সেলিম আহমেদ
প্রকাশিত ১০ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
একজন ঘুঘু নির্মাতার ‘হোয়াট ইজ লাভ’ সিনেমা
সেলিম আহমেদ
অহেতুক ভূমিকায় বিজ্ঞাপনের ভাবধরা নির্মাতারা
আমাদের এই মিডিয়া জগতের একটা বড়ো শাখা এবং খানিকটা প্রভাবশালী অংশের নাম বিজ্ঞাপনচিত্র। টেলিভিশন-বিজ্ঞাপন নির্মাতারা অনেক বেশি সচ্ছল, এরা সেকেন্ডের হিসাবে অনেক বেশি আয়োজন করে, যা টেলিভিশন-নাটক নির্মাতাদের অবাক করে দেয়। আমি প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই, যা আমাকে ভীষণ প্রশান্তির পাশাপাশি কলম্বাসের মতো অজানা অভিযাত্রায় নতুন দেশের সন্ধান দেয়। ছাত্রজীবনে আমি যখন ভাস্কর্যের প্রথম বর্ষ শেষ করছি, তখন হেনরি মুরের ভাস্কর্যে সারফেস এবং কার্ভে সবেমাত্র সঙ্গীতের সুর-তাল-লয় দেখছি, ঠিক তখনি শিল্পকলা একাডেমীর গানের আয়োজনে জ্যাজ মিউজিকের গায়ক চিকো ফ্রিম্যান ও তার দল আমাকে এক অবর্ণনীয় সঙ্গীতের ঠিকানা দিয়ে গেলো, সে এক অসম্ভব ভালোলাগা। আমার সারাটা জীবনই এমন হয়েছে, শুধুই বোনাস, এক খুঁজতে গিয়ে প্রাপ্তি একাধিক।
নাটক নির্মাণ আর টেলিভিশন-বিজ্ঞাপন নির্মাণের দৃশ্যত কিছু ব্যবধান আছে, যেমন—নাটকের এডিরা (অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টর) সেটে সারাক্ষণ হাঁপাতে থাকেন, ব্যস্ত থাকেন প্রপস্ নিয়ে, আর্টিস্ট নিয়ে; কাজ করতে করতে তারা জীবন প্রায় শেষ করে দেন। অন্যদিকে, বিজ্ঞাপনের এডিরা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, চমৎকার দৌড়ের জুতা, ফর্সা টি-শার্ট, সানগ্লাস আর হাতে একটা ওয়াকিটকি নিয়ে দামি সিগারেটে সুখটান দিয়ে ওভার-ওভার বলতে থাকেন। নাটকে প্রোডিউসার সেটে এলে খরচ কমানোর তাগাদা দেন, আর বিজ্ঞাপনে এজেন্সির লোক সেটে এলে খাবারের সাধ্যমতো এন্তেজাম করা হয়, একটা টাকা ছড়াছড়ির দৃশ্য দেখা যায়। সবকিছুতেই খরচের অংক টেলিভিশন-নাটক ও টেলিভিশন-বিজ্ঞাপনে একটা ব্যবধান তৈরি করতে থাকে।
বিজ্ঞাপনচিত্রে ক্যামেরা আর ডিওপি (ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি) খুব জরুরি এবং ভীষণ ব্যয়বহুল। এই ক্যামেরা আর এই সব ডিওপি সাধারণত নাটকে ব্যবহার হয় না। বিজ্ঞাপনের জন্য এফডিসি বা পরিত্যক্ত কোক ফ্যাক্টরিতে প্রয়োজনমতো সেট বানানো হয়, আর নাটকে উত্তরার কোনো হাউসে এক দেয়ালের ছবি আরেক দেয়ালে নিয়ে অথবা সবুজ পর্দা সরিয়ে লাল পর্দা লাগানোকেই আর্ট-ডিরেকশন বলে। প্রকৃত অর্থে নাটক ও বিজ্ঞাপনচিত্রে যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলো আর্ট-ডিরেকশন অনুপস্থিত; নাটক ও বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতারা মূলত বন্দোবস্তকারী, শুধু ডিরেক্টর না।
আমি যখন আমাদের এই মিডিয়াতে চিত্রনাট্য লিখতে মনোযোগী হয়েছি, ঠিক তখনি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের কিছুটা দেখে আসার সুযোগ হলো; আমিও সেসময় ফাঁকা ঝুলি খুলে রেখেছিলাম, দেখি কী কী সংগ্রহ হয়। ছাত্রজীবনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু উপদেশবাণী মনে রেখেছি, তার মধ্যে একটি—‘তুমি যা জানো না তা দিয়ে বড়ো বড়ো গ্রন্থাগার রচিত হয়।’ এই উপদেশবাণী আমি আজও স্বীকার করি এবং মনে রাখার চেষ্টা করি।
মগবাজারের মোড়ে সন্ধ্যার পর যে আড্ডা হয়, সেখানেই মিডিয়ায় পরিচিত আমার প্রায় সব মানুষের সঙ্গে প্রথম দেখা, প্রচুর গুণীমানুষের সঙ্গে পরিচয়। তাদের একজন খায়ের খন্দকার, সিনেমাটোগ্রাফার, আমার পছন্দের মানুষ। কোনো একরাতে তিনি আমার বাসার উল্টোদিকে কেএফসি’তে ডেকে এক টেলিভিশন-বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হতে বললেন, তার কথায় অনুমান করলাম নির্মাতা পাশেই আছেন। এভাবে আমার প্রথম বিজ্ঞাপনের চিত্রায়ণে থাকার সুযোগ। সে এক অন্য অভিজ্ঞতা, তা হয়তো অন্য লেখায় লিখবো, এ লেখায় প্রাসঙ্গিক না। তারপর, পরপর আরো দুটো বিজ্ঞাপন এবং চতুর্থ বিজ্ঞাপনে গ্রামীণফোনে কাজ করবার জন্য ‘নির্বাচিত’ হলাম। বিষয়টা খুবই প্রাসঙ্গিক এই জন্য যে, আমি যখন গ্রামীণফোনের সেই বিজ্ঞাপনে কাজ করছি, ঠিক একই সময়ে গ্রামীণফোনের আরেকটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ হচ্ছিলো, যার মডেল অনন্ত জলিল। এই দুটো বিজ্ঞাপন প্রায় একই সময়ে টেলিভিশনে দেখানো শুরু হয়, আমি মূলত অনন্ত জলিলকে এভাবেই জানি।
আর্ট-কালচার মাইন্ডের অভিজ্ঞতা
আমার ছাত্রত্বে প্রতিদিন ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যা বা একটু রাত অবধি হয়তো অন্য একটা কম্পোজিশন করছি, উঁচু ক্লাসের ছাত্ররা, দু-একজন শিক্ষকও কাজ করছেন। সব মিলে একটা সারাক্ষণ কাজের পরিবেশ। তখনো অবশ্য আমাদের সবকিছু রাজনীতিতে আক্রান্ত হয় নাই; আর্ট কলেজের জন্মের পর থেকেই বাঙালির ভাষা-কৃষ্টি-সার্বভৌমত্বে এ ক্যাম্পাসের সবাই নিবেদিত ও সোচ্চার ছিলো। যা বলছিলাম, ক্লাসের শেষে হয়তো উড কার্ভিং করছি, বহিরাগতদের অত্যাচারে কাজে মনোযোগী হতে পারতাম না। আমি চিরকালই সহজ পথ বেছে নিই, সেভাবেই আমি নিজেই উদ্যোগী হয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় ফটকে পাহারা বসানোর ব্যবস্থা করলাম আর বহিরাগতদের প্রবেশেই বাধা দিতে চেষ্টা করলাম। ঠিক সেসময় কেউ কেউ প্রধান ফটকে তীব্র প্রতিবাদ জানাতো, বলতো, ‘আমি খুব আর্ট-কালচার মাইন্ডের, আমাকে কেনো ঢুকতে দিচ্ছেন না।’ বর্তমানে আমাদের এখানে যে কর্পোরেট কালচার গড়ে উঠেছে, সেখানে তাদের নিজস্ব ক্রিয়েটিভ সেল আছে, কর্পোরেটিয় ওই সব কর্মচারীরা কলেজের প্রধান ফটকের সেই বহিরাগতদের মতো ভীষণ আর্ট-কালচার মাইন্ডের, ভীষণ ক্রিয়েটিভ। কর্পোরেট জগতে ‘সব বেচে দেই’ বলে একটা নিয়ম আছে, সেই নিয়মে গ্রামীণফোন অনন্ত জলিলকে বলির পাঁঠা বানিয়েছে, বেচে দিয়েছে।
এম এ জলিল অনন্ত
অনন্ত জলিলের জন্ম মুন্সীগঞ্জে, পাঁচ বছর বয়সে মা মারা যান। তারপর থেকে বড়ো ভাইয়ের সঙ্গেই বসবাস। তিনি ঢাকার অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ও এবং এ লেভেল পড়া শেষ করেন, তারপর ম্যানচেস্টারে গ্রাজুয়েশন। দেশে এসে অনন্ত জলিল গার্মেন্ট সেক্টরে বিনিয়োগ করেন এবং মনোযোগী হন; সেখানে আসে অসম্ভব সাফল্য, তিনি একজন সিআইপি (কমার্শিয়ালি ইম্পোর্টেন্ট পার্সন)। হঠাৎ তিনি খেয়াল করে দেখতে পান, বাংলা চলচ্চিত্রের দুর্দিন, সিদ্ধান্ত নেন এবং কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই দেশি চলচ্চিত্রের সুপারস্টার হয়ে যান!
আকবর হোসেনের নেওয়া বিবিসি’র সাক্ষাৎকারে জানা গেলো, ম্যানচেস্টারে অনন্ত জলিল বিবিএ পড়ালেখা করতেন। জলিল বলছেন, ‘এমন একটা কিছু করতে চাই যা দর্শক দেখবে, টাকাটা রিটার্ন আসবে আর আমার নাম হয়। ...টম ক্রুজের কথা ভাবেন—উনি নিজেই ইনভেস্ট করেন, নিজেই অভিনয় করেন। তাহলে কাজের একটা ফ্রিডম থাকে... রজনীকান্ত, সালমান খান বা শাহরুখ খান—এরা নিজেরাই ইনভেস্ট করে নিজেরাই অভিনয় করে... বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আমি নিজেকে যেখানে দেখতে চাই, আমি অলরেডি সেই জায়গায়।’
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মানে হোয়াট ইজ লাভ
অনন্ত জলিল প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। অনন্ত জলিলের পঞ্চম চলচ্চিত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এ লেখার প্রসঙ্গ। অভিনয়ে—আফিয়া নুসরাত বর্ষা, এম এ জলিল অনন্ত, নায়করাজ রাজ্জাক, মিশা সওদাগর, ডন, কাবিলা ও সুচিত্রা। যখন ঈদের আগে এ চলচ্চিত্র মুক্তির পোস্টার ঢাকা শহরের দেয়ালে জুড়ে দেওয়া হলো, লক্ষ করি সেই পোস্টারে কান ফিল্ম ফেস্টিভালের লোগো; মুর্খ মানুষের একটা সুবিধা আছে, যেকোনো কর্ম সম্পাদন করে সে বলতে পারে—আমি জানি না অথবা বুঝতে পারি নাই। ধূর্ত অনন্ত জলিল বোকা সেজে সেই মার্কেটিং করলেন, যদি লাইগা যায় টাইপের মিথ্যাচার। কান ফিল্ম ফেস্টিভাল নিয়ে গত এক বছরে একজন অভিনেত্রী, একটি জাতীয় দৈনিক, অনন্ত জলিল প্রচুর মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছেন।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সম্পর্কে অনন্ত জলিল ‘প্রথম আলো’র বিনোদন সাময়িকী ‘আনন্দ’-এ (১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩) লিখেছেন, ‘এটি বাস্তবতার গল্প... হয়তো আমাদের জীবনের কিছু ঘটনা এখানে আছে, তবে এর সঙ্গে অনেক রটনাও তো আছে। আসলে মানুষের জীবনে যেসব বাস্তবতা আছে, সেটিকে আমরা কাহিনীতে রূপ দিয়েছি।’
আমরা? শুনে মনে হয়, মাসোয়ারা পাওয়া কোনো লেখক আর টাকাওয়ালা অনন্ত জলিল মিলে আমরা। কাহিনীতে নায়ক অতিমানবীয় চরিত্রে অবতীর্ণ হয়েছেন, এ পুরুষের সবকিছু শুধুই সেই নায়িকাকে ঘিরে, যে লোভী-নেশাগ্রস্ত-অকৃতজ্ঞও বটে। কাহিনী যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই নিম্নমানের গল্পবলার কায়দা। নিজের অভিজ্ঞতা চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু গল্প কে বলছে—সেটা ভীষণ গুরুত্বের বিষয়। অনন্ত জলিলের এই সব্যসাচী হয়ে উঠবার ইচ্ছাটা খুবই স্বাভাবিক, কারণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মানুষগুলো সাধারণত সংস্কৃতির বাইরের মানুষ; সুতরাং ‘যার টাকা তারই আইডিয়া’ ফর্মুলা কাজ করেছে। অনন্তকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো বলতে পারে না—‘স্যার, এই বিষয়টা আপনি বোঝেন না’, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ম এখন সর্বত্র জুড়ে আছে।
কাহিনী
অনন্ত জলিল সাক্ষাৎকারে বললেন, ঢালিউডের চলচ্চিত্রের মূল সমস্যা হলো কাহিনী, গরিবের মেয়ে আর বড়োলোকের ছেলে অথবা গরিবের ছেলে আর বড়োলোকের মেয়ে এবং তাদের প্রেমকাহিনী। পুরো চলচ্চিত্রে তাদের টিকে থাকার সংগ্রাম এবং শেষে মিলনের দৃশ্যে পুরো পরিবারসহ একটি স্থিরচিত্র। অনন্ত জলিল এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’র কাহিনী যখন তৈরি করছেন, তখন তিনিও এফডিসির ফর্মুলার বাইরে নতুন কিছু ভাবতে পারছেন না; এই চলচ্চিত্রেও নায়ক বিত্তবান এবং সমাজে উপরতলার মানুষ হিসেবেই স্বীকৃত। আর নায়িকা দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা, অপুষ্টি আর অশিক্ষা থেকে বাঁচানোর জন্য তার আছে ত্রাণকর্তা। এইবার তাদের পরিচয় যৌবনে, নায়িকার মনোরঞ্জনে গাড়ি-বাড়ি সব না চাইতেই বন্দোবস্ত করে দেয় নায়ক।
সেলিব্রেটি ও ব্যবসায়ী নায়ক ছেলেবেলায় বাবার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো মদ ছুঁয়ে দেখবে না; কিন্তু নায়িকার হাতের নাগালে রাখে মদের ব্যবস্থা, নিজেই আনে কিনে। আবারো প্রমাণিত টাকা-সম্পদ দিয়ে ভালোবাসা হয় না। নায়িকার সেলিব্রেটি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষায় এগিয়ে আসে দালাল-নির্মাতা-ঠগবাজরা; সবার নজর নারীর যৌবনে এবং অনন্তের টাকায়। নায়ক তা হতে দেবে না এবং শেষ দৃশ্যের কাছে নায়িকার বোধোদয় এবং সিনেমা শেষ। অনন্ত জলিল ভাবলেন, এটাই নতুন গল্প, তার ধারণা—তার নির্মিত চলচ্চিত্রের দর্শক রিকশাওয়ালা থেকে বিবিএ পাশ করা যুবক এ গল্প জানে না।
এ সিনেমায় গানের কথা
‘হ্যালো, হ্যালো জনগণ, সবাই শোন দিয়া মন, আমি এসেছি এখানে নাচাতে। ...ঢাকার পোলা, ঢাকার পোলা, ভেরি ভেরি স্মার্ট।’‘...ময়না তুই পয়সা পাবি রে। ...তোকে আর ভাবি না, উড়ে যা এ বুক ছেড়ে’ এবং যথারীতি ‘সজনা ভালোবেসে ভোলা যায় না’—এর সুরে অনন্ত জলিল রাতের একাকী রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলেন।
এ সিনেমায় সংলাপ
রাজ্জাক বললেন—তোর জীবনে এমন একজন আসবে, যে তোকে এর চেয়েও দামি গাড়িতে চড়াবে।
বর্ষা—আমার সাথে রিলেশন রাখতে এখন তো তোমার কোনো আপত্তি নাই।
অনন্ত—মেঘলার জীবন থেকে সরে দাঁড়া, নইলে তোর জীবন থেকে তোকে সরিয়ে দেবো।
কাবিলা—মদ হইছে সিরাবন তহুরা...
মিশা সওদাগর—দানবের জীবন যেমন আলাদীনের চেরাগের মধ্যে থাকে, তেমনি অনন্তের জীবন (বন্দি নায়িকার দিকে তাকিয়ে) আমার হাতে।
চিত্রায়ণ ও গ্রাফিক্স
দৃশ্যায়ন অপরিকল্পিত, মানে চলো ওইখানে যাই, না না ওই জায়গাটা দারুণ—এভাবেই চিত্রায়িত। চলচ্চিত্র চিত্রায়ণে পরিচালক ও সিনেমাটোগ্রাফারের মধ্যে বিস্তর আলোচনা এবং ভাববিনিময় হয়; এক্ষেত্রে বোঝাই যাচ্ছে, বেতনভুক সিনেমাটোগ্রাফার প্রযোজক-পরিচালকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন লোকেশনে চিত্রায়ণ করলে কী হয়? তা আদৌ প্রয়োজন কি না, গল্পে বিশ্বাসের জায়গা কতোটুকু। কারণ আমরা দেখেছি, বহু দেশে চিত্রায়িত গানের কী দুর্দশা, তা না সঙ্গীত, না ফ্যাশন শো। গ্রাফিক্স নাকি দারুণ করেছে অনন্ত জলিল, তা আবার বিদেশি মানুষের বানানো। অনন্ত জলিলের পিছনের গাড়িটা যখন শত্রু আক্রান্ত হয়ে নিচের ট্রেন লাইনে পড়ে যায় অথবা দারুণ ইমোশনাল গানে টুডি গ্রাফিক্স দেখা যায়, তা হয়তো গার্মেন্ট ব্যবসায়ী পরিচালকের দারুণ লেগেছে কিন্তু আমাদের তরুণসমাজ কম্পিউটার ব্যবহারকারী হিসেবে এসব গ্রাফিক্সে মুগ্ধ হয় না।
হৃদয় দেখানোর চিত্রায়ণে দারুণ-মুর্খ জলিলের হাতে নিজের হৃৎপিণ্ড তুলে আনার দৃশ্যে জলিল নিজেই দারুণ দ্বিধায় ছিলেন, তাই হয়তো অ্যানিমেশনের সেই হৃৎপিণ্ডে নিজের একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি লেপ্টে দিয়েছেন। পুরো চলচ্চিত্রে গ্রাফিক্স খুবই নিম্নমানের। ভাগ্য ভালো কোথাও—‘আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো’ ধরনের সংলাপ ছিলো না; থাকলে হয়তো আমরা মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার দৃশ্যও অ্যানিমেশনে দেখতে পেতাম। শিল্পমানে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই, ব্যবসাসফল মানেই ভালো শিল্প নির্মাণ হয়েছে তা ভাবা নেহায়েত বোকামি কিংবা দেশের সব মানুষের ভোটে কাক, ময়ূরের থেকে আকর্ষণীয় হবে না।
নাগরিক সমালোচনা
এফডিসির কিছু নির্মাতা শুধুই হাহাকার করেছেন—‘উনি বেশুমার টাকা খরচ করেন, অনন্ত জলিলের ছবির বিপুল বাজেট।’ এই সব মন্তব্যে বোঝা যায়, এফডিসির খুদখাওয়া নির্মাতাদের কী দারুণ দীনতা। কিছু নবীন নির্মাতা শিল্পমানের কথা বলেছেন; তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘উনি প্রযোজক হতে পারেন, ভালো পরিচালককে দিয়ে ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে পারেন।’ আওয়ামী সরকারের অর্থমন্ত্রী এই চলচ্চিত্র দেখতে গিয়েছেন এবং প্রেক্ষাগৃহ থেকে বাইরে এসে বলেছেন, ‘অনন্ত জলিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মান অনেক উপরে সার্থকভাবে তুলেছেন, আমার উপলব্ধি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর্ন্তজাতিক মানের সিনেমা’। আমাদের মন্ত্রীদের সবচেয়ে বড়ো অসুবিধা হলো, যিনি টেলিফোনের মন্ত্রী তিনি কথা বলেন কৃষি নিয়ে আর কৃষিমন্ত্রী কথা বলেন বিমান ও পর্যটন নিয়ে।
মুহিত সাহেব উদ্ভট আর অর্থহীন কথা বলার জন্য খ্যাত, শিল্পমানের বিষয় তার কাছে জানতে হবে—তা জাতির জন্য ভীষণ উৎকণ্ঠার। কিছু যুবক-যুবতি স্মার্ট হয়ে উঠতে অনন্তকে ক্রমাগত বিদ্রূপ করছেন। টিভি চ্যানেলের উপস্থাপকের হাতে অনন্ত নাস্তানাবুদ হচ্ছেন। এই কিছুদিন আগে মফস্বল থেকে আসা ছেলে-মেয়ে রাজধানী উপভোগের তুলকালাম কাণ্ডে অনন্তর উচ্চারণ নিয়ে গণমশকরা করছেন। যুব সমাজে স্যাডিস্টদের মাত্রা ভয়ানক হয়ে গেছে তা এই চলচ্চিত্র মুক্তির পর বোঝা গেলো; তিন সপ্তাহ বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে উপচেপড়া অনন্তর চলচ্চিত্র দেখতে আসা ইয়ো ইয়ো স্মার্টরা স্যাডিস্ট ছাড়া অন্যকিছু নয়। এরা কোনো সংলাপ শোনে না, শুধু অনন্তকে পর্দায় দেখামাত্র চিৎকার-তামাশা করতে থাকে।
বোধোদয়
স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ছিলেন স্কটিশ চিকিৎসক ও বিখ্যাত গোয়েন্দাকাহিনী রচয়িতা। তার একটা কথা বলা খুবই জরুরি মনে করছি, ‘নিচু লোকেরা তাদের চেয়ে সেরা কিছুই জানে না, অন্যদিকে মেধাবীরা সহজেই প্রতিভাধরদের চিনতে পারে।’ সুতরাং সাবধান করে দিচ্ছি—নিচুলোকের দল থেকে বাইরে চলে আসুন। অনন্ত জলিলকে আমরা কেনো প্রশ্রয় দেবো? গ্রামীণফোন এই মেগাস্টারকে অ্যাম্বাসেডর বানাবে, উপরে তুলবে, তারপর আবার আরেকজন নিয়ে হৈচৈ করবে খুবই স্বাভাবিক—এটাই বেনিয়াদের কাজ। আজ আপনার এই বিকৃত উচ্চারণে—‘ইঠ ইজ শো ফানি’ বলে একটু হাসি—অনন্ত জলিলকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে, জলিলের চলচ্চিত্র লাভের মুখ দেখছে। বন্ধ করুন এই সব, আপনার এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, আপনার আর্টিফিশিয়াল অহমবোধ পরের প্রজন্মকে দিশেহারা করবে। শিল্প আর উন্মাদনা এক নয়। আমি এ দেশের চলচ্চিত্রে একজন আশাবাদী মানুষ। আমি প্রতিদিন নবীনদের এ জগতে ঢুকতে দেখি; আমি দেখি আশার আলো। ‘চ্যানেল আই’-এর বুটিক-সিনেমা নির্মাতা দল অথবা বেঙ্গলের নবীন ১০ নির্মাতা নিশ্চয় ভালো কিছু করবেন; তারপর আছে প্রতিদিন স্বপ্নদেখা মানুষের দল শাহবাগ বা মগবাজারে। তাই জলিলদের বর্জন করুন, গ্রহণ করবার মতো অপরূপ কিছু সামনেই আছে।
লেখক : সেলিম আহমেদ, স্নাতক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে ভাস্কর্যে। দীর্ঘসময় হস্তশিল্প, ফ্যাশন ও গ্রাফিক্সের সঙ্গে তার বসবাস। বর্তমানে তৈরি হচ্ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন