কাজী মামুন হায়দার
প্রকাশিত ২৪ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
নারী-ভানুর গান্ধী জয়, শিল্পে জয়ী নারীর ‘পরাজয়’
কাজী মামুন হায়দার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ো ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রথম ভারতীয় আই সি এস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) কর্মকর্তা। সত্যেন্দ্রনাথ যখন বিয়ে করেন তার স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীর বয়স ছিলো মাত্র সাত বছর। এই জ্ঞানদানন্দিনীই নাকি পরে জোড়াসাঁকোর পুরো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের নিয়ন্ত্রক হয়েছিলেন। বাংলার স্ত্রী-স্বাধীনতার পথিকৃৎ এই মহীয়সী নারীর কাছে নাকি আজকের আধুনিক বাঙালি ললনাদের ঋণের শেষ নেই। বলা হয়ে থাকে, এই জ্ঞানদানন্দিনীই বাঙালি নারীদের আধুনিক কায়দায় শাড়ি পরতে শিখিয়েছিলেন। ঠাকুরবাড়ির বউদের শাড়ি পরার ধরনটি ফ্যাশন হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, এবং তা শেখান জ্ঞানদানন্দিনীই। স্বামীর কর্মস্থল বোম্বাই (বর্তমানে মুম্বাই) থাকাকালে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি শাড়ি ও জামার নমুনার বিবিধ পরিবর্তন করেন। গুজরাটি মেয়েরা যেভাবে শাড়ি পরে, তার কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে ডান কাঁধের বদলে বাম কাঁধে আঁচল নিয়ে শাড়ি পরার প্রচলিত যে রূপটি আমরা আজকের দিনে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান মেয়েদের দেখি, তা জ্ঞানদানন্দিনীরই আবিষ্কার। শাড়ির সঙ্গে সায়া, ব্লাউজ, সেমিজ, জামা পরার চলটি তিনিই অবিভক্ত বাংলাতে প্রবর্তন করেন। এছাড়া পত্রিকা প্রকাশ, প্রবন্ধ রচনা, রূপকথাকে নাট্যরূপ দেওয়া, অভিনয়—এসব কাজেও জ্ঞানদানন্দিনী পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন।১
নারী-জ্ঞানদানন্দিনীকে অবশ্য কেউ মনে রাখেননি, রাখার কথাও নয়। ঠাকুরবাড়ির পুরুষ-রবীন্দ্রনাথের ‘দাপটে’ যখন পুরুষ-প্রতিভাবানরাই (প্রিন্স দ্বারকানাথ, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, ধীরেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ—এরা কেউই কারো চেয়ে কম নন। শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় তাদের বিচরণ ছিলো।) হাবুডুবু খাচ্ছেন, তখন নারী-জ্ঞানদানন্দিনী তো তুচ্ছ! তাই আজকের আধুনিক নারী-পুরুষদের কেউই হয়তো জ্ঞানদানন্দিনীকে চেনেনই না। জ্ঞানদানন্দিনীর মতো অনেক মহীয়সীকেই আমরা ভুলে যাই, যেমন ভুলে আছি ভারতীয় আরেক নারীর বিশাল অর্জনকে!
কেনো জানি এতদিনেও ওই নারীর নাম শোনা হয়নি। প্রথম জানলাম দৈনিক সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদন থেকে। শিরোনামটাই বেশ আকর্ষণীয়, রহস্যেঘেরা—‘কাউকে বিশ্বাস করেন না ভান’২। ১৯৮৩ সালে গান্ধী চলচ্চিত্রের পোশাক পরিকল্পনার জন্য প্রথম ভারতীয় হিসেবে অস্কার পুরস্কারটি পেয়েছিলেন এই ভানু আথাইয়া। ভানু মনে করেন, ভারতে তার পুরস্কারটি নিরাপদ নয়। তার ভাষায়, ‘ভারতে কারো ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছি না। যদি শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কারটি চুরি হয়ে যেতে পারে, আমার অস্কারের নিশ্চয়তা কে দেবে? ভারতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক পুরস্কারের কোনো মূল্য নেই। আর দেশের পরিচয় তুলে ধরা বা পরিচয় বহনকারী ঐতিহ্য নষ্ট করতে ভারতীয়দের জুড়ি নেই।’৩ তার এই ক্ষোভের হয়তো যুক্তিযুক্ত কারণ আছে, হয়তো নেই। সেটা আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমার প্রশ্ন অন্যখানে—কেনো শুনিনি তার নাম! সত্যজিৎ থেকে হালের এ আর রহমান তো পুরো ফাটিয়ে বেড়াচ্ছেন এই উপমহাদেশের সব চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। এমনকি আমার প্রজন্ম (মানে যাদের বয়স ৩০-৩৫ বছরের মধ্যে) তো এই উপমহাদেশে অস্কার বলতে চেনেনই সত্যজিৎকে।
ভানুর নাম না জানার বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে; প্রথমত, ভানু নারী; দ্বিতীয়ত, ভানুর অস্কার জয় পরিচালনা বা অভিনয়ে নয়, পোশাক পরিকল্পনায়; তৃতীয়ত, হয়তো নারী-ভানু চাননি অন্য নারীদের মতো নিজেকে চেনাতে। ভানুর ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে এগুলোর সবগুলোই হতে পারে আবার নাও হতে পারে। তবে মোদ্দাকথা হলো, আমরা ভানু আথাইয়াকে চিনি না। তাহলে যৌথ শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রে পোশাক পরিকল্পনা বিভাগটি কি নমশূদ্র কিংবা নারী-ভানু কি অবহেলিত? এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা থাকবে এই লেখায়; সঙ্গে পোশাক পরিকল্পনা এবং অজানা ভানুকে নিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা তো থাকছেই।
২.
বাঙালি নির্মাতা সত্যজিৎ অস্কার পেয়েছিলেন ১৯৯২ সালে, মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে। এর ১০ বছর আগে ১৯৮৩ সালে ভানু আথাইয়া ভারতীয় হিসেবে প্রথম অস্কার পেয়েছিলেন। স্যার রিচার্ড অ্যাডেনবরো পরিচালিত গান্ধীর পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে তিনি এই পুরস্কার পান। এরপর এ আর রহমান ও গুলজার অস্কারের মুকুট জিতে নিয়েছেন ২০০৯ সালে স্লামডগ মিলিয়নিয়ার-এ সুরারোপ করে। সবমিলে মোটে চারজন!
গান্ধীতে গান্ধীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠান দৃশ্যায়নে অংশ নেয় প্রায় চার লক্ষ শিল্পী, চলচ্চিত্রের ভাষায় যাদের এক্সট্রা বলা হয়। ভারতের মতো জাতি বৈচিত্র্যের দেশে এই ধরনের একটা অনুষ্ঠানে চার লক্ষ মানুষের উপস্থিতি পোশাক পরিকল্পনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে চলচ্চিত্রের পর্দায় ঠিক কোন্ কৌশলে ভানু আথাইয়া উপস্থাপন করেছিলেন সেটাও বিষয় হিসেবে অনুকরণীয়। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী গান্ধীর সেই শেষকৃত্য অনুষ্ঠান বিশ্বের সর্বাধিক শিল্পীর সমন্বয়ে করা দৃশ্য হিসেবে স্বীকৃত।
গান্ধী অস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদনা, কেন্দ্রীয় অভিনেতা, শিল্প নির্দেশনা ও পোশাক পরিকল্পনা বিভাগে পুরস্কার পায়। গান্ধী নিয়ে ভানুর বক্তব্য ঠিক এ রকম—‘চলচ্চিত্রে মহাত্মার ৫০ বছরের জীবন তুলে ধরা আসলেই খুব কষ্টকর ছিলো, কারণ ইংল্যান্ডের ডান্ডিসহ নানা পরিস্থিতিতে, নানা অবস্থায় ছিলো তার বিচরণ। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই যুবক গান্ধী সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তিত হয়েছেন, তার এই পরিবর্তনটা ধরে সেটা ফুটিয়ে তোলা খুব কঠিনই ছিলো। এছাড়া আরো ভিন্ন বাস্তবতাও ছিলো, একটা সময়কাল ধরে শত শত মানুষের পোশাকে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এই কাজ আমি এক হাতে করেছি; এজন্য আমাকে গান্ধীর পুরো দলের আন্তর্জাতিক মানের কর্মীবাহিনীর সঙ্গে সমানতালে কাজ করার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। কিন্তু একথা সত্য যে, সময় ধরে রাখার জন্য যা যা করা দরকার ছিলো আমি তা করতে সফল হয়েছিলাম।’
৩.
চলচ্চিত্র চলে মূলত ইমেজকে ধরে। তাই চলচ্চিত্রের ইতিহাস ঘাঁটলে ইমেজের নির্দিষ্ট বিবর্তন ধরা পড়ে। আইজেনস্টাইন-এর ভাষায়, কোনো এক বিশেষ যুগের শিল্পে লভ্য কল্পমূর্তিমালা তুলে ধরে বিশেষ ওই যুগের কল্পমূর্তিকেও এবং ওই যুগের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কল্পনাধারা ও যুক্তিপ্রণালীর কল্পমূর্তিকেও।৪ এটা বিবর্তনেরই অংশ। এ কারণে ছবির ইমেজের ধরন ছবির জাতিত্ব ও ঘরানার ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল হয়। পরাবাস্তববাদ চলচ্চিত্রের ইমেজ থেকে নব্যবাস্তববাদ চলচ্চিত্রের ইমেজ, হলিউড চলচ্চিত্রের ইমেজ থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড চলচ্চিত্রের ধরন, অর্থ ব্যঞ্জনা ও পরিণতিতে আলাদা। এই প্রসঙ্গেই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ক্রিয়াশীল হয়েছে নানা ইজম বা বাদ। চলচ্চিত্রে ইজমের প্রসঙ্গ আসলেই ন্যাচারালিজম ও রিয়ালিজম নিয়ে কথা বলতে হয়।
১৯ শতকের মাঝামাঝি ইউরোপের সবখানে সবক্ষেত্রেই ন্যাচারালিজম বা স্বাভাবিকতাবাদের প্রাধান্য দেখা যায়। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তখন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মানে জীববিদ্যা, মনোবিদ্যা ও সমাজবিদ্যার জয়জয়কার। সাহিত্যের ন্যাচারালিজম আগ্রহী ছিলো তথাকথিত শিল্প সৃষ্টির পরিবর্তে ‘slices of life’ তুলে ধরায়, প্রকৃতির যথাযথ অনুকরণে।৫ রিয়ালিজমের মতো এরও লক্ষ্য অবজেক্টিভিটি। রিয়ালিজম বস্তুজগতের সম্পর্ক উন্মেষের ও জীবন অন্বেষণের বাস্তবসম্মত পদ্ধতির পক্ষপাতি; জীবনকে আরো জীবন্ত করে দেখানোর প্রচেষ্টা। চলচ্চিত্রে প্রথম যখন এদের প্রকাশ দেখা গেলো, তখন এর সঙ্গে কল্পনা ও অতিরঞ্জন কিছুটা থাকতোই। প্রসঙ্গ ও পদ্ধতিতে তা কিছুটা থাকলেও মূল উদ্দেশ্য ছিলো বস্তুজগতের সঙ্গে চিত্র-উপাদানের স্বাভাবিক ও বাস্তব নৈকট্য বজায় রেখে চিত্রনির্মাণ।৬ যদিও চলচ্চিত্রে বাস্তববাদের প্রসঙ্গ বহু আলোচিত ও বিতর্কিত। তার পরও এক্সপ্রেশনিজম, সুররিয়ালিজমের মতো ইজমের সঙ্গে পথপরিক্রমায় ইতালিতে জন্ম নেওয়া নিওরিয়ালিজমের আবির্ভাব চলচ্চিত্রে বাস্তববোধের আরেক রূপ। সুররিয়ালিজম যেখানে বাস্তবকে বোঝানোর জন্য বাস্তবকে অতিক্রমের পক্ষে মত দেয়, নিওরিয়ালিজম সেখানে বাস্তবের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে পুরো মিশে যাওয়ার কথা বলতে থাকে।
চলচ্চিত্রের দুটো বৈশিষ্ট্য এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ক) এর গতিময়তা তথা ভরবেগ, চলচ্চিত্রের ধারাবাহিক চিত্ররূপের চলমানতা; খ) এর স্বপ্নময়তা, চলচ্চিত্রের কল্পলোক বা স্বপ্নলোক সৃষ্টি করতে পারার ক্ষমতা।৭ দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি পোশাক পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই স্বপ্নলোক ও কল্পলোক সৃষ্টির যে ক্ষমতা চলচ্চিত্রের আছে, সেটার জন্য অনেকগুলো কারণের মধ্যে পোশাক অন্যতম।
সত্যজিতের ভাষায়, ‘ইমেজ এখানে শুধু ছবিই নয়—বাক্সময় ছবি। অর্থাৎ ছবির ছবিত্বেই ছবির শেষ নয়, শুরুও নয়—শুরু ও শেষ পেইন্টিং-এ। এখানে মুখ্য হল ছবির অর্থ। এক একটি ছবি এক একটি বাক্য, সব ছবি মিলিয়ে পুরো বক্তব্য। চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগেও ছবি অর্থ বহন করেছে। এর ভাষা সংলাপ-নিরপেক্ষ।’৮ ইমেজের এই যে ব্যবহার, ধ্বনি ছাড়াও ইমেজ যে বাস্তবতা নির্মাণ করে সেখানে অন্য অনেক উপাদানের সঙ্গে পোশাক একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উপস্থিত হয়। সাদাকালো যুগে রঙ আলাদা কোনো বার্তা বহন না করলেও পোশাকের ধরন, তার নকশা নিঃসন্দেহে বার্তা দিয়েছে। আর রঙিনের যুগে ওগুলোর সঙ্গে সঙ্গে রঙ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাই ইমেজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে পোশাক।
৪.
আগের দিনের প্রথাগত সমাজে মানুষের সামাজিক ভূমিকা নির্দিষ্ট ছিলো। সেসময় কোনো ব্যক্তির পোশাক, তার চেহারার গড়ন, গায়ের রঙের মাধ্যমে তার শ্রেণি, পেশা, মর্যাদা ফুটে উঠতো। মধ্যযুগেও যে কেউ ইচ্ছে করলেই যেকোনো পোশাক পরতে পারতো না। তবে ১৭ শতকের শুরু থেকে পোশাকের এ অবস্থা অনেকখানি বদলে যেতে থাকে। বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লবের পরিণামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাশনের গণতন্ত্রায়ন হয়। ফলে সমাজে যার যে পোশাক পরার সামর্থ্য আছে, তারা তা পরার অধিকার পায়। বিপ্লবের পর পোশাকের সব কোড ভেঙে যায়। এর ফলে যে আধুনিক সমাজের জন্ম হয় তা ব্যক্তিকে আইডেনটিটি নির্মাণ করার প্রস্তাব করে।
এই ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের জয়গান গেয়েই আধুনিকতা শিল্পবিপ্লব ঘটিয়েছিল, পুঁজির চূড়ান্ত কর্তৃত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলো ধনতন্ত্রের। ...ধনতন্ত্র বলল—শত পুষ্প বিকশিত হোক, তবে বিকাশটা যেন একরকমভাবে হয়, সবাই যেন অর্থের ও যন্ত্রের দাসরূপে বিকশিত হয়। সমাজতন্ত্রও বলল—শত পুষ্প বিকশিত হোক, তবে বিকাশটা যেন হয় একভাবে, সবাই যেন মন্ত্র ও তন্ত্রের (অর্থাৎ ইজম ও সিস্টেমের) দাসরূপে বিকশিত হয়। সব ফুলই ফুটুক, তবে সব ফুল যেন দোপাটি ফুলের মতো ফোটে। একই চিন্তার একই ছন্দের একই কর্মের পুনরাবৃত্তির চক্র আধুনিকতাকে গ্রাস করে নিল—আধুনিকতা মৌলবাদের খপ্পরে চলে গেল। জীবনের সর্বক্ষেত্রে, জ্ঞানজগতে কর্মজগতে, শিল্পে সাহিত্যে রাজনীতিতে অর্থনীতিতে সংস্কৃতিতে সব শাখায়, আধুনিকতা পরিপ্রসারিত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু ক্রমে সে সবই মৌলবাদী-আধুনিকতায় পর্যবসিত হয়ে গেল। আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বতন্ত্র স্ফুরণে বিশ্বাসী মহান আধুনিকতা নিজের ফলিত প্রয়োগ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করল দুইখানি বিশ্বযুদ্ধে।’৯ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে অবশ্য সমাজতন্ত্র নামক চিন্তার প্রকাশ ও বিকাশ ম্রিয়মাণ হতে থাকে।
অন্যদিকে বিশ্বের একটি বিশাল অংশ অর্থের ও যন্ত্রের দাসরূপে বিকশিত হতে থাকে। তারা নতুন নতুন চাহিদা তৈরির মাধ্যমে এক অস্থির আধুনিক ব্যক্তিত্বকে চিরস্থায়ী করে। যা সবসময় নতুন, প্রশংসাকর বিষয় খুঁজতে থাকে। জন্ম হয় ফ্যাশনের; ফ্যাশন ও আধুনিকতা হাত ধরাধরি করে চলে তথাকথিত আধুনিক ব্যক্তিত্ব নির্মাণ করে। যে ব্যক্তিত্ব ফ্যাশনেবল নয়—এমন বিষয় নিয়ে সদাসর্বদা শঙ্কিত হতে থাকে। এই শঙ্কা কাটাতে তৈরি হতে থাকে নিত্য নতুন ফ্যাশন; এটি নিয়ে মাথা খাটাবার জন্য গড়ে ওঠে বিশেষ একটি শ্রেণি। যাদের নাম হয় ফ্যাশন ডিজাইনার।
মনে রাখতে হবে, এই ফ্যাশন ডিজাইনের সঙ্গে পোশাক পরিকল্পনাকারীর বড়ো পার্থক্য রয়েছে। পোশাক পরিকল্পনা কিন্তু মোটেও হালে আমরা যেটাকে ফ্যাশন ডিজাইন বলি সেটা নয়; ফ্যাশন ডিজাইনে সৌন্দর্য, আকর্ষণক্ষমতা কিংবা উজ্জ্বলতা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু পোশাক-পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হলো নাটক বা চলচ্চিত্রের গল্প ও তার চরিত্র। তবে শিল্প নির্দেশনার সঙ্গে পোশাক পরিকল্পনার সম্পর্ক রয়েছে। শিল্পনির্দেশক পরিকল্পনা মতো সেট তৈরি করেন, রঙ ব্যবহার করেন; কিন্তু শুটিংয়ের সময় দেখা গেলো অভিনয়শিল্পীরা যে জামা-কাপড় পরে এসেছে তার সঙ্গে সেটের রঙ যাচ্ছে না কিংবা এর উল্টোটা ঘটছে। এ অবস্থায় পুরো পরিস্থিতি পরিবর্তনের দরকার পড়ে। ফলে পোশাক পরিকল্পনাকারী ও শিল্পনির্দেশকের মধ্যে একটি সম্পর্ক, অন্য কথায় বোঝাপড়া থাকতে হয়।
পোশাক পরিকল্পনাকারীর কাজ বোঝাতে গিয়ে ভানু আথাইয়া বলছেন, ‘একজন পরিচালকের মাথায় এটা খুব পরিষ্কারভাবেই থাকে। কোনো চলচ্চিত্রের কোন্ চরিত্রের জন্য তার কী দরকার, এক্ষেত্রে তার সঙ্গে থাকেন শিল্পনির্দেশক। তারা তাদের মতো করে দর্জিবাড়ির কর্মীদের নির্দেশনাও দেন। আর এর সঙ্গে যোগ হন অভিনেতা নিজেও।’ এখন প্রশ্ন, তাহলে পোশাক পরিকল্পনাকারীর কাজ কী? ভানু বলছেন, এক্ষেত্রে পোশাক পরিকল্পনাকারী মূলত পরিচালক ও অভিনেতার মধ্যে সেতুবন্ধন নির্মাণের কাজ করে থাকেন। মানে কোনো চরিত্র নিয়ে পরিচালকের চিন্তা এবং শিল্পীর মধ্যে যে বোঝাপড়া থাকে, সেই বোঝাপড়ায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন পোশাক পরিকল্পনাকারী।১০
ভানু আরো বলছেন, একজন পোশাক পরিকল্পনাকারী একটি চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়ালি পুরো রূপটাকে তুলে ধরেন। ধরুন লগন-এর কথা, সেখানে একই সঙ্গে সাধারণ গ্রামবাসী থেকে শুরু করে ভারতীয় উপনিবেশে থাকা ব্রিটিশ এলিটদের তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় খুব সচেতনভাবে মনে রাখতে হবে, কোনো স্টার বা তারকার জন্য পোশাক পরিকল্পনা করা আর চলচ্চিত্রের নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের জন্য পোশাক পরিকল্পনার মধ্যে বড়ো ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
৫.
চলচ্চিত্র ‘মাধ্যমটি নিজ গুণেই পারিপার্শিক ভৌত আবহকে ধারণ করে। যা কিছু দৃষ্টিগ্রাহ্য তা চলচ্চিত্রে ধরা পড়ে। অর্থাৎ কাল এবং স্থান চলচ্চিত্রের আবশ্যিক আধেয়। এ অবস্থায় নির্মাতার যদি কোনো বিশেষ পক্ষপাত না থাকে তাহলে যে সময় ও কালে চলচ্চিত্রটি নির্মিত তার ভৌত সংকেতগুলিতে এই চলচ্চিত্র থেকে পাঠোদ্ধার করা যাবে।’১১ এই যে সময়কে পাঠোদ্ধার করতে পারার ক্ষমতা, তার অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে পোশাক। কারণ একটি নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট পোশাককে ধারণ করে। সেই এলিজাবেথিয়ান যুগ থেকে পোশাকের এই খেলা চলছে।
তাইতো চলচ্চিত্রের পোশাক পরিকল্পনার আগে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। পরিকল্পনাকারীকে চলচ্চিত্রের কাহিনি, কাহিনির সঙ্গে সম্পৃক্ত সঙ্গীত, নাচ ইত্যাদি বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হয়। তার পর তিনি যেটা করেন, কিছু বিষয়কে প্যারামিটার হিসেবে রেখে কাজ এগিয়ে নেন। এক্ষেত্রে তাকে মাথায় রাখতে হয়, কোন্ ভৌগোলিক অবস্থানে ঘটনা ঘটছে, দিন-মাস-বছর কিংবা বিশেষ কোনো পরিস্থিতি, কী কী চরিত্র সেখানে কাজ করছে; এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক—সেটা আর্থ-সামাজিক, রাষ্ট্রিক, ধর্মীয়, নৈতিক, বৈবাহিক কিংবা পারিবারিক হতে পারে।
তাছাড়া কাহিনির মধ্যে কোনো চরিত্র ঠিক চলতি কথায় যাকে বলে নায়ক নাকি খলনায়ক হিসেবে আছেন সেটা দেখা। এছাড়া পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সংলাপ ও তার ধারাবাহিকতা মাথায় রাখতে হয়। এতগুলো বিষয় বিবেচনায় রেখে একজন ডিজাইনারকে এগোতে হয়। কোনো সময়কে ধরার জন্য কখনো কখনো জাদুঘর, সেই সময়ের সংবাদপত্র, স্থাপত্য, পেইন্টিং এগুলোকে প্রাথমিক ডেটা হিসেবে নিতে হয়।
৬.
অস্কার নিয়ে ভারতে ফিরে এসে একটা মজার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন ভানু। অনেকেই তাকে প্রশ্ন করেছিলো, ‘ম্যাডাম, ঠিক কী কারণে আপনি গান্ধীতে অস্কার পেলেন, কারণ ওই চলচ্চিত্রে আমরা যা দেখেছি তা তো খুবই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। আপনি তাহলে আলাদা করে পোশাক নিয়ে কী কাজ করলেন?’১২ এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, যে সময়ে ভানু শুরু করেছিলেন সেই সময়ে পোশাক পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের জ্ঞান ঠিক কতোখানি ছিলো। বেশিরভাগই মনে করতো পোশাক পরিকল্পনা মানে নতুন কিছু করে দেখানো, একটু চাকচিক্য কিছু, যা সবার চোখে পড়বে, কেউ কেউ তা অনুসরণ, অনুকরণ করবে—এই না হলে পোশাক পরিকল্পনা!
মূলধারার চলচ্চিত্রগুলো যে চকচকে, মসৃণ, স্বার্থপর জীবনের কথা বলে সেখানে যে পোশাক থাকে, তা ঠিক পোশাক পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে না। সেটা বাজারের জন্য দরকার, চলচ্চিত্রের জন্য নয়। কারণ তা চরিত্র যতো না দাবি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি দাবি করে চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুঁজিবাজার। সেই সময় বেশিরভাগ পোশাক পরিকল্পনাকারী ভুলে যান ওই চরিত্রের জন্য এটা আসলেই কতোখানি প্রয়োজন। আর দর্শক তা দেখে, বিশেষ করে পুরুষেরা আহ্, উহ্, কতো সুন্দর বলে উচ্ছ্বাস করে। অন্যদিকে নারী-শরীরের ফাঁকা জায়গা দেখে কামুক হয়, নিজের মনে সৃষ্ট বিভ্রম তাকে বাস্তবতায় গিয়ে হতাশ করে। এতে ‘বাস্তবতা শুধু হারিয়ে যায় না, সেই সাথে হারিয়ে যায় বাস্তবতার অন্য ডাইমেনশনগুলি যেমন, সমাজ, দেশ, পরিবার, যৌক্তিকতা।’১৩
অথচ পোশাকে চরিত্রের প্রয়োজনে, কাহিনির প্রয়োজনে দেশ-কাল বা সময়ের ছাপ ফোটানো জরুরি। কারণ যে উপাখ্যান চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়, তা তিন ঘণ্টায় যে বাস্তবতা নির্মাণ করে সেটি দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়। প্রেক্ষাগৃহের আলো-আধারি কিংবা কম্পিউটারের মনিটরের সামনে বসে দর্শক কাঁদেন, হাসেন, উত্তেজিত হন, প্রভাবিত হন; এই সবগুলো প্রবৃত্তিকে এগিয়ে নিতে চলচ্চিত্রের অন্য অনেক উপাদানের সঙ্গে পোশাক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।
৭.
দিল্লির জে জে স্কুল অব আর্ট থেকে স্নাতক করার পর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘ইভ’স উইকলি’-তে কাজ শুরু করেছিলেন ভানু। সেখানে বেশ সুনাম হয় তার। ফ্যাশন নিয়ে ভানুর চিন্তা-ভাবনা, পত্রিকায় সেটার উপস্থাপন চলচ্চিত্রনির্মাতা ও তারকাদের বেশ আকৃষ্ট করে। একপর্যায়ে তারা ‘ইভ’স উইকলি’র সম্পাদককে একটি বুটিক দিতে পরামর্শ দেন এবং সেখানেই মূলত ভানুর পোশাক পরিকল্পনার কাজ শুরু। সেই বুটিকে নিয়মিতভাবে সেই সময়ের সব তারকারা আসতে থাকে। কামিনি খোশাল (Kamini Kaushal) নার্গিস থেকে রামনন্দ সাগর সবাই ছিলো এই তালিকায়। কামিনি খোশাল-ই প্রথম তার ব্যক্তিগত পোশাকের জন্য ভানুকে ডিজাইনার হিসেবে নিয়োগ করেন। পরে তার শাহেনশাহ ও আলীবাবা আওর চল্লিশ চোর চলচ্চিত্রে ভানু পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেন। যদিও পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে ভানুর প্রথম কাজ ভারতের বিখ্যাত পরিচালক গুরু দত্তের সি.আই.ডি.-তে কাজ করার মাধ্যমে ১৯৫৬ সালে। এরপর গুরু দত্তের দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন ভানু।
ভানুর জন্ম ১৯২৯ সালের ২৮ এপ্রিল মহারাষ্ট্রের কলাপুরে। সাত ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন ভানু। মাত্র নয় বছর বয়সে বাবা আনাসাহেব রাজোপাধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন। ভানু বিয়ে করেন কবি, গীতিকার সত্যেন্দ্র আথাইয়াকে। কিছুকাল পরে বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কের অবসান হয়। পরে আর বিয়ে করেননি ভানু আথাইয়া। সত্যেন্দ্র-ভানু দম্পতির এক মেয়ে রয়েছে; মেয়েটি বর্তমানে তার পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস করেন। ২০১২ সালের জুনে হঠাৎ-ই ভানুর ব্রেনে টিউমার ধরা পড়ে। একই বছরের ডিসেম্বরে ভানু তার অস্কার পুরস্কারটি লস অ্যাঞ্জেলস-এ আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার্স আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস-এর কাছে হস্তান্তর করেন। বর্তমানে তিনি মুম্বাইয়ে বসবাস করছেন। ভানু তার ৫০ বছরের কর্মজীবনে শতাধিক চলচ্চিত্রে পোশাক পরিকল্পনার কাজ করেছেন; স্বদেশ (১৯৯১) ও লগন-এ (২০০২) পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে পেয়েছেন ভারতের জাতীয় পুরস্কার।
৮.
১৯৮৩ সালের ১১ এপ্রিল অস্কারের ৫৫তম আসরে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ইতিহাস গড়েছিলেন ভানু আথাইয়া। আজ পর্যন্ত নারী হিসেবে তার এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেননি কেউ। এই অর্জন ভানু আথাইয়াকে অনন্য করে রেখেছে। ভানু আথাইয়ার সঙ্গে গান্ধীতে পোশাক পরিকল্পনায় যৌথভাবে পুরস্কার পেয়েছিলেন এক ব্রিটিশ, তার নাম জন মল্লো (John Mollo) ।
গান্ধীর কাস্টিং ডিরেক্টর ডলি ঠাকুরের দুটি মঞ্চনাটকে পোশাক পরিকল্পনার কাজ করেছিলেন ভানু আথাইয়া। সেই কাজে খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন ডলি। সেই সূত্রেই স্যার রিচার্ড অ্যাডেনবরো’কে বলেছিলেন আথাইয়ার কথা। এরপর গান্ধীর জন্য ১৯৮২ সালের জুলাইয়ে ভানু আথাইয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন স্যার অ্যাডেনবরো। মাত্র ১৫ মিনিটের সেই সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে অ্যাডেনবরো বেছে নিয়েছিলেন তার চলচ্চিত্রের যোগ্য পোশাক পরিকল্পনাকারীকে। ভানু আথাইয়ার লেখা বই ‘দ্য আর্ট অব কস্টিউম ডিজাইন’-এর মুখবন্ধে স্যার অ্যাডেনবরো নিজে বিষয়টি বলেছেন এভাবে, ‘আমি টানা ১৭ বছর ধরে স্বপ্ন দেখেছি এই একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবো বলে; গান্ধী আমার স্বপ্নের চলচ্চিত্র। আর সেই চলচ্চিত্রের জন্য মাত্র ১৫ মিনিট কথা বলেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম আমার সেই চলচ্চিত্রে হাজারো ভারতিয়কে যথাযথ তুলে আনতে যথার্থ লোকটি হলেন ভানু আথাইয়া।’১৪
এরপর দিল্লির অশোক হোটেলে অস্থায়ী কার্যালয়ে গান্ধীর প্রোডাকশন দলের সঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু করেন ভানু। যতোদূর সম্ভব ১ নভেম্বর থেকে এর শুটিং শুরু হয়েছিলো। ভানুর ভাষায়, গান্ধীতে কাজ করাটা একটু কঠিনই ছিলো।
৯.
‘চলচ্চিত্র পুরুষ-দৃষ্টিসর্বস্ব দৃশ্যমাধ্যম’১৫—আবিষ্কারের একশো বছর পরে এসে অন্যান্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের গ্রান্ড-ন্যারেটিভে যোগ হয়েছে এটি। তাই নারী চলচ্চিত্রের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি, হয়েছে চলচ্চিত্র ব্যবসার অন্যতম উপাদান। ফলে চলচ্চিত্রে নারী-সংশ্লিষ্টতা আজ কেবলই পুঁজি বৃদ্ধির জন্য। নারী চলচ্চিত্রের ব্যবসাকে যেকোনোভাবেই হোক কেবল সমৃদ্ধ করবে, এই চিন্তা এখন পুরো ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে। নারী শরীর ঠিক কতোখানি ঢাকা থাকবে, ঢেকে রাখা সেই পোশাকটি ঠিক কতোখানি উত্তেজক হবে কিংবা তার শরীরী আস্ফালন ঠিক কতোটা কাম ছড়াবে—সেটা কোনো নারী (মানে অভিনেত্রী, আইটেম গার্ল, পোশাক পরিকল্পনাকারী কিংবা কোরিওগ্রাফার) ঠিক কতোখানি ব্যবসাসফলভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন, তাই এখন চলচ্চিত্রে নারীর মূল্যায়নের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতার ধোঁয়া তুলে আমরা যাই বলি না কেনো, এর বাইরে চলচ্চিত্রে নারী যে অবদান রাখছেন সেটা অনেকটাই গৌণ।
আমি জানি না বিষয়টা ধোপে টিকবে কি না, ভানু আথাইয়ার পরিচিতি ও অন্যান্য বিয়ষগুলোর ক্ষেত্রে জেন্ডার সংক্রান্ত কোনো বিষয় কি কাজ করেছে? নারী-ভানু কি সমস্যায় ছিলেন? বিয়ে করেছিলেন ভানু, তারপর বিচ্ছেদ, এখন বৈধব্য। নারী হিসেবে যে স্বাধীনতার কথা ভানু স্বীকার করছেন, সত্যি কি এই সমাজে তা তিনি পেয়েছেন? তিনি বলছেন, ‘যদি কোনো নারী তার নিজস্ব প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারে, তবে তার বাধা কেটে যায়। তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন।’১৬ ভানুর এই উপলব্ধি এই সমাজ-বাস্তবতায় কতোখানি মানানসই? বাংলাদেশ বা ভারতে এই যে শত শত নারী আজ গণমাধ্যমের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছেন, তারা কি সবাই খুব স্বস্তিতে কাজ করতে পারছেন? নারী হিসেবে টাকা রোজগার কিংবা পুরুষের সমান মেধা খাটিয়ে এরা কি নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পেরেছেন? উত্তরগুলো এতো সহজে দেওয়া খুবই কঠিন। বিয়ে করে বিচ্ছেদ হলো কেনো—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা যেমন ভানুর জন্যও খুব সহজ নয়।
ভারতে সোনিয়া-মমতা হয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের নাচিয়ে ফারাহ খান কিংবা ‘নাচনেওয়ালি’ ক্যাটরিনা (ভারতের অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ধুম : থ্রিতে নাকি ক্যাটরিনাকে কেবল নাচতেই (!) দেখা গেছে), কঙ্কণা, কারিনা, সানি লিওন, পাড়ুকোনদের দাপটে আমরা আজকে তাদের যেভাবে চিনি, সেখানে নারী-ভানুরা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন বলে মনে হয় না।
প্রথম ভারতীয় হিসেবে অস্কার পেলেও ভানু আথাইয়া এই ৮৫ বছর বয়সেও দেশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সম্মাননা পাননি। এদিক থেকে অবশ্য আরেক কিংবদন্তি নারী সুচিত্রা সেন কিংবা আজকের হার্টথ্রব বিদ্যা বালান এগিয়ে। আন্তর্জাতিক অর্জন বলতে সুচিত্রা ১৯৬৩ সালে সাত পাকে বাঁধায় অভিনয়ের জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন। লাস্যময়ী এই অভিনেত্রীর গাঁটে রয়েছে সেই ১৯৭২ সালের ‘পদ্মশ্রী’, ২০০৫ সালের ভারতে চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা পুরস্কার ‘দাদাসাহেব ফালকে’র মনোনয়ন (যদিও পুরস্কার নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে আসতে হবে বলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন), ২০১২ সালের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘বঙ্গবিভূষণ’।
আর বিদ্যা বালান ২০০৫ সালে বলিউডে অভিষেক হয়ে মাত্র নয় বছরের মাথায় ২০১৪ সালে পেয়ে গেছেন ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘পদ্মশ্রী’। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য মেয়ে-নাতির বয়সী বিদ্যার সঙ্গে এবার ‘পদ্মশ্রী’ পেয়েছেন সুপ্রিয়া দেবী ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো বর্ষীয়ান অভিনয়শিল্পীরা!
সুচিত্রা থেকে বিদ্যা—নায়িকা বলে কথা, তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই! অন্যদিকে পোশাক পরিকল্পনাকারীর তো আর এতো ‘ক্রেজ’ নেই। পুরুষের এতো কামুক চোখও তার দিকে তাকিয়ে থাকে না। তাই হয়তো আক্ষেপ নিয়ে ভানু আথাইয়াকে বলতে শুনি, ‘এটা খুবই দুঃখজনক ও হতাশার। মুখে (ভারতকে) শিল্পীদের দেশ বললেও সেটা কাজে প্রকাশ পায় না।’১৭
১০.
অস্কার পুরস্কার আনার জন্য যখন মঞ্চে গিয়েছিলেন ভানু আথাইয়া, তার পরনে ছিলো শাড়ি। ভানু বলেন, ‘আমি সবসময় ভারতীয় নারীদের বলি আমাদের নিজস্ব পোশাক পরার জন্য। শাড়ি ভারতীয় পোশাক হিসেবে অত্যন্ত পরিচিত।’ সারাজীবন সবাইকে নানা পোশাকে সাজিয়েও নিজের দেশ, সংস্কৃতিকে ভুলে যাননি ভানু। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি আমরা সবাই ভানুকে ভুলে গেছি!
লেখক : কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।
kmhaiderru@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. এই আলোচনাটি নেওয়া হয়েছে শাকুর মজিদের ‘উত্তরাধিকারহীন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে। বিস্তারিত দেখতে পারেন সমকাল-এর শুক্রবারের সাময়িকী ‘কালের খেয়া’; ৯ মে ২০১৪।
২. ‘কাউকে বিশ্বাস করেন না ভানু’; কালের কণ্ঠ, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩।
৩. প্রাগুক্ত; কালের কণ্ঠ, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩।
৪. আইজেনস্টাইন, উদ্ধৃত; দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৪ : ৯০); সিনেমায় ইমেজ; বাণীশিল্প, কলকাতা।
৫. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৪ : ৯১)।
৬. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৪ : ৯১)।
৭. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৪ : ৯২)।
৮. রায়, সত্যজিৎ (১৯৮২ : ৪৭); ‘চলচ্চিত্র-রচনা : ‘আঙ্গিক, ভাষা ও ভঙ্গি’’; বিষয় চলচ্চিত্র; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
৯. খান, কলিম (বাংলা ১৪০৬ : ১১৬); দিশা থেকে বিদিশায়, নতুন সহস্রাব্দের প্রবেশ বার্তা; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।
১০. http://trishagupta.blogspot.com/2010/02/bhanu-athaiya-interview.html
১১. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৬৭); সিনেমা; ফ্ল্যাট ১/বি, বাড়ি ২৮, সড়ক ১৫ (নতুন), ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।
১৩. প্রাগুক্ত; হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৯৩)।
১৫. প্রাগুক্ত; হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৪)।
১৭. প্রাগুক্ত; কালের কণ্ঠ, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন