কাওসার বকুল
প্রকাশিত ০৬ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পিতা : অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের সাম্প্রদায়িক উপস্থাপন
কাওসার বকুল
১.
শব্দ হিসেবে—জাত, জাতি, জাতীয়তা এগুলো একেবারেই নবীন। মানুষ যখন গুহায় কিংবা জঙ্গলে বসবাস করতো তখন শব্দগুলোর ব্যবহার ছিলো না। আদিম সাম্যবাদী সমাজের ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে ও দাস সমাজের শুরুর দিকে মানুষের মধ্যে আমিত্ব মানে এটি আমার—এ বোধ জন্মেছিলো। তারা যখন গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস করতো তখন জীবন-জীবিকার তাগিদে চলতো শিকার, অন্যদের ওপর আক্রমণ। পৃথিবীতে পাল্টা প্রশ্ন ছাড়া স্বার্থ আদায় করতে গেলেই প্রয়োজন পড়ে অস্ত্রের কিংবা সর্বজনের স্বীকৃতি। অস্বীকৃতি থেকেই বিশৃঙ্খলা; শুরু হয় যুদ্ধ। বিভিন্ন সময় জাতিতে-জাতিতে, দেশে-দেশে এমনকি দেশের অভ্যন্তরে এমন ঘটনার নজির ভুরি ভুরি।
দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর এই বাংলা শাসিত-শোষিত হয় পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমানে পাকিস্তান) দ্বারা। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থানের মতো আন্দোলন-সংগ্রাম সঙ্গে দমন-পীড়ন আর শেষে মুক্তিসংগ্রামের ফল আজকের স্বাধীন বাংলা। ৭১-এ স্বাধীন হওয়া এই বাংলার মানুষ মুক্তিসংগ্রাম ছাড়াও বারবার দিয়েছে একাত্মতার পরিচয়। অবিভক্ত বাঙালির যে সম্পর্ক তা মানুষে মানুষেÑসে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যে ধর্মেরই হোক। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সম্প্রীতি গড়েছিলো এই মানুষ। ব্রিটিশ রাজের চক্রান্তে ধর্মের ধোঁয়া তুলে ৪৭-এ দেশভাগ হলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এতে বর্তমানের বাংলাদেশ চলে যায় পাকিস্তানের অধীনে; নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান।
কিছু মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশভাগকে মেনে নেয়নি এখানকার সাধারণ জনগণ। তারা স্লোগান তুলেছিলো, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়/লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।’‘সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হিন্দু ও মুসলমান দুই ভিন্ন জাতি বলে ‘দ্বি-জাতি তত্ত্বের’ যে সূত্র রচনা করা হয়েছে তা বাংলার ক্ষেত্রে সঠিক ছিলো না।’১ এ ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলিমের আলাদা কোনো পরিচয় ছিলো না। উৎসব-পূজা-পার্বণে একাকার হয়েছিলো তারা। একের বিপদে অন্যের এগিয়ে আসা ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শত বছরের সান্নিধ্যের কারণে মুসলমান সমাজে কিছুটা হিন্দুদের প্রভাব পড়ে, একই কথা হিন্দুদের বেলায়ও; মুসলমানদের পবিত্র স্থান কাবা কিংবা নবী-সাহাবাদের সঙ্গে দেব-দেবীদের মেলানোর চেষ্টা করতো।
অনেকে আবার হিন্দুধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরও সংস্কৃতি ও আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের পুরনো ঐতিহ্যকে বহুলাংশে আঁকড়ে ধরে থেকেছে। আগের যুগে যারা পুঁথি, কাব্য রচনা করতেন তাদের মধ্যে মুসলমানরা কেউ কেউ জগন্নাথ, নারায়ণ, পদ্মা এমনকি সীতার বন্দনাও করেন। আবার কিছু কিছু মুসলমান আতশবাজি, চৈত্রসংক্রান্তি, দুর্গোৎসব ও কবরে বাতি জ্বালানোর মতো হিন্দু আচার অনুসরণ করতো। এমনকি দশরত, নারায়ণ, সুনীল, অমূল্য নামগুলো মুসলমানেরও ছিলো।
বাংলার হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির মিল পাওয়া যায় আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাসে। একসময় বাংলার পীর নামে খ্যাত সুফিরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের মধ্যেই বসবাস করতো। এই পীরদেরই কেউ কেউ সত্যপীর (যাকে হিন্দুরা সত্য নারায়ণ ভাবতো) হিসেবে সব মন্দের অবসানকারী এবং সব উন্নতির নির্ধারকে পরিণত হয়। মজার ব্যাপার হলো, গরিব মুসলমানরা হিন্দুদের পীর পূজায় অংশগ্রহণ করতো; তখনো হিন্দু-মুসলমান আলাদা জাতি হওয়াটা কোনো বাধ সাধেনি।
২.
৪৭-এ দেশভাগের পর আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভুগতে থাকা বাংলার মানুষ ‘বসন্ত জাগরণ’ করেছিলো ৫২-তে এসে। নানা দমন প্রতিরোধের পর ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ফুঁসে ওঠা বাঙালি বিস্ফোরণ ঘটায়। এই অসাম্প্রদায়িক বাংলার অসাম্প্রদায়িক মানুষ আবার তার সম্প্রীতির পরিচয় দিয়েছিলো ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। সেই মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১-কে নতুন প্রজন্মসহ সারাদেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রাখতে ভূমিকা পালন করছে বিভিন্ন মাধ্যম। ইতিহাস হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ সংরক্ষিত থাকছে মুদ্রণ, ইলেক্ট্রনিকসহ নানা মাধ্যমে। বই, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র, চলচ্চিত্র ইত্যাদিতে সংরক্ষিত আছে এসব ইতিহাস। সাধারণ যে ইতিহাস তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেবল উচ্চবর্গের কথা উঠে আসলেও সাধারণ মানুষের বৃহৎ অংশ থেকে গেছে আড়ালে আবডালে।
মূলত চলতি সাধারণ ইতিহাস যাদের হাতে নির্মাণ হয়, সেই কাঠামোই দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রেও। ফলে তৈরি হয়েছে কর্তৃত্ববাদী এক ইতিহাস। যেখানে রাষ্ট্র-উচ্চবর্গ-ক্ষমতাসীনরাই প্রতিভূ। ইতিহাসের এই সঙ্কট মুদ্রণ মাধ্যমকে ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমেও। আর এর সঙ্গে নানা মতাদর্শের নানা পথ-মত তো আছেই। রেডিও, টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্র মাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধের কর্তৃত্ববাদী ওই ইতিহাসের ব্যত্যয় ঘটেনি। বাংলাদেশের একমাত্র স্টুডিও এফডিসি এবং এর বাইরে নির্মাণ হচ্ছে বা হয়েছে এসব চলচ্চিত্র। মূলধারার খ্যাতনামা পরিচালক সেই খান আতাউর রহমান থেকে শুরু করে চাষী নজরুল ইসলাম, বিকল্পধারার আলমগীর কবির, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, তারেক মাসুদ, হালের রুবাইয়াত হোসেনসহ আরো অনেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন; এখনো করছেন অনেকেই। এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করেছেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি মুক্তিযুদ্ধে নিম্নবর্গের মানুষের উপস্থিতি, রাজাকার নির্মাণের চলতি গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভকে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। ৭১-এর ভুলের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, দাড়ি-টুপির উপস্থাপন, মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ—এসব বিষয়ে তার চলচ্চিত্র নতুন চিন্তার উদ্রেক করে।
চলচ্চিত্রের অনুমোদন, সেন্সরের ক্ষেত্রেও ক্ষমতার কর্তৃত্বপনা সমানভাবে কাজ করেছে। অবশ্য সেন্সর বোর্ড গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেও এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। তাই সরকারের লোক হিসেবে তাদের মতাদর্শিক অবস্থান টিকে রাখা বোর্ডের সদস্যদের ‘দায়িত্বের’ মধ্যেই পড়ে যায়। দায়িত্ব অবশ্য তারা পালনও করেন ঠিকঠাক। তাই সারাবিশ্ব জয় করলেও মাটির ময়নার মতো চলচ্চিত্র নিজ দেশে নিষিদ্ধ হয়। এমনকি বিশেষ এক নেতার বিশেষ কোনো পোশাক খলনায়ক পরার অপরাধে সেই চলচ্চিত্রটি আটকে দেয় সেন্সর বোর্ড। পরে পরিচালককে পুনরায় শুট্ করে সেন্সর অনুমোদন নিতে হয়। এমন ‘জাতীয়তাবাদী চেতনা’য় বিশ্বাসী সেন্সর বোর্ডের লোকজন চলচ্চিত্র নিয়ে আরো কী কী করতে পারে তা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না! একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে যে ডিসকোর্স তার বাইরে কিছু দেখলেই তাদের খটকা লাগে। আর যদি সেটি হয় সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র তাহলে নির্মাতাকে সংযোজন-বিয়োজন করতে হয় অনেক কিছুই। অবশেষে কাটাছেঁড়ার পর দেখা যায় নির্মাতার কল্পিত চলচ্চিত্র স্ব-বৈশিষ্ট্যে আর নেই। অবশ্য অনুদানের চলচ্চিত্র নিয়ে এ চিত্র নতুন নয়। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই সরকারের টাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে তাদের মতো করেই করতে হয়।
যাক সেসব কথা, সব বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের এতো বছর পরেও তাই ভালো চলচ্চিত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে হাতেগোনা। বিষয় বিবেচনায় পেশাদার চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা, চাষী নজরুল ইসলামের হাঙ্গর নদী গ্রেনেড ও মেঘের পরে মেঘ, তারেক মাসুদের মুক্তির গান ও মাটির ময়না, রুবাইয়াত হোসেনের মেহেরজান ছাড়া অন্যসব চলচ্চিত্রে অমিলের চেয়ে মিলই বেশি পাওয়া যাবে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ, খুন আর দাড়ি-টুপির নেতিবাচক উপস্থাপনেই বেশিরভাগ চলচ্চিত্র ভরা। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাত কোটি সাধারণ মানুষ প্রায় উপেক্ষিত। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেও রুবাইয়াত হোসেন মেহেরজান-এ দেখালেন—এক পাকিস্তানি সৈনিকের সঙ্গে বাঙালি মেয়ের প্রেম। তাতেই যতো ঝামেলা। কোনো এক ‘রহস্যজনক’ কারণে সেন্সর বোর্ড চলচ্চিত্রটি ছেড়ে দিলেও ‘সুশীল-মধ্যবিত্ত’ সমাজ চলচ্চিত্রটি গ্রহণ করতে পারেনি। মুক্তির পর পরই সর্বমহলে তা ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত হয়। অভিযোগ ওঠে চলচ্চিত্রটিতে মুক্তিযুদ্ধের ‘অবমাননা’র। সুশীল সমাজের এই মানুষগুলো দাবি জানায় চলচ্চিত্রটি বাতিলেরও। শিক্ষিত ‘আধুনিক’ লোকদের প্রতিক্রিয়ায় চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। চলচ্চিত্র ঘিরে এ রকম প্রতিক্রিয়া সত্যিই নতুন করে ভাবায়।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের যখন এই ন্যারেটিভ, ঠিক সেই সময় মাসুদ আখন্দ সরকারি অনুদানে নির্মাণ করলেন পিতা (২০১২)। আমার আলোচনার বিষয় পিতা। মূলধারার বাইরে এসে মাসুদের পিতা তৎকালীন সমাজকে কতোটা ধরতে পেরেছে কিংবা নিম্নবর্গের মানুষের উপস্থিতিইবা সেখানে কতোখানি? আবার কতোটা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থেকে কাজ করেছেন তিনি? আর জাতীয়তাবাদের চলতি ধারণা থেকেইবা কতোখানি বের হতে পেরেছেন? সর্বোপরি সেই সমাজের সঙ্গে আজকের সমাজকে মেলানোর চেষ্টা থাকবে আলোচনায়।
৩.
প্রভুত্ব দিয়ে শুরু করছি। আপনা আপনি প্রভু হয়ে ওঠা বা কাউকে দিয়ে প্রভু বলে স্বীকার করানোটা বিষয় হিসেবে একটু জটিলই। কেননা, ‘উচ্চস্থান বজায় রাখতে হলে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীকে প্রমাণ করতে হবে যে উচ্চস্থানে বসাটা তার ন্যায্য প্রাপ্য। অন্যদের দিয়ে স্বীকার করিয়ে নিতে হবে যে সামগ্রিক সামাজিক প্রয়োজনেই উচ্চ-নীচের তারতম্যটা জরুরি।’২ এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা থেকে রাষ্ট্র একধরনের অনুশাসন চালু করে। ফলস্বরূপ একই রক্ত মাংসে গড়া মানুষ হয়েও ‘ব্রাহ্মণ’ উঁচু জাতে আর ‘চামার’ পড়ে নিচু শ্রেণিতে। অনুশাসনের বিভিন্ন ফ্রেমে বেঁধে রাষ্ট্র মূলত মানুষের ওপর নজরদারি করতে চায়।
রাষ্ট্রই স্বাভাবিকভাবে বোঝাতে চায়—সব মানুষ সমান নয়; জন্ম থেকেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠী পৃথক। পৃথক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মধ্যে ঢুকে পড়ে স্বার্থ। স্বার্থ দ্বন্দ্বে হয় শ্রেণি, শ্রেণিবৈষম্য। এই বৈষম্য আবার মেনেও নিয়েছে সাধারণ-শোষিত শ্রেণি। অন্যভাবে বললে শাসকশ্রেণিই তাদের মস্তিষ্কে এটা পুশ করে। এর বাইরে তাদের কিছু চিন্তার সুযোগও থাকে না। আর সেখান থেকে সাধারণের মধ্যে জাগানো হয় উগ্র জাতীয়তাবাদ।
এখন প্রশ্ন—জাতীয়তাবাদী গোঁড়ামি ‘চেতনা’ কতোটা মঙ্গল বয়ে আনে? যদিও বিশ্বের কোথাও এই গোঁড়ামি দিয়ে মঙ্গল বয়ে আনার নজির নেই। অথচ এই আবেগ নিয়ে খেলা হয়েছে সবসময়। তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা আসলেও ঘুরেফিরে দু-এক জনকে নিয়েই টানা-হেঁচড়া হয়। আমরা একজনকে ঈশ্বরের পর্যায়ে নিয়ে যাই তো আরেকজনকে মূল্যায়ন করতেই চলে আসে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব।
এখন যদি জানতে চাই, ৭১-এ যে স্বপ্নে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিলো বর্তমানে তা হয়েছে কি না? হয়তো হয়েছে, হয়তো হয়নি—সেখানেও নানা মত। যদি বলেন কেনো এমন হলো? শুধু সীমানা, কাঁটাতার দিয়ে ভূখ- নির্ধারণ করে যে রাষ্ট্র তৈরি হয়, সেটা আর যাই হোক স্বপ্নের সেই রাষ্ট্র হয়ে ওঠে না; হওয়া হয়তো সম্ভবও নয়। কারণ, কেবল শাসক বদলেছে, শোষণ তো থামেনি। ব্রিটিশ, ইংরেজ, পাকিস্তানিদের শোষণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এখন শোষিত হচ্ছি স্বজাতির দ্বারা। অনেকটা মাহমুদুজ্জামান বাবুর ভাষায়, ‘ভিনদেশি সেই বর্গীরা মা নেই তো এখন ঘরে, এখন দেখি স্বজনের হাত বর্গী সেজে লুট করে’ এর মতো।
যে কারণেই স্বাধীনতার এতো বছর পরেও বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা হয়, প্রতিমা ভাঙচুর হয়। একে অন্যের বাড়িতে আগুন দেয়; সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধে। বিষয়গুলো নিয়ে রাষ্ট্র কিন্তু মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। বরং বিভেদটা আরো জটলা পাকিয়ে সমস্যাটাকে জিইয়ে রাখছে। সাম্প্রতিক রাষ্ট্রের চেহারাতো সেটারই জানান দিচ্ছে একের পর এক। রাষ্ট্রের ফাঁদে পড়ে ব্যক্তির নিজস্ব মত বলে কিছু থাকছে না। সবই এখন উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া; একধরনের ঘোরের মধ্যে ফেলে জনগণের দিন অতিবাহিত করা। এরপরও কি বলবেন সেই সম্প্রীতি আছে? যদি থাকে, তাহলে আবার একই প্রশ্ন—মন্দিরে হামলা হয় কেনো? কেনোইবা মূর্তি (কারো কাছে ঈশ্বর) ভাঙা হয়?
৪.
আইটি ব্যবস্থাপনায় স্নাতক মাসুদ চলচ্চিত্র নির্মাণের আশায় দীর্ঘ প্রবাস জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। উদ্দেশ্য কথাসাহিত্যিক, পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজ করা। কিন্তু চলচ্চিত্র সম্পর্কে বোঝাপড়া ভালো না-থাকায় হুমায়ূন আহমেদের পরামর্শে ফিরে যান সুইডেনে। পড়াশোনা শুরু হয় সুইডেনের ফিল্ম স্কুলে, বিষয় ‘স্পেশাল ইফেক্ট’। ফিরে এসে মাসুদ কাজ শুরু করেন হুমায়ূনের সঙ্গে। অভিনয় করেছেন তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ঘেটুপুত্র কমলায়। পিতা মাসুদের প্রথম কাহিনীচিত্র। এখানে তিনি পরিচালনার পাশাপাশি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন।
১৪ ডিসেম্বর ২০১২ সালে দেশের ৪০টি প্রেক্ষাগৃহে একসঙ্গে মুক্তি দেওয়া হয় পিতা। পিতার গল্প নিয়ে মাসুদ আখন্দ বলেন, ‘মা-বাবার মুখে যুদ্ধের গল্প ছোটবেলা থেকে শুনছি। তাই গল্প তৈরি করতে গিয়ে পটভূমি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে আনলাম। চরিত্র আর কাহিনীর মধ্য দিয়ে নাটকীয়তা সৃষ্টি করলাম। পিতা চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকে আমি একটু নতুন ভঙ্গিতে দেখাতে চেয়েছি। ...এখানে আমি দেখিয়েছি, পাকিস্তানিদের নৃশংসতায় সাধারণ মানুষ ভয় পেলেও আঘাতটি যখন তাদের সন্তানের ওপর এসে পড়ে, তখন জেগে ওঠেন পিতা, প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।’৩ মোটাদাগে চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে এই ছিলো পরিচালকের মন্তব্য। এবার একটু দেখে নিই চলচ্চিত্র পিতায় তিনি কী দেখিয়েছেন—
পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুপ্রধান প্রত্যন্ত ছয়আনি গ্রামের দুই দিনের ঘটনা নিয়ে গড়ে উঠেছে পিতার কাহিনী। ২৬ মার্চের গণহত্যার খবর জানে না এ গ্রামের কেউ। মুক্তিযুদ্ধের কোনো আঁচও নেই এই গ্রামে। কারণ গ্রামে একটি রেডিও থাকলেও সেটি চালাতে জানে না ওই রেডিওর মালিক। অন্যদিকে, বাজারে আগুন দেওয়া, নির্বিচারে মানুষ হত্যা আর দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়া শরণার্থীদের কথা শোনা যায়। গ্রামের হিন্দুরাও দেশ ছাড়ার জন্য পরামর্শ করতে থাকে। তবে হানাদার বাহিনীর ভয়ে মাতৃভূমি ছাড়তে নারাজ কেউ কেউ। এর মধ্যে গ্রামে হানা দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে তছনছ করে দেয় পুরো গ্রাম। নির্বিচারে হত্যা করে হিন্দু পুরুষদের, মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়। অন্ধ বিষু মারা পড়ে পাকিস্তানিদের হাতে। এ সময় ডোবার পানিতে লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করে জলিল ও তার তিন ছেলে। শরৎ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী পল্লবীকে নিয়ে লুকিয়ে থাকে গভীর জঙ্গলে। কিন্তু জঙ্গল থেকে বের হতেই ধরা পড়ে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। একদিকে পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার অন্যদিকে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এক পিতার গল্প।
চলচ্চিত্রের প্রতি যার এতো টান, হুমায়ূন আহমেদের মতো খ্যাতনামা পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা যার, চলচ্চিত্রটিকে ঘিরে যার এতো এতো স্বপ্ন, সেই নির্মাতার পিতা খুব আগ্রহ ভরে দেখেছি বেশ কয়েকবার। দর্শক-চোখে প্রথমবারের দেখায় চলচ্চিত্রটি বেশ ভালোই লেগেছিলো। কারণ এতে মাসুদ যে নাটকীয়তা সৃষ্টি করেছেন তা দর্শক মনে ‘সুড়সুড়ি’ দিতে বাধ্য। কয়েকবারের দেখায় অবশ্য কিছু কারিগরি গড়মিল চোখে পড়েছে। এক্ষেত্রে পরিচালকের সতর্কতা জরুরি ছিলো। এ বিষয়ে আলোচনায় আসবো একটু পরে। তার আগে চলচ্চিত্রের অন্যান্য বিষয়ের দিকে একটু দৃষ্টি ফেরাতে চাই।
ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার প্যাটার্ন লক্ষ করলে উচ্চবর্গের সরব উপস্থিতি এবং তাদের প্রতিভা ও কীর্তির ছটা উজ্জ্বল হতে দেখা গেলেও নিম্নবর্গের কিংবা নিম্নবর্ণের মানুষের ছায়া-ছোঁয়া ছাড়া আর কিছুই নেই সেটা আগেই বলেছি। যে দু-এক জন নিম্নবর্গের মানুষের কথা বলা হয়, খেয়াল করলে দেখা যাবে সেখানেও এরা কোনো না কোনোভাবে উঠে এসেছে উচ্চবর্গের হাত ধরে। সেই হিসেবে পিতা নিঃসন্দেহে পৃথক। চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা জলিল পেশায় কামার, তার পালক পিতা বিষু, দোকানি জয়ন্ত, শরতের পরিবার কিংবা গ্রামের কাউকেই উচ্চবর্গ বলতে পারি না। এরা সবাই সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ; ইতিহাসের নিম্নবর্গ। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের টানাপড়েন উঠে এসেছে চলচ্চিত্রটিতে। সর্বোপরি নিম্নবর্গের মানুষের যে উপস্থিতি চলচ্চিত্রের আধেয় জুড়ে, সে কারণে মাসুদকে অভিনন্দন।
৫.
পিতার শুরুতেই ভোরবেলা মহিষের গাড়িতে করে এক পরিবারকে কোথাও যেতে দেখা যায়। প্রথমে না বোঝা গেলেও পরে বোঝা গেলো, এরা ভারতে শরণার্থী শিবিরে যাচ্ছে। শুধু এরাই নয়, শরতের বাবার (জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়) মুখে শোনা যায়, কুমারপাড়ার সবার ভারতে রওনা হওয়ার খবর। তিনি নিজেও রাতের মধ্যেই গ্রাম ছাড়তে চান। তবে, মুশকিল হলো তার ছেলে শরৎ কোনোভাবেই জন্মভূমি ছাড়তে রাজি না। প্রয়োজন হলে শরৎ কুঁচ (মাছ ধরা দেশিঅস্ত্র) দিয়ে মিলিটারির সঙ্গে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত। শরতের মতো নিতাই ঠাকুরের মেয়ে শর্মিলী, জলিল কামার কিংবা ফকিরও গ্রাম ছাড়তে নারাজ।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা থেকে বাঁচতে পাড়ি জমায় ভারতে। তখনো দেশ মাতৃকার টানে পড়েছিলো অনেকেই। তারা এক এক করে সংগঠিত হয়েছে, নিজের জীবন-সর্বস্ব দিয়ে লড়ে গেছে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। পিতায় দেখি এ রকম কয়েকজনকে; যারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। শরৎ, মুকুল, রতনকে ফকির দাদার তৈরি হয়ে আসতে বলা দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না তারা কীসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শেষাবধি ফকির দাদা, শরতের মর্মান্তিক মৃত্যু হলেও বাকিদের কথা জানা যায় না।
একদিকে যেমন ভারতে পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যে নিতাই ঠাকুরের উঠোনে আলোচনা চলতে থাকে, সমানে চলে অন্ধ বিষুর সঙ্গে জলিল ও তার ছেলে-মেয়ের সম্পর্কের দোলাচল। অন্ধ বিষুর ছেলে জলিল; যাকে তিনি আদর করে লোহা নামে ডাকেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিষুর সঙ্গে মুসলমান ঘরে জন্ম নেওয়া জলিল ও তার সন্তানদের মধ্যকার সম্পর্কে বোঝা যায় না এদের মধ্যে ‘রক্তের’ সম্পর্ক নেই। হিন্দুপাড়ার একমাত্র মুসলমান কামার জলিল, যে কিনা বড়ো হয়েছে হিন্দুবাড়িতে। বিষুর বউয়ের ইচ্ছে ছিলো, তার মুখাগ্নি জলিলকে দিয়ে করানোর; কিন্তু ‘পতিত’ হওয়ার ভয়ে সেটি করা হয়নি। বিষুরও ইচ্ছা একই। তার ভাষায়, ‘অন্নজাত যদি পুত্র হইতে পারে, তাইলে সে ক্যান পুত্রের অধিকার পাইতো ন ভগবান, ক্যান পাইতো ন?’
পাঠক একটু খেয়াল করে লক্ষ করুন, এক ধর্মের মানুষ যেখানে অন্য ধর্মের মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না (যদিও সব ধর্মেই মানুষের স্থান সবার উপরে); একজনের ছায়া পড়লে অন্যের সবকিছু যেখানে ‘অশুচি’ হয়ে যায়; আবার কেউবা হয়ে যায় ‘অপবিত্র’; একজনের খাবারের প্রাণীটি অন্যের উপাস্য, যেখানে আবার অন্যের ধর্মে নিষিদ্ধ (হারাম) জীবও কারো আহারের প্রাণী—ঠিক সেখানেই হিন্দুবাড়িতে বড়ো হয় মুসলমানের সন্তান! এ রকম সঙ্কটের মধ্যে হিন্দুবাড়িতে মুসলমানের সন্তান বেড়ে ওঠা কিংবা বড়ো করে তোলা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। আর একটু গভীরভাবে দেখলে, ধর্ম ছাপিয়ে সম্পর্কের মাত্রা ঠিক কোন্ পর্যায়ে গেলে মুসলমান পালক-ছেলেকে দিয়ে কোনো হিন্দু ধর্মাবলম্বী তার শেষকৃত্য করাতে চান। সেখানে এক ‘ঈশ্বর’-এর কাছে নতজানু হয় আরেক ‘ঈশ্বর’।
একদিকে চলে জলিল ও তার পরিবারকে ঘিরে অন্ধ বিষুর সম্পর্কের দোলাচল, অন্যদিকে প্রসব বেদনা ওঠে শরতের স্ত্রীর। এমতাবস্থায় স্ত্রীকে সঙ্গে করে শরৎ তার পিতাসহ নিতাই ঠাকুরের বোনকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বের হয় পথে-জঙ্গলে। চারিদিকে শুধু মানুষের নিষ্প্রাণ দেহ পড়ে থাকতে দেখে কেবলই আঁতকে ওঠে শরতেরর স্ত্রী। অন্ধ বিষু মারা পড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। ডোবার পানিতে লুকিয়ে থাকা জলিল ও তার তিন ছেলে দেখে পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়িতে তার মেয়ে লিলাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। মেয়েকে বাঁচাতে গর্জে ওঠে পিতা; শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে জলিলের যুদ্ধ।
৬.
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতায় গ্রাম যখন শ্মশান, নিজেকে-নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে মানুষজন যখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটোছুটি করছে, ঠিক এ রকম মুহূর্তে আত্মরক্ষার জন্য লুকিয়ে থাকা জলিলের সামনে লাশ হয় তার বাবা। একদিকে বাবা, অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েকে। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে মেয়েকে বাঁচাতে জলিল ও তার বড়ো ছেলে জহির তৈরি হয় লড়াইয়ের জন্য; ছোটো ছেলে দুটোকে বাড়িতে রেখে পিছু নেয় পাক হানাদার বাহিনীর। এতক্ষণে এসে ধীর গতিতে চলতে থাকা চলচ্চিত্রটিও যেনো জলিলের ‘জ্বলে’ ওঠার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে; হঠাৎ করেই সবকিছু কেমন দ্রুত চলতে থাকে। ঠিক এই সময় জলিল হয়ে ওঠেন ‘বাংলাদেশ’। এরপর গেরিলাযোদ্ধা জলিল পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে একা লড়ে উদ্ধার করে আনেন মেয়েকে।
ঠিক যেভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে ৭১-এ লড়েছে এখানকার চাষা-দিনমজুর, নিরক্ষর মানুষ। সেসময় বিশ্বে সবচেয়ে প্রশিক্ষিত ছিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী; যারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। আর সাধারণ বাঙালি যুদ্ধ করেছে কৌশলে, খাবারে বিষ মিশিয়ে, দেশিঅস্ত্র (বল্লম, লাঠি, দা) ব্যবহার করে। যুদ্ধের কৌশল জানা সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে শিশু-বৃদ্ধ-নারীসহ নওজোয়ানরা। ছোটো বাচ্চাটিও তার পকেটে করে বুলেট বহন করে মুক্তিবাহিনীদের সহযোগিতা করেছে। নিজের সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ঘরে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে এখানকার বাঙালি নারী। আর চলচ্চিত্রে দেখি জলিল বল্লম, ফলা, হাঁসুয়া, তীর-ধনুক ব্যবহার করছে পাকিস্তানিদের মারতে। জলিলের এ যুদ্ধ একটা প্রতীকী লড়াই। মূলত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে জলিল একা নন, লড়েছে বাংলাদেশ। জলিল প্রতীক হয়ে লড়েছেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির।
পিতায় আট-দশজন পাকিস্তানি যেমন পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেছে; কয়েকজন স্বাধীনতা বিরোধী যেমন প্রতিনিধিত্ব করেছে আরো সবার, ঠিক একইভাবে জলিল প্রতিনিধিত্ব করেছে বাংলার সব মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষের লড়াই-সংগ্রামের। সেসময় দেশকে শত্রু মুক্ত করতে, হানাদার বাহিনীর কব্জা থেকে নিজেদের বোন-মা-স্বজনকে বাঁচাতে তারা যেমন লড়েছে, জলিলও লড়েছে দেশি অস্ত্র নিয়ে; উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে নিজের মেয়েকে। তাহলে পিতায় পিতা-জলিলের এমন উপস্থাপন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
৭.
সন্ধ্যা রাত। আগুন জ্বলছে কয়েক টুকরো কাঠে। সেই আগুনকে সামনে রেখে বিরাট বটগাছের তলায় বসে আছে ফকির দাদা, শরৎ, রতন, মুকুল আর ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা কবি। শরৎ, রতন আর মুকুলকে উদ্দেশ করে ফকির দাদা বলেন, ‘কাল সন্ধ্যায় তোরা তৈরি হয়ে আসবি, এক মাসের ট্রেনিং। অল্প কিছু কাপড়-চোপড় নিবি, বোঝা যতো ছোটো হয় চলাফেরা ততো সুবিধের।’ এ সময় কবি সাহেব আশ্চর্যান্বিত হয়ে ফকির দাদাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা যুদ্ধে যাবেন!’ ফকির দাদা যদিও কবি সাহেবের এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেননি তার পরেও বুঝতে অসুবিধা হয় না তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যাক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, আমার আলোচনা ঠিক অন্যখানে। প্রথমে আমরা শরৎ, রতন, ফকির দাদা আর কবি সাহেবের কথোপকথন একটু জেনে নিই—
শরৎ : আপনি কবি মানুষ (হাসি), আর আপনিই পলায়ে যাইতেছেন?
কবি : আমি ভিতু মানুষ, মৃত্যুকে ভয় পাই খুব। সব কাজ সবার জন্য না, সবার মানসিক শক্তিও এক রকম না।
রতন : কথাটা ঠিক কইছেন, সব কাম সবার লাইগা না।
শরৎ : হুম, ঠিক।
ফকির দাদা : না শরৎ, কথাটা ঠিক না। কবি সাহেব, বেয়াদবি নিয়েন না। ছোটো মুখে একটা কথা বলি, আপনাদের মতো শিক্ষিত জ্ঞানী লোক যারা শহরে ইস্কুল-কলেজে পড়ালেখা করছে, তারা যদি দেশ ছাইড়া পলায়্যা যান; তাইলে আমার মতো মূর্খ লোকেরা যাইবো কই?
কবি : জ্ঞানী-গুণীর সাথে সাহসের কোনো সম্পর্ক নাই।
ফকির : তাইলে জ্ঞানী হইয়্যা কী লাভ? গরিব মাইনসের টাকায় ইস্কুল-কলেজ চলে, আর সেই ইস্কুল-কলেজ থাইক্যা যদি শিক্ষিত সাহসী মানুষ বাইর না হয়, যদি গরিব মানুষের অধিকার নিয়্যা দুইটা কথা না কয়, যুদ্ধ দেইখ্যা পলাইয়া যায়, তাইলে কি উচিত কাম হয়, কন?
কবি : না, হয় না।
পাঠক, এতক্ষণে দুই পক্ষের যে আলোচনা তাতে বিভ্রান্তির অবকাশ আছে। সাধারণ চোখে ফকির দাদার কথাকেই যৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি যুক্তি কিংবা অযৌক্তিকতার প্রশ্ন নয়। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে আমরা আসলে সেসময় ঠিক কোন্ অবস্থার মধ্যে ছিলাম। আর সেটা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে পিছনে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের কেউ পাকবাহিনীর সঙ্গে লড়েছে সামনা-সামনি, কেউ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে মুক্তিবাহিনীকে। তাদের জন্য রান্না করে, গান গেয়ে, চিকিৎসা দিয়ে সহায়তা করেছে। এমনকি যে লোকটি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি গান লিখেছেন; তার যুদ্ধটিও খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চেয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার যারা চালিয়েছেন তাদের যুদ্ধ কোনো অংশে কম নয়; এমনকি তাদের জন্য চা বানিয়ে দেওয়া ছেলেটির যুদ্ধও। এক্ষেত্রে দেশের জন্য, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ কিংবা নিজের সাহস থাকা কতোটা জরুরি?
আর সবাই তো সম্মুখ যুদ্ধ করবে না; করার প্রয়োজনও নেই। তবে এ কথা সত্য যে, এখানকার অনেক শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী সেসময় দেশ ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তার পরও এদেশ ছেড়ে সব শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী পালিয়ে যাননি। এখানে দেশ মাতৃকার টানে পড়েছিলেন অনেকেই। শিক্ষিত, জ্ঞানী মানুষদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনীকে নানা পরামর্শ, দিক-নির্দেশনা দিয়ে পিছন থেকে সহযোগিতা করেছেন। কেউ কবিতা লিখে, কেউবা গান লিখে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। তারেক মাসুদের মুক্তির গান-এ আমরা দেখি—১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামে একটি দল গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের মনোবল বাড়ায়। তাদের এই প্রচেষ্টা কোনো অংশে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চেয়ে কম নয়। কেবল মুক্তিযুদ্ধই নয়, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব আন্দোলনেই তো শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে এক কাতারে। সব বুদ্ধিজীবীরাই যদি পালিয়ে যেতেন তাহলে পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের চক্রান্তে বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রয়োজন পড়তো না।
মাসুদের পিতায় দেখা যায় পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়ার পর কবি সাহেব মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া সবার কথা বলে দেন। এবারেও কবি সাহেবের (বুদ্ধিজীবী) নেতিবাচক উপস্থাপন। আগের দৃশ্যে স্বার্থপর হিসেবে কবি সাহেবকে দর্শকের সামনে হাজির করে, এবার তাকে আরো নিচে নামালেন মাসুদ! তার এই উপস্থাপন বড়ো ধরনের প্রশ্ন জাগায়।
আগেই বলেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় শিক্ষিত-বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই দেশে ছিলেন না। দেশের জন্য বিন্দুমাত্র চিন্তা না-করে তারা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন; পাড়ি জমিয়েছেন ভারতের উদ্দেশে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস কাটিয়েছেন আয়েশে। শরণার্থী শিবিরে যখন আশ্রয় নেওয়া সাধারণ বাঙালি তার স্বজনের লাশ সৎকারের জন্য দিশেহারা, সেই সময়েও অনেকে বিলাসবহুল জীবন-যাপন করেছেন। আবার অনেকে তো যুদ্ধের এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংক ডাকাতি থেকে অন্যায়-অপকর্ম করে সম্পদের পাহাড় তৈরি করেছেন। আর পাকিস্তানিদের দালালিও যে কেউ করেনি, এমনটি ভাববারও কারণ নেই। এসব বিষয়গুলোতো ছিলোই; অনেক রকম অভিজ্ঞতা, নির্মম বাস্তবতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। তার পরও এখানকার মুক্তিযোদ্ধা-বুদ্ধিজীবীরা দৃঢ় মনোবলে দেশের জন্য লড়ে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা। কবি সাহেবকে দেখে কিন্তু প্রথম শ্রেণি নয়, দ্বিতীয় শ্রেণির লোক বলেই মনে হয়েছে। অথচ মাসুদ জেনে-বুঝে নাকি ভুলে, কবি সাহেবকে প্রথম শ্রেণির বুদ্ধিজীবী বানিয়ে ফেললেন!
৮.
পিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মতি। চোখে সুরমা, পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা দাড়িওয়ালা মধ্যবয়সী; কাজ করেন জমাদার সাহেবের ডান হাত হিসেবে। মেয়েদের দিকে তার চাহনি অন্যরকম কী জানি বলে। জমাদার সাহেবের হয়ে সহযোগিতা করেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন রয়েছে, যারাও নিবেদিতপ্রাণ পাকিস্তানিদের সহযোগিতায়। মতির সঙ্গে তাদের কথোপকথনে বোঝা যায়—কেনো আর কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে সেটাই তারা জানে না। অথচ মতি তাদেরকে ‘ইসলামের জন্য’, পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য ‘জিহাদ’-এর কথা বলেন। ইসলামের দুর্দিনে মুসলমানদের পাশে থাকার আহ্বান জানান। এক সহযোগী কাশেম তাকে প্রশ্ন করেন—‘আমাগো লাভ কী?’ মতি উত্তর দেন, ‘এই বেকুবটায় কয় কী? যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, এখন সব ক্ষমতা মিলিটারিগো হাতে। আর যুদ্ধের জয় মানে বুঝোস?’ একজন আবার জিজ্ঞেস করে ‘যুদ্ধের জয় মানে আবার কী?’ এবার মতি বলেন, ‘...আরে যুদ্ধের জয় মানে শত্রুগো সব মালামাল আমাগো।’ আবার প্রশ্ন, ‘সব মাল আমাগো?’ মতির উত্তর ‘হ’। আরেকজনের জিজ্ঞাসা, ‘জমি জেরাত?’, ‘আরে হ, এমনকি হ্যাগো বউ-বেটিও আমাগো’।
সংলাপ শেষে ওই দৃশ্যেই সবাই হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। এর খানিক পরে শুরু হয় নির্বিচারে, নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা, দোকানপাট লুট, বাড়ি থেকে মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়া। ১৯৭১ সালে ইসলামের মুখোশ পরা কিছু লোক গনিমতের অপব্যাখ্যা তৈরি করে ধর্মের নামে এই জঘন্য কাজগুলো করেছে। মুসলমানদের সহযোগিতার নামে খুন, লুটপাট, ধর্ষণ করেছে নির্বিচারে।
এ সবই বুঝলাম, মানলাম। কিন্তু মাসুদের চলচ্চিত্রে তো কোনো সাধারণ মুসলমানের উপস্থিতি চোখে পড়লো না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় খুনি-ধর্ষক-লুটপাটকারি এই ক্যাটাগরির বাইরেও তো ছিলো সাধারণ মুসলমানের এক বৃহৎ অংশ। যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শত্রু না-ভেবে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে; হাতে হাত রেখে শপথ করে একই খাবার ভাগ করে খেয়ে দেশের জন্য লড়ে গেছে। সেই সব সাধারণ মানুষ (মুসলমান) তাহলে কোথায় গেলো? নাকি সেই গ্রামে কোনো সাধারণ মুসলমান ছিলো না; আর চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট হিসেবে ওই গ্রামকেই বা কীভাবে-কেনো বেছে নিলেন মাসুদ, যেখানে সাধারণ মুসলমান থাকলো অনুপস্থিত। ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাংলার সব মুসলমানই কি তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলো? মাসুদের পিতা দেখে কিন্তু তেমনটি মনে হতে পারে।
৯/১১’র পর যখন বিশ্ব রাজনীতির জন্য মুসলমানদের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে; মনে করা হচ্ছে মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী, বোমাবাজ। পুরোবিশ্ব যখন মুসলমানদের নিয়ে এই ডিসকোর্সে মেতেছে, ঠিক সেই সময় মাসুদও একই পথে হাঁটলেন। তিনি ২০১২-তে দাঁড়িয়ে ১৯৭১-কে ব্যাখ্যা করলেন। অর্থাৎ বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতকে দেখলেন বর্তমানের মতো করে। কিন্তু অতীতকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতের ব্যাখ্যা দিতে হলে আপনি যে বর্তমানের মানুষ সেটা ভুলে যেতে হবে। অথচ, মাসুদ হাঁটলেন তার ঠিক উল্টো পথে। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, চলতি দাড়ি-টুপি, মুসলমানের যে ডিসকোর্স তারই প্রতিফলন ঘটলো মাসুদের চলচ্চিত্রেও। সময়টাকে ঠিকমতো ধরতে ব্যর্থ হলো পিতা।
আবার জলিলকে কিন্তু মাসুদ রাখলেন হিন্দু বিষুর ঘরেই। তার মানে কী, একজন মুসলমানের সন্তান বেড়ে উঠছে হিন্দুর বাড়িতে। অন্যভাবে বললে একজন হিন্দু নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিচ্ছে মুসলমানের সন্তানকে। সেই সন্তানকে ঘিরে পালক পিতার কামনা-বাসনার কথা অবশ্য উপরে আলোচনা করেছি। তবে প্রশ্ন হলো, কেবল একপক্ষ ভালো হলেই কি এ রকম সম্পর্ক তৈরি কিংবা গড়ে ওঠা সম্ভব? এক্ষেত্রে উভয়েরই আন্তরিকতা কি জরুরি নয়? মাসুদের পিতা তো সে আন্তরিকতার জানান দেয় না; বিপরীতে বিদ্বেষের কথাটা যতোটা খোলাখুলি তুলে ধরে! তার মানে কেবল একপক্ষ অর্থাৎ হিন্দুরাই কি সম্প্রীতির ক্ষেত্রে আন্তরিক ছিলো?
তাছাড়া পুরো চলচ্চিত্রে যে একজন ভালো মুসলমানকে দেখানো হলো সে কিন্তু হিন্দুবাড়িতে বেড়ে ওঠা জলিল। অর্থাৎ হিন্দুবাড়িতে বেড়ে ওঠার কারণে তার চিন্তা-ভাবনাও তৈরি হয়েছে হিন্দুদের মতো করে। আর পিতার কাহিনী যে গ্রামকে ঘিরে, মাসুদ বেছে নিলেন তার একটি পাড়া। তাহলে প্রশ্ন—তিনি হিন্দুপাড়া কেনো বেছে নিলেন? আর হিন্দুপাড়া বেছে নিলেও মুসলমান কেনো সেখানকার হিন্দুবাড়িতে? খুব পরিকল্পিতভাবেই মাসুদ এটা করেছেন; তাল মিলিয়েছেন সময়ের সঙ্গে, তবে ধরা পড়ে গেছেন পশ্চিমা ডিসকোর্সের ফাঁদে।
৯.
আগেই চলচ্চিত্রের টেকনিকাল ও কারিগরি দিক নিয়ে কথা তুলেছিলাম। এবার একটু বিস্তৃত করি। পিতা যেহেতু মাসুদ পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র, তাই এর টেকনিকাল ও কারিগরি দিক নিয়ে ভুল খোঁজাটা বোধ হয় ঠিক হবে না। তার পরও সব মিলে পিতা নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছি। চলচ্চিত্রের শুরুতেই টাইটেল কার্ডের সঙ্গে হালকা আলোয় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিময় ছবি এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীত চলচ্চিত্রটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।
চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে গ্রামের দোকানি জয়ন্তের স্ত্রী, শর্মিলী, জলিলের মেয়ে লিলাসহ আরেকজনকে রাস্তার পাশের ডোবা থেকে জল আনতে দেখা যায়। এ সময় লো-অ্যাঙ্গেল শটে সবার মুখ ধোয়ার দৃশ্য আলাদাভাবে দেখানোর পাশাপাশি কলসে জল ভরার দৃশ্য দেখানো হয় মাস্টার শটে। কলসে জল নিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় লিলা দাঁড়িয়ে যায়; এ সময় লিলার সঙ্গে ক্যামেরাও থেমে যায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। লিলা পিছন ফিরে তাকায়; ক্যামেরাও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে খালের ওপারের রাস্তায় মহিষের গাড়িতে থাকা এক পরিবারের কাছে। এছাড়া জলিলের বাড়িতে নেওয়া প্রথম দৃশ্যে ক্রেনে করে টিল্ট ডাউন শটে পুরো বাড়ির অসাধারণ উপস্থাপন চোখে পড়ে—সবগুলো ক্ষেত্রে সাইফুল শাহীনের ক্যামেরা সঞ্চালনা ভালো লেগেছে।
তবে সম্পাদনায় বেশকিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে, সমস্যা আছে ধারাবাহিকতাতেও। রতনের সঙ্গে শরতের বাজার থেকে ফেরার দৃশ্যে রাস্তায় এক শিশু তাকে নমস্কার জানায়। পরের শটে শরৎ রতনের সঙ্গে আলাপ করতে করতে বাঁশের সেতুর উপর দিয়ে পার হয়। অথচ শিশুটির সঙ্গে কথোপকথনের যে রাস্তা সেটা আসলে সেতু পারের পরই পাওয়া যাবে। সেতু পারের আগেই সেখানে কথোপকথন সেরে ফেলেন পরিচালক।
পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের সময় জলিল তার তিন ছেলেকে নিয়ে যে ডোবার পানিতে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করে; সেটা যে সেট, এটা দর্শকের বুঝতে একটুও অসুবিধা হয় না। বাড়ির পাশে একটা জায়গায় গর্ত খুঁড়ে সেখানে কিছু কচুরিপানা ছেড়ে দিলেই সেটা আর যাই হোক বিশ্বাসযোগ্য ডোবা হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে শিল্প-নির্দেশকের সতর্কতা জরুরি ছিলো। এছাড়াও কারিগরি গড়মিল রয়েছে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে জলিলের মেয়েকে বাঁচানোর লড়াইয়ে। এক শটে মাসুদ দেখালেন জলিলের ছেলে শামসু পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেনের পায়ে তীর মারলো। তীর লাগলো পিছন থেকে আর পাক সেনারা গুলি করতে লাগলো সামনের দিকে। এখানেও পরিচালক সচেতনতার পরিচয় দেননি।
১০.
আলোচনার শুরুতে অসাম্প্রদায়িক বাংলার তৎকালীন চিত্র তুলে ধরেছিলাম। পাশাপাশি চেষ্টা করেছি হিন্দু-মুসলমানের যে পারস্পরিক সম্পর্ক সেটাও দেখানোর। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো হিন্দু-মুসলিম আলাদা কিছু ছিলো না; গানের ভাষায় ‘...তারা হিন্দুও নয়/মুসলিমও নয়/তারা শুধু বাঙালি।’ হিন্দু কিংবা মুসলিম নয়, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে স্বপ্নবান বাঙালিরা। অথচ মাসুদের পিতায় বাঙালি মুসলমান মুক্তিযোদ্ধার বৃহদাংশের যে অংশগ্রহণ, তা একেবারেই অনুপস্থিত। তিনি মুক্তিযুদ্ধের গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বাইরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয়েছে; কিন্তু এটা কোন্ ধরনের বাইরে দাঁড়ানো?
অথচ আজকের বাংলাদেশে চলতি ডিসকোর্সের বাইরে গিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলার যে মুক্তিযুদ্ধ সেটার যথাযথ চিত্রায়ণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে ওই সময়টাকে ধরা বা সেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাকে দেখানোটা ছিলো জরুরি। তবে পিতা কি সেই কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে?
লেখক : কাওসার বকুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
bokulmcj71@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. শাহ, মোহাম্মদ (১৯৯৩ : ৭১২); ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি’; বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ৩; সম্পাদনা—সিরাজুল ইসলাম; এশিয়াটিক প্রেস, ঢাকা।
২. চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০০ : ৯১); ‘জাত-জাতি-জাতীয়তা’; ইতিহাসের উত্তরাধিকার; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩. ‘বাবার কথা ও মুক্তিযুদ্ধ’; প্রথম আলো, ১৩ ডিসেম্বর ২০১২।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন