Magic Lanthon

               

অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত, দীপঙ্কর দে ও মৃণাল সেন

প্রকাশিত ১০ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘অনেক সমকালীন পরিচালক রয়েছে, তবে ঋতু হচ্ছে আধুনিক পরিচালক’

অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত, দীপঙ্কর দে ও মৃণাল সেন

ঋতু ছিলেন, আমাদের মাঝে থাকবেনও; অসম্ভব মেধাবী, সাহসী এই মানুষটিকে স্মরণ না করে আমাদের কোনো উপায়ও থাকবে না। ঋতুপর্ণের মৃত্যুদিনে (৩০ মে ২০১৩) মনে রেখ শিরোনামে ভারতের স্যাটেলাইট চ্যানেল স্টার আনন্দ একটি স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সুমনের সঞ্চালনায় ঋতুর অত্যন্ত কাছের চারজন মানুষ অপর্ণা সেন, দীপঙ্কর দে, অঞ্জন দত্ত ও মৃণাল সেন তাকে নিয়ে বেশকিছু অজানা কথা বলেছেন। দৃশ্যমাধ্যমের সীমাবদ্ধতায় মনে রেখ অনুষ্ঠানে ঋতুর যে নির্মাণ তা দীর্ঘসময় নানাভাবে তার ভক্তদের মধ্যে ধারণ করা একটু কঠিনই। তাই ইউটিউব থেকে অনুষ্ঠানের ভিডিওটি সংগ্রহের পর তা ট্রান্সক্রিপ্ট করে আগ্রহী পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। অনেকে বলতে পারেন, ভিডিও তো আছেই তাহলে লিখিত রূপ কেনো? সেই দায়টুকু কাঁধে নিয়ে বলছি, আমরা লিখিত টেক্সটের একটি বাস্তবতা তৈরি করতে চেয়েছি মাত্র। তবে কেউ চাইলে ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন http://www.youtube.com/watch?v=DxwzmAyCEHI এই ঠিকানায়। [সম্পাদক]

সুমন : আমার এক ঈশ্বর বিশ্বাসী বন্ধু আজ বলছিলেন যে, যদি প্রতিপক্ষ কাউকে ভাবতে হয় তাহলে বোধ হয় মাঝে মাঝে ঈশ্বরকে প্রতিপক্ষ মনে হয়। তার কারণ ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো মানুষ, সৃষ্টিশীল মানুষতাকে এইভাবে বিনা নোটিশে আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলোএভাবেই অভিমান করছিলেন ঈশ্বরের কাছে সেই বন্ধু। এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে এই অনুষ্ঠানে আছেন রিনা দি মানে অপর্ণা সেন, টিটো দা মানে দিপঙ্কর দে এবং অঞ্জন দা। এবং এই অনুষ্ঠানে মৃণাল সেনও সরাসরি যোগ দেবেন তার বাসা থেকে।

আমি রিনা দি তোমাকে দিয়েই শুরু করবো, বোধ হয় দীর্ঘশ্বাস এমনি স্বতস্ফূর্তভাবেই বেরিয়ে আসছে, শুধু ইন্ডাস্ট্রি নয় যারা ছবির দর্শক তাদের কাছ থেকেও। ঋতু দার সঙ্গে তোমার তো অনেক দিনের পরিচয়, কোথাও কি তোমার মনে হয়েছে তোমার একটা অল্টার ইগো ঋতু দার মধ্যেও আছে? ঋতু দা বারবার তোমার মতো একটা কোথাও আইকনিক ব্যাপার অনুভব করতো। অনেক সময় আমাদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এটা সে বলতোএইটা কীভাবে, মানে এটা কবে থেকে, কতোদিন ধরে?

অপর্ণা সেন : রিংকু আমার কাছে, ঋতুকে আমি রিংকু বলে ডাকতাম। রিংকু আমার কাছে প্রথম আসে আমাদের বন্ধু রাম রায়, তার রেসপন্সিবল নামে একটা অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি ছিলো, সেখানে তখন রিংকু খুব ছেলেমানুষ একজন কর্মী। রাম একদিন ফোন করে আমাকে বললো, শোন্ তোর কাছে একটি ছেলেকে পাঠাবো ভালো লেখে, একটা স্ক্রিপ্ট লিখেছে দেখিস তো; তো এলো, কোঁকড়া চুল, তখন ও জিন্স আর টি-শার্ট পরতো। কোঁকড়া চুল, বড়ো বড়ো চশমা, জ্বলজ্বলে চোখ চশমার পিছনে, আমাকে বলছিলো, আপনি একটু শুনবেন আমার এই চিত্রনাট্য রাধা কৃষ্ণ সম্বন্ধে। সেই প্রথম ওর লেখা পড়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম এই ছেলে অনেক দূর যাবে। ওর সঙ্গে আমার একটা অকপট সম্পর্ক ছিলো। আমি বলতে পারতাম এটা আমার ভালো লাগেনি, এটা প্রায়ই বলতাম। আমি বোধ হয় একমাত্র যে ওকে বকতাম, শাসন করতাম। আমি সত্যিকারের মানে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সত্যিই ওর দিদি ছিলাম, ওর মা আমাকে মেয়ে বলতেন। ওর মা আমার থেকে অতো কিছু বড়ো নন; বড়োতো বটেই ধরো বছর দশেকের বড়ো হবে। কিন্তু উনি আমাকে মেয়ে বলতেন, কল্যাণকে জামাই বলতেন, আর ও আমাদের দিদি জামাইবাবু বলতো।

সুমন : সেই আপনি থেকে তুই-এ নামাটা কবে? উনিশে এপ্রিল-এর আগেই?

অপর্ণা : লেখাটা পড়ে আমি বললাম যে, তুমি আমার সঙ্গে লিখবে? ও বললো, হ্যাঁ। তো লেখা আর হতো না, আসতো খালি গল্পই হতো আড্ডাই হতো, আমার সঙ্গে বহু জায়গায় যেতো। তখন মৃণাল কাকারঅঞ্জন মনে আছে মহাপৃথিবী হচ্ছে, তো মহাপৃথিবীর শুটিংয়ে চলে এলো আমার সঙ্গে। তো একটা স্টেজে আমি ওকে তুই বলতে আরম্ভ করেছিলাম। তখন ও আমাকে তুমি বললো। তার অল্প দিনের মধ্যে তুই, রিনা দি তুই, শেষ অবধি সেই রিনা দি তুই-ই ছিলো। কী বলবো আমি বুঝতে পারছি না, কারণ ওর সঙ্গে যে সম্পর্কটা ছিলো সেটা সত্যিকারের একটা...। একটা সময় এমনও হয়েছে, আমার কল্যাণকে বিয়ে করার আগে যখন আমি ওকে বলেছি যে, একটা সময় তোর বাবা-মাও চলে যাবেন, আমার বাবা-মাও চলে যাবেনতখন আমরা একসঙ্গে থাকবো ভাই-বোনে কেমন (!) এবং আমরা ভাবতাম সেটা করবো। ওর চিত্রনাট্য আমি যখন পড়েছি প্রথম, বিশেষ করে উনিশে এপ্রিল, আমায় বললোএটা তুই শোনতো, আমাকে অনেকেই বলেছে এটা নাকি অটাম সোনাটার (Autumn Sonata, ১৯৭৮ সালে ইঙ্গমার বার্গম্যান নির্মিত) মতন। তো আমি শুনলাম, বললাম তুই অটাম সোনাটা দেখেছিস? বললো, না। আমি বললাম আছে, অটাম সোনাটার ছায়া আছে। তুই না দেখে থাকলে ইটস অ্যা গ্রেট ম্যান থিঙ্কস অ্যালাইক। তো ওর যে একটা এক্সপ্লোরেশন অব দ্য রিলেশনশিপ মা-মেয়ের মধ্যে... তারপর আমরা সেই স্ক্রিপ্টটা নিয়ে আলোচনা করেছি। সমস্তক্ষণ আলোচনা করতাম।

সেই স্ক্রিপ্ট নিয়ে আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি যে, এটা করুন। তাই আমি বলছিলাম একদিন যে, যারা পরে ঋতুপর্ণের ছবি করতে চেয়েছিলো, আমার মনে হয় তারা স্ক্রিপ্টটা শুনে তখন বুঝতে পারেনি কতোটা প্রতিভা আছে ওর! তো যাই হোক আমরা তখন মানে আমি, রেনু আর ঋতু তিনজনে মিলে স্পন্দন ফিল্মস বলে একটা কোম্পানি ফর্ম করে আমরা করলাম আমাদের প্রথম ছবি স্পন্দন ফিল্মস-এর। ওটা তো আমারই ছবি মনে হতো আমার, ওর-ও আমার ছবিকে ওর ছবি মনে হতো; আমারও ওর ছবিকে আমার ছবি মনে হতো। ও বলতো, এই শোন্ তুই সাজিয়ে দেনা ওই বেডরুমটা বা আমি বলতাম রিংকু এই ডায়লগটা লেখনা আমার স্ক্রিপ্টে। ওরকম ধরনের অদ্ভুত সিমবায়োটিক একটা সম্পর্ক ছিলো (দীর্ঘশ্বাস দিয়ে একটু থেমে) অনেকদিন পর্যন্ত। তারপর দুজনই কাজে ব্যস্ত, ছিলো টানটা শেষ অব্দি ছিলো।

সুমন : কিন্তু এই যে অনেকেই থাকেন, অত্যন্ত প্রতিভাবান কিন্তু সমালোচনায় স্পর্শকাতর, সেইটা তুমি বলছিলে যে...

অপর্ণা : কী না বলেছি ওকে আমি; প্রথম রাধা-কৃষ্ণ শুনে বললাম, হ্যাঁ খুব সুন্দর কিন্তু বেশি মিষ্টি। চোখের বালি দেখে বলেছিলাম, হ্যাঁ খুব ভালো হয়েছে, তুই অনেক যত্ন করেছিস, কিন্তু তুই আলপনা দিচ্ছিস কেনো; তুই আর একটু গভীরে যা। ও (ঋতু) বললো, ঠিক বলেছিস রে, তারপর সবাইকে গিয়ে বলে বেড়ালো রিনা দি বলেছে, আমি আলপনা দিয়েছি। আমি বলেছি, তুই ডেকোরেটিভ কেনো এতো? তারপরে চিত্রাঙ্গদা দেখে আমার এতো ভালো লেগেছিলো, ও যেনো একটা কোথায় কোন্ গভীরে চলে গিয়েছিলো ছেলেটা। আরো অনেক কিছু করতো কিন্তু ও, আরো অনেক কিছু করতো। চিত্রাঙ্গদায় ঋতু যেখানে পৌঁছেছিলো, তারপর ওর এভাবে চলে যাওয়াটা ঠিক নয়, ভেরি আনফেয়ার।

সুমন : (অঞ্জনকে লক্ষ্য করে) দুজন সফল চিত্রপরিচালকের মধ্যে একটা পেশাগত ঈর্ষা, একটা কোথাও আন্ডারকারেন্ট থাকবে এটাইতো স্বাভাবিক; আমি কালকে খুব মন দিয়ে তোমাদের স্টুডিও শোগুলো দেখছিলাম চিত্রাঙ্গদার আগে এবং পরের। এক্কেবারে দুজন দুজনার পরিপূরক এই রকম একটা ব্যাপার চলে আসে, সেটা শুধু পরিচালক, অভিনেতা বা সহ-অভিনেতার সম্পর্ক নয়। কোথাও একটা বন্ধুত্ব, পরস্পরের একটা বন্ডিং একটা হাত ধরাধরি; এইটা কী করে সম্ভব? যেখানে হয়তো পরের ছবিটাই দুজনে করবে, দুজনের রিলিজ ডেট খুব কাছাকাছি হবে, এবং একটা কম্পিটিশন চলে আসাটাই হয়তো স্বাভাবিক।

অঞ্জন : সেটা সাম হাউ আমাদের মধ্যে হয়নি। যেটা রিনা দি একটু আগে বলছিলো যে, আমিও খুব সহজভাবে ওকে অনেক কিছু বলেছি। ও আমার ছবি সম্পর্কে খুবই ক্রিটিকাল। ওর প্রথম ছবিকে আমি খুব ভালো বলেছিলাম। ও আমার প্রথম ছবিকে খুব খারাপ বলেছিলো। সত্যিই তো আমার প্রথম ছবিটা খুব খারাপ হয়েছিলো। আমাদের এমনই যোগাযোগ ছিলো, ও রেসপন্স-এ ঢুকলো আমি হিন্দুস্থান টমসন অ্যাডভার্টাইজিং ছেড়ে দিচ্ছিএ রকম একটা সময়ে আমি শুনছি অ্যাজ দিস অ্যাজ দিস একটা ছেলে স্মার্ট, ইন্টারেস্টিং লেখে, খুব ভালো বাংলা লেখে কপিরাইটারআমাকে ধৃতিমান বললো। সেটা আর একটু কাছে এলো রিনা দিযুগান্ত ছবিটা করতে গিয়ে। ও ঘুরঘুর করতো ওখানে। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি ঋতু কী করছে; ঋতু কি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর, কি আর্ট ডিরেক্টর?

অপর্ণা : একটু ইন্টারপ্ট করছি, একদিন কী বললো বলতো। শট্ চলছে, ও হঠাৎ বললো, কাটো। (হেসে) আমি বললাম তুই কাটো বলার কে রে? তুই কাটো বললি কেনো? ও হ্যাঁ হ্যাঁ, সরি সরি, আমি ভাবলাম তুই ভুলে গেছিস। এটা এখনও মনে আছে আমার। 

অঞ্জন : ও ওইখানে ইনভল্ব হয়ে থাকতো এবং সেইখানে আমার খানিকটা চেনা পরিচিত হলো। আমি ইউজুয়ালি শুটিংয়ে একা থাকতে চাই। ওই রকম একটা রোল, না মানে যেকোনো রোলে; তো রিনা দি বললো না, তোর ঘরে ঋতু থাকবে। আমি বললাম ঠিক আছে, ঋতু ক্যান জয়েন মি। তো যাই হোক সেই ভাবে একটা যোগাযোগ হয়। এবং একটা ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, বন্ধুত্ব হয়েছে। কিন্তু যেটা ভেরি অনেস্টলি আমার বলা উচিত আজকে, তিন বছর আগে আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন বন্ধু দার্জিলিংয়ের, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলা যায়পুরেন। ওর একটা ১০/১১ ঘণ্টার ওপেনহার্ট সার্জারি হয় এবং ওকে কিছুতেই দার্জিলিংয়ে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিলো না আর কি। কলকাতায় ওকে এখন তিন-চার মাস থাকতে হবে। কোথায় থাকবে, তখন ঋতু কোনো কথা না ভেবে ওর জোদপুর ফ্ল্যাটের বাড়ির চাবিটা আমাকে দিয়ে দিয়েছিলো; অ্যান্ড ফ্রম দ্যাট ডে হি বিক্যাম অ্যা এক্সট্রিমলি ক্লোজ পার্সন টু মি। এবং একটা অসম্ভব যোগাযোগ হতে আরম্ভ হলো তারপর। এবং তার ঠিক আগে আগে ও প্রথম ওপেন করলো নিজেকে, তার সেক্সুয়াল জায়গাটা।

আরেকটি প্রেমের গল্প করলো যেটা আমার খুব ভালো লেগেছিলো; তারপর মেমোরিজ ইন মার্চ, তারপরে এই চিত্রাঙ্গদা। এবং এই চিত্রাঙ্গদা করার সময় অনেক কথাবার্তা, একসঙ্গে থাকা, অনেক রাত্রি অবধি। ঋতু মদ্যপান করেনি কখনো, আমি করতাম; এই যে ইস্যুটা, এই যে ওর এই ইস্যুটা, ট্রান্সসেক্সুয়ালিটি এবং গে এই ইস্যুটাকে যে ও অ্যাড্রেস করলো, আমার মনে হয় অসম্ভব বড়ো একটা ঘটনা আমাদের কালচারাল জগতে ভারতবর্ষে। এবং বিশেষ করে আমাদের শহরে এবং পশ্চিমবঙ্গে যেখানে এখনো অধিকাংশ মানুষ মনে করে সমকামী, ট্রান্সসেক্সুয়াল একটা ডিজিজ একটা রোগ; এবং তার মানসিক চিকিৎসা করালে সে ঠিক হয়ে যায়। এটা কমপ্লিটলি একটা মিথ্যা কথা।

সুমন : এটা তোমার কি কখনো মনে হয়, এইটাই ইটসেল্ফ একটা মুভমেন্টের সূচনা করেছিলো?

অঞ্জন : মুভমেন্ট, মুভমেন্ট আমি বলবো না হয়তো সেভাবে, কিন্তু একটা সিনেমার মাধ্যমে এটা কেউ যখন একটা জায়গা দেয়, তখন অজস্র বাবা-মা বুঝতে পারে। এটা খুব ইম্পোর্টেন্ট, বাবা-মা ছাড়া তারা কার কাছে গিয়ে এটা বলবে...

সুমন : অনেকটা সোশ্যাল আই ওপেনার হয়ে যায়।

অঞ্জন : আজকে যদি আমি, সাপোজ আই অ্যাম অ্যা গে অর আই অ্যাম অ্যা ট্রান্সসেক্সুয়াল; আমি কাকে গিয়ে প্রথমে বলবো। আমার তো বাবা-মার কাছে গিয়ে বলতে হবে। আমি জানি না সে এই মুভমেন্টকে কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছে কি না, তবে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ কিন্তু অ্যাট লিস্ট বুঝতে পেরেছে এটা রোগ নয়, এটা একটা স্বাভাবিক জিনিস। এ রকম মানুষ হয় এবং তারা মার্জিনালাইজড হবার কোনো কারণ নেই। এইটা সিনেমা থ্রু দিয়ে এসছেতো, এটা আমার কাছে খুব বড়ো একটা ঘটনা।

অপর্ণা : আমি একটুখানি বলছি, হি ওয়াজ টু গুড অ্যা ফিল্মমেকার টু মেক জাস্ট অ্যা ম্যাসেজ (অঞ্জন দত্ত একই সময় বলতে চেষ্টা করছিলেন যে, তিনিও ঠিক এটাই বলতে চান) শুধু একটা ম্যাসেজ দেওয়ার জন্য ঋতু ওয়াজ টু গুড অ্যা ফিল্মমেকার ফর দ্যাট, ওর একদম একটা মানে ইন্ডিভিজ্যুয়াল মানে, ইন্ডিভিজ্যুয়াল আর এই মুভমেন্টটা মিলেমিশে গেছে। সেটাই একটা অত্যন্ত সাহসের পরিচয়।

অঞ্জন : হ্যাঁ, আমি তো সেভাবে দেখি না, বারবার যখন ডিসকাসন হতো এই ছবিটা নিয়েএকটা আইডেন্টিটি, একটা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এটা। এটা তুই বোঝার চেষ্টা কর, এটা কিন্তু একটা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। তার জন্য একটা নেসেসারিলি সেক্সুয়ালিটি থাকতে হবে। এই নিয়ে অনেক তর্ক হয়েছে। কিন্তু এখন আমি ভাবি এই ছবিগুলো যদি ও না করতো, অভিনয় না করতো, তাহলে হয়তো এই ছবিগুলো হতো না। এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালিরা অনেক কিছু জানতো না, বুঝতে পারতো না। সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

সুমন : টিটো দা একটা জিনিস কী মনে হয়, আমার অবশ্য ছবিটা দেখতে দেখতে বারবার মনে হয়েছে যে, আবহমান-এ যে বাবা-ছেলের সম্পর্ক, তোমার চরিত্রটা এবং যীশুর চরিত্রটা কোথাও ঋতু দা একটা নিজে ছেলে এবং বাবার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা, যে মিস করা বাবা চলে যাবার পর, যার প্রতিফলন ফার্স্ট পার্সন-এ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বারবার পড়েছে দিনের পর দিন, সেটা কোথাও নিজের স্ক্রিপ্টে কোথাও রিফ্লেক্টেড হয়েছে বা তোমায় যখন চরিত্রটা বুঝিয়েছে কোথাও কি সেটা এসে গিয়েছিলো নিজের বাবার একটা ছায়া?

দীপঙ্কর দে : অ্যা... না। আমাকে যখন চিত্রনাট্যটা শোনালো, তখন আমার কোনো একজন বিশ্ববিখ্যাত পরিচালকের কথা মাথায় এসেছিলো। আমি ঋতুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা কি তার কোনো ছায়া বা আমাকে কি সেই রোল মডেলটা ফলো করতে হবে? ও বললো, টিটো দা আমি কিন্তু সজ্ঞানে সেটা করিনি, এসে গেছে হয়তো। আমি কাউকে ছোটো করবার জন্য এই চরিত্রটা করিনি, কাউকে বড়ো করবার জন্যও করিনি; লিখতে লিখতে এটা এসেছে। এই চরিত্রে যেরম যেরম বিহেভ করা দরকার আমি তোমার ওপর ছেড়ে দিলাম, তুমি করো। সেটা তো মুখে বললো, কিন্তু প্রতিটি পদে, প্রতিটি শটে আমাকে ও একদম, যাকে বলে ক্লাস ওয়ানের ছাত্রের মতো ধরে ধরে, ধরে-ধরেএই জায়গাটা এইটুকু করো, এই জায়গাটা আরেকটু বাড়িয়ে দাও, এই জায়গাটা কমাও, কথা বলো না, আঙুলের একটা ম্যানারিজম রাখো; সঙ্গীতের তাল তোমার মাথায় ঘোরে, কথা বলতে বলতে আঙুলে সেই রিদমটা রাখবে। ছোটো-খাটো, ইউ নো এই যে অলঙ্করণগুলো, যেগুলো কিন্তু খুব প্রকট নয়, নিখুঁত ডিটেইলিং। আমি তো ব্যক্তিগতভাবে খুব এনজয় করেছিলাম চরিত্রটা অভিনয় করতে গিয়ে। তবে বাবা-ছেলের যে সম্পর্কের কথা তুমি বলছো সেটাই তো ছবির অন্তর্নিহিত ব্যাপার।

সুমন : আমাদের সঙ্গে এই আলোচনায় যোগ (বাসা থেকে) দিয়েছেন মৃণাল সেন। মৃণাল বাবু প্রথম প্রশ্ন আপনার কাছে থাকবে, ঠিক প্রশ্ন বলবো না, এটা স্মৃতিচারণার একটা অংশ যে আপনারই একটা লেখায় পড়ছিলামএই প্রজন্মের পরিচালক মানেই আপনার কাছে ঋতুপর্ণ ঘোষ। অ্যাজ অ্যা ফিল্মমেকার, আপনার উত্তরসূরিকে ফিল্মমেকার হিসেবে আপনি ঠিক কীভাবে দেখেন?

মৃণাল সেন : ঋতুপর্ণকে কবে দেখেছি? আমি ওকে দেখেছি ও প্রথম যখন ছবি করে তখনই। আজ আমার বয়স ৯১ বছর, ১৪ মেতে আমি ৯১ বছরে পড়েছি। আর ঋতু এখন ৪৯ বছর, ৩০শে মে। সেই সময় আমি যখন তার অবস্থা দেখি, টিভিতে যখন শুনি ঋতুপর্ণ নেই, তখন আমি অবাক হয়ে যাই; তখন আমি একেবারে ভেঙে পড়ি। তারপর ওকে যখন আমি দেখতে গেলাম, আমি আমার এই ভাঙা শরীরে ৯১ বছরে, সেখানে দেখি ঋতুপর্ণ শুয়ে আছে। ঋতুকে কখনো এই শুয়ে থাকতে আমি দেখিনি। ওকে আমি দেখেছি ছবি করতে। ওর প্রথম ছবি আমাকে চমকে দিয়েছিলো। সেই প্রথম ছবির নাম হচ্ছে হীরের আংটি, তাতেই আমি চমকে গিয়েছিলাম। এতোটুকু ছেলে কীভাবে করলো, কিন্তু দাপিয়ে ছবি করে গেলো।

ও এই সিনেমার আঙ্গিকটাকে পুরোপুরি রপ্ত করেছিলো তখন। তখন থেকেই সে চলেছে; তারপর দেখলাম ওর দ্বিতীয় ছবি। ছবিটার নাম হচ্ছে, (সঞ্চালক বললেন, উনিশে এপ্রিল) কী নাম (সঞ্চালক আবার বললেন, উনিশে এপ্রিল), যাই হোক সেই ছবি যখন দেখলাম তখন আমি অবাক হয়ে গেলাম। এ যেনো আমার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে ও, তার মানে নিজেকে ভাঙছে নিজেকে গড়ছে। সমস্ত কিছু আইন-কানুন ভেঙে চলছে এগিয়েই। সিনেমার ধর্মই তাই, সিনেমা টেকনোলজির ওপর নির্ভর করে, প্রযুক্তিবিদ্যার ওপর নির্ভর করে। প্রযুক্তিবিদ্যা পাল্টায়, জীবনও পাল্টায়, সময়ও পাল্টায়; সেই ভাবেই সমস্ত ভাষাটাও পাল্টে যায় সিনেমার। সেইভাবেই সেটাকে ও করে নিয়েছে এবং ভুল করার অধিকারটাও সে রপ্ত করেছে। এই সব দিয়েই ঋতুপর্ণ আমার কাছে মহৎ হয়ে ওঠে। এবং সে সত্যিই বড়ো মহৎ পরিচালক। সে শুধু চিত্রপরিচালকই নয়, সে পাঠক হিসেবে তার পরিচয় যা পেয়েছি অনবদ্য। সমস্ত মিলিয়ে এমন একটা জায়গায় ও পৌঁছে গিয়েছিলো আমি ভাবিনি ও কখনো থামবে, ও এগিয়েই চলবে এগিয়েই চলবে। সেই মানুষ কীভাবে এই ৪৯ বছর বয়সে, এই বয়সে চলে গেলোআশ্চর্য। আমরা সবাই মর্মাহত।

কখনো ভাবতে পারিনি ঋতুপর্ণ এই ভাবে যাবে। ঋতুপর্ণ অনেক অনেক ছবি করবে এটাই ভেবেছিলাম। যে সম্পর্কটাকে জানে, যে মানবিক সম্পর্কের জটিলতাটাকে ধরতে পারে, তাকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে দেখতে পারেএই রকম হচ্ছে মানুষসেই মানুষটি আজ নেই, এ ভাবা যায় না। ওকে নিয়ে আর নতুন করে আমার কিছু বলবার নেই, শুধু বলবো ও কেনো চলে গেলো? চলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই, একেবারেই নেই, ছিলো না। সে মানুষটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই মারা গেলো। আমি যখন দেখলাম, আমি দেখলাম ঘুমিয়ে আছে; একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেছে যেনো, হয়তো ইন্টার্নাল হেমারেজ হয়ে এমনটি হয়েছে, শুনেছি ডাক্তারদের কাছে। এইভাবে একটা মানুষের চলে যাওয়া এটা একেবারে আমার কাছে আশ্চর্য। মানে এতো বড়ো অঘটন যে ঘটতে পারে আমার জীবনে, এটা আমি জানি না।

ঋতুপর্ণ চলে গেলো কিন্তু আমি চলে গেলাম না। আমারই চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু আমি যাইনি। এখন ঋতুপর্ণের কথা ভাবছি বলছি শুনতে চাইছি আপনাদের কথা। এটা হওয়ার কথা নয়, ঋতুপর্ণ চলবে দাপিয়ে দাপিয়ে, চলবে লাফিয়ে লাফিয়ে। ঋতুপর্ণ একের পর এক ছবি করে যাবে, নিত্য নতুন চিন্তা-ভাবনায় জড়িয়ে পড়বে; এটাই ঋতুপর্ণ করেছে সারাটা জীবন। যতোটা ছবি করেছে সবটাতেই আমি তাই দেখেছি।

এই হোমোসেক্সুয়ালিটির কথা, ট্রান্সসেক্সুয়ালিটির কথা বলা হলো, এই হেটারোসেক্সুয়াল প্রশ্নগুলো উঠলো সেগুলোর সঙ্গে আমি নিজেকে জড়াতে পারি না, কিন্তু ওর ব্যাপারটা আমি বুঝি, কীভাবে আঁকড়ে ধরে ছিলো সমস্ত ব্যাপারটাকে। এই ভাবে অঞ্জনের সঙ্গে ঋতুপর্ণের যে ইয়ে হলো, আজকেই পড়ছিলাম অঞ্জনের একটা লেখা টেলিগ্রাফ-এ। সেটা শুনে যখন ভাবি, সত্যি কতো মহৎ প্রাণের লোক ছিলো, বিরাট মাপের লোক ছিলো। সেই মানুষটি আজ নেই, এ ভাবা যায় না।  

সুমন : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, অনেক ধন্যবাদ। রিনা দি, ঋতুর সৃষ্টিগুলো তো রয়ে গেলো। ফিল্মমেকার হিসেবে ঋতু দার ফিল্মে তোমার নিজের কাজ, তোমার ব্যক্তিত্বমানুষ হিসেবে ঋতু দা নিজেই বলতো আমাদেরও বহুবার বলেছে একটা ছায়া তোমার পড়েছে। ফিল্মে কখনো ফিল্মমেকার হিসেবে, ফিল্মমেকার অপর্ণা সেনের ছায়া কখনো পড়েছে; মনে হয়েছে তোমার কখনো যে, তুমিও ঠিক এইভাবেই ভাবতে এই দৃশ্যটা, দৃশ্যকল্পটা এইভাবেই সেলুলয়েডে তুলে ধরতে?

অপর্ণা : সত্যজিৎ রায়ের ছায়া ডেফিনেটলি ওর ওপর পড়েছে। সত্যজিৎ রায়ের ছায়া আমাদের সকলের ওপরই পড়েছে। যেভাবে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের বাবা-মায়েদের গুণাগুণ, তাদের ডায়াবেটিক্স, তাদের ব্লাডপ্রেসার, ব্লাডসুগার পাই। আমি আর ঋতু বলতাম যে, সেই ভাবেই আমরা মানিক কাকাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথকে আমরা সবাই, আমরা সবাই যারা বসে আছি, উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমাদের দুজনের আঙ্গিকের দিক থেকে ভাবনার দিক থেকে একটা মিল ছিলো। আমার মনে হয় না যে, আমি ঋতুপর্ণকে আলাদা করে প্রভাবিত করেছি। কিন্তু হয়তো ওর নন্দনবোধ, খুব একটা ইম্প্রেসনেবল বয়সে ও আমার সংস্পর্শে এসেছে, ও নিজে বলতো, আমি অতোটা বুঝি না, ও নিজে বলতো তোর একটা বিশাল রকমের প্রভাব আমার ওপর পড়েছে রিনা দি।

সাজানো মানে ঘর সাজাতে ভালোবাসি আমি; ও সব কিছু প্রথম দিকে আমার বাড়ি থেকে নিতোটেবিলল্যাম্প, রিনা দি এটা দেনারে। তারপরে ও দেখলো যে একটা ছবিতে হয়তো রিনা দির বাতি ধার নিলাম বা ওমুক নিলাম, তমুক নিলাম, কুশোন নিলাম; সব ছবিতে তো হবে না, আর ও ঘন ঘন ছবি করতো। ও আমাকে কতো বকেছে, তুই এতো গেঁতো কেনোরে, ঘন ঘন ছবি কর। তারপর ও কালেক্ট করতে আরম্ভ করলো। সে কী কালেকশন! আমি সেদিন ওর বাড়িতে গিয়ে দেখছিলাম (সঞ্চালক-একটা ঘরে তো তোমার একটা প্রমাণ সাইজ ছবি আছে), আমার আছে শর্মিলার আছে অনেকেরই আছে। সেদিন আমাকে কেউ একজন বলছিলো, তোমাদের পরের প্রজন্মের, আমার কখনো ঋতুকে আমার পরের প্রজন্মের মনে হয় না। কারণ মানসিকতার দিক থেকে আমি একটা প্রচণ্ড আত্মীয়তা বোধ করতাম ঋতুর সঙ্গে। ঋতুও বোধ করতো আমার সঙ্গে যে, আমাদের ছবি করার ধরনটা একরকম। আমাদের ভাবনার ধরনটা একরকম। সেখানে সেইটা হয়তো তোমাদের মনে হয়েছে যে প্রভাব, আমার মনে হয়েছে ভীষণ একটা আত্মীয়তা, মনের দিক থেকে একটা আত্মীয়তা।

সুমন : ঋতু দা যে পাগড়িটা ব্যবহার করতো সেখানেও কি তোমার একটা টাচ ছিলো মানে...

অপর্ণা : সে তো পাগলা ছিলো ছেলেটা একদম। হয়তো সেজেগুজে এসে বললো, বলতো আমাকে রিনা দির মতো দেখাচ্ছে? (হেসে) তারপরে ওই সব ওর নায়িকারা আমাকে বলেছে, ও বলতো এরম ভাবে সাজবি, ওইভাবে সাজবিফাইনালি একজন বলেছে, রিনা দি সাজতে হবে তো? ও বলেছে, হ্যাঁ। কোথাও একটা কী একটা কানেক্ট ছিলো আমাদের, বহুদিন পর্যন্ত একটা, কী করে বোঝাবো। সত্যিকারের ভাই-বোন যেরম করে একটা কানেক্টেড হয়ে যায় না, তাদের রাগ অভিমান ঝগড়াঝাঁটি সবকিছু হয়, কিন্তু সম্পর্কটা তো ডিনাই করা যায় না। সেটা আমাদের মধ্যে ছিলো ডেফিনেটলি এবং ওর বাবা যখন মারা গেলেন, আমি যখন গেলাম তখন সে বললো, তুই অন্তত আছিস। মাও তো চলে গিয়েছিলেন। সেই ব্যাপারটা ছিলো।

তবে ঋতুর ছবিতে আমার ছায়া কতোটা পড়েছে আমি বুঝতে পারি না, তবে মানিক কাকার ছায়া ডেফিনেটলি পড়তো। ইনফ্যাক্ট আমি ওকে সবসময় বলতাম, তুই ভিতরে গ্রহণ কর বাইরের দিক থেকে ইয়ে করিস না, নকল করিস না। এবং ও সেটা বুঝতো, ও কিন্তু আমাকে বুঝতো। আমার ছবি নিয়ে ও কতো ক্রিটিসিজম করেছে। আমাদের এইটা একটা অদ্ভুত ছিলো পরস্পরের ছবি সম্বন্ধে আমরা কিন্তু, আমি ওকে বলতাম, দেখ ভালো কথা বলার অনেকেই আছে; দেখ তুই আমাকে বলতো কোথায় কোথায় গণ্ডগোল ছিলো। ও বলতো শোন, রিনা দি এই জিনিসটা এভাবে না করে এটা করলে পারতিস। এরম অনেকবার বলেছে, জাপানিজ ওয়াইফ-এর একটা সিন রাহুলের, বললো যে, হোয়াই ডিড ইউ প্লেড ফর কমেডি? ওটাতে এমনিতেই হাসি আছে, ওটার মধ্যে এমনিতেই একটা ইনহিরেন্ট হিউমার আছে। তুই কেনো ওটাকে কমেডি করতে গেলি, কেনো? আমি বললামহ্যাঁ ঠিক বলেছিস রে, ইস্ কেনো করলাম, আমারও...। ঠিক তেমনি আমি ওকে যেমন বলেছি, ঠিক তেমনি ও বলেছে, ইস্ আর একটু আগে বলতে পারলি নাএই রকম একটা সম্পর্ক ছিলো আমাদের। আমি প্রভাবিত মানে ওই, মানুষ হিসেবে আমার রুচি, আমার নন্দনবোধ কিছুটা ওকে প্রভাবিত করেছিলো, যেভাবে একজন দিদির নন্দনবোধ তার ভাইকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিচালক হিসেবে সত্যি সত্যি ও প্রভাবিত হয়েছিলো সত্যজিৎ রায়ের দ্বারা।

সুমন : তুমি বলছো ব্যক্তিসত্তা প্রভাবিত হয়েছে মানে সেটা তো শিল্পীসত্তার সঙ্গে মিশে যাওয়া।

দীপঙ্কর : আমার মনে হয় অপর্ণা সেনের প্রভাব ঋতুপর্ণের ওপর যথেষ্টভাবে পড়েছে, তার ফ্রেমিং, তার কাহিনী, তার বিন্যাস সমস্ত কিছু; এই যে যেমন ঘর সাজানো, আমি শ্বেতপাথরের থালায় দেখেছি অপর্ণা সেন বাড়ি থেকে কুশোন নিয়ে আসছে, গাছ নিয়ে আসছে, সেট সাজাচ্ছে, এইটা যেমন ওর মধ্যে ভালো করার একটা ইনহিরেন্ট কোয়ালিটি আছে না, ঋতুর সেইম জিনিস ছিলো। গুছিয়ে করা, অনেক সময় মনে হতো এটা একটা পোস্টকার্ড গোছের, তা তো নয়, সর্বাঙ্গীনভাবে জিনিসটাকে একটা মানে অদ্ভুত সৌন্দর্যবোধ ছিলো, সেন্স অব ব্যালান্স ছিলো। সবচেয়ে বড়ো গুণ যেটা লেগেছে আমার, অনেক সমকালীন পরিচালক রয়েছে তবে ঋতু হচ্ছে আধুনিক পরিচালক। ভাবনা-চিন্তা অনেক দূর এগিয়ে, হি ইজ অ্যাহেড অব হিজ টাইম, অসাধারণ।

সুমন : টিটো দা এইখানে আমার একটা প্রশ্ন থাকবে যে, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তুমি কাজ করেছো। ঋতু দা সবসময় বলতো যে সত্যজিৎ রায় আইডল, ওই লোকটা না থাকলে ছবি করাই শিখতাম না। এই দুজনের তুলনা যদি অভিনেতা হিসেবে তোমাকে করতে বলি, পরিচালক হিসেবে সত্যজিৎ রায় এবং পরিচালক হিসেবে ঋতুপর্ণ ঘোষকোথায় কতোটা মিল ছিলো? 

দীপঙ্কর : অ্যা... এটা খুব কঠিন, মানে উত্তরটা দেওয়া খুব কঠিন। তবে ঋতুর একটা ক্যারেক্টারকে হ্যান্ডেল করার মধ্যে অনেকটা ওয়ার্মড, অনেক বেশি আদর ছিলো; আমি অন্তত সেইটুকু পেয়েছি। সেজন্য ওর কাছে অনেক বেশি সহজ হতাম, মানিক দার কাছে আমি একটু বরাবরই ভয়ে ভয়ে কাজ করেছি।

অপর্ণা : মানে তুমি অভিনেতা হিসেবে এটা বলছো।

দীপঙ্কর : অভিনেতা হিসেবে খুব ভয়ে ভয়ে কাজ করেছি। কিন্তু ঋতুর মধ্যে কী রকম অদ্ভুত একটা হৃদ্যতা, মানে থাকে না মানুষের মধ্যে।

অপর্ণা : ঋতু, মানিক কাকাকে ভিতরে নিয়ে নিয়েছিলো পরে; ওর একটা ওই যেটা বিন্যাস বললে, চিত্রনাট্যের বিন্যাস; একটা লেইট মোটিফ ঘুরে আসা এই জিনিসগুলো বা ডিটেইলের দিকে নজর, এটা মানিক কাকার থেকে পেয়েছিলো। তার পরেও একটা জেনারেশনাল তফাত তো ছিলোই। ঋতু তার পরেও সেখানে ওর সময় যেটা, এক্ষুনি টিটো বললো ভীষণ আধুনিক। এই যে আধুনিকতাটা সেটা বোঝা যায়, ওর যে রিলেশনশিপের কমপ্লেক্সিটি সেটা মানিক কাকার মধ্যে অনেক বেশি, আমার মনে হয়েছে, কমপ্লেক্সিটি অবকোর্স ছিলো মানিক কাকার মধ্যে, অনেক লেয়ারস থাকতো। কিন্তু মানে নারী-পুরুষের সম্পর্কের কমপ্লেক্সিটি ফাইনালি পুরুষে-পুরুষে সম্পর্কের কমপ্লেক্সিটি সেখানে, যেখানে মানিক কাকার শেষ হয় সেখানে ঋতু শুরু, যেহেতু সে আরো পরেরকার সময়ে এসেছে, পরবর্তী সময়ে এসেছে সেখানে সে মানে ঋতু এগিয়ে গেছে।

ঋতু নিজে যা সেটা হবার সাহসটা ক্রমশ সংগ্রহ করেছিলো। ওকে আমি চোখের সামনে দেখেছি বদলাতে, ধীরে-ধীরে-ধীরে-ধীরে সাজগোজ সবকিছু, নিজেকে যেনো প্রতিমার মতো গড়লো। নিজে কীরমভাবে গড়লো নিজেকে। এবং সেই সাহসটা আমি খুব অ্যাডমায়ার করি। কজন লোক পারে যে সমাজের তোয়াক্কা না করে সে নিজে যা তা হতে, কজন পারে? ঋতু পেরেছিলো।

সুমন : অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে।

অপর্ণা : হ্যাঁ, এই নিয়ে বলছি মানে এই প্রসেসটার আমি সাক্ষী। কারণ এটা আমি ওকে, এটা কে কীভাবে নেবেন আমি জানি না; কিন্তু আমি একদম আমার অন্তরের ভালোবাসা দিয়ে কথাটা বলছি, দিদি হিসেবে একটা সময় আমি ওকে খুব বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম, যখন ও প্রথম এসছিলো। আমি বলতাম, এই তুই বিয়ে কর। ও বলতো না না, কেনো বিয়ে বিয়ে করিস বলতো। আমি বলতাম, না তোকে বিয়ে করতে হবে। তোর জন্য পাত্রী দেখছি ওমুক-তমুক। ও বলতো জ্বালাস না আমাকে। তারপর একদিন আমাকে একটা বই দিলো, ওর একজন বন্ধুর দেয়া। পুরুষ বন্ধুর দেয়া বই। আমাকে বললো, তুই তো কবিতা পড়িস সব জায়গায়, তুই এর থেকে কবিতা দেখতে পারিস। আমি তার ফ্লাইলিফটা খুলে দেখলাম মানে উল্টাতে গিয়ে দেখলাম সেখানে লেখা আছে তোমাকে আমি। আমার না একদম চোখের সামনে একটা দরজা খুলে গেলো, জানলা খুলে গেলো। আমি ভাবলাম, আমি কী করছিলাম, এই ছেলেটাকে আমি এইভাবে কেনো যন্ত্রণা দিচ্ছিলাম। এবং আমি তারপর ও যখন নেক্সট টাইম এলো, আমি ওর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আমি-আমি বলেছিলাম, তুই আমায় ক্ষমা কর ভাই। আমি আর কোনো দিন বিয়ের কথা বলবো না তোকে, আমি বুঝতে পারিনি।

এবং এই যে বাঁধনটা ভেঙে গেলো মানে বন্ধনটা, তারপর ও আমাকে সব বলতো। এবং আমি ওকে খুব ভিতর থেকে বুঝতে পারতাম। এবং চোখের সামনে দেখলাম ধীরে-ধীরে-ধীরে-ধীরে। আমি ওকে বলেছিলাম রিংকু একটা জিনিস জানিস তো, তুই যেরকম সেটা তুই ফিল্মমেকার বলে তোর কিন্তু কতোটা সুবিধা, তুই ভেবে দেখেছিস। নিউজার্জির বাড়িতে বসে বলেছিলাম। তুই ধর ব্যাংকের যদি ক্লার্ক হতিস কিংবা একজন ব্যাংকার হতিস। তখন ও বললো, যা ভাগ্যিস হইনি রে। বললো যে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এইখানে আমাকে কতোখানি একটা ফ্রিডম দিয়েছে, আমি একজন শিল্পী, শিল্পীর কতোখানি মানে তুমি যদি তাকে অ্যাকসেন্টিক ভাবো অ্যাকসেন্টিক, নিউরোটিক ভাবতে চাও ভাবো, কিচ্ছু এসে যায় না। কিন্তু সে নিজে যা সেটা হওয়ার তার ক্ষমতা খানিকটা থাকে এবং সে ক্ষমতা রিংকু অর্জনও করেছিলো। আমি, এখানে আমি ওকে অনেক অনেক বড়ো জায়গায় রাখি। 

সুমন : অঞ্জন দা...

অঞ্জন : আমার মনে হয় যেটা, আমার বলতে ইচ্ছে করছে বলে বলছি যে, কথা হচ্ছিলো রিনা দির সঙ্গে মিল নিয়ে; আমার মনে হয়, আমি-আমি যতোটা ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলাম। এই রিনা দির একটা ভীষণ, মানে একটা ওপেননেস আছে। একজন পরিচালক, একজন এতো বড়ো স্টার, অ্যাক্ট্রেস পরে পরিচালক। রিনা দির সামনে খুব সহজভাবে ক্রিটিসাইজ করা যায় (সুমন বললেন, মানুষ হিসেবে), না না সকলের সামনে। বলা যায়, এটা ভালো লাগেনি, রিনা দি-ও বলে, ওটা ভালো লাগেনি। এই যে ওপেনলি কথা বলতে পারা এবং ওপেনলি ক্রিটিসিজম নেওয়া আবার সেটাকে... এইটা ঋতুর মধ্যেও ছিলো। ভীষণ স্ট্রঙলি ছিলো, মানে আমি আমার চারপাশে অন্যদের...

অপর্ণা : তার কারণ ও ভীষণ কনফিডেন্স ছিলো আসলে।

অঞ্জন : সেই কনফিডেন্সটার একটা মিল আমি পাই তোমার (অপর্ণা) সঙ্গে।

সুমন : তুমি (অঞ্জন) ঠিক এই কথাটা আমায় ছয় মাস আগে আমেরিকায় বলেছিলে যে, রিনা দি এবং ঋতু দাকে তুমি যেকোনো ফিল্ম নিয়ে যা খুশি বলতে পারো।

অঞ্জন : ওরাও বলতে পারে সেটা এবং এটার মধ্যে কোনো সাহসিকতা ঠিক নয়; এটা হচ্ছে একধরনের আধুনিকতা যেটা টিটো দা বলছিলো; আধুনিক মানুষরাই পারে এটা; আধুনিকতা, শহুরে আধুনিকতা। তো সেইটা খুব ইম্পোর্টেন্ট ছিলো, যে কারণে তিন বছরে আমরা অসম্ভব ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম ২০১০-এ। তিন বছরে আমি অনেক কিছু ওকে বলেছি, যেগুলো চট করে বলা যায় না ছবি সম্পর্কে, কাজ সম্পর্কে। কিংবা ও আমাকে যেগুলো বলেছে, এটা বলা খুব মুশকিল। তবে সেটা খুব ওপেনলি বলতে পারা গেছিলো আর কি। বিকজ হি ওয়াজ অ্যা ভেরি মডার্ন পার্সন, ইন্সপায়ার্ড বাই অ্যানাদার এক্সট্রিমলি মডার্ন, সাহসী পার্সন। এই-এই-এই, এটা আমি এই যোগসূত্রটা দেখি।

আরেকটা জিনিস আমার মনে হয়, আবার ফিরে আসছি ওই প্রসঙ্গটাতেকারণ ব্যাপারটা খুব ইম্পোর্টেন্ট যে, পৃথিবীতে প্রচুর সমকামী ফিল্মমেকার, সমকামী আর্টিস্টরা এসেছেন; প্রচুর এসেছেন, আমি এক্ষুনি অজস্র নাম বলে দিতে পারি। কারণ আমার ব্যক্তিগত বন্ধু-আর্টিস্টরাও তাই, ঋতু একজন সেরকম। কিন্তু কজন সমকামী আর্টিস্ট এতো ভালো, এতো বড়ো মাপের হেটারোসেক্সুয়াল রিলেশনশিপের গল্প তৈরি করতে পেরেছেন!

আজ যদি বসে আমি ভাবি, বড়ো বড়ো গে ফিল্মমেকারস এতো স্ট্রঙলি হেটারোসেক্সুয়াল রিলেশনশিপ নারী-পুরুষের গল্প এতো পাওয়ারফুলি... আমি যখন দেখেছি, আমি কিন্তু ঋতুকে একবার বলেও ফেললাম, আমার মনে হয়, তুই স্ট্রেইট জানিস ইউ আর স্ট্রেইট গাই, এটা হতে পারে না। হাউ কুড ইউ, আমি তো করতে পারবো না এ রকম। এতো স্ট্রঙলি ওম্যান অ্যান্ড ম্যান রিলেশনশিপ, দোসরহোয়াট এ ফিল্ম (সবাই)।

অপর্ণা : খুব, খুব আমার মনে হয়, দোসর ঋতুর ওয়ান অব দিস স্ট্রঙেস্ট ফিল্ম ইজ দোসর। খুব খুব দোসর আমার ভালো লেগেছিলো। আমি ঋতুকে বলেছিলাম, দোসর হওয়ার পর। এতো এতো, এতো তুই মানে কোথায় একটা; শংকরের সিনটা মনে আছে, শংকর উইথ দ্য প্রোস্টিটিউট, ওই রকম একটা সিন। একটা বিজার এলিমেন্ট ঢোকালো তার মধ্যে; ব্ল্যাক হিউমার, ঋতুর যে এই আধুনিকতা এগুলো। ঋতুর মধ্যে যে আরো একটা দিক ছিলো যেটা রবীন্দ্রনাথের ইন্সপিরেইশনে, সেটা হচ্ছে একটা মিস্টিক দিক। হ্যাঁ, সেটাও ছিলো। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে যেটা রবীন্দ্রনাথের কখনো ছিলো না, তিনি তার সময়কার মানুষ যে বিজার দিকটা। জীবনের তো অনেক বিজার দিক থাকে। কিন্তু এতো আনয়েরেঙ মানে একটা নির্ভুলভাবে সেটা ধরা। মানে ওই সিনটা, যেখানে শংকর আসছে, আর বোধ হয় কঙ্কনার সঙ্গে বসে কথা বলছে দুজনে। অদ্ভুত, দুইজনের স্বামী এবং স্ত্রীরওই সেন্সগুলো কী করে লিখলো এই ছেলেটা, কী করে লিখলো! আমার মাথার মধ্যে ঢুকে দেখতে ইচ্ছে করলো কী করে লিখলো ও। খুব খুউব আমার ভালো লেগেছিলো।

সুমন : অঞ্জন দা, অভিনেতা হিসেবে তুমিও তো পরিচালক-অভিনেতাএটা দ্বৈত সত্তার ব্যাপার যে, অভিনেতা সত্তা পরিচালক সত্তা। সেইখানে ঋতু দাতো তোমার মতো অনেক আগে থেকে অভিনয়, তারপরে পরিচালনায় এভাবে নয়। পরিচালক, প্রতিষ্ঠিত পরিচালক তারপর অভিনেতা, তারপর ক্যামেরার সামনে আসা। এটা কি কোথাও একটা ট্রানজিশন মনে হয়েছে তোমার, নাকি খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাভাবিকভাবে ইচ্ছে হয়েছে, এসেছে। মানে...

অঞ্জন : না, আমার মনে হয়েছে, ও যে ধরনের চরিত্র করেছে সেটা একটা বিশেষ ধরনের চরিত্র এবং সেটা করতে ও ভালো পেরেছে এবং তাই ও করেছে।

সুমন : মনে হয়, এটা ঋতু দার জন্যই লেখা হয়েছিলো, ঋতু দার জন্যই সৃষ্টি। 

অঞ্জন : ওই চরিত্রগুলো হেটারোসেক্সুয়াল চরিত্র নয়, অন্য ধরনের চরিত্র। এগুলো ওর ব্যক্তিসত্তার জায়গা থেকে, ও মনে করেছে এটা আমার করা জরুরি এবং আমাকে বহুবার ও বলেছে, এটা আমার একটা স্টেটমেন্ট। আমি নিজের ছবি যখন করবো, তখন আমি কিন্তু নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে করবো। এই চিত্রাঙ্গদাটা করছি, কিন্তু তার মানে সবসময় আমি করবো না। আমি একবার খুব ক্রিটিকাল হয়েছিলাম ওর সম্পর্কে, সারাক্ষণ কেনো তুমি এভাবে...

অপর্ণা : কেনো নয়? 

অঞ্জন : এটা আমার বলতে আজকে খুব খারাপ লাগছে, আমার মনে হয়েছিলো বন্ধু হিসেবে, আমি বলেছিলাম একটা সময়। হোয়াই?

অপর্ণা : একটা কথা বলি অঞ্জন। সরি, আমি একটু ঝগড়া করছি, হ্যাঁ। (হেসে) তোর সঙ্গে সবসময়ই আমার ঝগড়া হয়। সেটা হচ্ছে যে, যারা হেটারোসেক্সুয়াল তারা যদি শুধুই হেটারোসেক্সুয়াল করে যেতে পারে, তাহলে একজন গে ফিল্মমেকার কেনো শুধু সেটা করবে না? ইনফ্যাক্ট আমি একটা শুধু গে ফিল্ম করতে চাই, করতে চাই। আই হ্যাভ আন্ডারস্টুড ফ্রম ডিপ ইন সাইড, একটা গে মানুষের। মানুষ কথাটা আমি খুব গভীরভাবে বুঝেছি, তার জন্য ঋতুই দায়ী।

অঞ্জন : না আমি সেটা না। আমার খালি মনে হয়েছিলো। আমি ওকে বলতে চেয়েছিলাম তুমি কোথাও গিয়ে মানে ইউ আর নট রেস্ট্রিকটেড টু ইওর সেক্সুয়ালিটি। তুমি তো একটা বড়ো জগতের মানুষ, তুমি একধরনের জিনিস করছো কেনো? আবার ফিরে এসো। আমি একটা ছবি ওর সঙ্গে প্ল্যানও করেছিলাম। ওখানে অভিনয় করবে ও, আমিও অভিনয় করবো। এবং সেটা একটা হোমোসেক্সুয়াল রিলেশনশিপের গল্প নিয়ে আমরা ভেবেওছিলাম। আনন্দভৈরবী নাম দেওয়া হয়েছিলো। আমি স্ক্রিপ্টটা লিখেওছিলাম। দুজনে মিলে করার কথাও হয়েছিলো একটা। কিন্তু...

সুমন : এটা কি আরেকটি প্রেমের গল্পর পর?

অঞ্জন : হ্যাঁ, পর। কিন্তু সেটা মানে হয়ে ওঠেনি কোনো কারণে। যেখানে আমি ভেবেছিলাম যে, ঋতুকে আমি বলেছিলাম, তোমাকে আমি একটা পুরুষ হিসেবেই দেখবো, মেয়ে হিসেবে নয়। মানে মেয়েলি পুরুষ নয়, পুরুষালি পুরুষের মতো। চুল-টুল রাখতে হবে, এ করতে হবে সে করতে হবেএ রকম আর কি। কিন্তু সেটা হয়ে উঠলো না। কিন্তু আমি যেটা নিয়ে বলতে চাইছিলাম যে, কোথাও এই-এই এটা বলা যেতো কী করে অ্যাকসেপ্টেড? আমার মনে হতো পরে বাড়ি ফিরে এসে, আমি কি হার্ট করলাম, আমার এটা বলা ঠিক হলো কি না? কিন্তু পরে আমি দেখলাম না, ইটস্ ইটস্ বন্ধু; যাকে বলা যায়, ইজিলি বলা যায়। তাহলে কেনো আমি বলবো না এটা? তো সেইটা আমার কাছে মনে হয় খুব স্ট্রঙ পয়েন্ট, খুব আধুনিক এবং নট রেস্ট্রিকটেড টু তার সেক্সুয়ালিটি। নট রেস্ট্রিকটেড, তার চেয়ে অনেক বড়ো। রিনা দি যেটা বলছে যে, আস্তে-আস্তে-আস্তে-আস্তে-আস্তে-আস্তে-আস্তে-আস্তে-আস্তে ও নিজেকে প্রকাশ করলো পরিষ্কারভাবে এবং খুব স্ট্রঙলি।

দীপঙ্কর : ওর একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার ছিলো। সিনেমাটাই ওর সেই প্ল্যাটফর্ম, যেটার মাধ্যমে ওর নিজের কথাটা বলা ভীষণ প্রয়োজন ছিলো।

অপর্ণা : এবং ও খুব কষ্ট পেয়েছে। ও খুব কষ্ট পেয়েছে, সমাজ তো কী রকম। কষ্ট অনেকবার পেয়েছে। যাকে বলে আগুনে পুড়ে সোনা হওয়া না, ঋতুর তাই হয়েছিলো একদম। আমি জানি ও কতোটা কষ্ট পেয়েছে। আমাকে ও বলতো, অনেকবার অনেক কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এই কষ্টটা যেটা, এটা সাইন অব এ ট্রু আর্টিস্ট। যে কষ্টটা প্রকাশিত হয়েছে মানে শিল্পের মাধ্যমে। সেটাই তো সবচেয়ে মানে সেটাই হচ্ছে একটা শিল্পীর...

অঞ্জন : সেন্টিমেন্টালাইজ করেনি ও। সেইটা খুব বড়ো...

দীপঙ্কর : চিত্রাঙ্গদা ছবির শেষের দিকটায় আমার মনে হয়েছে কোথায় যেনো ও ফিরতে চাইছে। আমি সেটাকে নরমাল শব্দটা ঠিক নয়। মানে বোধহয় সাধারণ জীবনযাত্রা, সাধারণ মানুষের, যেসময় যীশু ওকে ছেড়ে চলে গেলো। তারপর বোধহয় এই চরিত্রটি... অ্যা... জানি না। খালি মনে হয়েছিলো ও ফিরতে...

অঞ্জন : এইটা-এইটা-এইটা এভাবে শেষ করার জন্য ও কিন্তু অসম্ভবভাবে ক্রিটিসাইজড হয়েছে এলজিবিটি (Lesbian, Gay, Bisexual and Transgender Social Movement) মুভমেন্ট থেকে। এই গে মুভমেন্টের লোকেরা যারা, তারা বলেছে তুমি পলিটিকালি কারেক্ট থাকছো না কেনো? ঋতু পলিটিকালি কারেক্ট কথা বলেনি শেষ কালে গিয়ে। বলেনি যে সেক্স চেঞ্জটা, অবকোর্স সেক্স চেঞ্জের স্বপক্ষে সে, পুরো ছবিটাই স্বপক্ষে। কিন্তু এই মানুষটা রিফিউজ করলো, সে বেরিয়ে এলো। এটাও কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে, একটা অদ্ভুত সাহসী ঋতু, একটা অদ্ভুত স্ট্রঙ পার্সন।

দীপঙ্কর : তাহলে কি ওর মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব ছিলো, ডিকোটামি ছিলো কিছু?

অঞ্জন : না। তবে আমার মনে হয়, আমার মনে হয়েছে ও এক জায়গায়, ওর কাছে মনে হয়েছে, আমি যেরকম আমি সেরকম থাকি। আমি আমার মতন।

অপর্ণা : তাই পলিটিকালি কারেক্ট থাকার দায়বদ্ধতা আমার নেই।

অঞ্জন : ওই যেটা রিনা দি একটু আগে বলছিলো, ম্যাসেজ দেওয়ার দায়বদ্ধতা, ওটা ওর ছিলো না।

অপর্ণা : ওসব ছিলো না। ওটা মানে, জাত শিল্পীর সেটা থাকে না। আমি একটা মেসেজ দেবো শুধু, জাত শিল্পীরা সেটা করে না।

অঞ্জন : কেনো সেতো ক্রিটিসাইজড হয়েছে, সো ফর...

অপর্ণা : ঋতু সেই অর্থে...

অঞ্জন : আমি করলে ক্রিটিসাইজড হলে সেই অর্থে কিছু এসে যায় না। ঋতু যে, হু ইজ সো মাচ পার্ট অব দ্য মুভমেন্ট; হু অ্যাকচুয়ালি সিনেমাতে এতো বড়ো মুভমেন্ট করলো, তাকে ক্রিটিসাইজ করা হলো। সেগুলো আমার, আমাকে আরো সাম হাউ আরো বেশি কষ্ট দিয়েছে, রাদার দ্যান ছবিটা আর কি।

সুমন : রিনা দি, পাশাপাশি আর একটি জিনিস প্রথম ছবি থেকে অ্যা... আমায় আমায় বহু মহিলা বলেছেন যে, একেবারে মেয়েদের মনের ভিতরের কথাটা একজন পরিচালক তার ক্যামেরায় কীভাবে তুলে আনতে পারেন, কীভাবে স্ক্রিপ্টে তুলে আনতে পারেন! এটা তুমি কী বলবে, কী থেকে আসে? অবজারভেশন, সেন্সিটিভিটি; মানে কী থেকে পরিচালক ঋতুপর্ণর ছবিতে মহিলারা এতো সত্যি, এতো বাস্তবসম্মতভাবনাটা কীভাবে রিফ্লেকশন হয়।

অপর্ণা : রবীন্দ্রনাথ যখন পূজার গান লিখতেন আর প্রেমের গান লিখতেন, তুমি তফাত বুঝতে পারো? আমি পারি না। তার কারণ রবীন্দ্রনাথের একটা অ্যান্ড্রোজিনাস কোয়ালিটি ছিলো; নারী অর্ধ-নারীশ্বর। ঋতুর মধ্যেও সেই অ্যান্ড্রোজিনাস কোয়ালিটিটা ছিলো। সত্যিকারের অ্যান্ড্রোজিনাস।

অঞ্জন : আমার মনে হয়, যেকোনো আর্টিস্টের মধ্যেই তা আছে। (অঞ্জনের কথার মধ্যে অপর্ণা বলেন, হ্যাঁ কম-বেশি) তোমার মধ্যেও দেয়ার ইজ অ্যা এলিমেন্ট অব মেল। (অপর্ণা বলেন, অবকোর্স) ঋতু দার মধ্যে দেয়ার ইজ অ্যান এলিমেন্ট অব ফিমেল। এভরি আর্টিস্ট হ্যাজ...

অপর্ণা : কিন্তু সেটা কম-বেশি থাকে। সেখানে ঋতুর মধ্যে সেটা খুব একেবারে খুব মিলেমিশে গিয়েছিলো। অনেক দিন পর্যন্ত আমি ভাবতাম যে ও, হি ইজ ওম্যান ইন অ্যা ম্যানস বডি। অনেক দিন পর্যন্ত আমি ভাবতাম, কিন্তু তারপর আমার মনে হয়েছিলো যে, না। ও কিন্তু অ্যান্ড্রোজিনাস। সত্যিকারের সবচেয়ে মহৎ অর্থে অ্যান্ড্রোজিনাস। এবং সেই অ্যান্ড্রোজিনাস কোয়ালিটিটা ওকে বুঝতে সাহায্য করেছে।

অঞ্জন : ও বলতো কিন্তু আমাকে, আমি-আমি আই উড লাইক টু বি কলড অ্যান অ্যান্ড্রোজিনাস।

অপর্ণা : হ্যাঁ, সেখানে ও পৌঁছেছিলো। সেখানে ধীরে ধীরে পৌঁছেছিলো।

অঞ্জন : হোয়াই ইউ কলিং মি, সারাক্ষণ আমায় গে বলছিলো কেনো? আমি মানে এগুলো ও আমায় বলেছে, আমি বলে ফেলছি আজকে এইভাবে।

অপর্ণা : আমি কেনো বলছি জানিস অঞ্জন, জানিস তো, কেউ হয়তো বলবে এসব বলার কী দরকার; কিন্তু যারা বলবে তারা বুঝবে; আমার মনে হয়, তারা তো ঋতুর যন্ত্রণাটা দেখেনি। তারা তার সাহসাটাও বুঝতে পারেনি। আমি বলবো, আমি সগর্বে বলবো, কেনো বলবো না? হ্যাঁ, অঞ্জন ঠিকই বলছে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে কম-বেশি সেটা থাকে এবং আমিও আশা করি, আমি পুরুষ চরিত্র যখন লিখবো, আমি যখন দীপু চরিত্র লিখেছিলামদীপক যুগান্ততে, তখন আমি পুরুষ হিসেবেই লিখেছিলাম সেটা। আমার মধ্যে যে পুরুষ সত্তা সেই সেটা লিখেছিলো। ঋতুর মধ্যে যে নারী সত্তা সেটা মেয়েদের বুঝতে পেরেছে। আরো অনেক ফিল্মমেকার আছে, যারা মেয়েদের বুঝতে পেরেছে। অনেক অনেক পুরুষ মানে সাহিত্যিক আছেন যারা মেয়েদের বুঝতে পেরেছেন। তার কারণ জাত শিল্পীদের মধ্যে এই কোয়ালিটিটা থাকে মানে অ্যান্ড্রোজিনাস কোয়ালিটিটা থাকে।

সুমন : একটা জিনিস রিনা দি, যন্ত্রণার কথাটা তুমি বারবার কেনো বলছো। ঋতু দা ওয়াইডলি অ্যাকসেপ্টেড, শ্রদ্ধা পেয়েছেন সব সেক্টর থেকে...

অঞ্জন : মানুষ হিসেবে জানো, মানুষ হিসেবে; একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে কোথাও একা থাকার ব্যাপার একটা। একটা লোক সে ঘুমের মধ্যে চলে গেলো, কেউ নেই। আমরা সকাল বেলা জানতে পাচ্ছি। এই যে একটা একা হয়ে পড়া, এটা তো কমপ্লিটলি একা হয়ে থাকা। হ্যাঁ, নিশ্চয় তার বন্ধু আছে, পার্টনারস ছিলো জীবনে। কিন্তু আমার কোথাও গিয়ে মনে হয়েছে একটা পয়েন্টে গিয়ে, ঋতু আমার থেকে আলাদা কারণ ঋতু আমার থেকে একা।

অপর্ণা : আমাকে ই-মেইলে, ওর বাংলা সফটওয়্যার ছিলো, ই-মেইলে চিঠি লিখেছিলো একবার। আমি উত্তর দিয়েছিলাম। আনফরচুনেটলি আমি রোমানে, আমার কাছে ছিলো না ওটা (বাংলা সফটওয়্যার)। সেখানে ও লিখেছিলো যে, দীপাবলির উৎসব হচ্ছে চতুর্দিকে এবং নিষ্প্রদীপ ঘরে আমি বসে আছি, একা। তখন আমি ওকে লিখেছিলাম, কেনো তুই একা? এরপর থেকে এ ধরনের কোনো উৎসবে তুই অন্তত আমাকে বলিস, আমি চলে আসবো কিংবা তুই আমার কাছে চলে আসিস। জানিনা ওর একাকিত্বটাও হয়তো ওর পড়াশোনায়ও সাহায্যে করেছে, ওর একটা গভীর পাণ্ডিত্য ছিলো, ও পড়তো। আমাকে ও বকতো, বলতো তুই আজকাল কেনো আর আগের মতো পড়িস না। আমরা তো একসময় অনেক পড়েছি, কবিতা পড়েছি, সাহিত্য পড়েছি দুজনে মিলে আলোচনা করেছি প্রচুর।

একসময় আমি ওকে ভীষণ বকেছি যে, তুই কেনো নাচ দেখতে যাচ্ছিস না, আমার সঙ্গে চল। তুই কেনো মিউজিক কনফারেন্সে যাচ্ছিস না, চল। একজন ফিল্মমেকার হতে গেলে সমস্ত অভিজ্ঞতা একদম স্পঞ্জের মতো গ্রহণ করতে হয়। শুধু একদম ফিল্মওয়ার্ল্ডের মধ্যে তুই কেনো, এই ফিল্মওয়ার্ল্ডের থেকে তুই কতোটা অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে পারবি। এই সব আলোচনা আমাদের হতো।

কিন্তু আমি বলছি যে, এটার মধ্যে দিয়ে ও রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছে গভীরভাবে পড়াশোনা করেছে। একটু আগে টিটোর সঙ্গে আমার আলোচনা হচ্ছিলো যে, ওর প্রবাহ, পাণ্ডিত্য যেটা, সেটা কিন্তু ওই একাকিত্বটা না হলে আর হয় না, সময় পাওয়া যায় না।

সুমন : টিটো দা, ডিরেক্টর হিসেবে একজন অভিনেতাকে যে ইন্সট্রাকশন, সেটা একদম প্রথম দিন স্ক্রিপ্ট শোনানো থেকে একেবারে তার শুটিংয়ের পর্ব; প্রত্যেকটা পর্বে, সেটা কীভাবে ঋতুপর্ণ ঘোষ ইউনিক ছিলেন। মানে আমি দেখেছি বারবার, আমরা শুটিং যখন কাভার করতে যেতাম বা চোখের বালিসহ ঋতু দার শুটিংয়ের সময় একাধিকবার গেছি, এক্কেবারে খুঁটিনাটি ডিটেইলস, কোন্ দিকে তাকাবে, সেটা হয়তো অন্যান্য পরিচালকরাও করে কিন্তু কোথাও একটা প্রবল মাতৃত্ববোধ, মমত্ব মানে পারফেকশনিস্ট এই-এই এইগুলো খুব মিশেছিলো। সেটা একজন অভিনেতার আয়নায় তোমার কী রকম লাগে?

দীপঙ্কর : তোমার-তোমার এই শব্দটি আমার ভালো লেগেছে। পরিচালনার মধ্যে একটা মাতৃত্ববোধ ওর ছিলো। হ্যাঁ, খুব; একটা বিড়াল ছানাকে যেমন, সেরমভাবেই ও শিল্পীদের হ্যান্ডেল করতো। অ্যাট দ্য সেইম টাইম একটু খ্যাপাটে ছিলো। রেগে যেতো দুমদাম। এই কিছু ছুড়ে ফেলে দিলো, আজকে এক্ষুনি আমি আর শুটিং করবো না, কালো বিড়াল সামনে দিয়ে গেছে। আমি কাজ করবো না। ওতো উইচক্র্যাফ্ট (Witchcraft) শিখেছিলো।

সুমন : ঋতু দা বিড়াল ভীষণ ভয় পেতো।

অপর্ণা : ভীষণ!

দীপঙ্কর : এই প্রসঙ্গে সাউদার্ন পার্কে যেখানে ও উইচক্র্যাফ্ট শিখতে গেছিলো ও তিনি কখনো কোনো পুরুষকে উইচক্র্যাফ্ট শেখাননি। ঋতু প্রুভড হিমসেল্ফ দ্যাট, না আমি নারী। এবং সেই ইপ্সিতা ভদ্রমহিলা ওর নামটা ঠিক মনে নেই, ওকে শিখিয়েছিলো। ওর এই কতোগুলো এলিভিশন্স ছিলো, কালো বিড়াল গেলে আজকে শুটিং করবো না।

অপর্ণা : ওর একটা সবকিছুর মধ্যে একটা ইনসেশেবল একটা কৌতূহল। এই যে উইচক্র্যাফ্ট এটার এটার মানে...

দীপঙ্কর : শিখবো মানে তো শিখবোই। ও যেকোনো জিনিসের গভীরে চলে যেতো। কিন্তু ওই খ্যাপামি, ওর খ্যাপামিটা না থাকলে, একটু বাউলপনা ছিলো তো। ওটা না থাকলে মজা থাকতো না।

সুমন : আমার মনে আছে, এই কয়েক সপ্তাহ আগে ঋতু দার শেষ ফোন। আমরা তো বিভিন্ন মাতৃভাষায় যার যেভাবে নাম ব্যবহার হয়, সেভাবে বাংলা বানানটা করি। ফোন করে ঋতু দা বললো, দ্যাখ সুমন তুই যদি আর একবার এই বড়ো বড়ো করে এই নামটা দিস, আমার চোখে লাগচে, তুই সরাবি কি না আমায় বল। তা আমি লজিকালি বোঝানোর চেষ্টা করলাম, না এটা ওনার ভাষা, এভাবে বলা হয়। ও বললো, না না তুই এক্ষুনি সরা। না মানে আমি বলছি, এই যে মায়ের মতো বকুনি।

অপর্ণা : ওর বকুনির রকম কী, ওকে খেতে দেবে না, তুই যা দোতলা বাস চাপা পড়ে মর। (সবার হাসি) এই সব অদ্ভুত মানে সেইটার ওপর সিরিয়াসলি নেওয়াও যায় না। তার মধ্যে মানে বকার মধ্যে যে একধরনের একটা প্রশ্রয়-আদর সবটাই ছিলো; সেটাও থাকতো, থাকতো না যে তা না। সেই জন্য ওই ভাবে বলতো।

দীপঙ্কর : কখনো আরোপিত বলে মনে হয়নি কিছু, ওর আচরণ, কখনো আরোপিত লাগেনি।

অঞ্জন : আমি জানি না, আমি যতোটুকু দেখেছি। আমি তো একটা ছবিতে সেভাবে অভিনয় করেছি, দুটো ছবির অফার এসছিলো সেগুলো হয়নি। অ্যা... স্ক্রিপ্ট নিয়ে এসছিলো, অনেকদিন আগে আমার বাড়িতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে এসছিলো, তখন আমিও ছবি করিনি। তখন ও ছবি করেনি। কিন্তু সেগুলো পরবর্তীকালে অন্যরা অভিনয় করেছে। কারণ তখন আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। কিন্তু আমার মনে হয় যতোটুকু দেখেছি, আমি রিনা দির সঙ্গে অ্যাসিস্ট করতে বা ওর ছবির আশেপাশে গিয়ে কাজ করে; ও অভিনয় করিয়ে নিতে পারতো। আবার ভালো অভিনেতাদের জায়গা করে দিতে পারতো, দুটোই ও করতে পারতো। শুধু অভিনয় করিয়ে নেওয়া নয়, যদি ভালো অভিনেতা থাকে যেমন টিটো দা, এ রকম অনেক বড়ো অ্যাক্টরদের সঙ্গে ও কাজ করেছে নাসিরের (নাসিরউদ্দিন শাহ্) সঙ্গে ও কাজ করেছে, তাকে একটা জায়গা করে দিতে পারতো কিন্তু।

অপর্ণা : হ্যাঁ, একদম একদম।

অঞ্জন : মানে আমিও, আমি তো রিনা দিকে একভাবে দেখে এসেছি, অ্যাজ অ্যান অ্যাক্ট্রেস। উনিশে এপ্রিল-এ আই ডিফ্রেন্টলি ডিসকাভারড হার, এটা বলতে আমার লজ্জা নেই।

অপর্ণা : কখনো বলেনি এই ভাবে কর। কঙ্কনাকে, ওইটুকুন মেয়েকে একবারও বলেনি তুই ওই ভাবে কর। দোসর-এ কঙ্কনাকে, একদম ওকে ছেড়ে দাও, কিচ্ছু বলতো না। এটা কিন্তু এইখানে ও মানিক কাকার মতো। মানিক কাকা যেরকম, হাতটা তোলো ঘাড়টা চুলকাও এদিকে তাকাও, ওদিকে তাকাওএ রকম করতেন আবার একেবারেই ছেড়ে দিতেন। সেই-সেই, ও ঠিক বুঝতে পারতো যে, এখানে দরকার তাই বললাম, এখানে দরকার নেই।

অঞ্জন : আমাকে একবার বলতে এসছে; আমি বললাম, না আমি একদম তোমার কোনো কথা শুনবো না। আমার যেরকম ইচ্ছা আমি সেরকম করবো পার্টটা। (সবার হাসি) তখন ও বললো, তুই অন্তত আমার সাথে রিহার্সেল কর, মানে আগে থেকে লেট আস রিহার্স। এবং আমরা দুজন বসে-বসে বসে-বসে রিহার্সেল করলাম। তারপর সেটা শুট্ করা হলো আর কি। কিন্তু সেইটা, সেইটা খুব মজা ছিলো। তবে মোটেও এরম না যে, আমার ছবি করছো, যখন-তখন আমি যেরম বলছি, সেরম তোমায় করতে হবে। সেটা কিন্তু একবারও বলেনি। অথচ আমি যে অভিনয়টা করি সেটা কিন্তু আমি অন্য জায়গায়ও করিনি, অন্যভাবে করেছি...

অপর্ণা : তোর ওপর কনফিডেন্স ছিলো একটা।

অঞ্জন : সেটা আমার মনে হয়, ভালো অ্যাক্টরসদের যখন নিয়ে কাজ করেছে, বহুবার রিপিটেড হয়েছে তারা। টিটো দা এখানে বসে আছে, মমতাতাদের বোধ হয় একটা জায়গা করে দিয়েছে ও; ভীষণ ভীষণ জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। আবার কিছু কিছু বড়ো বড়ো স্টারদের ও ব্যবহার করেছে ভীষণ ভালোভাবে। তাদের আর স্টার মনে হয়নি ছবিতে।

অপর্ণা : ইনফ্যাক্টলি, মানিক কাকা নিজে যদি অভিনয় করতেন অসাধারণ অভিনয় করতেন। কারণ মানিক কাকা যেরমভাবে বলতেন, ঠিক সেইটাই নকল করতে পারলে একটা দারুণ অভিনয় হয়ে যেতো। কিন্তু মানিক কাকা অভিনয় করেননি কখনো, ভিতরে আসলে লাজুক ছিলেন। অ্যা... ঋতু মানিক কাকার মতো ভীষণ ভালো অভিনয় করতো নিজে, ভীষণ ভালো; তা তোমরা সবাই দেখেছো কিন্তু লাজুক ছিলো না।

অঞ্জন : একটা সেন্স অব হিউমার ছিলো, যেটা রিনা দি বলছিলেন। তার এই হিউমার ছিলো বলেই হয়তো এতো ভালো বিজ্ঞাপন করতে পেরেছে আর কি।

অপর্ণা : আমাকে যুগান্ততে কী বলেছিলো জানিস?

অঞ্জন : কী কী একটা যেনো করেছিলো, দেখতে খারাপ মাখতে ভালো। (সবাই এক সঙ্গে, ফ্যান্টাস্টিক)

সুমন : নিম সাবান, নিম সাবান।

অঞ্জন : মানে সেন্স অব হিউমার না থাকলে কেউ এরম করতে পারে না।

অপর্ণা : ...বিকেম ফেমাস। তারপর আমাকে যুগান্ততে বললো, যুগান্ততে একজন নাচিয়ে ছিলো না অনিল বলে, যে ছেলেটি নাচ করতো। আমি কাউকে পাচ্ছিলাম না। ও বললো, শোন্ রিনা দি তুই চাস আমি করবো? আমার মধ্যে একটা, আমি জানি আমার মধ্যে একটা মেয়েলি ভাব আছে। তুই যদি বলিস, তুই লজ্জা পাস না বলতে, তুই চাস আমি করবো? তখন আমি বললাম, তুই নাচতে পারবি? ও বললো, স্কুলে আমি যখন সাউথ পয়েন্টে ছিলাম ওরা আমায় বলতো আমি খুব গ্রেজফুল; তাই বোধ হয় পারবো রে। আমি বললাম, চল তাহলে। দুজনে মিলে গেলাম, তখন একটুখানি মোটাসোটা ছিলো। তারপর নাচ শুরু করে ও হাঁপিয়ে-টাপিয়ে বললো, না আমি পারবো না; তুই অন্য কাউকে নে। কিন্তু তারপর যখন হয়ে গেলো তখন আমাকে বললো, দে আমি তোর ডাবিংটা করে দিচ্ছি।

আমরা না পরস্পরের ছবিটা মানে, ওর ছবি আমার, আমার ছবি ওর এরম একটা জিনিস ছিলো অনেকদিন পর্যন্ত। ও বলতো দে আমি তোর ডাবিংটা করে দিচ্ছি, দে আমি এখানটায় লিখে দিচ্ছিএই ব্যাপারগুলো ছিলো। (অঞ্জনের দিকে হাত করে) তোর যে উপন্যাসটা সেটা তো ঋতুই লিখে দিলো। আমি বললাম, তুই লিখতো আমি পারছি না, ও লিখলো।

সুমন : তোমাদের তিনজনকে এই অনুষ্ঠানে আমি অন্তত ধন্যবাদ দেবো না। তার কারণ আমি জানি না এটা কী? এটা অনুষ্ঠান, এটা আড্ডা, এটা আলাপচারিতা। আমরা আসলে ঋতু দার কথা বললাম, বলে বোধ হয় সম্ভবত সবাই একটু হালকা হলাম, আর সেটা আপনাদের সামনে হলো। এই অনুষ্ঠানে এটুকুই থাক।

 

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন