Magic Lanthon

               

ইমরান হোসেন মিলন

প্রকাশিত ২৬ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সত্যজিতের চলচ্চিত্রে রঙ 

ইমরান হোসেন মিলন

 

১.

বহুজন নানাভাবে সমালোচনা শুরু করলেন সত্যজিতকে নিয়ে। কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই তারা বললেন, দুর্ভিক্ষ নিয়ে নির্মিত অশনি সংকেত-এ তিনি রঙের ব্যবহার করে ভুল করেছেন। এমন একটা চলচ্চিত্রে রঙের ব্যবহার করা মোটেই ঠিক হয়নি (?) তার মতো বিজ্ঞ পরিচালকের! রীতিমতো বিতর্ক শুরু হয় অশনি সংকেত নিয়ে। ক্ষুধার্ত মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে সত্যজিতের এমন কাজকে একটা সূক্ষ্ম রাজনীতি বলেও মনে করতে থাকেন অনেক সমালোচক।

১৯৮১ সালে এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিতকে প্রশ্ন করা হলো, সমালোচকরা বলছেনআপনি নাকি দারিদ্রকে ভাবের জগতে নিয়ে গেছেন? রঙের ব্যবহারে আপনার চলচ্চিত্রে ক্ষুধা ও দারিদ্রের যে রূপটি উঠে আসার কথা ছিলো তা নাকি প্রকাশ পায়নি; এটা যদি রঙিন না হতো তাহলে সেই রূপটি আরো ভালোভাবে উঠে আসতো। অশনি সংকেত-এর এ বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি কথা বললেন না সত্যজিৎ। কেবল একটি কথায় শেষ করলেন তার বক্তব্য, বিষয়বস্তু দারিদ্র্য সংক্রান্ত, না সচ্ছলতা সংক্রান্ত সেটা কোনো প্রশ্নই নয়, কারণ দারিদ্র্যেরও বিশেষ রঙ আছে, যেমন সচ্ছলতারও আছে।

২.

পুরো পর্দাজুড়ে জ্বলছে আগুন। ক্রমেই তা দূরে সরে যেতে থাকে। পর্দায় ভেসে ওঠে ঘরে-বাইরে। সেই নামের ভিতরেও আগুন জ্বলতে থাকে। তার ঠিক নিচে সাদা হরফে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ছবি। লেখা মিশে যায়, আবারও পর্দাজুড়ে আগুন; ধীরে ধীরে হালকা হলুদ থেকে তা গাঢ় লালে পরিণত হয়। টাইটেলে নামগুলো সেই আগুনের ওপর দিয়ে উঠতে থাকে। একসময় আগুন জুম আউট হয়ে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। চারদিক অন্ধকার। শুধু আগুনটুকু জ্বলছে। একটা ডিজল্ভ। প্যান শটে বিমলা দেবীকে (মূক্ষী) দেখা যায়। চোখে জল, কপালে লাল টিপ, পরনে বিলেতি পোশাক আর গলায় সোনার গহনা। বিগ ক্লোজে তার মুখমণ্ডল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বোঝা যায়, উৎকণ্ঠায় ভরা চোখ-মুখ কোনো এক অজানা আশঙ্কায় লাল হয়ে উঠেছে।

ঘরে-বাইরের শুরুটা বললাম। মনে হতে পারে, কেনো এটা বলা বা রঙের সঙ্গে এর সম্পর্কটাই বা কোথায়? একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়, পর্দার আগুন হালকা হলুদ থেকে গাঢ় লাল হয়ে অন্ধকার হওয়া, আর বিমলার লাল টিপ, উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ভরা চোখ-মুখ কোনো কিছুর ইঙ্গিত করে। যে কারণে সত্যজিৎ ঘরে-বাইরে লেখার ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে হয়তো বোঝালেনদেখো, এই আগুন কতোটা বিভীষিকা ছড়াতে পারে! দগ্ধ করে দিতে পারে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে।

ঘরে-বাইরের পটভূমি ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথের মতো সত্যজিতও সেই আন্দোলনকে শুধু বাইরে না রেখে তা ঘরের ভিতর প্রবেশ করান। শুধু প্রবেশ করিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, রীতিমতো (চলচ্চিত্রটির শুরুতে যে আগুন দেখা যায় তার মতো করে) জ্বালিয়েও দিয়েছেনমূক্ষী, নিখিলেশ আর সন্দীপকে দিয়ে ঘরের ভিতর, আর বাইরে বন্দে মাতরম দিয়ে।

ক্যামেরা বিমলার বড়ো জার দিকে ধরা। পরনে সাদা থান। বুঝতে কষ্ট হয় না, তিনি বিধবা। ঘরে পর্যাপ্ত আলো। পাশে একটা গ্রামোফোন। সেটাতে বাজে রবীন্দ্র সঙ্গীত। সুরের তালে তালে আংটি পরা এক হাত অন্য হাতের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে তাল দিচ্ছেন। পিছনে বসা দুজন গৃহপরিচারিকা। পরনে তাদের রঙিন শাড়ি। ক্যামেরা প্যান করে প্রথমে বাঁয়ে, পরে ডানে ঘোরালে মাদুরের উপর বসা বিমলাকে দেখা যায়। পরনে ধূসর রঙের শাড়ি। সবুজ রঙের ব্লাউজের গলা এবং হাতায় সেলাইয়ের কাজ। পিছনে বসে এক পরিচারিকা তার চুল বেঁধে দেন।

রঙের বৈচিত্র্য এখানেই; কিছুই আলাদা করে বলতে হয় না। নীরবে সবই স্পষ্ট হয়। সত্যজিৎ এই সত্যটা উপলব্ধি করেছিলেন অশনি সংকেত নির্মাণের সময়ই। তার ভাষায়, অশনি সংকেতের দৃশ্য গ্রহণের কাজ শেষ করে আজ আমার বিশ্বাস হয়েছে যে রঙ জিনিসটা সবরকম বিষয়বস্তুর পক্ষেই উপযোগী। ছবির অন্যান্য উপাদানের মতোই রঙের কাজ হল কথা বলা, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নয়, বা মূল বক্তব্যকে ব্যহত করে নয়। সত্যজিৎ ঘরে-বাইরেতেও ব্যাহত করলেন না। ব্যাহত না করেই বিমলা এবং তার জার ভিতর বৈপরীত্য দাঁড় করালেন। ধূসর শাড়ি আর সবুজ ব্লাউজ দিয়ে বিমলার যে বৈপরীত্য আনলেন, তা কিন্তু সাধারণ বৈপরীত্য নয়।

তাহলে কি সত্যজিৎ সবুজ রঙ দিয়ে বোঝাতে চান বিমলা চিরসবুজ, চিরযৌবনা কিংবা অন্য কিছু? নাকি তিনি এটা প্রমাণ করতে চানবিমলার প্রাণ আছে, অর্থাৎ তার স্বামী এখনো জীবিত। যে কারণে বিমলা যখন লাল শাড়ি আর বিলেতি সবুজ ব্লাউজ পরে তার জার কাছে জানতে চায়কেমন লাগছে দিদি? তখন হয়তো সুযোগ পেয়ে সত্যজিৎ বিমলার জাকে দিয়ে বলিয়ে নেন, বড়ো ভাগ্যি করে এসেছিসরে ছোটু, মনের সুখে সাধ মিটিয়ে নে। এ বাড়ির বউয়েরা তো সুখের মুখ দেখেনি কখনো। স্বামীর মুখই দেখেনি, তার সুখের মুখ। অথচ দুজনই কিন্তু জমিদার বাড়ির বউ। সবুজ, লাল, ধূসর দিয়ে সেই সুখ, জীবন, প্রাণ (স্বামী) খোঁজার চেষ্টা সত্যজিতের।

সত্যজিৎ রায়ের দেখানো জমিদার বাড়িও অনেক পুরনো। রঙ চটে যাওয়া, কোথাও বা ফাটল ধরা; কিন্তু সেটি যে বনেদি তা বোঝা যায়। ঘরের চিত্র এর থেকে পুরোই উল্টো। জানালা, দরজা, ঘরের আসবাব, ঝাড়বাতি, রঙিন ঘুলঘুলি সবই মনে করিয়ে দেয় জমিদারের আভিজাত্যের কথা, তার ক্ষমতার কথা। কিন্তু সেই ক্ষমতা কতোটা শক্তিশালী, কতোটা দীর্ঘস্থায়ীসেটা নিয়ে ক্ষণিকের ভিতরেই প্রশ্ন জাগে।

ঘরে-বাইরের জমিদার নিখিলেশের বাড়ির কোনো কোনো দরজা, কাচের জানালায় হরেক রকম রঙ। সত্যজিৎ অনেকটা অবাধে সেগুলোতে ব্যবহার করেছেন amber বা লালচে হলুদ। প্রকৃতির রঙে লালচে হলুদ পাকা ফলের রঙ। দেখে মনে হয়, কোনো কিছু হারিয়ে যেতে বসেছে। হয়তো এই রঙে জমিদারের জমিদারি, তার ক্ষমতা হারানোর একটা ইঙ্গিত আছে; জমিদার নিখিলেশের জমিদারি যে পতনোন্মুখ, লালচে হলুদ বা সেই গাঢ় নীল রঙ তারই পূর্বাভাস দেয়।

৩.

অশনি সংকেত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে নির্মাণ করেন সত্যজিৎ। বিভূতিভূষণ অবশ্য তার গল্প থেকে চলচ্চিত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে বার বার নির্মাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন রঙের ব্যবহারে। বিভূতিভূষণের ভাষায়, রঙ ছাড়া ছবিতে ধরা পড়ে না। মেঘমুক্ত আকাশের রঙ প্রহরে প্রহরে বদলায়। কখনো বা গাঢ় নীল, কখনো বা ফিকে, কখনো বা নীলের লেশটুকু চলে গিয়ে স্বচ্ছ শাদা, আবার সকাল-সন্ধ্যায় হলুদ, লাল, কমলা, বেগুনির আভাস। প্রতিটি অবস্থায় মুড স্বতন্ত্র, প্রতিটি অবস্থা ছবির বিশেষ মুহূর্তে বিশেষ ভাব সঞ্চার করতে সক্ষম। কিন্তু এটা সম্ভব একমাত্র রঙে। যে ভাবটা বিভূতিভূষণের আরেক গল্প থেকে তৈরি সত্যজিৎ নির্মিত পথের পাঁচালীতে অনুপস্থিত; একেবারেই যে অনুপস্থিত এমনটিও নয়। তবে কোনো বিষয়ে যদি আমরা বৈপরীত্য আনার চেষ্টা করি বা সেটাকে স্পষ্ট করে তুলতে চাই, তবে অবশ্যই তা করতে হবে রঙে। পর্দায় সোনা, রুপা, তামা, কাঁসা, অ্যালুমিনিয়াম সাদাকালোয় একই মনে হয়, পার্থক্য করাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। যেটা রঙে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অশনি সংকেত-এর শুরুতেই সবুজ প্রকৃতি চোখে পড়ে। শান্ত মনোরম পরিবেশ, আর পাখির ডাক; বিলে শাপলা ফুটে আছে দলে দলে। চোখের দৃষ্টি যতোদূর যায় ততোদূর পর্যন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত। বাতাসের দোলায় যেনো দোলনা হেলিয়ে দুলিয়ে খেলা করছে। হঠাৎ করেই ধানক্ষেতে অন্ধকার নামার পূর্বাভাস। পর্দায় ভেসে ওঠে চলচ্চিত্রের নাম। পরক্ষণেই দেখা যায়, দুটি তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, আর তার মাথার উপর কালো মেঘ জমছে। ক্রমেই মেঘ ঘনীভূত হয়। বাতাস বাড়তে থাকে, বৃষ্টি শুরু হয়। সঙ্গে বদলাতে থাকে আকাশের রঙ। কখনো নীল আকাশ, কখনো কালো মেঘে ঢাকা আবার কখনো হালকা হলুদ। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকে শঙ্কার সুর।

একসময় সেই সুর থেমে নতুনভাবে শুরু হয় সকাল; শুরু হয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। তখনো কারো মনে হয় না, কতোটা আশঙ্কা তাদের গ্রাস করতে যাচ্ছে। তালগাছের মাথার উপরের কালো মেঘ যে তাদের আচ্ছন্ন করছে, এটাও তারা বুঝতে পারে না। টকটকে লাল রঙের আকাশের যে দৃশ্য দিয়ে সকাল শুরু হয়, ছবিটির শেষে সেই সকালটাই হয়ে ওঠে রুক্ষ আর বেদনাদায়ক।

৪.

১৯ শতকের ক্রান্তিলগ্নে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়ে আজ পেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ পথ। চলচ্চিত্রের উৎকর্ষ আনয়নে চলেছে নানাধরনের প্রাযুক্তিক, ধারাগত পরীক্ষা। কখনো এগুলো খুব কাজে এসেছে, কখনো বা আসেনি। বর্তমানে প্রাযুক্তিক দিক দিয়ে চলচ্চিত্রের এগোনো অভাবনীয়। চলচ্চিত্রের উন্নতি সাধনের পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ছিলো নির্বাক থেকে সবাক যুগে পদার্পণ; সেলুলয়েডের ছবিকে রঙিন করে বাস্তবের রঙকে সেই ছবিতে তুলে ধরা। যার কল্যাণে দর্শকরা ১৯৩৫ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে রঙিন ছবিও দেখতে পায়। কিন্তু নির্মাতারা যে এতে কিছুটা সঙ্কটে পড়লেন তা বলাই বাহুল্য। দেখা দিলো কিছু অম্লমধুর সমস্যা। কেননা মানুষ তার আগেই জেনে গেছে প্রকৃতিতে রঙের ব্যবহার। কোথায় কোন্ রঙ কতোটা কার্যকরী এবং তার অর্থ কী দাঁড়ায়।

প্রকৃতির পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাতেও রঙের যে দ্যুতি তা সেসময় প্রায় সবারই জানা। ফলে নির্মাতাদের জানতে হয়েছে প্রকৃতির রঙের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক রঙ সম্পর্কে, তা পরিমাপের একক মিলিমাইক্রন সম্পর্কে। তবে সব ক্ষেত্রে যে নির্মাতারা প্রকৃতি বা বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ীই রঙের ব্যবহার করেছেন, তা নয়। কখনো তারা রঙের ব্যবহারে নির্মাণ-বিনির্মাণের খেলা করেছেন। কখনো বা প্রকৃতি, বিজ্ঞানের কাঠামো ভেঙে ফেলে নতুন কিছু দাঁড় করিয়েছেন। তবে এটা ঠিক যে, তাদের জানতে হয়েছে।

সেই জানা ও তার প্রতিফলনে সত্যজিৎ হয়তো একটু এগিয়ে। এই এগিয়ে রাখতে অবশ্য তার পারিবারিক পরিবেশের ভূমিকা অনেক। দাদা উপেন্দ্রকিশোর, বাবা সুকুমার রায়, মা সুপ্রভা দেবীএভাবে ক্রমানুসারে আসলে দেখা যাবে সত্যজিতের পূর্বপুরুষরা সবাই শিল্প-সাহিত্যের মানুষ। সত্যজিতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হলো না। ছোটোবেলা থেকে তারও হাঁটা সেই পথেই। ম্যাট্রিকুলেশন পাশের পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে ভর্তি হন। তবে প্রবল ঝোঁক ও অত্যধিক দুর্বলতা ছিলো চারুকলার প্রতি। কলেজের পাঠ চুকিয়ে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে ভর্তি হলেও শেষ করতে পারেননি অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম।

একসময় কাজ নেন কলকাতায় একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। সেখানে সাধারণ মানুষকে রঙের খেলায় ভোক্তা বানানোর কাজ চলতে থাকে। একসময় কর্মসূত্রেই কলকাতা থেকে বদলি হয়ে লন্ডনে যেতে হয় তাকে। সেখানেই চলচ্চিত্রের নেশা মাথায় ঢোকে সত্যজিতের। ডি সিকার নিউরিয়ালিজম ধারার দ্য বাইসাইকেল থিভস দেখে চলচ্চিত্র-নির্মাণের ঘোর নিয়ে দেশে ফিরেন তিনি।

এতসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসা সত্যজিৎ তাই হয়তো বুঝতেনরঙের ব্যবহার কতোটা কঠিন। রঙ বিষয়টি তার ভাষায়, তাই আজকের দিনেও আমি বলি, যাত্রা সবে শুরু হয়েছে। এ যাত্রার শেষ কোথায়, আর কত পথ অতিক্রম করা যাবে, তা আমি অন্তত কল্পনাতেও দেখতে পারি না। তবে কল্পনা না করে তিনি তা করে দেখালেন। তাইতো তিনি বেশিরভাগ সময়ে জমিদার নিখিলেশ চ্যাটার্জির পোশাকে তার আভিজাত্য তুলে ধরেছেন ধবধবে সাদা বা হালকা সাদা (অফ হোয়াইট) রঙের ব্যবহারে। পাঞ্জাবির সঙ্গে মিলিয়ে চাদর পরিয়েছেন। কখনো বা হালকা বেগুনি দিয়ে দেখিয়েছেন বন্দে মাতরম শব্দের কাছে জমিদার নিখিলেশের নির্জীবতা, স্ত্রীর কাছে অসহায়ত্ব।

৫.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে পৃথিবী। প্রতিযোগিতা চলেকে কতোটা ধ্বংস করতে পারে বিরোধীদের, মারতে পারে মানুষ। ধ্বংসের এই প্রতিযোগিতায় প্রয়োজন হয় লক্ষ লক্ষ যোদ্ধার, প্রয়োজন হয় খাদ্যের। সেই খাদ্যের জোগান দিতে গিয়ে পৃথিবীর নানা দেশ পড়ে খাদ্যের সঙ্কটে। এটি যতোটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি কৃত্রিম; বলা যায় মানবসৃষ্ট। যার খেসারত দিতে হয় বাংলার মানুষকেও। এটাই সত্যজিৎ দেখিয়েছেন অশনি সংকেত-এ। 

অনেকেই মনে করেন, রঙের ব্যবহার মানে শুধুই গ্ল্যামার। আর গ্ল্যামারের এই ধারণা মানুষের মধ্যে বেশ কিছুদিন থেকে থাকলেও বর্তমানে এসে ধারণাটি আরো পাকাপোক্ত হয়েছে। তবে আমাদের এখানে এই চর্চায় হিন্দি চলচ্চিত্রকে দায়ী করেন সত্যজিৎ। তিনি মনে করেন, হিন্দি ছবিতে রঙের ব্যবহার গ্ল্যামারের উদ্দেশ্যে। বিষয়বস্তুর দৈন্য গোপন করার জন্যই এই বহুবর্ণ মোড়কের প্রয়োজন। তবে কি সত্যজিতও তা-ই করলেন অশনি সংকেত-এ? রঙ দিয়ে কি তিনি বোঝাতে চান দারিদ্র, দুর্ভিক্ষের আলাদা সৌন্দর্য (গ্ল্যামার) আছে? তাই অশনি সংকেত-এ রঙ দিয়ে সত্যজিৎ (তিনি) সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে তুলেছেন নারী শরীর। চুটকির ক্ষুধার্ত পেট বিবর্ণ হলেও রঙিন ছবিতে তার পরনের শাড়ি, সজ্জা কিন্তু এতোটুকু ম্লান হয়নি। কতোদিন চুটকির পেটে ভাত পড়েনি তার হিসাব হয়তো তিনিও রাখেননি। সেটা দিন দিন অসহ্যের পর্যায়ে গড়ায়। তিনি যেতে বাধ্য হন ইটভাটায় তার সবচেয়ে অপছন্দের লোকটির সঙ্গে দেখা করতে। ইটভাটার পোড়ামুখো লোকটা গাঢ় নীলরঙা শার্ট পরে অপেক্ষা করতে থাকেন চুটকির জন্য। অপেক্ষার পালা শেষ হয়, যখন কালো পাড় দেওয়া টকটকে লাল শাড়ি পরে চুটকি হাজির হন ইটভাটায়। আসলে রঙ অন্তরের নিজস্ব অনুভূতি ও ভাবকে ভাষা দিতে পারে, মূর্ত করতে পারে ও অতিরিক্ত অর্থ এনে দিতে পারে...। যা সত্যজিতও হয়তো দেখাতে চেয়েছেন চুটকি আর ইটভাটার লোকটিকে দিয়ে।

চুটকির ওপর লোকটির নজর অনেক আগে থেকেই ছিলো। কিন্তু কিছুতেই চুটকি মুখপোড়া লোকটির সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত যখন চুটকি ইটভাটায় যান, তখন গাঢ় নীল রঙের শার্ট পরে হয়তো মুখপোড়া লোকটি চুটকিকে ছোবল মারার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। যে ছোবলটা চুটকিকে সাপের বিষের মতো নীল করে দেওয়ার অপেক্ষার, কিংবা জীবনযুদ্ধে চুটকির পরাজয় বরণ করে নেওয়ার।

কিন্তু পোড়ামুখো লোকটির গাঢ় নীলের বিপরীতে চুটকির লাল শাড়িতে কালো পাড় দেওয়ার অর্থটা কী, তা একটা ধোঁয়াশার মধ্যেই রাখলেন সত্যজিৎ। সচরাচর লাল শাড়িতে কালো পাড় বিরল। অথচ সেটাই করলেন সত্যজিৎ। প্রথম দিকে লোকটার প্রস্তাবে কোনো সাড়াই দেননি চুটকি। আসলে এই সাড়া না দেওয়ার মধ্যে চুটকির একটা বিদ্রোহ ছিলো। হয়তো সত্যজিৎ চুটকির পরনের টকটকে লাল শাড়ি দিয়ে নিম্নবর্গের মানুষের সেই বিদ্রোহকেই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। যে কারণে হয়তো লোকটির গাঢ় নীলের বিপরীতে লাল দিয়ে নিজের মধ্যে বিদ্রোহের সেই তেজোদ্দীপ্ত ভাবটা ধরে রাখেন চুটকি।

তবে চুটকি শেষ পর্যন্ত তার সেই বিদ্রোহ ধরে রাখতে পারেননি। সত্যজিৎ হয়তো সেই লালে লম্বা কালো পাড় দিয়ে সীমানা টেনে দিলেন চুটকির বিদ্রোহে, বিপ্লবে। যে সীমানা পার হতে পারেন না চুটকি বা চুটকির মতো নিম্নবিত্ত মানুষরা।

একসময় চুটকি পোড়ামুখো লোকটির সঙ্গে শহরে পাড়ি জমান। চুটকির পরনে হালকা নীল রঙের শাড়ি, যাতে হলুদ পাড় দেওয়া। হালকা নীল শাড়ি পরে চুটকির এই চলে যাওয়াকে বিষাক্ত ছোবলে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ বললে হয়তো ভুল হবে না। তবে হলুদে কী দেখালেন সত্যজিৎ? তিনি কি ট্রাফিক সিগনালের ক্রমানুসারের মতো হলুদের পরে লাল আসা অর্থাৎ চুটকির আরো কঠিন জীবনের দিকে ধাবিত হওয়াকে দেখালেন?

বিপরীতে মুখপোড়া লোকটির পরনে হালকা সাদার ওপর চিকন লাল রঙের চেক শার্ট। হালকা খাকি রঙের প্যান্ট। হয়তো লোকটির নিজেকে ভদ্দরলোক প্রমাণের একটা চেষ্টা। চুটকিকে আয়ত্তে এনে হয়তো হালকা সাদা দিয়ে একটা জাতে ওঠার চেষ্টা করেন লোকটি। কিন্তু লোকটির শরীর এই পোশাকে ঢেকে দিয়ে কী আড়াল করতে চান সত্যজিৎ, তার পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা?

৬.

ব্রাহ্মণপত্নী অঙ্গনা, এক অঙ্গে অনেক রূপ। স্বামীর চাতুরী জানলেও সরল মনে মেনে নেন তার সবকিছুই। সেই অঙ্গনার অঙ্গেই সত্যজিৎ পরালেন হরেক রঙের পোশাক। হালকা আকাশির সঙ্গে লাল পরিয়ে আকাশের অসীমতায় হয়তো সত্যজিৎ দেখাতে চেয়েছেন অঙ্গনার উদারতা। যে উদারতায় তিনি ভিনদেশি অপরিচিত এক ব্রাহ্মণকে নিজের খাবার তুলে দিয়েছেন। মৃত্যু পথযাত্রী মতিকে জাতপাত ভুলে কলাপাতায় খাবার দিয়েছেন। এখানে ব্রাহ্মণ-অঙ্গনাকে বড়ো করে দেখালেন সত্যজিৎ। কিন্তু বেগুনিতে টকটকে লাল পাড় দেওয়া শাড়ি পরিয়ে সত্যজিৎ দেখালেন ভিন্ন চিত্র।

বেগুনি রঙ প্রকৃতিতে বিপজ্জনক হিসেবেই পরিচিত, সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি যার প্রমাণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানও বলে একই কথা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, যেসব শিল্পীরা বেগুনি রঙ নিয়ে কাজ করে তাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। শুধু আশঙ্কা নয়, সেটা হওয়ারও প্রমাণ আছে। একই সঙ্গে আইন বোঝাতেও বেগুনি রঙ ব্যবহার হয়। সত্যজিৎ সেই রঙই চড়ালেন অঙ্গনার শরীরে। অঙ্গনাকে হয়তো বেগুনি রঙ পরিয়ে ব্রাহ্মণের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করেছেন। সবসময় একটা কঠোর নিয়মের মধ্যে থেকেই এরা প্রভুর প্রতিনিধিত্ব করেছে। একটু উল্টো করে দেখলে, জাতপাতের মধ্যযুগীয় এই রীতি কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে রেখেছে ক্যান্সারের জীবাণুও। যার ক্ষত আমাদের টানতে হয় প্রতিদিন, প্রতিক্ষণকি মরণে, কি জীবনে, কি দুর্ভিক্ষে। আবার অঙ্গনার সেই বেগুনিতে লাল রঙ দিয়ে আইন ভাঙার বিষয়টিই কি দেখালেন সত্যজিৎ?

৭.

ঘরে খাবার নেই, গঙ্গাচরণ চালের খোঁজে বের হয়ে ফিরে আসে খালি হাতে। অন্যদিকে জাতপাতের দোহাই না মেনে অঙ্গনা চলে যান নিম্নবর্ণের হিন্দু চুটকিদের সঙ্গে ঢেঁকিতে ধান ভানার কাজ করতে। আলতা পরা পায়ের ক্লোজ শট্, হালকা বেগুনি শাড়ির লাল পাড়ের সেই পা পাড় দেয় ঢেঁকিতে। ক্যামেরা আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে। সাদা ব্লাউজ, হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে লাল টিপ আর পায়ে আলতা। অথচ পেটে নেই খাবার। এই অবস্থাতেও সত্যজিৎ অঙ্গনাকে ভিন্ন ভিন্ন সাজে সাজিয়ে রাখলেন।

আরেকদিকে কাম-বাসনা পূর্ণ করার জন্য মুখপোড়া লোকটির অস্থির চলাফেরা, অন্যদিকে সবুজ প্রকৃতিতে নিঃসঙ্গ চুটকি। কিন্তু পেটে ক্ষুধার জ্বালা। চুটকি জানেন না, কী করবেন তিনি। অথচ এই যখন বাস্তবতা, সেসময়ও সত্যজিৎ চুটকিকে নতুন নতুন শাড়ি পরিয়ে, পায়ে আলতা মাখিয়ে হাজির করছেন দর্শকদের সামনে। দুর্ভিক্ষের মতো এতো বড়ো সঙ্কটে তিনি নারীকে পুরুষের ভোগের জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভাবতে পারলেন না! ক্ষুধার্ত চুটকি ব্লাউজ ছাড়া লাল শাড়িতে পুরুষের চোখে কামুক হয়েই রইলো। সঙ্কটময় মুহূর্তে এভাবে নারীকে রঙ মাখিয়ে উপস্থাপন করাটাকে কী বলবেন সত্যজিৎ? কিংবা কোন্ সময় এটা করছেন সত্যজিৎ তা হয়তো ভুলেই গেছেন!

অথচ চুটকি কিংবা অঙ্গনাদের পোশাকে যে রঙ ব্যবহার করলেন সত্যজিৎ তাতে দর্শক হিসেবে আমার বিব্রত হওয়ার জায়গা আছে। এগুলো একটা দোলাচলে মনে সংশয় জাগালেও সরাসরি কখনো আঘাত করে না। তাহলে কি সত্যজিৎ শুধু দূর থেকেই বাস্তবতা দেখিয়েছেন তার চলচ্চিত্রগুলোতে! যে বাস্তবতা কখনো সরাসরি আঘাত করে না। আর আঘাত করে না বলেই হয়তো পতিতাবৃত্তি করতে যাওয়ার আগে অঙ্গনার উদ্দেশে চুটকিকে বলতে শোনা যায়—‘তুমি সতীলক্ষ্মী বাউন দিদি। আশির্বাদ করো বাউন দিদি, যেনো নরকে গিয়েও দুটা খেতে পাই।

বিপরীতে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মারা যান মতি। তার পরনে সাদা শাড়ি। হয়তো এই যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হতে অসীমের পথে, চির শান্তির পথে পাড়ি জমানোর ইঙ্গিত দেয় তার পোশাক। কিন্তু এ অবস্থাতেও কেউ যেনো মতিদের মৃত্যুতে এতটুকু বিচলিত হয় না। তাহলে সত্যজিৎ কোন্ বাস্তবতা হাজির করেছেন মতি, চুটকি, অঙ্গনাদের দিয়ে? কিংবা কোন্ বাস্তবতা নির্মাণ করলেন চুটকির ক্ষুধার্ত শরীরে বার বার নতুন রঙ লাগিয়ে?

৮.

অনেকগুলো গ্রাম ঘোরার পর শেষ পর্যন্ত একটি ব্রাহ্মণ পরিবার বসত গড়ে নতুনগাঁ-এ। তারা আসার আগে গ্রামে কোনো ব্রাহ্মণ পরিবার ছিলো না। শ্রী গঙ্গাচরণ চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী অঙ্গনা। ব্রাহ্মণ বলে গ্রামের সবাই তাদের সম্মান করে (সম্মান নাকি ভয় তা বোঝা কষ্টকর)। সেই সম্মানের সুযোগ নেয় চতুর গঙ্গাচরণ। কিছু সেবামূলক কাজের অজুহাতে মূলত নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত থাকে। তাইতো স্ত্রী অঙ্গনাকে বলে, গাঁয়ে সব মুখ্য-সুখ্য জানো তো, এদের সবদিক দিয়ে বেঁধে ফেলি দিতে হবে। গঙ্গাচরণ বেঁধেও ফেললেন। পাঠশালা খুলে জ্ঞান বিতরণ করে, ভিষক হয়ে রোগের ওষুধ দিয়ে, পুরুত হয়ে পূজা করে ধর্ম রক্ষা করলেন।

সনাতন ধর্মে ব্রাহ্মণদের অনেকটা প্রভু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারা সমাজের এমন একটি স্থানে অবস্থান করেন যেখানে নিচু স্তরের কারো ছায়া গায়ে পড়লে অপবিত্র হন। কিন্তু নিজেরা যা-ই করুক না কেনো কোনো ক্ষতি নেই। ব্রাহ্মণের সেই প্রতিনিধিত্ব গঙ্গাচরণকে দিয়ে ঠিক রাখলেন সত্যজিৎ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গঙ্গাচরণ অনেকটা এক কাপড়েই থাকলেন। সাদা ধুতি ও ফতুয়া, সঙ্গে লাল গামছা। গঙ্গাচরণকে ঢেকে দিলেন সাদার আবরণে। প্রশ্ন ওঠে, এই আবরণে গঙ্গাচরণে কোনো জ্ঞান, শান্তি কিংবা আধ্যাত্মিকতা ছিলো; নাকি সাদায় মুড়িয়ে তার সব ধরনের চাতুর্য আড়াল করা হলো, পবিত্র করে তোলা হলো তাকে? আর গামছার লাল দিয়ে ব্রাহ্মণ তথা প্রভুদের মধ্যে কোনো আশা খুঁজলেন তিনি?

৯.

রঙের বিজ্ঞানের শুরুর দেশ বলা হয় প্রাচীন গ্রিসকে। দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রথম বুঝেছিলেন রঙের প্রধান বস্তু আলো। আলো শোষণ করে বলেই বস্তুকে রঙিন দেখায়। কেননা আলো ছাড়া কোনো রঙ বোঝা সম্ভব নয়, সবই কালো মনে হয়। আসলে আলোকরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য রঙ নির্ণয় করে; কোন্টি লাল, নীল, বেগুনি, সবুজ আর আসমানি হবে তা বোঝা যায়। পরের দিকে রঙের বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন বিজ্ঞানী নিউটন। তিনি কাচের প্রিজমের একপাশ দিয়ে সাদা সূর্যালোক প্রবেশ করান, যখন সেই আলো অন্যপ্রান্ত দিয়ে বের হলো, তখন তা ধারণ করলো হরেক রঙ। অর্থাৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্য ভিন্ন হওয়ায় তাদের রঙও হলো ভিন্ন ভিন্ন।

তবে রঙের ভিন্নতার এই চিন্তা কিন্তু নিউটনেরও ১৬শো বছর আগের রোমান দার্শনিক সেনেকার। কিন্তু সেনেকা চিন্তাটাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। এটা ভাবাও সমীচীন হবে না যে, সেনেকার সময়েই রঙের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর উৎপত্তি জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে আদিম সাম্যবাদী সমাজের দিকে। যখন শক্তির একমাত্র উৎস মনে করা হতো সূর্যকে। আলো আর তাপ অনেক কিছু করতে পারে বলে তখনকার মানুষ ধারণা করতো। তারা দেখতো, একটা সময় রাত নামতো; অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্তু-জানোয়ারের আক্রমণের শিকার হতো তারা। তাই অন্ধকার বা কালো হয়ে উঠলো তাদের কাছে আতঙ্কের রঙ।

আগুন আবিষ্কারের আগে দাবানল পুড়িয়ে ফেলছে মানুষ, বন-জঙ্গল। মানুষগুলো দেখলো সেই আগুনের লাল রঙ; তারা ভয় পেলো, অসহায়ের মতো দূরে সরে গেলো। আগুনের সেই লাল রঙ তাদের কাছে হয়ে উঠলো বিপদের প্রতীক। তারা সকালের লাল সূর্যকে ভক্তি করা শুরু করলো। একসময় আগুনের আবিষ্কার ও তার নিয়ন্ত্রণ শুরু করলো সেই আদিম মানুষ। কিন্তু লালের ভয় দূর হয়নি তাদের মন থেকে। এভাবে নানা অভিজ্ঞতার আলোকে তারা দেখেছে নানান রঙ নানা অর্থ নিয়ে (মূলত শক্তি নিয়ে) হাজির হচ্ছে। ফলে তারা চিনতে বাধ্য হতো সেগুলো।

শিল্পে রঙের ব্যবহার অনেক আগের, বিশেষ করে চিত্রকলায়। গত শতকের দ্বিতীয় দশকে জার্মানিতে এক্সপ্রেশনিজম বা অভিব্যক্তিবাদ আন্দোলন হয়। মানুষের একেবারে ভিতরের সব অনুভূতি, আবেগ, দ্রোহ, রাগ-ক্ষোভ শিল্পে প্রকাশ পেতে থাকে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। প্রকাশের এই মাধ্যমগুলোর অন্যতম হলো চিত্রকলা। চিত্রকলাকে মানুষের সামনে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তাতে ব্যবহার করা হয় রঙ। ব্যবহৃত এই রঙ ছিলো খুবই চড়া প্রকৃতির, টকটকে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি ইত্যাদি। এমনভাবে তা ব্যবহার করা হতো, কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিলের ব্যাপার ছিলো না। অনেকটা জগাখিচুড়ি অবস্থা। 

শিল্পকলার এই আন্দোলন খুব অল্প সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্রে চলে আসে। তবে ভিন্নভাবে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, চলচ্চিত্রে রঙ ব্যবহারের সবচেয়ে বড়ো পদক্ষেপ কিন্তু এই এক্সপ্রেশনিজম আন্দোলনই। চলচ্চিত্রে এর প্রথম সার্থক রূপায়ণ ঘটে যখন রবার্ট ভিনে ১৯২০ সালে তার দ্য কেবিনেট অব ডক্টর ক্যালিগারি নির্মাণ করেন তখন। তবে খেয়াল করার বিষয় হলো, ভিনে কিন্তু তখনো চলচ্চিত্রে বাস্তবের রঙ দেখানোর পুরোপুরি সাহস পাননি। যে কারণে তার চলচ্চিত্রটি আংশিক রঙিন। 

এরপর ৩০-এর দশক। এ সময় বিশ্বের অনেক দেশে চলচ্চিত্র শুধু পৌঁছেই যায়নি, পুরোদমে নির্মাণও শুরু হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণও হয়েছে এ দশকেই। ১৯৩৫ সালে Becky sharp নির্মাণের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ রঙিন চলচ্চিত্রের। রঙের ব্যবহার বলতে আজকের দিনে যা বোঝায়, তা ছিলো না তখন। আসলে বাস্তবে যে জিনিসটি যেমন ছিলো তা চলচ্চিত্রে তুলে ধরাই ছিলো মূল উদ্দেশ্য। রঙ নিয়ে ক্রমেই মানুষের আকাক্সক্ষা বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতেই চলচ্চিত্রে রঙের বহুমুখী ব্যবহারে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন নির্মাতারা।

ফলে একদিকে চলচ্চিত্র-নির্মাণ, অন্যদিকে কোন্ রঙ কিসের প্রকাশ তা নিয়ে কিছু লোক কাজ করতে থাকেন। শেষমেষ তারা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা হিসাবও দাঁড় করান; বলা যায় রঙের একটা ভাবার্থ দাঁড়িয়ে যায়। দেশভেদে এতে তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে উপস্থিতি, মিলিমাইক্রনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে তারা একটি তালিকাও প্রকাশ করেন। যদিও সবার কাছে এটি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি।

১০.

মন্দিরে পর্যাপ্ত আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় কিছু লোককে। যাদের মধ্যে কিছু লোক সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি পরা। অন্যদের পরনে সাদা ধুতি, খাকি পাঞ্জাবি আর মাথায় পাগড়ি, বাম কাঁধ দিয়ে ডান দিকে নেমে গেছে লাল রঙের স্যাশ। তাতে সাদায় লেখা বন্দে মাতরম। ছোটো একটা জনসমাগম নিখিলেশ চ্যাটার্জির জমিদার বাড়ির নাট মন্দিরে। জনসমাগমের ভিতর থেকে কিছু মানুষ কাঁধে চেয়ারে করে নিয়ে আসে বিপ্লবী নেতা সন্দীপকে। সাদা ধুতি, হালকা সাদা (অফ হোয়াইট) পাঞ্জাবি (দেখতে অনেকটা গরদের পাঞ্জাবির মতো) আর গাঢ় খাকি রঙের চাদর গায়ে জড়িয়ে সম্মুখে সন্দীপ। উদ্দেশ্য, স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে কিছু বলা।

ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ব্রিটিশদের শাসন-শোষণের মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু একটা সময়ে এসে এই মানুষগুলোই ব্রিটিশদের ভিত্তিকে নাড়া দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বদেশি আন্দোলনে। বিদেশি পণ্য বর্জন, দেশি পণ্যের ব্যবহার, সঙ্গে ব্রিটিশ শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করা ছিলো এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য। স্বদেশি আন্দোলন ও তার সংঘটনের উপায় নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে সত্যি, তবে সেই আন্দোলনকে যখন সত্যজিৎ সেলুলয়েডে তুলে ধরছেন, তখন বাস্তবকে অস্বীকার করার উপায় ছিলো না। তাই হয়তো সত্যজিৎ বিপ্লবীদের বেশিরভাগ সময় খাকি পোশাক পরিয়েছেন। হয়তো সেই রঙ দিয়ে ব্রিটিশ নিরাপত্তাবাহিনীর বিপরীতে স্বদেশিরা নিজেরাই দায়িত্ব তুলে নেন দেশের নিরাপত্তার। একটা তুলনা বলা চলেব্রিটিশ নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে স্বদেশিদের। কিন্তু মূল যে পরিবর্তনের কথা সেটা হয়তো সত্যজিৎ বুঝিয়েছেন বিপ্লবী কর্মীদের স্যাশের লাল এবং তার মাঝে সাদায় লেখা বন্দে মাতরম দিয়ে। লাল রঙ বিপ্লবের প্রতীক। সেটা যেমন দেখিয়েছেন চ্যাপলিন, তেমনি সত্যজিতও।

নাট মন্দিরের দোতলার বারান্দা থেকে এগুলো দেখেন জমিদার বাড়ির দুই বউ। বারান্দার কারুকার্যের ভিতর দিয়ে আলো এসে পড়ে বিমলা দেবীর মুখমণ্ডলে। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে বিলেতি লাল চাদর গায়ে জড়ানো তার। বিমলা দেবী প্রথম যখন অন্দরমহল থেকে সন্দীপের সঙ্গে দেখা করতে বাইরে বের হন, তখন তার পরনে লাল শাড়ি। সন্দীপের কাছ থেকে স্বদেশি মন্ত্রে দীক্ষা নেওয়ার পর যখনই তার সঙ্গে দেখা করতে যান বিমলা, বেশিরভাগ সময়ে তার পরনে কোনো না কোনো লাল পোশাক ছিলোইকখনো শাড়ি, কখনো চাদর বা ওড়না। সন্দীপ আসার পর যে শাড়িগুলো পরতেন বিমলা, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিলো স্বদেশি। বোঝা যায়, সত্যজিৎ খুব সচেতন থেকেই বিমলাকে দিয়ে এই লাল ব্যবহার করেছেন। সেটা আসলে বিপ্লবের প্রতীক হিসেবেই। স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম করে তোলার জন্যই কি বার বার লাল পোশাকে বিমলার এই হাজিরা?

সন্দীপ স্বদেশি আন্দোলনের নেতা। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগ্রত করা, মানুষের মনে স্বদেশির বীজ বপন করা তার উদ্দেশ্য। যে উদ্দেশ্যের মূল শক্তি লাল কাপড়ে সাদায় লেখা বন্দে মাতরম। কিন্তু সেটা তার ক্ষেত্রে কখনো দেখা যায় না। বরং প্রতি মুহূর্তে এর উল্টোটিই হয়েছে। তার পোশাকে সবসময় আভিজাত্যের ছোঁয়াই দিয়েছেন সত্যজিৎ।

একসময় নিখিলেশের জমিদারি এলাকায় স্বদেশির পাঠ চুকিয়ে সন্দীপের গন্তব্য রংপুর। নিখিল ও বিমলার কাছে বিদায় নিতে আসেন সন্দীপ। ঘরে প্রদীপের আলোয় তিনজনের মুখ স্পষ্ট। কিন্তু রাত ঠিক কতোটা, ঠাওর করা যায় না। কথোপকথন হয় সন্দীপ আর নিখিলের মধ্যে, শ্রোতা-দর্শক বিমলা। সন্দীপের গায়ে সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবির  সঙ্গে লম্বা কালো কোট। হয়তো তার স্বদেশির ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দিতেই সাদাকে কালোর আবরণে ঢেকে দেওয়া। কেননা স্বদেশি প্রবর্তন করতে গিয়ে ততোদিনে সন্দীপ এই এলাকার মানুষের ভিতরে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে, চিড় ধরিয়েছেন হিন্দু-মুসলমানের বিশ্বাসবোধে। ফল হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। নিরীহ মানুষ মরেছে কিন্তু দেশ থেকে ব্রিটিশ তাড়ানোটা আর হয়নি।

বিপরীতে ব্রিটিশদের প্রতিনিধি হলেও নিখিলেশের সাদা রঙে হয়তো সত্যজিৎ সেই আশা বাঁচিয়ে রেখেছেন। নিখিল মনে করেন, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নয়, একটা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শোষণ-শাসনের হাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব। নিখিল আর সন্দীপের মাঝখানে বিমলা; তার পরনে সবুজ ব্লাউজ, সবুজ ফুল তোলা বেগুনি শাড়ি। মনে স্বদেশিভাব নিয়ে সংশয়-অনাস্থা আর শরীর জুড়ে বেগুনি রঙ। আগেই বলেছি, অতি বেগুনির কিন্তু একটা ভয়ঙ্কর প্রভাব আছে মানুষের জীবনে।

হয়তো সত্যজিৎ সবশেষে এসে বেগুনির মধ্যে সবুজ দিয়ে বিমলার প্রাণ (মানে স্বামী) সংহারের মতো বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছেন। যে ইঙ্গিত সত্যি হয়ে যায় সে রাতেই, যখন নিখিল তার দাঙ্গা আক্রান্ত গ্রামে বের হয়ে যান এবং লাশ হয়ে ফিরেন। তখন ক্যামেরা প্যান করে নিখিলের লাশ থেকে ধরা হয় বিমলার দিকে। কয়েকটি ডিজল্ভে সবুজ আর বেগুনির সাদা থানে পরিণত হওয়া দেখা যায়; দেখা যায় বিমলার বিধবা হওয়া, তার সবুজ হারানো। সঙ্গে হারিয়ে যায় আরো অনেক কিছু...।

শেষের আগে

ঋতুপর্ণ ঘোষের সঞ্চালনায় কলকাতা লিটারেরি মিট ২০১৩ নামের এক আয়োজনে সত্যজিতের নায়িকারা শিরোনামের এক আড্ডায় হাজির হয়েছিলেন তার চলচ্চিত্রের অভিনয় করা তিন নারী চরিত্রমাধবী মুখোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর ও অপর্ণা সেন। তাদের আলোচনায় উঠে আসে সত্যজিতের পরিচালনার নানা দিক। তাদের সবাইকে বলতে শোনা যায়সত্যজিৎ ছিলেন পারফেকশনিস্ট; তিনি তার চলচ্চিত্রে এমন কোনো ইমেজ ব্যবহার করেননি যার কোনো অর্থ নেই।

আমরা এখন বাস করছি উত্তর আধুনিক সময়ে। এই সময়ে এসে নিজের অনেক কিছুই আর নিজের থাকে না, ইন্টারটেক্সচুয়াল হয়ে যায়, লেখকের মৃত্যু হয়। ফলে পাঠকের/দর্শকের থাকে অবাধ স্বাধীনতা। দর্শক হিসেবে এই লেখায় আমি কেবল সেই স্বাধীনতাটুকু ভোগ করেছি।

 

লেখক : ইমরান হোসেন মিলন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

milonmcru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. রায়, সত্যজিৎ; রঙিন ছবি; ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন; সম্পাদনা : জহিরুল ইসলাম কচি; পৃ. ১৩৫, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা।

২. প্রাগুক্ত; রায়, সত্যজিৎ; পৃ. ১৩৫।

৩. প্রাগুক্ত; রায়, সত্যজিৎ; পৃ. ১৩৫।

৪. চট্টপাধ্যায়, জগন্নাথ (২০০৯ : ২৯); নির্বাক থেকে সবাক : বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি., কলকাতা।

৫. প্রাগুক্ত; রায়, সত্যজিৎ; পৃ. ১৩৫।

৬. পারভেজ, রুবেল; ক্ষুধার নন্দনতত্ত্ব নিয়ে সেলুলয়েডিয় রাজনীতি; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; ২য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১২, পৃ. ৪৮, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

৭. দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৪ : ৯৮); সিনেমায় ইমেজ; বাণীশিল্প, কলকাতা।

৮. প্রাগুক্ত; পারভেজ, রুবেল (২০১২ : ৪৮)।

৯. চাইলে ইউটিউবে ভিডিও দেখতে পারেন https://www.youtube.com/watch?v=0MEhqakZX-I ও  https://www.youtube.com/watch?v=gR5UZV-tRvQ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন