ দিয়ে সংবাদ করতে হবে। ব্যানারের আকার হিসাব করে সংবাদ করলে তো সেটা চলচ্চিত্রের জন্য বিজ্ঞাপনই হয়ে যায়। আর গণমাধ্যমগুলো সেটাই করছে।
‘আইটেম-নিউজ’ হলে সমস্যা কোথায়? সাধারণভাবে বিনোদন সাংবাদিকতা তো এমনই হওয়ার কথা; আসন্ন চলচ্চিত্র, মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ও সেসবের ব্যবসা, প্রচার প্রভৃতি নিয়েই তো বিনোদন সংবাদ করা হয়। কিন্তু শুধু এগুলোই কি বিনোদন সংবাদের বিষয়, নাকি আরো কিছু বিষয় বিনোদন সংবাদে উঠে আসতে পারে? এই যে এতো বড়ো একটি ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিবছর ৮০ ভাগের উপর চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে; সেটা কেনো হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে, এ থেকে উত্তরণ পেতে হলে কী করা দরকার—এ ধরনের বিষয়গুলো কি বিনোদন সংবাদে উঠে আসতে পারে না? পারে, কিন্তু সেগুলো তুলে আনা হয় না। কেনো? উত্তরটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই দিই। বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরদের বিভিন্ন ঘটনাই আমরা সংবাদ হিসেবে প্রতিদিন দেখি। সেসব প্রতিষ্ঠানে কে নতুন সি ই ও হলো, কোন্ নতুন প্যাকেজ ছাড়া হলো, সি এস আর অর্থাৎ সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তারা কী করলো—এসবের ফিরিস্তি। এসব জেনে কি আপনার তেমন কোনো লাভ হয়? আর এর বিপরীতে যদি সংবাদ হতো প্রতিদিন মোবাইল অপারেটরগুলো কতো টাকা বিদেশে পাঠায়; কিংবা কলচার্জের সঙ্গে ভ্যাট হিসেবে যে টাকা কেটে নেয় তার পরিমাণ কি আদৌ ১৫ শতাংশ নাকি বেশি; আপনি যদি ১০ সেকেন্ডে ১০ পয়সা হারে কথা বলেন, তবে ১০ সেকেন্ড কথা বললে চার্জ করা হবে ১২ পয়সা, অথচ হওয়ার কথা ১১.৫ পয়সা—এ বিষয়গুলো কিন্তু গণমাধ্যমে আসে না!
বলিউডের ক্ষেত্রেও তাই হয়। যে চলচ্চিত্রগুলো বড়ো ব্যানারে নির্মিত সেগুলোর অতি-সফলতাই শুধু সংবাদ আকারে পাঠক-দর্শকের সামনে হাজির করা হয়। চলচ্চিত্রটির প্রতিদিনের আয়ের খতিয়ান দর্শক-পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়, আকৃষ্ট করা হয় আরো নতুন দর্শককে। কারণ, ‘কী আছে এই চলচ্চিত্রে যে কারণে এতো টাকা ব্যবসা করলো—এই কৌতুহলে অনেকে চলচ্চিত্রটি দেখতে আগ্রহী হয়েছে (হয়)।’১২ মোদ্দা কথা, প্রচার দেখে মনে হয়—এই ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রগুলোই বলিউড, কারণ এগুলোর ওপর ভিত্তি করেই তো চলচ্চিত্র শিল্পের মোট আয় বাড়ছে (অবশ্য পরে এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলবো)। অন্যদিকে ব্যর্থগুলো তো চলচ্চিত্রই না! তাই সেগুলো নিয়ে সংবাদ করাটা অর্থহীন। অথচ ওই সফলগুলোও যে এমন কোনো আহামরি চলচ্চিত্র না, তা চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কথা থেকেই বোঝা যায়। সম্প্রতি বক্স অফিসে ঝড় তোলা হ্যাপি নিউ ইয়ারকে স্মরণকালের সবচেয়ে বাজে চলচ্চিত্র বলেছেন জয়া বচ্চন।১৩ তাহলে এই বাজে চলচ্চিত্র শত শত কোটি রুপি আয় করে কীভাবে? তাহলে কি শুধু বড়ো ব্যানারের চলচ্চিত্র বলেই তাকে নিয়ে এতো আওয়াজ?
বিপরীতে ছোটো ব্যানারে নির্মিত সত্য টু-এর মতো কাঠামোবিরোধী চলচ্চিত্র—যেখানে আন্ডারওয়ার্ল্ড আর রাষ্ট্রকে সমার্থক হিসেবে দেখানো হয়েছে—অন্ধকারেই থেকে যায়। কারণটি কি এমন যে, এসব চলচ্চিত্র দেখে যদি মানুষ জেগে যায়, যদি তারা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে? রাষ্ট্রকর্তাদের ভয় হয়, তাদের শোষণের হাতিয়ার (রাষ্ট্র) যদি ক্ষয় হয়!
দ্বিতীয়ত, এই রাজনীতি ছাড়াও গণমাধ্যম কোন্ চলচ্চিত্র নিয়ে প্রচার চালাবে, কোন্ চলচ্চিত্র নিয়ে প্রচার চালাবে না তার পিছনে অর্থনীতিও জড়িত। শূন্য দশকে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র বাজার একেবারে ভেঙে পড়ে। ‘অশ্লীলতা’র দায়ে ঢালিউডের চলচ্চিত্রকে বনবাস দেন দর্শকরা, খোলাখুলিভাবে বললে গণমাধ্যম। সেসময় কয়েকটি ঘটনা পাশাপাশি ঘটে। প্রথমত, ‘অশ্লীলতা’র অভিযোগ তুলে ঢাকাই চলচ্চিত্রকে তুলোধুনো করে গণমাধ্যম। ফল, দর্শকের প্রেক্ষাগৃহবিমুখতা, আর ইন্ডাস্ট্রির ভরাডুবি। দ্বিতীয়ত, ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরতে এগিয়ে আসে ‘চলচ্চিত্রপ্রেমী’ টিভি চ্যানেলগুলো। ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের নামে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে টিভি’তে চলচ্চিত্র দেখানোর অদ্ভুত পদ্ধতি প্রণয়ন করে তারা। এতে সমস্যা নয়, বরং সম্ভাবনা—চলচ্চিত্রে প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে দর্শককে সরাসরি ক্রেতা বানানো যায়!
সে উদ্দেশ্য নিয়ে দূরত্ব (২০০৬), ব্যাচেলর (২০০৩), থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার (২০০৯) মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়, যেসব ‘সিনেমার মধ্যে কৌশলে (ওই) নিবেদিত পণ্যের বিজ্ঞাপন উপস্থাপন করা ...’ হয়েছে।১৪ আবার এগুলোর বাইরে সেই দুরবস্থার মধ্যেও যে যে চলচ্চিত্র সফলতা পেয়েছিলো তার মধ্যে রয়েছে মনের মাঝে তুমি (২০০৩), কোটি টাকার কাবিন (২০০৬), চাচ্চু (২০০৬), মনপুরা (২০০৮)। অবশ্য গণমাধ্যমেও এ চলচ্চিত্র নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয় সেসময়, সামাজিক কাহিনির চলচ্চিত্র বলে তকমাও দেওয়া হয়। তার মানে গণমাধ্যম চাইলে যে কাউকে ‘হিরো’ বা ‘জিরো’ বানাতে পারে। কিন্তু গণমাধ্যম কেনো এমন করে? মুক্তবাজার অর্থনীতির এই যুগে সব সম্পর্কই দেওয়া-নেওয়ার; বিনা লাভে এখানে কেউ এক পাও নড়ে না! সে কারণেই যে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি ওই করপোরেট গণমাধ্যমকে ‘কিছু’ দিতে পারে না, তার প্রচার কেনো চালাবে সে? এই ‘কিছু’ হচ্ছে বাজার ধরার প্রতিনিধি, স্টার!
বলিউড যেখানে একের পর এক তারকা তৈরি করে চলেছে, সেখানে বাংলাদেশের ঢালিউডে এক সালমান শাহ্ ছাড়া আর তেমন কোনো ‘হার্টথ্রব হিরো’ পাওয়া যায় না। বরং বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘সিনেমার লোকজনের তুলনায় টেলিভিশনের লোকজনের প্রভাব বেশি।’১৫ ফলে তারাই ‘বাঙালি সংস্কৃতির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর আর সংস্কৃতি-নির্ভর করপোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠলেন ...’।১৬ সেজন্যই বাংলাদেশের গণমাধ্যম চলচ্চিত্রের শিল্পীদের তুলনায়, টিভি শিল্পীদের নিয়ে বেশি আগ্রহী। এমনকি ছোটো পর্দার কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রী যদি চলচ্চিত্রে যান, তবে তাকেই তারা বেশি কাভারেজ দেন। এইতো গত ২০১১-তে এক টিভি অভিনেত্রী চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর বাংলাদেশের প্রথম সারির একটি দৈনিক রীতিমতো হুলুস্থূল বাধিয়ে দেয়; এমনকি অফিসিয়াল আমন্ত্রণে কান-এ পর্যন্ত পাঠিয়ে দেন ওই অভিনেত্রীকে! অবশ্য সেই অভিনেত্রী কিন্তু প্রথমে বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেই জনপ্রিয়তা পান। তাহলে কি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ‘বাজারি দূত’ আলাদা হওয়ায়, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে এতটা অনাগ্রহী? বিপরীতে তারকা উৎপাদনে বলিউড কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যমের জন্য রত্নগর্ভা! সেজন্যই বলিউড নিয়ে তাদের এতো উচ্চবাচ্য। তাছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক-রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবও সবচেয়ে বেশি। এক ভারতের তারকা দিয়েই সারা উপমহাদেশে যেকোনো পণ্যের প্রচার চালানো সম্ভব এবং বর্তমানে তেমনটাই হচ্ছে।
কিছুদিন আগে ফেইসবুকের একটি পাতায় ৯০ দশকের একটি পানীয়ের বিজ্ঞাপনের ভিডিও লিঙ্ক দেখি। বাংলাদেশের জন্য নির্মিত বিজ্ঞাপনটিতে গায়ক শুভ্রদেব কাজ করেছিলেন।১৭ অন্যদিকে ভারতের জন্য নির্মিতটিতে ছিলেন আমির খান। অর্থাৎ তখনো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পীরা পুঁজিবাদীদের কাছে তেমন একটা গ্রহণযোগ্যতা পাননি। আর বর্তমানে তো এক ভারতের জন্য বিজ্ঞাপন বানালেই গোটা উপমহাদেশের মানুষকে ‘খাওয়ানো’ যায়। তাহলে আর আলাদা করে ঢালিউড দিয়ে কী হবে! বংলাদেশের করপোরেট গণমাধ্যমও তাই বলিউডকেই ফলাও করে প্রচার করে। ফল, ভারতের মতো বাংলাদেশেও বলিউডের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। তাহলে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণার খেলা তো বোঝা গেলো?
এবার দেখা দরকার, গণমাধ্যম কেনো শুধু বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের চলচ্চিত্র নিয়ে প্রচার চালায়। আগেই বলেছি করপোরেট গণমাধ্যম আর বড়ো চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই সহোদর! ফলে একই পুঁজির ছায়াতলে থেকে তারা একে অন্যের জন্য কাজ করে। চলচ্চিত্র গণমাধ্যমের জন্য আইকন তথা ‘স্টার’ সরবরাহ করে; কারণ ‘বাজারে মাল বেচতে প্রয়োজন একগুচ্ছ সুন্দরীর, যারা পণ্যের বহিরঙ্গের পণ্য হিসেবে বিকোবেন।’১৮ অর্থাৎ সেসব ‘স্টার’ গণমাধ্যমে পণ্যের বিজ্ঞাপনে হাজির হয়ে দর্শককে ক্রেতা বানাবেন। আবার এই স্টার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ওই গণমাধ্যম।
বলিউডের ডাকসাইটে তারকা অভিনেত্রী ও বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়ার তারকা হওয়ার পিছনের ঘটনা জানলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। ১৯৯৪ সালে বিশ্বসুন্দরী খেতাব অর্জন করা ঐশ্বরিয়াকে রুপালি পর্দায় সাফল্য পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৯৯ পর্যন্ত। তার প্রথম চারটি চলচ্চিত্র সফলতার মুখ দেখেনি। আশ্চর্যজনকভাবে সেক্ষেত্রেও আমাদের অনুসিদ্ধান্ত কাজ করেছে। কারণ ওই চারটি চলচ্চিত্র কোনো বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ছিলো না। ১৯৯৯ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালির হাম দিল দে চুকে সনম-এর মাধ্যমে বলিউডে তার ক্যারিয়ারের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, বড়ো ব্যানারের চলচ্চিত্রে কাজ করেই ঐশ্বরিয়া তারকাখ্যাতি পান।
কিন্তু শুধু চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হলেই তো তারকাখ্যাতি পাওয়া যায় না। তাহলে তো ১৯৯০-এর ব্লকবাস্টার আশিকির রাহুল রায় কিংবা অনু আগারওয়ালও তারকা হয়ে যেতেন। তেমন কিন্তু হয়নি। তাহলে ঐশ্বরিয়া কীভাবে তারকা হলেন? নিশ্চয়ই শুধু ওই ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় দিয়ে নয়। গণমাধ্যম তাকে নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাকে নিয়ে ‘আইটেম-নিউজ’ করেছে। মোট কথা, তাকে সবসময় আলোচনায় রেখেছে। যার ফল—তারকা ঐশ্বরিয়া।
বিপরীতে রয়েছেন ঐশ্বরিয়ার স্বামী অভিষেক বচ্চন, যিনি কোনো ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দিতে না পারলেও তারকা হিসেবে সফল। সেটা কি অভিষেকের পিতৃপরিচয়ের জন্য? সাধারণত, চলচ্চিত্র সফল হলেই তো অভিনয়শিল্পী সফল হন। কিন্তু অভিষেককে সফল তারকা করে তোলা হয়েছে। আর এই তারকা করে তোলার কাজটা গণমাধ্যমেরই। বিভিন্ন তারকাকে যেসব খেতাব দেওয়া হয়, যেমন : শাহরুখকে ‘বাদশাহ’, আমির খানকে ‘মি. পারফেকশনিস্ট’—এগুলো কিন্তু দর্শকরা দেয় না, গণমাধ্যমই দেয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তারকা বানিয়ে গণমাধ্যমের লাভ কী? প্রথমত, গণমাধ্যমের ভোক্তার একটি বড়ো অংশ বিনোদন অংশের দর্শক-পাঠক। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির সব অভিনয়শিল্পীর সংবাদ তো আর প্রকাশ করা যায় না। ফলে বাছাই করা কিছু অভিনয়শিল্পীকে গোটা ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধি করে সেসব ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে হয়। ফলে সময়ের আবর্তে সেসব অভিনয়শিল্পী তারকা হয়ে ওঠেন।
তারাই আবার পুঁজিপতিদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর হয়ে পণ্যের বিজ্ঞাপন করেন, ক্রেতা তৈরি করেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ ‘সফল’ তারকা শাহরুখ খান; তিনি ২০০৮ সালে ৩৯টি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর হিসেবে নিযুক্ত হন। শুধু তাই না, ২০১৩-তে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে ভারতের সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ড হিসেবে ঘোষণা করে।১৯ আর শুধু শাহরুখই নন, বলিউডের প্রত্যেক স্টারই নিজ দেশে এভাবে করপোরেট পুঁজির প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন। তাহলে পাঠক, গণমাধ্যমের কাছে বলিউড আর বলিউডের তারকাদের গুরুত্বটা বুঝলেন তো? এখন যদি বলিউডকে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি না বলি, পণ্য বিকিকিনির হাট বলি; আর গণমাধ্যমকে সে বাজারের বিলবোর্ড, তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে?
পুঁজিবাদের উৎপাদ
টালিগঞ্জের ২০১৪’র সবচেয়ে বড়ো বাজেটের চলচ্চিত্র যোদ্ধা পুঁজি ফেরত আনতে পারেনি।২০ এজন্য নয় যে, চলচ্চিত্রটির প্রচার-প্রচারণায় কমতি ছিলো, বরং উল্টোটাই সত্যি। বলিউডের চলচ্চিত্রগুলোর মতো এই চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও সব অনুসিদ্ধান্ত মেনেই প্রচার চালানো হয়েছে। তাহলে চলচ্চিত্রটি ব্যর্থ হলো কেনো? হতে পারে যোদ্ধা একটি দক্ষিণা চলচ্চিত্রের রিমেক। কিন্তু তাতেই বা কী? বলিউডে তো যেকোনো রিমেকই হেসে-খেলে হিট, সুপারহিট হয়ে যায়। তাহলে টালিগঞ্জের বেলায় কী হলো? বলা হচ্ছে ‘সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মুখে টলিউড।’২১ মূলত দর্শক তথা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের ওপর ভরসা না করে পুঁজি ফেরত আনতে স্যাটেলাইট স্বত্বের মতো অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভরশীল হওয়াতেই এ বিপর্যয়ে পড়েছে টালিগঞ্জ।
স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো এখন আর বেশি দামে চলচ্চিত্র কিনছে না। কারণ আগে টিভি চ্যানেলগুলো জনপ্রিয়তা পেয়ে নিজেদের ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তুলতে চলচ্চিত্র সম্প্রচার করতো। কিন্তু এখন সে কাজ বিভিন্ন রিয়ালিটি শো দিয়েই হচ্ছে। এতে আবার খরচও কম। তাহলে আর ফিল্মের কী দরকার? আর টিভি চ্যানেলগুলো বেশি দামে টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র কেনা বন্ধ করে দিতেই ইন্ডাস্ট্রি ধসে পড়ছে! ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখে কে—দর্শক নাকি গণমাধ্যম? এখান থেকে তো মনে হচ্ছে, গণমাধ্যমই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির উত্থান-পতন নিয়ন্ত্রণ করে। বলিউডের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা আমরা দেখেছি। সেখানেও চলচ্চিত্রের ব্যবসা সফলতায় গণমাধ্যমের প্রচারই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাহলে কি গণমাধ্যম চাইলে বলিউডও টালিগঞ্জের মতো ধসে পড়তে পারে? অবস্থাদৃষ্টে কিন্তু তা-ই মনে হচ্ছে!
তবে বলিউডের ক্ষেত্রে হয়তো এমনটি ঘটবে না। কারণ এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো পুঁজিগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে। মূলত ১৯৯৮ সালে ভারত সরকার চলচ্চিত্রকে শিল্পের মর্যাদা দিলে সেখানে ব্যাপক হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসতে শুরু করে। সে সূত্রে আজ বলিউডের সবচেয়ে বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোই—ডিজনি, ফক্স-স্টার স্টুডিও, ওয়ার্নার ব্রাদার্স, টুয়েন্টি সেঞ্চুরি ফক্স, ইউ টিভি মোশন পিকচারস্, সনি এন্টারটেইনমেন্ট—পশ্চিমা পুঁজির আশীর্বাদপুষ্ট। আর মুক্তবাজারের এই যুগে বড়ো পুঁজি কখনো হারে না। বরং আরো বড়ো হয়, ছোটোদের গলাধঃকরণ করে। বলিউডেও তা-ই দেখা গেলো। এখানেও বড়ো পুঁজির কাছে ছোটো পুঁজিগুলো পদে পদে মার খাচ্ছে। ফলে বলিউডের নিট আয় বাড়লেও সেটা দেখা যাচ্ছে, সেই কয়েকটি বড়ো পুঁজির সঙ্গেই জড়ো হচ্ছে। তাইতো ২০০৬ সালে বলিউড মোট একশো ৭৫ কোটি ডলার আয় করলেও এটা ডিজনির বার্ষিক আয়ের মাত্র অর্ধেক!২২ মূলত যেটা হয়, ‘পুঁজি পরিগঠিত হয়ে উঠবার পর বিশ্ববাজারকে নিজের অধীন করে ফেলে। ... একবার বিশ্ববাজার পুঁজির জন্মকারণ হিশাবে ভূমিকা পালন করে আবার অন্যদিকে পুঁজির জন্মলাভের পর বিশ্ববাজারকে সম্প্রসারিত ও প্রসারিত করে তোলে পুঁজি নিজে।’২৩ সুতরাং এই পুঁজিই হয়তো বলিউডকে বাঁচিয়ে রাখবে নিজের প্রয়োজনে।
তা এই প্রয়োজনটা কীসের—শুধু চলচ্চিত্র ব্যবসার, না আরো কিছু আছে এখানে? পাঠক, দর্শক সংখ্যার দিক থেকে বলিউডের অবস্থান হলিউডের উপরে। হলিউডের দর্শক যেখানে আড়াইশো কোটি, সেখানে বলিউডের দর্শক বছরে তিনশো কোটিরও বেশি।২৪ আর ভৌগোলিক দিক থেকেও যে বলিউড অনেক বড়ো এলাকার প্রতিনিধিত্ব করে তাতো আগেই বলা হয়েছে। অন্যদিকে যেকোনো গণমাধ্যমের কাছেই দর্শক আসলে দর্শক নয়, পণ্য—যাকে বিজ্ঞাপনদাতার কাছে বিক্রি করা যায়! এটা করেই তো ফেইসবুকের মালিক জুকারবার্গ আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালীতে পরিণত হয়েছেন। বিপরীতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জরা নিগৃহীত; যারা রাষ্ট্রের ‘গোপন’ তথ্য বিনামূল্যে রাষ্ট্রের মালিক-জনগণকে জানিয়েছিলেন।
যাহোক, দর্শক বিক্রির এই পদ্ধতি শুধু বলিউড নয়, বরং হলিউডেরও অন্যতম আয়ের উৎস। সেখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ওপর প্রযোজকরা বেশি নির্ভর করেন না।২৫ মানেটা হলো, কোনো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি শুধু চলচ্চিত্র বিক্রি করে না, দর্শককেও বিক্রি করে। তাহলে এই ইন্ডাস্ট্রিতে চলচ্চিত্র কোথায়? কেননা, আপনি কোন্ চলচ্চিত্র দেখবেন, আর কোন্টি দেখবেন না—সেটাও তো ওই পুঁজিপতিদের আশীর্বাদপুষ্ট গণমাধ্যমই ঠিক করে দিচ্ছে। না হলে ওই ব্যবসায় ধসে পড়া চলচ্চিত্র আপনি দেখেন তো না-ই, নামও জানেন না, কেনো?
তাহলে নিশ্চয়ই বিশ্ববাজারের ন্যায় বলিউডের বাজারও ত্রুটিপূর্ণ। ২০১৪-তে অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া ফ্রান্সের জ্যঁ তিরল দেখিয়েছেন, বিশ্ব প্রযুক্তির বাজার হাতেগোনা কয়েকটি বড়ো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় এই ক্ষেত্রটিতে নতুন বিনিয়োগকারী তৈরি হচ্ছে না কিংবা নতুনরা দাঁড়াতে পারছে না। এর কারণ হচ্ছে বড়ো প্রতিষ্ঠানগুলোর অলিগোপলি, মানে সিন্ডিকেট আর কি। সেই ‘বস্তু’ তো বলিউডেও বিদ্যমান। তা না হলে কাহানির নির্মাণ কাজ আগে শেষ হলেও দ্য ডার্টি পিকচারকে আগে মুক্তি দেওয়া হয় কেনো? এটা স্পষ্টতই সিন্ডিকেটকে প্রমাণ করে। আর বলিউডে এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই দেখা যায়। বড়ো প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত একই সময়ে আলাদা আলাদা চলচ্চিত্র মুক্তি দেয় না। অন্যদিকে ছোটো প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কোনো সমঝোতায় আসতে পারে না। ফলে তাদেরকে বড়োদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলচ্চিত্র মুক্তি দিতে হয়। না হলে হ্যাপি নিউ ইয়ার-এর মতো বড়ো বাজেটের চলচ্চিত্রের সঙ্গে একই দিনে সিডি কাণ্ড আর কাবাব মে হাড্ডি মুক্তি পায় কীভাবে?
শেষ করছি, তবে...
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের দুটি জিনিস সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এক, ক্রিকেট; দুই, বলিউড। দুটি ক্ষেত্রই সাধারণ মানুষকে অনেক বিনোদন দিয়েছে, সত্য। তবে পুঁজিবাদীদেরও কম কিছু দেয়নি। দুটি জিনিসই পুঁজিবাদীদের পুঁজি বাড়ানোর কাজে উর্বর ভূমি হিসেবে কাজ করেছে, করছে।
তাহলে কি চলচ্চিত্র আজ পুঁজির কাছে বন্দি? সেলুলয়েডের কিংবা রুপালি পর্দার এতো গ্ল্যামারাস, আলোকোজ্জ্বল, ঝাঁ চকচকে জীবন কি শুধু ভোগকেই ‘প্রমোট’ করবে আমাদের কাছে? সম্মোহনী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের জন্য কিছু করবে না? আর বিপরীত দিকে ছোটো নির্মাতা-প্রযোজকরাই বা কী করবেন? তারা কি আদির হলিউডের মতো নতুন কোনো ইন্ডাস্ট্রি খুঁজতে (হলিউডের আদি পর্বে ১৯০৯ সালের দিকে বড়ো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘মোশন পিকচার পেটেন্টস্ কোম্পানি’ গঠন করলে ছোটো ছোটো প্রতিষ্ঠানগুলো নিউইয়র্ক থেকে ব্যবসা গুটিয়ে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার হলিউডে চলে আসে। এখানেই পত্তন হয় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির।) বের হবেন? আর যদি বা খুঁজে পানও, সর্বগ্রাসী পুঁজির থাবা থেকে চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে পারবেন তো?
লেখক : মাহামুদ সেতু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সম্প্রতি তিনি হীরকের রাজা ২০১৪ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
msetu.mcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. www.boxofficeindia.com/
২. http://www.talkingmoviez.com/monthly-box-office-report-may-2013/
৩. http://en.wikipedia.org/wiki/Monpura
৪. http://en.wikipedia.org/wiki/Kahaani#Marketing_and_release
৫. http://en.wikipedia.org/wiki/PK_%28film%29#Marketing
৬. http://en.wikipedia.org/wiki/PK_%28film%29#Distribution
৭. http://www.koimoi.com/bollywood-popular/aamirs-pk-satellite-rights-sold-at-whopping-85-crores/
৮. http://bangla.bdnews24.com/glitz/article859560.bdnews
৯. ‘শাহরুখের দেওয়ালি উপহার’; প্রথম আলো’র বৃহস্পতিবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘আনন্দ’, ২৩ অক্টোবর ২০১৪।
১০. http://goo.gl/UmA529
১১. http://www.bollywoodhungama.com/movies/list/sort/Released_in_2014
১২. দোয়েল, আশফাক; ‘‘আকাশেতে লক্ষ তারা, ধুম : থ্রি একটারে’ : চাঁদ তার আলো ধরে রাখতে পারবে তো’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; সংখ্যা ৭, জুলাই ২০১৪, পৃ. ৫৯, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
১৩. ‘সবচেয়ে বাজে ছবি ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার!’; প্রথম আলো, নভেম্বর ২০১৪।
১৪. কর্মকার, শুভ ও রোকনুজ্জামান রাকিব; ‘বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল প্রযোজিত সিনেমা : নাই মামা, নাকি শকুনি মামা’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ১, সংখ্যা ১, জুলাই ২০১১, পৃ. ২৫, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
১৫. আজম, মোহাম্মদ (২০১৩ : ২১৮); ‘‘অশ্লীলতা’-বিরোধী প্রপাগান্ডা ও ‘সুস্থ’ চলচ্চিত্রের যুগে ঢাকাই সিনেমা’; মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
১৬. প্রাগুক্ত; আজম, মোহাম্মদ (২০১৩ : ২১৯)।
১৭. চাইলে দেখতে পারেন : https://www.youtube.com/watch?v=nFEED0FzjKo ও https://www.youtube.com/watch?v=31f31eKgQLY
১৮. হক, ফাহমিদুল (২০১১ : ৫২); ‘‘আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী’ ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি’; অসম্মতি উৎপাদন : গণমাধ্যম-বিষয়ক প্রতিভাবনা; সংহতি, ঢাকা।
১৯. http://en.wikipedia.org/wiki/Shah_Rukh_Khan#Endorsements
২০. http://www.boxofficekolkata.in/2014/10/yoddha-warrior-2013.html
২১. http://goo.gl/Ju2LLf
২২. http://mutiny.wordpress.com/2007/02/01/bollywood-vs-hollywood-the-complete-breakdown/
২৩. মজহার, ফরহাদ (২০১১ : ৫৮); মার্কস পাঠের ভূমিকা; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
২৪. http://mutiny.wordpress.com/2007/02/01/bollywood-vs-hollywood-the-complete-breakdown/
২৫. http://mutiny.wordpress.com/2007/02/01/bollywood-vs-hollywood-the-complete-breakdown/
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ম্যাজিক লণ্ঠনের ৮ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন