Magic Lanthon

               

আসাদ লাবলু

প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

হারায়ে তাহারে খুঁজিয়া ফিরি

সালমান শাহ : ভাটির আগে উজানের শেষ ঢেউ

আসাদ লাবলু

কোনো বিষয়ে রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই একটি বৈশিষ্ট্য আছে। নিজের বোঝাপড়ায় যা ‘সঠিক-সুন্দর-সত্য’, তা-ই চরম। অতএব এই চরমের সঙ্গে দ্বিমত যাদের, তাদের বোঝাপড়ায় ভিন্নতা আছে। কিন্তু ব্যক্তি তার পছন্দকে চরম বলতে পারবে কি না,  সে ‘কুতর্কের’ দোকান ফকির লালন যেমন আর করে না, আমিও করতে চাই না। কিন্তু বোঝাপড়ার ভিন্নতার যে কথা বললাম, সেটি নিয়ে কথা আছে। ভিন্নতাকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেখা হয়। অনেকেই এটাকে সমস্যা হিসেবে দেখেন; দেখতেই পারেন। এখন যিনি এটাকে সমস্যা হিসেবে দেখবেন, তিনি নিজের কর্তব্যজ্ঞানে এর পরিবর্তন করতে চাইবেন—এটাই স্বাভাবিক। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মোটামুটি দুটি উপায় থাকতে পারে; প্রথমটি হলো, আপনার যে ভিন্নতা তার পুরোটাই অচল; অতএব পুরোটাই বদলাতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো, আপনার ভিন্নতা বদলানোর দরকার নেই; কিছুটা ঘষামাজাতেই সারবে। প্রথম পদক্ষেপের সমস্যা হলো, সেখানে ভিন্নতাকে স্বীকার করা হলেও তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদ্ধতি নিয়েই হয়তো কথা বলার সুযোগ আছে।

আজ আমরা যারা চলচ্চিত্র চরম বুঝে ফেলেছি, তাদের অনেকেই ভিন্নতাকে প্রথম ব্যবস্থায় ফেলে বিচার করি। কিন্তু তাতে যে খুব একটা লাভ হচ্ছে, তা মনে হয় না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হচ্ছে চরম নিয়ে জেদাজেদি। ভিন্নতা (যারা ভালো চলচ্চিত্র বোঝে না) চরমকে বলে, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস, ধুম : থ্রি কিংবা টার্মিনেটর থ্রিই আমার কাছে ভালো লাগে, তোমাদের ওই রাশোমন দেখে আমি কোনো মজা পাই না।’ খুবই যুক্তির কথা, বেচারা মজা না পেলে তার আর কী-ইবা করার আছে! কিন্তু তাই বলে চরমের কি বলা সাজে, ‘হে ভিন্নতা, তুমি যা দেখে মজা পাও তা তো চলচ্চিত্রের জাতের মধ্যেই পড়ে না?’ আর কেউ দেখেছেন কি না জানি না, অনেক চলচ্চিত্র ‘বুঝনেওয়ালা’র সঙ্গে ‘না-বুঝনেওয়ালা’র এই সম্পর্ক আমি দেখেছি।

এ কারণেই এই দুই শ্রেণির খুব একটা মেলামেশা নেই। এ বিভেদ কেবল চলচ্চিত্র ভোক্তাদের মধ্যেই নয়, এ বিভেদ উৎপাদনকারীর ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়; আছে সমালোচকদের ক্ষেত্রেও। আমাদের ‘বিকল্পধারা’ ও ‘মূলধারা’র মধ্যেও কি এই বিভেদ নেই? যেহেতু লিখছি, সেহেতু চলচ্চিত্র সমালোচকদের মধ্য দিয়ে এই বিভেদটি নিয়ে আরো দু-চার কথা বলতে চাই। তুলনার বিচারে বাংলা চলচ্চিত্র এখন বিশ্ব চলচ্চিত্রের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে—এমন মন্তব্যের সঙ্গে অধিকাংশ সমালোচকই একমত হবেন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এসব সমালোচক স্বাভাবিকভাবেই চান বাংলা চলচ্চিত্র এগিয়ে যাক। তাদের সমালোচনার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যও সেদিকেই থাকে। নীচের অনুচ্ছেদের আলোচনাটুকু এসব সমালোচকদের নিয়ে।

নানান কারণে সমালোচকদের বাংলাদেশের অতীত চলচ্চিত্রের মুখোমুখি হতে হয়। এই মুখোমুখি হওয়ার পর সমালোচকরা যা হাজির করেন তাকে বলা যায়, সময়ক্রমিক অতীত। এ অতীতে খেয়াল করলেই আপনারা দেখতে পাবেন, অমুক দশক থেকে অমুক দশক পর্যন্ত একটা ভালো সময় গেছে। অমুক নায়ক, অমুক নায়িকা কিংবা অমুক পরিচালকদের সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকপ্রিয়তা ছিলো। অথবা, অমুক সময়ে অমুক-অমুক কারণে বাংলা চলচ্চিত্রের আজ এই দশা! এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত মন্তব্য যে, দেশের চলচ্চিত্রের অতীত নিয়ে সমালোচকদের আগ্রহ কিংবা সিদ্ধান্ত মোটাদাগে এই। এবং এ ‘মোটাদাগ’ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাগকে একত্রিত করে তৈরি হয়নি। আমি বলতে রাজি নই যে, আমাদের সমালোচকদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। কেননা, এক সত্যজিতের চলচ্চিত্র নিয়েই আপনি বাংলাদেশি লেখকদের ভুরি ভুরি লেখা পাবেন। সেগুলোতে আপনি দেখবেন সত্যজিতের চলচ্চিত্রে নারী, সত্যজিতের চলচ্চিত্রে সঙ্গীত, সত্যজিতের চলচ্চিত্রে দেশপ্রেম, সত্যজিতের চলচ্চিত্রে রঙের ব্যবহার, সত্যজিতের চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ—এ রকম নানান কিসিমের বিষয়। সত্যজিতকে নিয়ে বেশি লেখা হয়ে গেছে, আমি তা বলছি না। আমি বলতে চাইছি, সত্যজিতের মতো অনেককে নিয়েই মোটাদাগে মন্তব্য করার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাগ (অর্থাৎ অনেক লেখা) হাতের কাছে পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রে অনেকেই আছেন যাদের নিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তেমন কোনো দাগও নেই। অথচ তাদের নিয়ে দাগ কাটা যেতো। আবার এ রকমও তো নয় যে, তাদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নেই। তাহলে তারা বাদ পড়লো কেনো—এই প্রশ্নের আবির্ভাব স্বাভাবিক।

আমার খেয়াল হলো, এই সমালোচকদের মধ্যে অতীত নিয়ে লেখাজোখার একটা অনীহা আছে। পিছিয়ে পড়েছি, এগোতে হবে, তাই পিছনের দিকে এতো মনোযোগ দেওয়ার কিছু দেখছি না—এমন মনোভাব এই অনীহার একটি অন্যতম কারণ হতে পারে। আর যেহেতু এতো মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই, তাই হয়তো একনজরে অতীত দেখা, মোটাদাগে সিদ্ধান্ত নেওয়া! কিন্তু একনজরে দেখতে গেলে তো অনেক কিছুই বাদ পড়ে যেতে পারে। আর এই বাদ পড়ে যাওয়ার পরও যেটার অস্তিত্ব মিলবে, তা দিয়ে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অতীত’ নামক পাঠ্যবই বানালে সেখান থেকে কেবল কিছু নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে, বর্ণনামূলক নয়।

২.     

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রয়াত এক নায়ককে খুঁজতে গিয়ে আমার মধ্যে উল্লিখিত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সেই নায়কের নাম সালমান শাহ। সালমান শাহকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে সংখ্যার বিচারে লেখা পাওয়া গেছে অনেক। অধিকাংশ লেখার অবস্থান পত্রিকার (কাগজ ও অনলাইন) পাতায়, তবে বইয়ের তাকে কম। এসব লেখা থেকে জানা যায়—সালমানের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ, তিনি কতোগুলো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, তিনি কতোটা জনপ্রিয় ছিলেন; আরো জানা যায়, সালমান কোন্‌ স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, তার ডাকনাম কী, স্ত্রীর নাম কী। সেখানে এও পাওয়া যায়, তিনি কোন্‌ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয় শুরু করেন, তাকে নিয়ে কার কোন্‌ সুখস্মৃতি আছে এসব।

সালমান কিংবা মান্নার অকাল মৃত্যুর পর তাদের নিয়ে প্রকাশিত বই (মূলত পুস্তিকা) মাইকিং করে রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি করতো এক শ্রেণির হকার। এসব বই বিক্রির সময় খুব আবেগ নিয়ে—‘এই বই পড়লে জানতে পারবেন সালমান শাহের মৃত্যুর পর নায়িকা শাবনুর কেঁদে কেঁদে কী বলেছিলো’ জাতীয় প্রশ্ন তুলে উৎসুক পাঠককে আগ্রহী করা হতো। পরে পাঁচ-দশ টাকা দিয়ে বইটি কিনে পাঠক মূলত হতাশই হতেন। সালমান শাহকে নিয়ে এ রকম বিপুল সংখ্যক লেখা থেকে সারাংশ বানাতে গিয়ে আমি খানিকটা হতাশই হয়েছি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাকে নিয়ে এতকিছু লেখার দরকার আছে কি না? অনেকে আবার সঙ্গে উত্তরটাও দিতে পারেন—না, এতকিছু লেখার মতো অভিনেতা-নায়ক তিনি ছিলেন না। ধরে নিলাম ছিলেন না। কিন্তু তার হিসাব তো আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস বা সমালোচনার মধ্যে পাওয়া যায় না (হতে পারে আমার বিচরণের সীমাবদ্ধতা আছে)।

তবে সালমান গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন কি ছিলেন না, সেই সিদ্ধান্ত দেওয়া আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং সালমানকে নিয়ে এই সিদ্ধান্তের আগের আলোচনা যতোটুকু সম্ভব করতে চাই।

৩.

সংস্কৃতি বলতেই ঐতিহ্য (ট্র্যাডিশন) থাকবে। সহজ করে বললে, এটাই সংস্কৃতির গভীরতা। এই গভীরতা সময় দিয়ে মাপা যায়; মাপা যায় ভৌগোলিকভাবেও। এই দুই পদ্ধতিতেই বাংলার চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির ঐতিহ্যে দেখা যায়, এখানে রোমান্টিক নায়কদের কদর বরাবরই বেশি। তা উত্তমকুমার, রাজ্জাক, জাফর ইকবাল কিংবা সালমান শাহ, যাই বলেন না কেনো! কিন্তু কদর বেশি বলেই বিষয়টি এমন নয় যে, ‘রোমান্টিক’ পণ্য উৎপাদিত হওয়ামাত্রই তা বাজার দখল করতে পারবে। পণ্যগুণ বলেও একটি কথা থেকে যায়। এছাড়া মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে রোমান্টিক নামে আরো একই জাতের পণ্য বাজারে থাকলে সেগুলোকেও টেক্কা দেওয়া চাই। রোমান্টিক হিসেবে সালমান তা পেরেছিলেন কি না, তা আপেক্ষিক হলেও তৎকালীন বাজার-পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। 

প্রথমেই সালমানের উৎপাদনকালটা দেখা দরকার। এটা কয়েকটা আঙিনা থেকে দেখা যেতে পারে। চলচ্চিত্রে তার প্রথম বাজারজাত হয় ১৯৯৩ সালে কেয়ামত থেকে কেয়ামত-এর মাধ্যমে। ওই সময়টাতে নায়ক বলতে যাদের বোঝায়-আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, জসিম, ওমর সানি, রুবেল, আমিন খান, নাঈম কারো জনপ্রিয়তাই কম ছিলো না। ফলে এলাম, দেখলাম, জয় করলাম—পরিস্থিতি তখন মোটেও এ রকম ছিলো না। কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্রেই সালমান দর্শকের কাছে স্বতীয়তার আলামত দেখান। অবশ্য অনেকেই কেয়ামত থেকে কেয়ামত হিন্দি চলচ্চিত্রের নকল বলে তার স্বকীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু নকলমাত্রই তাকে ছোটো করে দেখার কিছু নেই। কারণ এই কাজটিও সহজ বিদ্যা নয়।

বর্তমানেও তো হরহামেশাই তামিল, হিন্দি, হলিউডি চলচ্চিত্র নকল কিংবা অনুকরণ হচ্ছে! কিন্তু কেয়ামত থেকে কেয়ামত-এর মতো নকল পণ্যে সালমানের মতো আলাদা নির্যাসের গন্ধ কয়টি ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে? কেয়ামত থেকে কেয়ামত বললে দর্শকদের মনে কেবল কাহিনিই ভেসে ওঠে না, সঙ্গে সালমানও হাজির থাকেন। আর এটিই সালমানের রোমান্টিকতার স্বকীয়তা । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়,

উপকরণের উপর সম্পূর্ণ দখল না থাকিলেই অনুকরণের নিরাপদ গণ্ডির বাহিরে পদার্পণ করিতে বিপদ ঘটে। অল্প সাঁতার জানিলে ঘাটের আশ্রয় ছাড়িতে পারা যায় না, তটের কাছাকাছি ঘুরিতে ফিরিতে হয়। সকল বিদ্যারই যে একটি বাহ্য অংশ আছে তাহাকে একান্ত আয়ত্ত করিতে পারিলে তবেই তাহাকে স্বাধীন ব্যবহারের স্বকীয় ভাবপ্রকাশের অনুকূল করা যায়।

তাই নতুন কিছু না পেলে অনুকরণ করা একেবারেই অপরাধ নয়। এছাড়া সালমানের আগমন আরেকটি জায়গা থেকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। হাইকোর্টের রায় কিংবা কোনো জ্ঞানী তাত্ত্বিকের সিদ্ধান্ত নয়, নিতান্তই আম দর্শকদের মতে, বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম এক রোমান্টিক নায়ক ছিলেন জাফর ইকবাল। মাস্তান (১৯৭৫), এক মুঠো ভাত (১৯৭৬), নয়নের আলো (১৯৮৪), অবুঝ হৃদয় (১৯৮৯), সন্ত্রাস (১৯৯০), ভাইবন্ধু (১৯৯০), অবদান (১৯৯১), মামা-ভাগ্নে (১৯৯১), ফেরারির (১৯৯১) মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। হয়তো আরো দূর যেতে পারতেন, কিন্তু ১৯৯১ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান এই নায়ক। এই সময়টাতে যে জনপ্রিয় নায়ক ইন্ডাস্ট্রিতে আর ছিলো না, তা নয়। ছিলো এবং তাদের নাম একটু আগেই নিয়েছি। কিন্তু একঘেয়েমির কারণে কি না জানি না, দর্শকরা নতুন কাউকে চাচ্ছিলেন। তবে কেবল নতুন হলেই চলবে না—এমন খুঁতখুঁতে স্বভাবও যে দর্শকদের মধ্যে ছিলো তা পরে বোঝা গেছে।

১৯৯১ সালে ঠিক এই রকম একটা সময় পরিচালক এহতেশামের হাত ধরে চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে নাঈম-শাবনাজ জুটির। খেয়াল রাখতে হবে যে, নতুন মুখের প্রতীক্ষার পাশাপাশি জাফর ইকবালের ‘শূন্যতা’ও কিন্তু তৈরি হয়েছে। নাঈম-শাবনাজ জুটির প্রথম চলচ্চিত্র চাঁদনী (১৯৯১)। এটি ব্যাপক ব্যবসাসফল হয়। বিশেষ করে এর গান দর্শকদের মনে দাগ কাটে। শুরুর দিকে এই জুটিকে নিয়ে দর্শক ও নির্মাতাদের মধ্যে ভালোই আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু বেশিদিন এই আগ্রহ থাকেনি। হতে পারে দর্শকদের সেই খুঁতখুঁতে চাহিদা তারা মেটাতে পারেনি। কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে সালমান যতোদিন ছিলেন, তাকে নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ এতটুকু কমার আলামত পাওয়া যায়নি। বাংলা চলচ্চিত্রে বোধ করি সালমানই একমাত্র নায়ক যার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের চেয়ে অজনপ্রিয় ছবির তালিকা করা সহজ।

৪.

অধিকাংশ চলচ্চিত্র-কারখানায় দর্শকপ্রিয় নায়ক হওয়ার ক্ষেত্রে আরো দুইটি উপায় আছে। এসব ক্ষেত্রে দর্শকপ্রিয় হওয়ার জন্য অন্যের উছিলা পেলেই হয়, ব্যক্তি-নায়ককে যোগ্যতার মানদণ্ডে খুব বেশি কড়াকড়ি পরীক্ষার সামনে পড়তে হয় না। এর একটি উপায় হলো জনপ্রিয় নায়িকার উছিলা, অন্যটি নামিদামি পরিচালকের। নির্দিষ্ট একজন পরিচালক, নায়ক কিংবা নায়িকার সঙ্গে কাজ করে নাম কুড়িয়েছেন—এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি। তাই সেদিকে আর যাবো না। বরং দেখবো সালমান শাহ এমন কোনো পদ্ধতির সহায়তা পেয়েছেন কি না?

নায়ক-জীবনে ২৬টির মতো চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন সালমান শাহ (এর মধ্যে কয়েকটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করে যেতে পারেননি)। সবগুলো নিয়ে আলোচনা না করে আমরা ১৯৯৩—১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো দেখবো। এই সময়ে ১৩টি চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে কাজ করেন সালমান। এর সবগুলোই ব্যবসাসফল হয়। বিশ্বাস করানোর স্বার্থে কালক্রমিক নামগুলো বলছি—কেয়ামত থেকে কেয়ামত, অন্তরে অন্তরে, দেনমোহর, তোমাকে চাই, বিক্ষোভ, বিচার হবে, চাওয়া থেকে পাওয়া, আনন্দ অশ্রু, আশা ভালোবাসা, জীবন সংসার, মহামিলন, স্বপ্নের পৃথিবী স্বপ্নের ঠিকানা। এর মধ্যে মাত্র দুটি চলচ্চিত্রের (অন্তরে অন্তরেআনন্দ অশ্রু) পরিচালক ছিলেন একই ব্যক্তি; শিবলী সাদিক। এছাড়া বাকি ১১টি চলচ্চিত্রের পরিচালক আলাদা। এখানে পরিষ্কার যে, সালমানের যে দর্শকপ্রিয়তা ছিলো তা কোনো নির্দিষ্ট নির্মাতার মাধ্যমে আসেনি।

এবার আসা যাক নায়িকার ক্ষেত্রে। সালমানের ১৪টি চলচ্চিত্রেই নায়িকা ছিলেন শাবনুর। তবে কি শাবনুরের ভূমিকা আছে সালমানের যশের পিছনে? উত্তরটা একটু জটিল। বরং কেউ যদি উল্টো প্রশ্ন করে, সেখানেও যথেষ্ট যুক্তি আছে। প্রথম কথা হলো, শাবনুর ছাড়া অন্য নায়িকার সঙ্গে করা সালমানের চলচ্চিত্রগুলোও ব্যবসাসফল। নজির—কেয়ামত থেকে কেয়ামত, অন্তরে অন্তরেদেনমোহর। তিনটিতেই সালমানের বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী। এছাড়া ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিতে পারেননি—এমন বেশ কয়েকজন নায়িকার সঙ্গে কাজ করেও সফল ছিলেন সালমান। যেমন, এই ঘর এই সংসার (বৃষ্টি), কন্যাদান (লিমা) কিংবা সত্যের মৃত্যু নাই (শাহনাজ)।

বলছিলাম, শাবনুরের জনপ্রিয়তায় সালমানের প্রভাব আছে কি না! এই সন্দেহের কারণ, এহতেশামের হাত ধরে চাঁদনী রাতে (১৯৯৩) চলচ্চিত্রে সাব্বির নামে একজনের সঙ্গে জুটি বেঁধে শাবনুরের আগমন হয়। চলচ্চিত্রটি ব্যবসা করেনি বললেই চলে। ফলে শাবনুর কিংবা সাব্বির, কেউই আলোচনায় আসতে পারেননি। এরপর শাবনুর জুটি বাঁধেন আমিন খানের সঙ্গে। তাদের প্রথম চলচ্চিত্র দুনিয়ার বাদশা (১৯৯৪); এরপর হৃদয় আমার (১৯৯৫)। কিন্তু শাবনুর সেখানেও ব্যর্থ। সালমান শাহর বিপরীতে মতিন রহমানের তোমাকে চাই-এর মাধ্যমে জনপ্রিয়তার পথে যাত্রা শুরু হয় শাবনুরের। অথচ ততোদিনে সালমান কিন্তু সালমান হয়ে উঠেছেন।

আরেকটা কথা। সালমান মোটেও ফাঁকা মাঠে গোল করেননি। তার সময়ে সংখ্যার বিচারে নায়কের অভাব ছিলো না, আগেই বলেছি। অভাব যা ছিলো, তা হলো নতুন মুখ ও রোমান্টিক কারো উপস্থিতির। সালমান কিন্তু সেই অভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। সালমানের আরেকটি মূল্যায়ন হতে পারে তার নিজের মৃত্যু-পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনা করে। ১৯৯৬ সালে তার মৃত্যুতে নায়কপাড়ায় একটি বড়ো ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, এটি পরিষ্কার। ৯০-এর পর থেকে যেমন সালমানের মতো কারো আশায় দর্শকরা অপেক্ষা করছিলেন, তেমনই অপেক্ষা শুরু হয় সালমানের মৃত্যুর পর থেকেও। সেই অপেক্ষার গোচরে আসেন শাকিল খান, রিয়াজ, ফেরদৌসের মতো কয়েকজন। কিন্তু এদের কেউই সালমানের সেই জায়গা কোনোভাবেই নিতে পারেননি। কিছু সময় পরই দর্শকরা ফের একঘেয়েমিতে ভুগতে শুরু করে। যদিও সালমান-পরবর্তী ১৮ বছর পর এখনকার দর্শকরা কেবল আর একজন ভালো নায়কের আশাই করেন না, তাদের অতৃপ্তি এখন প্রায় সবকিছুতেই।

৫.

সালমান অভিনেতা হিসেবে কেমন ছিলেন, তা বিচার করা কঠিন বৈকি। এটা যার যার ব্যক্তিগত মাপকাঠির ওপর নির্ভর করে। তাই বলে এদেশের ১৬ কোটি মানুষের মাপকাঠি মোটাদাগে ১৬ কোটি রকমের নয়—এও সত্য। সালমানের সময় সালমানের চলচ্চিত্র সবার ভালো লাগতো না, জানি। কারো হয়তো তার অভিনয় নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। আবার প্রকাশ্যে না হোক মনে মনে হয়তো অনেকে সেগুলোকে চলচ্চিত্র বলতেও রাজি নন। কিন্তু তত্ত্ব ও জ্ঞানীর বিশ্লেষণে ‘ভালো’ চলচ্চিত্রের একটা সংজ্ঞা দাঁড়ালেও, তা সবাই মানতে বাধ্য নন। যে কারণে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও ভালো চলচ্চিত্রের মধ্যে পার্থক্য সবসময়ই ছিলো; বিরোধও চোখে পড়ে। কিন্তু অনেক আগে থেকেই জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের কদর বেশি (জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও ‘ভালো’ হতে পারে)। সালমান এই জনপ্রিয় চলচ্চিত্রেরই জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন। জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের দর্শকদেরও কিন্তু অভিনয়ের ভালো-মন্দ বিচারের একটা মানদণ্ড অবশ্যই আছে। সেই মানদণ্ডের ভালো-মন্দ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মানদণ্ডকে স্বীকার করতেই হবে। এতক্ষণ এই আলোচনা এ কারণে যে, সালমান সেই মানদণ্ডে যতো নম্বর পেয়েছিলেন, অতো নম্বর তার পরে আজ অবধি কোনো নায়ক পেয়েছেন কি না সন্দেহ আছে।

আইনবিদ্যায় একটি কথা আছে যে, সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে, পারিপার্শ্বিকতা নয়। সালমানের শারীরিক উচ্চতা গল্প-উপন্যাসের নায়কের মতো ছিলো না। তার সময়ে তার চেয়ে দেখতে সুদর্শন নায়ক চলচ্চিত্র-কারখানায় ছিলেন না—এমনও বলার উপায় নেই। অতো টাকা পয়সার মালিকও তিনি ছিলেন না। তিনি চলচ্চিত্রে আসার আগে একাধিক টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন মাত্র; কাজ করেছেন বিজ্ঞাপনচিত্রেও। এসব পারিপার্শ্বিকতা বিচারেও সালমানের জনপ্রিয়তার কারণ খোঁজা যেতে পারে।

৬. 

সেই অর্থে সালমান খুবই অল্প সময় চলচ্চিত্র জগতে ছিলেন। এ কারণে তাকে নিয়ে সবচেয়ে বড়ো জিজ্ঞাসা হলো—তিনি বেঁচে থাকলে এই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারতেন তো? নাকি কয়েক বছর পর দর্শক তার কাছ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিতো! কারণ, আমাদের চলচ্চিত্রের আজ যে দশা, তা কেবল সালমানদের মতো নায়কদের অভাবেই নয়। সময়ের আবর্তে অনেকগুলো অভাব ঢুকে পড়েছে এই চলচ্চিত্রে। আর সেই ঢোকার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যবস্থার ফলে সৃষ্ট উপকরণ পিছন থেকে ঠেলা মেরেছে। কিন্তু আশার কথা হলো, অভাববোধটা আমাদের মধ্যে এখনো আছে।

আলোচনার শেষে এসে আলোচনার শুরুর অংশটা আবার তুলতে চাই। তবে তার আগে আবারও বলে রাখছি, সালমানকে বিশেষ নায়ক, সেরা নায়ক কিংবা কিংবদন্তি নায়ক বলার দাবি আমি করছি না। আমি মূলত আমাদের চলচ্চিত্রের অতীত পর্যালোচনার গতিপ্রকৃতি বোঝা এবং তা নিয়ে নিজের দু-একটি ভাবনা বলার জন্য আলোচনায় সালমানকে নমুনা হিসেবে নিয়েছি। সেই গতিপ্রকৃতিতে আমাদের মনোভাব হলো, চলচ্চিত্রে আমরা নতুন করে শুরু করতে চাই। তাই এ নিয়ে আমাদের মধ্যে এই বোধ তৈরি হয়েছে যে, এজন্য অতীতকে একপাশে রেখে দিলে খুব বেশি সমস্যা নেই। এর পিছনে আরেকটা যুক্তি হতে পারে এমন—ঠিক আগের মানের গান, কাহিনি, সংলাপ কিংবা নায়ক দিয়ে এখন আর চলবে না। তাই অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে কী লাভ! আমি নিজে যে এই যুক্তির সঙ্গে একমত নই তা নয়। কিন্তু এর ফলে একটা সমস্যাও তৈরি হয়েছে।

বলিউডে নায়ক হিসেবে শাহরুখ খানের আবির্ভাব সালমান শাহর সমসাময়িক। ১৯৯২ সালে দিব্যা ভারতীর বিপরীতে দিওয়ানির মাধ্যমে চলচ্চিত্র-জগতে পা রাখেন তিনি। এখন শাহরুখ দর্শকপ্রিয়তার দিক থেকে ভারতের অন্যতম একজন হিরো। কিন্তু ১৯৯২ সালের শাহরুখ আর এখনকার শাহরুখ কিন্তু এক নন। তিনি বদলেছেন কিংবা তাকে বদলানো হয়েছে। তার বাজিগারহ্যাপি নিউ ইয়ার কিন্তু আলাদা জিনিস। অথচ দুটি চলচ্চিত্রই ব্যবসাসফল। এদিকে আমরা কিন্তু আমাদের সালমান শাহ, ইলিয়াস কাঞ্চন, আমিন খান কিংবা অমিত হাসানকে বদলাতে পারিনি। তাদের দিয়ে আমরা একসময় বাজিগার-এর মতো চলচ্চিত্র বানাতে পারলেও এখন আর হ্যাপি নিউ ইয়ার বানাতে পারছি না। এখন প্রশ্ন, আমরা কি হ্যাপি নিউ ইয়ার-এর মতো চলচ্চিত্র বানানোর স্বপ্ন দেখি? কিংবা এ রকম একটি চলচ্চিত্র হুমড়ি খেয়ে দেখবে—এমন দর্শক তৈরি করতে চাই? না, সেটা হয়তো জরুরি নয়। কিন্তু ন্যূনতম সেটি বানাতে পারলেও দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য একটা ফায়দা ছিলো। ওই পশ্চিমবঙ্গেই তো ‘কতো রকম’ চলচ্চিত্র হচ্ছে, দর্শক খাচ্ছেও। অস্ত্রোপচার করতে রোগীর শরীরের অনেক কিছুই স্বাভাবিক থাকতে হয়। সব পরিস্থিতিতেই কাটাছেঁড়া চলে না। বিপ্লব চাইবো, কিন্তু বিবর্তন মানবো না—এমন হয়!


লেখক : আসাদ লাবলু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি  কালের কণ্ঠপত্রিকায় শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

asadmcru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০১১ : ২৯৯); ‘মন্দিরপথবর্তিনী’; রবীন্দ্রসমগ্র ১৭শ খণ্ড; পাঠক সমাবেশ, ঢাকা।

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন