মেহেরুল ইসলাম
প্রকাশিত ০৯ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সোনার গহনা থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা আগুনের নাম গয়নার বাক্স
মেহেরুল ইসলাম
১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হলেও তাকে শিল্প হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ ছিলেন অনেক ‘চলচ্চিত্রবোদ্ধা’। তখন চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক দিকটিই ছিলো প্রধান বিবেচ্য, শিল্প তথা মানুষের উপস্থিতি তখনো চলচ্চিত্রে মুখ্য হয়ে ওঠেনি। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর মহামতি লেনিনই প্রথম চলচ্চিত্রকে মানুষের কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেন। এরপর বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৩০ সালের মধ্যে চলচ্চিত্র একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে বিকশিত হয়েছিলো। কিন্তু এই কাজটি যে খুব সহজে হয়েছে তা ভাববার কোনো অবকাশ নেই। কারণ এর জন্য পাড়ি দিতে হয়েছে এক্সপ্রেশনিজম, দাদাইজম, সুররিয়ালিজম, নিউরিয়ালিজমের মতো শক্ত চলচ্চিত্র আন্দোলন। ফলে সমাজ-বাস্তবতা, সামাজিক বৈষম্য কিংবা সমাজ-পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র। আইজেনস্টাইন, পুদভকিন কিংবা ভিত্তোরিও ডি সিকা’র মতো নির্মাতাদের চেষ্টায় চলচ্চিত্রে উঠে আসতে থাকে সাধারণ মানুষের কথা। তারা বিশ্বাস করতেন, শিল্পী তথা নির্মাতার দায়বদ্ধতা রয়েছে ওই মানুষগুলোর কাছে; কারণ সব শিল্পের শেষ কথা মানুষ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘শিল্প অবশ্যই সত্যের কাছে ও দ্বিতীয়ত সুন্দরের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।’১ আর সত্যটা একজন শিল্পীর চিন্তা-চেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমেই বেরিয়ে আসে।
শিল্পীর এই চিন্তা-চেতনা ও আত্মোপলব্ধি উপমহাদেশে সত্যজিতের মানবিকতা ও চিন্তার ক্ষেত্রে হয়তো শক্তিশালী ছিলো বলেই তার চলচ্চিত্র আজও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে আছে। মানুষের চাওয়া-পাওয়া, পারস্পরিক সম্পর্ক, আবেগ ও চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারলে চলচ্চিত্র পৌঁছে যেতে পারে সবার কাছে—চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সত্যজিৎ তা প্রমাণ করে গেছেন। এজন্য সত্যজিৎ আজ বেঁচে না থেকেও জীবন্ত হয়ে আছেন তার সৃষ্টিকর্মের মধ্যে। যে সৃষ্টিকর্ম আজও পথ দেখাচ্ছে হাজারো চলচ্চিত্রপ্রেমীদের; প্রভাবিত করছে সমাজ ও সমাজের অধস্তন সাধারণ মানুষের চলমান জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি সেলুলয়েডের ফিতায় তুলে আনতে।
সত্যজিৎ—উত্তর স্বয়ং সত্যজিৎ দ্বারা প্রভাবিত তেমনি এক চলচ্চিত্রপ্রেমী অপর্ণা সেন; সত্যজিতের তিন কন্যার (১৯৬১) মাধ্যমে যার চলচ্চিত্র-জীবনের পথচলা। এরপর ক্যামেরা হাতে নিজেই নেমে পড়েন মাঠে; নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র। তার অধিকাংশ চলচ্চিত্রে নারী চরিত্রগুলো পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যয়ী। তবে এটা ঠিক, সত্যজিতের মতো দূর থেকে দেখা কোনো বাস্তবতাকে অপর্ণা ধরার চেষ্টা করেননি। অপর্ণা যতোখানি পেরেছেন কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন বাস্তবকে। শিল্প শিল্পীর জন্য নাকি মানুষের জন্য—এ নিয়ে দ্বন্দ্বে তিনি হয়তো মেনেছেন মানুষের জন্যই শিল্পকে। তাই অপর্ণা—নারী, নারীর এগিয়ে যাওয়া, নারীর বাস্তব জীবন, নারীর চাওয়া-পাওয়ার মতো বিষয়গুলোকে শৈল্পিকভাবে পূর্ণতা দিতে সচেষ্ট থেকেছেন চলচ্চিত্র নামক শিল্পমাধ্যমে।
২.
‘পরাধীনতা সব চেয়ে বড় বন্ধন নয়, কাজের সংকীর্ণতাই হচ্ছে সব চেয়ে কঠোর খাঁচা।’২ রবীন্দ্রনাথের কথার মতো এই কাজের সংকীর্ণতাই নারীদের আজ পরাধীন করে রেখেছে বহুক্ষেত্রে। তবে রবীন্দ্রনাথ যে সমাজকে নিয়ে লিখেছেন সেখানে পুরুষের আধিপত্য ছিলো সুপ্রতিষ্ঠিত। তার পরও তিনি সর্বদা জিতিয়ে দিয়েছেন নারীকে; কেননা তারা প্রতিনিধিত্ব করে সৃষ্টির, প্রকৃতির ও স্বাভাবিকতার। তবে বিশাল এ রবীন্দ্র-সাহিত্যের একরকম পক্ষপাতিত্ব ছিলো নারীর পক্ষে। আর একবিংশ শতাব্দীতে এসে তেমনি পুরুষতান্ত্রিকতার বিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে চলচ্চিত্রনির্মাতা অপর্ণা সেনকে। অপর্ণার চলচ্চিত্রগুলো দেখলে মনে হওয়া স্বাভাবিক নারী চরিত্রগুলো নিজেই যেনো এক একটা অপর্ণা। যেখানকার নারীরা ব্যক্তি-অপর্ণার মতো অনেকটাই প্রত্যয়ী। যেনো ব্যক্তি-অপর্ণার চাওয়া-পাওয়া, না-পাওয়া, চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন এসব চলচ্চিত্র। তাই হয়তো নারীর নিঃসঙ্গ একাকী জীবন দেখা যায় ৩৬ চৌরঙ্গী লেন-এ (১৯৮১)। আবার পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী কেবলই বোঝা। তাই মা-বাবার মুখ দেখানো কঠিন হয় সমাজে; ঠিক যেমনটি সতীতে (১৯৮৯)। আবার সেই বোঝা (নারী) ইচ্ছে করলেই করতে পারে অনেক কিছু, তারই প্রমাণ পাই পারমিতার একদিন-এ (২০০০)। স্বামী-সন্তান ও সংসারের যান্ত্রিক ব্যস্ততায় নারী ভুলেই যায়, সে একসময় সেতার বাজাতো, কবিতা আবৃত্তি করতো কিংবা তার স্বপ্ন ছিলো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা শিক্ষক হওয়ার। তাই পরমার (১৯৮৪) মতো নারীরা কখনো কখনো চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানকে, দাঁড়াতে চায় সমাজের প্রচলিত নিয়ম-নীতির বাইরে।
সংসারের গণ্ডির বাইরে কাউকে ভালোবাসার স্বাধীনতা কোনো নারীর নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রাত্যহিক চলাফেরায় নারী যেকোনো সময় কারো প্রতি দুর্বল কিংবা প্রেমে পড়তেই পারে, চাইতে পারে পূর্ণতা। অথচ মিসেস আয়ারদের মতো নারীরা অনুশাসনের শিকড় ছিঁড়তে পারেন না বলে হয়তো এখনো কারো জন্য চোখের জল ফেলেন। আবার চলতি যান্ত্রিকতায় আমরা এতোটাই ব্যস্ত যে, খোঁজ রাখতে পারি না কাছের মানুষটিরও। যে কারণে ধীরে ধীরে আঘাত লাগে আমাদের মানবিক সম্পর্কগুলোতে—যুগান্ত (১৯৯৫) এ রকম এক মানবিক সম্পর্কের গল্প বলে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কি নারীর গতিপথের কোনো পরিবর্তন হয়েছে; নাকি তারা মৃণালিনীর মতো আধুনিকতার ধোঁয়া তুলে আজও পুরুষের দ্বারা দাহ হচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন মাধ্যমে—এ ধরনের নানা বিষয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন অপর্ণা তার চলচ্চিত্রগুলোতে। যেনো সেলুলয়েডের ফিতায় নারীর নির্মাণ পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে আঘাত করেছে বারবার। অপর্ণার এমনই একটি চলচ্চিত্র গয়নার বাক্স। আর এই আলোচনা গয়নার বাক্সকে নিয়ে।
৩.
একটি পরিবারের দিবা-রাত্রির বিচিত্র ঘটনা শিল্পিতরূপে পরিস্ফুট হয়েছে গয়নার বাক্স-এ। যেখানে তিন প্রজন্মের তিন নারীর হাতে গয়নার বাক্স ব্যবহার হয় ভিন্নভাবে। আর এর মাধ্যমে ধরা পড়ে সমাজের বিভিন্ন প্রজন্মের নারীদের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি। চলচ্চিত্রের শুরু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পটভূমিতে আর শেষ ১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। যেখানে উঠে এসেছে রাসমণি নামের এক বাল্যবিধবার একাকিত্ব আর মনঃকষ্ট। অল্প বয়সে স্বামী হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তার সুখের যাবতীয় অনুভূতিগুলোরও যেনো মৃত্যু হয়। অন্যান্য বিধবাদের মতো পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হতে না হলেও কেউ তাকে এতোটুকু বোঝার চেষ্টা করেনি; যতোটুকু করেছে তাও কেবল তার গয়নার বাক্সের জন্যই। একদিন হঠাৎ রাসমণি মারা যান সবার অলক্ষে। আর সঙ্গে সঙ্গে বাক্সটা খোঁজার হিড়িক পড়ে যায় বাড়িতে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কেউ আর বাক্সটা খুঁজে পায় না। ‘ভূত’ হয়ে রাসমণি তার প্রাণাধিক প্রিয় গয়নার বাক্সটা সযত্নে রাখার দায়িত্ব দেন তার সহজ-সরল ভাইপো-বৌ সোমলতাকে।
রাসমণি তার মনের সব চাওয়া-পাওয়াকে পূর্ণতা দিতে বেছে নেন সোমলতাকে। তাই গয়নার বাক্সের গয়না আর আগের মতো থাকে না; সোমলতা এটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন ভিন্নভাবে। একপর্যায়ে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এই গয়নার বাক্স দিয়েই সোমলতা নিজেকে আত্মনির্ভরশীল নারী হিসেবে গড়ে তোলেন। সোমলতা হয়ে ওঠেন অকর্মা শ্বশুর-স্বামী-ভাসুরের আশার আলো। একসময় সফল নারী সোমলতার কাছে গচ্ছিত থাকা গয়নার বাক্স উত্তরাধিকার সূত্রে তারই মেয়ে চৈতালীর হাতে আসে। কিন্তু গয়নার বাক্সে তার যেনো কোনো আগ্রহ নেই। সে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এটা দান করে দেয়।
রাসমণি, সোমলতা এবং তার মেয়ে চৈতালী—তিন প্রজন্মের তিন নারী আর এক গয়নার বাক্সকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়ে চলে। সঙ্গে যুক্ত হয় তৎকালীন সমাজব্যবস্থার নানা চালচিত্র। একদিকে যেমন পাওয়া যায় সেকালের নারীদের অসহায়ত্বের গল্প, অন্যদিকে স্বাধীনচেতা নারীদের মুক্তির স্বাদ। আর এ রকম ফ্যান্টাসি-নির্ভর চলচ্চিত্রে বাস্তবমুখী গল্প বলার যে দুঃসাহস অপর্ণা দেখান তা সত্যিই প্রশংসা পায়।
৪.
অস্ত্রের জোরে অন্যান্য দেশের মতো ভারতবর্ষেও উপনিবেশের গোড়াপত্তন হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগে। পলাশীর মাঠে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তার ভিত আরো শক্তিশালী হয়। কিন্তু ইংরেজরা যখন রাজত্ব শুরু করে তখন আমাদের সমাজ-সস্কৃতি, রীতি-নীতি, ভাষা প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে সাড়ে পনেরো আনাই৩ তাদের অজানা ছিলো। তাই ‘দেওয়ানি হাতে নিয়েই ইংরেজ টের পায় যে এ দেশের কৃষিব্যবস্থা অতি প্রাচীন, জমির সঙ্গে রাজা ও প্রজার সম্পর্ক এখানে নানা সনাতন প্রথায় নিয়ন্ত্রিত, এবং জমির মালিকানা, ফসলবোনার কায়দা ইত্যাদি সব কিছুই এক সাবেক সংস্কারের অঙ্গ।’৪ ফলে এ রকম একটি অপরিচিত দেশ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করা ইংরেজ রাজশক্তির পক্ষে মোটেও সহজ ছিলো না। তাই ইংরেজদের প্রয়োজন পড়লো কিছু এদেশিয় প্রতিনিধির। যারা ভারতের বুকে নির্বিঘ্নে পদচারণায় তাদের পথ-প্রদর্শকের (সোজা কথায় দালাল) ভূমিকা পালন করবে।
এজন্য তারা সমাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী; বিশেষ করে হিন্দু জমিদার ও ক্ষমতাবান রাজাদের হাত করে নেয় বিভিন্ন কায়দায়। আর তখন সমাজে এদের স্থান হয় ইংরেজদের ঠিক পরেই; ফলে বাড়তে থাকে তাদের দম্ভ। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে ঘটে যাওয়া শিল্পবিপ্লব একসময় ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবী জুড়ে; বিকাশ ঘটে মধ্যবিত্ত শ্রেণির, বাড়তে থাকে পুঁজির দাপট। সমসাময়িককালে ব্রিটিশ যুগে নতুন রূপে আবির্ভূত জমিদার শ্রেণিতে দেখা দেয় ভাঙন। আর পুঁজিবাদের ঘেরাটোপে যেনো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে জমিদারিত্বের দিনলিপি। সেই জমিদারিত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি মারে দেশভাগ। তবে জমিদারি হারিয়ে যেতে থাকলেও দম্ভের কিন্তু কোনো কমতি দেখা যায় না। গয়নার বাক্স-এ সোমলতার শ্বশুর-স্বামী-ভাসুর যেনো তারই প্রতীক। তাইতো দেশভাগের পর তাদের বাসস্থানের পরিবর্তন ঘটলেও; কেবল পরিবর্তন ঘটে না সেই জীবন-যাপনে। তাই টাকার পরিবর্তে পাওনাদারদের দিতে হয় বাড়ির দামি দামি জিনিসপত্র। অবশ্য তাতেও কোনো মাথা ব্যথা নেই তাদের। কারণ তারা জমিদার, পরের গোলামি করা তাদের সাজে না। ক্ষমতা কাঠামোর এমন জায়গায় তাদের অবস্থান যে, সেখানে থেকে কাজ করতে গেলে তাদের সেই ক্ষমতার জায়গাটা হারিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে! তাইতো সোমলতার স্বামী কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাগো বংশের পুরুষরা কখনো পরের গোলামি করে না।’
একই দম্ভ আমরা দেখি সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর-এ। সেখানে সামন্তপ্রভুদের অবক্ষয় আর নব্য ধনিক শ্রেণির উত্থানের যুগ-সন্ধিক্ষণকে, বিশেষ করে তখনকার আর্থ-সামাজিক পটভূমিকে ক্যামেরায় বন্দি করেছেন সত্যজিৎ। জলসাঘরের বাতিগুলো নিভে গেলে ভৃত্য অনন্ত যখন জানালার পর্দা সরিয়ে দেয়, তখন আলোয় ভরে ওঠে ঘর; এ দিয়ে সত্যজিৎ সামন্ততন্ত্রের বিদায় আর পুঁজিবাদ আগমনের আওয়াজ দেন। রায় বংশের শেষ জমিদার বিশ্বম্ভরের অহঙ্কার আর নির্বুদ্ধিতার কারণে জমিদারি দিন দিন হারিয়ে গেলেও সেই দম্ভ থেকেই যায়। তাইতো উঠতি ধনী মহিম গাঙ্গুলির উদ্দেশে বিশ্বম্ভর রায়কে আমরা বলতে শুনি, ‘সে পারেনি, পারেনি... কেনো পারেনি জানো? ...রক্ত... রক্ত।’ যেনো ধমনিতে প্রবাহিত পূর্বপুরুষের রক্তের গরিমা তাকে বারবার উত্তেজিত করে তোলে। শেষে অপরিণামদর্শী বৃদ্ধ জমিদার ঘোড়ায় চেপে ছুটতে থাকেন নতুন সূর্যোদয়ের হাতছানিতে। কিন্তু ওই সূর্যোদয় যে কেবলই মরীচিকা, অহঙ্কারী বিশ্বম্ভর তা বুঝতে পারেন জীবন দিয়ে।
শুধু বংশ-মর্যাদার বড়াই নয়, বাস্তুহারা এই জমিদারদের আরো একটা মোক্ষম অস্ত্র ছিলো পুরুষ হিসেবে তাদের উদ্ধত আচরণ। এজন্য ঘরে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রয়োজন পড়তো পরনারীর। যেনো নারী তাদের কেনা দাস; যাকে ইচ্ছে মতো যেকোনো কাজে লাগানো যায়। অন্যদিকে, সোমলতা জমি সম্পর্কে জানতে চাইলে তাকে তহসিলদারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। নারীর যেনো পারিবারিক বিষয়ে মতামত এবং কোনো কিছু সম্পর্কে জানারও অধিকার নেই। যেখানে পুরুষ কোনো কাজে হাত দিলে ‘আত্ম-সম্মানে’ বাধে; সেখানে নারীর তো প্রশ্নই আসে না। তাইতো সোমলতা যখন স্বামী চন্দনকে নিয়ে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন, তখন তার শ্বশুর-ভাসুরের ‘বংশ-মর্যাদা’য় আঘাত লাগে। সোমলতার শ্বশুরের মুখে উচ্চারিত হয়, ‘আমাগো বংশের পোলা দোকানদারি করতে বইছে!’ এমনকি পারিবারিক শালিস ডেকে সোমলতাকে বলা হয়,
তুমি এক বেহায়া মাইয়া
শ্বশুর কূলে কালি দিয়া
বংশের নামে নাম ডুবাইয়া
অ্যাহন আইছো বুক ফুলাইয়া
দোকান খুইলা ব্যবসা করতে, ছি!
তাদের কাছে নারী যেনো কেবলই গৃহিণী; সে শুধুই গৃহপরিচর্যা, সন্তান উৎপাদন, লালন-পালন, আর স্বামী সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শুধু জমিদারদের ক্ষেত্রেই নয়, গোটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে দেখা হয় একই দৃষ্টিতে। কিন্তু অপর্ণা সেন যেনো নারীকে এই গণ্ডির মধ্যে ধরে রাখতে রাজি নন।
৫.
‘আমি ঈর্ষাকাতর নই, আমি অচরিতার্থ’ আত্মহত্যার আগে এমনই বলেছিলেন আন্না; টলস্টয়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘আন্না কারেনিনা’র নায়িকা। যিনি স্বামীকে ত্যাগ করেছেন প্রেমিকের হাত ধরে। আর প্রেমিককে ত্যাগ করেছেন আত্মহননের মধ্য দিয়ে। সেন্ট পিটার্সবুর্গে বিয়ে হয়েছিলো সরকারের সর্বোচ্চ আমলাদের একজনের সঙ্গে আন্নার। স্বামীর সঙ্গে তার বয়সের তফাত ছিলো কুড়ি বছরের। স্বামী সর্বদাই ব্যস্ত; দিনের অধিকাংশ সময় কাটে অফিসে আর ছুটি কাটে ইউরোপে। আর আন্নার পুরোটা সময় জুড়ে ঘর-সংসার সামলানো ও পতির জন্য অপেক্ষা। কিন্তু একপর্যায়ে ভ্রনস্কি নামে এক যুবকের প্রেমে পড়েন আন্না, পালিয়েও যান সংসারের মায়াজাল ছিন্ন করে। একসময় তারা দেশে ফিরে আসেন; কিন্তু সমাজ তাদের গ্রহণ করে না। অথচ তার ভাই স্টিভা অবলনস্কি স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও পরকীয়া প্রেম করলে তার বেলায় ওই একই সমাজ থাকে নীরব; কিন্তু নারী-আন্না প্রাণ দেন ঠিকই।৫ অবশ্য আন্নার বিয়ে থেকেই শুরু হয়েছিলো সঙ্কটের। বয়সের বিস্তর ব্যবধানের এই বিয়েতে সম্পর্কের চেয়ে হয়তো ক্ষমতাবান জামাই পাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো আন্নার পরিবারের! তাইতো আন্না নারী হয়ে ওঠার আগেই হয়ে উঠেছিলেন স্ত্রী।
গয়নার বাক্স-এ বিধবা পিসিমা রাসমণিকে আমরা আন্না থেকে খুব একটা আলাদা করতে পারি না। তাকেও আন্নার মতো সুবিধা পাওয়ার আসায় মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের হাতে তুলে দিতে পিছপা হননি মা-বাবা। আর ব্রাহ্মণের এক পা কবরে গেলেও হিন্দু সমাজের দেবতা সে। তাই স্বর্গে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেও রাসমণির মতো সদ্য ফোটা ফুলের পূজা নিতে তাদের বাধে না। কিন্তু দেবতা তো স্বর্গে চলে যান। আর সদ্য ফোটা কুঁড়িটি সাদা কাপড়ে মুড়ে পৃথিবীর ভাগাড়ে পড়ে থাকে নিঃশ্বাস ওঠা অবধি। সব রঙ, আলো যেনো তার কাছে বিবর্ণ, আমিষ ছোঁয়াও তার নিষেধ। আন্নার মতো রাসমণিরও সঙ্কটের শুরু বিয়ে থেকেই। কিন্তু আন্না তার স্বামী থেকে কিছু না পেলেও রাসমণি ঠিকঠাক ফেরত পেয়েছিলেন যৌতুকের সেই গয়নার বাক্সটি। আর সবকিছু ভুলে গয়নার বাক্সই যেনো হয়ে ওঠেছিলো তার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা-ক্ষমতার প্রতীক।
কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীর কাছে গয়নাকে মূল্যবান করে তুললেও; সোনার গয়না যে দাসত্বের নিদর্শন তা বেগম রোকেয়া ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন এটা পুরুষের কাছে নারীর দৈহিক উপযোগিতা বৃদ্ধি করার একটা প্রক্রিয়া মাত্র। এমনকি পুরুষের অধঃস্তনতার আরেকটা ধাপও বটে। তাইতো কারাগারে আসামিদের যেমন লৌহনির্মিত বেড়ি পরানো হয় তেমনি নারীদের পরানো হয় স্বর্ণ-রৌপ্যের বেড়ি।৬ আর এই স্বর্ণ-রৌপ্য ব্যবহার করে ‘অসহায়’ নারী পায় একধরনের আত্মতৃপ্তি। কারণ তাদের এমন এক অনুশাসনের মধ্যে রাখা হয়; যেখান থেকে তারা আর বের হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, সুন্দর ও কণ্ঠস্বর মধুর কোনো পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে মানুষ যেমন গর্ব অনুভব করে;৭ তেমনি নারীকে গয়নার মতো বাক্সে বন্দি করে আমাদের সমাজ গর্ব করে। গয়না যেমন সৌন্দর্যের প্রতীক; তাকে ধরা যায়, ছোঁয়া যায় অথচ বাইরের কোনো কাজে লাগানো যায় না; ঠিক নারী সম্পর্কে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ধারণাটাও তেমন। তাইতো রাসমণিকে বাড়ির বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করতে দেওয়া হয় না; স্বপ্ন থাকা সত্ত্বেও হয় না তার বাস্তবায়ন। চাওয়া-পাওয়া ও স্বপ্ন যেনো ডুকরে কাঁদে গয়নার বাক্সে। রাসমণি অর্থাৎ নারীর প্রকৃতি যেনো হয়ে ওঠে গয়নার বাক্স। তাইতো পুরুষও নারীকে ব্যবহার করে গয়নার মতো, যতোক্ষণ তাদের প্রয়োজন।
এজন্য পুরুষের থাকতে হয় একাধিক যৌনসঙ্গী; এছাড়া তাদের ‘পুরুষত্ব’ থাকে না। গয়নার বাক্সতে সোমলতার স্বামী ও শ্বশুর ওই পুরুষদের প্রতিনিধিত্ব করে; স্টিভা অবলনস্কির মতো প্রয়োজন পড়ে পরনারীর। কিন্তু নারীর ইচ্ছে থাকলেও তারা সেটা চিন্তাও করতে পারে না সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে। কাম যেহেতু শারীরবৃত্তীয় চাহিদা সেহেতু এই চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রাসমণি ক্ষণিকের জন্য হলেও আন্না কিংবা ডিডোর মতো গোপন সঙ্গম লাভের চেষ্টা করে। তবে আন্না স্বামী থাকা সত্ত্বেও অন্যের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, এমনকি পালিয়ে গিয়েছিলেন। আর ভার্জিলের মহাকাব্য ‘ঈনিদ’-এর নায়িকা ডিডো, স্বামীর মৃত্যুর পর নিজেকে আঁকড়ে ধরে না রেখে ট্রয়ের রাজবংশের শেষ প্রদীপ মহাবীর ঈনিয়াসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন গোপন সঙ্গমে। কিন্তু রাসমণি তা পারেননি; বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো সমাজ। তবে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে কার্পণ্য করেননি রাসমণির ‘ভূত’, বলেছেন, ‘ক্যান? কেবল পুরুষগুলোর রক্ষিতা থাকবো ক্যান? মাইয়া মাইনষের বুঝি সাধ-আহ্লাদ থাকবার পারে না।’
৬.
শোনা গেলো দরজা খোলার শব্দ। যেনো ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে গভীর রাতে। সেই শব্দ যেনো সারা ইউরোপে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আর নোরার চলে যাওয়ার ওই শব্দ ওয়াটারলু’র কামানের আওয়াজের চেয়েও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বার্নাড শ। এই নোরা ছিলেন হেনরিখ ইবসেনের ‘পুতুলের সংসার’ নাটকের নায়িকা। নোরার স্বামী হেলমার ছিলেন ব্যাংকের ম্যানেজার; সংসার জীবন ভালোই কাটছিলো তাদের। তার পরও হঠাৎ একদিন ঘর ছাড়লো নোরা। না, কোনো পাগলামিতে নয়; ছাড়লো ‘মুক্তি’র খোঁজে। হেলমার যে দুর্বৃত্ত ছিলো এমনও নয়; তিনিও সাধারণ আর পাঁচটা স্বামীর মতোই। আর পাঁচজনের মতো নোরার কথায় উদ্বিগ্ন হয়ে তিনিও বলেছিলেন, ধর্মের কথা, সমাজ কী বলবে সে কথা—নোরা যেনো নিবৃত্ত হয়, গৃহত্যাগ না করে। শেষ পর্যন্ত তিনি দোহাই দেন স্বামী-সন্তানের প্রতি ‘কর্তব্যে’রও। কিন্তু নোরার দৃঢ় জবাব, ‘প্রায় সমান পবিত্র আর একটি কর্তব্য রয়েছে আমার। আর সেটা আমার নিজের প্রতি।’ নিজের প্রতি এই ‘কর্তব্য’ পালন করতে গিয়েই হয়তো ঘর ছাড়তে হয়েছিলো তাকে। পুরুষশাসিত ওই সমাজব্যবস্থাকে কোনোভাবেই মানতে রাজি ছিলেন না নোরা। তাই কথাগুলো তিনি কেবল স্বামীকেই নয়; গোটা সমাজব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করেই বলছেন। পৃথিবীতে নারী যে পুতুল হয়ে আছে এ সত্য ধরা পড়ে গেছে নোরার চোখে। তাই ওই খেলার পুতুল হতে আর রাজি নন তিনি। আর এজন্যই বোধহয় বেরিয়ে পড়েন অন্ধকার থেকে ‘মুক্তি’র খোঁজে।৮
নোরার সঙ্গে আমরা সোমলতাকে খুব একটা পৃথক করতে পারি না। তিনি নোরার মতো হয়তো গৃহত্যাগ করতে পারেননি; কিন্তু ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন নিজের ক্ষমতার জায়গাটাকে। নিজের ভিতরে যে সুপ্ত ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ঘটেছে, তারই বলে গয়নার বাক্সটি ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন সোমলতা। কারণ সোমলতারা আজ রাসমণিদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন, সোনার গয়নারও একটা ক্ষমতা তথা অর্থমূল্য আছে; শুধু নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধিই এর একমাত্র উপযোগিতা নয়। তাইতো সোমলতা গয়না বন্ধক রেখে শুরু করেন ব্যবসা। কিন্তু এবারও বাধা হয়ে দাঁড়ায় পুরুষতান্ত্রিকতা। তার পরও সোমলতারা থামে না, সবকিছুর বাইরে এসে দাঁড়িয়ে বা দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে হজম করতে হয় অনেক কটুকথা।
তাদের থামলে চলে না। কারণ নারী ‘দৈহিক দিক দিয়ে পুরুষদের মতো শক্তিশালী না হলেও প্রকৃতি নারীদের এমন কিছু গুণ দিয়েছে যার মাধ্যমে তারা এই বিষয়গুলোকে উতরে বের হয়ে আসতে পারে। তারা অপেক্ষাকৃত বেশি সৎ, অকপট এবং অনেক দিক দিয়েই বেশি শক্তিশালী।’৯ আর সোমলতার ওই শক্তি ছিলো বলেই হয়তো তিনি প্রমাণ করে দেখান নারীও করতে পারে অনেক কিছুই। তারা গয়নার বাক্সের মধ্যে বন্দি থাকার জিনিস না। অন্যদিকে, সমকক্ষতার বিচারে পুরুষ-স্বামীকে একেবারে ফেলে দেননি সোমলতা। স্বামী পরনারী আসক্ত জেনেও তাকে ঘৃণা করেননি। তাকে বুঝিয়েছেন, সময় দিয়েছেন; তাতে কিছুটা কাজও হয়েছে। তার ভাষায়, মনের ওপর তো আর জোর চলে না। অথচ সোমলতা কিন্তু তার নিজের ওপর জোর খাটিয়েছেন। তাইতো তার প্রেমে এক মুসলমান কবি প্রায় পাগল হলেও তিনি তার ‘নৈতিক’ জায়গা থেকে সরে দাঁড়াননি। যদিও ভূত রাসমণি বারবার তাকে উদ্বুদ্ধ করেন যৌবনের স্বাদ নিতে। কারণ তিনি তো জানেন শরীরে বান ডাকলে সারাজীবন জল না পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণার কথা। তবে সোমলতা চাইলে দেখা করতে পারতেন কবির সঙ্গে শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে। কিন্তু তিনি নিজেকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করলেন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও। অপর্ণা কি এ রকম পরিস্থিতিতে পরিমিতিবোধ দেখালেন, নাকি শেষ পর্যন্ত নিজেকে সঁপে দিলেন—সেই প্রশ্ন জরুরি। নাকি পুরো দেয়ালটা একবারে ভাঙতে চাননি অপর্ণা? তাই হয়তো চৈতালীকে দিয়ে সোমলতার কাছে লিখিয়েছিলেন—
মা,
আমার জিনিস আমি নিলাম।
তোমার জিনিস তোমাকে দিলাম।
এত ভালবাসা অবহেলায়
ফিরিয়ে দিয়েছিলে মা?
চৈতালী
৭.
অ্যারিস্টটলের ভাষায়, ‘মেয়েরা হচ্ছে পুরুষের হীন সংস্করণ।’১০ কথাটির সঙ্গে আপনারা হয়তো কেউ একমত হবেন না। কারণ মেধা ও যোগ্যতায় নারীরা হীন, বিষয়টি মোটেও এমন নয়। সত্য এই যে, নারী তার আচার-আচরণ, তার শিক্ষা, তার বিশ্বাস প্রভৃতি বিষয়গুলোকে বাইরের বৃহৎ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিকশিত করবার সম্পূর্ণ সুযোগ পায়নি; মানে সুযোগ তাদের দেওয়া হয়নি। কালে কালে নারীর আত্মপ্রকাশকে নানাভাবে বিঘ্নিত করেছে পুরুষ। ঠিক যেমনটি করা হয়েছিলো রাসমণির বেলায়। তাইতো ১১-তে বিয়ে আর ১২ না পুরতেই বিধবা। তবে রাসমণির চেয়ে চিন্তা-ভাবনার জায়গা থেকে একটু এগিয়ে পরের প্রজন্মের সোমলতা। যার বদৌলতে পরিবারের লোকজনের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সোমলতার মেয়ে চৈতালী একেবারে ভিন্ন এক নারী। সে রাসমণি কিংবা সোমলতার মতো পুরুষ প্রাধান্যশীলতার বেড়াজালে বন্দি থাকেনি। সে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। যে উন্মুক্ত আকাশের নিচে এতোদিন পদচারণা করেছে শুধুই পুরুষ; সেখানে চৈতালী যেনো আজ নিজের অধিকার আদায় করে নিতে শুরু করেছে ভিন্ন এক পথে। কারণ দীর্ঘকাল ধরে নারীর হৃদয়মাধুর্য ও সেবানৈপূণ্যকে পুরুষ ব্যক্তিগত অধিকারের বেড়া দিয়ে রেখেছে। নারীরা কেবল অন্তরালেই থেকে করেছে ঘরের কাজ। কিন্তু চৈতালীর দ্বার খুলেছে মনের। চৈতালীরা আজ মুক্ত করে দিয়েছে হৃদয়কে, বুদ্ধিকে করছে বিকশিত; আর নিষ্ঠা প্রয়োগ করেছে জ্ঞানের তপস্যায়।
চৈতালীর মনে তাই ঠাঁই পায়নি রাসমণি ও সোমলতার মতো ‘স্বামীধর্ম’, পেয়েছে কেবলই ‘মানবধর্ম’। যার জন্য বংশ-পরম্পরায় পাওয়া গয়নার বাক্সে কোনো আগ্রহ নেই তার। সে নিজেই যে সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অলঙ্কার, তা ঠিকই বুঝে গেছে চৈতালী। কারণ তার সঙ্গে আছে শিক্ষা; যা তাকে এগিয়ে নেবে অনেক দূর। শিক্ষা ছাড়া যে নারীর এগোনোর কোনো বিকল্প নেই, বেগম রোকেয়া সেই ১৯ শতকের গোড়াতেই সে কথা বলেছিলেন। ‘উন্নতি এবং মুক্তির প্রথম শর্ত শিক্ষা, নিজেকে এবং জগৎকে জানা—এ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। সে জন্যেই পণ করেছিলেন যে, অশিক্ষিত নারীদের মধ্যে জ্ঞানের আলোক যতোটুকু পারেন ছড়িয়ে দিবেন আপন সীমিত শক্তি নিয়ে।’১১ শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত চৈতালীরও চিন্তার জগৎ জুড়ে রয়েছে তার কলেজ, বন্ধু-বান্ধব ও দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। এজন্য চৈতালী তার প্রেমিককে ভালোবাসা সত্ত্বেও বিয়েই যে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এমনটা মনে করেনি।
চৈতালীর প্রেমিক বেনু দা-ও তার মতোই এগিয়ে। সে-ও সোমলতার শ্বশুর-স্বামী-ভাসুরের থেকে একেবারেই আলাদা। যার কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন নিজের প্রেমের চেয়েও দামি। তাইতো যুদ্ধে মারা গেলেও সে ফিরে আসতে চায় এই সোনার বাংলায় জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো—
আবার আসিব ফিরে
ধানসিড়িটির তীরে—এই বাংলায়
চৈতালী তাকে অনেক ভালোবাসে, উৎসাহ যোগায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের। এমনকি নিজেও পাশে থেকে সার্বক্ষণিক সেবা করেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের। শুধু তাই নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গয়নার বাক্সটাও শেষ পর্যন্ত দান করে দেয় পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের মুক্তির সংগ্রামে। আর এভাবেই একজন মানুষ-নারীর গয়নার বাক্স হয়ে ওঠে আরেকজন নারী তথা দুর্বলের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর হাজারো মুক্তির প্রতীকে।
৮.
চলচ্চিত্রনির্মাণ যতোটা না কঠিন, তার থেকে বেশি কঠিন সুন্দর সমাপ্তির মধ্য দিয়ে তার যবনিকাপাত। সে দিক থেকে গয়নার বাক্সকে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বোধহয় দেখাই যায়। দেখুন, অপর্ণা কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে নিয়ে গেলেন; হাস্যোজ্জ্বল গল্পটিতে আপনি হঠাৎ-ই আবিষ্কার করবেন প্রচণ্ড এক ইমোশনাল পরিবেশ! আমার সোনার বাংলা শুনতে শুনতে আমিও ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছিলাম। তবে দেবজ্যোতি মিশ্র’র অসাধারণ সঙ্গীত পরিচালনা, বিশেষ করে বাংলায় র্যাপ মিউজিকের (Rap Music) ব্যবহার গয়নার বাক্সকে আলাদা একটা মাত্রা দিয়েছে। এছাড়া চলচ্চিত্রের শেষ অংশে প্রেমের কবিতাগুলো সত্যিই দর্শকদের নিয়ে যায় ভিন্ন এক জগতে। শেষে একটি কথা না বললেই নয়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত অপর্ণা সেনের গয়নার বাক্স চলচ্চিত্রটি বাংলা চলচ্চিত্রে এক অন্যতম সংযোজন বললে বোধ হয় ভুল হবে না।
অপর্ণার সুখ্যাতি মূলত অভিনয়ে। কিন্তু সময়ের আবর্তে আজ যেনো চলচ্চিত্রনির্মাতা অপর্ণা সেন ছাপিয়ে গেছেন অভিনেত্রী অপর্ণা সেনকে। যেনো তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে ‘নারী-ডিসকোর্স’কেও ভাঙার দায়িত্ব নিয়েছেন নিজ হাতে। আর এক্ষেত্রে অপর্ণা বোধহয় অত্যন্ত সচেতনভাবেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন চলচ্চিত্রকে। তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উদ্দেশে রাসমণি চরিত্রটি বেশ কিছু বাস্তব প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে; আবার নারীকে ওই সমাজের ‘আধিপত্য’ থেকে বের করে আনতে চৈতালীও দিয়েছে সুস্পষ্ট বার্তা। এজন্য অবশ্য অনেকে অপর্ণাকে নারীবাদী চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবেও দেখছেন। তবে তিনি শুধু নিজেকে ‘একজন নারীবাদী পরিচয়ের খোলসে বন্দী করতে আপত্তি’১২ জানিয়েছেন। কারণ তিনি হয়তো এভাবে নারীর ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হতে চান না; যে নারীর স্বপ্ন অপর্ণা দেখেন সেই নারীকে উদ্ধারে হয়তো কোনো ত্রাণকর্তা লাগে না, তার থাকে না নির্দিষ্ট কোনো পরিচয়ের গণ্ডি।
লেখক : মেহেরুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
meherul.mcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. ইসলাম, উদিসা (২০১৩ : ২০); ‘আমি লড়তে জানি, পরোয়া করি না’; মুখোমুখি ঋত্বিক-সত্যজিৎ; ভাষাচিত্র, শাহবাগ, ঢাকা।
২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উদ্ধৃত; চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম (২০০৫ : ১৩৯); ‘রবীন্দ্রনাথের নায়িকা’; ধ্রুপদী নায়িকাদের কয়েকজন; বিদ্যাপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা।
৩. গুহ, রণজিৎ (২০০৪ : ২৫); ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা—গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
৪. প্রাগুক্ত; গুহ, রণজিৎ (২০০৪ : ২৪)।
৫. চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম (২০০৫ : ১০৯—১২৬); ‘আন্না কারেনিনার আত্মহনন’; ধ্রুপদী নায়িকাদের কয়েকজন; বিদ্যাপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা।
৬. হক, মাহমুদ শামসুল (২০০৫ : ৪০); ‘অলঙ্কার’; নারীকোষ; হাতেখড়ি, ঢাকা।
৭. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৩ : ১৪১); ‘নারী’; কালান্তর; সালাউদ্দিন বইঘর, বাংলাবাজার, ঢাকা।
৮. চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম (২০০৫ : ১২৭—১৩৮); ‘নোরা, তুমি যাবে কোথায়’; ধ্রুপদী নায়িকাদের কয়েকজন; বিদ্যাপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা।
৯. ইসলাম, উদিসা (২০১৩ : ৭৩); ‘সবসময় খুশীর সিনেমা বানানো সম্ভব না’; মুখোমুখি ঋত্বিক-সত্যজিৎ; ভাষাচিত্র, শাহবাগ, ঢাকা।
১০. অ্যারিস্টটল, উদ্ধৃত; চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম (২০০৫ : ৭); ‘অবতরণিকা’; ধ্রুপদী নায়িকাদের কয়েকজন; বিদ্যাপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা।
১১. মুরশিদ, গোলাম (১৯৯৩ : ১৭৭); ‘প্রথম নারীবাদী : রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’; নারীপ্রগতির একশো বছর : রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া; অবসর প্রকাশনা সংস্থা, সূত্রাপুর, ঢাকা।
১২. ‘অপর্ণা সেনের ‘না’’; প্রথম আলো, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন