মাসুদ পারভেজ
প্রকাশিত ২৪ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
দর্শকের খোঁজে
মাসুদ পারভেজ

যে সময়টার কথা বলা হচ্ছে তখন বি টি ভি মানে বাংলাদেশ টেলিভিশন ছাড়া অন্য কোনো বাংলা চ্যানেল বাংলাদেশে ছিলো না। বলা যায়, বি টি ভি ছিলো সবেধন নীলমণি। সেই বিটিভি দেখার জন্য যে টিভি, তাও ছিলো আলাদিনের চেরাগের মতন এক আকাঙ্ক্ষিত চিজ। আলাদিনের চেরাগের জিন বের হওয়ার মতোই ছিলো টিভির পর্দায় ছবি ভেসে ওঠার প্রতীক্ষা। তখন বাংলাদেশের গ্রামগুলো সত্যিকার অর্থেই গ্রাম ছিলো। সত্যিকার অর্থে গ্রাম মানে শহুরে জীবনের লুম্পেনদের ফটকাবাজি গ্রামের যুবকদের মধ্যে আসেনি, শহুরে দুলাল-দুলালীদের রঙচটা জিন্সের প্যান্ট আর চিপাচাপা স্কার্ট কি জামার ছোঁয়া গ্রামে পড়েনি। রাস্তাগুলো ছিলো মাটির। যে রাস্তায় বর্ষা-বাদলে জুতা হাতে নিয়ে হাঁটা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। আর বিদ্যুৎ ছিলো হাতেগোনা কিছু গ্রামে, তাও সেটা অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তির ফল। তখন উইয়ের ঢিবির মতন গার্মেন্ট হয়নি, ব্যাঙের ছাতার মতন এন জি ও গজায়নি। ফলে বউ-বেটিরা গ্রামে বসে নিজ বুদ্ধিতে গরু পালতো, হাঁস-মুরগি পুষতো, মাছের শুটকি শুকাতো আর আচার বানাতো। কারো মাথা থেকে পাচার হওয়া বুদ্ধিতে স্বাবলম্বী হওয়ার আগে তারা স্বাবলম্বী ছিলো সাপ্তাহিক কিস্তির বালাই ছাড়াই। অভাব-অনটন তখন যে ছিলো না, তা কিন্তু নয়। তবে সেটা বাংলায় কোন্ আমলে ছিলো না সেটা গবেষণার বিষয়। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদেও হাঁড়িতে ভাত না থাকার গীত শুনতে পাওয়া যায়। অতএব, অভাব সবকালেই ছিলো এবং থাকবে। সমাজকাঠামো কিংবা এনজিও মডেল এভাবেই তৈরি করা হয়েছে।’
তো সেই গ্রাম্য দিনগুলোতে মানুষের বিনোদনের খোঁজ করা দরকার। বি টি ভি’র সেই দিনগুলোতে মাসে একটা চলচ্চিত্র দেখানো হতো। সেই দিনটি ছিলো শুক্রবার। তবে সেটা কোন্ সপ্তাহের শুক্রবার—সেটার কোনো হদিস ছিলো না গ্রাম্য সেই মানুষগুলোর কাছে। তখন তারা শুক্রবার সকালের অধিবেশন সমাপ্তি ঘোষণার আগে স্মিত হাসি নিয়ে টিভির পর্দায় হাজির হওয়া এক নারীর দিকে চাতকের দৃষ্টি দিতো। স্মিত হাস্যময়ী যখন বিকেলের অধিবেশন ঘোষণা করতো, তখন সবার মধ্যে এক অধীর আগ্রহ। মাত্র কয়েকটি বাক্য, এর মধ্যে যদি বলতো, বিকেল তিনটা ২০ মিনিটে আপনাদের জন্যে থাকছে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি... শ্রেষ্ঠাংশে...। ব্যস, আর কিছু বলার বা শোনার দরকার পড়তো না। চোখের পলকে খবরটা চারপাশে চাউর হয়ে যেতো। বউ-বেটিরা হাতের কাজ শেষ করার জন্যে মরিয়া হয়ে পড়তেন। আরেকটা ব্যাপার ছিলো টেনশনের, সেটা হলো ব্যাটারি চার্জ করা। সেক্ষেত্রে অবশ্য শুক্রবারের আগে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে আনা হতো। আর যদি কোনোভাবে ব্যাটারিতে চার্জ না থাকতো তাহলে চলচ্চিত্রের ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি নিয়ে সাইকেলে শোঁ।
চলচ্চিত্র শুরুর আগেই বাড়ির বউ-বেটি-পুরুষ-বাচ্চা সবাই হাজির হতো টিভিওয়ালা বাড়িতে। নির্ধারিত সময়ের আগে কখনোই টিভি চালু করা হতো না, যদি ব্যাটারির চার্জ নষ্ট হয়। এমনও দেখা গেছে, ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য চাঁদায় টাকা তোলা হতো। ছোটো একটা টিভি—সেটা ১৪ কিংবা ১৭ ইঞ্চি, আবার সাদাকালো—তার দিকে কী মনোযোগ আর আকর্ষণ নিয়ে মানুষগুলোর তাকিয়ে থাকা, একাকার হয়ে উপভোগ করা চলচ্চিত্রের হাসি-কান্না। নায়িকার দুঃখে নিজের অজান্তে আঁচল দিয়ে চোখ মোছা, আবার সুখে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছাড়া। এভাবে তিনটা ঘণ্টা কি তারও বেশি সময় তারা মন্ত্রাহত হয়ে পড়ে থাকতো; ভুলে যেতো বাস্তব জগৎ কিংবা যাপিত জীবনকে। এটা একটা দর্শকশ্রেণি, যাদের আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
২.
এটাও সেই সময়ের কথা যখন গ্রাম থেকে শহরের দূরত্ব শুধু মাইল কি কিলোমিটারে ছিলো না, ছিলো মানসিক দিক দিয়েও। তখন গ্রামের ওই সব কর্মজীবী মানুষ কিংবা শখের বেপারিরা গ্রাম থেকে কোনো কাজে শহরে এলে বলতো, ‘টাউন’ যাই। আর এই টাউনে যে তারা হররোজ আসতো, তা কিন্তু না। বিশেষ দরকার কিংবা কর্ম ছাড়া কেউ টাউনমুখী হতো না। তারা যখন কোনো কাজে টাউনে আসতো, তখন সেই কাজ শেষ হওয়ার পর তাদের আরেকটি কাজ যোগ হতো—সেটা হলো তিনটার শো’তে সিনেমাহলে একটা সিনেমা দেখা। এটা তাদের কাছে একটা নিখাদ বিনোদন কিংবা টাউনে এলে কাজ শেষে কাজের অংশ হয়ে দাঁড়াতো। এই দর্শকেরা নায়ক-নায়িকার নাচ-গানের তালে শিস দিতো, নায়কের কষ্টে ইস্ করে উঠতো, নায়িকার বিপদের মুহূর্তে নায়কের আবির্ভাবে তালি ও শিস মেরে হই হই করে উঠতো। সে অনেকদিন আগে, খুব সম্ভবত চকোরি সিনেমায় নায়িকা শাবানা কোনো একটা দৃশ্যে পুকুরে নামার কালে শাড়িটা হাঁটু পর্যন্ত তুলেছে কি তুলেনি, তাতে দর্শকের মধ্যে শিস আর তালির মহড়া চলে। এই একটা দর্শকশ্রেণি, যাদের আমরা হারিয়েছি।
৩.
একটা সময় ছিলো যখন বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে নতুন ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গেরস্তবাড়িতে নানারকম উৎসব লেগে থাকতো। আর এই সব ঘরোয়া উৎসবে গ্রামীণ পরিবারগুলো মেয়ে-জামাইসহ অন্যান্য আত্মীয়দের দাওয়াত দিতো। আর এই মেয়ে-জামাইয়ের উপস্থিতি বেশি আনন্দ দিতো ওই সব পরিবারের ছোটো ছেলেমেয়েদের। এর অবশ্য কারণও আছে। বড়ো বোন আর দুলাভাইয়ের কাছে তাদের আবদারের শেষ নাই। আর এই সব আবদারের অন্যতম হলো সিনেমাহলে সিনেমা দেখানো। তখন শ্যালক-শ্যালিকাদের নিয়ে দলবেঁধে দুলাভাই সিনেমা দেখতে টাউনে যেতো। আবার এমন মুহূর্তে কখনো ননদ-ভাবি-জা মিলে সিনেমা দেখতে যেতো। তখন কিন্তু সিনেমা ‘কাটপিস’ নামক যন্ত্রণা ছিলো না। আমরা এই মৌসুমি দর্শকদেরও হারিয়ে ফেলেছি।
৪.
শহুরে মধ্যবিত্তরা ছুটির দিনগুলোতে, বিভিন্ন উৎসব, পালা-পার্বণে পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমাহলে যেতো। তারা একটা সময়ে সিনেমাহলে যাওয়া বন্ধ করে দিলো। আর এখানেই ঘটে গেলো একটা ব্যাপার; মধ্যবিত্ত যে দর্শকশ্রেণিটা ড্রয়িংরুমে বসে সিনেমা দেখা শুরু করলো, তাদেরকে পুঁজি মেনে একধরনের পরিচালক শুরু করলো সিনেমা বানানো। আর এই সিনেমা আসলে আদৌ মধ্যবিত্তকে সিনেমাহলে টানবে কি না কিংবা টানছে কি না, তারা সেটা দেখলো না। তারা এটাও ভেবে দেখলো না, যেটাকে সিনেমা বলে চালিয়ে মধ্যবিত্ত দর্শককে ধরার জন্য তারা জান দিয়ে দিচ্ছে, সেটা বড়ো দৈর্ঘ্যের নাটকের বাইরে কিছু হচ্ছে না! এফ ডি সি’র পরিচালকরা যেমন সিনেমার কাহিনিতে নতুনত্ব না আনতে পেরে ‘যাহা লাউ তাহাই কদু’ বানিয়ে বছরের পর বছর চালাতে চালাতে তাতে কাটপিস লাগিয়ে নতুনভাবে দর্শক ধরার পাঁয়তারা করলো। ঠিক তারই বিপরীতে টিভি-নাটককে টেনে-হিঁচড়ে বাড়িয়ে মধ্যবিত্তকে ধরার জন্যে ‘সুস্থধারা’ নামে সিনেমা বানানো শুরু হলো।
কিন্তু এই সব পরিচালক বুঝলো না, এই মধ্যবিত্ত এফ ডি সি’র বাংলা সিনেমা নিয়ে নাক সিটকায়, অশ্লীলতার কথা বলে, আবার ড্রয়িংরুমে বসে ঠিকই ‘চলি কে পিছে ক্যায়া হে’ থেকে শুরু করে ‘চিকনি চামেলি’—কোনোটাই দেখা বাদ দেয় না। তারা পামেলা অ্যান্ডারসনের ‘বেওয়াচ’ যেমন দেখে, সানি লিওনের পর্নো কিংবা হিন্দি সিনেমাও ছাড়ে না। অথচ তাদের যতো ক্ষোভ এফ ডি সি’র বাংলা সিনেমা নিয়ে।
বাংলা সিনেমার প্রতি তাদের এই ক্ষোভ কিংবা উন্নাসিকতা থেকে বাংলা সিনেমাকে রিকশাওয়ালার সিনেমা, গার্মেন্ট শ্রমিকের সিনেমা হিসেবে তকমা দেওয়া হলো। আর এই তকমা দেওয়ার কাজটা করলো মধ্যবিত্ত, যারা ড্রয়িংরুমে বসে সিনেমা দেখে। ফলে ড্রয়িংরুমে মানে টেলিভিশনে ‘সুস্থধারা’ নামে সিনেমার রিলিজ কিংবা প্রিমিয়ার শুরু হলো। মধ্যবিত্ত ধরার ধান্দা করলেও এসব আসলে বেওয়ারিশ সিনেমা হিসেবে ঘুরপাক খাচ্ছে। সিনেমার এই দর্শকদেরও আমরা হারিয়েছি।
৫.
যে সময়টার কথা বলা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বি টি ভি ছাড়া আর কিছু ছিলো না। বি টি ভি তখন জনগণের খবরের চাহিদা আর জ্ঞাপনের মাধ্যম ছিলো, সেটা যেমনই হোক না কেনো। কেমন হতো সেই সময়ের বাংলা সিনেমার বিজ্ঞাপন? এখন যেমন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সিনেমা বিষয়ক অনুষ্ঠান কিংবা খবরে কোনো মহরত থেকে শুরু করে শুটিংয়ের ভিতর-বাহির সব একাকার করে দেখানো হয়, তখন তো সে সুযোগ ছিলো না। কিংবা এখন যেমন ফেইসবুক-টুইটার কিংবা ই-মেইলে কুশীলবরা নিজেরাই তাদের সিনেমার প্রচার চালাতে পারেন, তখন এসব কিছুই ছিলো না। তাহলে দর্শকের কাছে সিনেমার খবর পৌঁছাতো কেমনে? সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর সিনেমাহল থেকে মাইকিং করে প্রচার চালানো হতো—প্রতিদিন চারটি করে শো চলছে..., অমুক সিনেমাহলে...। কিন্তু এটা তো করা হতো সিনেমা রিলিজ পাবার পর। তাহলে তার আগে? তার আগে একমাত্র ভরসা রেডিও।
বাংলাদেশ বেতারে প্রতিদিন দুপুরে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে এক একটি সিনেমার বিজ্ঞাপন চলতো। ভরদুপুরে গাছতলাতে বসে গ্রামের যুবক কিংবা মাঠে গরু ছেড়ে দিয়ে রাখাল শুনতো—হ্যাঁ ভাই, আমি গাজী মাজহারুল ইসলাম, আপনাদের কাছে হাজির হয়েছি... আসিতেছে, আসিতেছে...। এই ১০ কি ১৫ মিনিটে সেই সিনেমার কাহিনি এমনভাবে তুলে ধরা হতো, যাতে থাকতো গান, নায়ক-নায়িকার সংলাপ, অ্যাকশন আর ক্লাইমেক্স। কোনো একপর্যায়ে এসে আবার গাজী মাজহারুল বলতেন, এখন তাহলে কী হবে...? কোথায় যাবে...? পাবে কি পাবে না...? এমন নানা প্রশ্ন তুলতো যাতে দর্শক-শ্রোতার মনে আগ্রহ জন্মায়। আর সিনেমার এই কাহিনি জানার জন্য দর্শককে নিকটস্থ সিনেমাহলে যেতে উৎসাহিত করা হতো। সেই সময়টাও চলে গেছে।
আবার দৈনিক খবরের কাগজে সিনেমার বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। বিশেষ করে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ কয়েক পাতা জুড়ে থাকতো সিনেমার বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনে মূলত সিনেমার পোস্টার আর তার নীচে সিনেমাহলের নাম আর বন্ধনীতে থাকতো জেলার নাম কিংবা জায়গার নাম। অর্থাৎ সারাদেশে কোথায় কোথায় একযোগে এই সিনেমা চলছে, তার একটা ফিরিস্তি। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হলো : দৈনিক পত্রিকা পড়ে কোন্ শ্রেণির জনগণ? যেহেতু সেই সময়ে পত্রিকায় সিনেমার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, তার মানে পত্রিকা পড়নেওয়ালাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা কিংবা তাদের জানান দেওয়া। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় সেই সময়ে পত্রিকা পড়নেওয়ালারা সিনেমার দর্শক ছিলো। কারণ, যারা পত্রিকা পড়ে না নিশ্চয়ই তাদের জন্যে সিনেমার বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো না। এখন আর পত্রিকায় সিনেমার বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে না। তাহলে পত্রিকা পড়ে যেসব দর্শক সিনেমার খোঁজ নিতো কিংবা দেখতো, তাদের আমরা হারিয়েছি।
৬.
টেপ রেকর্ডারে গান শোনার চল এখন আর নেই। গানের ক্যাসেট ছিলো একটা সময় গান শোনার বড়ো অনুষঙ্গ। ক্যাসেটে যে শুধু গান শোনা হতো, তা না। ধর্মীয় ওয়াজ, যাত্রা থেকে শুরু করে নানারকম কিংবদন্তি কাহিনি কিংবা ঘটনার ক্যাসেট পাওয়া যেতো। যদিও সেটা শ্রোতার ওপর নির্ভর করতো। সেই সময়ে আরো একধরনের ক্যাসেট পাওয়া যেতো, যাতে একটি সিনেমার পুরো কাহিনি এক ঘণ্টায় গানসহ তুলে ধরা হতো। আর সেই ক্যাসেট চালু করে গ্রামের যে নারীরা সিনেমাহলে যেতে পারতো না কিংবা কোনো সিনেমা দেখার পরে যদি তাদের সেটা বেশি ভালো লাগতো, তখন তারা সেটার ক্যাসেট কিনে অবসরে শুনতো। এটা যে শুধু তাদের বিনোদন ছিলো তা কিন্তু নয়, সিনেমার প্রতি ভালোবাসারও একটা রূপ। তা না হলে, যে সিনেমা দেখার জিনিস তা কেনো তারা শুনবে অধীর আগ্রহ নিয়ে; কিংবা যে সিনেমা একবার দেখেছে, তা কেনো আবার ক্যাসেটে শুনবে। আবার অনেকে প্রথমে ক্যাসেটে সিনেমার কাহিনি শুনতো, তারপর হলে যেতো দেখার জন্যে। আমরা এই দর্শকদের হারিয়েছি।
৭.
৯০ দশকের শেষের দিকে বাংলা সিনেমায় ‘কাটপিসে’র আবির্ভাব ঘটে। কাটপিসের আগে আমাদের দেশে সেনা অডিটোরিয়াম কিংবা বর্তমানের বি জি বি অডিটোরিয়ামগুলোতে যে সিনেমাহলগুলো চলতো, সেখানে ‘এক টিকিটে দুই ছবি’ নামে ভিনদেশি ভাষার সিনেমা দেখানো হতো। যার একটি অ্যাকশন সিনেমা আর অন্যটি ছিলো পর্নো সিনেমা। যারা এই এক টিকিটে দুই সিনেমার দর্শক, তারা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে তা দেখতে যেতো। তবে সেক্ষেত্রে তাদের কিছুটা শঙ্কা আর লজ্জাও কাজ করতো। কারণ যদি পরিচিত কেউ দেখে ফেলে! এজন্য কোনো কোনো দর্শক আবার মুখ রুমাল দিয়ে কিংবা অন্য কোনোভাবে আড়াল করার চেষ্টা করতো। কিন্তু বাংলা সিনেমার মধ্যে যখন কাটপিস জুড়ে দেওয়া শুরু হলো, তখন দর্শকেরা আগে থেকে জানতে পারতো না, এটা ঠিক কখন শুরু হবে কিংবা আদৌ আছে কি না।
হঠাৎ কোনো গানের দৃশ্যে কিংবা কোনো ধর্ষণের দৃশ্যের সঙ্গে ওই সব পর্নোদৃশ্য জুড়ে দেওয়া হতো। এই সিনেমা দেখার দর্শকের কয়েকটা ধরন তৈরি হয়েছিলো। যারা কালেভদ্রে হলে সিনেমা দেখতে যেতো তারা সিনেমা দেখা বন্ধ করে দিলো। যারা ‘এক টিকিটে দুই সিনেমা’র দর্শক ছিলো তারা বাংলা কাটপিস সিনেমার দিকে আগ্রহী হলো। আর স্কুল-কলেজ পড়ুয়া যে ছেলেরা বয়সের কারণে এক টিকিটে দুই সিনেমার দর্শক হতে পারতো না, তারা বাংলা কাটপিস সিনেমার দিকে ঝুঁকে পড়লো। ফলে সিনেমাকে কেন্দ্র করে প্রচ্ছন্ন ক্ষয় চলতে থাকলো। এটা সামাজিক ও ব্যক্তিক উভয় দিকেই হাত বাড়ায়। আর যারা বাংলা সিনেমার গড়পড়তা দর্শক ছিলো, তারা একপর্যায়ে সিনেমাহলে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিলো।
৮.
কয়েক বছর অশ্লীল সিনেমার দাদাগিরিতে গুটিকয়েক পরিচালক কাটপিস জুড়বেন না বলে প্রায় বসেছিলেন—এমন কাহিনি শোনা যায়। এমন একসময়ে বাংলাদেশের নাচ-গান-ফাইটিং মসলার বাইরে কিছু সিনেমা তৈরি হয়। লাল সালু, মাটির ময়না, চন্দ্রকথা, নিরন্তর, অন্তর্যাত্রা, দারুচিনি দ্বীপ, আমার আছে জল, মেড ইন বাংলাদেশ, রাবেয়া, স্বপ্নডানায়, চন্দ্রগ্রহণ, রূপান্তর, মনপুরাসহ আরো বেশকিছু সিনেমা আছে সেই তালিকায়। এগুলোর মধ্যে সবগুলো সিনেমা হয়ে উঠেছে কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেদিকে যাচ্ছি না। এই সব সিনেমা কীভাবে যেনো ‘সুস্থধারা’র সিনেমা হিসেবে নামকরণ পেলো।
আসলে সুস্থধারার এই নামকরণ কীভাবে হলো তা পরিষ্কার নয়। এটা হতে পারে যে, সেই সময় মানে এফ ডি সি’র বাণিজ্যিক সিনেমা যখন কাটপিসের সিনেমা হিসেবে পরিচিত, তখন তার বাইরের সিনেমাগুলো সুস্থধারার সিনেমা হিসেবে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার একটা কৌশল; অবশ্য এটা নাও হতে পারে। আবার এটাও দেখা গেছে, অনেক টিভি-নাটকের শিল্পীকে যখন কোনো সিনেমায় অভিনয় প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হতো, তখন তার উত্তর ছিলো এমন—বাণিজ্যিক সিনেমা হলে অভিনয় করবো না, ভিন্নধারা কিংবা সুস্থধারার হলে করবো। আর এই উত্তরের সঙ্গে তারা উদাহরণ হিসেবে দু-একটা সিনেমার নামও জুড়ে দিতো।
আর এই সাক্ষাৎকার যখন কোনো পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হতো, তখন ভিন্নধারা কিংবা সুস্থধারার ব্যাপারটা এমনিতেই পাঠকের মগজে জায়গা পায়। এই পাঠকের মগজটা হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই ভিন্নধারার সিনেমাগুলো সিনেমাহলে রিলিজ না করে টিভিতে প্রিমিয়ার শো দেখানো হয়। ফলে সিনেমার মূলধারা কিংবা যে সিনেমার দর্শকেরা সিনেমাহলে সিনেমা দেখে অভ্যস্ত ছিলো, সেই সব সাধারণ দর্শকদের মনে সিনেমা নিয়ে যে ভাবনা ছিলো তা থেকে তারা বিচ্যুত হলো। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে সিনেমা মানে অন্ধকার ঘরে বড়ো পর্দায় ছবি দেখা।
৯.
যে দর্শকরা বাংলা সিনেমা থেকে হারিয়ে গেলো কিংবা সরে এলো, তারা কিন্তু বাংলা সিনেমার বাইরে অন্য শিল্পমাধ্যমে কিংবা অন্যভাবে তাদের বিনোদনের জোগান নেওয়া শুরু করলো। ততোদিনে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল চালু হয়েছে। গ্রামেও সেটার প্রভাব পড়লো। লেবার ভিসায় দেশত্যাগী শ্রমিকদের পাঠানো টাকায় তখন গ্রামের ঘরে ঘরে ইন্ডিয়ান, না হয় চায়নিজ সিডি প্লেয়ার শোভা পায়। আর যাদের ভিনদেশি টাকার উৎস নাই, তারা দেখা গেলো এন জি ও থেকে লোন নিয়ে হলেও সিডি প্লেয়ারের ব্যবস্থা করলো। এর বাইরে কৃষকের ধান, কৃষক পত্নীর হাঁস-মুরগি বেচা টাকা মিলেমিশে তাদের ঘরে টিভি আর সিডি প্লেয়ার নিয়ে এলো। কারো গতরখাটা টাকার সঙ্গে চড়া সুদে ধার নেওয়া টাকা মিলে হলো টিভি-সিডি প্লেয়ারের ব্যবস্থা।
আসলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে, নতুন এই প্রযুক্তির প্রতি স্বাভাবিকভাবে তাদের আগ্রহ কিংবা নেশা জন্মে, আর সিডি প্লেয়ারে যেহেতু সময়ের তোয়াক্কা না করে যখন খুশি তখন সিনেমা দেখা যায়, গানের ভিডিও দেখা যায়, এটা তাদের মধ্যে একধরনের ঘোর তৈরি করে। সেক্ষেত্রে আরো একটি ব্যাপার ঘটলো : যারা সিডি প্লেয়ার কি রঙিন টিভি কিনতে একেবারে অক্ষম, তারা চায়ের স্টলে বসে সেটার খায়েশ মেটালো।
চায়ের স্টলে টেলিভিশন রাখা বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে ব্যাপকভাবে শুরু হলো। ফলে নিম্ন আয়ের দিনমজুর গোছের লোকজন সেই চায়ের দোকানে বসে সিডি প্লেয়ারে সিনেমা দেখা শুরু করলো। আর এই সব ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, স্টলে বসে টিভি দেখতে হলে কিছু সময় পর পর তাকে চা, না হয় বিস্কুট, না হয় পান-সিগারেট—কিছু না কিছু খেতে হতো। এখানে দুইটা ব্যাপার ঘটলো : প্রথমত, একজন রিকশাওয়ালা গোছের কর্মজীবী প্রতিদিন বসে সিডি প্লেয়ার দেখতে দেখতে তার কর্মসময় আগের তুলনায় হ্রাস করলো; দ্বিতীয়ত, বাংলা সিনেমার একজন দর্শক যে সিনেমাহলে যেতো, তার সংখ্যা কমলো।
সামগ্রিকভাবে গ্রামের বাংলা সিনেমার দর্শকেরা স্যাটেলাইট চ্যানেল আর সিডি প্লেয়ারে হিন্দি সিনেমা, কলকাতার বাংলা সিনেমার দিকে ঝুঁকলো। আর বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত নাটকগুলো হলো তাদের বিনোদনের অন্যতম খোরাক। ফলে একই রকম বিষয় আর প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে নাটক-সিরিয়াল বানানোর হিড়িক পড়ে গেলো। আর যারা শহুরে দর্শক, তারা এই সব সিরিয়ালে কতোটা মজলো সেটা জানা না গেলেও তারা হিন্দি এবং কলকাতার টিভি সিরিয়ালে জমে গেলো ঠিকই। ফলে এই সব হিন্দি সিরিয়ালের নকলে বাংলাদেশেও সিরিয়াল বানানো শুরু হলো।
এই সব সিরিয়ালের বিষয় কতোটা আমাদের জীবনের সঙ্গে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখলো না নির্মাতারা। মূলত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন এসব সিরিয়াল নির্মাণের তাগিদ আসে ভারতের চ্যানেলগুলোর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে। তাই ‘টিভির কাহিনীচিত্র, সিরিয়্যাল, সোপ অপেরায় প্রতিহিংসা এখন প্রতিদিনকার চেনা ভাষা হয়ে উঠেছে। মানুষের রক্ত আর মানুষের কাছে তত অপরিচিত ঠেকেনা।’১
১০.
ভিন্নধারা কিংবা সুস্থধারা—যে নামেই ডাকি, যারা এই সিনেমা-নির্মাণের সঙ্গে জড়িত, তারা দর্শকের একটা শ্রেণিকে মাথায় রেখে কাজ করলো। আমাদের দেশে যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত, তারা নিরক্ষরদের ছোটোলোক বলে মনে করে। এই ব্যাপারটি-ই ঘটলো। কিন্তু এই বোধটি তাদের মাথায় আসে না যে, পর্দার সামনে বসলে কে শিক্ষিত আর কে অশিক্ষিত তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এখানে একটা মজার ব্যাপার ঘটলো, যে নির্মাতারা নিম্নজীবীদের তাদের দর্শক মানতে রাজি নয়, তারা কিন্তু ওই মানুষগুলোর জীবনের কোনো একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কাহিনি নির্মাণ করে বা সিনেমা বানায়। এতে তাদের গভীর একটা উদ্দেশ্য তো আছে। কিন্তু তারা যাদের জীবনের কাহিনিকে পর্দায় দেখাতে চায় তাদের সম্পর্কে তো উচ্চ ধারণা পোষণ করে না। এমনকি তাদেরকে সিনেমার দর্শকও মনে করে না। ফলে তারা যে সিনেমা বানায়, তা কখনোই ‘জীবন থেকে নেয়া’ হয়ে ওঠে না, জোচ্চুরি ছাড়া এটা আর কিছুই নয়।
দারিদ্র যত ভয়াবহ ও প্রকট হোক কেবল তা-ই দিয়ে কাউকে শনাক্ত করা হলে তাঁকে মর্যাদা দেওয়া হয় না। যাকে সম্মান করতে পারি না, তার সমস্যাকে অনুভব করতে পারব না। নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী যতো গরিব হোন না, তিনি একজন মানুষ। তিনি একজন ব্যক্তি, একটি পরিবারের প্রধান, কারো স্বামী, কারো ভাই, কারো ছেলে এবং নিজের ছেলেমেয়ের বাপ। পরিবারের যে—কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাঁকেই নিতে হয়।২
এসব বিষয় নির্মাতাদের মাথায় নাই। পুরোপুরি ব্যবসা ধরার একটা ফন্দি আর সঙ্গে আছে জাহির করার প্রবণতা। এই ব্যবসা কিন্তু দর্শক ধরার ব্যবসা না। এই গরিব-গুরবার জীবনকাহিনি নিয়ে বানানো সিনেমা পুরস্কার আনতে ভিনদেশে যায়, ব্যবসা এখানে কিছুটা বেরিয়ে আসে। তারা এমন কিছু বিষয় নিয়ে সিনেমা বানায়, সেই সঙ্কট দেশে থাকুক আর না থাকুক, সেটা পশ্চিমাদের কাছে দেশ নিয়ে ভীষণ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবস্থাটা তখন এমন যে, দেশটা গেলো গেলো। আরো ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, ওই সব সিনেমা আবার বিভিন্ন উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিনিধিত্বও করে। তখন প্রশ্ন জাগে, যে সিনেমাটা বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই সিনেমা বাংলাদেশের শতকরা কয়জন দেখেছে? আরো প্রশ্ন জাগে, ওই সব নির্মাতারা যদি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্কট নিয়েই সিনেমা বানায়, তাহলে তারা ফুলবাড়ির কয়লাখনি ও তার যে আন্দোলন—এ ধরনের বিষয়কে (আদিবাসী সঙ্কট, পতিতাবৃত্তি, হিজড়া, ফারাক্কা সমস্যা) উপজীব্য করে না কেনো? না, তারা সেটা নির্মাণ করবেন না!
কারণ পুরস্কার আনতে তারা পশ্চিমে যেতে চান। তখন তারা আবার ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক লাভ-লোকসানের হিসাব খাড়া করান। হিসাবে তারা ধরেই নেন, এসব বিষয়ের ওপর নির্মিত সিনেমা পশ্চিম খাবে না। আবার এদের প্রযোজক নিয়েও কথা আছে। ‘নতুন সিনেমায় সময়ের বাস্তবতার যে রূপায়ন আমরা দেখতে চাই তা অলটারনেটিভ সার্কিট কিংবা বিদেশী অর্থপুষ্ট এনজিও ছবিতে অসম্ভব।’৩ এ কথায় তাদের উদ্দেশ্য আর প্রযোজক বৃত্তান্ত কিছুটা জানা যায়। কারণ তারা কখনোই নিজেদের শ্রেণিগত জায়গায় আঘাত মেনে নেয় না। ফলে কখনোই গার্মেন্ট শ্রমিকের জীবন সিনেমার কাহিনিতে ধরা পড়ে না। অথচ এই গার্মেন্ট শ্রমিকেরা যেসব সিনেমা দেখে, তা নিয়ে হাসাহাসি-মশকরা-টিটকারি সবই তারা করে। তারা মানতে চায় না, এদের মতো দর্শকরাই বাংলাদেশের সিনেমাকে এতদিন টিকিয়ে রেখেছিলো। এই ‘অশিক্ষিত হয়ত অধিকতর সরল, কিন্তু অনেক শহুরে শিক্ষিত লোকের তুলনায় আবেগের দিক থেকে তারা অনেক বেশি পরিপক্ব এবং সাধারণ বুদ্ধির অধিকারী।’৪
১১.
সিনেমা বানাতে টাকা লাগে, সঙ্গে বুদ্ধিও। এই দুয়ের কম্বিনেশন ছাড়া আসলে সিনেমা হয় না। যদিও হয়, সেটা দাঁড়ায় না। সিনেমা যেহেতু একটা বাজারি পণ্যের মতো, তাই সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার হিসাব থাকাটাই স্বাভাবিক। আর এই হিসাবটা সঠিকভাবে করতে না পারার কারণেই নির্মাতারা ভেজাল করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা আর রুচির যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, তার জন্য সময় ধরেই বিচার করতে হবে। আর এই সময় ধরার মধ্যে আছে সময়ের গল্প, সময়ের কাঠামো, সময়ের মানুষ। যেহেতু সিনেমা অনেকগুলো বিষয়ের সংমিশ্রণের ফল, তাই এখানে দর্শকের উপস্থিতির মধ্যেও সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু ধারা কিংবা ধরনের কথা চিন্তা না করে সামগ্রিকভাবে চিন্তাটা করলেই মঙ্গল। কারণ, দর্শক কম্বিনেশন করতে না পারলে সিনেমা সবার হয়ে উঠবে না।
আমরা যদি নন্দনতত্ত্বের জায়গা থেকে কিংবা সিনেমায় স্পেশাল ইফেক্টের জায়গা থেকে কিংবা সিনেমায় বিভিন্ন সময়ের ইজমের জায়গা থেকে চিন্তা করি, তাহলে চলচ্চিত্র সবার জন্য হয়ে ওঠেনি—এটা ঠিক। কিন্তু আর্ট ফিল্ম, বিকল্পধারা, স্বাধীনধারা যাই হোক, এটা যদি ম্যাস পিপলকে দর্শক বানাতে না পারে তাহলে তা একটা শ্রেণিবৃত্তেই বন্দি হয়ে থাকবে। দর্শক হিসেবে আমাদের চাওয়া, এই সব আর্ট ফিল্ম-বিকল্পধারা-স্বাধীনধারা সাধারণ দর্শককে ধরুক। আর এই সাধারণদের ধরার জন্য নির্মাতারা আরো অসাধারণভাবে ভাবুক তাদের প্রেক্ষাপট কিংবা বিষয়। হয়নি বলে যে হবে না, তা মেনে নেওয়া কষ্টের।
অনেকেই ‘নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্য’ টাইটেলে একধরনের সাহিত্যের কথা বলে, কিন্তু বিষয়টা তো আদৌ সেরকম নয়। কারণ প্রতিটি বিষয় তো এক একটা নিরীক্ষা, যতোক্ষণ না সেটা শেষ হয়। তো এই সব আর্ট ফিল্ম-বিকল্পধারা-স্বাধীনধারাকে আর কোনো নিরীক্ষার জায়গায় রেখে, নামকরণ কিংবা শ্রেণিকরণ না করে সাধারণের জন্য ছেড়ে দেওয়া উচিত। দর্শকই বেছে নিক না—কোন্টা কার ধারা। আগে থেকেই কোনো টাইটেলে বন্দি করা ঠিক হবে না। এজন্য প্রয়োজনে মসলার কম্বিনেশন ঘটুক। কারণ আমাদের দেশ যে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা তো তাকে দেখাতে হবে। যে বোঝে কিংবা জানে তার জন্য এক কথা, কিন্তু যে জানে না তাকে তো জানান দিতে হবে। সিনেমা হচ্ছে একটা লড়াইয়ের জায়গা। আর এই লড়াই কখনো দর্শক বিভাজন করে সম্ভব না। এখানে বিভাজনটা হবে আধিপত্যবাদী আর শোষিতদের মধ্যে।
তাই চিন্তা, সিনেমার কাহিনি কিংবা নির্মাণের মধ্যেই যদি দর্শকদের শ্রেণিবিভাজনের ব্যাপার খাড়া হয়, তাহলে সেটা নির্মাতা, সিনেমা ও দর্শক-সবার জন্যে অস্বস্তিকর হবে। সর্বোপরি বিভিন্ন প্রেক্ষাপট আর সময়ের মধ্য দিয়ে বাংলা সিনেমা যে দর্শকদের হারিয়েছে কিংবা যারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের আবার বাংলা সিনেমার জগতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নির্মাতাদেরই নিতে হবে। এটা সময়ের দাবি।
লেখক : মাসুদ পারভেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ান। ‘গল্পকার’ ও ‘রানার’ নামে ছোটো কাগজের সম্পাদক। তার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের নাম ‘ঘটন অঘটনের গল্প’।
parvajm@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. রায়, দেবেশ (২০০৬ : ২৫); ‘বিবিধ আখ্যান ও টেকনোলজি’; উপন্যাসের নতুন ধরণের খোঁজে; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
২. ইলিয়াস, আখতারুজ্জামান (২০০৫ : ৩১); ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’; সংস্কৃতির ভাঙা সেতু; মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
৩. আতিক, নূরুল আলম (২০০৯ : ৪৩); নতুন সিনেমা : সময়ের প্রয়োজন; পান্ডুলিপি কারখানা, ঢাকা।
৪. রোবের্জ, গাস্তঁ (২০০৬ : ৫০৯); ‘সেন্সরসিপ’; চলচ্চিত্র অভিধান; সম্পাদনা : ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন