কাওসার বকুল
প্রকাশিত ১৩ জুন ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
দ্য রিভার : দৃকমাধ্যমে রেঁনোয়া’র প্রাচ্যনির্মাণ
কাওসার বকুল

প্রায় দুশো বছর ব্রিটিশদের শাসন-শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো ভারতবর্ষের মানুষ। নানারকম দমনপীড়নের শিকার এই মানুষগুলোর ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে জমেছিলো ক্ষোভ; সেই সঙ্গে উন্মুখ হয়ে ছিলো মুক্তির অপেক্ষায়। মুক্তিকামী এই মানুষদের এক কাতারে যিনি এনেছিলেন তার কথা হয়তো অনেকেরই জানা। নানা ত্যাগ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে অবশেষে ভারতবর্ষের মানুষদের নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তোলেন, ৪৭-এ এসে ব্রিটিশরা সেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে এদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ব্রিটিশরা চলে গেলো, তবে বীজ বুনে গেলো আরেকটি কলঙ্কময় ইতিহাসের। রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় একদিকে বিভক্ত হলো ভারতবর্ষ, অন্যদিকে তারই জের ধরে ১৯৪৮-এ আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন ভারতীয়দের মুক্তির নায়ক গান্ধী।
গান্ধীর মৃত্যুর পর হাঙ্গেরির এক চলচ্চিত্রনির্মাতা ও প্রযোজক গ্যাব্রিয়েল প্যাস্কাল (Gabriel Pascal) তার জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণে আগ্রহী হন। এজন্য তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে একটি চুক্তিও করেন। কিন্তু ১৯৫৪-তে হঠাৎ-ই প্যাস্কাল মারা গেলে গান্ধীকে নিয়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে ডেভিড লিয়েন ও স্যাম স্পিগেল গান্ধীকে নিয়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তারাও সেটি করতে পারেননি। অবশেষে ১৯৮২ সালে স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরো নির্মাণ করেন বহুকাঙ্ক্ষিত চলচ্চিত্র গান্ধী।
ভারতবর্ষ যতোদিন থাকবে ততোদিন গুরুত্ব থাকবে গান্ধীকে নিয়ে প্রথম নির্মিত এই চলচ্চিত্রের; গান্ধীর সঙ্গে বেঁচে থাকবেন অ্যাটেনবরোও। একজন চলচ্চিত্রনির্মাতার একজীবনে এর চাইতে বড়ো পাওয়া আর কী হতে পারে! এটা একটা দিক; অন্যদিকে, যাদের জন্য এতো রক্তপাত, জীবনের এতো অবগাহন; যাদের উপনিবেশের বিষবাষ্প বয়ে বেড়াতে হচ্ছে আজ অবধি; যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে সেই সাধারণ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী আজকের গান্ধীজি—সেই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হাতেই নির্মাণ হলো গান্ধীর জীবনের ইতিহাস!
অন্যদিকে হীরালাল থেকে শুরু করে দাদাসাহেব ফালকে হয়ে আরো ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও ভারতীয় চলচ্চিত্র কেনো জানি মানুষের জীবনের কাছাকাছি পৌঁছতে পারছিলো না। এই যে প্রকৃতি, নদী, নদীর ঘাটে বাচ্চাদের লাফিয়ে পড়া, কলসি কাঁখে মেয়েদের বাড়ি ফেরা কিংবা নদীর তীরে গড়ে ওঠা সবুজে ঘেরা গাছপালা—এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কেনো জানি কারো চোখেই পড়লো না। এগুলো যে শিল্প হতে পারে কিংবা চলচ্চিত্রের আধেয়তে আসতে পারে, সেটির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হলো ১৯৪৮ সাল অবধি, ফরাসি চলচ্চিত্রনির্মাতা জ্যঁ রেঁনোয়া আসা পর্যন্ত। ভারতবর্ষের এই অপরূপ সৌন্দর্যকে তিনিই প্রথম তুলে ধরেন দ্য রিভার-এ (১৯৫১)।
রেঁনোয়া’র আসাটা ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রে কেবল নতুন মাত্রাই যোগ করেনি, শুরু করেছে এক নতুন অধ্যায়েরও। এই প্রভাবের ব্যাপকতা এতো যে, ভারতীয় চলচ্চিত্রকে যদি মোটাদাগে ভাগ করি তবে এর একভাগে পড়বে রেঁনোয়া আসার আগের চলচ্চিত্র আর অন্যভাগে পড়বে এর পরের চলচ্চিত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের চারপাশের সৌন্দর্যকে বোঝার জন্য কেনো রেঁনোয়ার প্রয়োজন পড়ে? রেঁনোয়া আসার আগেও এই পুকুর, নদী, ঘাট সবই ছিলো, তখন কেনো আমরা এই সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারিনি? তাহলে রেঁনোয়া এসে কী এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন যেটা পুরো ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসলো!
এ কথা সত্য, ভারতের সমসাময়িক চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে দ্য রিভার-এর একধরনের ভিন্নতা আছে। যে কারণেই নির্মাণের এতো বছর পরও চলচ্চিত্রটি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন পড়ে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এ রকম চিন্তা সত্যিই নতুন করে ভাবায়। আমার আলোচনার বিষয় রেঁনোয়া’র সেই দ্য রিভার।
চলচ্চিত্রের রেঁনোয়া
দ্য রুলস অব দ্য গেম-এর (১৯৩৯) উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে দর্শকের ক্ষোভের মুখে পড়েন রেঁনোয়া। চলচ্চিত্রের পর্দায় নিজেদের অন্তঃসারশূন্যতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলো না ফরাসি অভিজাতরা। দর্শকের এ রকম প্রতিক্রিয়ায় ঝামেলা এড়াতে রেঁনোয়া একশো ১৩ মিনিটের চলচ্চিত্রকে কাটাছেঁড়া করে একশো মিনিটে কমিয়ে আনেন। তার পরও দর্শক চলচ্চিত্রটি ভালোভাবে গ্রহণ করছে না দেখে, দ্বিতীয়বারের মতো দৃশ্য ছাঁটাই করে ৯৪ মিনিট করা হয়। বিষয়টির সুরাহা এতেও হয়নি। অবশেষে প্রদর্শন করা হয় ৮১ মিনিটের খাপছাড়া দ্য রুলস অব দ্য গেম। এতকিছুর পরেও চলচ্চিত্রটি বিতর্ক এড়াতে পারেনি; ক্ষুব্ধ এক দর্শক প্রেক্ষাগৃহে আগুন ধরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সব প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় দ্য রুলস অব দ্য গেম। উচ্চবিত্তের কথা বিবেচনায় রেখে ফরাসি সরকারও চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করে দেয়। ঘটনা এখানেই শেষ হয় না, ফ্রান্স ছেড়ে ইতালিতে পালিয়ে যেতে হয় রেঁনোয়া’কে।
দর্শকের এ রকম প্রতিক্রিয়ায় থেমে যাননি রেঁনোয়া; ইতালিতে পালিয়ে গিয়ে টসকা (Tosca) নামের এক চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্যের কাজ শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে চলচ্চিত্র বিষয়ে পাঠদানের দায়িত্বও পেয়ে যান ‘সেন্ট্রো এক্সপেরিমেন্টালে দি সিনেমাটোগ্রাফিয়া’য় (Centro Sperimentale di Cinematografia)। এ সময় প্রথমবারের মতো হলিউডে গিয়ে সোয়াম্প ওয়াটার (Swamp Water, 1941) নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণেরও সুযোগ হয় রেঁনোয়া’র। ৪৫-এ এসে ডায়েরি অব অ্যা চেম্বারমেড নির্মাণের পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি রেঁনোয়া’কে। ততোদিনে অবশ্য ফ্রান্সে কিছু চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সমালোচক দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের লেখনীতে রেঁনোয়া’র ৩০ দশকের সঙ্কটগুলোও আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকে, ফলে এ সময়ে যশ, খ্যাতি, মর্যাদা সবই পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণে তার সদিচ্ছার কোনো কমতি ছিলো—এ কথা বলবো না, তবে ৩০ দশকের চলচ্চিত্রের মতো এগুলো সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেনি।
বিষয়বস্তু ও উপস্থাপন কৌশলের ভিত্তিতেও রেঁনোয়া’র চলচ্চিত্রকে মোটাদাগে দুটি ভাগে ফেলা যায়। এর একভাগে ২০ শতকের ৩০ দশকে নির্মিত চলচ্চিত্র, আর অন্যভাগে ৫০ ও ৬০ দশকের চলচ্চিত্র। তবে তার ৬০ দশকের চলচ্চিত্রে একধরনের অস্থিরতার আভাস পাওয়া যায়। মূলত ফ্রান্সের বাইরে হলিউড, ইতালি, ভারতসহ নানা দেশ ঘুরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে তার চলচ্চিত্রে এ অস্থিরতা ঢুকে পড়ে। তিনি আসলে কোনো ছকে আটকে না থেকে নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও বিচক্ষণতায় নির্মাণ করেছিলেন এ সময়ের চলচ্চিত্রগুলো।
যুক্তির চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই আবেগকে প্রাধান্য দিতেন রেঁনোয়া। তার মানে এই নয়, তিনি যুক্তিহীন মানুষ ছিলেন। তিনি প্রাধান্য দিতেন মানুষের ভিতরের মানুষটাকে। যে কারণে
উনি শিল্পীদের চরিত্র এবং ঘটনাগুলিকে সবিস্তারে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিতেন, তারপর অত্যন্ত গভীরভাবে নতুনদের নিয়ে মহলা করতেন। মহলা ছাড়াও সমস্ত সময় নতুন শিল্পীদের প্রতিটি হাব-ভাব তিনি গোপনে লক্ষ করে রাখতেন। সংলাপ বলার সঙ্গে ঐ হাব-ভাবগুলিকেও উনি-প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতেন।১
অভিনয়টাকে রেঁনোয়া জীবনের বাইরের কিছু মনে করতেন না। ব্যক্তিজীবনে একজন মানুষ যে রকম আচরণ করে, তিনি চাইতেন অভিনয়টাও যেনো স্বাভাবিক জীবনের মতোই হয়। বার বার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বলতেন, অভিনয়কে অভিনয় না ভেবে নিজের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে হবে। এজন্য তিনি অভিনয়ের সময় ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক থাকারও উপদেশ দিতেন। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অনেক চরিত্রে অভিনয় করাতেন অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী দিয়ে; এক্ষেত্রে অভিনয়ের সময় তাদেরকে কোনো রকম চাপ না দেওয়ার কথাও বলতেন সেটের অন্যদের।
নিজস্ব অভিনয় কৌশলে রেঁনোয়া বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রসহ নির্মাণ করেছেন ৪০টিরও বেশি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে নানা (১৯২৬), দ্য বিচ (১৯৩১), তোনি (১৯৩৫), গ্রান্ড ইলিউশন (১৯৩৭), দ্য রুলস অব দ্য গেম (১৯৩৯), ডায়েরি অব অ্যা চেম্বারমেড (১৯৪৫), দ্য রিভার (১৯৫১), দ্য গোল্ডেন কোচ (১৯৫২), ফ্রেঞ্চ ক্যান ক্যান (১৯৫৪), পিকনিক অন দ্য গ্রাস (১৯৫৯) উল্লেখযোগ্য। তার এই শিল্পময় দীর্ঘজীবনে বিভিন্ন অবদানের স্বীকৃতি—সম্মানসূচক অস্কার ও ফ্রান্স থেকে পান ‘লিজন অব অনার’। ১৯৭৯ সালে বিখ্যাত এ নির্মাতা আমাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে।
‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, তাদের মোরা ছাত্র’
দ্য রিভার-এর শুটিংয়ের সময় রেঁনোয়া যে নৌকায় ছিলেন তার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অন্য একটি নৌকা। নৌকার উপর উবু হয়ে বসে একজন কুলকুচি করে পিচকিরির মতো মুখের জল নদীতে ফেলছে। রেঁনোয়া মোহিত হয়ে সেদিকে তাকান। সাধারণ এই দৃশ্যে কী এমন থাকতে পারে, রেঁনোয়ার মতো চলচ্চিত্রনির্মাতা দেখে মুগ্ধ হন? রেঁনোয়ার ভাষায়, ‘যে দেশে মানুষ যুদ্ধ দেখেনি শুধু তাদের পক্ষেই সম্ভব এমন নিশ্চিন্তে উবু হয়ে বসে থাকা, তাছাড়া প্রকৃতি ও জীবন এখানে এমন শিথিল ছন্দে আবদ্ধ যে, ওভাবে বসাটাই লোকটির পক্ষে অবশ্যম্ভাবী।’২
সাধারণ এই বিষয় তিনি ভাবনায় আনলেন ঠিক আছে, কিন্তু এখানকার মানুষদের তিনি কোন্ দৃষ্টিতে দেখলেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আগের যুগে মালিকরা দাসদের পেশীবহুল সুঠাম দেহের ছবি এঁকে তাদের ভালো থাকার বয়ান দিতো। কিন্তু দাস তো দাসই থেকে যেতো। ঔপনিবেশিক ভারতে এসে রেঁনোয়া নৌকায় উবু হয়ে বসাটাকে তুলনা করলেন যুদ্ধ না-দেখা মানুষের সঙ্গে। আবার সুখ-শান্তিরও খোঁজ করলেন উবু হয়ে বসার মধ্যে। অথচ ভারতবর্ষের হাজার বছরের ইতিহাস কিন্তু তার উল্টো কথা বলে। নিরীহ দেখালেও সবসময় সংগ্রামের মধ্যেই ছিলো এই মানুষেরা। বিজাতীয়দের দ্বারা শোষিত হতে হতে সবশেষ ব্রিটিশদের শোষণে একেবারে কাঁকড়ার খোসা হয়ে গেছে এই জনপদের মানুষ। ‘নিরীহ’ এই মানুষগুলোর সংগ্রামে হয়তো বোমা-বন্দুক ছিলো না; কিন্তু হাজারো মানুষের রক্ত ছিলো। রেঁনোয়া কি সেটা জানতেন না, নাকি ইচ্ছে করেই এমনটা করলেন! তিনি কিন্তু উবু হয়ে বসাটা দেখালেও ব্রিটিশ উপনিবেশের কথা একবারও আনলেন না। কারণ ভারতীয়দের সুখের কথা তো ব্রিটিশ উপনিবেশকেই জায়েজ করে!
রেঁনোয়া’র দৃষ্টিভঙ্গি আর ভারতবর্ষ তথা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। উনি এখানে এসেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করে আবার চলেও গেছেন। যে অল্প সময় তিনি ভারতবর্ষে কাটিয়েছেন, তার অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করেছেন দ্য রিভার-এর কাজে। এজন্য হয়তো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেননি এখানকার সমাজ, প্রকৃতি ও মানুষকে। জানতে পারেননি (নাকি জানতে চাননি?) খালি গায়ে বসে কুলকুচি করা মানুষটার ওই দশা কার শোষণে! কিন্তু তার পরও বলতে আপত্তি নেই, রেঁনোয়া’র আসাটা ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রের মোড় ইতিবাচক দিকেই ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। কারণ এই উপমহাদেশে চলচ্চিত্র মানেই ছিলো প্রেম, নায়কের শৌর্যবীর্য, খলনায়কের চিৎকার, মারপিট এবং সবশেষে মিলন; সঙ্গে গোটাকয়েক গান। এখানকার চলচ্চিত্রের সঙ্গে মূলত জনপ্রিয় লোকমাধ্যম যাত্রাপালার বড়ো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিলো; অন্যভাবে বললে যাত্রার যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনই ভারতীয় চলচ্চিত্র। সুতরাং এই যে প্রকৃতি, লাঙল দিয়ে চাষ করে কিংবা বাড়ির উঠানে কৃষানির ধানের কাজ—এগুলোও যে শিল্প হয়ে উঠতে পারে, উপমহাদেশের নির্মাতারা সেটা কখনো ভাবেনওনি। তাদের মধ্যে এই বোধটা ঢুকিয়ে দিলেন রেঁনোয়া।
দ্য রিভার-এ তিনিই প্রথম দেখালেন নদী, নদীর ঘাটে মেয়েদের স্নান কিংবা নৌকায় বসে মুখ ধোয়ার সেই দৃশ্যের সৌন্দর্যটাকে। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই পরবর্তী সময়ে সত্যজিৎ এবং সত্যজিৎ হয়ে আরো অনেকেই প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য বোঝার চেষ্টা করেছেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা হরিসাধন দাশগুপ্তের সহজ-সরল স্বীকারোক্তিতে, ‘রেঁনোয়ার আসাটা আমাদের, পার্সোনালি আমার, সত্যজিৎ রায়ের এবং সারা ভারতবর্ষের ফিল্মের জগতে একটা পরিবর্তন আনলো। সেটাতে আমি বা আমরা ইন্সপায়ার্ড হই। ... সত্যজিৎ রায়ও খুব ইনফ্লুয়েন্স হয়েছিলেন।’৩ যদিও সত্যজিতের ক্ষেত্রে ডি সিকা’র বাইসাইকেল থিভস্-এর প্রভাবের কথাটা বেশি শোনা যায়, তার পরও রেঁনোয়ার প্রভাব যে তার ওপর একেবারেই পড়েনি-এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। রেঁনোয়া এখানে এসেছেন, নিজের ভাবনা-চিন্তাকে উন্মুক্ত করে দেখিয়েছেন, সেরকম চিন্তা করবার বীজ বপন করেছেন এখানকার চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নক্ষত্রদের মাঝে।
দেহ গেলে কী যায় বলো, মন গেলে তো সবই যায়
বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্রনির্মাতা মার্টিন ক্রুসেস-এর পছন্দের তালিকায় পৃথিবীর সেরা দুটি রঙিন চলচ্চিত্রের একটি দ্য রিভার। চলচ্চিত্রটি মার্টিন-এর কেবল পছন্দের তালিকায় সীমাবদ্ধই ছিলো না,এর প্রেমে পড়ে পুনরায় প্রিন্ট তৈরিতে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে দ্য রিভার-এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে ভারতে এসে দ্য দার্জিলিং লিমিটেড (২০০৭) নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন আরেক মার্কিন নির্মাতা ওয়েস অ্যান্ডারসন। এর বাইরেও দ্য রিভার নির্মাণ করে বোদ্ধামহল থেকে বন্ধুমহল সব জায়গায় রেঁনোয়া পেয়েছিলেন সম্মান-খ্যাতি; পাশাপাশি ১৯৫২ সালের বক্স অফিসেও হিট ছিলো দ্য রিভার।এখন দেখে নিই বিখ্যাত এতো মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকা চলচ্চিত্রটিতে রেঁনোয়া ঠিক কী দেখিয়েছেন—
ভারতে বাস করা উচ্চ-মধ্যবিত্ত এক ব্রিটিশ পরিবারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দ্য রিভার-এর কাহিনি। পরিবারটিতে সবার বড়ো মেয়ে হ্যারিয়েট। তাদের ছয় বোনের আদরের একমাত্র ভাই বগি। প্রতিবেশী গরিব কানুর সঙ্গে খেলাধুলায় বগি সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। কচ্ছপ,পাখির বাসা খোঁজার পাশাপাশি গোখরা সাপ ধরার জন্য মাঝে মাঝেই দুই বন্ধু নলের বাঁশি আর দুধ নিয়ে জঙ্গলে ছুটে যায়।
হ্যারিয়েটের বাবা গঙ্গার তীরে একটি পাটকল চালান। ভারতে বসবাস করলেও তাদের বাড়িতে বিশুদ্ধ পাশ্চাত্য পরিবেশ;তবু প্রাচ্য,পাশ্চাত্য মিলিয়েই বড়ো হতে থাকে তারা। বাড়িতে সবসময় চঞ্চল বুদ্ধিমতী হ্যারিয়েট,তার বান্ধবী ভ্যালেরি’র আচরণে কিছুটা নাটকীয়তা চোখে পড়ে;অন্যদিকে পাশের বাড়ির মেলানি অনেকটা ধীরস্থির। হ্যারিয়েটদের দেখভালের জন্য রাখা ন্যান-এর সঙ্গে সবাই মিলে নানারকম চঞ্চলতায় সময় বয়ে যায়;অন্যদিকে মেলানির বাড়িতে বেড়াতে আসে যুদ্ধে এক পা হারানো ক্যাপ্টেন জন।
ক্রাচ ব্যবহার না করায় জনকে দেখে অবশ্য বোঝা যায় না, তার পা নেই। প্রথম দেখাতেই জনের প্রেমে পড়ে যায় হ্যারিয়েট। জনকে একপর্যায়ে বাড়িতে আমন্ত্রণও জানায় দেওয়ালি উৎসবে। ক্রমশ দুর্বল হতে থাকা হ্যারিয়েট একদিন গোপনে জনকে অনুসরণ করে; কলাবাগানের মাঝের এক ডোবার ধারে গিয়ে দেখে ভ্যালেরি’কে চুমু খাচ্ছে জন। এদিকে সাপের দংশনে মারা পড়ে বগি। একদিকে ভাইয়ের মৃত্যু, অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষকে হারানো—আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় হ্যারিয়েট। কিন্তু নদীতে ডুবে তার আর মরা হয় না; কানুর সহায়তায় হ্যারিয়েট বেঁচে যায়। অবশেষে জানা যায়, হ্যারিয়েট কিংবা ভ্যালেরি নয়, জন ভালোবাসে মেলানিকে। বয়ঃসন্ধিতে আসা তিন নারীর গল্পের ফাঁকে ভারতের অধিবাসীদের দর্শন,ধর্মীয় মূল্যবোধ,সংস্কৃতি সর্বোপরি নদীর চিত্রায়ণ করেছেন রেঁনোয়া।
দ্য রিভার-এর আগ পর্যন্ত নাচে-গানে ভরপুর ভারতের চলচ্চিত্রে রাজা-জমিদার কিংবা দেবদেবীর সরব উপস্থিতি থাকলেও আড়ালে-আবডালে ছিলো এখানকার প্রকৃতির স্বাভাবিক অপরূপ সৌন্দর্য। চলচ্চিত্রে যে দু-একজন নিম্নবর্ণের মানুষ উঠে আসতো সেটাও কোনো না কোনোভাবে উচ্চবর্গ-দেবদেবীর বদৌলতে। নিত্যদিনের কাজকর্ম চলচ্চিত্রে উঠে আসাটা ছিলো কল্পনার বাইরে। সেই তুলনায় দ্য রিভার নির্মাণ করে রেঁনোয়া প্রশংসা কুড়াবেন এটাই স্বাভাবিক। নদী, নদীতে চলা নৌকা, পাটকলে নৌকা থেকে পাট নামানো কিংবা বাজারে জনসাধারণের নিত্যদিনের কেনা-বেচা, সাপ খেলা সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রে দেখালেন তিনিই। তাছাড়া এখানকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, পূজা-পার্বণ কিংবা উৎসবগুলোর চিত্রও ফুটে উঠেছে চলচ্চিত্রটিতে। সর্বোপরি ভারতের প্রকৃতি, এখানকার মানুষের সংস্কৃতিকে দৃকমাধ্যমে তুলে ধরার সূচনা করায় রেঁনোয়া সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু অবাক লাগে, রেঁনোয়া চলচ্চিত্র-নির্মাণের আশায় সুদূর ফ্রান্স থেকে ভারতবর্ষে আসলেন; অথচ যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন তার কেন্দ্রে রাখলেন এখানকার এক ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ পরিবারকে। দ্য রিভার-এ এখানকার নদী, জল, প্রকৃতি সবই ঠিক থাকলো, ‘শুধু’ কেন্দ্রের মানুষগুলো ভিন্ন। বলতে পারেন, উনি তো ভারতে থাকা ব্রিটিশদের চিত্রায়ণ করছেন, ব্রিটিশদের কথা বলতে গেলে এখানকার লোকজনও তো উঠে আসবে; উঠে এসেছেও। কিন্তু সেই উঠে আসাটা কেমন?
রেঁনোয়া’র উপস্থাপনে প্রাচ্য
সৈয়দ মুজতবা আলী একবার আফ্রিকা যাবেন বলে ঠিক করলেন। গৃহপরিচারিকাকে সঙ্গে নিতে চাইলে কেনো জানি তিনি যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। অনেক জোরাজুরির পরেও তিনি বলছিলেন না, ঠিক কেনো যাবেন না। একপর্যায়ে মুজতবার কাছে আসল কারণ জানালেন গৃহপরিচারিকা। তার ধারণা—শারীরিকভাবে যেহেতু তিনি একটু মোটা, আফ্রিকার লোকজন তাকে খেয়ে ফেলতে পারে, তাই তিনি কোনোভাবেই আফ্রিকা যাবেন না। দীর্ঘদিন ধরে পাশ্চাত্য-প্রাচ্যে আফ্রিকা নিয়ে যে চর্চা তারই ফসল গৃহপরিচারিকার এ ভয়। পাশ্চাত্য আফ্রিকা নিয়ে যে ধরনের চর্চা করেছে, তাতে করে আসলে যে কারোরই পক্ষে এর বাইরে গিয়ে ভাববার অবকাশ কম।
একইভাবে প্রাচ্য নিয়েও ব্রিটিশরা দীর্ঘ সময় ধরে চর্চা করেছে এবং তা ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী। সেই ধারণার মূলে আছে ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং প্রাচ্যের নিকৃষ্টতার বোধ। এই বোধই আসলে ব্রিটিশদের উপনিবেশকে বৈধতা দিয়েছে। প্রাচ্য যেহেতু বাইরের গবেষকদের কাছে দূর ও অজানা; তাই তারা যখনই প্রাচ্যকে চিন্তা করেছে অমনি বাস্তব প্রাচ্যকে তারা নির্মিত ‘প্রাচ্য’ রূপেই দেখেছে। এমনকি বাস্তবের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে কল্পনার প্রাচ্যকে।৪
কার্ল মার্কসের মতো বিচক্ষণ ব্যক্তিও প্রাচ্যবাদের প্যাঁচে পড়েছিলেন। একসময় তারও ধারণা ছিলো, প্রাচ্যসমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তন হাজার বছর ধরে একই জায়গায় থেমে আছে এবং এই গতিহীনতার বীজ তার গ্রাম-সমাজের বিশিষ্ট গড়নের মধ্যেই নিহিত। প্রাচ্য নিয়ে মার্কসের বক্তব্য ছিলো—‘সমাজের অভ্যন্তরে এমন কোনও শক্তি নেই সেখানে যা এই অনড়তা কাটিয়ে দেশকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারে ঐতিহাসিক বিবর্তনের রাজপথে। একমাত্র বহিরাগত কোনও শক্তির ধ্বংসাত্মক আক্রমণেই কাটতে পারে সেই স্থাণুত্ব।’৫ সুতরাং মার্কসের চিন্তাতেও ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষে বিপ্লবই নিয়ে এসেছিলো। বিশ্ববাসীর কাছ থেকে ব্রিটিশরা ‘অসভ্য’, ‘বর্বর’ ভারতবর্ষ শাসনের বৈধতা আদায় করেছিলো এই চর্চা দিয়েই। যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা করেছিলো লাল পতাকার জুজুর ভয় দেখিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে; আরো পরে ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনায় জঙ্গি ডিসকোর্স নিয়ে। যার খেসারত গত দেড় দশক ধরে সারা পৃথিবীর মুসলিমকে দিতে হচ্ছে।
যাই হোক, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার চার বছর পরে এসে রেঁনোয়া কেনো জানি প্রাচ্যবাদের সেই ধারাতেই কথা বললেন। চলচ্চিত্র শুরুর পাঁচ মিনিট ৫২ সেকেন্ডে কয়েকজন নারীর কাজে যাওয়ার দৃশ্যে, আড়ালে থেকে গল্প বলা হ্যারিয়েটের কণ্ঠে প্রথম শোনা যায় কার্ল মার্কসের ভাষায় বাংলার সেই ‘অনড়তা’র কথা, ‘জীবন ধারণের জন্য নদীর তীরের গ্রামগুলোর মানুষজনদের গায়ে খাটতে হয়; হাজার বছরের ঐতিহ্যে সেটা অপরিবর্তনীয়।’
ব্রিটিশ যে পরিবারকে ঘিরে দ্য রিভার, সে পরিবারের ছয় বোনের আদরের একমাত্র ভাই বগি। আট-দশ বছরের বগিকে সবসময় হাফপ্যান্ট পরে হাফহাতা শার্ট ইন করে জুতা পায়ে দেখা যায়। ফুটফুটে চেহারার এই ছেলের ইতিবাচক উপস্থাপনই চোখে পড়ে। তার খেলার সাথী কানু। খালি গায়ে ধুতি পরে সেটা নেংটি মেরে, খালি পায়েই বগির সঙ্গে দেখা যায় কানুকে। বাজারে সাপ খেলা দেখা থেকে জঙ্গলে সাপ ধরতে যাওয়া—সবই তারা করে একসঙ্গে।
ব্রিটিশ পরিবারের ফুটফুটে বগির বন্ধু কৃষ্ণকায় দরিদ্র কানু। এই কানু এতটাই কৃষ্ণকায়, ভারতবর্ষে যার মতো আরেকটি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এটা হয়তো ঠিক, ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লোকের উপনিবেশ থাকায় গায়ের রঙ, শারীরিক গড়নে একধরনের প্রভাব পড়েছে। কিন্তু এটাও তো সত্য, আমরা গড়পড়তা অতোটা কালো নই, যতোটা কালো কানু। হয়তো বলতে পারেন, কানু কালো হয়েছে তাতে ক্ষতি কীসের? ক্ষতি ছিলো না, কানু যদি এখানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব না করতো। কিন্তু এখানে কানু তো আর শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না; পুরো ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করছে এই বালক। যেমনভাবে ব্রিটিশদের প্রতিনিধিত্ব করছে বগি। অথচ রেঁনোয়া কেনো জানি এই রকম কানুকেই খুঁজে আনলেন! কাহিনি এখানে শেষ হলেই ভালো হতো; কানুকে দিয়ে নির্মাতা আর যা যা করালেন সেটা দেখে রেঁনোয়াকে আরো ভালো বোঝা যায়।
বগিকে বার বার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় কানু। এমনকি সাপ ধরার জন্য যে দুধের প্রয়োজন সেটার জোগাড়ও কানুই করে। প্রথমবার জঙ্গলে সাপ দেখতে যায় দু’বন্ধু। কিন্তু সাপের যখন দেখা মিলে, অমনি বগিকে একা রেখে দূরে সরে যায় কানু। একপর্যায়ে সে বগিকে রেখে দেয়ালের ওপাশে পার হয়ে যায়। সাধারণ চোখে অবশ্য মনে হতেই পারে, বিপদে পড়লে তো এমন হয়। কিন্তু একটু অন্যভাবে চিন্তা করলে বিষয়টা দাঁড়ায়, ভারতীয় কানু ব্রিটিশ বগিকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বিপদের মুখে ফেলে সরে যাচ্ছে। আর পরের বার সাপ ধরতে গিয়ে মারা পড়ে বগি। প্রথম থেকেই কানুকে ন্যাংটা করে দর্শকের সামনে হাজির করে আস্তে আস্তে স্বার্থপর হিসেবে উপস্থাপন করে, অবশেষে খুনি চিহ্নিত করলেন রেঁনোয়া। এই হলো রেঁনোয়ার ভারতবর্ষ উপস্থাপন!
সাপ ধরতে যাওয়ার এই পুরো বিষয়টিকে অন্যভাবেও চিন্তা করা যায়। সাপটিকে যদি একটি বিপদ হিসেবে কল্পনা করি; তাহলে সাপের কাছে যাওয়া মানে বিপদের কাছে যাওয়া। কারণ সাপের হাতে জীবন চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সব জেনেও সেখানে যাওয়াটা নিঃসন্দেহে সাহসিকতার পরিচয় বহন করে। ডিসকভারি চ্যানেলে এখন হরহামেশাই দেখানো হচ্ছে, ভারতবর্ষে কারো বাড়িতে সাপ আছে, সাপটিকে ধরার জন্য নিয়ে আসা হচ্ছে সেই ব্রিটিশদেরই কাউকে। তারা এসে খালি হাতে সাপটিকে ধরে ফেলছে (সাপের কামড়টাও কোনো ব্যাপার না তাদের কাছে)। সাপটিকে ভয় হিসেবে না দেখে দাঁড় করাচ্ছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। সর্বোপরি তাদের সাহসিকতা এবং মানুষের কল্যাণে তাদের অবদানকে তুলে ধরছে। চলচ্চিত্রেও বগিকে সেরকম সাহসী বলেই মনে হয়। অন্যদিকে সাপ দেখে পালিয়ে যায় কানু। এছাড়া, দৃশ্যটিতে এক নারীকে সাপের পূজা করতেও দেখা যায়। তাহলে বিষয়টি দাঁড়ায়, ভয় পাওয়াটা আমাদের কাজ, বাঁচার জন্য উপায় না দেখে আমরা সাপের পূজা করি; আর তাদের কাজ হলো ভয়টা জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এই বিবেচনায়ও তো রেঁনোয়া উচ্চস্থান বরাদ্দ রেখেছেন ব্রিটিশদের জন্যই!
ব্রিটিশ ‘মহান’, বাকি সব ইন্ডিয়ান
হ্যারিয়েটের বাবা পাটকল থেকে বাড়ি ফিরবেন। তার আগে বাজারের এক দোকানে গেছেন বাচ্চাদের জন্য ঘুড়ি কিনতে। কয়েক রকমের ঘুড়ি দেখে অবশেষে একটা পছন্দ হয় তার। একই রকম কয়েকটি ঘুড়ি দিতে বলে দাম জিজ্ঞেস করেন দোকানির কাছে। দোকানির উত্তর, ‘চার আনা।’ পকেট থেকে টাকা বের করে না দেখেই দোকানির হাতে তুলে দেন তিনি। টাকা হাতে পেয়েই দোকানি বিনয়ের সঙ্গে যেভাবে দুহাত কপাল অবধি উঁচিয়ে নমস্কার জানান; তা দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না প্রাচ্যের এই মানুষগুলোর কাছে ‘দেবতুল্য’ ইংরেজের স্থান।
পরের শটে তা আরো নতুন মাত্রা পায়; ঘুড়ি হাতে এবার হ্যারিয়েটের বাবাকে দেখা যায় বাঁশের সাঁকোর উপর। এ সময় কয়েকজন নারী, শিশু কাজে যাচ্ছিলো। ইংরেজের চোখ আটকে যায় ছোটো একটি কন্যাশিশুর দিকে। নাম ধরে ডাকতে দেখে বোঝা যায়, শিশুটি তার চেনা। কাছে এলে একটি ঘুড়ি তার হাতে দেন তিনি, সেটি হাতে নিয়েই চলে যায় শিশুটি। অবশ্য চলচ্চিত্র শুরুর পাঁচ মিনিট দুই সেকেন্ডের মাথায় বাবা সম্পর্কে হ্যারিয়েটের যে বর্ণনা তাতেও এমন তথ্যই পাওয়া যায়—‘মানুষ হিসেবে তিনি একজন বন্ধুর মতো; মানুষজনদের তিনি খুব ভালোবাসতেন, লোকেরাও তাকে খুব পছন্দ করতো।’ প্রথম শটে দোকানদারকে দামের অতিরিক্ত দেওয়া; পরের শটে শিশুটিকে ঘুড়ি দেওয়া—দুটো ঘটনাতেই মানুষ হিসেবে ইংরেজ ও ভারতীয়দের স্থান রেঁনোয়া পরিষ্কার করেন।
ঘটনা আরো একটু এগিয়ে নিই। ঘুড়ি তিনি কার হাতে তুলে দিলেন? এই শিশু তো বিধবা। বাল্যবিবাহ, বাল্যবিধবা ও বিধবাবিবাহ না হওয়া—নিঃসন্দেহে এই উপমহাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। রামমোহন, বিদ্যাসাগররা দীর্ঘ সময় ধরে সমাজ সংস্কারের মধ্য দিয়ে এই সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যবস্থা করেন, যদিও ব্রিটিশদের সহযোগিতা ছাড়া এর সমাধান হয়তো অতোটা সহজ হতো না। ব্রিটিশদের সহায়তায় ১৮২৯ সালে আইনিভাবে বন্ধ হয় সতীদাহ প্রথা এবং বিধবা-বিবাহ চালু হয় ১৮৫৬ সালে। অথচ প্রায় একশো বছর পর ১৯৫১ সালে ঠিক সেই ভারতবর্ষেই রেঁনোয়া দেখালেন বাল্যবিবাহ, বাল্যবিধবা; যদিও ততোদিনে ব্রিটিশরা চলে গেছে এবং ভারতবর্ষও অনেকটাই আগের অবস্থা থেকে সরে এসেছে। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর যে অবস্থান ছিলো দেড়-দুশো বছর আগে, সেখানেও এসেছে অনেকটাই পরিবর্তন। পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে ততোদিনে জনজীবনের সর্বত্রই নারীরা লক্ষণীয়ভাবে বিচরণ শুরু করে অবদানও রেখেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। তবু রেঁনোয়া কেনো জানি ভারতীয় নারীর সেই পুরনো ছকের বাইরে বের হতে পারলেন না। এখানেই শেষ নয়, চলচ্চিত্রজুড়েই ভারতবর্ষের নেতিবাচক উপস্থাপন, একটু খেয়াল করলেই সেটা চোখে পড়ে। মি. জন যখন নদীর তীরে বসে ভাবনায় মগ্ন ছিলেন, ঠিক সেই সময়েও তার পাশ দিয়ে ঘটিতে জল নিয়ে এক বিধবাকে যেতে দেখা যায়। এই বিধবাও শিশু।
এর আগের দৃশ্যে ৩১ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে ধুতি পরা এক ছেলেকে তার সমবয়সী নারীর হাত ধরে যেতে দেখা যায়। বুঝতে অসুবিধা হয় না, বছর আটেক বয়সের এরা বিয়ে করেছে। তাছাড়া হ্যারিয়েটের বাবা যখন ঘুড়ির দোকানের দিকে যাচ্ছিলেন, তখনো শাড়ি পরা এক কন্যাশিশুকে তার পিছু পিছু হাঁটিয়েছেন রেঁনোয়া। সর্বোপরি চলচ্চিত্রজুড়ে যে নারীদের দেখানো হয়েছে তাদের অল্পবয়সীদের কেউ বিবাহিত, না হয় বিধবা; আর অন্যদের কেউ পরিচারিকা নয়তো বাড়ির কাজ করছে, কখনো বা বাইরে কাজে যাচ্ছে। এর বাইরে কোনো নারীর উপস্থাপন চোখে পড়ে না। বলতে পারেন, সবই তো ঠিক আছে; ভারতবর্ষে অহরহ ঘটছে এসব। কিন্তু এর বাইরেও তো এখানে ‘বিনোদিনী, কুসুমকুমারী, দেবিকা রানি, তৃপ্তি মিত্র, কানন দেবী’৬, বেগম রোকেয়ার মতো নারীরাও ছিলেন। কিন্তু চর্চা হলো কেবল ভারতের অল্প বয়সে বিয়ে, বিধবা, মাতৃমৃত্যু, রুগ্ন মানুষ, অশিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে।
দ্য রিভার-এর শিক্ষিত নারী মেলানি। সে আবার এখানকার কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নয়, খোদ ব্রিটেন থেকে পড়াশোনা করা। তাছাড়া হ্যারিয়েটের বান্ধবী ভ্যালেরি’র পড়াশোনার কথাও বলা হয় ব্রিটেনেরই এক স্কুলে। তার মানে ভারতে পড়াশোনার কোনো সুযোগ নেই, পড়াশোনার জায়গা হলো ব্রিটেন, পড়তে চাইলে ব্রিটেনেই যেতে হবে। যদিও কলকাতাতেই ব্রিটিশদের সহায়তায় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ এবং ১৮৩৫ সালে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯ শতকের ভারতবর্ষে ভাষা-সাহিত্য-সঙ্গীতে সৃজনশীলতার যে বিস্ফোরণ, ঐতিহাসিকরা যে জাগরণকে সীমিতভাবে রেঁনেসাঁস আখ্যা দিয়েছেন, তাতে যারা অসামান্য অবদান রেখেছেন তাদের বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থী। এবং সেসময় মুক্তবুদ্ধি চর্চার শুরুটাও হিন্দু কলেজ থেকেই। অবশ্য রেঁনোয়া সেই কলেজে মেলানি কিংবা ভ্যালেরি’কে পাঠাবেন কেনো? সে কলেজ তো প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো ‘অসভ্য’, ‘বর্বর’ শ্রেণির মানুষদের সভ্য করার জন্য!
এছাড়া পুরো চলচ্চিত্রে চোখে পড়ে খালি গায়ে ধুতি পরা লোকদের উপস্থাপন। কিন্তু এখানকার লোকেরা ঠিক কী কারণে খালি গায়ে ঘুরে বেড়ায়—দ্য রিভার একবারও সেই প্রশ্ন তোলে না। আরেকটা ব্যাপার হলো, রেঁনোয়া যেখানে ভারতবর্ষের মানুষদের খালি গায়ে কেবল ধুতি পরা অবস্থায় দেখাচ্ছেন, তার সঙ্গেই ব্রিটিশদের উপস্থাপন করছেন আধুনিক পোশাকে। এতে করে প্রাচ্য, পাশ্চাত্যের মানুষের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, রিভার সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ক্যাপ্টেন জন-এর ‘অনন্যতা’
বান্ধবীর সঙ্গে গল্পে মেতে আছে হ্যারিয়েট। গৃহপরিচারিকা ন্যান ঝড়ের বেগে এসে জানায়, ‘সকালবেলা আমার হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেছে। হাত থেকে কিছু পড়ে গেলে অতিথি আসে।’ কথাগুলো বলেই গৃহপরিচারিকা পাশের বাড়িতে ক্যাপ্টেন জন নামে একজন বেড়াতে আসার সংবাদ দেয় হ্যারিয়েট ও ভ্যালেরি’কে। জনের আসার খবরটা দেওয়ার সময় ন্যান-এর চোখে-মুখে এমন ভাব যেনো হ্যারিয়েটের স্বপ্নের রাজকুমার জন। ন্যানের কথা শেষ না হতেই ভ্যালেরিসহ হ্যারিয়েট ও তার ছোটো বোনেরা দৌড়ে গিয়ে প্রাচীরের এপাশে লুকিয়ে উৎসুক হয়ে প্রথমবারের মতো দেখে ক্যাপ্টেন জনকে। প্রথম দেখাতেই জনের প্রেমে পড়ে যায় হ্যারিয়েট, ভ্যালেরি দুজনেই (যদিও ভ্যালেরি সে কথা গোপন করে)। দেওয়ালি উৎসবে আমন্ত্রণ জানিয়ে জনকে চিঠিও লেখে ভ্যালেরি, কিন্তু হ্যারিয়েট সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে যায় জনের কাছে, তাদের বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানায়।
এই হলো মোটাদাগে হ্যারিয়েট, ভ্যালেরি ও জনের প্রেমের গল্প। এখন কথা হলো, রেঁনোয়া যেখানে সাত-আট বছর বয়সী নারীদের বিয়ে, প্রয়োজনে বিধবা বানাতেও ছাড়লেন না, ঠিক সেখানেই দেখালেন এদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়ো ব্রিটিশ পরিবারের মেয়েরা কেবল প্রেমে পড়ছে। এটা একটা দিক, আরো একটা ব্যাপার হলো—ক্যাপ্টেন জনকে প্রথমবার দেখেই আকৃষ্ট হয়ে পড়লো মেয়ে দুটি। তিনি বিয়ে করেছেন কি করেননি, মানুষ হিসেবে ভালো নাকি মন্দ—এমনকি পরিচয়ের আগেই তার প্রেমে পড়ে গেলো তারা। এই মেয়েরা কী তাহলে ভারতে বসবাস করার কারণে কখনোই জনের মতো কাউকে দেখেনি? নাকি এখানে পছন্দ করার মতো কোনো পুরুষ নেই? যে কারণে ভ্যালেরি যখন বলে ক্যাপ্টেন জনের এক পা নেই, তার পরও হ্যারিয়েট তাকে ভালোবাসতে চায়।
দেওয়ালি উৎসবের দিন থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের শেষ অবধি হ্যারিয়েট, ভ্যালেরি যে যার মতো করে ক্যাপ্টেন জনের সঙ্গে প্রেম করার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে। দেওয়ালি উৎসবের রাতে সবার অলক্ষে জনের সঙ্গে ভ্যালেরি যখন একান্তে দেখা করে, কেবল জনকে খুশি করার মানসে সিগারেট খায়। আর জনকে আপন করে পাওয়ার আশায় নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনায় হ্যারিয়েট। তাছাড়া ন্যানের পরামর্শে একেক সময় একেক কাজ করে গেছে মেয়ে দুটি। কিন্তু ক্যাপ্টেন জন এগুলো জানার পরেও কোনো ভ্রূক্ষেপ করেননি। তিনি চাইলে হ্যারিয়েট, ভ্যালেরির যে কারো সঙ্গেই প্রেম করতে পারতেন। এমনকি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনেও হয়তো তেমন কোনো বেগ পেতে হতো না। কিন্তু জন এগুলোর কোনোটাই করেননি। বরং মেয়ে দুটোর ভালোবাসাকে তিনি ছেলেমানুষি এবং বয়সের ভুল বলে মনে করেছেন।
চলচ্চিত্রজুড়েই ক্যাপ্টেনকে সৎ, চরিত্রবান একজন সুপুরুষ হিসেবেই দেখি। রেঁনোয়া এখানেও কি তাহলে দেখাতে চেয়েছেন, ব্রিটিশ এই সুপুরুষদের প্রেমে মেয়েরা পড়তেই পারে, কিন্তু তাই বলে তাদের প্রেমে পড়া কিংবা ছেলেমানুষির সুযোগ কাজে লাগানোটা ব্রিটিশদের কাজ নয়? এরা চরিত্রবান, মেয়েরা এদের কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু পাশাপাশি এটাও তো প্রমাণ হয়ে যায়, ভারতে যোগ্য এমন কাউকে পায়নি এই মেয়েরা, যাদের প্রেমে তারা পড়তে পারে। যে কারণেই এক পা না থাকা ক্যাপ্টেন জনই তাদের কাছে হয়ে ওঠে স্বপ্নের রাজকুমার।
‘বাস্তববাদ ধারা’র দ্য রিভার
হ্যারিয়েটের পরিবার দেখানোর ফাঁকে যখনই ক্যামেরা বাইরে বেরিয়েছে, দেখা গেছে—নদী, পাট ভর্তি নৌকা, নৌকা ঠেলার দৃশ্য। নদী, নৌকা, পাটের বাইরে আর বোধহয় কিছুই নেই ভারতে! এই পাট দিয়ে এখানেও যে কিছু তৈরি হয়, সেটা কিন্তু একবারও দেখানো হয় না। আবার নৌকায় বয়ে নিয়ে যাওয়া পাটের মালিককেও খুঁজে পাওয়া যায় না দ্য রিভার-এ। তার মানে এই মানুষগুলো শুধুই শ্রমিক। আবার এই এতো পাট নিয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশদেরই পাটকলে। এর দ্বারা বুঝতে কষ্ট হয় না, ব্রিটিশরা না আসলে এখানকার এই বিপুল পরিমাণ পাট ‘নষ্ট’ হতো, কিংবা এ পাট দিয়ে কিছুই করার ছিলো না। এখন তাদের সহায়তায় নষ্টের হাত থেকে ‘রক্ষা’ পেলো এই পাট; ভারতবর্ষের ‘চাষারা’ কিছু পয়সার মুখও দেখলো।
অথচ নামমাত্র টাকায় এখানকার পাট কিনে ড্যান্ডিতে নিয়ে যেতো ব্রিটিশরা। এ দেশ থেকে কম দামে পাট নিয়ে কেবল ব্রিটেনের শিল্পের উন্নতিই তারা করেনি; সেই শিল্পজাত পণ্য ভারতবর্ষে এনে এখানকার শিল্পকে ধ্বংস করেছে; এখানকার সম্পদ ক্রমাগত ব্রিটেনে পাঠিয়ে আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। অন্যদিকে আবার নিজেদের পাট দিয়ে তৈরি পোশাক আমাদেরই কিনতে হয়েছে চড়া দামে। ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের যারা বিত্ত-বৈভবে সমাজের শীর্ষে অবস্থান করছিলেন, তাদের শিল্প সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়েছিলো এই পাট চাষীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে। এই ব্রিটিশদের অনেকেই গঙ্গার দু’ধারে পাটকল চালু করেছিলো এটি যেমন সত্য; তাদের মতো করে না হলেও এখানকার লোকজনও শুরু করেছিলো পাট দিয়ে জিনিসপত্র তৈরি; পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবসায়ও এগিয়ে এসেছিলেন এখানকার অনেকেই, এদের মধ্যে বেশি শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের ঠাকুর দা ‘দ্বারকানাথ ঠাকুরের’৭ নাম।
ভারতবর্ষ থেকে অন্য দেশে পণ্য রপ্তানি এবং জিনিসপত্র আমদানির জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যে কয়টি জাহাজ ছিলো তার বাইরে ব্যক্তিগতভাবে জাহাজের কোম্পানি গড়ে তোলেন দ্বারকানাথ নিজেই। জাহাজ এবং রানীগঞ্জের কয়লাখনি কিনে, সেই কয়লা সরবরাহ করে ভারতবর্ষে তিনি বাষ্পীয় প্রযুক্তিগত বাণিজ্যের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি চা-শিল্প, লবণ তৈরির কোম্পানিও ছিলো দ্বারকানাথের। রিভার-এ তো সেরকম কারো নাম উঠে আসে না। তার বদলে ফুটিয়ে তোলা হয় কেবল মাটির মূর্তি, বাজারে বাঁশ-বেতের সামগ্রী বানানোর দৃশ্য।
চলচ্চিত্রজুড়ে এখানকার মানুষের যে জীর্ণ-শীর্ণ চেহারাটা তুলে এনেছেন এর কী ব্যাখ্যা নির্মাতা দিবেন? উত্তর যদি হয়, ভারতবর্ষের মানুষেরাই তো কুটিরশিল্পের কাজগুলো সবচেয়ে ভালো পারে। আর কে বা আছে এ রকম কাজগুলো করতে পারে? রেঁনোয়া যদি এগুলোকে কুসংস্কার কিংবা অশিক্ষা না ভেবে শিল্প হিসেবেও দেখে থাকেন; তাহলেও বলবো, রেঁনোয়া’র দেখা আর আমাদের সত্যজিৎ কিংবা শিল্পী এস এম সুলতানের দেখার চোখ এক নয়।
অতঃপর রেঁনোয়া সফল
আলোচনার শুরুতে বলেছিলাম, গান্ধীকে ঘিরে অ্যাটেনবরো’র চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা। আর রিভার নিয়ে যা কিছু বলবার ছিলো ইতোমধ্যে আলোচনায় তার সবগুলোই বলা হয়ে গেছে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার; ব্রিটিশরা তো ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছে, আমরা আদিম-বন্য-অসভ্য; কারণ এতে তাদের উপনিবেশটা জায়েজ হয়। আমরা জানি, একটি চিত্র হাজার কথার চেয়েও অনেক বেশি কথা বলে। রিভার-এ রেঁনোয়া তার ভাগ্নে সিনেমাটোগ্রাফার ক্লদ রেঁনোয়া’র সহায়তায় ধারণ করেছেন হাজারো চিত্র। চলচ্চিত্র শুরুর প্রথম দৃশ্য থেকে নৌকায় বসে মাঝির গান, বাজারের দৃশ্য কিংবা নদীতে নৌকা চলা, পূজা—যেদিকে চোখ গেছে সেদিক থেকেই তিনি কেবল ইমেজ ধরেছেন।
নদীতে নৌকায় পাট নিয়ে চলার দৃশ্যগুলো লঙ্ শটে প্যান করে যেভাবে দেখিয়েছেন, তাতে কারোরই বুঝতে অসুবিধা হবে না এগুলো কোন্ অঞ্চলের দৃশ্য; রাস্তাঘাট, মানুষজন, নদী, জঙ্গল, কুটিরশিল্পের কাজ, গ্রামীণ সংস্কৃতি, পূজার দৃশ্য দেখে যে কেউ বুঝে নিতে পারেন, এটা একেবারেই প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেখানে এখনো আধুনিকতার ছায়া-ছোঁয়া লাগেনি, বন্য দশা থেকে কেবল একটু সভ্য হয়েছে মাত্র। আর সেখানেই হয়তো দ্য রিভার ও রেঁনোয়া’র ‘সফলতা’।
লেখক : কাওসার বকুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
bokulmcj71@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. সেনগুপ্ত, রামানন্দ (১৯৯৬ : ৭৯); ‘জঁ রনোয়া এবং তাঁর আগে ও পরে : আমার অভিজ্ঞতা’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ১; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
২. প্রাগুক্ত; সেনগুপ্ত, রামানন্দ (১৯৯৬ : ৭৮)।
৩. দাশগুপ্ত, হরিসাধন; ‘আমি কাঙাল হয়ে রয়েছি বলে বিশ্বাস করো বাংলাদেশ আমার দেশ’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ৩, সংখ্যা ২, জানুয়ারি ২০১৪, পৃ. ২৫৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
৪. সাঈদ, এডওয়ার্ড ডব্লিউ (২০০৭ : ১১); ‘অনুবাদের ভূমিকা’; অরিয়েন্টালিজম; ভাষান্তর : ফয়েজ আলম; র্যামন পাবলিশার্স, ঢাকা।
৫. চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০০ : ১০২); ‘বাংলার গ্রাম-সমাজ প্রসঙ্গে কার্ল মার্কস’; ইতিহাসের উত্তরাধিকার; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৬. আনুমানিক ১৮৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা রঙ্গমঞ্চের আদিপর্বের সবচেয়ে বিখ্যাত অভিনেত্রী বিনোদিনী। মাত্র ১০ বছর বয়সে থিয়েটারে যোগদানের সময় অভিনয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকলেও পরবর্তী সময়ে ৮০টিরও বেশি নাটকে শতাধিক চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। গিরিশ ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে ১৮৮২ সালে ‘স্টার থিয়েটার’ নির্মাণ করেন এই অভিনেত্রী।
১৮৭৬ সালে জন্ম নেওয়া কুসুমকুমারী বেঁচেছিলেন ১৯৪৮ অবধি। তার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিলো মিনার্ভা থিয়েটারে নাচের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে গ্রান্ড, ক্লাসিক, কোহিনুর, স্টার থিয়েটারে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তার বার বার ডাক পড়তো। তিনিই প্রথম অভিনেত্রী, যিনি অভিনয়ের পাশাপাশি অন্যদের নাচ শেখাতেন।
স্কুল জীবনেই অভিনয়ের জন্য অ্যাকাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টস-এর বিশেষ পুরস্কার পান দেবিকা রানি। লন্ডনে অ্যাপ্লাইড আর্টসে পড়াশোনা শেষে ১৯২৮ সালে ভারতে এসে অভিনয় করেন হিমাংশু রায়ের চলচ্চিত্রে। পরের বছর হিমাংশু রায়কে বিয়ে করে তার পরামর্শেই জার্মানিতে যান চলচ্চিত্রের ওপর পড়াশোনার জন্য। দেবিকা অভিনীত কর্ম নামে এক ইংরেজি চলচ্চিত্র বেশ খ্যাতি অর্জন করে; চলচ্চিত্রটি ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শন করা হয়। স্বামী মারা গেলে তিনি নিজেই চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনা শুরু করেন।
চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও তৃপ্তি মিত্রের খ্যাতিটা বেশি মঞ্চশিল্পী হিসেবেই। আর শম্ভু মিত্রকে বিয়ে করে দুজনে কলকাতার বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠাও করেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক নাটকেই তিনি একেবারে নতুন আঙ্গিক ও ঢঙে অভিনয় করেন। অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৬২ সালে ভারতের ‘সংগীত নাটক আকাদেমি’র সর্বোচ্চ পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী খেতাবও পান তিনি।
কাননবালা নাম নিয়ে ১৯২৬ সালে চলচ্চিত্রে আসেন কানন দেবী। পরিচয় ও শেষ উত্তর চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ৪০ দশকের গোড়ায় তিনি পর পর দুবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান।
৭. এ বিষয়ে আরো জানতে চাইলে পড়ুন : মুরশিদ, গোলাম; ‘দ্বারকানাথ ঠাকুর : আধুনিকতার বিস্মৃত পথিকৃৎ’; কালি ও কলম; সম্পাদনা : আবুল হাসনাত; বর্ষ ১১, সংখ্যা ৫, জুন ২০১৪, ঢাকা।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন