তামান্না মৌসী ও জাকারিয়া ইসলাম
প্রকাশিত ১৭ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সোপ অপেরার অর্জুন দ্রৌপদীরা
তামান্না মৌসী ও জাকারিয়া ইসলাম

দু-এক বছর আগে প্রাচীন চিনের ইতিহাস পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম ‘কনকিউবাইন’ (Concubine) শব্দটি। উইকিপিডিয়ার কল্যাণে বিস্তারিত তথ্যও পাই। সামাজিক অবস্থানগতভাবে উচ্চস্তরের কারো সামাজিকভাবে স্বীকৃত একজন স্ত্রী থাকবে। আর অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করে ওই ব্যক্তি অন্য অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারেন, যাদের বলা হয় ‘কনকিউবাইন’। অনেক সময় রাজাদের কনকিউবাইনের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। বিষয়টির আইনগত ভিত্তিও ছিলো। কনকিউবাইনদের সন্তানরাও উত্তরাধিকারের তালিকায় থাকতো। শুধু চিন নয়, প্রাচীন গ্রিস, রোম, ইসরায়েল সবখানেই ছিলো এমন প্রথা। আর আরবদের হেরেম-এর কথা তো সবারই জানা।
ভাবছেন, শুরুতেই এ কথা কেনো! আর কেনোই-বা সোপ অপেরায় অর্জুন-দ্রৌপদীকে টেনে আনা! কারণ আলোচনাটাই যে অনেক অনেক বিয়ে নিয়ে। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহকে সামাজিক নানা সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অনেক আগেই। কুসংস্কার আর অশিক্ষাকে দায়ী করা হয় এজন্য। কিন্তু শিক্ষিত মানুষেরাও যে বহুবিবাহের সঙ্গে জড়িত তার খবর রাখে না কেউ।
‘যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম’ই হোক বা ‘ফ্রম দিস ডে ফরওয়ার্ড, ফর বেটার, ফর ওয়ার্স, ফর রিচার, ফর পুয়োরার, ইন সিকনেস অ্যান্ড ইন হেলথ, আনটিল ডেথ ডু আস অ্যাপার্ট’ অথবা ‘এতো টাকা দেনমোহরে উমুককে বিয়ে করতে রাজি থাকলে বলুন কবুল’—যেটাই হোক না কেনো, বিয়েটা এখন আর জন্ম-জন্মান্তরের বাঁধন নয়। স্বামী-স্ত্রীও এখন আর কারো জন্য ‘একম এবং অদ্বিতীয়াম’ থাকছে না। তবে কি আমরা আবার ফিরে যাচ্ছি সেই বহুবিবাহের যুগে! মুসলমানদের হাদিসের মতো ইহুদিদের ধর্মীয় বিধি-নিষেধ নিয়ে লেখা গ্রন্থ ‘তালমুদ’। সেখানে বিয়েকে বলা হয়েছে ‘সোল-মেট’-এর বন্ধন। তবে সে বন্ধন ছিন্ন হতেও পারে (অবশ্যই স্ত্রীর অসততার কারণে)। সভ্য সমাজের সুশিক্ষিত মানুষদের বিষয়টা মেনে নিতে আপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু ঘটনা সেদিকেই এগোচ্ছে। আর এটাকে এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে আমাদের বিনোদনের উৎকৃষ্ট মাধ্যম ‘সোপ অপেরা’গুলো।
বিষয়টা যেনো এমন-আমার পছন্দের একজন তো থাকতেই পারে, যাকে বিয়ে করবো ভাবছি। আর বাবা-মা’র মন রাখতে আরেকজনকে বিয়ে করলাম, একটা ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ পরিস্থিতিতে। সঙ্গে আছে সড়ক দুর্ঘটনায় স্মৃতি হারিয়ে আরো একটা বিয়ে। স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বাচ্চাদের কথা বিবেচনা করে তো একটা বিয়ে করাই যায়। এতো সব ঘটন-অঘটন দেখার পরেও কি আপনার মনে হচ্ছে না, আসলেই বিয়ে তো কয়েকটা করাই যায়!
এখনো খটকা থাকলে চলুন আপনাদের ঘুরিয়ে আনি এ সময়ের জনপ্রিয় কিছু সিরিয়ালের কাহিনী থেকে। আলোচনার সুবিধার্থে আমরা বেছে নিয়েছি হালের হার্টথ্রব চ্যানেল ‘স্টার প্লাস’ ও ‘স্টার জলসা’কে। দেশি এতো চ্যানেল থাকতে এ দুটো কেনো-এমন প্রশ্ন করতেই পারেন। উত্তরটা হলো টিআরপি (টার্গেট রেটিং পয়েন্ট)। টিআরপি’র সঠিক হিসাব আমার জানা নেই স্বীকার করছি, কিন্তু সন্ধ্যার পর পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে যতোগুলো বাড়িতে টেলিভিশনের শব্দ শুনতে পাই, তার ৯৫ ভাগই এ দুটো চ্যানেলের। কাজেই এদেশে ওই সিরিয়ালগুলোর দর্শক সংখ্যা কতো সেটা আন্দাজ করতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়!
আর গণমাধ্যম বিষয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে টেলিভিশনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবটাও আমাদের জানা। ম্যাজিক বুলেট থিওরি বা হাইপোডার্মিক নিড্ল থিওরি হয়তো এখন আর কাজ করে না, কিন্তু কাল্টিভেশন থিওরি তো কাজ করতেই পারে, করছেও। নইলে সিরিয়াল নিয়ে এতো মানুষের আগ্রহ ধরে রাখা নিশ্চয় সম্ভব হতো না। পরোক্ষভাবে হলেও এর প্রভাব পড়ছে দেশের সমাজনীতি, অর্থনীতি ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। সেটা বোঝা যায়, যেকোনো উৎসবের আগে ফুটপাতের ‘খাড়া মার্কেট’ থেকে বিলাসবহুল বিপণিবিতানে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আচরণ দেখে। সেখানে গেলেই দোকানদাররা আপন আগ্রহে মুম্বাই বা কলকাতা থেকে আনা আনারকলি, ঝিলিক, খুশি, রাশি নামের বাহারি পোশাকগুলো এগিয়ে দেয়। এগুলোই হয় হালফ্যাশন; ট্রেন্ডি তো আপনাকেও হতে হবে।
গত পর্বে যা দেখেছেন
‘বিয়ে’ বিষয়টা নিয়ে প্রথমেই খানিকটা আলোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন মনে করছি। বেদ থেকে জানতে পারি প্রাচীন ভারতে আট ধরনের বিয়ের প্রথা। ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপাত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস, পৈশাচ। সে প্রথার এখন কতোই না রকমফের-মনোগামি, সিরিয়াল মনোগামি, বাইগামি, পলিগামি, সেইম-সেক্স ম্যারেজ, থার্ড-জেন্ডার ম্যারেজ, ওপেন ম্যারেজ, ফিক্সড-টার্ম ম্যারেজ (মুতাহ), ইন্টার্ম ম্যারেজ (হিল্লাহ); এছাড়া বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ফসলের মৌসুমে মুনিষ হিসেবে বেগার খাটানোর জন্য বিয়ের রেওয়াজ আছে, তাদের বলা হয় ‘ফসল তোলা বউ’, ফসল তোলার মাস ফুরালেই সে ফুরাবে।
আসলে কিন্তু বিয়ে ব্যাপারটি সম্পত্তির ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত। নিজের সম্পত্তি যেনো বেহাত হয়ে না যায়, তাই বৈধ উত্তরাধিকারী তৈরির প্রক্রিয়া হলো বিয়ে। সমাজকাঠামো টিকে রাখার স্বার্থে যুগের পর যুগ চলে আসছে এই প্রথা। তখন প্রয়োজন ছিলো, এখনো আছে বলেই টিকে আছে।
বিরতির পর যা থাকছে
একদিন সন্ধ্যা সাতটার সংবাদ দেখার জন্য টিভির রিমোটে হাত দিতেই মায়ের চিৎকার-‘রাখো, রাখো। বাহার স্বামীর আবার বিয়ে হচ্ছে ওরই বোনের সঙ্গে; দেখতে দাও।’ খানিকটা বিরক্ত হলেও বিষয়টা সেদিন কৌতূহলী করেছিলো। কী এমন কাহিনী, যার জন্য দেশের সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও পানসে লাগে! দেখলাম সেদিন। ৩০ মিনিটের সিরিয়াল, কিন্তু বিজ্ঞাপন বিরতি, আগে কী দেখেছেন আর কাল কী দেখবেন বাদ দিলে ১০-১২ মিনিটও থাকে না; কাজেই বুঝলাম না কিছুই! অগত্যা পরদিন আবার একই সময়ে বসলাম টিভির সামনে। এভাবেই মাসখানেকের নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগে উদ্ধার করলাম সোপ অপেরা ‘ইস্টি কুটুম’-এর তাৎপর্য। পলাশবনি নামের আদিবাসীপল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্টে যান সাংবাদিক অর্চিস্মান মুখার্জি। সেখানে পাকেজোকে বিয়ে করতে বাধ্য হন বাহা নামের এক আদিবাসী মেয়েকে। কিন্তু অর্চির আগেই বিয়ে ঠিক ছিলো প্রেমিকা কমলিনী/মুনের সঙ্গে। কলকাতায় ফিরে তিনি কাউকে কিছু জানাতে পারেন না ‘সঠিক সময়’-এর অভাবে। ফলে মুনের সঙ্গেও তার বিয়ে হয় মহাসমারোহে।
এদিকে বাহা তার খোঁজে শহরে এসে পৌঁছান। পাশাপাশি খুঁজতে শুরু করেন তার পিতৃপরিচয়। শেষে জানতে পারেন-মুনের বাবা, তারও বাবা। কাজেই সর্বংসহা ভারতিয় নারীর প্রতিমূর্তি হয়ে বোনের জন্য বিসর্জন দেন নিজের স্বামীকে। স্বামীর বাড়িতেই আশ্রিত হিসেবে থাকেন। মাধ্যমিকে অভাবনীয় সাফল্যের বদৌলতে কলেজেও ভর্তি হন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, কয়েক মাসের ‘এয়ারটাইম’ বরবাদ করার পর দেখা গেলো, এবার মুন তার বোনের জন্য স্বামীকে তালাক দিয়েছেন-অন্য পুরুষের সঙ্গে তার নতুন সম্পর্কের কথা জানিয়ে। আর তাদের দুজনের সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সোপ অপেরা সম্ভবত ‘মা’। তবে এটি ‘ঝিলিক’ নামেই সবার মুখে মুখে ফেরে। কারণ, কাহিনীর মূল চরিত্র সে। মুখার্জীবাড়ির হারিয়ে যাওয়া মেয়ে পরী। অপেরাটির বিষয়টাই এমন, কে ঝিলিক, কে পরী-এ নিয়েই তালগোল পাকানো। ফলে বিয়ে নিয়েও ঝামেলা শুরু হয়। কারণ, প্রকৃত পরিচয়ের সঙ্কট। কয়েক মাস আগের পর্বে দেখানো হয়, ঝিলিকের সঙ্গে আদিত্যের বিয়ের কথা থাকলেও বিয়েটা হয় ফুলকির সঙ্গে। কিন্তু বউ সেজে থাকতে হয় ঝিলিককেও। নইলে যে তার ‘মনি’ বাঁচবে না! ধীরে ধীরে সত্য প্রকাশ পায়। মুক্তি পায় ঝিলিক। কিন্তু তখন তিনি জানতে পারেন-তিনি আসলে ঝিলিক বা পরী নন। খুঁজতে খুঁজতে পান তার প্রকৃত পরিচয়। দার্জিলিংয়ের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর মেয়ে দিয়া তিনি। আর এরই মধ্যে দিয়া প্রেমে পড়েন পুলিশ কর্মকর্তা অংশুর। অনেকটা গান্ধর্ব মতে তাদের বিয়েও হয়। কিন্তু বাবার ইচ্ছায় আবার তিনি বিয়ে করতে রাজি হন বাল্যবন্ধু পক্ষাঘাতগ্রস্ত রাজদ্বীপকে। এখন প্রশ্ন, বিয়েটা যদি এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে একজনকে দিয়ে বারবার বিয়ে করিয়ে তাকে এতোটা ফেলনা করা কেনো?
আরেক লোকপ্রিয় সিরিয়াল ‘ভালোবাসা ডটকম’। যার নাটের গুরু ‘ওম’ আর ‘তোড়া’। টিনএজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে এ সিরিয়ালটি শুরুর দিকে চলছিলো ভালোই। কিন্তু যেদিন থেকে ওম আর তোড়ার বিয়ের কথা হয়, সমস্যার শুরু সেখান থেকেই। এর তাকে পছন্দ না, তার ওকে অপছন্দ, সামাজিক অবস্থানগত সমস্যা কতো কী। আজ পর্যন্ত এ দুজনের সঙ্গে কতোজনের যে বিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার হিসাব আদৌ দেওয়া সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। কয়েকদিন (এই লেখা যখন চলছিলো, ডিসেম্বর ২০১৩-এর শুরুর দিকে) আগে দেখলাম সিরিয়াল চলছে এখনো, তবে নেই ওম বা তোড়া’র কেউই। এখন নতুন নতুন চরিত্র, কিন্তু তাদের কার্যকলাপ আগের মতোই।
বিয়ে, বিয়ে আর বিয়ে। এটাই ‘সব’, আবার এটা ‘কিছুই না’। দেখতে দেখতে ভাবতে বাধ্য হই-এসবের মূল কারণটা কী? কাকতালীয় ঘটনা কি সব সিরিয়ালগুলোতেই ঘটে? নাকি আরো গভীর কিছু? সবকিছুর মনোযোগের জায়গা কি কেবলই বিয়ে? সেটা শুধু ‘বিবাহ’ নয়, ‘বহুবিবাহ’। বহুবিবাহকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার নতুন উপায়। রামায়ণের ‘সীতা’ সবার কাছে আদর্শ পত্নী, স্বামী ছাড়া অন্য কারো দিকে তিনি কখনো নজর দেননি বলেই কি? রাম কিন্তু ঠিকই অবতার হয়েও মানুষ-পুরুষের মতোই বারেবারে তার পরীক্ষা নিয়েছেন।
অন্যদিকে, ‘মহাভারত’-এর দ্রৌপদী। ইতিহাসের একমাত্র নারী, যিনি পাঁচ স্বামীর সঙ্গে ঘর করেছেন একই সময়ে। সেটাও কিন্তু নিজের ইচ্ছায় নয়। পুরুষের ভুল বা খামখেয়ালির কারণেই। লাঞ্ছিতও হয়েছেন বারবার, কিন্তু ছিলেন তেজোদীপ্ত। দুর্ভোগ তো তাকে পোহাতেই হবে। তিনি সীতার মতো সর্বংসহা নন, প্রতিশোধপরায়ণ; সেটাকে গৌরবজনক কিছু মনে করা হয় না। তাকে মনে করা হয়, তার সুস্বাদু রান্না আর বস্ত্রহরণের ঘটনার জন্যই। পাঁচ স্বামীর একজন অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণে স্বর্গেও ঠাঁই হয় না দ্রৌপদীর। অথচ অর্জুনেরও ছিলো একাধিক স্ত্রী। পুরাণের যুগ থেকেই কী তাহলে প্রেমের চেয়ে বিয়ের সম্পর্ককেই বেশি বিবেচনায় আনা হয়!
এবার চলুন অন্য কয়েকটি ঘটনা আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করি-
প্রেমালেক্ষ্য-১
ফারুক সাহেব ব্যাংকার। তার ছোটো সংসার-স্ত্রী সুমি ও সাত বছরের ছেলে ফাহিমকে নিয়ে। প্রায় এক যুগ চলছে তাদের সংসার। ফারুক সাহেবের স্ত্রীর বিয়ের আগে প্রেম ছিলো ইমন নামে একজনের সঙ্গে। বিয়ের এক যুগ পরে ইমনের সঙ্গে ঘটনাচক্রে দেখা হয় সুমির। ছেলেকে স্কুলে নেওয়ার নামে তারা আবার গোপনে দেখা করা শুরু করে। একপর্যায়ে স্বামী-সন্তান হার মানে পুরনো প্রেমের কাছে। সুমি চলে যায় ইমনের হাত ধরে।
প্রেমালেক্ষ্য-২
আজ থেকে নয় বছর আগের কথা; নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা সুমন ও চৈতির প্রণয় চলছিলো। দুবছরের মাথায় তাদের পরিণয়। সোহান ও স্নেহাকে নিয়ে তাদের সংসার ভালোই চলছিলো। ছেলেটির বয়স তখন ছয় আর মেয়েটির তিন। সুমনের বন্ধু সুবাদে তাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসতো শামসুল। একপর্যায়ে চৈতি মধ্যবিত্ত শামসুলের প্রেমে পড়ে। যদিও সে জানতো শামসুলের দুজন স্ত্রী আছে। তার পরও চৈতি তার স্বামী-ছেলেমেয়ে রেখে নতুন প্রেমিকের হাত ধরে ঘর ছাড়ে।
প্রেমালেক্ষ্য-৩
রফিক মিয়ার বয়স এখন ৪৫, আর স্ত্রী সাফিনার আনুমানিক ৪০ বছর। তাদের তিন সন্তান। একমাত্র মেয়ের বয়স ১৬; বড়ো ছেলেটি নয় বছরের, অন্যটির ছয়। প্রায় ২০ বছর সংসার করে তারা দুজনই এখন নতুন সংসার পেতেছেন। সাফিনা তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন পাশের মহল্লার ব্যবসায়ী তোফাজ্জলের ছেলের সঙ্গে। মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়ায় এলাকাবাসীর চাপে বাল্যবিবাহ ঠেকানো গেলেও সাফিনাকে ঠেকানো গেলো না। তিনি তোফাজ্জলকে বিয়ে করেন। সাফিনার বিয়ের তিন দিনের মাথায় রফিকও নতুন সংসার পাতেন ফেরদৌসি নামের একজনের সঙ্গে।
ঘটনাগুলোর মধ্যে নাটকীয়তা থাকলেও এগুলো সোপ অপেরার কোনো কাহিনী নয়। আমাদেরই আশেপাশের খুবই পরিচিত মানুষের ঘটনা এগুলো। কিন্তু ঘটনাগুলোর পিছনের কারণ খুঁজতে গেলে অনুঘটক হিসেবে ঘুরেফিরে আসবে টিভির ওই সিরিয়ালগুলোর কথা। নারী কিংবা পুরুষ হিসেবে অন্যান্য সব সীমাবদ্ধতার বাইরে (যদিও এই সমাজের সীমা কথাটি কেবল নারীর জন্য) সপ্তাহে পাঁচ দিন ঘড়ি ধরে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার মতো প্রতি সন্ধ্যায় নিয়মিত আপনি যা সেবন করছেন, সেটার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো দেখা দিবেই। আমাদের গৃহপালিত নারীদের জন্য সমাজ এমন কোনো ‘প্রতিষেধক’ সরবরাহ করে না, যাতে তারা এতে আক্রান্ত হবে না। উল্টো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সূক্ষ্মভাবে এ ‘ভাইরাস’ সরবরাহের ব্যবস্থা করে, নিজেরাও আক্রান্ত হয়। তবে চলতি সমাজে আখেরে লাভ থাকে পুরুষেরই।
অথচ আমাদের গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা শুধু ভাষার ওপর আগ্রাসন বন্ধে শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় কার্টুন ‘ডোরেমন’ প্রচার বন্ধে সোচ্চার হয়; এমনকি ডিজনির চ্যানেলটির সম্প্রচারও বন্ধ করে। এতে না হয় বাচ্চাদের সামলানো গেলো কিন্তু বড়োদের...!
আগামী পর্বে দেখবেন
এবার একটু ভিন্ন দিকে নজর ফেরাতে বলবো আপনাদের। ভাবুন তো, কাগজে স্বাক্ষর করে বা মন্ত্র পাঠ করে যে বৈবাহিক সম্পর্ক, সেটা তো এসেছে মানুষের তাগিদেই। তেমনি মানুষেরই প্রয়োজনে সেটি বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে একদিন। এটি তো আর চিরন্তন সত্য নয়। যে দেশটিতে নির্মিত মন্ত্রমুগ্ধকর সিরিয়ালগুলোতে ‘বিয়ে ছাড়া গতি নাই’ এমনটা দেখানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত, সেই ভারতেই আদালতের মাধ্যমে বলা হয়েছে লিভ টুগেদার বৈধ। এটি কোনো নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর অনুশাসন নয়। কয়েক দশক পরে এটি যে বিশ্বের সবখানেই স্বীকৃতি পাবে না, এই কথা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবে না।
যাই হোক, কথা হচ্ছে ‘লিভ টুগেদার’ ব্যাপারটা নিয়ে। দুজন মানুষকে নিয়ে। যারা পরস্পরকে বেশি করে জানতে চায়, থাকতে চায় তার সঙ্গে অনেক অনেক বছর, সম্ভব হলে সারাজীবনই-একটি কাগজে স্বাক্ষর করে বা না-করে। সম্পর্কটাকে নথিবদ্ধ করার আগে মানে কবুল বলার আগে আরেকটু ঝালাই করে নেওয়া, পারস্পরিক বোঝাপড়াকে সুদৃঢ় করা, যাতে সংসারজীবন সুখের মধ্যেই টিকে থাকে অনেক দশক। বুঝতে পারি ইদানিং ডিভোর্সের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণেই দুশ্চিন্তা একটু বেশি; অনেক অনেক বছরের সম্পর্কও টিকছে না প্রত্যাশা মতো, অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের শত্রু হয়ে দাঁড়াচ্ছে এককালের প্রাণের পরাণ ছেলে-মেয়ে দুটি।
লিভ টুগেদার মানে কিন্তু যখন খুশি তখন চলে গেলাম, বিষয়টা এমনও নয়। বিয়ে আর লিভ টুগেদারের তফাত হলো-বিয়েতে কাগজে সই করতে হয়, ধর্মীয় নিয়ম মানা হয়, লিভ টুগেদারে সেটা লাগে না। কিন্তু লিভ টুগেদার করেও আইনত সম্পত্তির দখল নেওয়া যায় অনেক উন্নত দেশে, তাদের ছেলেমেয়ে হয়, সারাজীবন সেভাবেই থাকে, তাদের ছাড়াছাড়ি হলে মেয়ে পার্টনারকে অর্ধেক সম্পত্তি দিয়ে দিতে হয় ছেলের পক্ষ থেকে, তাদের বাচ্চা থাকলে তাদের ভরণ-পোষণও দিতে হয়।
আমাদের দেশেও লিভ টুগেদার সেই জুটিদের জন্য, যারা দুইজনেই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী। তা না হলে দেখা যাবে, কয়েকদিন পরে তাদের ছাড়াছাড়ি হলে বা ছেলেটা মেয়েটার সঙ্গে আরাম-আয়েশ করে চম্পট দিলে-তখন মেয়েটাকে তার পরিবার সহজভাবে নেবে না, বা মেয়েটাকে সবাই ছি ছি করবে।
শুধু ধর্মীয় কারণেই যে লিভ টুগেদারকে ছি ছি করে-বিষয়টা কিন্তু এমন না; এর প্রধান কারণ ‘মানসিকতা’। ‘মহান’ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শেষ পর্যন্ত সব দোষ মেয়েদের কাঁধে চাপিয়েই সবাই অভ্যস্ত। স্ত্রীকে পিটিয়ে চোখ অন্ধ করে শরীরে আগুন লাগিয়ে দিলেও সুশীলেরা ভাবে-মেয়েটার নিশ্চয়ই কোনো দোষ ছিলো, তাছাড়া কেনো একজন স্বামী এমন অমানুষের মতো কাজ করবে! অধিকাংশ পুরুষের যৌনতা নিয়ে আদিখ্যেতা প্রবল, নিজে শত জনের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও মেয়েটি যেনো অসূর্যম্পশ্যা অক্ষতযোনি হয়, সেই বিষয়ে তারা অতি সচেতন। এমন অনেকে আবার লিভ টুগেদারে রাজি থাকে শুধু ভিন্ন ভিন্ন শরীরের স্বাদ পাওয়ার জন্য। ভুলে গেলে চলবে না, যৌনতা আমাদের সমাজে কেবল ঢাক গুড়গুড় ব্যাপার তা নয়, এটি একেবারে ‘ট্যাবু’। কাজেই দুর্ভিক্ষ লাগার আগে, সুযোগ কাজে লাগাতে এক পায়ে খাড়া তারা।
প্রকৃতপক্ষে, লিভ টুগেদার টিকে রাখা বিয়ের চেয়ে কঠিন। বিয়ের পর সমাজের, পরিবারের একটা বিশাল চাপ থাকে। সঙ্গে সন্তান থাকলে তো কথাই নেই! কিন্তু লিভ টুগেদারে সেইটা থাকে না, বরং থাকে দুইটা মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালো লাগা না-লাগা, রুচি-অরুচির সন্নিবেশনে গড়ে ওঠা সম্পর্ক; তা টিকে থাকুক বা ভেঙে যাক। এইখানে কেবল অবাধ যৌনতা খুঁজে পেলে বুঝতে হবে, তারা বিষয়টা জানেন না; কিংবা কেবল যৌন ক্ষুধার তাড়না থেকেই করে।
কিন্তু আমাদের ‘সুসভ্য’ টিভি সিরিয়ালগুলোতে এ জিনিস আপনি কখনোই পাবেন না। সেখানে দেখানো হয়, বাবা-মা’র পছন্দে বিয়ে করতে হয়েছে বলে স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে এক বিছানায় থাকতেও রাজি না, অথচ একই ঘরে থাকবে দুজন। কিন্তু স্ত্রীকে মেঝেতে মাদুর পেতে ঘুমাতে দেখাবে দিনের পর দিন (উচ্চবিত্ত এসব পরিবারের শয়নকক্ষে মাদুর কীভাবে জানি সবসময়ই থাকে সযত্নে!)। আত্মনিয়ন্ত্রণ আর সংযমের চূড়ান্ত নমুনার এক একজন নায়ক। প্রেমিকার জন্য স্ত্রীকে স্পর্শ না করেই থাকতে পারে। অথচ বাবা-মাকে নিজের পছন্দের কথা জানাতে পারে না। কী অদ্ভুত পারিবারিক শিক্ষা!
এখন আসি, কী দেখানো হয় ওই সব সিরিয়ালের বিয়েগুলোতে? এক মাস আগে থেকে প্রস্তুতি, ঘটা করে অভিনয়শিল্পীদের দিয়ে দর্শকদের নেমন্তন্ন জানানো। লৌকিকতা ও ভোজসভার নামে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ। তাহলে হালফ্যাশনের শাড়ি, শেরওয়ানি, গয়নার প্রদর্শনীই কি এর উদ্দেশ্য? মানতে না চাইলে কষ্ট করে একটু খেয়াল করুন তো সিরিয়ালগুলোর স্পন্সর কারা? তবেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন। আরে দেখতে দেখতেই তো শিখবেন। ওরা যেভাবে অনুষ্ঠান করছে বিয়েতে, আপনারও তেমনটা ইচ্ছা হতেই পারে। আর আপনি যদি আগে থেকে বিবাহিত হয়েই থাকেন, তাহলে ডিভোর্সের অপশন তো থাকলোই; করে ফেলুন আবার মনের মতো বিয়ে; নয়তো চাপিয়ে দিন ছেলেমেয়ের ঘাড়ে।
লেখক : তামান্না মৌসী ও জাকারিয়া ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর।
tammcj@gmail.com
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন