শাহরিনা অরিন
প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্র পাড়াতেও মার্কেজের একটি বাংলো ছিলো
শাহরিনা অরিন
My relation with it [cinema] is like that
of a couple who can’t live separated,
but who can’t live together either.1
—Gabriel GarciaMarquez
নিজের স্বপ্নের ওপর ভর করে মানুষ সৃষ্টিশীল সাধনা করে নিরন্তর। স্বপ্ন দেখার সাহস সবার না থাকলেও এই স্বপ্নই মানুষকে বড়ো করে তোলে। তবে সফলতা যে সবার আসে, তা নয়। কিন্তু এটা ঠিক, স্বপ্ন মানুষকে নিয়ে যেতে পারে অনেক দূর। মূলত মানুষ স্বপ্নপূরণ, নিজেকে ও অন্যকে জানা, বিকশিত করার তাগিদে বিভিন্ন মাধ্যমে জড়ায় প্রতিনিয়ত। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, শিল্প-সংস্কৃতির মধ্যে থাকে মানুষের স্বপ্নের গল্প। শিল্পমাধ্যম হলো শিল্পপ্রেমী সেই মানুষের স্বপ্নের প্রকাশ। চিত্রকলা, সাহিত্য, কবিতা, সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র-শিল্পের এ সবকটি মাধ্যমে শিল্পপ্রেমীর স্বপ্ন ধরা দেয়। চিত্রকলার পর স্বপ্নের সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার যে মাধ্যম, সেটি হলো চলচ্চিত্র। যেখানে নিজের স্বপ্ন, চিন্তা, কল্পনাগুলোকে খুব সহজে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়; ছড়িয়ে দেওয়া যায় নিজের স্বপ্ন দিয়ে বোনা চিত্রগুলোকে অন্যের মধ্যেও।
বিশাল এই শিল্পমাধ্যমে যুগে যুগে মানুষের স্বপ্ন প্রকাশের শেষ ছিলো না। তাই হয়তো চলচ্চিত্রের প্রতি সৃজনশীল মানুষের এতো অপার আকর্ষণ। যিনি সাহিত্যে নোবেল জিতলেন, পুরো বিশ্ব মগ্ন হলো যার কালো কালির ছোঁয়ায়, সেই মানুষই কিনা একপর্যায়ে আত্মনিবেদন করলেন চলচ্চিত্রে! বিস্ময়কর লাগে বৈকি। লেখক হওয়ার আগে তিনি নাকি চলচ্চিত্রনির্মাতাই হতে চেয়েছিলেন, অন্তত ইতিহাস তেমনটিই বলে। কলম্বিয়ার উপকূলীয় শহর আরাকাতাকা’য় বেড়ে ওঠা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের জীবনের কথা অনেকটা এ রকমই। সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও ছিলো তার সমান দাপট। সমালোচক হিসেবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার প্রথম সম্পর্ক হলেও পরবর্তী সময়ে অভিনয় করেছেন, পরিচালনা করেছেন, সঙ্গে শিক্ষকতাও। তার উপাখ্যান নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের তালিকাও দীর্ঘ।
সেই ‘গাবো’ (ভক্ত ও পাঠকরা মার্কেজকে এ নামেই ডাকতো) সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন, ‘উই উইল সি ইচ আদার ইন অগাস্ট’ উপন্যাসটি অসমাপ্ত রেখেই। এই ক্ষণজন্মা মানুষটির বিদায়ে পুরো বিশ্বের ভক্তকুল ভেসেছে শোকের সাগরে, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা উপলব্ধি করছে তার অভাব। তিনি হয়তো আরো কালজয়ী সব সৃষ্টি দিয়ে বার বার চমকে দিতেন বিশ্বকে, কিন্তু সে সম্ভাবনা থমকে গেলো ১৭ এপ্রিল ২০১৪-তে। জাদুবাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়ালিজমের জনকের বিদায়ে সেদিন থেকেই যেনো পুরো পৃথিবীর সাহিত্যজগতে ভর করেছে বিশাল শূন্যতা, যাতে ভেসেছে চলচ্চিত্রজগতও।
সাহিত্যের মার্কেজ, চলচ্চিত্রের মার্কেজ
উপন্যাসকে গাবো ঠিক কীভাবে আবিষ্কার করলেন, তা নাকি তিনি নিজেই জানতেন না। তবে ২০ বছর বয়সেই নাকি গাবো বুঝতে পেরেছিলেন, সাহিত্যিক হিসেবে তার পটভূমি তৈরি হয়ে গেছে। সেই সময় পড়াশোনা একদম ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সবকিছু থেকে প্রত্যাহার করে শুধু গল্প লেখা শুরু করেন তিনি। কিন্তু অন্য লেখকদের মতো তারও সমস্যা ছিলো একটাই, কী নিয়ে গল্প লিখবেন। সমস্যা সমাধানে পথ বাতলালেন নিজেই, কাজে লাগালেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে।
নিজের অভিজ্ঞতার বাইরেও উইলিয়াম ফকনার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও অন্যান্য বিদেশি লেখকের লেখা ছিলো তার লেখার প্রধান উৎস।
মার্কেসের লেখার প্রেক্ষাপট ছিল দারিদ্র্যপীড়িত এবং প্রায় নিয়মিত সহিংসতায় পরিপূর্ণ নিজ দেশ কলম্বিয়া। সেখানে গণতন্ত্রের শিকড় আসলে কখনোই গভীরে পৌঁছতে পারেনি। মার্কেসের গল্পগুলোর বয়ানে রয়েছে জাদুকরি নানা উপাদান। অদ্ভুত দক্ষতায় তিনি এ কল্পনাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। অনন্য গদ্যে তিনি বর্ণনা করেছেন লাতিন আমেরিকার ভালোবাসা, পরিবার-জীবন আর একনায়কতন্ত্রের আখ্যান।২
প্রথম দিককার গল্পগুলো ছাপা হতো কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা’র ‘এল এসপেক্তাদর’ পত্রিকায়, সেটি ১৯৪৭ সালের কথা। ১৯৫৩ সালে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালে ‘এল এসপেক্তাদর’ পত্রিকাতেই মার্কেজের সাংবাদিকতার শুরু। সেসময় চলচ্চিত্র নিয়ে প্রতি সপ্তাহে সমালোচনা লিখতেন তিনি। সমালোচনা লিখতে লিখতেই বছর খানেক পর হঠাৎ কী মনে হলো, নেমে গেলেন চলচ্চিত্র-নির্মাণে। মার্কেজ তার তিন বন্ধুকে নিয়ে নির্মাণ করলেন লা লেনগুস্তা আউল (১৯৫৪) নামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর পরের বছর ১৯৫৫-তে প্রকাশ হয় তার প্রথম ‘নভেলা’৩ ‘লিফ স্টোর্ম’। ১৯৪৮ সালে লেখা নভেলাটির প্রকাশক খুঁজে পেতে তার সাত বছর লেগেছিলো।
পরের ঘটনাটি ১৯৬২ সালের। বিখ্যাত সুররিয়ালিস্ট চলচ্চিত্রকার লুই বুনুয়েল’কে মার্কেজ একটি চিত্রনাট্য পাঠান। কিন্তু ‘ইটস সো ইজি, মেন ক্যান ডু দ্যাট’ নামে কমেডি চিত্রনাট্যটির প্রতি বুনুয়েল কেনো জানি কোনো রকম আগ্রহ না দেখিয়ে ‘সিনেমাথেক আর্কাইভ’-এ পাঠিয়ে দেন; দেবেন না-ই বা কেনো? বুনুয়েলের খ্যাতি তখন আকাশচুম্বী, দু-একটা অখ্যাত চিত্রনাট্য নিয়ে ভাববার সময় কোথায় তার? এতে অবশ্য মার্কেজ বিচলিত হননি। মজার বিষয় হলো, এর ৫০ বছর পর ২০১২ সালে ঘটনাটি জানা যায়।৪ ১৯৬৫-তে নিজের গল্প থেকে নির্মিত এন এস্তে পাবলো নো হে ল্যাড্রোনস্ চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেন মার্কেজ। চিত্রনাট্য লিখলেন তিনি ও তার বন্ধু বিশ্বখ্যাত লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস, আর পরিচালনা করলেন আলবার্তো আইজাক। চলচ্চিত্রে মার্কেজের চরিত্র ছিলো বেশ্যাপাড়ার পাহারাদারের। পরে অবশ্য আরো তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পাশাপাশি চলছিলো নিয়মিত উপন্যাস লেখা।
তার মানে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে মার্কেজের আত্মপ্রকাশ খুব কাছাকাছি সময়ে। একই সঙ্গে সাহিত্য, চলচ্চিত্র পরিচালনা, অভিনয়, চিত্রনাট্য রচনা-সব বিষয়ের মধ্যে তিনি হয়তো স্বপ্ন খুঁজে ফিরেছেন। নিজের লেখা প্রসঙ্গে গাবো বার বার বলতেন, তার নানা বয়সের দেখা ভিজ্যুয়াল ইমেজ দ্বারা প্রতিটি কাহিনি অনুপ্রাণিত হয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যকল্প তার ব্যক্তিজীবনকেও প্রভাবিত করেছে। মনে প্রশ্ন জাগে, যে দৃশ্যকল্পের সমাহার নিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন, তা-ই কি তার মনে চলচ্চিত্রকার হওয়ার বাসনা এনে দেয়? সমালোচনা করতে করতেই কি তার মনে হয়েছিলো, যে ধরনের চলচ্চিত্র তিনি দেখছেন, তার কোনোটিই সাধারণ অর্থে ভিজ্যুয়াল আর্ট নয়? এর বদল হওয়া উচিত ভেবেই কি চলচ্চিত্রকার হওয়ার বাসনায় চিত্রনাট্য রচনায় হাত দেওয়া বা বন্ধুদের নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র-নির্মাণ কিংবা অভিনয়?৫
১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল জেতেন মার্কেজ; তার বহু আগে থেকেই চলচ্চিত্রে যুক্ত ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রের প্রতি তীব্র ভালোবাসা, মুগ্ধতা, আকর্ষণ সর্বোপরি অদম্য ইচ্ছার কারণে এর সঙ্গে সারাজীবন নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন তিনি। ‘লিফ স্টোর্ম’ প্রকাশের পর থেকে তিনি নিয়মিত উপন্যাস লিখতে থাকেন। পাশাপাশি তার উপন্যাস থেকে নির্মাণ হতে থাকে চলচ্চিত্র। ১৯৬১-তে প্রকাশ পায় তার বিখ্যাত নভেলা ‘নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল’। ১৯৯৯-এ এই নভেলা নিয়ে একই নামে মেক্সিকোতে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। আরতুরো রিপস্তাইন পরিচালিত চলচ্চিত্রটি ওই বছরই কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শন করা হয়। ১৯৬৭ সালে প্রকাশ পায় তার অমর সৃষ্টি ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড’, যেটি ৩৫টি ভাষায় অনূদিত। এই উপন্যাস নিয়ে ১৯৮১-তে একশো ৪৩ মিনিটের ভিডিও ফিকশন নির্মাণ করেন জাপানি নির্মাতা শুজি তেরায়ামা। পরে ১৯৮৪ সালে শুজি এর চলচ্চিত্র রূপ দেন ফেয়ার ওয়েল টু দ্য আর্ক নামে। ১৯৮৫ সালে এটি কান-এ সেরা চলচ্চিত্রের মনোনয়ন পায়।
১৯৭৫ সালে প্রকাশ পায় উপন্যাস ‘অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’। ১৯৭৯ সালে চিলির পরিচালক মিগুয়েল লিত্তিন মার্কেজের ছোটোগল্প ‘দ্য উইডো অব মন্ট্রিল’ অবলম্বনে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সে বছরই তার গল্প ও চিত্রনাট্য অবলম্বনে মেক্সিকোতে নির্মাণ হয় থ্রিলার মেরি মাই ডিয়ারেস্ট। এতে ছোটো একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেন মার্কেজ।
১৯৮১ সালে প্রকাশ পায় নভেলা ‘ক্রনিকল অব অ্যা ডেথ ফোরটোল্ড’, যা থেকে ১৯৮৭ সালে ইতালির ফ্রান্সিসকো রোসি একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৮৩ সালে ফ্রান্স, জার্মানি ও মেক্সিকোর যৌথ প্রযোজনায় এরেন্দিরা নির্মাণ হয় ‘দ্য ইনক্রেডিবল অ্যান্ড স্যাড টেইল অব ইনোসেন্ট এরেন্দিরা অ্যান্ড হার হার্টলেস গ্র্যান্ডমাদার’ গল্প থেকে। ১৯৮৫-তে প্রকাশ হয় আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ চলচ্চিত্রকার মাইক নিউয়েল এটি অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। দক্ষিণ আমেরিকার নেতা সিমন বলিভারের শেষ জীবন নিয়ে উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল ইন হিজ লেবিরিন্থ’ ১৯৮৯-এ প্রকাশ পায়। একই বছর মার্কেজের ‘লেটার্স ফ্রম দ্য পার্ক’ গল্প নিয়ে কিউবান চলচ্চিত্রকার টমাস গুতিয়ারেজ আলেয়া একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এর চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন মার্কেজ নিজেই।
১৯৯০ সালে গাবো’র উপন্যাসের কল্পিত গ্রাম ‘মাকোন্দো’ নিয়ে ড্যান ওয়েল্ডন নির্মাণ করেন মাই মাকোন্দো। এতে প্রধান কথকের ভূমিকায় অভিনয় করেন মার্কেজ। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘অব লাভ অ্যান্ড আদার ডেমনস’ উপন্যাস অবলম্বনে কোস্টারিকা ও কলম্বিয়ার যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় ২০০৯ সালে একই নামে। ২০০২ সালে প্রকাশ পায় তার আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘লিভিং টু টেল দ্য টেইল’। ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘মেমোরিস অব মাই মেলানকোলি হোরস’ নভেলা অবলম্বনে ডেনিশ চলচ্চিত্রকার হেনন্নিং কার্লসেন ২০১১ সালে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এটি মালাগা স্প্যানিশ চলচ্চিত্র উৎসবে ‘স্পেশাল ইয়াং জুরি অ্যাওয়ার্ড’ পায়।
এই যে তার সাহিত্য থেকে এতো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে, এগুলো নিয়ে মার্কেজের ভাবনা বা মত কী ছিলো? ১৯৮১ সালে ‘প্যারিস রিভিউ’-এর সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আজ পর্যন্ত তার কোনো উপন্যাস কি সঠিকভাবে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে? উত্তরে মার্কেজ জানিয়েছিলেন, ‘আমি আজ পর্যন্ত একটি সিনেমার কথাও ভাবতে পারছি না, যেটা মূল ভালো উপন্যাসকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছে। কিন্তু আমি অনেক ভালো সিনেমার নাম উল্লেখ করতে পারি, যেগুলো তৈরি হয়েছে খুব খারাপ উপন্যাস থেকে।’৬ না, নিজের কোনো উপন্যাসের প্রসঙ্গে এই কথাগুলো তিনি বলেননি। কিন্তু এই উত্তরের মধ্যে যে ইশারা নিহিত, তা খুবই স্পষ্ট।
তবে মার্কেজ চাইতেন না, তার লেখা নিয়ে কেউ চলচ্চিত্র করুক। তিনি মনে করতেন, তার গল্পের যে গঠন তা থেকে চলচ্চিত্র করা মুশকিল, তাতে গল্পের মূল চরিত্রই নষ্ট হয়ে যাবে। তবে ভারতের খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনকে একবার মার্কেজ তার ‘দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ নিয়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণের অনুরোধ করেছিলেন, বিনিময়ে কোনো অর্থও নেবেন না বলেছিলেন। কিন্তু গল্পটি লাতিন আমেরিকার সমাজ-বাস্তবতায় হওয়ায় মৃণাল এ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে অপারগতা প্রকাশ করেন। মার্কেজ অবশ্য তা মেনেও নিয়েছিলেন। এর পর ১৯৮২-তে কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি হিসেবে যান মৃণাল ও মার্কেজ। সেখান থেকে বন্ধুত্ব; এর দুই-তিন বছর পর হাভানাতে দুজনের একসঙ্গে আড্ডা, ছবি দেখা ও বেড়ানো। মৃণাল চেয়েছিলেন মার্কেজকে কলকাতায় আনতে, আমন্ত্রণপত্র পাঠানোও হয়েছিলো। কিন্তু মার্কেজ সেই আমন্ত্রণপত্র নাকি পাননি! আর এর ফলে বাঙালি বঞ্চিত হয় মার্কেজের সংস্পর্শ থেকে।৭
১৯৯০ সালে জাপান সফরে যান মার্কেজ। সেখানে জাপানের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া’র সঙ্গে দেখা করেন, আলোচনা করেন চলচ্চিত্র ও রাজনীতি নিয়ে। কুরোসাওয়া’র একটি চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে মার্কেজ তার সাক্ষাৎকারও নেন।
লাতিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবী
ঔপনিবেশিকতা এমনই এক ভয়াবহ শোষণযন্ত্র, যা কোনো দেশ ও জাতিকে নিংড়ে সমস্ত নির্যাস বের করে পঙ্গু করে দেয়। এমনটি ঘটেছিলো লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ক্ষেত্রে। স্পেন ও পর্তুগালের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হতে না হতেই তাদের পড়তে হয়েছিলো ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। উপনিবেশ রাষ্ট্রের কাঠামোকে অপরিবর্তিত রাখে ঠিকই, বিপরীতে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভিত্তিকে পঙ্গু করে শিল্প-সংস্কৃতির ধারাকে চরমভাবে অকেজো করে দেয়। সে কারণেই চলচ্চিত্র এর প্রভাবমুক্ত ছিলো না। যদিও উপনিবেশের এই সময়ে লাতিন আমেরিকার নিজস্ব চলচ্চিত্র বলতে কিছু ছিলো না; তার পরও পরনির্ভরশীল অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য নির্যাসহীন ধুকে ধুকে টিকে থাকা লাতিন দেশগুলোর মানুষ ঔপনিবেশিক সঙ্কটের মুখে চলচ্চিত্র রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে নেমেছে।
এরই একপর্যায়ে লাতিন দেশ ব্রাজিলে ৫০-এর দশকে দুর্ভিক্ষ, খাদ্য ঘাটতি, অনাহারে মৃত্যু, সহিংসতার মতো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় নিয়ে ‘সিনেমা নোভো’ নামে চলচ্চিত্র ধারার যাত্রা শুরু হয়। ব্রাজিলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ছিলো সেই ধারার বিষয়বস্তু। এই ধারা অবশ্য পরে আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, কিউবা, চিলি, বলিভিয়া, মেক্সিকোতেও ছড়িয়ে পড়ে। মূলত ‘লাতিন আমেরিকার দেশসমূহ একই ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঔরসজাত—তাই তাদের চলচ্চিত্রকর্মে একই আদর্শগত শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প প্রতিধ্বনিত’৮ হতো। ১৯৬০ সালের দিকে ‘সিনেমা নোভো’ ধারার একপর্যায়ে আর্জেন্টিনায় ‘থার্ড সিনেমা’ নামে নতুন একটা ধারার প্রচলন ঘটে। এ ধারার চলচ্চিত্র দর্শককে লড়াকু করে তুলেছিলো, সেই সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলে প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক পরিকাঠামোকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেছিলো।
এদিকে ১৯৫৯ সালে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ফিদেল কাস্ত্রোর উত্থান ঘটে কিউবায়। সমাজতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার শুরুতেই সবকিছু পরিবর্তনের ধারায় চলচ্চিত্র নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়। কিউবাতেও ‘থার্ড সিনেমা’ ধারা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬০ সালেই কিউবার চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘দ্য কিউবান ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটিক আর্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (আই সি এ আই সি)। এটির ওপর দেশের চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নেওয়ার পুরো ভারই ছিলো। কাস্ত্রো চলচ্চিত্রশিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আমন্ত্রণ জানান বন্ধু মার্কেজকে। মার্কেজ ততোদিনে সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অনেকখানি জায়গা করে নিয়েছেন। সেসময় অবশ্য খুব অল্প সময়ের জন্য কিউবাতে ছিলেন মার্কেজ, পরে ফিরে যান মেক্সিকোতে। মেক্সিকোতে মার্কেজ ব্যস্ত হয়ে পড়েন সাহিত্য নিয়ে, সঙ্গে চিত্রনাট্য রচনাও ছিলো। মার্কেজের সাহিত্য নিয়ে তখন কেবল চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়েছে। পরে অবশ্য লাতিন আমেরিকার প্রায় সব দেশেই তার সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়।
বিপ্লবের কিছুদিন পর নতুন ধারার চলচ্চিত্রের জন্য কাস্ত্রোর পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। ফাউন্ডেশনটির হাত ধরেই কিউবাতে ১৯৮৬ সালে গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র স্কুল-‘ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অব সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন’, যা লাতিন আমেরিকায় ‘এস্কুয়েলা ইন্তারনাসিওনাল দে সিনে ই তেলিভিসিওন’ (ই আই সি টি ভি) নামে পরিচিত। যার উদ্যোক্তা ছিলেন স্বয়ং মার্কেজ। স্কুলটি লাতিন চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করা হয়েছিলো। এ সময় স্কুলটির দায়িত্ব নিতে দীর্ঘদিন পর কিউবায় প্রত্যাবর্তন করেন মার্কেজ। ততোদিনে লেখক জীবনের সবচেয়ে বড়ো অর্জন নোবেল পেয়ে গেছেন তিনি। স্কুলটির দায়িত্বে তার সঙ্গে আরো ছিলেন আর্জেন্টিনার পরিচালক ফার্নান্দো বিরি, কিউবান পরিচালক টমাস গুতিয়ারেজ আলেয়া এবং সংস্কৃতিমন্ত্রী ও চলচ্চিত্রনির্মাতা হুলিও গার্সিয়া এসপিনোজা। উল্লেখ্য, এই চার জনই কিন্তু একসময় রোমের বিখ্যাত ‘এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমাটোগ্রাফি সেন্টার’ এবং ইতালির নব্য-বাস্তববাদ চলচ্চিত্র ধারার তাত্ত্বিক সেজার জাভাত্তিনি’র ছাত্র ছিলেন। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন মার্কেজ। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, স্কুলটির জন্য মার্কেজ তার নোবেল পুরস্কারের অর্থের একটা বড়ো অংশ ব্যয় করেন।
অদ্ভুত নৈপুণ্যে হাসি-আনন্দের সঙ্গে শৃঙ্খলার অপূর্ব সমন্বয়ে স্কুলটি পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্যের শিক্ষকতাও করতেন মার্কেজ। ঠিক নয়টায় তিনি ক্লাসে উপস্থিত হতেন। ক্লাস সময়মতো শুরু হলেও এর শেষ কখন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেউই তা জানতো না। অধিকাংশ দিন ক্লাস এগিয়ে চলতো নতুন কিছু একটা সৃষ্টির লক্ষ্যে। ফলে প্রত্যেককেই একধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হতো যাতে তারা ক্লাসে কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় না পড়ে। ক্লাস শুরু হতো চিত্রনাট্য লেখার নিয়ম দিয়ে; আর শেষ হতো একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। এই করতে গিয়েই কোনোদিন সকাল থেকে স্নিগ্ধ বিকেল, কখনো বা দিন গড়িয়ে রাত নেমে আসতো।৯
শুধু কিউবাতেই নয়, মেক্সিকোতেও একবার চিত্রনাট্য নিয়ে কর্মশালা করেছিলেন মার্কেজ। সপ্তাহ ধরে দলবল নিয়ে বসে ‘কেমন করে গল্প হয় চিত্রনাট্য’ শীর্ষক সেই কর্মশালায় নতুন নতুন চিন্তাভাবনা, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে চিত্রনাট্য গড়ে দেখিয়েছিলেন তিনি। লাতিন আমেরিকার পিছিয়ে পড়া মানুষদের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনকে তিনি নিজের মধ্যে অনুভব করেছেন; ত্রাতা, ঈশ্বর বা রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তাদের আলোতে নিয়ে কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সেটি করে দেখিয়েছেন। আর তাই লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ও বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে অন্তত মার্কেজকে বোঝা সম্ভব নয়।
লা লেনগুস্তা আউল বা নীল চিংড়ি সমাচার
১৯৫৪ সাল, তখন মাত্রই লেখালেখি শুরু করেছেন মার্কেজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিছুকাল আগে শেষ হয়েছে, চারদিকে এর রেশ তখনো কাটেনি। এমন একটা সময়ে লেখালেখির পাশাপাশি হঠাৎ চলচ্চিত্র-নির্মাণের ভূত চাপলো মাথায়। তিন বন্ধু আলভেরো সেপেদা সামুদিও, এনরিক গ্রাউ আরাউয়ো ও লুইস ভিসেন্স’কে নিয়ে মার্কেজ নির্মাণ করেন লা লেনগুস্তা আউল বা দ্য ব্লু লবস্টার নামের ২৯ মিনিটের নির্বাক চলচ্চিত্র। কী ছিলো তার সেই গল্পে?
ক্যারিবিয়ান উপকূলীয় এলাকায় আসেন এল গ্রিঙ্গো নামের এক ব্যক্তি। তার হাতে থাকা ব্যাগে অনেকগুলো ট্যাগ লাগানো দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, তিনি অনেক জায়গা ঘুরে এখানে এসেছেন। গ্রিঙ্গো সেখানকার একটি হোটেলে যান কক্ষের জন্য। হোটেলের অভ্যর্থনাকারী বেলুন ফোলাতে থাকে, কিন্তু গ্রিঙ্গোকে দেখে তার বেলুন চুপসে যায়। এরপর হোটেল কক্ষে গিয়ে গ্রিঙ্গো ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে আসে একগাদা গলদা চিংড়ি। চিংড়িগুলো মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করতে থাকেন গ্রিঙ্গো। একপর্যায়ে নীল রঙের বড়ো একটি চিংড়িতে কিছু একটা মাখিয়ে বাথরুমে চলে যান তিনি। এই ফাঁকে একটি কালো বিড়াল কক্ষে ঢুকে সেই চিংড়িটি নিয়ে যায়। ফিরে এসে গ্রিঙ্গো সেই চিংড়িটি দেখতে না পেয়ে তড়িঘড়ি করে হোটেল থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে থাকেন। এর পর তিনি এক মেয়ের কাছে সাহায্যের জন্য গেলে, মেয়েটি তাকে গণকের কাছে নিয়ে যান। গণক চিংড়ি সেজে, ছবি এঁকে উপাসনার আয়োজন করে চিংড়ি ফিরে পাওয়ার জন্য। কিন্তু ফল হয় উল্টো। উপাসনা শেষে মাটির হাঁড়ির ভিতর থেকে চিংড়ির বদলে বের হয়ে আসে মুরগি! সেই মুরগি চলে গেলে পড়ে থাকে পালক; হতাশ গ্রিঙ্গো ফিরে আসেন হোটেলে।
এবার গ্রিঙ্গো উপকূলের শিশুদের চিংড়িটি খোঁজার কাজে লাগান। শিশুরা অতি উৎসাহে এখানে-সেখানে চিংড়িটি খুঁজতে থাকে। কিন্তু এটাকে গা না করে আপনমনে ঘুড়ি ওড়াতে থাকে একটি শিশু। ওদিকে চিংড়ি হারানোর কথা শুনে স্বপ্রণোদিত হয়ে এক ব্যক্তি জেলেদের কাছ থেকে কিছু চিংড়ি নিয়ে যান গ্রিঙ্গোর কক্ষে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চিংড়িটি না পেয়ে গ্রিঙ্গো হোটেল থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় অবশ্য গ্রিঙ্গোর কক্ষে সাহায্যকারী সেই মেয়েটিকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
এতো কিছুর পর চিংড়ি না পেয়ে উদাস মনে সৈকতে হাঁটতে থাকেন গ্রিঙ্গো। হঠাৎই তিনি দেখতে পান ঘুড়ি উড়ানো সেই ছেলেটি হারিয়ে যাওয়া চিংড়িটিকে তার ঘুড়ির লেজে বেঁধে ওড়াচ্ছে। এটা দেখামাত্রই গ্রিঙ্গো দৌড়ে গিয়ে চিংড়ির জন্য নাটাই নিয়ে ছেলেটির সঙ্গে কাড়াকাড়ি শুরু করেন। কাড়াকাড়ির একপর্যায়ে নাটাই-ঘুড়ি-চিংড়ি সবই উড়ে যায় আকাশে। মজার ব্যাপার হলো, চলচ্চিত্রের পুরো ঘটনাই একজন ব্যক্তি সবার অলক্ষে উঁচু জায়গায় বসে দুরবিন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন।
এ ধরনের সাদামাটা কাহিনি নিয়ে নির্মিত লা লেনগুস্তা আউল। কিন্তু এই সাদামাটা কাহিনি দিয়ে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন মার্কেজ? মূলত লা লেনগুস্তা আউল ছিলো সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ ধারার নিরীক্ষামূলক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। যুগে যুগে সাধারণ মানুষ শাসকশ্রেণির হাতে শোষিত হয়েছে, যা থেকে পরিত্রাণের পথও খুঁজেছে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবও হয়েছিলো এই মুক্তির জন্যই। কিন্তু অল্প সময়েই বোঝা গিয়েছিলো সেটাও ভুল। শোষণের কৌশল কেবল এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে পৌঁছেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই অবস্থা বৃহদাকার ধারণ করে। ধীরে ধীরে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে মনের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে, তা রূপ নিতে থাকে বিদ্রোহে। এই অবস্থা কিন্তু পরিকল্পিত ছিলো না। অবচেতন মনে জমে ওঠা এই ক্ষোভগুলো বাইরে উঁকি দিতে থাকে। যারা শিল্পী, তারা অবদমিত এই অভিব্যক্তিকে শিল্পকর্ম দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তা শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে থাকে। দৃশ্যমান বাস্তবতার পক্ষপাতিত্ব না করে অদৃশ্য যে বাস্তবতা, যেটা মনে লুকিয়ে থাকে, সেটাকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে আন্দোলন বিস্তৃত হয়। মূলত এটিই সুররিয়ালিজম ধারা, যেটি শিল্পকে স্বাধীন করে তোলে। মার্কেজ এই ধারার পরিপ্রেক্ষিতেই লা লেনগুস্তা আউল নির্মাণ করেন, মনের লুক্কায়িত কথাগুলো ব্যাখ্যা করেন এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আমরা মার্কেজের এই অভিব্যক্তিকে এইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি—
হারানো চিংড়িটিকে মানুষের স্বাধীনতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। আর সবসময়ই এই স্বাধীনতা হরণে ওতপেতে থাকে অপশক্তি; হয়তো সেটাই মার্কেজ কালো বিড়ালের চিংড়ি চুরির মাধ্যমে বোঝান। তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীনতাহারা অসহায় এই মানুষেরা তা পুনরুদ্ধারে যাদের কাছে ধরনা দেয়, তারা মার্কেজের চোখে লা লেনগুস্তা আউল-এর ভণ্ড-গণক হয়ে ধরা দেয়। এই গণকরা স্বাধীনতা উদ্ধারে চেষ্টার ভান করে, গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ধুয়া তুলে গুচ্ছবোমা হামলা চালায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিংড়িরূপী স্বাধীনতা পরিবর্তে হাঁড়িতে পড়ে থাকে মুরগির পালকের মতো স্বাধীনতাকামী মানুষের কঙ্কাল।
যে নারী গ্রিঙ্গো’কে গণকের কাছে নিয়ে যায়, সে-ই আবার পরে স্বল্পবসনে তার কক্ষে শুয়ে থাকে; ভুলিয়ে রাখতে চায় তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের মতো উপকূলের সেই মানুষটি নানাধরনের চিংড়িরূপী ‘স্বাধীনতা’ এনে গ্রিঙ্গো’কে দেখায় সেখান থেকে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার জন্য। তাতে কাজ হয় না, প্রকৃত স্বাধীনতার সন্ধানে বেরিয়ে যান গ্রিঙ্গো। তখন ‘শান্তি’র পক্ষের সেই দুই এজেন্ট হোটেল কক্ষে মিলে যায়। উদাস মনে হাঁটতে থাকা গ্রিঙ্গো অবশেষে স্বাধীনতার খোঁজ পায় ঠিকই, কিন্তু তা আর ধরা দেয় না। আর এই সবটাই উপরে বসে (পেন্টাগন-এ) মজা করে দেখে প্রভুরা।
স্বপ্ন দিয়েই শেষ
যে স্বপ্নের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, মার্কেজ নিজে সেই স্বপ্ন নিয়ে তার ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘মানুষ বুড়ো হয়ে যায় বলে স্বপ্নের পেছনে ছোটা বন্ধ করে দেয়, এটা সত্যি নয়। বরং তারা স্বপ্নের পেছনে ছোটা বন্ধ করে দেয় বলেই বুড়ো হয়ে যায়।’১০ তার মানে স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই হয়তো মার্কেজ নিজে কখনো স্বপ্নের পিছনে ছোটা বন্ধ করেননি। একটার পর একটা স্বপ্ন দিয়ে অদৃশ্য সুতোয় মালা গেঁথেছেন আমৃত্যু। ঘাত-প্রতিঘাতকে সরিয়ে করেছেন অতুলনীয় একেকটি সৃষ্টি। তিনি চেয়েছিলেন গোটা বিশ্বই একটা কাঙ্ক্ষিত সমতার দিকে এগিয়ে যাক।
সাহিত্য ও চলচ্চিত্র দুটোতেই মার্কেজ বলিষ্ঠ হাতে কাজ করেছেন সেই স্বপ্নকে সঙ্গী করে। অবশ্য চলচ্চিত্রের সামনে সশরীরে খুব বেশি সক্রিয় না থাকলেও চলচ্চিত্রের নেপথ্যে তার অসামান্য সক্রিয়তা ছিলো। তার প্রতিটি সৃষ্টি দ্বারা তাকে বার বার নতুন করে চিনতে হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজে চেনার চেষ্টা করেছেন জীবনের অন্তর্নিহিত দিকগুলোকেও। তারই একটি প্রমাণ দিয়ে শেষ করছি, ১৯৮৩ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণে জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর এক সম্মেলন হয় ভারতে। তাতে যোগ দিতে এসেছিলেন কিউবার রাষ্ট্রপতি ফিদেল কাস্ত্রো। কাস্ত্রো সেই সফরে সঙ্গে এনেছিলেন বন্ধু মার্কেজকে।
রাষ্ট্রনায়কদের সম্মেলনে মার্কেজের কোনো কাজ ছিলো না। তাই কাউকে না জানিয়ে সরকারি অতিথিশালা থেকে হঠাৎই উধাও হয়ে যান মার্কেজ। চারিদিকে খোঁজাখুঁজি পড়ে গেলো, কিন্তু গোপনে। তিন দিন ধরে চললো খোঁজ, কিন্তু তার টিকিটিরও দেখা মিললো না। চতুর্থ দিন সকালে দিল্লি জামে মসজিদের সামনে রাস্তার উপর চকখড়ি দিয়ে কাজ করা এক গনৎকারের সামনে উবু হয়ে বসে থাকতে দেখা গেলো এক মোটাসোটা লোককে; মাথায় ঝাঁকড়া চুল, ঝোপের মতো গোঁফ, অপরিচ্ছন্ন জামাকাপড়, খয়েরি গায়ের রঙ। ওই ভাবে বসে গনৎকারকে তার হাত দেখিয়ে ভবিষ্যৎ জানতে চাইছেন লোকটি। এক পুলিশের সন্দেহ হলে তাকে আটক করে জানা যায় তার আসল পরিচয়।১১ গণকের কাছেও কি নতুন কিছু খুঁজছিলেন মার্কেজ?
লেখক : শাহরিনা অরিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
ador.haque.skp@gmail.com
তথ্যসূত্র
২. ‘নেমেছে হাজার বছরের বিষণ্নতা’; প্রথম আলো, ১৯ এপ্রিল ২০১৪।
৩. ‘নভেলা’ (Novella) হলো ছোটোগল্পের তুলনায় বেশি বড়ো আবার উপন্যাস থেকে একটু ছোটো উপাখ্যান। এই ইতালিয়ান শব্দটির অর্থ ‘ছোটো উপন্যাসিকা’। আধুনিককালে নভেলাকে মূলত সংজ্ঞায়িত করা হয় এর দৈর্ঘ্য দিয়েই। সাধারণত ২০ থেকে ৪০ হাজার শব্দের গল্পগুলো নভেলা। তবে প্রকাশকদের হিসাবে, ৬০ থেকে ১২০ পৃষ্ঠার গল্পগুলো নভেলা হিসেবে স্বীকৃত। উপন্যাস থেকে নভেলার মূল পার্থক্য, এখানে প্রধান চরিত্রের সংখ্যা থাকে খুব কম—এক থেকে বড়োজোর দু’জন। এই চরিত্রগুলোকে আবর্তিত করেই গড়ে ওঠে কাহিনি। ছোটোগল্পের তুলনায় নভেলায় চরিত্রগুলো আরো বেশি বিকশিত করে দেখানো হয়, এর প্লটও বেশ আকর্ষণীয়।
৪.http://eisamay.indiatimes.com/entertainment/cinema/marquez-as-a-filmmaker/articleshow/34233082.cms
৫.http://eisamay.indiatimes.com/entertainment/cinema/marquez-as-a-filmmaker/articleshow/34233082.cms
৬.http://eisamay.indiatimes.com/entertainment/cinema/marquez-as-a-filmmaker/articleshow/34233082.cms
৭.http://mzamin.com/details.php?mzamin=MTk5NjI=
৮. আউয়াল, সাজেদুল (২০১৪ : ৮৭); চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।
৯. রানা, রায়হানুল; ‘ইআইসিটিভি, পিছিয়ে পড়া মানুষের এগোনোর স্বপ্ন’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ২, সংখ্যা ২, জানুয়ারি ২০১৩, পৃ. ২৪৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
১০. প্রাগুক্ত; প্রথম আলো, ১৯ এপ্রিল ২০১৪।
১১.http://goo.gl/9Q8ldA
পাঠ সহায়িকা
http://goo.gl/HZhdww
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন