আসাদ লাবলু
প্রকাশিত ২৪ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
অতএব, তোমরা ভানুর কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে
আসাদ লাবলু

‘যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এক সৈনিক পালিয়ে চলে আসলো। সবাই বলতে লাগল—শেষ পর্যন্ত তুমি তাহলে ভয়ে কাপুরুষের মতো পালিয়ে চলে এলে?
সৈনিকের উত্তর : ঠিক তা নয়। আমার যুক্তি শুনলেই তোমরা তা বুঝতে পারবে—দেয়ার আর টু পসিবিলিটি ইন ফ্রন্ট। যুদ্ধে আমি শত্রুকে মারবো, নয়তো শত্রু আমাকে মারবে। আমি শত্রুকে মারলে নো প্রবলেম। কিন্তু শত্রু আমাকে মারলে এগেইন দেয়ার আর টু পসিবিলিটি। হয় আমি আহত নতুবা নিহত হব। আহত হলে নো প্রবলেম। কিন্তু নিহত হলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটি। হয় ওরা আমাকে জ্বালিয়ে দেবে নয়তো কবর দেবে। জ্বালিয়ে দিলে নো প্রবলেম।
কিন্তু কবর দিলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটি। হয় আমার কবরের ওপর বড়-বড় গাছ জন্মাবে, নয়তো ঘাস জন্মাবে। ঘাস জন্মালে নো প্রবলেম। কিন্তু বড় গাছ জন্মালে দেয়ার আর টু পসিবিলিটি। গাছের কাঠ দিয়ে হয় ফার্নিচার তৈরি হবে, নতুবা কাগজ তৈরি হবে। ফার্নিচার তৈরি হলে নো প্রবলেম।
কিন্তু কাগজ হলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটি। ভালো কাগজ হলে তা দিয়ে সংবাদপত্র ছাপা হবে, কিন্তু বাজে কাগজ হলে তা দিয়ে টয়লেট পেপার তৈরি হবে। লোকজন বাথরুমে তাদের বটম সাফ করার জন্য আমাকে ব্যবহার করবে। যা আমি একজন সৈনিক হয়ে কিছুতেই সহ্য করতে পারবো না। তাই আমি যুদ্ধ করতে আগ্রহী নই। কারো পায়ুর জন্য আমি আমার আয়ু বিসর্জন দিতে রাজি নই।’১
যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে ‘যুদ্ধবিরোধী’ এই কৌতুকটি সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই কৌতুক অভিনেতার আরেকটি নাম এবং আরেকটি পরিচয় আছে। সেই নাম ও পরিচয় বললে অনেকেই চিনতে পারবেন। কিন্তু তার সেই নামের মধ্য দিয়ে বেশিরভাগ মানুষের মাথায় যে ডিসকোর্স তৈরি হয়েছে, সেই ডিসকোর্স তাকে পুরোপুরি উপস্থাপন করে না। ডিসকোর্সের অপূর্ণতাটুকু নিয়ে আলোচনা করাই আজকের লেখার মৌলিক উদ্দেশ্য। আর এ আলোচনায় অপূর্ণতাটুকুর যতোটুকু পাওয়া যাবে, আমার বিশ্বাস ততোটুকু অনায়াসে তাত্ত্বিকভাবে উৎসর্গ করা যাবে ওই ‘সাম্যময়’ নামের ভিতরে। বলেই দিই, তার আরেক নাম ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা—এই পরিচয়েই আমরা বেশিরভাগ মানুষ তাকে চিনি। কেবলই যে কথা বললাম, কতোটুকু চিনি আর কতোটুকু চিনি না—তা-ই এখন দেখবো।
দুভাগে আলোচনা করবো। এক ভাগে শিল্পী ভানুকে (আমি তাকে কেবল চলচ্চিত্রশিল্পী বলতে রাজি নই) নিয়ে, আরেক ভাগে ব্যক্তি ভানুকে নিয়ে। তবে তার আগে খুবই ছোটো আকারে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নিবো :
ভানুর জন্ম ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জে। বাবা জিতেন্দ্রনাথ ছিলেন ঢাকার নবাব এস্টেটের সদর মোক্তার। আর মা সুনীতি দেবী কাজ করতেন ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষা দপ্তরে। ভানুর প্রাথমিক শিক্ষা পোগোস বিদ্যালয়ে, পরের ধাপগুলিতে ছিলেন জর্জস হাইস্কুল, জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশ ভাগের আগেই ১৯৪১ সালে চলে যান কলকাতায়। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক সেখানে গিয়েই। এবং ১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ সেখানেই মৃত্যু। কাজ করেছেন প্রায় তিনশো চলচ্চিত্রে। এছাড়া নাটক, যাত্রাপালার মঞ্চেও তার উপস্থিতি ছিলো উল্লেখযোগ্য। আছে বেশ কয়েকটি কৌতুকের অ্যালবাম (ক্যাসেট); লিখেছেন বই-ও। এসবের বিস্তারিত আলোচনা পরে থাকছে।
শিল্পী ভানু
একজনের শিল্পত্বকে তার ব্যক্তিত্ব থেকে আলাদা করা যায় না—এ কথা আমি মানি। কিন্তু নিজেকে স্বাধীনভাবে প্রকাশের ক্ষেত্রে শিল্পমাধ্যমে কারো ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি ছাড় সবসময় পায় না। আর ছাড় পাওয়ার অদম্য দাবি থেকেই তৈরি হয় বিকল্প শিল্প, বিকল্প শিল্পমাধ্যম ও বিকল্প শিল্পী। সেই দাবি ছিলো ভানুর মধ্যে। তিনি মূলত কমেডি অভিনেতা ছিলেন। কিন্তু সেই কমেডিকে কেবল ভাঁড়ামি হিসেবে ব্যবহার করেননি তিনি—তার কথা ও পারিপার্শ্বিকতায় বিশ্বাস রাখলে আমরা এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
কী তার কথা, আর কী তার সেই পারিপার্শ্বিকতা? প্রথম কথা, যে ব্যক্তি নিজেকে মনে-প্রাণে, কাজে-কর্মে কমিউনিস্ট দাবি করতেন (কেনো করতেন, সে আলোচনা নীচে আছে) এবং যার চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণার ব্যক্তি ছিলেন ‘মহত্তম’ চ্যাপলিন—সে ব্যক্তির কাছে কমেডি কেবল ভাঁড়ামি হওয়া অসম্ভব। টালিগঞ্জের চারুচন্দ্র অ্যাভিনিউয়ের একটি বাড়িতে থাকতেন ভানু। সেখানে তার ‘ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ত চার্লি চ্যাপলিনের একটা বিশাল ছবি। ...গ্রেট ডিক্টেটর পারলে রোজ দেখতেন। গোল্ড রাশ দেখে ভয়ঙ্কর কষ্ট পেয়েছিলেন, আর মডার্ন টাইমস এর চ্যাপলিনই বোধহয় তাঁকে চলচ্চিত্র-শিল্পের সংরক্ষণবিরোধী আন্দোলনে সামিল করেছিল। লাইমলাইট দেখে বাড়িতে এসে কেঁদেছিলেন ভানুদা। স্বগতোক্তির মতো করে সেদিন তাঁর স্বজনদের তিনি বলেছিলেন, মইরা গেলেও লোকে বিশ্বাস করব না, কইব আমি হ্যালারে হাসাইতাছি। আমাগো দেশে এইটাই ট্র্যাজেডি, কমেডিয়ানরে লোকে ভাঁড় ভাবে।’২
এই কথার মধ্যে স্পষ্ট, ভানু কমেডিকে আর যাই ভাবেন, ভাঁড়ামি ভাবতেন না। আর সবাই ভাঁড়ামি ভাবুক আর যাই ভাবুক, কিংবা তার কমেডির আসল রসদ লোকে না বুঝলেও কমেডিকে চলচ্চিত্রের একটা শক্ত জায়গায় দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। গত শতাব্দীর ৫০ দশকের পরের সময়, তখন উত্তম-সুচিত্রা জুটির দাপট চলছিলো, কিন্তু তখন ভানু ও জহর রায় জুটির দাপটও কম ছিলো না। ওরা থাকে ওধারে চলচ্চিত্রে সুচিত্রা সেনের দৈনিক পারিশ্রমিক ছিলো দেড় হাজার টাকা। একই চলচ্চিত্রে কমেডিয়ান হিসেবে ভানু নিয়েছেন এক হাজার টাকা করে। এবং লড়াই ও দাবির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত দৈনিক পারিশ্রমিক দেড় হাজার টাকায় উন্নীত করেন তিনি। অথচ শুরুর দিকে ভানুর দৈনিক পারিশ্রমিক ছিলো আড়াইশো টাকা। পরিচালক-প্রযোজকদের সঙ্গে পারিশ্রমিক নিয়ে যে ঝগড়া হতো তাতে ভানুর বক্তব্য ছিলো, ‘নায়ক-নায়িকাই শিল্পী! ওরাই কেবল চরিত্র সৃষ্টি করে! পার্শ্ব চরিত্রে যারা কাজ করে, তারা সব গরু-গাধা? তাদের অবদান কোন্ অংশে কম?’
কমেডিয়ান হিসেবে অভিনয় করলেও ভানুর শিল্পীসত্তার আত্মবিশ্বাস ছিলো প্রচণ্ড রকমের। ‘আমাগো দেশে এইটাই ট্র্যাজেডি, কমেডিয়ানরে লোকে ভাঁড় ভাবে’—এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে ভানুর মনঃকষ্ট থাকলেও তিনি নিজের জায়গায় অটুট ছিলেন। কারণ নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াটা ভানুর নড়বড়ে ছিলো না। ভানু বলতেন, ‘বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে যা কিছু সমাজের, সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী, আমি দরকার মতো, সাধ্য মতো তার বিরুদ্ধে মানুষকে খোঁচা দিয়ে জাগানোর জন্য নাটক, সিনেমা করে যেতে চাই, তা সে ব্যঙ্গ বা সিরিয়াস, যা কিছু হোক না কেন। এটাই আমার কমিটমেন্টের শেষ কথা।’৩
আর তার এ ‘খোঁচা’র আলামত পাওয়া গেছে অনেক চলচ্চিত্রেই। নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে, টাকা আনা পাই, দর্পচূর্ণ, নতুন ইহুদি, পারসোনাল অ্যাসিসটেন্ট, ওরা থাকে ওধারে, সাড়ে “৭৪”, যমালয়ে জীবন্ত মানুষ তার মধ্যে কয়েকটি। মূলত সাড়ে “৭৪”-এ অভিনয়ের ওপর নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন ভানু। মাসিমা, মালপো খামু—চলচ্চিত্রে ভানুর এ সংলাপটি আজও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মুখে শোনা যায়। অনেকে মনে করেন, আমিও একমত যে, সাড়ে “৭৪”-এ ভানুর দাপট উত্তম-সুচিত্রার চেয়ে প্রকট ছিলো।
প্রায় তিনশোর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও ‘প্রধান’ চরিত্রে ভানুকে কমই পাওয়া গেছে। আমার মতে, তার দরকারও পড়েনি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের। ভানুর ‘গলার আওয়াজ’ এতো উচ্চ ছিলো যে, তিনি কারো খুব কাছে গিয়ে নিজের কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেননি; দূর থেকেই নিজের কথা পৌঁছে দিয়েছেন প্রাপকের কাছে। তার পরও অনেক ক্ষেত্রে অনেক নির্মাতাই ভানুকে নিজেদের প্রয়োজনে চলচ্চিত্রের ‘প্রধান চেয়ারটি’তে বসিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো যমালয়ে জীবন্ত মানুষ (১৯৫৮), পারসোনাল অ্যাসিসটেন্ট (১৯৫৯), আশিতে আসিও না (১৯৬৭), শোরগোল (১৯৮৪) ইত্যাদি। আলাদাভাবে বলবো, তাই এখানে দুটি চলচ্চিত্রের নাম বলিনি। ‘আজ পর্যন্ত কোথাও দেখা যায় নি, অভিনেতার নাম দিয়ে একটা গোটা ছবি তৈরি হচ্ছে। এমনকি ...সবার প্রিয় উত্তমকুমারকে নিয়েও হয়নি! এনার নামে দু-দুটো ছবি হয়েছিল। ভানু পেল লটারি ও ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিসটেন্ট।’৪ তাই বলে আবার এর সঙ্গে কেউ দয়া করে নাম্বার ওয়ান শাকিব খান-এর তুলনা করবেন না। কারণ এক কথায়, শাকিব ‘ভেড়ার দলে বাছুর প্রধান’। কিন্তু ভানু ঠিক তার উল্টো—আমার একান্ত মত তাই।
আলাদাভাবে বলতে হবে যমালয়ে জীবন্ত মানুষ নিয়েও। ভানুর এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে আলাদাভাবেই একটি লেখা হতে পারে। তাই সংক্ষেপে বলাটা কঠিন-ই। ‘যাদের আমরা চলচ্চিত্র-শিল্পী বলতে চাই, তারা বিভিন্নভাবে অগ্রসর হয়েছেন। আমরা অন্তত তিনটি অবস্থার কথা বলতে পারি।
১. যারা চলচ্চিত্রের গ্রান্ড-ন্যারেটিভের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সূত্রগুলিকে মেনে নিয়েছেন এবং একটা মানিয়ে নেওয়ার পথে নিজের কাজটুকু করতে চেয়েছেন অথবা তাদের শিল্প-ভাবনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের জন্য মাথাব্যাথা সৃষ্টি করে নি। সত্যজিৎ রায় কি এরকম শিল্পীর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ? তাঁর ছবি প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করে নি। বড়জোর প্রশ্ন করেছে এবং তাঁর নৈতিকতা এবং শ্রেয়বোধ প্রতিষ্ঠান-নির্ধারিত প্যারাডাইমকে অতিক্রম করে নি...।
২. যারা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থেকে তার সাথে ক্রমাগত দর কষাকষি এবং সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছেন—কখনও ছাড় দিয়েছেন, কখনও ছাড় পেয়ে গেছেন...।
৩. যারা বিকল্প প্রকল্প উপস্থাপন করতে চেয়েছেন এবং লড়াই-এর মাঠেই যাদের কেটেছে জীবন...।’৫
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কি এ রকম শিল্পীর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ? হ্যাঁ-না, কোনোটাই বলবো না। তার বদলে যমালয়ে জীবন্ত মানুষ-এর একটি দৃশ্যে ভানুর কথোপকথন তুলে ধরতে চাই। ভানুকে মৃত ভেবে দুই যমদূত তাকে যমালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে ঘটনাক্রমে তিনি ধর্মরাজের সিংহাসনটি দখল করেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধর্মের বিধান সংস্কার শুরু করেন তিনি। যমালয়ে মানুষের পাপ-পুণ্যের হিসাব যারা রাখেন তাদের একজন বিচিত্রগুপ্ত। তার সঙ্গে আলাপকালে মানুষের আয়ুর বিষয়ে ধর্মের বিরাজমান বিধান প্রসঙ্গে ভানু বলেন,
‘কী আমার বিধানরে! সুন্দর ফুটফুটে শিশু, মায়ের কোল উজ্জ্বল করে আছে, সে মরে গেলো! ২০ বছরের জোয়ান ছেলে, দেশের আশা-ভরসা, তার অকালে মৃত্যু! আরে বাবা, অকাল মৃত্যুই যদি হবে, জন্মালো কেনো?’
এর পরেই বিচিত্রগুপ্তকে নিয়ম বদলিয়ে ভানু লিখতে বলেন, ‘লেখো, একশো বছরের আগে কোনো মানুষের মৃত্যু হবে না। নিজেরা অমর হয়ে থাকবেন, আর মানুষের বেলায় যত্ত-সব! না না, শুধু বেঁচে থাকবে না। ...লেখো, অদক্ষ-পঙ্গু হয়ে নয়, মানুষ বেঁচে থাকবে মানুষের মতো মানুষ হয়ে।’
ভানু বলতেই থাকেন, ‘যারা সৃষ্টি করছেন, তাদের তো বাহারের শেষ নেই। নিজেদের দেবীদের একেবারে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। অথচ যাদের শাসন করছেন, সেই স্রষ্টার জীবরা যে এক মুঠো ভাতের জন্য যে হাহাকার করছে! ...একবার ফিরে যাই। তারপর কন্ট্রোলের লাইনে যারা এক মুঠো চালের জন্য গুঁতোগুঁতি করছে, তাদের কাছে সব কথা ফাঁস করে দেবো। তারপর তারা যখন স্বর্গরাজ্যে গিয়ে ঢুকবে, তখন বুঝবে কত্তারা, ফুড ক্রাইসিস কাকে বলে?’
পুরো চলচ্চিত্রে ‘কর্তৃপক্ষ’কে এ রকম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেন ভানু। হ্যাঁ, আমি জানি, সেটা ভানুর অভিনয়। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, যমালয়ের সেই কৃত্রিম ভানুই মানবালয়ের আসল ভানু। আর বিশেষ দ্রষ্টব্য হলো, এটিও ভানুর একটি কমেডি চলচ্চিত্র। কিন্তু তার কাছে কমেডির বিশেষত্ব কেবল চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। তার জগৎ-সংসারে কমেডির সর্বজনীন একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। ভানু প্রায়ই বলতেন, ‘রসরাজ রাজশেখর বসু একবার আমাদের বলেছিলেন, জগতের সমস্ত সত্যকথাই হাসির কথা। তবে, সেটা কীভাবে এবং কোথায় বলতে হবে জানা দরকার।’৬
এ কথা বলা যায় যে, চ্যাপলিনের হাত ধরে যেমন হলিউডের কমেডি এক নতুন মাত্রা পেয়েছিলো, তেমনি টালিগঞ্জের কমেডিও ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিলো ভানুর হাত ধরেই। চ্যাপলিনের সঙ্গে ভানুর তুলনা না হলেও অন্তত সম্পর্ক স্থাপন করা যায় এভাবে—‘কমেডিতে বা স্যাটায়ারে রূপ ও রস যতই বিভিন্ন ও বিচিত্র হোক, উদ্দেশ্য সর্বত্র ও সর্বদা এক। সকলের একই উদ্দেশ্য। আর তা হলো ব্যঙ্গের অস্ত্র দিয়ে তমসা ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই।’৭
একটু আগেই বলছিলাম লড়াইয়ের মাঠে টিকে থাকার কথা। টালিউডে চলচ্চিত্রের সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলনে প্রযোজকদের বিরুদ্ধে ও কলাকুশলীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন ভানু। এ কারণে টানা পাঁচ বছর ছিলেন ব্ল্যাক লিস্টেড। তিনি কোনো কাজ পাননি। তখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার সঙ্গে ছিলেন। তবে সৌমিত্র অধ্যাপনায় চলে যাবেন বলেও কথা উঠেছিলো। কিন্তু ভানুর কী হতো? কারণ, অভিনয়ই ছিলো ভানুর একমাত্র পেশা।
ভানুর চলচ্চিত্রে আসার প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিল্পজগতে তার আনাগোনার আরো নতুন কিছু এলাকা বের হয়। ১৯৪৬ সালের দিককার কথা। ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নামের একটি নাটকে চাণক্যের ভূমিকায় অভিনয় করেন ভানু। তখনই নজরে পড়েন পরিচালক সুশীল মজুমদারের সহকারী ভূজঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেখান থেকেই সোজা স্টুডিওতে ভানু। বিভূতি চক্রবর্তীর জাগরণ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ‘চন্দ্রগুপ্ত’ তার কতোতম নাটক জানি না, কিন্তু এ খবর পাওয়া গেছে যে, ‘রণবীর’ নামের একটি নাটকে প্রথম যখন অভিনয় করেন, তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। এরপর অভিনয় করেছেন ‘নতুন ইহুদি’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’সহ বেশকিছু নাটকে।
১৯৭০ সালের পর পরই সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলনের সময় ‘সুনীল নাট্য সংস্থা’ কিনে নেন ভানু। নাম দেন ‘সুনীল নাট্য কোম্পানি’। এছাড়া মুক্তমঞ্চ নামে ১৯৭৪ সালে একটি যাত্রাদল গঠন করেন তিনি। অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলেও ভানুর কখনো শ্রেণিচ্যুতি ঘটেনি। তিনি ব্ল্যাক লিস্টেড হয়েও কখনো আজকালকার তারকাদের মতো রেস্টুরেন্টের ব্যবসা খুলে বসেননি। যাত্রাদল নিয়ে গ্রামে-গঞ্জের মাঠে-মাঠে যাত্রা করে বেড়াতেন। বেশ কয়েকটি কৌতুকের অ্যালবামও আছে ভানুর। ছোটোবেলা থেকেই এক্ষেত্রে ঝোঁক ছিলো তার। ১৯৪৩ সালে প্রথম অ্যালবাম বের করেন তিনি। নাম দেন ‘ঢাকার গাড়োয়ান’। এবং এই শ্রুতিনাট্যটির অনুপ্রেরণা নাকি তিনি পেয়েছিলেন ঢাকার গাড়োয়ানদের কাছ থেকেই।
সবকিছু মিলিয়ে ভানু সম্পর্কে এমন মন্তব্যের প্রস্তাব তোলা যায় যে, তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি শিল্পী হিসেবে কারো কাছে হার মানেননি। নিজেকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে কেউ প্রভুপনাও করতে পারেনি তার ওপর।
অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভানু সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেছেন। সেটি দিয়েই এ অংশের আলোচনা শেষ করবো—‘পূর্বসূরির প্রতি সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধা, সমসাময়িকের প্রতি এমন দ্বিধাহীন, ঈর্ষাশূন্য স্বীকৃতি কজন শিল্পীর মধ্যে দেখতে পাই!’
ব্যক্তি ভানু
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি নিয়ে নেতিবাচক-ইতিবাচক সমালোচনা মানে তো তার সর্বনাম নিয়ে কথা বলা। যারা রবীন্দ্রনাথের আখ্যান সম্পর্কে বলেন, ‘হইছে হইছে, এবার থামেন’—এ কথা তো তারা রবীন্দ্রনাথের সর্বনামে গুঁতা মেরেই বলেন। শিল্প-সাহিত্যে শিল্পীকে সনদ দেওয়ার সময় যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে, তাতে সর্বনামের ওপর ভালো একটা মার্ক থাকে। মনে রাখা দরকার, ভানুর আরেক নাম সাম্যময়। নামটি তার মাতামহ রেখেছিলেন। ভানু মজা করে প্রায়ই বলতেন, ÔThat I am communist, I bear it in my name.’ কিন্তু ভানুই তো বিশ্বাস করতেন, জগতের সব মজার কথাই সত্য কথা! যাই হোক, তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন কি না, সে সিদ্ধান্ত যার যার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে প্রভাব নামের একটি উপাদান তৈরি করা যেতে পারে।
উপরে বলেছি, ভানুর মা-বাবা ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করতেন। এজন্য স্বভাবতই পরিবারে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের প্রকাশ একপ্রকার নিষিদ্ধই ছিলো। কিন্তু ভানু তা মানেননি। মাত্র ১২ বছর বয়সে স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তখন তিনি ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের ছাত্র। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের সাইকেলের পিছনে চড়ে স্কুলে যেতেন। সাহিত্যিক শৈলেশ দে তখন ভানুর সহপাঠী। শৈলেশ ‘নিষিদ্ধ’ রাজনীতির বই সংগ্রহ করে আনতেন। ‘আর সেটা নিজের ব্যাগে নিয়ে তিনি দীনেশবাবুর সাইকেলে চেপে পৌঁছে যান সদরঘাটে। বইগুলি ওপার থেকে কেউ নিয়ে যেত। যতক্ষণ ওপার থেকে কেউ না আসে, ততক্ষণ একাই বসে থাকতে হয় তাঁকে। দীনেশবাবু চলে গেছেন। নির্ভয়ে এবং কৌতূহলে সেসব বই পড়তে থাকেন তিনি।’৮ ১৯৪০ সালে ঢাকার বেশিরভাগ অনুশীলন সঙ্ঘের বিপ্লবীরা আর এস পি নামে বামপন্থি দল গঠন করে। ভানুও তাতে যোগ দেন। ভানু তখন ছাত্রনেতা। ওই সময় আন্দামান থেকে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির ব্যাপারেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ভানু। কিন্তু এ রাজনীতির কারণেই ঢাকায় থাকা হয়নি তার। ১৯৪১ সালে হুলিয়া জারি হয় তার বিরুদ্ধে। এবং এই সেই মুহূর্ত, যখন ভানুকে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে হয় কলকাতায়। কিন্তু কলকাতায় গিয়েও তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেননি। ৪২-এ জড়িয়ে পড়েন ভারত ছাড় আন্দোলনে। আর ওই সময়টিতে তিনি বিনয় বসু, কেদারেশ্বর সেনগুপ্ত ও রমেশ আচার্যের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন।
ভানু সম্পর্কে বলার জন্য বলছি, মানুষ মানবিক বলেই তার সত্তা দ্বিধাবিভক্ত। আর এটিই হলো তার চৈতন্যের ধর্ম। এবং ভিতর ও বাইরের জগতের অনেক কিছুতেই সে উদাসীন। ‘কিন্তু আদিচৈতন্যের এই উদাসীনতাও অনন্ত বা অসীম নয়। কালের সীমায় এসে তা ঠেকে যায়। অন্য সবকিছু যা জাগতিক এবং যা আত্মবিকাশের ক্রমিকতায় গ্রথিত, তাদেরই মতন চৈতন্যকেও ইতিহাসের নিয়ম মেনে চলতে হয়। ফলে, তার অভিব্যক্তিতে ভাঙন ধরে এবং সেই ভাঙনের চিড়ে চিড়ে তার ফাটলের দাগে দাগে মিলিয়ে চৈতন্য আত্মপ্রকাশ করে সমাজসংসারের অভিজ্ঞতায়। এই ভাবে চৈতন্য যখন সাংসারিকতায় প্রবিষ্ট, সে অবস্থায় তার স্বরূপ নির্ণীত হয়, আকারে ও প্রকারে, পার্থিবতার অর্থাৎ অভিজ্ঞতার আঘাতে বিধ্বস্ত জগতে ভেদাভেদের নিয়ম অনুযায়ী। সে নিয়মগুলির মূল কথা মানবিকতার অন্তর্দ্বন্দ্ব। সেই দ্বন্দ্বের ব্যক্তিসত্তায় প্রত্যেকেরই প্রাথমিক নীতিবোধের উন্মেষ খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত ও বিচ্ছুরিত হয় নানা ঘটনার চাপে, এবং সেই সূত্রেই প্রত্যেকেরই জীবনে রচিত হয় তার নিজস্ব এক একটি নৈতিক পরিবেশ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই নীতিম-লগুলির সংঘর্ষ ও সহযোগিতাই মানুষের নীতিজগৎ (ethical world)।’৯
এই প্রক্রিয়ায় ভানুর যে নীতিজগৎ তৈরি হয়েছিলো, তাতে ব্রিটিশ গোলামদের হাতে বিপ্লবী দীনেশ বাবুর মৃত্যুর ঘটনার প্রভাব ছিলো অনেক। ‘দীনেশ গুপ্তের বীরের মতো মৃত্যু তাঁকে এ শিক্ষাই দিয়েছিল, কোনোরকম অন্যায়, অত্যাচারের কাছে নতজানু হওয়া নয়। মাথা উঁচু করে জানাতে হবে প্রতিবাদ। এইভাবেই তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের বাতাবরণ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে করে তুলেছিল একজন সচেতন শিল্পী।’১০ একজন সচেতন মানুষ, নীতিবান মানুষ। তবে নীতিবান মানুষদের ক্ষমতার কাছে বাধ্যতামূলক কিছু পরাজয়ের কারণে ঈশ্বরের ওপর ক্ষোভ ছিলো ভানুর। দীনেশের মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘ভগবান, লীলা বোঝা ভার। কিন্তু একটা ব্যাপারে তোমার ওপর আমার ভীষণ রাগ। আত্মার নিজস্ব শক্তি দিলে না কেন? দিলে দীনেশদার আত্মা এখনকার বাকসর্বস্ব, অসৎ, বহু রাজনীতিওয়ালাদের মুণ্ডু ছিড়ে ফেলতেন।’
শেষে বলতে চাই
এ আলোচনায় বেশকিছু সীমাবদ্ধতা ছিলো। হাতের কাছের বইয়ের দোকানগুলোতে খোঁজাখুজি করেও ভানুর বিষয়ে ‘কিছুই’ পাইনি। যতোটুকু পেয়েছি গুগলে ‘ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়’ লিখে সার্চ দিয়ে। কিন্তু সেখানেও হতাশ হয়েছি। যেখানে চেয়ারকে টেয়ার লিখে সার্চ দিলেও গুগল জানতে চায়, আপনি চেয়ার বোঝাতে চেয়েছেন কি না, সেখানে সঠিকভাবে ভানু লিখেও হাতেগোনা কয়েকটি লেখা পেয়েছি। ভানু সম্পর্কে এতটুকু প্রাপ্তির কারণে তাকে ‘নিখোঁজ’ বলা যাবে কি না—জানি না। তবে যতোটুকু সন্ধান মিলে, তাতে তাকে ঠিক ঠাওর করা যায় না। ঠাওর করা যাবেই বা কীভাবে? যেকোনো কিছুর পরম্পরা না থাকলে, তার অস্তিত্ব বিলীন না হলেও বিকৃতি হবেই।
জাতি হিসেবে আমাদের যে ইতিহাস, তাতে সময় মতো আমরা কখনোই কোনো সময়কে বা ব্যক্তিকে উপলব্ধি করতে পারিনি। ‘লর্ড ক্লাইভ তার ডায়েরিতে লিখে গেছেন : পলাশীর যুদ্ধশেষে তার বাহিনী যখন ফিরে আসছিল, তখন যে বিপুল সংখ্যক বাঙালি জনতা রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার ওই বিজয়ী (?) বাহিনীর প্রত্যাগমন দেখছিল, তারা যদি একটি করে ঢিল ছুঁড়ত, তাহলে ওই বিজয়ীবাহিনী ধূলিস্যাৎ হয়ে যেত। তারা ঢিল মারেনি। কারণ, ওই যুদ্ধে ‘প্রাণ দেব তবু মান দেব না’—জাতীয় কোনো ভাবাবেগ তাদের ছিল না। ...ওই পরাজয়কে বাঙালি জাতির পরাজয় কিংবা ভারতবাসীর জাতীয় পরাজয় রূপে উপলব্ধি করার জন্য যে ‘জাতীয়তাবোধ’-এর প্রয়োজন ছিল, তা শিখে উঠতে বাঙালি জাতির তখনও দুশো বছর বাকি ছিল।’১১
এ সময়ে এসে ভানুকে নিয়ে থাকা সব স্মৃতিতে ধুলো পড়ার কারণও তাই। অনেকে বলবেন, ভানুর মতো বিলুপ্তপ্রায় ‘প্রাণীদের’ এ সময়ের কাছে আমরা তুলে দিতে পারিনি। অনেকের এ ব্যাখ্যার সত্য-মিথ্যা জানি না। কিন্তু এ সময়ের হাতে তুলে দিয়ে দেখলে হতাশ হতে হয়। যে চ্যাপলিনের চলচ্চিত্র দেখেনি, তাকে চ্যাপলিনের একটি চলচ্চিত্র হাতে ধরিয়ে দিলেই সে চ্যাপলিনের ভক্ত হয়ে যাবে না। কিংবা চ্যাপলিনের বাকিগুলো নিজের উদ্যোগে সংগ্রহ করবে না। সৃষ্টির গুণগত মানই কেবল রুচিবোধ বদলাতে পারে না—এ আমার বিশ্বাস। যদি তাই হতো, হিসাব করে দেখেন, এখন কোন্ চলচ্চিত্রগুলো মানুষ সবচেয়ে বেশি দেখছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, গুণগত মানের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে রুচিবোধের পরিবর্তন কিসের সঙ্গে সম্পর্কিত? বঙ্কিম এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন এভাবে—কেনো মানুষ অন্যান্য সাহিত্যের তুলনায় ধর্মীয় সাহিত্য পড়তে কম আগ্রহী। ‘ধর্মের সঙ্গে সাহিত্যের সম্বন্ধ নিয়ে সরাসরি আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্কিমের প্রশ্ন এই। তাঁর জিজ্ঞাস্য পাঠকরা কেন ধর্মবিষয়ক রচনার চেয়ে এত বেশি আকৃষ্ট হয় নাটক নভেলের প্রতি। যদি তারা চায় বিস্ময়কর ঘটনার আমোদ তাহলে, ‘জিজ্ঞাসা করি, বিশ্বেশ্বরের এই বিশ্বসৃষ্টির অপক্ষো বিস্ময়কর ব্যাপার কোন সাহিত্যে কথিত হইয়াছে? ...কিন্তু প্রতিবাদে, পাঠক তো বলতেই পারে যে ধর্মের স্বপক্ষে এই ওকালতি সে মানতে রাজি নয়, কারণ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সে জানে যে সাহিত্য পড়ে সে সত্যিই যে আনন্দ পায়, ধর্মপুস্তক থেকে তা পায় না।’১২
বঙ্কিমের মতো আমারও মত, এখনকার দর্শকরা নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানে যে, ধুম : থ্রি বা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে সে সত্যিই যে আনন্দ পায়, ভানু, সত্যজিৎ কিংবা তারেক মাসুদে তা পায় না। তাই গুণগত মান বৃদ্ধির পাশাপাশি, সেই না পাওয়ার কারণও খুঁজে বের করতে হবে। এতে বঙ্কিম যে বিষয়টি উদ্ধার করেছেন, তা যদি আজকের আলোচনায় আমার মতো করে বলি, তাহলে বলতে হয়, আনন্দপিপাসু পাঠক যে ভানুদের চলচ্চিত্রে আস্বাদ পায় না, তা কেবল এজন্যই যে চিত্তবৃত্তিগুলির যথাযথ অনুশীলন বাদ দিয়েই আনন্দের অনুসন্ধান তার অভ্যাসগত হয়ে গেছে। যে বৃত্তিতে সবার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের মর্ম গ্রহণ করা সম্ভব, তা যদি এখন অনুশীলন করা হয়, তাহলে বোঝা যাবে চলচ্চিত্রে যে সুখ আছে, তার চেয়ে আরো বেশি সুখ দর্শকের প্রাপ্য হতে পারে। আর এ অনুশীলন যতোদিন না হবে, ততোদিন ভানু-ভানু কিংবা চার্লি-চার্লি বলে গলা ফাটিয়ে কোনো লাভ হবে না।
লেখক : আসাদ লাবলু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি কালের কণ্ঠ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
asadmcru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. http://forum.projanmo.com/topic26971.html
২. http://forum.banglalibrary.org/viewtopic.php?id=877&p=2
৩. http://forum.banglalibrary.org/viewtopic.php?id=877&p=2
৪. http://www.lotakambal.com/lotakambal/Aricle/6
৫. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৬-৮৭); ‘চলচ্চিত্রে মতানৈক্যের কণ্ঠস্বর : বিকল্প চলচ্চিত্র’; সিনেমা; ফ্ল্যাট ১/বি, বাড়ি ২৮, সড়ক ১৫ (নতুন), ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।
৬. http://forum.banglalibrary.org/viewtopic.php?id=877&p=2
৭. দাশগুপ্ত, ধীমান (২০১১ : ১০৩-১০৪); ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ : কমেডি থেকে স্যাটায়ার’; চলচ্চিত্র সমালোচনা ১৫; সম্পাদনা : অজয় সরকার; বাণীশিল্প, কলকাতা।
৮. http://forum.banglalibrary.org/viewtopic.php?id=877&p=2
৯. গুহ, রণজিৎ (২০১৩ : ২৭-২৮); ‘আন্তিগোনে’; প্রেম না প্রতারণা; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
১০.http://forum.banglalibrary.org/viewtopic.php?id=877&p=2
১১. খান, কলিম (২০০০ : ৬৫); ‘কলকাতার বংশপরিচয় ও উত্তরাধিকার একটি জিন-আর্কিয়োলজিক্যাল রিপোর্ট’; ফ্রম এনলাইটেন্মেন্ট টু ইমোশনাল বন্ডেজ : জ্যোতি থেকে মমতায়; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।
১২. গুহ, রণজিৎ (২০১৩ : ৩৭-৩৮); ‘চিত্তশুদ্ধি : ধর্ম ও সাহিত্য’; প্রেম না প্রতারণা; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন