Magic Lanthon

               

মেহেরুল ইসলাম

প্রকাশিত ০৭ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

কৌশলী গৌতমের শূন্য অঙ্ক’র ভয়াবহ শূন্যতা

মেহেরুল ইসলাম

 

কিছু কথা

বাস্তব কিংবা কল্পনার জগতকে ক্যামেরার মাধ্যমে দৃশ্যমান করে তোলাই চলচ্চিত্র নামের শিল্পমাধ্যমটির প্রধান কাজ। যেখানে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে বহমান সমাজের নানাধরনের সাংস্কৃতিক উপাদান। তাই যে সাংস্কৃতিক আবহের ভিতর দিয়ে এটা নির্মাণ করা হয়, তারই ছোঁয়া পাওয়া যায় ওই চলচ্চিত্রে। এজন্য শিল্পকলার প্রভাবশালী মাধ্যম, শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যম কিংবা শিক্ষার অন্যতম উপকরণ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে চলচ্চিত্রের। আর ভিজ্যুয়াল অর্থময়তার কারণে এই চলচ্চিত্র দেশ-কাল ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ করতে পারে, যা হয়তো অন্য কোনো শিল্পমাধ্যমের দ্বারা এতটা সম্ভব নয়।

অবশ্য চলচ্চিত্রের যাত্রাকালে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো শক্তিশালী মাধ্যম ছিলো না। কারণ, বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই শাসকশ্রেণি এটিকে নিজেদের মতো ব্যবহার করতে থাকেএমনকি অর্থলগ্নিও করে। এভাবে চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে থাকে তাদের আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম হাতিয়ার। ফলে চলচ্চিত্র আর সাধারণ মানুষের নাগালে থাকতে পারেনি, সঙ্গে তো অর্থনৈতিক সঙ্কট ও প্রাযুক্তিক দুষ্প্রাপ্যতা ছিলোই।

তবে আধুনিক চলচ্চিত্রের গণতন্ত্রায়নের এই যুগে সমাজের প্রতি যারা নিজেদের দায়বদ্ধতার কথা স্বীকার করেন, সৃষ্টিকে পৌঁছে দিতে চান সাধারণ মানুষের কাছে, তারা চাইলেই ক্যামেরায় বন্দি করতে পারেন রাষ্ট্রশাসিত সেই মানুষের না বলা কথাকে। কিন্তু প্রশ্ন, সবাই কি এই পথে হাঁটতে পারেন? নাকি কেউ কেউ রাষ্ট্র শাসকদের বেঁধে দেওয়া গণ্ডির মধ্যেই হারিয়ে যান; রাষ্ট্রের চোখ দিয়েই দেখতে থাকেন অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ আর পারিপার্শ্বিকতাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র যেভাবে চায় ঠিক সেভাবেই এই নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এতে বাহবাও আসে রাষ্ট্রের সব স্তর থেকে, মিলেও যায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মতো বড়ো বড়ো পুরস্কার।

কিন্তু তাতে কি ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে নির্যাতিত, অসহায় মানুষগুলোর? নাকি মূলধারার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, নিপীড়িত এই মানুষগুলোর কান্না আর আর্তনাদ আরো বেশি তলিয়ে যায় রাষ্ট্রের করতালি আর বাহ্বার ভিড়ে। কারণ সেখানে যেমন হাজির থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জাতীয়তাবোধ নামক ধারণা, তেমনি হাজির থাকে আপনপরের ধারণা কিংবা বলতে পারেন পরভীতি। তাই জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মূলধারার কোনো চলচ্চিত্রনির্মাতা যখন রাষ্ট্রের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইরত প্রান্তিক সমাজের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তখনই তা ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সভ্যঅসভ্যর দ্বন্দ্বে

একই মায়ের উদর সন্তান

আধুনিক রাষ্ট্র তার ক্ষমতা কাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে মানুষ নিজের দ্বারা নিজেই শাসিত হয়। বিষয়টিকে অনেকখানি ব্যাখ্যা করা যায় মিশেল ফুকোর অনুশাসন-এর ধারণা দিয়ে। যদি মানুষদের প্রতি দৃকপাত করা যায়, বিশেষভাবে তাদের দেহকাঠামোয় (body)তবে খোলাসা হবে এরা রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্র-সংযুক্ত সংস্থা কর্তৃক সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।আর রাষ্ট্রের এই সংস্থার নিয়ন্ত্রণে যারা থাকে, তারাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রর সচেতন নাগরিক, সভ্য সমাজের সভ্য মানুষ। পক্ষান্তরে, যারা এর বাইরে দাঁড়ায় কিংবা দাঁড়াতে বাধ্য হয়; তারা যেনো রাষ্ট্রের নাগরিক নয়, সভ্য সমাজের অসভ্য মানুষ। তাই প্রয়োজন পড়ে তাদের উচ্ছেদ, বিতাড়ন, এমনকি হত্যা করার। যেমনটি দেখা যায় আদিবাসীদের ক্ষেত্রে। মূলধারার জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে (বিশেষ করে প্রান্তিক এই মানুষগুলো তাদের শেষ সম্বল ভূমিটুকুকে যদি ব্যবসায়ী নাগরিকদের হাতে তুলে দেয়, তাহলেই তাল মিলিয়ে চলা বুঝতে হবে) না পারায় রাষ্ট্রের চোখে তারা অসভ্য, জংলি; তারা সমাজের সভ্য মানুষের জন্য মোটেও মঙ্গলকর নয়। তাই এই অসভ্যজংলিদের কাছ থেকে সভ্য মানুষদের দূরত্ব বজায় রাখা রাষ্ট্রের কাছে মঙ্গলজনক বলেই মনে হয়।

এজন্য তাদের নাগরিকত্ব দিতে কিংবা আদিবাসী বলে স্বীকার করতেও কষ্ট হয় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র ক্রমাগত অবহেলা, বঞ্চনা ও অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তাদের দেশান্তরিত হতে বাধ্য করে, কেড়ে নেয় ভূমি অধিকার। এ কারণে আজও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলে প্রত্যক্ষ সেনা মদদে কিংবা অভিবাসিত বাঙালি দ্বারা পাহাড়ি জনপদে একের পর এক রোমহর্ষক গণহত্যা, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, পাহাড় ও অরণ্যভূমি দখলের মহোৎসব চলে।

ভৌগোলিক ও শারীরিক ভিন্নতা থাকলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীদের মিল রয়েছে তাদের প্রান্তিক অবস্থান, শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র, অশিক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে। যা দেখতে অবশ্য দূর দেশ অস্ট্রেলিয়া কিংবা আমেরিকায় চোখ রাখার প্রয়োজন পড়ে না, পাশে থাকা বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের দিকে তাকালেই ভুরি ভুরি উদাহরণ মিলে। যেখানে আদিবাসীরা তাদের নিজ ভূমি রক্ষার্থে যুগের পর যুগ লড়াই করে যাচ্ছে রাষ্ট্র ও বৃহদাকার খনি-কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে। আর এই বিরুদ্ধাচরণই যেনো তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের চোখে আজ তারা মাওবাদী সন্ত্রাসী। রাষ্ট্র তাদেরকে সন্ত্রাসীর তকমা লাগিয়ে আইনের বৈধতা নিয়ে যত্রতত্র ক্রসফায়ার-এ হত্যা করে নির্দ্বিধায়।

এমতাবস্থায়, নিরুপায় এই মানুষগুলো হয় নিজের গলায় দেয় দড়ির ফাঁস অথবা অস্ত্র হাতে নেমে পড়ে শ্রেণিশত্রু খতম করে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু পেশি শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্র তাদের আর বেশি দূর এগোতে দেয় না। যেমনটি দেখা যায়, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা গৌতম ঘোষের শূন্য অঙ্ক-তে (২০১৩)।

শূন্য অঙ্কদৃশ্যপট 

শূন্য অঙ্কর উৎস সম্পর্কে গৌতমের ভাষ্য, লালা নামে হিন্দি-ইংরেজিতে আমার দ্বিভাষিক ছবিটা নিয়ে একটা মিটিং সেরে রোম থেকে ফিরছিলাম। সেই সময়ই ফ্লাইটে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে শেষ লাইনটায় এসে আমি আটকে গেলাম। ওই লাইনটা ঠিক একটা বুলেটের মতো যেন আমায় চার্জ করল। লাইনটা ছিলআ ম্যান ক্যান বি ডেস্ট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড! এই শেষ লাইনটাই শূন্য অঙ্ক ছবির ভাবনাটা মনের মধ্যে তৈরি করে দিল। অর্থাৎ একজন মানুষ ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু সে কখনো হারে না ভাবনায় উৎসাহিত হয়েই গৌতম শূন্য অঙ্ক নির্মাণ করেছেন। পাঠক তাহলে চলুন, জেনে নিই শূন্য অঙ্কর এই হার না মানা মানুষেরা কারা।

শূন্য অঙ্ক পুরনো গ্রিক নাটকের মতো নানা অঙ্কে ভাঙা, যা ১০টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। এর কেন্দ্রে রয়েছে অগ্নি বোস ও রাকা বিশ্বাস, সঙ্গে অগ্নির স্ত্রী ঝিলিক বোস। অগ্নি কাজ করে একটি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে (এম এন সি), যারা ভারতের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বক্সাইট খননের কাজ করে। কাজের সুবাদেই অগ্নিকে আসতে হয় বিধানগিরিতে। সেখানে সাংবাদিক রাকা অনুসন্ধান করতে যায়, কীভাবে বক্সাইট খনির খোঁজে আদিবাসীদের জীবিকাবাহী জঙ্গল, পাহাড় ধ্বংস করার ছক কষছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। ঘটনাক্রমে সেখানেই রাকা ও অগ্নি বোসের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অন্যদিকে ঝিলিক প্রাক্তন বিমানবালা, যে এখন উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত অন্তঃসারশূন্য জীবনের নিঃসঙ্গ গৃহবধূ।

আর এই নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে ওঠার জন্যই তুষারে আবৃত পর্যটন এলাকা মানালিতে দ্বিতীয় হানিমুনে (তাদের ভাষায়) যায় অগ্নি ও ঝিলিক। সেখানে মুসলমান এক বৃদ্ধ দম্পতি কবির চৌধুরী ও লায়লার বাড়িতে ওঠে তারা। লায়লা ধর্মপ্রাণ, ভিন্নধর্মাবলম্বীদের প্রতি অসহিষ্ণু; ছেলেকে হারিয়ে অদ্ভুত এক মানসিক রোগে ভুগছে। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী কবির চৌধুরী চেষ্টা করছেন একটি সুপার হ্যাকিং সিস্টেম তৈরি করে মানালি থেকে ভাইরাস পাঠিয়ে পৃথিবীর সব যুদ্ধবাজ দেশের কম্পিউটার ধ্বংস করতে।

যাহোক, বোস দম্পতিকে স্নেহের ছোঁয়া দেয় কবির ও লায়লা। এরই মধ্যে অগ্নি ও ঝিলিকের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতাও গড়ে ওঠে। মানালি থেকে ফিরে ঝিলিক বিমানবালা প্রশিক্ষণের জন্য একটি স্কুল চালু করে। আর অগ্নি ফিরে যায় রাকার প্রতি বন্ধুত্বের টানে সেই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়। অবশ্য কিছুক্ষণ পরই সেখানে যৌথবাহিনী মাওবাদীদের ওপর কম্বিং অপারেশন চালায়। এ পরিস্থিতিতে রাকাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে অগ্নি মরিয়া হয়ে ওঠে, কিন্তু বিপদ আসন্ন জেনেও রাকা সেই স্থান ছেড়ে যায় না। ফলে আরো অনেক আদিবাসী মাওবাদীদের সঙ্গে নিহত হয় রাকাও। এভাবেই শেষ হয় শূন্য অঙ্কর শূন্য অঙ্ক।

করপোরেটিয় নায়কে দেশ উদ্ধার

মানবসমাজ একটি অখণ্ড ও বহমান বাস্তবতা হওয়ার পরও মানুষের সামাজিক সত্তা ও স্বার্থ এবং ব্যক্তিসত্তা ও স্বার্থএই দুইয়ের সম্ভাব্য দ্বন্দ্বে নানা রূপান্তর ঘটে আমাদের চারপাশে। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে বিবর্তনের পথ পরিক্রমায় পুঁজিবাদ যেনো তারই প্রতিফলন। যেখানে আওড়ানো হয় মানুষের মুক্তচিন্তা আর অবাধ স্বাধীনতার কথা, যেখানে বিশ্ব ব্যবসায়ীরা ধনতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে গণতন্ত্র নামের এক অপূর্ব ব্যবস্থার ডিজাইন করে, যাতে খুব সহজেই জনগণের শ্রম শোষণ করে পুঁজির পাহাড় গড়া যায়।

আর পুঞ্জীভূত এই পুঁজির মোহে আবিষ্ট হয়ে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে নানা আইন ও চুক্তিতে জড়িয়ে রাষ্ট্রকর্তারা নিজেদের সম্পদ তুলে দেয় তাদের হাতে। তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চাইলেই রাষ্ট্রের কাছ থেকে  সরাসরি ওই সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন পড়ে কিছু উচ্চশ্রেণিভুক্ত দেশীয় প্রতিনিধির, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নির্বিঘ্নে সেই দেশের মাটিতে তাদের পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করে।

শূন্য অঙ্কতে ঠিক এ রকম একটি বহুজাতিক কোম্পানির দেশীয় প্রতিনিধি অগ্নি বোস, যাকে বক্সাইট খনি উত্তোলনের জন্য আদিবাসীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে পাঠানো হয় বিধানগিরিতে। কিন্তু এখানে এসে সাংবাদিক রাকার সান্নিধ্য পাওয়ার পরই এম এন সির এই উঠতি এক্সিকিউটিভ প্রকাশ করতে থাকে আদিবাসীদের প্রতি তার সংবেদনশীলতা; মনে হয়, যেনো সত্যিই সে নিপীড়িত ওই মানুষগুলোর কথা ভাবে। আর এভাবে চলচ্চিত্রের শুরুতেই সে হয়ে উঠতে থাকে নায়ক (জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে নায়ক মানেই সৎ, পবিত্র, ত্যাগী, গরিবের বন্ধু)। কিন্তু আদিবাসীদের প্রতি তৈরি হওয়া সেই সংবেদনশীলতা রাকার প্রতি বন্ধুত্বের টানে নাকি সহজাত কারণে তা পরিষ্কার হয় না। তবে আদিবাসীদের প্রতি অগ্নি বোসের এই নায়কি বেশ-ভঙ্গিমা কিন্তু চলচ্চিত্রের শেষ পর্যন্ত থাকেনি। তার কর্পোরেট চেহারাটি ঠিকই উন্মোচন হয় রাকার সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে :

রাকা বিশ্বাস : জাস্ট লুক অ্যাট দ্যাট মিয়ানডারিং ভ্যালি। কী সুন্দর না!

অগ্নি বোস : হুম, রিচ ইন বক্সাইট।

রাকা : থাক না, ওগুলো পাহাড়ের গভীরে। জঙ্গলে গাছ থাক, নদীতে জল থাক। সব কেনো নষ্ট করবো ইন দ্য নেইম অফ ডেভেলপমেন্ট?

অগ্নি : গ্লোবাল মার্কেট খুব রুথলেস রাকা।

এভাবে প্রকৃতির বিশুদ্ধতা উপভোগ কিংবা পাহাড়ের সৌন্দর্য না দেখে যে অগ্নি এসবের মধ্যেই তার প্রভু প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবক্সাইট খুঁজে বেড়ায়, তখন তার কর্পোরেট চেহারাটা নিয়ে অবশ্যই কোনো বিভ্রান্তি থাকার কথা নয়। হয়তো এ কারণেই তার চোখে সৌন্দর্য মানেই টাকা, সৌন্দর্য মানেই রুথলেস গ্লোবাল মার্কেটকে টেনে তোলা। যেখানে পাহাড়ের গভীরে থাকা বক্সাইট যতো বেশি সাজানো থাকবে, ততোই সে খুঁজে পাবে তার সৌন্দর্যকে। অথচ এই অগ্নি সেই পরিবারের, যাকে তার বাবা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, দেশের অনেক বঞ্চিত মানুষের কঙ্কালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার সমৃদ্ধি। এই অগ্নি সেই অগ্নি, যার চোখের সামনে এই গ্লোবাল মার্কেট রক্ষাকারীরা (রাষ্ট্র) তার ভাই পবন বোসকে হত্যা করেছিলো; যিনি কিনা চেয়েছিলেন শ্রেণিবৈষম্যহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। নায়ক করে তোলার গৌতমীয় যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন, তবে তাল গাছটি হবে তাদের (কর্পোরেটের)।

শূন্য অঙ্কর শেষ দৃশ্যে মাওবাদী সন্ত্রাসীদের হত্যা করতে অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষীরা যখন বিধানগিরিতে আসে, যখন শত শত নিরীহ মানুষ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে অগ্নি শুধু রাকাকেই নিরাপদে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। এমনকি এ সময় মারদাঙ্গা চলচ্চিত্রের নায়কের মতো সে তাকে কোলে পর্যন্ত তুলে নেয়, যদিও সে শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়। এরপর ঘটনাস্থল ত্যাগ করে রাকার চিন্তায় গাড়ির মধ্যেই নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে দেয়।

বোঝা যায়, রাকার প্রতিই যেনো তার সব মায়া। অথচ চলচ্চিত্রের শুরুতে আদিবাসীদের প্রতি তার যে সংবেদনশীলতা, তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না এই পরিস্থিতিতে। এসব মিলিয়ে অগ্নির কৌশলী উপস্থাপনে ব্যস্ত গৌতম। তিনিও কর্পোরেটিয় কৌশলেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাই সাদা চোখে স্বার্থপর, লোভী অগ্নির নায়কোচিত উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে অগ্নিরা হয়ে ওঠে ধোয়া তুলসী পাতা। নিঃস্ব ও শ্রেণিবৈষম্যের শিকার মানুষেরা তাই বিশ্বাস করে নিজেদের শেষ অবলম্বন বক্সাইটকে তুলে দেয় এই অগ্নি বোসদের হাতে।

পুরুষের সান্নিধ্যই তোমার স্বাধীনতা

অগ্নি বোসের সঙ্গে বয়ে চলেছে আরো একটি জীবনের গল্পস্ত্রী ঝিলিক বোস। ঝিলিক বিয়ের আগে বিমানবালা হিসেবে কর্মরত ছিলো, কিন্তু বিয়ের পর ডানা কাটা যাওয়ায় হতাশ। তাই চার দেয়ালের মধ্যে তার শূন্যতা পূরণ কিংবা স্বাধীনতা যাই বলি না কেনো তা কেবল অগ্নির সান্নিধ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যাহোক, এম এন সিতে কর্মরত অগ্নি নিজেকে নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, স্ত্রীর দিকে তাকানোর ফুরসত পর্যন্ত তার নেই। যে কথা সে নিজেই স্বীকার করে এভাবে,  আমি বুঝতে পারছি ঝিলিক, আমি যতো উপরে উঠছি, তোমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি; এবার হয়তো আমায় থামতে হবে। অগ্নি বোসদের এই থামতে চাওয়ার ইচ্ছে ক্ষণিকের হলেও নারীদের স্বস্তি দেয়, ঝিলিকের হাস্যোজ্জ্বল মুখই তার প্রমাণ।

অবশ্য অগ্নি বোসদের এই থামতে চাওয়ার শেষ হয় মানালি কিংবা অন্য কোনো অবকাশযাপন কেন্দ্রে কয়েকদিন ছুটি কাটানোর মধ্য দিয়ে; যেখানে রুটিনে বাঁধা খানিকটা নাচ, গান, আর ফুর্তি করিয়ে স্বামী হিসেবে দায়িত্বও পালন করা যায়। কিন্তু তাতে কি নারী হৃদয়ের ওপর জমাট বাঁধা নিকষ কালো মেঘ সরে গিয়ে রোদ্দুরের দেখা মিলে? হয়তো না। কারণ অগ্নি বোসদের দায়িত্ব পালনের ঘোর কাটলে আবার সেই ব্যস্ততা, আবার তাদের সেই থামতে চাওয়া পর্যন্ত নারীর অপেক্ষা।

তাইতো স্ত্রী ঝিলিকের রোজকার সঙ্গী হয়ে ওঠে মদ, সিগারেট আর সেই সঙ্গে যাপিত জীবনের নিঃসঙ্গতা। যা তাকে নিষ্প্রভ করে দেয় প্রতি মুহূর্তে। হয়তো এজন্যই ঝিলিকের চোখে আজ সবকিছুই খেলনা মনে হয়। যদিও   সে নিজেই সংসারে খেলনার চেয়ে বেশি কিছু নয়। পণ্যের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার মতো, যার আর কোনো মূল্য নেই, যেনো পুরুষ অগ্নির মূল্যায়নেই তার মূল্য, আত্মতৃপ্তি। এ কারণে ঝিলিক যখন পুরুষ-অগ্নির অনুপস্থিতিতে একাকিত্বে ভোগে; এমনকি যন্ত্রণায় নিঃশেষ হয়, তখনো তাকে অন্য একজন পুরুষকে প্রত্যাশা করতে হয় এভাবেI want a man.। যেনো পুরুষই নারীর সব রোগের মহৌষধ। হয়তো ঝিলিক এতদিনে বুঝে গেছে, পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে পুরুষের সান্নিধ্য পাওয়ার মধ্যেই রয়েছে মানুষ হওয়ার সার্থকতা!

তাই স্বামী অগ্নির কাছে একধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও পুরুষ প্রত্যাশী এই ঝিলিককে বলতে শোনা যায়, আই অ্যাম সরি। তখন সত্যিই ধন্দ লাগে, যেনো হাজার দোষ করলেও পুরুষের সরি বলা যাবে না; বলার কর্তব্য একমাত্র নারীরই। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এ যেনো নারীর সেই চিরাচরিত রূপ, আর এতে স্পষ্ট হয় শূন্য অঙ্কর নির্মাতা নারীর কোন্ ইমেজ নির্মাণে অগ্রসর হচ্ছেন।

এর প্রমাণ আরো আছে, বিজ্ঞান ও ধ্বংস শুধু যে পুরুষের জন্য তাও একপ্রকার বলার চেষ্টা আছে শূন্য অঙ্কতে। ঝিলিক যখন কবির চৌধুরীর হ্যাকিং সিস্টেম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তখন লায়লা চৌধুরী বলে ওঠে, ঝিলিক, তোমাকে আর ওই সব পাগলামো দেখতে হবে না, তুমি বরং একটা গান শোনাও। এমনকি কবির চৌধুরী আর অগ্নি যখন প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত, তখন লায়লা চৌধুরী ব্যস্ত ঝিলিককে রান্না শেখানো নিয়ে। যেনো পুরুষতন্ত্র তার আপন স্বার্থে পরিকল্পিত এক বিশেষ ছকে বেঁধে দিয়েছে নারী-পুরুষের ব্যক্তিত্বকে। তাইতো পুরুষ-গৌতমের কাছেও স্থির হয়ে গেছে, পুরুষ মানেই সৃষ্টিশীল, ধ্বংসাত্মক, বুদ্ধিমান, বলবান; আর নারী, সে তো রাঁধুনী, মিষ্টভাষী, নিষ্ক্রিয়, কামের আধার ও বশ মানা কোনো খাঁচার পাখি। 

ঘুঘু দেখেছো, ঘুঘুর

ফাঁদ দেখোনি

আগেই বলেছি, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলচ্চিত্র আজ সাধারণের কাছে; নিজেকে সে প্রতিষ্ঠিত করেছে স্বতন্ত্র এক শিল্পমাধ্যম হিসেবে। যা কখনো কখনো বাস্তবের ছোঁয়া পেয়ে আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতার খানিকটা ছোঁয়া শূন্য অঙ্কতে দেখে দর্শক হিসেবে অনেক সময় স্বস্তি লাগে। ডা. প্রবাল রায়কে দেখে মনে পড়ে যায় বাস্তবের ডা. বিনায়ক সেনকে। যে বিনায়ক সেন এই প্রবাল রায়ের মতোই নিঃস্ব আদিবাসীদের স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে তাদের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ এই মানুষটিকেই রাষ্ট্র একসময় গ্রেপ্তার করে নকশালপন্থিদের বার্তাবহনের অভিযোগে। অন্যদিকে রাষ্ট্র কর্তৃক নিপীড়িত মানুষের কথা যার লেখনীর হাতিয়ার, সেই সাহসী মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক অরুন্ধতী রায়ের মতোই মনে হয় শূন্য অঙ্কর রাকা বিশ্বাসকে। কাহিনিচিত্রের কাহিনিতে প্রামাণ্যতার উপস্থিতির জন্য গৌতম অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখেন।

অবশ্য আমার আলোচনা অন্য জায়গায়। রাকা জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছেন মহৎ পেশা হিসেবে, এমনকি এই পেশার ওপর অ্যাকাডেমিক সর্বোচ্চ ডিগ্রি পিএইচডিও করেছেন। কিন্তু একসময় এই রাকাই আদিবাসী মানুষ, যারা বাস্তুচ্যুত, নিদেনপক্ষে জীবনযাত্রার খেই হারিয়ে ফেলার মুখে, তাদের অনির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি অগ্নিকে আদিবাসীদের পক্ষে আনতে কৌশলে তার সঙ্গে পরিচিতও হয় সে। যেখানে রাকার একমাত্র উদ্দেশ্য এই মানুষগুলোর প্রকৃতি-নির্ভরতা আর সহজ-সরল জীবনযাত্রার সঙ্গে অগ্নিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাতে অবশ্য কারোরই আপত্তি থাকার কথা নয়।

কিন্তু শূন্য অঙ্কর শেষ দিকে অগ্নির মুখে আদিবাসী এলাকায় স্কুল, কলেজ কিংবা হাসপাতাল খোলার কথা শোনার পরই রাকা যখন আনন্দে আটখানা হয়ে বলে ওঠে, বুঝলাম, এতদিনে তোমাদের কোম্পানির টনক নড়লো! আপত্তিটা ঠিক তখনই। কারণ, কর্পোরেট স্যোশাল রেসপন্সিবিলিটির নামে এভাবেই যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যুগ যুগ ধরে সাধারণ মানুষের চেতনায় নিজেদের ভালোত্ব আর মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে তাদের বন্দি করে। যেখানে আদিবাসীদের এই স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন অগ্নিদের উন্নয়নকে আরো সহজ করে দেয়, তা কি রাকার মতো একজন বুদ্ধিদীপ্ত সাংবাদিকের বোধগম্য ছিলো না! নাকি নিজের অজান্তেই রাকা পা বাড়ায় ক্ষমতা কাঠামোর সেই পেতে রাখা ফাঁদে? অবশ্য গৌতম ঘোষের শূন্য অঙ্কর রাকা বুঝতে না পারলেও বাস্তবের অরুন্ধতী ঠিকই বুঝেছিলেন, ক্যান্সার হাসপাতাল যখন বানাচ্ছে, কাছে-পিঠে বক্সাইটের পাহাড় আছেই আছে।

চোরে চোরে মাসতুতো ভাই

পাশ্চাত্যের কল্যাণ-এ বেশ কিছুকাল ধরে একটি নতুন শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে, যার নাম ভালো মুসলমান, যা কিনা ৯/১১ উত্তর দুনিয়ায় পুরোদস্তুর একটি রাজনৈতিক পরিচয়। তাই এই ভালো মুসলমানরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিম বিশেষ করে মার্কিন মুল্লুকের কাছে। তাদের সেই আত্মপরিচয়ের রাজনীতিরই প্রতিনিধিত্ব দেখা যায় শূন্য অঙ্কতে। যেখানে কবির ও লায়লা নামে দুটি ভিন্ন আদর্শের মুসলমান চরিত্র আছে। এই দুই পক্ষকে তিনি যথাক্রমে ভালোখারাপ মুসলমান হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন বলে মনে হয়। কিন্তু এই ভালো বা খারাপ মুসলমান কারা? পশ্চিমা তত্ত্ব মতে, মুসলমানকে প্রথমত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় যে, সে ইসলামি সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের পক্ষে না বিপক্ষে, বিশ্ব মানবতার পক্ষে না বিপক্ষে অথবা শিক্ষা-দীক্ষায় পাশ্চাত্যের পক্ষে না বিপক্ষে। ব্যস, তাহলেই নির্ধারিত হবে সে ভালো নাকি খারাপ মুসলমান?

মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামে হারাম বলে ঘোষিত মদ পানে কবিরের বাধা নেই। এমনকি স্ত্রী লায়লা তাদের ছেলের হত্যার জন্য অমুসলিমকে দোষারোপ করলেও সে কিন্তু নিশ্চুপ। নিশ্চুপতার মধ্যে লায়লাকে মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত করা যেনো কবিরের সেই ভালো মুসলমান হয়ে ওঠারই লক্ষণ। মুসলিম তথা সমগ্র মানবতাকে ভালোখারাপএই দুই ভাগে ভাগ করে নিজেকে ভালো মুসলমান প্রমাণ করার জন্য তার যে চেষ্টা, তা নিয়ে অন্তত আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু সেই ভালো মুসলমানই (কবীর চৌধুরী) যখন একটি সুপার হ্যাকিং সিস্টেম তৈরি করে পৃথিবীর সব যুদ্ধবাজ দেশের কম্পিউটারকে ধ্বংস করতে চায়, তখনই প্রশ্ন জাগে। কেননা, কবিরের মতো একজন ভালো মুসলমানের দ্বারা যে যুদ্ধ, সেই যুদ্ধ কোন্ যুদ্ধবাজ দেশের বিরুদ্ধে কিংবা এই যুদ্ধের ফলাফল কাদের পক্ষে যাবে (ভালো মুসলমান নাকি খারাপ মুসলমানের) তা নিয়ে যথেষ্টই সংশয়ের অবকাশ আছে।

আর এই সংশয়ের আরো কারণ আছে। কবির চৌধুরী তার গোপন সেই যুদ্ধের কথা এমন একজনের কাছে প্রকাশ করে যে কিনা সেই যুদ্ধবাজদেরই মদদপুষ্ট বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, অগ্নি। অথচ পাঠক, এই অগ্নি সেই ব্যক্তি, যে আদিবাসীদের মঙ্গল-এর কথা বলে তাদের উচ্ছেদ করার ছক আঁকে। আর বাজ পাখির মতো তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাদের ভগবানতুল্য সেই পাহাড়ে সন্ধান করতে থাকে বক্সাইট। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, কবির চৌধুরী এমন একজন ব্যক্তিকে তার হ্যাকিং ষড়যন্ত্রের কথা বলে দিলো কেনো? নাকি ধরে নিবো ভালো মুসলমান হওয়ার অন্যতম শর্তই নিজের গোপনীয় সবকিছুকে কুর্নিশ সহকারে অগ্নি তথা পশ্চিমাদের হাতে সমর্পণ করা? 

আমরা তো একই পথের পথিক

সুখে-দুঃখে থাকবো মোরা সঠিক

ঘৃণা-ক্লেদে পূর্ণ আজকের এই পৃথিবীতে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যে অসহিষ্ণুতা চলছে তার বিপক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি রয়েছে কেবল মানবধর্মের; যার সন্ধান প্রকৃতি, মানুষ ও লোকধর্মের মধ্যে করতে পারলে হয়তো আজ আমাদের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের অবসান ঘটতো। শূন্য অঙ্কতে গৌতম সেই শান্তির বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে মনে হয়। আর এই বার্তা দিতে গিয়ে তিনি মুসলমানদের যেভাবে উপস্থাপন করলেন তা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে। বিশেষত ৯/১১র টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনায় পুরো বিশ্বের রাজনীতিতে মুসলমানদের যেভাবে সন্ত্রাসী,  জঙ্গি বা মৌলবাদী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে; কোথাও হামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই যখন মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সন্ত্রাসীর তকমা, ঠিক তখন গৌতম ঘোষও একই পথে হাঁটলেন; তবে একটু ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। লায়লার বক্তব্যে যা আরো স্পষ্ট হয়।

ধর্মপ্রাণ মুসলমান লায়লা। ছেলে দারা যুদ্ধবিধ্বস্ত কাশ্মীরে ছবি তুলতে গিয়ে গুম হয়েছেন নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে। মা লায়লার বদ্ধমূল ধারণা ছেলের হত্যাকারী নিশ্চয়ই কোনো অমুসলিম। পাঠক, এখানেই সম্ভবত গৌতম তার রাজনীতির পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। কারণ, সারাবিশ্বে যেকোনো হামলার সঙ্গে যখন মুসলমানদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে, তখন গৌতম সেই নাটাইটিকেই ঘোরালেন, তবে একটু অন্যভাবে। যেখানে কোনো মুসলমানকে হত্যার জন্য মুসলমানকে দিয়েই তিনি দোষারোপ করিয়েছেন কোনো অমুসলিমকে। যা কিনা মুসলমানদের আরো বেশিমাত্রায় হিংস্র করে উপস্থাপন করে। আর এভাবেই চলতে থাকা মুসলিম-অমুসলিম দ্বন্দ্বটিকে ভয়ঙ্কর ধারালো করলেন গৌতম।

পুরো চলচ্চিত্রে লায়লাকে উপস্থাপন করা হয়েছে একজন সাম্প্রদায়িক ও কট্টর মুসলমান হিসেবে। অর্থাৎ যারা কিনা নিজের ভিতর সবসময়ই অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা আর সহিংসতার মানসিকতা পোষণ করে। তাইতো লায়লার কাছে হিন্দুরা কাফের, ডিসিপ্লিন বলে কিছু নেই; তাদের দেবতারাও নেশা করে। চারদিকে যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, যুদ্ধকালীন ভয়াবহতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, তখন মুসলমান-লায়লার এই হিংসাত্মক রেপ্রিজেন্টেশনের রাজনীতি প্রশ্ন জাগায়। অথচ আফগানিস্তান-ফিলিস্তিন-কাশ্মীর-ইরাক-সিরিয়া-মিসর-মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর পশ্চিমারা একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালালেও তা নিয়ে গৌতমের চলচ্চিত্রে কোনো কিছুরই ইঙ্গিত নেই!

অবশ্য আরেকটু খুঁজলে গৌতমের এই কৌশলী চিন্তাকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। এজন্য আমরা তার নির্মিত বহুল আলোচিত ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র মনের মানুষ-এর কিছু চরিত্রের দিকে নজর রাখতে পারি। যে লালন প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসকে এড়িয়ে চলতেন, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, সেই লালনকেই লালন চন্দ্র কর বানিয়ে হিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা দেখা যায়। এমনকি চলচ্চিত্রের শেষে দূরের প্রতিবেশী পাড়া থেকে যখন আজানের শব্দ ভেসে আসে, তখন হয়তো গৌতম আমাদের জানিয়ে দিতে চান মুসলমান বলেও আলাদা একটি জাতি আছে, যারা এদেশেরই বাসিন্দা। যার বীজ শূন্য অঙ্কতেও বপন করতে ভোলেননি তিনি।

বেঁধেছে এমন জীবন শূন্যের

উপর পোসতা করে

১৮ শতক কিংবা তারও আগে রাষ্ট্রকাঠামোয় রাজতন্ত্র অর্থাৎ রাজাই ছিলো সব ক্ষমতার উৎস। তখন কেউ রাজার বিরুদ্ধে গেলে কিংবা অপরাধী হলে কঠোর ও ভয়ানক শাস্তির ব্যবস্থা ছিলো। অপরাধীকে চাবুক, অগ্নিদহন, ফাঁসি, প্রস্তর নিক্ষেপ, মাটিতে অর্ধপ্রোথিত করে তিলে তিলে হত্যা করা হতো। আর সেই শাস্তিকে নানা তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে একটি দৃশ্যমান আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হতোউদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষকে দেখানো। কারণ, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তারা যেনো ভবিষ্যতে সেই কাজ মানে রাজার বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকে। ফুকোর ভাষায়, আধুনিক ক্ষমতা’ শুধু দমন বা অত্যাচার করে না। কোনটা সঠিক, কোনটা সত্য, কোনটা করা উচিত, কোনটা উচিত নয়, সেটিও নির্ধারণ করে দেয়। ফলে রাষ্ট্র পূর্বকে পশ্চিম বললেও সাধারণ মানুষ তা মেনে নিতো নির্দ্বিধায়। রাজতন্ত্রের সময়ে এভাবেই সাধারণ মানুষদের নিয়ে হোলি খেলতো ক্ষমতাবানরা।

রাজতন্ত্রের সেই শাস্তির বিধান বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও চালু আছে বহাল তবিয়তে, শুধু পরিবর্তন হয়েছে শাস্তির ধরনে। কারণ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার উৎস তো আর রাজা নয়, জনগণ। তাই রাজতন্ত্রের মতো প্রকাশ্য পীড়নরীতি মোটেও শোভন নয় আজকের শাসকদের জন্য। কেননা এতে করে যেসব লোক আসর জমিয়ে পীড়ন ও মৃত্যুদণ্ড উপভোগ করে তারা অধিক হারে অবাধ্য হয়ে পড়ে। বেমানান কিছু করে ফেলে। যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপকদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণি গণতন্ত্রের নামে অত্যন্ত সুকৌশলে সর্বত্র শোষণের হাত বাড়িয়ে দেয়, যার অন্যতম হাতিয়ার ভয়। আর জনগণের ভিতরে এই ভয়ের সংস্কৃতি চালু রাখতেই ক্রসফায়ারের মতো নানা ঘটনাকে দেওয়া হয় আইনের বৈধতা। কারণ, ভয়ের সংস্কৃতিই তো শাসনের অন্যতম নিয়ামক। যা কবি নজরুল তার সময়েই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, ওরা ভয় দেখিয়ে করছে শাসন, জয় দেখিয়ে নয়।

শূন্য অঙ্কতে যেমনটি আমরা প্রত্যক্ষ করি। যেখানে অগ্নির ভাই পবন বোস ও রাকা বিশ্বাসের মাওবাদী প্রেমিককে হত্যা করে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয় ভয়ের সংস্কৃতি; যা কিনা পরবর্তী সময়ে জন্ম দেয় অগ্নি বোসের মতো মানুষদের। অর্থাৎ রাষ্ট্র আপনার সামনে দুটি পথ বাতলে দিবে। যেখানে হয় পবন বোসের মতো নিশ্চিত মৃত্যু, নয়তো পবন বোসের পরিণতি দেখে ভয়ে অগ্নি বোস হয়ে ওঠা। তবে নিপীড়িত মানুষের জন্য লড়াই করে জীবন দেওয়া পবন বোসদের ছাপিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বেঁচে থাকা অগ্নি বোসদের শূন্যতা পূরণই যেনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দেয় গৌতমের এই চলচ্চিত্রে।

চলচ্চিত্রজুড়ে অগ্নির নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, পুলিশ কর্তৃক মাওবাদী সন্ত্রাসীদের হত্যার মধ্য দিয়ে বিধানগিরিতে বক্সাইট উত্তোলনে এম এন সির সম্ভাব্য সুযোগ, এমনকি ঝিলিকের বিমানবালা প্রশিক্ষক হয়ে ওঠা যেনো তারই প্রমাণ। অথচ শূন্য অঙ্কর আদ্যোপান্তে থাকা নিম্নবর্গের মানুষ অর্থাৎ আদিবাসীরা গৌতমের তুলিতে হয়ে উঠেছেন শূন্য অঙ্ক-এর যাত্রী। যারা সারাজীবন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাবে, রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে যাবে কিন্তু ফলাফল তাদের শূন্য ছাড়া আর কিছুই নয়। চলচ্চিত্রের শেষে প্রান্তিক অর্থাৎ আদিবাসীদের ওপর যৌথবাহিনীর হামলায় রাকা, সাবিত্রীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হয়তো গৌতম সে কথাই আমাদের জানিয়েছেন।

তাহলে গৌতম কি রাকা, সাবিত্রীর মৃতদেহ দেখিয়ে রাজতন্ত্রের সেই শাসকদের মতোই আবার জনগণের মধ্যে ভয়ের জন্ম দিতে চেয়েছেন? যেনো প্রান্তিক এই মানুষেরা নিজেদের অধিকার আদায়ের কথা বলতে কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস না পায়। এগুলো হয়তো কৌশলী গৌতমের শূন্য অঙ্কতেই সম্ভব! কেননা যদি তাই হতো, তাহলে যুগে যুগে রাকা, সাবিত্রীরা জন্ম নিতো না, হয়ে উঠতে পারতো না রাষ্ট্রঘোষিত সন্ত্রাসী। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন দেখা কিংবা পুনরায় নব-উদ্যমে জেগে ওঠা জিইয়ে না রেখে, গৌতম কেনো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই মানুষগুলোর জীবন শূন্যতায় ভরিয়ে দিলেন? তাহলে শূন্য অঙ্কহার না মানা মানুষেরা কি এরাই? তবে এরাই যদি তার চোখে হার না মানা মানুষ হতেন, তাহলে তাদের এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত তিনি অবশ্যই দিতেন। কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেলো না চলচ্চিত্রটিতে!  

যা না বললেই নয়

পাঠক, এতক্ষণের আলোচনায় গৌতমের শূন্য অঙ্কর দার্শনিক ও আধেয়গত যে অবস্থান, তা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। তাই চলচ্চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সহমত না হয়ে বলা যায়, এক মুঠো গুড়, এক চিমটি লবণ ও আধা লিটার পানি দিয়ে একধরনের স্যালাইন তৈরির চেষ্টা করেছেন গৌতম। যেখানে তিনি বলতে চেয়েছেন, ধর্ম সহিষ্ণুতা, সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন সংগ্রাম, নারী মুক্তি, এমনকি তৃতীয় বিশ্বের ওপর এম এন সির প্রভাব।

ওই সব বিষয়বস্তু উপস্থাপনে চলচ্চিত্রে যেসব চরিত্র আমদানি করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ভিতরেই কোনো না কোনো শূন্যতা জমাট বেঁধে ছিলো বলে মনে হয়েছে গৌতমের কাছে। তাই হয়তো তিনি বলেন, চলচ্চিত্রটি শূন্য দিয়ে শুরু, আবার শূন্য দিয়েই শেষ।১০ কিন্তু পাঠক, শেষ পর্যন্ত সবার ভাগ্যে কি সেই শূন্যতাই ছিলো? সাধারণ মানুষের শূন্যতার মধ্য দিয়েই কিন্তু অগ্নি, ঝিলিক ও কবির চৌধুরীর মতো উচ্চবর্গের মানুষের তিনি পূর্ণতা দিয়েছেন। তাই কবির সুমনের ক্ষোভকত হাজার মরলে পরে বলবে তুমি শেষে, বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।১১

 

লেখক : মেহেরুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

meherul.mcj@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. চৌধুরী, ফকরুল (২০০৭ : ১২৩); বিবিধ শাস্ত্রের তদন্তকারী; মিশেল ফুকো পাঠ ও বিবেচনা; সম্পাদনা : পারভেজ হোসেন; সংবেদ প্রকাশনা, ঢাকা।

http://goo.gl/5jkQnf

http://m.somewhereinblog.net/blog/Shams13/29751752

৪. রায়, অরুন্ধতী (২০১০ : ৯); পায়ে পায়ে কমরেড; ভাষান্তর : সীতাংশুশেখর, প্রমোদ গুপ্তা, পার্থ গোস্বামী; ন-হন্যতে প্রকাশ, কলকাতা।

৫. এ বিষয়ে আরো জানতে চাইলে পড়ুন : কাজী মামুন হায়দার সম্পাদিত ম্যাজিক লণ্ঠন-এর ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১১-তে প্রকাশিত আ-আল মামুনের মনের মানুষ : বেশরা ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে ভদ্দরলোকদের সূক্ষ্ম প্রেমের মর্ম বোঝা ভার!! প্রবন্ধটি।

৬. পারভেজ, রুবেল; রানওয়ে: একটি মুসলমানি চলচ্চিত্র; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; ৩য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৩, পৃ. ১৩৭, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

৭. আকাশ, এম এম (২০০৭ : ১৯৮); ক্ষমতা প্রশ্ন ও মিশেল ফুকোর মতামত; মিশেল ফুকো পাঠ ও বিবেচনা; সম্পাদনা : পারভেজ হোসেন; সংবেদ প্রকাশনা, ঢাকা।

৮. প্রাগুক্ত; চৌধুরী, ফকরুল (২০০৭ : ১২৩)।

৯. http://deshinewsbd.com/news/3631/ বিশেষ কলাম ওরা ভয় দেখিয়ে করছে শাসন, জয় দেখিয়ে নয়।

১০. http://archive.prothom-alo.com/detail/news/321466

১১. http://deshinewsbd.com/news/3631/ বিশেষ কলাম ওরা ভয় দেখিয়ে করছে শাসন, জয় দেখিয়ে নয়।

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ম্যাজিক লণ্ঠনের সপ্তম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন